জন্ম ও শৈশব
-
হযরত মূসা (আঃ) বনি ইসরাইল গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।
-
সে সময় মিশরের ফেরাউন ঘোষণা দিয়েছিল, বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশু হত্যা করা হবে, কারণ সে শুনেছিল এক শিশু জন্ম নেবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।
-
মূসা (আঃ)-এর জন্মের পর আল্লাহর নির্দেশে তাঁর মা তাঁকে একটি ছোট বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন।
-
বাক্সটি ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার হাতে এসে পৌঁছে। তিনি তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন এবং প্রাসাদে লালনপালন করেন।
-
ছোটবেলায় মূসা (আঃ) ফেরাউনের কোলে বসে তাঁর দাড়ি টেনে ধরেন। ফেরাউন সন্দেহ করলে আগুন ও খেজুরের দানা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। মূসা (আঃ) আগুনের কয়লা মুখে দিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলেন, ফলে তাঁর কথা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
যৌবন ও ঘটনা
-
যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ স্বভাবের ছিলেন।
-
একদিন তিনি দেখলেন এক মিশরীয় সৈন্য এক ইসরাইলীয়কে নির্যাতন করছে। তিনি তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ভুলবশত মিশরীয়কে আঘাত করেন এবং সে মারা যায়।
-
এরপর ভয়ে মূসা (আঃ) মিশর ছেড়ে মাদইয়ান নগরে পালিয়ে যান।
-
সেখানে তিনি নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং কয়েক বছর তাঁর সেবা করেন।
নবুওত প্রাপ্তি
-
একদিন সীনাই পর্বতের কাছে মূসা (আঃ) আগুন দেখতে পান।
-
কাছে গিয়ে আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেন। এ কারণেই তাঁকে বলা হয় কালিমুল্লাহ (যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন)।
-
আল্লাহ তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করেন এবং ফেরাউনের কাছে গিয়ে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করার দায়িত্ব দেন।
-
মূসা (আঃ)-কে দুইটি মুজিজা (অলৌকিক নিদর্শন) প্রদান করা হয়:
-
লাঠি – যা সাপ হয়ে যেত।
-
হাত – কাপে রাখলে বের হতো উজ্জ্বল আলো।
-
ফেরাউনের সঙ্গে মোকাবিলা
-
মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সাথে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।
-
ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলে জাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করায়।
-
মূসা (আঃ)-এর লাঠি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে জাদুকরদের জাদু গ্রাস করে নেয়।
-
এতে অনেক জাদুকর ঈমান আনয়ন করে মুসলমান হয়ে যায়, যদিও ফেরাউন তাদের কঠোর শাস্তি দেয়।
বনি ইসরাইল মুক্তি
-
ফেরাউন কোনোভাবেই বনি ইসরাইলকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি।
-
আল্লাহ তাঁর উপর বিভিন্ন আজাব পাঠান (পঙ্গপাল, উকুন, রক্ত, ব্যাঙ ইত্যাদি)।
-
শেষে মূসা (আঃ) বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বেরিয়ে যান।
-
ফেরাউন সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, আল্লাহর হুকুমে মূসা (আঃ) লাঠি দ্বারা সমুদ্র আঘাত করেন।
-
সমুদ্র দুইভাগ হয়ে যায়, বনি ইসরাইল পার হয়ে যায়।
-
ফেরাউন ও তার সেনারা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারে।
তাওরাত প্রাপ্তি
-
মুক্তির পর মূসা (আঃ) সীনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদত করেন।
-
সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত প্রদান করেন – যা বনি ইসরাইলের জন্য হিদায়াতের গ্রন্থ।
-
কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে কিছু লোক বাছুর পূজা শুরু করে। মূসা (আঃ) ফিরে এসে তাদের কঠোরভাবে শাস্তি দেন।
মৃত্যু
-
হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনি ইসরাইলকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে।
-
মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (ফিলিস্তিন) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই পৌঁছান।
-
সহিহ হাদিসে আছে, ফেরেশতা তাঁর রূহ কবজ করেন এবং তাঁকে এমন স্থানে কবর দেওয়া হয়, যেখানে আজও সঠিকভাবে চিহ্ন জানা যায় না।
✅ শিক্ষা:
হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবনে আমরা ধৈর্য, সাহস, আল্লাহর উপর আস্থা এবং তাওহীদের প্রতি অটল থাকার শিক্ষা পাই।
হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) – একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ঐতিহাসিক জীবনী
জন্ম ও শৈশবকাল
হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাইল বংশে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মিশরের ফেরাউন (রামেসিস বা মির্সা ফেরাউন বলে ইতিহাসে পরিচিত) অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল।
-
এক রাতে ফেরাউন স্বপ্ন দেখে বা তার জ্যোতিষীরা তাকে জানায় যে, বনী ইসরাইলের মধ্যে একটি ছেলে জন্মাবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।
-
তখন ফেরাউন হুকুম দেয়, প্রতিটি নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করতে হবে এবং কেবল কন্যাশিশুদের বাঁচিয়ে রাখা হবে।
মূসা (আঃ) জন্মের পর তাঁর মা ইউখাবিদ ভয় পেয়ে যান। আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম আসে:
"তুমি তাকে দুধ পান করাও, আর যদি ভয় পাও তবে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। আমি তাকে তোমার দিকে ফিরিয়ে দেব এবং নবী বানাব।" (সূরা কাসাস: ৭)
তিনি শিশুকে একটি বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর কুদরত এমনভাবে কাজ করলো যে বাক্সটি গিয়ে পৌঁছায় ফেরাউনের প্রাসাদে। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুজাহিম (যিনি ঈমানদার মহিলা ছিলেন) শিশুটিকে দেখে দয়া করে বলেন:
"এ শিশুটি আমাদের জন্য শীতল চোখ হবে, একে হত্যা করো না।" (সূরা কাসাস: ৯)
ফলে মূসা (আঃ) ফেরাউনের প্রাসাদেই বড় হতে থাকেন।
যৌবন ও মিশরের ঘটনা
যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী ছিলেন। একদিন দেখলেন এক মিশরীয় (কপ্টি) একজন ইসরাইলীকে অন্যায়ভাবে মারছে। মূসা (আঃ) তাকে রক্ষা করতে গিয়ে আঘাত করেন, এতে লোকটি মারা যায়। (সূরা কাসাস: ১৫)
ভয়ে তিনি প্রার্থনা করেন:
"হে আল্লাহ, আমি নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা কর।"
আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন।
পরের দিন তিনি আবার দেখলেন ঐ একই ইসরাইলী আরেকজনের সাথে ঝগড়া করছে। এবার মূসা (আঃ) তাকে বকাঝকা করলেন। এতে মিশরীয়রা সন্দেহ করে ফেলে। খবর পৌঁছে যায় ফেরাউনের কাছে, এবং তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়।
একজন মিশরীয় মুসলমান (ঐতিহাসিকভাবে মুমিনে আলে ফেরাউন নামে পরিচিত) তাকে সতর্ক করে দেন। তখন মূসা (আঃ) মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ানের দিকে চলে যান।
মাদইয়ান জীবন
মাদইয়ান শহরে গিয়ে তিনি এক কূপের পাশে দেখলেন অনেক লোক পশুকে পানি খাওাচ্ছে। দুই তরুণী মেয়েকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি তাদের সাহায্য করেন।
তারা ছিল নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যা। শুআইব (আঃ) মূসা (আঃ)-কে আমন্ত্রণ জানান এবং পরে নিজের কন্যাকে তাঁর সাথে বিবাহ দেন। মূসা (আঃ) প্রায় ৮–১০ বছর মাদইয়ানে বসবাস করেন।
নবুওত প্রাপ্তি
একদিন মূসা (আঃ) পরিবার নিয়ে সিনাই মরুভূমি পেরোচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি তূর পর্বতের কাছে আগুনের শিখা দেখতে পান। আগুন আনতে গেলে আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন:
"হে মূসা! আমি তোমার প্রতিপালক। জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তূয়ায় আছ। আমি তোমাকে নবী বানালাম।" (সূরা ত্বাহা: ১১–১৩)
তাঁকে দুটি মুজিজা দেওয়া হয়:
-
লাঠি ফেলে দিলে বিশাল সাপে পরিণত হতো।
-
হাত কাপড়ে রেখে বের করলে উজ্জ্বল আলো ছড়াত।
আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন: ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করতে হবে।
ফেরাউনের দরবারে দাওয়াত
মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।
তিনি বললেন:
"আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হয়ে এসেছি, বনী ইসরাইলকে আমাদের সাথে পাঠাও।"
ফেরাউন অহংকারভরে বলল:
"আমি তো তোমার লালনপালন করেছি, তবু তুমি অকৃতজ্ঞ! আমিই তো তোমার উপরে প্রভু।"
মূসা (আঃ) অলৌকিক নিদর্শন দেখালেন। কিন্তু ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলল এবং প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ জাদুকরদের একত্র করল।
জাদুকরদের পরাজয়
জাদুকররা লাঠি ও দড়ি নিক্ষেপ করল, সেগুলো মানুষের চোখে সাপের মতো মনে হলো।
মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন, সেটি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে সব জাদু গ্রাস করল।
জাদুকররা সাথে সাথে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে বলল:
"আমরা মূসা ও হারুনের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি।"
ফেরাউন রেগে তাদের হুমকি দিলেও অনেকেই ঈমান নিয়ে শহীদ হন।
বনী ইসরাইল মুক্তি
ফেরাউন ক্রমেই জেদ বাড়াতে থাকে। আল্লাহ তার উপর বিভিন্ন আজাব নাজিল করেন – খরা, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি। তবুও সে ঈমান আনেনি।
শেষে আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আঃ) রাতের অন্ধকারে বনী ইসরাইলকে নিয়ে বেরিয়ে যান।
ফেরাউন সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, লোহিত সাগরের তীরে মূসা (আঃ) লাঠি আঘাত করলেন। সমুদ্র ফেটে বারোটি রাস্তা বের হলো।
বনী ইসরাইল নিরাপদে পার হলো, কিন্তু ফেরাউন ও তার সৈন্যরা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারল।
কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আজ আমি তোমার দেহকে বাঁচিয়ে রাখব, যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হও।" (সূরা ইউনুস: ৯২)
তাওরাত প্রাপ্তি
মুক্তির পর মূসা (আঃ) সিনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদতে লিপ্ত হন। সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত দান করেন, যা ছিল বনী ইসরাইলের জন্য হিদায়াত ও শরীয়তের গ্রন্থ।
তবে এ সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে সামিরি নামক একজন বাছুরের মূর্তি বানিয়ে অনেককে বিভ্রান্ত করে। তারা বাছুর পূজা শুরু করে।
ফিরে এসে মূসা (আঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের তাওবা করতে বাধ্য করেন।
মৃত্যু
হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনী ইসরাইলকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে।
তাঁর শেষ বয়সে আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (বায়তুল মুকাদ্দাস) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই নিয়ে আসেন।
সহীহ হাদীসে আছে, মূসা (আঃ)-এর রূহ কবজ করা হয় এবং তাঁকে এমন এক স্থানে দাফন করা হয়, যার সঠিক অবস্থান আজও অজানা।
শিক্ষা ও বার্তা
হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবন থেকে আমরা পাই –
-
আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা।
-
অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।
-
ধৈর্য ও সাহস।
-
তাওহীদ ও শিরক বর্জন।
তিনি ছিলেন কুরআনে সর্বাধিক উল্লেখিত নবী, যার ঘটনা থেকে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন