শিরোনাম
Loading latest headlines...
হজ্জ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হজ্জ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৫

বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলা এবং কাফিরদের উপর ব্যাপক হামলার বিধান

বুধবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

সামরিক-বেসামরিক বলতে কী বোঝায়

  

সামরিক-বেসামরিক বলতে কী বোঝায়?

আমাদের আলোচ্য বিষয় বুঝতে হলে সর্বপ্রথম জানতে হবে সামরিক ও বেসামরিক বলতে কী বুঝায়? বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কোনো দেশের সামরিক নাগরিক বলতে বোঝায় যারা সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত তারা, এমনিভাবে যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারাও সামরিক। আর বাকি সাধারণ নাগরিক যারা রয়েছে তারা সবাই হলো বেসামরিক নাগরিক। এরা পুরুষ হোক নারী হোক, বৃদ্ধ বা শিশু হোক, সুস্থ-সবল হোক দুর্বল হোক অথবা অসুস্থ হোক, যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলে কিংবা কোনো সামরিক বাহিনীতে না থাকলে বেসামরিক বলেই গণ্য হয়। কিন্তু ইসলাম কি সামরিক-বেসামরিকের এই কনসেপ্ট গ্রহণ করেছে? বর্তমানে প্রচলনে সামরিক-বেসামরিক বলতে যেটা বোঝানো হয় সেটা কি মুসলিমরা মানতে বাধ্য? অসম্ভব, কখনোই নয়। ইসলাম স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র দীন। ইসলামী শরীয়তে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যুদ্ধের সময় কাদেরকে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না? আমাদের ফুকাহায়ে কিরাম কোন্ পরিস্থিতিতে কাকে হত্যা করা যাবে এবং কোন্ পরিস্থিতিতে কাকে হত্যা করা যাবে না তার সবকিছু নিয়েই খুলে খুলে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইসলামেরও একটি নিজস্ব সামরিক-বেসামরিক সংজ্ঞা রয়েছে। এজন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে ইসলামের দৃষ্টিতে সামরিক কারা এবং বেসামরিক কারা? যুদ্ধের সময় কাদেরকে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না? মূলত ফিকহের বড় বড় প্রায় সব কিতাবেই 'কিতাবুস সিয়ার' বা 'কিতাবুল জি হা দে' কাফেরদের মধ্যে কাদেরকে যুদ্ধের সময় হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে অল্প জায়গায় খোলাসা উল্লেখ করে সবচেয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন ইমাম আলাউদ্দীন আল কাসানী রহিমাহুল্লাহ তার কালজয়ী ও অনবদ্য গ্রন্থ বাদায়িউস সানায়ি'তে। তিনি বলেন,

[فصل في بيان من يحل قتله من الكفرة ومن لا يحل] وأما بيان من يحل قتله من الكفرة ومن لا يحل، فنقول: الحال لا يخلو إما أن يكون حال القتال، أو حال ما بعد الفراغ من القتال، وهي ما بعد الأخذ والأسر؛


أما حال القتال فلا يحل فيها قتل امرأة ولا صبي، ولا شيخ فان، ولا مقعد ولا يابس الشق، ولا أعمى … ولو قاتل واحد منهم قتل، وكذا لو حرض على القتال، أو دل على عورات المسلمين، أو كان الكفرة ينتفعون برأيه، أو كان مطاعا، وإن كان امرأة أو صغيرا؛ لوجود القتال من حيث المعنى.


وقد روي «أن ربيعة بن رفيع السلمي – رضي الله عنه – أدرك دريد بن الصمة يوم حنين، فقتله وهو شيخ كبير كالقفة، لا ينفع إلا برأيه، فبلغ ذلك رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ولم ينكر عليه»


والأصل فيه أن كل من كان من أهل القتال يحل قتله، سواء قاتل أو لم يقاتل، وكل من لم يكن من أهل القتال لا يحل قتله إلا إذا قاتل حقيقة أو معنى بالرأي والطاعة والتحريض، وأشباه ذلك على ما ذكرنا…

অর্থঃ “অধ্যায়: যেসব কা*ফেরকে হ*ত্যা করা জায়েয এবং যাদের হ*ত্যা করা জায়েয নয়ঃ


এ সম্পর্কে আমরা বলব, এক্ষেত্রে দুটি অবস্থা। যুদ্ধরত অবস্থা এবং যুদ্ধ থেকে ফারেগ হওয়ার পর গ্রেফতার ও বন্দী করা অবস্থা।


যুদ্ধ চলাকালে নারী, শিশু, অতিশয় বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং অন্ধকে… হ*ত্যা করা জায়েয নেই। তবে এদের কেউ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলে তাকে হ*ত্যা করা হবে। এমনিভাবে যদি তাদের কেউ যুদ্ধে উৎসাহ দেয়, মুসলমানদের বিপক্ষে গোয়েন্দাগিরি করে, কা*ফেররা তার মতামত দ্বারা লাভবান হয় অথবা সে অনুসরণীয় (নেতৃস্থানীয়) হয় -হোক সে নারী বা শিশু- (তাহলে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও) পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার কারণে তাকেও হ*ত্যা করা হবে।


এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত রবিআ ইবনে রাফি আসসুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু হুনাইন যুদ্ধের দিন দুরাইদ ইবনে সিম্মাহকে বাগে পেয়ে হত্যা করেন। অথচ তখন সে ছিল ক্ষীণকায় ও অতিশয় বৃদ্ধ। তার বুদ্ধি-পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে উপকৃত হওয়ার পথ তাদের ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি কোন আপত্তি করেননি।


এক্ষেত্রে মূলনীতি হল, যে কেউ যুদ্ধ করার উপযুক্ত, সে যুদ্ধ করুক বা না করুক- তাকে হ*ত্যা করা জায়েয। আর যে যুদ্ধের উপযুক্ত নয়, তাকে হ*ত্যা করা নাজায়েয। তবে যদি তারা সরাসরি যুদ্ধে আসে অথবা বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে, কিংবা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হওয়ার কারণে কিংবা উৎসাহ প্রদান প্রভৃতির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে লড়াইয়ে অংশ নেয়, তাহলে (সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও) তাদেরকে হ*ত্যা করা জায়েয। (বাদায়িউস সানায়ি’: ৯/৩৩৮-৩৪৮, প্রকাশনীঃ দারুল হাদীস)


এটাই হলো, ইসলামের সামরিক বেসামরিক কনসেপ্ট। ইসলাম অন্যদের থেকে ধার করে চলে না। অর্থাৎ ইসলামে সামরিক তারাই যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম, সে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক। পক্ষান্তরে যারা যুদ্ধে অক্ষম তারাই হল বেসামরিক। যেমন নারী, শিশু, অতি বৃদ্ধ, এমন পাদ্রী যে সারাজীবন শুধু গির্জাতেই পড়ে থাকে এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে না, এমন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যার পক্ষে কোনোভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে এ ধরণের ব্যক্তিরাও যদি যেকোনোভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তাহলে তাদেরকেও  হত্যা করা যাবে। এমনিভাবে যদি তারা এমন মেধাবী হয় যাদের দ্বারা যুদ্ধের কাজে সাহায্য নেওয়া যায় কিংবা পরামর্শ নেওয়া যায় অথবা সে সমাজের নেতা বা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয় তাহলে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তাদেরকে হত্যা করা যাবে। এটাই ইসলামের সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্ট। ফিকহের বড় বড় সব কিতাবেই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সকল দলীল ও রেফারেন্স একত্র করতে গেলে বিশাল একটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। তাই আপাতত সামান্য কয়েকটি উদাহরণ দেখুন,

আল হিদায়াঃ ২/৩৪০-৩৪১,প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফাতাহ (কম্পিউটার নুসখা) , আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহঃ ২/২১১, বাবু কাইফিয়্যাতিল কিতাল, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ (দেওবন্দ), তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমঃ ৩/৩৫-৩৬, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতু দারিল উলুম, করাচী)


পাঠক লক্ষ্য করে দেখুন, বর্তমানে প্রচলিত সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্টের সাথে ইসলামী শরীয়তের সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্টের বিশাল পার্থক্য। এই সহজ বিষয়টা অনেকেই  তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। প্রচলিত অর্থে বেসামরিক নাগরিক হলেই ইসলাম তাদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে এমন অনর্থক ও ফালতু কথা অনেক বড় বড় ব্যক্তিদেরকেও বলতে শোনা যায়! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অথচ এটা ইসলামী শরীয়তের একটি প্রসিদ্ধ মাসআলা। ফিকহের একজন সাধারণ থেকে সাধারণ তালিবুল ইলমেরও এই মাসআলা হল (সমাধান) থাকা দরকার ছিলো! অথচ আমাদের পরিচিত ভালো ভালো মেধাবী বড় ভাইদেরও এক্ষেত্রে পদস্খলনের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। و إلى الله المشتكى


যাইহোক, এটা হলো স্বাভাবিক অবস্থার কথা। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃতভাবে কাদেরকে টার্গেট করে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না তাদের আলোচনা। কিন্তু যদি কাফের নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ এমনকি মুসলিমরাও একত্রে একটা অঞ্চলে বা একটা জায়গায় থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে হামলা করা জায়েয আছে কি-না? অর্থাৎ আমরা নিশ্চিত যে হামলা করলে অনেক নারী শিশু এমনকি মুসলিমও মারা যেতে পারে এটা জানা সত্ত্বেও তাদেরকে টার্গেট না করে সেই অঞ্চলে বা জায়গায় ব্যাপক হামলা করা যাবে কি-না?


এক্ষেত্রে প্রথমেই আমরা উপমহাদেশের অন্যতম মান্যবর আলেম মুফতী তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহর বক্তব্য তুলে ধরছি! তিনি তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,

" لا بأس إذن في إصابة النساء و الصبيان. و ليس المراد إباحة قتلهم بطريق القصد إليهم، بل المراد: إذا لم يمكن الوصول إلى الآباء إلا بوطأ الذرية، فإذا أصيبوا لاختلاطهم بهم جاز قتلهم...

و به يؤخذ حكم قذف القنابل في زماننا, فإنه يجوز إذا لم يقصد بها النساء و الصبيان. بل أريد بها النكاية في العدو. فإن أصيب بها النساء و الصبيان من غير قصد فلا بأس بها."

অর্থঃ এমন অবস্থায় (অর্থাৎ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী মুশরিকদের উপরে রাতে ব্যাপক ও অতর্কিত হামলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে) নারী এবং শিশুদের হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এর উদ্দেশ্য এই নয় যে, তাদেরকে টার্গেট করে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা বৈধ। বরং উদ্দেশ্য হলো, যদি শিশুদেরকে হত্যা করা ছাড়া বড়দেরকে হত্যা করা সম্ভব না হয়, তাহলে একত্রে মিশে থাকার কারণে তাদেরকে হত্যা করা  হলে তা বৈধ হবে।...

এ থেকে আমাদের যুগে বোমা নিক্ষেপ করার হুকুম গ্রহণ করা যায়। কেননা, নারী ও শিশুদেরকে সরাসরি টার্গেট না করলে তা বৈধ রয়েছে। বরং, এক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্য হয় শত্রুকে পরাস্ত করা এবং এক্ষেত্রে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করা হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমঃ ৩/৩৫)


বক্তব্য একদম পরিষ্কার। ইসলামী শরীয়তে দৃষ্টিতে যারা বেসামরিক অর্থাৎ যাদেরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা বৈধ নয় তারাও যদি সামরিকদের সাথে (যাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিতে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও হত্যা করা বৈধ তাদের সাথে) একত্রে মিশে থাকে তাহলে তাদের উপরে ব্যাপকভাবে হামলা করা বৈধ। এতে যদি ইসলামের দৃষ্টিতে বেসামরিক নাগরিক মারাও যায় তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা যাবে না। এই মাসআলাটাও একদম প্রসিদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত মাসআলা। এমনকি ফুকাহায়ে কিরাম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এমন অবস্থায় যদি কোনো মুসলিম বন্দি বা ব্যবসায়ীও কাফেরদের মাঝে থাকে তবুও ব্যাপকভাবে হামলা করা বৈধ আছে‌। এমনকি যদি তারা মুসলিমদেরকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তাহলে সেক্ষেত্রে আগে মুসলিমকে হত্যা করে তারপর তাদেরকে হত্যা করা বৈধ। তবে উদ্দেশ্য থাকবে কাফেররা। মুসলিমরা উদ্দেশ্য থাকবে না। পরবর্তীতে এই হত্যার কারণে কোনো ধরনের কিসাস বা দিয়ত (রক্তপণ) আসবে না। আহলুল ইলম ও তালিবুল ইলমদের উদ্দেশ্যে ইমাম মারগীনানী রহিমাহুল্লাহর হিদায়ার ইবারত তুলে ধরছি,

" ولا بأس برميهم وإن كان فيهم مسلم أسير أو تاجر " لأن في الرمي دفع الضرر العام بالذب عن بيضة الإسلام وقتل الأسير والتاجر ضرر خاص ولأنه قلما يخلو حصن من مسلم فلو امتنع باعتباره لانسد بابه " وإن تترسوا بصبيان المسلمين أو بالأسارى لم يكفوا عن رميهم " لما بينا " ويقصدون بالرمي الكفار " لأنه إن تعذر التمييز فعلا فلقد أمكن قصدا والطاعة بحسب الطاقة. (الهداية: كتاب السير، باب كيفية القتال، ٣/٤٣٩)

আরো দেখুন,

শরহু মুখতাসারিত তহাবীঃ ৭/২১-২২, আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহঃ ২/২১০, বাদায়িউ সানায়ি': ৩/৩৪৭-৩৪৮


যাইহোক, এ ব্যাপারে সব হাওয়ালা দিতে গেলে পোস্ট আর পোস্ট থাকবে না! কিতাবে পরিণত হয়ে যাবে। পরিশেষে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহর চমৎকার আলোচনা উল্লেখ করছি,


المحرم إنما هو قصد قتلهن فأما إذا قصدنا قصد الرجال بالإغارة أو نرمي بمنجنيق أو فتح شق أو إلقاء نار فتلف بذلك نساء أو صبيان لم نأثم بذلك لحديث الصعب بن جثامة أنه سأل النبي صلى الله عليه وسلم عن أهل الدار من المشركين يبيتون فيصاب الذرية فقال “هم منهم” متفق عليه ولأن النبي صلى الله عليه وسلم رمى أهل الطائف بالمنجنيق مع أنه قد يصيب المرأة والصبي وبكل حال فالمرأة الحربية غير مضمونة بقود ولا دية ولا كفارة لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يأمر من قتل المرأة في مغازيه بشيء من ذلك فهذا ما تفارق به المرأة الذمية


 وإذا قاتلت المرأة الحربية جاز قتلها بالاتفاق لأن النبي صلى الله عليه وسلم علل المنع من قتلها بأنها لم تكن تقاتل فإذا قاتلت وجد المقتضى لقتلها وارتفع المانع. اهـ


“নিষেধ হল- ইচ্ছাকৃত টার্গেট বানিয়ে মহিলাদের হ*ত্যা করা। সুতরাং যদি আমরা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বা কোন অঞ্চল বিজয়ের জন্য অতর্কিত আক্রমণ করি বা মিনজানিক (প্রাচীন ক্ষেপণাস্ত্র) দিয়ে আগুন ইত্যাদি নিক্ষেপ করি, ফলে কিছু নারী বা শিশু ধ্বংসের শিকার হয়, এ কারণে আমরা গুনাহগার হব না। কেননা, সা’ব ইবনে জাসসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি মু*শরিকদের ভূমিতে অতর্কিত আক্রমণের ফলে নিহত শিশুদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ওরা ওদের (মু*শরিকদের)-ই অন্তর্ভুক্ত’। (সহীহ বুখারী ও সহীহ ‍মুসলিম)। এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ বাসীর উপর মিনজানিক হামলা করেছেন। অথচ এর দ্বারা অনেক সময় নারী-শিশু আক্রান্ত হয়ে থাকে।


সর্বোপরি কথা হল, হা*রবী মহিলার কোন কিসাস, দিয়ত বা কাফফারার বিধান নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধসমূহে কোন ব্যক্তি কোন মহিলাকে হ*ত্যা করে থাকলে, তিনি তাকে এসব কিছুর হুকুম দেননি। এটাই হা*রবী ও যিম্মি নারীর পার্থক্য।


হা*রবী মহিলা যদি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তাহলে সকলের ঐকমত্যে তাকে হ*ত্যা করা জায়েয। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হ*ত্যা করা নিষেধ হওয়ার কারণ এই বলেছেন যে, ‘সে তো কি*তাল করে না’। সুতরাং যখন সে কি*তালে লিপ্ত হবে, তখন হত্যার উপযুক্ত কারণ পাওয়া গেল এবং নিষেধাজ্ঞার কারণ বিলুপ্ত হয়ে গেল …।” –আসসারিমুল মাসলূল: ১০৪


যাইহোক বিষয়টি একদম সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার।  এখানে জলঘোলা করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি বিপরীত দাবী করে তাহলে তাকে আমরা বলবো,

هاتوا برهانكم ان كنتم صادقين



শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪

কুরআনের আলোকে হজের গুরুত্ব :

শুক্রবার, মে ২৪, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 


"ফরজ এবাদত হিসাবে হজ মুমিনের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার,"

ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হজ। সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। শারীরিক সক্ষম ও আর্থিকভাবে সচ্ছল প্রত্যেক মুমিন মুসলমান বায়তুল্লাহর কালো গিলাফ আর কালো পাথর ছুঁয়ে জীবনের সব অপরাধের জন্য ক্ষমা পেতে চান। যাদের চোখের জল আর মনের আকুতি কবুল হয় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দেন।

করোনার প্রদুর্ভাবে এবার দ্বিতীয়বারের মতো সর্বসাধারণের জন্য হজ পালনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে সৌদি সরকার। শিগ্গির এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে। হাজীদের জন্য খুলবে কাবার দুয়ার।


 লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত হবে আকাশ বাতাস-এমনটাই প্রত্যাশা সারা বিশ্বের বিশ্বাসী মানুষের। 

মহান আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘আর তুমি মানুষের মাঝে হজের ঘোষণা প্রচার করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে হেঁটে এবং সব ধরনের (পথশ্রান্ত) কৃশকায় উটের ওপর সওয়ার হয়ে দূরদূরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের (দুনিয়া ও আখিরাতের) কল্যাণের জন্য সেখানে উপস্থিত হতে পারে এবং রিজিক হিসাবে তাদের দেওয়া গবাদিপশুগুলো জবেহ করার সময় নির্দিষ্ট দিনগুলোতে তাদের ওপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে’। [সূরা হজ, ২২/২৭-২৮]।

হাদিসের আলোকে হজের গুরুত্ব : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপরে প্রতিষ্ঠিত 

১. তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা এ মর্মে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তার বান্দা ও রাসূল। 

২. নামাজ কায়েম করা 

৩. জাকাত প্রদান করা। ৪. হজ সম্পাদন করা। ৫. রমজানের রোজা পালন করা’। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৮]।

হজের ফজিলত ও তাৎপর্য : ‘আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন-‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ করেছে, যার মধ্যে সে অশ্লীল কথা বলেনি বা অশ্লীল কার্য করেনি, সে হজ থেকে ফিরবে সেদিনের মতো (নিষ্পাপ অবস্থায়) যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন’। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৫২১]। 

অর্থাৎ সে কবিরা-সগিরা, প্রকাশ্য-গোপনীয় সব গুনাহ থেকে ওইরূপ মুক্ত হয়ে ফিরে আসে, যেরূপ একজন শিশু গুনাহ মুক্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করে। [ইবনু হাজার, ফাতহুল বারী ৩/৩৮২]

হজ ও ওমরাহকারীর দোয়া কবুল করা হয় : হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন-

‘হজ ও ওমরাহকারীরা আল্লাহর প্রতিনিধি দল। তারা দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদের তা দেওয়া হয়। [মুসনাদে বাযযার, হাদিস: ১১৫৩]। 

ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

হজের একমাত্র প্রতিদান জান্নাত : ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন- ‘এক ওমরাহ অপর ওমরাহ পর্যন্ত সময়ের (সগিরা গুনাহের) কাফফারাস্বরূপ। আর জান্নাতই হলো হজে মাবরুর বা কবুল হজের একমাত্র প্রতিদান’। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৭৭৩]।

হজের জন্য খরচ করার ফজিলত : হজরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন- ‘হজের জন্য খরচ করা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার মতোই, যার সওয়াব সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।’ [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৩০০০]।

হাজীর সম্মানে সবকিছুই তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে : ‘হজরত সাহল ইবনু সা’দ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন-যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে, তখন তার ডানে ও বামে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি সবকিছুই তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে; এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়’। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৮২৮]।

হজ দরিদ্রতা ও গোনাহগুলো বিদূরিত করে : ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন-‘তোমরা হজ ও ওমরাহর মধ্যে ধারাবাহিকতা বজায় রাখ (অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে কর)। কেননা এ দুটি মুমিনের দরিদ্রতা ও গোনাহগুলো দূর করে দেয়, যেমন (কামারের আগুনের) হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ময়লা দূর করে দেয়। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়’। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৮১০]।

হজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল : ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.)কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, ‘শ্রেষ্ঠ আমল হলো আল্লাহ ও তার রাসূলের ওপরে ইমান আনা। বলা হলো, তারপর কী? তিনি বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা। জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কী? তিনি বললেন, কবুল হজ’। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৫১৯]।

হাজীরা আল্লাহর মেহমান : ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হজরত রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর মেহমান হলো তিনটি দল-আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধকারী, হজকারী ও ওমরাহ্কারী’। [সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ২৬২৫]।

হজের নিয়তকারীরা কোনো কারণে হজ করতে সক্ষম না হলেও নেকি পাবে : ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি হজ, ওমরাহ কিংবা জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হলো এবং রাস্তায় মৃত্যুবরণ করল, আল্লাহ তার জন্য পূর্ণ নেকি লিখে দেবেন’। [বায়হাকী, শু ‘আবুল ঈমান, হাদিস নং ৪১০০]।

তালবিয়া পাঠের ফজিলত : হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণিত-‘নবী করিম (সা.)কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন হজ সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যে হজে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা হয় এবং কুরবানি করা হয়। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৮২৭]।

বায়তুল্লাহ তাওয়াফের ফজিলত : ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করবে ও শেষে দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে, সে যেন একটি গোলাম আজাদ করল’। [ইবনু মাজাহ, হাদিস নং ২৯৫৬]।

হজরত ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বলতে শুনেছি-‘যে ব্যক্তি যথাযথভাবে সাতবার বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে তার একটি গোলাম আজাদ করার সমান সওয়াব হয়। তাওয়াফের প্রতি কদমে আল্লাহ তার একটি করে গুনাহ মাফ করেন, একটি করে নেকি লেখেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন’। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৪৪৬২]।

হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানি স্পর্শ করার ফজিলত : ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) স্পর্শ করবে, এ দুটি তার সব গোনাহ ঝরিয়ে দেবে’। [মু’জামুল কাবির, হাদিস নং ১৩৪৩৮]।

যমযমের পানি পান করার ফজিলত : তাওয়াফ শেষে দু’রাকাত নামাজান্তে মাতাফ থেকে বেরিয়ে পাশেই যমযম কূপ। সেখানে গিয়ে যমযমের পানি বিসমিল্লাহ বলে দাঁড়িয়ে পান করবে ও কিছুটা মাথায় দেবে। [মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত, হাদিস নং ৪২৬৮]। 

যমযমের পানি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে সেরা পানি হলো যমযমের পানি। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিকর খাদ্য এবং রোগমুক্তি’। [ত্বাবারাণী, মু’জামুল আওসাত্ব, হাদিস নং ৩৯১২]।

 বায়তুল্লাহে নামাজ আদায়ের ফজিলত : ‘হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘অন্যত্র নামাজ আদায়ের চেয়ে আমার মসজিদে (মসজিদে নববীতে) নামাজ আদায় করা এক হাজার গুণ উত্তম এবং মসজিদুল হারামে নামাজ আদায় করা অন্য মসজিদে নামাজ অপেক্ষা এক লাখ গুণ উত্তম’। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৯১৬]। 

 ইয়াওমে আরাফার ফজিলত : হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘আরাফার অধিবাসীদের ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের কাছে গর্ব করেন এবং তাদের বলেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখ, তারা এলোমেলো চুলে, ধুলোমলিন অবস্থায় আমার কাছে এসেছে’। [মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৭০৮৯]। 

.......হজ একটি ইবাদত, যা আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও বিশেষ মর্যাদা লাভ করা যায়। তাই প্রত্যেকের হজ পালন করা উচিত। আয়েশা (রা.) হজের বিধান জানার পর কখনো হজ ত্যাগ করেননি। হজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে এর কার‌্যাবলি সম্পাদন করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে পৃথক পৃথক ফজিলত ও মর্যাদা রয়েছে। রাসূল (সা.) আয়েশা (রা.)-কে লক্ষ্য করে বলেন-‘তোমার কষ্ট ও খরচের পরিমাণের ওপর তোমার সওয়াব প্রাপ্তি নির্ভর করবে’। [দারা কুতনি, হাদিস নং ২৭৬২]। 

......সুতরাং আমাদের উচিত হজ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে এ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি সম্পন্ন করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এর গুরুত্ব ও ফজিলত বুঝে তদানুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। 

...............আমীন।............

 (লেখক পরিচিতি : মুহাদ্দিস, সারসীনা দারুস্সুন্নাত জামেয়ায়ে নেসারিয়া দীনিয়া



বুধবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২২

সালাত ঈমানের শামিল

বুধবার, অক্টোবর ১৯, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

গ্রন্থঃ সহীহ বুখারী (তাওহীদ)
অধ্যায়ঃ ২/ ঈমান (বিশ্বাস) (كتاب الإيمان)
হাদিস নম্বরঃ ৪০

 
২/৩০ সালাত ঈমানের শামিল। 

وَقَوْلُ اللهِ تَعَالَى )وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ( يَعْنِي صَلاَتَكُمْ عِنْدَ الْبَيْتِ

আল্লাহর বাণীঃ আল্লাহ এরূপ নন যে তোমাদের ঈমান ব্যর্থ করবেন- (সূরাহ্ আল-বাক্বারাহ ২/১৪৩)। অর্থাৎ বায়তুল্লাহর নিকট (বায়তুল মুকাদ্দাসমুখী হয়ে) আদায়কৃত তোমাদের সালাতকে তিনি নষ্ট করবেন না।

৪০. বারাআ (ইবনু ‘আযিব) (রাযি.) হতে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনা্য় হিজরত করে সর্বপ্রথম আনসারদের মধ্যে তাঁর নানাদের গোত্র [আবূ ইসহাক (রহ.) বলেন] বা মামাদের গোত্রে এসে ওঠেন। তিনি ষোল-সতের মাস বাইতুল মাকদিসের দিকে ফিরে সালাত আদায় করেন। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল যে, তাঁর কিবলা বাইতুল্লাহর দিকে হোক। আর তিনি (বাইতুল্লাহর দিকে) প্রথম যে সালাত আদায় করেন, তা ছিল আসরের সালাত এবং তাঁর সঙ্গে একদল লোক সে সালাত আদায় করেন। তাঁর সঙ্গে যাঁরা সালাত আদায় করেছিলেন তাঁদের একজন লোক বের হয়ে এক মসজিদে মুসল্লীদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁরা তখন রুকূ‘ অবস্থায় ছিলেন। তখন তিনি বললেনঃ ‘‘আমি আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে বলছি যে, এইমাত্র আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে মক্কার দিকে ফিরে সালাত আদায় করে এসেছি। তখন তাঁরা যে অবস্থায় ছিলেন সে অবস্থায়ই বাইতুল্লাহর দিকে ঘুরে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বায়তুল মাকদিস-এর দিকে সালাত আদায় করতেন তখন ইয়াহুদীদের ও আহলি-কিতাবদের নিকট এটা খুব ভাল লাগত; কিন্তু তিনি যখন বাযতুল্লাহর দিকে তাঁর মুখ ফিরালেন তখন তারা এটা খুব অপছন্দ করল। যুহায়র (রহ.) বলেন, আবূ ইসহাক (রহ.) বারাআ (রাযি.) থেকে আমার নিকট যে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাতে এ কথাও রয়েছে যে, কিবলা পরিবর্তনের পূর্বে বেশ কিছু লোক মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং শাহাদাত বরণ করেছিলেন, তাঁদের ব্যাপারে আমরা কী বলব, সেটা আমাদের জানা ছিল না। তখন আল্লাহ তা‘আলা অবতীর্ণ করেনঃ (وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِيعَ إِيمَانَكُمْ)  ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের সালাতকে বিনষ্ট করবেন না’’। (৩৯৯, ৪৪৭৬, ৪৪৯২, ৭২৫২; মুসলিম ৫/২ হাঃ ৫২৫, আহমাদ ১৮৫৬৪, ১৮৭৩২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৯)

হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)


বুধবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

হজ্ব কত প্রকার ও কী কী? বিস্তারিত কার্যাবলী ও হুকুম আলোচনা

বুধবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

হজ্জ তিন প্রকার
হজ্ব কত প্রকার ও কী কী? বিস্তারিত কার্যাবলী ও হুকুম আলোচনা

(১) হজ্জে কিরান। এক ইহরামে উমরা ও হজ্জ উভয়টি পালন করা।
(২) হজ্জে তামাত্তু। আলাদা আলাদা ইহরাম পরিধান করে উমরা এবং হজ্জ পালন করা।
(৩) হজ্জে ইফরাদ। শুধুমাত্র হজ্জের ইহরাম বেধে হজ্জ করা।
এই তিন প্রকারের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হজ্জ হচ্ছে, হজ্জে কিরান, তারপর হজ্জে তামাত্তু, অতপর হজ্জে ইফরাদ।

হজ্জে কিরান:
এর কাজ সর্বমোট ১৩টি
১। উমরা ও হজ্জের নিয়তে ইহরাম বাধা। ফরজ।
২। বাইতুল্লায় প্রবেশ করে তাওয়াফে উমরা বা উমরার তাওয়াফ আদায় করা। ফরজ।
৩। তাওয়াফের পর উমরার সায়ী করা। ওয়াজিব।
৪। তাওয়াফে কুদুম করা । সুন্নত।
৫। সায়ী করা। ওয়াজিব।
৬। ৮ই জিলহজ্জ যোহর থেকে ৯ই জিলহজ্জ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করা। সুন্নত।
৭। ৯ই জিলহজ্জ সূর্য ঢলা থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত উকুফে আরাফা (আরাফায় অবস্থান) করা। হজের অন্যতম ফরজ।
৮।৯ই জিলহজ দিবাগত রাত উকুফে মুজদালিফা (মুজদালিফায় অবস্থান) করা। পুরুষের জন্য ওয়াজিব। মহিলাদের জন্য ওয়াজিব নয়।
৯। ১০,১১ ও ১২ই জিলহজ্ব মিনায় জামারাতে (কংকর নিক্ষেপের স্থানে) কংকর নিক্ষেপ করা। ওয়াজিব।
১০। কোরবানি করা ওয়াজিব।
১১। হলক করে ইহরাম খোলা । ওয়াজিব (হলক বা কছর )
১২। তাওয়াফে যিয়ারত করা ফরজ।
১৩। সর্বশেষ মক্কা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিদায়ী তাওয়াফ করা। ওয়াজিব।
বিদায়ী তাওয়াফ করলে হজ্জে কিরানের কার্যাবলী সমাপ্ত হবে।

হজ্জে তামাত্তু:

এর কাজ সর্বমোট ১৪ টি
১। উমরার নিয়তে ইহরাম বাঁধা।ফরজ।
২। বায়তুল্লায় উমরার তাওয়াফ করা। ফরজ।
৩। উমরার সায়ী করা।ওয়াজিব।
৪। হলক করে উমরার ইহরাম খোলা। ওয়াজিব।
৫। ৮ই জিলহজ্জ হজ্জের উদ্দেশ্যে ইহরাম বাঁধা।ফরজ।
৬। ৮ই জিলহজ্জ মিনায় গমন করে সেখান থেকে যোহর আসর মাগরিব এশা এবং ৯ই জিলহজ্জ এর ফজর সর্বমোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। সুন্নত।
৭। ৯ই জিলহজ্জ উকুফে আরাফা বা আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। আর উকুফে আরাফা হজ্জের একটি অন্যতম ফরজ।
৮। ৯ই জিলহজ্জ দিবাগত রাতে উকুফে মুজদালিফা বা মুজদালিফায় অবস্থান করা। পুরুষদের জন্য ওয়াজিব। মহিলাদের জন্য ওয়াজিব নয়।
৯। ১০ ১১ ও ১২ই জিলহজ্জ জামারাতে (কংকর নিক্ষেপের স্থানে) কংকর নিক্ষেপ করা। ওয়াজিব।
১০। পশু কোরবানি করা। ওয়াজিব।
১১। হলক করা। ওয়াজিব।
১২। তাওয়াফে জিয়ারত করা। ফরজ।
১৩। তাওয়াফে জিয়ারত এর সায়ী করা। ওয়াজিব।
১৪। সর্বশেষ মক্কা থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। বিদায়ী তাওয়াফ করার মাধ্যমে হজ্জে তামাত্তু এর কার্যাবলী সমাপ্ত হবে।

পবিত্র হজ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের নিশানা

হাদিস শরিফে সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে একটি দেহের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ এই জাতি সব বিবাধ ভুলে গিয়ে দলমত-জাতিবর্ণ নির্বিশেষে মহান প্রভুর কুদরতি পায়ে মাথা অবনত করে সেজদায় ইবাদতে মগ্ন হয়।

প্রত্যেক ধর্মেরই কিছু নির্দ্দিষ্ট আচার-অনুষ্টান আছে যার দ্বারা সেই ধর্মের অনুসারিগণ এক স্থানে সমবেত হন। একে অন্যের সাথে সাক্ষাত হয়। কিন্তু পৃথিবীর সব ধর্মের চেয়ে ইসলাম ধর্ম তার অনুসারিদের একত্রিকরনের জন্য রেখেছে ব্যতিক্রম ব্যবস্থা।

হজ্ব হচ্ছে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা আর্থিক ও শারিরিক ইবাদতও বটে। হজ্বের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছা করা, সংকল্প করা। শরিয়তের পরিভাষায় হজ্বের মাস সমূহে বিশেষ কিছু কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে নির্দ্দিষ্ট কিছু স্থানের যিয়ারত করাকে হজ্ব বলে।

হজ্বের মাসসমূহঃ- শাওয়াল, যিলক্বাদাহ ও যিলহাজ্জার দশ দিন। বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে হজ্ব যখন ওয়াজিব হয় তখনই পালন করা এবং একবারই পালন করা ফরয।
হজ্ব ফরয হওয়ার শর্ত আটটিঃ
(১) মুসলমান হওয়া
(২) জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া
(৩) বালেগ হওয়া
(৪) স্বাধিন হওয়া
(৫) হজ্বের সময় হওয়া
(৬) মধ্যম ধরনের ব্যয় হিসেবে সফরের ব্যয় বহনের সামর্থ থাকা, যদি হজ্ব পালনকারি মআ শরিফে অবস্থান করে তবুও
(৭) যারা মক্কা শরিফের বাহিরে থাকেন তাদের জন্য হজ্ব পালনের শর্ত হল মালিকানা বা ভাড়া সূত্রে স্বতন্ত্রভাবে একটি বাহন বা অন্যকিছু ব্যবহারের সামর্থ থাকা যেমনঃ আমাদের দেশের হাজ্বিগণ বিমান ব্যবহার করে থাকেন। তবে কেউ যদি বিনিময় ছাড়া তার বাহন বা সওয়ারি ব্যবহারের অনুমতি দেয় তাহলে তা সামর্থ হিসেবে গণ্য হবে। যারা মক্কার আশেপাশে অবস্থান করেন, তাদের উপর তখন হজ্ব ফরয হয়। যখন তারা কষ্ট সহ্য করে নিজ শক্তিতে পায়ে হেটে হজ্ব করতে পারে। কিন্তু হাটতে সক্ষম না হলে সেই ব্যক্তি মক্কার অধিবাসি হোক বা না হোক তার জন্য অবশ্যই বাহনের প্রয়োজন হবে।

(৮) অমুসলিম দেশে ইসলাম গ্রহনকারি ব্যক্তির “হজ্ব ইসলামের একটি রুকন (ফরয)”একথা জানা থাকা বা সে ব্যক্তি মুসলিম দেশের অধিবাসি।

হজ্ব ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাঁচটিঃ 
(১) সুস্থ থাকা
(২) হজ্বে যাওয়ার বাহ্যিক বাধা দূরিভুত হওয়া
(৩) রাস্থাঘাট নিরাপদ থাকা (স্থল ও সামুদ্রিক পথে যদি অধিকাংশ লোক নিরাপদে ফিরে আসে তবেই রাস্থা নিরাপদ বলে ধর্তব্য হবে।)
(৪) মহিলাগন তাদের ইদ্দত অবস্থায় না থাকা
(৫) নারির বেলায় হজ্বে তার সাথে একজন মুসলমান আস্থাভাজন, জ্ঞান সম্পন্ন, বালেগ মাহরাম পুরুষ বা স্বামি থাকা। মাহরাম ব্যক্তি স্তন্যসূত্রে মাহরাম হতে পারে অথবা বৈবাহিক সূত্রেও হতে পারে।

চারটি কাজে হজ্ব পালনঃ চারটি কাজ করলে স্বাধিন ব্যক্তির হজ্বের ফরয বিশুদ্ধভাবে পালিত হয়। এক. ইহরাম। দুই. ইসলাম। এ দুটি হল হজ্বের শর্ত অতঃপর হজ্বের অপর দুই ফরয পালন করা। অর্থাৎ যিলহজ্বের নবম তারিখে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে যাওয়ার পর থেকে কোরবানির দিনের ফযর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্তত এক মূহুর্ত আরাফাতের ময়দানে ইহরাম অবস্থায় থাকা। তবে শর্ত হল এর পূর্বে ইহরাম অবস্থায় স্ত্রী সহবাস না করা চাই। দ্বিতিয় ফরয হল তাওয়াফে যিয়ারতের অধিকাংশ চক্কর যথাসময়ে অর্থাৎ দশম তারিখের ফযরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর পালন করা।

হজ্বের ওয়াজিব সমূহঃ
(১) মিক্বাত হতে ইহরাম বাধা
(২) সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা
(৩) যিলহজ্বের দশ তারিখে ফযরের সময় শুরু হওয়ার পর এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে মুযদালিফায় থাকা
(৪) পাথর নিক্ষেপ করা
(৫) হজ্বে ক্বেরান ও হজ্বে তামাত্তু পালনকারির পশু যবেহ করা
(৬) মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করা
(৭) মাথা মুন্ডানোর কাজটি হারাম শরিফে এবং ক্বোরবানির দিন গুলোতে সম্পন্ন করা
(৮) মাথা মুন্ডানোর পূর্বে পাথর নিক্ষেপ করা
(৯) হজ্বে ক্বেরান ও হজ্বে তামাত্তু পালনকারির পাথর নিক্ষেপ ও মাথা মুন্ডানোর মধ্যবর্তি সময়ে পশু যবেহ করা
(১০) ক্বোরবানির দিনগুলোতে তাওয়াফে যিয়ারত সম্পন্ন করা
(১১) হজ্বের মাসগুলোতে সাফা-মারওয়ার মধ্যখানে সায়ী করা
(১২) গ্রহনযোগ্য তাওয়াফের পর সায়ী করা।
(১৩) ওযর ব্যতিত পায়ে হেটে সায়ী করা
(১৪)সাফা থেকে সায়ী আরম্ভ করা
(১৫) বিদায়ি তাওয়াফ করা
(১৬) বায়তুল্লাহ শরিফের সবকটি তাওয়াফ হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) থেকে শুরু করা
(১৭) ডান দিক থেকে তাওয়াফ শুরু করা
(১৮) ওযর ছাড়া পায়ে হেটে তাওয়াফ করা
(১৯) ছোট-বড় উভয় প্রকার হাদাস থেকে পবিত্র থাকা
(২০) সতর ঢাকা
(২১) তাওয়াফে যিয়ারতের অধিকাংশ চক্কর (ক্বোরবানির দিনগুলোতে) সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট চক্করগুলো সম্পন্ন করা
(২২) নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা যেমনঃ পুরুষরা সেলাইকৃত কাপড় পরিধান করা এবং মাথা ও চেহারা ঢাকা, মহিলারা চেহারা ঢাকা, যৌন উত্তেজক কথাবার্তা বলা, গুনাহের কাজ করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, শিকার বা শিকারের প্রতি ইশারা করা কাউকে শিকার দেখিয়ে দেয়া ইত্যাদি।

হজ্বের কার্যাবলি পুরোপুরিভাবে সম্পাদনের পদ্ধতিঃ যখন কেউ হজ্ব করার ইচ্ছা করবে তখন সে মিক্বাত থেকে ইহরাম বাধবে। ইহরাম বাধার নিয়ম এই যে, ইহরাম বাধার প্রারম্ভে গোসল কিংবা ওযু করে নেয়া। তবে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য গোসলই উত্তম। কাজেই হায়েয ও নেফাসগ্রস্থ নারীর যদি গোসল করলে ক্ষতি না হয় তাহলে গোসল করবে। নখ ও গোফ কেটে, বগলের পশম পরিস্কার করে, নাভির নিচের পশম মুড়িয়ে, গোসল করে সুগন্ধি লাগিয়ে তেল ব্যবহার করে সম্পূর্ণরুপে পরিস্কার হওয়া মুস্তাহাব। পুরুষ লোক একটি ইযার ও চাদর পরিধান করবে, যা নতুন কিংবা ধৌতকরা হতে পারে। তবে নতুন সাদা কাপড় উত্তম। চাদরটি বোতামবিহীন হতে হবে। কোন প্রকারের জোড়া বা কাপড় ছিড়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখা সম্পূর্ণ নিষেধ। এ ধরনের কাজ করা মাকরুহ। এ জন্য তার উপর ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোন কিছু ওয়াজিব হবে না।
হে হজ্ব বা ওমরাহ পালনকারি ব্যক্তি! এবার আপনি দু’রাকাত নামায পড়–ন। অতঃপর বলুন, হে আল্লাহ আমি হজ্ব পালন করার ইচ্ছা করেছি, সুতরাং আপনি আমার জন্য কাজটি সহজ করে দিন এবং আমার পক্ষ থেকে তা ক্ববুল করুন। নামাযের পর তালবিয়া পড়–ন “লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকালাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদাহ, ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাকা”। যখন আপনি হজ্ব বা ওমরার নিয়তে তারবিয়া পড়লেন তখনই আপনার ইহরাম বাধা হয়ে গেল। সুতরাং এ সময় থেকে আপনি রাফাস তথা স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকবেন। সবসময় তালবিয়া পড়–ন, তবে চিৎকার দেয়ার প্রয়োজন নেই। যার দ্বারা নিজের বা অন্যের ক্ষতি হয়। যখন আপনি মক্কায় পৌছবেন তখন আপনার গোসল ও দরজায়ে মুআল্লা দিয়ে প্রবেশ করা মুস্তাহাব।

হজ্বের প্রকারভেদঃ হজ্ব মোট তিন প্রকার।
১. হজ্বে ইফরাদ
২. হজ্বে তামাত্তু এবং ৩.হজ্বে ক্বেরান।
হজ্বে ইফরাদের পরিচয়ঃ ইফরাদ শব্দের আভিধানিক অর্থঃ একা, একাকি বা পৃথক। শরিয়তের পরিভাষায় মিক্বাত হতে শুধু হজ্বের নিয়ত করে ইহরাম বেধে শুধুমাত্র হজ্ব সম্পন্ন করার নাম ইফরাদ।
হজ্বে তামাত্তু এর পরিচয়ঃ তামাত্তু এর আভিধানিক অর্থঃ উপকারিতা অর্জন করা, উপভোগ করা। পরিভাষায় মিক্বাত হতে প্রথমে ওমরার ইহরাম বেধে তার কার্যাবলি সমাপন করে হালাল হওয়ার পর হজ্বের সময় হজ্বের ইহরাম বেধে তার আহকাম সমূহ সম্পাদন করাকে তামাত্তু বলে।

হজ্বে ক্বেরান এর পরিচয়ঃ ক্বেরানের শাব্দিক অর্থঃ মিলানো, মিশ্রন করা। পরিভাষায় মিক্বাত হতে একসাথে হজ্ব ও ওমরার নিয়ত করে ইহরাম বেধে উভয়টিকে একই ইহরামে সমাপ্ত করাকে ক্বেরান বলে।

সর্বোত্তম হজ্ব কোনটিঃ তিন প্রকারের হজ্বের মধ্যে কোনটি সর্বোত্তম তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
ইমাম আবু হনিফা (রহ.)’র মতে হজ্বে ক্বেরান হচ্ছে সর্বোত্তম হজ্ব। এরপর তামাত্তু তারপর ইফরাদ। কেননা নবিয়ে করিম (সা.) বিদায় হজ্বের সময় ক্বেরান হজ্ব করেছেন এবং তার পরিবারবর্গকেও তা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া এটা পালন করা খুবই কষ্টকর। কারণ এতে দুটি ইবাদত একসাথে করা হয়।



হজ্বের অর্থ ও তাৎপর্য আলোচনা

বুধবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
পাঠ সংক্ষেপ
হজ্বের অর্থ ও তাৎপর্য আলোচনা

বস্তুত হজ্বের দৃশ্য বড়ই বিস্ময়কর ও হৃদয়স্পর্শী। এ দৃশ্য দেখে মুমিনগণ আনন্দিত হন এবং একত্ববাদীগণ হন সম্মানিত ও গর্বিত। সেই সাথে অপরাধীরা হয় লজ্জিত এবং উদাসীনদের হয় দৃষ্টিভ্রম। এ সুবিশাল সমাবেশ ও মহান মিলনমেলা আমাদেরকে কোনো উপদেশ ও শিক্ষা না দিয়ে বিদায় নেবে তা হতে পারে না।

প্রথম খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ جَعَلَ الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنَا وَأَمَرَ بِاتِّخَاذِ مَقَامٍ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلَّى وَفَرَضَ عَلَى عِبَادِهِ حَجَّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيْلاً، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ :
হজ্ব, মুমিনের মিলনমেলা ডাকে তোমাকে হাতছানি দিয়ে,ইব্রাহীমি আহ্বান নিয়ে ডাকে শুদ্ধ হতে, ফিরে যেতে নবজাতকের পবিত্রতায়।
মুহতারাম হাযেরীন! আপনারা কি হজ্ব ও তার বিশালত্বের বিষয়টি কল্পনা করেছেন? আপনারা কি দেখেছেন ঈমান ও তার সমুজ্জ্বলতা? লক্ষ্য করেছেন লোকদের বিরাট সমাবেশ, যারা বাইতুল্লাহ শরীফে আগমন করেছে আল্লাহর বড়ত্ব, প্রশংসা ও বুযুর্গী বর্ণনা করতে করতে? বস্তুত হজ্বের দৃশ্য বড়ই বিস্ময়কর ও হৃদয়স্পর্শী। এ দৃশ্য দেখে মুমিনগণ আনন্দিত হন এবং একত্ববাদীগণ হন সম্মানিত ও গর্বিত। সেই সাথে অপরাধীরা হয় লজ্জিত এবং উদাসীনদের হয় দৃষ্টিভ্রম।

অতএব, হে মুসলমানগণ! আমার তো মনে হয় না যে, এই সুবিশাল সমাবেশ ও মহান মিলনমেলা আমাদেরকে কোনো উপদেশ ও শিক্ষা না দিয়েই বিদায় নিবে!
মক্কার পবিত্র ভূমিতে আল্লাহ তা‘আলার দাওয়াতে লোকদের এই বিশাল সমাবেশ সংঘটিত হয়। তারা উপস্থিত হয় আল্লাহ তা‘আলার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা ও তার একত্ববাদের ঘোষণা দেয়ার জন্য। তাই যারা সামার্থ্য রাখে তাদের ওপর হজ্ব করে দিয়ে আল্লাহ তাঅ‘লা বলেন:
{ وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ البَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً }
‘এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্ব করা ফরজ’ (সূরা আল ইমরান: ৯৭)।

হজ্বের সমাবেশ অনেক বড় সমাবেশ যা দেখে গোটা বিশ্ব কম্পিত হয়, ইসলামের দুশমনেরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয় এবং ইহুদী-খৃস্টানেরা ঘাবড়ে যায়। এতে কি আপনারা এই দীনের শ্রেষ্ঠত্ব এবং এই উম্মতের মর্যাদার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারছেন না?

প্রিয় ভাইয়েরা! হজ্ব হলো উম্মতের বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় একত্রিত হওয়ার ময়দান এবং অপদস্থতার পর ইজ্জত বা সম্মানের মিনারা স্বরূপ। শুধু তাই নয়, হজ্ব মুসলমানদের জীবন ও অস্তিত্বের আলামতও বটে। এ সত্ত্বেও উম্মতের জন্য কি এটা উচিত হবে যে, তারা হজ্বের মতো এই গুরুত্বপূর্ণ আমলের ভেদ ও রহস্য উদঘাটন করা থেকে নির্লিপ্ত থাকবে?

হজ্ব হলো পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করা, ঈমানের নবায়ন করা এবং একে অপরের সাথে পরিচিত হওয়ার স্থান।
কেননা হজ্ব করতে এসে এক মুসলমান দূরের আরেক মুসলমানের সাথে পরিচিত হয়, তার কথা শুনে এবং সাহায্যের মুখাপেক্ষী হলে তাকে সাহায্য করে।
হে আল্লাহর বান্দাগণ! হজ্বের রহস্য ও ভেদ জানার জন্য প্রয়োজন হলো হজ্ব সম্পর্কিত আয়াতগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগতি লাভ করা।
আল্লাহ তা‘আলা বায়তুল্লাহ শরীফের বুনিয়াদ রেখেছেন যাতে মানুষ তার একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয় এবং তার ইবাদত করে। যেমন তিনি বলেন:
{ وَإِذْ بَوَّأْنَا لإِبْراهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لاَّ تُشْرِكْ بِى شَيْئًا وَطَهّرْ بَيْتِىَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ }
‘আর স্মরণ কর, যখন আমি ইবরাহীমকে সে ঘরের (বায়তুল্লাহ্র) স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখবে তাওয়াফকারীদের জন্য, নামাযে দণ্ডায়মানদের জন্য এবং রুকু সেজদাকারীদের জন্য’ (সূরা হাজ্জ: ২৬)।

নিশ্চয় খালেস ও নির্ভেজাল একত্ববাদ আল্লাহর এই যমীনে মানুষের খিলাফতের ভিত্তি এবং সর্বোৎকৃষ্ট ও মহিমান্বিত একটি বিষয়। বস্তুত নির্ভেজাল একত্ববাদই পারে গোটা মানবজাতিকে আল্লাহ তা‘আলার যাত ও সিফাতের মধ্যে শিরক করা থেকে নিরাপদ রাখতে।

একত্ববাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকেই কিছু পাওয়ার আশা রাখে, তাকেই সে ভয় পায় এবং তার কাছেই সে সাহায্য প্রার্থনা করে। উপরন্তু সে এটাও কামনা করে যে, আল্লাহর যমীনে যেন আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়, তাঁর বিধি-বিধানই কার্যকর হয়।

হজ্বের অন্যতম শিক্ষা হলো তাওহীদ। হজ্বের প্রতিটি বিধানই তাওহীদী ভাবধারাকে আন্দোলিত করে তোলে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়রাজ্যে।

বায়তুল্লাহর তাওয়াফের সময় আমরা হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করি অথবা স্পর্শ করি অথবা হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করি। রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণার্থেই আমরা কেবল এরূপ করি। তাছাড়া হাজরে আসওয়াদের আলাদ কোনো বরকত নেই। হাজরে আসওয়াদ কেবলই একটা পাথর মাত্র যা উপকার অপকার কোনোটাই করতে পারে না। উমর রাযি. তার ভাষায় উক্ত বিষয়টিকে খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন:
( إِنِّي أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ، وَلَوْلَا أَنِّيْ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللَّهِ يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ )
‘ আমি জানি, তুমি একটি পাথর বৈ কিছু নও। তুমি না কোনো ক্ষতি করতে পারো, না কোনো উপকার করতে পারো। যদি আমি এটা না দেখতাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে চুম্বন করেছেন তাহলে কখনোই আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না’।

অতএব একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস রাখা প্রত্যেক মুসলমানের উচিত যে, বায়তুল্লাহর তাওয়াফ, হাজরে আসওয়াদ চুম্বন এবং রুকনে ইয়ামানীর স্পর্শ আমাদের কোনো প্রকার লাভ কিংবা ক্ষতি করতে পারবে না। লাভ-ক্ষতির মালিক একমাত্র আল্লাহ। এ বিষয়ে একমাত্র তাঁরই রয়েছে সর্বময় ক্ষমতা।যদি এই বিশ্বাসে কোনো ত্রুটি আসে তাহলে তা শিরক হবে, যা বাইতুল্লাহ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকেই ব্যহত করবে। তাই আমাদের সবাইকে এই ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে যে কোনো মূল্যে বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-কে নবম হিজরীতে হজ্বে পাঠিয়েছিলেন। হজ্বের উদ্দেশ্যে সমবেত মানুষদেরকে তিনি এই ঘোষণা শোনাতে বললেন যে, কোনো মুশরিক এবছরের পর হজ্ব করবে না। কেউ উলঙ্গ অবস্থায় বায়তুল্লাহর তাওয়াফও করবে না’ ( বুখারী ও মুসলিম)।
হজ্ব তাওহীদী আকীদাকে দৃঢ় ও মজবুত করে, শিরক বর্জনের মানিসকতায় সৃষ্টি করে নতুন উত্তাপ। ইরশাদ হয়েছে:
{ ذلِكَ وَمَن يُعَظّمْ حُرُمَاتِ اللَّهِ فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ عِندَ رَبّهِ وَأُحِلَّتْ لَكُمُ الأنْعَامُ إِلاَّ مَا يُتْلَى عَلَيْكُمْ فَاجْتَنِبُواْ الرّجْسَ مِنَ الأوْثَانِ وَاجْتَنِبُواْ قَوْلَ الزُّورِ }
‘ এটিই বিধান। আর কেউ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র বিষয়সমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তাই তার জন্য উত্তম। আর তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে চতুষ্পদ জন্তু, তবে যা তোমাদের কাছে পাঠ করা হয় তা ছাড়া। সুতরাং মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর’ (সূরা আল হাজ্জ:৩০)।

হজ্ব পালনকারীদের আরেকটি বিষয় সম্পর্কে অবগতির প্রয়োজন। তা হলো, হজ্বরত অবস্থায় হজ্বের কার্যাবলী যথাযথভাবে সম্পাদন করলে যেমন পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তেমনি তাতে অবহেলা বা ত্রুটি করলেও কঠোর ধমক ও সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা হজ্বের বিধি-বিধান বর্ণনা করার পর বলেছেন:
{ ذلِكَ لِمَن لَّمْ يَكُنْ أَهْلُهُ حَاضِرِى الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَاتَّقُواْ اللَّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ }
‘ এ নির্দেশ তাদের জন্য, যাদের পরিবার-পরিজন মসজিদুল-হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহ্কে ভয় কর। এবং জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ্ আযাবদানে কঠোর’ (সূরা বাকারা: ১৯৬)।

এখানে আল্লাহ তা‘আলা একথা বলেননি যে, নিশ্চয় আল্লাহ পরম দয়াশীল। বরং বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ আযাবদানে কঠোর। এভাবে বলার কারণ হলো, লোকজন যাতে হজ্বের সম্মান যথাযথভাবে বজায় রাখে এবং তাকে পরিপূর্ণভাবে আদায় করে। আর ধমক তো শুধু অবহেলাকারিদের জন্যই।
হাজীদের আরো একটি বিষয় অবগত হওয়া প্রয়োজন। তা হলো, গরিব ও অভাবগ্রস্থদের কথা বিবেচনায় রাখা। ইরশাদ হয়েছে:
{ لّيَشْهَدُواْ مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُواْ اسْمَ اللَّهِ فِى أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مّن بَهِيمَةِ الأنْعَامِ فَكُلُواْ مِنْهَا وَأَطْعِمُواْ الْبَائِسَ الْفَقِيرَ }
‘ যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহ্র নাম স্মরণ করে তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ্ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্তকে আহার করাও’ (সূরা-হাজ্জ: ২৮)।

অন্য আয়াতে তিনি বলেছেন:
{ فَكُلُواْ مِنْهَا وَأَطْعِمُواْ الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ كَذالِكَ سَخَّرْنَاهَا لَكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ }
‘অতঃপর তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাঞা করে না তাকে এবং যে যাচ্ঞা করে তাকে। এমনিভাবে আমি এগুলোকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’ (সূরা-হাজ্জ: ৩৬)।

মুসল্লিয়ানে কেরাম! হজ্বের শিক্ষণীয় বিষয় থেকে আরো একটি বিষয় হলো, হজ্ব তাকওয়া বা পরহেযগারী অবলম্বন করার গুরুত্ব এবং বান্দার আমলে তার সীমাহীন প্রভাবের বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দেয়।

তাকওয়া হলো ঐ মাপকাঠি, যদ্বারা আমল ওজন করা হয়। অনুরূপভাবে তার মাধ্যমে মানুষের মর্যাদাও নিরুপন করা হয়। একারণেই হজ্ব সম্পর্কিত আয়াতগুলোতে তাকওয়ার ব্যাপারে অধিক পরিমাণে ওসিয়ত করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
{ وَاتَّقُواْ اللَّهَ وَاعْلَمُواْ أَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ }
‘আর আল্লাহ্কে ভয় কর। এবং জেনে রাখো, নিশ্চয় আল্লাহ্র আযাবদানে কঠোর’ (সূরা-বাকারা:১৯৬)।
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন :
{ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَى وَاتَّقُونِ ياأُوْلِي الألْبَابِ }
‘আর তোমরা পাথেয় গ্রহণ কর। নিশ্চয় সর্বোত্তম পাথেয় তাকওয়া। আর হে বিবেকসম্পন্নগণ, তোমরা আমাকে ভয় কর’ (সূরা বাকারা:১৯৭)।

তিনি আরো বলেন :
{ فَمَن تَعَجَّلَ فِى يَوْمَيْنِ فَلا إِثْمَ عَلَيْهِ وَمَن تَأَخَّرَ فَلا إِثْمَ عَلَيْهِ لِمَنِ اتَّقَى }
‘অতঃপর যে তাড়াহুড়া করে দ’ুদিনে চলে আসবে, তার কোনো পাপ নেই। আর যে বিলম্ব করবে তারও কোনো অপরাধ নেই। এ বিধান তাদের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহ্কে ভয় কর এবং জেনে রাখ, নিশ্চয় তোমাদেরকে তাঁরই কাছে সমবেত করা হবে’ (সূরা আল-বাকারা: ২০৩)।

অন্য এক আয়াতে তিনি বলেন:
{ ذلِكَ وَمَن يُعَظّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ }
‘এটাই হলো আল্লাহর বিধান যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই’ (সূরা হজ্জ: ৩২)।

তিনি আরো বলেন :
{ لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلاَ دِمَاؤُهَا وَلَاكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ }
‘আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৭)।

বস্তুত তাকওয়া হলো সকল কল্যাণের আধার।
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহ তা‘আলার দরবারে মানুষের মর্যাদা ও পরিচয় ভাষা, বর্ণ, দৈহিক আকৃতি ও দেশের ভিত্তিতে হয় না। বরং তা হয় একমাত্র তাকওয়ার ভিত্তিতে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
{ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عَندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ }
‘নিশ্চয় তোমদের মধ্যে আল্লাহ্র কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তাকওয়াসম্পন্ন’ (সূরা হুজুরাত: ১৩)।

আল্লাহর বান্দাগণ! তাকওয়ার ভিত্তিতেই মানুষ মর্যাদার সুউচ্চ আসনে সমাসীন হয় এবং এর দ্বারাই সে অর্জন করে বুযুর্গী ও শ্রেষ্ঠত্ব। যেমন সুহাইব ও সালমান ফারসী রাযি.।

পক্ষান্তরে মানুষের মধ্যে যদি তাকওয়া না থাকে তাহলে তার অপমান ও অপদস্থতা সুনিশ্চিত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলা তাকে লাঞ্ছিত ও বেইজ্জত করেন। যেমন তিনি শিরক ও কুফরীর কারণে আবু লাহাবকে লাঞ্ছিত করেছেন। করেছেন সীমাহীন অপমানিত। আর তাকওয়ার কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় ফুফাতো বোন জয়নব বিনতে জাহ্শকে যায়েদ ইবন হারেসা রাযি. এর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ করেন। অথচ যায়েদ ইবন হারেসা রাযি. ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর আযাদকৃত দাস।

হজ্বের আরেকটি রহস্য ও তাৎপর্য হলো, তা এ উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানায়।

হজ্বের সময় হাজীগণ একই স্থানে একত্রিত হন এবং একই সাথে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদতে নিমগ্ন হন। নামায আদায় এবং সিয়াম সাধনার ক্ষেত্রেও মুসলমানগণ ঐক্যের পরিচয় দেন। মষ্টিগত এই ইবাদতগুলো মুসলিম উম্মাহকে সাম্য ও ঐক্যের শিক্ষা দেয়। সেই সাথে এও জানিয়ে দেয় যে, এ জাতি কখনো সফল হতে পারবে না যদি না তারা ঐক্যবদ্ধ হয়।

একথা আজ দিবালোকের ন্যায় পরিস্কার যে, বর্তমানে মুসলমানদের উপর কাফির-মুশরিকরা যে আগ্রাসন চালাচ্ছে তা কেবল তাদের দ্বিধা বিভক্তি ও ঐক্যহীনতার কারণেই। যেমন আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
{ وَلاَ تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ }
‘আর তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। তাহলে তোমরা সাহসহারা হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে’(সূরা আল-আনফাল: ৪৬)।

হজ্বের বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যে এটিও একটি যে, হজ্ব ঈমানকে নতুনত্ব দান করে, আত্মাকে সংশোধন করে এবং বিভিন্ন প্রকার আত্মিক ব্যাধি ও কুপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করে। হজ্বের সময় তাওহীদ বা একত্ববাদের বুলন্দ আওয়াজ যমীনকে প্রকম্পিত করে এবং হাজীগণ মশগুল হয় বিভিন্ন প্রকার ইবাদতে যা তাদের গুনাহসমূহকে মিটিয়ে দেয় এবং ছাওয়াবকে বর্ধিত করে। হাদীসে এসেছে:
( مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ مِنْ ذُنُوْبِهِ كَيَوْمَ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ )
‘যে ব্যক্তি হজ্ব করল এবং কোনোপ্রকার অশ্লীল ও শরীয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত হলো না, তবে সে গোনাহ থেকে পবিত্র হয়ে এমনভাবে ফিরে আসবে, যেমন ছিল তার জম্মদিবসে’ (বুখারী)।

হজ্বের তাৎপর্যসূহের মধ্যে এটিও একটি যে, হজ্ব কাফির সম্প্রদায়ের নিকট এ মর্মে পত্র প্রেরণ করে, হে কাফির ও অমুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা চেয়ে দেখো মুসলিম জাতি তাদের ধর্ম পালনে কত অবিচল ও সুশৃঙ্খল! কত মজবুত ও অটল!! এতে কাফিরগোষ্ঠী ভীত-সন্তস্ত্র হয় এবং মুসলমানদের তারা ভয় পায়। তারা মুসলমানদের সামনে মাথা উঁচু করে কথা বলার সাহস পায় না। তারা হয়ে যায় বাকশক্তিহীন ।
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْم، أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .

দ্বিতীয় খুৎবা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف المرسلين وعلى آله وأصحابه أجمعين، أما بعد:
মুহতারাম হাযেরীন! হজ্বের আরেকটি তাৎপর্য হলো, হজ্ব মানুষকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সেই কঠিন দিবসের ব্যাপারে সতর্ক করে। আল কুরানে ইরশাদ হয়েছে:
{ رَبَّنَا إِنَّكَ جَامِعُ النَّاسِ لِيَوْمٍ لاَّ رَيْبَ فِيهِ }
‘হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি এমন এক দিনে লোকদেরকে সমবেত করবেন যেদিনের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই’ (সূরা আল ইমরান: ৯)।

আরাফার দিনকে একটি ছোটোখাটো কিয়ামতের দিনই বলা যায়। এ দিনটি মানুষকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, যেমনিভাবে তোমরা আজকের এই দিনে আরাফার ময়দানে উপস্থিত হয়েছ, ঠিক তেমনি তোমাদেরকে ভীত-সন্তস্ত্র ও ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে একদিন মহান আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে হবে।

হজ্ব হলো সম্মিলিতভাবে ইবাদত করার এমনি এক বিশাল চিত্র, যা ইতিপূর্বে অন্য কোনো উম্মতকে দেয়া হয়নি। যা এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব ও স্থায়িত্বের প্রমাণ বহন করে। উপরন্ত হজ্ব মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে এবং বৃদ্ধি করে মহব্বত ও ভালোবাসা।

হজ্ব ইসলামের পঞ্চম রুকন এবং সুদূরপ্রসারী গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি ইবাদত।
হজ্বের বিধান যেমন একাধারে যুগ ও কালের সকল সীমানা পেরিয়ে সমগ্র মানবজাতির মনে ঐতিহ্য-চেতনা অম্লান করে রাখে, তেমনি সকল ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে এক আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মানবজাতির ঐক্য ও অভিন্নতার অনুভূতি জাগ্রত করে দেয়। ভাষা, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষই যে একে অপরের সাথে একটা অভিন্ন ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ এ মনোভাব সৃষ্টিতে হজ্ব যে তুলনাবিহীন একটি অনুষ্ঠান, এ সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

হজ্ব মানবজাতির জন্য একটি বহুমুখী উপকারী ইবাদত এই ইঙ্গিত পবিত্র কুরআনে রয়েছে। এসবের যে কোনো একটি দিক নিয়ে চিন্তাভাবনা বৃহৎ একটি গ্রন্থের পরিসর সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া স্থল ও সমুদ্র পথের সীমাহীন কষ্টসাধ্য সফরে মানুষকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে হজ্বের অবদান স্মরণীয়।

হজ্বের সমাবেশে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক অবস্থান এবং কুশলাদি সম্পর্কিত তথ্য বিনিময়, প্রত্যেক অঞ্চলের সমস্যাদি সম্পর্কে পরামর্শ ও সমাধানের ব্যাপারে একে অন্যের সহযোগিতার পন্থা উদ্ভাবন প্রভৃতিও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
(إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে হজ্বের প্রকৃত শিক্ষা ও তাৎপর্য ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে আপনার মর্জি অনুযায়ী হজ্ব আদায় করার তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল প্রকার বালা-মুসিবত ও বিপদ-আপদ থেকে হেফাযত করুন। আমাদের অভাব দূর করে দিন। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকর্মে বরকত দিন। আমাদেরকে হালাল কামাই করার তাওফীক দিন।
عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله :(إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.



রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

বিদায় হজ্জের ভাষণ

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
বিদায় হজ্জের ভাষণ ১০ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হজ্জ পালনকালে আরাফাতের ময়দানে ইসলাম ধর্মের শেষ রাসুল মুহাম্মাদ (স:) কর্তৃক প্রদত্ত খুৎবা বা ভাষণ। হজ্জ্বের দ্বিতীয় দিনে আরাফাতের মাঠে অবস্থানকালে অনুচ্চ জাবাল-এ-রাহমাত টিলার শীর্ষে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (স:) জীবিতকালে এটা শেষ ভাষণ ছিলো, তাই সচরাচর এটিকে বিদায় খুৎবা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।[১] ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে এই ভাষণে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিলো।
 

পরিচ্ছেদসমূহ
  •     সংরক্ষণ
  •     তাৎপর্য
  •     হাদিস সাহিত্যে ভাষণের বর্ণনা
  •     তথ্যসূত্র
  •     বহিঃসংযোগ

সংরক্ষণ
তাৎপর্যসম্পাদনা

ইসলাম ধর্ম যে ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে পূর্ণতা পেয়েছিলো, তারই চূড়ান্ত ঘোষণা ছিলো মুহাম্মাদ (স:) এর এই ভাষণ। এ কারণে সেদিন ভাষণ প্রদানকালে কুরআনের সূরা মায়িদাহ'র ৩ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিলো[৩] : “আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকারীকে সুসম্পন্ন করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।     ”

এই ভাষণে ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছিলো। মুসলিম জাতির সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে মুহাম্মদ (স:) চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন ছিলো না, বরং মানবসমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশও এতে ছিলো। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম সব বিষয়ই এই ভাষণের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই ভাষণে তাকওয়া বা দায়িত্বনিষ্ঠতার কথা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল্লাহ ও মানবসম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল ইবাদের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছিলো। মুহাম্মদ [স.] এই ভাষণে সমাজ ও রাষ্ট্রে অরাজকতা, বিদ্রোহ এবং কুপরামর্শ প্রদানকারী শয়তানদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলেছেন। এই ভাষণে বিভিন্ন ধরনের সুদপ্রথা রহিত করে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিলো। নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য মুসলমানদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো এই ভাষণে। মানুষে মানুষে আত্মীয়তার বন্ধন, বিশেষ করে রক্তের সম্পর্কের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সামাজিক কুসংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি লাভের ওপর জোর দেয়া হয়েছিলো। মুহাম্মদ [স.]-এর এই ঐতিহাসিক ভাষণে স্বর্গ-মর্তের সকল কিছুর ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিলো এবং মানুষকে এসবকিছুর আমানতদার হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর মালিকানায় সবার অধিকার স্বীকৃত বলে উত্তরাধিকার আইনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো। আমানতের খেয়ানতকারীর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিলো। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়পরায়ণতা, ভ্রাতৃত্ব এবং বদান্যতা ও মানবতার পরম ধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিলো।[৪]
হাদিস সাহিত্যে ভাষণের বর্ণনাসম্পাদনা


সহিহ মুসলিম[৫], তিরমিজি[৬], সুনান আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ[৭], সুনান ইবনে মাজাহ[৮] গ্রন্থে উল্লেখিত যাবির ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত বিদায় হজ্বের ভাষণের নিম্নোক্ত দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়াও ইবনে ইসহাক ও আল জাহিজও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে একই বর্ণনা প্রদান করেছেন।
উপস্থিত জনমণ্ডলী! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। হয়তো আমি আর কখনো এখানে তোমাদের সঙ্গে একত্রিত হতে পারব না।
 
হে জনমণ্ডলী! আজকের এই দিন (জুমার দিন), এই মাস (জিলহজ মাস) ও এই শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র; তোমাদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু, মান-সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত এমনই পবিত্র। কারো কাছে যদি কোনো আমানত রক্ষিত থাকে, তাহলে সে যেন তা আমানতকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। আজ থেকে সব ধরনের সুদ রহিত করা হলো। তোমাদের কেবল মূলধনের ওপর অধিকার রইল। তোমরা অন্যের ওপর অত্যাচার করবে না, নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না। সর্বপ্রথম আমি হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করছি। অন্ধকার যুগের সব কৌলীন্য বিলুপ্ত করা হলো। শুধু কাবাঘরের তত্ত্বাবধান ও হাজিদের পানি পান করানো ছাড়া। আজকের পর তোমাদের ভূখণ্ডে শয়তানের উপাসনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু ব্যাপার, যেগুলোকে তোমরা বড় পাপ মনেই করো না। তার অনুসরণ করলে শয়তান খুশি হবে। জনমণ্ডলী! তোমাদের নিজ স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তদ্রূপ তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার রয়েছে। স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে, তারা যেন নিজ স্বামী ছাড়া পরপুরুষের সঙ্গে ভোগে লিপ্ত না হয়। যদি তারা তা করে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের তাদের প্রতি কঠোরতা করার অনুমতি দিয়েছেন। এমতাবস্থায় তোমরা তাদের শয্যা পৃথক করে দেবে। এবং মৃদু প্রহার করবে। তাতে তারা বিরত হলে নিয়মমাফিক তাদের ভরণপোষণের প্রতি লক্ষ রাখবে। স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তারা তোমাদের সাহায্যকারিণী। তোমরা তাদের আল্লাহর নির্ধারিত কালিমা বাক্যের (ইজাব-কবুল) মাধ্যমে নিজেদের জন্য হালাল করেছো। সুতরাং তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। জনমণ্ডলী! সব মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। কারো জন্য অন্যের সম্পদ বৈধ নয়। তবে যদি কেউ স্বেচ্ছায় কাউকে কিছু দেয়, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার। আমার পর তোমরা কুফরিতে ফিরে যেও না। পরস্পর খুনাখুনি করো না। আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে কখনো বিভ্রান্ত হবে না। তা হচ্ছে_আল্লাহর কিতাব (পবিত্র কোরআন) ও তাঁর রাসুলের হাদিস। জনমণ্ডলী! তোমাদের প্রভু একজন। তোমাদের পিতাও একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। তোমাদের মাঝে যারা সর্বাধিক মুত্তাকি, খোদাভীরু তারাই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। তাকওয়া ছাড়া কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জনমণ্ডলী : আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর জন্য কোনো ওসিয়ত প্রযোজ্য নয়। অন্যদের জন্য এক-তৃতীয়াংশের অধিক ওসিয়ত করা বৈধ নয়। আমাদের কিয়ামত দিবসে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমাদেরও জিজ্ঞাসা করা হবে। তখন তোমরা আমার ব্যাপারে কী বলবে? আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌছে দিয়েছি? উপস্থিত সাহাবায়েকেরাম উত্তর দিলেন, আমরা সাক্ষ্য দেব যে আপনি আপনার দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছেন। হিত কামনা করেছেন। অতঃপর রাসুল (সা.) আকাশের দিকে হাত তুলে তিনবার বললেন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন। তারপর বললেন, তোমরা এখানে যারা উপস্থিত আছো তারা অনুপস্থিতদের কাছে (কথাগুলো) পৌঁছে দেবে।

সহিহ মুসলিমের বর্ণনাটি নিম্নরূপঃ[৫]
 “হে মানব মন্ডলী!
তোমরা হৃদয়ের কর্ণে ও মনোযোগ সহকারে আমার বক্তব্য শ্রবণ কর। আমি জানিনা, আগামী বছর এ সময়ে, এ- স্থানে, এ-নগরীতে সম্ভবত তোমাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ আর হবে কি না। “হে মানব সকল! সাবধান! সকল প্রকার জাহেলিয়াতকে আমার দুপায়ের নিচে পিষ্ঠ করে যাচ্ছি। নিরাপরাধ মানুষের রক্তপাত চিরতরে হারাম ঘোষিত হল। প্রথমে আমি আমার বংশের পক্ষ থেকে রবিয়া বিন হারেস বিন আবদুল মোত্তালিবের রক্তের দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। সে বনি লাইস গোত্রে দুধ পান করেছে, হুযাইল তাকে হত্যা করেছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ’সুদ’ কে চির দিনের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। আমি আজ আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালিবের যাবতীয় সুদের দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। হে লোক সকল! বল আজ কোন দিন? সকলে বলল “আজ মহান আরাফার দিন, আজ হজ্বের বড় দিন” সাবধান! তোমাদের একের জন্য অপরের রক্ত তার মাল সম্পদ, তার ইজ্জত-সম্মান আজকের দিনের মত, এই হারাম মাসের মত, এ সম্মানিত নগরীর মত পবিত্র আমানত। সাবধান! মানুষের আমানত প্রকৃত মালিকের নিকট পৌঁছে দেবে। হে মানব সকল! নিশ্চয়ই তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ একজন, তোমাদের সকলের পিতা হযরত আদম (আঃ)। আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার উপর কালোর আর কালোর উপর সাদার কোন মর্যাদা নেই। ‘তাকওয়াই’ শুধু পার্থক্য নির্ণয় করবে। হে লোক সকল! পুরুষদেরকে নারী জাতীর উপর নেতৃত্বের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তবে নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় কর। নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে তেমনি পুরুষদের উপর রয়েছে নারীদের অধিকার। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামিনে গ্রহণ করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে নারীরা স্বামীর গৃহে ও তার সতীত্বের মধ্যে অন্য কাউকেও শরিক করবেনা, যদি কোন নারী এ ব্যপারে সীমা লংঘন করে, তবে স্বামীদেরকে এ ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে যে, তারা স্ত্রীদের থেকে বিছানা আলাদা করবে ও দৈহিক শাস্তি দেবে, তবে তাদের চেহারায় আঘাত করবে না। আর নারীগণ স্বামী থেকে উত্তম ভরণ পোষণের অধিকার লাভ করবে, তোমরা তাদেরকে উপদেশ দেবে ও তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে। হে উপস্থিতি! মুমিনেরা পরষ্পর ভাই আর তারা সকলে মিলে এক অখন্ড মুসলিম ভ্রাতৃ সমাজ। এক ভাইয়ের ধন-সম্পদ তার অনুমতি ব্যতিরেকে ভক্ষণ করবে না। তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করবেনা। হে মানুষেরা! শয়তান আজ নিরাশ হয়ে পড়েছে। বড় বড় বিষয়ে সে তোমাদের পথ ভ্রষ্ট করতে সমর্থ হবে না, তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তোমরা সর্তক থাকবে ও তার অনুসারী হবেনা। তোমরা আল্লাহর বন্দেগী করবে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, রমজান মাসের সিয়াম পালন করবে, যাকাত আদায় করবে ও তোমাদের নেতার আদেশ মেনে চলবে, তবেই তোমরা জান্নাত লাভ করবে। সাবধান! তোমাদের গোলাম ও অধীনস্তদের বিষয়ে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে। তোমরা যা পরবে তাদেরকেও সেভাবে পরতে দেবে। হে লোক সকল! আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহ তা’আলার পয়গাম পৌছে দিয়েছি? লোকেরা বলল, “হ্যা” তিনি বললেন “আমার বিষয়ে তোমাদের জিঞ্জাসা করা হবে, সে দিন তোমরা কি সাক্ষ্য দিবে, সকলে এক বাক্যে বললেন, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আমাদের নিকট রিসালাতের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন, উম্মতকে সকল বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন, সমস্ত গোমরাহির আবরণ ছিন্ন করে দিয়েছেন এবং অহীর আমানত পরিপূর্ণ ভাবে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন” অত:পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজ শাহাদাত আঙ্গুলি আকাশে তুলে তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ তা’আলা আপনি সাক্ষী থাকুন, আপনি স্বাক্ষী থাকুন, আপনি সাক্ষী থাকুন”। হে মানুষেরা! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সম্পদের মিরাস নির্দিষ্টভাবে বন্টন করে দিয়েছেন। তার থেকে কম বেশি করবেনা। সাবধান! সম্পদের তিন ভাগের এক অংশের চেয়ে অতিরিক্ত কোন অসিয়ত বৈধ নয়। সন্তান যার বিছনায় জন্ম গ্রহণ করবে, সে তারই হবে। ব্যভিচারের শাস্তি হচ্ছে প্রস্তরাঘাত। (অর্থাৎ সন্তানের জন্য শর্ত হলো তা বিবাহিত দম্পতির হতে হবে। ব্যভিচারীর সন্তানের অধিকার নেই)। যে সন্তান আপন পিতা ব্যতীত অন্যকে পিতা এবং যে দাস নিজের মালিক ব্যতীত অন্য কাউকে মালিক বলে স্বীকার করে, তাদের উপর আল্লাহ তা’আলা, ফেরেশতাকুল এবং সমগ্র মানব জাতির অভিশাপ এবং তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল হবে না। হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা দুনিয়ার মানুষের বোঝা নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন কিয়ামতে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ না কর। কেননা আমি আল্লাহর আযাবের মোকাবিলায় তোমাদের কোন উপকার করতে পারবো না। তোমাদের দেখেই লোকেরা আমল করে থাকবে। মনে রেখ! সকলকে একদিন আল্লাহ তা’আলার নিকট হাজির হতে হবে। সে দিন তিনি প্রতিটি কর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন। তোমরা আমার পরে গোমরাহিতে লিপ্ত হবে না, পরস্পর হানাহানিতে মেতে উঠবনা। আমি আখেরী নবী, আমার পরে আর কোন নবী আসবেনা। আমার সাথে অহীর পরিসমাপ্তি হতে যাচ্ছে। হে মানুষেরা! আমি নিঃসন্দেহে একজন মানুষ। আমাকেও আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হবে। আমি তোমাদের জন্য দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি যতদিন তোমরা এই দুটি বস্তু আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব ও অপরটি রাসূলের (সঃ) সুন্নাহ। হে মানব মন্ডলী! তোমরা আমির বা নেতার আনুগত্য করো এবং তার কথা শ্রবণ করো যদিও তিনি হন হাবশী ক্রীতদাস। যতদিন পর্যন্ত তিনি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করেন, ততদিন অবশ্যই তাঁর কথা শুনবে, তাঁর নির্দেশ মানবে ও তাঁর প্রতি আনুগত্য করবে। আর যখন তিনি আল্লাহর কিতাবের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করবে, তখন থেকে তাঁর কথাও শুনবেনা এবং তাঁর আনুগত্যও করা যাবেনা। সাবধান! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। জেনে রেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীগণ এই বাড়াবড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। (এ নির্দেশনাটি হচ্ছে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে অর্থাৎ কোন বিধর্মীকে বাড়াবাড়ি বা জোরজবস্তি করে ইসলামে দীক্ষা দেয়া যাবে না। তবে একজন মুসলমানকে অবশ্যই পরিপূর্ণ ইসলামী জীন্দেগী অবলম্বন করে জীবন যাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সুবিধাবাদের কোন সুযোগ নেই)। আবার বললেন, আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌছে দিয়েছি? সকলে বললেন, “নিশ্চয়ই”। হে উপস্থিতগণ! অনুপস্থিতদের নিকট আমার এ পয়গাম পৌছে দেবে। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ এ নসিহতের উপর তোমাদের চেয়ে বেশী গুরুত্বের সাথে আমল করবে। “তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক” বিদায়।


তথ্যসূত্রসম্পাদনা
Last Sermon of our Beloved Prophet (saw)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
The Last Sermon of the Prophet Khutbatul Wada
The Farewell Sermon[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
The Farewell Address of the Holy Prophet Muhammad PBUH
Sahih Muslim. Kitab al-Hajj. Hadith 159. Sunnah.com
Al-Tirmidhi Hadith, Number 104
Musnad Ahmad।
"সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ২০১৪-০১-১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-১৪।
বহিঃসংযোগ


শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯

হজ্জের ফযীলত :

শনিবার, নভেম্বর ০২, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

হজ্জ ইসলামের পাঁচটি রুকনের অন্যতম। এটি শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। আল্লাহ সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর জীবনে একবার হজ্জ ফরয করেছেন। পাশাপাশি হজ্জের মত ফযীলতপূর্ণ এমন কতিপয় আমল ও ইবাদত ইসলামী শরী‘আতে বিধিবদ্ধ করেছেন, যেন অসমর্থ ব্যক্তিরাও সেই আমল সম্পাদনের মাধ্যমে হজ্জের সমান নেকী লাভে ধন্য হ’তে পারে। এখানে ইসলামের মহানুভবতা ফুটে ওঠে। এ নিবন্ধে হজ্জের সমান নেকী পাওয়া যায়, এমন কিছু আমল সম্পর্কে আলোচনা করা হ’ল।-
হজ্জের ফযীলত :
হজ্জ এমন একটি ইবাদত, যার মাধ্যমে হজ্জ সম্পাদনকারী নিষ্পাপ হয়ে যায়। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, مَنْ حَجَّ للهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ، متفق عليه- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ করেছে। যার মধ্যে সে অশ্লীল কথা বলেনি বা অশ্লীল কার্য করেনি, সে হজ্জ হ’তে ফিরবে সেদিনের ন্যায় (নিষ্পাপ অবস্থায়) যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিল’।[1]
অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, أَنَّ الْحَجَّ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ، ‘নিশ্চয়ই হজ্জ পূর্বের সকল গুনাহকে ধ্বংস করে দেয়’।[2] শুধু তাই নয়, হজ্জ সম্পাদনকারীর একমাত্র প্রতিদান হবে জান্নাত। নবী করীম (ছাঃ) এরশাদ করেছেন,اَلْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِّمَا بَيْنَهُمَا وَالْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ، متفق عليه- ‘এক ওমরাহ অপর ওমরাহ পর্যন্ত সময়ের (ছগীরা গোনাহ সমূহের) কাফফারা স্বরূপ। আর কবুল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ব্যতীত কিছুই নয়’।[3]
কবুল হজ্জের মাধ্যমে মুমিন বান্দা সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে যায় এবং আখেরাতে আল্লাহ তাকে জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত করবেন। এক্ষণে আমরা হজ্জের মত ফযীলতপূর্ণ কয়েকটি আমল সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।
১. হজ্জের খালেছ নিয়ত করা :
কোন মুসলিম ব্যক্তি হজ্জের খালেছ নিয়ত করলে এবং সে কোন কারণে হজ্জে গমন করতে না পারলে আল্লাহ তার জন্য হজ্জের নেকী লিখে দিবেন। রাসূল (ছাঃ) বলেন,قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا هَمَّ عَبْدِى بِحَسَنَةٍ وَلَمْ يَعْمَلْهَا كَتَبْتُهَا لَهُ حَسَنَةً فَإِنْ عَمِلَهَا كَتَبْتُهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, আমার বান্দা যখন ভাল কাজের নিয়ত করে, কিন্তু তা সম্পাদন করে না, আমি তার জন্য একটি পূর্ণ নেকী লিখি। আর যদি ভাল কাজের নিয়ত করার পর তা বাস্তবায়ন করে, তাহ’লে আমি তার জন্য দশ গুণ হ’তে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত নেকী লিখি’।[4] অন্য বর্ণনায় এসেছে, জাবির (রাঃ) বলেন, আমরা তাবূক যুদ্ধে নবী করীম (ছাঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন তিনি বললেন,إِنَّ بِالْمَدِيْنَةِ لَرِجَالاً مَا سِرْتُمْ مَسِيْرًا وَلاَ قَطَعْتُمْ وَادِيًا إِلاَّ كَانُوْا مَعَكُمْ حَبَسَهُمُ الْمَرَضُ. ‘মদীনায় এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা তোমাদের প্রতিটি পথ চলার এবং প্রান্তর অতিক্রমকালে তোমাদেরই সঙ্গেই ছিল (ছওয়াব লাভের ক্ষেত্রে)। রোগ-ব্যাধি তাদেরকে আটকে রেখেছিল’।[5] অন্যত্র তিনি বলেন, حَبَسَهم العُذْرُ ‘ওযর তাদেরকে আবদ্ধ রেখেছিল’।[6] তিনি অন্যত্র বলেন,إلاَّ شَرَكُوْكُمْ فِي الْأجْرِ، ‘তবে ছওয়াব লাভের ক্ষেত্রে তারা তোমাদেরই সঙ্গেই রয়েছে’।[7]
২. ছালাতের পরে তাসবীহ-তাহলীল করা :
দিনে-রাতে ছালাতের পরে নির্দিষ্ট হারে তাসবীহ-তাহলীল পাঠ করলে হজ্জের সমান নেকী লাভ করা যায়। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضى الله عنه قَالَ جَاءَ الْفُقَرَاءُ إِلَى النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالُوا ذَهَبَ أَهْلُ الدُّثُورِ مِنَ الْأَمْوَالِ بِالدَّرَجَاتِ الْعُلاَ وَالنَّعِيمِ الْمُقِيمِ، يُصَلُّوْنَ كَمَا نُصَلِّى، وَيَصُوْمُوْنَ كَمَا نَصُومُ، وَلَهُمْ فَضْلٌ مِنْ أَمْوَالٍ يَحُجُّونَ بِهَا، وَيَعْتَمِرُوْنَ، وَيُجَاهِدُوْنَ، وَيَتَصَدَّقُونَ قَالَ أَلاَ أُحَدِّثُكُمْ بِأَمْرٍ إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ أَدْرَكْتُمْ مَنْ سَبَقَكُمْ وَلَمْ يُدْرِكْكُمْ أَحَدٌ بَعْدَكُمْ، وَكُنْتُمْ خَيْرَ مَنْ أَنْتُمْ بَيْنَ ظَهْرَانَيْهِ، إِلاَّ مَنْ عَمِلَ مِثْلَهُ تُسَبِّحُونَ وَتَحْمَدُوْنَ، وَتُكَبِّرُوْنَ خَلْفَ كُلِّ صَلاَةٍ ثَلاَثًا وَثَلاَثِيْنَ. فَاخْتَلَفْنَا بَيْنَنَا فَقَالَ بَعْضُنَا نُسَبِّحُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَنَحْمَدُ ثَلاَثًا وَثَلاَثِينَ، وَنُكَبِّرُ أَرْبَعًا وَثَلاَثِيْنَ. فَرَجَعْتُ إِلَيْهِ فَقَالَ تَقُولُ سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَاللهُ أَكْبَرُ، حَتَّى يَكُونَ مِنْهُنَّ كُلِّهِنَّ ثَلاَثًا وَثَلاَثِيْنَ.
আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, দরিদ্রলোকেরা নবী করীম (ছাঃ)-এর নিকট এসে বললেন, সম্পদশালী ও ধনী ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের দ্বারা উচ্চমর্যাদা ও স্থায়ী আবাস লাভ করছেন। তাঁরা আমাদের মত ছালাত আদায় করছেন, আমাদের মত ছিয়াম পালন করছেন এবং অর্থের দ্বারা হজ্জ, ওমরাহ, জিহাদ ও ছাদাক্বাহ করার মর্যাদাও লাভ করছেন। একথা শুনে তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু কাজের কথা বলব, যা তোমরা করলে, যারা নেক কাজে তোমাদের চেয়ে অগ্রগামী হয়ে গেছে, তাদের পর্যায়ে পৌঁছতে পারবে। তোমাদের পরে কেউ তোমাদের নাগাল পাবে না। আর তোমাদের সামনে যারা আছে তাদের মধ্যে তোমরা সর্বোত্তম। তবে যারা পুনরায় এ ধরনের কাজ করবে তাদের কথা স্বতন্ত্র। তোমরা প্রত্যেক ছালাতের পর তেত্রিশ বার করে তাসবীহ্ (সুবহানাল্লাহ্), তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ্) এবং তাকবীর (আল্লাহু আকবার) পাঠ করবে। (এ নিয়ে) আমাদের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হ’ল। কেউ বলল, আমরা তেত্রিশ বার তাসবীহ্ পড়ব। তেত্রিশ বার তাহমীদ আর চৌত্রিশ বার তাকবীর পড়ব। অতঃপর আমি তাঁর নিকট ফিরে গেলাম। তিনি বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার’ বলবে, যাতে সবগুলোই তেত্রিশবার করে হয়ে যায়।[8]
৩. রামাযান মাসে ওমরাহ করা :
রামাযান বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসে সকল আমলের নেকী বান্দা দ্বিগুণ হারে লাভ করে। অনুরূপভাবে এই মাসে ওমরাহ সম্পাদনের মাধ্যমে হজ্জ করার সমপরিমাণ ছওয়াব অর্জন করা যায়।
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হজ্জ থেকে ফিরে এসে উম্মে সিনান নামক এক আনছার মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেন আমার সাথে হজ্জ পালন করলে না? তখন মহিলাটি বলল, ‘আমার স্বামীর দু’টি সেচের উট ছিল। একটি নিয়ে তিনি হজ্জে গেছেন। আরেকটি জমি সেচের কাজে নিয়োজিত আছে (সেই জন্য আমি হজ্জ করতে পারিনি)। তখন রাসূল (ছাঃ) বললেন, فَإِنَّ عُمْرَةً فِيْ رَمَضَانَ تَقْضِيْ حَجَّةً أَوْ حَجَّةً مَعِيْ ‘রামাযান মাসে ওমরাহ করা হজ্জ করার ন্যায় অথবা আমার সাথে হজ্জ করার ন্যায়’।[9] অন্যত্র তিনি বলেছেন, إِنَّ عُمْرَةً فِىْ رَمَضَانَ تَعْدِلُ حَجَّةً، ‘নিশ্চয়ই রামাযান মাসের ওমরাহ একটি হজ্জের সমান।[10]
তবে এই ওমরাহ পালনে হজ্জের ফরযিয়্যাত আদায় হবে না; বরং হজ্জের সমপরিমাণ নেকী পাওয়া যাবে।
৪. নিজ অর্থ ব্যয়ে অপরকে হজ্জ করানো :
কোন ব্যক্তিকে হজ্জ করালে হজ্জের সমপরিমাণ নেকী লাভ করা যায়। এমনকি যদি কেউ তার মৃত পিতা-মাতার পক্ষ থেকেও হজ্জ সম্পাদন করেন, আল্লাহ হজ্জের নেকী সেই মৃতের কবরে পৌঁছিয়ে দেন।[11] সালাফে ছালেহীন নিজেরা হজ্জ পালন করার পাশাপাশি অপরকেও হজ্জ করার ব্যাপারে সহযোগিতা করতেন। কেননা রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ، ‘যে ব্যক্তি অন্য কোন মানুষকে কোন সৎ কাজের পথ দেখায় (উৎসাহিত করে), সে ঐ নেক কাজ সম্পাদনকারীর সমান ছওয়াব পাবে’।[12] সেকারণ তাদের অনেকেই রাসূল (ছাঃ)-এর নিম্নোক্ত আহবানে সাড়া দিয়ে বেশী বেশী হজ্জ ও ওরমাহ পালনের ব্যাপারে অতি আগ্রহী ছিলেন। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
تَابِعُوْا بَيْنَ الحَجِّ وَالعُمْرَةِ، فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الفَقْرَ وَالذُّنُوْبَ كَمَا يَنْفِي الكِيْرُ خَبَثَ الحَدِيْدِ، وَالذَّهَبِ، وَالفِضَّةِ، وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ المَبْرُوْرَةِ ثَوَابٌ إِلَّا الجَنَّةُ،
‘তোমরা হজ্জ ও ওমরাহ কাছাকাছি সময়ে আদায় করো (হজ্জ ও ওমরাহ একসাথে আদায় করো অথবা একটির পর আরেকটি আদায় করো)। কেননা হজ্জ ও ওমরাহ এমন ইবাদত, যা দরিদ্রতাকে দূর করে দেয় এবং পাপসসমূহ মুছে দেয়, যেমনভাবে কামারের হাঁপর লোহার মরিচা ও স্বর্ণ- রৌপ্যের যাবতীয় ময়লা দূরীভূত করে দেয়। আর কবুল হজ্জের প্রতিদান কেবলমাত্র জান্নাত’।[13]
এই হাদীছ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে প্রখ্যাত ফক্বীহ মুসলিম বিন ইয়াসার (রহঃ) প্রত্যেক বছরই তার নিকটতম ব্যক্তিদের নিয়ে হজ্জ করতেন।[14] প্রখ্যাত তাবেঈ আব্দুল্লাহ বিন মুবারাক (রহঃ) ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনিও তাঁর আত্মীয়-প্রতিবেশীদেরকে হজ্জ করাতেন।[15]
৫. ইশরাক্বের ছালাত আদায় করা :
‘শুরূক’ শব্দের অর্থ সূর্য উদিত হওয়া। সূর্যোদয়ের পরপরেই দিনের প্রথম প্রহরের শুরুতে যে ছালাত আদায় করা হয়, তাকে ইশরাক্বের ছালাত (صلاة الإشراق) বলে। আনাস বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ صَلَّى الْغَدَاةَ فِيْ جَمَاعَةٍ ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ تَامَّةٍ. ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায়ের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে আল্লাহর যিকিরে মশগূল থাকল, অতঃপর (সূর্যোদয়ের পর) দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করল, তার জন্য একটি পূর্ণ হজ্জ ও একটি পূর্ণ ওমরার নেকী রয়েছে’।[16]
যদিও এই ছালাত প্রতিদিন আদায় করা আবশ্যক নয়। কিন্তু খুব কম সংখ্যক মানুষই এই সুন্নাতটির প্রতি আমল করে। ব্যস্ততা থাকলেও অন্তত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এই সুন্নাতের উপর আমল করে হজ্জ ও ওমরার নেকী একসাথে লাভ করা যায়। তাছাড়া কূবা মসজিদে নফল ছালাত আদায়ের মাধ্যমেও ওমরার নেকী লাভ করা যায়। সাহল বিন হুনাইফ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ تَطَهَّرَ فِيْ بَيْتِهِ ثُمَّ أَتَى مَسْجِدَ قُبَاءَ، فَصَلَّى فِيْهِ صَلَاةً، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ عُمْرَةٍ، ‘যে ব্যক্তি বাড়ীতে ওযূ করে পবিত্র হয়ে মসজিদে কূবায় এসে ছালাত আদায় করবে, তার জন্য রয়েছে ওমরার সমপরিমাণ ছওয়াব’।[17]
৬. মসজিদে তা‘লীমী বৈঠক বা দরসে অংশগ্রহণ করা :
যে সকল মসজিদে তা‘লীমী বৈঠক, দ্বীনী আলোচনা বা দরস অনুষ্ঠিত হয়, এতে হাযির হ’লে পরিপূর্ণ হজ্জের ছওয়াব লাভ করা যায়। ছাহাবী আবু উমামা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, مَنْ غَدَا إِلَى الْمَسْجِدِ لَا يُرِيْدُ إِلَّا أَنْ يَتَعَلَّمَ خَيْرًا أَوْ يَعْلَمَهُ، كَانَ لَهُ كَأَجْرِ حَاجٍّ تَامًّا حِجَّتُهُ. ‘যে ব্যক্তি দ্বীনী জ্ঞান অর্জন অথবা ঐ জ্ঞান বিতরণের জন্যই শুধু মসজিদে গমন করে, তার জন্য পরিপূর্ণ হজ্জের নেকী রয়েছে’।[18]
আমরা অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে মসজিদের এই সকল দ্বীনী বৈঠকে উপস্থিত থাকতে চাই না। আবার অনেক সময় মনে করি ফেইসবুক লাইভে অথবা ইউটিউবে পরবর্তীতে আলোচনাটা শুনে নেব। এতে আমরা বিশাল ছওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়ে যাই, যা ঐ বৈঠকে হাযির হওয়া ব্যতীত লাভ করা সম্ভব নয়। কারণ ফেরেশতামন্ডলী এই মজলিসগুলো ঘিরে রাখেন এবং সেখানে আল্লাহর রহমত নাযিল হয়।[19] আর উপস্থিত হওয়ার প্রতিদান হিসাবে হজ্জের নেকী তো আছেই।
৭. ফরয ছালাত মসজিদে আদায় করা :
পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায় করা যেমন ফরয, তেমনি এই ফরয ছালাত মসজিদে জামা‘আতের সাথে আদায় করাও অপরিহার্য। কারণ কোন শারঈ ওযর ছাড়া মসজিদে জামা‘আতে হাযির না হয়ে বাড়ীতে, দোকানে বা অফিসে একাকী ছালাত আদায় করা সিদ্ধ নয়।[20] আর যারা বাড়ী থেকে পবিত্র হয়ে মসজিদে এসে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায়  করে তার মর্যাদা হজ্জ সম্পাদনকারীর মত। উমামা বাহেলী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ مُتَطَهِّرًا إِلَى صَلَاةٍ مَكْتُوْبَةٍ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْحَاجِّ الْمُحْرِمِ، وَمَنْ خَرَجَ إِلَى تَسْبِيْحِ الضُّحَى لَا يَنْصِبُهُ إِلَّا إِيَّاهُ فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْمُعْتَمِرِ، وَصَلَاةٌ عَلَى أَثَرِ صَلَاةٍ لَا لَغْوَ بَيْنَهُمَا كِتَابٌ فِي عِلِّيِّيْنَ.
‘যে ব্যক্তি বাড়ী থেকে পরিত্র হয়ে ফরয ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে গমন করবে, তার প্রতিদান ইহরাম পরিহিত একজন হজ্জ পালনকারীর ন্যায়। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র চাশতের ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যেই মসজিদে গমন করে, তার প্রতিদান একজন ওমরাহ পালনকারীর ন্যায়। আর এক ছালাতের পর অপর ছালাতের মধ্যবর্তী সময়ে কোন অহেতুক কথা-কর্ম ত্যাগ করলে, তার আমলনামা ইল্লিয়ীনে রাখা হয়’।[21] অন্যত্র রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ مَشَى إلَى صَلاةٍ مَكْتُوبَةٍ فِي الْجَمَاعَةِ فَهِيَ كَحَجَّةٍ، وَمَنْ مَشَى إلَى صَلاةِ تَطَوُّعٍ فَهِيَ كَعُمْرَةٍ نَافِلَةٍ، ‘যে ব্যক্তি ফরয ছালাত জামা‘আতে আদায়ের জন্য (মসজিদে) গমন করে, সে হজ্জের সমান নেকী লাভ করে। আর যে ব্যক্তি নফল ছালাত আদায়ের জন্য (মসজিদে) গমন করে, সে নফল ওমরার সমান নেকী লাভ করে’।[22]
অতএব যে ব্যক্তি তার বাড়ীতে ওযূ করে পবিত্র হয়ে ফরয ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে দৈনিক পাঁচ বার মসজিদে যায়, আল্লাহ তার আমলনামায় প্রতিদিন পাঁচটি হজ্জের ছওয়াব লিখে দেন। উপরন্তু প্রতি কদমে তার পাপ ঝরে যায়, মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়, ফেরেশতারা তার জন্য দো‘আ করে এবং একাকী ছালাত আদায় করার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশী নেকী লাভ করে।[23] এর কারণ হ’ল বায়তুল্লাহর যিয়ারতকারী যেমন আল্লাহর মেহমান, অনুরূপভাবে মসজিদে আগমনকারী ব্যক্তিও আল্লাহর মেহমান। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,مَنْ تَوَضَّأَ فِيْ بَيْتِهِ فَأَحْسَنَ الْوَضُوْءَ، ثُمَّ أَتَى الْمَسْجِدَ؛ فَهُوَ زَائِرُ اللهِ، وَحَقٌّ عَلىَ الَمَزُوْرِ أنْ يُّكْرَمَ الزَّائِرَ. ‘যে ব্যক্তি বাড়ীতে সুন্দর করে ওযূ করে মসজিদে আগমন করে, সে ব্যক্তি আল্লাহর মেহমান। আর মেহমানকে সম্মানিত করা মেযবানের কর্তব্য হয়ে যায়’।[24]
সম্মানিত পাঠক! একটু ভেবে দেখুন হজ্জ বা ওমরা পালন করতে হ’লে কত শ্রম, টাকা-পয়সা ও সময় খরচের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ উপরোক্ত আমলগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে আমরা ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই হজ্জ বা ওমরাহর নেকী অর্জন করতে পারি। শুধু প্রয়োজন ইবাদতের ব্যাপারে একনিষ্ঠতা ও সচেতনতা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!
– আব্দুল্লাহ আল-মা‘রূফ

  • [1]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫০৭।
  • [2]. মুসলিম হা/১২১; মিশকাত হা/২৮।
  • [3]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/২৫০৮।
  • [4]. মুসলিম হা/১২৮।
  • [5]. মুসলিম হা/১৯১১।
  • [6]. বুখারী হা/২৮৩৯, ৪৪২৩; মিশকাত হা/৩৮১৫।
  • [7]. মুসলিম হা/১৯১১; ইবনু মাজাহ হা/২৭৬৫।
  • [8]. বুখারী হা/৮৪৩, ৬৩২৯; মুসলিম হা/৫৯৫।
  • [9]. বুখারী হা/১৮৬৩; ‘হজ্জ’ অধ্যায়, ‘মহিলাদের হজ্জ’ অনুচ্ছেদ।
  • [10]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, মিশকাত হা/২৫০৯।
  • [11]. আবূদাঊদ হা/২৮৮৩, সনদ হাসান।
  • [12]. মুসলিম হা/১৮৯৩।
  • [13]. তিরমিযী হা/৮১০; নাসাঈ হা/২৬৩১; মিশকাত হা/২৫২৪; সনদ ছহীহ।
  • [14]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৪/৫১২।
  • [15]. ঐ, ৭/৩৬৮-৬৯।
  • [16]. তিরমিযী হা/৫৮৬; মিশকাত হা/৯৭১, সনদ হাসান।
  • [17]. ইবনু মাজাহ হা/১৪১২, সনদ ছহীহ।
  • [18]. তাবারাণী, মু‘জামুল কাবীর হা/৭৪৭৩; ছহীহ আত-তারগীব হা/৮৬।
  • [19]. মুসলিম হা/২৭০০; তিরমিযী হা/৩৩৭৮; ইবনে মাজাহ হা/২২৫; মিশকাত হা/২২৬১।
  • [20]. ইবনু মাজাহ হা/৭৯৩, সনদ ছহীহ।
  • [21]. আবূদাঊদ হা/৫৫৮; মিশকাত/৭২৮, সনদ হাসান।
  • [22]. ছহীহুল জামে‘ হা/৬৫৫৬।
  • [23]. বুখারী হা/৬৪৫,৬৫৯; আবূদাঊদ হা/৫৬৩।
  • [24]. ছহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব হা/৩২২।


ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png