শিরোনাম
Loading latest headlines...
কালেমা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কালেমা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫

পাঁচ কালেমা

শুক্রবার, এপ্রিল ০৪, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



(১) কালেমা তাইয়্যেবা

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ مُحَمَّدُ رَّسُوْ لُ الله

উচ্চারণঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ।

অর্থঃ আল্লাহ ভিন্ন ইবাদত বন্দেগীর উপযুক্ত আর কেহই নাই । হযরত মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাঁহার প্রেরিত রসূল ।

(২) কালেমা শাহাদত

اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَه’ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه’ وَرَسُوْلُه’

উচ্চারণঃ আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাছুলুহু ।

অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে , অল্লাহ ভিন্ন আর কেহই ইবাদতের উপযুক্ত নাই তিনি এক তাঁহার কোন অংশীদার নাই ।আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং তাঁহার প্রেরিত নবী ।

(৩) কালেমা তাওহীদ

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ وَاحِدَ لاَّثَانِىَ لَكَ مُحَمَّدُرَّ سُوْلُ اللهِ اِمَامُ الْمُتَّقِيْنَ رَسُوْ لُرَبِّ الْعَلَمِيْنَ

উচ্চারণ ঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহেদাল্লা ছানীয়ালাকা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা ইমামুল মোত্তাকীনা রাছুলুরাবি্বল আলামীন ।

অর্থঃ আল্লাহ ভিন্ন কেহ এবাদতের যোগ্য নাই । তিনি এক তাঁহার অংশীদার নাই মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সোত্তাকীনদের (ধর্মভীরুগণের) ইমাম এবং বিশ্বপালকের প্রেরিত ।

(৪) কালেমা তামজীদ

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ نُوْرَ يَّهْدِىَ اللهُ لِنُوْرِهِ مَنْ يَّشَاءُ مُحَمَّدُ رَّسَوْ لُ اللهِ اِمَامُ الْمُرْسَلِيْنَ خَا تَمُ النَّبِيِّنَ

উচ্চারণঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা নুরাইইয়াহ দিয়াল্লাহু লিনুরিহী মাইয়্যাশাউ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহি ইমামূল মুরছালীনা খাতামুন-নাবিয়্যীন ।

অর্থঃ হে খোদা! তুমি ব্যতীত কেহই উপাস্য নাই, তুমি জ্যোতিময় । তুমি যাহাকে ইচ্ছা আপন জ্যোতিঃ প্রদর্শন কর । মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত পয়গম্বরগণের ইমাম এবং শেষ নবী।

(৫) কালেমা রদ্দেকুফর

اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنْ اَنْ اُشْرِكَ بِكَ شَيْئً وَاَنَا اعَلَمُ بِهِ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِمَا اعَلَمُ بِهِ وَمَا لاَاعَلَمُ بِهِ تُبْتُ عَنْهُ وَتَبَرَّأتُ مِنَ الْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالْمَعَاصِىْ كُلِّهَا وَاَسْلَمْتُ وَاَمَنْتُ وَاَقُوْلُ اَنْ لاَّاِلَهَ اِلاَّاللهُ مُحَمَّدُ رَّسَوْلُ اللهِ –

উচ্চারণ ঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইআও ওয়া আনা আলামু বিহি ওয়া আসতাগ ফিরুকা লিমা আলামু বিহি ওয়ামা লা আলামু বিহি তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্শির্কি ওয়াল মা আছি কুল্লিহা ওয়া আসলামতু ওয়া আমানতু ওয়া আক্বলু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদু রাসূলুল্লাহ ।

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশা করছি, যেন কাহাকেও তোমান সহিত অংশীদার না করি । আমার জানা-অজানা গুনাহ হতে ক্ষমা চহিতেছি এবং ইহা হতে তওবা করিতেছি । কুফর, শিরক এবং অন্যান্য সমস্ত গুনাহ হতে বিদুরীত হইতেছি এবং প্রতিজ্ঞা করিতেছি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁহার রাসুল ।



বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

ঈমান

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে
ঈমান


ইবন ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি।

১. আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা।

২. সালাত কায়িম করা।

৩. যাকাত আদায় করা।

৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং

৫. রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা।


(সহীহ বুখারী , অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নম্বরঃ ৮)


ঈমান



রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


মুল: আশ্‌শাইখ মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান আত্‌তামীমী (রাহ:) 
গ্রন্থনা: শাইখ আব্দুল্লাহ বিন ইবরাহীম আল কারআওয়ী। 
ভাষান্তর : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া মজুমদার

ভূমিকা
সর্বপ্রথম আমি আল্লাহর প্রশংসা আদায় করছি, যিনি আমাকে সঠিক পথ দিয়েছেন, সাথে সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর দরুদ পেশ করছি, যার অনুসরনের মধ্যেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। আল্লাহ তা‘আলার খাস রহমাত যে তিনি তাঁর এ বান্দাকে দ্বীনি ইলম শিক্ষা করার তৌফিক দিয়েছেন তার জন্য বলি আলহামদুলিল্লাহ্। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের তাওফীক হওয়া যেমনি সৌভাগ্যের ব্যাপার তেমনি তা দায়িত্বও বটে। আমার জাতি যারা বাংলা ভাষাভাষি তারাই আমার গুরুত্বের বেশী হকদার। তাদের হিদায়াতের জন্য কিছু করা উচিত। পৃথিবীর এক বৃহত্তম জনগোষ্ঠী এ ভাষায় কথা বলে। তাদের সংখ্যা একশত নব্বই মিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। তাদের মধ্যে রয়েছে সঠিক আক্কীদা চর্চার অভাব। তাই এ বইটি তাদের সামনে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। যা আয়তনে ছোট হলেও আক্কীদার মৌলিক বিষয়সমুহে সমৃদ্ধ।

হিজরী ১৪১৪ সালেই প্রথম এর অনুবাদ করি, এবং নিজস্ব প্রচেষ্টায় আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজানের লাইব্রেরী থেকে ছাপানো এবং বিনামুল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করি।

ইতিমধ্যে এর সমস্ত কপি নিঃশেষ হওয়ায় দ্বিতীয়বারের মত ছাপানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি, এবং উদ্যোগ গ্রহণ করি। পূর্বের সংস্করণের চেয়ে বর্ধিতভাবে বর্তমান সংস্করণে এর মধ্যকার আয়াত সমুহকে সুরার দিকে নির্দেশ করি, আর হাদীসসমুহকে যে সমস্ত মুল গ্রন্থ থেকে তা নেওয়া হয়েছে তার দিকে নির্দিষ্ট করি। আর কিছু বানানগত ভুল - ত্রুটি শুদ্ধ করি। আল্লাহ তা‘আলা আমার এ প্রচেষ্টা কবুল করুন, এবং হাশরের মাঠে আমার জন্য নাজাতের ওসীলা বানান। আমীন ॥
-আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

তিনটি মূলনীতি
যা জানা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর একান্ত কর্তব্য

মুলনীতিগুলো হলো :

১। রব বা পালন কর্তা সম্পর্কে জানা।
২। দ্বীন সম্পর্কে জানা।
৩। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা।

রব কে জানার পদ্ধতি :
যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব বা পালনকর্তা কে?

তখন উত্তরে বলবে আমার রব হলেন আল্লাহ, যিনি আমাকে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে তার অনুগ্রহে লালন করছেন, তিনিই আমার একমাত্র উপাস্য,তিনি ব্যতিত আমার অপর কোন মা’বুদ বা উপাস্য নেই।

দ্বীন জানার পদ্ধতি:
যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার দ্বীন কি?
উত্তরে বল : আমার দ্বীন হলো ইসলাম, যার মানে - আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নিয়ে সম্পূর্নভাবে তাঁর কাছে আত্নসমর্পণ করা, তাঁর নির্দেশ অনুসরণের মাধ্যমে স্বীকার করা, এবং আল্লাহর ইবাদতে অন্য কিছুর অংশীদারীত্ব করা থেকে মুক্ত থাকা এবং যারা তা করে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জানার পদ্ধতি:
যদি তোমাকে প্রশ্ন করা হয় তোমার নবী কে?
উত্তরে বল, তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম, যার পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং দাদার নাম আবদুল মোত্তালি, প্রপিতামহের নাম হাশিম। আর হাশিম কোরাইশ গোত্রের, কোরাইশগন আরব, যারা ইব্রাহীম আলাইহিস্‌ সালাম এর পুত্র ইসমাঈলের বংশধর।
দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি
দ্বীন এর বুনিয়াদ বা ভিত্তি দুটি বিষয়ের উপর :
এক : আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে একমাত্র তাঁরই ইবাদতের নির্দেশ দেয়া, এ ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করা, যারা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা, এবং যারা তা ত্যাগ করে তাদেরকে কাফির মনে করা।
দুই :
আল্লাহর ইবাদাতে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা থেকে সাবধান করা, এ ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করা, এবং যারা তাঁর সাথে শির্ক করে তাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা এবং যারা শির্ক করবে তাদেরকে কাফির মনে করা।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (কালেমা তাইয়্যেবা) মেনে চলার শর্তাবলী

এক : কালেমা তাইয়্যেবার অর্থ জানা।
অর্থাৎ এ কালেমার দুটো অংশ রয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে জানা।
সে দুটো অংশ হলো:
1. কোন হক্ক মা’বুদ নেই
2. আল্লাহ ছাড়া (অর্থাৎ তিনিই শুধু মা’বুদ)

দুই : কালেমা তাইয়্যেবার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
অর্থাৎ সর্ব প্রকার সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকা ।
তিন : কালেমার উপর এমন একাগ্রতা ও নিষ্ঠা রাখা, যা সর্বপ্রকার শিরকের পরিপন্থী।
চার : কালেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা, যাতে কোন প্রকার মিথ্যা বা কপটতা না থাকে।
পাঁচ : এ কালেমার প্রতি ভালবাসা পোষণ এবং কালেমার অর্থকে মনে প্রাণে মেনে নেয়া ও তাতে খুশী হওয়া।
ছয় : এই কালেমার অর্পিত দায়িত্ব সমূহ মেনে নেয়া অর্থাৎ এই কালেমা কর্তৃক আরোপিত ওয়াজিব কাজসমূহ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই সন্তুষ্টির নিমিত্তে সমাধান করা।
সাত : মনে-প্রাণে এই কালেমাকে গ্রহণ করা যাতে কখনো বিরোধিতা করা না হয়।
কালেমা তাইয়্যেবার যে সমস্ত শর্ত বর্ণিত হলো, তার সমর্থনে কোরআন ও হাদীস থেকে দলিল প্রমাণাদি:

প্রথম শর্ত: কালেমার অর্থ জানা। এর দলিল : আল্লাহর বাণী:
﴿فَاعْلَمْ أَنَّهُ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مُتَقَلَّبَكُمْ وَمَثْوَاكُمْ﴾
‘জেনে রাখুন নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মা‘বুদ নেই।” [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৯] আল্লাহ আরো বলেন:
﴿وَلا يَمْلِكُ الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ الشَّفَاعَةَ إِلَّا مَنْ شَهِدَ بِالْحَقِّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ﴾
“তবে যারা হক্ক (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) এর সাক্ষ্য দিবে এমনভাবে যে, তারা তা জেনে শুনেই দিচ্ছে অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।” [সূরা আয যুখরুফ: ৮৬]

এখানে জেনে শুনে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হলো তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে তাদের অন্তর তা সম্যকভাবে জানে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা যায় যে সে জানে আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই সে জান্নাতে যাবে।” [মুসলিম(১/৫৫) হাদীস নং (২৬)]

দ্বিতীয় শর্ত : কালেমার উপর বিশ্বাসী হওয়া। এর প্রমাণাদি:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “নিশ্চয়ই মুমীন ওরাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছে , অত:পর এতে কোন সন্দেহ-সংশয়ে পড়েনি এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।” [সুরা আল হুজরাতঃ (১৫)]

এ আয়াতে আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ঈমান যথাযথভাবে হওয়ার জন্য সন্দেহ সংশয়মুক্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অর্থাৎ তারা সন্দেহ করেনি, কিন্তু যে সন্দেহ করবে সে মুনাফিক, ভন্ড (কপট বিশ্বাসী)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ বা উপাস্য নেই, আর আমি আল্লাহর রাসূল। যে বান্দা এ দুটো বিষয়ে সন্দেহ - সংশয় মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসলিম (১/৫৬), হাদীস নং (২৭০)]

আর এক বর্ণনায় এসেছে : “কোন ব্যক্তি এ দু'টো নিয়ে সন্দেহহীন অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে জান্নাতে যাওয়ার পথে তার কোন বাধা থাকবেনা।” [মুসলিম (১/৫৬), হাদীস নং (২৭০)]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে অপর এক হাদীসের বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছিলেনঃ “তুমি এ বাগানের পিছনে এমন যাকেই পাও, যে মনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস এর সাথে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ নেই তাকেই জান্নাতের শুসংবাদ প্রদান করবে।” [মুসলিম (১/৫৯)]

তৃতীয় শর্ত : এ কালেমাকে ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে স্বীকার করা।
এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন:“তবে জেনে রাখ দ্বীন খালেছ সহকারে বা নিষ্ঠা সহকারে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা আয্‌যুমারঃ ৩]

আল্লাহ আরো বলেন: “তাদেরকে এ নির্দেশই শুধূ প্রদান করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্যই খালেস করে সম্পূর্ণরুপে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়ে তারই ইবাদাত করবে।” [সূরা আল বাইয়েনাহঃ ৫]

হাদীস শরীফে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তিই বেশী সৌভাগ্যবান হবে যে অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে বলেছে আল্লাহ ছাড়া কোন সত্যিকার উপাস্য নেই।” [বুখারী , হাদীস নং ৯৯]

অপর এক সহীহ হাদীসে সাহাবী উৎবান বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ( لا إله إلا الله) বা আল্লাহ ছাড়া হক্ক কোন মা’বুদ নেই বলেছে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।” [মুসলিম ১/৪৫৬, হাদীস নং- ২৬৩, বুখারী, হাদীস নং ৪২৫]

ইমাম নাসায়ী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “দিন রাত্রির জিক্‌র” নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মনের নিষ্ঠা সহকারে এবং মুখে সত্য জেনে নিম্নোক্ত কলেমা সমুহ বলবে আল্লাহ সেগুলির জন্য আকাশকে বিদীর্ণ করবেন যাতে তার দ্বারা জমীনের মাঝে কে এই কালেমাগুলি বলেছে তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আর যার দিকে আল্লাহর নজর পড়বে তার প্রার্থিত ও কাংখিত বস্তু তাকে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব। সে কালেমাগুলি হলো:
)لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير(
অর্থাৎ : “শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া হক্ক কোন মা’বুদ নেই, তার কোন শরীক বা অংশীদার নেই, তার জন্যই সমস্ত রাজত্ব বা একচ্ছত্র মালিকানা, তার জন্যই সমস্ত প্রশংসা আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান”। [নাসায়ী , আমালুল ইয়াওমে ওয়াল্লাইলা, হাদীস নং- ২৮]

চতুর্থ শর্ত : কলেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা। এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ “আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি ধারণা করেছে যে, ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবেনা? আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি যাতে আল্লাহর সাথে যারা সত্য বলেছে তাদেরকে স্পষ্ট করে দেন এবং যারা মিথ্যা বলেছে তাদেরকেও স্পষ্ট করে দেন।” [সূরা আলআনকাবুতঃ ১-৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন : “মানুষের মাঝে কেউ কেউ বলে আমরা আল্লাহ এবং পরকালের উপর ঈমান এনেছি, অথচ তারা ঈমানদার নয়, তারা (তাদের ধারণামতে) আল্লাহ ও ঈমানদারদের সাথে প্রতারণা করছে, অথচ (তারা জানেনা) তারা কেবল তাদের আত্মাকেই প্রতারিত করছে কিন্তু তারা তা বুঝতেই পারছেনা। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, ফলে আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর মিথ্যা বলার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল বাকারাঃ ৮-১০]

তেমনিভাবে হাদীস শরীফে মুআ’য বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে কোন লোক মন থেকে সত্য জেনে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত হক্ক কোন মা’বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।” [বুখারী , হাদীস নং- ১২৮, মুসলিমঃ ১/৬১]

পঞ্চম শর্ত : এ কালেমাকে মনে প্রাণে ভালবাসা।
এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “কোন কোন লোক আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ ও অংশীদার গ্রহণ করে তাদেরকে আল্লাহর মত ভালবাসে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে অত্যন্ত বেশী ভালবাসে” । [সূরা আল বাকারাঃ ১৬৫]

আল্লাহ আরো বলেন : “হে ঈমানদারগণ তোমাদের থেকে যদি কেহ তার দ্বীনকে পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ এমন এক গোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করে আনবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসেন, যারা মুমীনদের প্রতি নরম- দয়াপরবশ, কাফেরদের উপর কঠোরতা অবলম্বনকারী; তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করেনা।” [সূরা আল মায়েদাঃ ৫৪]

তেমনিভাবে হাদীস শরীফে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি বস্তুর সমাহার ঘটেছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে: (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত বা ভালবাসা অন্য সবকিছু থেকে বেশী হবে। (দুই) কোন লোককে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসবে। (তিন) কুফরী থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেয়ার পর সে কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করবে।” [বুখারী, হাদীস নং- ৪৩, মুসলিমঃ ১/৬৬]

ষষ্ট শর্ত: কালেমার হকসমুহ মনে প্রাণে মেনে নেয়া
এর দলীল: আল্লাহর বাণী: “আর তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে ফিরে যাও, এবং তাঁর কাছে আত্নসমর্পণ করো।” [সূরা আয্‌যুমারঃ ৫৪]

আল্লাহ আরো বলেন: “আর তারচেয়ে কার দ্বীন বেশী সুন্দর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছে, এমতাবস্থায় যে, সে মুহসীন”, [সূরা আন্‌নিসাঃ ১২৫] মুহসীন অর্থ : নেককার, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল করেছে।

আরও বলেন: “আর যে নিজেকে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ করে আত্নসমর্পন করেছে আর সে মুহসীন”, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত অনুযায়ী আমল করেছে “সে মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরেছে” [ সূরা লুকমানঃ ২২] অর্থাৎ : لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মাবুদ নেই এ কালেমাকেই সে গ্রহণ করেছে।

আরও বলেন: “তারা যা বলছে তা নয়, তোমার প্রভূর শপথ করে বলছি, তারা কক্ষনো ঈমানদার হবেনা যতক্ষণ আপনাকে তাদের মধ্যকার ঝগড়ার নিষ্পত্তিকারক (বিচারক) হিসাবে না মানবে, অত:পর আপনার বিচার- ফয়সালা গ্রহণ করে নিতে তাদের অন্তরে কোন প্রকার অভিযোগ থাকবেনা এবং তারা তা সম্পূর্ন কায়মনোবাক্যে নির্দ্বিধায় মেনে নিবে।” [সূরা আন্‌নিসাঃ ৬৫]

অনুরুপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউই ঐ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবেনা যতক্ষন তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসারী হবে।” [হাদীস খানি খতিব বাগদাদী তার তারিখে বাগদাদের ৪/৩৬৯, এবং বাগাভী তার সারহুছছুন্নার ১০৪ নং এ বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ শুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ আছে।] আর এটাই পূর্ণ আনুগত্য ও তার শেষ সীমা।
সপ্তম শর্ত: কালেমাকে গ্রহণ করা।

এর দলীল: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর এমনিভাবে যখনই আপনার পূর্বে আমি কোন জনপদে ভয় প্রদর্শনকারী (রাসূল বা নবী) প্রেরণ করেছি তখনি তাদের মধ্যকার আয়েসী বিত্তশালী লোকেরা বলেছে : আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে একটি ব্যবস্থায় পেয়েছি, আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। (ভয় প্রদর্শনকারী) বলল: আমি যদি তোমাদের কাছে বাপ-দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছ তার থেকে অধিক সঠিক বা বেশী হেদায়েত নিয়ে এসে থাকি তারপরও? (তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার অনুকরণ করবে?) তারা বলল: তোমরা যা নিয়ে এসেছ আমরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছি, ফলে আমি (আল্লাহ) তাদের থেকে (এ কুফরীর) প্রতিশোধ নেই, সুতরাং আপনি মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণামফল কেমন হয়েছে দেখে নিন।” [সূরা আযযুখরুফঃ ২৩-২৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “নিশ্চয়ই তারা অযথা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতো যখন তাদেরকে বলা হত যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ক মা’বুদ নেই, এবং বলতো: আমরা কি পাগল কবির কথা শুনে আমাদের উপাস্য দেবতাগুলিকে ত্যাগ করবো?” [সূরা আস্‌সাফ্‌ফাতঃ ৩৫-৩৭]

অনুরুপভাবে হাদীসে শরীফে আবু মুসা আশআ’রী রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে এমন মুষলধারার বৃষ্টির মতো যা ভূমিতে এসে পড়েছে, ফলে এর কিছু অংশ এমন উর্বর পরিষ্কার ভূমিতে পড়েছে যে ভূমি পানি চুষে নিতে সক্ষম, ফলে তা পানি গ্রহণ করেছে, এবং তা দ্বারা ফসল ও তৃণলতার উৎপত্তি হয়েছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে গর্তওয়ালা ভূমিতে (যা পানি আটকে রাখতে সক্ষম) সুতরাং তা পানি সংরক্ষন করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে আল্লাহ এর দ্বারা মানুষের উপকার করেছেন তারা তা পান করেছে, ভূমি সিক্ত করিয়েছে এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পেরেছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে এমন অনুর্বর সমতল ভূমিতে যাতে পানি আটকে থাকেনা, ফলে তাতে পানি আটকা পড়েনি, ফসলও হয়নি। ঠিক এটাই হলো ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দ্বীনকে বুঝতে পেরেছে এবং আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হতে পেরেছে, ফলে সে নিজে জেনেছে এবং অপরকে জানিয়েছে। (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেনীর ভূমি)। এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে এই হিদায়েত এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের দিকে মাথা উঁচু করে তাকায়নি, ফলে আল্লাহ যে হিদায়েত নিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন তা গ্রহণ করেনি। (তৃতীয় শ্রেনীর ভূমি) ।” [সহীহ বুখারী, ১/১৭৫ হাদীস নং ৭৯, সহীহ মুসলিম হাদীস নং ২২৮২]



মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 


 আপনারা জানেন, মানুষ একটি কালেমা পাঠ করে ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করে থাকে। সেই কালেমাটি খুব লম্বা -চওড়া কিছু নয় কয়েকটি শব্দ মাত্র। (*) এই কয়টি শব্দ মুখে উচ্চারণ করলেই মানুষ একবারে বদলে যায়। একজন কাফের যদি এটা পড়ে, তবে সে মুসলমান হয়ে যায়। ফলে পূর্বে সে নাপাক ছিল, এখন সে পাক হয়ে গেল। পূর্বে তার ওপর আল্লাহর গযব আসতে পারতো; কিন্তুএখন সে আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হয়ে গেল। প্রথমে সে জাহান্নামে যাবার যোগ্য ছিল• এখন জান্নাতের দুয়ার তার জন্য খুলে গেল। শুধু এটুকুই নয়, এই ‘কালেমা’র দরুন মানুষে মানুষেও বড় পার্থক্য হয়ে পড়ে। এ ‘কালেমা’ যারা পড়ে তারা এক উম্মাত আর যারা এটা অস্বীকার করে তারা হয় আলাদা এক জাতি। পিতা যদি ‘কালেমা’ পড়ে আর পুত্র যদি তা অস্বীকার করে তবে পিতা আর পিতা থাকবে না, পুত্র আর পুত্র বলে গণ্য হবেনা। পিতার সম্পত্তি হতে সেই পুত্র কোন অংশই পাবে না, তার নিজের মা ও বোন পর্যন্ত তাকে দেখা দিতে ঘৃণা করবে। পক্ষান্তরে একজন বিধর্মী যদি কালেমা পড়ে,আর ঐ ঘরের মেয়ে বিয়ে করে তবে সে এবং তার সন্তান ঐ ঘর হতে মীরাস পাবে। কিন্তু নিজ ঔরস জাত সন্তান শুধু এই ‘কালেমাকে’ অস্বীকার করার কারণেই  একেবারে পর হয়ে যাবে। এটা দ্বারা বুঝতে পারা যায় যে এই ‘কালেমা’ এমন জিনিস যা পর লোককে আপন করে একত্রে মিলিয়ে দেয়। আর আপন লোককে পর করে পরস্পরের সম্পর্ক ছিন্ন করে।
একটু ভেবে দেখুন মানুষে মানুষে এতবড় পার্থক্য হওয়ার প্রকৃত কারণ কি? ‘কালেমা’তে কয়েকটা অক্ষর ছাড়া কি-ই বা রয়েছে? কাফ, লাম, মীম, আলিফ, সীন আর এ রকমেরই কয়েকটা অক্ষর ছাড়া আর তো কিছুই নয়। এ অক্ষরগুলো যুক্ত করে মুখে উচ্চারণ করলে। কোন যাদুর স্পর্শে মানুষ এতখানি বদলে যায়! শুধু এতটুকু কথা দ্বারা কি মানুষের পরস্পরের মধ্যে এত আকাশ-পাতাল পার্থক্য হতে পারে? •••••••••• একটু চিন্তা করলে।  আপনারা বুঝতে পারবেন আপনাদের বিবেক বুদ্ধি বলে ওঠবে যে কয়েকটা অক্ষর মিলিয়ে মুখে উচ্চারণ করলেই এতবড় ক্রিয়া কিছুতেই হতে পারে না। মূর্তিপূজক মুশরিকগন অবশ্য মনে করে যে একটা মন্ত্র পড়লেই পাহাড় টলে যাবে; যমীন ফেটে যাবে এবং তা হতে পানি উথলে ওঠবে !•••••••••••••••••••••••মন্ত্রের কোন অর্থ কেউ অবগত হোক বা না-ই হোক, তাতে কোন ক্ষতি বৃদ্ধি নেই। কারণ অক্ষরের মধ্যেই যাবতীয় শক্তি নিহিত আছে বলে তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। কাজেই তা মুখে উচ্চারিত হলেই সকল রহস্যের দুয়ার খুলে যাবে। কিন্তু ইসলামে এরূপ ধারণার কোনই মূল্য নেই। এখানে আসল জিনিস হচ্ছে অর্থ; শব্দের মধ্যে যা কিছু ক্রিয়া বা তা’ছীর আছে, তা অর্থের দরুনই হয়ে তাকে। শব্দের কোন অর্থ না  হলে তা মনের মূলের সাথে গেঁথে না গেলে এবং তার ফলে মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, চরিত্র ও তার কাজ -কর্মে পরিবর্তন না ঘটলে, শুধু শব্দের উচ্চরণ করলেই কোন লাভ নেই।

একথাটি সহজ  উদাহরণ দ্বারা আপনাদেরকে বুঝাতে চাই। যেমন ধরুন, আপনার ভয়ানক শীত লাগছে। এখন আপনি যদি মুখে  ‘লেপ -তোষক’ বলে চিৎকার করতে শুরু করেন• তবে শীত লাগা কিছুমাত্র কমবে না। সারা রাত বসে ‘লেপ-তোষক’ বলে হাজার তাসবীহ পড়লেও কোন ফল ফলবে না। অবশ্য আপনি লেপ -তোষক যোগাড় করে যদি গায়ে দিতে পারেন তবে শীত লাগা নিশ্চয় বন্ধ হয়ে যাবে। এরূপে মনে করুন, আপনার তৃষ্ণা লেগেছে। এখন যদি আপনি সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘পানি’ ‘পানি ’করে চিৎকার করতে থাকেন •তবে তাতে পিপাসা মিটবে না। কিন্তু এক গ্লাস পানি যদি পান করেন তবে আপনার কলিজা অবশ্যই ঠান্ডা হবে। মনে করুন, আপনার অসুখ হয়েছে এখন যদি আপনি ‘ওষুধ’ ‘ওষুধ’ করে তাসবীহ পাঠ শুরু করেন, আপনার রোগ তাতে দূর হবে না। হাঁ যদি ঠিক ওষুধ খরিদ করে তা সেবন করেন, তবে আপনার রোগ সেরে যাবে। ‘কালেমা’র অবস্থাও ঠিক এটাই। শুধু ছয়-সাতটি শব্দ মুখে বলে দিলে এত বড় পার্থক্য হতে পারে না, যে মানুষ কাফের ছিল সে এর দরুন একেবারে মুসলমান হয়ে যাবে, নাপাক হতে পাক  হবে, দুশমন লোক  একেবারে বন্ধু হয়ে যাবে, জাহান্নামী ব্যক্তি একেবারে জান্নাতী হয়ে যাবে। মানুষে মানুষে এরূপ পার্থক্য হয়ে যাওয়ার একটি মাত্র উপায় আছে। তা এই যে, প্রথমে এই শব্দগুলোর অর্থ বুঝে নিতে হবে, সেই অর্থ যাতে মানুষের মনের মূলে শিকড় গাড়তে পারে, সেই জন্যে চেষ্টা করতে হবে। এভাবে অর্থ জেনে ও বুঝে যখন এটা মুখে উচ্চারণ করবেন, তখনই আপনারা বুঝতে পারবেন যে এই কালেমা পড়ে আপনারা আপনাদের আল্লাহর সামনে কত বড় কথা স্বীকার করেছেন, আর এর  দরুন আপনাদের ওপর কত বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে। এসব কথা বুঝে শুনে যখন আপনারা ‘কালেমা’ পড়বেন তখন আপনাদের চিন্তা এবং আপনার সমস্ত জীবনের ওপর এ‘কালেমা’র পূর্ণ আধিপত্য স্থাপিত হবে। এর পর এ ‘কালেমা’র বিরোধী কোন কথা আপনাদের মন ও মগজে একটু স্থান পেতে পারে না। চিরকালের তরে আপনাদের একথাই মনে করতে হবে যে এই কালেমার বিপরীত যা তা মিথ্যা -এ কালেমাই একমাত্র সত্য। আপনাদের জীবনে সমস্ত কাজ কারবারে এ ’কালেমা’ই হবে একমাত্র হুকুম দাতা। এ ‘কালেমা’ পড়ার পরে কাফেরদের  মত স্বাধীনভাবে যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন না। তখন এ ‘কালেমা’ই হুকুম পালন করে চলতে হবে, এটা যে কাজ করতে বলবে তাই করতে হবে এবং যে কাজের নিষেধ করবে তা হতে ফিরে থাকতে হবে। এভাবে‘কালেমা’ পড়লেই মানুষে মানুষে পূর্বোল্লেখিতরূপে পার্থক্য হতে পারে।

এখন  কালেমার অর্থ কি, তা পড়ে মানুষ কি কথা স্বীকার করে, আর তা স্বীকার করলেই মানুষ কোন বিধান মত চলতে বাধ্য হয় প্রভৃতি বিষয় আলোচন করবো।

কালেমার অর্থঃ
 “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, হযরত মুহাম্মাদ (সা•) আল্লাহ তা’আলার রাসূল বা প্রেরিত পুরুষ।” কালেমার মধ্যে যে ‘ইলাহ্’ শব্দটি রয়েছে এর অর্থ হচ্ছে মালিক, সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যে বিধান রচনাকারী, মানুষের  দোয়া যিনি শোনেন এবং গ্রহন করেন-তিনিই উপাসনা পাবার একমাত্র উপযুক্ত। এখন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়লে তার অর্থ এই হবে যে আপনি প্রথম স্বীকার করলেনঃ এ দুনিয়া আল্লাহ ছাড়া সৃষ্টি হতে পারেনি, এর সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই বর্তমান আছেন, আর সেই সৃষ্টিকর্তা বহু নয়-- মাত্র একজন। তিনি ছাড়া আর কারও খোদায়ী বা প্রভুত্ব কোথাও নেই; দ্বিতীয়ত কালেমা পড়ে আপনি স্বীকার করলেন যে সেই এক আল্লাহ ই মানুষের ও সারে জাহানের মালিক। আপনি ও আপনার প্রত্যকটি জিনিস এবং দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুই তাঁর। সৃষ্টিকর্তা তিনি, রিযিক দাতা তিনি, জীবন ও মৃত্যু তাঁরই হুকম মত হয়ে থাকে। সুখ ও বিপদ তাঁরই তরফ হতে আসে। মানুষ যা কিছু পায়, তারঁই কাছ থেকে পায়--সকল কিছুর দাতা প্রকৃত পক্ষে তিনি। আর মানুষ যা হারায় তা প্রকৃত  পক্ষে তিনিই কেড়ে নেন। শুধু তাঁকেই ভয় করা উচিত, শুধু তারই কাছে প্রার্থনা করা উচিত, তারই সামনে মাথা নত করা উচিত। কেবল মাত্র তারই ইবাদাত ও বন্দেগী করা কর্তব্য। তিনি ছাড়া আমাদের মনিব, মালিক ও আইন রচনাকারী আর কেউই নাই। একমাত্র তারই হুকুম মেনে চলা এবং কেবল তারই আইন অনুসারে কাজ করা আমাদের আসল ও একমাত্র কর্তব্য।

‘কালেমা’ *** পড়ে আপনি আল্লাহর কাছে এই ওয়াদাই করে থাকেন আর সারা দুনিয়া এ মৌলিক অঙ্গীকারের সাক্ষী হয়ে থাকে। বিপরীত কাজ করলে আপনার জিহ্বা,আপনার হাত-পা, আপনার প্রতিটি পশম এবং আকাশ ও পৃথিবীর এক একটি অনূ -পরমানু যাদের সামনে আপনি এ ওয়াদা করেছিলেন আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সাক্ষ্য দেবে। আপনি সেখানে একেবারে অসহায় হয়ে পড়বেন। আপনার সাফাই প্রমান করার জন্য একটি সাক্ষী কোথাও পাবেন না। কোন উকিল কিংবা ব্যারিস্টার আপনার পক্ষ সমর্থন করার জন্য সেখানে থাকবে না। বরং স্বয়ং উকিল সাহেব কংবা ব্যারিস্টার সাহেব দুনিয়ার আদালতে যারা আইনের মারপ্যাচ খেলে থাকে,তারা সকলেই সেখানে আপনারই মত নিতান্ত অসহায় অবস্থায় পড়ে যাবে। সেই আদালতে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে, জাল দলীল দেখিয়ে এবং উকিলের দ্বারা মিথ্যা ওকালতী করিয়ে আপনারা রক্ষা পেতে পারবেন না। দুনিয়ার পুলিশের চোখ হতে আপনারা নিজেদের অপরাধ লুকাতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর পুলিশের চোখ হতে তা গোপন করা সম্ভব নয়। দুনিয়ার পুলিশ ঘুষ খেতে পারে, আল্লাহর পুলিশ কখনও ঘুষ খায়না। দুনিয়ার সাক্ষী মিথ্যা বলতে পারে, আল্লাহর সাক্ষী সকলেই সত্যবাদী --তারা মিথ্যা বলে না। দুনিয়ার বিচারকেরা অবিচার করতে পারে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা অবিচারক নন। তারপর আল্লাহ যে জেলখানায় পাপীদেরকে বন্দী করবেন, সেখান হতে পলায়ন করা কোন মতেই সম্ভব নয়। কাজেই আল্লাহর সাথে মিথ্যা ওয়াদা করা বড় আহাম্মকি এবং সবচেয়ে বেওকুফী সন্দেহ নেই। যখন আল্লাহর সামনে ওয়াদা করছেন, তখন খুব ভাল কর বুঝে শুনে করুন এবং তা পালন করার চেষ্টা করুন, নতুবা শুধু মুখে ওয়াদা করতে আপনাকে কেউ জবরদস্তি করছে না। কারণ মুখে শুধু স্বীকার করার কোন মূল্যই নেই।

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলার পর বলতে হয় ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’। এর অর্থ এই যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মধ্যস্থতায়ই আল্লাহ তাআলা তার আইন মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন একথা আপনারা স্বীকার করছেন। আল্লাহকে নিজেদের মনিব, মালিক ও বাদশাহ স্বীকার করার পর একথা অবগত হওয়া একান্ত দরকার ছিল যে, সেই বাদশাহে দো-আলমের আইন ও হুকুম কি? আমরা কোন কাজ করলে তিনি খুশী হবেন, আর কোন কাজ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হবেন? কোন আইন অণুসরণ করলে তিনি আমাদের ক্ষমা করবেন আর কোন আইনের বিরোধিতা করলে তিনি আমাদেরকে শাস্তি দেবেন? এসব জানার জন্যে আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ(সা)-কে তাঁর দূত নির্দিষ্ট করেছেন। তার মধ্যস্থতায় তিনি আমাদের প্রতি তার কিতাব পাঠিয়েছেন এবং হযরত মুহাম্মাদ (সা•) আল্লাহর হুকুম মত কিরূপে জীবনযাপন করতে হয়, তা বাস্তব ক্ষেত্রে দেখিয় গিয়েছেন।
কাজেই আপনারা যখন বলেন, ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ তখন এর দ্বারা আপনারা একথাই স্বীকার করে থাকেন যে, যে আইন এবং যে নিয়ম হযরত মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন, আপনারা তা অনুসরণ করে চলবেন। আর যে আইন এর বিপরীত হবে তাকে পদদলিত করবেন। এ ওয়াদা করার পর যদি আপনারা হযরত মুহাম্মাদ (সা•)-এর প্রচার আইনকেই ছেড়ে দেন, আর দুনিয়ার আইন অনুসরণ করে চলেন তবে আপনাদের চেয়ে বড় মিথ্যাবদী ও বেঈমান আর কেউ নেই। কারণ হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর প্রচারিত আইনকে একমাত্র সত্য আইন মেনে এবং তার অনুসরণ করে চলার অঙ্গীকার করেই আপনারা ইসলামের সীমার মধ্যে এসেছেন।  একথা স্বীকার করেই আপনারা মুসলামানদের ভাই হয়েছেন, এরই দরুন আপনারা মুসলমান পিতার উত্তরাধিকারী হতে পেরেছেন। এরই বদৌলতে আপনারা মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করেছেন। এরই কারণে আপনাদের সন্তান ন্যায়ত সন্তান হতে পেরেছে। এরই দরুন মুসলমানগণ আপনাদেরকে সাহায্য করেছে আপনাদেরকে যাকাত দিয়েছে, আপনাদের জান-মাল ও মান -সম্মানে হেফাযত করার দায়িত্ব নিয়েছে।  এতসব হওয়া সত্ত্বেও যদি আপনারা নিজেদের ওয়াদা ভঙ্গ করেন, তবে এটা অপেক্ষা বড় বেঈমানী দুনিয়ায় আর কি হতে পারে? আপনারা যদি (***) এর অর্থ জানেন এবং জেনে -বুঝেই এটা স্বীকার করেন, তাহলে সকল অবস্থাতেই আল্লাহর আইন মেনে চলা আপনাদের কর্তব্য। আল্লাহর আইন জারি হয়ে না থাকলেও আপনাদের এটা জারি করা উচিত। যে ব্যক্তি মনে করে আল্লাহর পুলিশ, সৈন্য, আদালত এবং জেলখানা কোথাও মওজুদ নেই, কাজেই তাঁর আইন লংঘন করা সহজ আর গর্ভমেন্টের পুলিশ ফোজ, আদালাত এবং জেলখানা চারদিকে বর্তমান আছে, কাজেই তার আইন ভঙ্গ করা বড়ই মুশকিল --তবে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আমি পরিস্কার ভাষায়ই বলে দিচ্ছি যে (***) কালেমা সে মিথ্যাই পড়েছে। সে এটা দ্বারা তার আল্লাহকে, সারে জাহানকে, সমস্ত মুসলকমানকে এং স্বয়ং নিজের মনকে ধোঁকা দিচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ইতিপূর্বে কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ আমি বলেছি। এখন সেই বিষয়ে অন্য আর একদিক দিয়ে ভেবে দেখতে বলছি।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের এবং প্রত্যেক জিনিসেরই মালিক একথা আপনারা স্বীকার করছেন। কিন্তু এর অর্থ কি? এর অর্থ এই যে আপনাদের জান মাল আপনাদের নিজের দেহ আল্লাহর। আপনাদের হাত, কান এবং আপনাদের দেহের কোন একটা অঙ্গও আপনাদের নিজের নয়। যে জমি আপনারা চাষবাদ করেন যেসব পশু দ্বারা আপনারা কাজ করান যেসব জিনিস-পত্র আপনারা সবসময় ব্যবহার করছেন, এদের কোনটাই আপনাদের নিজের নয়। সবকিছুই  আল্লাহ  তাআলার মালিকানা এবং আল্লাহর দান হিসেবেই এগুলো আপনারা পেয়েছেন। একথা স্বীকার করার পর আপনাদের একথা বলার কি অধিকার থাকতে পারে যে জান --প্রাণ আমার শরীর আমার মাল আমার ,অমুক জিনিস আমার আর অমুক জিনিসটি আমার। অন্য একজনকে কোন জিনিসের মালিক বলে ঘোষণা করার পর তার জিনিসকে আবার নিজের বলে দাবী করা সম্পূর্ণ অথহীন। যদি বাস্তবিকই আল্লাহকে দুনিয়ার সমস্ত জিনিসের মালিক মনে করেন। তবে তা হতে আপনা আপনি দু’টি জিনিস আপনাদের ওপরে এসে পড়ে। প্রথম এই যে, আল্লাহ ই যখন মালিক আর তিনি তাঁর মালিকানার জিনিস আমানত স্বরূপ আপনাদেরকে দিয়েছেন, তখন সেই মালিকের হুকুম মতই আপনাদের সেই জিনিসগুলো ব্যবহার করতে হবে। তাঁর মর্জির উল্টা কাজ যদি এর দ্বারা করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনারা আমানতের খেয়ানত করছেন। আপনাদের হাত-পা পর্যন্ত সেই মালিকের মর্জির বিপরীত কাজে ব্যবহার করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আপনাদের চোখ দ্বারাও তার নিষিদ্ধ জিনিস দেখতে পারেন না। যা তাঁর মর্জির বিপরীত। আপনাদের এই জমি -জায়গাকে মালিকের বিধানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আপনাদের কোনই অধিকার নেই। আপনাদের যে স্ত্রী এবং  সন্তানকে নিজেদের বলে দাবী করেন, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে দান করেছেন বলেই তারা আপনাদের আপন হয়েছে, কাজেই তাদের সাথে আপনাদের ইচ্ছামত নয়-মালিকরই হকুম মত ব্যবহার করা কর্তব্য। তার মতের উল্টো যদি ব্যবহার করেন তবে আপনারা ডাকাত নামে অভিহিত হবার যোগ্য। পরের জিনিস হরণ করলে পরের জায়গা শক্তির বলে দখল করলে আপনারা তাকে বলেন, বেঈমান; সেরূপ  আল্লাহর দেয়া জিনিসকে নিজের মনে করে নিজের ইচ্ছা কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ও মর্জিমত যদি ব্যবহার করেন• তবে সেই বেঈমানীর অপরাধে আপনারাও অপরাধী হবেন। মালিকের মর্জি অনুসারে কাজ করলে যদিও আপনাদের কোন ক্ষতি হয় হোক, জান চলে যায় যাক, হাত-পা ভেঙ্গে যায় যাক, সন্তানের লোকসান হয় হোক, মাল ও জমি -জায়গা বরবাদ হযে যায় যাক, আপনারা সেই জন্য কোন পরোয়া করবেন না। জিনিসের মালিকই যদি এর ক্ষয় বা ক্ষতি পসন্দ করেন, তবে তা করার তাঁর অধিকার আছে। তবে হাঁ,মালিকের মর্জির খেলাপ যদি আপনারা করেন, আর তাতে যদি কোন জিনিসের ক্ষতি হয়ে পড়ে, তবে সে জন্য আপনারাই অপরাধী হবেন, সন্দেহ নেই। কারণ পরের জিনিস আপনারা নষ্ট করেছেন। আপনারা আপনাদের জানকেও পর্যন্ত নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারেন না। মালিকের মর্জি অনুসারে জান কুরবান করলে মালিকেরই হক আদায় হবে, তাঁর মতের উল্টা কাজে প্রাণ দিলে মস্তবড় বেঈমানী করা হবে।

দ্বিতীয় কথা এইযে, মালিক যে জিনিসই আপনাকে দান করেছেন, তা যদি সেই মালিকের কাজেই ব্যবহার করেন• তবে তার দ্বারা কারোও প্রতি কোন অনুগ্রহ হতে পারে না-মালিকের প্রতিও নয়। এ পথে যদি আপনারা কিছু দান করেলেন, কোন খেদমত করলেন, কিংবা আপনাদের প্রিয়বস্তু প্রাণকে কুরবান করলেন• তবে তা কারোও প্রতি আপনাদের একবিন্দু অনুগ্রহ নয়। আপনাদের প্রতি মালিকের যে হক ছিল এর দ্বারা শুধু তাই আদায় করলেন মাত্র। এতে গৌরব বা অহংকার করার মত কিংবা তারীফ বা প্রশংসা পাবার মত কিছু নেই। মনে রাখবেন, মুসলমান ব্যক্তি মালিকের পথে কিছু খরচ করে কিংবা তার কিছু কাজ করে কিছুমাত্র গৌরব বোধ করে না, বরং সে বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে; গৌরব বা অহংকার ভাল কাজকে বরবাদ করে দেয়। যে ব্যাক্তি প্রশংসা পাবার আশা করে এবং শুধু সে উদ্দেশ্যেই ভাল কাজ করে কারণ সে তার কাজের প্রতিফল এ দুনিয়াতেই পেতে চাচ্ছে, আর তাই সে পেয়েছে নিখিল দুনিয়ার মালিক আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ দেখুন, তিনি তাঁর নিজের জিনিস আপনাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেন, আর বলেন যে এ জিনিস তোমাদের কাছ থেকে আমি ক্রয় করলাম এবং তার মূল্য ও তোমাদেরকে দেব। আল্লাহু আকবার। আল্লাহর দান ও অনুগ্রহের কি কোন সীমা-পরিসীমা আছে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ**

 “আল্লাহ তায়ালা ঈমানদার ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল খরিদ করেছেন এবং তার বিনিময়ে তাদের জন্য জান্নাত নির্দিষ্ট করে রেখেছেন”। (সূরা আত তাওবাঃ ১১১)
 

আপনাদের সাথে মালিকের এরূপ ব্যবহার ! কিন্তু আপনি তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করছেন, তা একবার বিচার করে দেখুন।  মালিক যে বস্তু আপনাদেরকে দিয়েছেন, তারপর সেই মালিক সে জিনিস মূল্য দিয়ে আপনাদের কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, সে জিনিসকে আপনারা অন্যের কাছে বিক্রি করছেন, আর খুবই সামান্য ও নিকৃষ্ট মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করছেন। যার কাছে বিক্রি করছেন সে মালিকের মর্জির উল্টা কাজে আপনাদের সেসব জিনিসকে ব্যবহার করে  আর আপনারা তাদেরকে আপাদের রেযেকদাতা মনে করেই তাদের কাজ করে থাকেন। মূলত আপনাদের দেহের শক্তিগুলো এমনভাবে বিক্রি করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আল্লাহ দ্রোহী শক্তি যা কিছু কিনতে চায়, আপনারা তাই তাদের কাছে বিক্রি করেন, তা অপেক্ষা বড় দুর্নীতি আর কি হতে পারে? একবার বিক্রি করা জিনিসকে পুনরায় অন্যের কাছে বিক্রি করা আইনত  এবং নীতগতভাবে অপরাধ। দুনিয়ায় এ জন্য আপনার বিরুদ্ধে প্রবঞ্চনার মামলা চলতে পারে। আপনারা কি মনে করেন আল্লাহর আদালতে এ বিষয়ে মামলা চলবে না?

 
পাক কালেমা ও নাপাক কালেমা
কালেমায়ে তাইয়্যেবার অর্থ ইতিপূর্বে বলেছিঃ এখানে সেই সম্পর্কেই আর একটু ব্যাখ্যা করে আপনাদেরকে বুঝাতে চাই। কারণ এ কালেমাই ইসলামের মূল ভিত্তি, এরই সাহায্যে মানুষ ইসলামে দাখিল হয়, আর এ কালেমাকেই ভাল করে না বুঝে এবং সে অনুসারে নিজের জীবনকে গঠন না করে কোন মানুষ মুসলমান থাকতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে এ কালেমার পরিচয়  এভাবে দিয়েছেঃ
“কালেমায়ে তাইয়্যেবার উদাহরণ যেমন কোন ভাল জাতের গাছ, এর শিকড় মাটির নীচে মজবুত হয়ে গেঁথে রয়েছে। এর শাখা-প্রশাখাগুলো আকাশের শূণ্যলোকে বিস্তৃত -- আল্লাহর হুকুমে তা অনবরত ফলের পর ফলদান করছে। আল্লাহ এরূপ দৃষ্টান্ত মানুষের উপদেশ গ্রহণের জন্য দিয়েছেন। এর বিপরীত হচ্ছে কালেমায়ে খাবিসাহ অর্থাৎ খারাপ আকিদা ও মিথ্যা কথা। এর উদাহরণ যেমন বন-জঙ্গলের ছোট ছোট আগাছা -পরগাছা। মাটির একেবারে উপরিভাগে তা- জন্মে•সামান্য এক টানেই তা উৎপাটিত হয়ে যায়; কারণ এর শিকড় মাটিতে খুব মজবুত হয়ে গাঁথতে পারে না। আল্লাহ সেই পাকা কথার দরুন মুমিনেদেরকে ইহকালে ও পরকালে সুদৃঢ় রাখেন এবং যালেমদেরকে বিভ্রান্ত করে থাকেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন।” (সূরা ইব্‌রাহীমঃ ২৪-২৭)
আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা এমন একটা অতুলীয় উদাহরণ দিয়েছেন যে,আপনারা একটু চিন্তা করলেই এটা হতে খুব বড় শিক্ষা পেতে পারেন। দেখুন একটি আম গাছের শিকড় মাটির কত নীচে ঘেঁথে রয়েছে, ওপরের দিকে কতখানি উচ্চ হয়ে ওঠেছে, তার কত ডাল -পালা চারদিকে বিস্তৃত হয়েছে, আর তাতে প্রতি বছর কত ভাল ভাল ফল ফলছে। কিন্তু এটা কেমন করে হলো? এর বীজ খুব শক্তিশালী ছিল বলে। এত বড় একটা গাছ হবার তার পূর্ণ হক ছিল। আর সেই   হক এত সত্য ছিল যে যখন এটা নিজের হক এর দাবী করলো তখন মাটি পানি, বায়ু, দিনের গরম, রাতের ঠান্ডা সব জিনিসই তার দাবী মেনে নিয়েছে।  আমের সেই বীচি যার কাছে যা চেয়েছে তার প্রত্যেকেই তাকে তা দিয়েছে। এভাবে সে নিজের অধিকারের জোরে এত বড় একটা গাছ হয়ে ওঠতে পেরেছে। পরে সে মিষ্টি মিষ্টি ফল দিয়ে একথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে বাস্তবিকই এমন একটা গাছ হওয়ার তার অধিকার ছিল। আকাশ ও পৃথিবীর সকল শক্তি একত্র হয়েও যদি তার সাহয্যে করে থাকে, তবে তা কিছুমাত্র অন্যায় করেনি, বরং এদের এরূপ করাই উচিত ছিল। কারণ জমি, পানি, বায়ু এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক জিনিসের মধ্যে গাছ -পালার খোরাক যোগাবার ও এদের বড় করে তোলার শক্তি এ জন্য নিহিত আছে যে, তা দ্বারা ভালে জাতের গাছ গুলোরঅনেক উপকার হবে।
 এ ছড়া বন -জঙ্গলে ছোট ছোট এমন কত গাছ আছে - যা নিজে- নিজেই হয়েছে। এদের মধ্যে কি শক্তি আছে? ছোট একটু শিকড় একটা ছোট ছেলে তা টেনে উপড়ে ফেলতে পারে। কিংবা তা এতই নরম ও দুর্বল যে একটু দমকা তাওয়া  লাগলেই তা নত হয়ে পড়ে। তা কাঁটায় ভরা, স্পর্শ করলেই কাঁটা বিদ্ধ হয়। তা মুখে দিলে মুখ নষ্ট করে দেয়।  রোজ রোজ কত জন্ম হয়, কত যে উপড়িয়ে ফেলা হয়, তার হিসেব আল্লাহই জানেন। এগুলোর এরূপ অবস্থা কেন? কারণ এগুলোর মধ্যে আম গাছের মত অতখানি জোর নেই। জমিতে যখন ভাল জাতের গাছ হয়না, তখন জমি বেকার পড়ে থেকে একেবারে হতাশ হয়ে যায়। কাজেই সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এসব আগাছা পরগাছাকে তার বুকে স্থান দেয়। পানি কিছু সাহায্য করে, বাযু তার কিছু শক্তি দান করে; কিন্তু আকাশ ও পৃথিবীর কোন জিনিসই এসব পরগাছার কোন স্বত্ব স্বীকার করতে চায়না। এজন্য জমি তার বুকের মধ্যে এদের শিকড় বিস্তৃত হতে দেয় না। পানি ওর খুব বেশী সাহায্য করে না। আর বায়ু ওকে প্রাণ খুলে বাতাস দান করে না। এভাবে টানাটানানির পর যখন ওটা একটু মাথা জাগায়, তখন তা এত তিক্ত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে যাতে প্রমান হয়ে যায় যে, আকাশ ও পৃথিবীর  শক্তি সমুহ মূলত এ আগাছা জন্মাবার জন্য নয়। আগাছাগুলো প্রকৃতির বুক হতে সামান্য কিছু শক্তি যে পেয়েছে এদের পক্ষে এটাই মস্ত ভাগ্যের কথা।
এ দুটি উদাহরণ সামনে রাখুন, তারপর কালেমায়ে তাইয়্যেবা ও কালেমায়ে খাবীসার পার্থক্য সম্পর্কে ভাল করে চিন্তা করুন।
কালেমায়ে তাইয়্যেবা কি?
•••••••••• একটা সত্য কথা, এমন সত্য কথা যে, এ দুনিয়ায় তা অপেক্ষা অধিক সত্য কথা এর একটিও নেই। এক আল্লাহই সারেজাহানের ইলাহ, আকাশ ও পৃথিবীর  প্রত্যেকটি জিনিসই একথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। মানুষ, জানোয়ার, গাছ, পাথর, বালুকণা, প্রবাহমান ঝর্ণা, উজ্জ্বল সূর্য চারদিকে বিস্তৃত  এই সমস্ত জিনিস -- এর কোনটাকে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেননি?  আল্লাহ ছাড়া আর কেউ কি এ গুলোকে সৃষ্টি করেছেন? তাঁর দয়া ও মেহেরবানী ছাড়া অন্য কারো অনুগ্রহে কি এগুলো বেচেঁ আছে? এদের মধ্যে কোন একটিকে ও কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ জীবন বা মৃত্যু  দান করতে পারে? এই সারেজাহান যখন আল্লাহ তাআলারই সৃষ্টি তাঁরই দয়ায়  যখন এসবকিছু বর্তমান আছে এবং তিনিই যখন এসবের একমাত্র মালিক ও হুকুমদাতা, তখন যে সময়েই আপনি বলবেন এ পৃথিবীতে সে এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোও প্রভুত্ব বা খোদায়ী নেই, তৎক্ষনাৎই আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটা জিনিসই বলে ওঠবেঃ তুমি সত্য কথা বলেছো, আমরা সকলেই তোমার কথার সত্যতার সাক্ষ্য দিচ্ছি।  সেই আল্লাহর সামনে যখন আপনি মাথা নত করবেন, বিশ্বভুবনের প্রত্যেকটি জিনিসই আপনার সাথে তারই সামনে ঝুকেঁ পড়বে। কারণ, ••••••••••• এই সমস্ত জিনিসও একমাত্র তারঁই ইবাদত করে। আপনি যখন তাঁরই হুকুম পালন করে বলবেন,তখন আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিসই আপনার সাক্ষী হবে। কারণ এসবই যে একমাত্র তাঁরই অনুগত। আপনি যখন তাঁর পথে চলতে শুরু করবেন, তখন আপনি একাকী হবেন না, এ নিখিল জাহানের অগণিত ‘সৈন্য’ আপনার সাথে চলতে আরম্ভ করবে। কারণ, আকাশের সূর্য হতে শুরু করে পৃথিবীর ক্ষদ্রতম বস্তুকণা পর্যন্ত সর্বদা তাঁরই নির্ধারিত পথে চলছে। আপনি যখন সেই এক আল্লাহর ওপর নির্ভর করবেন, তখন সামান্য শক্তির ওপর নির্ভর করা হবে না-আপনার ভরসা করা হবে এমন এক বিরাট শক্তির ওপর,যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত শক্তি ও ধন -সম্পদের একমাত্র মালিক। মোটকথা, এই নিগুড় তত্ত্ব যদিও আপনি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে চলেন• তবে আপনি ভাল করেই জানতে পারবেন যে কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান এনে যে ব্যাক্তি  নিজের জীবনকে সেই আদর্শ অণুসারে গঠন করে নেবে, আকাশ ও পৃথিবীর যাবতীয় শক্তিই তার সাহায্য কাজে নিযুক্ত হবে। দুনিয়ার জীবন হতে পরকাল পর্যন্ত সে কেবল উন্নতি করতে থাকবে। তার কোন চেষ্টাই ব্যর্থ হবে না। কোন উদ্দেশ্যই অপূর্ণ থাকতে পারবেনা। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা একথাই বলেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃ এই কালেমা এমন একটা গাছ, যার শিকড় গভীর মাটির তলে মজবুত হয়ে গেঁথে রয়েছে এবং শাখা প্রশাখা আকাশের মহাশূন্য বিস্তৃত হয়ে আছে। আর সব সময়ই তারা আল্লাহর হুকুমে ফলদান করে থাকে।
‘কালেমায়ে খাবীসাহ’এর সম্পূর্ন বিপরীত মতবাদ উপস্থিত করে। ‘কালেমায়ে খাবীসাহ’ অর্থঃ এ দুনিয়ার ইলাহ বা সৃষ্টিকর্তা কেউ নেই, কিংবা এ দুনিয়ায় একাধিক ইলাহ রয়েছে। একটু চিন্তা করে দেখলেই বুঝতে পারবেন যে তা অপেক্ষা বড় মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন কথা আর কিছুই হতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুই বলে ওঠে, তুমি মিথ্যাবাদী, নিশ্চয়ই আল্লাহ আছেন। আমাদেরকে আর তোমাদেরকে সেই আল্লাহই তো সৃষ্টি করেছেন। আর সে আল্লাহই তোমাকে ঐ জিহ্বা দিয়েছেন  যার দ্বারা তুমি এতবড় একটা মিথ্যা কথা বলছো। মুশরিক বলে যে,আল্লাহ এক নয়, তাঁর সাথে আরও অনেক দেবদেবী রয়েছে। তারাও রেযেক দেয়, তারাও তোমাদের মালিক তারাও তোমাদের ভাগ্য গড়তে ও ভাঙতে পারে। উপকার করা কিংবা ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদেরও আছে তোমাদের  দোয়া তারাও শুনতে পারে। তারাও তোমাদের মকসুদ পূর্ণ করতে পারে, তাদেরকে ভয় করে চলা উচিত। তাদের ওপর ভরসা করা যেতে পারে। দুনিয়া পরিচালনার ব্যাপারে তাদেরও হুকুম চলে। আল্লাহ ছাড়া তাদেরও হুকুম পালন করে চলা কর্তব্য ।  এসবই কালেমায়ে খাবীসাহ। এসব কথার উত্তরে আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস বলে ওঠেঃ তুমি মিথ্যাবাদী  তোমার প্রত্যেকটা কথাই সত্যের বিলকুল খেলাপ। এখন ভেবে দেখুন এ কালেমা যে ব্যক্তি কবুল করবে এবং সে অণুসারে নিজের জীবনকে গঠন করবে, দুনিয়া ও আখেরাতে সে কেমন করে উন্নতি লাভ করতে পারে? আল্লাহ অণুগ্রহ করে এসব লোককে অবসর ও অবকাশ দিয়ে রেখেছেন এবং রেযেক দেবারও ওয়াদা করেছেন। কাজেই আকাশ ও পৃথিবীর শক্তিগুলো কিছু না কিছু পরিমাণে তাদেরকে প্রতিপালন করবে- যেমন বন--  জঙ্গলে আগাছা পরগাছাগুলোকে করছে। কিন্তু পৃথিবীর কোন একটা জিনিসও আগ্রহ করে তাদেরকে সাহায্য করবেনা। এবং পূর্ণশক্তি দিয়ে তাদের সহায়তা করবে না। তারা ঠিক জঙ্গলের আগাছার মতই কিছুদিন মাত্র বেঁচে থাকতে পারবে তার-  বেশী নয়।

উক্তরূপ পার্থক্য এ কালেমাদ্বয়ের পরিণাম ফলের ব্যাপারে ও বর্তমান রয়েছে। ‘কালেমায়ে তাইয়্যেবা’ যখন ফল দান করবে, তখন তা খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদুই হবে। দুনিয়ার বুকে তা দ্বারা শান্তি স্থাপিত হবে। চারদিকে সত্য ও পূর্ণ সুবিচার কায়েম হবে। কিন্তু কালেমায়ে খাবীসাহ যতই বৃদ্ধি পাবে, কেবল কাঁটায় ভরা ডাল-- পালাই তা হতে বের হবে। তিক্ত ও বিষাক্ত ফল তাতে ফলবে। এর শিরায় শিরায় বিষ ভরা থাকবে। নিজেদের চোখ দিয়েই আপনারা তা দেখে নিতে পারেন। দুনিয়ার যেখানেই কুফরি শিরক এবং নাস্তিকতার জোর বেশী, সেখানে কী হচ্ছে? সেখানে মানুষ মানুষের রক্ত পান করছে। দেশের পর দেশ গ্রামের পর গ্রামে ধ্বংস করার আয়োজন খুব জোরের সাথেই চলছে। বিষাক্ত গ্যাস তৈরী হচ্ছে। এক জাতি অন্য জাতিকে সমূলে ধবংস করার জন্যে ওঠেপড়ে লেগেছে। শক্তিমান দুর্বল ব্যক্তিগণকে নিজের গোলাম বানিয়ে রেখেছে --তার ভাগের রুটি কেড়ে নেবার জন্য শুধু দুর্বল মানুষকে সেখানে সৈন্য, পুলিশ, জেল ও ফাঁসির ভয় দেখিয়ে অবনমিত করে রাখার এবং শক্তিশালী জাতির যুলুম নীরবে সহ্য করার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া এসব জাতির ভিতরের অবস্থা আরও ভয়ানক খারাপ। তাদের নৈতিক চরিত্র এতই কদর্য যে, স্বয়ং শয়তানও তা দেখে লজ্জাপায়। মানুষ সেখানে জন্তু -জানোয়ার অপেক্ষাও হীনতর কাজ করছে। মায়েরা সেখানে নিজেদের হাতেই নিজেদের সন্তানকে হত্যা করছে- যেন এ সন্তান সুখ-সম্ভোগের পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। স্বামীরা সেখানে নিজেদের স্ত্রীদেরকে অন্যের কোলে ঠেলে দিচ্ছে শুধু পরের  স্ত্রীকে নিজের বুকে পাবার  উদ্দেশ্যে। উলংগদের ক্লাব ঘর তৈরী করা হয়েছে, সেখানে নারী --পুরুষ পশুর মত উলংগ হয়ে চলাফেরা করছে। ধনী ব্যক্তি সুদ গ্রহণ করে গরীবদের প্রতি কেনা গোলামের ন্যায় ব্যবহার করছে মনে হয়। কেবল তারেই খেদমত করার জন্য দুনিয়ায় এদের জন্ম হয়েছে। মোটকথা এই কালেমায়ে খাবীসার দরুন সেখানে কাঁটায় চারদিকে ভরে গেছে; আর যে ফলই তাতে ফলছে তা হয়েছে ভয়ানক তিক্ত ও বিষাক্ত।
  আল্লাহ তাআলা এ দুটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করার পর বলেছেন, কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি যারা ঈমান আনবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে একটি মজবুত বাণীর সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন--তারা অটল ও অক্ষয় হবে। আর তার মোকাবিলায় কালেমায়ে খাবীসাতে যারা বিশ্বাস করবে, আল্লাহ তাআলা তাদের সকল আয়োজন ও চেষ্টাকেই ব্যর্থ করে দেবন। তারা কখনই কোন সহজ কাজ করতে পারবে না। তা দ্বারা দুনিয়ায় কিংবা আখেরাতে তাদের কিছুমাত্র কল্যাণ ও সাধিত হতে পারে না। কালেমায়ে তাইয়্যেবা ও কালেমায়ে খাবীসার পার্থক্য ও উভয়ের ফলাফল আপনারা শুনলেন। এখন আপনারা অবশ্যই জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, আমরাও কালেমায়ে তাইয়্যেবাকে মানি; কিন্তু তবু কোন কারণে আমাদের উন্নতি হয় না?  আর যে কাফেরগণ কালেমায়ে খাবিসাকে বিশ্বাস করে  তারাই বা কোন কারণে এত শক্তিমান ও উন্নত হচ্ছে।
এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার ভার আমার ওপর। আমি এর জবার দেব, কিন্তু পূর্বেই বলেছি, আমার জবাব শুনে কেউ রাগ করতে পারবেন না। আমার জবাব ঠিক কি না আপনারা শুধু তাই বিচার করে দেখবেন।
    আপনারা কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান এনেছেন বলে দাবী করেন এবং তবুও আপনাদের উন্নতি হচ্ছে না, প্রথম এ কথাটাই সত্য। কারণ কেবল মুখে মুখে কালেমায়ে তাইয়্যেবা পড়লেই কোন  কাজ হয়না তা মন দিয়ে পড়তে হবে। মন দিয়ে পড়ার অর্থ বিশ্বাস ও মতবাদের পরিবর্তন করা। এর বিরোধী কোন বাদ বা মতবাদ যেন কালেমা বিশ্বাসী ব্যক্তির মনে স্থান না পায় এবং কালেমার নির্দেশের বিপরীত কোন কাজও যেন সে কখনও না করে। কিন্তুবলুন, আপনাদের প্রকৃত অবস্থা কি এরূপ? আপনাদের মধ্যে কি কালেমায়ে তাইয়্যেবার বিপরীত হাজারও কুফরি ও মুশরিকী ধারণা বর্তমান নেই? মুসলমানের মাথা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও সামনে নত হয় না? মুসলমান আল্লাহ ছাড়া অন্য লোককে কি ভয় করে না?  অন্যের সাহায্যের ওপর কি ভরসা করে না? আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কি তারা রেযেকদাতা বলে বিশ্বাস করে না? আল্লাহর  আইনকে ছেড়ে দিয়ে তারা খুশী হয়েই কি অন্যের আইন অনুসরণ করে চলেনা? মুসলমান হবার দাবীদার লোকেরা আদালতে গিয়ে পরিস্কার ভাবে বলে না যে, আমরা শরীয়াতের বিচার চাই না? আমরা দেশের প্রচলিত প্রথামত বিচার চাই? আপনাদের মধ্যে এমন কোন লোক কি নেই, যারা দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ লাভের জন্য আল্লাহর আইন লংঘন করতে একটু পরোয়া করে না? আপনাদের মধ্যে এমন লোক কি নেই, যারা কাফেরদের ক্রোধের ভয়ে ভীত; কিন্তু আল্লাহর গযবকে মোটেই ভয় করে না? এমন লোক কি আপনাদের মধ্যে নেই যারা কাফেরদের কৃপাদৃষ্টি লাভ করার জন্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত, কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ দৃষ্টি লাভ করার জন্য কিছুই করতে রাজী নয়? এমন  লোকও কি নেই, যারা কাফেরদের রাজত্বকে রাজত্ব বলে মনে করে, কিন্তু আল্লাহর রাজত্ব যে কোথাও বর্তমান আছে, সেই কথা তাদের একবারেই মনে পড়ে না?  সত্য করে বলুন, এসব কথা কি সত্য নয়? যদি বাস্তবিকই সত্য হয়ে থাকে, তবে আপনারা কালেমায়ে তাইয়্যেবাকে স্বীকার করেন এবং তা সত্বেও আপনাদের উন্নতি হয়না একথা কোন মুখে বলতে পারেন? প্রথমে খাঁটি মনে ঈমান আনুন এবং কালেমায়ে তাইয়্যেবা অনুসারে জীবনকে গঠণ করুন। তারপর যদি গভীর মাটির তলে মজবুত শিকড় ও শুন্য আকাশে বিস্তৃত শাখার সেই মহান গাছের জন্ম না হয়। তখন বলতে পারবেন যে আল্লাহ মিথ্যা ওয়াদা করেছেন (নাউযুবিল্লাহ )। পরন্তু কালেমায়ে খাবীসাহ বিশ্বাসী লোক দুনিয়ায় খুবই উন্নতি লাভ করছে বলে মনে করাও সর্ম্পূণরূপে ভুল। কারণ কালেমায়ে খাবীসাকে যারা মানবে তারা উন্নতি লাভ করতে পারে না; অতীতে কখনও পারেনি আর এখনও পারছে না। তাদের ধন-দৌলত,সুখ-- শান্তি  ও স্ফুর্তির জীবন, বিলাসিতা ও আনন্দের সাজ-- সরঞ্জাম এবং বাহ্যিক শান-শওকত দেখে আপনারা হয়ত মনে করেছেন যে, তারা আসলে বুঝি খুবই উন্নতি করছে। কিন্তু আপনারা তাদের মনের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তাদের মধ্যে কতজন লোক বাস্তবিকই শান্তিতে আছে? বিলাসিতা ও সুখের সরঞ্জাম তাদের প্রচুর আছে; কিন্তু মনের মধ্যে আগুনের উল্কাপিন্ড সবসময় দাউ দাউ করে জ্বলছে। এ জন্যই তারা এক আল্লাহকে পেতে পারে না। আল্লাহর আইনের অমান্য করার কারণে তাদের প্রত্যেকটি পরিবারে জাহান্নামের অগ্নিকুন্ডে পরিণত হচ্ছে। খবরের কাগজ খুলে দেখুন, ইউরোপ ও আমেরিকায় আত্নহত্যার হিড়িক পড়ে গেছে। কত অসংখ্য তালাক দিন রাত সংঘটিত হচ্ছে। সেই দেশের  সন্তান কিভাবে নষ্ট করা হচ্ছে এবং ওষুধ ব্যবহার করে জন্মের হার কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। নানা প্রকার দূষিত রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের মধ্যে খাদ্য নিয়ে কিভাবে টানাটানি ও কাড়াকাড়ি চলছে। হিংসা -দ্বেষ এবং শত্রুতা একজাতীয় মানুষের মধ্যে কিভাবে যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিয়েছে। বিলাসিতার চাকচিক্যময় শহরে দূর হতে দেখে যাকে আপনারা স্বর্গের সমান মনে করেন -- লক্ষ লক্ষ লোক কি দঃখের জীবন যাপন করছে,তা ভাবলেও শরীর শিউরে ওঠে।•••••••••এটাকে কি কখনও উন্নতি বলে মনে করা যায়? এ স্বর্গ পাবার জন্যই কি আপনারা লালায়িত?
মনে রাখবেন, আল্লাহর বাণী কখনও মিথ্যে হতে পারেনা। বাস্তবিকই কালেমায়ে তাইয্যেবা ছাড়া আর কোন কালেমা এমন নেই, যা অনুসরণ করে মানুষ দুনিয়ায় সুখ এবং পরকালে মহাশান্তি লাভ করতে পারে। যেদিকে ইচ্ছে আপনারা চোখ খলে দেখুন, এ সত্যের বিপরীত আপনারা কোথাও দেখতে পারেন না।

কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্য

 পূর্বেই দুটি প্রবন্ধে কালেমায়ে তাইয়্যেবার বিশদ অর্থ আপনাদের সামনে ব্যক্ত করেছি। বর্তমান প্রবন্ধে আমি কালেমায়ে তাইয়্যেবার প্রতি ঈমান আনার আবশ্যকতা  এবং তার উপকারিতা ব্যক্ত করতে চেষ্টা করবো।
 আপনারা সকলে জানেন যে, মানুষ দুনিয়ায় যে কাজই করুক না কেন, তার মূলে একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই বর্তমান থাকে এবং কিছু না কিছু উপকার পাবার জন্যই মানুষ সে কাজ করে থাকে। বিনা উদ্দেশ্যে, বিনা গরজে এবং বিনা উপকারিতায় কোন কাজ কেউই করে না। আপনারা পানি পান করেন কেন?  পান করেন এ জন্য যে, তাতে আপনাদের পিপাসা নিবারণ হয়। কিন্তু পানি পান করার পরও যদি আনপাদের পিপাসা না মিটত তবে আপনারা কিছুতেই পানি পান করতেন না। কারণ এ পানি পান করায় কোন ফল নেই। আপনারা খাদ্যদ্রব্য কেন আহার করেন? এ উদ্দেশ্যে যে তাতে আপনাদের ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে এবং আপনাদের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু আহার ও অনাহার উভয়েরই ফল যদি একরূপ হয়। তবে খাদ্য ভক্ষণের কাজটাকে আপনারা একটা বাজে কাজ বলে মনে করতেন। রোগ হলে আপনারা ওষুধ সেবন করেন এ জন্যে যে তাতে রোগ দূর হয়ে যাবে এবং আপনারা পূর্ণ স্বাস্থ্যবান হবেন; কিন্তু ওষুধ সেবন করার পরও যদি রোগ দূর না হয় বরং পূর্বের মতই অবস্থা বর্তমান থাকে তাহলে আপনি অবশ্যই বলবেন, এ ওষুধ সেবন করা সম্পূর্ণ নিষ্ফল। কৃষি কাজে আনপারা এত পরিশ্রম করেন কেন? করেন এ জন্য যে আপনারা এর দ্বারা শস্য ফল ও নানা রকমের তরিতকারী পেতে পারেন। কিন্তু বীজ বপন করার পরও যদি জমিতে কোন শস্য না হয় তবে আপনারা হাল-- চাষ, বীজ বোনা এবং তাতে পানি দেয়ার জন্য এতদূর  কষ্ট কিছুতেই স্বীকার করতেন না। মোটকথা দুনিয়ায় আপনারা যে কাজই কারেননা কেন, তাতে উদ্দেশ্য সফল হলে কাজ ঠিকমত হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে আপনারা বলেন যে কাজ ঠিকমত করা হয়নি।

এ নিগূঢ় কথাটি মনে রাখুন তারপর আপনারা আমার এক একটা প্রশ্নের জবাব দিতে থাকুন। প্রথম প্রশ্ন এই যে কালেমা পড়া হয় কেন? এ প্রশ্নের জবাবে  আপনি এছাড়া আর কিছুই বলতে পারেন না যে কালেমা পড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে এর দ্বারা কাফের ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করতে চাইযে, কাফের ও মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য কি?  এর অর্থ কি এই যে কাফেরের দুটি চোখ,কাজেই মুসলমান কালেমা পড়লে তার চারটি চোখ হবে? অথবা কাফেরের মাথা একটি কাজেই মুসলমানের মাথা দু’টো হবে? আপনি নিশ্চয়ই বলবেন যে না এখানে দৈহিক পার্থক্যের কথা বলা হচ্ছে না। পার্থক্য হওয়ার আসল অর্থ এই যে কাফেরের পরিণাম ও মুসলমানের পরিণাম পার্থক্য হবে। কাফেরের পরিণাম এই যে পরকালে সে আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হবে এবং তার জীবনের উদ্দেশ্য বিফল হয়ে যাবে। আর মুসলমানের পরিণাম এইযে, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে এবং পরকালে সে সফল হবে-মহাসুখে কাল যাপন করবে।
আপনাদের এ জবাব শুনে আমি বলবো যে আপনারা ঠিক জবাবই দিয়েছেন। কিন্তু আপনারা আমাকে বলুন পরকাল কাকে বলে? পরকাল বিফল ও সার্থক হওয়ার অর্থ কি?  আর সেখানে সফলতা ও কামিয়াবী লাভের তাৎপর্যই বা কি?  এ কথাগুলো ভাল করে বুঝে নিতে না পারলে পরবর্তী আলোচনা শুরু করা যায় না।
এ প্রশ্নের জবাব আপনাকে দিতে হবে না। পূর্বেই এর জবাব দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছেঃ **** “ইহকাল পরকালের কৃষি ক্ষেত”।

দুনিয়া ও আখেরাত দুটি ভিন্ন জিনিস নয়। উভয়ই মানুষের একই পথের দু’টি মনজিল। দুনিয়া এ পথের প্রথম মনজিল,আর আখেরাত সর্বশেষ মনজিল। জমি চাষ করা এবং তা হতে ফসল পাওয়ার মধ্যে যে সম্পর্ক এ দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে ঠিক সে সম্পর্কই বিদ্যমান। আপনারা জমিতে হাল চাষ করেন, তার পরে বীজ বপন করেন, দরকার হলে তাতে পানি দেন, তার পরে ফসল পেতে পারেন। আপনি  জমিতে যে জিনিসেরই চাষ করবেন, ফলও তারই পাবেন। ধান বপন করলে ধান পাবেন, পাট বপন করলে পাট পাবেন, গম বপন করলে গমেরই ফসল পাবেন,কাঁটার গাছ যদি বপন করেন, তবে কাঁটার গাছই আপনার ক্ষেতে জন্মাবে। আর যদি কিছুই বপন  না করন, তবে আপনার ক্ষেতে  কিছুই জন্মাবে না। তারপর হাল-চাষ করতে, বীজ বপন করতে, তাতে দরকার মত পানি দিতে এবং ক্ষেতের দেখাশুনা করতে যে ভুল ত্রুটি আপনার দ্বারা হয় তার মন্দ ফল আপনার ফসল কাটার সময় জানতে পারেন। আর এসব কাজ যদি আপনি খুব ভালভাবে করে থাকেন, তবে ফসল কাটার সময়ই আপনি এর বাস্তব ফল দেখতে পাবেন। দুণিয়া ও আখেরাতের অবস্থাও ঠিক এরূপ। দুনিয়াকে মনে করেন একটা ক্ষেত। এখানে নিজের পরিশ্র্রম ও চেষ্টার দ্বারা নিজের জন্যে ফসল উৎপন্ন করার উদ্দেশ্যে মানুষকে পাঠানো হয়েছে। জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে চাষাবাদের জন্য সময় দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মানুষ যে ফসলেই চাষ করে, সেই ফসলেই সে মৃত্যুর পরে পরকালের জীবনে পেতে পারবে,আর যে ফসলই সেখানে পাবে তারই পরকালীন জীবন একমাত্র তারই ওপর নির্ভর করবে। যদি কেউ দুনিয়ায় জীবন ভরে ভাল ফসলের চাষ করে, তাতে দরকার মত পানি দেয় এবং তার দেখাশুনাও যদি খুব ভালভাবে করে, তবে পরকালের জীবনে সে যখনই পা রাখবে, তখনই তার পরিশ্রমের ফলস্বরূপ একটি ফলে-- ফুলে ভরা শ্যামল বাগিচা দেখতে পাবেন। তাকে এ পরকালের জীবনে আর কোন পরিশ্রম করতে  হবে না। বরং দুনিয়ার জীবন সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে অতিবাহিত হবে। এ জিনিসেরই নাম হচ্ছে জান্নাত। এটা লাভ করতে পারলেই বুঝতে হবে যে পরকালে সে সফল ও কামিয়াব হয়েছে।
কিন্তু যে ব্যক্তি তার দুনিয়ার জীবনে কেবল কাঁটা, তিক্ত ও  বিষাক্ত ফলের বীজ বপন করে, পরকালের জীবনে শুধু তারই ফসল পাবে  সেখানে খারাপ ফসল নষ্ট করে দিয়ে ভাল ফসল তৈরী করার এবং নিজের এ নির্বুদ্ধিতার পরিবর্তে বুদ্ধিমানের মত কাজ করার কোন সুয়োগ বা সময় সে আর পাবেনা। সেই খারাপ ফসলের দ্বারাই পরকালের সমস্ত জীবন কাটাতে হবে, কারণ দুনিয়ায় সে শুধু এরই চাষ করেছে। যে কাঁটা সে রোপণ করেছিল, পরকালে তাকে সেই কাঁটার শয্যায়ই শায়িত করা হবে। আর যে তিক্ত ও বিষাক্ত ফলের চাষ করে ছিল, সেখানে তাঁকে তাই ভোগ করতে হবে। পরকালে ব্যর্থ ও বিফল হওয়ার অর্থ এটাই।
 আখেরাতের ব্যাখ্যা এইমাত্র আমি করলাম, কুরআন ও হাদীস হতেও এটাই প্রমাণিত হয়। এ ব্যাখ্যা হতে নিঃসন্দেহে জানা গেল যে, পরকালের জীবনে মানুষের বিফল কিংবা সফল হওয়া এবং তার পরিণাম ভাল কিংবা মন্দ হওয়া প্রকৃত পক্ষে তার এ দুনিয়ার জীবনের ইলম ও আমল, জ্ঞানও কাজের ভাল কিয়ভা মন্দ হওয়ারই একমাত্র ফল  এতে কোন সন্দেহ নেই।
এ কথাটি বুঝে নেয়ার সাথে সাথে এ কথাটিও অতি সহজেই বুঝতে পারবেন যে, মুসলমান ও কাফেরের পরিণাম ফলের পার্থক্য বিনা কারণে হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে পরিণামের পার্থক্য প্রথম সূচনার পার্থক্যের ফলমাত্র। দুনিয়ায় যদি মুসলমান এবং কাফেরের জ্ঞান ও কাজের পার্থক্য  না হয়। তবে পরাকালেও তাদের পরিণামের দিক দিয়ে কোনই পার্থক্য হতে পারে না। দুনিয়ায় এক ব্যক্তির জ্ঞান ও কাজ ঠিক একজন কাফেরের জ্ঞান ও কাজের মতই হবে অথচ পরকালে কাফেরের দুঃখময় পরিণাম হতে সে বেঁচে যাবে, এটা কিছুতেই হতে পারেনা।
এখন আবার সেই গোড়ার প্রশ্ন জেগে ওঠে যে, কালেমা পড়ার উদ্দেশ্য কি? প্রথমে আপনি এ প্রশ্নের জবাবে বলেছেন যে, কাফেরের পরিণাম ও মুসরমানের পরিণামে পার্থক্য হওয়াই কালেমা পড়ার একমাত্র উদ্দেশ্য। তারপরে ও আপনি পরিণাম ও পরকালের যে ব্যাখ্যা শুনিয়েছেন, সেই অনুসারে আপনার প্রদত্ত  জবাব সম্পর্কে আপনাকে আবার একটু ভেবে দেখতে হবে এবং আপনাকে এখন এ কথাই বলতে হবে যে কালোমা পড়ার উদ্দেশ্য দুনিয়ার মানুষের ইলম বা জ্ঞান ও কাজকে ঠিক এমনভাবে  করা -যেন পরকালে তার পরিণাম ভাল হয়। পরকাল মানুষকে এ দুনিয়ায় সেই ফলের বাগান তৈরির কাজ শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি এ কালেমা কেই স্বীকার না করে তবে সেই বাগানই বা তৈরি করবে কি করে, আর পরকালে সে কিসের ফল ভোগ করবে?  মানুষ যদি কেবল মুখে মুখেই এ কালেমা পড়ে; কিন্তু তার জ্ঞান যদি কালেমা না পড়া ব্যক্তির মত হয় এবং তার কাজ- কর্ম যদি একজন কাফেরের মত হয়, তাহলে তার বিবেক বলে ওঠবে যে, এভাবে কালেমা পড়ায় কোনই লাভ নেই। এমন ব্যক্তির পরিণাম একজন কাফেরের পরিণামের চেয়ে ভাল হবার কোন কারণ থাকতে পারে না। শুধু মুখ দিয়ে কালেমা পড়ে আল্লাহর ওপর সে কোন অনুগ্রহ করেনি। কজেই বাগান বানাবার নিয়ম না শিখে বাগান তৈরি না করে এবং সারা জীবন কেবল কাঁটার চাষ করে কোন মানুষই পরকালের সবুজ শ্যামল ও ফুলে -ফলে ভরা বাগান লাভ করতে পারে না। এরূপ ধারণা করাও আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। পূর্বে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে প্রকাশ করেছি, যে কাজ করা এবং না করা উভয়েরই ফল এক রকম, সেই  কাজের কোন দাম নেই তা  একেবারেই অর্থহীন। যে ওষুধ সেবন করার পরও রুগীর অবস্থা ঠিক সেই রকমই থাকে যেমন ছিল ওষুধ পান করার পূর্বে,তা আসলে ওষুধ নয়। ঠিক এ রকমই কালেমা পড়া মানুষের জ্ঞান এবং কাজ যদি ঠিক কালেমা না পড়া লোকদের মতই  থাকে তবে এমন কালেমা পড়া একেবারেই অর্থহীন। দুনিয়ায়ই যখন কাফের ও মুসলমানের বাস্তব জীবনধারায় কোনরূপ পার্থক্য হলোনা তখন পরকালে তাদের পরিণাম ফল ভিন্ন ভিন্ন হবে কেন?
এখন কালেমায়ে তাইয়্যেবা মানুষকে কোন ধরনের জ্ঞান শিক্ষা দেয় এবং সেই জ্ঞান শেখার পর মুসলমান ও কাফেরের  দৈনন্দিন কাজে কোন ধরনের পার্থক্য হওয়া বাঞ্ছনীয় তারই আলোচনা করবো।
 দেখুন, এ কালেমা হতে আপনি সর্বপ্রথম জানতে পারেন যে, আপনি আল্লাহর বান্দাহ, আর কারো বান্দাহ আপনি নন। একথা যখন আপনি জানতে পরলেন তখন আপনা আপনি এ কথাও আপনার জানা হয়ে গেল যে আপনি যার বান্দাহ দুনিয়ায় তাঁরই মর্জিমত আপনাকে কাজ করতে হবে। কারণ তাঁর মর্জির খেলাপ যদি আপনি চলেন বা কাজ করেন, তবে আপনার মালিকের বিরুদ্ধে আপনার বিদ্রোহ করা হবে।

অতএব এ কালেমা আপনাকে শিক্ষা দেয় যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসূল। একথা জেনে নেয়ার সাথে সাথে একথাও আপনি জানতে পারলেন যে,আল্লাহর রাসূল দনিয়ার ক্ষেতে কাঁটা ও বিষাক্ত ফলের চাষ করার পরিবর্তে ফুল এবং মিষ্ট ফলের বাগান রচনা করার যে নিয়ম দেখিয়ে দিয়েছেন, আপনাকেও ঠিক সেই নিয়মেই কাজ করতে হবে। আপনি যদি সেই নিয়ম অনুসরণ করেন, তাহলেই পরকালে আপনি ভাল ফসল পেতে পারবেন। আর যদি তার বিপরীত পন্থায় কাজ করেন, তবে দুনিয়ায় আপনার কাঁটা চাষ করা হবে এবং পরকালে ঠিক কাঁটাই আপনি ফলস্বরূপ পাবেন, অন্য কিছু নয়।
এ জ্ঞান লাভের পর আপনার দৈনন্দিন জীবনধারাকেও সেইঅনুসারে গঠন করতে হবে। আপনি যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, আপনাকে একদিন মরতে হবে, মরার পরে একদিন এক ভিন্ন রকমের জীবন যাপন করতে হবে এবং সেই জীবনে আপনাকে এ দুনিয়ায় অর্জিত ফসলের ওপর নির্ভর করে চলতে হবে, তাহলে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর উপস্থাপিত নিয়ম ও বিধান অনুসরণ না করে অন্য কোন পন্থা অনুযায়ী চলা আপনার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। দুনিয়ায় আপনি চাষাবাদ করেন কেন?  করেন  এ জন্য যে চাষ না করলে ফসল পাওয়া যাবে না। আর ফসল না হলে না খেয়ে মরতে হবে--   এ কথার প্রতি আপনার খুবই বিশ্বাস আছে। আপনি যদি এ কথা বিশ্বাস না করতেন এবং যদি মনে করতেন যে চাষ না করলেও ফসল ফলবে কিংবা ফসল ছাড়াও আপনি বেঁচে থাকতে পারবেন, তাহলে আপনি চাষাবাদের জন্য এত পরিশ্রম কিছুতেই করতেন না। এখন আপনি নিজের সম্বন্ধে চিন্তা করুন। যে ব্যক্তি আল্লাহকে নিজের প্রভু ও মুহাম্মাদ (সা)-কে আল্লাহর রাসূল মুখে মুখে স্বীকার করে এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাস আছে বলে দাবী করে কিন্তু তার দৈনন্দিন জীবনে কাজ-- কর্ম আল্লাহর কুরআন ও রাসূল (সা) এর হাদীসের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় চলে, তার সম্বন্ধে জেনে রাখুন যে তার ঈমান  প্রকৃতপক্ষে অতিশয় দুর্বল। সে নিজের ক্ষেতের কাজ না করার মন্দ পরিণাম যেরূপ নিশ্চতার সাথে বিশ্বাস করে, যদি ততটুকু নিশ্চয়তার সাথে আখেরাতের জন্য ফসল তৈরি না করার দুঃখময় পরিণাম বিশ্বাস করতো তবে কখনই সে পরকালের কাজে এরূপ অবহেলা প্রদর্শন করতে পারতো না। কেউ জেনে শুনে নিজের ভবিষ্যতের জন্য কাঁটা বীজের চাষ করে না। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে না যে,কাঁটা রোপণ করলে তা হতে কাঁটাই জন্মাবে, আর সে কাঁটাই তাকে কষ্ট দেবে একমাত্র সেই ব্যক্তিই কাঁটা চাষ করতে পারে অন্য কেউ  নয়। আপনি জেনে শুনে আপনার হাতে জলন্ত অংগার কখনই নিতে পারেন না। কারণ আপনি নিশ্চিত জানেন যে, এতে হাত পুড়ে যাবে। কিন্তু একটি অবুঝ শিশু আগুনে হাত দেয়, কেননা তার পরিণাম যে কত কষ্টদায়ক তা সে আদৌ জানে না।
সর্বশেষ আপডেট ( Thursday, 26 August 2010 )
 



মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০

কালেমা- ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির প্রথম ও প্রাধান

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

নবী করীম (সা:)এরশাদ করেছেন: ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপর স্থাপিত : কালিমা-নামায-রোজা-হজ্ব-যাকাত (বুখারী ও মুসলিম)
উক্ত হাদীসে রাসূলে আকরাম (সা:) ইসলাম ধর্মের বুনিয়াদ অর্থাৎ ফাউন্ডেশন বা ভিত্তি প্রস্তর হিসাবে পাঁচটি জিনিসকে ঘোষনা করেছেন। তন্মধ্যে প্রথম এবং প্রধান হল কালিমা।

১. কালিমায়ে তাইয়িবাহ্ : শব্দের অর্থ-পবিত্র বাক্য।
আরবি : لآ اِلَهَ اِلّا اللّهُ مُحَمَّدٌ رَسُوُل اللّهِ
উচ্চারণ ঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
বাংলা অর্থ ঃ আল্লাহ এক আর কোন মাবুদ নেই। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।

২. কালিমা শাহাদৎ
আরবি : اشْهَدُ انْ لّآ اِلهَ اِلَّا اللّهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَه، وَ اَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدً اعَبْدُهوَرَسُولُه
উচ্চারণ ঃ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।
বাংলা অর্থ ঃ আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি এক। তাঁহার কোন অংশীদার নেই, এবং আমি আরও সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহ্র প্রেরিত বান্দা ও রাসূল।

৩. কালিমায়ে তাওহীদ :
لا اله الا انت وحدا لا ثانى لك محمد رسول الله امام المتقين رسول رب العلمين
উচ্চারণঃ- লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা ওয়াহিদাল্‌-লা-ছানিয়া-লাকা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহি ইমামুল মুত্তাক্বিনা রাসুলু রব্বিল আলামিন।
অর্থঃ- হে আল্লাহ্‌! তুমি ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নেই, তুমি এক, তোমার কোন দ্বিতীয় স্বত্ত্বা নেই, মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল। ধর্মভীরুদের ইমাম, তিনি জগতের প্রতিপালক প্রভূর মহান দূত।

৪. কালিমায়ে তামজীদ :
لااله الا انت نورا يهدى الله لنوره من يشاء محمد رسول الله امام المرسلين خاتم النبين
উচ্চারণঃ- লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা নূরাই ইয়াহ্‌দি আল্লাহু লিনূরিহি মাই-ইয়াশাউ-মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহি ইমামুল মুরছালিনা খাতামুন্‌ নাবিয়্যিন।
অর্থঃ- হে আল্লাহ্‌! তুমি ছাড়া নেই কোন ইলাহ্‌, তুমি জ্যোতির্ময় আল্লাহ্‌! তোমার নূর দ্বারা যাকে ইচ্ছা তাকেই সৎপথ প্রদর্শন করেছ। মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর বার্তাবাহক, সমস্ত রাসূলগণের ইমাম বা নেতা, সর্বশেষ নবী।


প্রশ্ন ১২৩ --> কালেমা কয়টি ও কি কি?
উত্তর :
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর। দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসূল (সা) এর উপর। পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।

আমাদের দেশে ইসলামী ঈমান-আকীদার বিবরণের ক্ষেত্রে ‘পাঁচটি কালিমা’র কথা প্রচলিত আছে। এছাড়া ঈমানে মুজমাল ও ঈমানে মুফাস্সাল নামে দুইটি ঈমানের কথা আছে। কায়েদা, আমপারা, দ্বীনিয়াত ও বিভিন্ন প্রচলিত বই পুস্তকে এই কালিমাগুলি রয়েছে। এগুলিকে অত্যন্ত  জরুরী মনে করা হয় এবং বিশেষভাবে মুখস্থ করা হয়। এই বাক্যগুলির অর্থ সুন্দর। তবে সবগুলি বাক্য এভাবে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয় নি। এগুলিকে সব কুরআনের কথা বা হাদীসের কথা মনে করলে ভুল হবে।

(১) কালিমায়ে শাহাদত
কুরআন ও হাদীসে ইসলামী ঈমান বা বিশ্বাসের মূল হিসাবে দু ইটি সাক্ষ্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আমাদের দেশে ‘কালিমা শাহাদত’ হিসাবে পরিচিত।  এই কালিমায়  আল্লাহর তাওহীদ এবং মুহাম্মাদ  (সা)  এর রিসালাতের সাক্ষ্য প্র দান করা  হয়। প্রকৃতপক্ষে  একমাত্র  কালিমা  শাহাদতই  হাদীস  শরীফে  ঈমানের  মূল  বাক্য  হিসাবে  উল্লে খ  করা  হয়েছে।  সালাতের  (নামাযের) ‘তাশাহ্ হুদের’ মধ্যে বাক্যদ্বয় এভাবে একত্রে বলা হয়েছে:

أَشْهَدُ أَنْ لا إلا الله و أَشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عََبْدُهُ وَ رَسولُهُ

আমি সাক্ষ্য  দিচ্ছি যে,  আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই এবং আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর
বান্দা ও রাসূল।”
এই ‘কালিমা’ বা বাক্যটি দুইটি বাক্যের সমন্বয়ে গঠিত।

প্রথম বাক্য:      أَشْهَدُ أَنْ لا إلا الله
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি  যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ (উপাস্য) নেই।”
এ প্রথম বাক্যটির ক্ষেত্রে কোনো কোনো হাদীসে বলা হয়েছে:

لا إِلَهَ إِلا اللهُ وَحْدَهُ لا شَرِيْكَ لَهُ
“আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই।”

দ্বিতীয় বাক্য:   و أَشْهَدُ أنَّ مُحَمَّدًا عََبْدُهُ وَ رَسولُهُ
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
আযানের মধ্যে এ বাক্যদ্বয়কে পৃথকভাবে উল্লে খ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বাক্যটির ক্ষেত্রে কোনো কোনো হাদীসে (أشهد) অর্থাৎ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি’ কথাটি পুনরাবৃত্তি না করে শুধুমাত্র ( وَ أَنَّ ) ‘এবং নিশ্চয়’ বলা হয়েছে। কোনো কোনো হাদীসে বাক্যদ্বয়ের শুরুতে (أشهد) বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে:

لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
দ্বিতীয় বাক্যটির ক্ষেত্রে  অনেক হাদীসে ( أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ) ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ কথাটির পরিবর্তে ( أَنَّ مُحَمَّدًا عََبْدُهُ وَ رَسولُهُ)   ‘মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল’ -  বলা হয়েছে।  এছাড়া কোনো কোনো হাদীসে ‘সাক্ষ্য প্রদান’ শব্দের পরিবর্তে ‘বলা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন হাদীসে আমরা এ কালেমাটিকে নিম্নের বিভিন্ন রূপে দেখতে পাই (বুখারী, আস-সহীহ, ১/১২, ২৯, ৩/১২৬৭; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৪৫, ৪৭, ৫৭, ৬১)

(১) প্রথম রূপ:     أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ و أَشْهَدُ أَنِّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(২) দ্বিতীয় রূপ:       أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ و أَنِّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(৩) তৃতীয় রূপ:     أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ و رَسولُهُ
(৪) চতুর্থ রূপ:         لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ و أَنِّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(৫) পঞ্চম রূপ:     أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ و رَسولُهُ

বিভিন্ন  হাদীসে  আমরা  দেখতে  পাই  যে,  সাহাবায়ে  কেরাম  ইসলাম  গ্রহণের  সময়ে  এ  উপরে  উল্লিখিত  এ  সকল  বাক্যের কোনো একটি পাঠ করে ইসলামের ছায়াতলে প্রবেশ করতেন। (বুখারী, আস-সহীহ ১/১৭৬, ৩/১২১১; মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩০২, ৩/১৩৮৬; নাসাঈ, আস-সুনান ১/১০৯)

(২) কালিমায়ে তাইয়েবা
আমাদের দেশে কালিমা তাইয়েবা বা ‘পবিত্র বাক্য’ বলতে বুঝানো হয় তাওহীদ ও রিসালাতের একত্রিত ঘোষণা:

لا إله إلا الله محمّدٌ رسول اللهِ
কুরআন কারীমে এরশাদ করা হয়েছে:
“তুমি কি দেখ নি, কিভাবে আল্লাহ একটি উদাহরণ পেশ করেছেন: একটি ‘কালিমায়ে তাইয়েবা’ বা পবিত্র বাক্য একটি পবিত্র বৃক্ষের মত, তার মূল প্রতিষ্ঠিত এবং তার শাখা-প্রশাখা আকাশে প্রসারিত।” (সূরা ইবরাহীম: ২৪)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) ও অন্যান্য মুফাস্সির থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, এখানে ‘কালিমা তাইয়েবা’ বলতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ তাওহীদের এ বাক্যটিকে বুঝানো হয়েছে। (তাফসির ইবনে কাসির)
কিন্তু (লা ইলাহা ইল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) দুইটি বাক্য একত্রিতভাবে কোনো হাদীসে কালিমা তাইয়েবা হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। আমরা দেখেছি যে, কালিমা শাহাদাতকে অনেক সময় “শাহাদাত” শব্দ উহ্য রেখে নিম্নরূপে বলা হয়েছে:
لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ و أَنِّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
কিন্তু মাঝখানে (وَ أَنَّ) বাদ দিয়ে উভয় অংশ একত্রে
لا إله إلا الله محمّدٌ رسول اللهِ
এভাবে ‘কালিমা’ হিসাবে  সহীহ হাদীসে  কোথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা যায় না।  কোনো কোনো হাদীসে  বর্ণিত হয়েছে যে, এভাবে এ বাক্যদ্বয় একত্রে আরশের গায়ে লিখা ছিল।  এ হাদীসগুলি  অত্যন্ত  দুর্বল  বা বানোয়াট। কোনো কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) -এর ঝাণ্ডা বা পতাকার গায়ে লিখা ছিল:
لا إله إلا الله محمّدٌ رسول اللهِ
এ অর্থের হাদীসগুলির সনদে দুর্বলতা আছে। (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৫/৩২১)

এখানে উল্লেখ্য যে, কালিমা তাইয়িবার দুটি অংশ পৃথকভাবে কুরআন কারীমে ও  হাদীস শরীফে উল্লে খ করা হয়েছে। উভয় বাক্যই কুরআনের অংশ এবং ঈমানের মূল সাক্ষ্যের প্রকাশ। উভয় বাক্যকে একত্রে বলার মধ্যে কোনো প্রকারের অসুবিধা নেই ।
তাবেয়ীগণের  যুগ  থেকেই  কালিমা  শাহাদতের  মূল  ঘোষণা  হিসাবে  এ  বাক্যটির  ব্যবহার  দেখতে  পাওয়া  যায়।  কুরআন  কারীমে ‘কালিমাতু তাকওয়া’  ‘তাকওয়ার বাক্য’ বলা হয়েছে (সূরা ফাতহ: ২৬) । এর ব্যাখ্যায় তাবিয়ী আতা আল-খুরাসানী (১৩৫ হি) বলেন: কালিমায়ে তাকওয়া হলো (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) ( তাফসিরে তাবারী)

(৩) কালিমায়ে তাওহীদ
কালিমায়ে তাওহীদ নামে আমাদের দেশে নিম্নের বাক্যটি প্রচলিত:
لا إلَهَ إلَّا أَنْتَ و احِدٌا لا ثَاني لَكَ مُحَمَّدٌ رَسولُ اللهِ إِمامُ المُتَّقينَ و رَسولُ رَبِّ العالَمينَ
এ বাক্যটির অর্থ সুন্দর। তবে এ  বাক্যটির কোনোরূপ গুরুত্ব এমনকি এর কোনো প্রকারের উল্লেখ বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যায় না।

(৪) কালিমায়ে তামজীদ
কালেমায়ে তামজীদ হিসাবে নিম্নে র বাক্যটি প্রচলিত:
لا إَلَهَ آلَّا أَنْتَ نورًا يَهْديْ اللهُ لِنورِهِ مَنْ يَشَاءُ مُحَمَّدٌ رَسولُ اللهِ إِمامُ المُرْسَلينَ خاتَمُ النَّبيِّينَ
এ বাক্যটির অর্থও সুন্দর। কিন্তু এভাবে এ বাক্যটি বলার কোনো নির্দেশনা, এর কোনো গুরুত্ব বা অস্তিত্ব কুরআন বা হাদীসে পাওয়া যায় না।

(৫) কালিমায়ে রাদ্দে কুফর
কালেমায়ে রাদ্দে কুফর নামে কয়েকটি বাক্য প্রচলিত আছে, যেমন:
اللَّهُمَّ إِنِّى أَعوذُ بِكَ مِنْ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْعًا و نُؤْمِنَ بِهِ و أَسْتَغْفِرُكَ مِمَّا أَعْلَمُ بِهِ وَ ما لا أَعْلَمُ بِهِ و أَتُوبُ و آَمَنْتُ وَ أَقُوْلُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللهِ
বাক্যগুলির অর্থ ভাল। কিন্তু বাক্যগুলি এভাবে কোনো হাদীসে পাওয়া যায় না এবং এই বাক্যের কোনো বিশেষ গুরুত্বও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।

(৬) ঈমানে মুজমাল

ইমানে মুজমাল নামে প্রচলিত বাক্যটির অর্থ সুন্দর  ও সঠিক।  তবে এরূপ  কোনো বাক্য কোনোভাবে কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয়নি।

(৭) ঈমানে মুফাস্সাল
ঈমানের পরিচয় দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ وَ مَلائِكَتِهِ و كُتُبِهِ و رُسُلِهِ و اليَومِ الآَخِرِ و تُؤْمِنَ بِالقَدْرِ خَيْرِهِ و شَرِّهِ
“তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর উপরে, তাঁর ফিরিশতাগণের উপরে, তাঁর কেতাবগুলির উপরে, তাঁর রাসূলগণের উপরে, শেষ দিবসের (আখেরাতের) উপরে, এবং তুমি ঈমান আনবে তাকদীরের উপরে: তার ভাল এবং তার মন্দের উপরে।” (মুসলিম, আস-সহীহ ১/৩৭; বুখারী, আস-সহীহ ১/২৭, ৪/১৭৯৩)

ঈমানের এ ছয়টি রুকন বা স্তম্ভের কথা কু রআন  ও হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে। লক্ষ্যণীয় যে, ‘ঈমানে মুফাস্সালের মধ্যে আখিরাতের বিশ্বাসকে পৃথক দুটি বাক্যাংশে প্রকাশ করা হয়েছে (ইয়াওমিল আখির) ও (বা’সি বা’দাল মাউত): শেষ দিবস ও মৃত্যুর পরে উত্থান। উভয় বিষয় একই।



মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তাবলী

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর শর্তাবলী


প্রথম শর্ত: الشرط الأول : (العلم ) ইলম বা জ্ঞান:
এ কালেমার না বাচক এবং হ্যাঁ বাচক দুটি অংশের অর্থ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা প্র্রয়োজন। অর্থ এবং উদ্দেশ্য না বুঝে শুধু মাত্র মুখে এ কালেমা উচ্চারণ করার মধ্যে কোন লাভ নেই। কেননা সে ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি এ কালেমার মর্মের উপর ঈমাান আনতে পারবে না। আর তখন এ ব্যক্তির উদাহরণ হবে ঐ লোকের মত যে লোক এমন এক অপরিচিত ভাষায় কথা বলা শুরু করল যে ভাষা সম্পর্কে তার সামান্যতম জ্ঞান নেই।
এই কালেমার অর্থ, আবেদন ও দাবী সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করা, অজ্ঞতা পরিহার করা: বান্দাকে অবশ্যই জানতে হবে, لا إله إلا الله এই কালিমার দাবি হচ্ছে- সত্যিকারার্থে আল্লাহ ছাড়া কেউ এবাদতের উপযুক্ত নয়। এরশাদ হচ্ছে
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِك

‘জেনে রাখুন, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। ক্ষমা প্র্রার্থনা করুন আপনার ত্রুটির জন্যে।’ (সূরা: মুহাম্মদ: ১৯)
রসূল সা. বলেছেন-
عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم: مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ رواه مسلم

‘যে ব্যক্তি لا إله إلا الله এর তাৎপর্য ও অর্থ জানাবস্থায় মারা গেল, সে জান্নাতে প্র্রবেশ করবে।’

২. الشرط الثاني ( اليقين ) কালিমা সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা: – এই কালেমার উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, সংশয়-সন্দেহ পরিত্যাগ করা।
لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করার মানে, এর ব্যাপারে কোনো ধরনের সংশয়, সন্দেহ বা কিংকর্তব্য বিমূঢ়তার বিন্ধুমাত্র শংমিশ্রন থাকতে পারবে না। এরশাদ হচ্ছে-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ

‘তারাই মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্র্রতি ঈমাান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ। (সূরা আল হুযুরাত: ১৫)
রাসূল (সা.) এরশাদ করেন –
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ ، لا يُلْقَى بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ فِيهِمَا إِلا دَخَلَ الْجَنَّةَ . أَخْرَجَهُ مُسْلِمٌ

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূূল।’ সংশয়হীনভাবে এ কালেমা পাঠকারী যদি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করে তবে জান্নাতের মধ্যে এবং তার মধ্যে কোনো প্র্রতিবন্ধকতা থাকবে না।

৩. الشرط الثالث (القبول ) এই কালেমার আবেদন ও দাবী স্বতঃস্ফুর্ত গ্রহণ করা প্র্রত্যাখ্যান না করা: অন্তর ও অঙ্গ- প্রতঙ্গের মাধ্যমে এই কালেমার আবেদন সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। যে ব্যক্তি এই কালেমার আবেদনকে প্র্রত্যাখ্যান করবে, আন্তরিকভাবে মেনে না নিবে, সে কাফের। সাধারণত প্র্রত্যাখ্যান করা হয়ে থাকে অহংকার, বিরোধিতা, হিংসা, বাপ-দাদার অন্ধানুকরণ ইত্যাদি কারণে। যেমন পবিত্র কুরআনের ভাষায় অহংকার বশত لا إله إلا الله এর অর্থ ও তাৎপর্যকে প্র্রত্যাখ্যানকারী কাফেরদের ঔদ্ধত্য প্রকাশ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে-
إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ ﴿৩৫﴾ وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُوا آَلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ ﴿ سورة الصافات:৩৫-৩৬﴾

‘‘তাদের যখন বলা হত আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের পরিত্যাগ করব?’ (সূরা সাফফাত: ৩৫-৩৬)
অতীত উম্মাতের ভিতর যারা এই কালেমার আহ্বান প্র্রত্যাখ্যান করেছে, আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের থেকে নেয়া প্রতিশোধ চিত্র পবিত্র কুরআনে তুলে ধরা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে-
وَكَذَلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِنْ نَذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آَبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آَثَارِهِمْ مُقْتَدُونَ ﴿২৩﴾ قَالَ أَوَلَوْ جِئْتُكُمْ بِأَهْدَى مِمَّا وَجَدْتُمْ عَلَيْهِ آَبَاءَكُمْ قَالُوا إِنَّا بِمَا أُرْسِلْتُمْ بِهِ كَافِرُونَ ﴿২৪﴾ فَانْتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ﴿২৫﴾ (سورة الزخرف :২৩ (

‘এমনি ভাবে আপনার পুর্বেআমি যখন কোন জনপদে কোন সতর্ককারী প্রেরণ করেছি, তখন তাদেরই বিত্তশালীরা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি এক পথের পথিক এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলি। সে বলত, তোমরা তোমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে যে বিষয়ের উপর পেয়েছ, আমি যদি তদপেক্ষা উত্তম বিষয় নিয়ে তোমাদের কাছে এসে থাকি, তবুও কি তোমরা তাই বলবে, তারা বলত তোমরা যে বিষয়সহ প্রেরিত হয়েছ, তা আমরা মানব না। ফলে আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়েছি। অতঃপর দেখুন, মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কিরূপ হয়েছে।’ (সূরা আয যুখরুফ: ২৩-২৫)

৪- الشرط الرابع ( الإخلاص) এই কালেমার প্রতি পূর্ণ ইখলাস প্রদর্শন করা: লৌকিকতা, সুখ্যাতি ও অংশীদারিত্ব পরিহার করা। সমস্ত ইবাদাতে একমাত্র আল্লাহর প্রতিনিবিষ্ট চিত্তে মনোনিবেশন করা। ছোট বড় সমস্ত শিরক হতে নিয়ত পরিশুদ্ধ রাখা। এরশাদ হচ্ছে-

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ.

‘তাদেরকে এ ছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে, তারা খাঁটি মনে একনিষ্টভাবে আল্লাহ তাআলার এবাদত করবে, নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই সঠিক ধর্ম।’ (সূরা আল বায়্যিনাহ-৫)
রসূল সা. বলেছেন-
عن عِتْبَانَ بْن مَالِكٍ الْأَنْصارِيَّ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : (إِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ روى البخاري

আল্লাহ তাআলা ঐ ব্যক্তির উপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য لا إله إلا الله বলেছে।’ বুখারী।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، مَنْ أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِكَ ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ أَنْ لَا يَسْأَلُنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلَ مِنْكَ ، لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ : لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قِبَلِ نَفْسِه * رواه البخارىِ    “

‘আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন আমি বলেছি, হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশের মাধ্যমে কে সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান হবে? তিনি বললেন: হে আবু হুরায়রা! আমি নিশ্চিতভাবে ধারণা করেছিলাম যে, এ ব্যাপারে তোমার আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করবে না। যেহেতু হাদীসের প্রতি তোমার অধিক আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। শুন! কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত বা সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি বেশি লাভবান হবে যে অন্তরের অন্তঃস্থল হতে নিবিষ্ট চিত্তে لا إله إلا الله বলেছে।

৫. الشرط الخامس ( الانقياد ) এই কালেমার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা, পরিত্যক্ত করে না রাখা: বাহ্যিক অঙ্গ- প্রতঙ্গ, আভ্যন্তরীণ মননশীলতার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই কালিমার অর্থ, আবেদন ও তাৎপর্যকে সম্পূর্ণরূপে মেনে নেয়া। যার সত্যতা প্রমাণিত হবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ বাস্তবায়ন, তার পছন্দনীয় বস্তুগুলো গ্রহণ, অপছন্দনীয় বস্তু গুলো বর্জন এবং তার গোস্বা ও রাগান্বিত বিষয়-বস্তু গুলো পরিহার করার মাধ্যমে। এরশাদ হচ্ছে-
وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ  وَمَنْ كَفَرَ فَلَا يَحْزُنْكَ كُفْرُهُ.

‘যে ব্যক্তি সৎকর্ম পরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করে, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এক মজবুত হাতল। যাবতীয় কাজের পরিণাম আল্লাহর ইখতিয়ারে। যে ব্যক্তি কুফরী করে, তার কুফরী যেন আপনাকে ক্লিষ্ট না করে। (সূরা লুকমান: ২২-২৩)

وَأَنِيبُوا إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ الْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ* الزمر

ফিরে এসো তোমারে রবের দিকে এবং তাঁর অনুগত হয়ে যাও, তোমাদের ওপর আযাব আসার পুর্বেই। তখন কোন দিক থেকেই আর সাহায্য পাওয়া যাবে না। (সূরা যুমার: ৫৪)

قُلْ إِنَّمَا يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ* سورة الأنبياء

এদেরকে বলো,“আমার কাছে যে অহী আসে তা হচ্ছে এই যে, কেবলমাত্র এক ইলাহই তোমাদের ইলাহ, তারপর কি তোমরা আনুগত্যের শির নত করছো ?”

অন্যত্র এরশাদ হচ্ছে-
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿৬৫﴾. (سورة النساء৬৫(

‘অতএব তোমার পালনকর্তার শপথ! তারা কখনো ঈমাানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মেনে না নেয়, তৎপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণনা করে।’ (সূরা নিসা: ৬৪)

রাসূল সা. বলেছেন-
عن أبي محمد عبد الله بن عمرو بن العاص – رضي الله عنهما – قال :قال رسول الله لَا يُؤْمِن أَحَدكُمْ حَتَّى يَكُون هَوَاهُ تَبَعًا لِمَا جِئْت بِهِ

‘ তোমাদের কেউ মুমিন বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার আনীত বিধানের প্রতি তার প্রবৃত্তি আনুগত্য প্রকাশ না করবে।’

৬- والسادس (الصدق ) এই কালেমার ব্যাপারে নিরেট সততা প্রর্দশন করা, মিথ্যা ও কপটতা পরিহার করা: বান্দার অন্তরে সুপ্ত অভিব্যক্তির সাথে মুখের উচ্চারণের এতটুকু সমন্বয় থাকতে হবে, যার দ্বারা তার অবস্থা মুনাফিক তথা কপটদের অবস্থা হতে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়- যারা মিথ্যা ও ধোকার আশ্রায় নিয়ে মুখে এমন সব কথা উচ্চারণ করে যা তাদের অন্তরে বিদ্যমান থাকে না।

وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ * الزمر

আর যে ব্যক্তি সত্য নিয়ে এসেছে এবং যারা তাকে সত্য বলে মনে নিয়েছে তারাই আযাব থেকে রক্ষা পাবে।
অর্থাৎ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’আলার আদালতে যে মোকাদ্দমা দায়ের হবে তাতে কোন লোকেরা শাস্তি লাভ করবে তা তোমরা আজই শুনে নাও। তাতে নিশ্চিতভাবে সে লোকেরাই শাস্তি পাবে যারা এ মিথ্যা আকীদা গড়ে নিয়েছিলো যে, আল্লাহর সত্তা, গুণাবলী, ইখতিয়ার এবং অধিকারে অন্য কিছু সত্তাও শরীক আছে। তাদের আরো বড় অপরাধ ছিল এই যে, তাদের সামনে সত্য পেশ করা হয়েছে কিন্তু তারা তা মানেনি। বরং যিনি সত্য পেশ করেছেন উল্টো তাকেই মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছে। পক্ষান্তরে যিনি সত্য এনেছেন আর যারা তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে আল্লাহর আদালতে তাদের শাস্তি পাওয়ার কোন প্রশ্ন ওঠে না। রাসূল সা. বলেছেন:
عن معاذ بن جبل رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم: مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ * رواه أحمد

‘ যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে لاإله إلا الله অর্থাৎ সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এর সাক্ষ্য প্রদান করবে তার উপর আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম হারাম করে দিবেন। (মুসনাদে আহমদ) মহান আল্লাহ এরশাদ করছেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ ﴿৮﴾ يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ – فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ. (سورة البقرة:

‘আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতিঈমাান এনেছি অথচ তারা আদৌ ঈমাানদার নয়। তারা আল্লাহ এবং ঈমাানদারগণকে ধোঁকা দেয়। অথচ এর দ্বারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না। অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না। তাদের অন্তকরণ ব্যধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।’ (সূরা আল বাক্বারা: ৮-১০)

৭. والسابع (المحبة) এই কালেমার প্রতি খাঁটি মহাব্বত প্রদর্শন করা, বিদ্বেষ পোষণ না করা: এই কালিমা ও তার আবেদনের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও মহাব্বত রাখা। অর্থাৎ এই কালেমা অনুযায়ী আমল পছন্দ করা, যারা এর উপর আমল করে এবং এর প্রতি আহ্বান করে তাদের মহাব্বত করা। যারা এই কালেমাকে অপছন্দ করে এর সাথে প্রতারণা বা মিথ্যারোপ করে, এর থেকে পৃষ্ঠ প্রর্দশন করে ও এর প্রচার প্রসারকে বাধা গ্রস্ত করে, তাদেরকে অপছন্দ ও প্রতিহত করা। এই কালেমার প্রতি মহাব্বতের প্রমাণ দেয়ার জন্য আরো প্রয়োজন- আল্লাহ তাআলার আদেশকৃত ও পছন্দনীয় জিনিসগুলো বাস্তবায়ন করা, যদিও তা প্রবৃত্তির বিপরীত হয়। অপর পক্ষে আল্লাহ তাআলার নিষেধকৃত ও অপছন্দনীয় জিনিসগুলোর প্রতিবিদ্বেষ পোষণ করা, তা হতে দূরে থাকা, যদিও তার প্রতি অন্তর ধাবিত হয়। আল্লাহর বান্দাদের সাথে সর্ম্পক স্থাপন করা। আল্লাহর শত্রুদের সাথে সর্ম্পকচ্ছেদ করা। রাসূলের অনুকরণ করা। তার দিক নির্দেশনার অনুসরণ করা। তার আনীত বিধানকে কবুল করা। এ ছাড়া মহাব্বত শুধু একটি দাবী যার কোন বাস্তবতা নেই। এরশাদ হচ্ছে-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ* سورة البقرة .

‘আর কোন লোক এমন রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং এদের প্রতি এমন ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতিভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।’ (সূরা আল বাক্বারা: ১৬৫) অর্থাৎ কালেমায়ে তাওহীদ তাদের অন্তরে ও হৃদয়ে স্থায়ীরূপ নিয়েছে। তাদের অন্তর ও হৃদয় এ কালেমা পরিপূর্ণ করে দিয়েছে, বিধায় অন্য কোনো জিনিসের জন্য তাদের অন্তর উন্মুক্ত হয় না। তাদের অন্তরে যত মহাব্বত-বিদ্বেষ দেখা যায় সব এই কালেমার অনুকরণে উৎসারিত হয়।

عن أنس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم :: ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ* (متفق عليه .

তিনটি গুণ যার মাঝে থাকবে সে ঈমানের স্বাদ উপভোগ করতে পারবে : (১) আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূূল অন্য সবকিছু থেকে তার কাছে অধিক প্রিয় হওয়া (২) একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে কাউকে মহাব্বত করা এবং (৩) ঈমান আনার পর কুফরে ফিরে যাওয়াটা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দের। আল্লাহ তায়ালা বলে =

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ ۚ ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ﴾

হে ঈমাানদারগণ! তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি দ্বীন থেকে ফিরে যায়, (তাহলে ফিরে যাক), আল্লাহ এমনিতে আরো বহু লোক সৃষ্টি করে দেবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারা আল্লাহকে ভালবাসবে, যারা মুমিনদের ব্যাপারে কোমল ও কাফেরদের ব্যাপারে কঠোর হবে, যারা আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা ও সাধনা করে যাবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবেনা। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে চান তাকে দান করেন। আল্লাহ ব্যাপক উপায় উপকরণের অধিকারী এবং তিনি সবকিছু জানেন। (সূরা মায়েদা: ৫৪)



মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯

সহিহ ফাযায়েলে আমল অধ্যায়-২ ফাযায়িলে কালেমা (১৪ -৭২টি হাদীস)

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
ফাযায়িলে কালেমা (১৪ - ৭২টি হাদীস)

২ ফাযায়িলে কালেমা (১৪ - ৭২টি হাদীস)
পরিচ্ছেদঃ
ইসলাম গ্রহণ ও ঈমান আনার ফাযীলাত

১৪
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং আমি আল্লাহ্‌র রাসূল। যে কোন বান্দা সন্দেহাতীতভাবে এই বাক্য দু’টির ওপর ঈমান আনবে, সে আল্লাহ্‌র সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে যে, সে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে না।
হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/১৪৮- তাহক্বীক্ব শু’আইব আরনাউত্ব ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ : হাদীস সহীহ : তাহক্বীক্ব শায়খ আহমাদ শাকির : এর সানাদ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

১৫
‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেন: হে খাত্তাবের পূত্র ! যাও, লোকদের মাঝে ঘোষণা করে দাও যে, কেবলমাত্র ঈমানদার লোকেরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ‘উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করলাম : শুনে রাখো, ঈমানদার ছাড়া কেউই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [১]
[১] হাদীস সহীহ ; সহীহ মুসলিম হা/৩২৩, তাহক্বীক্ব আলবানী : হাদীস সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

১৬
‘উক্ববাহ্ ইবনু আমির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, উমার (রাঃ) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)- কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং পরকালের প্রতি ঈমান রেখে মারা যাবে, তাকে বলা হবে, তুমি জান্নাতের আটটি দরজার মধ্যকার যে দরজা দিয়ে ইচ্ছে প্রবেশ করো।” (আহমাদ হা/৯৭- শায়খ শু’আইব আরনাউত্ব বলেন : হাদীসটি হাসান লিগাইরিহি। এর শাওয়াদিহ বর্ণনা রয়েছে)
হাদিসের মানঃ হাসান লিগাইরিহি

১৭
সুফিয়ান ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

একদা আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ইসলামের এমন একটি কথা বলে দিন যা আপনার পরে বা আপনি ছাড়া অন্য কাউকে আমি জিজ্ঞেস করবো না। তিনি (সাঃ) বললেন : তুমি বলো : আমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলাম। অতঃপর এরই উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো।” (সহীহ মুসলিম হা/১৬৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

১৮
‘উবাদাহ ইবনুস সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি বলে : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি একক এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর নিশ্চয়ই ঈসা (আঃ) আল্লাহর বান্দা, তাঁর বান্দীর (মারইয়ামের) পুত্র ও তাঁর সেই কালেমা যা তিনি মারইয়ামকে পৌঁছিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ হতে প্রেরিত একটি রূহ মাত্র, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য” - তাকে জান্নাতের আটটি দরজার যেটি দিয়ে প্রবেশ করতে চাইবে, প্রবেশ করাবেন।
হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/৩১৮০
অন্য বর্ণনায় রয়েছে : “তার ‘আমল যা-ই হোক না কেন আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” (সহীহুল বুখারী হা/৩১৮০, সহীহ মুসলিম হা/১৫০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

১৯
আবূ বুরদাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : তিন ব্যক্তির জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে। এক, ঐ ব্যক্তি যে আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত নিজের নাবীর (আ) উপর ঈমান এনেছে আবার মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপরও ঈমান এনেছে। দুই, ঐ ক্রীতদাস যে মহান আল্লাহর হক আদায় করার পাশাপাশি স্বীয় মুনিবের হকও আদায় করে। তিন, ঐ ব্যক্তি যার কোন ক্রীতদাসী রয়েছে। আর সে তাকে উত্তম আদব শিখিয়েছে এবং উত্তমরূপে ইলম শিক্ষা দিয়েছে, অতঃপর তাকে আযাদ করে বিয়ে করেছে, তার জন্য দ্বিগুণ সাওয়াব রয়েছে।
হাদীস সহীহ্ : সহীহুল বুখারী হা/৯৫- হাদীসের শব্দাবলী তার, সহীহ মুসলিম হা/৪০৪, আহমাদ হা/১৯৫৩২- তাহক্বীক্ব শু’আইব আরনাউত্ব : সানাদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। আহমাদ শাকির বলেন : সানাদ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২০
মাঈয (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নাবী (সাঃ)- কে জিজ্ঞেস করা হলো, সকল আমলের মধ্যে সর্বোত্তম ‘আমল কোনটি? তিনি (সাঃ) বললেন : আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান আনা, যিনি একক। এরপর আল্লাহ্‌র পথে জিহাদ করা, অতঃপর কবুল হাজ্জ। এ ‘আমলগুলো ও অন্যান্য আমলের মধ্যে ফাযীলাতের দিক দিয়ে এই পরিমাণ ব্যবধান রয়েছে যে পরিমাণ ব্যবধান রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যকার দূরত্বের মাঝে।” [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/১৯০১০, শু’আইব আরনাউত্ব বলেন : হাদীস সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২১
‘উবাদাহ ইবনু সামিত (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি এ সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল” আল্লাহ্ তার উপর জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন। [১]
[১] হাদীস সহীহ্ : সহীহ্ মুসলিম হা/১৫১শির্‌ক
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২২
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

“নাবী (সাঃ) বলেন: যে কোন বান্দা এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল, আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামের আগুনের জন্য হারাম করে দেন। তখন মু’আয (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি লোকদেরকে এ সুসংবাদ জানিয়ে দিব না? তিনি (সাঃ) বললেন, তাহলে তারা এর উপরই ভরসা করে থাকবে (‘আমল ছেড়ে দেবে)। অতঃপর মু’আয (রাঃ) স্বীয় মৃত্যুর সময় (ইলম গোপন করার গুনাহের ভয়ে) এ হাদীস বর্ণনা করেন।”
তিরমিযী হা/৩৩৮৩, ইবনু মাজাহ্ হা/৩৮০০, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস

২৩
আবূ ‘আমরাহ আল-আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আল্লাহর রাসূল। আর আমি আল্লাহর নিকট সাক্ষ্য দিচ্ছি- যে কোন বান্দা এ (কালেমা) দু’টির প্রতি ঈমান রেখে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে, এ দুটো অবশ্যই তার জন্য ক্বিয়ামাতের দিন জাহান্নামের আগুন থেকে আড়াল হবে। [১]
[১] সহীহ লিগাইরিহি : ইবনু হিব্বান হা/২২১- হাদীসের শব্দাবলী তার- তাহক্বীক্ব আলবানী : সহীহ লিগাইরিহি।
হাদিসের মানঃ সহিহ লিগাইরিহি

২৪
মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নাবী (সাঃ) বলেছেন : যে কোন ব্যক্তি এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, সে খাঁটি অন্তরে এই সাক্ষ্য দেয় যে, “আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল”- আল্লাহ তাকে অবশ্যই ক্ষমা করে দিবেন। [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/২১৯৯৮- আলবানী : হাসান সহীহ্
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২৫
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো যে, সে আল্লাহর প্রতি আন্তরিক ও মুখলেস ছিল, যিনি অদ্বিতীয়, যার কোন শরীক নেই, এবং সলাত ক্বায়িম করেছে, যাকাত দিয়েছে। সে তো এরূপ অবস্থায় বিদায় নিলো যে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তষ্ট। এটাই হলো আল্লাহর দ্বীন, যা নিয়ে রাসূলগণ আগমন করেছিলেন এবং তাদের রবের পক্ষ হতে প্রচার করেছেন।
মুস্তাদরাক হাকিম হা/৩২৩৫। ইমাম হাকিম বলেন : এই হাদীসের সানাদ সহীহ। ইমাম যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২৬
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

একদা কিছু সংখ্যক মুশরিক লোক যারা মুশরিক অবস্থায় ব্যাপকহারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং যেনা-ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়েছে তারা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিকট এসে বললো : আপনি যা বলেন এবং যে দিকে আহ্বান করেন তা খুবই উত্তম। তবে আমাদেরকে বলুন, অতীত জীবনে আমরা যে সমস্ত মন্দ কাজ করেছি তা মুছে যাবে কিনা? (তাহলে আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো)। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো : “যে সমস্ত লোক আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ্ মানেনা, আল্লাহর হারাম করা কোন প্রাণকে অকারণে হত্যা করে না এবং যেনা করে না। যারা ঐসব কাজে লিপ্ত হবে তারা নিজেদের পাপের প্রতিফল পাবে”- (সূরাহ্ আল-ফুরক্বান : ৬৮)। আরো অবতীর্ণ হলো : “হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছো, তারা আল্লাহর রহমাত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন, তিনি তো ক্ষমাশীল”- (সূরাহ্ আয-যুমার : ৫৩)
হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/ ৩৩৭-হাদীসের শব্দাবলী তার।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২৭
‘আমার ইবনু ‘আবাসাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একদা অত্যন্ত বৃদ্ধ একটি লোক তার লাঠির উপর ভর করে নাবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! (কাফির অবস্থায়) আমি বহু ওয়াদা ভঙ্গ করেছি এবং অসংখ্য পাপ কাজ করেছি, সুতরাং আমার ক্ষমার ব্যবস্থা আছে কি? তিনি (সাঃ) জবাবে বললেন : তুমি কি এ সাক্ষ্য দাও না যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই? লোকটি বললো, হ্যাঁ, আর আমি এ সাক্ষ্যও দেই যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। নাবী (সাঃ) বললেন : তাহলে তো তোমার সমস্ত ওয়াদা ভঙ্গ ও গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।
আহমাদ হা/১৯৪৩২, তাহক্বীক্ব শু’আইব : হাদীসটি সহীহ এর শাওয়াহিদ দ্বারা। এছাড়া আরো বহু শাহেদ বর্ণনা রয়েছে)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২৮
ম
ইবনু শিমাসাহ আল-মাহরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) যখন মৃত্যু শয্যায় ছিলেন, আমরা তাঁর কাছে উপস্থিত হলাম। তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে কাঁদলেন এবং দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভাবছিলেন। তার ছেলে বলতে লাগলো, হে আব্বা, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কি আপনাকে এই সুসংবাদ দেননি? রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কি আপনাকে এরূপ সুসংবাদ দেননি? বর্ণনাকারী বলেন, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে বললেন, অবশ্যই আমরা যা কিছু পুঁজি সঞ্চয় করেছি তন্মধ্যে “আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রাসূল”- সবচেয়ে উত্তম সঞ্চয়। আমি আমার জীবনে তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে এসেছি। (প্রথম পর্যায়) আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর প্রতি আমার চেয়ে অধিক বিদ্বেষ পোষণ করতে আর কাউকে দেখিনি। তখন আমার ইচ্ছা ছিল যে, যদি আমি সুযোগ পাই তাহলে তাঁকে হত্যা করে মনের ঝাল মেটাব। (দ্বিতীয় পর্যায় হলো) অতঃপর যখন আল্লাহ্ আমার অন্তরে ইসলামের প্রেরণা ঢেলে দিলেন, আমি নাবী (সাঃ)-এর কাছে এসে বললাম, আপনার ডান হাত প্রসারিত করুন। আমি আপনার কাছে বাই’আত করবো। তিনি তাঁর ডান হাত প্রসারিত করলে আমি আমার হাতখানা টেনে নিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ‘আমর! তোমরা কি হয়েছে? আমি বললাম, আমি কিছু শর্ত করতে চাই। তিনি বললেন : তুমি কি শর্ত করতে চাও। আমি বললাম, আমি এই শর্ত করতে চাই যে, আমাকে ক্ষমা করা হোক। তিনি বললেন : হে ‘আমর! তুমি জান না ইসলাম পূর্বেকার সমস্ত অপরাধ ধ্বংস করে দেয়? অনুরূপভাবে হিজরাত ও হাজ্জের দ্বারাও পূর্বের সমস্ত অপরাধ ধ্বংস হয়ে যায়? তখন থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর চেয়ে অন্য কোন ব্যক্তি আমার কাছে অধিক প্রিয় ছিলো না। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার এমনি এক প্রভাব ছিলো যে, আমি কখনো তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে স্থির থাকতে পারতাম না। যদি কেউ আমাকে তাঁর দৈহিক সৌষ্ঠবের বর্ণনা করার জন্য অনুরোধ করতো তাও আমার দ্বারা সম্ভব হতো না। যদি এ অবস্থায় আমার মৃত্যু হতো তাহলে আমি আশা করতে পারতাম যে, আমি জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভূক্ত। (তৃতীয় পর্যায় হলো) অতঃপর আমার ওপর বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব ন্যাস্ত হলো। আমি অবগত নই যে, এগুলোর মধ্যে আমার অবস্থা কেমন?। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ্ মুসলিম হা/৩৩৬
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
ইসলাম গ্রহণে অতীতের সৎ ‘আমল নষ্ট হয় না
২৯
হাকিম ইবনু হিযাম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, যে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বলুন, জাহিলী যুগে ভাল কাজ মনে করে আমি যে দান-খয়রাত করেছি, দাস মুক্ত করেছি বা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেছি, তার জন্য কোন প্রতিদান পাওয়া যাবে কি? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন : তুমি অতীত জীবনে যে সব সাওয়াবের কাজ করেছো তা সহকারেই তুমি মুসলিম হয়েছো। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ্ মুসলিম হা/৩৩৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
ইসলাম গ্রহণ নিরাপত্তার বিধান দেয়
৩০
ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলছেন : আমি মানুষের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করার জন্য প্রেরিত হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহামাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত ক্বায়িম করবে এবং যাকাত দিবে। তারা যদি এটা করে তাহলে আমার পক্ষ থেকে তাদের রক্ত ও সম্পদের নিরাপত্তার ঘোষণা রইল। তবে ইসলামের হাক্ব ব্যতীত। তাদের হিসাব্ আল্লাহর উপর। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/২৪, সহীহ মুসলিম হা/১৩৫
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৩১
হাকিম ইবনু হিযাম থেকে বর্ণিতঃ

“আল্লাহর শপথ! আমি জাহিলী যুগে যেসব নেক কাজ করেছি তা কখনো পরিত্যাগ করবো না, বরং ইসলামের মধ্যেও অনুরূপ করবো।” (সহীহ মুসলিম হা/৩৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৩২
হিশাম ইবনু ‘উরওয়াহ্ থেকে বর্ণিতঃ

“হাকিম হিযাম জাহিলী যুগে একশো দাস মুক্ত করেছেন এবং সওয়ারীর জন্য একশো উট দান করেছিলেন। অতঃপর মুসলিম হওয়ার পরও পুনরায় একশো দাস মুক্ত করেছেন এবং আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য একশো উট দান করেছেন। অতঃপর নাবী (সাঃ)-এর নিকট আসলেন।” হাদীসের বাকী অংশ পূর্বের হাদীসের অনুরূপ। (সহীহ মুসলিম হা/১৪১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
নাবী (সাঃ)- কে না দেখে ঈমান আনার ফাযীলাত
৩৩

আবূ ‘আবদুল রহমান জুহানী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট বসা ছিলাম। এমন সময় দুইজন আরোহীকে আসতে দেখা গেলো। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তাদেরকে দেখে বললেন, এদেরকে কিন্দা ও মাযহিজ গোত্রের মনে হচ্ছে। অতঃপর তারা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন তাদের সাথে মাযহিজ গোত্রের কিছু লোকও ছিল।
বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর দুই আগুন্তুকের মধ্যকার একজন বাই’আত গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর নিকটবর্তী হলো। যখন তিনি তাঁর (সাঃ) হাত নিজের হাতে নিলেন তখন বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! যে ব্যক্তি আপনার সাথে সাক্ষ্যৎ করলো এবং আপনার উপর ঈমান আনলো, আপনাকে সত্য বলে মানলো এবং আপনার অনুসরণ করলো সে কি পাবে? তিনি (সাঃ) বললেন : তার জন্য সুসংবাদ (মোবারকবাদ)। অতঃপর লোকটি তাঁর হাতের উপর হাত বুলিয়ে বাই’আত গ্রহণ করে চলে গেলো।
অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তি অগ্রসর হলো। সেও বাই’আত গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর হাত নিজের হাতে রেখে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! যে ব্যক্তি আপনাকে না দেখে আপনার উপর ঈমান আনলো, আপনাকে সত্য বলে মানলো এবং আপনার অনুসরণ করলো সে কি পাবে? তিনি (সাঃ) বললেন : তার জন্য সুসংবাদ, তার জন্য সুসংবাদ, তার জন্য সুসংবাদ। অতঃপর এ লোকটিও তাঁর হাতের উপর নিজের হাত বুলিয়ে বাই’আত গ্রহণ করে চলে গেলো। [১]
[১] সানাদ হাসান :আহমাদ হা/ ১৭৩৮৮- হাদীসের শব্দাবলী তার- তাহক্বীক্ব শু’আইব আরনাউত্ব : সানাদ হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস

৩৪
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি আমাকে দেখেছে এবং আমার প্রতি ঈমান এনেছে তার জন্য একবার সুসংবাদ। আর যে ব্যক্তি আমাকে দেখে নাই, তথাপি আমার প্রতি ঈমান এনেছে তার জন্য সাত বার (বারবার) মোবারকবাদ।”
আহমাদ হা/১২৫৭৮- তাহক্বীক্ব শু’আইব আরনাউত্ব : সানাদ দুর্বল, তবে হাদীসটি হাসান লিগাইরিহি। এছাড়া আবূ ইয়ালা হা/৩৩৯১। হাদীসটির শাওয়াহিদ বর্ণনা আছে। তন্মধ্যে আবূ সাঈদ খুদরী হতে এর শাহিদ হাদীস রয়েছে আহমাদ হা/১১৬৭৩
হাদিসের মানঃ হাসান লিগাইরিহি

৩৫
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : আমার আকাঙ্খা হয়, যদি আমার ভাইদের সাথে অমার সাক্ষ্য হতো! তখন নাবী (সাঃ)-এর সাহাবীগণ বলেন : আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি (সাঃ) বললেন : “তোমরা তো আমার সাহাবী। আমার ভাই হলো তারা, যারা আমাকে না দেখে আমার উপর ঈমান আনবে।”
আহমাদ হা/১২৫৭৯, আবূ ইয়ালা হা/৩৩৯০, ত্বাবারানী আওসাত হা/৫৪৯০। শু’আইব আরনাউত্ব বলেন : সানাদ দুর্বল, তবে হাদীসটি হাসান লিগাইরিহি। এর শাহেদ হাদীস রয়েছে।
হাদিসের মানঃ হাসান লিগাইরিহি

৩৬
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

একদা কিছু লোক “আবদুল্লাহ্ (রাঃ)-এর সামনে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর সাহাবীদের ঈমান সম্পর্কে আলোচনা করলো তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)- কে দেখেছেন তাদের সামনে তাঁর সত্যতা একেবারেই সুস্পষ্ট ছিল। সেই সত্তার শপথ যিনি ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই। সবচেয়ে উত্তম ঈমান হলো ঐ ব্যক্তির যে না দেখে ঈমান এনেছে। অতঃপর এর প্রমাণে তিনি এ আয়াত পড়লেন : “আলিফ, লাম-মীম, এটা এমন কিতাব যাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। মুত্তাকীনদের জন্য হিদায়াত স্বরূপ, যারা গায়েবের প্রতি ঈমান রাখে।”
মুস্তাদরাক হাকিম হা/২৯৮৮। ইমাম হাকিম বলেন : এই হাদীস বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। ইমাম যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
যে ‘আমলের দ্বারা ঈমানের স্বাদ পাওয়া যায়
৩৭
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নাবী (সাঃ)- কে বলেছেন। তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ সেই পাবে। এক, তার অন্তরে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা সবচেয়ে বেশি হবে। দুই, যে কোন ব্যক্তির সাথে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে। তিন, ঈমানের পর কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া তার কাছে এরূপ অপছন্দনীয় যেরূপ আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপছন্দনীয়। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/৬৪২৮- হাদীসের শব্দাবলী তার, অনুরূপ সহীহ মুসলিম হা/১৭৪
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৩৮
‘আব্বাস ইবনু ‘আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) - কে বলতে শুনেছেন: যে ব্যক্তি সন্তুষ্টিচিত্তে আল্লাহকে রব্ব, ইসলামকে নিজের দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) - কে রাসূল হিসেবে মেনে নিয়েছে, সে ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেছে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/১৬০
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- বলার ফাযীলাত
৩৯
জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : ইবনু হিব্বান হা/২০১, সিলসিলাহ্ সহীহাহ হা/২৩৫৫- শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪০
মু’আয (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি খালেস অন্তরে ইখলাসের সাথে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর সাক্ষ্য দিবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (ইবনু হিব্বান, আবূ নু’আইম, আহমাদ। এর সানাদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। সিলসিলাহ্ সহীহাহ্ হা/২৩৫৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪১
‘ইতবান বিন মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহ কে সন্তুষ্ট করার জন্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলবে, ক্বিয়ামাতের দিন সে এমনভাবে উপস্থিত হবে যে, তার উপর জাহান্নাম হারাম হয়ে গেছে।” (আহমাদ হা/১৬৪৮২, সহীহুল বুখারী, সহীহ্ মুসলিম, বায়হাক্বীর ‘আসমা ওয়াস সিফাত’ ও দূররে মানসুর)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪২
ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নাবী (সাঃ) তাকে বললেন। লোকদের মাঝে ঘোষণা দাও : “যে ব্যক্তি ইখলাসের সাথে এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই”- সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বাযযার, সহীহ্ জামিউল সাগীর হা/৮৫১- তাহক্বীক্ব আলবানী : সহীহ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৩
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : ঈমানের সত্তর বা ষাটের অধিক শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো এ কথা বলা যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই। আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি বিশেষ শাখা। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/৮, সহীহ মুসলিম হা/১৬২-০, কোন বর্ণনায় রয়েছে : ‘সবচেয়ে উঁচু শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং কোন বর্ণনায় রয়েছে : ‘সবচেয়ে বড় শাখা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। অতঃপর হাদীসের বাকী অংশ অনুরূপ। যেমন ত্বাবারানীতে বর্ণিত হয়েছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৪
জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

নাবী (সাঃ) বলেন : সর্বোত্তম যিকির হচ্ছে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এবং সর্বোত্তম দু’আ হলো ‘আল-হামদুলিল্লাহ্’। [১]
[১] হাদীস সহীহ : তিরমিযী হা/৩৩৮৩, ইবনু মাজাহ হা/৩৮০০, ইবনু হিব্বান, নাসায়ী, মুস্তাদরাক হাকিম হা/১৮৩৪ যাহাবীর তা’লীক্বসহ। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৫
‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : নূহ (আঃ) স্বীয় ইন্তিকালের সময় তাঁর দুই ছেলেকে ডেকে বলেছেন : আমি তো অক্ষম হয়ে পড়েছি। তাই আমি তোমাদেরকে অসিয়ত করে যাচ্ছি। আমি তোমাদেরকে দু’টি বিষয়ে আদেশ করছি এবং দু’টি বিষয় থেকে নিষেধ করছি। আমি তোমাদেরকে শির্‌ক এবং অহংকার থেকে নিষেধ করছি। আর যে দুটি বিষয়ে আদেশ করছি তার একটি হলো : “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্”। কেননা সমস্ত আসমান ও যমীন এবং এর মাছে যা কিছু আছে সব কিছু যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর অপর পাল্লায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” রাখা হয়, তাহলে কালেমার পাল্লাই ঝুলে যাবে (ভারি হবে)। আর যদি সমস্ত আসমান-যমীন (সাত আকাশ ও সাত যমীন) এবং এর মধ্যকার যা কিছু আছে, একটি হালকা বা গোলাকার করে তার উপর এ কালেমাকে রাখা হয় তাহলে ওজনের কারণে তা ভেঙ্গে যাবে। আর আমি তোমাদেরকে আদেশ করছি ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামাদিহি’ (পাঠ করার জন্য), কেননা এটা প্রত্যেক বস্তুর তাসবীহ, এর দ্বারাই প্রত্যেক বস্তুকে রিযিক্ব দেয়া হয়। [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/৬৫৮৩, ৭১০১- শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৬
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন : একদা আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ক্বিয়ামাতের দিন আপনার শাফা’আত দ্বারা কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে? রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন : হাদীসের প্রতি তোমার আগ্রহ দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, তোমার আগে এ বিষয়ে কেউ জিজ্ঞেস করবে না। (অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন: আমার শাফায়া’আত দ্বারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে ঐ ভাগ্যবান ব্যক্তি যে অন্তরের ইখলাসের সাথে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলবে।’
হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/৯৭- হাদীসের শব্দাবলী তার, অনুরূপ আহমাদ হা/৮৮৫৮
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৭
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলবে একদিন না একদিন এই কালেমা অবশ্যই তার উপকারে আসবে। যদিও ইতিপূর্বে তাকে কিছুটা শাস্তি ভোগ করতে হবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : বাযযার হা/৮২৯২- হাদীসের শব্দাবলী তার, ত্বাবারানীর কাবীর হা/১৪০, ৭৩৩, ১১১১, সহীহ আত-তারগীব হা/১৫২৫। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আল্লামা হায়সামী ‘মাজমাউয যাওয়ায়িদ’ গ্রন্থে (হা/১৩) বলেন : এর রিজাল সহীহ্ রিজাল।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৮
আবূ বাকর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : যে ব্যক্তি এই কালেমা গ্রহণ করবে যা আমি আমার চাচার (আবূ ত্বালিবের) কাছে পেশ করেছিলাম এবং তিনি তা প্রত্যাখান করেছিলেন, সেই কালেমা এই ব্যক্তির নাজাতের উপায় হবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/২০শির্‌ক শু’আইব আরনাঊত্ব বলেন : বর্ণনাটি সহীহ এর শাওয়াহিদ দ্বারা।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪৯
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে এই কালেমা তাকে ঐ সময়ে মুক্তি দিবে যখন তার উপর মুসিবত আসবে।” (সিলসিলাহ সহীহাহ্ হা/ ১৯৩২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫০
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নাবী (সাঃ) বলেছেন : এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং তার অন্তরে যবের দানার ওজন পরিমাণও কল্যাণ (ঈমান) থাকবে। এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং তার অন্তরে গমের দানার ওজন পরিমাণও কল্যাণ থাকবে। অতঃপর এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং তার অন্তরে অণু পরিমাণও কল্যাণ থাকবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/৬৮৬১- হাদীসের শব্দাবলী তার, অনুরূপ সহীহ মুসলিম হা/৪৯৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫১
‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন: মহান আল্লাহ ক্বিয়ামাতের দিন আমার উম্মাতের মধ্য থেকে এক ব্যক্তিকে সমস্ত হাশরবাসীর সামনে আলাদা করে এনে উপস্থিত করবেন। তিনি তার সামনে ৯৯টি ‘আমলনামার খাতা খুলে ধরবেন। প্রতিটি খাতা দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। অতঃপর তাকে প্রশ্ন করা হবে, তুমি কি এসব ‘আমলনামার কোন কিছুকে অস্বীকার করো। ‘আমলনামা লিখার কাজে নিয়োজিত আমার ফিরিশতারা কি তোমার উপর কোন জুলুম করেছে? সে বলবে, না। অতঃপর প্রশ্ন করা হবে, এ সমস্ত গুনাহের পক্ষে তোমার একটি নেকী আমার কাছে রয়েছে। আজ তোমার উপর কোন জুলুম করা হবে না। অতঃপর একটি কাগজের টুকরা বের করা হবে, যাতে লিখা থাকবে : ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।’ বলা হবে, যাও এটাকে ওজন করে নাও। সে আরজ করবে, এতোগুলো দফতরের মোকাবেলায় এই সামান্য কাগজের টুকরা কি কাজে আসবে। বলা হবে, আজ তোমার উপর কোন জুলুম করা হবে না। অতঃপর ঐ দফতরগুলোকে এক পাল্লায় রাখা হবে এবং অপর পাল্লায় কাগজের ঐ টুকরাটি রাখা হবে। তখন দফতরওয়ালা পাল্লাটির মোকাবেলায় ঐ কাগজের টুকরার পাল্লাটি ওজনে ভারি হয়ে যাবে। আসল কথা হলো, আল্লাহর নামের বিপরীতে কোন কিছুই ভারি হতে পারে না। [১]
[১] হাদীস সহীহ : তিরমিযী হা/২৬৩৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫২
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : কোন বান্দা এমন নেই যে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে আর তার জন্য আকাশসমূহের দরজাগুলো খূলে যায় না। এমনকি এ কালেমা সোজা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তবে শর্ত হচ্ছে, এর পাঠকারী কবীরাহ গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকবে। [১]
[১] হাদীস হাসান : তিরমিযী হ/৩৫৯০- হাদীসের শব্দাবলী তার, সহীহ জামিঊস সাগীর হা/৫৬৪৮। ইমাম তিরমিযী বলেন। এ সূত্রে হাদীসটি হাসান ও গরীব। শায়খ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।
হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস

৫৩
হুযাইফাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : কাপড়ের কারুকার্য যেমন মুছে যায় তেমনি ইসলামও এক সময় অস্পষ্ট হয়ে যাবে। এমনকি লোকেরা এটাও জানবে না যে, সিয়াম কি, সলাত কি, কুরবানী কি এবং সদাক্বাহ কি জিনিস। একটি রাত আসবে যখন অন্তরসমূহ থেকে কুরআন উঠিয়ে নেয়া হবে এবং যমীনের উপর কুরআনের একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। তখন মানুষদের মধ্যে একদল বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা অবশিষ্ট থাকবে। তারা বলবে, আমরা আমাদের বাপ-দাদার (পূর্ব পুরুষের) কাছ থেকে এই কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” শুনেছিলাম, সেজন্য আমরাও এই কালেমা পাঠ করি। তখন সিলাহ্ বিন যুফার হুযাইফাহ (রাঃ)- কে জিজ্ঞেস করলো, তারা যেহেতু ঐ সময় সলাত, সিয়াম, কুরবানী এবং সদাক্বাহ সম্পর্খে অবহিত থাকবে না, তাহলে এই কালেমা তাদের কী উপকারে আসবে? হুযাইফাহ (রাঃ) কোন জবাব দিলেন না। তিনি একই প্রশ্ন করলেন। প্রতিবারেই (রাঃ) কোন জবাব দিলেন না। অতঃপর তৃতীয়বারের পর (অনুরোধ) করলে তিনি বলেন, হে সিলাহ্! এই কালেমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবে। এই কালেমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবে। এই কালেমা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : ইবনু মাজাহ হা/৪০৪৯, হাকিম হা/৮৬৩৬, ৮৪৬০- হাদীসের শব্দাবলী উভয়ের, শায়খ আলবানী বলেন : হাদীস সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫৪
মিক্বদাদ ইবনু আসওয়াদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)- কে বলতে শুনেছি : যমীনের উপর এমন কোন মাটির ঘর বা তাঁবু অবশিষ্ট থাকবে না যেখানে মহান আল্লাহ্ ইসলামের কালেমা (হুকুমাত) প্রবেশ না করাবেন। যারা মানবে তাদেরকে কালেমার অধিকারী (অনুসারী) হিসেবে সম্মানিত করবেন এবং যারা মানবে না তাদেরকে অপদস্থ করবেন। অতঃপর তারা (জিযিয়া দিয়ে) মুসলিমদের অধীনস্থ হয়ে থাকবে। [১]

[১] সানাদ সহীহ : আহমাদ হা/২৩৮১৪
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫৫
ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : ইসলামের স্তুম্ভ পাঁচটি। এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, সলাত ক্বায়িম করা, যাকাত দেয়া, হাজ্জ্ব করা এবং রমাযানের সওম পালন করা। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/১২২
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৫৬
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

একদা জিবরীল (আ) রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) -এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলাম কী ? রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “ইসলাম হল, তুমি এক আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর সলাত ক্বায়িম করবে ও ফরয যাকাত প্রদান করবে এবং রামাযানের সিয়াম পালন করবে।” (সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম, আহমাদ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
মৃত্যুর সময় কালেমা পাঠের ফাযীলাত
৫৭
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : তোমরা তোমাদের মৃত্যু পথযাত্রীকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তালকীন করাও। কেননা যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় শেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [১]
[১] হাদীস হাসান : ইবনু হিব্বান হা/৩০০৪- শু’আইব আরনাউত্ব বলেন : হাদীস সহীহ। ইরওয়াউল গালীল হা/৬৮৭- হাদীসের শব্দাবলী তার থেকে গৃহীত। শায়খ আলবানী বলেন : সানাদের ব্যক্তিবর্গ প্রত্যেকেই নির্ভরযোগ্য। অবশ্য মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল ব্যতীত। তাকে ইবনু হিব্বান ‘সিকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আর হাদীসের বাক্য : “যারা শেষ কথা হবে...” এটি বাযযার ভিন্ন সানাদে বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস

৫৮
‘উসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে মৃত্যু বরণ করলো যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/১৪৫- হাদীসের শব্দাবলী তার, অনুরূপ আহমান হা/৪৬৪, ৪৯৮- তাহক্বীক্ব ও শু’আইব আরনাউত্ব : সানাদ বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। আহমাদ শাকির বলেন (হা/৪৯৮) : সানাদ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৫৯
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

অন্য বর্ণনায় রয়েছে : “যে ব্যক্তির শেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (আবূ দাঊদ, হাকিম, ইবনু মানদাহ্ ‘আত-তাওহীদ’ এবং আহমাদ। ইমাম হাকিম বলেন : সানাদ সহীহ। ইমাম যাহাবীর মতও তাই। শায়খ আলবানী একে হাসান বলেছেন। ইরওয়াউল গালীল হা/৬৮৭)
হাদিসের মানঃ হাসান হাদিস
৬০
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

অন্য বর্ণনায় রয়েছে : রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “আমি এমন একটি কালেমা জানি, যে কোন বান্দা এ কালেমা অন্তরের সাথে সত্য জেনে পাঠ করবে এবং ঐ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে সে জাহান্নামের জন্য হারাম হয়ে যাবে। সেই কালেমা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (হাকিম। ইমাম হাকিম বলেন : হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন সহীহ আত-তারগীব গ্রন্থে)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৬১
আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একদা আমি নাবী (সাঃ)-এর কাছে এসে দেখি তিনি সাদা কাপড় জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছেন। এরপর আবার এসেও তাকে ঘুমন্ত দেখতে পাই। অতঃপর আবার এসে দেখি তিনি জাগ্রত হয়েছেন। ফলে আমি তাঁর পাশে বসে পড়ি। তখন তিনি (সাঃ) বললেন : যে কোন বান্দা এ কথা বলে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই এবং এর উপরই মৃত্যু বরণ করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এ কথা শুনে আবূ যার (রাঃ) বলেন : যদি সে যেনা করে এবং যদি সে চুরি করে তবুও? নাবী (সাঃ) বললেন : যদি সে যেনা করে এবং যদি সে চুরি করে তবুও। আবূ যার (রাঃ) আবার বলেন : যদি সে যেনা করে, যদি সে চুরি করে তবুও? নাবী (সাঃ) বললেন : যদি সে যেনা করে এবং যদি সে চুরি করে তবুও সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আবূ যার নাবী (সাঃ)- কে প্রশ্নটি তিনবার করেন আর প্রতিবারই নাবী (সাঃ) একই জবাব দেন। অতঃপর চতুর্থবারে বললেন, আবূ যারের নাক ধুলো মলিন হোক। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/২৮৩- হাদীসের শব্দাবলী তার, অনুরূপ সহীহুল বুখারী হা/৫৩৭৯।

দৃষ্টি আকর্ষণ : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা ফাযীলাত সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোতে মূলত ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠের শর্তগুলো চমৎকারভাবে পেশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ফাযীলাত লাভের দিকগুলো ফুটে উঠেছে। সুতরাং অধিক উপকার প্রদানের আশায় এর শর্তগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”- এর শর্তসমূহ

(১) এ বিষয়ে ইলম থাকা। অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া সকল গাইরুল্লাহকে অস্বীকার করে একমাত্র আল্লাহকে ইলাহ্ বলে স্বীকার করা এবং এ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“আর জেনে রেখো, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ্ নেই।” (সূরাহ মুহাম্মাদ : ১৯)
“তবে যারা সজ্ঞানে সত্যের সাক্ষ্য দেয়।” (সূরাহ যুখরুফ : ৮৬)
অর্থাৎ কালেমার সাক্ষ্য, তারা মুখে যা বলে সেটি অন্তর দিয়ে জানে।
নাবী (সাঃ) বলেছেন : “যে লোক এমন অবস্থায় মারা গেলো যে, জীবিত অবস্থায় সে জানত, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই। অবশ্যই সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ মুসলিম)
 
(২) দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা : কোনরূপ সন্দেহ ছাড়া ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর বিশ্বাস অন্তরে পূর্ণভাবে থাকতে হবে। কালেমাকে এমন পরিপূর্ণভাবে জানতে হবে যাতে সংশয়-সন্দেহ না থাকে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“সত্যিকারের মু’মিন হল তারাই, যারা আল্লাহ্ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছে এবং ঈমান আনার পর তাতে কোনরূপ সন্দেহ পোষণ করে না।” (সূরাহ্ আল-হুজুরাত : ১৫)।
নাবী (সাঃ) বলেছেন : “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, আমি তাঁর রাসূল। যে লোক এতে কোনরূপ সন্দেহ পোষণ না করে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ মুসলিম)
 
(৩) কবুল করা : অর্থাৎ অন্তর ও জিহবার দ্বারা স্বীকার করা। মুশরিকদের অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“তাদেরকে যখন বলা হত, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই, তখন তারা অহংকার করত এবং বলত : একজন পাগল কবির কথায় আমরা কি আমাদের ইলাহগুলোকে পরিত্যাগ করব?।” (সূরাহ সাফফাত : ৩৫-৩৬)
এ আয়াতের তাফসীরে হাফিয ইবনু কাসীর (রহঃ) বলেন : মু’মিনগণ যেমনিভাবে এ কালেমা মুখে উচ্চারণ করতেন ঠিক তার বিপরীত কাফিররা তা বলতে অস্বীকার করত অহঙ্কারের কারণে। কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মুখে উচ্চারণ করার গুরুত্ব সম্পর্কে নাবী কারীম (সাঃ) বলেন : “আমাকে আদেশ করা হয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত লোকেরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ না বলবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। যখন কেউ তা মেনে নিবে ও মুখে উচ্চারণ করবে তখন সাথে সাথে তার জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ। তবে ইসলামের যে হাক্বাসমূহ আছে তা আদায় করতে হবে এবং তার হিসাব নিবেন স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা।” (সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)

(৪) আত্মসমপর্ণ ও যথাযথ অনুসরণ করা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন কর এবং তাঁর কাছে সম্পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ কর।” (সূরাহ্ যুমার : ৫৪)।
 
(৫) সত্যবাদিতা, যা মিথ্যার বিপরীত : তা হল অন্তরে সর্বান্তকরণে কালেমাকে উচ্চারণ করা। আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে সাবধান করে বলেন :

“আলিফ লাম-মীম : লোকেরা কি ভেবে নিয়েছে যে, “আমরা ঈমান এনেছি’ এ কথা বললেই তারা নিরাপদ হয়ে যাবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; অতএব আল্লাহ্ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে।” (সূরাহ্ আনকাবূত : ১-৩)
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “যদি কেউ খাটি অন্তরে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল, তবে আল্লাহ্ তার জন্য জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দিবেন।” (সহীহুল বুখারী, সহীহ্ মুসলিম)
(৬) ইখলাস : তা হচ্ছে নিয়্যাতকে শুদ্ধ করে যাবতীয় শির্‌ক থেকে নিজেকে দূরে রেখে নেক ‘আমল করা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“তাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে ইখলাসের সাথে আল্লাহর আনুগত্যসহ ‘ইবাদাত করতে।” (সূরাহ বাইয়্যিনাহ্ : ৫)
রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন : “ক্বিয়ামাতের দিন আমার শাফা’য়াত পাওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে ঐ ব্যক্তি যে অন্তর থেকে ইখলাসের সাথে ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ স্বীকার করে।” (সহীহুল বুখারী)
তিনি (সাঃ) আরো বলেছেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা ঐ ব্যক্তির জন্য জাহান্নামের আগুনকে হারাম করে দিয়েছেন যে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে।” (সহীহুল বুখারী)
 
(৭) কালেমা তায়্যিবার প্রতি ভালবাসা পোষণ করা : কালেমার দাবী হলো, যে সকল মু’মিন উপরোক্ত শর্তসমূহ মানবে মানুষ কেবল তাদেরকেই ভালবাসবে এবং যারা তা মানবে না তাদেরকে ঘৃণা করবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“মানুষের মাঝে এমন লোকও রয়েছে যে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে তাঁর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং আল্লাহকে যেমন ভালবাসতে হয় তেমন তাদেরকে ভালবাসে। কিন্তু যারা প্রকৃত ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি তাদের ভালবাসা আরো মজবুত।” (সূরাহ আল-বাক্বারাহ্ : ১৬৫)
রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন : “তিনটি জিনিস যার মধ্যে রয়েছে ঈমানের প্রকৃত স্বাদ সেই পাবে : এক, তার অন্তরে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের প্রতি ভালবাসা সবচেয়ে বেশি হবে। দুই, যে কোন ব্যক্তির সাথে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে। তিন, ঈমানের পর কুফরীর দিকে ফিরে যাওয়া তার কাছে এরূপ অপছন্দনীয় যেরূপ আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপছন্দনীয়।” (সহীহুল বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
 
(৮) তাগুতের প্রতি কুফরী করা : তাগুত হল ঐ সকল বাতিল ইলাহ্ আল্লাহকে ছাড়া যাদের ‘ইবাদাত করা হয়। সুতরাং কালেমা পাঠকারী তাদেরকে বর্জন করবে, যদিও সে একমাত্র আল্লাহকে রব্ব এবং সত্যিকারের ইলাহ্ বলে স্বীকার করে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
“আর যে লোক তাগুতদের অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে নিশ্চয়ই সে এমন এক শক্ত বন্ধনকে আঁকড়ে ধরল যা ছুটবার নয়।” (সূরাহ আল-বাক্বারাহ্ : ২৫৬)
রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) বলেছেন : “যে ব্যক্তি অন্তর থেকে বলে ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং আল্লাহ্ ব্যতীত যে সকল ইলাহর ‘ইবাদাত করা হয় তা অস্বীকার করে তার জীবন ও সম্পদ (নষ্ট করা) অন্যের জন্য হারাম।” (সহীহ মুসলিম)
৬২
ইয়াহইয়া ইবনু ত্বালহা থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)-এর ইস্তিকালের পর একদা ‘উমার (রাঃ) ত্বালহার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। ‘উমার (রাঃ) ত্বালহাকে বিষন্ন দেখে বললেন : কি ব্যাপার, তোমাকে বিষন্ন দেখছি? তোমার চাচাতো ভাইয়ের খিলাফাত কি তোমার অপছন্দ হচ্ছে? ত্বালহা বললেন, না। তবে আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)- কে বলতে শুনেছি : এমন একটি কালেমা আমি জানি, তা যে কেউ মৃত্যুর সময় পাঠ করলে তার ‘আমলনামার জন্য সেটা নূর হবে এবং এবং নিঃসন্দেহে তার দেহ ও আত্মা মৃত্যুর সময় সেটার দ্বারা স্বস্তি লাভ করবে। কিন্তু উক্ত কালেমা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)- কে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। এ সময়ের মধ্যে তিনিও ইন্তিকাল করেছেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমার সেই কালেমা জানা আছে। এটা সেই কালেমা যা তিনি তাঁর চাচার কাছে আশা করেছিলেন (অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’)। [১]
[১] হাদীস সহীহ : ইবনু মাজাহ হা/৩০৭৭
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৩
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

অন্য বর্ণনায় রয়েছে : ত্বালহা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)- কে বলতে শুনেছি : “আমি এমন একটি কালেমা জানি, যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তা পাঠ করবে তার মৃত্যুকষ্ট দূর হয়ে যাবে, তার রং মৃত্যুর সময় উজ্জ্বল হতে থাকবে এবং সে আনন্দদায়ক দৃশ্য দেখতে পাবে।” কিন্তু আমি উক্ত কালেমা সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)- কে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। সেজন্য আমি মনক্ষূন্ন আছি। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমার সেই কালেমা জানা আছে। ত্বালহা (রাঃ) আনন্দিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সেটা কি? ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি অবগত আছি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কালেমা আর নেই যা তিনি স্বীয় চাচা আবু ত্বালিবকে মৃত্যুর সময় পেশ করেছিলেন, অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। ত্বালহা (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম এটাই, আল্লাহর কসম এটাই সেই কালেমা।”

বায়হাক্বীর আসমা ওয়াস সিফাত হা/১৭২- উপরোক্ত শব্দে, দূররে মানসুর, হাকিম হা/১২৪৪, আহমাদ হা/১৩৮৪, আবূ ইয়াসা। ইমাম হাকিম বলেন : বুখারী ও মুসলিমের শর্তে সহীহ। ইমাম যাহাবী একে স্বীকৃতি দিয়েছেন। শায়খ শু’আইব আরনাউত্ব বলেন : এর সানাদ সহীহ
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদঃ
শির্‌ক না করার ফাযীলাত
৬৪
মু’আয (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

একদা আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) পিছনে ঊফাইর নামক গাধার পিঠে সওয়ার ছিলাম। এ সময় রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) আমাকে বললেন : হে মু’আয! তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর কি হক রয়েছে এবং আল্লাহর উপর বান্দার কি হক রয়েছে? আমি বললাম, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তিনি (সাঃ) বললেন : বান্দার উপর আল্লাহর হক হচ্ছে- তারা আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে অন্য কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার অধিকার হচ্ছে, যে বান্দা তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না তিনি তাকে আযাব দিবেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি লোকদেরকে এ সুসংবাদ জানিয়ে দিবো না? তিনি (সাঃ) বললেন : তাদেরকে এ সুসংবাদ দিও না। কেননা তারা এর উপর নির্ভর করে ‘আমল ছেড়ে দিবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহুল বুখারী হা/২৬৪৪
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৫
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একদা রাসূল (সাঃ) বললেন দুটি জিনিস ওয়াজিব হয়ে গেছে। এক ব্যক্তি এসে বললো, যে আল্লাহর রাসূল! কোন দুটি জিনিস ওয়াজিব হয়ে গেছে? তিনি (সাঃ) বললেন : যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুতে শরীক না করে মারা গেছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করে মারা গেছে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/২৭৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৬
‘আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে মি’রাজ করানো হয় তখন তিনি সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছেন যা সপ্তম আকাশে রয়েছে। যে জিনিস উপরে উঠে তা এখান পর্যন্ত পৌঁছে, তারপর এখান থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। আর যে জিনিস অবতরণ করে তা এখান পর্যন্ত অবতারিত, তারপর এখান থেকে গ্রহণ করা হয়। ঐ গাছের উপর সোনার ফড়িং ছেয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে পাঁচ ওয়াক্ত সলাত, এবং সূরাহ্ বাক্বারাহর শেষের দুই আয়াত দেয়া হয়। এবং এটাও দেয়া হয় যে, তার উম্মাতের মদ্যে যারা শির্‌ক করবে না তাদের কবীরাহ গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/৪৪৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৭
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। যে সব অপরাধী আল্লাহর সাথে শির্‌ক করেনি তাদেরকে ক্ষমা করা হয়। কিন্তু পরস্পর সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি সম্পর্কে (আল্লাহ্ বলেন) : এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে, এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে, এদেরকে অবকাশ দাও যতক্ষণ না এরা নিজেদের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/৬৭০৯
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৮
আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : আল্লাহ্ তা’আলা বলেন : কেউ একটি নেক ‘আমল করলে এর বিনিময়ে তাকে এর দশগুণ বা আরো অধিক দিবো। কেউ যদি একটি গুনাহ করে তাহলে এর বিনিময়ে কেবল একটি গুনাহ (লিখা) হবে অথবা আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো। আর কেউ যদি আমার কাছে পৃথিবীর সমান গুনাহসহ উপস্থিত হয় এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে থাকে তাহলে আমিও ঠিক পৃথিবীর সমান ক্ষমা নিয়ে তার কাছে এগিয়ে যাবো। [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/২১৩৬০
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৬৯
‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে এরূপ অবস্থায় সাক্ষ্যাৎ করলো যে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করেনি, তবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তার অন্যান্য পাপ তার কোন ক্ষতি করবে না। যেমন কোন ব্যক্তি শির্‌ক করে তাঁর সাথে সাক্ষ্যাৎ করলে সে জাহান্নামে যাবে এবং তার অন্যান্য সাওয়াব তার কোন উপকারে আসবে না। [১]
[১] হাদীস সহীহ : আহমাদ হা/৬৫৮৬
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৭০
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : প্রত্যেক নাবীর বিশেষ একটি দু’আ আছে যা কবুল করা হবে। প্রত্যেক নাবীই তাঁর যে দু’আ আগে ভাগে (দুনিয়াতেই) করে ফেলেছেন। আর আমি আমার সে দু’আ ক্বিয়ামাতের দিন আমার উম্মাতের শাফা’আতের জন্য (দুনিয়াতে) মুলতবী রেখেছি। আমার উম্মাতের যে ব্যক্তি শির্‌ক না করে মৃত্যুবরণ করবে, ইনশাআল্লাহ্ সে তা লাভ করবে। [১]
[১] হাদীস সহীহ : সহীহ মুসলিম হা/৫১২
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৭১
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একদা এক বেদুইন নাবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বললো : আমাকে এমন আমলের কথা বলে দিন যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো। তিনি (সাঃ) বললেন : আল্লাহর ‘ইবাদাত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শরীক করবে না। ফরয সলাত ক্বায়িম করবে, ফরয যাকাত আদায় করবে এবং রমাযানের সাওম পালন করবে। একথা শুনে লোকটি বললো, সেই সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি এর চেয়ে বেশিও করবো না এবং কমও করবো না। অতঃপর লোকটি যখন চলে যেতে লাগলে নাবী (সাঃ) বললেন, কেউ কোন জান্নাতী লোক দেখে আনন্দিত হতে চাইলে সে যেন এই লোকটিকে দেখে। [১]
[১] হাদীস সহীহ :সহীহুল বুখারী হা/১৩১০
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৭২
বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ

উম্মাতকে শির্‌ক বিবর্জিত ‘ইবাদাত শিক্ষার দায়িত্ব দিয়েই মহান আল্লাহ্ নাবী (সাঃ)- কে নাবী করে পাঠিয়েছেন। যেমন, ‘আমর ইবনু ‘আবাসাহ আস-সুলামী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে আমি আমার সম্প্রদায়ের ইলাহগুলো থেকে বিমুখ ছিলাম। একদা আমি নাবী (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, তিনি আত্মগোপনে আছেন। আমি গোপনে খোঁজ নিয়ে তাঁর নিকট প্রবেশ করলাম। আমি তাঁকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে? তিনি বললেন : নাবী। আমি বললাম, নাবী কি? তিনি বললেন : আল্লাহর রাসূল। আমি বললাম, আপনাকে কে পাঠিয়েছেন? তিনি বললেন : মহান আল্লাহ। আমি বললাম, আপনাকে কি দিয়ে প্রেরণ করেছেন? তিনি বললেন : “এ আদেশ দিয়ে প্রেরণ করেছেন যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা হবে, রক্ত সংরক্ষণ করতে হবে, রাস্তা নিরাপদ করতে হবে, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে হবে এবং এক আল্লাহর ইবাদাত করতে হবে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না।” আমি বললাম, আপনাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতো অত্যন্ত ভাল। আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি যে, আমি আপনার উপর ঈমান এনেছি এবং আপনাকে সত্য বলে ঘোষণা করছি। আপনি বলুন, আমি কি আপনার সাথে অবস্থান করবো? তিনি বললেন : তুমি দেখছো যে, আমি যা নিয়ে আগমন করেছি তা লোকেরা অপছন্দ করেছে। কাজেই তুমি তোমার পরিবারের কাছেই থাকো। অতঃপর যখন তুমি আমার সম্পর্কে জানবে যে, আমি আমার অবস্থান থেকে বেরিয়েছি তখন আমার কাছে এসো।”
আহমদ হা/১৭০১৬- ইমাম যাহাবী বলেন : সহীহ
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস


ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png