মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫
আলহামদুলিল্লাহ বলার ফজিলত
শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫
একগুচ্ছ মুক্তাদানা: দ্বীনে ইসলামীর সৌন্দর্য
শিরোনাম, অনুচ্ছেদ ও উদ্ধৃতি সব মিলিয়ে যেন এটি শ্রুতিমধুর ও হৃদয়স্পর্শী হয়।
🌿 একগুচ্ছ মুক্তাদানা: দ্বীনে ইসলামীর সৌন্দর্য 🌿
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইসলাম — আল্লাহ প্রদত্ত পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এটি এমন এক দীপ্তিময় পথ, যেখানে মানুষের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি চিন্তা, এমনকি হৃদয়ের অনুভূতিও আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে সংযুক্ত। ইসলামের প্রতিটি দিক যেন একেকটি মুক্তাদানা—যা মিলেমিশে গড়ে তোলে সৌন্দর্য, শৃঙ্খলা ও শান্তির এক অপরূপ মালা।
🌸 ১. তাওহীদ — একত্ববাদের মুক্তা
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ, অর্থাৎ এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস। তিনি এক, অদ্বিতীয়, সকল শক্তি ও নিয়ন্ত্রণের একমাত্র মালিক। মানুষ যখন এই তাওহীদের মর্ম উপলব্ধি করে, তখন তার অন্তর মুক্ত হয় ভয়, অহংকার ও নির্ভরতার শৃঙ্খল থেকে।
“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।”
— (সূরা আল-ইখলাস ১)
🌿 ২. সালাত — আত্মার প্রশান্তির মুক্তা
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শুধু ইবাদত নয়, বরং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার এক অনন্য মাধ্যম। নামাজ মানুষকে আল্লাহর নিকটে নিয়ে আসে, হৃদয়ে সৃষ্টি করে শান্তি ও বিনয়।
“নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।”
— (সূরা আল-আনকাবুত ৪৫)
💧 ৩. যাকাত — সামাজিক ন্যায়ের মুক্তা
যাকাত মুসলমান সমাজে সম্পদের ভারসাম্য রক্ষা করে। এটি ধনীর হাতে সম্পদকে গেঁড়ে বসতে দেয় না; বরং দরিদ্রের মুখে এনে দেয় হাসি, সমাজে আনে সমতা।
এর মাধ্যমে মুসলিম সমাজে তৈরি হয় ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতার বন্ধন।
🌙 ৪. রোজা — আত্মসংযমের মুক্তা
রমজানের রোজা মানুষকে শেখায় সংযম, ত্যাগ ও ধৈর্য। ক্ষুধা ও পিপাসার মধ্যেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে সংযত রাখার প্রশিক্ষণ দেয়।
“হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর করা হয়েছিল, যাতে তোমরা সংযমী হতে পারো।”
— (সূরা আল-বাকারা ১৮৩)
🕋 ৫. হজ — ঐক্য ও আত্মসমর্পণের মুক্তা
হজ মুসলমানদের বিশ্বজনীন মিলনমেলা। সেখানে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সকলেই এক পোশাকে, এক দেহভঙ্গিতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়।
এই দৃশ্য মানবতার এক মহান বার্তা বহন করে — সবাই আল্লাহর বান্দা, সবাই সমান।
এখানেই ফুটে ওঠে ইসলামের ঐক্যের মহিমা।
🌺 ৬. উত্তম চরিত্র — ইসলামের সৌন্দর্যের পরিপূর্ণতা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন —
“তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম, যার চরিত্র সর্বোত্তম।”
— (সহীহ বুখারী)
সত্যবাদিতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, বিনয় — এই গুণগুলো ইসলামের আসল অলংকার।
একজন সত্যিকার মুসলিমের জীবন যেন সুগন্ধ ছড়ানো ফুলের মতো — যেখানে যায়, সেখানে শান্তি ও সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে।
✨ উপসংহার
ইসলাম শুধুই কিছু নিয়ম বা আচার নয়; এটি এক সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা —
যেখানে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি দয়া, আর আত্মার প্রশান্তি মিলেমিশে তৈরি করে সৌন্দর্যের এক মহিমান্বিত চিত্র।
এই একগুচ্ছ মুক্তাদানা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় —
“ইসলামই শান্তি, ইসলামই সৌন্দর্য, ইসলামই মুক্তির পথ।”
ইসলাম একত্ববাদের ধর্ম
নিচে “ইসলাম একত্ববাদের ধর্ম” বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, শ্রুতিমধুর ও ইসলামিক প্রবন্ধ দেওয়া হলো — যা বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা বা ইসলামিক ক্লাসে পাঠের জন্য একদম উপযোগী ভাষায় লেখা হয়েছে 👇
🌙 ইসলাম — একত্ববাদের ধর্ম
✨ “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” — মানবতার মুক্তির বার্তা
🌿 ভূমিকা
পৃথিবীতে অনেক ধর্ম, দর্শন ও বিশ্বাসের পথ আছে।
কিন্তু ইসলাম এমন এক ধর্ম যা একত্ববাদে (তাওহীদে) অটল, স্পষ্ট ও বিশুদ্ধ।
“ইসলাম” শব্দের অর্থই হলো — আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
যে ধর্ম মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতে আহ্বান করে,
সব রকম শির্ক, মূর্তিপূজা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখে —
সেই ধর্মই ইসলাম।
🕋 ইসলাম ও একত্ববাদের মূলনীতি
ইসলামের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এক মহান বাক্যে —
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”
অর্থাৎ —
“আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।”
এই ঘোষণাই ইসলামের আত্মা।
এতে নিহিত রয়েছে জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য দিকনির্দেশনা —
কেননা, যদি আল্লাহই একমাত্র প্রভু হন, তবে
তাঁরই হুকুমে জীবন পরিচালিত হবে, তাঁরই সন্তুষ্টিই হবে মানুষের লক্ষ্য।
📖 কুরআনের দৃষ্টিতে একত্ববাদ
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন —
“বল, তিনিই আল্লাহ, একক।
আল্লাহ অমুখাপেক্ষী।
তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি।
আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।”
— (সূরা আল-ইখলাস, ১১২: ১–৪)
এই সূরাই ইসলামের একত্ববাদী বিশ্বাসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী ব্যাখ্যা।
এখানে আল্লাহর একত্ব (তাওহীদ), অমুখাপেক্ষিতা, ও অতুলনীয়তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
🌍 একত্ববাদের মানবিক বার্তা
ইসলামের একত্ববাদ শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়,
এটি মানব সমাজে ন্যায়, সমতা ও শান্তির ভিত্তি।
যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে —
সৃষ্টিকর্তা এক, তিনিই সবার প্রভু —
তখন জাত, বর্ণ, শ্রেণি বা সম্পদের বিভাজন অর্থহীন হয়ে যায়।
কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।”
— (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)
🌺 নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর দাওয়াত
নবী করিম ﷺ মানবজাতিকে আহ্বান করেছেন এক আল্লাহর ইবাদতে,
অন্যায়, মূর্তিপূজা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে দূরে থাকতে।
তাঁর বাণী ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার:
“হে আমার জাতি! তোমরা বল ‘আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই’, তাহলেই তোমরা সফল হবে।”
এই আহ্বান ছিল শুধু ধর্মীয় নয়,
এটি ছিল নৈতিক, সামাজিক ও আত্মিক স্বাধীনতার বার্তা —
কারণ যে ব্যক্তি কেবল আল্লাহকে মানে,
সে আর কারও দাস নয়।
⚖️ তাওহীদের তিনটি দিক
ইসলামী আকীদায় একত্ববাদ তিনটি স্তরে বিবেচিত হয় —
1️⃣ তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ব):
আল্লাহই সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও নিয়ন্ত্রক।
2️⃣ তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে একত্ব):
শুধু আল্লাহরই ইবাদত হবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করা যাবে না।
3️⃣ তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত (নাম ও গুণে একত্ব):
আল্লাহর নাম ও গুণাবলী অনন্য —
তাঁর মতো কেউ নেই, তাঁর কোনো অংশীদার নেই।
🕊️ একত্ববাদের প্রভাব
ইসলামের একত্ববাদ মানুষকে—
-
অহংকার থেকে মুক্ত করে (কারণ সবকিছু আল্লাহর দান)
-
ভয় থেকে মুক্ত করে (কারণ ক্ষতি ও উপকার একমাত্র আল্লাহর হাতে)
-
নৈতিক শক্তি প্রদান করে (কারণ সবকিছুর জবাবদিহি আল্লাহর কাছে)
এভাবেই তাওহীদ শুধু বিশ্বাস নয়,
একটি জীবনব্যবস্থা, একটি চেতনা, একটি শান্তির পথ।
🌷 উপসংহার
ইসলাম হলো সেই আলোর দিশা যা মানুষকে বহু দেবতা, বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে এক আল্লাহর দিকে নিয়ে আসে।
একমাত্র আল্লাহই প্রভু,
তাঁরই বিধান মানলেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব —
ব্যক্তি জীবনে, সমাজে, ও বিশ্বে।
“নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু — সবই আল্লাহর জন্য, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।”
— (সূরা আল-আনআম, ৬:১৬২)
🕋 শেষ কথা
ইসলাম একত্ববাদের ধর্ম —
যে ধর্ম মানুষকে এক আল্লাহর দাসত্বে,
এক মানবতার বন্ধনে,
এবং এক শান্তির পথে আহ্বান জানায়।
✨ “তাওহীদই মানবতার মুক্তি,
বহুত্ব নয়, একত্বেই শান্তি।” ✨
জাবালে রহমত” (আরাফাতের পাহাড়) সম্পর্কে ইসলামি ঐতিহ্য ও ইতিহাস
“জাবালে রহমত” (আরাফাতের পাহাড়) সম্পর্কে ইসলামি ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংক্রান্ত সবচেয়ে معتبر দৃষ্টিভঙ্গা নিচে তুলে ধরা হলো — যদি চান, পয়েন্ট আকারে সংক্ষিপ্ত সারমর্মও দিতে পারি।
🕌 “জাবালে রহমত”-এর পরিচিতি
-
আরাফাত ময়দান-এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একটি পাহাড়, যাকে আরবি ভাষায় বলা হয় جبل الرحمة (Jabal ar-Rahmah), অর্থ “রহমতের পাহাড়।”
-
মক্কা শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। হজ্বের নবি (সা.)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণও এই আরাফাত ময়দানের এমন একটি অংশ থেকে দেওয়া হয়েছিল।
📜 ইসলামি ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রগত তথ্য
-
“জাবালে রহমত” বাংলা ভাষায় “রহমতের পাহাড়” নামে বেশি পরিচিত; আরবীতে তা “Jabal ar-Rahmah” বা “Jabal ar-Rahmah/Jabal ar-Rahma” বলা হয়।
-
হাদিস বা কোরআনিক উৎসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নেই যে, নবী মুহাম্মদ (সা.) এই পাহাড়ে আরোহণ করেছেন বা এর চূড়ায় বিশেষভাবে দোয়া-অনুরোধ করেছিলেন যা হজ্বের অবশ্যই পালনীয় রীতিতে পরিণত হয়েছে।
-
অনেক সাধারণ মুসলিমরা হজ্বের সময় এই পাহাড়ে যায় এবং উপরে উঠতে চায়, দোয়া করে। তবে ইসলামী আইন ও শাস্ত্রবিদরা বলছেন, এই কাজ কোনো প্রমাণিত সুন্নত নয় এবং কোনো শংসাপত্র নেই যে, পাহাড়ে ওঠা হয় একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে।
↔️ কিংবদন্তি ও লোক বিশ্বাস
-
একটি প্রচলিত বিশ্বাস আছে যে, হযরত আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ) প্রথমে উত্তরা হয়ে পাথরের এই পাহাড়ে মিলিত হয়েছিল পৃথিবীতে নেমে আসার পর।
-
একইভাবে, অনেক হাজি ও অন্যান্য মুসলমান এই পাহাড়ে গিয়ে অতিরিক্ত দোয়া ও ইবাদত করার চেষ্টা করেন, বিশেষত ‘আরাফার দিন’–এ, কারণ তারা মনে করেন এটি দোয়া কবুল হওয়া স্থানগুলোর মধ্যে একটি।
⚠️ ইসলামিক আইন-দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কতা
-
ইসলামের শিক্ষাবিদগণ সাধারণভাবে মনে করেন যে, পাহাড়ে উঠা ও সেটাকে কোন রীতি বা আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনীয় অংশ বানানো (হজ্বের ক্ষেত্রে) ইনোভেশন (বেদনাদায়ক নতুন সংস্কার) হবে যদি এটি বিশ্বাস করা হয় যে, পাহাড়ে ওঠা বাধ্যতামূলক বা বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কাজ। (
-
ইমাম নাওয়াওয়ী এবং অন্যান্য স্কলাররা বলেছেন, “জাবালে রহমত”-এর প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে — এমনকি কেউ কেউ ভাবেন যে আরাফাতে হজ্ব করা হলে যদি জাবালে রহমত-এ দোয়া না করে তবে হজ্ব সম্পূর্ণ হয় না — যা শাস্ত্রগত ভিত্তিহীন ধারণা।
✅ শিক্ষা ও সারমর্ম
-
বিশ্বাস ও ইতিহাসের পার্থক্য বুঝতে হবে — লোককথা ও প্রচলিত বিশ্বাস সব সময় শাস্ত্রের সঙ্গে মেলে না।
-
আনুষ্ঠানিক হাদিস বা শেয়খানি প্রমাণ ছাড়া কোনো কাজকে রীতিতে পরিণত করা উচিত নয়।
-
আরাফাত ময়দান সম্পূর্ণভাবে নিজেই গুরুত্ব রাখে — দাঁড়িয়ে থাকা (وقفۃ আরাফা) হজ্বের অন্যতম নিয়ামত — অতিরিক্ত কোনো স্থান-বিশেষের দৃষ্টিভঙ্গা দাওয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
-
ভক্তি ও দোয়া করতে অংশগ্রহণ করা ভালো, তবে সেটা যেন কোন বাধ্যবাধকতা বা সূন্নাতের প্রতি অতিরিক্ত বিশ্বাসে রূপান্তরিত না হয়।
নিশ্চয়ই 🌿
নিচে “জাবালে রহমত (রহমতের পাহাড়)” বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, ইসলামিক ও শ্রুতিমধুর প্রবন্ধ দেওয়া হলো — যা মসজিদে আলোচনা, স্কুল-কলেজে ইসলামিক পাঠ, বা দাওয়াতি লেকচারে পাঠের উপযোগী ভাষায় লেখা হয়েছে।
🌸 জাবালে রহমত (রহমতের পাহাড়)
— এক করুণাময় স্মৃতি ও শিক্ষা
🌄 ভূমিকা
পৃথিবীর বুকে কিছু স্থান আছে যেগুলো শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, বরং আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অসীম মর্যাদার অধিকারী।
তেমনই এক ঐশী স্থান হলো “জাবালে রহমত”, অর্থাৎ রহমতের পাহাড়।
এটি অবস্থিত আরাফাত ময়দানে, মক্কা শরিফের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।
প্রতি বছর লাখো হাজি এই ময়দানে এসে আল্লাহর দরবারে অশ্রুসিক্ত হয়ে দাঁড়ান, আর তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
🕋 জাবালে রহমতের ইতিহাস
আরবী শব্দ “জাবাল” মানে পাহাড়, আর “রহমত” মানে করুণা বা দয়া।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই পাহাড়েই আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম করুণায় আদম (আঃ) ও হাওয়া (আঃ)-কে পৃথিবীতে অবতরণের পর পুনর্মিলনের সুযোগ দেন।
সেই মিলন ছিল অনুতাপ, ক্ষমা প্রার্থনা ও রহমতের প্রতীক।
এই কারণেই পাহাড়টির নাম হয় জাবালে রহমত — রহমতের পাহাড়।
🌤️ নবী করিম ﷺ ও জাবালে রহমত
হজ্বের শেষ এবং মহান মুহূর্ত — “ইয়াওমে আরাফা”-তে নবী মুহাম্মদ ﷺ আরাফাত ময়দানে দাঁড়িয়ে মানবজাতির জন্য ঐতিহাসিক “বিদায় হজ্বের ভাষণ” প্রদান করেন।
এই ভাষণে তিনি মানবাধিকার, নারী-পুরুষের মর্যাদা, সম্পদ-রক্তের নিরাপত্তা, এবং তাওহীদের বার্তা ঘোষণা করেন।
যদিও নবী ﷺ নির্দিষ্টভাবে জাবালে রহমতের চূড়ায় ওঠেননি —
তবুও আরাফাত ময়দান এবং এর আশপাশের এই পাহাড় তাঁর দোয়া ও রহমতের স্মৃতি বহন করে।
🌧️ রহমতের পাহাড়ের প্রতীকী তাৎপর্য
এই পাহাড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় —
যখন মানুষ ভুল করে, তওবা করে ফিরে আসে, তখন আল্লাহর দরজা কখনো বন্ধ থাকে না।
যেভাবে আল্লাহ আদম (আঃ)-কে ক্ষমা করেছিলেন, সেভাবেই তিনি আজও তাঁর বান্দাদের জন্য “রহমতের দরজা” উন্মুক্ত রেখেছেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছ! আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গোনাহ ক্ষমা করেন।”
— (সূরা আজ-যুমার, ৩৯:৫৩)
🕊️ ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দেশনা
ইসলামী শাস্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছে — হজ্বের জন্য “আরাফাতে অবস্থান” (ওকুফ) করা ফরজ,
কিন্তু “জাবালে রহমতের চূড়ায় ওঠা” কোনো ফরজ বা সুন্নত নয়।
অনেকে আবেগে পাহাড়ে ওঠেন, দোয়া করেন, কিন্তু এটা কেবল দোয়ার জায়গা —
কোনো বিশেষ ইবাদতের স্থান নয়।
ইমাম নাওয়াবী (রহঃ) বলেন:
“আরাফাতে দাঁড়ানোই হজ্বের মূল। পাহাড়ে ওঠা বা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়ানো কোনো শরয়ি বিধান নয়।”
🌿 শিক্ষণীয় বার্তা
১️⃣ আল্লাহর রহমত সীমাহীন — যত বড় গুনাহই হোক, তওবা করলে ক্ষমা সম্ভব।
২️⃣ ইবাদতে সংযম ও শুদ্ধতা জরুরি — আবেগ নয়, দলিলই আমাদের পথনির্দেশক।
৩️⃣ মানবতার ঐক্য ও পরিশুদ্ধি — আরাফা ও জাবালে রহমতের বার্তা হলো ঐক্য, অনুতাপ ও নৈতিক শুদ্ধি।
৪️⃣ নবীর (সা.) আদর্শ অনুসরণই হজ্বের আসল সৌন্দর্য।
🪔 উপসংহার
জাবালে রহমত শুধু একটি পাহাড় নয় —
এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর অসীম ক্ষমা, মমতা ও ভালোবাসার প্রতীক।
প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ে এই পাহাড় স্মরণ করিয়ে দেয়—
যে বান্দা ভুল করেও ফিরে আসে,
আল্লাহ তার জন্য দরজা খোলা রাখেন,
এবং বলেন:
“আমার রহমত সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করেছে।”
— (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:১৫৬)
লুত (আঃ)-এর কওমের পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
খুব সুন্দর ও গভীর প্রশ্ন 🌿
হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের পরিণতি আমাদের জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা ও শিক্ষার উৎস। নিচে সংক্ষেপে ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো —
🌩️ লুত (আঃ)-এর কওমের পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
১️⃣ অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার পরিণতি ভয়াবহ
২️⃣ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করলে কোনো জাতিই রক্ষা পায় না
৩️⃣ নবীর দাওয়াতের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য অপরিহার্য
৪️⃣ পরিবারেও ঈমানের পার্থক্য হতে পারে
৫️⃣ অতিথি ও দুর্বলদের প্রতি সম্মান ইসলামের নীতি
৬️⃣ সমাজে পাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা ঈমানের দাবি
৭️⃣ আল্লাহর ধৈর্যের সীমা আছে
🌿 সারসংক্ষেপে শিক্ষা:
“যে জাতি আল্লাহর অবাধ্য হয়, অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হয়, নবীর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে — সে জাতি কখনো টিকে থাকতে পারে না।”
হযরত লুত (আঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী
নিচে হযরত লুত (আঃ)–এর একটি পূর্ণাঙ্গ, ঐতিহাসিক ও ইসলামী উৎসনির্ভর জীবনী দেওয়া হলো — সহজ ও ধারাবাহিকভাবে, যাতে তাঁর জীবন, দাওয়াত, কওম, এবং শিক্ষা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় 👇
🌿 হযরত লুত (আঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী
🕋 পরিচিতি
-
নাম: লুত (আঃ)
-
বংশ: ইবরাহিম (আঃ)-এর ভ্রাতুষ্পুত্র (ভাইয়ের ছেলে)
-
উপাধি: আলাইহিস সালাম (আল্লাহর শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর উপর)
-
যুগ: হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর যুগে
-
নবুয়তের স্থান: সাদূম (বর্তমান জর্দান বা মৃত সাগরের এলাকা)
-
ধর্মগ্রন্থ: তাওরাত যুগের পূর্ববর্তী নবী, তাই পৃথক কিতাব প্রাপ্ত ছিলেন না
🧭 প্রারম্ভিক জীবন
হযরত লুত (আঃ) ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আঃ)-এর ভাই হারান-এর পুত্র। ছোটবেলা থেকেই তিনি চাচা ইবরাহিম (আঃ)-এর তত্ত্বাবধানে বড় হন এবং তাঁর সঙ্গে মিশর ও ফিলিস্তিন অঞ্চলে বহু জায়গায় সফর করেন।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে নবুওয়তের মর্যাদা দেন এবং তাঁকে প্রেরণ করেন সাদূম ও আশেপাশের শহরের মানুষদের দিকে।
⚠️ কওমে লুতের পাপাচার
লুত (আঃ)-এর কওম (সাদূমবাসী) ছিল মানব ইতিহাসে প্রথম সমাজ যারা ভয়ঙ্কর সমকামিতা (পুরুষের সঙ্গে পুরুষের অশ্লীল আচরণ) শুরু করে।
তারা নানা অন্যায়, ডাকাতি, অতিথি নির্যাতন, এবং প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত ছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা এমন অশ্লীল কাজ কর যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কোনো জাতি করেনি।”
— [সূরা আল-আ’রাফ ৭:৮০]
📣 লুত (আঃ)-এর দাওয়াত
তিনি কওমকে আল্লাহর ভয় দেখিয়ে, পাপ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানালেন—
“তোমরা কি নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের কাছে যাও? তোমরা তো সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।”
— [সূরা আশ-শুআরা ২৬:১৬৫–১৬৬]
কিন্তু তাঁরা তাঁর কথা উপহাস করত এবং বলত—
“তুমি যদি সত্যবাদী হও তবে আল্লাহর শাস্তি নিয়ে এসো।”
😢 কওমের অস্বীকার ও ধ্বংস
যখন তাদের সীমালঙ্ঘন চরমে পৌঁছায়, তখন আল্লাহ তাআলা তিনজন ফেরেশতাকে পাঠান, যারা প্রথমে ইবরাহিম (আঃ)-এর কাছে যান এবং পরে লুত (আঃ)-এর শহরে পৌঁছান সুদর্শন যুবকের রূপে।
কওমে লুত ঐ অতিথিদের দিকে অশ্লীল অভিপ্রায়ে এগিয়ে আসে।
তখন ফেরেশতারা তাঁদের আসল রূপে প্রকাশিত হয়ে বলেন:
“হে লুত! আমরা তোমার প্রভুর প্রেরিত ফেরেশতা। তারা তোমার কাছে পৌঁছাতে পারবে না।”
তারপর তারা বলেন,
“এই রাতেই তুমি তোমার পরিবার নিয়ে শহর ত্যাগ করো, তোমাদের কেউ পেছনে ফিরে তাকাবে না।”
⚡ আল্লাহর শাস্তি
যখন লুত (আঃ) ও তাঁর পরিবার শহর ত্যাগ করলেন (তাঁর স্ত্রী বাদে, কারণ সে অবিশ্বাসী ছিল), তখন আকাশ থেকে ভয়াবহ শাস্তি নেমে এল:
-
ভূমি উল্টে দেওয়া হয় (উল্টে ফেলা পাহাড়ের মতো)
-
উপর থেকে পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করা হয়
-
পুরো জাতি ধ্বংস হয়ে যায়
“আমরা তাদের ওপর পাথরের বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলাম—যা ছিল চিহ্নিত পাথর।”
— [সূরা হুদ ১১:৮২–৮৩]
🕊️ শিক্ষা ও বার্তা
-
অশ্লীলতা ও সমকামিতা মহাপাপ।
-
আল্লাহর হুকুম অমান্য করলে জাতি ধ্বংস হয়।
-
নবীর প্রতি আনুগত্য ও সততা রক্ষা করাই মুক্তির পথ।
-
অবিশ্বাসীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও (যেমন লুতের স্ত্রী), ঈমানহীনতা রক্ষা করবে না।
🪔 মৃত্যু
ধ্বংসের পর হযরত লুত (আঃ) ফিলিস্তিনে ফিরে যান এবং ইবরাহিম (আঃ)-এর নিকটবর্তী এলাকায় জীবনযাপন করেন।
তাঁর মৃত্যু হয় বার্ধক্যে, এবং ধারণা করা হয় তিনি সুবা বা সাবা নামক স্থানে সমাহিত হন (বর্তমান জর্দান বা ফিলিস্তিন অঞ্চলে)।
📖 কুরআনে উল্লেখ
হযরত লুত (আঃ)-এর নাম ও কওমের কাহিনী কুরআনের বহু সূরায় এসেছে:
-
সূরা হুদ (১১)
-
সূরা আল-আ’রাফ (৭)
-
সূরা আশ-শুআরা (২৬)
-
সূরা আনকাবুত (২৯)
-
সূরা কামার (৫৪)
ইত্যাদি।
🌟 উপসংহার
হযরত লুত (আঃ)-এর জীবন আমাদের শেখায় —
👉 সমাজ যতই উন্নত হোক, নৈতিকতার অবক্ষয় হলে পতন অনিবার্য।
👉 আল্লাহর বিধানই সত্য ও মুক্তির একমাত্র পথ।
হযরত লুত আঃ এর পরিচয় ও বিশেষ ঘটনা
পরিচয়ঃ হযরত লুত আঃ ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর ভাতিজা। চাচার সাথে তিনিও জন্মভূমি ‘বাবেল’ শহর থেকে হিজরত করে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অদূরে কেন‘আনে চলে আসেন। আল্লাহ লূত (আঃ)-কে নবুঅত দান করেন এবং কেন‘আন থেকে অল্প দূরে জর্ডান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের মধ্যবর্তী ‘সাদূম’ অঞ্চলের অধিবাসীদের পথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেন। এ এলাকায় সাদূম, আমূরা, দূমা, ছা‘বাহ ও ছা‘ওয়াহ নামে বড় বড় পাঁচটি শহর ছিল। কুরআন মজীদ বিভিন্ন স্থানে এদের সমষ্টিকে ‘মু’তাফেকাহ’ (নাজম ৫৩/৫৩) বা ‘মু’তাফেকাত’ (তওবাহ ৯/৭০, হাক্বক্বাহ ৬৯/৯) শব্দে বর্ণনা করেছে। যার অর্থ ‘জনপদ উল্টানো শহরগুলি’। এ পাঁচটি শহরের মধ্যে সাদূম ছিল সবচেয়ে বড় এবং সাদূমকেই রাজধানী মনে করা হ’ত। হযরত লূত (আঃ) এখানেই অবস্থান করতেন। এখানকার ভূমি ছিল উর্বর ও শস্য-শ্যামল। এখানে সর্বপ্রকার শস্য ও ফলের প্রাচুর্য ছিল। এসব ঐতিহাসিক তথ্য বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ‘সাদূম’ সম্পর্কে সকলে একমত। বাকী শহরগুলির নাম কি, সেগুলির সংখ্যা তিনটি, চারটি না ছয়টি, সেগুলিতে বসবাসকারী লোকজনের সংখ্যা কয়শত, কয় হাজার বা কয় লাখ ছিল, সেসব বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এগুলি ইস্রাঈলী বর্ণনা, যা কেবল ইতিহাসের বস্তু হিসাবে গ্রহণ করা যায়। কুরআন ও হাদীছে শুধু মূল বিষয় বর্ণনা এসেছে, যা মানবজাতির জন্য শিক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে, লূত (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১৫টি সূরায় ৮৭টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।
লূত (আঃ)-এর দাওয়াতঃ লূত (আঃ)-এর কওম আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত হয়েছিল। দুনিয়াবী উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত হওয়ার কারণে তারা সীমা লঙ্ঘনকারী জাতিতে পরিণত হয়েছিল। পূর্বেকার ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলির ন্যায় তারা চূড়ান্ত বিলাস-ব্যসনে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল। অন্যায়-অনাচার ও নানাবিধ দুষ্কর্ম তাদের মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি পুংমৈথুন বা সমকামিতার মত নোংরামিতে তারা লিপ্ত হয়েছিল, যা ইতিপূর্বেকার কোন জাতির মধ্যে পরিদৃষ্ট হয়নি। জন্তু-জানোয়ারের চেয়ে নিকৃষ্ট ও হঠকারী এই কওমের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ লূত (আঃ)-কে প্রেরণ করলেন। কুরআনে লূতকে ‘তাদের ভাই’ (শো‘আরা ২৬/১৬১) বলা হ’লেও তিনি ছিলেন সেখানে মুহাজির। নবী ও উম্মতের সম্পর্কের কারণে তাঁকে ‘তাদের ভাই’ বলা হয়েছে। তিনি এসে পূর্বেকার নবীগণের ন্যায় প্রথমে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে বললেন,
‘আমি তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত রাসূল। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আমি এর জন্য তোমাদের নিকটে কোনরূপ প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্বপ্রভু আল্লাহ দিবেন’ (শো‘আরা ২৬/১৬২-১৬৫)। অতঃপর তিনি তাদের বদভ্যাসের প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, ‘বিশ্ববাসীর মধ্যে কেন তোমরাই কেবল পুরুষদের নিকটে (কুকর্মের উদ্দেশ্যে- আ‘রাফ ৭/৮১) এসে থাক’? ‘আর তোমাদের স্ত্রীগণকে বর্জন কর, যাদেরকে তোমাদের জন্য তোমাদের পালনকর্তা সৃষ্টি করেছেন? নিঃসন্দেহে তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়’ (শো‘আরা ২৬/১৬৫-১৬৬)। জবাবে কওমের নেতারা বলল, ‘হে লূত! যদি তুমি (এসব কথাবার্তা থেকে) বিরত না হও, তাহ’লে তুমি অবশ্যই বহিষ্কৃত হবে’। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের এইসব কাজকে ঘৃণা করি’ (শো‘আরা ২৬/১৬৭-১৬৮)। তিনি তাদের তিনটি প্রধান নোংরামির কথা উল্লেখ করে বলেন,
‘তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে পৃথিবীর কেউ কখনো করেনি’। ‘তোমরা কি পুংমৈথুনে লিপ্ত আছ, রাহাজানি করছ এবং নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে গর্হিত কর্ম করছ’? জবাবে তাঁর সম্প্রদায় কেবল একথা বলল যে, আমাদের উপরে আল্লাহর গযব নিয়ে এসো, যদি তুমি সত্যবাদী হও’। তিনি তখন বললেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! এই দুষ্কৃতিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তুমি আমাকে সাহায্য কর’ (আনকাবূত ২৯/২৮-৩০; আ‘রাফ ৭/৮০)।
বিশেষ ঘটনাঃ আল্লাহর হুকুমে কয়েকজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে প্রথমে হযরত ইবরাহীমের বাড়ীতে পদার্পণ করলেন। তিনি তাদেরকে মেহমানদারীর জন্য একটা আস্ত বাছুর গরু যবেহ করে ভুনা করে তাদের সামনে পরিবেশন করলেন। কিন্তু তারা তাতে হাত দিলেন না। এতে ইবরাহীম (আঃ) ভয় পেয়ে গেলেন (হূদ ১১/৬৯-৭০)। কেননা এটা ঐ সময়কার দস্যু-ডাকাতদেরই স্বভাব ছিল যে, তারা যে বাড়ীতে ডাকাতি করত বা যাকে খুন করতে চাইত, তার বাড়ীতে খেত না। ফেরেশতাগণ নবীকে অভয় দিয়ে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘আমরা এসেছি অমুক শহরগুলি ধ্বংস করে দিতে। ইবরাহীম একথা শুনে তাদের সাথে ‘তর্ক জুড়ে দিলেন’ (হূদ ১১/৭৪) এবং বললেন, ‘সেখানে যে লূত আছে। তারা বললেন, সেখানে কারা আছে, আমরা তা ভালভাবেই জানি। আমরা অবশ্যই তাকে ও তার পরিবারকে রক্ষা করব, তবে তাঁর স্ত্রী ব্যতীত। সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (আনকাবূত ২৯/৩১-৩২)। অতঃপর তারা ইবরাহীম দম্পতিকে ইসহাক-এর জন্মের সুসংবাদ শুনালেন।
বিবি সারা ছিলেন নিঃসন্তান। অতি বৃদ্ধ বয়সে এই সময় তাঁকে হযরত ইসহাকের জন্মের সুসংবাদ দেওয়া হয়। শুধু তাই নয় ইসহাকের পরে তার ঔরসে যে ইয়াকূবের জন্ম হবে সেটাও জানিয়ে দেওয়া হ’ল (হূদ ১১/৭১-৭২)। উল্লেখ্য যে, ইয়াকূবের অপর নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’ এবং তাঁর বংশধরগণকে বনু ইস্রাঈল বলা হয়। যে বংশে হাজার হাজার নবীর আগমন ঘটে।
কেন‘আনে ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট থেকে বিদায় হয়ে ফেরেশতাগণ সাদূম নগরীতে ‘লূত (আঃ)-এর গৃহে উপস্থিত হ’লেন’ (হিজর ১৫/৬১)। এ সময় তাঁরা অনিন্দ্য সুন্দর নওজোয়ান রূপে আবির্ভূত হন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যখন কোন জাতিকে ধ্বংস করেন, তখন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের পরীক্ষা নেন। সাদূম জাতি তাদের এই চূড়ান্ত পরীক্ষায় ব্যর্থকাম হ’ল। তারা যখন জানতে পারল যে, লূত-এর বাড়ীতে অতীব সুদর্শন কয়েকজন নওজোয়ান এসেছে, ‘তখন তারা খুশীতে আত্মহারা হয়ে সেদিকে ছুটে এল’ (হূদ ১১/৭৮)। এ দৃশ্য দেখে লূত (আঃ) তাদেরকে অনুরোধ করে বললেন, – ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। অতিথিদের ব্যাপারে তোমরা আমাকে লজ্জিত করো না। তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভাল মানুষ নেই’? (হূদ ১১/৭৮)। কিন্তু তারা কোন কথাই শুনলো না। তারা দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢোকার উপক্রম করল। লূত (আঃ) বললেন, হায়! – ‘আজকে আমার জন্য বড়ই সংকটময় দিন’ (হূদ ১১/৭৭)। তিনি বললেন,
‘হায়! যদি তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোন শক্তি থাকত, অথবা আমি কোন সুদৃঢ় আশ্রয় পেতাম’ (হূদ ১১/৮০)। এবার ফেরেশতাগণ আত্মপরিচয় দিলেন এবং লূতকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘হে লূত! আমরা আপনার প্রভুর প্রেরিত ফেরেশতা। ওরা কখনোই আপনার নিকটে পৌঁছতে পারবে না’ (হূদ ১১/৮১)।
এজন্যেই আমাদের রাসূল (সা:) বলেন, ‘আল্লাহ রহম করুন লূতের উপরে, তিনি সুদৃঢ় আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন’ (অর্থাৎ আল্লাহর আশ্রয়)। অতঃপর জিবরীল তাদের দিকে পাখার ঝাপটা মারতেই বীর পুঙ্গরেরা সব অন্ধ হয়ে ভেগে গেল। আল্লাহ বলেন, ‘ওরা লূতের কাছে তার মেহমানদের দাবী করেছিল। তখন আমি তাদের দৃষ্টি বিলুপ্ত করে দিলাম। অতএব আস্বাদন কর আমার শাস্তি ও হুঁশিয়ারী’ (ক্বামার ৫৪/৩৭)।
অতঃপর ফেরেশতাগণ হযরত লূত (আঃ)-কে স্বীয় পরিবারবর্গসহ (ক্বামার ৫৪/৩৪) ‘কিছু রাত থাকতেই’ এলাকা ত্যাগ করতে বললেন এবং বলে দিলেন যেন ‘কেউ পিছন ফিরে না দেখে। তবে আপনার বৃদ্ধা স্ত্রী ব্যতীত’। নিশ্চয়ই তার উপর ঐ গযব আপতিত হবে, যা ওদের উপরে হবে। ভোর পর্যন্তই ওদের মেয়াদ। ভোর কি খুব নিকটে নয়’? (হূদ ১১/৮১; শো‘আরা ২৬/১৭১)। লূত (আঃ)-এর স্ত্রী ঈমান আনেননি এবং হয়তবা স্বামীর সঙ্গে রওয়ানাই হননি। তারা আরও বললেন, ‘আপনি তাদের পিছে অনুসরণ করুন। আর কেউ যেন পিছন ফিরে না তাকায়। আপনারা আপনাদের নির্দেশিত স্থানে চলে যান’ (হিজর ১৫/৬৫)। এখানে আল্লাহ লূতকে হিজরতকারী দলের পিছনে থাকতে বলা হয়েছে। বস্তুত এটাই হ’ল নেতার কর্তব্য।
অতঃপর আল্লাহর হুকুমে অতি প্রত্যুষে গযব কার্যকর হয়। লূত ও তাঁর সাথীগণ যখন নিরাপদ দূরত্বে পৌছেন, তখন জিবরীল (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ পাওয়া মাত্র সুবহে সাদিক-এর সময় তাদের শহরগুলিকে উপরে উঠিয়ে উপুড় করে ফেলে দিলেন এবং সাথে সাথে প্রবল বেগে ঘুর্ণিবায়ুর সাথে প্রস্তর বর্ষণ শুরু হয়। যেমন আল্লাহ বলেন,
‘অবশেষে যখন আমাদের হুকুম এসে পৌঁছল, তখন আমরা উক্ত জনপদের উপরকে নীচে করে দিলাম এবং তার উপরে ক্রমাগত ধারায় মেটেল প্রস্তর বর্ষণ করলাম’। ‘যার প্রতিটি তোমার প্রভুর নিকটে চিহ্নিত ছিল। আর ঐ ধ্বংসস্থলটি (বর্তমান আরবীয়) যালেমদের থেকে বেশী দূরে নয়’ (হূদ ১১/৮২-৮৩)।
এটা ছিল তাদের কুকর্মের সাথে সামঞ্জস্যশীল শাস্তি। কেননা তারা যেমন আল্লাহর আইন ও প্রাকৃতিক বিধানকে উল্টিয়েছিল অর্থাৎ স্ত্রীসঙ্গ বাদ দিয়ে মানুষের স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে পুংমৈথুনে ও সমকামিতায় লিপ্ত হয়েছিল, ঠিক তেমনি তাদেরকে মাটি উল্টিয়ে উপুড় করে শাস্তি দেওয়া হ’ল।
ডঃ জামু বলেন, তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন আকারের এক হাজার উল্কাপিন্ড সংগ্রহ করেন। তন্মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওযন ছিল ৩৬ টন। এর মধ্যে অনেকগুলি আছে নুড়ি পাথর, যাতে গ্রানাইট ও কাঁচা অক্সাইড লৌহ মিশ্রিত। তাতে লাল বর্ণের চিহ্ন অংকিত ছিল এবং ছিল তীব্র মর্মভেদী। বিস্তর গবেষণার পরে স্থির হয় যে, এগুলি সেই প্রস্তর, যা লূত জাতির উপরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। ইতিহাস-বিজ্ঞান বলে, সাদূম ও আমুরার উপরে গন্ধক (Sulpher)-এর আগুন বর্ষিত হয়েছিল।
হযরত লূত (আঃ)-এর নাফরমান কওমের শোচনীয় পরিণতি বর্ণনা করার পর দুনিয়ার অপরাপর জাতিকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ‘(জনপদ উল্টানো ও প্রস্তর বর্ষণে নিশ্চিহ্ন ঐ ধ্বংসস্থলটি) বর্তমান কালের যালেমদের থেকে খুব বেশী দূরে নয়’ (হূদ ১১/৮৩)। মক্কার কাফেরদের জন্য উক্ত ঘটনাস্থল ও ঘটনার সময়কাল খুব বেশী দূরের ছিল না। মক্কা থেকে ব্যবসায়িক সফরে সিরিয়া যাতায়াতের পথে সর্বদা সেগুলো তাদের চোখে পড়ত। কিন্তু তা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতো না। বরং শেষনবী মুহাম্মাদ (সা:)-কে অবিশ্বাস করত ও তাঁকে অমানুষিক কষ্ট দিত। আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেন, ‘যখন আমার উম্মত পাঁচটি বিষয়কে হালাল করে নেবে, তখন তাদের উপর ধ্বংস নেমে আসবে।
- (১) যখন পরস্পরে অভিসম্পাৎ ব্যাপক হবে ।
- (২) যখন তারা মদ্যপান করবে ।
- (৩) রেশমের কাপড় পরিধান করবে।
- (৪) গায়িকা-নর্তকী গ্রহণ করবে।
- (৫) পুরুষ-পুরুষে ও নারী-নারীতে সমকামিতা করবে’।
ধ্বংসস্থলের বিবরণঃ কওমে লূত-এর বর্ণিত ধ্বংসস্থলটি বর্তমানে ‘বাহরে মাইয়েত’ বা ‘বাহরে লূত’ অর্থাৎ ‘মৃত সাগর’ বা ‘লূত সাগর’ নামে খ্যাত। যা ফিলিস্তীন ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিশাল অঞ্চল জুড়ে নদীর রূপ ধারণ করে আছে। যেটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে বেশ নীচু। এর পানিতে তৈলজাতীয় পদার্থ বেশী। এতে কোন মাছ, ব্যাঙ এমনকি কোন জলজ প্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না। এ কারণেই একে ‘মৃত সাগর’ বা ‘মরু সাগর’ বলা হয়েছে। সাদূম উপসাগর বেষ্টক এলাকায় এক প্রকার অপরিচিত বৃক্ষ ও উদ্ভিদের বীজ পাওয়া যায়, সেগুলো মাটির স্তরে স্তরে সমাধিস্থ হয়ে আছে। সেখানে শ্যামল-তাজা উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যার ফল কাটলে তার মধ্যে পাওয়া যায় ধূলি-বালি ও ছাই। এখানকার মাটিতে প্রচুর পরিমাণে গন্ধক পাওয়া যায়। Natron ও পেট্রোল তো আছেই। এই গন্ধক উল্কা পতনের অকাট্য প্রমাণ। আজকাল সেখানে সরকারী প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পক্ষ হ’তে পর্যটকদের জন্য আশপাশে কিছু হোটেল-রেস্তোঁরা গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনা থেকে শিক্ষা হাছিলের জন্য কুরআনী তথ্যাদি উপস্থাপন করে বিভিন্ন ভাষায় উক্ত ঘটনা লিপিবদ্ধ করে তা থেকে উপদেশ গ্রহণের জন্য পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই হ’ত সবচাইতে যরূরী বিষয়। আজকের এইড্স আক্রান্ত বিশ্বের নাফরমান রাষ্ট্রনেতা, সমাজপতি ও বিলাসী ধনিক শ্রেণী তা থেকে শিক্ষা গ্রহণে সক্ষম হ’ত। কেননা এগুলি মূলতঃ মানুষের জন্য শিক্ষাস্থল হিসাবে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
‘নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন সমূহ রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য’ … এবং বিশ্বাসীদের জন্য’ (হিজর ১৫/৭৫, ৭৭)। একই ঘটনা বর্ণনা শেষে অন্যত্র তিনি বলেন, – ‘জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আমরা অত্র ঘটনার মধ্যে স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি’ (আনকাবূত ২৯/৩৫)।
মুক্তিপ্রাপ্ত লোকদের সংখ্যাঃ তখন উক্ত জনপদে লূত-এর পরিবারটি ব্যতীত মুসলমান ছিল না। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা সেখানে একটি বাড়ী ব্যতীত কোন মুসলমান পাইনি’ (যারিয়াত ৫১/৩৬)। কুরআনী বর্ণনা অনুযায়ী উক্ত গযব হ’তে মাত্র লূত-এর পরিবারটি নাজাত পেয়েছিল। তাঁর স্ত্রী ব্যতীত’ (আ‘রাফ ৭/৮৩)। তাফসীরবিদগণ বলেন, লূত-এর পরিবারের মধ্যে কেবল তাঁর দু’মেয়ে মুসলমান হয়েছিল। তবে লূত-এর কওমের নেতারা লূত-কে সমাজ থেকে বের করে দেবার যে হুমকি দেয়, সেখানে তারা বহুবচন ব্যবহার করে বলেছিল . ‘এদেরকে তোমাদের শহর থেকে বের করে দাও। কেননা এই লোকগুলি সর্বদা পবিত্র থাকতে চায়’ (আ‘রাফ ৭/৮২; নমল ২৭/৫৬)। এতদ্ব্যতীত শহর থেকে বের হবার সময় আল্লাহ লূতকে ‘সবার পিছনে’ থাকতে বলেন (হিজর ১৫/৬৫)। অন্যত্র বলা হয়েছে ‘অতঃপর আমরা তাকে ও তার পরিবার সবাইকে নাজাত দিলাম’
(শো‘আরা ২৬/১৭০)। এখানে ‘সবাইকে’ শব্দের মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঈমানদারগণের সংখ্যা বেশ কিছু ছিল। অতএব এখানে লূত-এর ‘আহ্ল’ (আ‘রাফ ৮৩; হূদ ৮১; নমল ৫৭; ক্বামার ৩৪) বা পরিবার বলতে লূত-এর দাওয়াত কবুলকারী ঈমানদারগণকে সম্মিলিতভাবে ‘আহলে ঈমান’ বা ‘একটি ঈমানদার পরিবার’ গণ্য করা যেতে পারে। তবে প্রকৃত ঘটনা যেটাই হৌক না কেন, কেবলমাত্র নবীর অবাধ্যতা করলেই আল্লাহর গযব আসাটা অবশ্যম্ভাবী। তার উপরে কেউ ঈমান আনুক বা না আনুক। হাদীছে এসেছে, ‘ক্বিয়ামতের দিন অনেক নবীর একজন উম্মতও থাকবে না’। এখানে লক্ষণীয় যে, নবীপত্নী হয়েও লূতের স্ত্রী গযব থেকে রেহাই পাননি। আল্লাহ নূহ পত্নী ও লূত পত্নীকে ক্বিয়ামতের দিন বলবেন- ‘যাও জাহান্নামীদের সাথে জাহান্নামে চলে যাও’ (তাহরীম ৬৬/১০)।
সমকামিতার শাস্তি
কুরআনের আরো বিভিন্ন স্থানে কেবল এতটুকুন বলা হয়েছে, যে, লূত জাতি একটি অতি জঘন্য ও নোংরা পাপ কাজের অনুশীলন করে যাচ্ছিল । এবং এ ধরনের পাপ কাজের পরিণামে এ জাতির ওপর আল্লাহর গযব নেমে আসে। তারপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশনা থেকে আমরা একথা জানতে পেরেছি যে, এটি এমন একটি অপরাধ সমাজ অংগনকে যার কুলুষমুক্ত রাখার চেষ্টা করা ইসলামী রাষ্ট্রের দায়ীত্বের অন্তর্ভুক্ত এবং এ ধরনের অপরাধকারীদেরকে কঠোর শাস্তি দেয়া উচিত।এ প্রসংগে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যে সমস্ত হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার কোনটিতে বলা হয়েছেঃ ও যার সাথে সে অপরাধ করেছে তাদের উভয়কে হত্যা করো আবার কোনটিতে এর ওপর এতটুকু বৃদ্ধি করা হয়েছেঃ বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। আবার কোথাও এও বলা হয়েছেঃ ওপরের ও নীচের উভয়কে পাথর মেরে হত্যা করো।
কিন্তু যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এ ধরনের কোন মামলা আসেনি তাই এর শাস্তি কিভাবে দেয়া হবে, তা অকাট্যভাবে চিহ্নিত হতে পারেনি।সাহাবীগণের মধ্যে হযরত আলীর(রা) মতে অপরাধীকে তরবারীর আঘাতে হত্যা করতে হবে এবং কবরস্থ করার পরিবর্তে তার লাশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে। হযরত আবু বকর(রা) এ মত সমর্থন করেন।হযরত উমর(রা) ও হযরত উসমানের (রা) মতে কোন পতনোন্মুখ ইমারতের নীচে তাকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ইমারতটিকে তার ওপর ধ্বসীয়ে দিতে হবে। এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাসের (রা) ফতোয়া হচ্ছে, মহল্লার সবচেয়ে উঁচু বাড়ির ছাদ থেকে তাকে পা উপরের দিকে এবং মাথা নিচের দিকে করে নিক্ষেপ করতে এবং এই সংগে উপর থেকে তার ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে হবে।
ফকীহদের মধ্যে ইমাম শাফেঈ(র) বলেন, অপরাধী ও যার সাথে অপরাধ করা হয়েছে তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত , তাদের উভয়কে হত্যা করা ওয়াজিব।শাবী যুহরী, মালিক ও আহমদ (রাহেমাহুল্লাহুর)মতে তাদের শাস্তি হচ্ছে রজম অর্থাৎ পাথর মেরে হত্যা করা। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়েব,আতা, হাসান বসরী, ইবরাহীম নাখঈ, সুফিয়ান সওরী , ও আওযাঈর (রাহেমাহুমুল্লাহুর )মতে যিনার অপরাধে যে শাস্তি দেয়া হয় এ অপরাধের সেই একই শাক্তি দেয়া হবে। অর্থাঃ অবিবাহিতকে একশত বেত্রাঘাত করে দেশ থেকে বহিস্কার করা হবে, এবং বিবাহিতকে রজম করা হবে। ইমাম আবু হানিফার(র) মতে,তার ওপর কোন দণ্ডবিধি নির্ধারিত নেই বরং এ কাজটি এমন যে,ইসলামী শাসক তার বিরুদ্ধে অবস্থা ও প্রয়োজন অনুপাতে যে কোন শিক্ষনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।এর সমর্থনে ইমান শাফেঈর একটি বক্তব্যও পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য যে, কোন ব্যক্তির তার নিজের স্ত্রীর সাথেও লূত জাতির কুকর্ম করা চূড়ান্তভাবে হারাম। সহীহ আবু দাউদ হাদিসের বরাত দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ উক্তি উদ্বৃত হয়েছেঃ যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে(পায়ুপথে) যৌন কার্য করে সে অভিশপ্ত। ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ বানী উদ্বৃত হয়েছেঃ যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর পশ্চাদ্দেশে যৌন সংগমে লিপ্ত হয় আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না।
ইমাম তিরমিযী তাঁর আর একটি নির্দেশ উদ্ধৃত করেছেন। তাতে বলা হয়েছেঃ “আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা (দুজন) এতে লিপ্ত হবে তাদেরকে শাস্তি দাও৷ তারপর যদি তারা তাওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তাহলে তাদেরকে ছেড়ে দাও৷ কেননা আল্লাহ বড়ই তাওবা কবুলকারী ও অনুগ্রশীল৷ তবে একথা জেনে রাখো, আল্লাহর কাছে তাওবা কবুল হবার অধিকার এক মাত্র তারাই লাভ করে যারা অজ্ঞতার কারণে কোন খারাপ কাজ করে বসে এবং তারপর অতি দ্রুত তাওবা করে ৷ এ ধরনের লোকদের প্রতি আল্লাহ আবার তাঁর অনুগ্রহের দৃষ্টি নিবন্ধ করেন এবং আল্লাহ সমস্ত বিষয়ের খবর রাখেন, তিনি জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ৷ কিন্তু তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা খারাপ কাজ করে যেতেই থাকে, এমন কি তাদের কারো মৃত্যুর সময় এসে গেলে সে বলে, এখন আমি তাওবা করলাম৷ অনুরূপভাবে তাওবা তাদের জন্যও নয় যারা মৃত্যুর সময় পর্যন্ত কাফের থাকে৷ এমন সব লোকদের জন্য তো আমি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তৈরী করে রেখেছে৷” (নিসাঃ ১৬-১৮)।
আল্লাহ্র রাসুল (সাঃ) বলেন,
“তোমাদের মধ্যে যাদেরকেই লুতের কাজ করতে পাওয়া যাবে, তাদের মধ্যে যে করেছে এবং যাকে করেছে উভয়কেই হত্যা করো” (আবু দাউদঃ ৪৪৬২)
“যদি কোন অবিবাহিত পুরুষ সমকামী অবস্থায় ধরা খায়, তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা কর।” (আবু দাউদঃ ৪৪৪৮)
এ বিষয়ে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
“আমার উম্মত সম্পর্কে যেসব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় করি তা হচ্ছে পুরুষে পুরুষে যৌন মিলনে লিপ্ত হওয়া।” [ইবনু মাজাহ, মিশকাত, হাদীস নম্বর: ৩৪২১]
কুরআন মাজীদের অন্যান্য স্থানে তাদের এ সাধারণ অবস্থা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ
“তোমাদের অবস্থা কি এমন হয়ে গেছে যে, চোখে দেখে অশ্লীল কাজ করছো৷” (আন্ নামলঃ ৫৪)
“তোমরা কি এমনই বিকৃত হয়ে গেছো যে, পুরুষদের সাথে সঙ্গম করছো, রাজপথে দস্যূতা করছো এবং নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে খারাপ কাজ করছো৷” (আল আনকাবুতঃ ২৯)
সূরা তাহরীমে নূহ (আ) ও লূতের (আ) স্ত্রীদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “এ মহিলা দু’টি আমার দু’জন সৎ বান্দার গৃহে ছিল। কিন্তু তারা তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে” (১০ আয়াত)
অর্থাৎ তারা উভয়ই ছিল ঈমান শূন্য এবং নিজেদের সৎ স্বামীদের সাথে সহযোগিতা করার পরিবর্তে তারা তাদের কাফের জাতির সহযোগী হয়। এজন্য আল্লাহ যখন লূতের জাতির উপর আযাব নাযিল করার ফায়সালা করলেন এবং লূতকে নিজের পরিবার পরিজনদের নিয়ে এ এলাকা ত্যাগ করার হুকুম দিলেন তখন সাথে সাথে নিজের স্ত্রীকে সংগে না নেবার হুকুমও দিলেন।
সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
প্রশ্ন: নামাজে সেজদা থেকে ওঠার সময় টুপি তুলে মাথায় দেই, তা হলে কি নামাজের কোনো ক্ষতি হবে?
প্রশ্ন: নামাজে সেজদা থেকে ওঠার সময় মাথা থেকে টুপি পড়ে যায়। এতে আমার খুব অস্বস্তি লাগে। এই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য আমি যদি সেজদা থেকে ওঠার সময় টুপি তুলে মাথায় দেই, তা হলে কি নামাজের কোনো ক্ষতি হবে?
উত্তর: আপনার প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং এমন সমস্যা অনেক নামাজিরই হয়ে থাকে। নামাজে একাগ্রতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের ছোটখাটো বিষয়গুলো জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
আপনার ক্ষেত্রে, সেজদা থেকে ওঠার সময় বা বসা অবস্থায় যদি মাথা থেকে পড়ে যাওয়া টুপি এক হাত দিয়ে মাথায় তুলে নেন, তা হলে নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং এমন পরিস্থিতিতে এক হাত ব্যবহার করে টুপি ঠিক করে নেওয়াই উত্তম। এতে আপনার অস্বস্তিও দূর হবে এবং নামাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন।
তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। টুপি ঠিক করার জন্য কখনোই দুই হাত ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, নামাজের মধ্যে অপ্রয়োজনে দুই হাত ব্যবহার করলে তা ‘আমলে কাছির’ (বেশি নড়াচড়া) হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা নামাজ ফাসেদ বা নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে।
অতএব, নির্দ্বিধায় এক হাত দিয়ে টুপি তুলে মাথায় দিতে পারেন, আপনার নামাজে কোনো সমস্যা হবে না।
তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ১/১৫৭; শরহুল মুনইয়া ৪৪২-৪৪৩; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১/৮৫৬৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪০৮
আল-কোরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসকল নবী -রাসূলদেরকে গাইডবুক হিসেবে সহীফা ও কিতাব দিয়েছেন। এসব কিতাব সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব হচ্ছে আল-কোরআন। পূর্ব পূবর্বর্তী কিতাবসমূহের উপরে ঈমান আনা এবং আল-কোরআনকে মেনে চলা মুসলিমদের উপরে আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন। আল-কোরআন এসেছে বিশ্ব মানবতাকে হিদায়াতের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘রমযান মাস, যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদের্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সূরা আল-বাকারা-১৮৫)
হিদায়াতের এই কিতাব আল -কোরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ করা হয়েছে। নিম্নে আল-কোরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেআলোচনা করা হলো আল-কোরআন শিক্ষা করা ফরজ আল-কোরআনের প্রথম বাণী হচ্ছে, ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক-১)
এখানে ইক্বরা, অর্থ: পড়ো। এ আয়াতের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসমুলিমকে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন তোমরা যিনার জন্য, বোঝার জন্য এবং সঠিকটা মেনে চলার জন্য পড়া-লেখা করো, অধ্যয়ন করো। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তায়ালা ফরজ করে দিয়েছেন। আর এটার বাস্তব নির্দেশ দিয়েছেন রাসূল (সা.)।
আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলসূ (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ।’ (সূনান ইবনে মাজা) জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আল-কোরআন শিক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের উপরে আল্লাহ ফরজ করে দিয়ে ছেন। রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলসূ (সা.) বলেছেন, তোমরা কোরআন ও ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) শিক্ষা করো এবং মানুষদেরকে শিক্ষা দাও কেননা আমাকে উঠিয়ে নেয়া হবে।’ (সূনা সূ ন আত-তিরমিযি) তাই, আমাদের উপরে কর্তব্য আল-কো রআন ও ইলমে ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করা এবং এর আলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র পরিচালনা করা। আল-কোরআন শিক্ষা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত আল-কোরআন অধ্যয়ন করা, কোরআন জানা-বোঝার চেষ্টা করা পৃথিবীর সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজ। কারণ এ কো রআনের মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবন পরিচালনা পদ্ধতি, হিদায়াতের সঠিক পথ। প্রত্যেক কাজ শুরু করার সময় রাসূল (সা.) বিসমিল্লাহ পড়ে (আল্লাহর নাম নিয়ে) শুরু করার কথা বলে ছেন। তবে যেকোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আউযুবিযু ল্লাহি মিনাশ শাইতারিজ রাজীম’ অর্থাৎ শয়তা নের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেননি। তবে একটি কাজ করার আগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন, সেটা হলো আল-কোরআন তিলাওয়াত বা অধ্যয়নের সময়। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘সুতরাং যখন তুমি কোরআন পড়বে তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও।’ (সূরা আন-নাহল-৯৮)
হাদিস হতে কিছু কথাঃ-
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْاٰنَ وَعَلَّمَهٗ
‘যে কুরআন শরীফ শিক্ষা করে ও শিক্ষা দেয় সে-ই তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ বুখারী
মুসলিম শরীফে আছে :
اَفَلَا يَغْدُوْا اَحَدُكُمْ اِلٰى الْمَسْجِدِ فَيَتَعَلَّمُ مِنْ كِتَابِ اللهِ اٰيَتَيْنِ خَيْرٌ لَّهُ مِنْ نَاقَتَيْنِ وَثَلَاثٌ خَيْرٌلَّهُ مِنْ ثَلِاثٍ وَاَرْبَعٌ خَيْرٌلَّهُ مِنْ اَرْبَعٍ وَمِنْ اَعْدَادِهِنَّ مِنَ الْاِبِلِ.
“তোমাদের মধ্যে কেহ মসজিদে গিয়ে কুরআনের দুইটি আয়াত কেন শিক্ষা লাভ করে লয় না? কুরআনের দুইটি আয়াত শিক্ষা করা দুইটি উট অপেক্ষা অধিক ভাল। এইরূপে তিনটি আয়াত তিনটি উট অপেক্ষা এবং চারটি আয়াত চারটি উট অপেক্ষা অধিক ভাল। এমনিভাবে যত সংখ্যক আয়াত হবে, তত সংখ্যক উট হতে অধিক ভাল।”
আল-কোরআনের এ বক্তব্য থেকে জানা যায়, শয়তান সকল কাজেই বান্দা কে কুমন্ত্রণা দেয়। তবে কোরআন অধ্যয়নের সময় শয়তান সবচেয়ে বেশি কুমন্ত্রণা দিয়ে মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করে। কোরআনের কথা যেন মানুষ বুঝতে না পারে, সে জন্য শয়তান শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে থাকে। মুসলমানরা কোরআন থেকে দূরে সরে থাকলে শয়তান বেশি খুশি হয়। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা কোরআন অধ্যয়নের সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন।
এজন্য আমাদের উচিত আল- কোরআন জানা ও বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করা। আল-কোরআন হিদায়াতের একমাত্র কিতাব আল-কোরআন হচ্ছে বিশ্ব মানবাতার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব। এই কোরআনই বিশ্বের সকল মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে, হিদায়াতের আলোয় আলোকিত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরপুস্কার। আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব।’ (সূরা বনি ইসরাইল- ৯-১০)
‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।’ (সূরাআল-মায়েদা- ১৫-১৬)
আল-কোরআন ছাড়া অন্য কারো কাছে হিদায়াত অন্বেষণ করা যাবে না। কেউ এটা করলে আল্লাহ নিজে তাকে গুমরাহ করে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্য ক্তি কোরআন ছাড়া অন্য করো কাছে হিদায়াত চাইবে, আল্লাহ তা কে পথভ্রষ্ট করে দিবেন।’ (সূনান আত-তিরমিযি) অতএব, আমাদের জীবন চলার পাথ ইসলামকে সঠিকভাবে জানার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব আল-কোরআন শিক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে।
কুরআন শরীফের আয়াত উট অপেক্ষা অধিক ভাল, ইহা বুঝতে বেশী কিছু চিন্তার দরকার হয় না। কারণ, উট তো একমাত্র দুনিয়াতেই কাজে আসে, আর কুরআনের আয়াত দুনিয়া ও আখেরাত দু-জাহানে কাজে আসে। এখানে উটকে উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা, আরব দেশের লোকেরা উটকেই বড় সম্পত্তি মনে করে, নতুবা একটি আয়াতের পরিবর্তে সমগ্র বিশ্বেরও কোন মূল্য হয় না।
এই হাদীস দ্বারা এই উপদেশ লাভ করা যায় যে, সমস্ত কুরআন শরীফ না পড়তে পারলেও যতটুকু পড়–ক না কেন ততটুকুতেই বড় ফযীলত ও অতি বড় নেয়ামত। হাদীসে আছে-
اَلْمَاهِرُ بِالْقُرْاٰنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَيَتَتَعْتَعُ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَّهٗ اَجْرَانِ. بخارى
‘যে ব্যক্তি স্পষ্টভাবে অনায়াসে কুরআন শরীফ পড়তে পারে সে ব্যক্তি ঐ সমস্ত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবে, যাঁরা বড়ই পবিত্র, বড়ই সম্মানী এবং যারা লোকের আমলনামা লিখেন। আর যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়ে, কিন্তু মুখে বাধবাধ ঠেকে এবং বড়ই কঠিন বোধ করে, সে-ও দ্বিগুণ সওয়াব পাবে।’ দ্বিগুণ সওয়াবের কারণ এই যে, শুধু পাঠ করার জন্য এক সওয়াব পাবে, আর পড়ার সময় কষ্টের কারণে যে বিরক্ত হয়ে পড়া ক্ষান্ত না করে পড়তে থাকে, তজ্জন্য আর একটি সওয়াব পাবে। -বুখারী শরীফ
যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ ভালমত পাঠ করতে না পারা সত্তে¡ও বিরক্ত হয়ে পাঠ ছেড়ে দেয় না, তার জন্য এই হাদীস কত বড় খোশখবরী (সুসংবাদ) দেওয়া হয়েছে যে, তাকে দ্বিগুণ সওয়াব দেওয়া হবে। অন্য হাদীসে আছে-
اِنَّ الَّذِىْ لَيْسَ فِىْ جَوْفِه شَىْءٌ مِّنَ الْقُرْاٰنَ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ. ترمذي
‘যাহার সিনার মধ্যে (অন্তরে) একটুও কুরআন নাই, সে যেন একখানা উজাড় ঘর।’ -তিরমিযী কোনো মুসলমানের অন্তরই কুরআন শূণ্য থাকা চাই না। হাদীসে আছে-
مَنْ قَرَأَ مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهٗ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ اَمْثَالِهَا لَا اَقُوْلُ الۤمۤ حَرْفٌ بَلْ اَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيْمٌ حَرْفٌ . ترمذي
‘যে ব্যক্তি (আল্লাহর কিতাব) কুরআন শরীফের একটি অক্ষর পড়ে, সে একটি নেকি পায়, আর প্রত্যেক নেকি দশ নেকির সমান (এই হিসাবে প্রত্যেক অক্ষরে দশ নেকি করে পাওয়া যায়)। আমি এ কথা বলি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ এক অক্ষর; বরং ‘আলিফ’ এক অক্ষর, ‘লাম’ এক অক্ষর এবং ‘মীম’ এক অক্ষর। -তিরমিযী
এর দৃষ্টান্ত এই যে, যদি কেউ ‘আলহামদু’ পড়ে, তবে এর পাঁচটি অক্ষরের পঞ্চাশ নেকি পাবে। আল্লাহু আকবার! কত বড় ফযীলত। সুতরাং সামান্য একটু কষ্ট ও পরিশ্রম স্বীকার করে যে এত বড় ফযীলত হাসিল না করবে, তার উপর বড়ই আক্ষেপ।
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ قَرَأَ الْقُرْاٰنَ وَعَمِلَ بِمَا فِيْهِ اُلْبِسَ وَالِدَاهٗ تَاجًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ضَوْءُهٗ اَحْسَنُ مِنْ ضَوْءِ الشَّمْسِ فِىْ بُيُوْتِ الدُّنْيَا لَوْ كَانَتْ فِيْكُمْ فَمَاظَنُّكُمْ بِالَّذِىْ عَمِلَ بِهٰذَا.
‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়েছে এবং উহার হুকুমের উপর আমল করেছে, তার মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন এমন একটি তাজ (মুকুট) পরান হবে, যার আলোক সূর্যের আলোক হতে অধিকতর উজ্জল হবে- যে আলোক দুনিয়াতে যে সূর্য যখন তোমাদের মধ্যে আসে, তখন তোমাদের ঘরের মধ্যে হয় অর্থাৎ, সূর্য যখন কাছে আসে, তখন তোমাদের ঘরের মধ্যে কত আলো হয়, সেই তাজের আলো ইহা অপেক্ষাও অধিক হবে। যখন মাতা-পিতার এত বড় মর্তবা হবে, তখন যে ব্যক্তি স্বয়ং কুরআন শরীফ পড়বে ও তদনুযায়ী আমল করবে, তার সম্বন্ধে তোমাদের কি ধারণা? অর্থাৎ, তার মর্তবা অসীম ও অতুলনীয়।’
ছেলে-মেয়েদেরকে যদি সময়াভাবে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ শিক্ষা না-ও দেওয়া যায়, তবে (পারা বা সূরা) যতটুকু হউক না কেন, তাই শিক্ষা দেওয়া নেহায়েত দরকার। যদি হিফজ করতে পারে, তবে তো অফুরন্ত ফযীলত।
অনেক মুসলমান নিজের সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষার পরিবর্তে জাগতিক শিক্ষা দেওয়াটা অধিক গুরুত্ব ও গৌরবের বিষয় মনে করে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কুরআন সহীহ-শুদ্ধতার প্রতি লক্ষ্য করা হয় না, একই সাথে কুরআনের প্রতি আদবের শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বহীন।
বর্তমানে মুসলমানদের ঘর ও মসজিদ তিলাওয়াত শূন্য হয়ে গেছে। গুনাহের আসবাব দ্বারা ঘর, দোকান-পাট ভরে গেছে। একসময় মুসলমানদের ঘর-বাড়ি থেকে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ আসত। সেখান থেকে এখন আসছে গান-বাদ্যের আওয়াজ। ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি ও বরকতের জন্য কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত করা হতো। এখন দোকান-পাটে টি.ভি. ও ভি. সি.ডি. এবং বাদ্য-বাজনার মাধ্যমে উন্নতি কামনা করা হয়। মসজিদে কুরআন মাজীদ থাকলে তা তালাবদ্ধ আলমারিতে রাখা হয়। অনেক স্থানে শুধু ব্যবস্থাপনার কারণে তিলাওয়াতের সুযোগ হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মসজিদে বা ঘরে কুরআনকে ধরা ছোঁয়ার কেউ নেই। অথচ মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত সম্পর্কে হযরত উকবা ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমরা মসজিদে নববীর সুফ্ফায় বসা ছিলাম। এমন সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কে ইহা পছন্দ কর যে, সকাল বেলা বতহান বা আকীক নামক বাজারে যেয়ে কোন রকম গোনাহ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না করে দু’টি অতি উত্তম উটনী নিয়ে আসবে? সাহাবায়ে কেরাম রাযি. আরজ করলেন, ইহা তো আমাদের সকলেই পছন্দ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মসজিদে গিয়ে দু’টি আয়াত পড়া বা দু’টি আয়াত শিক্ষা দেওয়া দু’টি উটনী হতে এবং তিনটি আয়াত তিনটি উটনী হতে এমনিভাবে চারটি আয়াত চারটি উটনী হতে উত্তম এবং ঐগুলোর সমপরিমাণ উট হতে উত্তম। -মুসলীম, আবু দাউদ
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ قَرَأَ الْقُرْاٰنَ فَاسْتَظْهَرَهٗ فَاَحَلَّ حَلَالَهٗ وَحَرَّمَ حَرَامَهٗ اَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِىْ عَشَرَةٍ مِّنْ اَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ قَدْ وَجَبَتْ لَهٗ النَّارَ
‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়বে এবং তা হিফজ করবে এবং তার হালালকৃতকে হালাল ও হারামকৃতকে হারাম জেনে চলবে, (অর্থাৎ, কুরআনের খেলাফ যেন কোনো আকীদা না হয়। উপরে আমলের কথা বলা হয়েছিল, এখানে আকীদার কথা বলা হলো।) আল্লাহ তাকে বেহেশতে স্থান দিবেন এবং তার আত্মীয়বর্গের মধ্য হতে দশজন লোকের জন্য তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন যাদের জন্য দোযখ সাব্যস্ত হয়ে ছিল।’ -তিরমিযী
এই হাদীসে কুরআন শরীফ হিফজ করার ফযীলত আরো বেশী বর্ণনা করা হয়েছে। আর আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী মা-বাবা। অতএব, মা বাবার জন্য যে সুপারিশ ও বখশিশ হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। নিজের ছেলেকে হাফেজ বানাবে যে কত বড় ফযীলত তা এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اِنَّ هٰذِهِ الْقُلُوْبَ تَصْدَءُ كَمَا يَصْدَءُ الْحَدِيْدُ اِذَا اَصَابَهُ الْمَاءُ قِيْلَ يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَمَا جِلَائُهَا؟ قَالَ كَثْرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةِ الْقُرْاٰنِ. بيهقى
‘পানি লাগলে লোহায় যেরূপ মরিচা ধরে, সেই রকম মানুষের দিলেও মরিচা ধরে। (মজলিস হতে) আরজ করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সেই জিনিস কি যাদ্বারা দিলকে সাফ করা যায়? রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, মৃত্যুকে বেশী স্মরণ করলে এবং কুরআন শরীফ পড়তে থাকলে। (দিল সাফ থাকে, মরিচা ধরে না)।’ -বায়হাকী
وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَنَحْنُ نَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَفِيْنَا الْعَرَبِىُّ وَالْعَجَمِىُّ فَقَالَ اقْرَؤُوْا فَكُلٌّ حَسَنٌ
‘হযরত জাবের রাযি. হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এমতাবস্থায় তাশরীফ আনলেন, যখন আমরা কুরআন শরীফ পাঠ করছিলাম, তখন আমাদের মধ্যে পাড়াগাঁয়ের লোকও ছিল। (আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আরবী লোক ছিল, তারা কুরআন শরীফ শুদ্ধভাবে পড়তে পারত, আর কয়েকজন পাড়াগাঁয়ের লোকও ছিল, যারা শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ পড়তে পারত না।) হযরত বললেন, পড়তে থাক, সবই ভাল।’
অর্থাৎ চেষ্টা করতে থাক যদি তা সত্তে¡ও ভালো পড়তে না পার তাতে মন ছোট করো না, আর যারা ভালো পড়তে পারে, তারা যেন তোমাদেরকে ঘৃণা না করে। (আল্লাহ তা‘আলা দিল দেখেন।) একথা দ্বারা বুঝা গেল যে, ‘জবান (মুখ) সাফ নয় বা বয়স বেশি হয়ে গিয়েছে, এমতাবস্থায় সহীহ করে (শুদ্ধ করে) পড়তে পারা যাবে না, সুতরাং সওয়াব কি হবে? বরং গোনাহ (পাপ) হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ এমন মনে করা উচিত নয়। বরং রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে সান্তনা দিয়ে পড়তে বললেন।
মিশকাত শরীফে আছে-
مَنِ اسْتَمَعَ اِلٰى اٰيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللهِ كَتَبَتْ لَهٗ حَسَنَةٌ مُّضَاعَفَةٌ وَمَنْ تَلَاهَا كَانَتْ لَهٗ نُوْرًا يَّوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের একটি আয়াত শুনার জন্যও কান লাগাবে অর্থাৎ মনোযোগের সাথে শুনবে, তাকে এমন একটি নেকি (পূণ্য) দেওয়া হবে, যা সর্বদা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। (কতদূর যে বাড়বে তার কোন সীমা নির্দেশ করেন নাই। অতএব, আল্লাহ তা‘আলার রহমতের দরবারে আশা করা যায় যে, ইহা ধারণাতীত বাড়বে।) আর যে ব্যক্তি সে আয়াতটি পাঠ করবে, তার জন্য সেই আয়াতটি কিয়ামতের দিবসে একটি উজ্জল নূর হবে।’ আহমদ
কুরআন শরীফ কত বরকতের জিনিস। যদি নিজে পড়তে না পারে, তবে কোনো কুরআন পাঠকের পড়ার দিকে কান লাগিয়ে শুনলেও বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। হে আল্লাহর বান্দা! ইহা তো কিছুই কঠিন নয়। (এখনও জাগ, আখেরাতের জন্য একটু চিন্তা কর, অলস্য নিদ্রা পরিত্যাগ কর, আর ঘুমে বিভোর থেকো না।)
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
اِقْرَؤُوْا الْقُرْاٰنَ فَاِنَّهٗ يَأْتِىْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيْعًا لِّاَصْحَابِه – مسلم
‘(হে আমার উম্মতগণ!) তোমরা কুরআন শরীফ সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাক; কেননা যারা কুরআন শরীফ সর্বদা তিলাওয়াত করবে, কিয়ামতের দিন কুরআন শরীফ তাদের জন্য সুপারিশ করবে (তাদেরকে দোযখ হতে বাঁচিয়ে দিবে)।
রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-
يَجِيْئُ صَاحِبُ الْقُرْاٰنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُوْلُ الْقُرْاٰنُ يَا رَبِّ حَلِّه فَيُلْبَسُ تَاجُ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُوْلُ يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةُ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُوْلُ يَارَبِّ اِرْضَ عَنْهٗ فَيُرْضٰى عَنْهُ فَيُقَالُ اِقْرَأْ وَارْقَ وَيَزْدَادُ بِكُلِّ اٰيَةٍ حَسَنَةٌ- ترمذى
কুরআন শরীফ পাঠকারীগণ কিয়ামতের দিবসে যখন আল্লাহর দরবারে আসবে, তখন কুরআন শরীফ বলবে, ‘হে আল্লাহ! তাদেরকে সম্মানের লেবাস পরিধান করান। অতঃপর তাদেরকে বড় সম্মানের তাজ পরান হবে। অতঃপর কুরআন শরীফ পুনরায় বলবে, ‘হে আল্লাহ! তাদেরকে আরো দিন।’ তখন তাদেরকে আরো সম্মানের লেবাস পরান হবে। পুনরায় কুরআন শরীফ বলবে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাদের উপর চিরকালের জন্য সন্তুষ্ট হয়ে যান।’ অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর চিরকালের জন্য সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং বলবেন: ‘কুরআন শরীফের এক একটি আয়াত পাঠ করো এবং এক একটি উচ্চ দর্জায় আরোহণ করতে থাক।’
অন্য এক হাদীসে এই পড়া এবং উপরের দর্জায় চড়ার বিস্তৃত বর্ণনা এসেছে। যা এরূপ: ‘যে ভাবে দুনিয়াতে তারতীলের সাথে পড়তে সেই রকম পড়তে ও চড়তে থাকো; যে আয়াতে গিয়ে তোমার পড়া শেষ হবে সেখানেই তোমার থাকার স্থান।’
হে মুসলমানগণ!
এই সকল হাদীস খুব চিন্তার সাথে পাঠ করুন। কুরআন শরীফ অমূল্য রত্ন , যত্নের সাথে শিক্ষা লাভ করুন এবং নিজের ছেলে-মেয়েদেরকেও শিক্ষা দিতে চেষ্টা করুন। যদি সহীহ করে পড়তে না পারা যায়, তবে ঘাবরানোর কোনো কারণ নাই। চেষ্টা করতে থাকলেও বহু সওয়াব পাওয়া যাবে। যদি হিফজ (কণ্ঠস্থ) না হয়, তবে দেখে দেখে পড়তে ও পড়াতে থাকবে। তাতে অনেক ফযীলত হাসিল হবে। যদি সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ পাঠ শিক্ষা লাভ করার সময় ও সুযোগ না ঘটে, তবে যারা সম্পূর্ণ কুরআন শিক্ষা লাভ করেছেন তাদের নিকট বসে শুনলেও অনেক সওয়াব পাওয়া যাবে।
সকলেরই জানা আছে যে, যে সকল কাজ অত্যন্ত দরকারী তা করাতে সওয়াব পাওয়া যায়, অথচ তা হাসিল করার উপায়গুলি অর্জন করা যেমন জরূরী বা দরকারী, তেমন তাতে অফুরন্ত সওয়াবও নিহিত আছে।
অতএব, কুরআন শরীফ শিক্ষার বন্দোবস্ত করাও নেহায়েত জরূরী এবং তাতে অশেষ সওয়াব আছে। প্রতি গ্রামে মুসলমান ভাইগণ মিলিতভাবে চেষ্টা করবেন, যাতে গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায় কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য মক্তব স্থাপিত হয়। সেই মক্তবে ছেলে-মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার বন্দোবস্ত করা একান্ত দরকার। বয়স্কদেরও কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য কিছু সময় বের করতে হবে। দুনিয়ার সমস্ত কাজ-কর্মের জন্য সময় মিলে, আর আল্লাহর কালাম কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য সময় মিলবে না?
শিক্ষক যদি বিনা বেতনে পাওয়া যায়, তবে ভালই। নতুবা সকলে মিলে চাঁদা করে শিক্ষকের জীবিকা নির্বাহের যোগ্য কিছু সম্বল সংগ্রহ করে দেওয়া দরকার। যে সমস্ত ছেলেরা দারিদ্রতার কারণে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ পড়তে পারে না, তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে দেওয়া আবশ্যক। এই প্রথা বাংলাদেশ ব্যতীত অন্যান্য ইসলামী দেশে এখনও প্রচলিত আছে, যেমন- দেওবন্দ, সাহারানপুর, থানাভবন এবং অন্যান্য মাদরাসায় ছাত্রগণ নিশ্চিন্ত হয়ে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ শিক্ষা করতে পারে। আর ছেলেরা মক্তবে যতটুকু শিক্ষা করবে, ততটুকু তারা বাড়ীর মেয়েদেরকে শিক্ষা দিলে স্ত্রী-পুরুষ সকলেই কুরআন শরীফ শিক্ষা করতে পারে। যদি কেউ আমপাড়া দেখে পড়তে না পারে, তবে অন্ততপক্ষে কিছু সংখ্যক সূরা মুখস্ত পড়ে নেওয়া আবশ্যক।
কুরআনে কারীমের প্রতি ইমামে আ‘জমের আযমত
আবু হানীফা রহ. ইজতিহাদে সবচেয়ে বড় ও বিজ্ঞ ইমাম ছিলেন। এ কারণে তাকে ‘ইমামে আযম’ বলা হয়। তিনি কুরআন শরীফের বড় আশেক ছিলেন। ছিলেন কুরআনী জ্ঞানের মহাপÐিত। কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফিক্হের প্রবর্তন করেছেন। তিনি অত্যন্ত খোদাভীরু ও কোমল হৃদয়ের অধীকারী ছিলেন। ইলম ও আলেমদের তিনি খুবই সম্মান করতেন। কুরআন শরীফের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক অনুভব করতেন। তাদের প্রতি ছিল তার ঐকান্তিক ভালোবাসা। তাঁদেরকে খুশি করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। তাঁদের সেবায় থাকতেন উৎসর্গিত।
একদিনের ঘটনা। তাঁর ছেলে যেদিন শিক্ষকের নিকট পবিত্র কুরআনের সবক শুরু করল, সেদিন তিনি ছেলের শিক্ষকের খেদমতে পাঁচ হাজার দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) উপঢৌকন স্বরূপ পেশ করলেন। এরপর যেদিন তাঁর ছেলে সূরা ফাতিহা শেষ করল, সে দিনও তিনি শিক্ষকের খিদমতে পাঁচ হাজার দেরহাম হাদিয়া স্বরূপ পেশ করলেন এবং অতি ন¤্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আরয করলেন, “আল্লাহর কসম, যদি আমার নিকট এর চেয়েও বেশি দেরহাম থাকত, তবে অবশ্যই তাও আপনার খেদমতে পেশ করতাম।”
হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনী
জন্ম ও শৈশব
-
হযরত মূসা (আঃ) বনি ইসরাইল গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
-
সে সময় মিশরের ফেরাউন ঘোষণা দিয়েছিল, বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশু হত্যা করা হবে, কারণ সে শুনেছিল এক শিশু জন্ম নেবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।
-
মূসা (আঃ)-এর জন্মের পর আল্লাহর নির্দেশে তাঁর মা তাঁকে একটি ছোট বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন।
-
বাক্সটি ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার হাতে এসে পৌঁছে। তিনি তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন এবং প্রাসাদে লালনপালন করেন।
-
ছোটবেলায় মূসা (আঃ) ফেরাউনের কোলে বসে তাঁর দাড়ি টেনে ধরেন। ফেরাউন সন্দেহ করলে আগুন ও খেজুরের দানা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। মূসা (আঃ) আগুনের কয়লা মুখে দিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলেন, ফলে তাঁর কথা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
যৌবন ও ঘটনা
-
যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ স্বভাবের ছিলেন।
-
একদিন তিনি দেখলেন এক মিশরীয় সৈন্য এক ইসরাইলীয়কে নির্যাতন করছে। তিনি তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ভুলবশত মিশরীয়কে আঘাত করেন এবং সে মারা যায়।
-
এরপর ভয়ে মূসা (আঃ) মিশর ছেড়ে মাদইয়ান নগরে পালিয়ে যান।
-
সেখানে তিনি নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং কয়েক বছর তাঁর সেবা করেন।
নবুওত প্রাপ্তি
-
একদিন সীনাই পর্বতের কাছে মূসা (আঃ) আগুন দেখতে পান।
-
কাছে গিয়ে আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেন। এ কারণেই তাঁকে বলা হয় কালিমুল্লাহ (যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন)।
-
আল্লাহ তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করেন এবং ফেরাউনের কাছে গিয়ে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করার দায়িত্ব দেন।
-
মূসা (আঃ)-কে দুইটি মুজিজা (অলৌকিক নিদর্শন) প্রদান করা হয়:
-
লাঠি – যা সাপ হয়ে যেত।
-
হাত – কাপে রাখলে বের হতো উজ্জ্বল আলো।
-
ফেরাউনের সঙ্গে মোকাবিলা
-
মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সাথে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।
-
ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলে জাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করায়।
-
মূসা (আঃ)-এর লাঠি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে জাদুকরদের জাদু গ্রাস করে নেয়।
-
এতে অনেক জাদুকর ঈমান আনয়ন করে মুসলমান হয়ে যায়, যদিও ফেরাউন তাদের কঠোর শাস্তি দেয়।
বনি ইসরাইল মুক্তি
-
ফেরাউন কোনোভাবেই বনি ইসরাইলকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি।
-
আল্লাহ তাঁর উপর বিভিন্ন আজাব পাঠান (পঙ্গপাল, উকুন, রক্ত, ব্যাঙ ইত্যাদি)।
-
শেষে মূসা (আঃ) বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বেরিয়ে যান।
-
ফেরাউন সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, আল্লাহর হুকুমে মূসা (আঃ) লাঠি দ্বারা সমুদ্র আঘাত করেন।
-
সমুদ্র দুইভাগ হয়ে যায়, বনি ইসরাইল পার হয়ে যায়।
-
ফেরাউন ও তার সেনারা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারে।
তাওরাত প্রাপ্তি
-
মুক্তির পর মূসা (আঃ) সীনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদত করেন।
-
সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত প্রদান করেন – যা বনি ইসরাইলের জন্য হিদায়াতের গ্রন্থ।
-
কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে কিছু লোক বাছুর পূজা শুরু করে। মূসা (আঃ) ফিরে এসে তাদের কঠোরভাবে শাস্তি দেন।
মৃত্যু
-
হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনি ইসরাইলকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে।
-
মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (ফিলিস্তিন) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই পৌঁছান।
-
সহিহ হাদিসে আছে, ফেরেশতা তাঁর রূহ কবজ করেন এবং তাঁকে এমন স্থানে কবর দেওয়া হয়, যেখানে আজও সঠিকভাবে চিহ্ন জানা যায় না।
✅ শিক্ষা:
হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবনে আমরা ধৈর্য, সাহস, আল্লাহর উপর আস্থা এবং তাওহীদের প্রতি অটল থাকার শিক্ষা পাই।
হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) – একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ঐতিহাসিক জীবনী
জন্ম ও শৈশবকাল
হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাইল বংশে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মিশরের ফেরাউন (রামেসিস বা মির্সা ফেরাউন বলে ইতিহাসে পরিচিত) অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল।
-
এক রাতে ফেরাউন স্বপ্ন দেখে বা তার জ্যোতিষীরা তাকে জানায় যে, বনী ইসরাইলের মধ্যে একটি ছেলে জন্মাবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।
-
তখন ফেরাউন হুকুম দেয়, প্রতিটি নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করতে হবে এবং কেবল কন্যাশিশুদের বাঁচিয়ে রাখা হবে।
মূসা (আঃ) জন্মের পর তাঁর মা ইউখাবিদ ভয় পেয়ে যান। আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম আসে:
"তুমি তাকে দুধ পান করাও, আর যদি ভয় পাও তবে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। আমি তাকে তোমার দিকে ফিরিয়ে দেব এবং নবী বানাব।" (সূরা কাসাস: ৭)
তিনি শিশুকে একটি বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর কুদরত এমনভাবে কাজ করলো যে বাক্সটি গিয়ে পৌঁছায় ফেরাউনের প্রাসাদে। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুজাহিম (যিনি ঈমানদার মহিলা ছিলেন) শিশুটিকে দেখে দয়া করে বলেন:
"এ শিশুটি আমাদের জন্য শীতল চোখ হবে, একে হত্যা করো না।" (সূরা কাসাস: ৯)
ফলে মূসা (আঃ) ফেরাউনের প্রাসাদেই বড় হতে থাকেন।
যৌবন ও মিশরের ঘটনা
যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী ছিলেন। একদিন দেখলেন এক মিশরীয় (কপ্টি) একজন ইসরাইলীকে অন্যায়ভাবে মারছে। মূসা (আঃ) তাকে রক্ষা করতে গিয়ে আঘাত করেন, এতে লোকটি মারা যায়। (সূরা কাসাস: ১৫)
ভয়ে তিনি প্রার্থনা করেন:
"হে আল্লাহ, আমি নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা কর।"
আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন।
পরের দিন তিনি আবার দেখলেন ঐ একই ইসরাইলী আরেকজনের সাথে ঝগড়া করছে। এবার মূসা (আঃ) তাকে বকাঝকা করলেন। এতে মিশরীয়রা সন্দেহ করে ফেলে। খবর পৌঁছে যায় ফেরাউনের কাছে, এবং তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়।
একজন মিশরীয় মুসলমান (ঐতিহাসিকভাবে মুমিনে আলে ফেরাউন নামে পরিচিত) তাকে সতর্ক করে দেন। তখন মূসা (আঃ) মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ানের দিকে চলে যান।
মাদইয়ান জীবন
মাদইয়ান শহরে গিয়ে তিনি এক কূপের পাশে দেখলেন অনেক লোক পশুকে পানি খাওাচ্ছে। দুই তরুণী মেয়েকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি তাদের সাহায্য করেন।
তারা ছিল নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যা। শুআইব (আঃ) মূসা (আঃ)-কে আমন্ত্রণ জানান এবং পরে নিজের কন্যাকে তাঁর সাথে বিবাহ দেন। মূসা (আঃ) প্রায় ৮–১০ বছর মাদইয়ানে বসবাস করেন।
নবুওত প্রাপ্তি
একদিন মূসা (আঃ) পরিবার নিয়ে সিনাই মরুভূমি পেরোচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি তূর পর্বতের কাছে আগুনের শিখা দেখতে পান। আগুন আনতে গেলে আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন:
"হে মূসা! আমি তোমার প্রতিপালক। জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তূয়ায় আছ। আমি তোমাকে নবী বানালাম।" (সূরা ত্বাহা: ১১–১৩)
তাঁকে দুটি মুজিজা দেওয়া হয়:
-
লাঠি ফেলে দিলে বিশাল সাপে পরিণত হতো।
-
হাত কাপড়ে রেখে বের করলে উজ্জ্বল আলো ছড়াত।
আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন: ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করতে হবে।
ফেরাউনের দরবারে দাওয়াত
মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।
তিনি বললেন:
"আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হয়ে এসেছি, বনী ইসরাইলকে আমাদের সাথে পাঠাও।"
ফেরাউন অহংকারভরে বলল:
"আমি তো তোমার লালনপালন করেছি, তবু তুমি অকৃতজ্ঞ! আমিই তো তোমার উপরে প্রভু।"
মূসা (আঃ) অলৌকিক নিদর্শন দেখালেন। কিন্তু ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলল এবং প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ জাদুকরদের একত্র করল।
জাদুকরদের পরাজয়
জাদুকররা লাঠি ও দড়ি নিক্ষেপ করল, সেগুলো মানুষের চোখে সাপের মতো মনে হলো।
মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন, সেটি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে সব জাদু গ্রাস করল।
জাদুকররা সাথে সাথে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে বলল:
"আমরা মূসা ও হারুনের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি।"
ফেরাউন রেগে তাদের হুমকি দিলেও অনেকেই ঈমান নিয়ে শহীদ হন।
বনী ইসরাইল মুক্তি
ফেরাউন ক্রমেই জেদ বাড়াতে থাকে। আল্লাহ তার উপর বিভিন্ন আজাব নাজিল করেন – খরা, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি। তবুও সে ঈমান আনেনি।
শেষে আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আঃ) রাতের অন্ধকারে বনী ইসরাইলকে নিয়ে বেরিয়ে যান।
ফেরাউন সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, লোহিত সাগরের তীরে মূসা (আঃ) লাঠি আঘাত করলেন। সমুদ্র ফেটে বারোটি রাস্তা বের হলো।
বনী ইসরাইল নিরাপদে পার হলো, কিন্তু ফেরাউন ও তার সৈন্যরা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারল।
কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আজ আমি তোমার দেহকে বাঁচিয়ে রাখব, যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হও।" (সূরা ইউনুস: ৯২)
তাওরাত প্রাপ্তি
মুক্তির পর মূসা (আঃ) সিনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদতে লিপ্ত হন। সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত দান করেন, যা ছিল বনী ইসরাইলের জন্য হিদায়াত ও শরীয়তের গ্রন্থ।
তবে এ সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে সামিরি নামক একজন বাছুরের মূর্তি বানিয়ে অনেককে বিভ্রান্ত করে। তারা বাছুর পূজা শুরু করে।
ফিরে এসে মূসা (আঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের তাওবা করতে বাধ্য করেন।
মৃত্যু
হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনী ইসরাইলকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে।
তাঁর শেষ বয়সে আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (বায়তুল মুকাদ্দাস) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই নিয়ে আসেন।
সহীহ হাদীসে আছে, মূসা (আঃ)-এর রূহ কবজ করা হয় এবং তাঁকে এমন এক স্থানে দাফন করা হয়, যার সঠিক অবস্থান আজও অজানা।
শিক্ষা ও বার্তা
হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবন থেকে আমরা পাই –
-
আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা।
-
অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।
-
ধৈর্য ও সাহস।
-
তাওহীদ ও শিরক বর্জন।
তিনি ছিলেন কুরআনে সর্বাধিক উল্লেখিত নবী, যার ঘটনা থেকে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ করে।
বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
বনি ইসরাইলের ইতিহাস ও শিক্ষা
বনি ইসরাইলের ইতিহাস ও শিক্ষা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। কুরআনে তাদের সম্পর্কে বহুবার আলোচনা এসেছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার।
🕰️ ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ
- উৎপত্তি: “ইসরাইল” নামটি হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর উপাধি। তাঁর বংশধরদের বলা হয় “বনি ইসরাইল”।
- বংশধারা: হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দুই পুত্র—ইসমাইল (আঃ) ও ইসহাক (আঃ)। ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়াকুব (আঃ)-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইল জাতির সূচনা।
- মিসরে আগমন: হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলরা মিসরে বসতি স্থাপন করে এবং দীর্ঘকাল শাসন করে।
- ফিরাউনের অত্যাচার: পরবর্তীতে ফিরাউনদের শাসনে তারা নিপীড়িত হয়। হযরত মূসা (আঃ) তাদের মুক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হন।
- লোহিত সাগর পার হওয়া: মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে তারা সাগর পার হয়ে মুক্তি লাভ করে এবং সিনাই অঞ্চলে আশ্রয় নেয়।
📚 শিক্ষাগুলো
আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব
তারা বহুবার আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, যার ফলে শাস্তি পেয়েছে। এটি মুসলিমদের জন্য সতর্কবার্তা।নবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুসরণ
বনি ইসরাইল বহু নবী পেয়েছে, কিন্তু অনেক সময় তাদের অমান্য করেছে। মুসলিমদের উচিত নবীদের আদর্শ অনুসরণ করা।নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা
আল্লাহ তাদের অনেক নিয়ামত দিয়েছেন, কিন্তু তারা তা অবহেলা করেছে। কৃতজ্ঞতা না জানালে নিয়ামত হারানোর সম্ভাবনা থাকে।ঐক্য ও নেতৃত্বের গুরুত্ব
মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে তারা মুক্তি পেয়েছে, যা নেতৃত্বের গুরুত্ব বোঝায়।আত্মসমালোচনার শিক্ষা
কুরআনে তাদের ভুলগুলো তুলে ধরা হয়েছে যেন মুসলিমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
কুরআনের ধর্মীয় নীতিগুলো শুধু তত্ত্ব নয়—এগুলো জীবনের প্রতিটি স্তরে ব্যবহারযোগ্য একেকটি বাস্তব নির্দেশনা। তুমি যেহেতু বাস্তবভিত্তিক, ব্যবহারিক সমাধানে আগ্রহী, তাই নিচে আমি কুরআনের নীতিগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের ৫টি উপায় দেখাচ্ছি, সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আয়াত ও বাস্তব উদাহরণ:
🧭 ১. নৈতিকতা ও আচরণে প্রয়োগ
আয়াত: “তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।” — সুরা আল ইমরান ৩:১০৪
প্রয়োগ:
- অফিসে বা পরিবারে অন্যায় দেখলে নম্রভাবে প্রতিবাদ করা।
- নিজের আচরণে সততা, নম্রতা, ও সহনশীলতা বজায় রাখা।
💼 ২. পেশাগত জীবনে সততা
আয়াত: “তোমরা পরিমাপে কম দিও না।” — সুরা হুদ ১১:৮৪
প্রয়োগ:
- ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা, অতিরিক্ত দাবি না করা।
- API ব্যবহারে লাইসেন্স ও কনটেন্টের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা (তোমার নীতির সঙ্গে মিলেই যায়!)।
🕊️ ৩. সম্প্রীতি ও সহনশীলতা
আয়াত: “তোমরা ভালো ও খারাপ সমান করতে পারো না। তুমি ভালো ব্যবহার করো, তাহলে শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হবে।” — সুরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪
প্রয়োগ:
- পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বে উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা।
- ভাষা শেখার সময় অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করা (তোমার ভাষা-আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে)।
🕰️ ৪. সময় ও দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা
আয়াত: “সময়ের শপথ, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” — সুরা আসর ১০৩:১–৩
প্রয়োগ:
- প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা করা (প্রজেক্ট টাইমলাইন, UI/UX টাস্ক ইত্যাদি)।
- প্রার্থনার সময় ঠিক রাখা—যেমন তুমি প্রার্থনার সময় উইজেট বানিয়েছো!
🧠 ৫. জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার চর্চা
আয়াত: “তারা কি চিন্তা করে না?” — সুরা রুম ৩০:৮
প্রয়োগ:
- প্রযুক্তি ও ধর্মের সংমিশ্রণে নতুন সমাধান খোঁজা (যেমন বাংলা ভাষায় ইসলামিক কনটেন্ট বা লোকালাইজড ফিচার)।
- কুরআনের আয়াতগুলোকে UI-তে যুক্ত করে ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করা।
চমৎকার অনুরোধ, aopurbo! কুরআনে বনি ইসরাইল সম্পর্কে বহু আয়াত এসেছে, যেগুলো শুধু ঐতিহাসিক নয়—বরং গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা বহন করে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত তুলে ধরছি, সঙ্গে বিশ্লেষণও:
🕊️ ১. সুরা বাকারা, আয়াত ৪৭
“হে বনি ইসরাইল! আমার সে অনুগ্রহ স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকে বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।”
বিশ্লেষণ:
- আল্লাহ তাদেরকে নবী, কিতাব, খাদ্য, নিরাপত্তা—সবকিছু দিয়েছিলেন।
- কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব ছিল শর্তসাপেক্ষ: আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তিতে।
- শিক্ষা: মর্যাদা ধরে রাখতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
🔥 ২. সুরা বাকারা, আয়াত ১০০
“তারা যখনই কোনো অঙ্গীকার করে, তখনই তা ভঙ্গ করে; বরং তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসহীন।”
বিশ্লেষণ:
- বনি ইসরাইলের মধ্যে চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সাধারণ প্রবণতা।
- শিক্ষা: মুসলিমদের উচিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।
💰 ৩. সুরা হাশর, আয়াত ১৩
“আসলে তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয়ই বেশি, কারণ তারা অবুঝ সম্প্রদায়।”
বিশ্লেষণ:
- তারা বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও অন্তরে দুর্বল ছিল।
- শিক্ষা: প্রকৃত শক্তি আসে আল্লাহর প্রতি ভয় ও তাকওয়া থেকে।
🌍 ৪. সুরা মায়িদা, আয়াত ৬৪
“তারা যতবার যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দিয়েছেন। তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আর আল্লাহ বিশৃঙ্খল ব্যক্তিদের ভালোবাসেন না।”
বিশ্লেষণ:
- বনি ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার প্রবণতা ছিল।
- শিক্ষা: শান্তি ও সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের মূলনীতি।
📖 ৫. সুরা ইসরা (বনী ইসরাঈল), আয়াত ৪
“আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে বলে দিয়েছি, তোমরা পৃথিবীতে দু’বার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত অহংকারে লিপ্ত হবে।”
বিশ্লেষণ:
- ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বলা হয়েছে, তারা দুইবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাবে।
- শিক্ষা: অহংকার ও অবাধ্যতা জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
কুরআনের ধর্মীয় নীতিগুলো শুধু তত্ত্ব নয়—এগুলো জীবনের প্রতিটি স্তরে ব্যবহারযোগ্য একেকটি বাস্তব নির্দেশনা। তুমি যেহেতু বাস্তবভিত্তিক, ব্যবহারিক সমাধানে আগ্রহী, তাই নিচে আমি কুরআনের নীতিগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের ৫টি উপায় দেখাচ্ছি, সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আয়াত ও বাস্তব উদাহরণ:
🧭 ১. নৈতিকতা ও আচরণে প্রয়োগ
আয়াত: “তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।” — সুরা আল ইমরান ৩:১০৪
প্রয়োগ:
- অফিসে বা পরিবারে অন্যায় দেখলে নম্রভাবে প্রতিবাদ করা।
- নিজের আচরণে সততা, নম্রতা, ও সহনশীলতা বজায় রাখা।
💼 ২. পেশাগত জীবনে সততা
আয়াত: “তোমরা পরিমাপে কম দিও না।” — সুরা হুদ ১১:৮৪
প্রয়োগ:
- ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা, অতিরিক্ত দাবি না করা।
- API ব্যবহারে লাইসেন্স ও কনটেন্টের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা (তোমার নীতির সঙ্গে মিলেই যায়!)।
🕊️ ৩. সম্প্রীতি ও সহনশীলতা
আয়াত: “তোমরা ভালো ও খারাপ সমান করতে পারো না। তুমি ভালো ব্যবহার করো, তাহলে শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হবে।” — সুরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪
প্রয়োগ:
- পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বে উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা।
- ভাষা শেখার সময় অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করা (তোমার ভাষা-আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে)।
🕰️ ৪. সময় ও দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা
আয়াত: “সময়ের শপথ, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” — সুরা আসর ১০৩:১–৩
প্রয়োগ:
- প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা করা (প্রজেক্ট টাইমলাইন, UI/UX টাস্ক ইত্যাদি)।
- প্রার্থনার সময় ঠিক রাখা—যেমন তুমি প্রার্থনার সময় উইজেট বানিয়েছো!
🧠 ৫. জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার চর্চা
আয়াত: “তারা কি চিন্তা করে না?” — সুরা রুম ৩০:৮
প্রয়োগ:
- প্রযুক্তি ও ধর্মের সংমিশ্রণে নতুন সমাধান খোঁজা (যেমন বাংলা ভাষায় ইসলামিক কনটেন্ট বা লোকালাইজড ফিচার)।
- কুরআনের আয়াতগুলোকে UI-তে যুক্ত করে ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করা।
Islamic History
ফটো গ্যালারী
* সম্মানিত ইসলামী আইকন সদস্যবৃন্দ *
_ আর্কাইভ *ইসলাম-আইকন _
-
▼
2025
(28)
- ▼ অক্টোবর 2025 (7)
- ► সেপ্টেম্বর 2025 (17)
- ► আগস্ট 2025 (1)
-
►
2024
(21)
- ► আগস্ট 2024 (1)
-
►
2023
(19)
- ► নভেম্বর 2023 (5)
- ► মার্চ 2023 (1)
-
►
2022
(39)
- ► মার্চ 2022 (1)
- ► ফেব্রুয়ারি 2022 (1)
-
►
2021
(40)
- ► সেপ্টেম্বর 2021 (1)
-
►
2019
(227)
- ► ডিসেম্বর 2019 (81)
- ► নভেম্বর 2019 (105)
Total Follow Us
ফেসবুক গ্রুপ
নামাযের সময়সূচী
Social Follow Us
Audio Quran
Categories
- আখলাক চরিত্র (18)
- আল কোরআন-আরবি (5)
- ইসলামিক বই (42)
- ইসলামী জীবন (290)
- ঈমান ও আকীদাহ (40)
- কালেমা (8)
- কোরআন-তাফসীর (26)
- কোরআনের বাণী (33)
- দোয়া (3)
- নও মুসলিম জীবনি (6)
- নবীদের জীবনী (47)
- নামাজ শিক্ষা (58)
- প্রশ্নোত্তর/ফাতাওয়া (138)
- বাংলা কোরআন (5)
- রোযা (25)
- সাহাবীদের জীবনি (32)
- সূরা ও দোয়া (42)
- হাদীস (44)
জনপ্রিয় বা সর্বাধিক পঠিত পোস্ট
-
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, হাদীসের সহীহ/ জাল কার কথার উপর ভিত্তি করে বিশ্বাস করবো ? আর এগুলো কতোটা সত...
-
নামাজের ওয়াজিব ১৪টি ১. প্রথম দুই রাকাতে সুরা ফাতিহা পূর্ণ পড়া। (বুখারি ১/১০৪, হাদিস : ৭৫৬) ২. প্রথম দুই রাকাতে সুরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য একট...
-
নারীদের নামাযের সর্বোত্তম স্থান : মুসলমান মাত্রই তার ভেতর এই আবেগময় প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে যে পুরুষরা তো মসজিদে জামাতের সহিত নামায আদায় ক...
-
লেখকঃ আহমেদ রফিক গাজিপুর থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। বাসে উঠে বসলাম। কিছুক্ষন পর এক মুরব্বী উঠে আমার পাশেই বসলেন। আমি সালাম দিলাম। স্নিগ্ধ কোমল চে...
-
প্রশ্ন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ কোনটি? আমার জানা মতে এ বিষয়ে অনেকগুলো অভিমত। এর মধ্যে বিশু...
-
বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ার কারনে এখানকার মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্য যেকোন দেশের চেয়ে বেশি। চলুন জেনে নিই বিভিন্ন সো...
-
লেখকঃ ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়...
-
নিসাব (نصاب الزكوة)আরবি শব্দ। ইসলামী শরিয়তের পারিভাষায় যাকাতের নিসাব হলো যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ। নিসাবের বিবরণ- যে...







