শিরোনাম
Loading latest headlines...

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বই: ছহীহ কিতাবুদ দো’আ

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 

 বইটিতে কুরআন ও ছহীহ হাদীছ থেকে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় দো’আসমূহ সংকলিত হয়েছে। পাঠকের সুবিধার্থে ‘ছহীহ কিতাবুদ দো‘আ’ বইটি তিনটি পর্বে বিভক্ত করা হয়েছে। ১ম পর্বে পবিত্র কুরআনের দো‘আ সমূহ, ২য় পর্বে ছালাত সংগান্ত প্রয়োজনীয় দো‘আ সমূহ এবং ৩য় পর্বে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় দো‘আ সমূহ। বইটির ১ম পর্বে উৎস ও আমল সহ ৪৫টি কুরআনী দো‘আ স্থান পেয়েছে। এছাড়া ২য় পর্বে ৩০ টি ও ৩য় পর্বে ৬৭ টি মূল দো‘আসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে আনুসঙ্গিক অনেক দো‘আর সমাবেশ ঘটেছে। সর্বসাধারণের সুবিধার্থে প্রতিটি দো‘আর বাংলা উচ্চারণ এবং অনুবাদ সহজ ভাষায় পেশ করা হয়েছে। হাদীছের নম্বরসমূহ ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ কর্তৃক প্রকাশিত ছহীহ বুখারী এবং এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ঢাকা কর্তৃক প্রকাশিত বঙ্গানুবাদ ‘মেশকাত শরীফ’ থেকে গৃহীত হয়েছে। বইটি লিখেছেন মুহাম্মাদ নুরূল ইসলাম।



যেমন কর্ম তেমন ফল

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 

অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর। সেজন্যই সম্ভবত অ্যালেকজান্ডার পােপ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন
A little learning is a dangerous thing
Drink deep or taste not the Pierian spring.
কোনাে বিষয়ে ভাসা ভাসা জ্ঞান অর্জন করার চেয়ে সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝে নেয়াই কাম্য। নতুবা অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ওপর আমল করতে গিয়ে অনর্থ সৃষ্টি হয়।

কিছু কিছু আধুনিক ছেলেমেয়েদের এক বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কুরআন, হাদীস, তাফসীর , ফিকহ কিছুই না পড়ে ইউটিউবে কখানা লেকচার দেখে মুই কি হনুরে’ মনে করা। ব্যাস, তাদের না যায় কিছু বলা আর না যায় কিছু বুঝানাে। ব্যাপারটা এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকলেও হতাে। কিন্তু যখন ওরা এই অপর্যাপ্ত জ্ঞান অনুযায়ী নিজেরা চলে এবং অন্যদের লেকচার দেয় তখন আরও বড় বিপদ দেখা দেয়। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের কিছু বােনরা ধারণা পেয়ে বসেছে যে, শ্বশুরবাড়ির লােকজনের প্রতি তাদের কোনাে দায়দায়িত্ব নেই। সুতরাং তারা অপরপক্ষের সাথে সামান্য সদাচরণটুকুও বজায় রাখা নিষ্প্রয়ােজন মনে করে। স্বামী যেন তাদের ব্যক্তিগত সম্পদ। সুতরাং স্বামীকে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে সহযােগিতা করা তাে দূরে থাক; বরং সে নিজে কিছু করলেও বিরক্তি প্রকাশ করে।
নিতান্ত নিরুপায় হয়ে এই বিষয়ে আলােকপাত করতে হচ্ছে। যেহেতু আমাদের এই অবুঝ বােনগুলাের কারণে ইসলামের ব্যাপারে স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন লােকজনের মনে ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। তারা ইসলামকে কটাক্ষ করার সুযােগ পাচ্ছে। অথচ ইসলামের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে যথাসম্ভব মানবীয় দুর্বলতার ঊর্ধ্বে উত্তরণ করতে সহায়তা করা, যাতে সবার অধিকার সংরক্ষিত হয়।
আমরা কুরআন আদ্যোপান্ত পড়লে দেখতে পাই, এখানে এমন কোনাে বিষয় নেই যা আলােচনা করা হয়নি। ঈমান আকিদা থেকে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমরনীতি, এমনকি পারস্পরিক আচরণগুলাে পর্যন্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। পারস্পরিক আচরণের ক্ষেত্রে যে সম্পর্ক সবচেয়ে সহজ, স্বাভাবিক এবং আন্তরিক, সেই মা-বাবার সাথে সম্পর্কের নিয়ামাবলি পর্যন্ত বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মা-বাবার সাথে কেমন আচরণ করা যাবে, কী করা যাবে না, তা স্পষ্টভাবে বলে দেয়া হয়েছে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে প্রত্যেক সন্তান তার মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করবে, সাধ্যমতাে দেখাশােনা করবে, সকল আদেশ-নিষেধ মান্য করবে (সে সকল ক্ষেত্র ব্যতীত যা আল্লাহ তায়ালার আদেশের বিরুদ্ধে যায়) এবং কখনােই তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করবে না। এভাবেই ভাইবােন, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু, প্রতিবেশি এমনকি শত্রুর সাথে আচরণ কেমন হবে তা পর্যন্ত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অথচ কুরআনের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। শ্বশুরবাড়ির সাথে জামাতা বা বউয়ের আচরণ কেমন হবে। আমাদের কিছু কিছু বােন এখান থেকে ধরে নিয়েছে, শ্বশুরবাড়ির প্রতি আমাদের কোনাে দায়দায়িত্ব নেই। যিনি সবার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কুরআন নাযিল করেছেন, আমরা কীভাবে ধরে নিতে পারি তিনি এই বিষয়টি কোনাে কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে গিয়েছেন? এর পেছনে গুঢ় কারণ রয়েছে এবং সেটা অবশ্যই অসাধারণ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আল্লাহ কোনাে ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যাতীত বােঝা চাপান না, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার ওপর বর্তায় যা সে করে। (আল বাকারা: ২৮৬)
এতটুকু স্পষ্ট হবার পর আমরা বুঝার চেষ্টা করে দেখতে পারি এই সম্পর্কটি ব্যাখ্যা না করার মাহাত্ম কী।

এখানে দুটো অংশ আছে। প্রথমত, আল্লাহ তায়ালা কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনাে কাজের ভার দেন না। মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পুত্র ও কন্যা উভয়ের জন্য ফরয। এটি বাদ দেয়ার কোনাে উপায় নেই। কারাে সাথে শেয়ার করার কোনাে উপায় নেই। পরিমাণ লাঘব করারও কোনাে উপায় নেই। একজন মানুষের সামর্থ্য সীমিত। তাই একটি গুঢ় দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়ার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অন্যান্য ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দিয়েছেন। একটি মেয়ে যখন মনে করে শ্বশুরবাড়ির সবাইকে খুশি করা তার দায়িত্ব, তখন এই চিন্তা তার মনের ওপর জগদ্দল পাথরের মতাে চেপে বসে। কারণ কোনাে সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে গিয়ে সবার মন-মর্জি বুঝে, সবার সেবায় এমনভাবে নিয়ােজিত হয়ে যাওয়া , যাতে তারা সকলে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। অথচ এটা স্বাভাবিক মানবীয় দুর্বলতা যে, মানুষ তার মা-বাবার কাছেও নিজের উত্তম প্রচেষ্টার স্বীকৃতি চায়। শ্বশুরবাড়ির লােকজন যদি মেয়েটির সেবা তাদের পাওনা মনে করে তবে তারা মেয়েটির প্রচেষ্টায় আহা! উহু! করে প্রশংসা করার মতাে কিছু দেখতে পায় না। সব ভালােরই আরও ভালাে সংস্করণ হতেই পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ অনুদার ও স্বার্থপর হয়ে পড়ে এবং মেয়েটির কৃত সবকিছুকে ফর গ্রান্টেড’ ধরে নেয়। যার ফলে মেয়েটি কী করতে পারল, তার চেয়েও তার আরও কী করা উচিত ছিল সেটাই তাদের কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে মেয়েটি উত্তরােত্তর প্রচেষ্টার পরিমাণ বৃদ্ধি করতে করতে একসময় মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সাধ্যাতীত পরিশ্রম তাকে করে তুলতে পারে ক্ষুব্ধ, হতাশ ও ভগ্নহৃদয়। ফলে তার আচরণ হয়ে যেতে পারে রুক্ষ ও অনিয়ন্ত্রিত।
সেজন্য আল্লাহ এটা কারাে ওপর দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দেননি। এখানেই আল্লাহর দূরদৃষ্টির কাছে আমাদের শির আপনা আপনিই নত হয়ে যায়।
এবার আসছে দ্বিতীয় অংশ, সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার ওপর বর্তায় যা সে করে। আল্লাহ মা-বাবার বাইরেও যাদের সাথে আমরা অন্যান্যভাবে সম্পর্কিত; যেমন প্রতিবেশী, সহকর্মী, বন্ধুবর্গ, চেনা-অচেনা লােকজন; সবার প্রতি আমাদের মানবিক দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন যার জন্য আমরা জিজ্ঞাসিত হব। এই দায়িত্ব মা-বাবার প্রতি দায়িত্বের মতাে এতখানি কঠোর নয়। আবার দায়িত্বে অবহেলা করার মতাে শিথিলও নয়। এর ফলাফল আমরা আখেরাতেও পাব, দুনিয়াতে
পাব। আমাদের মনে রাখা প্রয়ােজন, দায়িত্ব ব্যতীত অধিকার জন্মায় না। যে ছেলেটির সাথে মেয়েটির বিয়ে হয় সেই ছেলেটি আরেকজনের দীর্ঘকালীন শ্রম এবং প্রচেষ্টার ফলাফল। সুতরাং ছেলেটির ওপর তার যতখানি অধিকার তা শাশুড়ির সাথে ভাগ করে নেয়া তার দায়িত্ব। শাশুড়িকেও বুঝতে হবে তাঁর ছেলের সংসারে আগত মেয়েটি তাঁর ভবিষ্যত বংশধরদের মা। তার সাথে সুসম্পর্কই নিশ্চিত করবে তাঁর আগামী দিনের প্রতিনিধিদের সুন্দর ভবিষ্যত। তাহলে বিয়ের পর বউ শাশুড়ি মিলে একজন পুরুষকে নিয়ে চর দখলের প্রতিযােগিতায় নামবেন না; বরং উভয়ে সচেষ্ট হবেন একটি নির্মল, সুন্দর, সৌহার্দ্যপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে, যেখানে হেসে-খেলে বেড়াবে আগামীর প্রতিনিধিরা। আমাদের মনে রাখা প্রয়ােজন, সে তাই-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই-ই তার ওপর বর্তায় যা সে করে। যৌবনে আমরা যদি স্বামীর দখলদারিত্বে মত্ত হই, বৃদ্ধবয়সে আমাদের সন্তানদের কাছে আমরা একই আচরণ ফিরে পাব।

এখন দেখুন, একটি মেয়ে যদি মনে করে শ্বশ্রবাড়ির লােকজনের জন্য কিছু করা তার দায়িত্ব নয়; কিন্তু সে তাদের সাথে হেসে কথা বলা থেকে শুরু করে তাদের জন্য যা কিছু করবে সবকিছুর জন্য তার আখেরাতের খাতায় জমা হতে থাকবে ভুরি ভুরি বােনাস পয়েন্টস, তখন ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াবে? তখন তাকে কারাে বাধ্য করতে হবে না; বরং সে খুশি হয়ে সবার জন্য ভূমিকা রাখতে উদ্বুদ্ধ হবে। তার চাপ বােধ হবে না। যেহেতু সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যতটুকু করতে পারবে তার বাইরে তাকে কোনােকিছু করতে বাধ্য করা হবে। এমনকি শ্বশুরবাড়ির কেউ তাকে অ্যাপ্রিশিয়েট না করলেও তাকে সবার সাথে সদ্ব্যবহার করা থেকে ঠেকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে। কারণ সে জানে যার যার জবাবদিহিতা তার তার। ওদের মূল্যায়ন ব্যতিরেকে সে তার বােনাস পয়েন্টস পেয়ে যাবে। উপরন্তু স্বামী যদি স্ত্রীর আত্মীয়-পরিজনের সাথে সদ্ভাব। বজায় রাখে তাতে স্ত্রী যেমন আনন্দিত হয়, স্ত্রী স্বামীর পরিবার পরিজনের সাথে সদাচরণ করলে স্বামীও তেমনই সন্তুষ্ট হয়। শেষতক কেয়ামতের মাঠে স্বামী এবং স্ত্রীই তাে পরস্পর পরস্পরের প্রধান সাক্ষী, তাই একে অপরকে ক্ষেপিয়ে লাভ কী? স্বামী বা স্ত্রীর ওপর জবরদস্তি করে দুনিয়াতে হয়তাে সাময়িক জিত হয়, কিন্তু আখেরাত পুরােটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আনন্দের কথা হলাে, দুনিয়াতে কিছু ধৈর্য ও ত্যাগের বিনিময় যে শুধু পরকালে মিলবে তা কিন্তু নয়, এর আংশিক পুরস্কার আমরা জীবদ্দশাতেই পেয়ে যাব।

অপরদিকে শ্বশুরবাড়ির সবার কাছে যদি ব্যাপারটা পরিষ্কার থাকে যে, বউ মানবিক সম্পর্কের বাইরে তাদের কারাে জন্য কিছু করতে বাধ্য নয় তখন সে তাদের সাথে হেসে কথা বললেও তারা আনন্দিত হবেন। তার বাইরে আরও কিছু করলে তাে আল্লাদে আটখানা হয়ে যাবেন। ‘যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ নয়।

মুসনাদে আহমদ, তিরমীযি এই কথা মাথায় রেখে তারা মেয়েটির সকল প্রচেষ্টাকেই স্বাগত জানাবেন, অ্যাপ্রিশিয়েট করবেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই উভয়ের মাঝে সৃষ্টি হবে একটি সুমধুর সম্পর্ক। পুরুষদের বেলাতেও এটি সমভাবে প্রযােজ্য।
শ্বশুরবাড়ির প্রতি দায়িত্ব চাপিয়ে না দেয়ার পেছনে এটিই মূল রহস্য।
আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং পরকালে তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে আত্মরক্ষা করা। এই লক্ষ্য অর্জন করার জন্য মহান আল্লাহ আমাদের যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তা হলাে,

“তােমরা দৌড়ে এসাে তােমাদের প্রভুর ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার প্রশস্ততা মহাকাশ এবং পৃথিবীর মতাে। তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্যে। যারা ব্যয় (দান) করে সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায়, যারা রাগ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল-কোমল। আর আল্লাহ তাে কল্যাণকামীদেরই ভালােবাসেন। (আলে ইমরান: ১৩৩-১৩৪)

জান্নাতের পথে ছুটে চলার সময় যদি কারাে সাথে ভুল বুঝাবুঝি হয়, তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ মনােভাব সৃষ্টি হয়, তবে এর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ক্ষমা করে দেবেন ভেবে তাদের মাফ করে দিলে নিজের চলার গতি বৃদ্ধি হয়। আমাদের দৃষ্টি যদি আমাদের লক্ষ্যের দিকে নিবদ্ধ থাকে, তাহলে আশেপাশে বিদ্যমান বাঁধাবিপত্তি চলার পথে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি করলেও আমাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারবে না। একটি আয়াত আমাদের মাথায় স্পষ্ট হওয়া প্রয়ােজন, তা হলাে,

‘পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে সেগুলাে আমরা এর শােভা বানিয়ে দিয়েছি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, আমলের দিক থেকে তাদের মধ্যে কে উত্তম? (আল কাহফ: ৭)

সুতরাং পৃথিবীস্থ কোনাে কিছুই আমাদের লক্ষ্যবস্তু হবার উপযুক্ত নয়। পৃথিবীতে আমাদের সাময়িক অবস্থান কেবল পরীক্ষার নিমিত্ত মাত্র। আল্লাহ তায়ালা দেখতে চান আমাদের মাঝে কে নিজের প্রভুকে ভালােবেসে তাঁর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য বানিয়ে এগিয়ে যায়। আর কে পথের আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা খেলনাসদৃশ বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে মূল লক্ষ্য ভুলে বসে থাকে। তবে যে লক্ষ্যের ওপর অটল থাকে, সে বিজয়ী হবেই। যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তার প্রতিযােগিতায় পুরস্কার পাবার কোনাে যৌক্তিকতা নেই বলাই বাহুল্য।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে অনেক কিছুই বুঝা অনেক সহজ হয়ে যায়। জীবনের আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই তখন তুচ্ছ বা অপ্রয়ােজনীয় মনে হয়। অনেক ব্যর্থতা এবং না পাওয়ার বেদনা তখন হাসির উদ্রেক করে।

বিয়ে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি ইহকাল ও পরকালের জীবনকে সাজানাের জন্য দুজনের পার্টনারশিপ। এতে আনুষাঙ্গিক ব্যাপারগুলােকে প্রাধান্য দিয়ে এত দুঃখ, বেদনা ও দ্বন্দ্বের অবতারণা না করে নিজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এগিয়ে যাবার মাঝেই সাফল্য নিহিত।

রেহনুমা বিনতে আনিস



ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

পটভূমি
বদর যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করলো বটে, কিন্তু যুদ্ধের মাধ্যমে তারা যেনো ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়লো। এই প্রথম যুদ্ধেই তারা দৃঢ়তার সঙ্গে কাফিরদের মুকাবেলা করেছিল এবং কাফিরদেরকেও শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে পিছু হটতে হয়েছিল। এ ঘটনা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমগ্র আরব জনগোষ্ঠীকে প্রচণ্ড ভাবে উত্তেজিত করে দিলো। যারা এই নয়া আন্দোলনের দুশমন ছিল , তারা এ ঘটনার পর আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। তদুপরি মক্কার যে সব কুরাইশ সর্দার এ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল, তাদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অসংখ্য চিত্ত অস্থির হয়ে উঠলো। আরবে যেকোন এক ব্যক্তির রক্তই পুরুষানুক্রমে যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। আর এখানে তো এমন অনেক ব্যক্তিই নিহত হয়েছিল ,যাদের রক্তমূল্য অসংখ্য যুদ্ধে ও আদায় হতে পারতো না। তাই চারদিকে ঝড়ের আলামত দেখা যেতে লাগলো। ইহুদীদের যে সব গোত্র ইতঃপূর্বে মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছিলো, তারা চুক্তির কোন মর্যাদা রক্ষা করলো না। এমন কি তারা খোদা,নবুয়্যাত আখিরাত এবং কিতাবের প্রতি ঈমান পোষণের দাবি করার ফলে যেখানে মুসলমানদের সাথে অধিকতর নৈকট্য থাকা উচিত ছিলো,সেখানে মুশরিক কুরাইশদের প্রতিই তাদের সমস্ত সহানুভূতি উপচে পড়তে লাগলো। তারা খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে কুরাইশদে কে উত্তেজিত করতে শুরু করলো।বিশেষত কাব বিন আশরাফ নামক বনী নাযির গোত্রের জনৈক্য সরদার এ ব্যাপারে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও অন্ধ শত্রুতায় লিপ্ত হলো। এ থেকে স্পষ্টত অনুমিত হলো যে, ইহুদীরা না পড়োশী হিসেবে কোন কর্তব্য পালন করবে আর না হযরত (সা:) এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করবে।
এর ফলে মদিনার এই ক্ষুদ্র জনপদটি চারদিক দিয়েই বিপদ পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লো। অভ্যন্তরীন দিক দিয়ে মুসলমানদের অবস্থা ছিল এমনিতেই দুর্বল ,তদুপরি যুদ্ধের ফলে তাদেরকে আরো বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হলো।

মক্কার মুশরিকদের অন্তরে এমনিতেই মুসলমানদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল । তাদের বড়ো বড়ো সর্দারগণ প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে ইতোমধ্যে প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছিল। প্রত্যেক গোত্রের মনেই ক্রোধ ও উত্তেজনা কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছিল। এমনি অবস্থায় ইহুদীগণ কর্তৃক মক্কাবাসীকে যুদ্ধের জন্যে উদ্বুদ্ধ করারচেষ্টা আগুনে তেল ছিটানোর কাজ করলো। ফলে বদর যুদ্ধের পর একটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতেই মদিনায় এই মর্মে খবর পোঁছলো যে, মক্কার মুশরিকগণ এক বিরাট বাহিনী নিয়ে মদিনা আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কুরাইশদের অগ্রগতি
এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় হিজরীর শাওয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহে হযরত (সা:) কয়েকজন লোককে সঠিক খবর খবর সংগ্রহের জন্যে মদিনার বাইরে প্রেরণ করলেন। তারা ফিরে এসে খবর দিল যে, কুরাইশ বাহিনী মদিনার প্রায় কাছাকাছি এসে পড়েছে। এমনকি তাদের ঘোড়গুলো মদিনার একটি চারণ ভূমি পর্যন্ত সাফ করে ফেলেছে। এবার নবী করীস (সা:) সাহাবীদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। কুরাইশ বাহিনীর মুকাবেলা কি মদিনায় বসে করা হবে , না বাইরে গিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা হবে ? কোন কোন সাহাবী এই অভিমত ব্যক্ত করলেন যে, মুকাবেলা মদিনায় বসেই করতে হবে। কিন্তু বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান নি অথচ শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত এমন কতিপয় যুবক দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ ‘না, বাইরের ময়দানে গিয়েই তাদের মুকাবেলা করতে হবে। ’ অবশেষে তাদের এই দৃঢ়তা দেখে নবী করীম (সা:) মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।

মুনাফিকদের ধোকাবাজি
কুরাইশগণ মদিনার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে ওহুদ পাহাড়ের পাদদেশে তাদের ছাউনি ফেললো। তার একদিন পর হযরত (সা:) জুম’আর নামাজ বাদ এক হাজার সাহাবী নিয়ে মদিনা থেকে রওয়ানা করলেন। এদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক আবদুল্লাহ বিন উবাইও ছিল। এ লোকটি দৃশ্যত মুসলমান হলেও কার্যত ছিল মুনাফিক ।এর প্রভাবাধীন আরো বহু মুনাফিক মুসলমানদের সঙ্গে যাত্রা করেছিল। কিছুদূর গিয়ে আবদুল্লাহ বিন উবাই তিন’শ লোক নিয়ে হঠাৎ ‘যুদ্ধ হবে না’ বলে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এখন শুধু সাত শ সাহাবী বাকী রইলেন। এমনি নাজুক অবস্থায় মুনাফিকদের এই আচরণ ছিল গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের শামিল । কিন্তু যে সব মুসলমানের হৃদয় আল্লাহর প্রতি ‌ঈমান, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস এবং সত্যের পথে শহীদ হবার আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ ছিল, এ ঘটনায় তাদের ওপর কোন বিরুপ প্রতিক্রিয়ারই সৃষ্টি হলো না। তাই তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে সামনে অগ্রসর হলেন।

যুব সমাজের উদ্দীপনা 

এ সময় হযরত (সা:) তার সঙ্গী- সাথীদের অবস্থা একবার যাচাই করে নিলেন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক তরুণদের ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। এদের মধ্যে রাফে ’ ও সামারাহ নামক দুটি কিশোর বালকও ছিল। কিশোরদের কে যখন সেনাবাহিনী থেকে আলাদা করে দেয়া হচ্ছিল , তখন রাফে তার পায়ের অগ্রভাগের ওপর ভর করে দাঁড়ালো। যেনো লম্বায় তাকে কিছু উঁচু দেখায় , এবং তাকে সঙ্গে নেয়া হয়। তার এই কৌশল ফলপ্রসূও প্রমাণিত হলো। কিন্তু সামারাহ সেনাবাহিনীতে থাকবার অনুমতি না পেয়ে বললোঃ ‘রাফেকে যখন রেখে দেয়া হয়েছে , তখন আমাকেও থাকবার অনুমতি দেয়া উচিত । কারণ আমি তাকে কুস্তি প্রতিযোগিতায়া পরাজিত করতে পারি । ’ তার এ দাবির যথার্থতা প্রমাণের জন্যে উভয়ের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হলো। অবশেষে সে রাফেকে পরাজিত করলো এবং তাকেও সেনাবাহিনীতে নিয়ে নেয়া হলো। এ একটি সামান্য ঘটনামাত্র । কিন্তু এতেই আন্দাজ করা চলে যে, মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহর পথে জিহাদ করার কতখানি অদম্য আগ্রহ ছিল।

সৈন্যদের প্রশিক্ষণ
ওহুদ পাহাড় মদীনা থেকে প্রায় চার মাইল দূরে অবস্খিত। হযরত (স) এমনভাবে তার সৈন্যদের মোতায়েন করলেন যে, পাহাড় পিছন দিকে থাকলো আর কুরাইশ সৈন্যরা রইলো সামনের দিকে। পিছন দিকে পাহাড়ের মাঝ বরাবর একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিলো এবং সে দিক থেকেও হামলার কিছুটা আশাংকা ছিলো। হযরত (স) সেখানে আবদুল্লাহ বিন জুবাইরকে পঞ্চাশ জন তীরন্দাজসহ মোতায়েন করলেন। তাকে এই র্মমে নির্দেশ দিলেন যে, এই সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে কাঊকে আসতে দেয়া যাবে না এবং তুমিও এখান থেকে কোন অবস্থায় নড়বে না। এমন কি যদি দেখো যে, পাখিরা আমাদের গোশ্‌ত ছিঁড়ে নিয়ে খাচ্ছে, তবুও তুমি নিজের স্থান ত্যাগ করবে না

কুরাইদের সাজ-সজ্জা
এবার কুরাইশরা অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ সাজ-সজ্জা করে এসেছিলো। প্রায় তিন হাজার সৈন্য ও প্রচুর সামান্তপত্র তাদের সঙ্গে ছিলো। তখনকার দিনে যে যুদ্ধে মেয়েরা যোগ দান করতো, তাতে আরবরা জীবনপণ করে লড়াই করতো। তারা মনে করতো, যুদ্ধে যদি পরাজয় হয় তো মেয়েদের বেইজ্জত হবে। এ যুদ্ধেও কুরাইশ বাহিনীর সঙ্গে অনেক মহিলা এসেছিল। এদের মধ্যে আপন পুত্র ও প্রিয়জন মারা গেছে, এমন অনেকেই ছিলো। এতে কেউ কেউ প্রিয়জনদের হত্যাকারীদের রক্তপান করে তবেই নিঃশ্বাস ফেলবে-এমন প্রতিজ্ঞা পর্যন্ত করেছিলো।

যুদ্ধের সূচনা
কুরাইশরা তাদের সৈন্যদেরকে খুব ভালোমতো প্রশিক্ষণ দিয়েছিলো। যুদ্ধের সূচনা-পর্বে কুরাইশ মহিলারা দফ বাজিয়ে আবেগ ও উদ্দীপনাময় কবিতা আবৃতি করতে লাগলো। তারা যোদ্ধদেরকে বদর যুদ্ধে নিহতদের রক্তের বদলা নেবার জন্যে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায় উৎসাহ যোগালো। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রথম পর্যায়ে মুসলমানদের দিকেই পাল্লা ভারী রইলো এবং কুরাইশ পক্ষের বহু সৈন্য নিহত হলো।তাদের সৈন্য দের মধ্যে হতাশা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিল । এদিকে সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় নিযুক্ত সৈন্যরা যখন দেখলো যে, মুসলমানরা মাল সংগ্রহে লিপ্ত হয়েছে এবং দুশমনরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে.তখন তারাও গনীমতের মাল সংগ্রহে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের নেতা হযরত আবদুল্লাহ বিন জুবাইর বারবার তাদেরকে বিরত রাখতে চাইলেনএবং হযরত (সা:) এর কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।কিন্তু কতিপয় লোক ছাড়া কেউ তার কথা শুনলো না।

পশ্চাদিক থেকে কুরাইশদের হামলা
খালিদ বিন অলীদ তখন কাফির সৈন্যদের একজন অধিনায়ক। সে এই সুবর্ণ সুযোগ কে পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং পাহাড়ের পেছন দিক দিয়ে ঘুরে গিয়ে সুড়ঙ্গ -পথে মুসলমানদের ওপর হামলা করলো।হযরত আবদুল্লাহ এবং তার ক’জন সঙ্গী শেষ পর্যন্ত সুড়ঙ্গ পথের প্রহরায় ছিলেন,তাদের অধিকাংশই এই হামলার মুকাবেলা করলেন।কিন্তু কাফের দের এই প্রচণ্ড হামলাকে তারা প্রতিহত করতে পারলেন না। তারা শহীদ হয়ে গেলেন। অতঃপর দুশমনরা একে একে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওদিকে যে সব পলায়নপর কাফির দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছিল , তারাও আবার ফিরে এলো।এবার দুদিক দিয়ে মুসলমানদের ওপর হামলা শুরু হলো।এই অভাবিত পরিস্থিতিতে মুসলমানদের মধ্যে এমন আতঙ্কের সঞ্চার হলো যে, যুদ্ধের মোড়ই সম্পূর্ণ ঘুরে গেলো। মুসলমানেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক পালাতে লাগলো। এমনকি আতঙ্কের মধ্যেই গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে, নবী করীম(সা:) শহীদ হয়ে গেছেন। এই খবরে সাহাবীদের মধ্যে বাকী উদ্যমটুকুও নষ্ট হয়ে গেলো এবং অনেকে সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেললো।

আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয়
এ সময় দশ-বারো জন সাহাবী নবী করীম(সা:) কে ঘিরে রেখেছিলেন। তিনি অবশ্য আহত হয়েছিলেন। সাহাবীরা তাকে একটি পাহাড়ের ওপর নিয়ে এলেন। অতঃপর অন্য মুসলমানরা ও জানতে পারলেন যে, নবী করীম (সা:) সুস্থ ও নিরাপদ আছেন।তাই তারা আবার দলে দলে তার কাছে একত্রিত হতে লাগলেন। কিন্তু এ সময় কি কারণে যেন কাফিরদের মনোযোগ হঠাৎ অন্যদিকে নিবদ্ধ হলো এবং নিজেদের বিজয়কে পূর্ণ পরিণতি পর্যন্ত না পৌঁছিয়েই তারা ময়দান ছেড়ে চলে গেল।
তারা যখন কিছু্‌টা দূরে চলে গেল, তখন তাদের সম্ভিত ফিরে এলো। তারা পরস্পরকে বললোঃ এ আমরা কি ভুল করলাম ! মুসলমানদের সম্পূর্ণ খতম করে দেবার দুর্লভ সুযোগটিকে নষ্ট করে এমনিই চলে এলাম! এরপর তারা এক জায়গায় থেকে পরস্পর বলাবলি করলোঃ এবার তাহলে মদিনার ওপর আর একবার হামলা করা উচিত । কিন্তু শেষ পর্যন- আর তাদের সাহস হলো না। তারা মক্কায় ফিরে গেলো।

এদিকে নবী করীম (সা:) চিন্তিত ছিলেন যে,শত্রুরা না জানি আবার ফিরে এসে আবার হামলা করে বসে । তাই তিনি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে মুসলমানদের কে দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করার নির্দেশ দিলেন। এটা ছিল অত্যন্ত নাজুক সময় । কিন্তু যারা সাচ্চা মুমিন ছিল , তারা আল্লাহর ওপর ভরসা করে পুনরায় জান কুরবান করার জন্যে তৈরি হয়ে গেল । নবী করীম(সা:) হামরা-উল-আসাদ নামক স্থান পর্যন্ত দুশমনদের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। এ জায়গাটি মদিনা থেকে ৮ মাইল দূরে অবস্থিত । এখানে পৌঁছে জানা গেল যে, কুরাইশরা মক্কায় ফিরে গেছে। তাই তিনিও মুসলমানদের নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।
এ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হলেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন আনসার । তাই মদিনায় ঘরে ঘরে শোকের বন্যা নেমে এলো। এ সময় হযরত (সা:) মুসলমানদের শোক প্রকাশের নিয়মাবলী সম্পর্কে অবহিত করলেন।তিনি বললেনঃ ‘মাতম করা এবং ছাতি পিটিয়ে কান্না-কাটি করা মুসলমানদের পক্ষে মর্যাদা হানিকর । ’

বিপর্যয়ের কারণ এবং মুসলমানদের প্রশিক্ষণ
ওহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের যে বিপর্যয় ঘটে , তার পেছনে মুনাফিকদের চালবাজি ও কলা কৌশলের প্রভাব ছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই সঙ্গে মুসলমানদের নিজস্ব দুর্বলতাও কম দায়ী ছিল না । অবশ্য ইসলামী আন্দোলন যে ধরণের মেজাজ তৈরি করে এবং তার কর্মীদের যে রুপ প্রশিক্ষণ দিতে ইচ্ছুক , তার জন্যে তখনও পুরোপুরি সুযোগ পাওয়া যায় নি। আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার এ ছিল দ্বিতীয় সুযোগ মাত্র । তাই এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই কিছু কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেলো। যেমনঃ সম্পদের মোহে কর্তব্য অবহেলা করা , নেতার হুকুম অমান্য করা ,দুশমনকে পুরোপুরি খতম করার আগে গনীমতের মালের দিকে মনোযোগ দেয়া ইত্যাদি। এ কারণেই যুদ্ধ শেষ হবার পর আল্লাহ তাআলা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অত্যন্ত বিস্তৃত ভাবে পর্যালোচনা করলেন। এ পর্যালোচনা ইসলামের দৃষ্টিতে মুসলমানদের মধ্যে যা কিছু দোষ-ত্রুটি বাকী ছিল , তার প্রতিটি দিককেই তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন এবং সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলীও প্রদান করলেন।সূরা আল ইমরানের শেষাংশে এই নির্দেশাবলীর কথা বিবৃত হয়েছে। এখানে তার কতিপয় অংশ উদ্ধৃত করা যাচ্ছে। এ থেকে ইসলামী আন্দোলনে যুদ্ধের স্থান কোথায় এবং ইসলামের দৃষ্টিতে যুদ্ধ সংক্রান্ত ঘটনাবলীর ওপর কিভাবে আলোকপাত করতে হয়, তা আর একবার উপলব্ধি করা যাবে।

খোদা-নির্ভরতা
মুসলমানরা যখন যুদ্ধের জন্যে যাত্রা করেছিল ,তখন তাদের সংখ্যা ছিল এক হাজারের মতো। পক্ষান্তরে দুশমনদের সংখ্যা ছিল তিন হাজার। এরপরও কিছুদূর গিয়ে তিন শ’ মুনাফিক আলাদা হয়ে গেল। এবার বাকী থাকলো শুধু সাত শ’ মুসলমান। তদুপরি যুদ্ধের সামান্তপত্র ছিল কম এবং এক তৃতীয়াংশ সৈন্যও গেল বিচ্ছিন্ন হয়ে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে কিছু লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়তে লাগলো । এ সময় শুধু আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের ওপর ভরসাই মুসলমানদেরকে দুশমনদের মুকাবেলায় এগিয়ে নিয়ে চললো। এ উপলক্ষে হযরত (সা:) মুসলমানদের কে যে সান্ত্বনা প্রদান করেন, আল্লাহ তা নিম্নোক্ত ভাষায় উল্লেখ করেছেনঃ “স্মরণ করো, যখ,তোমাদের মধ্যকার দুটি দল নির্বুদ্ধিতা প্রদর্শনের জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল, অথচ আল্লাহ তাদের সাহায্যের জন্যে বর্তমান ছিলেন। আর মুমিনদের তো আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত । এর আগে বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তোমাদের শোকরী থেকে তোমাদের বেঁচে থাকা উচিত। আশা করা যায়, এবার তোমরা কৃতজ্ঞ হবে। স্মরণ করো, যখন তুমি (হে নবী) মুমিনদের কে বলেছিলঃ তোমাদের জন্যে এটা কি যথেষ্ট নয় যে, আল্লাহ তিন হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করে তোমাদের সাহায্য করবেন। তোমরা যাতে খুশি হও এবং তোমাদের হৃদয় নিশ্চিন্ত হয়, সে জন্যেই আল্লাহ তোমাদের কাছে একথা প্রকাশ করলেন। বিজয় বা সাহায্য যা কিছুই হোক , আল্লাহর কাছ থেকেই আসে । তিনি অত্যন্ত শক্তিমান, বিচক্ষণ । (আলে ইমরান আয়াতঃ১২২-১২৬)

এখানে মুসলমানদের কে শেষ বারের মতো বুঝিয়ে দেয়া হলো যে, প্রকৃতপক্ষে বস্তগত শক্তির ওপর ভরসা করা মুসলমানদের কাজ নয়। তাদের শক্তির আসল উৎস হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার সাহায্যের ওপর ভরসা।

ধন-সম্পদের মোহ
ওহুদে মুসলমানদের বিপর্যয়ের আর একটি বড় কারণ হলো এই যে, মুসলমানরা যুদ্ধের ঠিক মাঝখানেই সম্পদের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল এবং দুশমনকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করার আগেই সম্পদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল । এমনকি , যারা সুড়ঙ্গ-পথের প্রহরায় নিযুক্ত ছিল,তাদের মধ্যে পযর্ন্ত দুর্বলতা প্রকাশ পেল। এভাবে যুদ্ধের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে গেল। তাই আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের হৃদয় থেকে ধনের মোহ দূরীভূত করার জন্যে আ সময়ই মোহ সৃষ্টির একটি বড় কারণকে নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। অর্থাৎ এ সময় সূদকে হারাম ঘোষণা করা হলো। যারা সূদী কারবার করে , তাদের হৃদয়ে ধনের মোহ এমনি বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, তা আর কোন মহৎ কাজের উপযোগী থাকে না।সূদের ফলেই এক শ্রেণীর মনে লালসা, কার্পণ্য , আত্মকেন্দ্রিকতা এবং ধনের মোহ সৃষ্টি হয়। আর এক শ্রেণীর মধ্যে জাগ্রত হয় হিংসা দ্বেষ ও ক্রোধ-বিক্ষোভ

সাফল্যের চাবিকাঠি
যদি মনোবলকে সমুন্নত রাখার জন্যে কোন ক্রিয়াশীল শক্তি বর্তমান না থাকে , তাহলে পরাজয়ের পর তা হ্রাস পেতে থাকবেই । ওহুদে মুসলমানদের যে পরাজয় ঘটেছিল , তাতে কিছু লোকের মনোবল ভেঙ্গে পড়ার আশংকা ছিল। কিন্তু এ সময় মুসলমানদের কে এই বলে আশ্বাস দেয়া হলো যে, “ তোমাদের না নিরুৎসাহ হওয়া উচিত আর না দুঃখ প্রকাশ করা উচিত । তোমাদেরই হবে, যদি তোমরা খাঁটি মুমিন হও, ঈমানের ওপর অবিচল থাকো এবং তার দাবি সমূহ পূর্ণ করতে থাকো। তোমাদের কাজ শুধু এটুকুই ; এরপর তোমাদের সমুন্নত করা এবং দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আল্লাহর । এরপর রইলো তোমাদের এই সাময়িক দুঃখ- ক্লেশ ও পরাজয়ের প্রশ্ন। এটা শুধু তোমাদেরই ব্যাপার নয়, তোমাদের বিরুদ্ধ দলের ওপরও এরকম দুঃখ-মুসিবত এসে থাকে । তারা যখন মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়েও নিরুৎসাহিত হয়না, তখন তোমরা কেন সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে চিন্তা-ভাবনা করো ?তোমরা তো জান্নাতের প্রত্যাশী । তোমরা কি মনে করো, এমনিই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে ? অথচ তোমাদের ভেতর কে আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করেছে আর কে তার জন্যে প্রতিকূল অবস্থায়ও ধৈর্য অবলম্বন করতে ইচ্ছুক, আল্লাহ তা এখন পর্যন্ত যাচাই-ই করেননি।(আল -ইমরানঃআয়াত১৩৯-১৪২)

ইসলামী আন্দোলনের প্রাণবস্ত
পৃথিবীর যেকোন আন্দোলনেই তার প্রাণবস্ত কিংবা চালিকা-শক্তিরুপে একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব বর্তমান থাকে। কিন্তু আদর্শবাদী আন্দোলনের উন্নতি বা স্থায়িত্ব কোন ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং যে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে এ আন্দোলন উত্থিত হয়, তার দৃঢ়তা ও সত্যতার ওপরই এর সবকিছু নির্ভর করে। ইসলামী আন্দোলনের জন্যে নবীদের ব্যক্তিত্ব কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ , তা সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এটি একটি আদর্শবাদী আন্দোলন এবং এর উন্নতি ও স্থায়িত্ব সম্পূর্ণত ইসলামের উপস্থাপিত নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে মুসলমানদের এ কথা জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন হলো যে, নবীর মহান ব্যক্তিত্ব তাদের ভেতর বর্তমান থাকলেই কেবল তারা আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডা সমুন্নত করবে এবং নবীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হলে অমনি তারা এ পথ ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন পথ অবলম্বন করবে, এরুপ ধারণা যেনো তাদের মনের কোণেও ঠাঁই পায়। ইতঃপূর্বে ওহুদের ময়দানে যখন এই মর্মে গুজব প্রচারিত হলো যে, হযরত (সা:) শহীদ হয়ে গেছেন, তখন কিছু মুসলমানের মনোবল একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিল। তারা ভেবেছিল : হযরতের ছায়াই যখন চলে গেল, তখন আর যুদ্ধ করে কি হবে! এই ভুল ধারণা দূর করার জন্যেই এই সময় মুসলমানদের বুঝিয়ে দেয়া হলোঃ “দেখো,মুহাম্মদ (সা:) একজন রাসূল বৈ কিছুই নন। তার আগেও অনেক রাসূল চলে গেছেন। এখন তিনি যদি মরে যান কিংবা নিহত হন, তাহলে তোমরা কি পশ্চাদপসরণ করবে ? মনে রেখো, যে ব্যক্তি পশ্চাদপসরণ করবে সে আল্লাহর কোনই ক্ষতি করবে না । পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দাহ হিসেবে জীবন যাপন করবে, তাকে তিনি পুরস্কৃত করবেন।”(আল ইমরানঃআয়াত১৪৪)

আরো বলা হলোঃ ‘তোমরা যে দ্বীনকে বুঝে-শুনে গ্রহণ করেছো, তার ওপর অবিচল থাকার এবং তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যে তোমাদের মধ্যে হামেশা নবীর উপস্থিত মাত্র ।এর ওপর অবিচল থাকলে তোমরা নিজেরাই সুফল পাবে। এ দ্বীনের আসল শক্তি হচ্ছে এর উপস্থাপিত সত্যতা। এর সমুন্নতি না তোমাদের শক্তি -সামর্থের ওপর আর না কোনো বিশেষ ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল।’

দুর্বলতার উৎস-১
মানুষের সমস্ত দুর্বলতার উৎস হচ্ছে মৃত্যু-ভয়।তাই এ সময় মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো যে, তোমাদের মৃত্যু-ভয়ে পলায়ন করা নিতান্তই অর্থহীন। কারণ মৃত্যুর জন্যে নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত কোন প্রাণীরই মৃত্যু হতে পারে না। অন্য কথায় , আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের আগে না কেউ মরতে পারে আর না তারপর এক মুহূর্তও কেউ বেঁচে থাকতে পারে। অতএব, তোমাদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচবার চিন্তা করার প্রয়োজন নেই ; বরং জীবনের যেটুকু অবকাশ পাওয়া গেছে, তা কি দুনিয়াদারিতে ব্যয়িত হচ্ছে না আখিরাতের কাজে ,তা-ই শুধু চিন্তা করা উচিত। কারণ যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়াদারির জন্যে তার শ্রম-মেহনত নিয়োজিত করে, তার যা কিছু প্রাপ্য তা দুনিয়ায়ই পেয়ে থাকে।আর যে ব্যক্তি আখিরাতের কল্যাণের জন্যে কাজ করে ,আল্লাহ তাকে আখিরাতেই প্রতিফল দান করবেন।কাজেই যারা আল্লাহর দ্বীন কবুল করার ,এর ওপর কায়েম থাকার এবং একে হারাম করবার চেষ্টা-সাধনার সুযোগ পেয়েছে, তাদের পক্ষে এই মহা মূল্যবান নিয়ামতটিরই কদর করা এবং এর জন্যেই নিজেদের সবকিছু নিয়োজিত করা উচিত । এর ফলাফল অবশ্যই তাদের পক্ষে কল্যাণপ্রদ হবে; আখিরাতের স্থায়ী সাফল্য তারা অর্জন করবে। আর এই নিয়ামতের যারা শোকর আদায় করবে, আল্লাহ তাদেরকে সর্বোত্তম নিয়ামত দ্বারা কৃতার্থ করবেন। তারা আপন মালিকের কাছ থেকে সর্বোত্তম পুরস্কারে ভূষিত হবে।




ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png