শিরোনাম
Loading latest headlines...

সোমবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৯

সহিহ বুখারী-০৪ অধ্যায়ঃ ওজু (হাদিস ১৩৫ থেকে হাদিস ২৪৭)

সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

৪/১. অধ্যায়ঃ উযূর বর্ণনা।

আল্লাহ্‌ তা’আলার বাণীঃ (ওহে যারা ঈমান এনেছ!) তোমরা যখন সালাতের জন্য দাঁড়াতে চাও তখন ধৌত করে নিবে নিজেদের মুখমণ্ডল এবং হাত কনুই পর্যন্ত আর মাস্‌হ করে নিবে নিজেদের মস্তক এবং ধৌত করে নিবে নিজেদের পা গ্রন্থি পর্যন্ত। (সূরা আল-মায়িদাহ্‌ ৫/৬)
আবূ ‘আবদুল্লাহ্‌ বুখারী (রহঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ উযূর ফরয হ’ল এক-একবার করে ধোয়া। তিনি দু’-দু’বার করে এবং তিন-তিনবার করেও উযূ করেছেন, কিন্তু তিনবারের অধিক ধৌত করেন নি। পানির অপচয় করা এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ‘আমলের সীমা অতিক্রম করাকে ‘উলামায়ে কিরাম মাকরূহ বলেছেন।

৪/২. অধ্যায়ঃ
পবিত্রতা ব্যাতীত সালাত কবুল হবে না।

১৩৫
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ الْحَنْظَلِيُّ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ تُقْبَلُ صَلاَةُ مَنْ أَحْدَثَ حَتَّى يَتَوَضَّأَ ‏”‏‏.‏ قَالَ رَجُلٌ مِنْ حَضْرَمَوْتَ مَا الْحَدَثُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ فُسَاءٌ أَوْ ضُرَاطٌ‏.‏
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তির হাদাস হয় তার সালাত কবুল হবে না, যতক্ষণ না সে উযূ করে। হাযরা-মাওতের জনৈক ব্যক্তি বললো, ‘হে আবূ হুরাইরা! হাদাস কী? হাদাস কী?’ তিনি বললেন, ‘নিঃশব্দে বা সশব্দে বায়ু বের হওয়া।’
(৬৯৫৪; মুসলিম ২/২, হাঃ ২২৫, আহমাদ ৮০৮৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৩৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩. অধ্যায়ঃ
উযূর ফযীলত এবং উযূর প্রভাবে যাদের উযূর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উজ্জ্বল হবে।
 ১৩৬
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ خَالِدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي هِلاَلٍ، عَنْ نُعَيْمٍ الْمُجْمِرِ، قَالَ رَقِيتُ مَعَ أَبِي هُرَيْرَةَ عَلَى ظَهْرِ الْمَسْجِدِ، فَتَوَضَّأَ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ إِنَّ أُمَّتِي يُدْعَوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ غُرًّا مُحَجَّلِينَ مِنْ آثَارِ الْوُضُوءِ، فَمَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ أَنْ يُطِيلَ غُرَّتَهُ فَلْيَفْعَلْ
নু’আয়ম মুজমির (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ)-এর সঙ্গে মসজিদের ছাদে উঠলাম। অতঃপর তিনি উযূ করে বললেনঃ ‘আমি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, ক্বিয়ামাতের দিন আমার উম্মাতকে এমন অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, উযূর প্রভাবে তাদের হাত-পা ও মুখমন্ডল উজ্জ্বল থাকবে। তাই তোমাদের মধ্যে যে এ উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিতে পারে, সে যেন তা করে।’
(মুসলিম ২/১২, হাঃ ২৪৬, আহমাদ ৯২০৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৩৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪. অধ্যায়ঃ
নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সন্দেহের কারণে উযূ করতে হয় না।
১৩৭
حَدَّثَنَا عَلِيٌّ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، وَعَنْ عَبَّادِ بْنِ تَمِيمٍ، عَنْ عَمِّهِ، أَنَّهُ شَكَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الرَّجُلُ الَّذِي يُخَيَّلُ إِلَيْهِ أَنَّهُ يَجِدُ الشَّىْءَ فِي الصَّلاَةِ‏.‏ فَقَالَ ‏ “‏ لاَ يَنْفَتِلْ ـ أَوْ لاَ يَنْصَرِفْ ـ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا ‏”
‘আব্বাদ ইব্‌নু তামীম (রহঃ)-এর চাচা থেকে বর্ণিতঃ
একদা আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এক ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হলো যে, তার মনে হয়েছিলো যেন সালাতের মধ্যে কিছু হয়ে গিয়েছিলো। তিনি বললেনঃ সে যেন ফিরে না যায়, যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা দুর্গন্ধ পায়।
(১৭৭, ২০৫৬; মুসলিম ৩/২৬, হাঃ ৩৬১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৩৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫. অধ্যায়ঃ
হালকাভাবে উযূ করা।
১৩৮
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَمْرٍو، قَالَ أَخْبَرَنِي كُرَيْبٌ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم نَامَ حَتَّى نَفَخَ ثُمَّ صَلَّى ـ وَرُبَّمَا قَالَ اضْطَجَعَ حَتَّى نَفَخَ ـ ثُمَّ قَامَ فَصَلَّى‏.‏ ثُمَّ حَدَّثَنَا بِهِ سُفْيَانُ مَرَّةً بَعْدَ مَرَّةٍ عَنْ عَمْرٍو عَنْ كُرَيْبٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ بِتُّ عِنْدَ خَالَتِي مَيْمُونَةَ لَيْلَةً، فَقَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِنَ اللَّيْلِ، فَلَمَّا كَانَ فِي بَعْضِ اللَّيْلِ قَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَتَوَضَّأَ مِنْ شَنٍّ مُعَلَّقٍ وُضُوءًا خَفِيفًا ـ يُخَفِّفُهُ عَمْرٌو وَيُقَلِّلُهُ ـ وَقَامَ يُصَلِّي فَتَوَضَّأْتُ نَحْوًا مِمَّا تَوَضَّأَ، ثُمَّ جِئْتُ فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ ـ وَرُبَّمَا قَالَ سُفْيَانُ عَنْ شِمَالِهِ ـ فَحَوَّلَنِي فَجَعَلَنِي عَنْ يَمِينِهِ، ثُمَّ صَلَّى مَا شَاءَ اللَّهُ، ثُمَّ اضْطَجَعَ، فَنَامَ حَتَّى نَفَخَ، ثُمَّ أَتَاهُ الْمُنَادِي فَآذَنَهُ بِالصَّلاَةِ، فَقَامَ مَعَهُ إِلَى الصَّلاَةِ، فَصَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ‏.‏ قُلْنَا لِعَمْرٍو إِنَّ نَاسًا يَقُولُونَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تَنَامُ عَيْنُهُ وَلاَ يَنَامُ قَلْبُهُ‏.‏ قَالَ عَمْرٌو سَمِعْتُ عُبَيْدَ بْنَ عُمَيْرٍ يَقُولُ رُؤْيَا الأَنْبِيَاءِ وَحْىٌ، ثُمَّ قَرَأَ ‏{‏إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ‏}‏‏.‏
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুমিয়েছিলেন, এমনকি তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ হতে লাগলো। অতঃপর তিনি সালাত আদায় করলেন। সুফিয়ান (রহঃ) আবার কখনো বলেছেন, তিনি শুয়ে পড়লেন, এমনকি নাক ডাকার আওয়ায হতে লাগলো। অতঃপর দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করলেন। অন্য সূত্রে সুফিয়ান (রহঃ) ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আমি এক রাতে আমার খালা মাইমূনা (রাঃ)-এর নিকট রাত কাটালাম। রাতে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুম থেকে উঠলেন এবং রাতের কিছু অংশ চলে যাবার পর আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ঝুলন্ত মশক হতে হালকা ধরনের উযূ করলেন। রাবী ‘আমর (রহঃ) বলেন যে, হালকাভাবে ধুলেন, পানি কম ব্যবহার করলেন এবং সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, তখন তিনি যেভাবে উযূ করেছেন আমিও সেভাবে উযূ করলাম এবং এসে তাঁর বাঁয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। সুফিয়ান (রহঃ) কখনো কখনো يسار (বাম) শব্দের স্থলে شمال বলতেন। তারপর আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে ধরে তাঁর ডান দিকে দাঁড় করালেন। অতঃপর আল্লাহ্‌র যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি সালাত আদায় করলেন। অতঃপর কাত হলেন আর ঘুমিয়ে পড়লেন, এমনকি তাঁর নাক ডাকালেন। অতঃপর মুয়াযযিন এসে তাঁকে সালাতের কথা জানিয়ে দিলেন। তিনি তার সঙ্গে সালাতের জন্য চললেন এবং সালাত আদায় করলেন, কিন্তু উযূ করলেন না। আমরা ‘আমর (রহঃ)-কে বললামঃ লোকে বলে যে, আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চোখ ঘুমায় কিন্তু তাঁর অন্তর ঘুমায় না। তখন ‘আমর (রহঃ) বললেন, ‘আমি ‘উবায়দ ইব্‌নু ‘উমায়র (রহঃ) কে বলতে শুনেছি, নবীগণের স্বপ্ন ওয়াহী। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেন, إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ “আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে কুরবানী করছি” – (সূরা আস সাফ্‌ফাত ৩৭/১০২)।
(১১৭ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬. অধ্যায়ঃ
পূর্ণরূপে উযূ করা।
ইব্‌ন ‘উমর (রাঃ) বলেন, ‘ভালভাবে পরিষ্কার করাই হল পূর্ণরুপে উযূ করা।’
১৩৯
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ، عَنْ كُرَيْبٍ، مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ، أَنَّهُ سَمِعَهُ يَقُولُ دَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مِنْ عَرَفَةَ حَتَّى إِذَا كَانَ بِالشِّعْبِ نَزَلَ فَبَالَ، ثُمَّ تَوَضَّأَ وَلَمْ يُسْبِغِ الْوُضُوءَ‏.‏ فَقُلْتُ الصَّلاَةَ يَا رَسُولَ اللَّهِ‏.‏ فَقَالَ ‏ “‏ الصَّلاَةُ أَمَامَكَ ‏”‏‏.‏ فَرَكِبَ، فَلَمَّا جَاءَ الْمُزْدَلِفَةَ نَزَلَ فَتَوَضَّأَ، فَأَسْبَغَ الْوُضُوءَ، ثُمَّ أُقِيمَتِ الصَّلاَةُ فَصَلَّى الْمَغْرِبَ، ثُمَّ أَنَاخَ كُلُّ إِنْسَانٍ بَعِيرَهُ فِي مَنْزِلِهِ، ثُمَّ أُقِيمَتِ الْعِشَاءُ فَصَلَّى وَلَمْ يُصَلِّ بَيْنَهُمَا‏.‏
উসামাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আরাফার ময়দান হতে রওনা হলেন এবং উপত্যকায় পৌঁছে নেমে তিনি পেশাব করলেন। অতঃপর উযূ করলেন কিন্তু উত্তমরূপে উযূ করলেন না। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহ্‌র রসূল! সালাত আদায় করবেন কি?’ তিনি বললেনঃ ‘সালাতের স্থান তোমার সামনে’। অতঃপর তিনি আবার সওয়ার হলেন। অতঃপর মুযদালিফায় এসে সাওয়ারী থেকে নেমে উযূ করলেন। এবার পূর্ণরূপে উযূ করলেন। তখন সালাতের জন্য ইক্বামাত দেওয়া হলো। তিনি মাগরিবের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর সকলে তাদের অবতরণস্থলে নিজ নিজ উট বসিয়ে দিলো। পুনরায় ‘ইশার ইক্বামাত দেয়া হলো। অতঃপর তিনি ‘ইশার সালাত আদায় করলেন এবং উভয় সালাতের মধ্যে অন্য কোন সালাত আদায় করলেন না।
(১৮১, ১৬৬৭, ১৬৬৯, ১৬৭২; মুসলিম ১৫/৪৫, হাঃ ১২৮০, আহমাদ ২১৮০১, ২১৮০৮, ২১৮৯০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭. অধ্যায়ঃ
এক আঁজলা পানি দিয়ে দু’হাতে মুখমণ্ডল ধোয়া।
১৪০
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحِيمِ، قَالَ أَخْبَرَنَا أَبُو سَلَمَةَ الْخُزَاعِيُّ، مَنْصُورُ بْنُ سَلَمَةَ قَالَ أَخْبَرَنَا ابْنُ بِلاَلٍ ـ يَعْنِي سُلَيْمَانَ ـ عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ تَوَضَّأَ فَغَسَلَ وَجْهَهُ، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ، فَمَضْمَضَ بِهَا وَاسْتَنْشَقَ، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ، فَجَعَلَ بِهَا هَكَذَا، أَضَافَهَا إِلَى يَدِهِ الأُخْرَى، فَغَسَلَ بِهِمَا وَجْهَهُ، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ، فَغَسَلَ بِهَا يَدَهُ الْيُمْنَى، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ، فَغَسَلَ بِهَا يَدَهُ الْيُسْرَى، ثُمَّ مَسَحَ بِرَأْسِهِ، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً مِنْ مَاءٍ فَرَشَّ عَلَى رِجْلِهِ الْيُمْنَى حَتَّى غَسَلَهَا، ثُمَّ أَخَذَ غَرْفَةً أُخْرَى، فَغَسَلَ بِهَا رِجْلَهُ ـ يَعْنِي الْيُسْرَى ـ ثُمَّ قَالَ هَكَذَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ‏.‏
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি উযূ করলেন এবং তাঁর মুখমন্ডল ধুলেন। এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে কুলি করলেন ও নাকে পানি দিলেন। অতঃপর আর এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে অনুরূপ করলেন অর্থাৎ আরেক হাতের সাথে মিলিয়ে মুখমন্ডল ধুলেন। অতঃপর আর এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে ডান হাত ধুলেন। অতঃপর আর এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে তাঁর বাম হাত ধুলেন। অতঃপর তিনি মাথা মাস্‌হ করলেন। অতঃপর আর এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে ডান পায়ের উপর ঢেলে দিয়ে তা ধুয়ে ফেললেন। অতঃপর আর এক আঁজলা পানি নিয়ে তা দিয়ে বাম পা ধুলেন। অতঃপর বললেনঃ ‘আমি আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে এভাবে উযূ করতে দেখেছি।’
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৮. অধ্যায়ঃ
সর্বাবস্থায়, এমনকি সহবাসের সময়েও বিস্‌মিল্লাহ্‌ বলা।
১৪১
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ سَالِمِ بْنِ أَبِي الْجَعْدِ، عَنْ كُرَيْبٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، يَبْلُغُ بِهِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏.‏ فَقُضِيَ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ، لَمْ يَضُرَّهُ بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏ “‏‏.‏
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে, بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا‏‏ (আল্লাহর নামে আরম্ভ করছি। আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখো এবং যা আমাদেরকে দান করবে তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখো)- তারপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
(৩২৭১, ৩২৮৩, ৫১৬৫, ৬৩৮৮, ৭৩৯৬; মুসলিম ত্বলাক অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ১৭ হাঃ ১৪৩৪, আহমাদ ১৯০৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৯. অধ্যায়ঃ
শৌচাগারে যাওয়ার সময় কী বলতে হয়?
১৪২
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَبْدِ الْعَزِيزِ بْنِ صُهَيْبٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْخَلاَءَ قَالَ ‏ “‏ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ ‏”‏‏.‏ تَابَعَهُ ابْنُ عَرْعَرَةَ عَنْ شُعْبَةَ‏.‏ وَقَالَ غُنْدَرٌ عَنْ شُعْبَةَ إِذَا أَتَى الْخَلاَءَ‏.‏ وَقَالَ مُوسَى عَنْ حَمَّادٍ إِذَا دَخَلَ‏.‏ وَقَالَ سَعِيدُ بْنُ زَيْدٍ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَدْخُلَ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন প্রকৃতির ডাকে শৌচাগারে যেতেন তখন বলতেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ

(“হে আল্লাহ্ ! আমি মন্দ কাজ ও শয়তান থেকে আপনার আশ্রয় চাচ্ছি।”) ইব্‌ন ‘আর‘আরা (রহঃ) শুবা (রহঃ) সূত্রেও অনুরূপ বর্ণনা করেন। গুনদার (রহঃ) শুবা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, إِذَا أَتَى الْخَلاَءَ (যখন শৌচাগারে যেতেন)। মূসা (রহঃ) হাম্মাদ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, إِذَا دَخَلَ (যখন প্রবেশ করতেন)। সা‘ঈদ ইব্‌ন যায়দ (রহঃ) ‘আবদুল ‘আযীয (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, ‘যখন প্রবেশ করার ইচ্ছা করতেন।
(৬৩২২; মুসলিম ৩/৪২, হাঃ ৩৭৫, আহমাদ ১১৯৪৭, ১১৯৮৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১০. অধ্যায়ঃ
শৌচাগারের কাছে পানি রাখা।
১৪৩
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا هَاشِمُ بْنُ الْقَاسِمِ، قَالَ حَدَّثَنَا وَرْقَاءُ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي يَزِيدَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَخَلَ الْخَلاَءَ، فَوَضَعْتُ لَهُ وَضُوءًا قَالَ ‏”‏ مَنْ وَضَعَ هَذَا ‏”‏‏.‏ فَأُخْبِرَ فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ فَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একবার নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শৌচাগারে গেলেন, তখন আমি তাঁর জন্য উযূর পানি রাখলাম। তিনি জিজ্ঞাস করলেনঃ ‘এটা কে রেখেছে?’ তাঁকে জানানো হলে তিনি বললেনঃ ‘ইয়া আল্লাহ! আপনি তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করুন।’
(৭৫; মুসলিম ৪৪/৩০, হাঃ ২৪৭৭, আহমাদ ২৩৯৭, ২৮৮১, ৩০২৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১১. অধ্যায়ঃ
পেশাব পায়খানা করার সময় ক্বিবলামুখী হবে না, তবে দেয়াল অথবা কোন আড় থাকলে ভিন্ন কথা।
১৪৪
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَزِيدَ اللَّيْثِيِّ، عَنْ أَبِي أَيُّوبَ الأَنْصَارِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِذَا أَتَى أَحَدُكُمُ الْغَائِطَ فَلاَ يَسْتَقْبِلِ الْقِبْلَةَ وَلاَ يُوَلِّهَا ظَهْرَهُ، شَرِّقُوا أَوْ غَرِّبُوا ‏
আবূ আইয়ুব আনসারী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন শৌচাগারে যায়, তখন সে যেন ক্বিবলার দিকে মুখ না করে এবং তার দিকে পিঠও না করে, বরং তোমরা পূর্ব দিক এবং পশ্চিম দিকে ফিরে বসবে (এই নির্দেশ মদীনার বাসিন্দাদের জন্য) [১]।
৩৯৪; মুসলিম ২/১৭, হাঃ ২৬৪, আহমাদ ২৩৫৮৩, ২৩৫৯৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৬)
[১] যাদের ক্বিবলা উত্তর বা দক্ষিণে হবে তাদের জন্য এই হুকুম। আর যাদের ক্বিবলা পূর্ব বা পশ্চিমে তারা উত্তর বা দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১২. অধ্যায়ঃ
যে ব্যক্তি দু’ইটের উপর বসে মলমূত্র ত্যাগ করল।
১৪৫
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، عَنْ عَمِّهِ، وَاسِعِ بْنِ حَبَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ إِنَّ نَاسًا يَقُولُونَ إِذَا قَعَدْتَ عَلَى حَاجَتِكَ، فَلاَ تَسْتَقْبِلِ الْقِبْلَةَ وَلاَ بَيْتَ الْمَقْدِسِ‏.‏ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عُمَرَ لَقَدِ ارْتَقَيْتُ يَوْمًا عَلَى ظَهْرِ بَيْتٍ لَنَا، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى لَبِنَتَيْنِ مُسْتَقْبِلاً بَيْتَ الْمَقْدِسِ لِحَاجَتِهِ‏.‏ وَقَالَ لَعَلَّكَ مِنَ الَّذِينَ يُصَلُّونَ عَلَى أَوْرَاكِهِمْ، فَقُلْتُ لاَ أَدْرِي وَاللَّهِ‏.‏
قَالَ مَالِكٌ يَعْنِي الَّذِي يُصَلِّي وَلاَ يَرْتَفِعُ عَنِ الأَرْضِ، يَسْجُدُ وَهُوَ لاَصِقٌ بِالأَرْضِ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘লোকে বলে পেশাব পায়খানা করার সময় ক্বিবলার দিকে এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে বসবে না।’ ‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌ন ‘উমর (রাঃ) বলেন, ‘আমি একদা আমাদের ঘরের ছাদে উঠলাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখলাম বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে দু’টি ইটের উপর স্বীয় প্রয়োজনে বসেছেন। তিনি [ওয়াসী (রহঃ)-কে] বললেন, তুমি বোধ হয় তাদের মধ্যে শামিল, যারা পাছায় ভর দিয়ে সালাত আদায় করে। আমি বললাম, ‘আল্লাহ্‌র কসম! আমি জানি না।’ মালিক (রহঃ) বলেন, (এর অর্থ হলো) যারা সালাত আদায় করে এবং মাটি থেকে পাছা না উঠিয়ে সাজদা দেয়।
(১৪৮,১৪৯,৩১০২ ; মুসলিম ২/১৭, হাঃ ২৬৬, আহমাদ ৪৮১২, ৪৯৯১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪২ হাদীসের শেষাংশ নেই, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৪/১৩. অধ্যায়ঃ
পেশাব পায়খানার জন্য নারীদের বাইরে যাওয়া।
১৪৬
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، قَالَ حَدَّثَنِي عُقَيْلٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ أَزْوَاجَ النَّبِيِّ، صلى الله عليه وسلم كُنَّ يَخْرُجْنَ بِاللَّيْلِ إِذَا تَبَرَّزْنَ إِلَى الْمَنَاصِعِ ـ وَهُوَ صَعِيدٌ أَفْيَحُ ـ فَكَانَ عُمَرُ يَقُولُ لِلنَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم احْجُبْ نِسَاءَكَ‏.‏ فَلَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَفْعَلُ، فَخَرَجَتْ سَوْدَةُ بِنْتُ زَمْعَةَ زَوْجُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم لَيْلَةً مِنَ اللَّيَالِي عِشَاءً، وَكَانَتِ امْرَأَةً طَوِيلَةً، فَنَادَاهَا عُمَرُ أَلاَ قَدْ عَرَفْنَاكِ يَا سَوْدَةُ‏.‏ حِرْصًا عَلَى أَنْ يَنْزِلَ الْحِجَابُ، فَأَنْزَلَ اللَّهُ آيَةَ الْحِجَابِ‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রীগণ রাতের বেলায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে খোলা ময়দানে যেতেন। আর ‘উমর (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতেন, ‘আপনার স্ত্রীগণকে পর্দায় রাখুন।’ কিন্তু আল্লাহ্‌র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা করেননি। এক রাতে ‘ইশার সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী সওদা বিনতু যাম’আ (রাঃ) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বের হন। তিনি ছিলেন দীর্ঘাঙ্গী। ‘উমর (রাঃ) তাঁকে ডেকে বললেন, ‘হে সওদা! আমি কিন্তু তোমাকে চিনে ফেলেছি।’ যেন পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হয় সেই উদ্দেশ্যেই তিনি এ কথা বলেছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ তা’আলা পর্দার হুকুম অবতীর্ণ করেন।
(১৪৭, ৪৭৯৫, ৫২৩৭, ৬২৪০ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৪৭
حَدَّثَنَا زَكَرِيَّاءُ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ قَدْ أُذِنَ أَنْ تَخْرُجْنَ فِي حَاجَتِكُنَّ ‏”‏‏.‏ قَالَ هِشَامٌ يَعْنِي الْبَرَازَ
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ ‘তোমাদের প্রয়োজনের জন্য বের হবার অনুমতি দেয়া হয়েছে।’ হিশাম (রহঃ) বলেন, অর্থাৎ পেশাব পায়খানার জন্য।
(১৪৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৪৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৪. অধ্যায়ঃ
গৃহের মধ্যে পেশাব পায়খানা করা।
১৪৮
حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ الْمُنْذِرِ، قَالَ حَدَّثَنَا أَنَسُ بْنُ عِيَاضٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، عَنْ وَاسِعِ بْنِ حَبَّانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ ارْتَقَيْتُ فَوْقَ ظَهْرِ بَيْتِ حَفْصَةَ لِبَعْضِ حَاجَتِي، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقْضِي حَاجَتَهُ مُسْتَدْبِرَ الْقِبْلَةِ مُسْتَقْبِلَ الشَّأْمِ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, ‘আমি আমার বিশেষ এক প্রয়োজনে হাফসা (রাঃ)-এর ঘরের ছাদে উঠলাম। তখন দেখলাম, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্বিবলার দিকে পিঠ দিয়ে শাম-এর দিকে মুখ করে তাঁর প্রয়োজনে বসেছেন।’
(১৪৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৪৯
حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، قَالَ أَخْبَرَنَا يَحْيَى، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ يَحْيَى بْنِ حَبَّانَ، أَنَّ عَمَّهُ، وَاسِعَ بْنَ حَبَّانَ، أَخْبَرَهُ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ أَخْبَرَهُ قَالَ لَقَدْ ظَهَرْتُ ذَاتَ يَوْمٍ عَلَى ظَهْرِ بَيْتِنَا، فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَاعِدًا عَلَى لَبِنَتَيْنِ مُسْتَقْبِلَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘একদা আমি আমাদের ঘরের উপর উঠে দেখলাম, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু’টি ইটের উপর বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বসেছেন।
(১৪৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৫. অধ্যায়ঃ
পানি দ্বারা শৌচ কাজ করা।
১৫০
حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ، هِشَامُ بْنُ عَبْدِ الْمَلِكِ قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي مُعَاذٍ ـ وَاسْمُهُ عَطَاءُ بْنُ أَبِي مَيْمُونَةَ ـ قَالَ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا خَرَجَ لِحَاجَتِهِ أَجِيءُ أَنَا وَغُلاَمٌ مَعَنَا إِدَاوَةٌ مِنْ مَاءٍ‏.‏ يَعْنِي يَسْتَنْجِي بِهِ‏.‏
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হতেন তখন আমি ও অপর একটি ছেলে পানির পাত্র নিয়ে আসতাম। অর্থাৎ তিনি তা দিয়ে শৌচকার্য সারতেন।
(১৫১, ১৫২, ২১৭, ৫০০; মুসলিম ২/২১, হাঃ ২৭০, আহমাদ ১৩৭১৯, ১৩১০৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৬. অধ্যায়ঃ
পবিত্রতা অর্জনের জন্য কারো সঙ্গে পানি নিয়ে যাওয়া।
আবুদ-দারদা (রাঃ) বলেন, তোমাদের মধ্যে কি জুতা, পানি ও বালিশ বহনকারী ব্যক্তিটি [ ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ) ] নেই?
১৫১
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ أَبِي مُعَاذٍ ـ هُوَ عَطَاءُ بْنُ أَبِي مَيْمُونَةَ ـ قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا خَرَجَ لِحَاجَتِهِ تَبِعْتُهُ أَنَا وَغُلاَمٌ مِنَّا مَعَنَا إِدَاوَةٌ مِنْ مَاءٍ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হতেন তখন আমি এবং আমাদের অন্য একটি ছেলে তাঁর পিছনে পানির পাত্র নিয়ে যেতাম।
(১৫০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৭. অধ্যায়ঃ
ইস্‌তিন্‌জার জন্য পানির সাথে (লৌহ ফলকযুক্ত) লাঠি নিয়ে যাওয়া।
১৫২
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي مَيْمُونَةَ، سَمِعَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدْخُلُ الْخَلاَءَ، فَأَحْمِلُ أَنَا وَغُلاَمٌ إِدَاوَةً مِنْ مَاءٍ، وَعَنَزَةً، يَسْتَنْجِي بِالْمَاءِ‏.‏ تَابَعَهُ النَّضْرُ وَشَاذَانُ عَنْ شُعْبَةَ‏.‏ الْعَنَزَةُ عَصًا عَلَيْهِ زُجٌّ‏.‏
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন শৌচাগারে যেতেন তখন আমি এবং একটি ছেলে পানির পাত্র এবং ‘আনাযা’ নিয়ে যেতাম। তিনি পানি দ্বারা শৌচকার্য করতেন।
(১৫০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৪৯)
নাযর (রহঃ) ও শাযান (রহঃ) শু’বা (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন। হাদীসে বর্ণিত عَنَزَةً শব্দের অর্থ এমন লাঠি যার মাথায় লোহা লাগানো থাকে। (ই.ফা. ১৫৪)
নাযর (রহঃ) ও শাযান (রহঃ) শু’বা (রহঃ) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন। হাদীসে বর্ণিত عَنَزَةً শব্দের অর্থ এমন লাঠি যার মাথায় লোহা লাগানো থাকে। (ই.ফা. ১৫৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৮. অধ্যায়ঃ
ডান হাতে শৌচকার্য করা নিষেধ।
১৫৩
حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ فَضَالَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا هِشَامٌ ـ هُوَ الدَّسْتَوَائِيُّ ـ عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي قَتَادَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ إِذَا شَرِبَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَتَنَفَّسْ فِي الإِنَاءِ، وَإِذَا أَتَى الْخَلاَءَ فَلاَ يَمَسَّ ذَكَرَهُ بِيَمِينِهِ، وَلاَ يَتَمَسَّحْ بِيَمِينِهِ ‏”‏‏.‏
আবূ ক্বাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমাদের কেউ যখন পান করে, তখন সে যেন পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস না ছাড়ে। আর যখন শৌচাগারে যায় তখন তার পুরুষাঙ্গ যেন ডান হাত দিয়ে স্পর্শ না করে এবং ডান হাত দিয়ে যেন শৌচকার্য না করে।
(১৫৪, ৫৬৩০; মুসলিম ২/১৮, হাঃ ২৬৭, আহমাদ ২২৬২৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/১৯. অধ্যায়ঃ
প্রস্রাব করার সময় ডান হাতে পুরুষাঙ্গ ধরবে না।
১৫৪
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنَا الأَوْزَاعِيُّ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي قَتَادَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا بَالَ أَحَدُكُمْ فَلاَ يَأْخُذَنَّ ذَكَرَهُ بِيَمِينِهِ، وَلاَ يَسْتَنْجِي بِيَمِينِهِ، وَلاَ يَتَنَفَّسْ فِي الإِنَاءِ ‏”‏‏.‏
আবূ ক্বাতাদা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ যখন পেশাব করে তখন সে যেন কখনো ডান হাত দিয়ে তার পুরুষাঙ্গ না ধরে এবং ডান হাত দিয়ে শৌচকার্য না করে এবং পান করার সময় যেন পাত্রের মধ্যে শ্বাস না ছাড়ে।
(১৫৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২০. অধ্যায়ঃ
পাথর দিয়ে ইস্‌তিন্‌জা করা।
১৫৫
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدٍ الْمَكِّيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى بْنِ سَعِيدِ بْنِ عَمْرٍو الْمَكِّيُّ، عَنْ جَدِّهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ اتَّبَعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَخَرَجَ لِحَاجَتِهِ، فَكَانَ لاَ يَلْتَفِتُ فَدَنَوْتُ مِنْهُ فَقَالَ ‏ “‏ ابْغِنِي أَحْجَارًا أَسْتَنْفِضْ بِهَا ـ أَوْ نَحْوَهُ ـ وَلاَ تَأْتِنِي بِعَظْمٍ وَلاَ رَوْثٍ ‏”‏‏.‏ فَأَتَيْتُهُ بِأَحْجَارٍ بِطَرَفِ ثِيَابِي فَوَضَعْتُهَا إِلَى جَنْبِهِ وَأَعْرَضْتُ عَنْهُ، فَلَمَّا قَضَى أَتْبَعَهُ بِهِنَّ‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বের হলে আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। আর তিনি এদিক-ওদিক চাইতেন না। যখন আমি তাঁর নিকটবর্তী হলাম তখন তিনি আমাকে বললেনঃ ‘আমাকে কিছু পাথর কুড়িয়ে দাও, আমি তা দিয়ে শৌচকার্য সারবো’ (বর্ণনাকারী বলেন), বা এ ধরনের কোন কথা বললেন, আর আমার জন্য হাড্ডি বা গোবর আনবে না।’ তখন আমি আমার কাপড়ের কোচায় করে কয়েকটি পাথর এনে তাঁর পাশে রেখে আমি তাঁর নিকট হতে সরে গেলাম। তিনি প্রয়োজন মিটিয়ে সেগুলো কাজে লাগালেন।
(৩৮৬০ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২১. অধ্যায়ঃ
গোবর দ্বারা শৌচকার্য না করা।
১৫৬
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، قَالَ لَيْسَ أَبُو عُبَيْدَةَ ذَكَرَهُ وَلَكِنْ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ الأَسْوَدِ عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ سَمِعَ عَبْدَ اللَّهِ، يَقُولُ أَتَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْغَائِطَ، فَأَمَرَنِي أَنْ آتِيَهُ بِثَلاَثَةِ أَحْجَارٍ، فَوَجَدْتُ حَجَرَيْنِ، وَالْتَمَسْتُ الثَّالِثَ فَلَمْ أَجِدْهُ، فَأَخَذْتُ رَوْثَةً، فَأَتَيْتُهُ بِهَا، فَأَخَذَ الْحَجَرَيْنِ وَأَلْقَى الرَّوْثَةَ وَقَالَ ‏ “‏ هَذَا رِكْسٌ ‏”‏‏.‏ وَقَالَ إِبْرَاهِيمُ بْنُ يُوسُفَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা শৌচ কাজে যাবার সময় তিনটি পাথর কুড়িয়ে দিতে আমাকে নির্দেশ করলেন। তখন আমি দু’টি পাথর পেলাম এবং আরেকটি খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। তাই একখন্ড শুকনো গোবর নিয়ে তাঁর নিকট গেলাম। তিনি পাথর দু’টি নিলেন এবং গোবর খন্ড ফেলে দিয়ে বললেন, এটা অপবিত্র।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৩)
ইব্‌রাহীম ইব্‌নু ইউসুফ (রহঃ), তার পিতা, আবূ ইসহাক (রহঃ), ‘আবদুর রহমান (রহঃ)-এর সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেন। (ই.ফা. ১৫৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২২. অধ্যায়ঃ
উযূর মধ্যে একবার করে ধৌত করা।
১৫৭
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ تَوَضَّأَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مَرَّةً مَرَّةً‏.‏
ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক উযূতে একবার করে ধুয়েছেন।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৫৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৩. অধ্যায়ঃ
উযূতে দু’বার করে ধোয়া।
১৫৮
حَدَّثَنَا حُسَيْنُ بْنُ عِيسَى، قَالَ حَدَّثَنَا يُونُسُ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا فُلَيْحُ بْنُ سُلَيْمَانَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ عَمْرِو بْنِ حَزْمٍ، عَنْ عَبَّادِ بْنِ تَمِيمٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم تَوَضَّأَ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ
‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উযূতে দু’বার করে ধুয়েছেন।’
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৪. অধ্যায়ঃ
উযূতে তিনবার করে ধোয়া।
১৫৯
حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ الأُوَيْسِيُّ، قَالَ حَدَّثَنِي إِبْرَاهِيمُ بْنُ سَعْدٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّ عَطَاءَ بْنَ يَزِيدَ، أَخْبَرَهُ أَنَّ حُمْرَانَ مَوْلَى عُثْمَانَ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، رَأَى عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ دَعَا بِإِنَاءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى كَفَّيْهِ ثَلاَثَ مِرَارٍ فَغَسَلَهُمَا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَمِينَهُ فِي الإِنَاءِ فَمَضْمَضَ، وَاسْتَنْشَقَ، ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا، وَيَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ ثَلاَثَ مِرَارٍ، ثُمَّ مَسَحَ بِرَأْسِهِ، ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَيْهِ ثَلاَثَ مِرَارٍ إِلَى الْكَعْبَيْنِ، ثُمَّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، لاَ يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏‏.
হুমরান (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি ‘উসমান ইব্‌নু আফ্‌ফান (রাঃ)-কে দেখেছেন যে, তিনি পানির পাত্র আনিয়ে উভয় হাতের তালুতে তিনবার ঢেলে তা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর ডান হাত পাত্রের মধ্যে ঢুকালেন। তারপর কুলি করলেন ও নাকে পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করলেন। তারপর তাঁর মুখমন্ডল তিনবার ধুয়ে এবং দু’হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। অতঃপর মাথা মাস্‌হ করলেন। অতঃপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। পরে বললেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার মত এ রকম উযূ করবে, অতঃপর দু’রাক’আত সালাত আদায় করবে, যাতে দুনিয়ার কোন খেয়াল করবে না, তার পূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে।
(১৬০, ১৬৪, ১৯৩৪, ৬৪৩৩; মুসলিম ২/৩, হাঃ ২২৬, আহমাদ ৪৯৩, ৫১৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৬০
وَعَنْ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ قَالَ صَالِحُ بْنُ كَيْسَانَ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَلَكِنْ عُرْوَةُ يُحَدِّثُ عَنْ حُمْرَانَ،، فَلَمَّا تَوَضَّأَ عُثْمَانُ قَالَ أَلاَ أُحَدِّثُكُمْ حَدِيثًا لَوْلاَ آيَةٌ مَا حَدَّثْتُكُمُوهُ، سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏”‏ لاَ يَتَوَضَّأُ رَجُلٌ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ، وَيُصَلِّي الصَّلاَةَ إِلاَّ غُفِرَ لَهُ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الصَّلاَةِ حَتَّى يُصَلِّيَهَا ‏”‏‏.‏ قَالَ عُرْوَةُ الآيَةُ ‏{‏إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ‏}‏‏.‏
ইব্‌নু শিহাব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, ‘উরওয়াহ হুমরান থেকে বর্ণনা করেন, ‘উসমান (রাঃ) উযূ করে বললেন, আমি তোমাদের নিকট একটি হাদীস পেশ করবো। যদি একটি আয়াতে কারীমা না হতো, তবে আমি তোমাদের নিকট এ হাদীস বলতাম না। আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, যে কোন ব্যক্তি সুন্দর করে উযূ করবে এবং সালাত আদায় করবে, পরবর্তী সালাত আদায় করা পর্যন্ত তার মধ্যবর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। ‘উরওয়াহ (রহঃ) বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ‏
সে আয়াতটি হলো : “আমি যে সব স্পষ্ট নিদর্শন অবতীর্ণ করেছি তা যারা গোপন করে…।” (সূরা বাক্বারাহ : ১৫৯)
(১৫৯; মুসলিম ২/৪, হাঃ ২২৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৬ শেষাংশ, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬১ শেষাংশ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৫. অধ্যায়ঃ
উযূতে নাকে পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করা।
‘উসমান (রাঃ), ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) ও ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে এ কথা বর্ণনা করেছেন।
১৬১
حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا يُونُسُ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبُو إِدْرِيسَ، أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ ‏ “‏ مَنْ تَوَضَّأَ فَلْيَسْتَنْثِرْ، وَمَنِ اسْتَجْمَرَ فَلْيُوتِرْ ‏”‏‏.
আবূ ইদরিস (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে বলতে শুনেছেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি উযূ করে সে যেন নাকে পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করে। আর যে শৌচকার্য করে সে যেন বিজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করে।
(১৬২; মুসলিম ২/৮, হাঃ ২৩৭, আহমাদ ১০৭২৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৬. অধ্যায়ঃ
(শৌচকার্যের জন্য) বিজোড় সংখ্যক ঢিলা ব্যবহার করা
১৬২
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا تَوَضَّأَ أَحَدُكُمْ فَلْيَجْعَلْ فِي أَنْفِهِ ثُمَّ لِيَنْثُرْ، وَمَنِ اسْتَجْمَرَ فَلْيُوتِرْ، وَإِذَا اسْتَيْقَظَ أَحَدُكُمْ مِنْ نَوْمِهِ فَلْيَغْسِلْ يَدَهُ قَبْلَ أَنْ يُدْخِلَهَا فِي وَضُوئِهِ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ لاَ يَدْرِي أَيْنَ بَاتَتْ يَدُهُ ‏”‏‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উযূ করে তখন সে যেন তার নাকে পানি দিয়ে ঝাড়ে। আর যে শৌচকার্য করে সে যেন বিজোড় সংখ্যায় ঢিলা ব্যবহার করে। আর তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে জাগে তখন সে যেন উযূর পানিতে হাত ঢুকানোর পূর্বে তা ধুয়ে নেয়; কারণ তোমাদের কেউ জানে না যে, ঘুমন্ত অবস্থায় তার হাত কোথায় থাকে।
(১৬১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৭. অধ্যায়ঃ
দু’পা ধৌত করা এবং তা মাসহ্ না করা।
১৬৩
حَدَّثَنَا مُوسَى، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو عَوَانَةَ، عَنْ أَبِي بِشْرٍ، عَنْ يُوسُفَ بْنِ مَاهَكَ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ تَخَلَّفَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَنَّا فِي سَفْرَةٍ سَافَرْنَاهَا، فَأَدْرَكَنَا وَقَدْ أَرْهَقْنَا الْعَصْرَ، فَجَعَلْنَا نَتَوَضَّأُ وَنَمْسَحُ عَلَى أَرْجُلِنَا، فَنَادَى بِأَعْلَى صَوْتِهِ ‏ “‏ وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ ‏”‏‏.‏ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا‏.‏
‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সফরে আমাদের পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন, অতঃপর তিনি আমাদের নিকট পৌঁছে গেলেন। তখন আমরা আসরের সালাত শুরু করতে দেরী করে ফেলেছিলাম। তাই আমরা উযূ করছিলাম এবং (তাড়াতাড়ির কারণে) আমাদের পা মাস্‌হ করার মতো হালকাভাবে ধুয়ে নিচ্ছিলাম। তখন তিনি উচ্চৈস্বঃরে বললেনঃ ‘পায়ের গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের শাস্তি রয়েছে।’ দু’বার অথবা তিনবার তিনি একথার পুনরাবৃত্তি করলেন।
(৬০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৫৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৮. অধ্যায়ঃ
উযূর সময় কুলি করা।
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) ও ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে তা বর্ণনা করেছেন।
১৬৪
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي عَطَاءُ بْنُ يَزِيدَ، عَنْ حُمْرَانَ، مَوْلَى عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ أَنَّهُ رَأَى عُثْمَانَ دَعَا بِوَضُوءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى يَدَيْهِ مِنْ إِنَائِهِ، فَغَسَلَهُمَا ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَمِينَهُ فِي الْوَضُوءِ، ثُمَّ تَمَضْمَضَ، وَاسْتَنْشَقَ، وَاسْتَنْثَرَ، ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا وَيَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ ثَلاَثًا، ثُمَّ مَسَحَ بِرَأْسِهِ، ثُمَّ غَسَلَ كُلَّ رِجْلٍ ثَلاَثًا، ثُمَّ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا وَقَالَ ‏ “‏ مَنْ تَوَضَّأَ نَحْوَ وُضُوئِي هَذَا ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، لاَ يُحَدِّثُ فِيهِمَا نَفْسَهُ، غَفَرَ اللَّهُ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏‏.
‘উসমান ইব্‌নু ‘আফ্‌ফান (রাঃ)-এর মুক্ত করা দাস হুমরান (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি ‘উসমান (রাঃ)-কে উযূর পানি আনাতে দেখলেন। অতঃপর তিনি সে পাত্র হতে উভয় হাতের উপর পানি ঢেলে তা তিনবার ধুলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাত পানিতে ঢুকালেন। অতঃপর কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়লেন। অতঃপর তাঁর মুখমন্ডল তিনবার এবং উভয় হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন, অতঃপর মাথা মাস্‌হ করলেন। অতঃপর উভয় পা তিনবার ধোয়ার পর বললেনঃ আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমার এ উযূর ন্যায় উযূ করতে দেখেছি এবং আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি আমার এ উযূর ন্যায় উযূ করে দু’রাক’আত সালাত আদায় করবে এবং তার মধ্যে অন্য কোন চিন্তা মনে আনবে না, আল্লাহ্ তা’আলা তার পূর্বকৃত সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’
(১৫৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/২৯. অধ্যায়ঃ
গোড়ালি ধোয়া।
১৬৫
حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِي إِيَاسٍ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ زِيَادٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا هُرَيْرَةَ ـ وَكَانَ يَمُرُّ بِنَا وَالنَّاسُ يَتَوَضَّئُونَ مِنَ الْمِطْهَرَةِ ـ قَالَ أَسْبِغُوا الْوُضُوءَ فَإِنَّ أَبَا الْقَاسِمِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ وَيْلٌ لِلأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ ‏
মুহাম্মাদ ইব্‌নু যিয়াদ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) আমাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। লোকেরা সে সময় পাত্র থেকে উযূ করছিল। তখন তাঁকে বলতে শুনেছি, তোমরা উত্তমরূপে উযূ কর। কারণ আবুল কাসিম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ পায়ের গোড়ালিগুলোর জন্য জাহান্নামের ‘আযাব রয়েছে।
(মুসলিম ২/৯, হাঃ ২৪২, আহমাদ ৯২৭৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩০. অধ্যায়ঃ
জুতা পরা অবস্থায় উভয় পা ধুতে হবে জুতার উপর মাস্‌হ করা যাবে না।
১৬৬
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ عُبَيْدِ بْنِ جُرَيْجٍ، أَنَّهُ قَالَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ يَا أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ، رَأَيْتُكَ تَصْنَعُ أَرْبَعًا لَمْ أَرَ أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِكَ يَصْنَعُهَا‏.‏ قَالَ وَمَا هِيَ يَا ابْنَ جُرَيْجٍ قَالَ رَأَيْتُكَ لاَ تَمَسُّ مِنَ الأَرْكَانِ إِلاَّ الْيَمَانِيَيْنِ، وَرَأَيْتُكَ تَلْبَسُ النِّعَالَ السِّبْتِيَّةَ، وَرَأَيْتُكَ تَصْبُغُ بِالصُّفْرَةِ، وَرَأَيْتُكَ إِذَا كُنْتَ بِمَكَّةَ أَهَلَّ النَّاسُ إِذَا رَأَوُا الْهِلاَلَ وَلَمْ تُهِلَّ أَنْتَ حَتَّى كَانَ يَوْمُ التَّرْوِيَةِ‏.‏ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ أَمَّا الأَرْكَانُ فَإِنِّي لَمْ أَرَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَمَسُّ إِلاَّ الْيَمَانِيَيْنِ، وَأَمَّا النِّعَالُ السِّبْتِيَّةُ فَإِنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَلْبَسُ النَّعْلَ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا شَعَرٌ وَيَتَوَضَّأُ فِيهَا، فَأَنَا أُحِبُّ أَنْ أَلْبَسَهَا، وَأَمَّا الصُّفْرَةُ فَإِنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَصْبُغُ بِهَا، فَأَنَا أُحِبُّ أَنْ أَصْبُغَ بِهَا، وَأَمَّا الإِهْلاَلُ فَإِنِّي لَمْ أَرَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُهِلُّ حَتَّى تَنْبَعِثَ بِهِ رَاحِلَتُهُ
‘উবায়দ ইব্‌নু জুরায়জ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি ‘আবদুল্লাহ্ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ)-কে বললেন, ‘হে আবূ ‘আবদুর রহমান! আমি আপনাকে এমন চারটি কাজ করতে দেখি, যা আপনার অন্য কোন সাথীকে দেখি না।’ তিনি বললেন, ‘ইব্‌নু জুরায়জ, সেগুলো কী?’ তিনি বললেন, আমি দেখি, (১) আপনি ত্বওয়াফ করার সময় দুই রুকনে ইয়ামানী ব্যতীত অন্য রুক্‌ন স্পর্শ করেন না। (২) আপনি ‘সিবতী’ (পশমবিহীন) জুতা পরিধান করেন; (৩) আপনি (কাপড়ে) হলুদ রং ব্যবহার করেন এবং (৪) আপনি যখন মক্কায় থাকেন লোকে চাঁদ দেখে ইহ্‌রাম বাঁধে; কিন্তু আপনি তারবিয়ার দিন (৮ই যিলহজ্জ) না এলে ইহরাম বাঁধেন না। ‘আবদুল্লাহ্ (রাঃ) বললেনঃ রুক্‌নের কথা যা বলেছ, তা এজন্য করি যে আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ইয়ামানী রুকনদ্বয় ব্যতীত আর কোনটি স্পর্শ করতে দেখিনি। আর ‘সিবতী’ জুতা, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সিবতী জুতা পরতে এবং তা পরিহিত অবস্থায় উযূ করতে দেখেছি, তাই আমি তা পরতে ভালবাসি। আর হলুদ রং, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা দিয়ে কাপড় রঙিন করতে দেখেছি, তাই আমিও তা দিয়ে রঙিন করতে ভালবাসি। আর ইহরাম, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে তাঁর সওয়ারী রওনা না হওয়া পর্যন্ত আমি তাঁকে ইহরাম বাঁধতে দেখিনি।
(১৫১৪, ১৫৫২, ১৬০৯, ২৮৬৫, ৫৮৫১; মুসলিম ১৫/৫, হাঃ ১১৮৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩১. অধ্যায়ঃ
উযূ এবং গোসল ডান দিক থেকে শুরু করা ।
১৬৭
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنَا خَالِدٌ، عَنْ حَفْصَةَ بِنْتِ سِيرِينَ، عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ، قَالَتْ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم لَهُنَّ فِي غُسْلِ ابْنَتِهِ ‏ “‏ ابْدَأْنَ بِمَيَامِنِهَا وَمَوَاضِعِ الْوُضُوءِ مِنْهَا ‏”‏‏
উম্মু আতিয়্যাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মেয়ে [ যায়নাব (রাঃ) ]-কে গোসল করানোর সময় তাঁদের বলেছিলেনঃ তোমরা তার ডান দিক হতে এবং উযূর অংগ হতে আরম্ভ কর।
(১২৫৩ হতে ১২৬৩ পর্যন্ত) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৬৮
حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَشْعَثُ بْنُ سُلَيْمٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَبِي، عَنْ مَسْرُوقٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِي تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُورِهِ وَفِي شَأْنِهِ كُلِّهِ‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা পরা, চুল আচঁড়ানো এবং পবিত্রতা অর্জন করা তথা প্রত্যেক কাজই ডান দিক হতে আরম্ভ করতে পছন্দ করতেন।
(৪২৬, ৫৩৮০, ৫৮৫৪, ৫৯২৬; মুসলিম ১৫/৫, হাঃ ১১৮৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৬৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩২. অধ্যায়ঃ
সালাতের সময় হলে উযূর পানি অনুসন্ধান করা।
আয়িশা (রাঃ) বলেনঃ একবার ফজরের সময় হল, তখন পানি তালাশ করা হল; কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না । তখন তায়াম্মুম (এর আয়াত) নাযিল হল ।
১৬৯
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ إِسْحَاقَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي طَلْحَةَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّهُ قَالَ رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَحَانَتْ صَلاَةُ الْعَصْرِ، فَالْتَمَسَ النَّاسُ الْوَضُوءَ فَلَمْ يَجِدُوهُ، فَأُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِوَضُوءٍ، فَوَضَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي ذَلِكَ الإِنَاءِ يَدَهُ، وَأَمَرَ النَّاسَ أَنْ يَتَوَضَّئُوا مِنْهُ‏.‏ قَالَ فَرَأَيْتُ الْمَاءَ يَنْبُعُ مِنْ تَحْتِ أَصَابِعِهِ حَتَّى تَوَضَّئُوا مِنْ عِنْدِ آخِرِهِمْ‏.‏
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দেখলাম, তখন আসরের সালাতের সময় হয়ে গিয়েছিল। আর লোকজন উযূর পানি খুঁজতে লাগল কিন্তু পেল না। তারপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কিছু পানি আনা হল। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে পাত্রে তাঁর হাত রাখলেন এবং লোকজনকে তা থেকে উযূ করতে বললেন। আনাস (রাঃ) বলেন, সে সময় আমি দেখলাম, তাঁর আঙ্গুলের নীচ থেকে পানি উপচে পড়ছে। এমনকি তাদের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত তার দ্বারা উযূ করল।
(১৯৫, ২০০, ৩৫৭২ হতে ৩৫৭৫ পর্যন্ত; মুসলিম ৪৩/৩, হাঃ ২২৭৯, আহমাদ ১২৪৯৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৩.১. অধ্যায়ঃ
যে পানি দিয়ে মানুষের চুল ধোয়া হয়।
‘আত্বা (রহঃ) চুল দিয়ে সুতা এবং রশি প্রস্তুত করায় দোষের কিছু মনে করতেন না। কুকুরের ঝুটা এবং মসজিদের ভিতর দিয়ে কুকুরের যাতায়াত সম্পর্কে যূহরী (রহঃ) বলেন, কুকুর যখন কোন পানির পাত্রে মুখ দেয় এবং ঊযূ করার জন্য সে পানি ব্যতীত অন্য কোন পানি না থাকে, তবে তা দিয়েই উযূ করবে। সুফিয়ান (রহঃ) বলেন, হুবুহু এ মাসআলাটি বিধৃত হয়েছে আল্লাহ তা’আলার এ বাণীতে النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا “তারপর তোমরা যদি পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম কর।” আর এ তো পানিই । কিন্তু অন্তরে যেহেতু কিছু সন্দেহ রয়েছে তাই তা দিয়ে উযূ করবে, পরে তায়াম্মুমও করবে।
১৭০
حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا إِسْرَائِيلُ، عَنْ عَاصِمٍ، عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، قَالَ قُلْتُ لِعَبِيدَةَ عِنْدَنَا مِنْ شَعَرِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَصَبْنَاهُ مِنْ قِبَلِ أَنَسٍ، أَوْ مِنْ قِبَلِ أَهْلِ أَنَسٍ فَقَالَ لأَنْ تَكُونَ عِنْدِي شَعَرَةٌ مِنْهُ أَحَبُّ إِلَىَّ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيهَا‏.‏
ইব্‌নু সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি আবীদাকে বললাম, আমাদের নিকট নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুল রয়েছে যা আমরা আনাস (রাঃ)-এর নিকট হতে কিংবা আনাস (রাঃ)-এর পরিবারের নিকট হতে পেয়েছি। তিনি বললেন, তাঁর একটি চুল আমার নিকট থাকাটা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা অর্জনের চেয়ে অধিক পছন্দের।
(১৭১ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭১
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحِيمِ، قَالَ أَخْبَرَنَا سَعِيدُ بْنُ سُلَيْمَانَ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبَّادٌ، عَنِ ابْنِ عَوْنٍ، عَنِ ابْنِ سِيرِينَ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمَّا حَلَقَ رَأْسَهُ كَانَ أَبُو طَلْحَةَ أَوَّلَ مَنْ أَخَذَ مِنْ شَعَرِهِ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মাথা মুন্ডন করলে আবূ তালহা (রাঃ)-ই প্রথমে তাঁর চুল সংগ্রহ করেন।
(১৭০; মুসলিম ১৫/৫৬, হাঃ ১৩০৫, আহমাদ ১২০৯৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৩.২. অধ্যায়ঃ
কুকুর যদি পাত্র হতে পানি পান করে ।
১৭২
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ أَبِي الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعًا ‏”‏‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর পান করে তা যেন সাতবার ধুয়ে নেয়।
(মুসলিম ২/২৭, হাঃ ২৭৯, আহমাদ ৭৩৫০, ৭৩৫১,৭৪৫১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৩
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ، أَخْبَرَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ، سَمِعْتُ أَبِي، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ أَنَّ رَجُلاً رَأَى كَلْبًا يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ الْعَطَشِ، فَأَخَذَ الرَّجُلُ خُفَّهُ فَجَعَلَ يَغْرِفُ لَهُ بِهِ حَتَّى أَرْوَاهُ، فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَأَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ ‏”
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ (পূর্ব যুগে) জনৈক ব্যক্তি একটি কুকুরকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ভিজা মাটি চাটতে দেখতে পেয়ে তার মোজা নিল এবং কুকুরটির জন্য কুয়া হতে পানি এনে দিতে লাগল যতক্ষণ না সে ওর তৃষ্ণা মিটাল। আল্লাহ্‌ এর বিনিময় দিলেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।
(২৩৬৩, ২৪৬৬, ৬০০৯ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৬৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৪
وَقَالَ أَحْمَدُ بْنُ شَبِيبٍ حَدَّثَنَا أَبِي، عَنْ يُونُسَ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ حَدَّثَنِي حَمْزَةُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كَانَتِ الْكِلاَبُ تَبُولُ وَتُقْبِلُ وَتُدْبِرُ فِي الْمَسْجِدِ فِي زَمَانِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَلَمْ يَكُونُوا يَرُشُّونَ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যামানায় কুকুর মসজিদের ভিতর দিয়ে আসা-যাওয়া করত অথচ এজন্য তাঁরা কোথাও পানি ছিটিয়ে দিতেন না।
(আ.প্র. ১৬৯ শেষাংশ, ই.ফা. ১৭৪ শেষাংশ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৫
حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ عُمَرَ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنِ ابْنِ أَبِي السَّفَرِ، عَنِ الشَّعْبِيِّ، عَنْ عَدِيِّ بْنِ حَاتِمٍ، قَالَ سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ إِذَا أَرْسَلْتَ كَلْبَكَ الْمُعَلَّمَ فَقَتَلَ فَكُلْ، وَإِذَا أَكَلَ فَلاَ تَأْكُلْ، فَإِنَّمَا أَمْسَكَهُ عَلَى نَفْسِهِ ‏”‏‏.‏ قُلْتُ أُرْسِلُ كَلْبِي فَأَجِدُ مَعَهُ كَلْبًا آخَرَ قَالَ ‏”‏ فَلاَ تَأْكُلْ، فَإِنَّمَا سَمَّيْتَ عَلَى كَلْبِكَ، وَلَمْ تُسَمِّ عَلَى كَلْبٍ آخَرَ
‘আদী ইব্‌নু হাতিম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আমি (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর সম্পর্কে) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেনঃ তুমি যখন তোমার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর শিকার ধরতে ছেড়ে দাও, তখন সে হত্যা করলে তা তুমি খেতে পারো। আর সে তার অংশবিশেষ খেয়ে ফেললে তুমি তা খাবে না। কারণ সে তা নিজের জন্যই শিকার করেছে। আমি বললামঃ কখনো কখনো আমি আমার কুকুর (শিকারে) পাঠিয়ে দেই, অতঃপর তার সঙ্গে অন্য এক কুকুরও দেখতে পাই (এমতাবস্থায় শিকারকৃত প্রাণীর কী হুকুম)? তিনি বললেনঃ তবে খেও না। কারণ তুমি বিসমিল্লাহ্‌ বলেছো কেবল তোমার কুকুরের বেলায়, অন্য কুকুরের বেলায় বিসমিল্লাহ্‌ বলোনি।
(২০৫৪, ৫৪৭৫, ৫৪৭৬, ৫৪৭৭, ৫৪৮৩ হতে ৫৪৮৭,৭৩৯৭ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৪/৩৪. অধ্যায়ঃ
সামনের এবং পেছনের রাস্তা দিয়ে কিছু নির্গত হওয়া ব্যতীত অন্য কারণে যিনি উযূর প্রয়োজন মনে করেন না।
আল্লাহ্ তা’আলার এ বাণীর কারণেঃ أَو جاَ ءَ أَحَدٌ مِنكُم مِنَ الغاَئِطِ “অথবা তোমাদের কেউ শৌচাগার হতে আসে।” (সূরা আন-নিসা ৪/৪৩)
‘আত্বা (রহঃ) বলেন, যার পেছনের রাস্তা দিয়ে পোকা বের হয় অথবা যার পুরুষাঙ্গ দিয়ে উকুনের ন্যায় কিছু বের হয়, তার পুনরায় উযূ করতে হবে।
জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, কেউ সালাত অবস্থায় হেসে ফেললে পুনরায় শুধুমাত্র সালাতই আদায় করবে, পুনঃ উযু করবে না। হাসান (রাঃ) বলেন, কেউ যদি চুল অথবা নখ কাটে অথবা তার মোজা খুলে ফেলে তবে তার পুনরায় উযূ করতে হবে না। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, ‘হাদাস’ ব্যতীত অন্য কিছুতে উযূর প্রয়োজন নেই। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত । নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘যাতুর রিকা’-এর যুদ্ধে ছিলেন। সেখানে জনৈক ব্যক্তি তীরবিদ্ধ হলেন এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল,কিন্তু তিনি (সে অবস্থায়ই) রুকূ করলেন, সাজদা করলেন এবং সালাত আদায় করতে লাগলেন। হাসান (রহঃ) বলেন, মুসলিমগণ সব সময়ই তাদের যখম অবস্থায় সালাত আদায় করতেন এবং তাঊস (রহঃ), মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী (রহঃ), আত্বা (রহঃ) ও হিজাযবাসীগণ বলেন, রক্তক্ষরণে উযূ করতে হয় না। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) একদা একটি ছোট ফোড়াঁ টিপ দিলেন, তা থেকে রক্ত বের হল, কিন্তু তিনি উযূ করলেন না । ইব্‌নু আবূ আওফা (রাঃ) রক্ত মিশ্রিত থুতু ফেললেন কিন্তু তিনি সালাত আদায় করতে থাকলেন। ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) ও হাসান (রহঃ) বলেন, কেউ শিঙ্গা লাগালে কেবল তার শিঙ্গা লাগানো স্থানই ধুয়ে ফেলা দরকার।
১৭৬
حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِي إِيَاسٍ، قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ لاَ يَزَالُ الْعَبْدُ فِي صَلاَةٍ مَا كَانَ فِي الْمَسْجِدِ يَنْتَظِرُ الصَّلاَةَ، مَا لَمْ يُحْدِثْ ‏”‏‏.‏ فَقَالَ رَجُلٌ أَعْجَمِيٌّ مَا الْحَدَثُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ الصَّوْتُ‏.‏ يَعْنِي الضَّرْطَةَ‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ বান্দা যে সময়টা মসজিদে সালাতের অপেক্ষায় থাকে, তার সে পুরো সময়টাই সালাতের মধ্যে গণ্য হয় যতক্ষণ না সে হাদাস করে। জনৈক অনারব বলল, হে আবূ হুরায়রা ! ‘হাদাস কি?’ তিনি বললেন, ‘শব্দ করে বায়ু বের হওয়া।’
(৪৪৫, ৪৭৭, ৬৪৭, ৬৪৮, ৬৫৯, ২১১৯, ৩২২৯, ৪৭১৭ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৭
حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ، قَالَ حَدَّثَنَا ابْنُ عُيَيْنَةَ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ عَبَّادِ بْنِ تَمِيمٍ، عَنْ عَمِّهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ لاَ يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا ‏”‏‏.
‘আব্বাস ইব্‌নু তামীম (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি তাঁর চাচার সূত্রে বর্ণনা করেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ (কোন মুসল্লী) সালাত থেকে সরে থাকবে না যতক্ষণ না সে শব্দ শুনতে পায় কিংবা গন্ধ পায়।
(১৩৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৮
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ مُنْذِرٍ أَبِي يَعْلَى الثَّوْرِيِّ، عَنْ مُحَمَّدٍ ابْنِ الْحَنَفِيَّةِ، قَالَ قَالَ عَلِيٌّ كُنْتُ رَجُلاً مَذَّاءً، فَاسْتَحْيَيْتُ أَنْ أَسْأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَمَرْتُ الْمِقْدَادَ بْنَ الأَسْوَدِ فَسَأَلَهُ فَقَالَ ‏ “‏ فِيهِ الْوُضُوءُ ‏”‏‏.‏ وَرَوَاهُ شُعْبَةُ عَنِ الأَعْمَشِ‏.
মুহাম্মাদ ইব্‌নুল হানাফিয়্যাহ (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আলী (রাঃ) বলেছেন, আমার অধিক পরিমাণে মযী বের হতো। কিন্তু আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করছিলাম। তাই আমি মিকদাদ ইব্‌নু আসওয়াদ (রাঃ) কে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-নিকট জিজ্ঞেস করেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বলেনঃ এতে শুধু উযূ করতে হয়। হাদীসটি শু’বাহ (রহঃ) আ’মাশ (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।
(১৩২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৭৯
حَدَّثَنَا سَعْدُ بْنُ حَفْصٍ، حَدَّثَنَا شَيْبَانُ، عَنْ يَحْيَى، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، أَنَّ عَطَاءَ بْنَ يَسَارٍ، أَخْبَرَهُ أَنْ زَيْدَ بْنَ خَالِدٍ أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، سَأَلَ عُثْمَانَ بْنَ عَفَّانَ ـ رضى الله عنه ـ قُلْتُ أَرَأَيْتَ إِذَا جَامَعَ فَلَمْ يُمْنِ قَالَ عُثْمَانُ يَتَوَضَّأُ كَمَا يَتَوَضَّأُ لِلصَّلاَةِ، وَيَغْسِلُ ذَكَرَهُ‏.‏ قَالَ عُثْمَانُ سَمِعْتُهُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏ فَسَأَلْتُ عَنْ ذَلِكَ عَلِيًّا، وَالزُّبَيْرَ، وَطَلْحَةَ، وَأُبَىَّ بْنَ كَعْبٍ ـ رضى الله عنهم ـ فَأَمَرُوهُ بِذَلِكَ‏.‏
যায়দ ইব্‌নু খালিদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি ‘উসমান ইব্‌নু আফফান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেনঃ কেউ যদি স্ত্রী সহবাস করে, কিন্তু মনী (বীর্য) বের না হয় (তবে তার হুকুম কী)? ‘উসমান (রাঃ) বললেনঃ ‘সে সালাতের ন্যায় উযূ করে নেবে এবং তার লজ্জাস্থান ধুয়ে ফেলবে। উসমান (রাঃ) বলেন, আমি এ কথা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনেছি। (যায়দ বলেন) তারপর আমি এ সম্পর্কে আলী (রাঃ), যুবায়র (রাঃ), তালহা (রাঃ) ও উবাই ইব্‌নু কা’ব (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা আমাকে এ নির্দেশেই দিয়েছেন। [১]
(২৯২; মুসলিম ৩/২১, হাঃ ৩৪৭, আহমাদ ৪৫৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭৯)
[১] হাদীসগুলোর হুকুম মানসুখ হয়ে গেছে। ইসলামিক প্রাথমিক যুগে তা বৈধ ছিল। পুরুষাঙ্গের অগ্রভাগ সামান্যও যদি স্ত্রীর যোনীতে প্রবেশ করে তাহলে বীর্যপাত হোক না হোক গোসল ফরয হয়ে যায়।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৮০
حَدَّثَنَا إِسْحَاقُ، قَالَ أَخْبَرَنَا النَّضْرُ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ ذَكْوَانَ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرْسَلَ إِلَى رَجُلٍ مِنَ الأَنْصَارِ فَجَاءَ وَرَأْسُهُ يَقْطُرُ، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لَعَلَّنَا أَعْجَلْنَاكَ ‏”‏‏.‏ فَقَالَ نَعَمْ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِذَا أُعْجِلْتَ أَوْ قُحِطْتَ، فَعَلَيْكَ الْوُضُوءُ ‏”‏‏.‏ تَابَعَهُ وَهْبٌ قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ‏.‏ قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ وَلَمْ يَقُلْ غُنْدَرٌ وَيَحْيَى عَنْ شُعْبَةَ الْوُضُوءُ‏.‏
আবূ সা’ঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনৈক আনসারীর নিকট লোক পাঠালেন। তিনি আসলেন। তখন তাঁর মাথা থেকে পানির ফোঁটা ঝরছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ‘সম্ভবত আমরা তোমাকে তাড়াহুড়া করতে বাধ্য করেছি।’ তিনি বললেন, ‘জ্বী’। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ যখন তাড়াহুড়ার কারণে মনী বের না হবে (অথবা বললেন), মনীর অভাবজনিত কারণে তা বের না হবে তখন উযূ করে নিবে। ওয়াহ্‌ব (রহঃ) শু’বাহ (রহঃ) সূত্রে এ রকমই বর্ণনা করেন। তিনি [শু’বাহ (রহঃ)] বলেন, আবূ ‘আব্দুল্লাহ (রহঃ) বলেছেনঃ গুনদার (রহঃ) ও ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) শু’বাহ (রহঃ)- এর সূত্রে বর্ণনায় উযূর কথা উল্লেখ করেননি। [২]
(মুসলিম ৩/২১, হাঃ ৩৪৫, আহমাদ ১১১৬২, ১১২০৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮০)
[২] এটি পূর্বের হুকুম যা পরে রহিত হয়ে গেছে।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৫. অধ্যায়ঃ
নিজের সাথীকে উযূ করিয়ে দেয়া ।
১৮১
حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ سَلاَمٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، عَنْ يَحْيَى، عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ، عَنْ كُرَيْبٍ، مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمَّا أَفَاضَ مِنْ عَرَفَةَ عَدَلَ إِلَى الشِّعْبِ، فَقَضَى حَاجَتَهُ‏.‏ قَالَ أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ فَجَعَلْتُ أَصُبُّ عَلَيْهِ وَيَتَوَضَّأُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتُصَلِّي فَقَالَ ‏ “‏ الْمُصَلَّى أَمَامَكَ ‏”‏‏.‏
‘উসামা ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ‘আরাফা হতে ফিরছিলেন, তখন তিনি একটি গিরিপথের দিকে গিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিলেন। উসামা (রাঃ) বলেন, পরে আমি তাঁকে পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম আর তিনি উযূ করেছিলেন। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল ! আপনি কি সালাত আদায় করবেন? তিনি বললেনঃ সালাতের স্থান তোমার সম্মুখে (অর্থাৎ মুযদালিফায়)।’
(১৩৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৮২
حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ عَلِيٍّ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ، قَالَ سَمِعْتُ يَحْيَى بْنَ سَعِيدٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي سَعْدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، أَنَّ نَافِعَ بْنَ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ، أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، سَمِعَ عُرْوَةَ بْنَ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، يُحَدِّثُ عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، أَنَّهُ كَانَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي سَفَرٍ، وَأَنَّهُ ذَهَبَ لِحَاجَةٍ لَهُ، وَأَنَّ مُغِيرَةَ جَعَلَ يَصُبُّ الْمَاءَ عَلَيْهِ، وَهُوَ يَتَوَضَّأُ، فَغَسَلَ وَجْهَهُ وَيَدَيْهِ وَمَسَحَ بِرَأْسِهِ وَمَسَحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ‏.‏
মুগীরা ইব্‌নু শু’বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি কোন এক সফরে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সাথে ছিলেন। এক সময় তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেলেন। (প্রয়োজন সেরে আসার পর) মুগীরা (রাঃ) তাঁকে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন এবং তিনি উযূ করছিলেন। তিনি তাঁর মুখমন্ডল এবং দু’হাত ধুলেন এবং তাঁর মাথা মাস্‌হ করলেন ও উভয় মোজার উপর মাস্‌হ করলেন।
(২০৩, ২০৬, ৩৬৩, ৩৮৮, ২৯১৮, ৪৪২১, ৫৭৯৮, ৫৭৯৯; মুসলিম ২/২২, হাঃ ২৭৪, আহমাদ ১৮১৮৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৬. অধ্যায়ঃ
বিনা উযূতে কুরআন প্রভৃতি পাঠ।
ইবরাহীম (রহঃ) বর্ণনা করেনঃ বিনা উযূতে গোসলখানায় (কুরআন) পাঠ এবং পত্র লেখায় কোন দোষ নেই। হাম্মাদ (রহঃ) ইবরাহীম (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, গোসলখানার লোকদের পরনে লুঙ্গি থাকলে সালাম দিও নইলে সালাম দিও না।
১৮৩
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ مَخْرَمَةَ بْنِ سُلَيْمَانَ، عَنْ كُرَيْبٍ، مَوْلَى ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ، أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، بَاتَ لَيْلَةً عِنْدَ مَيْمُونَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَهِيَ خَالَتُهُ فَاضْطَجَعْتُ فِي عَرْضِ الْوِسَادَةِ، وَاضْطَجَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَهْلُهُ فِي طُولِهَا، فَنَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَتَّى إِذَا انْتَصَفَ اللَّيْلُ، أَوْ قَبْلَهُ بِقَلِيلٍ أَوْ بَعْدَهُ بِقَلِيلٍ، اسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَجَلَسَ يَمْسَحُ النَّوْمَ عَنْ وَجْهِهِ بِيَدِهِ، ثُمَّ قَرَأَ الْعَشْرَ الآيَاتِ الْخَوَاتِمَ مِنْ سُورَةِ آلِ عِمْرَانَ، ثُمَّ قَامَ إِلَى شَنٍّ مُعَلَّقَةٍ، فَتَوَضَّأَ مِنْهَا فَأَحْسَنَ وُضُوءَهُ، ثُمَّ قَامَ يُصَلِّي‏.‏ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ فَقُمْتُ فَصَنَعْتُ مِثْلَ مَا صَنَعَ، ثُمَّ ذَهَبْتُ، فَقُمْتُ إِلَى جَنْبِهِ، فَوَضَعَ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى رَأْسِي، وَأَخَذَ بِأُذُنِي الْيُمْنَى، يَفْتِلُهَا، فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ أَوْتَرَ، ثُمَّ اضْطَجَعَ، حَتَّى أَتَاهُ الْمُؤَذِّنُ، فَقَامَ، فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ، ثُمَّ خَرَجَ فَصَلَّى الصُّبْحَ‏.‏
‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী মাইমূনা (রাঃ)-এর ঘরে রাত কাটান। তিনি ছিলেন ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর খালা। ইব্‌নু আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ অতঃপর আমি বিছানায় প্রশস্ত দিকে শুলাম এবং আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- ও তাঁর স্ত্রী বিছানার লম্বা দিকে শুলেন; আর আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুমিয়ে পড়লেন। এমনিভাবে রাত যখন অর্ধেক হয়ে গেল তাঁর কিছু পূর্বে কিংবা কিছু পরে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাগলেন। তিনি বসে হাত দিয়ে তাঁর মুখমন্ডল থেকে ঘুমের আবেশ মুছতে লাগলেন। অতঃপর সূরা আল-‘ইমরানের শেষ দশটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে একটি ঝুলন্ত মশক হতে সুন্দরভাবে উযূ করলেন। অতঃপর সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমিও উঠে তিনি যেরূপ করেছেন তদ্রুপ করলাম। তারপর গিয়ে তাঁর বাম পাশে দাঁড়ালাম। তিনি তাঁর ডান হাত আমার মাথার উপর রাখলেন এবং আমার ডান কান ধরে একটু নাড়া দিয়ে ডান পাশে এনে দাঁড় করালেন। অতঃপর তিনি দু’রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর দু’রাক’আত, তারপর দু’রাক’আত, তারপর দু’রাক’আত, তারপর দু’রাক’আত, তারপর দু’রাক’আত, তারপর বিতর আদায় করলেন। তারপর শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর নিকট মুয়ায্‌যিন এলে তিনি দাঁড়িয়ে হাল্কাভাবে দু’রাক’আত সালাত আদায় করলেন। তারপর বেরিয়ে গিয়ে ফাজরের সালাত আদায় করলেন।
(১১৭; মুসলিম ৬/২৬, হাঃ ৭৬৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৭. অধ্যায়ঃ
অজ্ঞান না হলে উযূ না করা ।
১৮৪
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنِ امْرَأَتِهِ، فَاطِمَةَ عَنْ جَدَّتِهَا، أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ أَنَّهَا قَالَتْ أَتَيْتُ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حِينَ خَسَفَتِ الشَّمْسُ، فَإِذَا النَّاسُ قِيَامٌ يُصَلُّونَ، وَإِذَا هِيَ قَائِمَةٌ تُصَلِّي فَقُلْتُ مَا لِلنَّاسِ فَأَشَارَتْ بِيَدِهَا نَحْوَ السَّمَاءِ وَقَالَتْ سُبْحَانَ اللَّهِ‏.‏ فَقُلْتُ آيَةٌ فَأَشَارَتْ أَىْ نَعَمْ‏.‏ فَقُمْتُ حَتَّى تَجَلاَّنِي الْغَشْىُ، وَجَعَلْتُ أَصُبُّ فَوْقَ رَأْسِي مَاءً، فَلَمَّا انْصَرَفَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، ثُمَّ قَالَ ‏ “‏ مَا مِنْ شَىْءٍ كُنْتُ لَمْ أَرَهُ إِلاَّ قَدْ رَأَيْتُهُ فِي مَقَامِي هَذَا حَتَّى الْجَنَّةِ وَالنَّارِ، وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَىَّ أَنَّكُمْ تُفْتَنُونَ فِي الْقُبُورِ مِثْلَ أَوْ قَرِيبًا مِنْ فِتْنَةِ الدَّجَّالِ ـ لاَ أَدْرِي أَىَّ ذَلِكَ قَالَتْ أَسْمَاءُ ـ يُؤْتَى أَحَدُكُمْ فَيُقَالُ مَا عِلْمُكَ بِهَذَا الرَّجُلِ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ ـ أَوِ الْمُوقِنُ لاَ أَدْرِي أَىَّ ذَلِكَ قَالَتْ أَسْمَاءُ ـ فَيَقُولُ هُوَ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ، جَاءَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى، فَأَجَبْنَا وَآمَنَّا وَاتَّبَعْنَا، فَيُقَالُ نَمْ صَالِحًا، فَقَدْ عَلِمْنَا إِنْ كُنْتَ لَمُؤْمِنًا، وَأَمَّا الْمُنَافِقُ ـ أَوِ الْمُرْتَابُ لاَ أَدْرِي أَىَّ ذَلِكَ قَالَتْ أَسْمَاءُ ـ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي، سَمِعْتُ النَّاسَ يَقُولُونَ شَيْئًا فَقُلْتُهُ ‏”‏‏
আসমা বিনতু আবূ বক্‌র (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ)- এর নিকট আসলাম। তখন সূর্যে গ্রহণ লেগেছিল। দেখলাম সব মানুষ দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছে এবং ‘আয়িশা (রাঃ)-ও দাড়িঁয়ে সালাত আদায় করছেন। আমি বললাম, লোকদের কী হয়েছে? তিনি তাঁর হাত আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন ‘সুবাহান্নালাহ্‌’! আমি বললাম, এটা কি কোন আলামত? তিনি ইঙ্গিত করে বললেনঃ ‘হ্যাঁ’। অতঃপর আমিও সালাতে দাঁড়িয়ে গেলাম। এমনকি আমার জ্ঞান হারিয়ে ফেলার উপক্রম হলো এবং আমি আমার মাথায় পানি দিতে লাগলাম। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) [মুসল্লীদের দিকে] ফিরে আল্লাহর হামদ ও সানা বর্ণনা করে বললেনঃ “যেসব জিনিস আমি ইতোপূর্বে দেখিনি সেসব আমার এ স্থানে আমি দেখতে পেয়েছি, এমনকি জান্নাত এবং জাহান্নামও। আর আমার নিকট ওয়াহী পাঠানো হয়েছে যে , কবরে তোমাদের পরীক্ষা করা হবে দাজ্জালের ফিতনার ন্যায় অথবা কাছাকাছি।” বর্ণনাকারী বলেনঃ আসমা (রাঃ) কোন্‌টি বলেছিলেন, আমি জানি না। তোমাদের প্রত্যকের নিকট (ফেরেশতাগণ) উপস্থিত হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, “এ ব্যক্তি সম্পর্কে তুমি কি জান?”- তারপর ‘মু’মিন,’ বা ‘মু’কিন ব্যক্তি বলবে- আসমা ‘মু’মিন’ বলেছিলেন না ‘মুকিন’ তা আমি জানি না- ইনি আল্লাহর রসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি আমাদের নিকট মু’জিযা ও হিদায়াত নিয়ে আগমন করেছিলেন। আমরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছি, তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং তাঁর ইত্তেবা’ করেছি। তারপর তাকে বলা হবে, নিশ্চিন্তে ঘুমাও। আমরা জানলাম যে, তুমি মু’মিন ছিলে। আর ‘মুনাফিক’ বা ‘মুরতাদ’ বলবে- আমি জানি না আসমা এর কোনটি বলেছিলেন- লোকজনকে এর সম্পর্কে কিছু একটা বলতে শুনেছি আর আমিও তাই বলেছি।
(৮৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৭৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৮. অধ্যায়ঃ
পূর্ণ মাথা মাস্‌হ করা।
আল্লাহ তা’আলার এ বাণীর পরিপ্রেক্ষিতে وَامْسَحُوا بِرُءُوسِكُمْ (আর তোমাদের মাথা মাস্‌হ কর) (সূরা আল- মায়িদাহ্‌ ৫/৬)।
ইব্‌নুল মুসায়্যিব বলেন, নারী পুরুষের মধ্যে মাথা মাস্‌হ করার ব্যাপারে কোন ভেদাভেদ নেই। ইমাম মালিক (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, মাথার কিছু অংশ মাস্‌হ করা কি যথেষ্ট হবে ? তিনি ‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ)-এর হাদীস দলিল হিসেবে পেশ করলেন।
১৮৫
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ عَمْرِو بْنِ يَحْيَى الْمَازِنِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ ـ وَهُوَ جَدُّ عَمْرِو بْنِ يَحْيَى ـ أَتَسْتَطِيعُ أَنْ تُرِيَنِي، كَيْفَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ زَيْدٍ نَعَمْ‏.‏ فَدَعَا بِمَاءٍ، فَأَفْرَغَ عَلَى يَدَيْهِ فَغَسَلَ يَدَهُ مَرَّتَيْنِ، ثُمَّ مَضْمَضَ وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثًا، ثُمَّ غَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا، ثُمَّ غَسَلَ يَدَيْهِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ، ثُمَّ مَسَحَ رَأْسَهُ بِيَدَيْهِ، فَأَقْبَلَ بِهِمَا وَأَدْبَرَ، بَدَأَ بِمُقَدَّمِ رَأْسِهِ، حَتَّى ذَهَبَ بِهِمَا إِلَى قَفَاهُ، ثُمَّ رَدَّهُمَا إِلَى الْمَكَانِ الَّذِي بَدَأَ مِنْهُ، ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَيْهِ‏.‏
ইয়াহ্‌ইয়া আল-মাযিনী (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
জনৈক ব্যক্তি ‘আব্দুল্লাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ)-কে (তিনি ‘আমর ইব্‌নু ইয়াহ্‌ইয়ার দাদা) জিজ্ঞেস করলঃ আপনি কি আমাদেরকে দেখাতে পারেন, কীভাবে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উযূ করতেন? ‘আব্দুল্লাহ্‌ ইবনু যায়দ (রাঃ) বললেনঃ ‘হ্যাঁ’। অতঃপর তিনি পানি আনালেন। হাতের উপর সে পানি ঢেলে দু’বার তাঁর হাত ধুলেন। তারপর কুলি করলেন এবং তিনবার নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়লেন। অতঃপর চেহারা তিনবার ধুলেন। তারপর দু’হাত কনুই পর্যন্ত দু’বার করে ধুলেন। তারপর দু’হাত দিয়ে মাথা মাস্‌হ করলেন। অর্থাৎ হাত দু’টি সামনে ও পেছনে নিলেন। মাথার সম্মুখ ভাগ থেকে শুরু করে উভয় হাত পেছনের চুলের শেষ পর্যন্ত নিলেন। তারপর আবার যেখান থেকে শুরু করেছিলেন, সেখানেই ফিরিয়ে আনলেন। তারপর দু’পা ধুলেন।
(১৮৬, ১৯১, ১৯২, ১৯৭, ১৯৯; মুসলিম ২/৭, হাঃ ২৩৫, আহমাদ ১৬৪৪৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৩৯. অধ্যায়ঃ
উভয় পা টাখনু পর্যন্ত ধোয়া।
১৮৬
حَدَّثَنَا مُوسَى، قَالَ حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، عَنْ عَمْرٍو، عَنْ أَبِيهِ، شَهِدْتُ عَمْرَو بْنَ أَبِي حَسَنٍ سَأَلَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ زَيْدٍ عَنْ وُضُوءِ النَّبِيِّ، صلى الله عليه وسلم فَدَعَا بِتَوْرٍ مِنْ مَاءٍ، فَتَوَضَّأَ لَهُمْ وُضُوءَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأَكْفَأَ عَلَى يَدِهِ مِنَ التَّوْرِ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ ثَلاَثًا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي التَّوْرِ، فَمَضْمَضَ وَاسْتَنْشَقَ وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثَ غَرَفَاتٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فَغَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فَغَسَلَ يَدَيْهِ مَرَّتَيْنِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ مَرَّتَيْنِ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فَمَسَحَ رَأْسَهُ، فَأَقْبَلَ بِهِمَا وَأَدْبَرَ مَرَّةً وَاحِدَةً، ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَيْهِ إِلَى الْكَعْبَيْنِ‏.‏
‘আমর ইব্‌নু আবূ হাসান (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ)- কে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর উযূ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি এক পাত্র পানি আনলেন এবং তাঁদের (দেখাবার) জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর মত উযূ করলেন। তিনি পাত্র থেকে দু’হাতে পানি ঢাললেন। তা দিয়ে হাত দু’টি তিনবার ধুলেন। অতঃপর পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তিন খাবল পানি নিয়ে কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়লেন। তারপর আবার হাত ঢুকালেন। তিনবার তাঁর মুখমন্ডল ধুলেন। তারপর আবার হাত ঢুকিয়ে (পানি নিয়ে) দুই হাত কনুই পর্যন্ত দু’বার ধুলেন। তারপর আবার হাত ঢুকিয়ে উভয় হাত দিয়ে সামনে এবং পেছনে একবার মাত্র মাথা মাস্‌হ করলেন। তারপর দু’পা টাখনু পর্যন্ত ধুলেন।
(১৮৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪০.১. অধ্যায়ঃ
উযূর অবশিষ্ট পানি ব্যবহার।
জাবির ইব্‌নু ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁর পরিবারকে মিসওয়াক ধোয়া অবশিষ্ট পানি দিয়ে উযূ করতে নির্দেশ দেন।
১৮৭
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا الْحَكَمُ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا جُحَيْفَةَ، يَقُولُ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِالْهَاجِرَةِ، فَأُتِيَ بِوَضُوءٍ فَتَوَضَّأَ، فَجَعَلَ النَّاسُ يَأْخُذُونَ مِنْ فَضْلِ وَضُوئِهِ فَيَتَمَسَّحُونَ بِهِ، فَصَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الظُّهْرَ رَكْعَتَيْنِ وَالْعَصْرَ رَكْعَتَيْنِ، وَبَيْنَ يَدَيْهِ عَنَزَةٌ‏.‏
আবূ জুহাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন একদা দুপুর বেলা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিকট এলেন। তাঁকে উযূর পানি এনে দেয়া হলে তিনি উযূ করলেন। লোকে তার উযূর ব্যবহৃত পানি নিয়ে গায়ে মাখতে লাগল। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুহরের দু’রাক‘আত এবং ‘আসরের দু’রাক‘আত সালাত আদায় করলেন। আর তাঁর সামনে ছিল একটি লাঠি।
(৩৭৬, ৪৯৫, ৪৯৯, ৫০১, ৬৩৩, ৬৩৪, ৩৫৫৩, ৩৫৬৬, ৫৭৮৬, ৫৮৫৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৮৮
وَقَالَ أَبُو مُوسَى دَعَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِقَدَحٍ فِيهِ مَاءٌ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ وَوَجْهَهُ فِيهِ، وَمَجَّ فِيهِ ثُمَّ قَالَ لَهُمَا اشْرَبَا مِنْهُ، وَأَفْرِغَا عَلَى وُجُوهِكُمَا وَنُحُورِكُمَا‏.‏
আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি পাত্র আনালেন যাতে পানি ছিল। অতঃপর তিনি তার মধ্যে উভয় হাত ও মুখমন্ডল ধুলেন এবং তার দ্বারা কুলি করলেন। অতঃপর তাদের দু’জন [আবূ মূসা (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ)]-কে বললেনঃ ‘তোমরা এ থেকে পান কর এবং তোমাদের মুখমন্ডলে ও বুকে ঢাল।’
(১৯৬, ৪৩২৮; মুসলিম ৪/৪৭, হাঃ ৫০৩, আহমাদ ১৮৭৬৯, ১৮৭৮২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮২ শেষাংশ, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৭ শেষাংশ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৮৯
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبِي، عَنْ صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي مَحْمُودُ بْنُ الرَّبِيعِ، قَالَ وَهُوَ الَّذِي مَجَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي وَجْهِهِ وَهْوَ غُلاَمٌ مِنْ بِئْرِهِمْ‏.‏ وَقَالَ عُرْوَةُ عَنِ الْمِسْوَرِ وَغَيْرِهِ يُصَدِّقُ كُلُّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا صَاحِبَهُ وَإِذَا تَوَضَّأَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ‏.‏
মাহমূদ ইব্‌নুর-রবী’ ‘(রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
বর্ণনাকারী বলেনঃ তিনি সে ব্যক্তি, যার মুখমন্ডলে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের কুয়া হতে পানি নিয়ে কুলির পানি দিয়েছিলেন। তিনি তখন বালক ছিলেন। ‘উরওয়া (রহঃ) মিসওয়ার (রহঃ) প্রমুখের নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করেন। এ উভয় বর্ণনা একটি অন্যটির সত্যায়ন স্বরূপ। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন উযূ করতেন তখন তাঁর ব্যবহৃত পানির উপর তাঁরা (সাহাবায়ে কিরাম) যেন হুমড়ি খেয়ে পড়তেন।
(১৯৬, ৪৩২৮ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৩ কিন্তু প্রথমাংশ নেই, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
 
৪/৪০.২. অধ্যায়ঃ
১৯০
حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ يُونُسَ، قَالَ حَدَّثَنَا حَاتِمُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، عَنِ الْجَعْدِ، قَالَ سَمِعْتُ السَّائِبَ بْنَ يَزِيدَ، يَقُولُ ذَهَبَتْ بِي خَالَتِي إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ ابْنَ أُخْتِي وَجِعٌ‏.‏ فَمَسَحَ رَأْسِي وَدَعَا لِي بِالْبَرَكَةِ، ثُمَّ تَوَضَّأَ فَشَرِبْتُ مِنْ وَضُوئِهِ، ثُمَّ قُمْتُ خَلْفَ ظَهْرِهِ، فَنَظَرْتُ إِلَى خَاتَمِ النُّبُوَّةِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ مِثْلِ زِرِّ الْحَجَلَةِ‏.‏
সায়িব ইব্‌নু ইয়াযীদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমার খালা আমাকে নিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রসূল! আমার ভাগিনা অসুস্থ’। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং বরকতের দু‘আ করলেন। অতঃপর উযূ করলেন। আমি তাঁর উযুর (অবশিষ্ট) পানি পান করলাম। তারপর তাঁর পিছনে দাঁড়ালাম। তখন আমি তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যস্থলে নবুওয়াতের মোহর দেখতে পেলাম। তা ছিল পর্দার ঘুণ্টির মত।
(৩৫৪০, ৩৫৪১, ৫৬৭০, ৬৩৫২; মুসলিম ৪৩/৩০, হাঃ ২৩৪৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৮৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪১. অধ্যায়ঃ
এক আঁজলা পানি দিয়ে কুলি করা ও নাকে পানি দেয়া।
১৯১
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ، أَنَّهُ أَفْرَغَ مِنَ الإِنَاءِ عَلَى يَدَيْهِ فَغَسَلَهُمَا، ثُمَّ غَسَلَ أَوْ مَضْمَضَ، وَاسْتَنْشَقَ مِنْ كَفَّةٍ وَاحِدَةٍ، فَفَعَلَ ذَلِكَ ثَلاَثًا، فَغَسَلَ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ، وَمَسَحَ بِرَأْسِهِ مَا أَقْبَلَ وَمَا أَدْبَرَ، وَغَسَلَ رِجْلَيْهِ إِلَى الْكَعْبَيْنِ، ثُمَّ قَالَ هَكَذَا وُضُوءُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم‏.‏
‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা তিনি পাত্র হতে দু’হাতে পানি ঢেলে দু’হাত ধৌত করলেন। অতঃপর এক খাবল পানি দিয়ে (মুখ) ধুলেন বা কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিলেন। তিনবার এরূপ করলেন। তারপর দু’ হাত কনুই পর্যন্ত দু’-দু’বার ধুলেন এবং মাথার সামনের অংশ এবং পেছনের অংশ মাস্‌হ করলেন। আর টাখনু পর্যন্ত দু’ পা ধুলেন। অতঃপর বললেনঃ “আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উযূ এরূপ ছিল।”
(১৮৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪২. অধ্যায়ঃ
একবার মাথা মাস্‌হ করা।
১৯২
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ شَهِدْتُ عَمْرَو بْنَ أَبِي حَسَنٍ سَأَلَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ زَيْدٍ عَنْ وُضُوءِ النَّبِيِّ، صلى الله عليه وسلم فَدَعَا بِتَوْرٍ مِنْ مَاءٍ، فَتَوَضَّأَ لَهُمْ، فَكَفَأَ عَلَى يَدَيْهِ فَغَسَلَهُمَا ثَلاَثًا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ، فَمَضْمَضَ وَاسْتَنْشَقَ، وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثًا بِثَلاَثِ غَرَفَاتٍ مِنْ مَاءٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ، فَغَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ، فَمَسَحَ بِرَأْسِهِ فَأَقْبَلَ بِيَدَيْهِ وَأَدْبَرَ بِهِمَا، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي الإِنَاءِ فَغَسَلَ رِجْلَيْهِ‏.‏ وَحَدَّثَنَا مُوسَى قَالَ حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ قَالَ مَسَحَ رَأْسَهُ مَرَّةً‏.‏
ইয়াহইয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘আমি একদা ‘আমর ইব্‌নু আবূ হাসান (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ)-কে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উযূ সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। অতঃপর তিনি পানির একটি পাত্র এনে তাঁদের উযূ করে দেখালেন। তিনি পাত্রটি কাত করে উভয় হাতের উপর পানি ঢেলে তিনবার তা ধুয়ে ফেলেন। তারপর পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকালেন এবং তিন খাবল পানি দিয়ে তিনবার করে কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে তা ঝাড়লেন। অতঃপর পুনরায় পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তিনবার মুখমন্ডল ধুলেন। অতঃপর পুনরায় পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে উভয় হাত কনুই পর্যন্ত দু’-দু’বার ধুলেন। অতঃপর পুনরায় পাত্রের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তাঁর মাথা হাত দিয়ে সামনে এবং পেছনে মাস্‌হ করলেন। তারপর আবার পাত্রের মধ্যে তাঁর হাত ঢুকিয়ে দুই পা ধুলেন।’ [১]
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯১)
উহায়ব (রহ.) সূত্রে মূসা (রহ.) বর্ণনা করেন, মাথা একবার মাসেহ করেন। (১৮৫) (ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯২)
[১] ঘাড় মাস্‌হ করা বিদ‘আত। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে ঘাড় মাস্‌হ প্রমাণিত নয়। সহীহ্‌ মুসলিমের ভাষ্যকার ইমাম নাবাবী (রহঃ) একে বিদ‘আত বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৩. অধ্যায়ঃ
স্বীয় স্ত্রীর সঙ্গে উযূ করা এবং স্ত্রীর উযূর অবশিষ্ট পানি (ব্যবহার করা)।
‘উমর (রাঃ) গরম পানি দিয়ে এবং খৃস্টান মহিলার ঘরের পানি দিয়ে উযূ করেন।
১৯৩
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ قَالَ كَانَ الرِّجَالُ وَالنِّسَاءُ يَتَوَضَّئُونَ فِي زَمَانِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم جَمِيعًا‏.‏
‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল –এর সময় পুরুষ এবং মহিলা একত্রে (এক পাত্র হতে) উযূ করতেন।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
৪/৪৪. অধ্যায়ঃ
অজ্ঞান লোকের উপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উযূর পানি ছিটিয়ে দেয়া।
১৯৪
حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْمُنْكَدِرِ، قَالَ سَمِعْتُ جَابِرًا، يَقُولُ جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَعُودُنِي، وَأَنَا مَرِيضٌ لاَ أَعْقِلُ، فَتَوَضَّأَ وَصَبَّ عَلَىَّ مِنْ وَضُوئِهِ، فَعَقَلْتُ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَنِ الْمِيرَاثُ إِنَّمَا يَرِثُنِي كَلاَلَةٌ‏.‏ فَنَزَلَتْ آيَةُ الْفَرَائِضِ‏.‏
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি অসুস্থ থাকা অবস্থায় একবার আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার খোঁজ-খবর নিতে এলেন। আমি তখন এতই অসুস্থ ছিলাম যে আমার জ্ঞান ছিল না। তারপর তিনি উযূ করলেন এবং তাঁর উযূর পানি আমার উপর ছিঁটিয়ে দিলেন। তখন আমার জ্ঞান ফিরে এল। আমি বললামঃ হে আল্লাহর রসূল! (আমার) ‘মীরাস’ কে পাবে? আমার একমাত্র ওয়ারিস হল কালালাহ [১]। তখন ফারায়েযের আয়াত অবতীর্ণ হল।
(৪৫৭৭, ৫৬৫১, ৫৬৬৪, ৫৬৭৬, ৫৭২৩, ৬৭২৩, ৬৭৪৩, ৭৩০৯ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৪)
[১] কালালাহঃ যার ছেলেমেয়ে ও পিতা নেই তার উত্তরাধিকারীকে কালালাহ বলা হয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৫. অধ্যায়ঃ
গামলা, কাঠ ও পাথরের পাত্রে উযূ-গোসল করা।
১৯৫
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُنِيرٍ، سَمِعَ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ بَكْرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا حُمَيْدٌ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ حَضَرَتِ الصَّلاَةُ، فَقَامَ مَنْ كَانَ قَرِيبَ الدَّارِ إِلَى أَهْلِهِ، وَبَقِيَ قَوْمٌ، فَأُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِمِخْضَبٍ مِنْ حِجَارَةٍ فِيهِ مَاءٌ، فَصَغُرَ الْمِخْضَبُ أَنْ يَبْسُطَ فِيهِ كَفَّهُ، فَتَوَضَّأَ الْقَوْمُ كُلُّهُمْ‏.‏ قُلْنَا كَمْ كُنْتُمْ قَالَ ثَمَانِينَ وَزِيَادَةً‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একদা সালাতের সময় উপস্থিত হলে যাঁদের বাড়ি নিকটে ছিল তাঁরা (উযূ করার জন্য) বাড়ি চলে গেলেন। আর কিছু লোক রয়ে গেলেন (তাঁদের কোন উযূর ব্যবস্থা ছিল না)। তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য একটি পাথরের পাত্রে পানি আনা হল। পাত্রটি এত ছোট ছিল যে, তার মধ্যে তাঁর উভয় হাত মেলে দেয়া সম্ভব ছিল না। তা থেকেই কওমের সকল লোক উযূ করলেন। আমরা জিজ্ঞেস করলামঃ ‘আপনারা কতজন ছিলেন’? তিনি বললেনঃ ‘আশিজন বা তারও কিছু অধিক।’
(১৬৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৮৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৯৬
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْعَلاَءِ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، عَنْ بُرَيْدٍ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِي مُوسَى، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَعَا بِقَدَحٍ فِيهِ مَاءٌ، فَغَسَلَ يَدَيْهِ وَوَجْهَهُ فِيهِ وَمَجَّ فِيهِ
আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি পানি ভর্তি পাত্র আনালেন। তাতে তাঁর উভয় হাত ও মুখমন্ডল ধুলেন এবং কুলি করলেন।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৯৭
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ يُونُسَ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ أَبِي سَلَمَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ يَحْيَى، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ، قَالَ أَتَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَأَخْرَجْنَا لَهُ مَاءً فِي تَوْرٍ مِنْ صُفْرٍ فَتَوَضَّأَ، فَغَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثًا وَيَدَيْهِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ، وَمَسَحَ بِرَأْسِهِ فَأَقْبَلَ بِهِ وَأَدْبَرَ، وَغَسَلَ رِجْلَيْهِ
‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের বাড়ি এলেন। আমরা তাঁকে পিতলের একটি পাত্রে পানি দিলে তা দিয়ে তিনি উযূ করলেন। তাঁর মুখমন্ডল তিনবার ও উভয় হাত দু’-দু’বার করে ধুলেন এবং তাঁর হাত সামনে ও পেছনে এনে মাথা মাস্‌হ করলেন আর উভয় পা ধুলেন।
(১৮৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
১৯৮
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ لَمَّا ثَقُلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَاشْتَدَّ بِهِ وَجَعُهُ، اسْتَأْذَنَ أَزْوَاجَهُ فِي أَنْ يُمَرَّضَ فِي بَيْتِي، فَأَذِنَّ لَهُ، فَخَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ رَجُلَيْنِ تَخُطُّ رِجْلاَهُ فِي الأَرْضِ بَيْنَ عَبَّاسٍ وَرَجُلٍ آخَرَ‏.‏ قَالَ عُبَيْدُ اللَّهِ فَأَخْبَرْتُ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عَبَّاسٍ فَقَالَ أَتَدْرِي مَنِ الرَّجُلُ الآخَرُ قُلْتُ لاَ‏.‏ قَالَ هُوَ عَلِيٌّ‏.‏ وَكَانَتْ عَائِشَةُ ـ رضى الله عنها ـ تُحَدِّثُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ بَعْدَ مَا دَخَلَ بَيْتَهُ وَاشْتَدَّ وَجَعُهُ ‏ “‏ هَرِيقُوا عَلَىَّ مِنْ سَبْعِ قِرَبٍ، لَمْ تُحْلَلْ أَوْكِيَتُهُنَّ، لَعَلِّي أَعْهَدُ إِلَى النَّاسِ ‏”‏‏.‏ وَأُجْلِسَ فِي مِخْضَبٍ لِحَفْصَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، ثُمَّ طَفِقْنَا نَصُبُّ عَلَيْهِ تِلْكَ حَتَّى طَفِقَ يُشِيرُ إِلَيْنَا أَنْ قَدْ فَعَلْتُنَّ، ثُمَّ خَرَجَ إِلَى النَّاسِ‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি আমার ঘরে শুশ্রূষার জন্য তাঁর স্ত্রীদের নিকট অনুমতি চাইলে তাঁরা অনুমতি দিলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (আমার ঘরে আসার জন্য) দু’ব্যক্তির উপর ভর করে বের হলেন। আর তাঁর পা দু’খানি তখন মাটিতে চিহ্ন রেখে যাচ্ছিল। তিনি ‘আব্বাস (রাঃ) ও অন্য এক ব্যক্তির মাঝখানে ছিলেন। ‘উবাইদুল্লাহ (রহঃ) বলেনঃ আমি ‘আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ)-কে এ কথা জানালাম। তিনি বললেনঃ সে অন্য ব্যক্তিটি কে তা কি তুমি জান? আমি বললাম, না। তিনি বললেনঃ তিনি হলেন ‘আলী ইব্‌নু আবূ ত্বলিব (রাঃ)। ‘আয়িশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ঘরে আসলে অসুস্থতা আরো বৃদ্ধি পেল। তিনি বললেনঃ ‘তোমরা আমার উপর মুখের বাঁধন খোলা হয়নি এমন সাতটি মশকের পানি ঢেলে দাও, তাহলে হয়ত আমি মানুষকে কিছু উপদেশ দিতে পারব।‘ তাঁকে তাঁর স্ত্রী হাফসা (রাঃ)–এর একটি বড় পাত্রে বসিয়ে দেয়া হল। অতঃপর আমরা তাঁর উপর সেই সাত মশক পানি ঢালতে লাগলাম। এভাবে ঢালার পর এক সময় তিনি আমাদের প্রতি ইঙ্গিত করলেন, (এখন থাম) তোমরা তোমাদের কাজ করেছ। অতঃপর তিনি বের হয়ে জনসম্মুক্ষে গেলেন।
(৬৬৪, ৬৬৫, ৬৭৯, ৬৮৩, ৬৮৭, ৭১২, ৭১৩, ৭১৬, ২৫৮৮, ৩০৯৯, ৩৩৮৪, ৪৪৪২, ৪৪৪৫, ৫৭১৪, ৭৩০৩ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৬. অধ্যায়ঃ
গামলা হতে উযূ করা।
১৯৯
حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ مَخْلَدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ يَحْيَى، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كَانَ عَمِّي يُكْثِرُ مِنَ الْوُضُوءِ، قَالَ لِعَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ أَخْبِرْنِي كَيْفَ رَأَيْتَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ فَدَعَا بِتَوْرٍ مِنْ مَاءٍ، فَكَفَأَ عَلَى يَدَيْهِ فَغَسَلَهُمَا ثَلاَثَ مِرَارٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فِي التَّوْرِ، فَمَضْمَضَ وَاسْتَنْثَرَ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ مِنْ غَرْفَةٍ وَاحِدَةٍ، ثُمَّ أَدْخَلَ يَدَهُ فَاغْتَرَفَ بِهَا فَغَسَلَ وَجْهَهُ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، ثُمَّ غَسَلَ يَدَيْهِ إِلَى الْمِرْفَقَيْنِ مَرَّتَيْنِ مَرَّتَيْنِ، ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِهِ مَاءً، فَمَسَحَ رَأْسَهُ، فَأَدْبَرَ بِيَدَيْهِ وَأَقْبَلَ ثُمَّ غَسَلَ رِجْلَيْهِ، فَقَالَ هَكَذَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ‏.‏
ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমার চাচা উযূর পানি অধিক খরচ করতেন। একদা তিনি ‘আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌নু যায়দ (রাঃ)-কে বললেনঃ ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কীভাবে উযূ করতেন আপনি কি তা দেখেছেন?’ তিনি এক গামলা পানি আনালেন। সেটি উভয় হাতে কাত করে (তা থেকে পানি ঢেলে) হাত দু’টি তিনবার ধুলেন, অতঃপর তার হাত গামলায় ঢুকালেন। অতঃপর এক খাবল (করে) পানি দিয়ে তিনবার কুলি করলেন এবং নাক ঝাড়লেন। তারপর পানিতে তাঁর হাত ঢুকালেন। উভয় হাতে এক খাবল (করে) পানি নিয়ে মুখমন্ডল তিনবার ধুলেন। অতঃপর উভয় হাত কনুই পর্যন্ত দু’বার করে ধুলেন। অতঃপর উভয় হাতে পানি নিয়ে মাথার সামনে এবং পেছনে মাস্‌হ করলেন এবং দু’ পা ধুলেন। তারপর বললেনঃ ‘আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে এভাবেই উযূ করতে দেখেছি।’
(১৮৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৯৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২০০
حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم دَعَا بِإِنَاءٍ مِنْ مَاءٍ، فَأُتِيَ بِقَدَحٍ رَحْرَاحٍ فِيهِ شَىْءٌ مِنْ مَاءٍ، فَوَضَعَ أَصَابِعَهُ فِيهِ‏.‏ قَالَ أَنَسٌ فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَى الْمَاءِ يَنْبُعُ مِنْ بَيْنِ أَصَابِعِهِ، قَالَ أَنَسٌ فَحَزَرْتُ مَنْ تَوَضَّأَ مَا بَيْنَ السَّبْعِينَ إِلَى الثَّمَانِينَ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একপাত্র পানি চাইলে একটি বড় পাত্র তাঁর নিকট আনা হল, তাতে সামান্য পানি ছিল। তারপর তিনি তার মধ্যে তাঁর আঙ্গুল রাখলেন। আনাস (রাঃ) বলেনঃ আমি পানির দিকে তাকাতে লাগলাম। তাঁর আঙ্গুলের ভেতর দিয়ে পানি উপচে পড়তে লাগল। আনাস (রাঃ) বলেনঃ যারা উযূ করেছিল, আমি অনুমান করলাম তাদের সংখ্যা ছিল সত্তর হতে আশি জনের মত।
(১৬৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৭. অধ্যায়ঃ
এক মুদ দিয়ে উযূ করা।
[১] ১ মুদ = ৬০০ গ্রাম, চার মুদ = ১ সা‘ অর্থাৎ প্রায় আড়াই কেজির পাত্র বিশেষ। তবে শস্যের তারতম্যের কারণে ওজনের তারতম্য ঘটে। যেমন যব কিংবা গম হলে আড়াই কেজির কিছুটা কম হতে পারে। আবার চাল ভারি হবার কারণে বেশী হতে পারে। (ইত্তেহাফুল কিরাম তা‘লীক বুলুগুল মারাম ২৩ পৃঃ)
বিশিষ্ট সাহাবী যায়দ বিন সাবিত (রাঃ) এর ব্যবহৃত পাত্র যা ‘উনাইয়াহ শহরে মাটির নীচে পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী ভাল জাতের গম হলে এক সা‘ সমান হয় ২ কেজি ৪০ গ্রাম। -মুহাম্মাদ বিন সালিহ বিন উসাইমিন। (আশ্-শারহুল মুফতী ‘আলা যাদিল মুসতাকদি ৬ষ্ঠ খন্ড, ৭৪, ৭৬, ১৭৬, ১৭৭ পৃষ্ঠা) (মাজালিশে শাহরি রমাযান ১৩৮ পৃষ্ঠা) সলিহ আল ‘উসাইমীনের বরাত দিয়ে অনেকে ২ কেজি ৪০০ গ্রাম উল্লেখ করেছেন যা ভুল। কারণ তিনি তাঁর কিতাবে সংখ্যায় না লিখে কথায় লিখেছেনঃ …………………………………………………
২০১
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا مِسْعَرٌ، قَالَ حَدَّثَنِي ابْنُ جَبْرٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، يَقُولُ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَغْسِلُ ـ أَوْ كَانَ يَغْتَسِلُ ـ بِالصَّاعِ إِلَى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ، وَيَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সা‘ (৪ মুদ) হতে পাঁচ মুদ পর্যন্ত পানি দিয়ে গোসল করতেন এবং উযূ করতেন এক মুদ দিয়ে।
(মুসলিম ৩/১০, হাঃ ৩২৫, আহমাদ ১৪০০২, ১৪০৯৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৮. অধ্যায়ঃ
মোজার উপর মাস্‌হ করা।
২০২
حَدَّثَنَا أَصْبَغُ بْنُ الْفَرَجِ الْمِصْرِيُّ، عَنِ ابْنِ وَهْبٍ، قَالَ حَدَّثَنِي عَمْرٌو، حَدَّثَنِي أَبُو النَّضْرِ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ، عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ مَسَحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ‏.‏ وَأَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ سَأَلَ عُمَرَ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ نَعَمْ إِذَا حَدَّثَكَ شَيْئًا سَعْدٌ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلاَ تَسْأَلْ عَنْهُ غَيْرَهُ‏.‏ وَقَالَ مُوسَى بْنُ عُقْبَةَ أَخْبَرَنِي أَبُو النَّضْرِ أَنَّ أَبَا سَلَمَةَ أَخْبَرَهُ أَنَّ سَعْدًا حَدَّثَهُ فَقَالَ عُمَرُ لِعَبْدِ اللَّهِ‏.‏ نَحْوَهُ‏.‏
সা‘দ ইব্‌নু আবূ ওয়াককাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উভয় মোজার উপর মাস্‌হ করেছেন। ‘আবদুল্লাহ্‌ ইব্‌নু ‘উমর (তাঁর পিতা) ‘উমর (রাঃ)-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ ‘হাঁ! সা’দ (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে কিছু বর্ণনা করলে সে ব্যাপারে আর অন্যকে জিজ্ঞেস করো না।’
মূসা ইব্‌নু ‘উকবাহ (রহঃ)….সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ অতঃপর ‘উমর (রাঃ) ‘আবদুল্লাহ (রাঃ)-কে অনুরূপ বললেন।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২০৩
حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ خَالِدٍ الْحَرَّانِيُّ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، عَنْ سَعْدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ، عَنْ نَافِعِ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الْمُغِيرَةِ، عَنْ أَبِيهِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ، عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ خَرَجَ لِحَاجَتِهِ فَاتَّبَعَهُ الْمُغِيرَةُ بِإِدَاوَةٍ فِيهَا مَاءٌ، فَصَبَّ عَلَيْهِ حِينَ فَرَغَ مِنْ حَاجَتِهِ، فَتَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَى الْخُفَّيْنِ‏.‏
মুগীরা ইব্‌নু শু‘বাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলে তিনি [ মুগীরা (রাঃ) ] পানি সহ একটা পাত্র নিয়ে তাঁর অনুসরণ করলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাকৃতিক প্রয়োজন শেষ করে এলে তিনি তাঁকে পানি ঢেলে দিলেন। আর তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উযূ করলেন এবং উভয় মোজার উপর মাস্‌হ করলেন।
(১৮২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২০৪
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا شَيْبَانُ، عَنْ يَحْيَى، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ جَعْفَرِ بْنِ عَمْرِو بْنِ أُمَيَّةَ الضَّمْرِيِّ، أَنَّ أَبَاهُ، أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، رَأَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَمْسَحُ عَلَى الْخُفَّيْنِ‏.‏ وَتَابَعَهُ حَرْبُ بْنُ شَدَّادٍ وَأَبَانُ عَنْ يَحْيَى‏.
উমাইয়া যামরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উভয় মোজার উপর মাস্‌হ করতে দেখেছেন। হার্‌ব ও আবান (রহঃ) ইয়াহ্‌ইয়া (রহঃ) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
(২০৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২০৫
حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا الأَوْزَاعِيُّ، عَنْ يَحْيَى، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ جَعْفَرِ بْنِ عَمْرٍو، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَمْسَحُ عَلَى عِمَامَتِهِ وَخُفَّيْهِ‏.‏ وَتَابَعَهُ مَعْمَرٌ عَنْ يَحْيَى عَنْ أَبِي سَلَمَةَ عَنْ عَمْرٍو قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم‏.‏
উমাইয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাঁর পাগড়ীর উপর এবং উভয় মোজার উপর মাস্‌হ করতে দেখেছি’। মা‘মার (রহঃ) ‘আম্‌র (রহঃ) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেনঃ ‘আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তা করতে দেখেছি।’
(২০৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৯৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৪৯. অধ্যায়ঃ
পবিত্র অবস্থায় উভয় পা (মোজায়) প্রবেশ করানো।
২০৬
حَدَّثَنَا أَبُو نُعَيْمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا زَكَرِيَّاءُ، عَنْ عَامِرٍ، عَنْ عُرْوَةَ بْنِ الْمُغِيرَةِ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي سَفَرٍ، فَأَهْوَيْتُ لأَنْزِعَ خُفَّيْهِ فَقَالَ ‏ “‏ دَعْهُمَا، فَإِنِّي أَدْخَلْتُهُمَا طَاهِرَتَيْنِ ‏”‏‏.‏ فَمَسَحَ عَلَيْهِمَا‏.‏
মুগীরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে কোন এক সফরে ছিলাম। (উযূ করার সময়) আমি তাঁর মোজা দু’টি খুলতে চাইলে তিনি বললেনঃ ‘ও দু’টো থাক, আমি পবিত্র অবস্থায় ও দু’টি পরেছিলাম’। (এই বলে) তিনি তার উপর মাস্‌হ করলেন।
(১৮২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫০. অধ্যায়ঃ
বকরীর গোশত ও ছাতু খেয়ে উযূ না করা।
আবূ বক্‌র, ‘উমর ও ‘উসমান (রাঃ) গোশত খেয়ে উযূ করেননি।
২০৭
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ، عَنْ عَطَاءِ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ،‏.‏ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَكَلَ كَتِفَ شَاةٍ، ثُمَّ صَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ‏.‏
‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বকরীর কাঁধের গোশত খেলেন। অতঃপর সালাত আদায় করলেন; কিন্তু উযূ করলেন না।
(৫৪০৪, ৫৪০৫; মুসলিম ৩/২৪, হাঃ ৩৫৪, আহমাদ ১৯৯৪, ১৯৮৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২০৮
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي جَعْفَرُ بْنُ عَمْرِو بْنِ أُمَيَّةَ، أَنَّ أَبَاهُ، أَخْبَرَهُ أَنَّهُ، رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَحْتَزُّ مِنْ كَتِفِ شَاةٍ، فَدُعِيَ إِلَى الصَّلاَةِ فَأَلْقَى السِّكِّينَ فَصَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ‏.‏
উমাইয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে একটি বকরীর কাঁধের গোশ্‌ত কেটে খেতে দেখলেন। এ সময় সালাতের জন্য আহ্বান হল। তিনি ছুরিটি ফেলে দিলেন, অতঃপর সালাত আদায় করলেন; কিন্তু উযূ করলেন না।
(৬৭৫, ২৯২৩, ৫৪০৮, ৫৪২২, ৫৪৬২; মুসলিম ৩/২৪, হাঃ ৩৫৫, আহমাদ ১৭২৫০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫১. অধ্যায়ঃ
ছাতু খেয়ে উযূ না করে কুলি করা যথেষ্ট।
২০৯
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، عَنْ بُشَيْرِ بْنِ يَسَارٍ، مَوْلَى بَنِي حَارِثَةَ أَنَّ سُوَيْدَ بْنَ النُّعْمَانِ، أَخْبَرَهُ‏.‏ أَنَّهُ، خَرَجَ مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَامَ خَيْبَرَ، حَتَّى إِذَا كَانُوا بِالصَّهْبَاءِ ـ وَهِيَ أَدْنَى خَيْبَرَ ـ فَصَلَّى الْعَصْرَ، ثُمَّ دَعَا بِالأَزْوَادِ، فَلَمْ يُؤْتَ إِلاَّ بِالسَّوِيقِ، فَأَمَرَ بِهِ فَثُرِّيَ، فَأَكَلَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَكَلْنَا، ثُمَّ قَامَ إِلَى الْمَغْرِبِ، فَمَضْمَضَ وَمَضْمَضْنَا، ثُمَّ صَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ‏.‏
সুওয়াইদ ইব্‌নু নু’মান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ খায়বার যুদ্ধের বছর তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বের হলেন। চলতে চলতে তাঁরা সাহবা-য় পৌঁছলেন, এটি খায়বরের নিকটবর্তী অঞ্চল, তখন তিনি আসরের সালাত আদায় করলেন। অতঃপর খাবার আনতে বললেনঃ কিন্তু ছাতু ব্যতীত আর কিছুই আনা হল না। অতঃপর তিনি নির্দেশ দিলে তাতে পানি মেশানো হয়। আল্লাহর রসূল তা খেলেন এবং আমরাও খেলাম। অতঃপর তিনি মাগরিবের জন্য দাঁড়ালেন এবং কুলি করলেন এবং আমরাও কুলি করলাম। পরে তিনি সালাত আদায় করলেন; উযূ করলেন না।
(২১৫, ২৯৮১, ৪১৭৫, ৪১৯৫, ৫৩৮৪, ৫৩৯০, ৫৪৫৪, ৫৪৫৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২০৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২১০
وَحَدَّثَنَا أَصْبَغُ، قَالَ أَخْبَرَنَا ابْنُ وَهْبٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي عَمْرٌو، عَنْ بُكَيْرٍ، عَنْ كُرَيْبٍ، عَنْ مَيْمُونَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَكَلَ عِنْدَهَا كَتِفًا، ثُمَّ صَلَّى وَلَمْ يَتَوَضَّأْ‏.‏
উম্মুল মু’মিনীন মাইমূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর (বকরীর) কাঁধের গোশত খেলেন, অতঃপর সালাত আদায় করলেন অথচ উযূ করলেন না।
(মুসলিম ৩/২৪, হাঃ ৩৫৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫২. অধ্যায়ঃ
দুধ পান করে কি কুলি করতে হবে?
২১১
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ بُكَيْرٍ، وَقُتَيْبَةُ، قَالاَ حَدَّثَنَا اللَّيْثُ، عَنْ عُقَيْلٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَرِبَ لَبَنًا، فَمَضْمَضَ وَقَالَ ‏ “‏ إِنَّ لَهُ دَسَمًا ‏”‏‏.‏
تَابَعَهُ يُونُسُ وَصَالِحُ بْنُ كَيْسَانَ عَنِ الزُّهْرِيِّ‏.‏
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
একদা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুধ পান করলেন। অতঃপর কুলি করলেন এবং বললেনঃ ‘এতে রয়েছে তৈলাক্ত বস্তু’ (কাজেই কুলি করা উত্তম)। ইউনুস ও সালিহ ইব্‌নু কায়সার (রাঃ) যুহরী (রহঃ) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
(৫৬০৯; মুসলিম ৩/২৪, হাঃ ৩৫৮, আহমাদ ১৯৫১, ৩০৫১) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৩. অধ্যায়ঃ
ঘুমালে উযূ করা এবং দু’একবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে বা মাথা ঝুঁকে পড়লে উযূ না করা।
২১২
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ وَهُوَ يُصَلِّي فَلْيَرْقُدْ حَتَّى يَذْهَبَ عَنْهُ النَّوْمُ، فَإِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا صَلَّى وَهُوَ نَاعِسٌ لاَ يَدْرِي لَعَلَّهُ يَسْتَغْفِرُ فَيَسُبَّ نَفْسَهُ ‏”‏‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ সালাতরত অবস্থায় তোমাদের কেউ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লে সে যেন ঘুমের আমেজ চলে না যাওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়ে নেয়। কারণ, যে তন্দ্রাচ্ছন্ন সালাত আদায় করে সে জানে না যে, সে কি ইস্তেগফার করছে নাকি নিজেকে গালি দিচ্ছে।
(মুসলিম ৬/৩১, হাঃ ৭৮৬, আহমাদ ২৪৩৪১, ২৫৭৫৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২১৩
حَدَّثَنَا أَبُو مَعْمَرٍ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَارِثِ، حَدَّثَنَا أَيُّوبُ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ إِذَا نَعَسَ أَحَدُكُمْ فِي الصَّلاَةِ فَلْيَنَمْ حَتَّى يَعْلَمَ مَا يَقْرَأُ ‏”‏‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ কেউ যদি সালাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, সে যেন ততক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়, যতক্ষণ না সে কী পড়ছে, তা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৪. অধ্যায়ঃ
হাদাস ব্যতীত উযূ করা।
২১৪
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَمْرِو بْنِ عَامِرٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا، ح قَالَ وَحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ سُفْيَانَ، قَالَ حَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ عَامِرٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ عِنْدَ كُلِّ صَلاَةٍ‏.‏ قُلْتُ كَيْفَ كُنْتُمْ تَصْنَعُونَ قَالَ يُجْزِئُ أَحَدَنَا الْوُضُوءُ مَا لَمْ يُحْدِثْ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক সালাতের সময় উযূ করতেন। আমি বললাম : আপনারা কী করতেন? তিনি বললেনঃ হাদাস (উযূ ভঙ্গের কারণ) না হওয়া পর্যন্ত আমাদের (পূর্বের) উযূ যথেষ্ট হত।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২১৫
حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ مَخْلَدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنِي يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي بُشَيْرُ بْنُ يَسَارٍ، قَالَ أَخْبَرَنِي سُوَيْدُ بْنُ النُّعْمَانِ، قَالَ خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَامَ خَيْبَرَ، حَتَّى إِذَا كُنَّا بِالصَّهْبَاءِ، صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْعَصْرَ، فَلَمَّا صَلَّى دَعَا بِالأَطْعِمَةِ، فَلَمْ يُؤْتَ إِلاَّ بِالسَّوِيقِ، فَأَكَلْنَا وَشَرِبْنَا، ثُمَّ قَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِلَى الْمَغْرِبِ فَمَضْمَضَ، ثُمَّ صَلَّى لَنَا الْمَغْرِبَ وَلَمْ يَتَوَضَّأْ
সুওয়াইদ ইব্‌নু নু’মান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ খায়বার যুদ্ধের বছর আমরা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে বের হলাম। সহ্‌বা নামক স্থানে পৌঁছে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করলেন। সালাত শেষে তিনি খাবার আনতে বললেন। ছাতু ব্যতীত আর কিছুই আনা হল না। আমরা তা খেলাম এবং পান করলাম। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাগরিবের জন্য দাঁড়ালেন, অতঃপর কুলি করলেন; অতঃপর আমাদের নিয়ে মাগরিবের সালাত আদায় করলেন অথচ তিনি (নতুন) উযূ করলেন না।
(২০৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২০৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৫. অধ্যায়ঃ
পেশাবের অপবিত্রতা হতে হুশিয়ার না হওয়া কাবীরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত।
২১৬
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ مُجَاهِدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِحَائِطٍ مِنْ حِيطَانِ الْمَدِينَةِ أَوْ مَكَّةَ، فَسَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذَّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا، فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ يُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ ‏”‏، ثُمَّ قَالَ ‏”‏ بَلَى، كَانَ أَحَدُهُمَا لاَ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الآخَرُ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ دَعَا بِجَرِيدَةٍ فَكَسَرَهَا كِسْرَتَيْنِ، فَوَضَعَ عَلَى كُلِّ قَبْرٍ مِنْهُمَا كِسْرَةً‏.‏ فَقِيلَ لَهُ يَا رَسُولَ اللَّهِ لِمَ فَعَلْتَ هَذَا قَالَ ‏”‏ لَعَلَّهُ أَنْ يُخَفَّفَ عَنْهُمَا مَا لَمْ تَيْبَسَا أَوْ إِلَى أَنْ يَيْبَسَا
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা মদীনা বা মক্কার বাগানগুলোর মধ্য হতে কোন এক বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি এমন দু’ ব্যক্তির আওয়ায শুনতে পেলেন যে, তাদেরকে কবরে আযাব দেয়া হচ্ছিল। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এদের দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে, অথচ কোন গুরুতর অপরাধে তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তারপর তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ, এদের একজন পেশাব করতে গিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করত না। অপর ব্যক্তি চোগলখোরী করত। অতঃপর তিনি একটি খেজুরের ডাল আনতে বললেন, এবং তা ভেঙ্গে দু’ টুকরা করে প্রত্যেকের কবরের উপর এক টুকরা করে রাখলেন। তাঁকে বলা হল, ‘হে আল্লাহর রসূল! কেন এমন করলেন?’ তিনি বললেনঃ আশা করা যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু’টি শুকিয়ে না যায় তাদের আযাব কিছুটা হালকা করা হবে।
(২১৮, ১৩৬১, ১৩৭৮, ৬০৫২, ৬০৫৫; মুসলিম ২/৩৪, হাঃ ২৯২, আহমাদ ১৯৮০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৬. অধ্যায়ঃ
পেশাব ধোয়া সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে।
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জনৈক কবরবাসী সম্পর্কে বলেছেন, সে তার পেশাব থেকে সতর্ক থাকত না। তিনি শুধু মানুষের পেশাব সম্পর্কেই উল্লেখ করেছেন।
২১৭
حَدَّثَنَا يَعْقُوبُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ حَدَّثَنِي رَوْحُ بْنُ الْقَاسِمِ، قَالَ حَدَّثَنِي عَطَاءُ بْنُ أَبِي مَيْمُونَةَ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا تَبَرَّزَ لِحَاجَتِهِ أَتَيْتُهُ بِمَاءٍ فَيَغْسِلُ بِهِ
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বের হলে আমি তাঁর নিকট পানি নিয়ে যেতাম। তিনি তা দিয়ে শৌচকার্য করতেন।
(১৫০) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২১৮
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ خَازِمٍ، قَالَ حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ، عَنْ مُجَاهِدٍ، عَنْ طَاوُسٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ مَرَّ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِقَبْرَيْنِ فَقَالَ ‏”‏ إِنَّهُمَا لَيُعَذَّبَانِ، وَمَا يُعَذَّبَانِ فِي كَبِيرٍ أَمَّا أَحَدُهُمَا فَكَانَ لاَ يَسْتَتِرُ مِنَ الْبَوْلِ، وَأَمَّا الآخَرُ فَكَانَ يَمْشِي بِالنَّمِيمَةِ ‏”‏‏.‏ ثُمَّ أَخَذَ جَرِيدَةً رَطْبَةً، فَشَقَّهَا نِصْفَيْنِ، فَغَرَزَ فِي كُلِّ قَبْرٍ وَاحِدَةً‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ، لِمَ فَعَلْتَ هَذَا قَالَ ‏”‏ لَعَلَّهُ يُخَفَّفُ عَنْهُمَا مَا لَمْ يَيْبَسَا ‏”‏‏.‏ قَالَ ابْنُ الْمُثَنَّى وَحَدَّثَنَا وَكِيعٌ قَالَ حَدَّثَنَا الأَعْمَشُ قَالَ سَمِعْتُ مُجَاهِدًا مِثْلَهُ ‏”‏ يَسْتَتِرُ مِنْ بَوْلِهِ
ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা দু’টি কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। এ সময় তিনি বললেনঃ এদের ‘আযাব দেয়া হচ্ছে, কোন গুরুতর অপরাধের জন্য তাদের শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। তাদের একজন পেশাব হতে সতর্ক থাকত না। আর অপরজন চোগলখোরী করে বেড়াত। তারপর তিনি একখানি কাঁচা খেজুরের ডাল নিয়ে ভেঙ্গে দু’ভাগ করলেন এবং প্রত্যেক কবরের উপর একখানি গেড়ে দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! কেন এমন করলেন? তিনি বললেনঃ আশা করা যেতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত এ দু’টি শুকিয়ে না যায় তাদের আযাব কিছুটা হালকা করা হবে। ইব্‌নুল মুসান্না (রহঃ) আ’মাশ (রহঃ) বলেনঃ আমি মুজাহিদ (রহঃ) হতে অনুরূপ শুনেছি। সে তার পেশাব হতে সতর্ক থাকত না।
(২১৬) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৭. অধ্যায়ঃ
জনৈক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করলে পেশাব শেষ না করা পর্যন্ত নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং অন্যান্য লোকের পক্ষ হতে অবকাশ দেয়া।
২১৯
حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، قَالَ حَدَّثَنَا هَمَّامٌ، أَخْبَرَنَا إِسْحَاقُ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم رَأَى أَعْرَابِيًّا يَبُولُ فِي الْمَسْجِدِ فَقَالَ ‏ “‏ دَعُوهُ ‏”‏‏.‏ حَتَّى إِذَا فَرَغَ دَعَا بِمَاءٍ فَصَبَّهُ عَلَيْهِ
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক বেদুঈনকে মসজিদে পেশাব করতে দেখলেন। তখন তিনি বললেনঃ ‘তাকে ছেড়ে দাও’। সে পেশাব শেষ করলে পানি নিয়ে আসতে বললেন, অতঃপর তা সেখানে ঢেলে দিলেন।
(২২১, ৬০২৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২১৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৮. অধ্যায়ঃ
মসজিদে পেশাবের উপর পানি ঢেলে দেয়া।
২২০
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ أَخْبَرَنِي عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ، قَالَ قَامَ أَعْرَابِيٌّ فَبَالَ فِي الْمَسْجِدِ فَتَنَاوَلَهُ النَّاسُ، فَقَالَ لَهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ دَعُوهُ وَهَرِيقُوا عَلَى بَوْلِهِ سَجْلاً مِنْ مَاءٍ، أَوْ ذَنُوبًا مِنْ مَاءٍ، فَإِنَّمَا بُعِثْتُمْ مُيَسِّرِينَ، وَلَمْ تُبْعَثُوا مُعَسِّرِينَ ‏”‏‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একদা জনৈক বেদুঈন দাঁড়িয়ে মসজিদে পেশাব করল। তখন লোকেরা তাকে বাধা দিতে গেলে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের বললেনঃ তোমরা তাকে ছেড়ে দাও এবং ওর পেশাবের উপর এক বালতি পানি ঢেলে দাও। কারণ তোমাদেরকে কোমল ও সুন্দর আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, রূঢ় আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়নি।
(৬১২৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২২১
حَدَّثَنَا خَالِدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، قَالَ جَاءَ أَعْرَابِيٌّ فَبَالَ فِي طَائِفَةِ الْمَسْجِدِ، فَزَجَرَهُ النَّاسُ، فَنَهَاهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم، فَلَمَّا قَضَى بَوْلَهُ أَمَرَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِذَنُوبٍ مِنْ مَاءٍ، فَأُهْرِيقَ عَلَيْهِ‏.‏
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। (২১৯)
আনাস ইব্‌নু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একবার এক বেদুঈন এসে মসজিদের এক পাশে পেশাব করে দিল। তা দেখে লোকজন তাকে ধমকাতে লাগল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের নিষেধ করলেন। তার পেশাব শেষ হলে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশে এর উপর এক বালতি পানি ঢেলে দেওয়া হল।
(২১৯ নম্বর হাদিসের অনুরুপ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৫৯. অধ্যায়ঃ
বাচ্চাদের পেশাব।
২২২
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنْ هِشَامِ بْنِ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ أُمِّ الْمُؤْمِنِينَ، أَنَّهَا قَالَتْ أُتِيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِصَبِيٍّ، فَبَالَ عَلَى ثَوْبِهِ، فَدَعَا بِمَاءٍ فَأَتْبَعَهُ إِيَّاهُ‏.‏
উম্মুল মু’মিনীন মা ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট একটি ছেলে শিশুকে আনা হল। শিশুটি তাঁর কাপড়ে পেশাব করে দিল। তিনি পানি আনালেন এবং এর উপর ঢেলে দিলেন।
(৫৪৬৮, ৬০০২, ৬৩৫৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২২৩
حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ، عَنْ أُمِّ قَيْسٍ بِنْتِ مِحْصَنٍ، أَنَّهَا أَتَتْ بِابْنٍ لَهَا صَغِيرٍ، لَمْ يَأْكُلِ الطَّعَامَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، فَأَجْلَسَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي حِجْرِهِ، فَبَالَ عَلَى ثَوْبِهِ، فَدَعَا بِمَاءٍ فَنَضَحَهُ وَلَمْ يَغْسِلْهُ‏.‏
উম্মু কায়স বিন্‌ত মিহসান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি তাঁর এমন একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলেন যে তখনো খাবার খেতে শিখেনি। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শিশুটিকে তাঁর কোলে বসালেন। তখন সে তাঁর কাপড়ে পেশাব করে দিল। তিনি পানি আনিয়ে এর উপর ছিটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করলেন না। [১]
(৫৬৯৩; মুসলিম ২/৩১, হাঃ ২৮৭, আহমাদ ২৭০৬৪, ২৭০৭২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৩)
[১] পেশাব অপবিত্র। তবে পেশাব লেগে যাওয়া বস্তুকে পবিত্র করার পদ্ধতি দু রকম। এক : প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি অথবা দুগ্ধপোষ্য মেয়ে হলে তার পেশাব অবশ্যই ধুয়ে ফেলতে হবে। দুই : যদি দুগ্ধপোষ্য ছেলে হয় তবে পানির ছিটা দিলে তা পবিত্র হয়ে যাবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬০. অধ্যায়ঃ
দাঁড়িয়ে ও বসে পেশাব করা।
২২৪
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ أَتَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم سُبَاطَةَ قَوْمٍ فَبَالَ قَائِمًا، ثُمَّ دَعَا بِمَاءٍ، فَجِئْتُهُ بِمَاءٍ فَتَوَضَّأَ‏.‏
হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা গোত্রের ময়লা আবর্জনা ফেলার স্থানে আসলেন। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে পেশাব করলেন। [১] অতঃপর পানি আনতে বললেন। আমি তাঁকে পানি এনে দিলে তিনি উযূ করলেন।[১]
(২২৫, ২২৬, ২৪৭১ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৪)
[১] সাধারণত বসে পেশাব করাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অভ্যাস । এ জন্যই হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, “যে ব্যাক্তি তোমাদের বলবে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন -– তার কথা বিশ্বাস করো না” (তিরমিযী, নাসাঈ) । এই একটি মাত্র স্থানেই তাঁর অভ্যাসের ব্যতিক্রম পাওয়া যায় । এর কারণ সম্পর্কে আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোমর ব্যাথার কারণে দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন ।” (বায়হাকী, হাকেম)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬১. অধ্যায়ঃ
সাথীর নিকট বসে পেশাব করা এবং দেয়ালের আড়াল করা।
২২৫
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ رَأَيْتُنِي أَنَا وَالنَّبِيُّ، صلى الله عليه وسلم نَتَمَاشَى، فَأَتَى سُبَاطَةَ قَوْمٍ خَلْفَ حَائِطٍ، فَقَامَ كَمَا يَقُومُ أَحَدُكُمْ فَبَالَ، فَانْتَبَذْتُ مِنْهُ، فَأَشَارَ إِلَىَّ فَجِئْتُهُ، فَقُمْتُ عِنْدَ عَقِبِهِ حَتَّى فَرَغَ‏.‏
হুযাইফা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমার স্মরণ আছে যে, একদা আমি ও নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক সাথে চলছিলাম। তিনি দেয়ালের পিছনে মহল্লার একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায় এলেন। অতঃপর তোমাদের কেউ যেভাবে দাঁড়ায় সে ভাবে দাঁড়িয়ে তিনি পেশাব করলেন। এ সময় আমি তাঁর নিকট হতে সরে যাচ্ছিলাম কিন্তু তিনি আমাকে ইঙ্গিত করলেন। আমি এসে তাঁর পেশাব করা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
(২২৪; মুসলিম ২/২২, হাঃ ২৭৩, আহমাদ ২৩৩০১, ২৩৪০৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২১৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬২. অধ্যায়ঃ
গোত্রের আবর্জনা ফেলার স্থানে পেশাব করা।
২২৬
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَرْعَرَةَ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، قَالَ كَانَ أَبُو مُوسَى الأَشْعَرِيُّ يُشَدِّدُ فِي الْبَوْلِ وَيَقُولُ إِنَّ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَ إِذَا أَصَابَ ثَوْبَ أَحَدِهِمْ قَرَضَهُ‏.‏ فَقَالَ حُذَيْفَةُ لَيْتَهُ أَمْسَكَ، أَتَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُبَاطَةَ قَوْمٍ فَبَالَ قَائِمًا‏.‏
আবূ ওয়াইল (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আবূ মূসা (রাঃ) পেশাবের ব্যাপারে খুব কঠোরতা আরোপ করতেন এবং বলতেন : বনী ইসরাঈলের কারো কাপড়ে (পেশাব) লাগলে তা কেটে ফেলত। হুযায়ফা (রাঃ) বললেন, আবূ মূসা (রাঃ) যদি এ হতে বিরত থাকতেন (তবে ভাল হত)। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহল্লার আবর্জনা ফেলার স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পেশাব করেছেন।
(২২৪) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৩. অধ্যায়ঃ
রক্ত ধুয়ে ফেলা।
২২৭
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ الْمُثَنَّى، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ هِشَامٍ، قَالَ حَدَّثَتْنِي فَاطِمَةُ، عَنْ أَسْمَاءَ، قَالَتْ جَاءَتِ امْرَأَةٌ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ أَرَأَيْتَ إِحْدَانَا تَحِيضُ فِي الثَّوْبِ كَيْفَ تَصْنَعُ قَالَ ‏ “‏ تَحُتُّهُ، ثُمَّ تَقْرُصُهُ بِالْمَاءِ، وَتَنْضَحُهُ وَتُصَلِّي فِيهِ ‏”‏‏.
আসমা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, জনৈকা মহিলা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেনঃ (হে আল্লাহর রসূল!) বলুন, আমাদের কারো কাপড়ে হায়যের রক্ত লেগে গেলে সে কী করবে? তিনি বললেনঃ সে তা ঘষে ফেলবে, তারপর পানি দিয়ে রগড়াবে এবং ভাল করে ধুয়ে ফেলবে। অতঃপর সেই কাপড়ে সালাত আদায় করবে।
(৩০৭; মুসলিম ২/৩৩, হাঃ ২৯১, আহমাদ ৬৯৯৮, ২৭০৪৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২২৮
حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ جَاءَتْ فَاطِمَةُ ابْنَةُ أَبِي حُبَيْشٍ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي امْرَأَةٌ أُسْتَحَاضُ فَلاَ أَطْهُرُ، أَفَأَدَعُ الصَّلاَةَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ لاَ، إِنَّمَا ذَلِكِ عِرْقٌ، وَلَيْسَ بِحَيْضٍ، فَإِذَا أَقْبَلَتْ حَيْضَتُكِ فَدَعِي الصَّلاَةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ ثُمَّ صَلِّي ‏”‏‏.‏ قَالَ وَقَالَ أَبِي ‏”‏ ثُمَّ تَوَضَّئِي لِكُلِّ صَلاَةٍ، حَتَّى يَجِيءَ ذَلِكَ الْوَقْتُ
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ফাতিমা বিন্‌তু আবূ হুবায়শ (রাঃ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি একজন রক্ত-প্রদর রোগগ্রস্তা (ইস্তিহাযাহ) মহিলা। আমি কখনো পবিত্র হতে পারি না। এমতাবস্থায় আমি কি সালাত পরিত্যাগ করবো?’ আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ না, এতো শিরা হতে নির্গত রক্ত; হায়য নয়। তাই যখন তোমার হায়য আসবে তখন সালাত ছেড়ে দিও। আর যখন তা বন্ধ হবে তখন রক্ত ধুয়ে ফেলবে, তারপর সালাত আদায় করবে।
বর্ণনাকারী বলেন, আমার পিতা বলেছেনঃ অতঃপর এভাবে আরেক হায়য না আসা পর্যন্ত প্রত্যেক সালাতের জন্য উযূ করবে।
(মুসলিম ৩/১৪, হাঃ ৩৩৩, আহমাদ ২৪৫৭৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৪. অধ্যায়ঃ
বীর্য ধোয়া এবং ঘষে ফেলা এবং স্ত্রীলোক হতে যা লেগে যায় তা ধুয়ে ফেলা।
২২৯
حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ الْجَزَرِيُّ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُ الْجَنَابَةَ مِنْ ثَوْبِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، فَيَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ، وَإِنَّ بُقَعَ الْمَاءِ فِي ثَوْبِهِ‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাপড় হতে অপবিত্রতার চিহ্ন ধুয়ে দিতাম এবং কাপড়ে ভিজা চিহ্ন নিয়ে তিনি সালাতে বের হতেন।
(২৩০, ২৩১, ২৩২; মুসলিম ২/৩২, হাঃ ২৮৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২২৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩০
حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا يَزِيدُ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرٌو، عَنْ سُلَيْمَانَ، قَالَ سَمِعْتُ عَائِشَةَ، ح وَحَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، قَالَ سَأَلْتُ عَائِشَةَ عَنِ الْمَنِيِّ، يُصِيبُ الثَّوْبَ فَقَالَتْ كُنْتُ أَغْسِلُهُ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، فَيَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ وَأَثَرُ الْغَسْلِ فِي ثَوْبِهِ بُقَعُ الْمَاءِ‏.‏
সুলাইমান ইব্‌নু ইয়াসার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
‘আমি ‘আয়িশা (রাঃ)-কে কাপড়ে লাগা বীর্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম।’ তিনি বললেনঃ আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাপড় হতে তা ধুয়ে ফেলতাম। তিনি কাপড় ধোয়ার ভিজা দাগ নিয়ে সালাতে বের হতেন।
(২২৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৫. অধ্যায়ঃ
জানাবাতের অপবিত্রতা বা অন্য কিছু ধোয়ার পর যদি ভিজা চিহ্ন রয়ে যায়।
২৩১
حَدَّثَنَا مُوسَى، قَالَ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَاحِدِ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ، قَالَ سَأَلْتُ سُلَيْمَانَ بْنَ يَسَارٍ فِي الثَّوْبِ تُصِيبُهُ الْجَنَابَةُ قَالَ قَالَتْ عَائِشَةُ كُنْتُ أَغْسِلُهُ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، ثُمَّ يَخْرُجُ إِلَى الصَّلاَةِ وَأَثَرُ الْغَسْلِ فِيهِ بُقَعُ الْمَاءِ‏.‏
‘আমর ইব্‌নু মায়মূন (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ কাপড়ে জানাবাতের অপবিত্রতা লাগা সম্পর্কে আমি সুলায়মান ইব্‌নু ইয়াসার (রহঃ)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ ‘আয়িশা (রাঃ) বলেছেনঃ আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাপড় হতে তা ধুয়ে ফেলতাম। অতঃপর তিনি সালাতে বেরিয়ে যেতেন আর তাতে পানি দিয়ে ধোয়ার চিহ্ন অবশিষ্ট থাকত।
(২২৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩২
حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ خَالِدٍ، قَالَ حَدَّثَنَا زُهَيْرٌ، قَالَ حَدَّثَنَا عَمْرُو بْنُ مَيْمُونِ بْنِ مِهْرَانَ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ، عَنْ عَائِشَةَ، أَنَّهَا كَانَتْ تَغْسِلُ الْمَنِيَّ مِنْ ثَوْبِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم، ثُمَّ أَرَاهُ فِيهِ بُقْعَةً أَوْ بُقَعًا‏.‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাপড় হতে বীর্য ধুয়ে ফেলতেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বললেনঃ তারপর আমি তাতে পানির একটি বা কয়েকটি দাগ দেখতে পেতাম।
(২২৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

/৬৬. অধ্যায়ঃ
উট, চতুষ্পদ জন্তু ও বকরীর পেশাব এবং বকরীর খোঁয়াড় প্রসঙ্গে।
আবু মূসা (রাঃ) দারুল বারীদে (কূফার একটি স্থান, যেখানে সরকারী ডাক বহনকারীরা অবতরণ করতেন) সালাত আদায় করেন । আর তার পাশেই গোবর এবং খালি ময়দান ছিল । তিনি বললেনঃ এ জায়গা এবং ঐ জায়গা একই পর্যায়ের ।
২৩৩
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ حَرْبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ أَيُّوبَ، عَنْ أَبِي قِلاَبَةَ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ قَدِمَ أُنَاسٌ مِنْ عُكْلٍ أَوْ عُرَيْنَةَ، فَاجْتَوَوُا الْمَدِينَةَ، فَأَمَرَهُمُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِلِقَاحٍ، وَأَنْ يَشْرَبُوا مِنْ أَبْوَالِهَا وَأَلْبَانِهَا، فَانْطَلَقُوا، فَلَمَّا صَحُّوا قَتَلُوا رَاعِيَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَاسْتَاقُوا النَّعَمَ، فَجَاءَ الْخَبَرُ فِي أَوَّلِ النَّهَارِ، فَبَعَثَ فِي آثَارِهِمْ، فَلَمَّا ارْتَفَعَ النَّهَارُ جِيءَ بِهِمْ، فَأَمَرَ فَقَطَعَ أَيْدِيَهُمْ وَأَرْجُلَهُمْ، وَسُمِرَتْ أَعْيُنُهُمْ، وَأُلْقُوا فِي الْحَرَّةِ يَسْتَسْقُونَ فَلاَ يُسْقَوْنَ‏.‏
قَالَ أَبُو قِلاَبَةَ فَهَؤُلاَءِ سَرَقُوا وَقَتَلُوا وَكَفَرُوا بَعْدَ إِيمَانِهِمْ، وَحَارَبُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ ‘উকল বা ‘উরাইনাহ গোত্রের কিছু লোক (ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশে) মদীনায় এলে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের (সদকার) উটের নিকট যাবার এবং উটের পেশাব ও দুধ পান করার নির্দেশ দিলেন। তারা সেখানে চলে গেল। অতঃপর তারা সুস্থ হয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রাখালকে হত্যা করল এবং উটগুলো তাড়িয়ে নিয়ে গেল। এ সংবাদ দিনের প্রথম ভাগেই (তাঁর নিকট) এসে পৌঁছল। তিনি তাদের পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য লোক পাঠালেন। বেলা বাড়লে তাদেরকে পাকড়াও করে আনা হল। অতঃপর তাঁর আদেশে তাদের হাত পা কেটে ফেলা হল। উত্তপ্ত শলাকা দিয়ে তাদের চোখ ফুটিয়ে দেয়া হল এবং গরম পাথুরে ভূমিতে তাদের নিক্ষেপ করা হল। তারা পানি চাইছিল, কিন্তু তাদেরকে পানি দেয়া হয়নি।
আবূ কিলাবাহ (রহঃ) বলেন, এরা চুরি করেছিল, হত্যাকান্ড ঘটিয়েছিল, ঈমান আনার পর কুফরী করেছিল এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল।
(১৫০১, ৩০১৮, ৪১৯২, ৪১৯৩, ৪৬১০, ৫৬৮৫, ৫৬৮৬, ৫৭২৭, ৬৮০২, ৬৮০৩, ৬৮০৪, ৬৮০৫, ৬৮৯৯; মুসলিম ২৮/২, হাঃ ১৬৭১, আহমাদ ১২৯৩৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩৪
حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنَا أَبُو التَّيَّاحِ، يَزِيدُ بْنُ حُمَيْدٍ عَنْ أَنَسٍ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي قَبْلَ أَنْ يُبْنَى الْمَسْجِدُ فِي مَرَابِضِ الْغَنَمِ‏.‏
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ মসজিদে নাবাবী নির্মিত হবার পূর্বে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বকরীর খোঁয়াড়ে সালাত আদায় করতেন। [১]
(৪২৮, ৪২৯, ১৮৬৪, ২১০৬, ২৭৭১, ২৭৭৪, ২৭৭৯, ৩৯৩২; মুসলিম ৫/১, হাঃ ৫২৪, আহমাদ ১৩০১৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৪)
[১] যে পশুর গোশত হালাল তার পেশাব ও গোবর অপবিত্র নয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৭. অধ্যায়ঃ
ঘি এবং পানিতে নাপাকী পড়া
যুহরী (রহঃ) বলেনঃ পানিতে অপবিত্রতা পড়লে কান ক্ষতি নেই, যতক্ষণ তার স্বাদ, গন্ধ বা রং বদলে না যায়। হাম্মাদ (রহঃ) বলেনঃ মৃত (পাখির) পালক (পানিতে পড়লে) কোন দোষ নেই। যুহরী (রহঃ) মৃত জন্তু, যথা : হাতী প্রভৃতির হাড় সম্পর্কে বলেনঃ আমি পূর্ববর্তী আলিমদের মধ্যে কিছু আলিমকে পেয়েছি, তাঁরা তা (চিরুণী বানিয়ে) চুল আঁচড়াতেন এবং তার পাত্রে তেল রেখে ব্যবহার করতেন, এতে তাঁরা কোনরূপ দোষ মনে করতেন না। ইব্‌নু সীরীন (রহঃ) ও ইবরাহীম (রহঃ) বলেনঃ হাতীর দাঁতের ব্যবসায়ে কোন দোষ নেই।
২৩৫
حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنْ مَيْمُونَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ فَأْرَةٍ سَقَطَتْ فِي سَمْنٍ فَقَالَ ‏ “‏ أَلْقُوهَا وَمَا حَوْلَهَا فَاطْرَحُوهُ‏.‏ وَكُلُوا سَمْنَكُمْ ‏”‏‏.‏
মাইমূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘ঘি’য়ে পতিত ইঁদুর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেনঃ ‘ইঁদুরটি এবং তার আশ পাশ হতে ফেলে দাও এবং তোমাদের অবশিষ্ট ঘি খাও।
(২৩৬, ৫৫৩৮, ৫৫৩৯, ৫৫৪০ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২২৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩৬
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا مَعْنٌ، قَالَ حَدَّثَنَا مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ بْنِ مَسْعُودٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنْ مَيْمُونَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ فَأْرَةٍ سَقَطَتْ فِي سَمْنٍ فَقَالَ ‏ “‏ خُذُوهَا وَمَا حَوْلَهَا فَاطْرَحُوهُ ‏”‏‏.‏ قَالَ مَعْنٌ حَدَّثَنَا مَالِكٌ مَا لاَ أُحْصِيهِ يَقُولُ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ عَنْ مَيْمُونَةَ‏.‏
মাইমূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ‘ঘি’র মধ্যে ইঁদুর পড়ে যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি বললেনঃ তা ও তার আশপাশ হতে ফেলে দাও। (আ.প্র. ২৩০)
মা’ন (রহঃ) বলেন, মালিক (রহঃ) আমার নিকট বহুবার এভাবে বর্ণনা করেছেন : ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) হতে এবং ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) মাইমূনা (রাঃ) হতেও।
(ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩৭
حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ مُحَمَّدٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ، عَنْ هَمَّامِ بْنِ مُنَبِّهٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ كُلُّ كَلْمٍ يُكْلَمُهُ الْمُسْلِمُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يَكُونُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَهَيْئَتِهَا إِذْ طُعِنَتْ، تَفَجَّرُ دَمًا، اللَّوْنُ لَوْنُ الدَّمِ، وَالْعَرْفُ عَرْفُ الْمِسْكِ ‏”‏‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ আল্লাহর রাস্তায় মুসলিমদের যে যখম হয়, ক্বিয়ামাতের দিন তার প্রতিটি যখম আঘাতকালীন সময়ে যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থাতেই থাকবে। রক্ত ছুটে বের হতে থাকবে। তার রং হবে রক্তের রং কিন্তু গন্ধ হবে মিশকের মত।
(২৮০৩, ৫৫৩৩; মুসলিম ৩৩/২৮, হাঃ ১৮৭৬, আহমাদ ৯১৯৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩১, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৮. অধ্যায়ঃ
আবদ্ধ পানিতে পেশাব করা।
২৩৮
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، قَالَ أَخْبَرَنَا أَبُو الزِّنَادِ، أَنَّ عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ هُرْمُزَ الأَعْرَجَ، حَدَّثَهُ أَنَّهُ، سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ نَحْنُ الآخِرُونَ السَّابِقُونَ ‏”‏‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন যে, আমরা শেষে আগমনকারী এবং (ক্বিয়ামাত দিবসে) অগ্রবর্তী।
(৮৭৬, ৮৯৬, ২৯৫৬, ৩৪৮৬, ৬৬২৪, ৬৮৮৭,৭০৩৬,৭৪৯৫ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ নাই, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮)
এ সনদেই তিনি বলেনঃ তোমাদের কেউ যেন স্থির- যা প্রবাহিত নয় এমন পানিতে কখনো পেশাব না করে। (সম্ভবত) পরে সে আবার তাতে গোসল করবে।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮ শেষাংশ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস
২৩৯
وَبِإِسْنَادِهِ قَالَ ‏ “‏ لاَ يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ الَّذِي لاَ يَجْرِي، ثُمَّ يَغْتَسِلُ فِيهِ ‏”‏‏.‏
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তোমাদের কেউ যেন স্থির- যা প্রবাহিত নয় এমন পানিতে কখনো পেশাব না করে। (সম্ভবত) পরে সে আবার তাতে গোসল করবে।
(আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৮ শেষাংশ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৬৯. অধ্যায়ঃ
মুসল্লীর পিঠের উপর ময়লা বা মৃত জন্তু ফেললে তার সালাত বাতিল হবে না।
ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) সালাত আদায়ের অবস্থায় তাঁর কাপড়ে রক্ত দেখলে (সেভাবেই) তা রেখে দিয়ে সেভাবে সালাত আদায় করে নিতেন।
ইব্‌নুল মুসায়্যাব ও শা’বী (রহঃ) বলেন, যখন কেউ সালাত আদায় করে আর তার কাপড়ে রক্ত অথবা জানাবাতের নাপাকী থাকে অথবা সে ক্বিবলাহ ব্যতীত অন্যদিকে মুখ করে অথবা তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করে অতঃপর ওয়াক্তের মধ্যেই যদি পানি পেয়ে যায় তবে (সালাত) দুহ্‌রাবে না।
২৪০
حَدَّثَنَا عَبْدَانُ، قَالَ أَخْبَرَنِي أَبِي، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، عَنْ عَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ بَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَاجِدٌ ح قَالَ وَحَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ عُثْمَانَ قَالَ حَدَّثَنَا شُرَيْحُ بْنُ مَسْلَمَةَ قَالَ حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ يُوسُفَ عَنْ أَبِيهِ عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ قَالَ حَدَّثَنِي عَمْرُو بْنُ مَيْمُونٍ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ مَسْعُودٍ حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُصَلِّي عِنْدَ الْبَيْتِ، وَأَبُو جَهْلٍ وَأَصْحَابٌ لَهُ جُلُوسٌ، إِذْ قَالَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ أَيُّكُمْ يَجِيءُ بِسَلَى جَزُورِ بَنِي فُلاَنٍ فَيَضَعُهُ عَلَى ظَهْرِ مُحَمَّدٍ إِذَا سَجَدَ فَانْبَعَثَ أَشْقَى الْقَوْمِ فَجَاءَ بِهِ، فَنَظَرَ حَتَّى إِذَا سَجَدَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَهُ عَلَى ظَهْرِهِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ وَأَنَا أَنْظُرُ، لاَ أُغَيِّرُ شَيْئًا، لَوْ كَانَ لِي مَنْعَةٌ‏.‏ قَالَ فَجَعَلُوا يَضْحَكُونَ وَيُحِيلُ بَعْضُهُمْ عَلَى بَعْضٍ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَاجِدٌ لاَ يَرْفَعُ رَأْسَهُ، حَتَّى جَاءَتْهُ فَاطِمَةُ، فَطَرَحَتْ عَنْ ظَهْرِهِ، فَرَفَعَ رَأْسَهُ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِقُرَيْشٍ ‏”‏‏.‏ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ، فَشَقَّ عَلَيْهِمْ إِذْ دَعَا عَلَيْهِمْ ـ قَالَ وَكَانُوا يُرَوْنَ أَنَّ الدَّعْوَةَ فِي ذَلِكَ الْبَلَدِ مُسْتَجَابَةٌ ـ ثُمَّ سَمَّى ‏”‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِأَبِي جَهْلٍ، وَعَلَيْكَ بِعُتْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ، وَشَيْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ، وَالْوَلِيدِ بْنِ عُتْبَةَ، وَأُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ، وَعُقْبَةَ بْنِ أَبِي مُعَيْطٍ ‏”‏‏.‏ وَعَدَّ السَّابِعَ فَلَمْ يَحْفَظْهُ قَالَ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَقَدْ رَأَيْتُ الَّذِينَ عَدَّ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَرْعَى فِي الْقَلِيبِ قَلِيبِ بَدْرٍ‏.‏
‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একদা আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাজদারত অবস্থায় ছিলেন। অন্য সূত্রে আহমাদ ইব্‌নু ‘উসমান (রহঃ)….. ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা বায়তুল্লার (ক্বাবার) পাশে সালাত আদায় করছিলেন এবং সেখানে আবূ জাহেল ও তার সাথীরা বসা ছিল। এমন সময় তাদের একজন অন্যজনকে বলে উঠল ‘তোমাদের মধ্যে কে অমুক গোত্রের উটনীর নাড়িভুঁড়ি এনে মুহাম্মাদ যখন সাজ্‌দা করেন তখন তার পিঠের উপর চাপিয়ে দিতে পারে’? তখন গোত্রের বড় পাষণ্ড (‘উকবাহ) তাড়াতাড়ি গিয়ে তা নিয়ে এল এবং তাঁর প্রতি লক্ষ্য রাখল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন সাজদায় গেলেন, তখন সে তাঁর পিঠের উপর দুই কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দিল। ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেন, আমি (এ দৃশ্য) দেখছিলাম কিন্তু আমার কিছু করার ছিল না। হায়! আমার যদি বাধা দেবার শক্তি থাকত! তিনি বলেন, তারা হাসতে লাগল এবং একে অন্যের উপর লুটোপুটি খেতে লাগল। আর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন সাজদায় থাকলেন, মাথা উঠালেন না। অবশেষে ফাতিমা (রাঃ) এসে সেটি তাঁর পিঠের উপর হতে ফেলে দিলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাথা উঠিয়ে বললেনঃ হে আল্লাহ! আপনি কুরায়শকে ধ্বংস করুন। এরূপ তিনবার বললেন। তিনি যখন তাদের বদ দু’আ করেন তখন তা তাদের অন্তরে ভয় জাগিয়ে তুলল। বর্ণনাকারী বলেন, তারা জানত যে, এ শহরে দু’আ কবূল হয়। অতঃপর তিনি নাম ধরে বললেনঃ হে আল্লাহ! আবূ জাহেলকে ধ্বংস করুন এবং ‘উতবাহ ইব্‌নু রবী’আহ, শায়বাহ ইব্‌নু রবী’আ, ওয়ালীদ ইব্‌নু ‘উতবাহ, উমাইয়া বিন খালাফ ও ‘উকবাহ ইব্‌নু আবী মু’আইতকে ধ্বংস করুন। রাবী বলেন, তিনি সপ্তম ব্যক্তির নামও বলেছিলেন কিন্তু তিনি স্মরণ রাখতে পারেননি। ইব্‌নু মাস’ঊদ (রাঃ) বলেনঃ সেই সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের নাম উচ্চারণ করেছিলেন, তাদের আমি বদরের কূপের মধ্যে নিহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি।
(৫২০, ২৯৩৪, ৩১৮৫, ৩৮৫৪, ৩৯৬০; মুসলিম ৩২/৩৯, হাঃ ১৭৯৪, আহমাদ ৩৭২২) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৩৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭০. অধ্যায়ঃ
থুথু, নাকের শ্লেম্মা ইত্যাদি কাপড়ে লেগে গেলে।
‘উরওয়াহ (রহঃ) মিসওয়ার ও মারওয়ান (রহঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদায়বিয়ার সময় বের হলেন। অতঃপর পূর্ণ হাদীস বর্ণনার পর তিনি বলেন, আর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (সেদিন) যখনই কোন শ্লেম্মা ঝেড়ে ফেলছিলেন, তখন তা তাদের কারো না কারো হাতে পড়ছিল। তারপর তা (বরকত স্বরূপ) ঐ ব্যক্তি তা তার মুখমণ্ডল ও শরীরে মেখে নিচ্ছিল।
২৪১
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ يُوسُفَ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ حُمَيْدٍ، عَنْ أَنَسٍ، قَالَ بَزَقَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فِي ثَوْبِهِ‏.‏ طَوَّلَهُ ابْنُ أَبِي مَرْيَمَ قَالَ أَخْبَرَنَا يَحْيَى بْنُ أَيُّوبَ حَدَّثَنِي حُمَيْدٌ قَالَ سَمِعْتُ أَنَسًا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏.
আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা তাঁর কাপড়ে থুথু ফেললেন। ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন যে, ইব্‌নু আবূ মারইয়াম এ হাদীসটি বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।
(৪০৫, ৪১২, ৪১৩, ৪১৭, ৫৩১, ৫৩২, ৮২২, ১৬১৪ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৪, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭১. অধ্যায়ঃ
নবীয (খেজুর, কিসমিস, মনাক্কা, ইত্যাদি ভিজানো পানি) এবং নেশার উদ্রেককারী পানীয় দ্বারা উযূ না-জায়িয
হাসান (রহঃ) ও আবুল ‘আলিয়াহ (রহঃ) একে মাকরূহ বলেছেন। ‘আত্বা (রহঃ) বলেনঃ নবীয এবং দুধ দিয়ে উযূ করার চেয়ে তায়াম্মুম করাই আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।
২৪২
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا الزُّهْرِيُّ، عَنْ أَبِي سَلَمَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ كُلُّ شَرَابٍ أَسْكَرَ فَهُوَ حَرَامٌ ‏”‏‏
‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যে সকল পানীয় নেশা সৃষ্টি করে, তা হারাম।
(৫৫৮৫, ৫৫৮৬ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭২. অধ্যায়ঃ
পিতার মুখমণ্ডল হতে কন্যা কর্তৃক রক্ত ধুয়ে ফেলা।
আবুল ‘আলিয়াহ (রহঃ) বলেনঃ আমার পায়ে ব্যাথা, তোমরা আমার পা মালিশ করে দাও।
 ২৪৩
حَدَّثَنَا مُحَمَّدٌ، قَالَ أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ، عَنْ أَبِي حَازِمٍ، سَمِعَ سَهْلَ بْنَ سَعْدٍ السَّاعِدِيَّ،، وَسَأَلَهُ النَّاسُ، وَمَا بَيْنِي وَبَيْنَهُ أَحَدٌ بِأَىِّ شَىْءٍ دُووِيَ جُرْحُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَا بَقِيَ أَحَدٌ أَعْلَمُ بِهِ مِنِّي، كَانَ عَلِيٌّ يَجِيءُ بِتُرْسِهِ فِيهِ مَاءٌ، وَفَاطِمَةُ تَغْسِلُ عَنْ وَجْهِهِ الدَّمَ، فَأُخِذَ حَصِيرٌ فَأُحْرِقَ فَحُشِيَ بِهِ جُرْحُ
আবূ হাযিম থেকে বর্ণিতঃ
যখন আমার এবং সাহল ইব্‌নু সা’দ আস-সা’ঈদী (রাঃ)-র মাঝখানে কেউ ছিল না, তখন লোকে তার নিকট আরয করলঃ (উহুদ যুদ্ধে) কী দিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যখমের চিকিৎসা করা হয়েছিল? তখন তিনি বললেনঃ এ ব্যাপারে আমার চেয়ে অধিক জানে এমন কেউ জীবিত নেই। ‘আলী (রাঃ) তাঁর ঢালে করে পানি আনছিলেন আর ফাতিমাহ্‌ (রাঃ) তাঁর মুখমণ্ডল হতে রক্ত ধুয়ে দিলেন। অবশেষে চাটাই পুড়িয়ে (তার ছাই) তাঁর ক্ষতস্থানে দেয়া হল।
(২৯০৩, ২৯১১, ৩০৩৭, ৪০৭৫, ৫২৪৮, ৫৭২২ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭৩. অধ্যায়ঃ
মিসওয়াক করা।
ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কাছে রাত কাটিয়ে ছিলাম। তখন [১] তিনি মিসওয়াক করলেন।
[১] তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে উঠে ।

২৪৪
حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، قَالَ حَدَّثَنَا حَمَّادُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ غَيْلاَنَ بْنِ جَرِيرٍ، عَنْ أَبِي بُرْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدْتُهُ يَسْتَنُّ بِسِوَاكٍ بِيَدِهِ يَقُولُ ‏ “‏ أُعْ أُعْ ‏”‏، وَالسِّوَاكُ فِي فِيهِ، كَأَنَّهُ يَتَهَوَّعُ‏.‏
আবূ বুরদাহ (রহঃ)-র পিতা [আবূ মূসা (রাঃ)] থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ একবার আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলাম। তখন তাঁকে দেখলাম তিনি মিসওয়াক করছেন এবং মিসওয়াক মুখে দিয়ে তিনি উ’ উ’ শব্দ করছেন যেন তিনি বমি করছেন।
(মুসলিম ২/১৫, হাঃ ২৫৪, আহমাদ ১৯৭৫৮) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

২৪৫
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ، قَالَ حَدَّثَنَا جَرِيرٌ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ أَبِي وَائِلٍ، عَنْ حُذَيْفَةَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا قَامَ مِنَ اللَّيْلِ يَشُوصُ فَاهُ بِالسِّوَاكِ‏.‏
হুযায়ফাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন রাতে (সালাতের জন্য) উঠতেন তখন মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন।
(৮৮৯, ১১৩৬; মুসলিম ২/১৫, হাঃ ২৫৫, আহমাদ ২৩৪৭৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৮, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭৪. অধ্যায়ঃ
বয়সে বড় ব্যক্তিকে মিসওয়াক প্রদান করা।
২৪৬
وَقَالَ عَفَّانُ حَدَّثَنَا صَخْرُ بْنُ جُوَيْرِيَةَ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ أَرَانِي أَتَسَوَّكُ بِسِوَاكٍ، فَجَاءَنِي رَجُلاَنِ أَحَدُهُمَا أَكْبَرُ مِنَ الآخَرِ، فَنَاوَلْتُ السِّوَاكَ الأَصْغَرَ مِنْهُمَا، فَقِيلَ لِي كَبِّرْ‏.‏ فَدَفَعْتُهُ إِلَى الأَكْبَرِ مِنْهُمَا ‏”‏‏.‏
قَالَ أَبُو عَبْدِ اللَّهِ اخْتَصَرَهُ نُعَيْمٌ عَنِ ابْنِ الْمُبَارَكِ عَنْ أُسَامَةَ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ‏.
ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি (স্বপ্নে) দেখলাম যে, আমি মিসওয়াক করছি। আমার নিকট দু’ ব্যক্তি এলেন। একজন অপরজন হতে বয়সে বড়। অতঃপর আমি তাদের মধ্যে কনিষ্ঠ ব্যক্তিকে মিসওয়াক দিতে গেলে আমাকে বলা হলো, ‘বড়কে দাও’। তখন আমি তাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকে দিলাম। আবূ ‘আবদুল্লাহ বলেন, ‘নু’আয়ম, ইব্‌নুল মুবারাক সূত্রে ইব্‌নু ‘উমর (রাঃ) হতে হাদীসটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন।
(মুসলিম ৪২/৪, হাঃ ২২৭১, আহমাদ ৬১০৭) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৩৯, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৭২ অনুচ্ছেদ)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

৪/৭৫. অধ্যায়ঃ
উযূ সহ রাতে ঘুমাবার ফযীলত।
২৪৭
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مُقَاتِلٍ، قَالَ أَخْبَرَنَا عَبْدُ اللَّهِ، قَالَ أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنْ مَنْصُورٍ، عَنْ سَعْدِ بْنِ عُبَيْدَةَ، عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ، قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ إِذَا أَتَيْتَ مَضْجَعَكَ فَتَوَضَّأْ وُضُوءَكَ لِلصَّلاَةِ، ثُمَّ اضْطَجِعْ عَلَى شِقِّكَ الأَيْمَنِ، ثُمَّ قُلِ اللَّهُمَّ أَسْلَمْتُ وَجْهِي إِلَيْكَ، وَفَوَّضْتُ أَمْرِي إِلَيْكَ، وَأَلْجَأْتُ ظَهْرِي إِلَيْكَ، رَغْبَةً وَرَهْبَةً إِلَيْكَ، لاَ مَلْجَأَ وَلاَ مَنْجَا مِنْكَ إِلاَّ إِلَيْكَ، اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ، وَبِنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ‏.‏ فَإِنْ مُتَّ مِنْ لَيْلَتِكَ فَأَنْتَ عَلَى الْفِطْرَةِ، وَاجْعَلْهُنَّ آخِرَ مَا تَتَكَلَّمُ بِهِ ‏”‏‏.‏ قَالَ فَرَدَّدْتُهَا عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمَّا بَلَغْتُ ‏”‏ اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ ‏”‏‏.‏ قُلْتُ وَرَسُولِكَ‏.‏ قَالَ ‏”‏ لاَ، وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ
বারাআ ইব্‌নু ‘আযিব (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ যখন তুমি বিছানায় যাবে তখন সালাতের উযূর মতো উযূ করে নেবে। তারপর ডান পাশে শুয়ে বলবেঃ
“হে আল্লাহ! আমার জীবন আপনার নিকট সমর্পণ করলাম। আমার সকল কাজ তোমার নিকট অর্পণ করলাম এবং আমি তোমার আশ্রয় গ্রহণ করলাম তোমার প্রতি আগ্রহ ও ভয় নিয়ে। তুমি ব্যতীত প্রকৃত কোন আশ্রয়স্থল ও পরিত্রাণের স্থান নেই। হে আল্লাহ! আমি ঈমান আনলাম তোমার অবতীর্ণ কিতাবের উপর এবং তোমার প্রেরিত নবীর প্রতি।”
অতঃপর যদি সে রাতেই তোমার মৃত্যু হয় তবে ইসলামের উপর তোমার মৃত্যু হবে। এ কথাগুলো তোমার সর্বশেষ কথায় পরিণত কর। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে এ কথাগুলি পুনরায় শুনালাম। যখন اللَّهُمَّ آمَنْتُ بِكِتَابِكَ الَّذِي أَنْزَلْتَ পর্যন্ত পৌছে وَرَسُولِكَ বললাম, তখন তিনি বললেনঃ না; বরং وَنَبِيِّكَ الَّذِي أَرْسَلْتَ বল। [১]
(৬৩১১, ৬৩১৩, ৬৩১৫, ৭৪৮৮; মুসলিম ৪৮/১৭, হাঃ ২৭১০, আহমাদ ১৮৫৮৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ২৪০, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ২৪৫)
[১] কুরআন ও সুন্নাহয় বর্ণিত দু’আয় আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বর্ণিত শব্দের পরিবর্তন করা যাবে না। এবং দু’আ নিজ পক্ষ হতে তৈরী করাও যাবে না। কারণ ‘আমল কবূলের দু’টি শর্ত রয়েছেঃ
(১) ইখলাস বা নিছক আল্লাহর উদ্দেশে হতে হবে।
(২) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের হুবহু অনুসরণ হতে হবে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দু’আ যেভাবে শিক্ষা দিয়েছেন ঠিক সেভাবেই দু’আ পড়তে হবে। দু’আর সঙ্গে শব্দ সংযোজন বা বিয়োজন সম্পূর্ণ অবৈধ বা বিদ’আত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে আমাদের দেশে রেডিও ও টেলিভিশনে ও বেশীরভাগ মসজিদে আযানের দু’আর মধ্যে অতিরিক্ত শব্দ সংযোজন করা হয় যা বিদ’আত। কিংবা দরুদ পাঠের সময় কিছু কিছু অতিরিক্ত বানানো শব্দ দ্বারা দরুদ পাঠ করা হয় এমনকি নতুন নতুন অনেক দরুদ তৈরী করা হয়েছে সবই বিদ’আত যা আল্লাহর রসূল শিক্ষা দেননি। কারণ, এ অতিরিক্ত শব্দগুলো ও বানানো দরুদগুলো সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস


মেয়েদের জন্য ১৫ টি হাদিস

সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

. দেবর মৃত্যু সমতুল্য। (মৃত্যু থেকে মানুষ যেভাবে পলায়ন বা সতর্কতা অবলম্বন করে এক্ষেত্রে তাই করতে হবে) (বুখারী শরীফ ৫২৩২, মুসলিম শরীফ ২১৭২, তিরমিযী শরীফ ১১৭১)

. কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হলে নিঃসন্দেহে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান। (তিরমিযী শরীফ ১১৭১)

. তোমরা সেই মহিলাদের নিকট গমন করো না যাদের স্বামীরা বিদেশে আছে। কারণ, শয়তান তোমাদের রক্ত শিরায় প্রবাহিত হয়। (তিরমিযী শরীফ  ১১৭২)

৪. কোন অবৈধ নারীকে স্পর্শ করার চেয়ে মাথায় লোহার পেরেক পুঁতে যাওয়া ভালো। (আস-সিলসিলাতুস সহীহাহ ২২৬)

৫. রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন, “দুই শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামের অধিবাসী যাদেরকে আমি দেখিনি। তারা ভবিষ্যতে আসবে। প্রথম শ্রেণী হবে একদল অত্যাচারী, যাদের সঙ্গে থাকবে গরুর লেজের মত চাবুক যার দ্বারা তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। আর দ্বিতীয় শ্রেণী হল সে নারীর দল, যারা কাপড় পরিধান করবে কিন্তু তবুও তারা উলঙ্গ অবস্থায় থাকবে, নিজেরা অন্যদের প্রতি আকৃষ্ট এবং অন্যদেরকেও তাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে, যাদের মস্তক (খোঁপা বাধার কারণে) উটের হেলে যাওয়া কুঁজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তার গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুগন্ধ বহু দূরবর্তী স্থান থেকেও পাওয়া যাবে।” (মুসলিম শরীফ ২১২৮)

৬. রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের বাহিরে দেখতে পান যে, নারীরা রাস্তায় পুরুষের সাথে মিশে গেছেন। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নারীদের বলেন, তোমরা অপেক্ষা কর, কারণ, তোমাদের জন্য রাস্তার মাঝে হাটা উচিত নয়, তোমাদের জন্য হল রাস্তার পাশ। এ কথা শোনে নারী দেয়াল ঘেঁসে হাটা শুরু করে তখন দেখা গেল তাদের অনেকের কাপড় দেয়ালের সাথে মিশে যেত। (আবু দাউদ শরীফ ৫২৭২)

. কোন মহিলা যেন মাহরাম পুরুষ ছাড়া একাকিনী সফর না করে, তার নিকট যেন মাহরাম ছাড়া কোনো বেগানা পুরুষ প্রবেশ না করে, এ কথা শোনে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, হে রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  আমি অমুক অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সৈন্য দলে নাম লিখিয়েছি অথচ আমার স্ত্রী হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন এখন আমি কি করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাকে উত্তর দিলেন তুমি তার সাথে বের হও। (বুখারী শরীফ ১৮৬২)

৮. নারী গোপন জিনিস, সুতরাং যখন সে(বাড়ি হতে) বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে রমণীয় করে দেখায়। (তিরমিযী শরীফ ১১৩৭)

৯. রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  আমাদেরকে নিষেধ করেছেন যে, “আমরা যেন মহিলাদের নিকট তাদের স্বামীদের বিনা অনুমতিতে গমন না করি।” (তিরমিযী ২৭৭৯)

১০.প্রত্যেক চক্ষুই ব্যভিচারী। আর নারী যদি সুগন্ধি ব্যবহার করে কোনো (পুরুষের) মজলিসের পাশ দিয়ে পার হয়ে যায় তাহলে সে এক বেশ্যা। এমন কি এই অবস্থায় নামাযের জন্য যেতেও নিষিদ্ধ। রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন, “যে মহিলা সেন্ট ব্যবহার করে মসজিদে যায়, সেই মহিলার গোসল না করা পর্যন্ত কোনো নামায কবুল হবে না।” (সহীহ আল-জামে আস-সগীর আযযিয়াদাতুহ ২৭০)

১১.আদম সন্তানের উপর ব্যভিচারের কিছু অংশ লিপিবদ্ধ হয়েছে সে অবশ্যই তার মধ্যে লিপ্ত হবে। দুই চোখের ব্যভিচার হল দৃষ্টি, দুই কানের ব্যভিচার হল শ্রবণ, মুখের ব্যাভিচার হল কথা বলা, হাতের ব্যভিচার হল স্পর্শ করা এবং পায়ের ব্যভিচার হল খারাপ উদ্দেশ্যে অগ্রসর হওয়া। আর অন্তর আশা ও আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে। লজ্জা স্থান তাকে বাস্তবায়ন করে অথবা মিথ্যায় পরিণত করে। (মুসলিম শরীফ ২৬৫৭)

১২ যে নারী স্বগৃহ, স্বামীগৃহ বা মায়ের বাড়ি ছাড়া অন্য স্থানে নিজের পর্দা রাখে (কাপড় খোলে) সে তার ও তার রবের মধ্যকার পর্দা ও লজ্জাশীলতাকে বিদীর্ণ করে দেয়। (তিরমিযী শরীফ ২৮০৩)

১৩.কোন নারীর উপর তোমার দৃষ্টি পড়লে তার প্রতি) বারবার দৃষ্টিপাত করো না। বরং নজর অতিসত্তর ফিরিয়ে নিও, কারণ, তোমার জন্য প্রথমবার ক্ষমা, দ্বিতীয়বার নয়। (আহমাদ শরীফ ১৩৬৯)

১৪.নারীদের বেশ ধারী পুরুষের উপর অভিশাপ এবং পুরুষদের বেশ ধারিণী নারীদের উপর আল্লাহর অভিশাপ। (ইবনে মাজাহ শরীফ ১৯০৪)

১৫. যে নারী তার মাথায় এমন চুল বাড়তি লাগায় যা তার মাথার নয়, সে তার মাথায় জালিয়াতি সংযোগ করে। (সহীহ আল-জামিউস সাগীর  ২৭০৫)

কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন,“যে ব্যক্তি মানুষকে হিদায়াতের দিকে ডাকে তার জন্য ঠিক ঐ পরিমাণ সাওয়াব রয়েছে,  পরিমাণ পাবে তাকে অনুসরণকারীরা,সহীহ মুসলিম শরীফ ২৬৭৪,৬৮০৪।

আল্লাহ তায়ালা মা বোনদেরকে আমল করার তাওফিক দান করুন।

©সিরাতাল মুস্তাকিম


শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯

হযরত ইবরাহীম (আ:) এর জীবনী

শনিবার, নভেম্বর ১৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্ভবত: এগারোতম অধঃস্তন পুরুষ। নূহ থেকে ইবরাহীম পর্যন্ত প্রায় ২০০০ বছরের ব্যবধান ছিল। হযরত ছালেহ (আঃ)-এর প্রায় ২০০ বছর পরে ইবরাহীমের আগমন ঘটে। ঈসা থেকে ব্যবধান ছিল ১৭০০ বছর অথবা প্রায় ২০০০ বছরের। তিনি ছিলেন ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের পিতা এবং তাঁর স্ত্রী ‘সারা’ ছিলেন ‘উম্মুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের মাতা। তাঁর স্ত্রী সারার পুত্র হযরত ইসহাক্ব-এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধর ‘বনু ইসরাঈল’ নামে পরিচিত এবং অপর স্ত্রী হাজেরার পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে জন্ম নেন বিশ্বনবী ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ(ছাল্লাল্লা-হু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। যাঁর অনুসারীগণ ‘উম্মতে মুহাম্মাদী’ বা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে পরিচিত।
বাবেল হ’তে তিনি কেন‘আনে (ফিলিস্তীন) হিজরত করেন। সেখান থেকে বিবি সারা-র বংশজাত নবীগণের মাধ্যমে আশপাশে সর্বত্র তাওহীদের দাওয়াত বিস্তার লাভ করে। অপর স্ত্রী হাজেরার পুত্র ইসমাঈলের মাধ্যমে বায়তুল্লাহ ও তার আশপাশ এলাকায় তাওহীদের প্রচার ও প্রসার হয় এবং অবশেষে এখানেই সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে। এভাবে ইবরাহীমের দুই স্ত্রীর বংশজাত নবীগণ বিশ্বকে তাওহীদের আলোয় আলোকিত করেন। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দেহসৌষ্ঠব ও চেহারা মুবারক পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ন্যায় ছিল। যা তিনি মে‘রাজ থেকে ফিরে এসে উম্মতকে খবর দেন।[1]


আবুল আম্বিয়া ও সাইয়েদুল আম্বিয়া :
ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন ইহুদী-খৃষ্টান-মুসলমান সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পিতা। কেননা আদম (আঃ) হ’তে ইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী বাদে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত ১ লাখ ২৪ হাযার পয়গম্বরের প্রায় সকলেই  ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর বংশধর। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,
إنَّ اللّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوْحاً وَآلَ إِبْرَاهِيْمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِيْنَ- (آل عمران ৩৩)-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, আলে ইবরাহীম ও আলে ইমরানকে বিশ্ববাসীর উপরে নির্বাচিত করেছেন’ (আলে ইমরান ৩/৩৩)। এই নির্বাচন ছিল বিশ্ব সমাজে আল্লাহর তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য। ইবরাহীম ছিলেন নবীগণের পিতা এবং পুত্র মুহাম্মাদ ছিলেন নবীগণের নেতা, এ বিষয়টি সর্বদা মুমিনের মানসপটে জাগরুক রাখার জন্য দৈনিক ছালাতের শেষ বৈঠকে পঠিত দরূদের মধ্যে ইবরাহীম ও মুহাম্মাদের উপরে এবং উভয়ের পরিবার বর্গের উপরে আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষণের জন্য দো‘আ করার বিধান রাখা হয়েছে। ইবরাহীমের বংশে বরকত হ’ল নবুঅত ও ঐশী কিতাবের বরকত এবং মুহাম্মাদের ও তাঁর বংশে বরকত হ’ল বিজ্ঞানময় কুরআন ও হাদীছ এবং তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বরকত।
ইবরাহীম ও তাঁর বংশধর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوْبَ وَجَعَلْنَا فِيْ ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِيْنَ- (العنكبوت ২৭)-
‘আমরা তাকে দান করলাম ইসহাক্ব ও ইয়াকূবকে এবং তার বংশধরগণের মধ্যে প্রদান করলাম নবুঅত ও কিতাব। তাকে আমরা দুনিয়াতে পুরষ্কৃত করলাম। নিশ্চয়ই পরকালে সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (আনকাবূত ২৯/২৭)
অতঃপর শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُوْلِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنْ كَانَ يَرْجُو اللهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيراً- (الأحزاب ২১)-
‘যারা আল্লাহ ও শেষদিবসের (অর্থাৎ আখেরাতে মুক্তির) আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক হারে স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের (মুহাম্মাদের) মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে’ (আহযাব ৩৩/২১)। অতঃপর তাঁর পরিবার সম্পর্কে বলা হয়েছে,
إِنَّمَا يُرِيْدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيْراً-(الأحزاب ৩৩)-
‘হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। শেষ যামানায় ইমাম মাহদী আসবেন হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর বংশধরগণের মধ্য হ’তে এ বিষয়ে বহু ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।[2] এইভাবে ইবরাহীম ও মুহাম্মাদের নাম পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত দিকে দিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হ’তে থাকবে। ফালিল্লাহিল হাম্দ

নবী ইবরাহীম :
আদম, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা প্রমুখ দু’তিন জনের ব্যতিক্রম বাদে নূহ (আঃ) সহ অন্যান্য সকল নবীর ন্যায় ইবরাহীমকেও আমরা ধরে নিতে পারি যে, তিনি ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ করেন। উম্মতে মুসলিমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) পশ্চিম ইরাকের বছরার নিকটবর্তী ‘বাবেল’ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরটি পরবর্তীতে সুলায়মান (আঃ)-এর সময়ে জাদুর জন্য বিখ্যাত হয় (বাক্বারাহ ২/১০২)
এখানে তখন কালেডীয় (كلدانى ) জাতি বসবাস করত। তাদের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন নমরূদ। যিনি তৎকালীন পৃথিবীতে অত্যন্ত উদ্ধত ও অহংকারী সম্রাট ছিলেন। তিনি প্রায় চারশো বছর রাজত্ব করেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজে ‘উপাস্য’ হবার দাবী করেন।[3] আল্লাহ তারই মন্ত্রী ও প্রধান পুরোহিত ‘আযর’-এর ঘরে বিশ্বনেতা ও বিশ্ব সংস্কারক নবী ইবরাহীমকে মুখ্যত: কালেডীয়দের প্রতি প্রেরণ করেন। ইবরাহীমের নিজ পরিবারের মধ্যে কেবল সহধর্মিনী ‘সারা’ ও ভ্রাতুষ্পুত্র ‘লূত’ মুসলমান হন।
স্ত্রী ‘সারা’ ছিলেন আদি মাতা বিবি হাওয়ার পরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মহিলা। তিনি ১২৭ বছর বয়সে ‘হেবরনে’ মৃত্যু ববণ করেন ও সেখানেই কবরস্থ হন।[4] সারার মৃত্যুর পরে ইবরাহীম ক্বানতূরা বিনতে ইয়াক্বতিন ও হাজূন বিনতে আমীন নামে পরপর দুজন নারীকে বিয়ে করেন এবং ৬+৫=১১টি সন্তান লাভ করেন।[5] তিনি প্রায় দু’শো বছর জীবন পান বলে কথিত আছে।
উল্লেখ্য যে, হযরত ইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২৫টি সূরায় ২০৪টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।[6] নিম্নে আমরা আয়াত সমূহ থেকে নিয়ে সাধ্যতম সাজিয়ে কাহিনী আকারে পেশ করার চেষ্টা পাব ইনশাআল্লাহ।-

সামাজিক অবস্থা:
ইবরাহীমের আবির্ভাবকালীন সময়ে কালেডীয় সমাজ শিক্ষা ও সভ্যতায় শীর্ষস্থানীয় ছিল। এমনকি তারা সৌরজগত নিয়েও গবেষণা করত। কিন্তু অসীলা পূজার রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা আল্লাহকে পাবার জন্য বিভিন্ন মূর্তি ও তারকা সমূহের পূজা করত। হযরত ইবরাহীম উভয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে প্রেরিত হন।

ইবরাহীম (আঃ)-এর দাওয়াত : মূর্তিপূজারী কওমের প্রতি-
সকল নবীর ন্যায় ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে প্রথমে তাওহীদের দাওয়াত দেন। যেমন আল্লাহ বলেন,
وََإِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ، إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَوْثَاناً وَتَخْلُقُونَ إِفْكاً إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقاً فَابْتَغُوا عِندَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ-(العنكبوت ১৬-১৭)-
‘স্মরণ কর ইবরাহীমকে, যখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁকে ভয় কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’। ‘তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে কেবল প্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর নিকটে রিযিক তালাশ কর। তাঁর  ইবাদত কর এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই নিকটে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (আনকাবূত ৩৩/১৬-১৭)
ইবরাহীম (আঃ) উক্ত দাওয়াতের মধ্যে কেবল আল্লাহর স্বীকৃতি কামনা করেননি। বরং স্বীকৃতির ফলাফল (ثمرة الإقرار) আশা করেছিলেন। অর্থাৎ তারা যেন আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে মান্য করে এবং কোন অবস্থায় তা লংঘন না করে। কেননা স্বীকৃতির বিপরীত কাজ করা তা লংঘন করার শামিল।

পিতার প্রতি :
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّهُ كَانَ صِدِّيْقاً نَّبِيًّا، إِذْ قَالَ لِأَبِيْهِ يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لاَ يَسْمَعُ وَلاَ يُبْصِرُ وَلاَ يُغْنِي عَنكَ شَيْئاً، يَا أَبَتِ إِنِّي قَدْ جَاءنِيْ مِنَ الْعِلْمِ مَا لَمْ يَأْتِكَ فَاتَّبِعْنِيْ أَهْدِكَ صِرَاطاً سَوِيّاً، يَا أَبَتِ لاَ تَعْبُدِ الشَّيْطَانَ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلرَّحْمَنِ عَصِيّاً، يَا أَبَتِ إِنِّيْ أَخَافُ أَن يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَن فَتَكُوْنَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيّاً-(مريم ৪১-৪৫)-
‘তুমি এই কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা কর। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী’(১৯/৪১)। ‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! তুমি তার পূজা কেন কর, যে শোনে না, দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না?(৪২)। ‘হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাকে সরল পথ দেখাব’(৪৩)। ‘হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না। নিশ্চয়ই শয়তান দয়াময়ের অবাধ্য’(৪৪)। ‘হে আমার পিতা! আমি আশংকা করছি যে, দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শ করবে, অতঃপর তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবে’ (মারিয়াম ১৯/৪১-৪৫)
অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
 وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ لأَبِيْهِ آزَرَ أَتَتَّخِذُ أَصْنَاماً آلِهَةً إِنِّيْ أَرَاكَ وَقَوْمَكَ فِيْ ضَلاَلٍ مُّبِيْنٍ- (الأنعام ৭৪)-
‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বললেন, তুমি কি প্রতিমা সমূহকে উপাস্য মনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছ’ (আন‘আম ৬/৭৪)
কিন্তু ইবরাহীমের এই প্রাণভরা আবেদন পিতা আযরের হৃদয় স্পর্শ করল না। রাষ্ট্রের প্রধান পুরোহিত এবং সম্রাটের মন্ত্রী ও প্রিয়পাত্র হওয়ায় সম্ভবত: বিষয়টি তার প্রেস্টিজ ইস্যু হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قِيلَ لَهُ اتَّقِ اللّهَ أَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالإِثْمِ فَحَسْبُهُ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ، ‘যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার সম্মান তাকে পাপে স্ফীত করে। অতএব তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হ’ল নিকৃষ্টতম ঠিকানা’ (বাক্বারাহ ২/২০৬)। বস্ত্ততঃ অহংকারীদের চরিত্র সর্বত্র ও সর্বযুগে প্রায় একই হয়ে থাকে।

পিতার জবাব :
পুত্রের আকুতিপূর্ণ দাওয়াতের উত্তরে পিতা বলল,قَالَ أَرَاغِبٌ أَنْتَ عَنْ آلِهَتِيْ يَا إِبْرَاهِيْمُ لَئِن لَّمْ تَنْتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِيْ مَلِيًّا- (مريم ৪৬)-   ‘হে ইবরাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই পাথর মেরে তোমার মাথা চূর্ণ করে দেব। তুমি আমার সম্মুখ হ’তে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও’ (মারিয়াম ১৯/৪৬)
ইবরাহীমের জবাব:
পিতার এই কঠোর ধমকি শুনে পুত্র ইবরাহীম বললেন,
قَالَ سَلاَمٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيّاً، وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلاَّ أَكُونَ بِدُعَاء رَبِّي شَقِيّاً- (مريم ৪৭-৪৮)-
‘তোমার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! আমি আমার পালনকর্তার নিকটে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি মেহেরবান’। ‘আমি পরিত্যাগ করছি তোমাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা পূজা কর তাদেরকে। আমি আমার পালনকর্তাকে আহবান করব। আশা করি আমার পালনকর্তাকে আহবান করে আমি বঞ্চিত হব না’ (মারিয়াম ১৯/৪৭-৪৮)

পিতাকে ও নিজ সম্প্রদায়কে একত্রে দাওয়াত:
আল্লাহ বলেন,
 وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيْمَ، إِذْ قَالَ لِأَبِيْهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُوْنَ، قَالُوْا نَعْبُدُ أَصْنَاماً فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِيْنَ، قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُوْنَ، أَوْ يَنْفَعُوْنَكُمْ أَوْ يَضُرُّوْنَ، قَالُوْا بَلْ وَجَدْنَا آبَاءنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُوْنَ، قَالَ أَفَرَأَيْتُم مَّا كُنْتُمْ تَعْبُدُوْنَ، أَنتُمْ وَآبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُوْنَ، فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِّي إِلاَّ رَبَّ الْعَالَمِيْنَ، الَّذِيْ خَلَقَنِيْ فَهُوَ يَهْدِيْنِ، وَالَّذِيْ هُوَ يُطْعِمُنِيْ وَيَسْقِيْنِ، وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ، وَالَّذِيْ يُمِيْتُنِيْ ثُمَّ يُحْيِيْنِ، وَالَّذِيْ أَطْمَعُ أَن يَّغْفِرَ لِيْ خَطِيئَتِيْ يَوْمَ الدِّيْنِ، رَبِّ هَبْ لِيْ حُكْماً وَأَلْحِقْنِيْ بِالصَّالِحِيْنَ، وَاجْعَل لِّيْ لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِيْنَ، َاجْعَلْنِيْ مِن وَّرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيْمِ، وَاغْفِرْ لِأَبِيْ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّيْنَ، وَلاَ تُخْزِنِيْ يَوْمَ يُبْعَثُوْنَ، يَوْمَ لاَ يَنفَعُ مَالٌ وَّلاَ بَنُوْنَ، إِلاَّ مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيْمٍ، وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِيْنَ، وَبُرِّزَتِ الْجَحِيْمُ لِلْغَاوِيْنَ، وَقِيْلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُوْنَ، مِنْ دُوْنِ اللهِ هَلْ يَنْصُرُوْنَكُمْ أَوْ يَنْتَصِرُوْنَ، فَكُبْكِبُوْا فِيْهَا هُمْ وَالْغَاوُوْنَ، وَجُنُوْدُ إِبْلِيْسَ أَجْمَعُوْنَ، قَالُوْا وَهُمْ فِيْهَا يَخْتَصِمُوْنَ، تَاللهِ إِنْ كُنَّا لَفِيْ ضَلاَلٍ مُّبِيْنٍ، إِذْ نُسَوِّيْكُم بِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ، وَمَا أَضَلَّنَا إِلاَّ الْمُجْرِمُوْنَ، َمَا لَنَا مِنْ شَافِعِيْنَ، وَلاَ صَدِيْقٍ حَمِيْمٍ، فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُوْنَ مِنَ الْمُؤْمِنِيْنَ، إِنَّ فِيْ ذَلِكَ لَآيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُم مُّؤْمِنِيْنَ- (الشعراء ৬৯-১০৪)-
‘আর তাদেরকে ইবরাহীমের বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিন’(শো‘আরা ২৬/৬৯)। ‘যখন সে স্বীয় পিতা ও সম্প্রদায়কে ডেকে বলল, তোমরা কিসের পূজা কর’?(৭০)। তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং সর্বদা এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি’(৭১)। ‘সে বলল, তোমরা যখন আহবান কর, তখন তারা শোনে কি’?(৭২)। ‘অথবা তারা তোমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে কি’?(৭৩)। ‘তারা বলল, না। তবে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, তারা এরূপই করত’(৭৪)। ইবরাহীম বলল, তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের তোমরা পূজা করে আসছ’?(৭৫)। ‘তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃপুরুষেরা’(৭৬)। ‘তারা সবাই আমার শত্রু, বিশ্ব পালনকর্তা ব্যতীত’(৭৭)। ‘যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে পথ প্রদর্শন করেছেন’ (৭৮)। ‘যিনি আমাকে আহার দেশ ও পানীয় দান করেন’ (৭৯)। ‘যখন আমি পীড়িত হই, তখন  তিনিই আমাকে  আরোগ্য দান করেন’(৮০)। ‘যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর পুনর্জীবন দান করবেন’ (৮১)। ‘আশা করি শেষ বিচারের দিন তিনি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিবেন’ (৮২)। ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে প্রজ্ঞা দান কর এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের   অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৩)। ‘এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সত্যভাষী কর’ (৮৪)। ‘তুমি আমাকে নে‘মতপূর্ণ জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৫)। (হে প্রভু) ‘তুমি আমার পিতাকে ক্ষমা কর। তিনি তো পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত’(৮৬) (হে আল্লাহ) ‘পুনরুত্থান দিবসে তুমি আমাকে লাঞ্ছিত কর না’ (৮৭)। ‘যে দিনে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না’ (৮৮) ‘কিন্তু যে ব্যক্তি সরল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে’ (৮৯)। ‘(ঐ দিন) জান্নাত আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে’(৯০)। ‘এবং জাহান্নাম বিপথগামীদের সামনে উন্মোচিত করা হবে’(৯১)। ‘(ঐ দিন) তাদেরকে বলা হবে, তারা কোথায় যাদেরকে তোমরা পূজা করতে’?(৯২) ‘আল্লাহর পরিবর্তে। তারা কি (আজ) তোমাদের সাহায্য করতে পারে কিংবা তারা কি কোনরূপ প্রতিশোধ নিতে পারে’? (৯৩)। ‘অতঃপর তাদেরকে এবং (তাদের মাধ্যমে)  পথভ্রষ্টদেরকে অধোমুখী করে নিক্ষেপ করা হবে জাহান্নামে’(৯৪) ‘এবং ইবলীস বাহিনীর সকলকে’ (৯৫)। ‘তারা সেখানে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ে বলবে’(৯৬) ‘আল্লাহর কসম! আমরা প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে ছিলাম’(৯৭), ‘যখন আমরা তোমাদেরকে (অর্থাৎ কথিত উপাস্যদেরকে) বিশ্বপালকের সমতুল্য গণ্য করতাম’(৯৮)।‘আসলে আমাদেরকে পাপাচারীরাই পথভ্রষ্ট করেছিল’ (৯৯)। ‘ফলে (আজ) আমাদের কোন সুফারিশকারী নেই’ (১০০) ‘এবং কোন সহৃদয় বন্ধুও নেই’(১০১)। ‘হায়! যদি কোনরূপে আমরা পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ পেতাম, তাহ’লে আমরা ঈমানদারগণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম’(১০২)। ‘নিশ্চয়ই এ ঘটনার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিল না’ (১০৩)। ‘নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা পরাক্রান্ত ও দয়ালু’ (শো‘আরা ২৬/৬৯-১০৪)
স্বীয় পিতা ও সম্প্রদায়ের নিকটে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তাদের জবাবকে আল্লাহ অন্যত্র নিম্নরূপে বর্ণনা করেন। যেমন-
إِذْ قَالَ لِأَبِيْهِ وَقَوْمِهِ مَا هَذِهِ التَّمَاثِيْلُ الَّتِيْ أَنْتُمْ لَهَا عَاكِفُوْنَ، قَالُوْا وَجَدْنَا آبَاءنَا لَهَا عَابِدِيْنَ، قَالَ لَقَدْ كُنْتُمْ أَنْتُمْ وَآبَاؤُكُمْ فِيْ ضَلاَلٍ مُّبِيْنٍ، قَالُوْا أَجِئْتَنَا بِالْحَقِّ أَمْ أَنْتَ مِنَ اللاَّعِبِيْنَ، قَالَ بَل رَّبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِيْ فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَى ذَلِكُم مِّنَ الشَّاهِدِيْنَ، وَتَاللهِ لَأَكِيْدَنَّ أَصْنَامَكُم بَعْدَ أَن تُوَلُّوْا مُدْبِرِيْنَ- (الأنبياء ৫২-৫৭)-
ইবরাহীম স্বীয় পিতা ও সম্প্রদায়কে বলল, ‘এই মূর্তিগুলি কী যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ’?(আম্বিয়া ২১/৫২)। ‘তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপ পূজা করতে দেখেছি’(৫৩)। ‘সে বলল, তোমরা প্রকাশ্য গুমরাহীতে লিপ্ত আছ এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও’ (৫৪)। ‘তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্যসহ এসেছ, না কেবল কৌতুক করছ’? (৫৫)। ‘সে বলল, না। তিনিই তোমাদের পালনকর্তা, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের পালনকর্তা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং আমি এ বিষয়ে তোমাদের উপর অন্যতম সাক্ষ্যদাতা’(৫৬)। ‘আল্লাহর কসম! যখন তোমরা ফিরে যাবে, তখন আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে একটা কিছু করে ফেলব’ (আম্বিয়া ২১/৫২-৫৭)

দাওয়াতের সারকথা ও ফলশ্রুতি :
মূর্তিপূজারী পিতা ও সম্প্রদায়ের নেতাদের নিকটে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তাদের প্রদত্ত জবাবের সার কথাগুলি নিম্নরূপ:
১. ইবরাহীম তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেন। তিনি মূর্তি পূজার অসারতার বিষয়টি তাদের সামনে বলে দেন। কেননা এটি ছিল সকলের সহজবোধ্য। কিন্তু তারা মূর্তিপূজার অসীলা ছাড়তে রাযী হয়নি। কারণ শিরকী প্রথার মধ্যে নেতাদের লাভ ছিল মাল-সম্পদ ও দুনিয়াবী সম্মানের নগদ প্রাপ্তি। পক্ষান্তরে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে এসবের প্রাপ্তি যোগ নেই। শিরকী পূজা-পার্বনের মধ্যে গরীবদের লাভ ছিল এই যে, এর ফলে তারা নেতাদের কাছ থেকে দুনিয়াবী সহযোগিতা  পেত। এ ছাড়াও বিভিন্ন কাল্পনিক ও ভ্রান্ত বিশ্বাস তাদেরকে মূর্তিপূজায় প্ররোচিত করত। পক্ষান্তরে একনিষ্ঠ তাওহীদ বিশ্বাস তাদেরকে এসব থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। যেখানে এক আল্লাহর গোলামীর অধীনে বড়-ছোট সবার জন্য সামাজিক সমানাধিকার নিশ্চিত হয়ে যায়।
২. মূর্তিপূজারীদের কোন সঙ্গত জবাব ছিল না। তারা কেবল একটা কথাই বলেছিল যে, এটা আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে চলে আসা প্রথা।
৩. ইবরাহীমের এত কিছু বক্তব্যের পরেও এই অন্ধপূজারীরা বলল, আসলেই তুমি কোন সত্য এনেছ, না আমাদের সাথে কৌতুক করছ? কারণ অদৃশ্য অহীর বিষয়টি তাদের বাস্তব জ্ঞানে আসেনি। কিন্তু মূর্তিকে তারা সামনে দেখতে পায়। সেখানে সেবা ও পূজা করে তারা তৃপ্তি পায়।
৪. পিতা তাঁকে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল এবং বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু তিনি পিতার জন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনার ওয়াদা করলেন। এর মধ্যে পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য বোধ ফুটে উঠেছে, যদিও তিনি মুশরিক হন। পরে পিতার কুফরী পরিষ্কার হয়ে গেলে তিনি বিরত হন (তওবাহ ৯/১১৪)
৫. পিতা বহিষ্কার করলেও সম্প্রদায় তখনও বহিষ্কার করেনি। তাই তিনি পুনরায় দাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। যদিও তার ফলশ্রুতি ছিল পূর্বের ন্যায় শূন্য।

তারকা পূজারীদের সাথে বিতর্ক :
মূর্তি পূজারীদের সাথে বিতর্কের পরে তিনি তারকাপূজারী নেতাদের প্রতি তাওহীদের দাওয়াত দেন। কিন্তু তারাও মূর্তি পূজারীদের ন্যায় নিজ নিজ বিশ্বাসে অটল রইল। অবশেষে তাঁর সাথে তাদের নেতাদের তর্কযুদ্ধ আবশ্যিক হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ইবরাহীমের কওমের লোকেরা একই সাথে মূর্তি ও তারকার পূজা করত। সেটাও অসম্ভব কিছু নয়।
পবিত্র কুরআনে এই তর্কযুদ্ধ একটি অভিনব ও নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে সহজে আরবীয় পাঠক হৃদয়ে রেখাপাত করে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন সমগ্র আরবের লোকদের পিতামহ। তাঁর প্রতি গোটা আরব জাতি সম্মান প্রদর্শন করত। অথচ তাদের পিতামহ যার বিরুদ্ধে জীবনভর লড়াই করলেন জাহিল আরবরা সেই সব শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। যে কা‘বা গৃহকে  ইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করেন এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য। তারা সেখানেই মূর্তিপূজা শুরু করে দিয়েছিল। অথচ মুখে আল্লাহকে স্বীকার করত এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করত। আজকের মুসলমানদের জন্য এর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কেননা তারাও মুখে আল্লাহকে স্বীকার করে এবং  শেষনবীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে। অথচ নিজেরা কবর পূজা ও স্থানপূজার শিরকে লিপ্ত রয়েছে। আল্লাহর বিধানের অবাধ্যতা ও তার পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া বিধান সমূহের আনুগত্য তো রয়েছেই। এক্ষণে আমরা কুরআনে বর্ণিত ইবরাহীমের অপর বিতর্ক যুদ্ধটির বিবরণ পেশ করব।-
আল্লাহ বলেন,
وَكَذَلِكَ نُرِيْ إِبْرَاهِيْمَ مَلَكُوْتَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ وَلِيَكُوْنَ مِنَ الْمُوْقِنِيْنَ، فَلَمَّا جَنَّ عَلَيْهِ اللَّيْلُ رَأَى كَوْكَباً قَالَ هَـذَا رَبِّي فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لا أُحِبُّ الآفِلِيْنَ، فَلَمَّا رَأَى الْقَمَرَ بَازِغاً قَالَ هَـذَا رَبِّيْ فَلَمَّا أَفَلَ قَالَ لَئِن لَّمْ يَهْدِنِيْ رَبِّي لَأَكُوْنَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّآلِّيْنَ، فَلَمَّا رَأَى الشَّمْسَ بَازِغَةً قَالَ هَـذَا رَبِّيْ هَـذَا أَكْبَرُ فَلَمَّا أَفَلَتْ قَالَ يَا قَوْمِ إِنِّيْ بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُوْنَ، إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضَ حَنِيْفاً وَّمَا أَنَاْ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، وَحَآجَّهُ قَوْمُهُ قَالَ أَتُحَاجُّونِّي فِي اللهِ وَقَدْ هَدَانِ وَلاَ أَخَافُ مَا تُشْرِكُوْنَ بِهِ إِلاَّ أَن يَّشَآءَ رَبِّيْ شَيْئاً وَسِعَ رَبِّيْ كُلَّ شَيْءٍ عِلْماً أَفَلاَ تَتَذَكَّرُوْنَ، وَكَيْفَ أَخَافُ مَا أَشْرَكْتُمْ وَلاَ تَخَافُوْنَ أَنَّكُمْ أَشْرَكْتُمْ بِاللّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَاناً فَأَيُّ الْفَرِيْقَيْنِ أَحَقُّ بِالأَمْنِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ، الَّذِيْنَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوْا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَـئِكَ لَهُمُ الأَمْنُ وَهُم مُّهْتَدُوْنَ- (الأنعام ৭৫-৮২)-
‘আমি এরূপভাবেই ইবরাহীমকে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের অত্যাশ্চর্য বস্ত্তসমূহ দেখাতে লাগলাম, যাতে সে দৃঢ়বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়’ (আন‘আম ৬/৭৫)। ‘অনন্তর যখন রাত্রির অন্ধকার তার উপরে সমাচ্ছন্ন হ’ল, তখন সে তারকা দেখে বলল যে, এটি আমার পালনকর্তা। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, আমি অস্তগামীদের ভালবাসি না’ (৭৬)। ‘অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, তখন সে বলল, এটি আমার পালনকর্তা। কিন্তু পরে যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ প্রদর্শন না করেন, তাহ’লে অবশ্যই আমি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (৭৭)। ‘অতঃপর যখন উদীয়মান সূর্যকে ডগমগে দেখতে পেল, তখন বলল, এটিই আমার পালনকর্তা এবং এটিই সবচেয়ে  বড়। কিন্তু পরে যখন তা ডুবে গেল, তখন বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত’ (৭৮)। ‘আমি আমার চেহারাকে ঐ সত্তার দিকে একনিষ্ঠ করছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেন এবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’ (৭৯)। ‘(তখন) তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্ক করল। সে বলল, তোমরা কি আমার সাথে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করছ? অথচ তিনি আমাকে সরল পথ দেখিয়েছেন। আর আমি ভয় করিনা তাদের, যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক কর, তবে আমার পালনকর্তা যদি কিছু (কষ্ট দিতে) চান। আমার প্রভুর জ্ঞান সবকিছুতেই পরিব্যপ্ত। তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না’? (৮০)। ‘কিভাবে আমি ঐসব বস্ত্তকে ভয় করব, যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক করেছ? অথচ তোমরা এ বিষয়ে ভয় পাওনা যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন সব বস্ত্তকে শরীক করেছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদের প্রতি কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। এক্ষণে উভয় দলের মধ্যে কে বেশী নিরাপত্তা লাভের অধিকারী? যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক’ (৮১)। ‘যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় ঈমানকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবং তারাই হ’ল সুপথপ্রাপ্ত’ (আন‘আম ৬/৭৫-৮২)
উপরের বর্ণনা ভঙ্গিতে মনে হয় যেন ইবরাহীম ঐ দিনই প্রথম নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্য দেখলেন এবং ‘এটি আমার পালনকর্তা’ বলে সাময়িকভাবে মুশরিক হয়েছিলেন। পরে শিরক পরিত্যাগ করে মুসলিম হ’লেন। অথচ ঘটনা মোটেই তা নয়। কেননা ঐ সময় ইবরাহীম (আঃ) অন্যূন সত্তরোর্ধ্ব বয়সের নবী। আর নবীগণ জন্ম থেকেই নিষ্পাপ ও শিরকমুক্ত থাকেন। আসল কথা হ’ল এই যে, মূর্তি পূজার অসারতা বুঝানো যতটা সহজ ছিল, তারকা পূজার অসারতা বুঝানো ততটা সহজ ছিল না। কেননা ওটা মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই ইবরাহীম (আঃ) এখানে বৈজ্ঞানিক পন্থা বেছে নিলেন এবং জনগণের সহজবোধ্য এমন একটি প্রমাণ উপস্থাপন করলেন, যাতে তাদের লা-জওয়াব হওয়া ব্যতীত কোন উপায় ছিল না। তিনি সৌরজগতের গতি-প্রকৃতি যে আল্লাহর হুকুমের অধীন, সে কথা না বলে তাদের অস্তমিত হওয়ার বিষয়টিকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন। কারণ এটাই ছিল তাদের জন্যে সহজবোধ্য। তিনি বলেন, যা ক্ষয়ে যায়, ডুবে যায়, হারিয়ে যায়, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, ধরে রাখতে পারে না, বরং দৈনিক ওঠে আর ডোবে, সে কখনো মানুষের প্রতিপালক হ’তে পারে না। বরং সর্বোচ্চ পালনকর্তা কেবল তিনিই হ’তে পারেন, যিনি এসব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা। আর তিনিই হ’লেন ‘আল্লাহ’। আমি তাঁর দিকেই ফিরে গেলাম এবং বাপ-দাদার আমল থেকে তোমরা যে শিরক করে আসছ, আমি তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করলাম।
বলা বাহুল্য, এর অন্তর্নিহিত দাওয়াত ছিল এই যে, হে আমার জাতি! তোমরাও আমার মত আল্লাহর দিকে ফিরে এসো এবং শিরক হ’তে মুক্ত হও। কিন্তু ইবরাহীমের এই তর্কযুদ্ধ নিষ্ফল হ’ল। সম্প্রদায়ের নেতারা নিজ নিজ মতের উপরে দৃঢ় রইল। কেউ তাঁর আহবানে সাড়া দিল না।

একটি সংশয় ও তার জওয়াব :
৭৫ হ’তে ৮২ পর্যন্ত ৮টি আয়াতে যে বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছে, এটি ইবরাহীমের শিশুকালে জ্ঞান-বুদ্ধির বয়স হবার সময়কার ঘটনা, নাকি নবী হবার পরের তর্কানুষ্ঠান, এ বিষয়ে বিদ্বানগণ মতভেদ করেছেন। ইবনু জারীর (মৃঃ ৩১০ হিঃ) প্রথমোক্ত  মত পোষণ করেন। তিনি এ বিষয়ে আলী ইবনে ত্বালহার সূত্রে ইবনু আববাস (রাঃ)-এর বর্ণনা পেশ করেছেন। তবে এই বর্ণনাটির সনদ যঈফ।[7]
মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব (৮৫-১৫০ হিঃ) বর্ণিত কিছু অলৌকিক ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে, যা উক্ত মতকে সমর্থন করে। যেমন বাদশাহ নমরূদ যখন জানতে পারেন যে, অচিরেই একটি পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে, যে তার রাজ্য হারানোর কারণ হবে, তখন তিনি নবজাতক সকল পুত্র সন্তানকে হত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। ইবরাহীমের মা তখন একটি পাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে ইবরাহীমকে প্রসব করেন এবং ইবরাহীম একাকী সেখানে বড় হন। ইবরাহীমের এক আঙ্গুল দিয়ে দুধ বের হ’ত, এক আঙ্গুল দিয়ে মধু বের হ’ত ও এক আঙ্গুল দিয়ে পানি বের হ’ত। এভাবে তিনি সেখানে তিন বছর কাটান। তারপর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে এসে মাকে বলেন, আমার প্রভু কে? মা বললেন, নমরূদ। তিনি বললেন, নমরূদের প্রভু কে? তখন মা তাকে চড় মারলেন এবং তিনি বুঝলেন এটিই হ’ল সেই ছেলে, যার সম্পর্কে  বাদশাহ নমরূদ আগেই স্বপ্ন দেখেছেন। সুদ্দী, যাহহাক প্রমুখের বরাতে কাসাঈ স্বীয় ক্বাছাছুল আম্বিয়ার মধ্যে এ ধরনের অনেক অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন (ইবনু কাছীর, কুরতুবী)। অতঃপর ইবরাহীম গুহা থেকে বের হয়ে প্রথম তারকা দেখলেন, তারপর চন্দ্র দেখলেন, তারপর সূর্য দেখলেন। অতঃপর সবকিছুর ডুবে যাওয়া দেখে নিজেই সিদ্ধান্ত  নিলেন যে, প্রকৃত পালনকর্তা তিনি, যিনি এগুলিকে সৃষ্টি করেছেন (কুরতুবী)। ইবনু জারীর দলীল এনেছেন ইবরাহীমের একথা দ্বারা, যেখানে তিনি বলেছেন, لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لأكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ، ‘যদি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ না দেখান, তাহ’লে অবশ্যই আমি পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’ (আন‘আম ৬/৭৭)
ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হিঃ) বলেন, বরং সঠিক কথা এই যে, ইবরাহীমের উপরোক্ত ঘটনা ছিল তার কওমের সাথে একটি তর্কানুষ্ঠান মাত্র। এটি কখনোই তার শিশুকালের ঘটনা নয় এবং তিনি ক্ষণিকের তরেও কখনো মুশরিক হননি। কেননা তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, إِنَّ إِبْرَاهِيمَ كَانَ أُمَّةً قَانِتاً لِلّهِ حَنِيفاً وَلَمْ يَكُ مِنَ الْمُشْرِكِينَ، ‘নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একটি উম্মত এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত ও একনিষ্ঠ। আর তিনি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না’ (নাহল ১৬/১২০)। তাছাড়া প্রত্যেক মানব শিশুই জন্মগতভাবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন, خَلَقْتُ عبادى حُنَفَاءَ ‘আমি আমার বান্দাদের সৃষ্টি করি আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হিসাবে’।[8] সাধারণ মানবশিশু যদি এরূপ হয়, তাহ’লে শিশু ইবরাহীম কেন মুশরিক হবেন? আর এটা যে কওমের নেতাদের সাথে তাঁর একটি তর্কানুষ্ঠান ছিল, তার বড় প্রমাণ এই যে, ৮০ নং আয়াতে বলা হয়েছে وَحَآجَّهُ قَوْمُهُ ‘তাঁর কওম তাঁর সাথে বিতর্ক করল’। তাছাড়া তর্ক শেষে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, يَا قَوْمِ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ، ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত’ (আন‘আম ৬/৭৮)
বলা বাহুল্য তারকা পূজারী নেতাদের সাথে ইবরাহীম (আঃ)-এর বিতর্কের ঘটনাটি কুরআন অত্যন্ত উঁচুমানের আলংকরিক ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছে, যা একটি বাস্তব ও অতুলনীয় বাণীচিত্রের রূপ ধারণ করেছে। যেমন ইবরাহীম (আঃ) উক্ত নেতাদের বলছেন, তোমাদের ধারণা অনুযায়ী ধরে নিলাম আকাশের ঐ  নক্ষত্র,  চন্দ্র ও সূর্য সকলেই ‘আমার রব’। কিন্তু ওরা যে ডুবে গেল। যারা নিজেরা ডুবে যায়, তারা আমাকে বা তোমাদেরকে কিভাবে রক্ষা করবে? অতএব আমি তোমাদের শিরকী আক্বীদা হ’তে মুক্ত। আমি এদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ও অনুগত রইলাম। তোমরাও এদিকে ফিরে এসো। যেমন ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ মুশরিকদের ডেকে বলবেন, أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنتُمْ تَزْعُمُونَ ‘তোমাদের ধারণা অনুযায়ী আমার শরীকরা কোথায়? (ক্বাছাছ ২৮/৬২)। অর্থাৎ তোমাদের দাবী অনুযায়ী ওরা আমার শরীক। অথচ আল্লাহর কোন শরীক নেই।

ইবরাহীম মূর্তি ভাঙ্গলেন :
জ্ঞানীদের ইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষ যখন কোন কিছুর প্রতি অন্ধভক্তি পোষণ করে, তখন শত যুক্তিও কোন কাজ দেয় না। ফলে ইবরাহীম ভাবলেন, এমন কিছু একটা করা দরকার, যাতে পুরা সমাজ নড়ে ওঠে ও ওদের মধ্যে হুঁশ ফিরে আসে। সাথে সাথে তাদের মধ্যে তাওহীদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। সেমতে তিনি সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরে গিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলার সংকল্প করলেন।
ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায় বছরের একটা বিশেষ দিনে উৎসব পালন করত ও সেখানে নানারূপ অপচয় ও অশোভন কাজ করত। যেমন আজকাল প্রবৃত্তি পূজারী ও বস্ত্তবাদী লোকেরা করে থাকে কথিত সংস্কৃতির নামে। এইসব মেলায় সঙ্গত কারণেই কোন নবীর যোগদান করা সম্ভব নয়। কওমের লোকেরা তাকে উক্ত মেলায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানালো। কিন্তু তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে সেখানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন (ছাফফাত ৩৭/৮৯)। অতঃপর তিনি ভাবলেন, আজকের এই সুযোগে আমি ওদের দেবমন্দিরে প্রবেশ করে মূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেব। যাতে ওরা ফিরে এসে ওদের মিথ্যা উপাস্যদের অসহায়ত্বের বাস্তব দৃশ্য দেখতে পায়। হয়তবা এতে তাদের অনেকের মধ্যে হুঁশ ফিরবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান জাগ্রত হবে ও শিরক থেকে তওবা করবে।
অতঃপর তিনি দেবালয়ে ঢুকে পড়লেন ও দেব-দেবীদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন, (তোমাদের সামনে এত নযর-নেয়ায ও ভোগ-নৈবেদ্য রয়েছে)। অথচ ‘তোমরা তা খাচ্ছ না কেন? কি ব্যাপার তোমরা কথা বলছ না কেন? তারপর তিনি ডান হাতে রাখা (সম্ভবতঃ কুড়াল দিয়ে) ভীষণ জোরে আঘাত করে সবগুলোকে গুঁড়িয়ে দিলেন (ছাফফাত ৩৭/৯১-৯৩)। তবে বড় মূর্তিটাকে পূর্বাবস্থায় রেখে দিলেন, যাতে লোকেরা তার কাছে ফিরে যায় (আম্বিয়া ২১/৫৮)
মেলা শেষে লোকজন ফিরে এল এবং যথারীতি দেবমন্দিরে গিয়ে প্রতিমাগুলির অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে গেল। ‘তারা বলাবলি করতে লাগল, এটা নিশ্চয়ই ইবরাহীমের কাজ হবে। কেননা তাকেই আমরা সবসময় মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে বলতে শুনি। অতঃপর ইবরাহীমকে সেখানে  ডেকে আনা হ’ল এবং জিজ্ঞেস করল, أَأَنتَ فَعَلْتَ هَذَا بِآلِهَتِنَا يَا إِبْرَاهِيمُ؟ ‘হে ইবরাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যদের সাথে এরূপ আচরণ করেছ’? (আম্বিয়া ২১/৬২)
ইবরাহীম বললেন, بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُوْنَ- ‘বরং এই বড় মূর্তিটাই একাজ করেছে। নইলে এদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তারা কথা বলতে পারে’ (আম্বিয়া ২১/৬৩)। সম্প্রদায়ের নেতারা একথা শুনে লজ্জা পেল এবং মাথা নীচু করে বলল, قَدْ عَلِمْتَ مَا هَؤُلاَء يَنْطِقُوْنَ- ‘তুমি তো জানো যে, এরা কথা বলে না’। ‘তিনি বললেন, قَالَ أَفَتَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَا لاَ يَنفَعُكُمْ شَيْئاً وَّلاَ يَضُرُّكُمْ- ‘তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর, যা তোমাদের উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না’ (আম্বিয়া ২১/৬৫-৬৬)। তিনি আরও বললেন,قَالَ أَتَعْبُدُونَ مَا تَنْحِتُونَ، وَالله خَلَقَكُمْ وَمَا تَعْمَلُونَ-  ‘তোমরা এমন বস্ত্তর পূজা কর, যা তোমরা নিজ হাতে তৈরী কর’? ‘অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে ও তোমাদের কর্মসমূহকে সৃষ্টি করেছেন’ (ছাফফাত ৩৭/৯৫-৯৬)।أُفٍّ لَّكُمْ وَلِمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللهِ أَفَلاَ تَعْقِلُونَ- ‘ধিক তোমাদের জন্য এবং আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাদের পূজা কর, ওদের জন্য। তোমরা কি বুঝ না’? (আম্বিয়া ২১/৬৭)
তারপর যা হবার তাই হ’ল। যিদ ও অহংকারের বশবর্তী হয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা ইবরাহীমকে চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, একে আর বাঁচতে দেওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, একে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে মারতে হবে, যেন কেউ এর দলে যেতে সাহস না করে। তারা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব গ্রহণ করল এবং সেটা বাদশাহ নমরূদের কাছে পেশ করল। সম্রাটের মন্ত্রী ও দেশের প্রধান পুরোহিতের ছেলে ইবরাহীম। অতএব তাকে সরাসরি সম্রাটের দরবারে আনা হ’ল।

নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক ও অগ্নিপরীক্ষা :
ইবরাহীম (আঃ) এটাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করলেন। নমরূদ ৪০০ বছর ধরে রাজত্ব করায় সে উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং নিজেকে একমাত্র উপাস্য ভেবেছিল। তাই সে ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করল, বল তোমার উপাস্য কে? নমরূদ ভেবেছিল, ইবরাহীম তাকেই উপাস্য বলে স্বীকার করবে। কিন্তু নির্ভীক কণ্ঠে ইবরাহীম জবাব দিলেন, رَبِّيَ الَّذِيْ يُحْيِـيْ وَيُمِيْتُ ‘আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি মানুষকে বাঁচান ও মারেন’। মোটাবুদ্ধির নমরূদ বলল,  أَنَا أُحْيِـيْ وَأُمِيْتُ ‘আমিও বাঁচাই ও মারি’। অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীকে খালাস দিয়ে মানুষকে বাঁচাতে পারি। আবার খালাসের আসামীকে মৃত্যুদন্ড দিতে পারি। এভাবে সে নিজেকেই মানুষের বাঁচা-মরার মালিক হিসাবে সাব্যস্ত করল। ইবরাহীম তখন দ্বিতীয় যুক্তি পেশ করে বললেন, فَإِنَّ اللهَ يَأْتِيْ بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ  ‘আমার আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, আপনি তাকে পশ্চিম দিক হ’তে উদিত করুন’। فَبُهِتَ الَّذِيْ كَفَرَ ‘অতঃপর কাফের (নমরূদ) এতে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো’ (বাক্বারাহ ২/২৫৮)
কওমের নেতারাই যেখানে পরাজয়কে মেনে নেয়নি, সেখানে দেশের একচ্ছত্র সম্রাট কেন পরাজয়কে মেনে  নিবেন। যথারীতি তিনিও অহংকারে ফেটে পড়লেন এবং ইবরাহীমকে জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ  জারি করলেন। সাথে সাথে জনগণকে ধর্মের  দোহাই দিয়ে বললেন, حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِنْ كُنتُمْ فَاعِلِيْنَ ‘তোমরা একে পুড়িয়ে মার এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও’ (আম্বিয়া ২১/৬৮)। উল্লেখ্য যে, কুরআন কোথাও নমরূদের নাম উল্লেখ করেনি এবং সে যে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ উপাস্য’ দাবী করেছিল, এমন কথাও স্পষ্টভাবে বলেনি। তবে ‘আমিও বাঁচাতে  পারি ও মারতে পারি’ (বাক্বারাহ ২/২৫৮) তার এই কথার মধ্যে তার সর্বোচ্চ অহংকারী হবার এবং ইবরাহীমের ‘রব’-এর বিপরীতে নিজেকে এভাবে উপস্থাপন করায় সে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ রব’ হিসাবে ধারণা করেছিল বলে প্রতীয়মান হয়। প্রধানত: ইস্রাঈলী বর্ণনাসমূহের উপরে ভিত্তি করেই ‘নমরূদ’-এর নাম ও তার রাজত্ব সম্পর্কে জানা যায়। কুরআন কেবল অতটুকুই বলেছে, যতটুকু মানব জাতির হেদায়াতের জন্য প্রয়োজন।
যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে নমরূদ ইবরাহীম (আঃ)-কে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুকুম দিল। অতঃপর তার জন্য বিরাটাকারের আয়োজন শুরু হয়ে গেল। আল্লাহ বলেন, وَأَرَادُوْا بِهِ كَيْداً فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَخْسَرِيْنَ، ‘তারা ইবরাহীমের বিরুদ্ধে মহা ফন্দি অাঁটতে চাইল। অতঃপর আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম’ (আম্বিয়া ২১/৭০)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَسْفَلِينَ، ‘আমরা তাদেরকে পরাভূত করে দিলাম’ (ছাফফাত ৩৭/৯৮)
অতঃপর ‘একটা ভিত নির্মাণ করা হ’ল এবং সেখানে বিরাট অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হ’ল। তারপর সেখানে তাকে নিক্ষেপ করা হ’ল’ (ছাফফাত ৩৭/৯৭)। ছহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের সময় ইবরাহীম (আঃ) বলে ওঠেন, حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ، ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক’।[9]
একই প্রার্থনা শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) করেছিলেন, ওহোদ যুদ্ধে আহত মুজাহিদগণ যখন শুনতে পান যে, আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরে না গিয়ে পুনরায় ফিরে আসছে মদীনায় মুসলিম শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, তখন ‘হামরাউল আসাদে’ উপনীত তার পশ্চাদ্ধাবনকারী ৭০ জন আহত ছাহাবীর ক্ষুদ্র দল রাসূলের সাথে সমস্বরে বলে উঠেছিল حَسْبُنَا اللّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيْلُ، ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক’ ঘটনাটি কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে’।[10] এভাবে পিতা ইবরাহীম ও পুত্র মুহাম্মাদের বিপদ মুহূর্তের বক্তব্যে শব্দে শব্দে মিল হয়ে যায়। তবে সার্বিক প্রচেষ্টার সাথেই কেবল উক্ত দো‘আ পাঠ করতে হবে। নইলে কেবল দো‘আ পড়ে নিষ্ক্রিয় বসে থাকলে চলবে না। যেমন ইবরাহীম (আঃ) সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাওয়াত দিয়ে চূড়ান্ত বিপদের সময় এ দো‘আ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিরোধী পক্ষের সেনাপতি আবু সুফিয়ানের পশ্চাদ্ধাবনের পরেই উক্ত দো‘আ পড়েছিলেন।
বস্ত্ততঃ এই কঠিন মুহূর্তের পরীক্ষায় জয়লাভ করার পুরস্কার স্বরূপ সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশ এল قُلْنَا يَا نَارُ كُونِيْ بَرْداً وَّسَلاَماً عَلَى إِبْرَاهِيمَ، ‘হে আগুন! ঠান্ডা হয়ে যাও এবং ইবরাহীমের উপরে শান্তিদায়ক হয়ে যাও’ (আম্বিয়া ২১/৬৯)। অতঃপর ইবরাহীম মুক্তি পেলেন।
অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইবরাহীম (আঃ) ফিরে আসেন এবং এভাবে আল্লাহ কাফিরদের সমস্ত কৌশল বরবাদ করে দেন। এরপর শুরু হ’ল জীবনের আরেক অধ্যায়।

হিজরতের পালা :
ইসলামী আন্দোলনে দাওয়াত ও হিজরত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তৎকালীন পৃথিবীর সমৃদ্ধতম নগরী ছিল বাবেল, যা বর্তমানে ‘বাগদাদ’ নামে পরিচিত।[11] তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে এবং মূর্তিপূজারী ও তারকাপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধে জয়ী হয়ে অবশেষে অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তার প্রভাব সকলের নিকটে পৌঁছে গিয়েছিল। যদিও সমাজপতি ও শাসকদের অত্যাচারের ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ ইসলাম কবুলের ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু তাওহীদের দাওয়াত তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তা সাধারণ জনগণের হৃদয়ে আসন গেড়ে নিয়েছিল।
অতএব এবার অন্যত্র দাওয়াতের পালা। ইবরাহীম (আঃ) সত্তরোর্ধ্ব বয়সে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন। এই দীর্ঘ দিন দাওয়াত দেওয়ার পরেও নিজের স্ত্রী সারাহ ও ভাতিজা লূত ব্যতীত কেউ প্রকাশ্যে ঈমান আনেনি। ফলে পিতা ও সম্প্রদায় কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি আল্লাহর হুকুমে  হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি নিজ সম্প্রদায়কে ডেকে যে বিদায়ী ভাষণ দেন, তার মধ্যে সকল যুগের তাওহীদবাদী গণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় লুকিয়ে রয়েছে।

ইবরাহীমের হিজরত-পূর্ব বিদায়ী ভাষণ:
আল্লাহর ভাষায়, قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوْا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآؤُا مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَداً حَتَّى تُؤْمِنُوْا بِاللهِ وَحْدَهُ إِلاَّ قَوْلَ إِبْرَاهِيْمَ لِأَبِيْهِ لَأَسْتَغْفِرَنَّ لَكَ وَمَا أَمْلِكُ لَكَ مِنَ اللهِ مِنْ شَيْءٍ، رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ-
‘তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করছি তোমাদের সাথে এবং তাদের সাথে যাদেরকে তোমরা পূজা কর আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি এবং আমাদের ও  তোমাদের মাঝে স্থায়ী  শত্রুতা ও বিদ্বেষ বিঘোষিত হ’ল যতদিন না তোমরা কেবলমাত্র এক আল্লাহর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করবে। … প্রভু হে! আমরা কেবল তোমার উপরেই ভরসা করছি এবং তোমার দিকেই মুখ ফিরাচ্ছি ও তোমার নিকটেই আমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল’ (মুমতাহানাহ ৬০/৪)। এরপর তিনি কওমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, إِنِّي ذَاهِبٌ إِلَى رَبِّي سَيَهْدِيْنِ، ‘আমি চললাম আমার প্রভুর পানে, সত্বর তিনি আমাকে পথ দেখাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/৯৯)। অতঃপর তিনি চললেন দিশাহীন যাত্রাপথে।
আল্লাহ বলেন, وَنَجَّيْنَاهُ وَلُوطاً إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا لِلْعَالَمِيْنَ، ‘আর আমরা তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই দেশে, যেখানে বিশ্বের জন্য কল্যাণ রেখেছি’ (আম্বিয়া ২১/৭১)। এখানে তাঁর সাথী বিবি সারা-র কথা বলা হয়নি নারীর গোপনীয়তা রক্ষার শিষ্টাচারের প্রতি খেয়াল করে। আধুনিক নারীবাদীদের জন্য এর মধ্যে শিক্ষণীয়  বিষয় রয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী সারা ও ভাতিজা লূতকে পথ প্রদর্শন করে নিয়ে গেলেন পার্শ্ববর্তী দেশ শাম বা সিরিয়ার অন্তর্গত বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অদূরে কেন‘আন নামক স্থানে, যা এখন তাঁর নামানুসারে ‘খালীল’ (الخليل ) নামে পরিচিত হয়েছে। ঐ সময় সেখানে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের   অস্তিত্ব ছিল না। এখানেই ইবরাহীম (আঃ) বাকী জীবন অতিবাহিত করেন ও এখানেই কবরস্থ হন। এখানে হিজরতের সময় তাঁর বয়স ৮০  থেকে ৮৫-এর মধ্যে ছিল এবং বিবি সারা-র ৭০ থেকে ৭৫-এর মধ্যে। সঙ্গী ভাতিজা লূতকে আল্লাহ নবুঅত দান করেন ও তাকে পার্শ্ববর্তী সমৃদ্ধ নগরী সাদূমসহ পাঁচটি নগরীর লোকদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় ও তিনি সেখানেই বসবাস করেন। ফলে ইবরাহীমের জীবনে নিঃসঙ্গতার এক কষ্টকর অধ্যায় শুরু হয়।
উল্লেখ্য যে, মানবজাতির প্রথম ফসল ডুমুর (তীন) বর্তমান ফিলিস্তীনেই উৎপন্ন হয়েছিল আজ থেকে এগারো হাযার বছর আগে। সম্প্রতি সেখানে প্রাপ্ত শুকনো ডুমুর পরীক্ষা করে এ তথ্য জানা গেছে।[12]

কেন‘আনের জীবন :
জন্মভূমি বাবেল শহরে জীবনের প্রথমাংশ অতিবাহিত করার পর হিজরত ভূমি শামের কেন‘আনে তিনি জীবনের বাকী অংশ কাটাতে শুরু করেন। তাঁর জীবনের অন্যান্য পরীক্ষা সমূহ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়। কিছু দিন অতিবাহিত করার পর এখানে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। মানুষ সব দলে দলে ছুটতে থাকে মিসরের দিকে। মিসর তখন ফেরাঊনদের শাসনাধীনে ছিল। উল্লেখ্য যে, মিসরের শাসকদের উপাধি ছিল ‘ফেরাঊন’। ইবরাহীম ও মূসার সময় মিসর ফেরাঊনদের শাসনাধীনে ছিল। মাঝখানে ইউসুফ-এর সময়ে ২০০ বছরের জন্য মিসর হাকসূস (الهكسوس ) রাজাদের অধীনস্থ ছিল। যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর আবির্ভাবের প্রায় ২০০০ বছর আগেকার ঘটনা’।[13]

মিসর সফর :
দুর্ভিক্ষ তাড়িত কেন‘আন হ’তে অন্যান্যদের ন্যায় ইবরাহীম (আঃ) সস্ত্রীক মিসরে রওয়ানা হ’লেন। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাঁর জন্য এখানেই রূযী পাঠাতে পারতেন। কিন্তু না। তিনি মিসরে কষ্টকর সফরে রওয়ানা হ’লেন। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক কঠিন ও মর্মান্তিক পরীক্ষা এবং সাথে সাথে একটি নগদ ও অমূল্য পুরষ্কার।
ঐ সময় মিসরের ফেরাঊন ছিল একজন নারী লোলুপ মদ্যপ শাসক। তার নিয়োজিত লোকেরা রাস্তার পথিকদের মধ্যে কোন সুন্দরী মহিলা পেলেই তাকে ধরে নিয়ে বাদশাহকে পৌঁছে দিত। যদিও বিবি ‘সারা’ ঐ সময় ছিলেন বৃদ্ধা মহিলা, তথাপি তিনি ছিলেন সৌন্দর্য্যের রাণী। মিসরীয় সম্রাটের নিয়ম ছিল এই যে, যে মহিলাকে তারা অপহরণ করত, তার সাথী পুরুষ লোকটি যদি স্বামী হ’ত, তাহ’লে তাকে হত্যা করে মহিলাকে নিয়ে যেত। আর যদি ভাই বা পিতা হ’ত, তাহ’লে তাকে ছেড়ে দিত। তারা ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সারাকে তাঁর ‘বোন’ পরিচয় দিলেন। নিঃসন্দেহে ‘সারা’ তার ইসলামী বোন ছিলেন। ইবরাহীম তাকে আল্লাহর যিম্মায় ছেড়ে দিয়ে ছালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন ও আল্লাহর নিকটে স্বীয় স্ত্রীর ইয্যতের হেফাযতের জন্য আকুলভাবে প্রার্থনা করতে থাকলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার স্ত্রীর ইয্যতের হেফাযত করবেন।
সারাকে যথারীতি ফেরাঊনের কাছে আনা হ’ল। অতঃপর পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,
فلمَّا دَخلتْ سارةُ على الْمَلِكِ قامَ إليها فأَقبلتْ تتوضأُ و تُصَلىِّ وتقولُ: أللَّهم إِنْ كنتَ تعلمُ أَنِّي آمنتُ بِكَ وبرسولكَ وأَحْصنتُ فَرْجِي إلا على زوجي فلا تُسلِّطْ علىَّ الكافرَ ু رواه البخارىُّ و أحمد بإِسنادٍ صحيحٍ-
‘যখন সারা সম্রাটের নিকটে নীত হ’লেন এবং সম্রাট তার দিকে এগিয়ে এল, তখন তিনি ওযূ করার জন্য গেলেন ও ছালাতে রত হয়ে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! যদি তুমি জেনে থাক যে, আমি তোমার উপরে ও তোমার রাসূলের উপরে ঈমান এনেছি এবং আমি আমার একমাত্র স্বামীর জন্য সতীত্ব বজায় রেখেছি, তাহ’লে তুমি আমার উপরে এই কাফিরকে বিজয়ী করো না’।[14]
সতীসাধ্বী স্ত্রী সারার দো‘আ সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে গেল। সম্রাট এগিয়ে আসার উপক্রম করতেই হাত-পা অবশ হয়ে পড়ে গিয়ে গোঙাতে লাগলো। তখন সারাহ প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! লোকটি যদি এভাবে মারা যায়, তাহ’লে লোকেরা ভাববে আমি ওকে হত্যা করেছি’। তখন আল্লাহ সম্রাটকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু শয়তান আবার এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আবার মরার মত পড়ে রইল।
এভাবে সে দুই অথবা তিনবার বেহুঁশ হয়ে পড়লো আর সারা-র দো‘আয় বাঁচলো। অবশেষে সে বলল, তোমরা আমার কাছে একটা শয়তানীকে পাঠিয়েছ। যাও একে ইবরাহীমের কাছে ফেরত দিয়ে আসো এবং এর খেদমতের জন্য হাজেরাকে দিয়ে দাও। অতঃপর সারাহ তার খাদেমা হাজেরাকে নিয়ে সসম্মানে স্বামী ইবরাহীমের কাছে ফিরে এলেন’(ঐ)। এই সময় ইবরাহীম ছালাতের মধ্যে সারার জন্য প্রার্থনায় রত ছিলেন। সারা ফিরে এলে তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। আল-হামদুলিল্লাহ! যে আল্লাহ তাঁর বান্দা ইবরাহীমকে নমরূদের প্রজ্জ্বলিত হুতাশন থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন, সেই আল্লাহ ইবরাহীমের ঈমানদার স্ত্রীকে ফেরাঊনের লালসার আগুন থেকে কেন বাঁচিয়ে আনবেন না? অতএব সর্বাবস্থায় যাবতীয় প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য।
‘আবুল আম্বিয়া’ (أبو الأنبياء ) হিসাবে আল্লাহ পাক যেভাবে ইবরাহীমের পরীক্ষা নিয়েছেন, উম্মুল আম্বিয়া (أم الأنبياء ) হিসাবে তিনি তেমনি বিবি সারা-র পরীক্ষা নিলেন এবং উভয়ে পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হ’লেন। ফালিল্লাহিল হাম্দ।
ধারণা করা চলে যে, ফেরাঊন কেবল হাজেরাকেই উপহার স্বরূপ দেয়নি। বরং অন্যান্য রাজকীয় উপঢৌকনাদিও দিয়েছিল। যাতে ইবরাহীমের মিসর গমনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায় এবং বিপুল মাল-সামান ও উপঢৌকনাদি সহ তিনি কেন‘আনে ফিরে আসেন।

শিক্ষণীয় বিষয় :
উপরোক্ত ঘটনার মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, বান্দা যখন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে সোপর্দ করে দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির  লক্ষ্যেই  সকল  কাজ  করে,  তখন আল্লাহ তার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নেন। তার জান-মাল-ইয্যত সবকিছু তিনিই হেফাযত করেন। আলোচ্য ঘটনায় ইবরাহীম ও সারাহ ছিলেন একেবারেই অসহায়। তারা স্রেফ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করেছেন, তাঁর কাছেই কেঁদেছেন, তাঁর কাছেই চেয়েছেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।
দ্বিতীয় শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, বান্দার দায়িত্ব হ’ল, যেকোন মূল্যে হক-এর উপরে দৃঢ় থাকা ও অন্যকে হক-এর পথে দাওয়াত দেওয়া। ইবরাহীম দারিদ্রে্যর তাড়নায় কাফেরের দেশ মিসরে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিজেরা যেমন ‘হক’ থেকে বিচ্যুত হননি, তেমনি অন্যকে দাওয়াত দিতেও পিছপা হননি। ফলে আল্লাহ তাঁকে মর্মান্তিক বিপদের মধ্যে ফেলে মহা পুরষ্কারে ভূষিত করলেন।

ইবরাহীমের কথিত তিনটি মিথ্যার ব্যাখ্যা :
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, لم يَكْذِبْ إبراهيمُ عليه الصلاةُ والسلام إلاّ ثلاثَ كَذَباتٍ، ‘ইবরাহীম (আঃ) তিনটি ব্যতীত কোন মিথ্যা বলেননি’। উক্ত তিনটি মিথ্যা ছিল- (১) মেলায় না যাবার অজুহাত হিসাবে তিনি বলেছিলেন إِنِّيْ سَقِيْمٌ ‘আমি অসুস্থ’ (ছাফফাত ৩৭/৮৯)। (২) মূর্তি ভেঙ্গেছে কে? এরূপ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَذَا ‘বরং এই বড় মূর্তিটাই এ কাজ করেছে’ (আম্বিয়া ২১/৬৩)। (৩) মিসরের লম্পট রাজার হাত থেকে বাঁচার জন্য স্ত্রী সারা-কে তিনি বোন হিসাবে পরিচয় দেন।[15]
হাদীছে উক্ত তিনটি বিষয়কে ‘মিথ্যা’ শব্দে উল্লেখ করা হ’লেও মূলতঃ এগুলির একটাও প্রকৃত অর্থে মিথ্যা ছিল না। বরং এগুলি ছিল আরবী অলংকার শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘তাওরিয়া’ (الةورية) বা দ্ব্যর্থ বোধক পরিভাষা। যেখানে শ্রোতা বুঝে এক অর্থ এবং বক্তার নিয়তে থাকে অন্য অর্থ। যেমন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন হযরত আয়েশার কাছে তার এক বৃদ্ধা খালাকে দেখে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। একথা শুনে খালা কান্না শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তারা তখন সবাই যুবতী হয়ে যাবে’।[16] হিজরতের সময় পথিমধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জওয়াবে আবুবকর (রাঃ) বলেন, هذا الرجلُ يَهْديني الطريقَ ‘ইনি আমাকে পথ দেখিয়ে থাকেন’।[17] এতে লোকটি ভাবল, উনি একজন সাধারণ পথপ্রদর্শক ব্যক্তি মাত্র। অথচ আবুবকরের উদ্দেশ্য ছিল তিনি আমাদের নবী অর্থাৎ ধর্মীয় পথপ্রদর্শক (يهديني الى طريق الجنة)। অনুরূপভাবে যুদ্ধকালে রাসূল (ছাঃ) একদিকে বেরিয়ে অন্য দিকে চলে যেতেন। যাতে তাঁর গন্তব্য পথ গোপন থাকে। এগুলি হ’ল উক্তিগত ও কর্মগত তাওরিয়ার উদাহরণ।

তাওরিয়া ও তাক্বিয়াহঃ
উল্লেখ্য যে, এই তাওরিয়া ও শী‘আদের তাক্বিয়াহর (ةقية) মধ্যে পার্থক্য এই যে, সেখানে পুরাটাই মিথ্যা বলা হয় ও সেভাবেই কাজ করা হয়। যেমন উদাহরণ স্বরূপ, (১) শী‘আদের ৬ষ্ঠ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ জাফর, যিনি আছ-ছাদিক্ব বা সত্যবাদী বলে উপাধিপ্রাপ্ত, একদিন তাঁর নিকটতম শিষ্য মুহাম্মাদ বিন মুসলিম তাঁর নিকটে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গীত হৌক! গতরাতে আমি একটি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখেছি। তখন তিনি বললেন, তোমার স্বপ্ন বৃত্তান্ত বর্ণনা কর। এখানে একজন স্বপ্ন বিশেষজ্ঞ মওজূদ আছেন। বলে তিনি সেখানে উপবিষ্ট অন্যতম শিষ্য ইমাম আবু হানীফার দিকে ইঙ্গিত করলেন। অতঃপর শিষ্য মুহাম্মাদ বিন মুসলিম  তার স্বপ্ন বর্ণনা করলেন এবং আবু হানীফা তার ব্যাখ্যা দিলেন। ব্যাখ্যা শুনে ইমাম জাফর ছাদেক খুশী হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি সঠিক বলেছেন হে আবু হানীফা। রাবী বলেন, অতঃপর আবু  হানীফা সেখান থেকে চলে গেলে আমি ইমামকে বললাম, আপনার প্রতি আমার জীবন উৎসর্গীত হৌক! এই বিধর্মীর (নাছেবী) স্বপ্ন ব্যাখ্যা আমার মোটেই পসন্দ হয়নি। তখন ইমাম বললেন, হে ইবনু মুসলিম! এতে তুমি মন খারাব করো না। এদের ব্যাখ্যা আমাদের ব্যাখ্যা থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। আবু হানীফা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। আমি বললাম, তাহ’লে আমি আল্লাহর কসম করে তার ব্যাখ্যাকে সঠিক বললেন কেন? ইমাম বললেন, نعم حلفت عليه انه اصاب الخطأ হ্যাঁ, আমি কসম করে এটাই বলেছি যে, উনি যথাযর্থভাবেই ভুল বলেছেন।’
অথচ এই মিথ্যা বলার জন্য সেখানে কোন ভয়-ভীতির কারণ ছিল না। কেননা উভয়ে ইমামের শিষ্য ছিলেন। উপরন্তু আবু হানীফা তখন সরকারের অপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন।’[18] এটাই হ’ল শী‘আদের তাক্বিয়া নীতি, যা স্রেফ মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নয় এবং যার মাধ্যমে তারা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে থাকে ও প্রতারণা করে থাকে। এই মিথ্যাচারকে ইমাম জাফর ছাদেক তাদের দ্বীনের ১০ ভাগের নয় ভাগ মনে করেন। তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তির দ্বীন নেই, যার তাক্বিয়া নেই (ঐ, পৃঃ ১৫৩)(২) ব্যাকরণবিদ হুসায়েন বিন মু‘আয বিন মুসলিম বলেন, আমাকে একদিন ইমাম জাফর ছাদিক বললেন, শুনছি তুমি নাকি জুম‘আ মসজিদে বসছ এবং লোকদের ফৎওয়া দিচ্ছ? আমি বললাম, হাঁ। তবে আপনার কাছ থেকে বের হবার আগেই আমি আপনাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম যে, আমি জুম‘আ মসজিদে বসি, তারপর লোকেরা এসে আমাকে প্রশ্ন করে। আমি যখন বুঝি যে, লোকটি আমার ইচ্ছার বিরোধী, তখন আমি তাকে তার চাহিদা অনুযায়ী ফৎওয়া দেই।’ একথা শোনার পর ইমাম জাফর ছাদিক আমাকে বললেন, اصنع كذا فانى اصنع كذا ‘তুমি এভাবেই করো। কেননা আমিও এভাবে করে থাকি’ (ঐ, পৃঃ ১৭১-৭২)। অথচ সত্য কখনোই মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত হয় না এবং সত্য সংখ্যক সর্বদা একটিই হয়, তা কখনোই বহু হয় না। আল্লাহ বলেন, যদি সত্য তাদের প্রবৃত্তির অনুগামী হ’ত, তাহ’লে আকাশ ও পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সবকিছু ধ্বংস হয়ে যেত’ (মুমিনূন ২৩/৭১)। বস্ত্তত: এই তাক্বিয়া নীতি শী‘আদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অঙ্গীভূত। যা ইসলামের মৌল নীতির ঘোর বিরোধী। কিন্তু তাওরিয়ায় বক্তা যে অর্থে উক্ত কথা বলেন তা সম্পূর্ণ সত্য হয়ে থাকে। যেমন- (১)  ইবরাহীম নিজেকে سقيم (অসুস্থ) বলেছিলেন, কিন্তু مريض (পীড়িত) বলেননি। নিজ সম্প্রদায়ের শিরকী কর্মকান্ডে এমনিতেই তিনি ত্যক্ত-বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ ছিলেন। তদুপরি শিরকী মেলায় যাওয়ার আবেদন পেয়ে তাঁর পক্ষে মানসিকভাবে অসুস্থ (سقيم من عملهم) হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক ছিল। এরপরেও তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকতেও পারেন। (২) সব মূর্তি ভেঙ্গে তিনি বড় মূর্তিটার গলায় বা হাতে কুড়াল ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যাতে প্রমাণিত হয় যে, সেই-ই একাজ করেছে। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কওমের মূর্খতাকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেওয়া এবং তাদের মূর্তিপূজার অসারতা চোখে  আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। তাই মূর্তি ভাঙ্গার কাজটি তিনি বড় মূর্তির দিকে সম্বন্ধ করেন রূপকভাবে। তাছাড়া ঐ বড় মূর্তিটির প্রতিই লোকেদের ভক্তি ও বিশ্বাস ছিল সর্বাধিক। এর কারণেই মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছিল বেশী। ফলে সেই-ই মূলতঃ ইবরাহীমকে মূর্তি ভাঙ্গায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। অতএব একদিক দিয়ে সেই-ই ছিল মূল দায়ী।
(৩) সারা-কে বোন বলা। নিঃসন্দেহে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে দ্বীনী ভাই-বোন। স্ত্রীর ইযযত ও নিজের জীবন রক্ষার্থে এটুকু বলা মোটেই মিথ্যার মধ্যে পড়ে না।
এক্ষণে প্রশ্ন হ’ল, তবুও হাদীছে একে ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করা হ’ল কেন? এর জবাব এই যে, নবী-রাসূলগণের সামান্যতম ত্রুটিকেও আল্লাহ বড় করে দেখেন তাদেরকে সাবধান করার জন্য। যেমন ভুলক্রমে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়াকে আল্লাহ আদমের ‘অবাধ্যতা ও পথভ্রষ্টতা’ (وَعَصَى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى )[19] বলে অভিহিত করেছেন। অথচ ভুলক্রমে কৃত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য। উল্লেখ্য যে, মাওলানা মওদূদীর ন্যায় কোন কোন মুফাসসির এখানে হাদীছের  রাবী আবু হুরায়রাকেই উক্ত বর্ণনার জন্য দায়ী করেছেন, যা নিতান্ত অন্যায়।

কেন‘আনে প্রত্যাবর্তন :
ইবরাহীম (আঃ) যথারীতি মিসর থেকে কেন‘আনে ফিরে এলেন। বন্ধ্যা স্ত্রী সারা তার  খাদেমা হাজেরাকে প্রাণপ্রিয় স্বামী ইবরাহীমকে উৎসর্গ করলেন। ইবরাহীম তাকে স্ত্রীত্বে বরণ করে নিলেন। পরে দ্বিতীয়া স্ত্রী হাজেরার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন তার প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আঃ)। এই সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল অন্যূন ৮৬ বছর। নিঃসন্তান পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। শুষ্ক মরুতে যেন প্রাণের জোয়ার এলো। বস্ত্তত: ইসমাঈল ছিলেন নিঃসন্তান ইবরাহীমের দো‘আর ফসল। কেননা তিনি বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর নিকটে ‘নেককার সন্তান’ কামনা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِيْنَ، فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلاَمٍ حَلِيْمٍ- ‘(ইবরাহীম বললেন,) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দাও। অতঃপর আমরা তাকে একটি ধৈর্য্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।’ (ছাফফাত ৩৭/১০০-১০১)

ইবরাহীমী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
ইবরাহীমী জীবন মানেই পরীক্ষার জীবন। নবী হবার পর থেকে আমৃত্যু তিনি পরীক্ষা দিয়েই জীবনপাত করেছেন। এভাবে পরীক্ষার পর পরীক্ষা নিয়ে তাঁকে পূর্ণত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। অবশেষে তাঁকে ‘বিশ্বনেতা’ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَاماً قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِيْ قَالَ لاَ يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ- (البقرة ১২৪)-
‘যখন ইবরাহীমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হ’লেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করব। তিনি বললেন, আমার বংশধর থেকেও। তিনি বললেন, আমার অঙ্গীকার যালেমদের পর্যন্ত পৌঁছবে না’ (বাক্বারাহ ২/১২৪)। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরগণের মধ্যেই বিশ্ব নেতৃত্ব সীমিত রেখেছেন। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحاً وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ- ذُرِّيَّةً بَعْضُهَا مِن بَعْضٍ وَالله ُسَمِيعٌ عَلِيمٌ- (آل عمران ৩৩-৩৪)-
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীম-এর বংশধর ও ইমরানের বংশধরকে নির্বাচিত করেছেন’। ‘যারা ছিল পরস্পরের বংশজাত। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (আলে ইমরান ৩/৩৩, ৩৪)
বস্ত্ততঃ ইবরাহীম (আঃ)-এর পরবর্তী সকল নবী তাঁর বংশধর ছিলেন। আলে ইমরান বলতে ইমরান-পুত্র মূসা ও হারূণ ও তাঁদের বংশধর দাঊদ, সুলায়মান, ঈসা প্রমুখ নবীগণকে বুঝানো হয়েছে। যাঁরা সবাই ছিলেন ইবরাহীমের পুত্র ইসহাকের বংশধর। অপরপক্ষে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছিলেন ইবরাহীমের জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈলের বংশধর। সে হিসাবে আল্লাহ ঘোষিত ইবরাহীমের বিশ্বনেতৃত্ব যেমন বহাল রয়েছে, তেমনি নবীদের প্রতি অবাধ্যতা, বংশীয় অহংকার এবং যিদ ও হঠকারিতার জন্য যালেম ইহুদী-নাছারাগণ আল্লাহর অভিশাপ কুড়িয়ে বিশ্বের সর্বত্র ধিকৃত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। এক্ষণে ‘নবীদের পিতা’ ও মিল্লাতে ইসলামিয়াহর নেতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে কি কি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, আমরা সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করব।
ইবরাহীম (আঃ)-এর পরীক্ষা সমূহ ছিল দু’ভাগে বিভক্ত। (এক) বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ এবং (দুই) কেন‘আন জীবনের পরীক্ষা সমূহ। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবনের সঙ্গে পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবনের সুন্দর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মুহাম্মাদী জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে মক্কায় ও শেষাংশ কেটেছে মদীনায় এবং সেখানেই তিনি পূর্ণতা লাভ করেন ও মৃত্যুবরণ করেন। ইবরাহীমী জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে বাবেল শহরে এবং শেষাংশ কেটেছে কেন‘আনে। সেখানেই তিনি  পূর্ণতা পেয়েছেন ও সেখানেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
ইবরাহীম (আঃ)-এর বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহের মধ্যে (১) মূর্তিপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধের পরীক্ষা (২) পিতার পক্ষ থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তির পরীক্ষা (৩) স্ত্রী ও ভাতিজা ব্যতীত কেউ তাঁর দাওয়াত কবুল না করা সত্ত্বেও তীব্র সামাজিক বিরোধিতার মুখে একাকী দাওয়াত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকার মাধ্যমে আদর্শ নিষ্ঠার কঠিন পরীক্ষা (৪) তারকাপূজারীদের সাথে যুক্তিগর্ভ তর্কযুদ্ধের পরীক্ষা (৫) কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরে ঢুকে মূর্তি ভাঙ্গার মত দুঃসাহসিক পরীক্ষা (৬) অবশেষে রাজদরবারে পৌঁছে সরাসরি সম্রাটের সাথে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পরীক্ষা এবং বিনিময়ে (৭) জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করার মর্মান্তিক শাস্তি হাসিমুখে বরণ করে নেবার অতুলনীয় অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া। এছাড়াও সমাজ সংস্কারক হিসাবে জীবনের প্রতি পদে পদে যে অসংখ্য পরীক্ষার সম্মুখীন তাঁকে হর-হামেশা হ’তে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
উপরে বর্ণিত পরীক্ষাগুলির সবটিতেই ইবরাহীম (আঃ) জয়লাভ করেছিলেন এবং সেগুলির আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করে এসেছি। এক্ষণে আমরা তাঁর কেন‘আনী জীবনের প্রধান পরীক্ষাসমূহ বিবৃত করব ইনশাআল্লাহ।
কেন‘আনী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :
১ম পরীক্ষা: দুর্ভিক্ষে পতিত হয়ে মিসর গমন : কেন‘আনী জীবনে তাঁর প্রথম পরীক্ষা হ’ল কঠিন দুর্ভিক্ষে তাড়িত হয়ে জীবিকার সন্ধানে মিসরে হিজরত করা। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে।
২য় পরীক্ষা: সারাকে অপহরণ : মিসরে গিয়ে সেখানকার লম্পট সম্রাট ফেরাঊনের কুদৃষ্টিতে পড়ে স্ত্রী সারাকে অপহরণের মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।
৩য় পরীক্ষা: হাজেরাকে মক্কায় নির্বাসন : মিসর থেকে ফিরে কেন‘আনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলের জন্ম লাভ হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি শিশু সন্তান ও তার মা হাজেরাকে মক্কার বিজন পাহাড়ী উপত্যকায় নিঃসঙ্গভাবে রেখে আসার এলাহী নির্দেশ লাভ করেন। বস্ত্ততঃ এটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:
হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মাকে মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসার নির্দেশ পান, তখনই তার অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নিশ্চয়ই এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহর কোন মহতী পরিকল্পনা লুক্কায়িত আছে এবং নিশ্চয়ই তিনি ইসমাঈল ও তার মাকে ধ্বংস করবেন না।
অতঃপর এক থলে খেজুর ও এক মশক পানি সহ তাদের বিজনভূমিতে রেখে যখন ইবরাহীম (আঃ) একাকী ফিরে আসতে থাকেন, তখন বেদনা-বিস্মিত স্ত্রী হাজেরা ব্যাকুলভাবে তার পিছে পিছে আসতে লাগলেন। আর স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন। কিন্তু বুকে বেদনার পাষাণ বাঁধা ইবরাহীমের মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুলো না। তখন হাজেরা বললেন, আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাচ্ছেন? ইবরাহীম ইশারায় বললেন, হ্যাঁ। তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে হাজেরা বলে উঠলেন, إذَنْ لايُضَيِّعُنَا اللهُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে এলেন তিনি সন্তানের কাছে। দু’একদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে পানি ও খেজুর। কি হবে উপায়? খাদ্য ও পানি বিহনে বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কচি বাচ্চা কি খেয়ে বাঁচবে। পাগলপরা হয়ে তিনি মানুষের সন্ধানে দৌঁড়াতে থাকেন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের এ মাথা আর ও মাথায়। এভাবে সপ্তমবারে তিনি দূর থেকে দেখেন যে, বাচ্চার পায়ের কাছ থেকে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণার ফল্গুধারা, জিব্রীলের পায়ের গোড়ালি বা তার পাখার আঘাতে যা সৃষ্টি হয়েছিল। ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। স্নিগ্ধ পানি পান করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। হঠাৎ অদূরে একটি আওয়ায শুনে তিনি চমকে উঠলেন। উনি জিবরীল। বলে উঠলেন, لا تخافوا الضَّيعةَ، إنَّ هذا بيتُ الله يَبْنى هذا الغلامُ و أبوه وإن الله لايُضيعُ أهلَه-   ‘আপনারা ভয় পাবেন না। এখানেই আল্লাহর ঘর। এই সন্তান ও তার পিতা এ ঘর সত্বর পুনর্নির্মান করবেন। আল্লাহ তাঁর ঘরের বাসিন্দাদের ধ্বংস করবেন না’। বলেই শব্দ মিলিয়ে গেল’।
অতঃপর শুরু হ’ল ইসমাঈলী জীবনের নব অধ্যায়। পানি দেখে পাখি আসলো। পাখি ওড়া দেখে ব্যবসায়ী কাফেলা আসলো। তারা এসে পানির মালিক হিসাবে হাজেরার নিকটে অনুমতি  চাইলে তিনি এই শর্তে মনযুর করলেন যে, আপনাদের এখানে বসতি স্থাপন করতে হবে। বিনা পয়সায় এই প্রস্তাব তারা সাগ্রহে কবুল করল। এরাই হ’ল ইয়ামন থেকে আগত বনু জুরহুম গোত্র। বড় হয়ে ইসমাঈল এই গোত্রে বিয়ে করেন। এঁরাই কা‘বা গৃহের খাদেম হন এবং এদের শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে।
ওদিকে ইবরাহীম (আঃ) যখন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যান তখন হাজেরার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এই বলে,
رَّبَّنَا إِنِّيْ أَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِيْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِيْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ رَبَّنَا لِيُقِيْمُوا الصَّلاَةَ فَاجْعَلْ أَفْئِدَةً مِّنَ النَّاسِ تَهْوِيْ إِلَيْهِمْ وَارْزُقْهُم مِّنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ- (ابراهيم ৩৭)-
‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার পরিবারের কিছু সদস্যকে তোমার মর্যাদামন্ডিত গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি। প্রভুহে! যাতে তারা ছালাত কায়েম করে। অতএব কিছু লোকের অন্তরকে তুমি এদের প্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর। সম্ভবত: তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ  করবে’।[20]

শিক্ষণীয় বিষয়:
(১) ইবরাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে জনমানব শূন্য ও চাষাবাদহীন এক শুষ্ক মরু উপত্যকায় রেখে আসলেন, কোন সুস্থ বিবেক এ কাজকে সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী, তাদের জন্য বিষয়টি মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। আর সেকারণেই হাজেরা গভীর প্রত্যয়ে বলে উঠেছিলেন, إذَنْ لا يُضَيِّعُنِيَ اللهُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করবেন না’। আল্লাহ যে কেবল বিশ্বাসের বস্ত্ত নয়, বরং তিনি সার্বক্ষণিকভাবে বান্দার তত্ত্বাবধায়ক, ইবরাহীমের উক্ত কর্মনীতির মধ্যে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। অতি যুক্তিবাদী ও বস্ত্তবাদীদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের এক শিক্ষণীয় বিষয়।
(২) ইবরাহীমের দো‘আ আল্লাহ এমন দ্রুত কবুল করেছিলেন যে, দু’একদিনের মধ্যেই সেখানে সৃষ্টি হয় পানির ফোয়ারা, যা যমযম কূয়া নামে পরিচিত হয় এবং যার উৎসধারা বিগত প্রায় সোয়া চার হাযার বছর ধরে আজও সমভাবে বহমান। কিন্তু এই পানির রূপ-রস-গন্ধ কিছুরই কোন পরিবর্তন হয়নি। এ পানির কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এ পানিতে এমন সব উপাদান রয়েছে, যা মানুষের জন্য খাদ্য ও পানীয় উভয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। পৃথিবীর অন্য কোন পানিতে এ গুণ নেই। দৈনিক লাখ লাখ গ্যালন পানি ব্যয় হওয়া সত্ত্বেও এ পানির কোন ক্ষয় নেই, লয় নেই, কমতি নেই। এর কারণ অনুসন্ধানে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও বৈজ্ঞানিকেরা ব্যর্থ হয়েছেন। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।
(৩) তখন থেকে অদ্যাবধি মক্কা মু‘আয্যমায় চাষাবাদের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সারা পৃথিবী হ’তে তাবৎ ফল-ফলাদি সর্বদা সেখানে আমদানী হয়ে থাকে এবং সর্বদা অধিকহারে মওজূদ থাকে। আধুনিক বিশ্বের কোন শহরই এর সাথে তুলনীয় নয়। নিঃসন্দেহে এটা হ’ল ইবরাহীমের দো‘আর অন্যতম ফসল।
(৪) ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আয় বলা হয়েছিল, ‘আমি আমার সন্তানকে এখানে রেখে যাচ্ছি যেন তারা এখানে ছালাত কায়েম করে’। আল্লাহর রহমতে সেদিন থেকে অদ্যাবধি এখানে ছালাত, ত্বাওয়াফ ও অন্যান্য ইবাদত সর্বদা জারি আছে।
(৫) দো‘আয় তিনি বলেছিলেন, ‘মানব সমাজের কিছু অংশের হৃদয়কে তুমি এদের প্রতি ঝুঁকিয়ে দাও’। নিঃসন্দেহে সেই অংশটি হ’ল সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ। ইবরাহীম (আঃ) জানতেন যে, বিশ্বের সমস্ত লোক কখনো মুমিন হবে না। তাছাড়া তাবৎ বিশ্ব যদি কা‘বার প্রতি ঝুঁকে পড়ত, তাহ’লে সেখানে বসবাস, স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংকট দেখা দেওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। তখন থেকে এযাবত সর্বদা একদল শক্তিশালী ও ধর্মপরায়ণ মানুষ মক্কার সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। দেড় হাযার বছর পূর্বে খৃষ্টান গভর্ণর আবরাহার সকল প্রচেষ্টা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল, ক্বিয়ামত অবধি শত্রুদের সকল চক্রান্ত এভাবেই ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ।

৪র্থ পরীক্ষা: খাৎনা করণ :
ইবরাহীমের প্রতি আদেশ হ’ল খাৎনা করার জন্য। এসময় তাঁর বয়স ছিল অন্যূন ৮০ বছর। হুকুম পাওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে নিজেই নিজের খাৎনার কাজ সম্পন্ন করলেন।[21] বিনা দ্বিধায় এই কঠিন ও বেদনাদায়ক কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে আল্লাহর হুকুম দ্রুত পালন করার ও এ ব্যাপারে তাঁর কঠোর নিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়।
খাৎনার এই প্রথা ইবরাহীমের অনুসারী সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে আজও চালু আছে। বস্ত্ততঃ খাৎনার মধ্যে যে অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ তা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন। এর ফলে খাৎনাকারীগণ অসংখ্য অজানা রোগ-ব্যাধি হ’তে মুক্ত রয়েছেন এবং সুস্থ জীবন লাভে ধন্য হয়েছেন। এটি মুসলিম এবং অমুসলিমের মধ্যে একটি স্থায়ী পার্থক্যও বটে।

৫ম পরীক্ষা: পুত্র কুরবানী :
একমাত্র শিশু পুত্র ও তার মাকে মক্কায় রেখে এলেও ইবরাহীম (আঃ) মাঝে-মধ্যে সেখানে যেতেন ও দেখা-শুনা করতেন। এভাবে ইসমাঈল ১৩/১৪ বছর বয়সে উপনীত হ’লেন এবং পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার উপযুক্ত হ’লেন। বলা চলে যে, ইসমাঈল যখন বৃদ্ধ পিতার সহযোগী হ’তে চলেছেন এবং পিতৃহৃদয় পুরোপুরি জুড়ে বসেছেন, ঠিক সেই সময় আল্লাহ ইবরাহীমের মহববতের কুরবানী কামনা করলেন। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র নয়নের পুত্তলী ইসমাঈলের মহববত ইবরাহীমকে কাবু করে ফেলল কি-না, আল্লাহ যেন সেটাই যাচাই করতে চাইলেন। ইতিপূর্বে অগ্নিপরীক্ষা দেবার সময় ইবরাহীমের কোন পিছুটান ছিল না। কিন্তু এবার রয়েছে প্রচন্ড রক্তের টান।
দ্বিতীয়তঃ অগ্নি পরীক্ষায় বাদশাহ তাকে বাধ্য করেছিল। কিন্তু এবারের পরীক্ষা স্বেচ্ছায় ও স্বহস্তে সম্পন্ন করতে হবে। তাই এ পরীক্ষাটি ছিল পূর্বের কঠিন অগ্নি পরীক্ষার চেয়ে নিঃসন্দেহে কঠিনতর। সূরা ছাফফাত ১০২ আয়াত হ’তে ১০৯ আয়াত পর্যন্ত এ বিষয়ে বর্ণিত ঘটনাটি নিম্নরূপ:
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَآءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ- (الصافات ১০২)-
‘যখন (ইসমাঈল) পিতার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হ’ল, তখন (ইবরাহীম) তাকে বললেন, হে আমার বেটা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবহ করছি। এখন বল তোমার অভিমত কি? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা নির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’ (ছাফফাত ৩৭/১০২)
ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা থেকে বের করে ৮ কি: মি: দক্ষিণ-পূর্বে মিনা প্রান্তরে নিয়ে যাওয়ার পথে বর্তমানে যে তিন স্থানে হাজীগণ শয়তানকে পাথর মেরে থাকেন, ঐ তিন স্থানে ইবলীস তিনবার ইবরাহীম (আঃ)-কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। আর তিনবারই ইবরাহীম (আঃ) শয়তানের প্রতি ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন।[22] সেই স্মৃতিকে জাগরুক রাখার জন্য এবং শয়তানের প্রতারণার বিরুদ্ধে মুমিনকে বাস্তবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এ বিষয়টিকে হজ্জ অনুষ্ঠানের ওয়াজিবাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেই অনতিদূরে পূর্ব দিকে ‘মসজিদে খায়েফ’ অবস্থিত।
অতঃপর পিতা-পুত্র আল্লাহ নির্দেশিত কুরবানগাহ ‘মিনায়’ উপস্থিত হ’লেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তাঁর স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন এবং পুত্রের অভিমত চাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্ত করার সময় বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’। ইনশাআল্লাহ না বললে হয়ত তিনি ধৈর্য ধারণের তাওফীক পেতেন না। এরপর তিনি নিজেকে ‘ছবরকারী’ না বলে ‘ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ বলেছেন এবং এর মাধ্যমে নিজের পিতা সহ পূর্বেকার বড় বড় আত্মোৎসর্গকারীদের মধ্যে নিজেকে শামিল করে নিজেকে অহমিকা মুক্ত করেছেন। যদিও তাঁর ন্যায় তরুণের এরূপ স্বেচ্ছায় আত্মোৎসর্গের ঘটনা ইতিপূর্বে ঘটেছিল বলে জানা যায় না। আল্লাহ বলেন,
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَ تَلَّهُ لِلْجَبِينِ، وَنَادَيْنَاهُ أَن يَّآ إِبْرَاهِيْمُ، قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَالِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ، إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلآءُ الْمُبِيْنُ، وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ، وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ، سَلاَمٌ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ- (الصافات ১০৩-১০৯)-
‘অতঃপর (পিতা-পুত্র) উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করল’। ‘তখন আমরা তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম’! ‘তুমি তোমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। আমরা এভাবেই সৎকর্মশীলগণের প্রতিদান দিয়ে থাকি’। ‘নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। ‘আর আমরা তার পরিবর্তে একটি মহান যবহ প্রদান করলাম’ ‘এবং আমরা এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখে দিলাম’। ‘ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক’ (ছাফফাত ৩৭/১০৩-১০৯)। বর্তমানে উক্ত মিনা প্রান্তরেই হাজীগণ কুরবানী করে থাকেন এবং বিশ্ব মুসলিম ঐ সুন্নাত অনুসরণে ১০ই যুলহিজ্জাহ বিশ্বব্যাপী শরী‘আত নির্ধারিত পশু কুরবানী করে থাকেন।

শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :
(১) ইবরাহীমকে আল্লাহ স্বপ্নাদেশ করেছিলেন, সরাসরি আদেশ করেননি। এর মধ্যে পরীক্ষা ছিল এই যে, স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হ’তে পারত। যেমন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা মহাপাপ। অধিকন্তু পিতা হয়ে নির্দোষ পুত্রকে নিজ হাতে হত্যা করা আরও বড় মহাপাপ। নিশ্চয়ই এমন অন্যায় কাজের নির্দেশ আল্লাহ দিতে পারেন না। অতএব এটা মনের কল্পনা-নির্ভর স্বপ্ন (أضغاث أحلام ) হ’তে পারে। কিন্তু ইবরাহীম ঐসব ব্যাখ্যায় যাননি। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এটা ‘অহি’। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি পরপর তিনদিন একই স্বপ্ন দেখেন। প্রশ্ন হ’তে পারে, আল্লাহ জিব্রীল মারফত সরাসরি নির্দেশ না পাঠিয়ে স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ পাঠালেন কেন? এর জবাব এই যে, তাহ’লে তো পরীক্ষা হ’ত না, কেবল নির্দেশ পালন হ’ত। ইবরাহীমকে তার স্বপ্নের কাল্পনিক ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলার জন্যই তো শয়তান মাঝপথে বন্ধু সেজে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এর দ্বারা আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর নির্দেশ পালনের সময় অহেতুক প্রশ্ন সমূহ উত্থাপন ও অধিক যুক্তিবাদের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। বরং সর্বদা তার প্রকাশ্য অর্থের উপরে সহজ-সরলভাবে আমল করে যেতে হবে।
(২) আল্লাহর মহববত ও দুনিয়াবী কোন মহববত একত্রিত হ’লে সর্বদা আল্লাহর মহববতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং দুনিয়াবী মহববতকে কুরবানী দিতে হবে। ইবরাহীম এখানে সন্তানের গলায় ছুরি চালাননি। বরং সন্তানের মহববতের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। আর এটাই ছিল পরীক্ষা। যদি কেউ আল্লাহর মহববতের উপরে দুনিয়াবী মহববতকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেটা হয়ে যায় الإشراك في المحبة বা ভালোবাসায় শিরক। ইবরাহীম ও ইসমাঈল দু’জনেই উক্ত শিরক হ’তে মুক্ত ছিলেন।
(৩) পিতা ও পুত্রের বিশ্বাসগত সমন্বয় ব্যতীত কুরবানীর এই গৌরবময় ইতিহাস রচিত হ’ত না। ইসমাঈল যদি পিতার অবাধ্য হ’তেন এবং দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতেন, তাহ’লে আল্লাহর হুকুম পালন করা ইবরাহীমের পক্ষে হয়তবা আদৌ সম্ভব হ’ত না। তাই এ ঘটনার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, সমাজের প্রবীণদের কল্যাণময় নির্দেশনা এবং নবীনদের আনুগত্য ও উদ্দীপনা একত্রিত ও সমন্বিত না হ’লে কখনোই কোন উন্নত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।
(৪) এখানে মা হাজেরার অবদানও ছিল অসামান্য। যদি তিনি ঐ বিজন ভূমিতে কচি সন্তানকে তিলে তিলে মানুষ করে না তুলতেন এবং স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করে বুকে অসীম সাহস নিয়ে সেখানে বসবাস না করতেন, তাহ’লে পৃথিবী পিতা-পুত্রের এই মহান দৃশ্য অবলোকন করতে পারত না। এজন্যেই বাংলার বুলবুল কাজী নজরুল ইসলাম গেয়েছেন,
মা হাজেরা হৌক মায়েরা সব
যবীহুল্লাহ হৌক ছেলেরা সব
সবকিছু যাক সত্য রৌক
বিধির বিধান সত্য হৌক।
বলা চলে যে, এই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ইবরাহীম (আঃ) বিশ্ব নেতৃত্বের সম্মানে ভূষিত হন। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيْمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّيْ جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَاماً، (بقرة ১২৪)-
‘যখন ইবরাহীমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হ’লেন, তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতা করলাম’ (বাক্বারাহ ২/১২৪)
উপরোক্ত আয়াতে পরীক্ষাগুলির সংখ্যা কত ছিল, তা বলা হয়নি। তবে ইবরাহীমের পুরো জীবনটাই যে ছিল পরীক্ষাময়, তা ইতিপূর্বেকার আলোচনায় প্রতিভাত হয়েছে।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী :
বাবেল জীবনে ৭টি ও কেন‘আন জীবনে ৫টি বড় বড় পরীক্ষা বর্ণনার পর এবারে আমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবনের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী বিবৃত করব।-

(১) ইসহাক জন্মের সুসংবাদ :
পুত্র কুরবানীর ঘটনার পরে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আনে ফিরে এলেন।  এসময় বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহ্-র গর্ভে ভবিষ্যৎ সন্তান ইসহাক জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতাদের শুভাগমন ঘটে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, উক্ত ফেরেশতাগণ ছিলেন হযরত জিবরাঈল, মীকাঈল ও ইসরাফীল। তারা মানুষের রূপ ধারণ করে এসেছিলেন। এ বিষয়ে কুরআনী বক্তব্য নিম্নরূপ:
وَلَقَدْ جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيْمَ بِالْبُـشْرَى قَالُوْا سَلاَماً قَالَ سَلاَمٌ فَمَا لَبِثَ أَنْ جَاء بِعِجْلٍ حَنِيْذٍ- (هود ৬৯)-
‘আর আমাদের প্রেরিত সংবাদবাহকগণ (অর্থাৎ ফেরেশতাগণ) ইবরাহীমের নিকটে সুসংবাদ নিয়ে এল এবং বলল, সালাম। সেও বলল, সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেই সে একটা ভূণা করা বাছুর এনে (তাদের সম্মুখে) পেশ করল’ (হূদ ১১/৬৯)। ‘কিন্তু সে যখন দেখল যে, মেহমানদের হাত সেদিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে সন্দেহে পড়ে গেল ও মনে মনে তাদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগল (কারণ এটা তখনকার যুগের খুনীদের নীতি ছিল যে, যাকে তারা খুন করতো, তার বাড়ীতে তারা খেত না)। তারা বলল, আপনি ভয় পাবেন না। আমরা লূত্বের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তার স্ত্রী (সারা) নিকটেই দাঁড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। আমরা তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবং ইসহাকের পরে (তার পুত্র) ইয়াকূবেরও। সে বলল, হায় কপাল! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচ আমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ। এতো ভারী আশ্চর্য কথা! তারা বলল, আপনি আল্লাহর নির্দেশের বিষয়ে আশ্চর্য বোধ করছেন? হে গৃহবাসীগণ! আপনাদের উপরে আল্লাহর রহমত ও প্রভূত বরকত রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রশংসিত ও মহিমময়’ (হূদ ১১/৭০-৭৩)। একই ঘটনা আলোচিত হয়েছে সূরা হিজর ৫২-৫৬ ও সূরা যারিয়াত ২৪-৩০ আয়াত সমূহে।
উল্লেখ্য যে, অধিক মেহমানদারীর জন্য ইবরাহীমকে ‘আবুয যায়ফান’       (ابو الضيفان) বা মেহমানদের পিতা বলা হ’ত। এই সময় বিবি সারাহর বয়স ছিল অন্যূন ৯০ ও ইবরাহীমের ছিল ১০০ বছর। সারাহ নিজেকে বন্ধ্যা মনে করতেন এবং সেকারণেই সেবিকা হাজেরাকে স্বামীর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন ও তাঁর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন সন্তান লাভের জন্য। অথচ সেই ঘরে ইসমাঈল জন্মের পরেও তাকে তার মা সহ মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসতে হয় আল্লাহর হুকুমে। ফলে সংসার ছিল আগের মতই নিরানন্দময়। কিন্তু আল্লাহর কি অপূর্ব লীলা! তিনি শুষ্ক নদীতে বান ডাকাতে পারেন। তাই নিরাশ সংসারে তিনি আশার বন্যা ছুটিয়ে দিলেন। যথাসময়ে ইসহাকের জন্ম হ’ল। যিনি পরে নবী হ’লেন এবং তাঁরই পুত্র ইয়াকূবের বংশধারায় ঈসা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাযার হাযার নবী প্রেরিত হ’লেন। ফলে হতাশ ও বন্ধ্যা নারী সারাহ এখন কেবল ইসহাকের মা হ’লেন না। বরং তিনি হ’লেন হাযার হাযার নবীর মা বা ‘উম্মুল আম্বিয়া’ (ام الأنبياء)। ওদিকে মক্কায় ইসমাঈলের বয়স তখন ১৩/১৪ বৎসর। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘আবুল আরব’           (ابو العرب) বা আরব জাতির পিতা।
(২) মৃতকে জীবিত করার দৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ :
বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহর বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভের মাধ্যমে আল্লাহ যেভাবে তাদের ঈমান বর্ধিত ও মযবূত করেছিলেন। সম্ভবত: তাতে উৎসাহিত হয়ে ইবরাহীম (আঃ) একদিন আল্লাহর কাছে দাবী করে বসলেন, আপনি কিভাবে মৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে একটু দেখান, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّ أَرِنِيْ كَيْفَ تُحْيِـي الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنْ قَالَ بَلَى وَلَـكِن لِّيَطْمَئِنَّ قَلْبِيْ قَالَ فَخُذْ أَرْبَعَةً مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلْ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءاً ثُمَّ ادْعُهُنَّ يَأْتِيْنَكَ سَعْياً وَاعْلَمْ أَنَّ اللهَ عَزِيْزٌ حَكِيْمٌ- (البقرة ২৬০)-
‘আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে দেখাও কিভাবে তুমি (ক্বিয়ামতের দিন) মৃতকে জীবিত করবে। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? (ইবরাহীম) বলল, অবশ্যই করি। কিন্তু দেখতে চাই কেবল এজন্য, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। বললেন, তাহ’লে চারটি পাখি ধরে নাও এবং সেগুলিকে নিজের পোষ মানিয়ে নাও। অতঃপর সেগুলোকে (যবেহ করে) সেগুলির দেহের একেকটি অংশ বিভিন্ন পাহাড়ের উপরে রেখে আস। তারপর সেগুলিকে ডাক দাও। (দেখবে) তোমার দিকে দৌড়ে চলে আসবে (উড়তে উড়তে নয়। কেননা তাতে অন্যান্য পাখির সাথে মিশে গিয়ে তোমার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটতে পারে যে, সেই চারটি পাখি কোন্ কোন্টি)। জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত ও জ্ঞানময়’ (বাক্বারাহ ২/২৬০)
উপরোক্ত ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ মুশরিক ও নাস্তিক সমাজকে দেখিয়ে দিলেন যে, কিভাবে মাটিতে মিশে যাওয়া মৃত মানুষকে তিনি ক্বিয়ামতের দিন পুনর্জীবন দান করবেন।

(৩) বায়তুল্লাহ নির্মাণ:
বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) পুনর্নিমাণ করেন জিব্রীলের ইঙ্গিত মতে। তারপর নূহের তূফানের সময় বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হ’লেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়। পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনর্নির্মাণ করেন। এই নির্মাণকালে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আন থেকে মক্কায় এসে বসবাস করেন। ঐ সময় মক্কায় বসতি গড়ে উঠেছিল এবং ইসমাঈল তখন বড় হয়েছেন এবং বাপ-বেটা মিলেই কা‘বা গৃহ নির্মাণ করেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা‘বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও ত্বাওয়াফ চালু আছে এবং হরম ও তার অধিবাসীগণ পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সহকারে সেখানে বসবাস করে আসছেন। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা সমূহ নিম্নরূপ:
আল্লাহ বলেন,
 وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيْمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لاَّ تُشْرِكْ بِيْ شَيْئاً وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِيْنَ وَالْقَائِمِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُوْدِ- (الحج ২৬)-
‘আর যখন আমরা ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়ে বলেছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, ছালাতে দন্ডায়মানদের জন্য ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য’ (হজ্জ ২২/২৬)। আল্লাহ বলেন,
وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالاً وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيْقٍ- لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ- (الحج ২৭-২৮)-
‘আর তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা জারি করে দাও। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং (দীর্ঘ সফরের কারণে) সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং (কুরবানীর) নির্দিষ্ট দিনগুলিতে (১০, ১১, ১২ই যিলহাজ্জ) তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ পশু সমূহ যবেহ করার সময় তাদের উপরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহার করাও অভাবী ও দুস্থদেরকে’ (হজ্জ ২২/২৭-২৮)
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে কয়েকটি বিষয় জানা যায়। যেমন- (১) বায়তুল্লাহ ও তার সন্নিকটে কোনরূপ শিরক করা চলবে না (২) এটি স্রেফ তাওয়াফকারী ও আল্লাহর ইবাদতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে (৩) এখানে কেবল মুমিন সম্প্রদায়কে হজ্জের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
হযরত ইবরাহীম (আঃ) মাক্বামে ইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুই কানে আঙ্গুল ভরে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্ত ঘোষণা জারি করেন।
ইমাম বাগাভী হযরত ইবনু আববাসের সূত্রে বলেন যে, ইবরাহীমের উক্ত ঘোষণা আল্লাহ পাক সাথে সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তে মানুষের কানে কানে পৌঁছে দেন। ইবনু  আববাস (রাঃ) বলেন, ইবরাহীমী আহবানের জওয়াবই হচ্ছে হাজীদের ‘লাববায়েক আল্লা-হুম্মা লাববায়েক’ (হাযির, হে প্রভু আমি হাযির) বলার আসল ভিত্তি। সেদিন থেকে এযাবত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হ’তে মানুষ চলেছে কা‘বার পথে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ উটে, কেউ গাড়ীতে, কেউ বিমানে, কেউ জাহাযে ও কেউ অন্য পরিবহনে করে। আবরাহার মত অনেকে চেষ্টা করেও এ স্রোত কখনো ঠেকাতে পারেনি। পারবেও না কোনদিন ইনশাআল্লাহ। দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে সর্বদা চলছে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও ছাফা-মারওয়ার সাঈ। আর হজ্জের পরে চলছে কুরবানী। এভাবে ইবরাহীম ও ইসমাঈলের স্মৃতি চির অম্লান হয়ে আছে মানব ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে। এক কালের চাষাবাদহীন বিজন পাহাড়ী উপত্যকা ইবরাহীমের দো‘আর বরকতে হয়ে উঠলো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সম্মিলন স্থল হিসাবে। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْناً وَاتَّخِذُوْا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلًّى وَعَهِدْنَا إِلَى إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ أَنْ طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِيْنَ وَالْعَاكِفِيْنَ وَالرُّكَّعِ السُّجُوْدِ- (البقرة ১২৫)-
‘যখন আমরা কা‘বা গৃহকে লোকদের জন্য সম্মিলনস্থল ও শান্তিধামে পরিণত করলাম (আর বললাম,) তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোর স্থানটিকে ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ কর। অতঃপর আমরা ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তেকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’ (বাক্বারাহ ২/১২৫)
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّ اجْعَلْ هَـَذَا بَلَداً آمِناً وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ مَنْ آمَنَ مِنْهُم بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ قَالَ وَمَن كَفَرَ فَأُمَتِّعُهُ قَلِيْلاً ثُمَّ أَضْطَرُّهُ إِلَى عَذَابِ النَّارِ وَبِئْسَ الْمَصِيْرُ – (البقرة ১২৬)-
‘(স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলল, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তির নগরীতে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদেরকে তুমি ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর- যারা তাদের মধ্যে আল্লাহ ও ক্বিয়ামত দিবসের উপরে বিশ্বাস স্থাপন করে। (আল্লাহ) বললেন, যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরকেও কিছু ভোগের সুযোগ দেব। অতঃপর তাদেরকে আমি যবরদস্তি জাহান্নামের আযাবে ঠেলে দেব। কতই না মন্দ ঠিকানা সেটা’ (বাক্বারাহ ২/১২৬)
ইবরাহীমের উপরোক্ত প্রার্থনা অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيْمُ رَبِّ اجْعَلْ هَـذَا الْبَلَدَ آمِناً وَاجْنُبْنِيْ وَبَنِيَّ أَنْ نَّعْبُدَ الأَصْنَامَ- رَبِّ إِنَّهُنَّ أَضْلَلْنَ كَثِيراً مِّنَ النَّاسِ فَمَنْ تَبِعَنِي فَإِنَّهُ مِنِّيْ وَمَنْ عَصَانِي فَإِنَّكَ غَفُورٌ رَّحِيْمٌ- (إبراهيم ৩৫-৩৬)-
‘যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার পালনকর্তা! এ শহরকে তুমি শান্তিময় করে দাও এবং আমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ’ (ইবরাহীম ৩৫)। ‘হে আমার পালনকর্তা! এরা (মূর্তিগুলো) অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব যে আমার অনুসরণ করে, সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্যতা করে, নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ইবরাহীম ১৪/৩৬)
অতঃপর কা‘বা গৃহ নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র মিলে যে প্রার্থনা করেন, তা যেমন ছিল অন্তরভেদী, তেমনি ছিল সুদূরপ্রসারী ফলদায়ক। যেমন আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيْمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَإِسْمَاعِيْلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ- رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ- رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيْهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ العَزِيزُ الحَكِيمُ- (البقرة ১২৭-১২৯)-
‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বা গৃহের ভিত নির্মাণ করল এবং দো‘আ করল- ‘প্রভু হে! তুমি আমাদের (এই খিদমত) কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’। ‘হে প্রভু! তুমি আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহে পরিণত কর এবং আমাদের বংশধরগণের মধ্য থেকেও তোমার প্রতি একটা অনুগত দল সৃষ্টি কর। তুমি আমাদেরকে হজ্জের নীতি-নিয়ম শিখিয়ে দাও এবং আমাদের তওবা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি তওবা কবুলকারী ও দয়াবান’। ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি এদের মধ্য থেকেই এদের নিকটে একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদের নিকটে এসে তোমার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমি পরাক্রমশালী ও দূরদৃষ্টিময়’ (বাক্বারাহ ২/১২৭-১২৯)
ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপরোক্ত দো‘আ আল্লাহ কবুল করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বংশে চিরকাল একদল মুত্তাকী পরহেযগার মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরের সকল নবী তাঁদের বংশধর ছিলেন। কা‘বার খাদেম হিসাবেও চিরকাল তাদের বংশের একদল দ্বীনদার লোক সর্বদা নিয়োজিত ছিল। কা‘বার খেদমতের কারণেই তাদের সম্মান ও মর্যাদা সারা আরবে এমনকি আরবের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছিল। আজও সঊদী বাদশাহদের লক্বব হ’ল ‘খাদেমুল হারামায়েন আশ-শারীফায়েন’ (দুই পবিত্র হরমের সেবক)। কেননা বাদশাহীতে নয়, হারামায়েন-এর সেবক হওয়াতেই গৌরব বেশী।
ইবরাহীমের দো‘আর ফসল হিসাবেই মক্কায় আগমন করেন বিশ্বনবী ও শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তিনি বলতেন, أَنَا دَعْوَةُ أَبِيْ إِبْرَاهِيْمَ وَبُشْرَى عِيْسَى- ‘আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দো‘আর ফসল ও ঈসার সুসংবাদ’।[23]
এই মহানগরীটি সেই ইবরাহীমী যুগ থেকেই নিরাপদ ও কল্যাণময় নগরী হিসাবে অদ্যাবধি তার মর্যাদা বজায় রেখেছে। জাহেলী আরবরাও সর্বদা একে সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখত। এমনকি কোন হত্যাকারী এমনকি কোন পিতৃহন্তাও এখানে এসে আশ্রয় নিলে তারা তার প্রতিশোধ নিত না। হরমের সাথে সাথে এখানকার অধিবাসীরাও সর্বত্র সমাদৃত হ’তেন এবং আজও হয়ে থাকেন।

পরীক্ষা সমূহের মূল্যায়ন :
ইবরাহীমের পরীক্ষা সমূহ তাঁর যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ছিল না বা তাঁর কোন অপরাধের সাজা হিসাবে ছিল না। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে লালন করে পূর্ণত্বের মহান স্তরে পৌছে দেওয়া এবং তাঁকে আগামী দিনে বিশ্বনেতার মর্যাদায় সমাসীন করা। সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে এটা দেখিয়ে দেওয়া যে, আল্লাহর নিকটে প্রিয় ও সম্মানিত বান্দাগণকে দুনিয়াতে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তে হয়। আল্লাহর সুন্দর গুণাবলীর মধ্যে  رَبُّهُ (‘তার পালনকর্তা’)  গুণটিকে খাছ করে বলার মধ্যে স্বীয় বন্ধুর প্রতি স্নেহ ও তাকে বিশেষ অনুগ্রহে লালন করার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। এক্ষণে তাঁর পরীক্ষার সংখ্যা কত ছিল সে বিষয়ে কুরআন নির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখ করেনি। কেবল বলেছে, بِكَلِمَاتٍ ‘অনেকগুলি বাণী দ্বারা’ (বাক্বারাহ ২/১২৪)। অর্থাৎ শরী‘আতের বহুবিধ আদেশ ও নিষেধ সমূহ দ্বারা। ‘কালেমাত’ শব্দটি বিবি মারিয়ামের জন্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, وَصَدَّقَتْ بِكَلِمَاتِ رَبِّهَا ‘মারিয়াম তার পালনকর্তার বাণী সমূহকে সত্যে পরিণত করেছিল’ (তাহরীম ৬৬/১২)
ইবরাহীমের জীবনে পরীক্ষার সংখ্যা কত ছিল এরূপ এক প্রশ্নের জবাবে ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ইসলামের ৩০টি অংশ রয়েছে। যার ১০টি সূরা তওবায় (১১২ আয়াতে), ১০টি সূরা মুমিনূনে (১-৯ আয়াতে) ও সূরা মা‘আরিজে (২২-৩৪ আয়াতে) এবং বাকী ১০টি সূরা আহযাবে (৩৫ আয়াতে) বর্ণিত হয়েছে। যার সব ক’টি ইবরাহীম (আঃ) পূর্ণ করেন। অতঃপর  আল্লাহ তাকে সনদ দিয়ে বলেন, وَإِبْرَاهِيْمَ الَّذِىْ وَفَّى ‘এবং ইবরাহীমের ছহীফায়, যিনি (আনুগত্যের অঙ্গীকার) পূর্ণ করেছিলেন’ (নাজম ৫৩/৩৭)[24] তবে ইবনু জারীর ও ইবনু কাছীর উভয়ে বলেন, ইবরাহীমের জীবনে যত সংখ্যক পরীক্ষাই আসুক না কেন আল্লাহ বর্ণিত ‘কালেমাত’ বহু বচনের শব্দটি সবকিছুকে শামিল করে’ (ইবনু কাছীর)
বস্ত্ততঃ পরীক্ষা সমূহের সংখ্যা বর্ণনা করা কিংবা ইবরাহীমের সুক্ষ্মদর্শিতা ও জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করা এখানে মুখ্য বিষয় নয়, বরং আল্লাহর প্রতি তাঁর আনুগত্যশীলতা ও নিখাদ আত্মসমর্পণ এবং কার্যক্ষেত্রে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা যাচাই করাই ছিল মুখ্য বিষয়।
শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :
(১) ইবরাহীমী জীবন থেকে প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হ’ল সর্বাবস্থায় আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ। যাকে বলা হয় ‘ইসলাম’। যেমন আল্লাহ বলেন,
إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِيْنَ، وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيْمُ بَنِيْهِ وَيَعْقُوْبُ- (البقرة ১৩১-১৩২)-
‘স্মরণ কর যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, তুমি আত্মসমর্পণ কর। তখন সে বলল, আমি আত্মসমর্পণ করলাম বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালকের নিকট’। ‘এবং একই বিষয়ে সন্তানদেরকে অছিয়ত করে যান ইবরাহীম ও ইয়াকূব’ (বাক্বারাহ ২/১৩১-৩২)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, مَا كَانَ إِبْرَاهِيْمُ يَهُوْدِيًّا وَلاَ نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيْفًا مُّسْلِمًا- (آل عمران ৬৭)-  ‘ইবরাহীম ইহুদী বা নাছারা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠরূপে ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পিত’ (আলে ইমরান ৩/৬৭)।
অতএব ইহুদী, নাছারা ইত্যাদি দলীয় রং দিয়ে তাঁকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা বাতুলতা মাত্র। বরং তিনি ছিলেন নিখাদ আল্লাহ প্রেমিক। আর সেকারণ সকল আল্লাহভীরু মানুষের তিনি নেতা ছিলেন।
(২) আল্লাহর কাছে বড় হ’তে গেলে তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকেই বড় বড় পরীক্ষায় ফেলা হয়। আর তাতে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যেই থাকে ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা।
(৩) পরীক্ষা এলে সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করতে হয়। শয়তানী প্ররোচনায় পিছিয়ে গেলেই ব্যর্থ হ’তে হয়। যেমন পুত্র যবহের পূর্বে শয়তানী ধোঁকার বিরুদ্ধে ইবরাহীম (আঃ) কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন ও পরে সফলকাম হয়েছিলেন।
উপসংহার :
ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রায় দু’শো বছরের পুরা জীবনটাই ছিল পরীক্ষার জীবন। সুখে-দুখে, আনন্দে-বিষাদে সর্বাবস্থায় তিনি ছিলেন আল্লাহর উপরে একান্ত নির্ভরশীল। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা তাঁকে তাঁর বিশ্বাস থেকে এক চুল টলাতে পারেনি। অবশেষে জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত করে আসতেও তিনি  পিছপা হননি। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় বৃদ্ধ বয়সের নয়নের মণি একমাত্র শিশু পুত্রকে তার মা সহ মক্কার বিজনভূমিতে নির্বাসনে দিয়ে আসতেও তাঁর হৃদয় টলেনি। অবশেষে ঐ সন্তানকে যবেহ করার মত কঠিনতম উদ্যোগ নিতেও তাঁর হাত কেঁপে ওঠেনি। এভাবে জীবনভর অগণিত পরীক্ষার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পূর্ণ-পরিণত ইবরাহীম পেলেন ‘বিশ্বনেতা’ হবার মত বিরল দুনিয়াবী পুরস্কারের মহান এলাহী ঘোষণা। হ’লেন ভবিষ্যৎ নবীগণের পিতা ‘আবুল আম্বিয়া’ এবং মিল্লাতে ইসলামিয়াহর নেতা হবার মত দুর্লভ সম্মান। আজও যদি পৃথিবীর দিকে দিকে ইবরাহীমী ঈমানের জ্যোতি বিকীরিত হয়, আবার মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সে ঈমান ফিরে আসে, তবে বর্তমান অশান্ত পৃথিবীর নমরূদী হুতাশন আবারও পুষ্পকাননে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ। ইকবাল তাই গেয়েছেন,
اگر هو پہر ابراھیم کا ايماں پيدا
آگ کرسکتي هے پهر انداز گلستاں پيدا
‘বিশ্বে যদি সৃষ্টি হয় ফের ইবরাহিমী ঈমান
হুতাশনে তবে সৃষ্টি হবে ফের পুষ্পের কানন’



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png