শিরোনাম
Loading latest headlines...
যাকাত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
যাকাত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

আরবি: زكاة‎‎ zakāt, "যা পরিশুদ্ধ করে") হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 

আরবি: زكاة‎‎ zakāt, "যা পরিশুদ্ধ করে") হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি

(আরবি: زكاة‎‎ zakāt, "যা পরিশুদ্ধ করে") হলো ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের একটি। প্রত্যেক স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক মুসলমান নর-নারীকে প্রতি বছর স্বীয় আয় ও সম্পত্তির একটি নির্দিষ্ট অংশ, যদি তা ইসলামী শরিয়ত নির্ধারিত সীমা (নিসাব পরিমাণ) অতিক্রম করে তবে, গরীব-দুঃস্থদের মধ্যে বিতরণের নিয়মকে যাকাত বলা হয়। সাধারণত নির্ধারিত সীমাতিক্রমকারী সম্পত্তির ২.৫ শতাংশ (২.৫%) বা (১/৪০) অংশ বছর শেষে বিতরণ করতে হয়।

 ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্জ্ব এবং যাকাতই শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষ যে, তা সম্পদশালীদের জন্য ফরয বা আবশ্যিক হয়। উল্লেখ্য, নিসাব পরিমাণ হলেই যাকাত কোনো ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হয় এবং তখন তার উপর 'যাকাত' নামক ফরয বর্তায়; অর্থাৎ যাকাত আদায় করা ফরয। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে "যাকাত" শব্দের উল্লেখ এসেছে ৩২ বার।কুরআনে নামাজের পরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পূর্ন বিষয় হিসাবে উল্লেখ এই যাকাত।



যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত সমূহ

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 2
বার দেখা হয়েছে
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত সমূহ


কোন ব্যক্তির ওপর ইবাদত ফরজ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত থাকে। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্যও কিছু শর্ত আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু শর্ত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার যাকাত আর্থিক ইবাদত হওয়ায় সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু শর্তও আছে। শর্তগুলো হলো-

মুসলিম হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো মুসলিম হওয়া। যাকাত মুসলিমদের ওপর এক প্রকারের ইবাদত বিধায় তা অমুসলিমদের জন্য ফরজ হওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।

বালিগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া : শাফি’ঈ, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাব মতে, সম্পদশালী শিশুর ওপর যাকাত ফরজ হবে। তার সম্পদ হতে তার ওয়ালী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক যাকাত আদায় করবেন। হানাফী মাযহাব মতে, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে শিশুর সম্পদে যাকাত নেই। শিশুর সম্পদে যাকাত ফরজ না হওয়ার পক্ষে তাদের দলিল হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিন প্রকারের মানুষের ওপর হতে তাকলীফের কলম তুলে নেয়া হয়েছে- পাগল, যতক্ষণ না তার জ্ঞান ফিরে আসে; ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয় এবং শিশু যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়’  (জামে আত তিরমিযী)। তাছাড়া যাকাত এক প্রকারের ইবাদত বিধায় শিশুর ওপর তা ফরজ হবে না, যেমন সালাত ও রোযা শিশুর ওপর ফরজ হয় না (আল-কাসানী)। তবে অধিকাংশ আলেমদের মতে শিশুদের যাকাত পরিশোধ করাই অধিকতর দলিলসম্মত।

বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া : হানাফী মাযহাব মতে, যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই পাগলের ওপর যাকাত ফরজ নয়। যুক্তি হিসেবে তাঁরা তিন প্রকারের ব্যক্তির ওপর তাখলীফের কলম তুলে নেয়ার হাদীসটি  উল্লেখ করেন। অন্যান্য মাযহাব মতে, পাগলের ওপর যাকাত ফরজ হবে, তার পক্ষ হতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক যাকাত আদায় করবেন।

স্বাধীন ব্যক্তি হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকের স্বাধীন হওয়া অন্যতম শর্ত। এ কারণে দাসের ওপর যাকাত ফরজ নয়। বস্তুতপক্ষে দাস কোনো সম্পদের মালিক নয়, তার সব সম্পদের মালিক তার মনিব। তাই তার ওপর যাকাত ফরজ হওয়ার কোন প্রশ্ন নেই।

নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা : যাকাত ফরজ হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। শরীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদকে নিসাব বলে। যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত ফরজ হয়। এ সম্পদগুলো হলো নগদ বা ব্যবসায় বিনিয়োগকৃত টাকা, স্বর্ণ, রৌপ্য, শস্য ও প্রাণী।

সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা : যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের ওপর মালিকানা ও পূর্ণাঙ্গ দখল থাকতে হবে এবং সম্পদ ব্যবহারের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে, অন্যথায় যাকাত ফরজ হবে না। যেমন জনকল্যাণে ওয়াকফকৃত সম্পদে যাকাত নেই। তবে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য ওয়াকফ করা হলে তার যাকাত দিতে হবে।

যৌথ মালিকানাভুক্ত সম্পত্তির যাকাত : কোন সম্পদের দুই বা ততোধিক মালিক থাকলে প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশের যাকাত দেবেন। যদি প্রত্যেক মালিকের অংশ আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ না হয় তাহলে কাউকে যাকাত দিতে হবে না। যদি কারো অংশ নিসাব পরিমাণ হয় তবে তাকে যাকাত দিতে হবে।

হারাম সম্পদের যাকাত : চুরি, ডাকাত, সুদ, ঘুষ, ছিনতাই, রাহাজানি, অবৈধ ব্যবসা ইত্যাদি অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ হারাম বা অবৈধ সম্পদ বলে গণ্য। হারাম পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি ওই সম্পদের মালিক নয়। অতএব, তা খরচের অধিকারও তার নেই। যাকাত প্রদানও এক ধরনের খরচ।

সম্পদ বর্ধনযোগ্য হওয়া : যাকাত ফরজ হওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দরিদ্রকে সহযোগিতা এবং তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা। কিন্তু নিশ্চয়ই আল্লাহ চান না যে, যাকাত আদায় করে ধনী ব্যক্তি দরিদ্র হয়ে যাক। সম্পদ যদি বর্ধনশীল না হয় এবং তা হতে বছরের পর বছর যাকাত আদায় করা হতে থাকে, তাহলে ধনী ব্যক্তি এক সময় দরিদ্র্য হয়ে যাবে। তাই যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদ বর্ধনশীল হওয়া অপরিহার্য।

সম্পদ একবছর অধিকারে থাকা : কোন সম্পদ যদি এক বছরের কম সময়ে হাতে থাকে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে না। এ শর্তটি নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রৌপ্য, চতুষ্পদ জন্তু ও ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন সম্পদে যাকাত নেই’। (সুনানে আবু দাউদ)

সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া: হানাফী মাযহাবের আলিমগণ যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য অতিরিক্ত একটি শর্তারোপ করেন, সেটি হলো যাকাতযোগ্য সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয় না। যে ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ নেই তাকে ধনী বলা যায় না। আর যাকাত ফরজ করা হয়েছে ধনীদের ওপর। রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে মু’আয (রা.)কে বলেছিলেন, ‘এটি ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করতে হবে।’ (সহীহ আল বুখারী)

ঋণমুক্ত হওয়া : ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদের প্রথম হকদার হলো পাওনাদার। তাই প্রথমে ঋণ আদায় করতে হবে। অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কারো ওপর ঋণ থাকলে সে যেন প্রথমে তা শোধ করে, তারপর বাকি সম্পদের যাকাত আদায় করবে।’ (মুয়াত্তা)

মৃত ব্যক্তির যাকাত : কোনো ব্যক্তির ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে কিন্তু তিনি তা আদায় না করে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে ওয়ারিশগণ বা সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক যাকাত আদায় করবেন।

বহির্বিশ্বে রক্ষিত সম্পদের যাকাত : কারো সম্পদ যদি বিদেশের ব্যাংকে থাকে কিংবা কেউ যদি বিদেশে ব্যবসা করেন এবং ওই সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়, তবে তাকে যাকাত আদায় করতে হবে। বিদেশে শরীয়াহ নির্ধারিত খাতে যাকাত বণ্টন করার সুযোগ থাকলে তিনি সেখানে বণ্টন করতে পারবেন, অন্যথায় নিজ দেশে যাকাত আদায় করবেন।

কয়েদি বা সাজাপ্রাপ্ত আসামীর যাকাত : কারাদণ্ড বা বন্দিদশা যাকাত রহিত করে না। কারাবন্দী সে হাজতি হোক বা সাজাপ্রাপ্ত হোক নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে যাকাত দিতে হবে। তার পক্ষ হতে তার পরিবারের সদস্য বা তার সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক যাকাত আদায় করবেন। যদি তা না হয় মুক্তিলাভের পর পূর্বের বছরগুলোর যাকাত তাকে হিসাব করে আদায় করতে হবে।

মুসাফিরের যাকাত : সফরের কারণেও যাকাতের বিধান রহিত হয় না। মুসাফির ব্যক্তি (সফরকারী ব্যক্তি) যদি নিজ দেশে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তাহলে ওই সম্পদের যাকাত দিতে হবে। এটা সত্য যে, সম্পদশালী মুসাফিরও যদি বিদেশে বিপদগ্রস্ত হন তাহলে তিনি যাকাত গ্রহণ করতে পারেন। তাই বলে এ বিধানের বলে দেশে রক্ষিত সম্পদের ওপর যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হয় না।

                                                                                



নিসাব (نصاب الزكوة)

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 


নিসাব (نصاب الزكوة)আরবি শব্দ। ইসলামী শরিয়তের পারিভাষায় যাকাতের নিসাব হলো যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদ। নিসাবের বিবরণ- যেই পরিমাণ সম্পদ হলে যাকাত ফরজ হবে তাকে নিসাব বলে।

০১. স্বর্ণের ক্ষেত্রে যাকাতের নিসাব হল বিশ মিসকাল, আধুনিক হিসাবে সাড়ে সাত ভরি (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস ৭০৭৭,৭১০৪)।

০২. রূপার ক্ষেত্রে নিসাব হল দুইশত দেরহাম। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৪৪৭, সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯৭৯) আধুনিক হিসাবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা। এ পরিমান সোনা রূপা থাকলে যাকাত দিতে হবে।

০৩. প্রয়োজনের উদ্ধৃত্ত টাকা-পয়সা বা বানিজ্য দ্রব্যের মুল্য যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমপরিমাণ হয় তাহলে যাকাতের নেসাব পূর্ণ হয়েছে বলে ধরা হবে এবং এর যাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাদীস ৯৯৩৭)।

০৪. যদি সোনা- রূপা, টাকা-পয়সা, কিংবা বাণিজ্য দ্রব্য এগুলোর পৃথকভাবে নেসাব পরিমান না থাকে, কিন্তু এসবের একাধিক সামগ্রী এ পরিমান রয়েছে যা একত্র করলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্য বা তার চেয়ে বেশি হয় তাহলে এক্ষেত্রে সকল সম্পদ হিসাব করে যাকাত দিতে হবে (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস ৭০৬৬,৭০৮১)।

০৫. নিসাবের অতিরিক্ত সোনা-রূপা, টাকা-পয়সা ও বাণিজ্য পণ্যের যাকাত আনুপাতিক হারে দিতে হবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাদীস, ৬/৩৯০)

০৬. কারো কাছে সোনা-রূপা, টাকা-পয়সা কিংবা বাণিজ্য দ্রব্য পৃথকভাবে বা সম্মিলিতভাবে নিসাব পরিমান ছিল, বছরের মাঝে এ জাতীয় আরো কিছু সম্পদ কোন সুত্রে পাওয়া গেল। এ ক্ষেত্রে নতুন পাওয়া সম্পদ পুরাতন সম্পদের সাথে যোগ হবে এবং পুরাতন সম্পদের বছর পর সমুদয় সম্পদের যাকাত দিতে হবে। বছরের মাঝে যা যোগ হয়েছে তার জন্য পৃথক বছর পূর্ণ হওয়া লাগবেনা । (মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক হাদীস ৬৮৭২, ৭০৪০, ৭০৪৪)

০৭.  বছরের শুরু ও শেষে নেসাব পূর্ণ থাকলে যাকাত আদায় করতে হবে। মাঝে নিসাব কমে যাওয়া ধর্তব্য নয়। অবশ্যই বছরের মাঝে সম্পূর্ণ সম্পদ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় যদি নিসাব পরিমান সম্পদের মালিক হয় তাহলে ঐ সময় থেকে নতুন করে বছরের হিসাব আরম্ভ হবে। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর যাকাত আদায় করতে হবে।



রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২২

যাকাত বন্টনের নির্ধারিত সমূহ

রবিবার, এপ্রিল ২৪, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে



প্রথম খাত : ফকির- ফকির হলো সেই ব্যক্তি যার নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। যে ব্যক্তি রিক্তহস্ত, অভাব মেটানোর যোগ্য সম্পদ নেই, ভিক্ষুক হোক বা না হোক, এরাই ফকির। যেসব স্বল্প সামর্থ্যের দরিদ্র মুসলমান যথাসাধ্য চেষ্ট করা সত্ত্বেও বা দৈহিক অক্ষমতাহেতু প্রাত্যহিক ন্যায়সঙ্গত প্রয়োজনটুকু মেটাতে পারে না, তারাই ফকির। কারো মতে যার কাছে একবেলা বা একদিনের খাবার আছে সে ফকীর।

দ্বিতীয় খাত : মিসকীন - মিসকীন সেই ব্যক্তি যার কিছুই নেই, যার কাছে একবেলা খাবারও নেই। যেসব লোকের অবস্থা এমন খারাপ যে, পরের নিকট সওয়াল করতে বাধ্য হয়, নিজের পেটের আহারও যারা যোগাতে পারে না, তারা মিসকীন । মিসকীন হলো যার কিছুই নেই, সুতরাং যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদ নেই, তাকে যাকাত দেয়া যাবে এবং সেও নিতে পারবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, ফকির বা মিসকীন যাকেই জাকাত দেয়া হবে, সে যেন মুসলমান হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হয়।

তৃতীয় খাত : আমেলীন- ইসলামি সরকারের পক্ষে লোকদের কাছ থেকে যাকাত, উসর প্রভৃতি আদায় করে বায়তুল মালে জমা প্রদান, সংরক্ষণ ও বন্টনের কার্যে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ। এদের পারিশ্রমিক যাকাতের খাত থেকেই আদায় করা যাবে। কোরআনে বর্ণিত আটটি খাতের মধ্যে এ একটি খাতই এমন, যেখানে সংগৃহীত যাকাতের অর্থ থেকেই পারিশ্রমিক দেয়া হয়। এ খাতের বৈশিষ্ট্য হলো এতে ফকীর বা মিসকীন হওয়া শর্ত নয়। পক্ষান্তরে, অবশিষ্ট ৫টি খাতে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ দূরীকরণে যাকাত আদায় শর্ত।

চতুর্থ খাত : মুমু'আল্লাফাতুল কুলুব (চিত্ত জয় করার জন্য)- নতুন মুসলিম যার ঈমান এখনো পরিপক্ক হয়নি অথবা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক অমুসলিম। যাদের চিত্ত (দ্বীন ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করে) আকর্ষণ ও উৎসাহিত করণ আবশ্যকীয় মনে করে যাকাত দান করা হয়, যাতে তাদের ঈমান পরিপক্ক হয়। এ খাতের আওতায় দুঃস্থ নওমুসলিম ব্যক্তিদের যাকাত প্রদানের ব্যাপারে ফকিহরা অভিমত প্রদান করেছেন।

পঞ্চম খাত : ক্রীতদাস/বন্দী মুক্তি- এ খাতে ক্রীতদাস-দাসী/বন্দী মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। অন্যায়ভাবে কোনো নিঃস্ব ও অসহায় ব্যক্তি বন্দী হলে তাকেও মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। বর্তমান সময়ে ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত  হওয়ায় এই খাতটি আর বিবেচ্য নয়। 

ষষ্ঠ খাত : ঋণগ্রস্থ- এ ধরনের ব্যক্তিকে তার ঋণ মুক্তির জন্য যাকাত দেয়ার শর্ত হচ্ছে- সেই ঋণগ্রস্থের কাছে ঋণ পরিশোধ পরিমাণ সম্পদ না থাকা। আবার কোনো ইমাম এ শর্তারোপও করেছেন যে, সে ঋণ যেন কোনো অবৈধ কাজের জন্য- যেমন মদ কিংবা নাজায়েয প্রথা অনুষ্ঠান ইত্যাদির জন্য ব্যয় না করে।

সপ্তম খাত : আল্লাহর পথে-  সম্বলহীন মুজাহিদের যুদ্ধাস্ত্র/সরঞ্জাম উপকরণ সংগ্রহ এবং নিঃস্ব ও অসহায় গরীব দ্বীনি শিক্ষারত শিক্ষার্থীকে এ খাত থেকে যাকাত প্রদান করা যাবে। এ ছাড়াও ইসলামের মাহাত্ম ও গৌরব প্রচার ও প্রসারের কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে যারা জীবিকা অর্জনের  এবং যে আলিমগণ দ্বীনি শিক্ষাদানের কাজে ব্যাপৃত থাকায় জীবিকা অর্জনের অবসর পান না। তারা অসচ্ছল হলে সর্বসম্মতভাবে তাদেরকেও যাকাত দেয়া যাবে।

অষ্টম খাত : অসহায় মুসাফির- যে সমস্ত মুসাফির অর্থ কষ্টে নিপতিত তাদেরকে মৌলিক প্রয়োজন পুরণ হওয়ার মতো এবং বাড়ী ফিরে আসতে পারে এমন পরিমাণ অর্থ যাকাত থেকে প্রদান করা যায়।

এক নজরে জাকাত আদায় না করার পরিণতি :

০১. যাকাত না দেয়া প্রতিটি সম্পদের একটি আকৃতি হবে। যা আগুনে উত্তপ্ত করে ব্যক্তির শরীরে দাগিয়ে দেয়া হবে।

০২. কোনো কোনো সম্পদ বিষাক্ত সাপে পরিণত হবে এবং যাকাত আদায়কারীকে দংশন করতে থাকবে।

০৩. প্রাণী জাতীয় সম্পদসমূহ কোনটা শিং দিয়ে আঘাত করবে আবার কোনটা দাঁত দিয়ে কামড় দেবে।

যাকাত আদায়ের বিবিধ উপকারিতা ও শিক্ষা :

০১. গরীবের প্রযোজন পূর্ণ হয়।

০২. অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন হয়।

০৩. সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতাকে শেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

০৪. মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

০৫. দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

০৬. চুরি-ডাকাতি-চিনতাইসহ সবরকম অভাবজনিত অপরাধ মূলোৎটাটিত হয়।

০৭. গরীব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়।

০৮. সম্পদের বরকত ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যাকাতের সম্পদ কমে না। (সহিহ মুসলিম- হা : ৬৭৫৭, মা :, শা :, হা: ৬৯/২৫৮৮, জামি আত তিরমিযী-হা : ২০২৯, সহিহ)।

অথাৎ- হয়তো দৃশ্যত: সম্পদের পরিমাণ কমবে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই স্বল্প সম্পদের মাঝেই বেশি সম্পদের কার্যকারী ক্ষমতা দিয়ে দেবেন।

০৯. সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি পায়। কেননা সম্পদ যখন যাকাতের মাধ্যমে অভাবীদের মাঝে বন্টিত হয়, তখন এর উপকারিতার পরিধি বিস্তত হয়। আর যখন তা ধনীর পকেটে কুক্ষিগত থাকে, তখন এর উপকারিতার পরিধিও সংকীর্ণ হয়।

১০. যাকাত প্রদানকারী দান ও দয়ার গুণে গুণান্বিত হয়।

১১. অন্তরে অভাবীর প্রতি মায়া-মমতা সৃষ্টি হয়।

১২. কৃপণতার ন্যায় অসৎ গুণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা যায়। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

‘তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করো; যেন তুমি সেগুলোকে এর মাধ্যমে পবিত্র ও বরকতময় করতে পার।’ (সূরা : আত তাওবাহ, আয়াত : ১০৩)


বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

  

০১.    অর্থ কী?
‘অর্থ’ শব্দের একটি অর্থ উদ্দেশ্যে বা তাৎপর্য হলেও এখানে অর্থ মানে- ধন দৌলত, পয়সা কড়ি, বিত্ত সম্পত্তি, বিষয় ঐশ্বর্য, সংগতি, পূঁজি। জীবিকা, জীবনোপকরণ, সহায় সম্বল, অবলম্বন।
ইংরেজি ভাষায় অর্থকে বলা হয় wealth, money.
আরবি ভাষায় অর্থ সম্পদ, জীবিকা, জীবন-সামগ্রী ইত্যাদি বুঝানোর জন্যে ব্যবহার হয়- مَالٌ (মাল) বহুবচনে  اَمْوَالٌ। এছাড়া مَتَاعٌ (মাতা’) رِزْقٌ (রিয্ক) শব্দগুলোও ব্যবহার করা হয়। কুরআনে অর্থ সম্পদ ও জীবিকা বুঝানোর জন্যে উক্ত শব্দগুলো ছাড়াও রূপক অর্থে فَضْلُ الله (আল্লাহ্র অনুগ্রহ) এবং نِعْمَةُ اللهِ (আল্লাহ্র দান) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।
মূলত জীবন ধারণ ও জীবন যাপনের জন্যে মানুষের যেসব উপায় উপকরণ এবং সহায় সম্বল প্রয়োজন হয় সেগুলোকে বা সেগুলোর বিকল্পকেই অর্থ সম্পদ বা জীবিকা বলা হয়।

০২.    অর্থনীতি কী?
অর্থনীতির সংজ্ঞা নির্ণয় করা কঠিন। অর্থনীতি যেহেতু একটি সামাজিক বিজ্ঞান, তাই সমাজ বিশ্লেষণের বিভিন্ন দৃষ্টিভংগিতে সমাজ বিজ্ঞানীগণ অর্থনীতির সংজ্ঞা নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। সমাজ কাঠামোর একটি ধারা হলো অর্থনৈতিক ধারা। এ ধারার যারা বিশেষজ্ঞ পন্ডিত, তাদের মধ্যে এ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith ), অধ্যাপক মর্শাল (Prof. Marshall), অধ্যাপক এল. রবিন্স (Prof. L. Robbins), জন স্টুয়ার্ট মিল, কেয়ার্নক্রস, অধ্যাপক ক্যানান, স্যামুয়েলসন প্রমূখ অর্থনীতির বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
এ্যাডাম স্মিথের মতে: “অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধান করে।”
অধ্যাপক মর্শালের মতে : “অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কার্যাবলি আলোচনা করে।”
অধ্যাপক ক্যানান বলেন: “অর্থনীতি হলো মানুষের বস্তুগত কল্যাণের কারণ অনুসন্ধানকারী বিষয়।”
কোয়র্নক্রস বলেন: “মানুষের কার্যক্রমের যে অংশ অর্থের সাথে জড়িত, তার আলোচনাই অর্থনীতির বিষয়বস্তু।”
মূলত: অর্থ সংগ্রহ, অর্জন, আহরণ, বৃদ্ধি, বন্টন, ভোগ, ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে চর্চা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং এ সবের নিয়মনীতির শাস্ত্রকেই অর্থ শাস্ত্র, অর্থ বিদ্যা, অর্থবিজ্ঞান, অর্থতত্ত্ব বা অর্থনীতি (economics) বলা হয়।
অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতিকে ইতিবাচক এবং নীতিবাচক-এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদগণ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
ইতিবাচক পন্থীরা বলতে চান : যা আছে, যা হচ্ছে, এবং যা ঘটছে, তার সমাধান নির্দেশনাই অর্থনীতির কাজ।
নীতিবাচক পন্থীরা বলতে চান: কী হওয়া উচিত, আর কী হওয়া উচিত নয় এবং কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয়, সেই নির্দেশনা প্রদানই অর্থনীতির আলোচ্য বিষয়।

০৩.    অর্থনীতির ইসলামি সংজ্ঞা
ইসলাম অর্থনীতির আলাদা অস্বাভাবিক কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেনা। ইসলাম বলে: সম্পদের মূল মালিক মহান আল্লাহ, মানুষ সম্পদের আমানতদার এবং অর্থ মানব জীবনের অখন্ড ও অবিভাজ্য বিষয় সমূহের একটি মাত্র। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে : “আল্লাহ নির্দেশিত জীবন দর্শনের ভিত্তিতে মানুষের জীবিকা আহরণ, আহরিত সম্পদের ন্যায্য বন্টন এবং সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যয় ও ভোগ ব্যবহারের নির্দেশনাই অর্থনীতি।” আমাদের মতে এটাই অর্থনীতির সঠিক সংজ্ঞা হওয়া উচিত। ইসলামি অর্থনীতি একই সাথে ইতিবাচক এবং নীতিবাচক। ইসলামি অর্থনীতিতে উন্নয়ন ও সমস্যার সমাধান নির্দেশনা প্রদান করা হয় আদর্শ ও ন্যায় নীতির ভিত্তিতে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. এম. নেজাতুল্লাহ সিদ্দীকির মতে : Islamic economics is the Muslim thinkers’ response to the economic challenges of their times. In this endeavour they are aided by the Quran and the Sunnah as well as by reason and experience. (Lectures on Islamic Economic Thoughts, IRTI, Islamic Development Bank, Jeddah, 1992, P 69)

০৪.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার মতোই অর্থব্যবস্থাও তিনটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সেগুলো হলো :
১.    দর্শনগত ভিত্তির উপর পরিচালিত হওয়া।
২.    মাকাসিদে শরিয়া (শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ) অর্জনের জন্যে তৎপর থাকা।
৩.    হিকমা বা কর্মকৌশল ও প্রজ্ঞার প্রয়োগ।
১. দর্শনগত ভিত্তির অর্থ: দর্শনগত ভিত্তি বলতে বুঝায় বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া দৃষ্টিভংগি ও ধ্যান ধারণা। ইসলামি জীবন ব্যবস্থার দর্শনগত ভিত্তি তিনটি। সেগুলো হলো :
১.    তাওহীদ (আল্লাহ্র একত্ব এবং এক আল্লাহ্র দাসত্ব ও আনুগত্য)।
২.    খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহ্র প্রতিনিধি)।
৩.    আদল (ন্যায়, নায্য ও সুষমনীতি; Justice)।
এই তিনটি মূলনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসই মানব জীবনে শক্তি ও প্রেরণার মূল উৎস। তাঁকে মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মালিক ও পরিচালক মেনে নিয়ে তাঁর আনুগত্য ও দাসত্বের জীবন যাপন করাই মানব জীবন সাফল্যের একমাত্র করিডোর। এই পৃথিবী এবং মানুষ তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ মাত্র। তিনি কোনো কিছুই অর্থহীন সৃষ্টি করেননি। মানুষের ইহকালীন কর্মতৎপরতাকে তিনি পরকালীন সাফল্যের ভিত্তি বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে সাফল্যের জন্যে অবশ্যি তাঁর প্রদত্ত বিধানমতো চলতে হবে এবং শুধুমাত্র তাঁরই কাছে চাইতে হবে।
ইসলামে খিলাফতের ধারণাও বিশ্বজনীন। মানুষ পৃথিবীর মূল কর্তা নয়। পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীর সম্পদ ও কর্তৃত্ব মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। সুতরাং ক্ষমতা ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো সকল মানুষের কল্যাণে নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদকে নিবেদিত করা। খিলাফতের মূল স্পীরিট হলো :
১.    বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব বোধ : সব মানুষ একই সূত্রে গাঁথা। সবাই এক আল্লাহর সৃষ্টি। সবাই এক আদমের সন্তান।
২.    মানবতার প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ।
৩.    ক্ষমতা ও ধনসম্পদ তার কাছে আল্লাহ্র গচ্ছিত আমানত। এগুলোকে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করাই তার মূল দায়িত্ব।
৪.    বিনয় ও আনুগত্য। যেহেতু মানুষ পৃথিবীতে কোনো কিছুরই মালিক নয়, আমানতদার, তাই মূল মালিকের প্রতি আনুগত্য এবং বিনয়ী জীবন যাপন করাই তার কর্তব্য।
আদল কথাটিও ব্যাপক অর্থবোধক। এর ইংরেজি অনুবাদ Justice. বাংলায় ন্যায়, নায্য ও সুষমনীতি ও আচরণ বলা যায়। এর তাৎপর্য হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের শক্তি, ক্ষমতা ও সম্পদ মানব কল্যাণে নিয়োজিত করবে। সে তার অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচার ও কল্যাণ কামনা দ্বারা তাড়িত হবে।
অর্থনীতিসহ ইসলামের সকল কাজে এই তিনটি বিশ্বাস ও চিন্তাগত ভাবধারা মানবদেহের অভ্যন্তরে শোনিত ধারার মতো প্রবহমান থাকতে হবে।
২. মাকাসিদে শরিয়া (objectives of shariah) : মাকাসিদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন মাকসাদ। মাকসাদ মানে- উদ্দেশ্য (objective)। ইসলামের ভিত্তিতে জীবন যাপনের জন্যে আল্লাহ তায়ালা যে নিয়ম কানুন ও বিধি বিধান প্রদান করেছেন, তা-ই একমাত্র মানব কল্যাণের শরিয়া। মানুষের ইহ জাগতিক এবং পারলৌকিক সার্বিক কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ শরিয়া প্রদান করেছেন। ইসলামি শরিয়ার মূল উৎস (source) হলো আল কুরআন ও সুন্নতে রসূল সা.।
কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে মাকাসিদে শরিয়া বা ইসলামি শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ নিম্নরূপ :
১.    ঈমান ও তাওহীদ : অর্থাৎ মুমিনদের ঈমান ও আকিদা-বিশ্বাসের সংরক্ষণ।
২.    আদল : ন্যায় বিচার ও সুষমনীতি নিশ্চিত করণ।
৩.    ইহসান ও ফালাহে ’আম : মানবতার কল্যাণ ও সাফল্য।
৪.    হায়াতে তাইয়্যেবা : সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন।
৫.    মানবতার কল্যাণ, সাফল্য এবং সুন্দর-স্বচ্ছন্দ জীবন যাপনের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
৬.    জীবনের নিরাপত্তা।
৭.    মানব বংশ সংরক্ষণ।
৮.    সম্পদের নিরাপত্তা।
৯.    মর্যাদা তথা মান সম্মান ও ইয্যতের নিরাপত্তা।
১০.    মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ও বিকাশের সুবিধা নিশ্চিত করণ।
১১.    চিন্তা, চলাফেরা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করণ।
১২.    সামগ্রিক মানবাধিকার সংরক্ষণ।
৩. হিকমা (কর্মকৌশল ও প্রজ্ঞা) : শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ অর্জনের জন্যে হিকমা প্রয়োগ অপরিহার্য। হিকমা মানে- যথার্থ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও কর্মকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালানো। মূলত টিকে থাকা, উন্নয়ন, সাফল্য অর্জনের কৌশল ও সঠিক পদক্ষেপকে হিকমা বলা হয়। কুরআন বলছে, রসূল সা. তাঁর সাথিদের মানবিক ও নৈতিক সত্তার উন্নয়ন এবং কিতাব শিক্ষা দেয়ার সাথে সাথে হিকমাও শিক্ষা দিতেন :
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ 
অর্থ: অবশ্যি আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করেছেন তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রসূল পাঠিয়ে, যিনি তাদের প্রতি আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করেন, তাদের তাযকিয়া (মানবিক ও নৈতিক গুণাবলীর উন্নয়ন সাধন) করেন, তাদের আল কিতাব (কুরআন) এবং হিকমা শিক্ষা দান করেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৬৪)
মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে মানব সমাজের গোটা অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ভিত্তি হলো এই তিনটি। সুতরাং ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তিও এই তিনটি।

০৫.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য সমূহ
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহই এর মূলনীতি। সেগুলো হলো:
০১.    অর্থ সম্পদের মূল মালিক ও যোগানদাতা এই পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ।
০২.    মানুষ সম্পদের মূল মালিক নয়, আমানতদার এবং ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মাত্র। সুতরাং সে সম্পদের উৎপাদন, উপার্জন এবং ভোগ ব্যবহার করবে সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা মাফিক।
০৩.    মানুষের আর্থ সামাজিক বিষয়াদি তার বিশ্বাস, আদর্শ ও মূল্যবোধের সাথে একীভূত ও অবিভাজ্য। সুতরাং তার আর্থ সামাজিক বিষয়াদির উন্নয়ন ও ইতিবাচক নির্দেশনার ভিত্তি হবে নীতিবাচক তথা তার বিশ্বাস, আদর্শ এবং শরিয়া তথা কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তি, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা।
০৪.    ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম মূল নীতি হলো, জাতি ধর্ম, ভাষা বর্ণ এবং কুল গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ সাধন বা মানব কল্যাণ।
০৫.    ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আদল তথা ইনসাফ, সুবিচার ও ভারসম্যপূর্ণতা (Justice and balance)।
০৬.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সংঘাত নয়, বরং পারস্পারিক সহমর্মিতা, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতা (ইহ্সান)।
০৭.    ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় যুল্ম ও নিবর্তনমূলক সকল পন্থা ও প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ।
০৮.    ইসলামি অর্থব্যবস্থা উৎপাদন, উপার্জন ও উন্নয়নমুখী।
০৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থায় অর্থ সম্পদের কৃপণতা, অলস পূঞ্জীভূত করণ এবং অনুৎপাদনশীল সঞ্চয় নিষিদ্ধ।
১০.    ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদের অপব্যবহার, অপব্যয় এবং অপচয় নিষিদ্ধ।
১১.    ইসলামি অর্থনীতি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।
১২.    ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকারের স্বীকৃতি।
১৩.    ইসলামি অর্থব্যবস্থা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নির্দেশনা সম্বলিত সার্বজনীন জনহিতৈষী ব্যবস্থা।
১৪.    অর্থ হবে ধ্বংস ও অকল্যাণ থেকে মানুষ ও মানবতার মুক্তির হাতিয়ার।
১৫.    ব্যক্তি মালিকানার অধিকার। পুরুষ নারী প্রত্যেকেই বৈধ পন্থায় অর্জিত নিজ সম্পদের স্বত্বাধিকারী সে নিজে। বৈধ অন্থায় স্বাধীনভাবে এর বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যহারের অধিকার তার জন্যে সংরক্ষিত।
১৬.    যাকাত : অভাবী ও বিপদগ্রস্তদের অধিকার হিসেবে ধনীদের নগদ ও বিনিয়োগকৃত অর্থ, ফল ফসল এবং গবাদি পশুসহ সর্বপ্রকার বর্ধনশীল সম্পদের যাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
১৭.    সুদ ও সুদী কারাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১৮.    উত্তরাধিকার বিধান : শরিয়া নির্ধারিত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টন বাধ্যতা মূলক।
১৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামগ্রিক উদ্দেশ্য হলো, মাকাসিদে শরিয়া বা ইসলামি শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ বাস্তবায়ন।
২০.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, বিশ্বাসী হিসেবে দুনিয়ায় সুন্দর, স্বচ্ছন্দ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবন যাপনের মাধ্যমে আখিরাতের সাফল্য অর্জন।
ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য নীতিমালা সংক্রান্ত ধারণা বিষয়ে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো :
لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ 
অর্থ: মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর ভান্ডারের চাবিকাঠির মালিকানা ও কর্তৃত্ব আল্লাহ্র। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তার জীবিকায় (অর্থ সম্পদে) প্রশস্ততা দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা সীমিত দিয়ে থাকেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞানী। (সূরা ৪২ আশ শূরা : আয়াত ১২)
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا 
অর্থ: আল্লাহ সেই মহানুভব সত্ত্বা যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৯)
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ 
অর্থ: (হে মানুষ!) আমরা পৃথিবীতে তোমাদের কর্তৃত্ব দান করেছি এবং সেখানেই রেখে দিয়েছি তোমাদের জীবনের উপকরণ (অর্থাৎ পৃথিবীর বুকেই তোমরা জীবিকা সন্ধান সংগ্রহ করো)। (সূরা ৭ আল আ’রাফ : আয়াত ১০)
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ ۚ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا 
অর্থ: আল্লাহ যেসব জিনিস দিয়ে তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেটার জন্যে তোমরা লালসা করোনা। পুরুষ যা উপার্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আল্লাহর কাছে তার অনুগ্রহ (অর্থ সম্পদ, সহায় সম্বল) প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী। (সূরা ৪ আন্নিসা : আয়াত ৩২)
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
অর্থ: এবং তাদের (বিত্তবানদের) অর্থ সম্পদে অধিকার রয়েছে সাহায্যপ্রার্থী এবং বঞ্চিতদের। (সূরা ৫১ আয্ যারিয়াত : আয়াত ২৯)
مَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ 
অর্থ: আল্লাহ জনপদবাসীদের থেকে তাঁর রসূলকে যা  (যে সম্পদ) দিয়েছেন- তা আল্লাহর, আল্লাহর রসূলের, রসূলের স্বজনদের, এতিমদের, অভাবীদের এবং পথচারীদের জন্যে। এর উদ্দেশ্য হলো, অর্থ সম্পদ যেনো কেবল তোমাদের মধ্যকার বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। (সূরা ৫৯ আল হাশর: আয়াতাংশ ৭)
إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ 
অর্থ: তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে লেনদেনের (ঋণ দেয়া নেয়ার) ফায়সালা করবে, তখন তা লিখিতভাবে করবে। (সূরা ২ আল বাকারা ; আয়াত ২৮২)
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ 
অর্থ: তিনিই মহান আল্লাহ, যিনি পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো, তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করবেন। (সূরা ৬ আল আন’আম : আয়াত ১৬৫)
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ 
অর্থ: ওদের জিজ্ঞেস করো, কে হারাম করলো আল্লাহ্র সেই সব সৌন্দর্যকে, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্যে উৎপন্ন করেছেন এবং উত্তম জীবনোপকরণ সমূহকে? (সূরা ৭ আ’রাফ : আয়াত ৩২)
إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ 
অর্থ: তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তাও ভালো। আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা অধিকতর ভালো। এমনটি করলে তোমাদের বহু পাপ মুছে দেয়া হবে। তোমরা যাই করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (সূরা ২ বাকারা : ২৭১)
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ 
অর্থ: এই সাদাকা (যাকাত) নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো ফকিরদের জন্যে, মিসকিনদের জন্যে, সাদাকা আদায়-বন্টন বিভাগের কর্মচারীদের জন্যে, তাদের জন্যে (ইসলামের পক্ষে) যাদের মন আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য হবে, দাস মুক্তির জন্যে, ঋণে নিমজ্জিতদের সাহায্যের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং পথিকদের সাহায্যের জন্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ফরয। (সূরা ৯ তাওবা : ৬০)
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا  إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ 
অর্থ: আত্মীয় স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবী ও পথিকদের দাও তাদের প্রাপ্য। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অপব্যয় করোনা। কারণ অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ২৬-২৭)
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ 
অর্থ: হে আদম সন্তান! সালাত আদায়কালে তোমাদের উত্তম পবিত্র পোশাক পরে সৌন্দর্য গ্রহণ করো। আর আহার করো, পান করো, কিন্তু অপচয় করোনা। আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা ৭ আল আ’রাফ: আয়াত ৩১)
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا 
অর্থ: তুমি (কার্পণ্য করে) নিজের হাতকে গলায় বেঁধে রেখোনা, আবার (উজাড় করে খরচ করে ফেলার জন্যে) তা সম্পূর্ণ প্রসারিত করেও দিওনা। এমনটি করলে তিরস্কৃত হবে এবং খালি হাতে বসে পড়বে। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ২৯)
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَ‌ٰلِكَ قَوَامًا 
অর্থ: (আল্লাহ্র প্রিয় লোকদের বৈশিষ্ট্য হলো:) তারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপচয়-অপব্যয় করেনা, আবার কার্পণ্যও করেনা; বরং উভয় চরম পন্থার মাঝখানে তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। (সূরা ২৫ আল ফুরকান : আয়াত ৬৭)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ
অর্থ: হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল এবং উত্তম পবিত্র। তোমরা তাই খাও- ভোগ করো। তবে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা। (সূরা ০২ : ১৬৮)

০৬.    ইসলামি অর্থনীতির উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য
ইসলামি অর্থনীতি মানব কল্যাণের অন্যতম উপাদান। সমাজ থেকে অকল্যাণের পথ বন্ধ করে কল্যাণের স্রোতধারা বইয়ে দেয়াই ইসলামি অর্থনীতির কাজ। নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যাবলি হাসিলের প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুটি এবং আখিরাতের সাফল্য অর্জনই ইসলামি অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য :
১.    ফালাহ: ব্যাক্তির সাফল্য ও কল্যাণ সাধন,
২.    ইহ্সান: মানবতার কল্যাণ সাধন,
৩.    আদল: সমাজে অর্থ সম্পদের ন্যায্য ও সুষম প্রবাহ সৃষ্টি,
৪.    সমাজে ন্যায়নীতির প্রচলন,
৫.    দেশ ও সমাজকে ফিতনা ফাসাদ তথা ধ্বংসকর কর্মকান্ড থেকে রক্ষা করা।
এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের নিমোক্ত আয়াতগুলো অকাট্য দলিল :
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ 
অর্থ: আল্লাহ তোমাকে যে অর্থ সম্পদ দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস (জান্নাত) অনুসন্ধান করো এবং পার্থিব জীবনে তোমার বৈধ (ভোগের) অংশও ভুলে থেকোনা। (মানুষের) কল্যাণ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর (অর্থ সম্পদ দ্বারা) দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। (সূরা ২৮ আল কাসাস : আয়াত ৭৭)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ 
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন আদল ও ইহসান করার এবং নিকটাত্মীয়দের দান করার। আর তিনি নিষেধ করছেন অশ্লীলতা, অসৎকর্ম এবং সীমালংঘন থেকে। তিনি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। (সূরা ১৬ আন্ নহল : আয়াত ৯০)
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ: সালাত সমাপ্ত হলে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং (কাজ ও শ্রম দানের মাধ্যমে) আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা, অর্থ-সম্পদ) সন্ধান (সংগ্রহ) করো, আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমারা ফালাহ (কল্যাণ) লাভ করবে। (সূরা ৬২ আল জুমুয়া : আয়াত ১০)
وَأَنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ: তোমারা আল্লাহর পথে ব্যয় করো, আল্লাহর পথে খরচ না করে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা। মানুষের প্রতি ইহসান করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের (কল্যাণকারীদের) ভালোবাসেন। (সূরা ২ বাকারা : আয়াত ১৯৫)

০৭.    ইসলামে অর্থ উপার্জনের তাকিদ
প্রধানত তিনটি সূত্রে মানুষ অর্থ সম্পদ অর্জন করে। সেগুলো হলো :
১.    উত্তরাধিকার সূত্রে
২.    ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরি বাকুরি তথা কাজ করে উপার্জনের মাধ্যমে,
৩.    দান লাভের মাধ্যমে।
যারা শুধু প্রথমটির উপর নির্ভর করে, সেই সাথে দ্বিতীয় মাধ্যমটি গ্রহণ করেনা, তারা কর্মবিমূখ-অলস। ইসলামে এ ধরণের লোকেরা নিন্দনীয়। এরা ক্রমান্বয়ে তৃতীয় মাধ্যমটি অবলম্বনের দিকে অগ্রসর হয়।
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা ব্যবসা না করে, বা কাজ না করে, বা শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন না করে শুধু দান লাভ বা ভিক্ষাবৃত্তির উপর নির্ভর করে, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা খুবই নিন্দা ও তিরস্কারযোগ্য।
ইসলামে প্রশংসনীয় লোক হলো তারা, যারা দ্বিতীয় মাধ্যমটি গ্রহণ করে। অর্থাৎ যারা ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকুরি বাকুরির মাধ্যমে কিংবা শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করে।
অর্থ উপার্জনে আত্মনিয়োগ করা মুমিনদের জন্যে অত্যাবশ্যক। এর নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَ‌ٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ  فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ 
অর্থ: হে মুমিনরা! জুমাবারে যখন  সালাতের দিকে ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা বিজনেস রেখে দ্রুত আল্লাহ্র যিক্র (সালাত)-এর দিকে আসো। এতেই রয়েছে তোমাদের জন্যে কল্যাণ যদি তোমরা জ্ঞান খাটাও। অতপর সালাত শেষ হবার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ো জমিনে (তোমাদের পেশায়) এবং সন্ধান করো আল্লাহ্র অনুগ্রহ (জীবিকা), আর বেশি বেশি আলোচনা করো আল্লাহ্র কথা। এভাবেই অর্জন করবে তোমরা ফালাহ (কল্যাণ ও সাফল্য)। (সূরা ৬২ জুমুয়া : আয়াত ৯-১০)
নিদ্রা এবং রাত দিন সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন :
وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا  وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا  وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا
অর্থ : আমি তোমাদের নিদ্রাকে বানিয়ে দিয়েছি বিশ্রাম ও প্রশান্তি লাভের উপায়। রাতকে বানিয়ে দিয়েছি আবরণ। আর দিনকে বানিয়ে দিয়েছি জীবিকা উপার্জনের উপযুক্ত সময়। (সূরা ৭৮ জুমুয়া : আয়াত ৯-১১)
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
مَا اَكَلَ اَحَدٌ طَعَامًا خَيْرًا مِنْ انْ يَأكُلَ مِنْ عَمَلٌ يَدَيْهِ 
অর্থ: “নিজের উপার্জনের চাইতে উত্তম জীবিকা কেউ কখনো ভোগ করেনি।” (সহীহ বুখারি)
اِنَّ اَطْيَبَ مَا اَكَلْتُمْ مِنْ كَسْبَِكُمْ وَاِنَّ اَوْلاَدِكُمْ مِنْ كَسَبِكُمْ 
অর্থ: “তোমাদের সর্বোত্তম জীবিকা নিজের উপার্জন। আর তোমাদের সন্তানের উপার্জনও তোমাদের উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।” (তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, আবু দাউদ)
অর্থ উপার্জন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, রসূলুল্লাহর সা. এ হাদিসটি তার নির্দেশক :
طَلَبُ كَسَبِ الْحَلاَلِ فَرِيْضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيْضَةٌ 
অর্থ: “অন্যান্য ফরযের মতোই হালাল উপার্জনও একটি ফরয।” হাদিসটি বায়হাকি তাঁর শোয়াবুল ঈমানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা বর্ণনা করেছেন।
মুসনাদে আহমদে রাফে বিন খাদিজ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো : কোন্ ধরণের উপার্জন সর্বোত্তম? তিনি বললেন : “ব্যক্তির সশ্রমে হালাল ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন।”

০৮.    হালাল ও বৈধ উপার্জনকারীর পরকালীন সাফল্য

হালাল উপার্জন একটি ইবাদত। কারণ হালাল উপার্জনকারী আল্লাহ্র হুকুম পালন করে। আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন, সে সেগুলো পরিত্যাগ করে। যেসব মুমিন ব্যক্তি হালাল ও বৈধ পন্থায় জীবিকা তথা অর্থ সম্পদ উপার্জন করে, পরকালে আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদা দান করবেন। জাবির রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
رَحِمَ اللهُ رَجُلاً سَمْحًا اِذَا بَاعَ وَاِذَا شْتَرٰى وَاِذَا قْتَضٰى 
অর্থ: আল্লাহ তায়ালা ঐ উপার্জনকারীর প্রতি রহম করেন, যে বেচা কেনা এবং পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে সহনশীল হয়। (সহীহ বুখারি : ব্যবসা বাণিজ্য অধ্যায়)
আলী রা. বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি : “যেদিন আল্লাহ্র আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবেনা, সেদিন সেই ছায়ায় ঐ ব্যক্তিকে স্থান দেয়া হবে, যে আল্লাহ্র অনুগ্রহ (জীবিকার) সন্ধানে বের হয় এবং তা সংগ্রহ করে পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে আসে।” (মুসনাদে যায়েদ ইবনে আলী, Economic Teaching of Prophet Muhammad 3:3)
আবু সায়ীদ খুদরি রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
اَلتَّاجِرُ الصَّدُوْقُ الْاَمِيْنُ مَعَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ 
অর্থ: সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (পরকালে) নবী, সিদ্দিক এবং শহীদগণের সংগি হবে।” (তিরমিযি, দারেমি, দারু কুতনি, ইবনে মাজাহ। মিশকাত শরীফ হাদিস নম্বর : ২৬৭৪)

০৯.    হারাম ও অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি
কুরআন মজিদে অবৈধ উপার্জনকারীদের ভয়াবহ পরকালীন শাস্তির কথা উল্লেখ হয়েছে। রসূলুল্লাহ সা.-এর হাদিসেও অবৈধ উপার্জনের চরম নিন্দা করা হয়েছে। এখানে আমরা দুটি হাদিস উল্লেখ করছি। আবু বকর রা. বর্ণনা করেন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِىَ بِالْحَرَامِ 
অর্থ: যে শরীর (যে ব্যক্তি) হারাম (উপার্জন ভোগ) দ্বারা লালিত ও বিকশিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। (বায়হাকি, মিশকাত হাদিস নম্বর ২৬৬৭)
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
اِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لاَّ يَقْبَلُ اِلاَّ طَيِّبًا وَاِنَّ اللهَ اَمَرَ الْمُؤمِنِيْنَ بِمَا اَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِيْنَ  فَقَالَ يٰاَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَعْمَلُوْا صَالِحًا وَّقَالَ يٰاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَكُمْ ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلُ يُطِيْلُ السَّفَرَ اَشْعَثَ اَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ اِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَ مَطْعَمُه حَرَامٌ وَّمَشْرَبُه حَرَامٌ وَّمَلْبَسُه حَرَامٌ وَّغُذِىَ بِالْحَرَامِ فَاَنّٰى يُسْتَجَابَ لِذَالِكَ 
অর্থ: আল্লাহ উত্তম-পবিত্র। তিনি উত্তম এবং পবিত্র (পন্থা ও বস্তু) ছাড়া গ্রহণ করেন না। তিনি মুমিনদের সেই নির্দেশই দিয়েছেন, যে নির্দেশ দিয়েছেন রসূলগণকে। তিনি তাদের বলেছেন : ‘হে রসূলরা! তোমরা উত্তম ও পবিত্র জীবিকা আহার করো, ভোগ করো এবং আমলে সালেহ করো।’ তিনি আরো বলেছেন : ‘হে মুমিনরা! আমার প্রদত্ত উত্তম ও পবিত্র জীবিকা ভোগ-আহার করো।’ অতপর রসূলুল্লাহ সা. বললেন : দেখো, এক ব্যক্তি দূর দুরান্ত সফর করে আসে। তার চুল এলোমেলো, দেহ ধূলোমলিন। সে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা করে : ‘হে প্রভু, হে প্রভু!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম (অর্থাৎ হারাম উপার্জনের), হারাম উপার্জনই সে ভোগ করে। কী করে কবুল হবে তার দোয়া? (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হাদিস নম্বর ২৬৪০)

১০.    হালাল ও বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় সমূহ
হালাল এবং বৈধভাবে অর্থ উপার্জন ও ভোগ ব্যবহারের নির্দেশই ইসলামে দেয়া হয়েছে। ইসলাম নোংরা উপার্জন ও জীবিকাকে নিষিদ্ধ করে এবং উত্তম ও সুন্দর উপার্জন ও জীবিকাকে প্রশংসা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ  وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ 
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ যেসব ভালো জিনিস তোমাদের জন্যে হালাল করেছেন তোমরা সেগুলো নিষিদ্ধ করে নিওনা এবং সীমালংঘন করোনা। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তোমাদের যেসব হালাল ও ভালো জীবিকা-জীবনোপকরণ দিয়েছেন সেগুলো ভোগ আহার করো এবং সেই আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর প্রতি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছো।  (সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৮৭-৮৮)
মূলত নিষিদ্ধ উৎসসমূহ ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিতে উপার্জনের বাকি সব উৎসই হালাল বা বৈধ। আয় উপার্জনের নিম্নোক্ত উৎসসমূহ হালাল এবং বৈধ :
০১.    ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন। বৈধ পন্থায় ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জনকে ইসলাম সর্বাধিক উৎসাহিত করেছে। ব্যবসা করা যায় :
ক. একক ব্যবসা,
খ. পূজি বিনিয়োগের মাধ্যমে শরিকানা ব্যবসা,
গ. পূজি ও শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথ বা শরিকানা ব্যবসা।
০২.    কৃষি কাজের মাধ্যমে উপার্জন। যেমন :
ক. নিজের জমিতে ফল ফসল ও অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদন ও উপার্জন,
খ. পরের জমিতে বর্গা চাষের মাধ্যমে উৎপাদন ও উপার্জন,
গ. পরের জমি ভাড়া  (ইজারা) নিয়ে উৎপাদন।
০৩.    পশু পাখি ও মৎস পালনের মাধ্যমে উপার্জন (জলে স্থলে খামার পদ্ধতি)।
০৪.    শিল্প কারখানা স্থাপনের মাধমে উপার্জন।
০৫.    পেশা গ্রহণের মাধ্যমে উপার্জন। শিক্ষকতা, ডাক্তারি, ওকালতি, ইত্যাদি।
০৬.    সরকারি বেসরকারি চাকুরি গ্রহণের মাধ্যমে উপার্জন।
০৭.    সেবা প্রদানের (সাভির্স চার্জ গ্রহণের) মাধ্যমে উপার্জন।
০৮.    মানসিক এবং শারীরিক শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জন।
০৯.    দালালি (সহযোগিতা) করার মাধ্যমে উপার্জন।
১০.    দান লাভের মাধ্যমে অর্জন।
১১.    হাদিয়া, তোহফা ও অসিয়তের মাধ্যমে লাভ।
১২.    উত্তরাধিকার লাভ।
১৩.    অধিকার হিসাবে অভিভাবক থেকে লাভ।
১৪.    সরকারি সাহায্য লাভ।
১৫.    অন্যান্য।

১১.    নারীর অর্থ উপার্জন ও সম্পদের মালিকানা অর্জন
এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে নারীর অর্থোপার্জন এবং খরচের বিষয়টিও আলোচনা করা জরুরি মনে করছি। কারণ, এ নিয়ে অকারণে সৃষ্টি করা হয়েছে অনেক কল্পকাহিনী।
ইসলাম পুরুষের মতো নারীর অর্জিত সম্পদের মালিকানা নারীকেই দিয়েছে (সূরা আন্নিসা : আয়াত৩২)। পুরুষের মতোই শরিয়া অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় নারীর অর্জিত ও উপার্জিত নিজের অর্থ সম্পদের বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যবহারের অধিকার তার নিজের জন্যে সংরক্ষিত। তবে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনে এবং পরিবার পরিচালনায় অর্থ ব্যয়ের দায়িত্ব পুরুষের । এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ছাড়া নারীর অর্থ ব্যয় হয়না। নারীর আয়ের উৎস অধিক, ব্যয়ের বাধ্যতামূলক খাত একেবারেই সীমিত। তার ব্যয়ের খাত স্বাধীন সেচ্ছোমূলক। ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর আয় ও অর্জনের উৎস সমূহ নিম্নরূপ:
০১.    লালন পালন ও পড়া লেখার অর্থ পাবেন পিতার নিকট থেকে।
০২.    বিবাহের অর্থ প্রদান করবেন পিতা এবং স্বামী।
০৩.    বিবাহে স্বামীর নিকট থেকে মোহরানা লাভ।
০৪.    ঘর বাড়ি নির্মাণ খরচ বা বাসা ভাড়া পাবেন স্বামীর নিকট থেকে।
০৫.    খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার অর্থ পাবেন স্বামীর নিকট থেকে।
০৬.    সন্তান লালন পালন এবং তাদের শিক্ষা চিকিৎসা সহ যাবতীয় খরচের অর্থ নেবেন স্বামী থেকে।
০৭.    পিতা মাতা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থ সম্পদ লাভ করবেন।
০৮.    স্বামী এবং সন্তানের মৃতুতেও উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থ সম্পদ লাভ করবেন।
০৯.    স্বামী, সন্তান, পিতা, মাতা, ভাইবোন এবং অন্যান্য আত্মীয়দের পক্ষ থেকে দান, উপহার এবং হাদিয়া তোহফা লাভ।
১০.    স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতিক্রমে (যদি বর্তমান থাকে) বৈধ প্রক্রিয়ায় চাকুরির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ।
১১.    বৈধ প্রক্রিয়ায় ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ।
১২.    শিক্ষকতা, চিকিৎসা ও অন্যান্য স্বাধীন পেশার মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ।
১৩.    হস্তশিল্পসহ ঘরে প্রস্তুতযোগ্য সামগ্রী তৈরির মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ।
১৪.    বিবাহ বিচ্ছেদ কালে তালাক দাতা স্বামীর নিকট থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর  অর্থ  লাভ।
১৫.    তালাক দাতা স্বামীর শিশু সন্তানকে দুধপান করালে বা লালন পালন করলে সে জন্যে অর্থ লাভ।

১২.    নারীদের  খরচের খাত
০১.    পড়া লেখার খরচ : প্রদান করনে পিতা, মাতা, স্বামী,ভ্রাতা। নিজের খরচ নেই, থাকলেও ঐচ্ছিক।
০২.    বিবাহ খরচ : প্রদান করেন পিতা, মাতা, ভ্রাতা, বর। নিজের খরচ ঐচ্ছিক।
০৩.    সন্তান লালন পালন খরচ: এ ক্ষেত্রে মায়ের খরচ ঐচ্ছিক, পিতার খরচ বাধ্যতামূলক।
০৪.    বাসস্থানের খরচ : বহন করেন পিতা, স্বামী, সন্তান। নিজের খরচ ঐচ্ছিক এবং কদাচিৎ।
০৫.    অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা খরচ : বহন করেন পিতা, স্বামী, সন্তান। নিজের খরচ ঐচ্ছিক/ কদাচিৎ।
০৬.    দান সদকা।
০৭.    হাদিয়া, তোহফা, উপহার।
০৮.    যাকাত।
০৯.    কর, খাজনা।
১০.    কাফফারা, ফিদিয়া, মান্নত।
নারীদের অর্থব্যয়ের খাত দশটি। এর মধ্যে ৭টি ঐচ্ছিক এবং তিনটি ক্ষেত্র বিশেষে এবং ঘটনাক্রমে বাধ্যতামূলক।

১৩.    অর্থ উপার্জনের হারাম ও নিষিদ্ধ উপায় সমূহ
ব্যক্তি ও সমাজ তথা মানুষের জন্যে যা কিছু ক্ষতিকর, অকল্যাণকর, তা সবই হারাম, নিষিদ্ধ এবং অবৈধ। ইসলামের এ নীতি অর্থনৈতিক বিষয়াদিসহ মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইসলামের অর্থনীতি সমন্বিতভাবে ইতিবাচক ও নীতিবাচক । ইসলামের এই নীতিবাদিতা শরিয়ার বিধান এবং শাশ্বত আদর্শিক নীতিবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে হিসেবে ইসলামে নিুোক্ত উপায় ও পন্থা প্রক্রিয়ায় আয় উপার্জন হারাম, নিষিদ্ধ ও অবৈধ :
১.    রিবা (সুদ) : এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন :
وَاَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوا 
অর্থ: আল্লাহ হালাল করেছেন ব্যবসা বাণিজ্য এবং হারাম করেছেন রিবা (সূদ)। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৭৫)
২.    রিশওয়াত : অর্থাৎ ঘুষ ও উৎকোচের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ।
৩.    গরর : অর্থাৎ প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ, তা যে প্রকারেরই হোক।
৪.    ডাকাতি, লুন্ঠন, ছিনতাই ও অপহরণের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ।
৫.    দখল, জবর দখলের উপার্জন নিষিদ্ধ।
৬.    নিজের খুশিমতো দাম বা বিনিময় দিয়ে স্বত্তাধিকারীর অনিচ্ছা সত্তেও নিয়ে নেয়া নিষিদ্ধ।
এই কয়টি বিষয় সম্পর্কে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে :
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ 
অর্থ: তোমরা নিজেদের মধ্যে অবৈধ পন্থায় একে অপরের অর্থ সম্পদ খেয়োনা এবং সেগুলো শাসকদের সামনেও এমন কোনো উদ্দেশ্যে উত্থাপন করোনা, যাতে করে তোমরা জেনে বুঝে পরের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পাও। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ১৮৮)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ 
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের অর্থ সম্পদ বাতিল অন্যায় অবৈধ উপায়ে খেয়োনা। তবে পারস্পারিক ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা করলে ভিন্ন কথা। (সূরা ৪ আন্ নিসা : আয়াত ১৮৮) এ প্রসঙ্গে আরো দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৩৩।
৭.    আমানতের খেয়ানত ও আত্মস্যাতের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য (আল কুরআন ২ : ২৮৩; ৩ : ১৬১)
৮.    জুয়া, বাজি এবং এমন সব উপায় প্রক্রিয়া অবলম্বন করে উপার্জন করা, যার মাধ্যমে ঘটনাচক্রে একজনের অর্থসম্পদ আরেকজনের কাছে চলে যায়। এগুলো হারজিতের ধ্বংসকর খেলা। এতে এক পক্ষ কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই আরেক পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তার অর্থ লুটে নেয়। এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯০।
৯.    হারাম বস্তুর উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : যেমন, ক. মদ ও মাদকদ্রব্য, খ. মৃত প্রাণী, গ. শুয়োর, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদির ব্যবসা। দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৩,৯০ এবং হাদিস দ্রষ্টব্য।
১০.    লটারি, ভাগ্য গণনা ও জ্যোতিষ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯০।
১১.    অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি প্রচার ও প্রসারকারী কার্যক্রমের মাধ্যমে উপার্জন: দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ১৯।
১২.    ইহ্তিকার : ইহ্তিকারের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। ইহ্তিকার হলো দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মওজুদ করে রাখা। বাজারে এর বিভিন্ন ধরণের নাম রয়েছে। রসূল সা. এ ধরণের কারবার নিষিদ্ধ করেছেন। তাছাড়া এটা সূরা নিসার ২৯ আয়াতে বর্ণিত বাতিল পন্থায় উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।
১৩.    রাষ্ট্র ও ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে অর্থোপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য সূরা ২: আয়াত ১৮৮।
১৪.    চুরির মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য আল কুরআন সূরা ৫ : আয়াত ৩৮।
১৫.    দেহ ব্যবসা ও বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ২,৩৩।
১৬.    মাপে ও ওজনে কমবেশি করার মাধমে উপার্জন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মেপে বা ওজন করে নেয়ার সময় বেশি নেয়া এবং দেয়ার সময় কম দেয়া। কুরআন মাজিদে এ ধরনের লোকদের জন্যে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। দ্রষ্টব্য: সূরা ৮৩ মুতাফ্ফিফিন : আয়াত-১-১০।
১৭.    চোরাই মাল ক্রয় বিক্রয় এবং চোরালানী নিষিদ্ধ।
১৮.    অর্থ সম্পদ ও জমি জমা অনুৎপাদনশীল ফেলে রাখা নিষিদ্ধ।
১৯.    আসলের সাথে নকল ও ভেজাল মিশিয়ে বিক্রয় নিষিদ্ধ।
২০.    আসলের স্যাম্পল দেখিয়ে নকল সরবরাহ করা নিষিদ্ধ।
২১.    আসলের মোড়কে ভেজাল ও নকল মাল বিক্রি করা নিষিদ্ধ।
২২.    ফটকাবাজারি ও মুনাফাখোরী নিষিদ্ধ।
হাদিস থেকে এগুলোর নিষেধাজ্ঞা জানা যায়।
২৩.    এতিমের অর্থ সম্পদ ও সহায় সম্পত্তি ভোগ দখল করা নিষিদ্ধ : আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘যারা অন্যায় ভাবে এতিমদের অর্থ সম্পদ ও সহায় সম্পত্তি ভোগ দখল করে, তারা মূলত আগুন দিয়ে নিজেদের উদর ভর্তি করে। অচিরেই তাদের পোড়ানো হবে জ্বলন্ত আগুনে।’ (সূরা ৪ আন্নিসা : আয়াত ১০)
২৪.     বোনদের বা অন্য কারো উত্তরাধিকার বন্টন করে না দিয়ে নিজের সম্পদের সাথে একাকার করে রেখে ভোগ করা : যারা উওরাধিকার বন্টন করেন না, সূরা আন নিসার ১৪ আয়াতে তাদের অপমানজনক অনন্ত আযাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২৫.    ধনীদের যাকাত খাওয়া করা নিষিদ্ধ : ধনীদের যাকাত প্রদান করা ফরয। যাকাত পাওয়া অভাবীদের অধিকার। যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ থেকে যাকাত বের করে দেয়না, সে নিজ অর্থ সম্পদের সাথে অভাবীদের যাকাত বা অর্থ সম্পদ একাকার করে ভোগ করে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা অনুযায়ী এ সম্পদ দ্বারা তার জন্যে আগুনের বেড়ি তৈরি হচ্ছে। (দ্রষ্টব্য সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৮০)।
২৬.    দোকানি বা কারো নিকট থেকে কিছু ক্রয় করে দাম না দেয়া। ফলে ক্রয় করা বস্তু তার অবৈধ উপার্জন- যা তার জন্যে সম্পূর্ণ হারাম। এটা যুলুমের উপার্জন। অপরের অধিকার হরণ। (সূরা আন্নিসা : আয়াত ২৯)
২৭.    অন্যায্য বন্টন: উত্তরাধিকার বন্টন হোক, যৌথ কারবারের লাভালাভ বন্টন হোক, যৌথ ক্রয়ের মাল-সম্পদ বন্টন হোক, অথবা অন্য যে কোনো ধরণের বন্টনের ক্ষেত্রে নিজের ভাগে বেশি নেয়া, বেছে বেছে ভালোটা নেয়া, কিংবা নিজে সুবিধাজনকটা নিয়ে নেয়া অবৈধ। এটা যুলুমের মাধ্যমে উপার্জন। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (দ্রষ্টব্য : সূরা নিসা, আয়াত ১০ ও ৩০)।
২৮.    ধার, করজ, ঋণ বা লোন নিয়ে পরিশোধ না করা। মানুষ সাধারণত ক. উন্নয়ন কাজের জন্যে, খ. ব্যবসায়ে বিনিয়োগের জন্যে, কিংবা গ. অভাবের তাড়নায় মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে ঋণ করে থাকে।
ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকে সাধারণত সরকারি তহবিল, সরকারি ব্যাংক, প্রাইভেট ব্যাংক, সংস্থা এবং সামর্থবান ব্যক্তিদের নিকট থেকে।
কোনো চরম অভাবী বা দেউলিয়াকে ব্যক্তি তার ঋণ মাফ করে দিতে পারে। কিন্তু যারা ঋণ গ্রহণ করে চরম অভাবী বা দেওলিয়া না হয়েও ঋণ পরিশোধ করেনা, কিংবা সময়মতো করেনা, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা চরম শাস্তি ভোগ করবে। কারণ তারা অন্যায়ভাবে অন্যদের অর্থসম্পদ গ্রাস করেছে।
২৯.    হারানো বা পড়ে থাকা অর্থ সামগ্রী নিয়ে নেয়া; এ ধরণের কিছু পাওয়া গেলে তা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ উক্ত অর্থ সামগ্রীর স্বত্বাধিকারীকে খুঁজে বের করার জন্যে প্রচার বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করবে। শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া না গেলে এই অর্থ সামগ্রী জনকল্যাণ মূলক তহবিলে জমা হবে।
৩০.    সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ত্রাস ও আতংক সৃষ্টি করে এবং দাপট দেখিয়ে অর্থ আদায় করা নিষিদ্ধ। যেমন : চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, লুটপাট ইত্যাদি। কুরআন এবং হাদিসে এ ধরণের কাজকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২ : আয়াত ১৮৮; সূরা ৪ : আয়াত ২৯)
৩১.    যাদুমন্ত্র বা যাদু টোনার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। এটা মানুষের জন্যে ধ্বংসকর বিধায় কুরআন ও হাদিসে এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৩২.    মূর্তি, প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য নির্মাণ, উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রসূলুল্লাহ সা. এগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
৩৩.    এ ছাড়াও ব্যক্তি, মানবতা ও ঈমান আকিদার জন্যে ক্ষতিকর সবই নিষিদ্ধ।

১৪.    অর্থ সম্পদ ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা যা নিষিদ্ধ
মানুষ যেসব অর্থ অর্জন এবং উপার্জন করে, তা সাধারণত নিম্নরূপ খাতসমূহে ব্যয়-ব্যবহার করে থাকে :
১.    নিজের ও পরিবার পরিজনের জন্যে ব্যয় করে।
২.    উৎপাদন ও উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে।
৩.    যাকাত প্রদান করে।
৪.    ট্যাক্স, খাজনা ও বিভিন্ন প্রকার কর প্রদান করে।
৫.    বিভিন্ন প্রকার দায়িত্ব কর্তব্য (Obligations) ও অধিকার (Rights) আদায়ে প্রদান করে।
৬.    দান করে।
৭.    সঞ্চিত ও পূঞ্জিভূত করে।
৮.    অপচয় ও অপব্যয় (overuse & misuse) করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থ ব্যয় একদিকে যেমন বিরাট নেকি ও পুণ্যের কাজ। অপরদিকে তা বিরাট পাপও অকল্যাণের হাতিয়ার। ইসলাম সব ধরণের কল্যাণের ব্যয়কে উৎসাহিত করে। কিন্তু সব ধরনের অকল্যাণকর কাজে ব্যয় করাকে নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্মোক্ত খাত ও প্রক্রিয়ায় ব্যয় বিনিয়োগ করা অবৈধ ও নিষিদ্ধ :
০১.    সুদী কারবারে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২ : ২৭৫)
০২.    জুয়া খেলায় বিনিয়োগে নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ৫ : ৯০)
০৩.    ভাগ্য গণনায় ব্যয় নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ৫ : ৯০)
০৪.    ব্যভিচারের কাজে ব্যয় নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২৪ : ২,৩৩)
০৫.    সর্বপ্রকার অশ্লীলতা প্রসারকারী কাজ কারবারে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২৪ : ১৯)
০৬.    সর্বপ্রকার ধোকা প্রতারণার কাজে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (হাদিস : যে প্রতারণা করে, সে আমার লোক নয়)।
০৭.    ঘুষ প্রদান নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২ :১৮৮)
০৮.    মূর্তি, প্রতিকৃতি ও ভাষ্কর্য তৈরি ও ক্রয়ে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ।
০৯.    সর্বপ্রকার হারাম জিনিস ক্রয়ে ব্যয় করা নিষিদ্ধ। বিনিয়োগও নিষিদ্ধ।
১০.    ক্ষতিকর জ্ঞানার্জনে ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১১.    ভেজাল ও নকল ব্যবসায় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ।
১২.    অবৈধ উদ্দেশ্য হাসিলের নিয়্যতে ধার-করজ-ঋণ প্রদান নিষিদ্ধ।
১৩.    খোঁটা দেয়ার উদ্দেশ্যে বা জশ, খ্যাতি ও সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে দান করা নিষিদ্ধ।
১৪.    প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বা দান না করে কৃপণতা করা নিষিদ্ধ।
১৫.    সর্বস্ব দান করে ফেলা বা ব্যয় করে ফেলা নিষিদ্ধ।
১৬.    অর্থ-সামগ্রী অপচয় (overuse) করা নিষিদ্ধ।
১৭.    অর্থ সম্পদ অপব্যয় (misuse) করা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ নিষ্প্রয়োজনীয় ও নিষিদ্ধ খাতে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১৮.    কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১৯.    ভালো কাজের বিরোধিতা বা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
২০.    ইসলামের বিরোধিতা করা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কাজে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
২১.    যে কোনো ক্ষতিকর, অকল্যাণকর এবং সামাজিক ও সামষ্টিক অনিষ্টকর কাজে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।

১৫.    যেসব খাতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক
ইসলামের দৃষ্টিতে অর্জিত অর্থ সম্পদ বিনিয়োগ ব্যতিত যাবতীয় ব্যয়ের খাত সমূহ দুই ভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলো :
০১.    বাধ্যতামূলক,
০২.    স্বেচ্ছামূলক।
ইসলামে নিম্নোক্ত খাতসমূহে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক এবং আবশ্যক :
১.    হুকুক : অর্থাৎ রক্ত সম্পর্কের কারণে যারা অধিকার লাভ করেছে তাদের জন্যে ব্যয় করা। যেমন : সন্তান, পিতামাতা।
২.    নাফকা : এর অর্থ বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যারা অধিকার লাভ করে তাদের জন্যে ব্যয় করা। যেমন: স্ত্রীদের জন্যে। এমনকি স্ত্রীকে তালাক দিলেও ইদ্দত পালন কালে, গর্ভে সন্তান থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত এবং সন্তানকে দুধ পান করালে দুধ পান শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে নাফকা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে সূরা আন নিসার ৩৪ এবং সূরা আত তালাকের ৬-৭ আয়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৩.    বিবাহের মোহর: বিয়ের সময় একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে যে অর্থ প্রদান করেন তার নাম মোহর। মোহর প্রদান করা বাধ্যতামূলক, এ প্রসঙ্গে সূরা আন নিসার ৪ এবং ২০ আয়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৪.    যাকাত এবং উশর : মূলত উশর যাকাতেরই একটি অংগ। উশর হলো ফল ফসলের যাকাত। বছর শেষে হিসাব নিকাশ করে উদ্ধৃত্ত (balance) অর্থ সম্পদ থেকে শরিয়া নির্ধারিত হারে এবং খাতে একটি অংশ পরিশোধ করাকে যাকাত বলা হয়। সালাত আদায় করার মতোই যাকাত আদায় করা ফরয। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে : ‘তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত পরিশোধ করো।’ (সূরা আল বাকারা : আয়াত ৪৩,৮৩,১০)
৫.    কাফ্ফারা : কেউ কোনো পাপ বা অপরাধ করে ফেললে তা থেকে নিষ্কৃতি পওয়ার জন্যে যে নেক কাজ করতে হয়, তাকে কাফ্ফারা বলা হয়। কুরআন মজিদে তিনটি পাপের ক্ষেত্রে কাফ্ফারার মাধ্যমে নিষ্কৃতি লাভের বিধান দেয়া হয়েছে। সেগুলো হলো : ১. ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের ফরয রোযা ভঙ্গ করলে। ২. যিহার করলে। অর্থাৎ নিজের স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কোনো অঙ্গকে নিজের মা বা বোনের কোনো অঙ্গের মতো বলে তুলনা করলে। সূরা মুজাদালার ২-৪ আয়াতে এ সংক্রান্ত বিধান দেয়া হয়েছে। ৩. অংগিকার ভংগ করলে। সূরা আল মায়িদার ৮৯ আয়াতে -এ সংক্রান্ত বিধান দেয়া হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে কাফ্ফারা হিসেবে রোযা রাখা কিংবা অভাবীদের খাওয়ানো, অথবা মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের কথা বলা হয়েছে।
৬.    ফিদিয়া : বার্ধক্যজনিত কারণে এবং এমন রোগের কারণে- যে রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়না রমযান মাসের ফরয রোযা রাখতে না পারলে তার বিনিময়ে কুরআন নির্দেশিত প্রক্রিয়ায় ও পরিমাণে দান করাকে ফিদিয়া বলা হয়।
৭.    নযর : নযরকে আমাদের দেশে মান্নত বলা হয়। এর অর্থ- উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে কোনো ত্যাগ স্বীকার বা দান করার স্বগত অংগীকার করা। উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে প্রতিশ্রুত ত্যাগ স্বীকার করা বা দান করা বাধ্যতামূলক। যারা জান্নাতে যাবে, সূরা আদ্দাহরের ৭ আয়াতে তাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা নযর (মান্নত) পূর্ণ করে।
৮.    সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা : ঈদুল ফিতরের পূর্বে সামর্থবান ব্যক্তিগণ কর্তৃক অভাবী ব্যক্তিগণকে ঈদ আনন্দে শরিক করার জন্যে সুন্নাহ নির্ধারিত হারে সাহয্য প্রদানকে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। রসূল সা. এই সাহায্য প্রদানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
৯.    কুরবানির গোশত বিতরণ: যারা তামাত্তু হজ্জ করেন তাদেরকে বাধ্যতামূলক কুরবানি করতে হয়। তাছাড়া সকল সামর্থবান মুসলিমকেই কুরবানি করতে তাকিদ করা হয়েছে। কুরবানির গোশতের একটি অংশ অভাবীদের দান করতে বলা হয়েছে।

১৬.    ব্যয়ের কল্যাণময় স্বেচ্ছামূলক খাতসমূহ
কুরআন এবং হাদিসে মুমিনদেরকে ব্যাপকভাবে স্বেচ্ছামূলক দান করতে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করা হয়েছে। এসব দানের প্রক্রিয়া ও খাত নিম্নরূপ :
১.    সাধারণ দান : এটাকে সাধারণত, দান, খয়রাত (কল্যাণের কাজ), সদকা ইত্যাদি বলা হয়। অভাবী এবং বিপদগ্রস্তদের সব সময় সর্বাবস্থায় এ দান করা যায়। এ দানের একটি বড় খাত হলো আল্লাহর পথে দান করা। এ দানের ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নায় আহবান জানানো হয়েছে দান করতে :
ক.    দরিদ্র অভাবী আত্মীয় স্বজনকে।
খ.    অভাবী প্রতিবেশীদেরকে।
গ.    ফকির তথা নিঃস্ব সাহায্যপ্রার্থীদেরকে।
ঘ.    সাধারণ অভাবী লোকদেরকে।
ঙ.    অভিভাবকহীন বিধবাদেরকে।
চ.    নিঃস্ব এতিমদেরকে।
ছ.    মযলুমদেরকে।
জ.    বিপদগ্রস্তদের সাহায্যার্থে।
ঝ.    নিগৃহীত, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদকৃত এবং মুহাজিরদের সাহায্যার্থে।
ঞ.    নিঃস্ব পথিকদেরকে।
ট.    ঋণগ্রস্ত দেউলিয়াদেরকে।
ঠ.    পরের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তির কাজে।
ড.    জনকল্যাণের কাজে (অর্থাৎ শিক্ষা, চিকিৎসা, জনপথ তৈরি, সুস্থ পরিবেশ তৈরি, পানি সরবরাহসহ যাবতীয় মানব কল্যাণের কাজে ব্যয় করা)।
ঢ.    মসজিদ নির্মাণের কাজে।
ণ.    আল্লাহর পথে (অর্থাৎ ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র, হামলা ইত্যাদি প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার কাজে)। কুরআন মজিদে এ খাতটিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এসব কাজে ব্যয় করাকে কুরআন মজিদে এবং হাদিসে মুমিনদের জন্যে প্রভুত নেকি, সওয়াব, মর্যাদা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের উপায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২.    উপহার বা হাদিয়া হিসেবে দান।
৩.    অসিয়তের মাধ্যমে দান : কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে তার সম্পদের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করে (আদেশ / উপদেশ দিয়ে) দান করে যেতে পারেন।
৪.    ওয়াক্ফ : কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার উৎপাদনশীল কোনো অর্থ সম্পত্তি জনকল্যাণের কাজে দান করে যাওয়াকে ওয়াক্ফ বলা হয়। ওয়াক্ফ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকার কিংবা জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে।
৫.    হেবা : হেবা হলো কোনো ব্যক্তিকে স্থায়ী ও নি:স্বার্থভাবে নিজের কোনো সম্পদ দিয়ে দেয়া।
৬.    ফল বা উৎপাদন ভোগের সুবিধা প্রদান : এটা হলো নির্দিষ্ট মওসূম বা সময়ের জন্যে নিজের কোনো বাগান বা গাছের ফল কিংবা গাভীর দুগ্ধ কাউকেও ভোগ করার সুবিধা দান করা।
৭.    আকস্মিক সংকট উত্তরণে সাহায্য করা : এটা হলো হঠাৎ কেউ কোনো সংকটে, সমস্যায় বা বিপদে পড়লে তাকে আর্থিক সাহায্য করা।
দান করার অসীম কল্যাণ সম্পর্কে কুরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অবহিত করেছেন। এর জন্যে তিনি উপদেশ দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো :
وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ ۗ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ 
অর্থ: দান করো। এতেই রয়েছে তোমাদের নিজেদের জন্যে কল্যাণ। যারা মনের সংকীর্ণতা (কৃপণতা) থেকে মুক্ত হয়, তারাই ফালাহ (সফলতা) অর্জনকারী। (সূরা ৬৪ আত্ তাগাবুন : আয়াত ১৬)
لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ 
অর্থ: তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণ লাভ করবেনা, যতোক্ষণনা তোমাদের পছন্দের জিনিস দান করো। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ৯২)
مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ 
অর্থ: যারা নিজেদের অর্থ সম্পদ আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে, তাদের (দানের) উপমা একটি শস্যবীজ, যা উৎপাদন করে সাতটি শীষ এবং প্রত্যেক শীষে শতদানা। (এভাবেই) যাকে ইচ্ছা আল্লাহ বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন। তিনি মহা প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞানী। (সূরা ২ বাকারা : আয়াত ২৬১)
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَـٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ 
অর্থ: পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরানোতে প্রকৃত পক্ষে পুণ্য নেই। প্রকৃত পুণ্যের কাজ হলো, মানুষ ঈমান আনবে আল্লাহ্র প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আল কিতাবের প্রতি, নবীদের প্রতি; আর আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্থ সম্পদ দান করবে আত্মীয় স্বজনকে, এতিমদেরকে, অভাবীদেরকে, পথিকদেরকে, সাহায্যপ্রার্থীদেরকে এবং মানুষকে গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত করার কাজে; এছাড়া সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিয়ে দেবে। সূরা ২ : ১৭৭
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا  الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا  وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ 
অর্থ: তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করো, তাঁর সাথে কোনো কিছুকেই শরিক করোনা। আর ইহসান (দয়া ও সহানুভূতিমূলক আচরণ) করো পিতামাতার সাথে, আত্মীয় স্বজনের সাথে, এতিমদের সাথে, অভাবীদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, সাথি বন্ধুদের সাথে, পথিকদের সাথে এবং তোমাদের অধিনস্ত ভৃত্যদের সাথে। জেনে রাখো, আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারী লোকদের পছন্দ করেননা, যারা কার্পণ্য কঞ্জুসি করে, মানুষকে কৃপণতার শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ (অর্থ সম্পদ) থেকে তাদের যা দান করেছেন তা গোপন করে রাখে। এ ধরণের অকৃতজ্ঞ লোকদের জন্যে আমরা অপমানকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি। (আর ঐ সব লোকদেরও আল্লাহ পছন্দ করেন না) যারা কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্থ সম্পদ দান করে। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ৩৬-৩৮)
দান সম্পর্কে কুরআন মজিদে আরো বহু আয়াত রয়েছে। এ সম্পর্কে আছে রসূলুল্লাহ সা.-এর অনেক হাদিস। আগ্রহীগণ সেগুলো দেখে নেবেন।
সবশেষে আমরা ইসলামি অর্থনীতির কল্যাণধর্মীতা সম্পর্কে আধুনিক জগতের খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আবুল আ’লা মওদূদীর একটি দীর্ঘ বক্তব্যের অংশ বিশেষ উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন :
“ইসলাম শুধু এতোটুকুই চায়না যে, সমাজ জীবনে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত এবং অবাধ থাকবে; বরঞ্চ সেইসাথে এটাও চায় যে, এ ময়দানে প্রতিযোগীগণ পরস্পরের প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হবার পরিবর্তে সহমর্মী ও পিছে পড়ে থাকা মানুষের আশ্রয় প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায়। অপরদিকে সমাজে এমন একটি শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তুলতে চায়, যে সংস্থা অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাহায্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যেসব লোকের জীবিকা উপার্জনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা থাকবেনা, তারা এই সংস্থা থেকে নিজেদের অংশ পাবে; যারা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে, এই সংস্থা তাদের উঠিয়ে এনে আবার চলার যোগ্য করে দেবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্যে যাদের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, এই সংস্থা থেকে তারা সাহায্য সহযোগিতা লাভ করবে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম আইনগতভাবে দেশের গোটা সঞ্চিত সম্পদ থেকে বার্ষিক ২.৫% এবং গোটা বাণিজ্যিক পুঁজি থেকে বার্ষিক ২.৫% যাকাত সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছে। সমস্ত উশরি জমির উৎপন্ন ফসল থেকে ১০% কিংবা ৫% উশর এবং কোনো কোনো খনিজ সম্পদের উৎপাদন থেকে ২০% যাকাত উসুল করতে হবে। এছাড়া গৃহপালিত পশুর উপরও বার্ষিক যাকাত আদায় করতে বলেছে। এই গোটা সম্পদ ইসলাম গরীব, এতিম, বৃদ্ধ, অক্ষম, উপার্জনহীন, রোগী এবং সব ধরণের অভাবী ও দরিদ্রদের সাহাযার্থে ব্যবহার করতে বলেছে। এটা এমন একটা সামাজিক বীমা, যার বর্তমানে ইসলামি সমাজে কোনো ব্যক্তি জীবন যাপনের অপরিহার্য সামগ্রী থেকে কখনো বঞ্চিত থাকতে পারেনা। কোনো শ্রমজীবী মানুষকে অভূক্ত থাকার ভয়ে কারখানা মালিক বা জমিদারের যেকোনো অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হতে হবেনা। আর উপার্জনের প্রতিযোগিতায় নামার জন্যে ন্যূনতম যে শক্তি সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য, কোনো ব্যক্তির অবস্থাই তার চেয়ে নীচে নেমে যাবেনা।” (আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলামী অর্থনীতি, বঙ্গানুবাদ ৪র্থ মুদ্রণ ২০০৯, শতাব্দী প্রকাশনী ঢাকা।)

১৭.    যারা ইসলামি অর্থনীতি চর্চা করতে চান তাদের জন্যে ক’টি পরামর্শ
যারা ইসলামের অর্থনীতি ও অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে ও চর্চা করতে আগ্রহী, এখানে তাদের জন্যে কয়েকটি পরামর্শ পেশ করা হলো :
১.    অর্থনীতিকে একক বা স্বতন্ত্র কোনো শাস্ত্র হিসেবে চিন্তা করবেন না। অর্থ এবং অর্থনীতিকে মানব জীবন ও জীবন-ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য কাঠামোর একটি অংগ, অংশ এবং বিভাগ হিসেবে ভাবুন।
২.    আপনার দেহের একটি অংগকে যেমন অযথা অন্য অংগের উপর প্রধান্য দেয়া উচিত নয়, তেমনি অর্থ এবং অর্থনীতিকে আপনার জীবন ও জীবন ব্যবস্থার অন্যান্য বিভাগের উপর অযথা অগ্রাধিকার দিতে যাবেন না। সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভংগি ও নীতি অবলম্বন করুন।
৩.    ইসলামি অর্থনীতিকে ইসলামি জীবন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ ও বিভাগ হিসেবে গ্রহণ করুন।
৪.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার নীতি কাঠামো বুঝার জন্যে এক বা একাধিক বার মনোযোগ সহকারে আল কুরআন পাঠ (অধ্যয়ন, স্টাডি) করুন। সাথে সাথে অর্থ সম্পদ ও জীবিকা সংক্রান্ত আয়াতগুলো নোট করুন। সেই সাথে :
ক.    অর্থ সম্পদকে কিভাবে ঈমান, জীবন ব্যবস্থা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও সাফল্যের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন এবং নোট করুন।
খ.    কি কি কারণ ও প্রক্রিয়ায় অর্থ সম্পদ মানব জীবনে ব্যর্থতা ও ধ্বংস ডেকে আনে সে বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন এবং নোট করুন।
গ.    অতপর আপনার মাথায় (মনের মনিকোঠায়) এবং খাতায় অংকিত ধারণাগুলোকে পয়েন্ট আকারে লিপিবদ্ধ করুন এবং চর্চা করুন।
৫.    বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের ‘অর্থ সম্পদ’ ও ‘ব্যবসা বাণিজ্য’ সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো কুরআনের অনুরূপ পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করুন।
৬.    কয়েকটি ফিকহ্ গ্রন্থ পড়ে নিন। যেমন :
ক.    হিদায়া।
খ.    ফিকহুস সুন্নাহ : সাইয়েদ সাবেক।
গ.    হালাল ও হারাম : ইউসুফ আল কারদাভি।
৭.    ইসলামি অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থা সংক্রান্ত বাংলা ভাষায় লিখিত কয়েকটি বই পড়ে নিন। যেমন :
০১.    ইসলামি অর্থনীতি : আবুল আ’লা মওদূদী
০২.    ইসলামি অর্থনীতি : মুহাম্মদ আবদুর রহিম
০৩.    ইসলামি অর্থনীতি : ড. হাসান জামান
০৪.    ইসলামের অর্থনৈতিক মতাদর্শ : ড. মুহাম্মদ ইউসুফুদ্দীন
০৫.    ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ : ড. এম. উমর চাপরা
০৬.    ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ : শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
০৭.    ইসলামের যাকাত বিধান : ড. ইউসুফ আল কারদাভি
০৮.    অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান : আবুল আ’লা মওদূদী
০৯.    আল কুরআনের অর্থনৈতিক নীতিমালা : আবুল আ’লা মওদূদী
১০.    ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ : আবুল আ’লা মওদূদী
১১.    সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং : আবুল আ’লা মওদূদী
৮.    আধুনিক কালে যারা ইসলামি অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন, করছেন এবং ব্যাপক লেখালেখি করেছেন তাদের সম্পর্কে জানুন এবং তাদের গ্রন্থাবলী পড়–ন। তাদের কয়েকজন হলেন : মুহাম্মদ আনাস যারকা, আবুল আ’লা মওদূদী, ড. ইউসুফ আল কারদাভি, মুহাম্মদ বাকির সদর, প্রফেসর খুরশিদ আহমদ, ড. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি, প্রফেসর মুনযের কাহ্ফ, ড. এম. উমর চাপরা, ফাহিম খান, মুনাওয়ার ইকবাল, আকরাম খান, ইউসুফ কামাল, মুস্তফা যারকা, আহমদ আল নাজ্জার, সাবাহ উদ্দিন সায়েম প্রমূখ।
আমাদের বাংলাদেশে যারা এ ক্ষেত্রে অগ্রণি ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন : প্রফেসর ড. এম.এ. মান্নান, প্রফেসর আবদুল হামিদ, প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রফেসর মুহাম্মদ শরীফ হুসাইন, প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক প্রমূখ।
৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে জানুন। এ সম্পর্কে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু বই পুস্তক বাজারে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর নীতিমালা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ পদ্ধতি জেনে নিন। এ সম্পর্কে তাদের পুস্তিকা সমূহও পড়ুন।

সমাপ্ত
১৮. গ্রন্থসূত্র
০১.    আল কুরআন
০২.    সহীহ আল বুখারি
০৩.    সহীহ মুসলিম
০৪.    জামে তিরমিযি
০৫.    মিশকাতুল মাসাবিহ্
০৬.    সাইয়েদ সাবিক : ফিক্হুস্ সূন্নাহ্
০৭.    মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন : আল জামেউল আহকাম ফিক্হুস্ সুন্নাহ
০৮.    বুরহানুদ্দীন ফরগনানি : হিদায়া
০৯.    Muhammad Akram Khan : Economic Teaching of Prophet Mohammad
১০.    আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলামী অর্থনীতি
১১.    আবুল আ’লা মওদূদী : সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং
১২.    আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ
১৩.    আবুল আ’লা মওদূদী : অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান
১৪.    আবুল আ’লা মওদূদী : আল কুরআনের অর্থনৈতিক নীতিমালা
১৫.    Dr. M. Umer Chapra : Islam and the Economic Challenge
১৬.    ড. হাসান জামান: ইসলামী অর্থনীতি
১৭.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : হালাল ও হারাম
১৮.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম
১৯.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : ইসলামের যাকাত বিধান
২০.    মুহাম্মদ আবদুর রহীম : ইসলামী অর্থনীতি
২১.    প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান : প্রিন্সিপলস অব ইকোনমিক্স
২২.    ড. মুহাম্মদ ইউসুফুদ্দীন : ইসলামের অর্থনৈতিক মতাদর্শ
২৩.    আবু উবায়েদ আল কাসিম বিন সাল্লাম : কিতাবুল আওয়াল
২৪.    শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ
২৫.    শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সূদ একটি ভয়াবহ অভিশাপ : পরিত্রাণের উপায়
২৬.    এমরান এন. হুসাইন : ইসলামে রিবা নিষিদ্ধ কেন?
২৭.    মুহাম্মদ শরীফ হুসাইন : সুদ, সমাজ অর্থনীতি
২৮.    মুহাম্মদ বাকির সদর : ইসলামি ইকতিসাদিয়াত
২৯.    Ayatullah Sayyid Mahmud Taleghani : Society and Economics in Islam
___________________________________________________________________বই সম্পর্কিত তথ্যাবলী
বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি
ISBN: 978-984-645-053-8

ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা আবদুস শহীদ নাসিম, © author প্রকাশক: বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি। পরিবেশক : শতাব্দী প্রকাশনী ৪৯১/১ মগবাজার ওয়ারলেস রেলগেইট, ঢাকা-১২১৭, ফোন : ৮৩১১২৯২। ১ম প্রকাশ ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯। কম্পোজ Saamra Computer. মুদ্রণে আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস, ৪২৩ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।

Book Title : Islami Orthonitite Uparjon O Bayer Nitimala Author : Abdus Shaheed Naseem, Published by Bangladesh Quran Shikkha Society, Distributor: Shotabdi Prokashoni, 491/1 Moghbazar Wireless Railgate, Dhaka-1217, Bangladesh. Phone: 8311292. First Edition: December 2009.

দাম : ১৯ টাকা মাত্র।  Price TK. : 19.00 Only


বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত
নিম্নোক্ত বইগুলো পড়ুন :
    কুরআন বুঝার প্রথম পাঠ
    জানার জন্যে কুরআন মানার জন্যে কুরআন
    মানুষের চিরশত্রু শয়তান
    ঈমান ও আমলে সালেহ্
    ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা

সূচিপত্র______________________________________________
০১.        অর্থ কী?    ৫
০২.        অর্থনীতি কী?    ৫
০৩.        অর্থনীতির ইসলামি সংজ্ঞা    ৬
০৪.        ইসলামি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি    ৬
০৫.        ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য সমূহ    ৯
০৬.        ইসলামি অর্থনীতির উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য    ১৩
০৭.        ইসলামে অর্থ উপার্জনের তাকিদ    ১৪
০৮.        হালাল ও বৈধ উপার্জনকারীর পরকালীন সাফল্য    ১৬
০৯.        হারাম ও অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি    ১৬
১০.        হালাল ও বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় সমূহ    ১৭
১১.        নারীর অর্থ উপার্জন ও সম্পদের মালিকানা অর্জন    ১৮
১২.        নারীদের  খরচের খাত    ১৯
১৩.        অর্থ উপার্জনের হারাম ও নিষিদ্ধ উপায় সমূহ    ২০
১৪.        অর্থ সম্পদ ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা যা নিষিদ্ধ    ২৩
১৫.        যেসব খাতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক    ২৫
১৬.        ব্যয়ের কল্যাণময় স্বেচ্ছামূলক খাতসমূহ     ২৬
১৭.        যারা ইসলামি অর্থনীতি চর্চা করতে চান তাদের জন্যে ক’টি পরামর্শ    ৩০
১৮.        গ্রন্থসূত্র    ৩২



শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২০

যাকাতের হাকীকত

শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে
যাকাতের হাকীকত


সূচীপত্র
  • যাকাতের গুরুত্ব
  • যাকাতের মর্মকথা
  • সমাজ জীবনে যাকাতের স্থান
  • আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য সাধারণ নির্দেশ
  • যাকাত আদায়ের নিয়ম
যাকাতের গুরুত্ব
নামাযের পর ইসলামের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে যাকাত। সাধারণত নামাযের পরই রোযা উল্লেখ করা হয় বলে অনেকের মনে এ বিশ্বাস জন্মেছে যে, নামাযের পরই বুঝি রোযার স্থান। কিন্তু কালামে পাক থেকে জানা যায় যে, নামাযের পর যাকাতই হচ্ছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ দুটি ইসলামের প্রধান স্তম্ভ-এটা বিধ্বস্ত হয়ে গেলে ইসলামের প্রাসাদও ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

‘যাকাত’ অর্থ পবিত্রতা এবং পরিচ্ছন্নতা। নিজের ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ গরীব-মিসকীন ও অভাবী লোকদের মধ্যে বন্টন করাকে ‘যাকাত’ বলা হয়। কারণ এর ফলে সমগ্র ধন-সম্পত্তি এবং সেই সাথে তার নিজের আত্মার পরিশুদ্ধি হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত ধন-সম্পদ তাঁর বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ ব্যয় করে না, তার সমস্ত ধন অপবিত্র এবং সেই সাথে তার নিজের মন ও আত্মা পংকিল হতে বাধ্য। কারণ, তার হৃদয়ে কৃতজ্ঞতার নাম মাত্র বর্তমান নেই। তার দিল এতদূর সংকীর্ণ, এতদূর স্বার্থপর, এবং এতদূর অর্থ পিশাচ যে, যে আল্লাহ অনুগ্রত পূর্বক তাকে প্রয়োজনাতিরিক্ত ধন-সম্পদ দান করেছেন তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতেও তার মন কুন্ঠিত হয়। এমন ব্যক্তি দুনিয়ায় খালেছভাবে আল্লাহর জন্য কোনো কাজ করতে পারবে, তার দীন ও ঈমান রক্ষার্থে কোনোরূপ আত্মত্যাগ ও কুরবানী করতে প্রস্তুত হতে পারবে বলে মনে করা যেতে পারে কি? কাজেই একথা বলা যেতে পারে যে, যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করে না তার দিল নাপাক, আর সেই সাথে তার সঞ্চিত ধন-মালও অপবিত্র, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

‘যাকাত’ ফরয করে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকটি মানুষকে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন। যে ব্যক্তি নিজ ইচ্ছানুক্রমেই প্রয়োজনতিরিক্ত ধন-মাল হতে আল্লাহর নির্দিষ্ট হিস্যা আদায় করে এবং আল্লাহর বান্দাহদের যথাসাধ্য সাহায্য করে, বস্তুত সেই ব্যক্তিই আল্লাহর কাজ করার উপযুক্ত, ঈমানদার লোকদের মধ্যে গণ্য হওয়ার যোগ্যতা তারই রয়েছে। পক্ষান্তরে যার দিল এতদূর সংকীর্ণ যে, আল্লাহর জন্য এতটুকু কুরবানী করতে প্রস্তুত হয় না, তার দ্বারা আল্লাহর কোনো কাজই সাধিত হতে পারে না-সে ইসলামী জামায়াতে গণ্য হবার যোগ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে তাকে মানব দেহের একটি পঁচা অংগ মনে করা যেতে পারে, আর পঁচা অংগকে যত শীঘ্র কেটে বিচ্ছিন্ন করা যায় শরীরের অন্যান্য অংগ-প্রত্যংগের পক্ষে ততই মংগল। অন্যথায় সমগ্র দেহেই পচন শুরু হবে। এ জন্যই হযরত মুহাম্মদ (সা) এর ইন্তেকালের পর যখন আরবের কোনো এক গোত্রের লোক যাকাত আদায় করতে অস্বীকার করেছিল, তখন (প্রথম খলীফা) হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের বিরুদ্ধে-কাফেরদের বিরুদ্ধে যেমন করতে হয় ঠিক তেমনি-যুদ্ধের কথা ঘোষণা করেছিলেন। অথচ তারা নামায পড়তো, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের প্রতি তাদের ঈমানও বর্তমান ছিল। এত নিসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, যাকাত আদায় না করলে নামায-রোযা ইত্যাদি তার কোনো কাজই আল্লাহর কাছে গৃহীত হতে পারে না, আর এরূপ ব্যক্তির ঈমানদার হওয়ার দাবী করার আদৌ কোনো মূল্য নেই।

কুরআন মজীদ থেকে নিঃসন্দেহে জানতে পারা যায়, প্রাচীনকাল থেকে প্রত্যেক নবীর উম্মাতের প্রতিই সমানভাবে নামায ও যাকাত আদায় করার কঠোর আদেশ করা হয়েছিল-দীন ইসলামের কোনো অধ্যায়েই কোনো নবীর সময়ে কোনো মুসলমানকেই নামায ও যাকাত থেকে রেহাই দেয়া হয়নি। হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বংশের নবীদের কথা আলোচনা করার পর কুরআন পাকে বলা হয়েছে:

وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ ۖ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ

আমরা তাদেরকে মানুষের নেতা বানিয়েছি, তারা আমাদেরই বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে-পথপ্রদর্শন করে। আমরা ওহীর সাহায্যে তাদেরকে ভালো কাজ করার, নামায কায়েম করার এবং যাকাত আদায় করার আদেশ করেছি, তারা খাঁটিভাবে আমরা ইবাদাত করতো-হুকুম পালন করতো। সূরা আল আম্বিয়া : ৭৩

হযরত ইসমাঈল (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে:

وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ ص وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِندَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا

“তিনি তাঁর লোকদেরকে নামায এবং যাকাত আদায় করার আদেশ করতেন এবং আল্লাহর দরবারে তিনি বিশেষ মর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন।” সূরা মরিয়ম : ৫৫

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম তাঁর নিজের সম্পর্কে দোয়া করেছিলেন- “হে আল্লাহ! এ দুনিয়ায় আমার মঙ্গল দাও, পরকালেও কল্যাণ দান কর।” এর উত্তরে আল্লাহ সূরা আল আরাফের ১৫৬ আয়াতে বলেছিলেন:

عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ ۖ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ ۚ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ

 “যাকে ইচ্ছা হবে, তাকে আমার আযাবে নিক্ষেপ করবো। যদিও আমার রহমত সকল জিনিসের ওপরই পরিব্যাপ্ত আছে; কিন্তু তা কেবল সেই লোকদের জন্যই নির্দিষ্ট করবো যারা আমাকে ভয় করবে এবং যাকাত আদায় করবে, আর যারা আমার বাণীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে।” সূরা আরাফ : ১৫৬

হযরত মূসা আলাইহিস সালামের জাতির লোকদের দিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ছিল। ধন-সম্পদ লাভের জন্য প্রাণ দিতেও তারা কুণ্ঠিত হতো না। বর্তমানকালের ইয়াহুদীরাই তার বাস্তব উদাহরণ। এজন্য আল্লাহ তাআলা এ মহান সম্মানিত পয়গম্বরের প্রার্থনা উত্তরে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন যে, তোমার উম্মাত যথারীতি যাকাত আদায় করলে আমার রহমত পেতে পারবে অন্যথায় পরিষ্কার জেনে রাখ, তারা আমার রহমত হতে নিশ্চয়ই বঞ্চিত হবে এবং আমার আযাব তাদেরকে পরিবেষ্টন করে নেবে। হযরত মূসা (আ) এর পরেও বনী ইসরাঈলগণকে বার বার এ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। বার বার তাদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করা হয়েছে: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো বন্দেগেী করবে না এবং রীতিমত নামায ও যাকাত আদায় করবে। (সূরা আল বাকারা, রুকূ : ১০)। শেষ পর্যন্ত তাদেরকে সুস্পষ্ট নোটিশ দেয়া হয়েছে এই বলে :

وَقَالَ اللهُ اِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ اَقَمْتُمُ الصًّلوةَ وَاتَيْتُمْ الزَّكوةَ وَامْنْتُمْ بِرُسُلِىِ وَعَزَّرتُمُوْهُمْ وَاَقْرَضْتُمْ اللهَ قَرْضًا حَسَنًا لاَّكَفِّرَنَّ عَنْكُمْ سَيَّاتِكُمْ ـ المائِدة : ١٢

আল্লাহ বললেন, “হে নবী ইসরাঈল! তোমরা যদি নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় করতে থাক, আমার রাসূলদের ওপর ঈমান আন; তাদের সাহায্য কর এবং আল্লাহকে করযে হাসানা দাও, তাহলে আমি তোমাদের সাথী এবং তোমাদের দোষ-ত্রুটিগুলো দূর করে দেব (অন্যথায় রহমত লাভের কোনো আশাই তোমরা করতে পার না)।” সূরা মায়েদা : ১২

হযরত রাসূলে করীম (সা) এর পূর্বে হযরত ঈসা আলাইহিস সালামই সর্বশেষ নবী ছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকেও একই সাথে নামায এবং যাকাতের হুকুম দিয়েছেন। সূরা মারিয়ামে বলা হয়েছে:

وَّجَعَلّنِى مُبرَكًا اَيْنَا مَاكُنْتُ وَاَوْضنِى بَالصَّلوةِ وَالزَّكوْةِ مَادُمْتُ حَيًا ـ مريم : ٣١

“আল্লাহ আমাকে মহান করেছেন-যেখানেই আমি থাকি এবং যতদিন আমি জীবিত থাকবো ততদিন নামায পড়া ও যাকাত আদায় করার জন্য আমাকে নির্দেশ করেছেন।” সূরা মরিয়াম : ৩১

এ থেকে নিঃসন্দেহে জানতে পারা যায় যে, দীন ইসলাম প্রত্যেক নবীর সময়ই নামায ও যাকাত এ দুটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েছিল। আল্লায় বিশ্বাসী কোনো জাতিকেই এ দুটি কর্তব্য থেকে কখনও নিষ্কৃতি দেয়া হয়নি।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) এর উপস্থাপিত শরীয়াতে এ দুটি ফরযকে কিভাবে পরস্পর যুক্ত ও অবিচ্ছেদ্য করে দেয়া হয়েছে, তা অনুধাবন যোগ্য। কুরআন পাকের প্রথমেই যে আয়াতটি উল্লেখিত রয়েছে, তা এই :

ذَلِكَ الْكِتبُ لاَرَيْبَ فِيْهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ ـ الَّذِيْنَ يُؤِْنُوْنَ بِالْغِيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلوةَ وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُوْنَ ـ البقرة :

٢ -٣

“এ কুরআন আল্লাহর কিতাব-এতে কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। এটা পরহেযগার, আল্লাহভীরু লোকদেরকে দুনিয়ার জীবনের সঠিক ও সোজা পথপ্রদর্শন করে। পরহেযগার তারাই যারা অদৃশ্যকে বিশ্বাস করে, নামায কায়েম করে এবং আমরা তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।” সূরা আল বাকারা: ২-৩

অতপর বলা হয়েছেঃ

أُوْلَـٰٓٮِٕكَ عَلى هُدًى مِّنْ رَّبِهِمْ وَاُولئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ـ البقرة : ٥

“বস্তুত এরাই রব প্রদত্ত হেদায়াত লাভ করেছে এবং এরাই সফলকাম।” সূরা আল বাকারা : ৫

অর্থাৎ যাদের ঈমান নেই এবং নামায ও যাকাত আদায় করে না তারা শুধু আল্লাহর হেদায়াত থেকেই বঞ্চিত নয়, কল্যাণ ও সাফল্য তাদের ভাগ্যে জুটবে না। তারপর এ সূরা আল বাকারা পড়তে পড়তে সামনে এগিয়ে যান, কয়েক পৃষ্ঠা পরই আদেশ হয়েছে:

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ـ البقرة : ٤٣

“নামায কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রুকূ’কারীদের সাথে একত্রিত হয়ে রুকূ কর (জামায়াতের সাথে নামায আদায় কর) । সূরা আল বাকারা : ৪৩

অতপর কিছুদূর অগ্রসর হয়ে এ সূরায় বলা হয়েছে:

لَيْسَ الْبِرَّ اَنْ تُوْلُّوْا وَجُوْهَكُمْ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلكِنَّ البِرَّ مَنْ امَنَ بِاللهِ وَالْيُوْمِ الاخِرِ وَالْمَلئِكَةِ وَالْكِتبِ وَالنَّبِيْنَ وَاَتَى الْمَالَ عَلى حُبِّه ذَوِى الْقُرْبى وَالْيَتمى وَالْمَّسْكِيْنَ وَاَبْنَ السَّآئِلِيْنَ وَفِى ارِّقَابِ وَاَقامَ الصَّلوةَ وَاَتَى الزَّكوةَ وَالْمُؤْفُوْنَ بَعَهْدِهِمْ اِذَا عَهدُوْا الرِّقَابِ وَاَقَامَ الصَّلوَةَ وَاَتَى الزَّكوَةَ وَالْمُؤْفُوْنَ بَعَهْدِهِمْ اِذَا عَهدُوْا وَالصَّبِرِيْنَ فِى الْبَاسَآءِ وَالضَّرَّاءِ وَحَيْنَ الْبَاسِ اُوْلئِكَ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَاُوْلئِكَ هُمْ الْمُتَّقُوْنَ ـ البقرة : ٧ ١٧

“পূর্ব কিংবা পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়ালেই কোনো পূণ্য লাভ হয় না বরং যে ব্যক্তি আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, আসমানী কিতাব এবং পয়গাম্বরদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহর প্রেমে তার অভাবী আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম-মিসকীন, পথিক ও প্রার্থীকে নিজেদেরকে ধন-সম্পদ দান করে, অন্য লোকদেরকে তাদের ঋণ, দাসত্ব কিংবা কয়েদ থেকে মুক্তি লাভের ব্যাপারে সাহায্য করে এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে, বস্তুত একমাত্র তারাই পূণ্য লাভ করতে পারে। আর যারা প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, বিপদ, ক্ষতি-লোকসান এবং যুদ্ধের সময় যারা ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর সত্য পথে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে, তারাই পূণ্যবান। তারাই খাঁটি মুসলমান, মুত্তাকী ও পরহেযগার।” সূরা আল বাকারা : ১৭৭

এরপর সূরা আল মায়েদায় এ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তাও প্রণিধানযোগ্য :

اِنَّمَا وَلَيُّكُمُ اللهُ وَرَسُوْلُهُ وَالَّذِيْنَ امَنُوْا الَّذِيْنَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكوةَ وَهُمْ رِكِعُوْنَ ـ وَمَنْ يَّتَوَلَّ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَالَّذِيْنَ امَنُوْا فِانَّ حِزْبَ اللهِ هُمُ الْغلِبُوْنَ ـ المائِدَة : ٥٥-٥٦

“মুসলমান‍‍‍! তোমাদের প্রকৃত বন্ধু সাহায্যকারী হচ্ছে শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং ঈমানদার লোকগণ মাত্র। ঈমানদার লোক বলতে তাদেরকে বুঝায়, যারা নামায কায়েম কবে, যাকাত আদায় করে এবং আল্লাহর সামনে মাথা নত করে। অতএব যারা আল্লাহ, রাসূল এবং ঈমানদারদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, তারা আল্লাহর দল বলে বিবেচিত হবে এবং আল্লাহর দলই নিশ্চিতরূপে বিজয়ী হবে।”- সূরা মায়েদা : ৫৫-৫৬

এ আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতমত, এ আয়াত থেকে জানা গিয়েছে যে, যারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে তারাই মুসলমান। ইসলামের এ দুটি রুকন যে ব্যক্তি যথাযথরূপে আদায় করে না, তার ঈমানদার হওযার দাবী মূলত মিথ্যা। দ্বিতীয়ত, এ আয়াত থেকে একথাও প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ, রাসূল এবং ঈমানদার লোকগণ একটি দলভুক্ত। অতএব ঈমানদার ব্যক্তিগণের অন্যান্য সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করে এ পার্টিতে শামিল হতে হবে। এ দলের বাইরের কোনো ব্যক্তিকে সে পিতা হোক, ভাই হোক, পুত্র হোক, প্রতিবেশী, স্বদেশবাসী কিংবা অন্য যে কেউ হোক না কেন- কোনো মুসলমান যদি তাকে নিজের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে এবং তার সাথে ভালোবাসা ও সহানুভূতির সম্পর্ক স্থাপন করে তাহলে আল্লাহ তাআলা যে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে, এমন আশা কিছুতেই করা যেতে পারে না। সর্বশেষে এ আয়াত থেকে একথাও জানা গেল যে, ঈমানদার লোকগণ দুনিয়ায় কেবল তখনই জয়ী হতে পারে যখন তারা একনিষ্ঠ হয়ে শুধু আল্লাহ, রাসূল এবং ঈমানদার লোকদেরকেই নিজেদের পৃষ্ঠপোষক, বন্ধু, সাহায্যকারী এবং সাথী হিসেবে গ্রহণ করবে।

আরও খানিকটা অগ্রসর হয়ে তাওবায় আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে কাফের ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ক্রমাগত কয়েক রুকূ পর্যন্ত এ যুদ্ধ সম্পর্কে হেদায়াত দিয়েছেন। এ প্রসংগে বলা হয়েছে:

فَاِنْ تَابُوْا وَاَقَامُوْا الصَّلوةَ وَاتَوُا الزَّكوةَ فَاِخْوَانَكُمْ فِىْ الدِّيْنِ ـ

“তারা যদি কুফর ও শিরক থেকে ‘তাওবা’ করে খাঁটিভাবে ঈমান আনে এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে তবে তারা তোমাদের দীনি ভাইয়ে পরিণত হবে।”- সূরা আত তাওবা : ১১

অর্থাৎ শুধু কুফর ও শিরক থেকে ‘তাওবা’ করা এবং ঈমান আনার কথা প্রকাশ করাই যথেষ্ঠ নয়, সে যে কুফর ও শিরক থেকে তাওবা করেছে এবং প্রকৃতপক্ষেই ঈমান এনেছে, তার প্রমাণের জন্য যথারীতি নামায আদায় করা এবং যাকাত দেয়াও অপরিহার্য। অতএব, তারা যদি তাদের এরূপ বাস্তব কাজ দ্বারা একথার প্রকাশ পেশ করে, তাহলে নিশ্চয়ই তারা তোমাদের দীনি ‘ভাই’, অন্যথায় তাদেরকে ভাই মনে করা তো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও বন্ধ করা যাবে না। এ সূরায় আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে:

وَالْمُؤْمِنُوْنَ وَالْمُؤْمِنتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيْآَءُ بَعْضٍ يَامُوْرُونَ بِامُرُوْنَ بَالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُوْنَ الزَّكوةَ وَيُطِيْعُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهُ اُوْلئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللهُ ـ التوبية : ٧١

“ঈমানদার পুরুষ এবং ঈমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের বন্ধু ও সাহায্যকারী। এদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, এরা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায কায়েম করে এবং যাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রাসূলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে এদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করবেন।” সূরা আত তাওবা : ৭১

অন্য কথায় কোনো ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান এনে কার্যত নামায ও যাকাত আদায় না করবে, ততক্ষণ সে মুসলমানদের দীনি ভাই রূপে পরিগণিত হতে পারবে না। বস্তুত ঈমান, নামায ও যাকাত এই তিনটি জিনিসের সমন্বয়েই ঈমানদার লোকদের জামায়াত গঠিত হয়। যারা এ কাজ যথারীতি করে, তারা এ পাক জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত এবং তাদেরই পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভালবাসা ও সহানুভূতির সম্পর্ক স্থাপিত হবে। আর যারা এ তিনটি কাজ করে না, তারা এ জামায়াতের অন্তর্ভূক্ত নয়। তাদের নাম মুসলমানদের ন্যায় হলেও ইসলামী জামায়াতের মধ্যে শামিল হতে পারে না। এখন তাদের সাথে বন্ধুত্ব, প্রেম ও ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপন করলে আল্লাহর আইন ভংগ করা এবং তাতে আল্লাহর পার্টির শৃংখলা নষ্ট করা হবে। তাহলে এসব লোক দুনিয়ায় জয়ী হয়ে থাকার আশা কি করে করতে পারে?

আরও সামনে অগ্রসর হলে সূরা হজ্জ-এ দেখা যায়, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:

وَلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَّنْصُرُهُ اِنَّ اللهَ لَقَوِي عَزِيْزٌ ـ اَلَّذِيْنَ اِنْ مَّكَّنّهُمْ فِى الاَرْضِ اَقَامُوْا الصَّلوةَ وَاَتَوُا الزَّكوةَ وَاَمَرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِۗ وَلِلهِ عَاقِبَةُ الاُمُوْرِ ـ الحج ـ ٤٠-٤١

“যে আল্লাহর সাহায্য করবে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার সাহায্য করবেন। আল্লাহ তাআলা বড়ই শক্তিশালী এবং সর্বজয়ী। (আল্লাহর সাহায্য তারাই করতে পারে) যাদেরকে রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করলে তারা নামায আদায়ের (সামাজিক) ব্যবস্থা কায়েম করবে এবং সামগ্রিকভাবে যাকাত আদায় করবে, লোককে সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে। বস্তুত সকল জিনিসের পরিণাম আল্লাহর ওপরই নির্ভর করে।”- সূরা আল হজ্জ : ৪০-৪১

বনী ইসরাঈলদের ইতিপূর্বে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, এ আয়াতে মুসলমানদেরকেও ঠিক সেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে বনী ইসরাঈলদেরকে বলা হয়েছিল যে, তারা যতদিন নামায কায়েম করবে ও যাকাত আদায় করবে এবং নবীদের কাজে সাহায্য করতে থাকবে অর্থাৎ আল্লাহর আইন জারি করবে, ততদিন আল্লাহ তাদের সাথী ও সাহায্যকারী থাকবেন। আর যখন এ কাজ ত্যাগ করবে, তখনই আল্লাহ তাদের প্রতি সকল সাহায্য বন্ধ করে দেবেন। ঠিক একথাই এ আয়াতে মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, দুনিয়ার শক্তি লাভ করে যদি তারা নামায আদায়ের সামাজিক ব্যবস্থা এবং যাকাত আদায়ের সামগ্রিক পন্থা প্রতিষ্ঠা করে আর ভালো কাজের প্রচার ও মন্দ কাজের প্রতিরোধ করে, তাহলে আল্লাহ তাদের সাহায্যকারী হবেন। বস্তুত, আল্লাহ অপেক্ষা শক্তিমান সাহায্যকারী আর কেউ হতে পারে না। কিন্তু মুসলমান যদি নামায ও যাকাত আদায় করা পরিত্যাগ এবং দুনিয়ার শক্তি লাভ করে সৎকাজের পরিবর্তে অসৎকাজের প্রচার করে, অন্যায়কে নির্মূল না করে সৎকাজের পথ বন্ধ করতে থাকে, আল্লাহর কালেমাকে বিজয়ী করার পরিবর্তে নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করতে শুরু করে আর কর আদায় করে নিজেদের জন্য দুনিয়ার বুকে স্বর্গ রচনা করাকে রাজত্বের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে করে, তাহলে আল্লাহর সাহায্য তাদের ভাগ্যে কখনো জুটবে না। তারপর শয়তানই হবে তাদের সাহায্যকারী। ভাবতে অবাক লাগে, এটা কত বড় শিক্ষার কাজ! বনী ইসরাঈল আল্লাহ প্রদত্ত এ বাণীকে অমূলক ও মৌখিক মাত্র মনে করেছিল। ফলে তার বিপরীত কাজ করতে তাদেরকে দুনিয়ার দিকে দিকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়ে ঘুরে মরতে হচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, কোথাও তারা স্থায়ীভাবে আশ্রয় লাভ করতে পারছে না। এরা দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী সম্প্রদায়, কোটি কোটি টাকা তাদের ভান্ডারে স্তুপীকৃত হয়ে আছে, কিন্তু এ টাকা তাদের কোনো কাজেই লাগছে না। নামাযের পরিবর্তে অসৎকাজ এবং যাকাতের বদলে সুদখোরীর অভিশপ্ত পন্থাকেই অবলম্বন করে তারা একদিকে নিজেরা আল্লাহর কাছে অভিশপ্ত হচ্ছে, অপর দিকে তারা প্লেগের ইঁদুরের ন্যায় দুনিয়ার দিকে দিকে এ অভিশাপ সংক্রমিত করে ফিরছে। মুসলমানদেরকেও এ হুকুমই দেয়া হয়েছে। কিন্তু মুসলমানগণ সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নামায আদায় ও যাকাতদানের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়েছে এবং আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি প্রয়োগ করে সত্য প্রচার এবং মিথ্যা ও অন্যায় প্রতিরোধের দায়িত্ব পালন করা ভুলে বসেছে। আর এর তিক্ত ফলও তারা নানাভাবে ভোগ করেছে। (দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম ও মহাশক্তিধর) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়েছে। সমগ্র দুনিয়ায় তারা সকল যালেম শক্তির নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা দুর্বল ও পরাভূত। নামায ও যাকাত ত্যাগ করার কুফল তো দেখলেন। এখন এদের (বনী ইসরাঈলদের মধ্যে) এমন একটি দল সৃষ্টি হয়েছে যারা মুসলমানদের মধ্যে লজ্জাহীনতা, অশ্লীলতা, পর্দাহীনতা এবং কুৎসিত কাজের প্রবর্তন করতে বদ্ধপরিকর। তারা মুসলমানদেরকে বলছে, “তোমাদের আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করতে হলে ব্যাংক ও ইন্সুরেন্স কোম্পানী খুলে পেট ভরে সুদ খাও।” কিন্তু সত্য কথা এই যে, মুসলমানগণও যদি এতেই লিপ্ত হয়ে থাকে, তবে তাদেরকেও ইয়াহুদীদের ন্যায় চরম লাঞ্ছনার এক কঠিন বিপদে নিক্ষেপ করা হবে এবং চিরন্তন অভিশাপে অভিশপ্ত হবে।

যাকাত কি জিনিস এতে আল্লাহ তাআলা কত বড় শক্তি নিহিত রেখেছেন, যদিও মুসলমানগণ এটাকে একটি অতি সাধারণ জিনিস বলে মনে করছে, অথচ তাতে যে কত বিরাট লাভের সম্ভবনা রয়েছে এসব বিষয়ে পরবর্তী প্রবন্ধগুলোতে আমি বিস্তারিত আলোচনা করবো, এ প্রবন্ধটিতে আমি শুধু একথাই বলতে চাচ্ছি যে, নামায ও যাকাত ইসলামের একান্ত বুনিয়াদী জিনিস। ইসলামে এ দুটির গুরুত্ব এত অধিক যে, এটা যেখানে নেই সেখানে আর যাই থাক, ইসলাম যে নেই তা সন্দেহতীত। অথচ অনেক মুসলমান আজ নামায কায়েম না করে এবং যাকাত আদায় না করেও মুসলমান হিসেবে গণ্য হতে চায় এবং তাদের তথাকথিত কিছু ধর্মগুরুও এ বিষয়ে তাদেরকে নিশ্চয়তা দান করেছে। কিন্তু কুরআন তাদের দাবীর তীব্র প্রতিবাদ করে। মানুষ যদি কালেমায় তাইয়্যেবা পড়ে তার সত্যতা প্রমাণের জন্য নামায এবং যাকাত আদায় না করে, তাহলে কুরআনের দৃষ্টিতে তার এ কলেমা পড়া একেবারেই অর্থহীন। এজন্যই হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যাকাত দিতে অস্বীকারকারী ব্যক্তিদের কাফের মনে করে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন। যারা আল্লাহ ও রাসূলকে মানে এবং নামাযও পড়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা জায়েয কিনা সাহাবায়ে কেরামের মনে তখন এ সন্দেহ জাগ্রত হয়েছিল। কিন্তু যখন হযত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যাকে আল্লাহ তাআলা নবুয়াতের কাছাকাছি সম্মান দান করেছিলেন-সুদূঢ়ভাবে ঘোষণা করলেন : আল্লাহর শপথ, রাসূলে কারীম (সা) এর জীবন যারা যাকাত দিত, আজ যদি কেউ তার উট বাঁধার একটি রশিও দিতে অস্বীকার করে, তবে তার বিরুদ্ধে আমি অস্ত্র ধারণ করবো। শেষ পর্যন্ত সকল সাহাবীই একথার যৌক্তিকতা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং সকলে একমত হয়ে ঘোষণা করলেন যে, যারা যাকাত দিবে না তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা অপরিহার্য। কুরআন শরীফ সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছে যে, যাকাত না দেয়া কেবল পরকালে অবিশ্বাসী মুশরিকদেরেই কাজ:

وَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِيْنَ ـ الًّذِيْنَ لاَيُؤْتُوْنَ الزَّكوَةَ وَهُمْ بِالاخِرَةِ هُمْ كفِرُوْنَ ـ

“যেসব মুশরিক যাকাত দেয় না, যারা আখেরাতকে অস্বীকার করে, তাদের ধ্বংস অনিবার্য।”- সূরা হা-মীম-আস-সাজদা : ৬-৭

যাকাতের মর্মকথা
পূর্বে বলা হয়েছে, নামাযের পর ইসলামের সর্বপ্রধান রুকন হচ্ছে যাকাত। আর তার গুরুত্ব এতবেশী যে, নামাযকে অস্বীকার করলে যেমন কাফের হতে হয়, অনুরূপভাবে যাকাত দিতে অস্বীকার করলে তাকে শুধু কাফেরই হতে হয় না, সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম একমত হয়ে তার রিরুদ্ধে জিহাদও করেছেন।

এখানে আমি যাকাতের প্রকৃত রূপ এবং এর অর্ন্তনিহিত তত্ত্ব আলোচনা করতে চেষ্টা করবো। যাকাত মূলত কি জিনিস এবং ইসলাম এর এতবেশী গুরুত্ব দেয় কেন তা আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠবে।

আমাদের মধ্যে অনেক লোকই যার তার সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে থাকে। অথচ কাউকে বন্ধু বলে স্বীকার করার সময়ে সে বাস্তবিকই বন্ধুত্বের ব্যাপারে তারা প্রায়ই প্রতারিত হয়ে থাকে। পরে তাদের বড় দু:খ এবং অনুতাপ করতে হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যারা বুদ্ধিমান তারা যাদের সাথে মেলামেশা করে তাদেরকে খুব ভালো করে যাচাই ও পরীক্ষা করে নেয় এবং পরীক্ষার ভিতর দিয়ে যাদেরকে তারা খুব ভালো লোক, নির্ভরযোগ্য, নিষ্ঠাবান ও বিশ্বাসভাজন বলে মনে করে, কেবল তাদের সাথেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে, আর অন্যান্যের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।

আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ও সর্বাভিজ্ঞ। তিনি যাকে তাকে নিজের বন্ধু বানাবেন, নিজের দলভুক্ত করে নিবেন এবং তাঁর দরবারে সম্মান ও নৈকট্যের মর্যাদা দান করবেন তা কি করে আশা করা যেতে পারে? সাধারণ বুদ্ধিমান মানুষ যখন পরীক্ষা ও যাচাই না করে কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে রাযী হয় না, তখন সকল জ্ঞান ও বুদ্ধির একচ্ছত্র অধিকারী আল্লাহ তাআলা খুব ভালভাবে যাচাই ও পরীক্ষা না করে কাউকে বন্ধু বলে স্বীকার করতে পারেন না। দুনিয়ায় এই যে কোটি কোটি মানুষ ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে, যাদের মধ্যে ভাল-মন্দ সকল প্রকার মানুষই রয়েছে, নির্বিচারে ও নির্বিশেষে এদের সকলকেই আল্লাহর দলে শামিল করে নেয়া সম্ভব নয়। তাই আল্লাহ তাআলা যাদেরকে দুনিয়ায় তাঁর খলীফা বানাতে এবং আখেরাতে তাঁর নৈকট্য দান করতে চান, তাদেরকে সুনির্দিষ্ট মানদন্ডে বিশেষ পরিস্থিতি ও পরীক্ষার ভিতর দিয়ে যাচাই করে নিতে চান। যাঁরাই সেই পরীক্ষায় যথাযথাভাবে উত্তীর্ণ হবেন, তাঁরাই আল্লাহর দলে গণ্য হতে পারবেন, আর যারা তা পারবে না তারা নিজেরাই তা থেকে দূরে সরে যাবে এবং তারা পরিষ্কাররূপে জানতে পারবে যে, তারা আল্লাহর দলে শামিল হবার যোগ্যতা প্রমাণ করতে সমর্থ হয়নি। মানুষের পরীক্ষা করার সেই কষ্টি পাথরটি কি? আল্লাহ নিজে যেহেতু সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান তাই তিনি সর্বপ্রথম মানুষের বুদ্ধি-জ্ঞানকেই পরীক্ষা করতে চান। মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা কিছু আছে কিনা, না নিরেট নির্বোধ তা তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করে থাকেন। কারণ নির্বোধ লোকেরা কখনও বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের বন্ধু হতে পারে না। (আর মূর্খ ও নির্বোধ লোকেরা তো কিছুতেই এবং কখনই আল্লাহর বন্ধু হতে পারে না।) আল্লাহর অস্তিত্বের নিশানা দেখে যে বুঝতে পারে যে, তিনিই আমার মালিক ও সৃষ্টিকর্তা, তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ কোনো পরোয়ারদিগার, দোয়া শ্রবণকারী এবং সাহায্যকারী আর কেউ নেই। আল্লাহর কালাম দেখ যে তাকে আল্লাহর কালাম বলেই চিনতে পারে এবং তা অন্য কারো কালাম হতে পারে না বলে দৃঢ়রূপে বিশ্বাস করে, সত্য নবী এবং মিথ্যা নবীদের জীবন চরিত, কাজ-কর্ম ও শিক্ষা-দীক্ষার মৌলিক পার্থক্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং নবী হওয়ার দাবীদারগণের মধ্যে প্রকৃত নবীকে আল্লাহর প্রেরিত নবী এবং সত্যের পথ নির্দেশকারী নবী বলে চিনতে পারে, আর মিথ্যা নবীকে দাজ্জাল ও প্রতারক বলে চিহ্নিত করতে পারে সেই ব্যক্তিরই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাকে লক্ষ কোটি লোকের মধ্যে থেকে বেছে নিয়ে নিজের দলের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে গণ্য করেন। অবশিষ্ট যারা প্রথম পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় তাদেরকে তিনি পরিত্যাগ করেন।

এ প্রথম পরীক্ষায় যে সকল প্রার্থী উত্তীর্ণ হয় তাদেরকে অতপর দ্বিতীয় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। দ্বিতীয়বারে মানুষের বুদ্ধির সাথে সাথে তার নৈতিক চরিত্র বলেরও যাচাই করা হয়। সত্য এবং পূণ্য কাজের পরিচয় লাভ করে তা গ্রহণ করা এবং তদনুযায়ী কাজ করা এবং অন্যায় ও পাপ কাজের পরিচয় লাভ করার পর তা পরিত্যাগ করার যোগ্যতা ও শক্তি তার আছে কিনা তা জেনে নেয়া এ পরীক্ষার উদ্দেশ্য। যাচাই করে দেখা হয় যে, এ ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির দাস, বাপ-দাদার অন্ধ অনুসারী এবং পারিবারিক প্রথা এ দুনিয়ার সাধারণ রীতিনীতির গোলাম তো নয়? একটি কাজকে আল্লাহর বিধানের বিপরীত জেনে এবং তাকে খারাপ মনে করেও তার মধ্যে লিপ্ত থাকার মত দুর্বলতা তার মধ্যে নেই তো? পক্ষান্তরে একটি জিনিসকে আল্লাহর মনোনীত এবং সত্য জেনে তা গ্রহণ করার মনোবল আছে কিনা তাও যাচাই করা হয়। এ পরীক্ষায়ও যারা বিফল হয় তাদেরকে আল্লাহর দলভুক্ত করা হয় না। আল্লাহর দলভুক্ত কেবল তারাই হতে পারে, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

فَمَنْ يَّكْفُرْ بِالطَّاغُوْتِ وَيُؤْمِنْ بِاللهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرُوةِ الْوُثقى لاَ اَنْفِصَامَ لَهَا ـ

অর্থাৎ আল্লাহর বিধানের বিরোধী বিধান ও পথ এবং বিধানদাতাকে যারা সাহসের সাথে পরিত্যাগ করে-সেই ব্যাপারে কারো পরোয়া করে না এবং নির্ভীকভাবে কেবল আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারেই জীবন যাপন করতে প্রস্তুত হয়-তাতে কেউ খুশী হোক আর নারায হোক সেই দিকে মাত্রই ভ্রুক্ষেপ করে না, তারা একটি মজবুত জিঞ্জির দৃঢ়তার সাথে ধারণ করে নিয়েছে যা কখনো ছিড়বে না।

এ পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয় তাদেরকে তৃতীয় পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। একবার পরীক্ষা হয় আল্লাহর অনুসরণ ও আনুগত্য স্বীকারের প্রবণতার। এই সময়ে হুকুম দেয়া হয় যে, আমার তরফ থেকে যখনই কোনো নির্দেশ দেয়া হবে, তখনই তোমরা নিদ্রা ত্যাগ করে আমার সামনে হাজির হবে; কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করে, নিজের স্বার্থ ও মন:পুত কাজ ছেড়ে, আনন্দ আর খুশী ত্যাগ করে আসবে এবং নির্দিষ্ট কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করবে, গ্রীষ্ম হোক, শীতহোক-যাই হোক না কেন, সকল সময়েই ডাক শোনা মাত্র হাজির হবে-সকল দু:খ-কষ্ট সহ্য করে আমার দরবারে উপস্থিত হবে এবং কর্তব্য পালন করবে। আবার যখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার না করতে বলবো এবং নফসের খাহেশ পূরণ করতে নিষেধ করবো, তখন তোমাকে এ হুকুম পুরোপুরি পালন করতে হবে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় যত দু:সহ কষ্টই হোক না কেন; আর যত সুমিষ্ট পানীয়, স্বুস্বাদু খাদ্য তোমার সামনে স্তুপীকৃত হোক না কেন। এই পরীক্ষায় যারা অনুত্তীর্ণ হয় তাদেরকেও বলে দেয়া হয়, তোমাদের দ্বারা আমার কাজ সম্পন্ন হতে পারে না। আর তৃতীয় পরীক্ষায়ও যারা উত্তীর্ণ হয় কেবল তাদেরকেই নির্বাচন করা হয়। কারণ এদের সম্পর্কেই এ আশা করা যেতে পারে যে, আল্লাহর তরফ থেকে যে বিধান নাযিল করা হবে তাই তারা গোপনে ও প্রকাশ্যে স্বার্থ এবং লাভ, সুখ ও দু:খ-কষ্ট সকল অবস্থায়ই যথাযথরূপে পালন করতে পারবে।

অতপর চতুর্থ পরীক্ষা নেয়া হয় মানুষের ধন-সম্পদ কুরবানী করার। তৃতীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ লোকগণও আল্লাহর কর্মচারী পদে স্থায়ীভাবে নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য প্রমাণিত হতে পারেনি। কেননা তাদের দিল ছোট, সংকীর্ণ, হীন সাহস ও বীর্যহীন এবং নীচ কিনা-মুখে বন্ধুত্ব ও ভালবাসার বড় বড় দাবী করার লোক তো অসংখ্য পাওয়া যায়, কিন্তু বন্ধুর ও ভালবাসার বড় বড় দাবী করার লোক তো অসংখ্য পাওয়া যায়, কিন্তু বন্ধুর খাতিরে পকেটের পয়সা খরচ করতে প্রস্তুত কিনা, তার পরীক্ষা নেয়া এখনও বাকী রয়েছে। তারা তো সেই সকল লোকদের মত নয় যারা মুখে মুখে মা মা করে ভক্তিতে গদগদ এবং সেই মায়ের জন্য দাংগা করতেও পিছপা নয়, কিন্তু সেই মা যখন জন্তুর বেশে শস্যক্ষেত্র প্রবেশ করে তখন লাঠি নিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়-পিটিয়ে ছাল উঠিয়ে দেয়। এমন স্বার্থপর, অর্থপূজারী সংকীর্ণমনা ব্যক্তিকে কোনো সাধারণ বুদ্ধির মানুষও নিজের বন্ধু বলে গ্রহণ করতে পারে না। আর বড় উদার আত্মা বিশিষ্ট লোকও এমন ব্যক্তিকে নিজের কাচে কোনোরূপ মর্যাদা দিতেও প্রস্তুত হবে না। তাহলে যে মহান আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদ আল্লাহরই পথে খরচ করতে প্রস্তুত করতে পারেন, যে আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদ আল্লাহরই পথে খরচ করতে প্রস্তুত নয়? আর যে আল্লাহ এতবড় বুদ্ধিমান এবং বিজ্ঞ তিনি কেমন করে এমন ব্যক্তিকে নিজের দলভুক্ত করতে পারেন, যার বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা মৌখিক জমা-খরচ মাত্র এবং যার ওপর কোনো কাজেই বিন্দুমাত্র ভরসা করা যায় না? কাজেই এ চতুর্থ পরীক্ষায় যারা ব্যর্থ হয় তাদেরকেও পরিষ্কার বলে দেয়া হয় যে, আল্লাহর দলে তোমাদের কোনো স্থান নেই, তোমরাও অকর্মণ্য-আল্লাহর খলীফার ওপর যে বিরাট দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তা পালন করার যোগ্যতা তোমাদের নেই। এ দলে কেবল তাদেরকেই শামিল করা যেতে পারে যারা আল্লাহর ভালোবাসায় জীবন-প্রাণ ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, বংশ-পরিবার, দেশ-সবকিছুর ভালবাসাকে অকুন্ঠিত চিত্তে কুরবান করতে পারে:

لَنْ تَنَالُوْا الْبِرَّ حَتّى تُنْفِقُوْا مِمَّا تُحِبُّوْنَ ـ ال عمران : ٩٢

“তোমরা নিজ নিজ প্রিয় জিনিসগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর উদ্দেশ্যে ব্যয় না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পুণ্য ও মহত্বের উচ্চতম মর্যাদা লাভ করতে পারবে না।”- সূরা আলে ইমরান : ৯২

আল্লাহর এ দলে সংকীর্ণমনা লোকদের কোনোই স্থান নেই, কেবল উদার উন্নত হৃদয়বান ব্যক্তিরাই এই দলে শামিল হতে পারে।

وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِه فَأُوْلئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ـ التغابن : ١٦

“মনের সংকীর্ণতা এবং কৃপণতাকে যারা অতিক্রম করতে পেরেছে কেবল তারাই সর্বাঙ্গীন কল্যাণ লাভ করতে পারে।”- সূরা আত তাগাবুন: ১৬

আল্লাহর দলে কেবল এমন লোকদের ভর্তি করা যেতে পারে, যারা কেউ তাদের শত্রুতা করলেও, তাদেরকে দু:খ দিলেও, তাদের ক্ষতিসাধন করলেও এবং তাদের কলিজাকে টুকরো কুকরো করলেও-কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যেই তারা পেটের খাদ্য এবং পরণের কাপড় দিতে অস্বীকার করবে না এবং বিপদের সময় তার সাহায্য করতেও কুণ্ঠিত হবে না:

وَلاَ يَاتَلِ اُوْلُوْا الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ اَنْ يُّؤْتُوْا اُوْْلِى الْقُرْبى وَالْمَسكِيْنَ وَالْمُهجِرِيْنَ فِى سَبِيْلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَاْيَصْفَحُوْا اَلاَ تَحِبُّوْنَ اَنْ يَّغْفِرَ اللهُ لَكُمْ وَ اللهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ ـ النور : ٢٢

“তোমাদের মধ্যে যারা বড় এবং সংগতি সম্পন্ন লোক তারা যেন নিজেদের প্রিয়জনদের, নিকটাত্মীয়দের, গরীব-দু:খীদের এবং আল্লাহর পথে হিজরতকারীদের (কোনো অপরাধের জন্য বিরক্ত হয়ে তাদেরকে) সাহায্য দান বন্ধ না করে। বরং তাদেরকে মাফ করে দেয়াই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ তোমাদের মাফ করে দেন তা কি তোমরা দাও না? অথচ আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বড় ক্ষমাশীল এবং দয়াবান।”১- সূরা আন নূর : ২২

এ দলে এমন লোকদের আবশ্যক, যারা আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদ থেকে বেছে বেছে ভাল ভাল জিনিস আল্লাহর জন্যই খরচ করে:

يَآ يُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا اَنْفِقُوْا مِنْ طَيِّبتِ مَاكَسَبْتُمْ وَمِمَّا اَخْرَجْنَا لَكُمْ مِّنْ الاَرْضِ وَلاَ تَيْمَّمُوْا الْخَبِيْثَ مِنْهُ تُنْفِقُوْنَ ـ الرقرة : ٢٦٧

“হে ঈমানদারগন! তোমরা নিজেরা যে ধন-সম্পত্তি উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য যমীন থেকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে ভাল ভাল সামগ্রী (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর। খারাপ দ্রব্য থেকে কিছু সেই পথে খরচ করো না।”- (সূরা আল বাকারা : ২৬৭)

১. হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জনৈক প্রিয় লোক যখন তাঁর কন্যা হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার চরিত্র সম্পর্কে অপবাদ দেয়ার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করেছিল এবং হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার প্রতি অসন্তষ্ট হয়ে তার আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিলেন তখন এই আয়াতটি নাযিল হয়। আয়াতটি নাযিল হওয়ার সাথে সাথে তিনি কম্পিত ও ভীত হয়ে বললেন : আমি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাই এবং তখনই তিনি সেই লোকটির আর্থিক সাহায্য পুনরায় জারি করলেন।

এখানে এমন বড় আত্মার লোকদের আবশ্যক, যারা নিজেদের অভাব-অনটন, দারিদ্র ও রিক্ততার দু:সহ অবস্থায় নিজেদের অপরিহার্য প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় করাকে তারা নিষ্ফল মনে করবে না। বরং তারা একান্তভাবে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহর পথে যা কিছু খরচ করা যায়, দুনিয়া এবং আখেরাত তিনি তার উত্তম ফল দান করবেন। এজন্য তারা কেবল আল্লাহর সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যেই খরচ করে। তাদের এ দানশীলতার কথা দুনিয়ার প্রচার হোক না হোক কিংবা কেউ তার দানের শুকরিয়া আদায় করুক বা না করুক সে দিকে কিছুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করে না:

وَمَا تُنْفِقُوْا مِنْ خَيْرٍ فَلاَنْفُسِكُمْ وَمَا تُنْفِقُوْنَ اِلاَّ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ وَمَا تُنْفِقُوْا مِنْ خَيْرٍ يُّوْفَّ اِلَيْكُمْ وَاَنْتُمْ لاَتُظْلَمُوْنَ ـ البقرة : ٢٧٢

“তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু খরচ করবে তা তোমাদেরই কল্যাণ সাধন করবে- অবশ্য যদি তোমরা সেই খরচের ব্যাপার আল্লাহ ছাড়া আর কারো সন্তুষ্টি পেতে না চাও। এভাবে তোমরা ভাল কাজে যা কিছু দান করবে তার পূর্ণ ফল তোমরা লাভ করবে। সে দিক দিয়ে তোমাদের প্রতি বিন্দু পরিমাণও যুলুম করা হবে না।”- সূরা আল বাকারা : ২৭২

ধনী হয়ে সুখের মধ্যে ডুবে থেকেও যারা আল্লাহকে ভুলে যায় না, আল্লাহর দলে এ ধরনের ধীর প্রকৃতির লোকদেরই দরকার। তারা বড় বড় প্রাসাদে সুখ ও সম্ভোগের ভিতরে থেকেও আল্লাহকে ভুলে যাবে না:

يَآيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا لاَتُلْهِكُمْ وَلاَ اَوْلاَدُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ وَمَنْ يَّفْعَلِ ذلِكَ فَاوُلئِكَ هُمُ الْخسِرِوْنَ المنفقون : ٩

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের সম্পদ আর সন্তান যেন তোমাদেরকে কখনও আল্লাহর যিকর থেকে বিরত না রাখে। এসবের জন্য যারা আল্লাহকে ভুলে যাবে তারা বড়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”- সূরা মুনাফিকূন: ৯

ওপরে বর্ণিত গুণাবলী আল্লাহ তাআলার দলের লোকদের মধ্যে বর্তমান থাকা অপরিহার্য। এছাড়া কোনো ব্যক্তি আল্লাহর বন্ধুদের মধ্যে গণ্য হতে পারে না। বস্তুত এটা মানুষের শুধু নৈতিক চরিত্রেরই নয়, তার ঈমানেরও বড় কঠিন এবং তিক্ত পরীক্ষা। আল্লাহর পথে খরচ করতে যে ব্যক্তি কুণ্ঠিত হবে, এরূপ খরচকে যে নিজের ওপরে জরিমানা বলে মনে করবে, কৌশল ও শঠতা করে তা থেকে যে আত্মরক্ষা করতে চায়, আর কিছু খরচ করলেও সে জন্য লোকের প্রতি নিজের অনুগ্রহ প্রকাশ করে মনের জাল মিটাতে চায় কিংবা নিজের বদান্যতার কথা দুনিয়ায় প্রচার করতে চায়, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও পরকালের প্রতি এমন লোকদের আদৌ ঈমান থাকতে পারে না। সে মনে করে, আল্লাহর জন্য সে যা কিছু করেছে, তা একেবারে নিষ্ফল হয়েছে। তার নিজের সুখ-শান্তি, আরাম-আয়েশ, নিজের স্বার্থ ও খ্যাতিকেই সে আল্লাহ এবং তাঁর সন্তষ্টি অপেক্ষাও বেশী প্রিয় বলে মনে করে। তার মতে এ দুনিয়াটাই সবকিছু। টাকা-পয়সা খরচ করলেও এ দুনিয়ায়ই সে জন্য সুনাম ও খ্যাতি লাভ হওয়া আবশ্যক। কারণ তাহলে সে টাকার বিনিময় এখানেই পাওয়া যেতে পারে। নতুবা টাকাও খরচ করলো আর কেউ জানতেও পারলো না যে, অমুক ব্যক্তি ভাল কাজে এতগুলো টাকা দিয়ে দিয়েছে, তবে তা সবই অর্থহীন হয়ে যায়। কুরআন মজীদে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে যে, এ ধরনের মানুষ আল্লাহর কোনো কাজেই আসতে পারে না। সে যদি নিজেকে ঈমানদার বলে প্রচার করে তথাপি সে ঈমানদার তো নয়ই বরং সে প্রকাশ্য মুনাফিক নিম্নের আয়াতগুলো তার প্রমাণ:

يَآيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا صَدْقتِكُمْ بَالْمَنَ وَالاَذي كَالَّذِى يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَآ ءَ النَّاسِ وَلاَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيُوْمِ الاخِرِ ـ البقرة : ٢٦٤

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের দানকে অন্যের ওপরে নিজের অনুগ্রহ প্রচার করে বা কাউকে কষ্ট দিয়ে তার মতো নিষ্ফল করে দিও না, যে ব্যক্তি শুধু অন্যকে দেখাবার জন্য কিংবা সুনাম কিনার জন্য অর্থ ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস রাখে না।”

وَاَلَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَيُنْفِقُوْنَهَا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ فِبَشّرِهُمْ بِعَذَابِ اَلِيْمٍ ـ التوبة : ٣٤

“যারা স্বর্ণ এবং রৌপ্য সঞ্চয় করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না, তাদেরকে কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও।”- সূরা তাওবা : ৩৪।

لاَيَسْتَاْذِنُكَ الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الاخِرِ اَنْ يُّجَاهِدُوْنا يَاَمْوَالِهِمْ وَاَنْفٌسِهِمْ وَاللهُ عَلَيْمٌ بِالْمُتَّقِيْنَ ـ اِنَّمَا يَسْتَاذِنُكَ الَّذِيْنَ لاَيُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الاخِرِ وَارْتَابَتْ قُلُبُهُمْ فَهُمْ فِىْ رَيْبِهِمْ يَتَرَدَّدُوْنَ ـ

“হে নবী‍! যারা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে, তারা নিজেদের জান-মালসহ জিহাদে যোগদান করার কর্তব্য থেকে দূরে সরে থাকার জন্য কখনও অনুমতি চাইবে না। আল্লাহ তাআলা প্রকৃত মুত্তাকী বান্দাহগণকে খুব ভাল করেই জানেন। অবশ্য সেসব লোক ওজর আপত্তি করতে পারে, আল্লাহ ও পরকালের প্রতি যাদের আদৌ বিশ্বাস নেই-যাদের মনের মধ্যে সন্দেহ জমাট বেঁধে রয়েছে এবং নিজেদের সন্দেহের মধ্যে নিমজ্জিত থেকেই ইতস্তত করে।”- সূরা আত তাওবা : ৪৪-৪৫

وَمَا مَنَعَهَمْ اَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقّهُمْ اِلاَّ اَنَّهُمْ كَفَرُوْا بِاللهِ وَرَسُوْلِه وَلاَ يَاتُوْنَ الصَّلوةَ اِلاَّ وُهُمْ كُسَالى وَلاَ يُنْفِقُوْنَ اِلاَّ وَهُمْ كرِهُوْنَ ـ

“আল্লাহর পথে তাদের দান শুধু এজন্যই কবুল করা যায় না যে, মূলত আল্লাহ এবং রাসূলের প্রতি তাদের ঈমান নেই; নামাযের জন্য তারা আসে বটে; কিন্তু মনক্ষুণ্ন হয়ে; আর টাকা-পয়সাও তারা দান করে, কিন্তু বড়ই বিরক্তি সহকারে ।”- সূরা আত তাওবা : ৫৪

اَلْمُنفِقُوْنَ وَالْمُنفِقّتُ بَعْضُهُمْ مِّنْ بَعْضٍ يَامُرُوْنَ بِالْمُنْكَرِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمَعْرُوْفِ وَيقْبِضُوْنَ اَيْدِيْهِمْ نَسُوْا اللهَ فَنَسِيْهُمْ اِنَّ الْمُنفِقِيْنَ هُمْ الْفسِقُوْنَ ـ التوبة : ٦٧

“মুনাফিক পুরুষ আর মুনাফিক স্ত্রী সব একই দলের লোক-একে অন্যের সাহায্যকারী। এরা সকলেই মিলে অন্যায়ের আদেশ করে, ন্যায় ও সত্যকে নির্মূল রাখে। এরা সকলেই আল্লাহকে ভুলে গেছে। তাই আল্লাহ তাদেরকে ভুলে গেছেন। এসব মুনাফিক যে ফাসেক (আল্লাহর নির্ধারিত সীমালংঘনকারী) তাতে সন্দেহ নেই।”- সূরা আত তাওবা : ৬৭

وَمَنْ الاَعْرَابِ مَنْ يَّتَّخِذُ مَايُنْفِقُ نَغْرَمًا ـ التوْبة : ٩٨

“এ আরাব (মুনাফিকদের) অনেকেই আল্লাহর রাস্তায় কিছু খরচ করলেও তা করে একান্তভাবে ঠেকে-যেন জরিমানা আদায় করছে।”

هآَ نْتُمْ هؤْلاَءٍ تُدْعَوْنَ لِتُنْفِقُوْا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ فِمِنْكُمْ مَّنْ يَّبْخَلُ وَمَنْ يَّبْخَلْ فَانِّمَا يَبْخَلُ عَنْ نَّفْسِه وَاللهُ الْغَنِىُّ وَاَنْتُمْ الفُقَرَآءُ وَاِنْ تَتَوْلَّوْا يَسْتَبْدِلْ قَوْمًا غَيْرَكُمْ تُمَّ لاَيَكَوْنُوْا اَمْثَالَكُمْ ـ محمد : ٣٨

“জেনে রাখ, তোমাদের অবস্থা এতদূর খারাপ হয়ে গিয়েছে যে, তোমাদের আল্লাহর রাস্তায় কিছু খরচ করতে বললে তোমরা সেজন্য মোটেই প্রস্তুত হও না বরং তোমাদের অনেকেই তখন কৃপণতা করতে থাকে। অথচ যে ব্যক্তি এসব কাজে কৃপণতা করে সেই কৃপণতায় তার নিজেরই ক্ষতি হয়। মূলত আল্লাহ একমাত্র ধনশালী আর তোমরা সকলেই দরিদ্র-তাঁরই মুখাপেক্ষী। আল্লাহর রাস্তায় যদি তোমার আদৌ অর্থ ব্যয় করতে প্রস্তুত না হও তবে এ অপরাধের অনিবার্য ফলস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্থানে এক ভিন্ন জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। তারা নিশ্চয়ই তোমাদের মত (কৃপণ) হবে না।”- সূরা মুহাম্মাদ : ৩৮

মোটকথা, যাকাত ইসলামের একটি স্তম্ভ এবং এটাই তার মূল কথা। একে প্রচলিত সরকারী ট্যাক্সের মত মনে মারাত্মক ভুল। কারণ আসলে এটা ইসলামের প্রাণ, ইসলামের জীবনী শক্তি। যাকাত ফরয করার মূলে ঈমানের পরীক্ষা করাই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। ক্রমাগত পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রী লাভ করে, অনুরূপভাবে আল্লাহও মানুষের ঈমান যাচাই করার জন্য কতগুলো পরীক্ষা নির্দিষ্ট করে দেন; প্রত্যেক মানুষকেই এ পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। একজন মানুষ যখন এরূপ পরীক্ষা দিয়ে চতুর্থ পরীক্ষা-অর্থাৎ অর্থদানের পরীক্ষায়ও সাফল্য লাভ করে, তখনই সে খাঁটি মুসলমান হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এটা নিশ্চয়ই সর্বশেষ পরীক্ষা নয়।

এরপরে আসে প্রাণের পরীক্ষা। সেই সম্পর্কেও আমি পরে আলোচনা করবো। কিন্তু ইসলামের সীমার মধ্যে আসার জন্য-অন্য কথায় আল্লাহর দলভুক্ত হবার যে কয়টি প্রবেশিকা পরীক্ষা নির্দিষ্ট করা হচ্ছে, তার মধ্যে যাকাত হচ্ছে সর্বশেষ পরীক্ষা। বর্তমানে অনেকেই বলে বেড়াচ্ছে যে, টাকা-পয়সা খরচ বা দান করার অনেক ওয়াজই মুসলমানকে শুনান হয়েছে, বর্তমানে এ অভাব ও দারিদ্রের কঠিন মুহূর্তে তাদেরকে খানিকটা উপার্জন ও সঞ্চয় করার ওয়াজ শুনানো উচিত; কিন্তু তারা বুঝতে পারে না যে, যে জিনিসটির প্রতি তারা নাক ছিটকাচ্ছে তা হচ্ছে ইসলামের এ প্রাণ বস্তুটি। আর এ জিনিসটির অভাবই মুসলমানকে নৈতিক ও আর্থিক অধ:পতনের চরম সীমায় নিয়ে পৌঁছিয়েছে। এ প্রাণ বস্তুটি তাদেরকে অধপতিত করেনি। তাদের সর্বব্যাপী পতন হয়েছে শুধু এজন্য যে, এ প্রাণ বস্তুটিই তাদের দেহ থেকে নির্গত হয়ে গেছে।

সমাজ জীবনে যাকাতের স্থান
কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে যাকাত-সদকা ইত্যাদির কথা বুঝার জন্য ইনসাফ ফী সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা) বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে আবার বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর রাস্তায় যা-ই খরচ করবে তা আল্লাহর কাছে করযে হাসান (ধার) হিসেবে মওজুদ থাকবে। এক কথায় এটা দ্বারা ঠিক আল্লাহকে ধার দেয়া হয়, আর আল্লাহ মানুষের কাছে ঋণী হন। অনেক স্থানে একথাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহর রাস্তায় তোমরা যা কিছু দেবে তার বিনিময় দেয়ার দায়িত্ব আল্লাহর তিনি তোমাদের শুধু ততটুকু পরিমাণই ফিরিয়ে দেবেন না; তদপেক্ষা অনেক বেশী পরিমাণ দান করবেন।

কুরআন মজীদের উল্লেখিত কথাগুলো বাস্তবিকভাবেই প্রণিধানযোগ্য। আকাশ ও পৃথিবীর মালিক কি কখনও মুখাপেক্ষী হতে পারে? মানুষের কাছে থেকে সেই মহান পবিত্র আল্লাহর টাকা ধার নেয়ার কি প্রয়োজন থাকতে পারে? সেই রাজাধিরাজ সীমাসংখ্যাহীন ধন ভান্ডারের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ কি মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন ধার চান? কখনও নয়, তা হতেই পারে না। তাঁর দানেই দুনিয়ার জীব-জন্তু বস্তুনিচয় জীবন ধারণ করছে, তাঁর দেয়া জীবিকা দ্বারাই মানুষ বাঁচে। দুনিয়ার প্রত্যেক ধনী ও গরীবের কাছে যা কিছু আছে, তা সব তাঁরই দান। একজন অসহায় গরীব থেকে শুরু করে কোটিপতি পর্যন্ত প্রত্যেকেই তাঁর অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। কিন্তু তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি মানুষের কাছে ধার চাইবেন এবং নিজের জন্য মানুষের সামনে হাত প্রসারিত করবেন- তার আদৌ কোনো প্রয়োজন নেই। মূলত মানুষেরই কল্যাণের জন্য, মানুষের কাজে ব্যয় করার জন্যই তিনি আদেশ করেন। আর সে ব্যয়টাকেই তিনি তাঁর পথে খরচ কিংবা ধার বলে গণ্য করেন। বস্তুত এটাও তাঁর আর এক কল্যাণ কামনার বাস্তব প্রকাশ-এটাও তাঁর এক প্রকার বড় অনুগ্রহ বিশেষ। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদেরই সমাজের অভাবগ্রস্ত গরীব এবং আর এক কল্যাণ কামনার বাস্তব প্রকাশ-এটাও তাঁর এক প্রকার বড় অনুগ্রহ বিশেষ। তিনি বলেন, তোমরা যেসব লোককে অর্থ সাহায্য কর, এর বিনিময় তারা কোথা থেকে দেবে? এর প্রতিদান আমিই দান করবো। তোমরা ইয়াতিম, বিধবা, অসহায়, বিপদগ্রস্ত এবং নিসম্বল পথিক ভাইদেরকে যা কিছু দান করবে তার হিসেব আমার নামে লিখে রেখো এর তাগাদা তাদের কাছে নয় বরং আমার কাছে কারো। আমি তা পরিশোধ করবো। তোমরা তোমাদের গরীব ভাইদের ধার দাও কিন্তু তাদের কাছ থেকে সুদ গ্রহণ করে না, এর তাগাদা করে তাদেরকে অপ্রস্তুত ও বিব্রত করো না। তারা ঋণ শোধ করতে না পারলে সে জন্য তাদেরকে সিভিল জেল পাঠিয়ো না, তাদের কাপড়-চোপড় এবং ঘরের আসবাবপত্র ক্রোক করো না, তাদের অসহায় সন্তানদেরকে ঘর থেকে বের করে আশ্রয়হীন করে দিও না। কারণ তোমাদের ঋণ আদায়ের দায়িত্ব তাদের নয়- আমার, তারা যদি মূল টাকা আদায় করে দেয়, তবে তাদের পক্ষে থেকে সুদ আমি আদায় করবো আর তারা যদি আসল টাকাও না দিতে পারে, তাহলে আসল ও সুদ সবই আমি শোধ করবো। এভাবে নিজেদের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে মানুষের উপকারার্থে তোমরা যা খরচ, করবে, তার লাভ যদিও তোমরাই পাবে; কিন্তু সেই অনুগ্রহ আমার ওপর করা হবে, আমিই তার লাভ সহ পূর্ণ হিসেব করে তোমাদেরকে ফেরত দেব।

একমাত্র দয়াময়, রাজাধিরাজ আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহের যথার্থতা এখানেই মানব জাতির কাছে যা কিছু আছে, তা সব তাঁরই দান- অন্য কোথাও থেকে বা অন্য কারো কাছ থেকে তোমরা তা পাও না। তাঁরই ভাণ্ডার থেকে তোমরা নিয়ে থাক, কিন্তু যা কিছু দাও, তাঁকে নয়-তোমাদেরই আত্মীয়, এগানা, ভাই, বন্ধু ও নিজ জাতির লোকদেরকেই দিয়ে থাক। কিংবা নিজেদের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় কর, যার ফলও শেষ পর্যন্ত তোমরাই পেয়ে থাক। কিন্তু সেই মহান দাতার অসীম বদান্যতা লক্ষ্য কর, তিনি এ সকল দান সম্পর্কে বলেন যে, এটা তাঁকে ঋণ দেয়া হয়েছে, তাঁরই পথে খরচ করা হয়েছে, তাঁকে দেয়া হয়েছে-এর ফল আমিই তোমাদেরকে দেব। বস্তুত বদান্যতার এ অতুলনীয় পরাকাষ্ঠা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই পক্ষে শোভা পায়, কোনো মানুষ এর ধারণাও করতে পারে না।

ভাবার বিষয় এই যে, আল্লাহ তাআলা মানুষের মধ্যে দানশীলতা ও বদান্যতার উৎস সঞ্চার করার জন্য এ পন্থা অবলম্বন করলেন কেন? এ বিষয়ে যতই চিন্তা করা যায়, ইসলামের উন্নত শিক্ষার অন্তনির্হিত পবিত্র ভাবধারা ততই সুস্পষ্টরূপে হৃদয়ঙ্গম করা যায়; মন উদাত্ত কন্ঠে বলে উঠে –এ অতুলনীয় শিক্ষা আল্লাহ ছাড়া আর কারো হতে পারে না।

মানুষ যে স্বভাবতই কিছুটা যালেম এবং জাহেল হয়ে জন্মগ্রহণ করে, তা সকলেরই জানা কথা। তার দৃষ্টি অত্যন্ত সংকীর্ণ। বেশী দূর পর্যন্ত তা পৌঁছায় না। তাদের দিল খুবই ক্ষুদ্র, তার মনে বড় এবং উচ্চ ধারণার খুব কমই সংকুলান হয়ে থাকে। মানুষ ভয়ানক স্বার্থপর, কিন্তু সেই স্বার্থপরতা সম্পর্কেও কোনো ব্যাপক ও বিরাট ধারণা তার মন-মস্তিষ্কে স্থান পায় না। মানুষ অবিলম্বেই সবকিছু পেতে চায়: خَلَقَ الاِنْسَانَ مِنْ عَجَلٍ ـ প্রতিটি কাজের ফল এবং পরিণাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাভ করতে সে প্রয়াসী। যে ফল তার সামনে অবিলম্বে আসে এবং নিজের চোখ দ্বারা দেখতে পায়, তাই তার কাছে একমাত্র ফল ও পরিণাম। সুদূরপ্রসারী ফলাফল পর্যন্ত তার দৃষ্টি মোটেই পৌঁছায় না। উপরন্তু যে ফল খুব বড় আকারে সামনে আসে এবং যে ফলের ক্রিয়া বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, মানুষ তা অনুভব পর্যন্ত করতে পারে না। বস্তুত এটা মানুষের এক স্বাভাবিক দুর্বলতা বিশেষ। এ দুর্বলতার কারণে মানুষ নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। আর তাও আবার যেসব স্বার্থ ছোট আকারে এবং খুব দ্রুত লাভ করা যায়, তারই প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। সে বলে আমি যা উপার্জন করেছি বা আমার বাপ-দাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে যা পেয়েছি তা একান্তভাবে আমার, অন্য কারো কোনো অংশ বা অধিকার তাতে নেই। কাজেই আমি কেবল নিজের প্রয়োজনে, নিজের ইচ্ছায় এবং নিজের আরাম আয়েশের কাজে খরচ করবো। কিংবা যেসব কাজের ফল অবিলম্বে আমার হাতে ফিরে পাব কেবল সেই কাজে নিয়োগ করবো। আমি যদি টাকা খরচ করি তবে এর বিনিময় আমার মান-সম্মান বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা কোনো খেতাব লাভ করা একান্তই আবশ্যক। মানুষ যেন আমার সামনে মাথা নত করে, লোকের মুখে যেন আমার নামের চর্চা হয়। এসব জিনিসের কোনোটাই যদি আমি না পাই, তবে আমি টাকা খরচ করবো কেন? আমরা নিকটবর্তী কোনো গরীব-দু:খী বা ইয়াতীম মিসকিন যদি না খেয়ে মরে যায়, তবুও আমি কেন তাঁকে খাদ্য যোগাড় করে দেব? তার প্রতি তার পিতার কর্তব্য ছিল নিজের সন্তানের জন্য কিছু রেখে যাওয়া। আমার পাড়ার কোনো বিধবার যদি দু:খে দিন কাটে তবে আমার তাতে কি আসে যায়? তার জন্য তার স্বামীর চিন্তা করা উচিত ছিল। কোনো প্রবাসী যদি সম্বলহীন হয়ে পড়ে, তবে তার সাথে আমার কি সম্পর্ক থাকতে পারে? সে পথের ব্যবস্থা না করেই ঘর থেকে বের হয়ে বড় নির্বুদ্ধিতার কাজ করেছে। অন্য কোনো ব্যক্তি যদি দূরবস্থায় পড়ে তবে তার প্রতি আমার কী করণীয় থাকতে পারে? আমার ন্যায় তাকেও আল্লাহ তাআলা হাত-পা দিয়েছেন। নিজের প্রয়োজন পরিমাণ উপার্জন করা তার নিজেরই কর্তব্য। আমি তার সাহায্য করবো কেন? আর একান্তই আমি তাকে যদি কিছু টাকা-পয়সা দেই তবে ঋণ হিসেবেই দেব এবং আসল টাকার সাথে এর সুদও নিশ্চয়ই আদায় করবো। কারণ, বিনা পরিশ্রমে তো টাকা উপার্জিত হয়নি। সেই টাকা আামার কাছে থাকলে কত কাজেই না লাগাতে পারতাম-দালান-কোঠা তৈরি করতে পারতাম, মোটর গাড়ি কিনতে পারতাম কিংবা অন্য কোনো লাভজনক কাজে খাটাতে পারতাম। সে যদি আমার টাকা দিয়ে কোনো উপকার লাভ করতে পারে, তবে আমি আমার টাকা দ্বারা কিছু না কিছু লাভ করতে পারবে না কেন? তা থেকে আমার অংশই বা আমি আদায় করবো না কেন?

এরূপ স্বার্থপর মনোবৃত্তির কারণে প্রথমত মানুষ ধনপিশাচে পরিণত হয়। সে তা খরচ করলে ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই করবে। যে কাজে কোনো স্বার্থ দেখতে পাবে না, সেখানে এক পয়সাও খরচ করবে না। কোনো গরীবের সাহায্য যদি সে করেও, তবে মূলত তা দ্বারা সেই গরীবের কোনো সাহায্য হবে না, বরং তাকে আরো বেশী করে শোষণ করবে এবং তাকে যা দেবে তদপেক্ষা অনেক বেশী আদায় করবে। কোনো মিসকীনকে কিছু দান করলে সে এ ব্যক্তির প্রতি নিজের অনুগ্রহ দেখিয়ে তাকে কাতর করে ছাড়বে এবং তাকে এতদূর অপমানিত ও লাঞ্চিত করবে যে, তার মধ্যে আত্মসম্মানবোধটুকুও অবশিষ্ট থাকতে দেবে না। কোনো জাতীয় কাজে অংশ গ্রহণ করলে এ ধরনের মানুষ সর্বপ্রথম নিজের স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি দেবে। যেসব কাজে নিজের স্বার্থ লাভের সম্ভবনা থাকবে না, সেই কাজে একটি পয়সাও দিতে প্রস্তুত হবে না।

এধরনের মনোবৃত্তির পরিণাম কত ভয়াবহ তা ভেবে দেখেছেন কি? এর ফলে গোটা সমাজ জীবনই যে চুরমার হয়ে যাবে তাই নয়, বরং শেষ পর্যন্ত সেই ব্যক্তির অবস্থাও অত্যন্ত মারাত্মক হয়ে পড়বে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এদের দৃষ্টি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং তারা অতীব মূর্খ বলে এটা থেকেও তাদের নিজেদেরই উপকারিতার আশা করে থাকে। এ ধরনের উপার্জনহীন মনোবৃত্তি যখনই মানুষের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে তখন সমাজের খুব অল্প সংখ্যক লোকের হাতে সমগ্র জাতীয় সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে এবং অসংখ্য লোক একেবারে নিরুপায় ও উনহীন হয়ে পড়তে বাধ্য হয়। অর্থশালী লোক অর্থের বলে আরও বেশী পরিমাণ অর্থ শোষণ করে, গরীব লোকদের জীবন ক্রমশ আরও বেশী খারাপ হয়ে যায়। যে সমাজে দারিদ্র একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক স্বাস্থ্য-ধৈর্য চূর্ণ হয়, নানা প্রকার দুরারোগ্য ব্যাধি সমাজ দেহে আক্রমণ করে, ফলে তারা কাজের ও উৎপাদনের শক্তি হারিয়ে ফেলে। তাদের মধ্যে মূর্খতা ও অশিক্ষা বৃদ্ধি পায়, নৈতিক স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। তারা নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য অপরাধ প্রবণ হতে বাধ্য হয় এবং শেষ পর্যন্ত লুটতরাজ করতেও পশ্চাৎ পদ হয় না। সমাজে এক সর্বব্যাপী বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়, ধনী লোক গরীবদের হাতে নিহত হতে শুরু করে, তাদের ঘর-বাড়ী লুণ্ঠিত হয়, অগ্নিদগ্ধ হয় এবং তারা চিরতরে ধ্বংস হতে বাধ্য হয়।

সমাজ বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে প্রত্যেকটি মানুষের ব্যক্তিগত কল্যাণ তার সামাজিক বৃহত্তর কল্যাণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজনের কাছে যে অর্থ আছে তা যদি অন্য এক ভাইয়ের সাহায্যার্থে ব্যয়িত হয় তবে এ অর্থই আবর্তিত হয়ে অভাবিতপূর্ব কল্যাণ নিয়ে পুনরায় তার হাতেই ফিরে আসবে। পক্ষান্তরে নিতান্ত সংকীর্ণ দৃষ্টির বশবর্তী হয়ে যদি সে তার নিজের কাছেই সঞ্চয় করে রাখে, কিংবা নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থজনিত কাজে ব্যয় করে, তবে ফলত সে অর্থ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, একটি ইয়াতীম শিশুকে আপনি যদি লালন-পালন করে এবং উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে উপার্জনক্ষম করে দেন, তবে তাতে সামাজিক সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। আপনিও তা থেকে অংশ লাভ করতে পারবেন। কারণ, আপনিও সেই সমাজেরই একজন লোক। হতে পারে সেই ইয়াতীমের বিশেষ যোগ্যতার ফলে আপনি যে অর্থ লাভ করেছেন তা কোনো হিসেবের সাহায্যে হয়ত আপনি আদৌ জানতে পারেননি। কিন্তু প্রথমেই তার লালন-পালন করতে এবং তাকে শিক্ষা-দীক্ষা দিতে আপনি যদি অস্বীকার করেন এবং বলেন যে, আমি তার সাহায্য করবো কেন, তার পিতারই কিছু না কিছু ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত ছিল, তবে তো সে উদভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াবে, ছন্নছাড়া হয়ে নিরুদ্দেশ হাতড়িয়ে মরবে, অকর্মণ্য হয়ে যাবে এবং সামাজিক সম্পদ বৃদ্ধি করার মতো কোনো যোগ্যতাই সে লাভ করতে পারবে না। বরং সে অপরাধ প্রবণ হয়ে একদা স্বয়ং আপনার ঘরেই সিঁদ কাটতে প্রস্তুত হবে। এর অর্থ এ দাঁড়ায় যে, আপনি সমাজেরই এক ব্যক্তিকে অকর্মণ্য ও অপরাধ প্রবণ বানিয়ে কেবল তারই নয়-আপনার নিজেরও ক্ষতি সাধন করবেন। এ একটি মাত্র উদাহরণ সামনে রেখে দৃষ্টি প্রসারিত করলে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যাবে যে, নিস্বার্থভাবে যে ব্যক্তি সামাজিক বৃহত্তর কল্যাণের জন্য অর্থ খরচ করে, বাহ্য দৃষ্টিতে তা তার নিজ পকেট থেকে নির্গত হয় বটে; কিন্তু বাইরে এসে তাই বৃদ্ধি পেয় স্ফীত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাই অসংখ্য রূপ উপকার ও স্বার্থকতা নিয়ে আবার তার পকেটেই ফিরে যায়। আর যে ব্যক্তি বাহ্য দৃষ্টিতে তার অর্থ তার নিজের বাক্সে থেকে যায় বা সুদ খেয়ে তাকে আরও স্ফীত করে তোলে; কিন্তু প্রকতপক্ষে নিজের নির্বুদ্ধিতার দরুনই নিজের সম্পদ নষ্ট করে-নিজেরই ধ্বংসের ব্যবস্থা করে।

আল্লাহ তাআলা এ তত্ত্ব কথাই বলেছেন নিম্নলিখিত আয়াতে:

يَمۡحَقُ ٱللَّهُ ٱلرِّبَوٰاْ وَيُرۡبِى ٱلصَّدَقَـٰتِ‌ۗ ـ البقرة : (٢٧٦)

“আল্লাহ সুদ নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং দানকে ক্রমবৃদ্ধি প্রাপ্ত করেন।”

وَمَا اتَيْتُمْ مِّنْ رٍّبًا لِّيَرۡبُوَاْ فِىٓ أَمۡوَٲلِ ٱلنَّاسِ فَلَا يَرۡبُواْ عِندَ ٱللَّهِ‌ وَمَآ ءَاتَيۡتُم مِّن  زَكوْةٍ تُرِيْدُوْنَ وَجْهَ اللهِ فَاُوْلئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُوْنَ ـ الروم : ٣٩

“মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি করবে বলে তোমরা যে সুদ দাও, মূলত আল্লাহর কাছে তাতে সম্পদ মোটই বৃদ্ধি পায় না কিন্তু তোমরা যে যাকাত আদায় কর-একমাত্র আল্লাহর সন্তোষ লাভ করার উদ্দেশ্য তা অবশ্য দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়।”- সূরা আর রূম : ৩৯

কিন্তু এ গভীর তত্ত্ব কথা বুঝতে এবং তদানুযায়ী কাজ করতে মানুষের দৃষ্টি সংকীর্ণতা এবং চরম মূর্খতা বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা ইন্দ্রিয়ের দাস। যে টাকা তাদের পকেটে আছে তা দিয়ে তারা অনুভব করতে পারে এবং বুঝতে পারে যে, তা নিশ্চয়ই আছে। তাদের হিসেবের খাতায় যে পরিমাণ টাকা বেড়ে চলেছে তার ক্রম বৃদ্ধি সম্পর্কেও তারা নিসন্দেহ; কিন্তু যে টাকা তাদের কাছ থেকে চলে যায়; তা যে বাড়ছে এবং তাদের হাতে যে ফিরে আসতে পারে; সে কথা মোটেই বুঝতে ও দেখতে পায় না। তারা শুধু বুঝে এত টাকা আমার হাত থেকে চলে গিয়েছে এবং তা চিরকালের জন্যই গেছে।

মূর্খতার এ বন্ধনকে মানুষ নিজের বুদ্ধি বা চেষ্টার দ্বারা অদ্যাবধি খুলতে পারেনি। সারা দুনিয়ার অবস্থাই এরূপ। একদিকে পুজিঁবাদীদের দুনিয়া-সকল কাজই সেখানে সুদ প্রথার ওপর চলছে এবং ধন-সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও সেই দেশে দু:খ দারিদ্র আর অভাব অনটন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে এদের বিরোধী আর একটি দল ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে। তাদের মনে হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। এর পুঁজিবাদীদের ধন-ভান্ডার লুটে তো নেবেই সেই সাথে মানুষের তাহযীব-তমুদ্দুনের গোটা ইমারতকেও ধূলিসাৎ করে দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠেছে।

মানুষ এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। এর সুষ্ঠ সমাধান করেছে মানুষের স্রষ্টা-মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ তাআলা। তিনি এসব মানুষের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সুষ্ঠ সমাধানসহ যে কিতাব নাযিল করেছেন, তার নাম কুরআন মজীদ। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে মানুষকে আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনতে হবে। মানুষ যদি আল্লাহর এবং পরকালের প্রতি ঈমান আনতে হবে। মানুষ যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে এবং সন্দেহাতীতরূপে জেনে নেয় যে, আকাশ ও পৃথিবীর সমগ্র ধন-ভান্ডারের প্রকৃত মালিক হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা : আর মানুষের সকল কাজের ব্যবস্থাপনা একান্তভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তার কাছে প্রত্যেকটি অণু-পরমাণুর হিসেব বর্তমান আছে; মানুষের ভালো বা মন্দ কাজের পুরুস্কার বা শাস্তি আখেরাতে ঠিক তদনুযায়ী হবে। তাহলে নিজের স্থুলদৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে নিজের ধন-সম্পদ আল্লাহর বিধান অনুসারে ব্যয়-ব্যবহার করা এবং লাভ-ক্ষতি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়া মানুষের পক্ষে খুবই সহজ হয়ে পড়ে। এরূপ ঈমান নিয়ে সে যা কিছু খরচ করবে তা একান্তভাবে আল্লাহর জন্যই খরচ করা হবে। তার হিসেবেও আল্লাহর দফতরে যথাযথভাবে লিখিত হবে। তার এ খরচের খবর দুনিয়ার কোনো মানুষ জানতে না পারলেও আল্লাহ তাআলা সেই সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবহিত থাকেন। আর দুনিয়ার মানুষ তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলেও আল্লাহ নিজেই যখন তার প্রতিদান দেয়ার ওয়াদা করেছেন তখন পরকালেই হোক কিংবা ইহকাল ও পরকাল উভয় স্থানেই হোক-সেই ওয়াদা যে পূর্ণ হবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।

আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য সাধারণ নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা ইসলামী শরীয়াতের এ নিয়ম করেছেন যে, প্রথমে তিনি ভালো এবং পূণ্য কাজের একটা সাধারণ হুকুম জারী করেন, যেন মানুষ নিজের জীবনে সাধারণভাবে ভালো ও কল্যাণকর পন্থা অবলম্বন করতে পারে। তারপর সেই ভালো কাজসুসম্পন্ন করার জন্য একটি বিশেষ পন্থা নির্দেশ করা হয়। সেই বিশেষ পন্থাটি সকলেরই যথাযথ রূপে পালন করা কর্তব্য। উদারহণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে, আল্লাহকে স্মরণ করা একটি অত্যন্ত ভালো কাজ এবং সর্বাপেক্ষা অধিক ভালো কাজ। শুধু তাই নয়- বস্তুত সমস্ত ভালো কাজেরই মূল উৎস এটাই। সেজন্য আল্লাহকে সকল সময় ও সকল অবস্থায়ই স্মরণ করা এবং এক মুহূর্তও তাকে ভুল না যাওয়ার জন্য তাঁর নিদেশ রয়েছে:

فَاذْكُرُوْا اللهَ قِيْمًا وَّقُعُوْدُا وَّعَلى جُنُوْبِكُمْ ـ النساء : ١٠٣

“দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে (সকল সময় ও সকল অবস্থায়ই) আল্লাহকে স্মরণ কর।” সূরা আন নিসা : ১০৩

وَاَذْكُرُوْا اللهَ كَثِيْرَ لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ ـ الانفال : ٤٥

“খুববেশী করে তাঁর স্মরণ করতে থাক, কারণ একাজেই তোমাদের কল্যাণ হবে আশা করা যায়।”- সূরা আল আনফাল : ৪৫

اِنِّ فِىْ خَلْقِ السَّموتِ وَالاَرْضِ وَاَخْتِلاَفِ الَّيْلِ وَالنَّهَارِ لاَيْتٍ لاَوْلِىْ الاَلْبَابِ ـ الَّذِيْنَ يَذْكُرُوْنَ اللهَ قِيْمَامًا وَّقُعُوْادًا وَّعَلى جُنُوْبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُوْنَ فِىْ خَلْقِ السَّموتِ وَالاْرْضِ رَبُّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً ـ

“আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে (আল্লাহর অস্তিত্বের) বহু নিদর্শন রয়েছে, এবং চিন্তাশীল লোকদের জন্য- যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে, আর আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি ও গঠন রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করতে থাকে এবং (গভীরভাবে চিন্তা করার পর প্রত্যেকটি জিনিসের মহাত্ম্য বুঝতে পেরে উদাত্ত কন্ঠে) বলে উঠে- হে আল্লাহ! তুমি এর কোনো একটিও নিরর্থক সৃষ্টি করনি।”- সূরা আলে ইমরান : ১৯০-১৯১

وَلاَ تَطِعْ مَنْ اَغْفَلْنَا قَلْبَه عَنْ ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَٮٰهُ وَكَانَ اَمْرَهُ فُرُطًا ـ الكهاف : ٢٨

“যাদের দিলে আল্লাহর স্মরণ নেই, যারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যারা প্রত্যেকটি কাজের নির্দিষ্ট সীমালংঘন করে থাকে, তোমরা তাদের আনুগত্য বা অনুসরণ করো না।”- (সূরা আল কাহাফ :২৮)

এ আয়াতসমূহে এবং এ ধরণের আরও অনেক ও অসংখ্য আয়াতে পরিস্কার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, হে মানুষ! তোমরা সকল সময় সকল অবস্থায়ই আল্লাহকে স্মরণ কর। কারণ, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর স্মরণই মানুষের সকল কাজ-কর্ম সুষ্ঠু এবং সুন্দর করে দেয়। মানুষ যখনই এবং যে কাজেই তাঁকে ভুলে যাবে; সেখানেই প্রবৃত্তি (নফসের খাহেস) এবং শয়তানের প্রতারণা তাকে পরাভূত করবে। এর অনিবার্য পরিণামে মানুষ সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের জীবন যাপনের ব্যাপারে সীমালংঘন করতে শুরু করবে।

এটা ছিল আল্লাহকে স্মরণ করার একটি সাধারণ নির্দেশ। অতপর আল্লাহকে স্মরণ করার একটি বিশেষ উপায় নির্ধারণ করা হয়েছে। সে জন্য দিন-রাতের মধ্যে পাঁচবার কয়েক রাকাআত করে নামায পড়া ফরয করা হয়েছে। এ নামাযসমূহে একবার পাঁচ-সাত মিনিটের বেশী সময় অতিবাহিত হয় না। পাঁচ মিনিট এখন, আর পাঁচ মিনিট তখন এভাবে আল্লাহকে স্মরণ করা ফরয করে দেয়ার অর্থ এই যে, অন্ততপক্ষে এতটুকু সময়ের জন্য তো মুসলমানকে আল্লাহর স্মরণের কাজে আত্মনিমগ্ন হতেই হবে। তারপর তারা নিজ নিজ কাজ করে যাবে এবং সেই অবস্থায়ও আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকবে।

ইসলামে যাকাতের ঠিক এ অবস্থা। এখানেও একটি বিশেষ হুকুম এবং একটি সাধারণ হুকুম রয়েছে। একদিকে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, কৃপণতা ও মনের সংকীর্ণতা থেকে দূরে থাক, কারণ এটাই সকল অনর্থের মূল এবং সকল বিপর্যয়ের উৎস। তোমাদের নৈতিক জীবনে আল্লাহর রং ধারণ কর। কারণ তিনি প্রতিটি মুহূর্তে গোটা সৃষ্টিজগতের ওপর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষণ করে থাকেন, যদিও তাঁর ওপর কারো বিশেষ কোনো অধিকার বা দাবী নেই। আবার বলা হয়েছে, আল্লাহর রাস্তায় যত এবং যা কিছুই খরচ করতে পার, তা করতে থাক, নিজেদের প্রয়োজন পূর্ণ করে যা উদ্ধৃত্ত রাখতে পার রাখ এবং আল্লাহর অন্যান্য অভাবগ্রস্ত বান্দাদের প্রয়োজন মিটাবার জন্য যত পার দান কর। দীনের খেদমত এবং আল্লাহর কালেমা প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে জান-মাল দিয়ে চেষ্টা করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হইও না। আল্লাহর প্রতি যদি তোমার ভালবাসা থাকে, তবে ধন-সম্পত্তির প্রেমকে সে জন্য উৎসর্গ কর।

আল্লাহর পথে অর্থ দান করার জন্য এটা সাধারণ হুকুম। কিন্তু সেই সাথে বিশেষ নির্দেশ এই যে, এত পরিমাণ অর্থ তোমাদের কাছে সঞ্চিত হলে তা থেকে কমপক্ষে এত পরিমাণ অবশ্যই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে। তোমাদের ক্ষেতে এত পরিমাণ ফসল হলে তা থেকে এত পরিমাণ আল্লাহর পথে অবশ্যই দান করবে। নির্দিষ্ট কয়েক রাকাআত মাত্র নামায ফরয করার অর্থ যেমন এই নয় যে, ঐ কয় রাকাআত মাত্র আদায় করলেই আল্লাহকে স্মরণ করার কর্তব্য সম্পন্ন হয়ে গেল, অতএব তা ভিন্ন অন্যান্য সময় আল্লাহকে ভুলে যেতে পারবে। অনুরূপভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় দান করা যে ফরয করা হয়েছে, তার অর্থও এটা নয় যে, যাদের কাছে এত পরিমাণ অর্থ আছে কেবল তারাই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করত বাধ্য। আর যারা তদপেক্ষা কম অর্থের মালিক, তাদের মুঠি বন্ধ করে রাখবে। এমনকি, তার অর্থ এটাও নয় যে, ধনীদের ওপর যে পরিমাণ যাকাত ফরয হয়েছে, তারা কেবল সেই পরিমাণ অর্থ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করেই নিষ্কৃতি পেয়ে যাবে, অতপর কোনো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি আসলে তাকে তাড়িয়ে দেবে-দীন ইসলামের কোনো বৃহত্তর কাজের তাগীদ আসলে বলবে, একমাত্র যাকাতই আমার প্রতি ফরয হয়েছিল, আমি তা আদায় করেছি। অতএব এখন আর আমার কাছে কিছুই পেতে পারে না। বস্তুত যাকাত ফরয করার অর্থ মোটেই এটা নয়। যাকাত ফরয করার প্রকৃত তাৎপর্য এই যে, প্রত্যেক ধনী ব্যক্তি অন্ততপক্ষে এ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অবশ্যই আল্লাহর পথে খরচ করতে বাধ্য। আর তার অধিক ব্যয় করার সামর্থ্য থাকলে তাও তাকে অবশ্যই করতে হবে।

আল্লাহর রাস্তায় অর্থ খরচ করার সাধারণ হুকুম এবং তার বিশ্লেষণ এখানে করা যাচ্ছে:

কুরআন মজীদ কোন কাজের নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে তার অন্তনির্হিত যৌক্তিকতাও স্পষ্ট করে বলে দেয়। এটা কুরআন মজীদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর সাহায্যে মানুষ আল্লাহর আদেশের মূল লক্ষ্যে ও যৌক্তিকতা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে।

কুরআন মজীদের শুরুতে যে আয়াতটি চোখে পড়ে তা এই:

ذَلِكَ الْكِتبُ لاَرَيْبَ فِيْه هُدًى لِّلْمُتَّقِيْنَ ـ الَّذِيْنَ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيْمُوْنَ الصَّلوةَ وَمِمَّا رَزَقْنهُمْ يُنْفِقُوْنَ ـ البقرة : ٢-٣

“এ কুরআন আল্লাহর কিতাব, এতে কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। এটা সেই সব সত্যনিষ্ঠ মুত্তাকী লোকদেরকে সত্য পথের সন্ধান করে দেয়, যারা অদৃশ্যে বিশ্বাসী, নামায কায়েম করে এবং আমার দেয়া জীবিকা থেকে (আমার পথে) খরচ করে।”- সূরা আল বাকারা : ২-৩

এ আয়াতে একটি মূলনীতি বলে দেয়া হয়েছে। পার্থিব জীবনে সোজা পথে চলার জন্য তিনটি জিনিস অপরিহার্য। প্রথম, ঈমান বিল গায়েব অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন: দ্বিতীয়, নামায কায়েম করা এবং তৃতীয়, আল্লাহ তাআলা যে রিযক দান করেছেন, তা থেকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা। অন্যত্র বলা হয়েছে:

لَنْ تَنَالُوْا الْبِرَّ حَتّى تُنْفِقُوْنَ مِمَّا تَحِبُّوْنَ ـ ال عمران : ٩٢

“তোমাদের প্রিয় জিনিসগুলো আল্লাহর পথে অকাতরে খরচ না করা পর্যন্ত পুণ্যশীলতার উচ্চ মর্যাদা তোমরা কিছুতেই লাভ করতে পারো না।”

আবার বলা হয়েছে:

اَلْشَّيْطنُ يَعِدُكُمْ الْفَقْرَ وَيَامُرُكُمْ بِالْفَحْشَآَءِ ـ البقرة : ٢٦٨

“টাকা-পয়সা খরচ করলে শয়তান তোমাদেরকে গরীব হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায় এবং তোমাদেরকে লজ্জাকর কাজ-কৃপণতার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।”

এরপর ইরশাদ করা হয়েছে:

وَاَنْفِقُوْا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَلاَ تُلْقُوْا بِاَيْدِيْكُمْ اِلَى التَّهْلُكَةِ ـ ١٩٥

“আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর এবং নিজের হাতেই নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না (আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করলেই নিজকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা হয়)।”- সূরা আল বাকারা : ১৯৫

সর্বশেষ বলা হয়েছে:

وَمَنْ يُّوْقَ شُحَّ نَفْسِه فَاُوْلَئْكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ ـ الحشر : ٩

“মনের সংকীর্ণতা হতে যারা বাঁচতে পারবে তাঁরাই পরম কল্যাণ লাভ করবে।”- সূরা আল হাশর : ৯

উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে পরিষ্কার জানতে পারা যায় যে, দুনিয়ায় মানুষের জীবন যাপনের দুটি মাত্র পথ বিদ্যমান। একটি আল্লাহর পথ-যার পরিণামে চিরন্তন সুখ শান্তি এবং পরম কল্যাণ রয়েছে। এ পথে মানুষের দিল উদার-উন্মুক্ত হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। আল্লাহ তাকে কম কিংবা বেশী যে পরিমাণ রিযকই দান করেছেন, তা থেকে সে নিজের যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করবে, অন্যান্য ভাইদেরকেও যথাসম্ভব সাহায্য করবে এবং আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করা বা আল্লাহর দ্বীন ইসলামকে কায়েম করার কাজেও ব্যয় করবে। অপরটি হচ্ছে শয়তানের পথ। এ পথে বাহ্য দৃষ্টিতে মানুষ খুব আনন্দ এবং সুখ দেখতে পায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ পথে ধ্বংস এবং বিপর্যয় ভিন্ন আর কিছুই নেই। এ পথে স্বাভাবিকভাবেই অর্থ-সম্পদ শোষণ করে সঞ্চয় করতে চেষ্টা করে এবং অর্থের জন্য মন ও প্রাণ দিতেও কুন্ঠিত হয় না। আর তা করতেও প্রস্তত হয় না। একান্তই যদি খরচ করে, তবে তা কেবল নিজের প্রয়োজন এবং নিজের মনের লালসা চরিতার্থ করার জন্য মাত্র।

আল্লাহর পথের যাত্রীদেরকে আল্লাহর রাস্তায় ধন-সম্পদ খরচ করার যে নিয়ম ও পন্থা বলে দেয়া হয়েছে, এখানে ধারাবাহিকভাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে:

এক: সর্বপ্রথম কথা এই যে, কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই খরচ করবে, কারো প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করা বা দুনিয়ায় নাম ও খ্যাতি লাভ করার জন্য খরচ করবে না।

وَمَا تُنْفِقُوْنَ اِلاَّ اِبْتِغَاءَ وَجْهِ اللهِ ـ البقرة : ٢٧٢

“তোমরা যা কিছু খরচ কর, তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ছাড়া তোমাদের যেন আর কিছুই লক্ষ্য না থাকে।”

يَآ يُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا لاَتُبْطِلُوْا صَدَقتِكُمْ بِالْمَنِّ وَاَلاَذى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهُ وِئَآءَ النَّاسِ وَلاَيُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيُوْمِ الاخِرِ فَمَثَلُه’ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَاصَابَه وَابِلٌ فَتَرَكَاهُ صَلْدًا البقرة : ٢٦٤

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের দান-খয়রাতকে অনুগ্রহ প্রকাশ করে এবং মন:কষ্ট দিয়ে সেই ব্যক্তির ন্যায় কষ্ট দিও না-যে ব্যক্তি কেবল পরকে দেখাবার জন্য খরচ করে এবং আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে না। তার দান-খয়রাত ঠিক তেমনি যেমন একটি প্রস্তর খন্ডের ওপরে মাটি পড়ে আছে, এমতাবস্থায় তার ওপর যদি প্রবল বৃষ্টিপাত হয় তবে সমস্ত মাটিই ধুয়ে-মুছে প্রস্তর খণ্ডটি একেবারে ছাফ ও মাটিহীন হয়ে যাবে।”- সূরা আল বাকারা : ২৬৪

দুই : কাউকে কিছু দান করলে তার কাছে অনুগ্রহ প্রকাশ করতে পারবে না এবং এমন কোনো কাজ করতে পারবে না যাতে তার মনে কিছু মাত্র কষ্ট লাগতে পারে:

اَلَّذِيْنَ يُنْفِقُوْنَ اَمْوَالَهُمْ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ ثُمَّ لاَيُتْبِعُوْنَ مَآاَنْفَقُوْا مَنَّا وَّلاَ اَذّى لَّهُمْ اَجْرَهُمْ عِنْدَ رَبَّهِمْ وَلاَ خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلاَهُمْ يَحْزَنُوْنَ ـ قَوْلٌ مَعْرُوْفٌ وَّمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِنْ صَدَقَةَ يَّتْبَعُهَآ اّذّى : البقرة : ١٦٢-١٦٣

“আল্লাহর পথে যারা খরচ করে এবং খরচ করার পর নিজের অনুগ্রহ প্রকাশ করে না এবং কাউকে মন:কষ্ট দেয় না, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে বড়ই সওয়াব আছে এবং কোনো প্রকার ভয় ও ক্ষতির আশংকা তাদের নেই। কিন্তু যেসব দানের পর কষ্ট দেয়া হয় সেসব দান অপেক্ষা প্রার্থীকে নম্রতার সাথে ফিরিয়ে দেয়া এবং ‘ভাই’, ক্ষমা কর’ বলে বিদায় করাই উত্তম।”- সূরা আল বাকারা : ২৬২-২৬৩

তিন: আল্লাহর পথে সবসময়ই ভালো জিনিস দান করা উচিত। বেছে বেছে কেবল খারাপটাই যেন দেয়া না হয়। গরীবকে দেয়ার জন্য যারা ছিন্ন জামা-কাপড় তালাশ করে এবং কোনো দরিদ্রকে খাওয়াবার জন্য নিকৃষ্টতর খাদ্য প্রদান করে, আল্লাহর কাছ থেকে তারা অনুরূপ নিকৃষ্ট ফলই পাবে:

يَآيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا مِنْ طَيِّبَةُ مِنْ طَيّبِتِ مَاكَسَبَتُمْ وَمِمَّآ اَخْرَجْنَا لَكُمْ مِّنْ الاَرْضِ وَلاَ تَيْمَّمُوْا الْخَبِيْثَ مِنْهُ تُنْفِقُوْنَ ـ البقرة : ١٦٧

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা উপার্জন করেছ এবং আমরা তোমাদের জন্য মাটির বুক থেকে যা নির্গত ও উৎপন্ন করেছি, তা থেকে ভালো ভালো জিনিস আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর-আল্লাহর পথে খরচ করার জন্য নিকৃষ্ট মাল তালাশ করে ফিরো না।”- সূরা আল বাকারা : ২৬৭

চার : যতদূর সম্ভব আল্লাহর রাস্তায় গোপনভাবেই খরচ করতে হবে, লোক দেখানোর বিন্দুমাত্র ভাব যেন তাতে স্থান না পায়। প্রকাশ্যভাবে খরচ করায় যদিও দোষের কিছু নেই কিন্তু তবুও গোপনে খরচ করা উত্তম।

اِنْ تُبْدُوْا الصَّدَقتِ فَنْعِمًا هِىَ وَاِنْ تُخْفُوْنَ وَتُؤْتُوْهَا الْفُقَرَاءَ فُهُمْ خَيْرَ لَّكُمْ وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيَّاتِكُمْ ـ البقرة: ١٧١

“প্রকাশ্যভাবে খরচ করলে তা ভালো: কিন্তু লুকিয়ে গরীবদের দান করলে তোমাদের পক্ষে অতি ভালো এবং তাতে তোমাদের গুনাহ দূর হয়ে যাবে।”- সূরা আল বাকারা : ২৭১

পাঁচ : নির্বোধ ও অজ্ঞ লোকদেরকে তাদের প্রয়োজনতিরিক্ত সম্পদ কখনও দেয়া যাবে না। কারণ অধিক অর্থ পেয়ে তাদের বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়ার এবং তাদের হাতে সম্পদ নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছা এটা যে, খাদ্য ও বস্ত্র সকল মানুষকেই দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, সে যত বড় পাপী আর আল্লাহদ্রোহী হোক না কেন। কিন্তু মদপান, গাঁজা, আফিম খাওয়া এবং জুয়া খেলার জন্য কাউকে এক পয়সাও দেয়া যেতে পারে না।

وَلاَ تُؤْتُوْا السُّفَهَآَءَ اَمْوَالَكُمْ الَّتِىْ جَعَلَ اللهُ لَكُمْ قِيْمًا وَّارزٌقُوْهُمْ فِيْهَا وَاكْسُوْهُمْ ـ النساء : ٥

“তোমাদের ধন-সম্পত্তিকে আল্লাহ তাআলা জীবনযাপনের উপায় করে দিয়েছেন, কাজেই তা কখনও অজ্ঞ-মূর্খতার হাতে ছেড়ে দিও না। অবশ্য তা দ্বারা তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করে দিতে হবে।”

ছয় : কারো প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য তাকে ধার দেয়া হলে বার বার তাগাদা করে তাকে বিরক্ত করো না। তা আদায় করার জন্য তাকে যথেষ্ট অবকাশ দিতে হবে। আর তা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে তার অক্ষমতা যদি নিসন্দেহে জানা যায় এবং ঋণদাতারও যদি ক্ষমা করার মতো সঙ্গতি থাকে, তবে তাকে মাফ করে দেয়াই বাঞ্ছনীয়ঃ

وَاِنْ كَانَ ذُوْ عَسْرَةً فَنَظِرَةٌ اِلى مَيْسَرَةٍ وَاَنْ تَصَدَّقُوْا خَيْرَ لٌكُمْ اِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ ـ البقرة : ٢٨٠

“ঋণী ব্যক্তির আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। আর তাকে ক্ষমা করে দেয়া আরও ভালো—অবশ্য যদি তোমরা এর স্বার্থপরতা বুঝতে পার।”- সূরা আল বাকারাঃ ২৮০

সাতঃ  মানুষকে দান করারও একটা সীম আছে। সেই সীমা কখনও লংঘন করা যেতে পারে না। নিজেকে এবং নিজের সন্তান-সন্তুতিকে বঞ্চিত করে পরকে দান কারার আদেশ আল্লাহ তাআলা করেননি-তাঁর উদ্দেশ্যও তা নয়। আল্লাহর ইচ্ছা এই যে, সহজ ও সাধারণভাবে জীবনযাপনের জন্য যা কিছুর প্রয়োজন হবে তা তো খরচ করতেই হবে, তারপরে যা উদ্বৃত্ত থাকবে তা হতেই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবে:

وَيَسْئَلُوْنَكَ مَاذَا يُنْفِقُوْنَ قُلِ الْعَفْوَ ـ البقرة : ٢١٩

“তারা জিজ্ঞেস করে: কি খরচ করবো? (হে নবী! আপনি) বলে দিন যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা তাই খরচ করবে।”- সূরা বাকারা: ২১৯

وَاَلَّذِيْنَ اِذَا اَنْفَقُوْآ لَمْ يُسْرِفُوْا وَلَمْ يُقتُرُوْا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا ـ الفرقان : ٦٧

“আল্লাহর নেক বান্দাহ তারাই-যারা খরচ করে; কিন্তু অনর্থক খরচ করে না এবং খুব বেশী কার্পণ্যও করে না। বরং এ দু প্রান্তসীমার মধ্যবর্তী পন্থাই হয় তাদের আদর্শ।” সূরা আল ফুরকান : ৬৭

وَلاَ تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُوْلَةً اِلى عُنُقِكَ وَلاَ تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُوْمًا مَّحْسُوْرًا ـ بنى اسرايل : 29

“তোমাদের (দানের) হাত গুটিয়ে একেবারে গলার সাথে বেঁধে নিও না এবং তা বেশী ছড়িয়েও দিও না, কারণ তার ফলে তোমাকে অনুতপ্ত এবং লোকদের কাছে তিরস্কৃত হতে হবে।” সূরা বনী ঈসরাঈল : ২৯

আট : এ দানের উপযুক্ত পাত্র কে? সর্বশেষে একথাও জেনে নেয়া আবশ্যক। তার এক পূর্ণ তালিকাও আল্লাহ তাআলা পাক কালামে পেশ করেছেন। কে কে আপনার সাহায্য পেতে পারে এবং আপনার উপার্জনে আল্লাহর তরফ থেকে কার কার অধিকার নির্ধারিত হয়েছে, এ তালিকা দৃষ্টে তা পরিষ্কাররূপে বুঝতে পারা যায়।

وَاتِ ذَا الْقُرْبى حَقَّهُ وَالْمِسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ ـ بنى اسرائيل : ٢٦

“গরীব নিকটাত্মীয়দেরকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং মিসকীন ও গরীব প্রবাসীকেও।”- সূরা বনি ঈসরাঈল :২৬

وَاتِ الْماَلَ عَلى جُيَِه ذَوِى الْقُرْبى وَالْيَتَمى وَالْمَسْكِيْنَ وَابْنَ السَّبِيْلِ وَالسًَّآئِلِيْنَ وَفِىْ الرِّقَابِ ـ البقرة : ١٧٧

“তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যারা নিকাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, পথিক ও প্রার্থীকে এবং দাস ও কয়েদীদের মুক্তি বিধানের জন্য অর্থ দান করে, তারা আল্লাহর প্রিয়।”- সূরা আল বাকারা : ১৭৭

وَّبِالْوَالِدَيْنِ اَحْسَانًا وَّبِذِى القُرْبى وَالْيَتمى وَالْمَسكِيْنَ وَالْجَارِذِى الْقُرْبِى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيْلِ وَمَا مَلَكَتْ اَيْمَانُكُمْ ـ النساء : ٣٦

“নিজের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, আত্মীয় প্রতিবেশী ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, চলার সাথী, প্রবাসী এবং নিজের দাস-দাসীদের সাথে ভাল ব্যবহার কর।” সূরা আন নিসা : ৩৬

وَيُطْعِمُوْنَ الطّعَامَ عَلى حُبِّه مِسْكِيْنًا وَّيَتِيْمًا اِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْه الله لاَنُرِيْدُ مِنْكُمْ جَزَآءً وَّلاَ شُكُوْرًا ـ اِنَّا نَخَافُ مِنْ رَّبِّنَا يُوْمًا عَبُوْسًا قَمْطَرِيْرًا ـ الدهر : ٨ – ١٠

“আল্লাহর নেক বান্দাহগণ ইয়াতীম, মিসকীন এবং কয়েদীকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রেম লাভ করার উদ্দেশ্যে খাদ্যদান করে। তারা বলে যে,আমরা তোমাদেরকে শুধু আল্লাহর জন্য খানা খাইয়ে থাকি। আমরা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় ও কৃতজ্ঞতা চাই না। আমরা কেবল আল্লাহর কাছে সেই দিনেরই ভয় করছি, যে দিনের কঠিন বিপদে মানুষের মুখ শুকিয়ে যাবে এবং কপালে ভাঁজ পড়ে যাবে।”- সূরা আদ দাহর : ৮-১০

وَفِىْ اَمْوَالِهِمْ حَقٌ لِّلْسَّآئِلِ وَالْمَحْرُوْمِ ـ الذّريت : ١٩

“এবং তার ধন-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিত জনের অধিকার রয়েছে।”

لِلْفُقَرَآءِ الَّذِيْنَ اُحْصِرُوْا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ لاَيَسْتَطِيْعُوْنَ ضَرْبًا فِىْ الاَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ اَغْنِيَآءَ مِنَ التَّعَفُّفْ تَعْرِفُهُمْ بِسْيْمهُمْ لاَيَسْئَلُوْنَ النَّاسَ اِلْحَافًأ وَمَا تُنْفِقُوْا مِنْ خِيْرِ فَاِنَّ اللهَ بِه عَلِيْمٌ ـ

“যারা সকল সময়ে আল্লাহর কাজে লিপ্ত থাকে বলে নিজেদের জীবিকা উপার্জনের জন্য কোনো কাজ করতে পারে না, দান-খয়রাত তাদেরই প্রাপ্য। তাদের আত্মসম্মান জ্ঞান দেখে অন্তত মূর্খ লোকেরা তাদেরকে ধনী বলে মনে করে। কিন্তু তোমরা তাদের বেশ ও রূপ দেখেই বুঝতে পার, তারা কতো কষ্ট করছে। তোমাদের নিজেদেরই অগ্রসর হয়ে তাদের দান করা উচিত। কারণ, তারা মানুষকে জড়িয়ে ধরে সাহায্য চাওয়ার মত লোক নয়, গোপনভাবে তোমরা তাদেরকে যা কিছু দেবে আল্লাহ তা নিশ্চয় জানাবেন এবং তিনি তার বিনিময় নিশ্চয়ই দেবেন।” সূরা আল বাকারা : ২৭৩

যাকাত আদায়ের নিয়ম
পূর্বের প্রবন্ধে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার সাধারণ হুকুম বিবৃত হয়েছে। এখন যাকাত প্রসংগে যাবতীয় হুকুম বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।

যাকাত সম্পর্কে কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা তিন স্থানে ভিন্ন ভিন্নভাবে হুকুম দিয়েছেন। সূরা আল বাকারায় বলা হয়েছে:

اِنْفِقُوْا مِنْ طَيِّبتِ مَاكَسَبْتُمْ وَمِمَّا اَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الارْضِ ـ

“তোমরা নিজেরা যে পবিত্র ধন-সম্পদ উপার্জন করছেো এবং জমি থেকে যে ফসল আমি তোমাদের দান করেছি-এসব কিছু থেকে তোমরা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো।”- সূরা আল বাকারা : ২৬৭।

সূরা আল আনআমেও এ প্রসংগে বলা হয়েছে যে, আমিই তোমাদের জন্য যমীনে বাগিচা এবং ক্ষেত-খামার তৈরি করেছি। অতএব: ১৪১

كَلُوْ مِنْ ثَمَرِه اَثْمَرَ وَاتُوْا حَقَّه يَوْمَ حَصَادِه ـ الانعَام ـ ١٤١

“(বাগান এবং ক্ষেতে) যখন ফল বা ফসল ফলবে তখন তোমরা তা থেকে নিজেদের খাবার সংগ্রহ কর এবং ফল বা ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর প্রাপ্য আদায় করো।”- সূরা আল আনআম: ১৪১

এ উভয় আয়াতেই জমির ফসলের যাকাত সম্পর্কে বলা হয়েছে। হানাফী মাযহাবের ফিকাহ শাস্ত্রবিদগগণের মতে প্রাকৃতিক সম্পদ-কাঠ, ঘাস এবং বাঁশ ইত্যাদি ভিন্ন সকল প্রকার শস্য তরকারী ও ফলে আল্লাহর পাওনা রয়েছে এবং তা অবশ্যই আদায় করতে হবে। হাদীস শরীফে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, বৃষ্টি, নদী ও সমুদ্রের পানি থেকে যেসব ফসল জন্মে তাতে মোট ফসলের এক-দশমাংস আল্লাহর প্রাপ্য এবং যে জমিতে মানুষকে কৃত্রিম উপায়ে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে হয়েছে তাতে আল্লাহর অংশ নির্ধারিত হয়েছে মোট ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ। এ উভয় প্রকার অংশই শস্য কর্তনের সাথে সাথেই আদায় করা ওয়াজিব।

এর পর সূরা তাওবায় বলা হয়েছে:

وَالَّذِيْنَ يَكْنِزُوْنَ الْذِّهَبَ وَالْفِصَّةَ وَلاَ يُنْفِقُوْنَهَا فِىْ سَبِيْلِ اللهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ اَلَيْمٍ ـ يَّوْمَ يَحْمى عَلَيْهَا فِىْ نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوْى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوْبُهُمْ وَظُهُوْرُهُمْ هَذّا مَاكَنَزْتُمْ لاَنْفُسِكُمْ فَذُوْقُوْا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُوْنَ ـ التوبة : ٣٤-٣٥

“যারা সোনা ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা থেকে আল্লাহর রাস্তায় মোটেই খরচ করে না, তাদেরকে কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দাও। সেই দিনের আযাবের কথা জানিয়ে দাও যেদিন সোনা ও রূপা আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের ললাটে, পাঁজরে ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। আর তাদেরকে বলা হবে যে, এটাই হচ্ছে তোমাদের নিজেদের জন্য সঞ্চিত সেই ধন-সম্পদ। তোমরা যা কিছু সঞ্চয় করেছিলে এখন তারই স্বাদ গ্রহণ করো।”- সূরা আত তাওবা : ৩৪-৩৫

অতপর বলা হয়েছে:

اِنًَّمَا الصَّدَقتُ لِلْفُقََرَآءِ وَالْمَسْكِيْنَ وَالْعمِلِيْنَ عَلَيْهَا وَالْمُؤْلَّفَةِ قُلُوْبُهُمْ وَفِىْ الرَّقَابِ وَالْغَارِمِيْنَ وَفِىْ سَبِيْلِ اللهِ وَاَبْنِ السَّبيْلِ فَرِيْضضةٌ مِّنْ اللهِ ـ التوبة : ٦٠

“যাকাত আল্লাহর নির্ধারিত ফরয। এটা দেয়া হবে ফকীর, মিসকীন এবং যাকাত উসুলকারী কর্মচারীদেরকে, ভিন্ন ধর্মের লোকদের মন জয় করা, দাসত্ব শৃংখলে আবদ্ধ লোকদের মুক্তির ব্যবস্থা করা, ঋণী লোকদের ঋণ শোধ করা, আল্লাহ নির্ধারিত সার্বজনীন কাজে এবং নি:স্ব পথিকদের সাহায্যার্থেও এটা খরচ করা হবে।”- সূরা আত তাওবা : ৬০

এরপর আল্লাহ বলেছেন:

خَذُ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تَطَهِّرُهُمْ وَتُزْكِّهِمْ : التورة : ١٠٣

“তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত উসুল করে তাদেরকে পবিত্র এবং পরিচ্ছন্ন করে দাও।” সূরা আত তাওবা : ১০৩

উল্লেখিত তিনটি আয়াত থেকেই জানা যায় যে, যেসব সম্পদ সঞ্চয় করা হবে এবং পরিমাণে বৃদ্ধি করা হবে তা থেকে যদি আল্লাহর পথে খরচ করা না হয়, তবে তা নাপাক হবে, তা পবিত্র করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তা থেকে আল্লাহর প্রাপ্য অংশ উপযুক্ত লোকদের মধ্যে বন্টন করা। হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, সোনা ও রূপা সঞ্চয়কারীদের সম্পর্কে যখন এ আযাবের সংবাদ আসলো, তখন মুসলমান জনসাধারণ অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ এ আয়াতে অনুসারে তারা মনে করেছিল যে, কারো কাছে এক পয়সাও জমা রাখা অন্যায়, সব খরচ করে দিতে হবে। অবশেষে হযরত উমর ফারুক (রা) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হয়ে মুসলমানদের এ উৎকণ্ঠার কথা জানালেন। হযরত রাসূল (সা) উত্তরে এরশাদ করলেন: ‘আল্লাহ তোমাদের প্রতি যাকাত এজন্যই ফরয করেছেন যে, তা আদায় করলে অবশিষ্ট ধন তোমাদের জন্য পবিত্র ও হালাল হয়ে যাবে।’ হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা) থেকেও এরূপ একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূলে পাক (সা) বলেছেন, তোমার মাল থেকে যখন যাকাত আদায় করে দিলে, তখন তোমার প্রতি যা অবশ্য কর্তব্য (ওয়াজিব) ছিল তা তুমি আদায় করলে।

উল্লেখিত আয়াত থেকে শুধু সোনা-রূপার যাকাতের নির্দেশ জানতে পারা যায়; কিন্তু হাদীস থেকে জানা যায় যে, ব্যবসায়ের পণ্য, উট, গরু-ছাগলেরও যাকাত আদায় করতে হবে। রূপার সাড়ে বায়ান্ন তোলায় এবং স্বর্ণের সাড়ে সাত তোলায় যাকাত ফরয হয়। চল্লিশটি ছাগল এবং ত্রিশটি গরুতে যাকাত দিতে হবে এবং ব্যবসায়ের পণ্যের মূ্ল্যে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূ্ল্যের সমান হলে যাকাত দিতে হবে। অর্থাৎ এ নির্দিষ্ট পরিমাণ যার কাছে বর্তমান থাকবে এবং এভাবে তার একটি বছর সময় অতীত হবে, তাকে এ চল্লিশ ভাগের একভাগ যাকাত বাবদ আদায় করতে হবে। হানাফী মাযহাবের ইমামগণ বলেছেন যে, আলাদা আলাদাভাবে সোনা ও রূপার যাকাত ফরয হওয়ার নির্দিষ্ট পরিমাণ যদি বর্তমান না থাকে, কিন্তু দুটিরই সমষ্টিগত মূল্যে যাকাতের পরিমাণ(নেসাব) পর্যন্ত পৌছে তবে তা থেকেও যাকাত আদায় করতে হবে।

হযরত উমর ও ইবনে মাসউদ (রা) এর মতে সোনা রূপার অলংকারের যাকাত আদায় করা ফরয। ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহহি আলাইহহিও এ মত-ই গ্রহণ করেছন। হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, রাসূলে (সা) দুজন স্ত্রীলোকের হাতে স্বর্ণের কংকন দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা যাকাত আদায় করে কিনা। একজন উত্তরে বললো-না। হযরত (সা) বললেন, আজ যাকাত আদায় না করলে কিয়ামতের দিন তোমার হাতে আগুনের কংকন পরতে তুমি রাজী হবে কি? হযরত উম্মে সালমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁর কাছে ‘পাঁজেব’ নামক এক প্রকার স্বর্ণের অলংকার ছিল। তিনি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এটা কি সঞ্চিত ধনের শামিল? হযরত রাসূল (সা) বললেন, এর পরিমাণের ওপর যদি যাকাত ফরয হয় আর তা থেকে যাকাত আদায় করা হয়; তবে ওটা নিষিদ্ধ সঞ্চয় নয়। এ উভয় হাদীস থেকে জানা যায় যে, সোনা-রূপার অলংকার হলেও তাতে যাকাত ফরয হবে – যেমন মওজুদ সোনা-রূপার ওপর ফরয হয়। অবশ্য হীরা-জহরত বা আংটির কারুকার্যের জন্য যাকাত দিতে হয় না।

কালামে পাকে যাকাত পাবার যোগ্য আট শ্রেণীর লোকের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এখানে তাদের বিবরণ দেয়া হচ্ছে:

গরীব:
যাদের কাছে কিছু না কিছু ধন-সম্পদ আছে কিন্তু তা তাদের যাবতীয় প্রয়োজেন পূর্ণ করার পক্ষে যথেষ্ট নয়, খুবই টানাটানির ভেতর দিয়ে যাদের জীবন অতিবাহিত হয়, তদুপরি কারো কাছে কিছু চাইতেও পারে না, এরা গরীব। ইমাম জুহুরী, ইমাম আবু হানীফা, ইবনে আব্বাস, হাসান বসরী, আবুল হাসান করখী এবং অন্যান্য ফকীহগণ এদেরকেই ফকীর বা গরীব বলে অভিহিত করেছেন।

মিসকীন:
যেসব লোকের অবস্থা আরও খারাপ, পরের কাছে হাত পাততে বাধ্য হয়, নিজের পেটের অন্নও যারা যোগাড় করতে পারে না তারা মিসকীন। যারা সক্ষম কিন্তু বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকেও মিসকীনদের মধ্যে গণ্য করেছেন।

যাকাত বিভাগের কর্মচারী: ইসলামী রাষ্ট্র যাকাত আদায়ের জন্য যাদেরকে কর্মচারী নিযুক্ত করবে, তাদেরকেও যাকাতের অর্থ থেকেই বেতন দেয়া হবে।

যাদের মন রক্ষা করতে হয় :
ইসলামের সহায়তার জন্য কিংবা ইসলামের বিরোধিতা বন্ধ করার জন্য যাদেরকে টাকা দেয়ার প্রয়োজন তারা এর অন্তর্ভূক্ত। সেই সকল নও-মুসলিমও এর অন্তর্ভূক্ত যাদেরকে সমস্যা মুক্ত করা একান্ত অপরিহার্য। নও-মুসলিমগন অমুসলিম জাতির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে মুসলমানদের সাথে মিলিত হবার কারণে বেকার সমস্যা বা আর্থিক অনটনে পড়ে গেলে তাদের সাহায্য করা মুসলমানদের একটি জাতীয় কর্তব্য। এমনকি তারা ধনী হলেও তাদেরকে যাকাত দেয়া উচিত। এতে তারা ইসলামের ওপর অধিকতর আস্থাবান হবে। হোনাইনের যুদ্ধে জয়ের পর হযরত নবী করীম (সা) নও-মুসলিমদের গনীমতের বহু সম্পদ দান করেছেন। ফলে প্রত্যেক ব্যক্তির ভাগে একশ উট পড়েছিল। আনসারগণ এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘এরা সম্প্রতি ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে আমি তাদেরকে খুশী করতে চাই।’ এ হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম জুহুরী বলেছেন, যেসব ইয়াহুদী-খৃষ্টান মুসলমান হবে বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী ইসলাম কবুল করবে, তারা ধনী হলেও তাদের যাকাত দেয়া হবে।১

গোলাম ও কয়েদীদের মুক্তি বিধান:
যে ব্যক্তি দাসত্ব শৃংখলে বন্দী হয়ে আছে এবং যে মুক্তি পেতে চায়, তাকেও যাকাতের অর্থ দেয়া যায়। উক্ত অর্থের বিনিময়ে সে মালিকের দাসত্ব শৃংখলা থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেবে। বর্তমান যুগে দাস প্রথার প্রচলন নেই। তাই আমি মনে করি যেসব লোক কোন ব্যাপারে জরিমানা আদায় করতে অক্ষম বলে কয়েদ ভুগতে বাধ্য হয়, যাকাতের অর্থ দিয়ে তাদের মুক্তি বিধান করা যেতে পারে-করলে তাও এ বিভাগই গণ্য।

ঋণী ব্যক্তির ঋণ শোধ :
যেসব লোক ঋণী অথবা ঋণ আদায় করার সম্বল যাদের নেই, তাদেরকেও যাকাতের টাকা দ্বারা ঋণ ভার থেকে মুক্তি দেয়া যাবে। কিন্তু তাই বলে একজনের কাছে হাজার টাকা থাকলেও সে যদি একশ টাকার ঋণ হয় তাহলে তাকে কিছুতেই যাকাত দেয়া যাবে না। তবে যে ব্যক্তির ঋণ শোধ করার পর যাকাত ফরয হতে পারে, এপরিমাণ অর্থ যদি তার কাছে না থাকে তবে তাকে যাকাত দেয়া যেতে পারে। ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ এটাও বলেছেন যে, যারা অপচয় এবং বিলাসিতা ও কু-কাজ করে ঋণী হয়, তাদেরকে যাকাত দেয়া মাকরূহ। কারণ এমতাবস্থায় তাদেরকে যাকাত দিলে সে ধন-সম্পদের আরও অপচয় করবে এবং যাকাত নিয়ে ঋণ শোধ করার ভরসায় সে আরও অধিক ঋণ গ্রহণ করবে।

আল্লাহর পথে :
আল্লাহর পথে শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। মুসলমানদের সমস্ত নেক কাজেই যাকাতের টাকা ব্যয় করা যেতে পারে। কিন্তু বিশেষ করে এর অর্থ হচ্ছে-আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের সাহায্য করা। নবী করীম (সা) বলেছেন যে, ধনী ব্যক্তির পক্ষে যাকাত গ্রহণ জায়েয নয় কিন্তু ধনী ব্যক্তিই যদি জিহাদের জন্য সাহায্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, তবে তাকেও যাকাত দিতে হবে: কারণ এই যে, এক ব্যক্তি ধনী হতে পারে ; কিন্তু জিহাদের জন্য যে বিরাট ব্যয় আবশ্যক, তা সে শুধু নিজের অর্থ দ্বারা পূরণ করতে পারে না। তার এ কাজের জন্য তাকে যাকাতের টাকা সাহায্য করা যাবে।

১. এ বিষয়ে ইসলামী আইনের বিস্তৃত বিবরণ দেয়া এখানে সম্ভব নয়। এজন্য তাফহীমুল কুরআনের সূরা তাওবা তাফসীর দ্রষ্টব্য।

পথিক-প্রবাসী: পথিক বা প্রবাসীর নিজ বাড়ীতে যত ধন-সম্পদ থাকুক না কেন, কিন্তু পথে বা প্রবাসে সে যদি অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়ে তবে তাকে যাকাতের টাকা দিতে হবে।

এখন প্রশ্ন এই যে, ওপরে যে আট শ্রেণীর লোকের উল্লেখ করা হলো তাদের মধ্যে কাকে কোন অবস্থায় যাকাত দেয়া উচিত আর কোন অবস্থায় না দেয়া কর্তব্য- এ সম্বন্ধে এখানে আলোচনা করা যাচ্ছে:

এক: কোন ব্যক্তি নিজের পিতা বা পুত্রকে যাকাত দিতে পারে না, স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে যাকাত দিতে পারবে না। এ সম্পর্কে ইসলামী শরীয়াতবিদগণ সম্পূর্ণ একমত। কোনো কোনো ফিকাহ শাস্ত্রকার এটাও বলেছেন যে, যেসব নিকটাত্মীয়ের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব তোমার ওপর; যারা শরীয়াত অনুসারে তোমার উত্তরাধীকারী, তুমি তাদেরকে যাকাত দিতে পার না; অবশ্য দূরবর্তী আত্মীয় তোমার যাকাত পাবার অধিকারী হবে। বরং অন্যান্য লোকদের অপেক্ষা তাদের অধিকার বেশী স্বীকৃত হবে। কিন্তু ইমাম আওজায়ী বলেছেন যে, যাকাত দেবার জন্য কেবল নিজের আত্মীয় এগানাই তালাশ করো না।

দুই : যাকাত কেবল মুসলমানই পেতে পারে। অমুসলমানগণ যাকাত পেতে পারে না। যাকাতের সংজ্ঞা সম্পর্কে হাদীসে বলা হয়েছে : تُؤْخَذُ مِنْ اَغْنِيَاءَ كُمْ وَتُرَدُّ عَلى فُقَرَاءَ كُمْ ـ যাকাত তোমাদের ধনীদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে এবং তোমাদের গরীবদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে। অমুসলমান গরীবকে সাধারণ দান-খয়রাত অবশ্যই দেয়া হবে। বরং সাধারণ দানের ক্ষেত্রে মুসলমান-অমুসলমানের মধ্যে পার্থক্য করে মুসলমানকে দেয়া এবং অমুসলামানকে না দেয়া আদৌ সমীচীন নয়।

তিন : ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু ইউছুফ এবং ইমাম মুহাম্মাদ(সা) বলেন যে, প্রত্যেক এলাকার যাকাত সেই এলাকার গরীবদের মধ্যেই বন্টন করতে হবে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাকাতের অর্থ প্রেরণ করা ঠিক নয়। কিন্তু কোনো এলাকায় যাকাত গ্রহণ করার মত লোকই যদি না থাকে কিংবা অন্য এলাকায় যদি এমন কোনো বিপদ এসে পড়ে, যে জন্য দূরবর্তী এলাকা থেকে যাকাতের অর্থ সেখানে প্রেরণ করা অত্যন্ত জরুরী বোধ হয়, যথা-প্লাবন, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি; তবে তদনুযায়ী যাকাত বন্টন করা কোনো দোষের কাজ নয়। ইমাম মালেক ও ইমাম সুফিয়ান সাওরীর মতও প্রায় এরূপ। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাকাত প্রেরণ একেবারেই অসংগত বা নাজায়েয নয়।

চার: কোনো কোনো লোকের মতে যারা দু বেলা খাবার ব্যবস্থা আছে, তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা উচিত নয়। আবার কেউ কেউ বলেছন, যার কাছে দশ টাকা মওজুদ আছে,অন্য একজনের মতে যার কাছে সাড়ে বার টাকা আছে তার যাকাত নেয়া উচিত নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা এবং হানাফী মাযহাবের অন্যান্য আলেমগণ বলেছেন যে, যার কাছে পঞ্চাশ টাকার কম নগদ সম্পত্তি থাকবে সে যাকাত গ্রহণ করতে পারবে। বাড়ী ঘরের জিনিসপত্র এবং ঘোড়া ও চাকর এর মধ্যে গণ্য হবে না। অর্থাৎ এসব দ্রব্যাদি থাকা সত্ত্বেও যার পঞ্চাশ টাকার কম সম্পত্তি আছে, সে যাকাত পেতে পারে। এ ব্যাপারে একটি জিনিস হলো আইন আর অপরটি হলো ফযীলতের মান। এ দুটি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য আছে।

ফযীলতের মান সম্পর্কে হযরত রাসূল (সা) বলেছেন, যার সকাল ও সন্ধ্যার খাদ্যের ব্যবস্থা আছে সে যদি লোকদের কাছে প্রার্থনা করে তবে সে নিজের জন্য আগুন সঞ্চয় করে। অন্য হাদীসে নবী করীম (সা) বলেছেন, মানুষের কাছে ভিক্ষার হাত প্রসারিত করা অপেক্ষা কাঠ কেটেও যদি নিজের অন্ন সংস্থান করা হয়, তবে তাই আমার কাছে অধিক মনোনীত। তৃতীয় একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে, যার কাছে খাদ্য আছে কিংবা যার উপার্জন করার শক্তি আছে তার পক্ষে যাকাত গ্রহণ করা উচিত নয়। মানুষের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগাবার জন্যেই এটা হযরতের শিক্ষা-এটা আইন নয় আইনের একটি শেষ সীমা নির্দেশ করা হয়েছে এবং কতদূর পর্যন্ত মানুষ যাকাত নিতে পারে তা বলে দেয়া হয়েছে । একটি হাদীসে রাসূলে পাক (সা) করেছেন-

لِلسَّائِلِ حَقٌ وَاِنْ جَاءَ عَلَى الْفَرَسِ ـ

“ভিক্ষাপ্রার্থী ঘোড়ায় চড়ে আসলেও তাকে ভিক্ষা দিতে হবে।”

এক ব্যক্তি হযরতের কাছে জিজ্ঞাসা করলো, আমার কাছে দশ টাকা থাকলে আমি মিসকীনদের মধ্যে গণ্য হবো? হযরত বললেন, হাঁ। একবার দু ব্যক্তি হযরতের কাছে যাকাত চেয়েছিল। হযরত রাসূল (সা) তাদেরকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন এবং বললেন: “তোমরা নিতে চাইলে আমি তোমাদেরকে দেব বটে, কিন্তু মূলত ধনী এবং সক্ষম লোকদের এতে কোনো অংশ নেই।” এসব হাদীস থেকে পরিষ্কার জানা যায় যে, যাকাত ফরয হওয়া নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ যাদের নেই তারাও গরীবদের মধ্যে গণ্য হয় এবং তাদেরকেও যাকাত দেয়া যেতে পারে। বলাবাহুল্য যাকাত পাওয়ার প্রকৃত অধিকারী কেবল যথার্থ অভাবগ্রস্ত লোক হতে পারে।

যাকাতের জরুরী নিয়ম-কানুন এখানে বর্ণিত হলো; কিন্তু এ প্রসংগে একটি অত্যন্ত জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ কথা দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আমি বিশেষ আবশ্যক বলে মনে করি। কারণ যে কথাটি আমি বলতে চাই, বর্তমান মুসলমানগণ তা ভুলে গেছে। তা এই যে, ইসলামের সমস্ত কাজই দলগত ও সমষ্টিগতভাবে সম্পন্ন করতে হয়। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যমূলক বিচ্ছিন্নতা ইসলাম সমর্থন করে না। মসজিদ থেকে দূরে অবস্থিত কোনো মুসলমান যদি একাকী নামায পড়ে, তবে নামায হবে বটে, কিন্তু ইসলামী শরীয়াতে জামায়াতের সাথে নামায পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে-মুসলমান জামায়াতের সাথেই নামায আদায় করুক, এটাই শরীয়াতের কাম্য। কালামে পাকে এ দিকে ইংগিত করে বলা হয়েছে:

خُذْ مِنْ اَمْوَالِهِمْ صَدَقَةٌ تُطَهِّرُ هُمْ وَتُزَكِّيْهِمْ بِهَا : التوبة : 103

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা হযরত রাসূলে করীম (সা) মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাত উসূল করতে আদেশ দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে স্বতন্ত্র ও ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করতে বলা হয়নি। উপরন্তু যাকাত আদায়ের কর্মচারীদের জন্যও যাকাতের অর্থ অংশ নির্দিষ্ট করার অর্থ এই যে, মুসলমানদের ইমাম বা রাষ্ট্রপ্রধান সকলের কাছ থেকে যাকাত আদায় করবে এবং সমষ্টিগতভাবে তা খরচ করবে। নবী করীম (স) একথা বলেছেন:

اُمِرْتُ اَنْ اَخَذَ الصَّدَقَةَ مِنْ اغْنِيْاَءِ كُمْ وَاَرُدُّهَا فِىْ فُقَرَاءِ كُمْ ـ

অর্থাৎ তোমাদের ধনীদের কাছ থেকে যাকাত আদায় করে তোমাদের গরীবদের মধ্যে বন্টন করার জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি। নবী করীম (সা) এবং খেলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও যাকাত আদায়ের এ পদ্ধতি কার্যকর ছিল। ইসলাম রাষ্ট্রের কর্মকর্তাগণ সমস্ত যাকাত উসুল করতেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে তা রীতিমত বন্টন করা হতো।

— সমাপ্ত —


ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png