শিরোনাম
Loading latest headlines...

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০

খাবার গ্রহণে রাসুল (সা.) এর সুন্নত

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে



রাসুল (সা.) তার প্রিয় সাহাবিদের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ—প্রত্যেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। তার প্রতিটি কর্ম ও পদক্ষেপ মানবতার অনুসরণযোগ্য। সফলতা ও কামিয়াবির মাধ্যম। জীবনপথের পাথেয়। তার কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করলে ‍মুমিনের জীবনে বয়ে যাবে প্রশান্তির ফল্গুধারা।

রাসুল (সা.) কীভাবে খাবার খেতেন, খাবার গ্রহণে তার কী পদ্ধতি ছিল—সে সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।

খাবার গ্রহণের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা

রাসুল (সা.) খাবার গ্রহণের আগে সব সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলতেন। তার সঙ্গীদেরও বিসমিল্লাহ বলতে উৎসাহিত করতেন। রাসুল (সা.)  বলেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে ও ডান হাত দ্বারা খানা খাও। এবং তোমার দিক হতে খাও।’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫১৬৭, তিরমিজি, হাদিস নং : ১৯১৩)

বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, “যখন তোমরা খানা খেতে শুরু করো তখন আল্লাহর নাম স্মরণ করো। আর যদি আল্লাহর নাম স্মরণ করতে ভুলে যাও, তাহলে বলো, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওআখিরাহ।” (আবু দাউদ, হাদিস নং : ৩৭৬৭, তিরমিজি, হাদিস নং: ১৮৫৮)

হাত ধুয়ে শুরু ও শেষ করা

খাবার গ্রহণের আগে হাত ধোয়া আবশ্যক। না হয় বিভিন্ন ধরনের অসুখ দেখা দিতে পারে। রাসুল (সা.) খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার আদেশ দিয়েছেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) পানাহারের আগে উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিতেন। (মুসনাদে আহমাদ)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) খাওয়ার পর কুলি করতেন এবং হাত ধৌত করতেন। (মুসনাদে আহমাদ ও ইবনে মাজাহ)

দস্তরখান বিছিয়ে খাওয়া

আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পায়াবিশিষ্ট বড় পাত্রে খাবার খেতেন না। কাতাদা (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, তাহলে কীসের ওপর খানা খেতেন? তিনি বললেন, ‘চামড়ার দস্তরখানের ওপর।’ (বোখারি : ৫৩৮৬)

ডান হাত দিয়ে খাওয়া

রাসুল (সা.) আজীবন ডান হাত দিয়ে খাবার খেতেন। বাম হাত দিয়ে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন তিনি। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা বাম হাত দ্বারা খাবার খেয়ো না ও পান করো না। কেননা শয়তান বাম হাতে খায় ও পান করে।’ (বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৭৬; মুসলিম, হাদিস নং: ২০২২)

হাত চেটে খাওয়া

রাসুল (সা.) খাওয়ার সময় সর্বদা হাত চেটে খেতেন। না চাটা পর্যন্ত কখনো হাত মুছতেন না। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করবে, তখন হাত চাটা নাগাদ তোমরা হাতকে মুছবে (ধোয়া) না।’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫২৪৫)

আঙুল চেটে খাওয়া

আঙুল চেটে খাওয়ার ফলে বরকত লাভের অধিক সম্ভাবনা থাকে। কারণ খাবারের বরকত কোথায় রয়েছে মানুষ তা জানে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা যখন খাবার গ্রহণ করো তখন আঙুল চেটে খাও। কেননা বরকত কোথায় রয়েছে তা তোমরা জানো না।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ১৯১৪)

পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাওয়া

খাবার গ্রহণের সময় কখনো কখনো থালা-বাসন থেকে এক-দুইটি ভাত, রুটির টুকরো কিংবা অন্য কোনো খাবার পড়ে যায়। সম্ভব হলে এগুলো তুলে পরিচ্ছন্ন করে খাওয়া চাই।

রাসুল (সা.)-এর খাবারকালে যদি কোনো খাবার পড়ে যেত, তাহলে তিনি তুলে খেতেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের খাবার আহারকালে যদি লুকমা পড়ে যায়, তাহলে ময়লা ফেলে তা ভক্ষণ করো। শয়তানের জন্য ফেলে রেখো না।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ১৯১৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৪০৩)

হেলান দিয়ে না খাওয়া

কোনো কিছুর ওপর হেলান দিয়ে খাবার খেতে তিনি নিষেধ করেছেন। হেলান দিয়ে খাবার খেলে পেট বড় হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে দাম্ভিকতা প্রকাশ পায়। আবু হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-এর দরবারে ছিলাম। তিনি এক ব্যক্তিকে বলেন, আমি টেক লাগানো অবস্থায় কোনো কিছু ভক্ষণ করি না। (বুখারি, হাদিস নং: ৫১৯০, তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৮৬)

খাবারের দোষ-ত্রুটি না ধরা

শত চেষ্টা সত্ত্বেও খাবারে দোষ-ত্রুটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করা নিতান্ত বেমানান। রাসুল (সা.) কখনো খাবারের দোষ ধরতেন না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)  কখনো খাবারের দোষ-ত্রুটি ধরতেন না। তার পছন্দ হলে খেতেন, আর অপছন্দ হলে খেতেন না। (বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৩৮২)

খাবারে ফুঁ না দেওয়া

খাবার ও পানীয়তে ফুঁ দেওয়ার কারণে অনেক ধরনের রোগ হতে পারে। রাসুল (সা.) খাবারে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কখনো খাবারে ফুঁ দিতেন না। কোনো কিছু পান করার সময়ও তিনি ফুঁ দিতেন না। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৩৪১৩)

খাবারের শেষে দোয়া পড়া

আল্লাহ তাআলা খাবারের মাধ্যমে আমাদের প্রতি অনেক বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেন। এ দয়ার কৃতজ্ঞতা আদায় করা সভ্যতা ও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। খাবার গ্রহণ শেষে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করা অপরিহার্য।
খাবার শেষে রাসুল (সা.)  আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাতেন ও দোয়া পড়তেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) খাবার শেষ করে বলতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বয়্যিবান মুবারাকান ফিহি, গায়রা মাকফিইন, ওলা মুয়াদ্দায়িন ওলা মুসতাগনা আনহু রাব্বানা।’ তিনি কখনো এই দোয়া পড়তেন: ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতআমানা ওয়াছাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন।’  (বুখারি, হাদিস নং : ৫৪৫৮)
রাসুল (সা.)-এর সুন্নতগুলো জীবনে বাস্তবায়ন সম্ভব হলে, জীবন সুন্দর ও সার্থক হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।


>> খানা সামনে আসলে এই দোয়া পড়তে হয়----
اَللّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْما رَزَقْتَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফিমা রাজাকতানা ওয়া কিনা আ‘জাবান নার।

>> খানা খাওয়ার শুরুতে এই দোয়া পড়তে হয়----
بِسْمِ اللّهِ وَ عَلى بَرَكَةِ اللهِ  উচ্চারণঃ- বিস্মিল্লাহি ও‘আলা বারাকাতিল্লাহ

>> খানা খাওয়ার শুরুতে দোয়া পড়তে ভুরে গেলে খানার মাঝে স্মরণ আসার পর এই দোয়া পড়তে হয়----
بِسْمِ اللهِ أَوَّلَه وَآخِرَه  উচ্চারণঃ- বিসমিল্লাহি আউয়্যালাহু ওয়া আখীরাহ।

>> খানা খাওয়ার শেষে এই দোয়া পড়তে হয়----
اَلْحَمْدُ لِلّهِ الَّذِيْ اَطْعَمَنَا وَ سَقَانَا وَ جَعَلَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْن.
উচ্চারণঃ- আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী আতআ‘মানা ওয়া ছাক্বানা ওয়া জাআলানা মিনাল মুসলিমীন।

>> দাওয়াত খাওয়ার পর এই দোয়া পড়তে হয়----
اَللّهُمَّ اَطْعِمْ مَنْ اَطْعَمَنِيْ وَ اَسْقِ مَنْ سَقَانِيْ
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা আতঈম মান আত‘আামনী ওয়া আস্কী মান সাকানী
 




আহার শেষ করার পর দো‘আ

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 আহার শেষ করার পর দো‘আ #১

যে ব্যক্তি বলবে,

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَطْعَمَنِي هَذَا، وَرَزَقَنِيهِ، مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِنِّي وَلاَ قُوَّةٍ
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী আত‘আমানী হা-যা ওয়া রাযাকানীহি মিন গাইরি হাউলিম মিন্নী ওয়ালা কুওয়াতিন

অনুবাদঃ সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য, যিনি আমাকে এ আহার করালেন এবং এ রিযিক দিলেন যাতে ছিল না আমার পক্ষ থেকে কোনো উপায়, ছিল না কোনো শক্তি-সামর্থ্য।

...আল্লাহ তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন
হাদীসটি নাসাঈ ব্যতীত সকল সুনান গ্রন্থকারগণ সংকলন করেছেন। আবূ দাউদ, নং ৪০২৫; তিরমিযী, নং ৩৪৫৮; ইবন মাজাহ, নং ৩২৮৫। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী ৩/১৫৯।


আহার শেষ করার পর দো‘আ #২

الْحَمْدُ لِلَّهِ حَمْداً كَثِيراً طَيِّباً مُبَارَكاً فِيهِ، غَيْرَ (مَكْفِيٍّ وَلاَ) مُوَدَّعٍ، وَلاَ مُسْتَغْنَىً عَنْهُ رَبَّنَا

উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লা-হি হামদান কাসীরান তায়্যিবান মুবা-রাকান ফীহি, গাইরা মাকফিয়্যিন ওয়ালা মুয়াদ্দা‘ইন, ওয়ালা মুসতাগনান ‘আনহু রব্বানা

অনুবাদঃ আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা; এমন প্রশংসা যা অঢেল, পবিত্র ও যাতে রয়েছে বরকত; [যা যথেষ্ট করা হয় নি] , যা বিদায় দিতে পারব না, আর যা থেকে বিমুখ হতে পারব না, হে আমাদের রব্ব!

বুখারী ৬/২১৪, হাদীস নং ৫৪৫৮; তিরমিযী, আর শব্দটি তাঁরই, ৫/৫০৭, নং ৩৪৫৬।


খাওয়ার পূর্বে দো‘আ

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

খাওয়ার পূর্বে দো‘আ #১

যখন তোমাদের কেউ আহার শুরু করে তখন সে যেন বলে,

بِسْمِ اللَّهِ

উচ্চারণঃ বিসমিল্লাহ

আল্লাহর নামে।

  • আর শুরুতে বলতে ভুলে গেলে যেন বলে,


بِسْمِ اللَّهِ فِي أَوَّلِهِ وَآخِرِهِ

উচ্চারণঃ বিস্‌মিল্লাহি ফী আওওয়ালিহী ওয়া আখিরিহী
এর শুরু ও শেষ আল্লাহ্‌র নামে।


হাদীসটি সংকলন করেছেন আবূ দাঊদ ৩/৩৪৭, নং ৩৭৬৭; তিরমিযী, ৪/২৮৮, নং ১৮৫৮। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ২/১৬৭।


খাওয়ার পূর্বে দো‘আ #2

  • যাকে আল্লাহ কোনো খাবার খাওয়ায় সে যেন বলে,

اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيهِ وَأَطْعِمْنَا خَيْراً مِنْهُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা বারিক লানা ফীহি ওয়া আত‘ইমনা খাইরাম-মিনহু
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এই খাদ্যে বরকত দিন এবং এর চেয়েও উত্তম খাদ্য আহার করান।

  • আর আল্লাহ্‌ কাউকে দুধ পান করালে সে যেন বলে,


اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيهِ وَزِدْنَا مِنْهُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা বারিক লানা ফীহি ওয়াযিদনা মিনহু
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে এই খাদ্যে বরকত দিন এবং এর চেয়েও উত্তম খাদ্য আহার করান।

তিরমিযী ৫/৫০৬, নং ৩৪৫৫। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ৩/১৫৮।



হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) এর জীবনী

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ) জীবনী ও ঘটনা
আবদুর রহমান ইবন ’আউফ (রাঃ): ইমাম বুখারীর মতে জাহিলী যুগে আবদুর রহমান ইবন ’আউফের নাম ছিল ’আবদু ’আমর। ইবন সা’দ তাঁর ‘তাবাকাতে’ উল্লেখ করেছেন, জাহিলী যুগে তাঁর নাম ছিল ’আবদু কা’বা। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল সা. তাঁর নাম রাখেন ‘আবদুর রহমান’। তাঁর মাতা-পিতা উভয়ে ছিলেন ‘যুহরা’ গোত্রের লোক। মাতার নাম শিফা বিনতু ’আউফ। দাদা ও নানা উভয়ের নাম ’আউফ।
ইবন সা’দ ওয়াকিদীর সূত্রে উল্লেখ করেছেন, তিনি ’আমূল ফীলের (হস্তীর বৎসর) দশ বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। এ বর্ণনার ভিত্তিতে তিনি রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বয়সে দশ বছর ছোট। রাসূল সা. ’আমুল ফীলের ঘটনায় পঞ্চাশ দিন পর জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ইবন হাজার তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. তের বছর ছোট বলে উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পর প্রথম পর্যায়ে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন তিনি তাঁদেরই একজন। মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিদিনই হযরত আবু বকরের বাড়ীতে বৈঠকে মিলিত হতেন। আবদুর রহমানও ছিলেন এ বৈঠকের একজন নিয়মিত সদস্য। আবু বকরের সাথে ছিল তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। আবু বকরের দাওয়াতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু বকরের বাড়ীর এ বৈঠকের নিয়মিত পাঁচজন সদস্যের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। যেমনঃ উসমান, সা’দ, তালহা, যুবাইর এবং আবদুর রহমান। তাঁদের সকলেই আবু বকরের দাওয়াতে প্রথম পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের জন্য অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেন।
নবুওয়াতের পঞ্চম বছর রজব মাসে যে এগারজন পুরুষ ও চারজন নারীর প্রথম কাফিলাটি মক্কা থেকে হাবশায় হিজরাত করে তার মধ্যে আবদুর রাহমানও ছিলেন। আবার রাসূলের সা. মদীনায় হিজরাতের পর তিনিও মদীনায় হিজরাত করেন। যাঁরা হাবশা ও মদীনা দু’স্থানেই হিজরাত করেছিলেন তাঁদেরকে বলা হয় ‘সাহিবুল হিজরাতাইন’। মদীনায় তিনি হযরত সা’দ ইবন রাবী’ বলে আল-খাযরাজীর গৃহে আশ্রয় নেন এবং তাঁর সাথেই রাসূল সা. ভ্রাতৃসম্পর্ক স্থাপন করে দেন। এ সম্পর্কে ইমাম বুখারী একাধিক সনদের মাধ্যমে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। এ সম্পর্কে হযরত আনাস রা. বলেনঃ ‘আবদুর রহমান ইবন ’আউফ হিজরাত করে মদীনায় এলে রাসূল সা. সা’দ ইবন রাবী’র সাথে তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দেন। সা’দ ছিলেন মদীনার খাযরাজ গোত্রের নেতা ও ধনাঢ্য ব্যক্তি। তিনি আবদুর রহমানকে বললেন, ‘আনসারদের সকলে জানে আমি একজন ধনী ব্যক্তি। আমি আমার সকল সম্পদ সমান দু’ভাগে ভাগ করে দিতে চাই। আমার দু’জন স্ত্রী আছেন। আমি চাই, আপনি তাদের দু’জনকে দেখে একজনকে পছন্দ করুন। আমি তাকে তালাক দেব। তারপর আপনি তাকে বিয়ে করে নেবেন।’ আবদুর রহমান বললেনঃ ‘আল্লাহ আপনার পরিজনের মধ্যে বরকত ও কল্যাণ দান করুন! ভাই, এসব কোন কিছুর প্রয়োজন আমার নেই। আমাকে শুধু বাজারের পথটি দেখিয়ে দিন।
ইসলামী ভ্রাতৃত্বে হযরত সা’দের এ দৃঢ় আস্থা ও অতুলনীয় উদারতার দৃষ্টান্ত ইসলামী উম্মাহ তথা মানব জাতির ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে হযরত আবদুর রহমানের মহত্ব, আত্মনির্ভরতা ও নিজ পায়ে দাঁড়ানোর দৃঢ় সংকল্পও বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।
মদীনায় অবস্থানের দ্বিতীয় দিন আবদুর রহমান তাঁর আনসারী ভাই সা’দকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘বেচাকেনা হয় এমন কোন বাজার কি এখানে আছে?’’ বললেনঃ ‘‘হাঁ, ইয়াসরিবে (মদীনায়) কায়নুকার বাজার তো আছে।’’ হযরত আব্দুর রহমান এক স্থান থেকে কিছু ঘি ও পনির খরিদ করে বাজারে যান। দ্বিতীয় দিনও তিনি এমনটি করলেন। এভাবে তিনি বেচাকেনা জারি রাখেন। কিছু পয়সা হাতে জমা হলে তিনি এক আনসারী মহিলাকে বিয়ে করেন।
বিয়ের পর তিনি একদিন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলেন। তাঁর কাপড়ে হলুদের দাগ দেখে রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি বিয়ে করেছ?’ বললেন, ‘হাঁ’। জিজ্ঞেস করলেন কাকে?’ তিনি বললেন, ‘এক আনসারী মহিলাকে।’ রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘মোহর কত নির্ধারণ করেছ?’ তিনি বললেন, ‘কিছু সোনা।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করে নাও।’
তিনি ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকলেন। কিছুদিন পর তার হাতে আরও কিছু অর্থ জমা হলে রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশমত ওয়ালিমার কাজটি সেরে নেন। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হয়। মক্কার উমাইয়া ইবন খালফের সাথে একটি ব্যবসায়িক চুক্তিও সম্পাদন করেন।
হযরত আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বদর, উহুদ ও খন্দক সহ সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। ইমাম বুখারী ‘কিতাবুল মাগাজী’তে বদর যুদ্ধের একটি ঘটনা তাঁরই যবানে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘‘বদর যুদ্ধে, আমি সারিতে দাঁড়িয়ে। তুমুল লড়াই চলছে। আমি ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে আমার দু’পাশে দুই নওজোয়ানকে দেখলাম। তাদের ওপর আমার খুব একটা আস্থা হলো না। তাদের একজন ফিসফিস করে আমাকে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘‘চাচা, বলুন তো আবু জাহল কোন দিকে?’’ বললাম, ‘‘ভাতিজা, তাকে দিয়ে কি করবে?’’ সে বলল, ‘‘আমি আল্লাহর সাথে অংগীকার করেছি, হয় আমি তাকে কতল করবো, না হয় এ উদ্দেশ্যে আমার নিজের জীবন কুরবান করবো।’’ একই কথা ফিসফিস করে আমাকে বলল অন্যজনও। আবদুর রহমান বলেন, ‘‘তাদের কথা শোনার পর আমার আনন্দ হলো এই ভেবে যে, কত মহান দু’ব্যক্তির মাঝাখানেই না আমি দাঁড়িয়ে। আমি ইশারা করে আবু জাহলকে দেখিয়ে দিলাম। অকস্মাৎ তারা দু’জন একসাথে বাজপাখীর মত আবু জাহলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই তাকে কতল করে। এ দু’নওজোয়ান ছিল ’আফরার দু’পুত্র মুয়ায ও মু’য়াওবিয।’ বদর যুদ্ধে আবদুর রহমান পায়ে আঘাত পান।
উহুদের যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধেও তিনি অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। রাসূল সা. উহুদ পর্বতের এক কোণে আশ্রয় নিয়েছেন, উবাই ইবন খালফ এগিয়ে এলো আল্লাহর রাসূলকে শহীদ করার উদ্দেশ্যে। আবদুর রহমান তাকে জাহান্নামে পাঠাবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলে রাসূল সা. তাঁকে বাধা দেন। অতঃপর রাসূল সা. নিজেই হারিস ইবন সাম্মার নিকট থেকে বর্শা নিয়ে উবাই ইবন খালফের গর্দানে ছুড়ে মারেন। সামান্য আহত হয়ে সে চেঁচাতে চেঁচাতে পালিয়ে যায় এবং মক্কার পথে ‘সারফ’ নামক স্থানে নরক যাত্রা করে।
ইবন সা’দ ‘তাবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উহুদের যুদ্ধে আবদুর রহমান অসীম সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দেন। বালাযুরী তাঁর ফুতুহুল বুলদান, ইবনে হাজার তাঁর আল-ইসাবা এবং ইবন খালদুন তাঁর তারীখে বর্ণনা করেছেন, এ যুদ্ধে তিনি সারা দেহে মোট একত্রিশটি আঘাত পান।
ষষ্ঠ হিজরীর শাবান মাসে রাসূল সা. মদীনা থেকে প্রায় তিন শো মাইল উত্তরে ‘দুমাতুল জান্দালে’ একটি অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন। এ বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দেন আবদুর রহমানকে। যাত্রার পূর্বে তিনি উপস্থিত হলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট। রাসূল সা. নিজ হাতে আবদুর রহমানের মাথার পাগড়ীটা খুলে রেখে দিয়ে অন্য একটি কালো পাগড়ী তার মাথায় বেঁধে দেন। তারপর যুদ্ধের পলিসি সংক্রান্ত কিছু হিদায়াত দিয়ে তিনি আবদুর রহমানকে রা. বিদায় দেন।
মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ সা. মুহাজিরদের যে ছোট্ট দলটির সংগে ছিলেন, আবদুর রহমানও ছিলেন সেই দলে।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূল সা. আরব উপদ্বীপে দাওয়াতী কাজের জন্য কতকগুলি তাবলীগী গ্রুপ বিভিন্ন দিকে পাঠান। তখনও আরব গোত্রগুলি মূর্খতা ও আসাবিয়্যাতের মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এ কারণে রাসূল সা. তাবলীগী গ্রুপগুলিকে সশস্ত্র অবস্থায় পাঠলেন। যাতে প্রয়োজনে তারা আত্মরক্ষা করতে পারে। এরকম তিরিশ সদস্য বিশিষ্ট একটি দলকে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে বনু খুযায়মার লোকদের নিকট পাঠানো হলো। কিন্তু হযরত খালিদ ও বনু খুযায়মার মধ্যে ভুল বুঝা-বুঝি সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে হযরত খালিদ বনু খুযায়মার ওপর হামলা করে তাদের বহু লোককে হতাহত করেন। এ ঘটনা অবগত হয়ে রাসূল সা. হযরত খালিদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং তঁর ভুলের জন্য আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করেন। রাসূল সা. নিহত ব্যক্তিদের দিয়াত আদায় করেন। এমন কি কারও একটি কুকুরও মারা গিয়ে থাকলে তারও বিনিময় মূল্য আদায় করা হয।
বনু খুযায়মার এ দুর্ঘটনা নিয়ে খালিদ ও আবদুর রহমানের মধ্যে বচসা ও বিতর্ক হয়। এ কথা রাসূল সা. অবগত হয়ে খালিদকে ডেকে তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, ‘তুমি সাবেকীনে আওয়াবীন’ (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) একজন সাহাবীর সাথে ঝগড়া ও তর্ক করেছ। এমনটি করা তোমার শোভন হয়নি। আল্লাহর কসম, যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনার মালিকও তুমি হও এবং তার সবই আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দাও, তবুও তুমি আমার সেসব প্রবীণ সাহাবীর একজনেরও সমকক্ষ হতে পারবে না।’ উল্লেখ থাকে যে, হযরত খালিদ আহযাবের যুদ্ধের পর ষষ্ঠ হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
নবম হিজরীতে তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানগণ যে ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন হয় সে পরীক্ষায়ও তিনি কৃতকার্য হন। রাসূলুল্লাহর সা. আবেদনে সাড়া দিয়ে এ অভিযানের জন্য হযরত আবু বকর, উসমান ও আবদুর রহমান রা. রেকর্ড পরিমাণ অর্থ প্রদান করেন। আবদুর রহমান আট হাজার দিনার রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তুলে দিলে মুনাফিকরা কানাঘুষা শুরু করে দেয়। তারা বলতে থাকে, ‘সে একজন রিয়াকার- লোক দেখানোই তার উদ্দেশ্য।’ তাদের জবাবে আল্লাহ বলেন, ‘এ তো সেই ব্যক্তি যার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হতে থাকবে।’ (সূরা তাওবাহঃ ৭১) অন্য একটি বর্ণনায় আছে, উমার রা. তাঁর এ দান দেখে বলে ফেলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আবদুর রহমান গুনাহগার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সে তার পরিবারের লোকদের জন্য কিছুই রাখেনি।’ একথা শুনে রাসুল সা. জিজ্ঞেস করেন, ‘আবদুর রহমান, পরিবারের জন্য কিছু রেখেছ কি?’ তিনি বলেন, ‘হাঁ। আমি যা দান করেছি তার থেকেও বেশী ও উৎকুষ্ট জিনিস তাদের জন্য রেখেছি।’ রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত?’ বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসূল যে রিযিক, কল্যাণ ও প্রতিদানের অঙ্গীকার করেছেন, তাই।’
এ তাবুক অভিযানকালে একদিন ফজরের নামাযের সময় রাসূল সা. প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে যান। ফিরতে একটু দেরি হয়। এদিকে নামাযের সময়ও হয়ে যায়। তখন সমবেত মুসল্লীদের অনুরোধে আবদুর রহমান ইমাম হিসাবে নামাযে দাড়িয়ে যান। এদিকে রাসুল সা. ফিরে এলেন, এক রাকায়াত তখন শেষ। আবদুর রহমান রাসূলুল্লাহর সা. উপস্থিতি অনুভব করে পেছন দিকে সরে আসার চেষ্টা করেন। রাসূল সা. তাঁকে নিজের স্থানে থাকার জন্য হাত ইশারা করেন। অতঃপর অবশিষ্ট দ্বিতীয় রাকায়াতটিও তিনি শেষ করেন এবং রাসুল সা. তাঁর পেছনে ইকতিদা করেন। ইমাম মুসলিম ও আবু দাউদ তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে এ সম্পর্কিত হাদিস বর্ণনা করেছেন।
প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. অন্তিম রোগশয্যায়। জীবনের আশা আর নেই। তাঁর পর খলীফা কে হবেন সে সম্পর্কে  বিশিষ্ট সাহাবীদের ডেকে পরামর্শ করলেন। হযরত আবদুর রহমানের সাথেও পরামর্শ করেন এবং হযরত উমারের কিছু গুণাবলী তুলে ধরে পরবর্তী খলীফা হিসাবে তাঁর নামটি তিনি প্রস্তাব করেন। আবদুর রহমান ধৈর্য সহকারে খলীফার কথা শুনার পর বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। তাঁর যোগ্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। তবে স্বভাবগতভাবেই তিনি একটু কঠোর।
হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতকালে আটজন বিশিষ্ট সাহাবীকে ফাতওয়া ও বিচারের দায়িত্ব প্রদানের সাথে সাথে অন্য সকলকে ফাতওয়া দান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। আবদুর রহমান ছিলেন এ আটজনের একজন।
হযরত উমারও তাঁর খিলাফতকালে জ্ঞান ও বিচক্ষণতার অধিকারী সাহাবীদের ছাড়া অন্য সকলকে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখেন। এমনকি যে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদকে তিনি ‘খাযিনাতুল ইলম’ (জ্ঞানের ভাণ্ডার) বলে অভিহিত করতেন, তিনিও যখন পূর্ব অনুমতি ছাড়াই ফাতওয়া দিতে শুরু করেন, তাঁকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। জ্ঞানের যে শাখায় যিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন হযরত উমার তাকেই কেবল সে বিষয়ে মতামত প্রকাশের অনুমতি প্রদান করেন। এ সম্পর্কে সিরিয়া সফরকালে ‘জাবিয়া’ নামক স্থানে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘যারা কুরআন বুঝতে চায়, তারা উবাই বিন কা’ব, যারা ফারায়েজ সম্পর্কে জানতে চায়, তারা যায়িদ বিন সাবিত এবং যারা ফিক্‌হ সংক্রান্ত বিষয়ে অবগত হতে চায়, তারা মুয়ায বিন জাবাল ও আবদুর রহমান বিন ’আউফের সাথে যেন সম্পর্ক গড়ে তোলে।’’
খলীফা হযরত উমার হযরত আবদুর রহমানকে বিশেষ উপদেষ্টার মর্যাদা দেন। রাতে তিনি যখন ঘুরে ঘুরে নগরের মানুষের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন, অনেক সময সংগে নিতেন হযরত আবদুর রহমানকে এবং নানা বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন।
একদিন রাতে খলীফা উমার বের হলেন আব্দুর রহমানকে সংগে নিয়ে নগর পরিভ্রমণে। দূর থেকে তাঁরা লক্ষ্য করলেন একটি বাড়ীতে আলো। কাছে গিয়ে দেখলেন বাড়ীর দরজা-জানালা সব বন্ধ; কিন্তু ভেতর থেকে কিছু লোকের উচ্চকণ্ঠ ভেসে আসছে। খলীফা উমার আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি ভেতর থেকে আসা আওয়ায শুনতে পাচ্ছেন?
– ‘জী হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি।’
– ‘কি বলছে, তা-কি বুঝতে পারছেন?’
-‘সমবেত কণ্ঠের আওয়ায। কেবল শোরগোল শোনা যাচ্ছে। কি বলছে তা বুঝা যাচ্ছে না।’
– ‘আপনি কি জানেন বাড়ীটি কার?’
– ‘বাড়ীটি তো রাবীয়া’ ইবন উমাইয়্যার।’
উমার বলেন, ‘সম্ভবতঃ তারা মদপান করে মাতলামি করছে। আপনার কি মনে হয়?’
– ‘‘আল্লাহ আমাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তি থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ ওয়ালা তাজাস্‌সাসূ (গুপ্তচর বৃত্তি করোনা) এবং ওয়ালা তাকফু মা লাইসা লাকা বিহি ইলমুন (যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না)।’’
এ কথা শুনে উমার বললেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন এবং যথাসময়ে স্মরণ করে দিয়েছেন।’- এই বলে তিনি আবদুর রহমানকে সংগে নিয়ে সামনে অগ্রসর হন। হযরত আবদুর রহমান এ ক্ষেত্রে যে আয়াতে দু’টি আমীরুল মুমিনীনকে স্মরণ করে দেন, তা হচ্ছে মুসলিম সমাজ জীবনে ব্যক্তির বুনিয়াদী অধিকারের প্রাণস্বরূপ।
১৬ হিজরী সনে ইরাক বিজয়ের ফলে ইরাকে কিসরা শাহানশাহীর পতন হয় এবং ইয়ারমুকে যুদ্ধের পর সিরিয়া থেকে রোমের কাইসার সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। খলীফা জিযিয়া ও খারাজ নির্ধারণের ব্যাপারে উদ্যোগী হন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ, বিলাল ও আবদুর রহমানের প্রবল প্রতিবাদের সম্মুখীন হন। অবশেষে মজলিসে শূরার ক্রমাগত বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনার পর খলীফার মতামতই গৃহীত হয়।
খলীফা হযরত উমার রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের ভাতা নির্ধারণের ইচ্ছা করলেন। এ ইচ্ছা তিনি ব্যক্ত করলেন হযরত আবদুর রহমানের নিকট। তিনি পরামর্শ দিলেন, কুষ্ঠি বিদ্যায় পারদর্শী তিন ব্যক্তি- মাখযামা ইবন নাওফিল, খায়বর ইবন মাতয়াম এবং আকীল ইবন আবু তালিবের ওপর একটি তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব অর্পণের জন্য। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী খলীফা তাঁদেরকে দায়িত্ব প্রদান করলেন। তাঁরা তালিকা প্রণয়ন করে খলীফার নিকট পেশ করতে আমীরুল মুমিনীন ও আবদুর রহমান দু’জনেই তা পরীক্ষা করেন। হযরত উমার তালিকা দেখার পর বললেন, ‘‘বর্তমান তালিকার ক্রমধারা পরিবর্তন করে আমার নিজের ও আমার গোত্রীয় অন্য লোকদের নাম রাসূলের সা. সাথে বংশগত সম্পর্কে দিক দিয়ে যখন আসবে তখন লিখবে’’। হযরত আলী ও হযরত আবদুর রহমান আপত্তি করে বললেন, ‘‘আপনি আমীরুল মুমিনীন। তালিকার সূচনা আপনার নাম দিয়েই হওয়া উচিত।’’ তিনি বললেন, ‘‘না। রাসূলুল্লাহর সা. চাচা ’আব্বাস রা. থেকে শুরু কর, তারপর আলীর রা. নামটি লিখ।’’ ভাতার পরিমাণ তিনি আবদুর রহমানের সাথে পরামর্শ করেই নির্ধারণ করেন। তারপর তা মজলিসে শূরায় পেশ করেন।
আযওয়াজে মুতাহ্‌হারাত (রাসূলুল্লাহর সা. সহধর্মিণীগণ) বেশ আগে থেকেই হজ্জ্ব পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন। তেইশ হিজরী সনে খলীফা উমার তাঁদের হজ্জ্ব আদায়ের ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেন। তিনি নিজেও তাঁদের সফরসংগী হন। তাঁদের সফর ব্যবস্থাপনার যাবতীয় দায়িত্ব হযরত আবদুর রহমান ও হযরত উসমানের রা. ওপর অর্পণ করেন। সফরের সময় আবদুর রহমান কাফিলার আগে এবং উসমান পেছনে সশস্ত্র অবস্থায় পাহারা দিয়ে চলতেন। কোন ব্যক্তিকে তাঁদের উটের কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। তাঁরা যখন কোথাও অবস্থান করতেন, এরা দু’জন তাঁবুর প্রহরায় নিয়োজিত থাকতেন।
হযরত উমার তাঁর খিলাফতের প্রথম বছর আবদুর রহমানকে আমীরে হজ্জ নিয়োগ করে মক্কায় পাঠান। আর তাঁর সাথে পাঠান নিজের পক্ষ থেকে কুরবানীর একটি পশু। এ বছর বিশ্ব মুসলিম তাঁর নেতৃত্বেই হজ্জ্ব আদায় করে।
ফলীফা হযরত উমার রা. ফজরের জামায়াতে ইমামতি করছিলেন। ইবন শু’বার পারসিক দাস ফিরোয তাকে ছুরিকাঘাত করে। আহত অবস্থায় সংগে সংগে তিনি পেছনে দণ্ডায়মান আবদুর রহমানের হাতটি ধরে নিজের স্থানে তাঁকে দাঁড় করে দেন এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অতপর আবদুর রহমান অবশিষ্ট নামায দ্রুত শেষ করেন।
হযরত উমার আহত হওয়ার দশ ঘন্টা পর সমবেত লোকদের বললেন, ‘আপনারা যেমন বলতেন আমিও চাচ্ছিলাম, এ উম্মাতের বোঝা বহনের ক্ষমতা রাখে এমন এক ব্যক্তিকে আমি আমীর বানিয়ে যাই। পরে আমি চিন্তা করলাম, এমনটি করলে আমার মৃত্যুর পরও এর দায়-দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাবে। এ কারণে, আমার সাহস হলো না। এ ছ’ব্যক্তি- আলী, উসমান, আবদুর রহমান, সা’দ, যুবাইর ও তালহা। আল্লাহর রাসূল সা. তাদেরকে জান্নাতী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদের কোন একজনকে আপনারা আমীর নির্বাচন করে নেবেন। এ ছ’জন ছাড়া আমার পুত্র আবদুল্লাহও আছে। তবে খিলাফতের সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকবে না। উল্লেখিত ছয় ব্যক্তি যদি খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে তিনজন করে সমান দু’দলে বিভক্ত হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে আবদুল্লাহ যে দকে সমর্থন করবে সে দল থেকেই খলীফা হবে। কিন্তু আবদুল্লাহর মতামত যদি সর্বসাধারণের নিকট গৃহীত না হয় তাহলে আবদুর রহমান যে দলে থাকবেন তাঁদের মতই গ্রহণযোগ্য হবে।’ হযরত উমারের এ পরামর্শের মধ্যে আবদুর রহমান সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
হযরত উমার ইনতিকাল করলেন। আবদুর রহমান খলীফা হতে রাজি ছিলেন না। এদিকে হযরত তালহাও তখন মদীনায় ছিলেন না। অবশিষ্ট চার ব্যক্তি খলীফা নির্বাচনের পূর্ণ দায়িত্ব আবদুর রহমানের ওপর ন্যস্ত করেন।
হযরত আবদুর রহমানের ওপর অর্পিত এ দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আমানতদারীর সাথে পালন করেন। ক্রমাগত তিন দিন তিন রাত বিভিন্ন স্তরের লোকদের সাথে মত বিনিময় করেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হযরত উসমানের পক্ষেই মত ব্যক্ত করেন। অবশেষে উমারের নির্ধারিত সময় তিন দিন তিন রাত শেষ হওয়ার আগে তিনি মানুষকে ফজরের জামায়াতে শরীক হওয়ার জন্য আবেদন জানান। নামায শেষে তিনি সমবেত জনমণ্ডলীর সামনে খলীফা হিসাবে হযরত উসমানের নামটি ঘোষণা করেন। হযরত উমারের ছুরিকাহত হওয়ার পর থেকে তাঁরই নির্দেশে তৃতীয় খলীফা হিসাবে উসমানের রা. নাম ঘোষিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি জামায়াতের ইমামতি করেন এবং প্রশাসনের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন।
চব্বিশ হিজরী সনের মুহাররম মাসে হযরত উসমান খলীফা নির্বাচিত হন। সে বছরই তিনি আবদুর রহমানকে আমীরুল হজ নিযুক্ত করেন। মুসলিম উম্মাহ সে বছরের হজটি তাঁরই নেতৃত্বে আদায় করে।
হযরত আবদুর রহমান আমরণ খলীফা উসমানের মজলিসে শূরার সদস্য থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ দানের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর বিশেষ খিদমাত আঞ্জাম দেন। হযরত আবু বকর, উমার, উসমান রা- এ তিন খলীফার প্রত্যেকের নিকটই তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন ও আস্থার পাত্র।
ইবন সা’দের মতে, হযরত আবদুর রহমান হিঃ ৩২ সনে ৭৫ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তবে ইবন হাজারের মতে, তিনি ৭২ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। ইবন হাজার এ কথাও বলেছেন, হযরত উসমান অথবা যুবাইর ইবনুল আওয়াম তাঁর জানাযার ইমামতি করেন এবং তাঁকে মদীনার বাকী’ গোরস্থানে দাফন করা হয়। গোরস্থান পর্যন্ত তার লাশ বহনকারীদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসও ছিলেন।
পূর্বেই আমরা দেখেছি সম্পূর্ণ রিক্ত হস্তে আবদুর রহমান মদীনায় এসেছিলেন। সামান্য ঘি ও পনির কেনাবেচার মাধ্যমে তিনি তাঁর ব্যবসা শুরু করেন। কালক্রমে তিনি তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর একজন সেরা ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিকে পরিণত হন। রাসূল সা. তাঁর সম্পদ বৃদ্ধির জন্য দুআ করেছিলেন এবং সে দুআ আল্লাহর দরবারে কবুলও হয়েছিল। কিন্তু সে সম্পদের প্রতি তাঁর একটুও লোভ ও আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় এবং তাঁর ইনতিকালের পরেও আমরণ তিনি সে সম্পদ অকৃপণ হাতে আল্লাহর পথে ও মানব কল্যাণে ব্যয় করেছেন।
একবার রাসূল সা. একটি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একটি অভিযানে সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা করেছি, তোমরা সাহায্য কর।’ আবদুর রহমান এসে দৌড়ে বাড়ীতে গিয়ে আবার ফিরে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার কাছে এ চার হাজার আছে। দু’হাজার আমার রবকে করজে হাসানা দিলাম এবং বাকী দু’হাজার আমার পরিবার-পরিজনদের জন্য রেখে দিলাম।’ রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘তুমি যা দান করেছ এবং যা রেখে দিয়েছ, তার সবকিছুতে আল্লাহ তায়ালা বরকত দান করুন।
একবার মদীনায় শোরগোল পড়ে গেল, সিরিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য নিয়ে একটি বাণিজ্য কাফিলা উপস্থিত হয়েছে। শুধু উট আর উট। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ কার বাণিজ্য কাফিলা?’ লোকেরা বলল, ‘আবদুর রহমান ইবন আউফের।’ তিনি বললেন, আমি রাসূলকে সা. বলতে শুনেছি, আমি যেন আবদুর রহমানকে সিরাতের ওপর একবার হেলে গিয়ে আবার সোজা হয়ে উঠতে দেখলাম।’ অন্য একটি বর্ণনায় আছে, হযরত আয়িশা বলেন, ‘আল্লাহ দুনিয়াতে তাকে যা কিছু দিয়েছেন তাতে বরকত দিন এবং তাঁর আখিরাতের প্রতিদান এর থেকেও বড়। আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ আবদুর রহমান হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
হযরত আয়িশার এ কথাগুলো আবদুর রহমানের কানে গেল। তিনি বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ আমাকে সোজা হয়েই জান্নাতে প্রবেশ করতে হবে।’ অতঃপর তিনি তাঁর সকল বাণিজ্য সম্ভার সাদকা করে দেন। পাঁচ শো, মতান্তরে সাত শো উটের পিঠে এ মালামাল বোঝাই ছিল। কেউ বলেছেন, বাণিজ্য সম্ভারের সাথে উটগুলিও তিনি সাদকা করে দেন। হযরত আবদুর রহমান ছিলেন উম্মাহাতুল মুমিনীনের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তাঁদের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তিনি আজীবন অকাতরে খরচ করেছেন। তাঁদের নিকট তিনি ছিলেন একজন বিশ্বাসী ও আস্থাভাজন ব্যক্তি। একবার তিনি কিছু ভূমি চল্লিশ হাজার দীনারে বিক্রি করেন এবং বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ বনু যুহরা (রাসূলুল্লাহর সা. জননী হযরত আমিনার পিতৃ-গোত্র), মুসলমান, ফকীর মিসকীন, মুহাজির ও আযওয়াজে মুতাহ্‌হারাতের মধ্যে বণ্টন করে দেন। হযরত আয়িশার নিকট তাঁর অংশ পৌঁছলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে পাঠিয়েছে?’ বলা হলো, ‘আবদুর রহমান ইবন আওফ।’ তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ ‘আমার পরে ধৈর্যশীলরাই তোমাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাবে।’
ইবন হাজার ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে জা’ফর ইবন বারকানের সূত্রে উল্লেখ করেছেন, আবদুর রহমান মোট তিরিশ হাজার দাস মুক্ত করেছেন। জাহিলী যুগেও মদ পানকে তিনি হারাম মনে করতেন।
হযরত আবদুর রহমান ছিলেন তাকওয়া ও আল্লাহভীতির এক বাস্তব নমুনা। মক্কায় গেলে তিনি তাঁর আগের বাড়ী-ঘরের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, ‘আপনার বাড়ী-ঘরের প্রতি আপনি এত নাখোশ কেন?’ তিনি বললে, ‘ওগুলি তো আমি আমার আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিয়েছি।’
একবার তিনি তাঁর বন্ধুদের দাওয়াত দিলেন। ভালো ভালো খাবার এলো। খাবার দেখে তিনি কান্না শুরু করে দিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, ‘কি হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘রাসূল সা. বিদায় নিয়েছেন। তিনি নিজের ঘরে যবের রুটিও পেট ভরে খেতে পাননি।’
একদিন তিনি সাওম পালন করছিলেন। ইফতারের পর তাঁর সামনে আনীত খাবারের দিকে তাকিয়ে বলরেন, ‘মুসয়াব ইবন উমায়ের ছিলেন আমার থেকেও উত্তম মানুষ। তিনি শহীদ হলে তাঁর জন্য মাত্র ছোট্ট একখানা কাফনের কাপড় পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। তারপর আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য দুনিয়ার এ প্রাচুর্য দান করলেন। আমার ভয় হয়, আমাদের বদলা না জানি দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয়।’ অতঃপর তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।
হযরত উমার তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘আবদুর রহমান মুসলিম নেতৃবৃন্দের একজন।’ হযরত আলী একটি ঘটনা বর্ণনা প্রসংগে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করেন, ‘আবদুর রহমান আসমান ও যমীনের বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি।’
হযরত আবদুর রহমান রাসূলুল্লাহ সা. থেকে সরাসরি ও উমার রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে তাঁর পুত্রগণ, যেমন ইবরাহীম, হুমায়েদ, উমার, মুসয়াব, আবু সালামা, তাঁর পৌত্র মিসওয়ার, ভাগ্নে মিসওয়ার ইবন মাখরামা এবং ইবন আব্বাস, ইবন উমার, জুবাইর, জাবির, আনাস, মালিক ইবন আওস রা. প্রমুখ সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বড় পরিচয়, তিনি আশারায়ে মুবাশ্‌শারার একজন।
----####----



সুরা কাহাফের ফজিলত:

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


সুরাটির নামকরণ: 
আসহাবে কাহাফের ঘটনা সম্বলিত এ সুরাটি এক দল মুমিন যুবক নিয়ে আলোচিত। যে মুমিন যুবকরা দ্বীনকে সংরক্ষণের জন্য নিজেদের কোনো এক পাহাড়ের একটি গুহায় আত্মগোপনে রেখেছিলেন। তাদের ঘটনা বর্ণিত হওয়ায় এ সুরার নামকরণ করা হয়েছে সুরা কাহাফ। 

ঘটনা-০১. 
 ওই সব যুবকের ঘটনা, যারা ঈমান আকিদা রক্ষার জন্য নিজেদের ওপর কুরবানি করে নিজেদের আবাস, সহায়-সম্পদের মায়া ত্যাগ করে দূর অজানায় কোনো পাহাড়ের গুহায় আত্মগোপন করে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সেখানে ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে কাটানোর পর আল্লাহ তাআলা তাদের আবার জাগ্রত করেন। 

ঘটনা-০২.
হজরত মূসা ও খিজির আলাইহিস সালামের মাঝে সংঘটিত ঘটনাও এ সুরায় আলোচিত হয়েছে।

ঘটনা-০৩.
 দুনিয়ার ক্ষমতাশালী বাদশাহদের একজন ‘বাদশাহ জুলকারনাইন’। যিনি সারা বিশ্বের বাদশাহ ছিলেন এবং সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালের অনেক তথ্যবহুল ঘটনাগুলোর জন্যও এ সুরাটি যেমন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তেমনি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ।

সুরা কাহাফের ফজিলত:
হজরত আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, যে সুরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্ত করবে; সে দাজ্জালের ফিৎনা হতে নিরাপদ থাকবে। অন্য হাদিসে ভিন্ন রেওয়ায়েতে শেষ ১০ আয়াতের ব্যাপারে উল্লিখিত ফজিলতের বর্ণনা রয়েছে। (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ ও মুসনাদে আহমদ)

সুতরাং প্রথম বা শেষ ১০ আয়াত অথবা উভয় দিক দিয়ে মোট ২০ আয়াত যে মুখস্ত করবে সেও হাদিসের ঘোষিত ফজিলত লাভের অন্তর্ভুক্ত হবেন।

হজরত সাহাল ইবনে মুআয রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের প্রথম ও শেষ আয়াতগুলো পাঠ করবে; তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একটি নূর হয়ে যায়। আর যে পূর্ণ সুরা তিলাওয়াত করে তার জন্য জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত নূর হয়ে যায়। (মুসনাদে আহমদ) 

জুমাআর দিন তিলাওয়াতের ফজিলত :
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পাঠ করবে তার জন্য এক জুমা থেকে অপর (পরবর্তী) জুমা পর্যন্ত নূর হবে।

হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করবে, সে আট দিন পর্যন্ত সর্বপ্রকার ফিৎনা থেকে মুক্ত থাকবে। যদি দাজ্জাল বের হয় তবে সে দাজ্জালের ফিৎনা থেকেও মুক্ত থাকবে।

অন্য রেওয়ায়েতে আছে এক জুমা থেকে অপর জুমা পর্যন্ত তার সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে উল্লিখিত গোনাহ মাফ হওয়ার দ্বারা সগিরা গুনাহ উদ্দেশ্য। কারণ ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য হচ্ছে যে, কবিরা গোনাহ তাওবা করা ছাড়া ক্ষমা হয় না। 

পরিশেষে:
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে জুমআর দিন সুরা কাহাফ বেশি বেশি তিলাওয়াত করার তাওফিক দান করুন এবং এর মর্মার্থ বুঝে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও ঘোষিত ফজিলত অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।





সুরা কাহাফ

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
 আরবি উচ্চারণ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বাংলা অনুবাদ পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَلْ لَهُ عِوَجَا18.1 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১। আল্হাম্দু লিল্লা-হিল্লাযী য় আন্যালা ‘আলা ‘আবদিহিল্ কিতা-বা অ লাম্ ইয়াজ্ব‘আল্ লাহূ ‘ইওয়াজ্বা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে রাখেননি কোন বক্রতা ।

 قَيِّمًا لِيُنْذِرَ بَأْسًا شَدِيدًا مِنْ لَدُنْهُ وَيُبَشِّرَ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا حَسَنًا18.2 
আরবি উচ্চারণ ১৮.২। ক্বাইয়্যিমাল্ লিইয়ুন্যির বাসান্ শাদীদাম্ মিল্লাদুন্হু অইয়ুবাশ্ শিরাল্ মুমিনীনাল্লাযীনা ইয়া’মালূনাছ্ ছোয়া-লিহা-তি আন্না লাহুম্ আজ্বরান্ হাসানা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.২ সরলরূপে, যাতে সে তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন আযাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সুসংবাদ দেয়, সেসব মুমিনকে, যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।

18.3 مَاكِثِينَ فِيهِ أَبَدًا
 আরবি উচ্চারণ ১৮.৩। মা-কিছীনা ফীহি আবাদা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.৩ তারা তাতে অনন্তকাল অবস্থান করবে।

 وَيُنْذِرَ الَّذِينَ قَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا18.4 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৪। অইয়ুন্যিরল্লাযীনা ক্ব-লুত্তাখযাল্লা-হু অলাদা-।
 বাংলা অনুবাদ ১৮.৪ আর যেন সতর্ক করে তাদেরকে, যারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন’।

 مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ وَلَا لِآبَائِهِمْ كَبُرَتْ كَلِمَةً تَخْرُجُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ إِنْ يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبًا 18.5 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৫। মা-লাহুম্ বিহী মিন্ ‘ইল্মিঁও অলা- লিআ-বা-য়িহিম্; কাবুরত্ কালিমাতান্ তাখ্রুজু মিন্ আফ্ওয়া-হিহিম্; ইঁইয়াকু লূনা ইল্লা-কাযিবা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.৫ এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরও না। বড় মারাত্মক কথা, যা তাদের মুখ থেকে বের হয়। মিথ্যা ছাড়া তারা কিছুই বলে না!

 فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِنْ لَمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا18.6 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৬। ফালা‘আল্লাকা বা-খি‘উন্নাফ্সাকা ‘আলা য় আ-ছা-রিহিম্ ইল্ লাম্ ইয়ুমিনূ বিহা-যাল্ হাদীছি আসাফা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.৬ হয়তো তুমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজকে শেষ করে দেবে, যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান না আনে।

 إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا18.7 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৭। ইন্না- জ্বা‘আল্না-মা- ‘আলাল্ র্আদ্বি যীনাতাল্লাহা-লিনাব্লুঅহুম্ আইয়্যুহুম্ আহ্সানু ‘আমালা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.৭ নিশ্চয় যমীনের উপর যা রয়েছে, তা আমি শোভা করেছি তার জন্য, যাতে তাদেরকে পরীক্ষা করি যে, কর্মে তাদের মধ্যে কে উত্তম।

 وَإِنَّا لَجَاعِلُونَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا18.8 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৮। অইন্না-লাজ্বা-‘ইলূনা মা-‘আলাইহা-ছোয়া‘ঈদান্ জুরুযা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.৮ আর নিশ্চয় তার উপর যা রয়েছে তাকে আমি উদ্ভিদহীন শুষ্ক মাটিতে পরিণত করব।

 أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا18.9 
আরবি উচ্চারণ ১৮.৯। আম্ হাসিব্তা আন্না আছ্হা-বাল্ ক্বহ্ফি র্অরক্বীমি কা-নূ মিন্ আ-ইয়া-তিনা- ‘আজ্বাবা-
বাংলা অনুবাদ ১৮.৯ তুমি কি মনে করেছ যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা ছিল আমার আয়াতসমূহের এক বিস্ময়?

 إِذْ أَوَى الْفِتْيَةُ إِلَى الْكَهْفِ فَقَالُوا رَبَّنَا آتِنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا18.10 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১০। ইয্ আওয়াল্ ফিত্ইয়াতু ইলাল্ কাহ্ফি ফাক্ব-লূ রব্বানা য় আ-তিনা-মিল্লাদুন্কা রাহ্মাতাঁও অহাইয়ি লানা- মিন্ আম্রিনা- রশাদা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১০ যখন যুবকরা গুহায় আশ্রয় নিল অতঃপর বলল, ‘হে আমদের রব, আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দিন এবং আমাদের জন্য আমাদের কর্মকাণ্ড সঠিক করে দিন’।

 فَضَرَبْنَا عَلَى آذَانِهِمْ فِي الْكَهْفِ سِنِينَ عَدَدًا 18.11 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১১। ফাদ্বোয়ারব্না-‘আলা য় আ-যা- নিহিম্ ফিল্ কাহ্ফি সিনীনা ‘আদাদা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.১১ ফলে আমি গুহায় তাদের কান বন্ধ করে দিলাম অনেক বছরের জন্য।

ثُمَّ بَعَثْنَاهُمْ لِنَعْلَمَ أَيُّ الْحِزْبَيْنِ أَحْصَى لِمَا لَبِثُوا أَمَدًا18.12 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১২। ছুম্মা বা‘আছ্না-হুম্ লিনা’লামা আই ইয়ুল্ হিয্বাইনি আহ্ছোয়া-লিমা-লাবিছূ য় আমাদা-। বাংলা অনুবাদ ১৮.১২ তারপর আমি তাদেরকে জাগালাম, যাতে আমি জানতে পারি, যতটুকু সময় তারা অবস্থান করেছিল, দু’দলের মধ্যে কে তা অধিক নির্ণয়কারী।

 18.13نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ نَبَأَهُمْ بِالْحَقِّ إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৩। নাহ্নু নাকুছ্ছু ‘আলাইকা নাবায়াহুম্ বিল্হাক; ইন্নাহুম্ ফিত্ইয়াতুন্ আ-মানূ বিরব্বিহিম্ অযিদ্না-হুম্ হুদা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৩ আমিই তোমাকে তাদের সংবাদ সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। নিশ্চয় তারা কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

 وَرَبَطْنَا عَلَى قُلُوبِهِمْ إِذْ قَامُوا فَقَالُوا رَبُّنَا رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَنْ نَدْعُوَ مِنْ دُونِهِ إِلَهًا لَقَدْ قُلْنَا إِذًا شَطَطًا18.14 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৪। অ রবাত্বনা- ‘আলা-কুলূ বিহিম্ ইয্ ক্ব-মূ ফাক্ব-লূ রব্বুনা-রব্বুস্ সামা-ওয়া-তি অল্ র্আদ্বি লান্ নাদ্ব‘ঊঅ মিন্ দূনিহী য় ইলা-হাল্ লাক্বদ্ কুল্না য় ইযান্ শাত্বোয়াত্বোয়া-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৪ যখন তারা উঠেছিল, আমি তাদের অন্তরকে দৃঢ় করেছিলাম। তখন তারা বলল, ‘আমাদের রব আসমানসমূহ ও যমীনের রব। তিনি ছাড়া কোন ইলাহকে আমরা কখনো ডাকব না। (যদি ডাকি) তাহলে নিশ্চয় আমরা গর্হিত কথা বলব’।

 هَؤُلَاءِ قَوْمُنَا اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ آلِهَةً لَوْلَا يَأْتُونَ عَلَيْهِمْ بِسُلْطَانٍ بَيِّنٍ فَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا 18.15 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৫। হা য় উলা -য়ি ক্বওমুনাত্তাখাযূ মিন্ দূনিহী য়আ-লিহাহ্; লাওলা- ইয়াতূনা ‘আলাইহিম্ বিসুল্ত্বোয়া-নিম্ বাইয়িনিন্; ফামান্ আজ্লামু মিম্মানিফ্তার- ‘আলাল্লা-হি কাযিবা-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৫ এরা আমাদের কওম, তারা তাঁকে ছাড়া অন্যান্য উপাস্য গ্রহণ করেছে। কেন তারা তাদের ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না? অতএব যে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা রটায়, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে? 

18.16 وَإِذِ اعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ فَأْوُوا إِلَى الْكَهْفِ يَنْشُرْ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ رَحْمَتِهِ وَيُهَيِّئْ لَكُمْ مِنْ أَمْرِكُمْ مِرفَقًا
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৬। অ ইযি তাযাল্তুমূহুম্ অমা-ইয়া’বুদূনা ইল্লাল্লা-হা ফায়ূ য় ইলাল্ কাহ্ফি ইয়ার্ন্শু লাকুম্ রব্বুকুম্ র্মি রহ্মাতিহী অ ইয়ুহাইয়িয়ে; লাকুম্ মিন্ আম্রিকুম্ র্মিফাক্ব-। 
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৬ আর যখন তোমরা তাদের থেকে আলাদা হয়েছ এবং আল্লাহ ছাড়া যাদের তারা উপাসনা করে তাদের থেকেও, তখন গুহায় আশ্রয় নাও। তাহলে তোমাদের রব তোমাদের জন্য তার রহমত উন্মুক্ত করে দেবেন এবং তোমাদের জন্য তোমাদের জীবনোপকরণের বিষয়টি সহজ করে দেবেন।

18.17 وَتَرَى الشَّمْسَ إِذَا طَلَعَتْ تَزَاوَرُ عَنْ كَهْفِهِمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَإِذَا غَرَبَتْ تَقْرِضُهُمْ ذَاتَ الشِّمَالِ وَهُمْ فِي فَجْوَةٍ مِنْهُ ذَلِكَ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ مَنْ يَهْدِ اللَّهُ فَهُوَ الْمُهْتَدِي وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ وَلِيًّا مُرْشِدًا
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৭। অতারা শ্ শাম্সা ইযা- ত্বোয়ালা‘আত্ তাযা-অরু ‘আন্ কাহ্ফিহিম্ যা-তাল্ ইয়ামীনি অ ইযা-গরবাত্ তাকরিদ্বুহুম্ যা-তাশ্ শিমা-লি অহুম্ ফী ফাজ্বঅতিম্ মিন্হু যা-লিকা মিন্ আ-ইয়া-তিল্লা-হ্; মাইইঁয়াহ্দিল্লা-হু ফাহুওয়াল্ মুহ্তাদি অমাই ইঁয়ুদ্ব্লিল্ ফালান্ তাজ্বিদা লাহূ অলিয়্যার্ম্মুশিদা-।

বাংলা অনুবাদ ১৮.১৭ আর তুমি দেখতে পেতে, সূর্য উদিত হলে তাদের গুহার ডানে তা হেলে পড়ছে, আর অস্ত গেলে তাদেরকে বামে রেখে কেটে যাচ্ছে, তখন তারা ছিল তার আঙিনায়। এগুলো আল্লাহর আয়াতসমূহের কিছু। আল্লাহ যাকে হিদায়াত দেন, সে হেদায়াতপ্রাপ্ত। আর যাকে ভ্রষ্ট করেন, তুমি তার জন্য পথনির্দেশকারী কোন অভিভাবক পাবে না।

18.18 وَتَحْسَبُهُمْ أَيْقَاظًا وَهُمْ رُقُودٌ وَنُقَلِّبُهُمْ ذَاتَ الْيَمِينِ وَذَاتَ الشِّمَالِ وَكَلْبُهُمْ بَاسِطٌ ذِرَاعَيْهِ بِالْوَصِيدِ لَوِ اطَّلَعْتَ عَلَيْهِمْ لَوَلَّيْتَ مِنْهُمْ فِرَارًا وَلَمُلِئْتَ مِنْهُمْ رُعْبًا
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৮। অতাহ্সাবুহুম্ আইক্ব-জোয়াঁও অহুম্ রুকুদুঁও অ নুক্বল্লিবুহুম্ যা-তাল্ ইয়ামীনি অযা-তাশ্ শিমা-লি অকাল্বুহুম্ বা-সিত্বুন্ যির-‘আইহি বিল্অছীদ্; লাওয়িত্ত্ব ত্বোয়ালা’তা ‘আলাইহিম্ লাওয়াল্লাইতা মিন্হুম্ ফির-রঁও অলামুলিতা মিন্হুম্ রু’বা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৮ তুমি তাদেরকে মনে করতে জাগ্রত, অথচ তারা ছিল ঘুমন্ত, আমি তাদেরকে পাশ পরিবর্তন করাচ্ছি ডানে ও বামে এবং তাদের কুকুরটি আঙিনায় তার সামনের দু’পা বাড়িয়ে আছে। যদি তুমি তাদেরকে উঁকি মেরে দেখতে, তবে নিশ্চয় তাদের থেকে পেছনে ফিরে পালিয়ে যেতে এবং অবশ্যই তাদের কারণে ভীষণ ভীত হতে।

18.19 وَكَذَلِكَ بَعَثْنَاهُمْ لِيَتَسَاءَلُوا بَيْنَهُمْ قَالَ قَائِلٌ مِنْهُمْ كَمْ لَبِثْتُمْ قَالُوا لَبِثْنَا يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ قَالُوا رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَا لَبِثْتُمْ فَابْعَثُوا أَحَدَكُمْ بِوَرِقِكُمْ هَذِهِ إِلَى الْمَدِينَةِ فَلْيَنْظُرْ أَيُّهَا أَزْكَى طَعَامًا فَلْيَأْتِكُمْ بِرِزْقٍ مِنْهُ وَلْيَتَلَطَّفْ وَلَا يُشْعِرَنَّ بِكُمْ أَحَدًا 
আরবি উচ্চারণ ১৮.১৯। অ কাযা-লিকা বা‘আছ্না-হুম্ লিইয়াতাসা-য়ালূ বাইনাহুম্; ক্ব-লা ক্ব-য়িলুম্ মিন্হুম্ কাম্ লাবিছ্তুম্ ; ক্ব-লূ লাবিছ্না-ইয়াওমান্ আও বা’দ্বোয়া ইয়াওম্; ক্ব-লূ রব্বুকুম্ আ’লামু বিমা-লাবিছ্তুম্; ফাব্আছূ য় আহাদাকুম্ বিওয়ারিক্বিকুম্ হা-যিহী য় ইলাল্ মাদীনাতি ফাল্ইয়ার্ন্জু আই ইয়ুহা য় আয্কা-ত্বোয়া‘আ-মান্ ফাল্ইয়াতিকুম্ বিরিয্ক্বিম্ মিন্হু অল্ইয়াতালাত্ত্বোয়াফ্ অলা-ইয়ুশ্‘ইরান্না বিকুম্ আহাদা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.১৯ আর এমনিভাবে আমি তাদেরকে জাগিয়ে তুলেছিলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসা করে। তাদের একজন বলল, ‘তোমরা কতক্ষণ অবস্থান করলে’? তারা বলল, ‘আমরা একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করেছি। তারা বলল, ‘তোমরা কতক্ষণ অবস্থান করেছ, সে ব্যাপারে তোমাদের রবই অধিক জানেন। তাই তোমরা তোমাদের কাউকে তোমাদের এই রৌপ্যমুদ্রাগুলো দিয়ে শহরে পাঠাও। অতঃপর সে যেন দেখে শহরের কোন্ খাবার একেবারে ভেজালমুক্ত, তখন সে যেন তোমাদের জন্য তা থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসে। আর সে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করবে এবং কাউকে যেন তোমাদের ব্যাপারে না জানায়’।

إِنَّهُمْ إِنْ يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ يَرْجُمُوكُمْ أَوْ يُعِيدُوكُمْ فِي مِلَّتِهِمْ وَلَنْ تُفْلِحُوا إِذًا أَبَدً 18.20 
আরবি উচ্চারণ ১৮.২০। ইন্নাহুম্ ইঁ ইয়াজ্হারূ ‘আলাইকুম্ ইর্য়াজুমূকুম্ আও ইয়ু‘ঈ দূকুম্ ফী মিল্লাতিহিম্ অলান্ তুফ্লিহূ য় ইযান্ আবাদা। বাংলা অনুবাদ ১৮.২০ ‘নিশ্চয় তারা যদি তোমাদের ব্যাপারে জেনে যায়, তাহলে তারা তোমাদেরকে পাথর মেরে হত্যা করবে অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আর তখন তোমরা কোনভাবেই সফল হবে না’।

18.21 وَكَذَلِكَ أَعْثَرْنَا عَلَيْهِمْ لِيَعْلَمُوا أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَأَنَّ السَّاعَةَ لَا رَيْبَ فِيهَا إِذْ يَتَنَازَعُونَ بَيْنَهُمْ أَمْرَهُمْ فَقَالُوا ابْنُوا عَلَيْهِمْ بُنْيَانًا رَبُّهُمْ أَعْلَمُ بِهِمْ قَالَ الَّذِينَ غَلَبُوا عَلَى أَمْرِهِمْ لَنَتَّخِذَنَّ عَلَيْهِمْ مَسْجِدًا
আরবি উচ্চারণ ১৮.২১। অ কাযা-লিকা আ’র্ছানা-‘আলাইহিম্ লিইয়া’লামূ য় আন্না অ’দাল্লা-হি হাককুঁও অআন্নাস্সা-‘আতা লা-রইবা ফীহা-ইয্ ইয়াতানা-যা‘ঊনা বাইনাহুম্ আম্রহুম্ ফাক্ব-লুব্নূ ‘আলাইহিম্ বুন্ইয়া-না-; রব্বুহুম্ আ’লামু বিহিম্ ; ক্ব-লাল্লাযীনা গলাবূ ‘আলা য় আম্রিহিম্ লানাত্তাখিযান্না ‘আলাইহিম্ মাস্জ্বিদা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.২১ আর এমনিভাবে আমি তাদের ব্যাপারে (লোকদেরকে) জানিয়ে দিলাম, যাতে তারা জানতে পারে যে, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামতের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যখন তারা নিজদের মধ্যে তাদের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক করছিল, তখন তারা বলল, ‘তাদের উপর তোমরা একটি ভবন নির্মাণ কর’। তাদের রবই তাদের ব্যাপারে অধিক জ্ঞাত। যারা গুহাবাসীদের উপর প্রাধান্য লাভ করেছিল, তারা বলল, ‘আমরা অবশ্যই তাদের উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করব’।

18.22  سَيَقُولُونَ ثَلَاثَةٌ رَابِعُهُمْ كَلْبُهُمْ وَيَقُولُونَ خَمْسَةٌ سَادِسُهُمْ كَلْبُهُمْ رَجْمًا بِالْغَيْبِ وَيَقُولُونَ سَبْعَةٌ وَثَامِنُهُمْ كَلْبُهُمْ قُلْ رَبِّي أَعْلَمُ بِعِدَّتِهِمْ مَا يَعْلَمُهُمْ إِلَّا قَلِيلٌ فَلَا تُمَارِ فِيهِمْ إِلَّا مِرَاءً ظَاهِرًا وَلَا تَسْتَفْتِ فِيهِمْ مِنْهُمْ أَحَدًا
আরবি উচ্চারণ ১৮.২২। সাইয়াকুলূনা ছালা-ছার্তু র-বি‘ঊহুম্ কাল্বুহুম্ অইয়াকু লূনা খাম্সাতুন্ সাদিসুহুম্ কাল্বুহুম্্ রাজ্বমাম্ বিল্গইবি অ ইয়াকুলূনা সাব্‘আতুঁও অ ছা-মিনুহুম্ কাল্বুহুম্; ক্বর্ ু রব্বী য় আ’লামু বি‘ইদ্দাতিহিম্ মা-ইয়া’লামুহুম্ ইল্লা-ক্বলীল্; ফালা-তুমা-রি ফীহিম্ ইল্লা-মির-য়ান্ জোয়া-হিরঁও অলা-তাস্তাফ্তি ফীহিম্ মিন্হুম্ আহাদা-।
বাংলা অনুবাদ ১৮.২২ বিতর্ককারীরা বলবে, ‘তারা ছিল তিন জন, চতুর্থ হল তাদের কুকুর’। আর কতক বলবে, ‘তারা ছিল পাঁচজন, ষষ্ঠ হল তাদের কুকুর’। এসবই অজানা বিষয়ে অনুমান করে। আর কেউ কেউ বলবে, ‘তারা ছিল সাত জন; অষ্টম হল তাদের কুকুর’। বল, ‘আমার রবই তাদের সংখ্যা সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত’। কম সংখ্যক লোকই তাদেরকে জানে। সুতরাং স্পষ্ট আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের ব্যাপারে বিতর্ক করো না। আর তাদের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে কারো কাছে জানতে চেয়ো না।


সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০

সূরা আল-কোরাইশ

সোমবার, জানুয়ারি ২০, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু


বাংলা উচ্চারনঃ
১.লিঈলা-ফি কুরইশিন্।
২.ঈলা ফিহিম রিহ লাতাশশিতা ইওয়াসসাইফ।
৩.ফাল্ইয়া’বুদূ রব্বাহা-যাল্ বাইতি।
৪. আল্লাযি আত আ'মাহুম মিন যু'ঈ। ওয়া আমানাহুম মিন খাউফ।  

بِسمِ اللَّهِ الرَّحمٰنِ الرَّحيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু
[1] কোরাইশের আসক্তির কারণে
[1] (It is a great Grace and protection from
Allâh), for the taming of the Quraish
[2] আসক্তির কারণে তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের।
[2] (And with all those Allâh's Grace and Protections for their taming, We cause) the (Quraish) caravans to set forth safe in winter (to the south), and in summer (to the north without any fear)
[3] অতএব তারা যেন এবাদত করে এই ঘরের পালনকর্তার
[3] So let them worship (Allâh) the Lord of this House (the Ka'bah in Makkah).
[4] যিনি তাদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন এবং যুদ্ধভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।
[4] (He) Who has fed them against hunger, and has made them safe from fear.





হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) এর জীবনী

সোমবার, জানুয়ারি ২০, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) জীবনী ও ঘটনা
হযরত আলী (রাঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) মুহাম্মাদ (সঃ) এর চাচাত ভাই ও জামাতা এবং চতুর্থ খলীফা । তাঁহার পিতা আবু তালিব ছিলেন আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিমের পুত্র । আলী (রাঃ) এর ডাক নাম আবু তুরাব, হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর নিকট হইতে প্রাপ্ত । তিনি হযরত (সঃ) এর কন্যা ফাতিমা (রাঃ) কে বিবাহ করেন । তাঁহার মাতার নাম ফাতেমা বিনতে আসাদ ইবন হাশিম । ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁহার বয়স কত ছিল তাহা সঠিকরূপে নির্ধারন করা যায় না । হযরত খাদীজা (রাঃ) এর পরে তিনি প্রথম মুসলিম; আবুযার, আল মিকদাদ, আবু সাইদ আল খুদরী (রাঃ) প্রমুখের মতে বুরায়দা ইবনিল হুসায়ব (রাঃ) অথবা তিনি দ্বিতীয় মুসলিম । হযরত (সঃ) যে দশজনকে জান্নাতে প্রবেশ লাভ করিবেন বলিয়া স্পষ্টভাবে সুসংবাদ প্রদান করেন, তিনি তাহাদের অন্যতম । উমার (রাঃ) কর্তৃক তাঁহার মৃত্যুশয্যায় মনোনীত ছয়জন নির্বাচকেরও তিনি ছিলেন অন্যতম ।
হযরত আলী (রাঃ) এর বয়ছ ছিল তখন প্রায় বাইশ বছর । আল্লাহ্‌ তা~আলার নির্দেশে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ইয়াছরিবে হিজরত করার শেষ রাতে শত্রুদের চোখের সামনে দিয়া নিরাপদে গৃহ ত্যাগ করিলেন । যাবার সময় হযরত আলী (রাঃ) কে আমানতের গচ্ছিত সম্পদ প্রদানের দায়িত্ব দিয়া গেলেন । প্রত্যুষে শত্রুপক্ষ দেখিল, রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর বিছানায় শেরে খোদা হযরত আলী (রাঃ) নিশ্চিন্ত মনে শুইয়া আছে ।
হিজরাতের দ্বিতীয় বর্ষে হযরত (সঃ) এর প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রাঃ) এর সহিত আলী (রাঃ) এর বিবাহ সম্পন্ন হয় । বিবাহের সময় হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর বয়স ছিল ১৪ বছর এবং হযরত আলী (রাঃ) এর বয়স ছিল ২২ বছর । (তাবাকাতে ইবনে সা~দ, এসাবা, খোলাফায়ে রাশেদিন) । তিনি বদর, উহুদ ও খন্দক(পরিখা) এর যুদ্ধে যোগদান এবং তাবূক ছাড়া অন্য সমস্ত অভিযানে হযরত (সঃ) এর সঙ্গে গমন করেন । তাবূক অভিযানের সময় হযরত (সঃ) এর অনুপস্থিতিতে তাঁহার পরিবার-বর্গের তত্ত্বাবধান এবং মদিনার শাসনভার তাঁহার উপর ন্যস্ত ছিল । উহুদের যুদ্ধে তিনি ষোলটি আঘাতপ্রাপ্ত হন; তাঁহার প্রচণ্ড আক্রমণে খায়বারের দুর্জয় কা~মূস দূর্গের পতন ঘটে ।
হযরত (সঃ) এর উপর নবম সূরা (আল বারা~আঃ বা আত-তাওবা) অবতীর্ন হওয়ার অল্প পরে উহার প্রথম তেরটি আয়াত হাজ্জের সময় মিনা প্রান্তরে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করার জন্য হযরত (সঃ) তাহাকে প্রেরণ করেন । দশম হিজরি, মুতাবিক ৬৩১-৩২ সনে আলী (রাঃ) ইয়ামানে এ প্রচার সফরে গমন করেন । ইহারই ফলে হামাদানীরা ইসলাম গ্রহণ করে । এ বছরই রাসুল (সঃ) হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কাশরীফ গমন করেন; হজ্জ হতে ফেরার পথে তিনি হযরত আলী (রাঃ) এর হাত ধরিয়া ফরমাইলেন ~আমি যাহার মওলা হই, ইনিও অর্থাৎ হযরত আলী (রাঃ)ও তাঁহার মওলা ।-
হিজরাতের বছরকে ইসলামী সনের প্রারম্ভ হিসাবে গ্রহণের জন্য আলী (রাঃ) ই উমার (রাঃ) কে পরামর্শ দেন । হযরত উছমান (রাঃ) এর ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রদেশসমূহ হইতে অভিযোগ আসিলে তাঁহার নিকট অভিযোগগুলি উত্থাপনের ভার আলী (রাঃ) এর উপর অর্পিত হয় । উছমান (রাঃ) এর সময়ে অরাজকতা দেখা দিলে আলী (রাঃ) খালীফা ও বিক্ষুব্ধদের মধ্যস্থের কাজ করেন । উছমান (রাঃ) এর গৃহ অবরোধের সময় আলী (রাঃ) তাঁহার আনুকূল্য প্রদর্শন করেন এবং তাঁহার নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন । উছমান (রাঃ) এর শহীদ হওয়ার পর তিনি খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব প্রথমে বিনীতভাবে অস্বীকার করেন, কিন্তু পাঁচ দিন পরে সাহাবীদের অনুরোধে সাহাবীদের অনুরোধে তাহা গ্রহণ করেন । ৩৫ হিজরির জুলহিজ্জা শুক্রবার (জুন ২৪, ৬৫৬) মদিনার মসজিদে সমবেত মুসলিমগণ খালীফা হিসাবে তাঁহার হাতে বায়া~ত করেন ।
খিলাফাত গ্রহণের পরেই সর্বপ্রথম তিনি হযরত উসমান গনী (রাঃ) এর হন্তাদের খোঁজ করেন । কিন্তু প্রকৃত হন্তার কোন সন্ধান পাইলেন না । হযরত আলী (রাঃ) উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন যে বনু উমাইয়াদের বিশৃঙ্খলার দরুনই ইসলামী খিলাফাত এমন গুরুতর পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছে । তাই তিনি উচ্চপদস্থ সকলকে একে একে রদবদল করিলেন । এই রদবদলে হযরত ওসমান ইবনে হানীফ (রাঃ) বসরার এবং হযরত সাহল (রাঃ) সিরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত হন ।
হযরত সাহল (রাঃ) সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হইলে তবুক নামক স্থানে আমীর মুআবিয়া (রাঃ) এর লোকদের দ্বারা বাঁধা প্রাপ্ত হন । আমীর মুআবিয়া (রাঃ) হযরত উসমান গনী (রাঃ) এর হত্যার প্রতিশোধ লইবার জন্য শর্ত জুড়িয়া দেন । এদিকে হযরত আলী (রাঃ) উসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদের সন্ধান না পাওয়ায় হযরত তালহা (রাঃ) এবং হযরত যুবাইর (রাঃ) অসন্তুষ্ট হইয়া মক্কায় চলিয়া গেলেন । এসময় হযরত আয়েশা (রাঃ) হজ্জ পালনে নিমিত্ত মক্কায় অবস্থান করিতেছিলেন । সিরিয়া ও কুফা ব্যতীত অন্যান্য স্থানে আলী (রাঃ) এর নিযুক্ত গভর্নরগণ সমর্থন পান । এই পরিস্থিতিতে হযরত আলী (রাঃ) বুঝিতে পারিলেন যে, যুদ্ধ ব্যতীত এই গুরুতর পরিস্থিতির মোকাবেলা করা সম্ভবপর হইবে না । হযরত আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে এই ফ্যাসাদ ও বিদ্রোহের পরিচালক মারওয়ান ইবনে হাকাম তখন মক্কায় অবস্থান করিতেছিলেন । মুআবিয়া (রাঃ) এর সমর্থকদের একটা বিরাট দলও তাঁহার সাথে ছিল । তাহারা মিলিয়া হযরত আয়েশা (রাঃ) কে হযরত আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতেছিল এবং তাহাকে বসরায় গিয়া হযরত তালহা (রাঃ) এর সমর্থকদের সঙ্গে লইয়া মদিনায় গমন করিতে উদ্বুদ্ধ করিলেন । হযরত আলী (রাঃ) বসরার এইরূপ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন । মদীনা হইতে বসরাভিমুখে যখন রওনা হন তখন সুযোগসন্ধানী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এবং তাঁহার সঙ্গীরা হযরত আলী (রাঃ) এর সৈন্যদলে যোগদান করেন । প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত কাকা (রাঃ) কে তিনি আয়েশা (রাঃ) প্রমুখের খেদমতে প্রেরণ করিয়া মতানৈক্য দূর করার প্রয়াস চালান । হযরত কাকা (রাঃ) যুক্তিসঙ্গত বিবৃতির মাধ্যমে তাহাদের মধ্যে মতভেদ দূর করিতে সমর্থ হন । কিন্তু রাত্রিকালে উভয় দলে উপস্থিত মুনাফিকেরা কুচক্র করিয়া একে অপরের উপর ঝাপাইয়া পড়িয়া যুদ্ধ সৃষ্টি করিল । হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ) উভয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করিয়া যুদ্ধ থামাইতে চেষ্টা চালাইতেছিলেন ।
যুদ্ধ চলাকালে একসময় হযরত আলী (রাঃ) অশ্বারোহণে হযরত যুবাইর (রাঃ) এর কাছে আসিয়া ফরমাইলেন, ‘হে আবু আব্দুল্লাহ তুমি রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সম্মুখে এই কথা বলিয়াছিলে যে, আমি হযরত আলীকে ভালবাসি~। এতদুত্তরে রসুলুল্লাহ (সঃ) ফরমাইয়াছিলেনঃ ~তুমি একদিন অনর্থক আলীর সহিত যুদ্ধ করিবে । ~ কথাটা তোমার স্মরণ আছে কি?~
হযরত যুবাইর (রাঃ) কথাটা শ্রবণ করামাত্রই চমকিয়া উঠিলেন এবং রণক্ষেত্র ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন এবং সেবাহ্‌ নামক ময়দানে গিয়া নামাজ পড়িতে লাগিলেন । কিন্তু আমর ইবনে জরমুয নামক জনৈক সাবাঈ তাহাকে নামাজরত অবস্থায় তরবারি দ্বারা শহীদ করিল । হযরত আলী (রাঃ) যুবাইর (রাঃ) এর মস্তক দেখামাত্রই ক্রন্দন করিলেন এবং বলিলেন ‘ইহা সেই যুবাইরের মস্তক, যাহার তরবারি দীর্ঘকাল ধরিয়া রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর হেফাজত করিয়াছে । হে যুবাইরের হত্যাকারী আমি তোমকে জাহান্নামের সুসংবাদ জানাইতেছি ।- হত্যার পুরস্কার না পাইয়া ক্ষোভে অস্থির ইবনে জরমুয নিজের বুকে আপন তলোয়ার ঢুকাইয়া আত্নহত্যা করিল । এইভাবে হযরত আলী (রাঃ) তাহাকে যে সুসংবাদ জানাইয়াছিলেন তা সত্যে পরিণত হইল ।
অতঃপর আলী (রাঃ) উম্মুল মোমেনীন হজর আয়েশা (রঃ) এর খেদমতে হাযির হইলেন এবং কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিলেন । উভয়পক্ষের ভুল বুঝাবুঝির উপর অনুতাপ প্রকাশ করা হইল ।
এই যুদ্ধের নাম জঙ্গে জামাল । জামাল অর্থ উট । আয়েশা (রাঃ) এর উট ব্যবহার করিয়া মোনাফিকেরা যুদ্ধ চালাইয়া যাইতেছিল । যখন এই উট বসিয়া পড়িল যুদ্ধও ক্ষান্ত হইল । মুনাফিকেরা পলায়ন করিল ।
জঙ্গে জামালে আলী (রাঃ) জয়ী হবার পর আমীর মুআবিয়া (রাঃ) বুঝিতে পারিলেন যে আলী (রাঃ) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভবপর হইবে না । তাই শোরাহবিল ইবনে সামাত (রাঃ) এর সহযগীতায় তিনি সিরিয়াব্যাপী ব্যাপক সমর্থন আদায় করিবারা প্রয়াস করিলেন । ওসমান (রাঃ) এর রক্তমাখা জামা এবং তৎপত্নী নায়েলা (রাঃ) এর কাটা অঙ্গুলি [ যাহা ওসমান (রাঃ) কে রক্ষা করার চেষ্টায় কাটা গিয়াছিল ] এই দুইটি জিনিস জনসাধারণকে উত্তেজিত করতে ব্যবহার করা হইয়াছিল ।
এদিকে আমীর মুআবিয়া (রাঃ) এর প্রভাব হ্রাস এবং রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর স্মৃতিবিজড়িত শহর মদিনাকে আক্রমণ থেকে হেফাজতের উদ্দেশ্যে আলী (রাঃ) মদীনা থেকে রাজধানী কুফায় স্থানান্তর করিলেন ।
হযরত আলী (রাঃ) মুআবিয়া (রাঃ) এর সৈন্যদলকে ভয় করিতেন না; কিন্তু মুসলমানদের মধ্যে হানাহানি তিনি পছন্দ করিলেন না । তাই মুআবিয়া (রাঃ) এর নিকট সন্ধিপত্র পাঠাইয়া দিলেন এই মর্মে যে তিনি উসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদের বিচার করিবেন তবে এই জন্য আলী (রাঃ) এর বাইয়াত গ্রহণ করা জরুরী । কারন হযরত আলী (রাঃ) মুহাজির ও আনসারগণের দ্বারাই খলিফা নির্বাচিত হইয়াছেন । জবাবে মুআবিয়া (রাঃ) লিখিলেন, ‘আমরা আপনার হাতে বাইয়াত করিতে অস্বীকার করিতেছি না এবং আপনার যোগ্যতাও অস্বীকার করি না, তবে একটা শর্ত আছে এবং উহা এই যে, হযরত উসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদেরকে আমাদের হাতে অর্পন করিতে হইবে ।~
হজরত আলী (রাঃ) পুনরায় চিঠিতে মতৈক্যে পোছাতে আমীর মুআবিয়া (রাঃ) এবং তাঁর উপদেষ্টা আমর ইবনুল আ~সকে নির্দেশ দিলেন; অন্যথায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হইবে এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হইবে ।
এই চিঠির পরো কোন ধরনের মতৈক্যে পৌঁছা সম্ভবপর হয় নি । বাধ্য হইয়া হিজরি ৩৬ সালের শেষভাগে হযরত আলী (রাঃ) আশি হাজার সৈন্য লইয়া আমীর মুআবিয়ার মোকাবেলার জন্য রওনা হইলেন এবং ফোরাত নদীর তীরে সিফফফীন নামক স্থানে গিয়া অবস্থান করিলেন ।
এদিকে আমীর মুআবিয়ার সৈন্যগণ আগেই ফোরাত অধিকার করিয়া রাখিয়াছিলেন । তাহারা আলী (রাঃ) এর সৈন্যদের পানি ব্যাবহার করিতে দিত না । ফলে পানি লইয়া যুদ্ধ লাগিয়া গেল । এই যুদ্ধ সিফফিনের যুদ্ধ নামে পরিচিত । মুআবিয়া (রাঃ) এর সৈন্যগণ পলায়ন করিলেন । কিন্তু ফোরাতের পানি অধিকারে আসার পর হাসেমীগন এই পানি পানে কাউকে বাঁধা প্রদান করেননি । কয়েক মাসব্যাপী বারংবার এই যুদ্ধ চলে । উভয়পক্ষের অনেক সৈন্য নিহত হইল । রণক্ষেত্র লাশে পরিপূর্ন হইয়া গেল । দীর্ঘ যুদ্ধের পর মুআবিয়া (রাঃ) এর সৈন্যদল ক্রমশঃ দূর্বল হইয়া পড়িল এবং পরাজয়ের আশঙ্কায় সন্ধিপ্রস্তাব হযরত আলী (রাঃ) কে পাঠাইলেন । হিজরি ৩৭ সনের রবিউল আউয়াল মাসে উভয়পক্ষ সন্ধিপত্রে সাক্ষর করিল এবং সিদ্ধান্ত হইল যে, বিচারকদের সিদ্ধান্ত ঘোষণার অনুষ্ঠান শাম ও ইরাকের মধ্যবর্তী এলাকা দুমাতুল জন্দল নামক স্থান অনুষ্ঠিত হইবে । দুইজন বিচারক হওয়ায় যা হইবার তাহাই হইল; রায়ের পরিণাম দুঃখজনক হইল । সন্ধির পরপর একদল বিপ্লবী সন্ধি ভাঙ্গিয়া পুনরায় যুদ্ধ আরম্ভ করিবার চেষ্টা করিল । কুটচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ায় আলী (রাঃ) এর দলত্যাগ করিল । ইতিহাসে তাহারা খারিজি বলে পরিচিত । ইহাদের অনেক আকিদা ইসলাম সঙ্গত ছিল না । তাহারা একত্রিত হইয়া নিরীহ মুসলমান নর-নারীকে নির্দয়ভাবে হত্যা করিয়া চলিল । অবশেষে তাহাদের দমনার্থে আলী (রাঃ) অগ্রসর হইলেন । মুসলমানদের হাতে তারা পরাজিত হইল । কিন্তু আলী (রাঃ) এর বাহিনী ক্রমশঃ দূর্বল হইয়া গেল ।
অপরদিকে আমীর মুআবিয়া (রাঃ) শক্তিশালী হইয়া হেজাজ, ইরাক ও মিশরে আধিপত্য বিস্তার করিতে লাগিলেন । তাঁহার হাতে মক্কা ও মদিনার পতন হইল । অতঃপর ইয়ামনে আক্রমণ করিলেন এবং বহু সাধারণ লোক নিহত হইল । এইরূপ অরাজকতায় খারিজিরা সুযোগ লইল । আব্দুর রহমান ইবনে মুজলেম ১৮ ই রমজান ফজরের নামাজ ইমামতীকালীন আলী (রাঃ) কে বিষমাখা তরবারি দ্বারা মাথায় আঘাত করিল । হযরত আলী (রাঃ) নামাজের মসল্লাতেই শুইয়া পড়িলেন । তিনদিন পর ২১ শে রমজানর রাত্রে এই এলেমের সূর্য অস্ত গেল ।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর কোলে যিনি লালিত-পালিত হইয়াছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর মুখে যিনি কোরআন পাক শ্রবণ করিয়াছেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছেই যিনি কুরআন শিক্ষা লাভ করিয়াছেন এবং বুঝিয়াছেন, তাঁহার এলম সম্পর্কে আর কাহার এলেমের তুলনা করা যাইতে পারে? রাসুলুল্লাহ (সঃ) ফরমাইয়াছেনঃ ~আমি এলেমের শহর এবং আলী উহার দরজা ।~ এই কাড়নের সাহাবীগণের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অন্যান্য সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ।
তিন মুসাফির ও আটটি রুটি
একবার দুই পথিক পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তাদের ক্ষুধাও লেগেছিল ভীষণ। খাওয়া-দাওয়া করার জন্য দু’জন মিলে একটা সুবিধাজনক জায়গায় গিয়ে বসে পড়লো। এরপর পুটলি থেকে বের করে নিলো যার যার খাবার। একজনের রয়েছে পাঁচটি রুটি। অন্য জনের তিনটি।
তারা যখন খাবার খাওয়ার জন্য তৈরি হলো তখন সেখানে এসে হাজির হলো এক মুসাফির। তার বেশভূষা একদম সাদাসিধে। সে বললো,ভাই আমি অভুক্ত। খুব ক্ষুধা লেগেছে। আমার কাছে কোনো খাবার নেই। তোমরা আমাকে কিছু খাবার দাও।
পথিক দু’জন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। মনে মনে ভাবলো, তারা দু’জন খাবে আর একজন মুসাফির না খেয়ে থাকবে, এ কেমন কথা? তারা মুসাফিরকে তাদের সঙ্গে খেতে বসার অনুরোধ করলো।
তিনজন একসঙ্গে খেতে বসলো। একজনের পাঁচ রুটি। অন্যজনের তিন রুটি। মুসাফিরের শূন্য হাত। তবু তারা রুটি বণ্টনে কোনো তারতম্য করলো না। তারা ভাবলো, কারো সঙ্গে খাবার না থাকতে পারে, কিন্তু ক্ষুধা তো আর কম লাগেনি। তাছাড়া এক সঙ্গে খেতে বসে একজন বেশি খাবে আর একজন কম খাবে, তাই বা কেমন করে হয়? তিনজন সমান সমান রুটি খেলো।
খাওয়া-দাওয়া শেষ- এবার বিদায়ের পালা। মুসাফির চলে যাবার সময় পথিক দু’জনকে আটটি দিরহাম বখশিস দিলো। বললো, ভাই, আমি শুধু তোমাদেরটাই খেলাম। তোমাদের কিছুই খাওয়াতে পারলাম না। এই নাও আটটি দিরহাম। তোমরা দু’জনে ভাগাভাগি করে নাও।
মুসাফির চলে গেল। কিন্তু সমস্যা বাঁধলো দিরহাম ভাগ করা নিয়ে। যার পাঁচটি রুটি সে বললো, আমার পাঁচটি রুটি ছিল। সুতরাং আমি পাবো পাঁচ দিরহাম। আর তোমার তিনটি রুটির জন্য পাবে তিন দিরহাম।
কিন্তু তিন রুটিওয়ালা এ হিসাব মানতে রাজি হলো না। সে বললো, না, আমি তোমার হিসাবে রাজি নই। আমরা দু’জন খেয়েছি সমান সমান। সুতরাং তুমি পাবে চার দিরহাম।
প্রথমজন বললো, তা কি করে হয়? তুমি তিন রুটির জন্য চার দিরহাম পাবে। আর আমি পাঁচ রুটির জন্য চার দিরহাম পাবো? এটা কি কোনো আইনের কথা হলো?
এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে বেঁধে গেল তর্ক। কারো কথায় কেউ রাজি নয়। কিছুতেই তারা মীমাংসায় আসতে পারছে না। অবশেষে একজন বললো, শোন এভাবে বিবাদ করে তো কোনো লাভ নেই। চলো,আমরা আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.)এর কাছে যাই। তিনি যে বিচার করেন, তাই আমরা মেনে নেবো।
এরপর দু’জন মিলে গেল হযরত আলীর কাছে। তারা সব কথা খুলে বলে ন্যায় বিচারের জন্য ফরিয়াদ জানালো। হযরত আলী মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনলেন। কিছুক্ষণ তিনি মনে মনে কি যেন ভাবলেন। পরে বললেন, তিনজনে সমান খেয়েছো তো?
উভয়ে ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
হযরত আলী বললেন, তা হলে এ নিয়ে এত বিবাদ কিসের? হিসাব তো একেবারে পানির মতো সোজা। যার পাঁচটি রুটি সে পাবে সাত দিরহাম। যার তিনটি রুটি সে পাবে এক দিরহাম।
এমন হিসাবের কথা শুনে দুজনেই অবাক হয়ে গেল! সাত দিরহাম আর এক দিরহাম ভাগ হলো কোন হিসাবে তারা কিছুতেই বুঝতে পারল না। হিসাব বুঝতে না পেরে দু’জনই হা করে তাকিয়ে রইল হযরত আলীর দিকে। ইমাম আলী তাদের মনের কথা বুঝতে পারলেন। তিনি বললেন, তোমরা ছিলে তিনজন। রুটি আটটি। খেয়েছ সমান সমান। একেকটি রুটিকে তিন টুকরো করলে আটটি রুটি চব্বিশ টুকরো হয়। সুতরাং তোমরা একেক জন খেয়েছ আটটি করে টুকরা। মুসাফির লোকটা আট টুকরোর জন্য আট দিরহাম দিয়েছে।
হযরত আলী বললেন, এবার আসা যাক, কে কতটুকু পাবে সে হিসাবে। দ্বিতীয় জনের তিনটি রুটিতে নয় টুকরো হয়েছে। নয় টুকরোর আট টুকরো সে নিজে খেয়েছে। মাত্র এক টুকরো পড়েছে মুসাফিরের ভাগে। সুতরাং সে এক দিরহামের বেশি কিছুতেই পেতে পারে না। আর একজনের পাঁচ রুটিতে হয়েছে পনেরোটি টুকরো। তার মধ্যে সে নিজে খেয়েছে আট টুকরো। বাকি সাত টুকরো খেয়েছে মুসাফির। সুতরাং সে পাবে সাত দিরহাম।
হযরত আলীর হিসাবের কথা শুনে পথিক দু’জন বিস্মিত হলো। তাঁর বিচার বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে দারুণভাবে মুগ্ধ হলো। তারা আর কোনো ওজর আপত্তি না করে নীরবে মেনে নিলো বিচারের রায়।
হযরত আলী (রাঃ) ও কাযী শুরাইহের ন্যায়বিচার
হযরত আলী(রা) একবার তাঁর অতিপ্রিয় বর্ম হারিয়ে ফেললেন। কিছুদিন পর জনৈক ইহুদীর হাতে সেটি দেখেই চিনে ফেললেন। লোকটি কুফার বাজারে সেটি বিক্রয় করতে এনেছিল। হযরত আলী তাকে বললেনঃ “এতো আমার বর্ম।
আমার একটি উটের পিঠ থেকে এটি অমুক রাত্রে অমুক জায়গায় পড়ে গিয়েছিল।”
ইহুদী বললোঃ “আমীরুল মুমিনীন! ওটা আমার বর্ম এবং আমার দখলেই রয়েছে।”
হযরত আলী পুনরায় বললেনঃ “এটি আমারই বর্ম। আমি এটাকে কাউকে দানও করি নি, কারো কাছে বিক্রয়ও করি নি। এটি তোমার হাতে কিভাবে গেল?”
ইহুদী বললোঃ “চলুন, কাযীর দরবারে যাওয়া যাক।”
হযরত আলী(রা) বললেনঃ “বেশ, তাই হোক। চলো।” তারা উভয়ে গেলেন বিচারপতি শুরাইহের দরবারে। বিচারপতি শুরাইহ উভয়ের বক্তব্য জানতে চাইলে উভয়ে বর্মটি নিজের বলে যথারীতি দাবী জানালেন।
বিচারপতি খলিফাকে সম্বোধন করে বললেনঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আপনাকে দু’জন সাক্ষী উপস্থিত করতে হবে। হযরত আলী বললেনঃ “আমার ভৃত্য কিম্বার এবং ছেলে হাসান সাক্ষী আছে।”
শুরাইহ বললেনঃ “আপনার ভৃত্যের সাক্ষ্য নিতে পারি। কিন্তু ছেলের সাক্ষ্য নিতে পারবো না। কেননা বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য শরীয়তের আইনে অচল।”
হযরত আলী বললেনঃ “বলেন কি আপনি? একজন বেহেশতবাসীর সাক্ষ্য চলবে না? আপনি কি শোনেন নি, রাসূল(সা) বলেছেন, হাসান ও হোসেন বেহেশতের যুবকদের নেতা?”
শুরাইহ বললেনঃ “শুনেছি আমিরুল মু’মিনীন! তবু আমি বাপের জন্য ছেলের সাক্ষ্য গ্রহণ করবো না।”
অনন্যোপায় হযরত আলী ইহুদীকে বললেনঃ “ঠিক আছে। বর্মটা তুমিই নিয়ে নাও। আমার কাছে এই দু’জন ছাড়া আর কোনো সাক্ষী নেই।”
ইহুদী তৎক্ষণাৎ বললোঃ “আমিরুল মু’মিনীন! আমি স্বয়ং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ওটা আপনারই বর্ম। কি আশ্চর্য! মুসলমানদের খলিফা আমাকে কাজীর দরবারে হাজির করে আর সেই কাযী খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেয়। এমন সত্য ও ন্যায়ের ব্যবস্থা যে ধর্মে রয়েছে আমি সেই ইসলামকে গ্রহণ করেছি। আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু………..।”
অতঃপর বিচারপতি শুরাইহকে সে জানালো যে, “খলিফা সিফফীন যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমি তাঁর পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। হঠাৎ তাঁর উটের পিঠ থেকে এই বর্মটি পড়ে গেলে আমি তা তুলে নিই।”
হযরত আলী(রা) বলেনঃ “বেশ! তুমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছ, তখন আমি ওটা তোমাকে উপহার দিলাম।”
এই লোকটি পরবর্তীকালে নাহরাওয়ানে হযরত আলীর নেতৃত্বে খারেজীদের সাথে যুদ্ধ করার সময় শহীদ হন।
মুসলিম জাহানের ৪র্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এর জীবনী
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নিজ হাতে গড়া শ্রেষ্ঠ মানব ও মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)। যিনি ছিলেন বহুমুখী সৌরভ ও অতুলনীয় সব গুণের অধিকারী এবং তিনি বারে বারে ইসলামকে দিয়েছে নব-জীবন এবং টিকিয়ে রেখেছিলেন ইসলামের প্রকৃত প্রাণ ও চেতনা। এবার জেনে নিন, হযরত আলী (রা.) এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী।
নাম ও বংশ পরিচয়:
নাম আলী, পিতার নাম আবু তালিব, মাতার নাম: ফাতিমা বিনতে আসাদ। ৬০০ খৃষ্টাব্দে তিনি মক্কার বিখ্যাত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হযরত মুহাম্মদ সা. এর চাচাত ভাই। তার ডাক নাম আবু তোরাব ও আবুল হাসান।
ইসলাম গ্রহণ ও মদীনায় গমন:
রাসূল সা. এর নবুওয়াতের শুরুতেই হযরত আলী রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন আলী রা. এর বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। বালকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল থাকলেও অসি ও মসি দ্বারা ইসলামের প্রচুর খিদমত করেছেন। তিনিও মাহানবীর সাথে কুরাইশদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। তিনিই সেই সৌভাগ্যবান সাহাবী আল্লাহর নবী হিজরত করার সময় যাকে মক্কায় তার আমানত আদায়ের জন্য রেখে যান। জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি নবীজির বিছানায় শুয়ে ছিলেন। আর সবাই তার এই নবীপ্রেম দেখে আশ্চর্য হলো। পরবর্তীতে তিনিও মদীনায় হিজরত করেন। তার আগে তিনি নবীজির কাছে সবার গচ্ছিত আমানত ও পাওনা মিটিয়ে দেন।
আদর্শ ও চরিত্র:
মুসলিম জাহানের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রা. আল্লাহ ও তার রাসূলের একনিষ্ট প্রেমিক ছিলেন। দৃঢ় বিশ্বাসী, রণক্ষেত্রে সাহসী, ব্যক্তিগত আচরণে নম্র, আলোচনা ও বিচারকার্যে ছিলেন সুবিজ্ঞ। নিজের ভিতর ইসলামী গুণাবলীর মহান আদর্শ তিনি স্থাপন করেছিলেন নিজের ভিতর। ছিলেন নবীর প্রায় প্রতিটি যুদ্ধে তার বিশ্বস্ত সঙ্গি। পূর্ববর্তী খলীফাদের সহৃদ পরামর্শদাতা। মোটকথা, তিনি ছিলেন নবীর আদর্শ ও চরিত্রের রঙ্গে পুরো রঙ্গিণ ছিলেন।
আলী রা. এর বিবাহ:
মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. হযরত আলী রা. এর সাথে নিজের আদরের কন্যা হযরত ফাতেমা রা. কে বিবাহ দেন। তাদের পরবর্তী দাম্পত্য জীবন ছিলো অত্যন্ত সুমধুর। হযরত ফাতেমার গর্ভে হাসান, হুাসাইন ও মুহসিন নামে তিনজন ছেলে এবং জয়নব ও উম্মে কলসুম নামে দুজন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। মুহসিন ছোটকালেই ইন্তেকাল করেন। পরবর্তীতে হাসান হুসাইনের দ্বারাই তাদের ব্বংশ বিস্তৃত হয়। আর তারাই ইতিহাসে সৈয়দ নামে পরিচিত।
হযরত আলী রা. এর জ্ঞানের গভীরতা:
আলী রা. ছিলেন অসাধারণ আল্লাহ প্রদত্ব জ্ঞানের অধিকারী। স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞান গরিমায় ভরপুর ছিলেন এই নবী জামাতা। কুরআন, হাদীস, কাব্য, দর্শণ ও আইনশাস্রে ছিল তার সর্বিক বিচরণ। নাহু শাস্রের প্রবক্তাও এই মুরতাযা। ছিলেন তাফসীরকারক। ফতোয়ার কাজও করতেন নবীর যামানায়। ওহি লিখকও ছিলেন এই খলীফা। লিখে শেষ করা যাবেনা তার জ্ঞান কীর্তি। কারণ নবী সা. নিজে বলেছেন, আমি জ্ঞানের নগরী আর আলী তার দরজা।
বীরত্ব ও সাহসিকতা:
ইসলামের জন্য হযরত আলী রা. এর অবদান ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তার সসীম শক্তি ও বীরত্বকে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত করেছিলেন। রাসূল সা. এর জীবনে প্রায় সব যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং প্রতিটি যুদ্ধে তিনি তার শৌর্যবির্যের পরিচয় দেন। বদরের যুদ্ধে তিনি মহানবী সা. এর পতাকা বহন করেন। এ যুদ্ধে তিনি কুরাইশদের বিখ্যাত বীর আমর ইবন আবুদ্দোজা কে পরাজিত ও নিহত করে। এ সময় বীরত্বের জন্য তিনি মহানবী সা. এর কাছ হতে জুলফিকার তরবারি লাভ করেছিলেন। এমনি ভাবে তিনি উহুদ, খন্দক, খায়বার যুদ্ধে শত্রুকে পরাজিত করে বিখ্যাত কামুস দূর্গ জয় করে অসাধারণ সৌর্য বীর্য প্রদর্শন করেন। তার বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে মহানবী সা. তাকে আসাদুল্লাহ বা আল্লাহর বাঘ উপাধিাতে ভূষিত করেন।
হযরত আলী রা. শাহাদাত:
বিদ্রোহী খারেজীগণ হযরত আলী মুআবিয়া ও আমর ইবনুল আস রা. কে ইসলামের শান্তি শৃঙ্খলা বিনাসের কারণ বলে দায়ী করে। তাই তারা এ তিনজনকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। সেমতে কুফা, দামেষ্ক ও ফুসতাত প্রত্যেকে নিজ নিজ মসজিদ হতে বের হওয়ার পথে তাদেরকে শেষ করে দেয়ার ইচ্ছা করে আততায়ীরা। সৌভাগ্যক্রমে আমর ইবনুল আস সেদিন অনুপস্থিত ছিলেন। মুআবিয়া রা. আততায়ীর হাতে আহত হলেও প্রাণে বেচে যায়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা! আবদুর ইবনে মুলজামের খঞ্জরের আঘাতে হযরত আলী রা. গুরুতর আহত হন। সেই আঘাতেই ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ জানুয়ারী তিনি শাহাদাত লাভ করেন। আর এই মাহান খলীফার মৃত্যুর সাথে সাথেই সীরাতে মুস্তাকীমের উপর প্রতিষ্ঠিত খোলাফায়ে রাশেদীনের পবিত্র খেলাফতের পরিসমাপ্তি ঘটে।
১ম অংশ
আলোর আবাবিল।
মসজিদে জাবিয়া।
একান্তে বসে কথা বলছেন আলোর পাখিরা। কথা বলছেন ইবন গানাম, আবু দারদা এব উবাদা ইবনে সামিত। তাঁরা কথা বলছেন ‘আল্লাহর দীন’ নিয়ে। ইসলাম নিয়ে। কথা বলছেন প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) কে নিয়ে। আরও কত প্রসঙ্গে!
তাঁরা কথা বলছেন আর একে অপারের দিকে মহব্বতের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে জড়িয়ে আছে ভ্রাতৃত্ববোধ, সৌহার্দ্য আর বন্ধুসুলভ-বৃষ্টিধোয়া জোছনার পেলব। তাঁরা মগ্ন হলেন একে অপরের প্রতি। নিজেদের কথার প্রতি। গভীল মনোযোগের সাথে তাঁরা শুনছেন পরস্পরের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা।
এমনি সময়-
ঠিক এমনি সময় তাদের মনোযোগ ভেদ করে সেখানে উপস্থিত হলেন আর এক বেহেশতী আবাবিল –হযরত শাদ্দাদ। শাদ্দাদ উপস্থিত! সুতরাং সবার দৃষ্টি এখন তাঁর দিকে। কারণ তিনিও যে তাঁদের ভাই! একান্ত আপনজন। সহোদর ভাইয়ের চেয়েও অনেক কাছের।
কেন নয়?
সবাই যে সেই রাসূল (সা)-এর একই স্নেহের ছায়ায় লালিত! যে রাসূল (সা)-কে ভালোবাসেন প্রাণের চেয়েও অনেক বেশি। শাদ্দাদ এসেছেন! তাঁর দিকেই সবার দৃষ্টি। সম্ভবত তিনি কিছু বলবেন। সবাই মনোযোগী হলেন তাঁর দিকে। শাদ্দাদ এবার গাম্ভীর হলেন। চোখে মুখে কী যেন এক ভয়ের রেখা দুলে উঠলেন। কী যেন এক শঙ্কা! সে কি শঙ্কা, না কি উদ্বেগ! ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। প্রায় ক্লান্তকণ্ঠে শাদ্দাদ বললেন:
হে প্রাণপ্রিয় বন্ধুগণ! আপনাদের নিয়ে আমার ভয় হচ্ছে। দারুণ ভয়!
কী সে ভয়?
জিজ্ঞেস করলেন তারা। শাদ্দাদ বললেন, সেই ভয়টা হলো: রাসূল (সা) তো বলেছেন, আমার উম্মতের প্রবৃত্তি বা ইচ্ছা অনুসাী হয়ে পড়বে। এবং তারা লিপ্ত হবে শিরকে! চমকে উঠলেন আবু দারদা এবং উবাদা। বলেন ক? আমরা তো শুনেছি রাসূল (সা)-এর একটি হাদীস:
আরব উপদ্বীপের শয়তান তার উপাসনার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়েছে। তাহলে বলুন, বলুন ভাই শাদ্দা- মুশরিক হওয়ার অর্থ কী? কী বুঝাতে চাইছেন আপনার ঐ বেদনা-বিধূর বাক্য দিয়ে? শাদ্দাদ বললেন, ধরুন কোনো ব্যক্তি নামায পড়ে লোক দেখানোর জন্যে। এবার বলুন, ঐ লোকটি সম্পর্কে আপনাদের ধারণা কী?
আবু দারদা এবং উবাদা জবাব দিলেন, সে নিশ্চয়ই মুশরিক! শাদ্দাদ বললেন, ঠিক বলেছেন। আমি রাসূল (সা)-এর কাছে শুনেছি। তিনি বলেছেন, যারা লোক দেখানোর জন্যে এসব কাজ করবে, তারা হবে মুশরিক। এখানে উপস্থিত ছিলেন আউফ ইবন মালিকও। তিনি বললেন, যতটুকু কাজ লোক দেখানো থেকে মুক্ত হবে, ততোটুকু কবুল হওয়ার আশা আছে আল্লাহর কাছে। আর বাকি কাজ, যাতে শিরকের মিশ্রণ আছে, তা কখনো কবুল হবে না। এই হিসেবে আমাদের কাজের ওপর আস্থাবান হওয়া উচিত।
তাঁর কথাশুনে শাদ্দাদ বললেন, রাসূল (সা) বলেছেন, মুশরিকের যাবতীয় আমল তার মাবুদকে দেয়া হবে। আল্লাহ তার মুখাপেক্ষী নন। পবিত্র আল-কুরআনেও এমনি কথা। আল কুরআন বলছে:
আল্লাহ পাক কোনো অবস্থাতেই শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না।’
হযরত শাদ্দাদ। হাদীসের ব্যাপারে তাঁর ছিল দারুণ পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞান। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন খাঁটি অনুসারী। ছিলেন দীনের ব্যাপারে আপসহীন। আর ছিলেন ইবাদাতের প্রতি অসীম মনোযোগী। আল্লাহর ভয়ে তিনি সব সময় থাকতেন কম্পমান। ইবাদাত সেরে হয়তো বা শুয়ে পড়েছেন শাদ্দাদ। গভীর রাত। কিন্তু না, ঘুম আসছে না তাঁর চোখে। কেবলই ভাবছেন। ভাবছেন মৃত্যুর কথা। ভাবছেন আখেরাতের কথা।
ব্যস!
কোথায় আর ঘুম কিংবা শো! তিনি উঠে পড়লেন। উঠে পড়লেন এবং দাঁড়িয়ে গেলেন আবারও নামাযে। মশগুল হয়ে পড়লেন আল্লাহর ইবাদাতে। আর এভাবেই কেটে গেল সারাটি রাত। একদিন নয়, দু’দিন নয়। এভাবে কেটে যেত শাদ্দাদের রাতগুলো। এবাদাতের মাধ্যমে, নির্ঘুম অবস্থায়। আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে। ইন্তেকাল করেছেন দয়ার নবীজী (সা)।
এসেছেন খোলাফায়ে রাশেদার যুগ। এ সময়ে বেশ কিছুটা পরিবর্তন এসে গেছে মুসলমানদের মধ্যে। তাদের এই পরিবর্তনে দারুণভাবে ব্যথিত হলেন শাদ্দাদ। ভয়ে এবং শঙ্কায় কেঁপে উঠলো তাঁর কোমল বুক। তিনি কাঁদছেন। কাঁদছেন আর অঝোর ধারায় ঝরে পড়ছে বেদনার বৃষ্টি। শাদ্দাদ চলেছেন সামনের দিকে। পথে দেখা পেলেন উবাদা ইবনে নাসীকে। নাসীর হাতটি ধরে শাদ্দাদ তার বাড়িতে নিয়ে এলেন।
তারপর
২য় অংশ
আলোর আবাবিল।
তারপর আবার কাঁদতে শুরু করলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শাদ্দাদ। তাঁর কান্না দেখে উবাদা ইবনে নাসী কাঁদছেন।আপনি কাঁদছেন কেন? শাদ্দাদ জিজ্ঞেস করলেন । নাসী বললেন, আপনার কান্না দেখে আমারও কান্না পাচ্ছে। কিন্তু আপনিই বা কাঁদছেন কেন? শাদ্দাদ কম্পিত কণ্ঠে বললেন, কাঁদছি- কারণ, রাসুল (সা)-এর একটি হাদীস আমার মনে পড়ছে।
হাদীসটি কী? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
শাদ্দাদ বললেন, হাদীসটি হলো: রাসুল (সা) বলেছেন, ‘আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয় আমার উম্মতের প্রবৃত্তির গোপন কামনা-বাসনার পূজারী হওয়া এবং শিরকে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে।’ রাসূল (সা)-এর কথা শুনে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার উম্মত কি মুশরিক হয়ে যাবে?
রাসূল বললেন, হ্যাঁ। তবে তারা চন্দ্র-সূর্যকে পূজা করবে না। পূজা করবে না মূর্তি, পাথর বা অন্য কোনো বস্তুরও। বস্তুত তারা পূজা করবে রিয়া এবং প্রবৃত্তির। সকল রোযা রাখবে। কিন্তু যখন তার প্রবৃত্তি চাইবে, আর সাথে সাথে নিঃসঙ্কোচে তখন তা ভেঙ্গে ফেলবে। কী নিদারুণ পরিতাপের বিষয় বলূন! সেই জন্যই আমি কাঁদছি। বললেন শাদ্দাদ। এমনি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন শাদ্দাদ। আল্লাহর প্রতি ছিল তাঁর এমনি ভয়, ঈমান আর মুসলমানদের প্রতি ছিল তাঁর এমনি অপরিসীম ভালোবাসা।
রাসূল (সা) বসে আছেন। তাঁর চারপাশে ঘিরে আছে আলোর পরশ। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলেন শাদ্দাদ। এ কি! এ কেমন চেহারা শাদ্দাদের? সারা চেহারায় বিষণ্ণতার কালো ছাপ! চোখে-মুখে মেঘের আস্তরণ! চোখ দু’টো ভারাক্রান্ত।বিমর্ষতায় ছেয়ে আছে শাদ্দাদ। অবাক হলেন দয়ার নবীজী (সা)। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? নাকি অন্য কিছু?
শাদ্দাদের কণ্ঠটি ধরে এলো। বলরেণ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! মনে হচ্ছে- মনে হচ্ছে আমার জন্যে পৃথিবীটা সঙ্কীর্ণ হয়ে যাচ্ছে! হাসলেন রাসূলুল্লাহ (সা)। বললেন, না। তোমার জন্যে পৃথিবী সঙ্কীর্ণ হবে না কখনো। নিশ্চিন্তে থাকতে পার তুমি। জেনে রেখ, একদিন বিজিত হবে শাম এবং বাইতুল মাকদাস। আর সেদিন, সেদিন তুমি এবং তোমার সন্তানরা হবে সেখানকার ইমাম।
রাসূল (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণী। সত্যি তো হতেই হবে। সত্যিই শাম এবং বাইতুল মাকদাস একদিন বিজিত হলো। আর শাদ্দাদই হলেন সেখানকার নেতা। তিনি সেখানে সপরিবারে বসতি স্থাপন করলেন। কেমন ছিল তার তাকওয়া আর পরহেজগারি?
সে এক অনুকরীণয় ইতিহসই বটে! একবার একদল মুজাহিদ যাচ্ছেন জিহাদের ময়দানে। তাদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন শাদ্দা। যাবার সময় হলে মুজাহিদরা খাবার জন্যে আহ্বান জানালেন তাকে। সবিনয়ে শাদ্দাদ বললেন, রাসুল (সা)-এর হাতে বাইয়াতের পর থেকে খাবারটি কোথা থেকে এলো তা না জেনে খাবার অভ্যাস থাকলে অবশ্যই আজ তোমাদের সাথে খেতাম। কিছু মনে নিও না ভাই! তোমরা খাও।
এমন ছিল শাদ্দাদের আল্লাহভীতি। এমনি ছিল তাঁর দীনদারি। তিনি বলতেন, কল্যাণের সবকিছুই জান্নাতের। আর অকল্যাণের সবকিছুই জাহান্নামের। এই দুনিয়া একটি উপস্থিত ভোগের বস্তু। সৎ এবং অসৎ সবাই তো ভোগ করে। কিন্তু আখেরাত হচ্ছে সত্য অঙ্গীকার। যেখানে রাজত্ব করেন এক মহাপরাক্রমশালী রাজা। অর্থাৎ মহান রাব্বুল আলামীন। প্রত্যেকেরই আছে সন্তানাদি। তোমরা আখেরাতের সন্তান হও। দুনিয়ার সন্তান হয়ো না। কী চমৎকার কথা! শাদ্দাদের মত সোনার মানুষ, খাঁটি মানুষই কেবল বলতে পারেন এমন সোনার চেয়ে দামি কথা।
শাদ্দাদ ছিলেন যেমন খোদাভীরু, তেমনি ছিলেন সাহসী। তাঁ সাহসের অনেক উপমা আছে। আছে আগুনঝরা ইতিহাস।হযরত মুয়াবিয়া (রা) তখন শাসনকর্তা। কী তার দাপট আর ক্ষমতা। একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন শাদ্দাদকে। আচ্ছা, বলুন তো আমি ভালো, নাকি হযরত আলী? আমাদের দু’জনের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?
স্পষ্টভাষী শাদ্দাদ
তিনি অকপটে বললেন, আলী (রা) আপনার আগে হিজরত করেছেন। তিনি রাসূল (সা)-এর সাথে অনেক বেশি ভালো কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন আপনার চেয়ে বেশি সাহসী। তাঁর ছিল আপনার চেয়ে অনেক বেশি উদার ও প্রস্ত একটি হৃদয়। আর ভালোবাসার কথা বলছেন? আলী চলে গেছেন। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। সুতরাং মানুষ আজ আপনার কাছে তো বেশি কিছু অবশ্যই আশা করে।
এই ছিল শাদ্দাদের সততা। এই ছিল তার সত্যবাদিতা এবং অমলিন জীবন। ছিল সাগরের মত বিশাল আর আকাশের মত প্রশস্ত একটি হৃদয়। ছিলেন অসীম সাহসী আর ঈমানের ওপর পর্বতের মত অবিচল। কেন হবেন না?
তিনি তো ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহান নেতা-প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)- এরই একান্ত স্নেহ আর ভালোবাসায় সিক্ত। তিনি তো ছিলেন সত্যের সৈনিক, বেহেশতের আবাবিল।
মুমিনের আত্মসংযম
এক রণাঙ্গনে মুসলমান বাহিনীর সাথে কাফেরদের প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে।
হযরত আলী(রা) এক অমুসলিম যোদ্ধাকে ধরাশায়ী করে তার বুকের উপর চড়ে বসেছেন। হাতে নগ্ন তরবারী। এখনি তার বুকে বসিয়ে দিবেন।
সহসা ধরাশায়ী অমুসলিম সৈনিকটি তার শেষ অস্ত্র চালাতে গিয়ে বুকের ওপর চেপে বসা হযরত আলীর(রা) মুখে থুথু দিয়ে ভরে দিল। হযরত আলী(রা) এক মুহুর্ত থমকে বসে রইলেন। তারপর তার বুকের উপর থেকে উঠে আসলেন।
তরবারি দূরে নিক্ষেপ করে বললেন, “যাও, তুমি মুক্ত।”
কাফের সৈনিকটি তো হতবাক। সে যে একটি যুদ্ধের ময়দানে রয়েছে একথা ভুলে গেল।
সে জিজ্ঞাসা করলোঃ আলী তোমার কি হয়েছে? আমাকে অমন হাতের মুঠোয় পেয়েও ছেড়ে দিলে যে!
হযরত আলী(রা) বললেনঃ ময়দানে তোমাদের সাথে যে যুদ্ধ চলছিল সেটা চলছিল ইসলামের সাথে। কিন্তু যে মুহুর্তে তুমি আমার মুখে থুথু দিলে, তখন তোমার ওপর আমার প্রচন্ড আক্রোশ সৃষ্টি হলো। সেটা ছিল আমার ব্যক্তিগত আক্রোশ।
এই আক্রোশের বশে তোমাকে হত্যা করলে গুনাহ হবে। তাই ক্রোধ সম্বরণ করলাম।
সৈনিকটি তৎক্ষণাত বললোঃ “যে ধর্ম তোমাকে এমন কঠিন মুহুর্তেও আত্মসংযম শিক্ষা দেয়, তাতে আমাকেও দীক্ষিত কর।”
এই বলে সে ইসলাম গ্রহণ করলো।
শিক্ষাঃ
ব্যক্তিগত আক্রোশের বশে কারো ওপর আক্রমণ করা জায়েজ নয়।
তবে আত্মরক্ষার জন্য সর্বাবস্থায় যুদ্ধ করা কর্তব্য।
হযরত আলীর (রা) খোদাভীতি
হযরত আলী(রা) তখন মুসলিম জাহানের খলিফা। একদিন তার ছোটভাই আকীল তার কাছে এসে নিজের অনেক অভাব অভিযোগের কথা জানালেন এবং তাকে কিছু সাহায্য দেয়ার অনুরোধ করলেন। হযরত আলী বললেন, জনগণের সম্পদের কোষাগার বাইতুল মাল থেকে আমি তোমাকে এক কপর্দকও দিতে পারবো না। মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
আমি বেতন পেলে তা থেকে তোমাকে কিছু দেয়া হবে। হযরত আকীল বললেন, আপনি নিজের বেতন অগ্রিম নিয়ে নিন। হযরত আলী বললেন, আমার বেতন অন্য সকলের বেতনের সাথে আসবে। অগ্রিম নেয়ার কোনো অধিকার আমার নেই। হযরত আকীল নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, একটা কিছু করুন। আমার সংসার চলছে না। যেভাবেই হোক আমাকে কিছু সাহায্য দিন।
হযরত আলী বললেন, বাজারের কোনো দোকান থেকে তালা ভেঙ্গে কিছু নিয়ে নাও। আকীল বললেন, ওটাতো চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে। হযরত আলী(রা) বললেন, এই মুহুর্তে আমি যদি বাইতুল মাল থেকে তোমাকে কিছু দেই তবে তাও চুরি বা ডাকাতি বলে গণ্য হবে।
কেননা ওটা জনগণের সম্পদ এবং জনগণ আমাকে ওখান থেকে নেয়ার অনুমতি দেয় নি।
অগত্য হযরত আকীল হযরত মোয়াবিয়ার নিকট গেলে তিনি তাকে একশো দিরহাম দিয়ে বললেন, তুমি মসজিদে দাঁড়িয়ে সকলকে জানাবে যে, আলীর কাছে সাহায্য চেয়ে পাইনি, কিন্তু মোয়াবিয়ার কাছে চেয়ে পেয়েছি।
ইত্যবসরে হযরত আকীল হযরত আলীর বক্তব্যের যৌক্তিকতা বুঝতে পারলেন।
তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে বললেন, আমি আলীর কাছে অন্যায়ভাবে সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি খোদাভীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
আর মোয়াবিয়ার কাছে সাহায্য চাইলে তিনি খোদাভীতির পরিবর্তে আমাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
১। আপনি আচরি ধর্ম
আলী (রা) তখন বিশাল সাম্রাজ্যের শাসক।
আলী (রা) জ্ঞানের দরজা।
ন্যায়দণ্ডের এক আপোষহীন রক্ষক তিনি।
মদীনার এক শীতের রাত।
শীতে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছেন আমীরুল মুমিনীন, বিশাল এক সাম্রাজ্যের শাসক আলী (রা)।
শীত নিবারনের উপযুক্ত কাপড় তাঁর নেই।
অথচ তাঁর রাষ্ট্রীয় খাজাঞ্চীখানায় প্রচুর শীতবস্ত্র।
বরং সে খাজাঞ্চীখানা তাঁরই হাতের মুঠোয়।
কিন্তু তা থেকে একটি কম্বল নেবার জন্যে তাঁর হাত সেদিকে প্রসরিত হতে পারছে না। কারণ খাজাঞ্চীখানা জনগণের।
তিনি তো রক্ষক মাত্র। সবার সাথে তাঁর নামে যেটুকু বরাদ্দ হবে, তাই শুধু তাঁর।
অপেক্ষা করতে হবে তাকে সেই বরাদ্দের।
তাঁর আপোষহীন ন্যায়দণ্ড সদা উত্থিত ছিল। মানুষের জন্যে শুধু নয়, তাঁর নিজের জন্যও।
আপনি আচরি ধর্ম তিনি অপরে শিখিয়েছেন।
২। সে আমর, আমিও আলী
খন্দকের যুদ্ধ।
পরিখার ওপারে দশ হাজার মুশরিক সৈন্য। আর এপাড়ে প্রতিরোধের জন্য দাঁড়ানো আড়াই হাজার মুসলিম।
মদীনায় প্রবেশের মুখে পরিখা দেখে মুশরিক বাহিনী বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।
কারণ পরিখা খনন করে প্রতিরোধের কৌশলের সাথে আরবরা পরিচিত নয়।
বিমূঢ় ভাব তাদের কেটে যাবার পর তার অস্থির হয়ে পড়ল।
পরিখা অতিক্রমের জন্যে অগভীর ও প্রশস্ত কোন জায়গা তার তালাশ করতে লাগল।
পাহাড়ের কিনারে যেখানে পরিখা শেষ হয়েছে, সেখানে এমন একটি সুবিধামত জায়গা তার পেয়ে গেল।
তার পরিকল্পনা করল এই পথে তারা দুর্ধর্ষ ও অজেয় একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করবে।
তার ওপাড়ে গিয়ে পরিখার এই অংশকে শত্রুমুক্ত রাখবে এবং সেই সুযোগে অবশিষ্ট সৈন্য ঐ পথে নগরে প্রবেশ করবে।
তার ক্ষুদ্র বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ নির্বাচন করল আরবের সর্বজনবিদিত শ্রেষ্ঠ বীর আমর ইবনে আব্দে ওদ্দ এবং অমিত সাহসী তরুণ সেনাধ্যক্ষ আকরামা ইবনে আবু জেহেলকে।
আরবের মানুষের সাধারণ ধারণা, আমর একাই এক হাজার যোদ্ধার সাথে লাড়াই করে জিততে পারবে। আমর প্রথমে তার ঘোড়া নিয়ে লাফিয়ে পরিখা অতিক্রম করল।
তারপর অন্যান্যরা।
আমর ওপাড়ে পার হয়েই ভয়াল আকারে তর্জন-গর্জন শুরু করে দিল, কে আছ একেতো শত্রুর একটি দল পরিখা অতিক্রমে সমর্থ হয়েছে! তার উপর পরিখা অতিক্রম করেছে আমর-এর মত পালোয়ান।
প্রথমটায় মুসলমানরা চমকে গিয়ে কিছুটা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল।
সে কারণেই আমর প্রথম দিকে তার আস্ফালনের কোন জবাব পেল না।
আমরের তর্জন-গর্জন অব্যাহত। আহবান জানাচ্ছে যে কাউকে সে যুদ্ধের।
এই যে আমি আছি’ বলে শেরে খোদা হযরত আলী (রাঃ) বেরিয়ে এলেন।
আমরের তুলনায় হযরত আলী বালক-সদৃশ।
আমর মহাবীর ও বহুদর্শী এক বিশাল পালোয়ান।
আর হযরত আলী মাত্র এক নব্য তরুণ।
মহানবী (সা) হযরত আলীকে লক্ষ্য করে ত্বরিত কণ্ঠে বললেন, ‘জানো তো, সে আমর।’ হযরত আলী ঘুরে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বললেন, ‘সে আমর, আমিও আলী।’ বলেই হযরত আলী মহানবীর অনুমতি নিয়ে উলংগ তরবারী হাতে ছুটলেন আমরের দিকে।
শুরু হলো যুদ্ধ।
মুহূর্তেই ধুলায় অন্ধকার হয়ে গেল স্থানটা। অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না কারও।
ভয়াবহ এই যুদ্ধের একদিকে শক্তি, অন্যদিকে ঈমানের তেজ।
শক্তির সাথে ঈমানের তেজের লড়াই। মহানবীর (সা) কণ্ঠে তখন করুণ প্রার্থনা, হে আল্লাহ, বদর যুদ্ধে ওবায়দাকে গ্রহণ করেছে, ওহোদের অনল পরীক্ষায় হামজাকে তুমি নিয়েছ, আর এই আলী তোমার সন্নিধানে উপস্থিত।
সে আমার পরমাত্মীয়। আমাকে একদম স্বজন-বর্জিত করো না। মুসলমানরা বাক্হীন রুদ্ধশ্বাসে ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে। তাদের উদ্বিগ্ন, অচঞ্চল চোখ অপেক্ষা করছে ফলাফলের।
এক সময় ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে আল্লাহু আকবার নিনাদ ধ্বনিত হলো হযরত আলীর কণ্ঠে।
সংগে সহস্র কণ্ঠে আবেগ আনন্দ-আপ্লুত প্রতিধ্বনি উঠল, আল্লাহু আকবার।
এই বিজয় আনন্দের বন্যাবেগ সৃষ্টি করল মুসলমানদের মধ্যে।
৩। আলীর (রাঃ) কাছে একটি প্রশ্ন দশটি উত্তর
একদা ১০ জন লোক হযরত আলীর (রা) নিকট হাজির হলো এবং বলল, “আমরা আপনাকে একটি প্রশ্ন করার অনুমতি চাচ্ছি।”
হযরত আলি(রাঃ) বললেন, “স্বাধীনভাবে আপনারা প্রশ্ন করতে পারেন।”
তারা প্রশ্ন করল,
“জ্ঞান ও সম্পদের মধ্যে কোনটা ভাল এবং কেন ভালো?
অনুগ্রহ করে আমাদের প্রত্যেকের জন্যে একটি করে জবাব দিন।”
জবাবে হযরত আলী (রাঃ) নিম্নলিখিত ১০টি উত্তর দিলেনঃ
১। জ্ঞান হলো মহানবীর(সাঃ) নীতি, আর সম্পদ ফেরাউনের উত্তরাধিকার।
সুতরাং জ্ঞান সম্পদের চেয়ে উত্তম।
২। তোমাকে সম্পদ পাহারা দিতে হয়, কিন্তু জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়।
সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
৩। একজন সম্পদশালীর যেখানে শত্রু থাকে অনেক, সেখানে একজন জ্ঞানীর অনেক বন্ধু থাকে। অতএব জ্ঞান উত্তম।
৪। জ্ঞান উত্তম, কারণ এটা বিতরণে বেড়ে যায়, অথচ সম্পদ বিতরণে কমে যায়।
৫। জ্ঞান উত্তম, কারণ একজন জ্ঞানী লোক দানশীল হয়, অন্যদিকে সম্পদশালী ব্যক্তি কৃপণ।
৬। জ্ঞান চুরি করা যায় না, কিন্তু সম্পদ চুরি হতে পারে। অতএব জ্ঞান উত্তম।
৭। সময় জ্ঞানের কোন ক্ষতি করে না, কিন্তু সম্পদ সময়ের পরিবর্তনে ক্ষয় পেয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
৮। জ্ঞান সীমাহীন, কিন্তু সম্পদ সীমাবদ্ধ এবং গোণা যায়। অতএব জ্ঞান উত্তম।
৯। জ্ঞান হৃদয়- মনকে জ্যোতির্ময় করে, কিন্তু সম্পদ একে মসিলিপ্ত করায় মত্ত। সুতরাং জ্ঞান উত্তম।
১০। জ্ঞান উত্তম। কারণ জ্ঞান মানবতাবোধকে উদ্বুদ্ধ করে যেমন আমাদের মহানবী(সাঃ) আল্লাহকে বলেছেনঃ “আমরা আপনার উপাসনা করি, আমরা আপনারই দাস।”
অন্যদিকে সম্পদ ফেরাউন ও নমরুদকে বিপদগ্রস্ত করেছে। যারা দাবী করে যে তারা ইলাহ।
১ম অংশ
নাম আলী, লকব আসাদুল্লাহ, হায়দার ও মুরতাজা, কুনিয়াত আবুল হাসান ও আবু তুরাব।
পিতা আবু তালিব আবদু মান্নাফ, মাতা ফাতিমা। পিতা-মাতা উভয়ে কুরাইশ বংশের হাশিমী শাখার সন্তান।
আলী রাসূলুল্লাহর সা. আপন চাচাতো ভাই।
রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির দশ বছর পূর্বে তাঁর জন্ম। আবু তালিব ছিলেন ছাপোষা মানুষ।
চাচাকে একটু সাহায্য করার উদ্দেশ্যে রাসূল সা. নিজ দায়িত্বে নিয়ে নেন আলীকে।
এভাবে নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে তিনি বেড়ে ওঠেন।
রাসূল সা. যখন নবুওয়াত লাভ করেন, আলীর বয়স তখন নয় থেকে এগারো বছরের মধ্যে।
একদিন ঘরের মধ্যে দেখলেন, রাসূলে কারীম সা. ও উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা রা. সিজদাবনত।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কি? উত্তর পেলেন, এক আল্লাহর ইবাদাত করছি।
তোমাকেও এর দাওয়াত দিচ্ছি। আলী তাঁর মুরব্বির দাওয়াত বিনা দ্বিধায় কবুল করেন।
মুসলমান হয়ে যান। কুফর, শিরক ও জাহিলিয়্যাতের কোন অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।
রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সর্ব প্রথম হযরত খাদীজাতুল কুবরা রা. নামায আদায় করেন।
এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নেই। অবশ্য আবু বকর, আলী ও যায়িদ বিন হারিসা- এ তিন জনের কে
সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে।
(তাবাকাতঃ ৩/২১) ইবন ’আব্বাস ও সালমান ফারেসীর রা. বর্ণনা মতে, উম্মুল মুমিনীন
হযরত খাদীজার রা. পর আলী রা. সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।
তবে এ সম্পর্কে সবাই একমত যে, মহিলাদের মধ্যে হযরত খাদীজা, বয়স্ক আযাদ
পরুষদের মধ্যে আবু বকর, দাসদের মধ্যে যায়িদ বিন হারিসা ও কিশোরদের মধ্যে আলী রা. প্রথম মুসলমান।
নবুওয়াতের তৃতীয় বছরে রাসূলে কারীম সা. হুকুম দিলেন আলীকে, কিছু লোকের আপ্যায়নের ব্যবস্থা কর।
আবদুল মুত্তালিব খান্দানের সব মানুষ উপস্থিত হল। আহার পর্ব শেষ হলে রাসূল সা. তাদেরকে
সম্বোধন করে বললেনঃ আমি এমন এক জিনিস নিয়ে এসেছি, যা দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্য কল্যাণকর।
আপনাদের মধ্যে কে আমার সঙ্গী হবে? সকলেই নিরব।
হঠাৎ আলী রা. বলে উঠলেনঃ ‘যদিও আমি অল্পবয়স্ক, চোখের রোগে আক্রান্ত, দুর্বল দেহ, আমি সাহায্য করবো আপনাকে।’
হিজরাতের সময় হল। অধিকাংশ মুসলমান মক্কা ছেড়ে মদীনা চলে গেছেন।
রাসূলে কারীম সা. আল্লাহর হুকুমের প্রতীক্ষায় আছেন। এ দিকে মক্কার ইসলাম বিরোধী শক্তি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাসূলে কারীমকে সা. দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সা. এ খবর জানিয়ে দেন।
তিনি মদীনায় হিজরাতের অনুমতি লাভ করেন। কাফিরদের সন্দেহ না হয়, এ জন্য আলীকে রাসূল সা. নিজের বিছানায় ঘুমাবার নির্দেশ দেন এবং সিদ্দীকে আকবরকে সঙ্গে করে রাতের অন্ধকারে মদীনা রওয়ানা হন।
আলী রা. রাসূলে কারীমের সা. চাদর মুড়ি দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে অত্যন্ত আনন্দ সহকারে ঘুমালেন।
তিনি জানতেন, এ অবস্থায় তার জীবন চলে যেতে পারে।
কিন্তু তাঁর প্রত্যয় ছিল, এভাবে জীবন গেলে তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হবে না।
সুবহে সাদিকের সময় মক্কার পাষণ্ডরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্যে ভেতরে প্রবেশ করে
দেখতে পেল, রাসূলে কারীমের সা. স্থানে তাঁরই এক ভক্ত জীবন কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হয়ে শুয়ে আছে।
তারা ব্যর্থ হয় এবং আল্লাহ তাআলা আলীকে রা. হিফাজত করেন।
এ হিজরাত প্রসঙ্গে হযরত আলী রা. বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা. মদীনা রওয়ানার পূর্বে আমাকে নির্দেশ
দিলেন, আমি মক্কায় থেকে যাব এবং লোকদের যেসব আমানত তাঁর কাছে আছে তা ফেরত দেব।
এ জন্যই তো তাঁকে ‘আল-আমীন’ বলা হতো। আমি তিনদিন মক্কায় থাকলাম।
তারপর রাসূলুল্লাহর সা. পথ ধরে মদীনার দিকে বেরিয়ে পড়লাম।
অবশেষে বনী ’আমর ইবন আওফ- যেখানে রাসূল সা. অবস্থান করছিলেন, আমি উপস্থিত হলাম।
কুলসুম ইবন হিদ্‌মের বাড়ীতে আমার আশ্রয় হল।’ অন্য একটি বর্ণনায়, আলী রা. রবীউল আউয়াল
মাসের মাঝামাঝি কুবায় উপস্থিত হন। রাসূল সা. তখনো কুবায় ছিলেন। (তাবাকাতঃ ৩/২২)
২য় অংশ
মাদানী জীবনের সূচনাতে রাসূল সা. যখন মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে ‘মুয়াখাত’ বা দ্বীনী-ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করছিলেন, তিনি নিজের একটি হাত আলীর রা. কাঁধে রেখে বলেছিলেন, ‘আলী তুমি আমার ভাই।
তুমি হবে আমার এবং আমি হব তোমার উত্তরাধিকারী।’ (তাবাকাতঃ ৩/২২) পরে রাসূল সা. আলী ও সাহল বিন হুনাইফের মধ্যে ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছিলেন। (তাবাকাতঃ ৩/২৩)
হিজরী দ্বিতীয় সনে হযরত আলী রা. রাসূলে কারীমের সা. জামাই হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
রাসূলুল্লাহর সা. প্রিয়তম কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমার রা. সাথে তাঁর বিয়ে হয়।
ইসলামের জন্য হযরত আলী রা. অবদান অবিস্মরণীয়।
রাসূলে কারীমের সা. যুগের সকল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় তিনি দেন। এ কারণে হুজুর সা. তাঁকে ‘হায়দার’ উপাধিসহ ‘যুল-ফিকার’ নামক একখানি তরবারি দান করেন।
একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদরে তাঁর সাদা পশমী রুমালের জন্য তিনি ছিলেন চিহ্নিত। কাতাদা থেকে বর্ণিত। বদরসহ প্রতিটি যুদ্ধে আলী ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. পতাকাবাহী। (তাবাকাতঃ ৩/২৩) উহুদে যখন অন্যসব মুজাহিদ পরাজিত হয়ে পলায়নরত ছিলেন, তখন যে ক’জন মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূলুল্লাহকে সা. কেন্দ্র করে ব্যুহ রচনা করেছিলেন, আলী রা. তাঁদের একজন।
অবশ্য পলায়নকারীদের প্রতি আল্লাহর ক্ষমা ঘোষিত হয়েছে।
ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত। খন্দকের দিনে ’আমর ইবন আবদে উদ্দ বর্ম পরে বের হল।
সে হুংকার ছেড়ে বললোঃ কে আমর সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে? আলী উঠে দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর নবী, আমি প্রস্তুত।
রাসূল সা. বললেনঃ ‘এ হচ্ছে ’আমর তুমি বস।’ ’আমর আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলঃ আমার সাথে লড়বার মত কেউ নেই? তোমাদের সেই জান্নাত এখন কোথায়, যাতে তোমাদের নিহতরা প্রবেশ করবে বলে তোমাদের ধারণা? তোমাদের কেউই এখন আমার সাথে লড়তে সাহসী নয়? আলী রা. উঠে দাঁড়ালেন। বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি প্রস্তুত।
রাসূল সা. বললেনঃ বস। তৃতীয় বারের মত আহ্‌বান জানিয়ে ’আমর তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো। আলী রা. আবারো উঠে দাঁড়িয়ে আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি প্রস্তুত।
রাসূল সা. বললেনঃ সে তো ’আমর। আলী রা. বললেনঃ তা হোক। এবার আলী রা. অনুমতি পেলেন। আলী রা. তাঁর একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে আমরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
’আমর জিজ্ঞেস করলোঃ তুমি কে? বললেনঃ আলী। সে বললোঃ আবদে মান্নাফের ছেলে? আলী বললেনঃ আমি আবু তালিবের ছেলে আলী। সে বললোঃ ভাতিজা, তোমার রক্ত ঝরানো আমি পছন্দ করিনে।
আলী বললেনঃ আল্লাহর কসম, আমি কিন্তু তোমার রক্ত ঝরানো অপসন্দ করিনে। এ কথা শুনে ’আমর ক্ষেপে গেল। নিচে নেমে এসে তরবারি টেনে বের করে ফেললো। সে তরবারি যেন আগুনের শিখা।
সে এগিয়ে আলীর ঢালে আঘাত করে ফেঁড়ে ফেললো।
আলী পাল্টা এক আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেললেন।
এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ সা. তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠেন।
তারপর আলী নিজের একটি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে ফিরে আসেন। (আল–বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবন কাসীর ৪/১০৬)
সপ্তমি হিজরীতে খাইবার অভিযান চালানো হয়।
সেখানে ইয়াহুদীদের কয়েকটি সুদৃঢ় কিল্লা ছিল। প্রথমে সিদ্দীকে আকবর, পরে ফারুকে আজমকে কিল্লাগুলি পদানত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কেউই সফলকাম হতে পারলেন না।
নবী সা. ঘোষণা করলেনঃ ‘কাল আমি এমন এক বীরের হাতে ঝাণ্ডা তুলে দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রিয়পাত্র। তারই হাতে কিল্লাগুলির পতন হবে।’ পরদিন সকালে সাহাবীদের সকলেই আশা করছিলেন এই গৌরবটি অর্জন করার।
হঠাৎ আলীর ডাক পড়লো। তাঁরই হাতে খাইবারের সেই দুর্জয় কিল্লাগুলির পতন হয়।
তাবুক অভিযানে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসূল সা. আলীকে রা. মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।
আলী রা. আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি যাচ্ছেন, আর আমাকে নারী ও শিশুদের কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন? উত্তরে রাসূল সা. বললেনঃ হারুন যেমন ছিলেন মূসার, তেমনি তুমি হচ্ছো আমার প্রতিনিধি।
তবে আমার পরে কোন নবী নেই। (তাবাকাতঃ ৩/২৪)
৩য় অংশ
নবম হিজরীতে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে প্রথম ইসলামী হজ্জ্ব অনুষ্ঠিত হয়।
এ বছর হযরত সিদ্দীকে আকবর রা. ছিলেন ’আমীরুল হজ্জ্ব।
তবে কাফিরদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল ঘোষণার জন্য রাসূল সা. আলীকে রা. বিশেষ দূত হিসেবে পাঠান।
দশম হিজরীতে ইয়ামনে ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত খালিদ সাইফুল্লাহকে পাঠানো হয়।
ছ’মাস চেষ্টার পরও তিনি সফলকাম হতে পারলেন না। ফিরে এলেন। রাসূলে করীম সা. আলীকে রা. পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন। আলী রা. রাসূলুল্লাহর সা. কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ আপনি আমাকে এমন লোকদের কাছে পাঠাচ্ছেন যেখানে নতুন নতুন ঘটনা ঘটবে অথচ বিচার ক্ষেত্রে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। উত্তরে রাসূল সা. বললেনঃ আল্লাহ তোমাকে সঠিক রায় এবং তোমার অন্তরে শক্তিদান করবেন।
তিনি আলীর রা. মুখে হাত রাখলেন। আলী বলেনঃ ‘অতঃপর আমি কক্ষনো কোন বিচারে দ্বিধাগ্রস্ত হইনি।’ যাওয়ার আগে রাসূল সা. নিজ হাতে আলীর রা. মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দুআ করেন। আলী ইয়ামনে পৌঁছে তাবলীগ শুরু করেন।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে সকল ইযামনবাসী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং হামাদান গোত্রের সকলেই মুসলমান হয়ে যায়।
রাসূল সা. আলীকে রা. দেখার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন।
তিনি দুআ করেনঃ আল্লাহ, আলীকে না দেখে যেন আমার মৃত্যু না হয়।
হযরত আলী বিদায় হজ্জের সময় ইয়ামন থেকে হাজির হয়ে যান।
রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর তাঁর নিকট-আত্মীয়রাই কাফন-দাফনের দায়িত্ব পালন করেন।
হযরত আলী রা. গোসল দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।
মুহাজির ও আনসাররা তখন দরজার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।
হযরত আবু বকর, হযরত উমার ও হযরত উসমানের রা. খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁদের হাতে বাইয়াত করেন এবং তাঁদের যুগের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরীক থাকেন। অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতেও হযরত উসমানকে পরামর্শ দিয়েছেন।
যেভাবে আবু বকরকে ‘সিদ্দীক’, উমারকে ‘ফারুক’ এবং উসমানকে ‘গণী’ বলা হয়, তেমনিভাবে তাঁকেও ‘আলী মুরতাজা’ বলা হয়। হযরত আবু বকর ও উমারের যুগে তিনি মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। হযরত ’উসমানও সব সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। (মরুজুজ জাহাবঃ ২/২)
বিদ্রোহীদের দ্বারা হযরত উসমান ঘেরাও হলে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে আলীই রা. সবচেয়ে বেশী ভূমিকা পালন করেন। সেই ঘেরাও অবস্থায় হযরত উসমানের রা. বাড়ীর নিরাপত্তার জন্য তিনি তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হুসাইনকে রা. নিয়োগ করেন। (আল–ফিত্‌নাতুল কুবরাঃ ড. ত্বাহা হুসাইন)
হযরত উমার রা. ইনতিকালের পূর্বে ছ’জন বিশিষ্ট সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের অসীয়াত করে যান। আলীও ছিলেন তাঁদের একজন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আলীর রা. সম্পর্কে মন্তব্য করেনঃ লোকেরা যদি আলীকে খলীফা বানায়, তবে সে তাদেরকে ঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে পারবে। (আল–ফিত্‌নাতুল কুবরা) হযরত ‘উমার তাঁর বাইতুল মাকদাস’ সফরের সময় আলীকে রা. মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান।
হযরত ’উসমানের রা. শাহাদাতের পর বিদ্রোহীরা হযরত তালহা, যুবাইর ও আলীকে রা. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দেয়। প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, হযরত আলী রা. বার বার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। অবশেষে মদীনাবাসীরা হযরত আলীর রা. কাছে গিয়ে বলেন, খিলাফতের এ পদ এভাবে শূণ্য থাকতে পারে না।
বর্তমানে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি নেই। আপনিই এর হকদার। মানুষের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তবে শর্ত আরোপ করেন যে, আমার বাইয়াত গোপনে হতে পারবে না।
এজন্য সর্বশ্রেণীর মুসলমানের সম্মতি প্রয়োজন। মসজিদে নববীতে সাধারণ সভা হলো।
মাত্র ষোল অথবা সতেরো জন সাহাবা ছাড়া সকল মুহাজির ও আনসার আলীর রা. হাতে বাইয়াত করেন।
অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে হযরত আলীর রা. খিলাফতের সূচনা হয়।
খলীফা হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল হযরত উসমানের রা. হত্যাকারীদের শাস্তি বিধান করা।
কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। প্রথমতঃ হত্যাকারীদের কেউ চিনতে পারেনি। হযরত উসমানের স্ত্রী হযরত নায়িলা হত্যাকারীদের দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কাউকে চিনতে পারেননি। মুহাম্মাদ বিন আব আবু বকর হত্যার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন।
কিন্তু হযরত উসমানের এক ক্ষোভ-উক্তির মুখে তিনি পিছটান দেন। মুহাম্মাদ বিন আবু বকরও হত্যাকারীদের চিনতে পারেননি। দ্বিতীয়তঃ মদিনা তখন হাজার হাজার বিদ্রোহীদের কব্জায়। তারা হযরত আলীর রা. সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
কিন্তু তাঁর এই অসহায় অবস্থা তৎকালীন অনেক মুসলমানই উপলব্ধি করেননি।
তাঁরা হযরত আলী রা. নিকট তক্ষুনি হযরত উসমানের রা. ‘কিসাস’ দাবী করেন। এই দাবী উত্থাপনকারীদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. সহ তাল্‌হা ও যুবাইরের রা. মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও ছিলেন। তাঁরা হযরত আয়িশার রা. নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সহ মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাঁদের সমর্থকদের সংখ্যা ছিল বেশী।
আলীও রা. তাঁর বাহিনীসহ সেখানে পৌঁছেন। বসরার উপকণ্ঠে বিরোধী দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হযরত আয়িশা রা. আলীর রা. কাছে তাঁর দাবী পেশ করেন। আলীও রা. তাঁর সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন। যেহেতু উভয় পক্ষেই ছিল সততা ও নিষ্ঠা তাই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। হযরত তালহা ও যুবাইর ফিরে চললেন। আয়িশাও ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলেন।
কিন্তু হাংগামা ও অশান্তি সৃষ্টিকারীরা উভয় বাহিনীতেই ছিল। তাই আপোষ মীমাংসায় তারা ভীত হয়ে পড়ে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে রাতের অন্ধকারে এক পক্ষ অন্য পক্ষের শিবিরে হামলা চালিয়ে দেয়। ফল এই দাঁড়ায়, উভয় পক্ষের মনে এই ধারণা জন্মালো যে, আপোষ মীমাংসার নামে ধোঁকা দিয়ে প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর হামলা করে বসেছে।
পরিপূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আলীর রা. জয় হয়।
তিনি বিষয়টি হযরত আয়িশাকে রা. বুঝাতে সক্ষম হন।
আয়িশা রা. বসরা থেকে মদীনায় ফিরে যান।
৪র্থ অংশ
যুদ্ধের সময় আয়িশা উটের ওপর সওয়াব ছিলেন। ইতিহাসে তাই এ যুদ্ধ ‘উটের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।
হিজরী ৩৬ সনের জামাদিউস সানী মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আশারায়ে মুবাশ্‌শারার সদস্য হযরত তাল্‌হা ও যুবাইরসহ উভয় পক্ষে মোট তের হাজার মুসলমান শহীদ হন। অবশ্য এ ব্যাপারে মতভেদ আছে।
হযরত আলী রা. পনের দিন বসরায় অবস্থানের পর কুফায় চলে যান। রাজধানী মদীনা থেকে কুফায় স্থানান্তরিত হয়।
এই উটের যু্দ্ধ ছিল মুসলমানদের প্রথম আত্মঘাতী সংঘর্ষ।
অনেক সাহাবী এ যুদ্ধে কোন পক্ষেই যোগদান করেননি। এই আত্মঘাতী সংঘর্ষের জন্য তাঁরা ব্যথিতও হয়েছিলেন। আলীর রা. বাহিনী যখন মদীনা থেকে রওয়ানা হয়, মদীনাবাসীরা তখন কান্নায় ভেংগে পড়েছিলেন।
হযরত আয়িশার রা. সাথে তো একটা আপোষরফায় আসা গেল।
কিন্তু সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়ার রা. সাথে কোন মীমাংসায় পৌঁছা গেল না।
হযরত আলী রা. তাঁকে সিরিয়ার গভর্ণর পদ থেকে বরখাস্ত করেন।
হযরত মুয়াবিয়া রা. বেঁকে বসলেন। আলীর রা. নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন।
তাঁর বক্তব্যের মূলকথা ছিল, ‘উসমান রা. হত্যার কিসাস না হওয়া পর্যন্ত তিনি আলীকে রা. খলীফা বলে মানবেন না।’
হিজরী ৩৭ সনের সফর মাসে ‘সিফ্‌ফীন’ নাম স্থানে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. বাহিনীর মধ্যে এক সংঘর্ষ ঘটে যায়। এ সংঘর্ষ ছিল উটের যুদ্ধ থেকেও ভয়াবহ। উভয় পক্ষে মোট ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন।
তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ’আম্মার বিন ইয়াসীর, খুযাইমা ইবন সাবিত, ও আবু আম্মারা আল-মাযিনীও ছিলেন।
তাঁরা সকলেই আলীর রা. পক্ষে মুয়াবিয়ার রা. বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
উল্লেখ্য যে, আম্মার বিন ইয়াসির সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছিলেনঃ ‘আফসুস, একটি বিদ্রোহী দল আম্মারকে হত্যা করবে।’ (সহীহুল বুখারী) সাতাশ জন প্রখ্যাত সাহাবী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। হযরত মুয়াবিয়াও হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী।
অবশ্য হযরত মুয়াবিয়া রা. হাদীসটির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এত কিছুর পরেও বিষয়টির ফায়সালা হলো না।
সিফ্‌ফীনের সর্বশেষ সংঘর্ষে, যাকে ‘লাইলাতুল হার’ বলা হয়, হযরত আলীর রা. জয় হতে চলেছিল।
হযরত মুয়াবিয়া রা. পরাজয়ের ভাব বুঝতে পেরে পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মীমাংসার আহ্‌বান জানালেন। তাঁর সৈন্যরা বর্শার মাথায় কুরআন ঝুলিয়ে উঁচু করে ধরে বলতে থাকে, এই কুরআন আমাদের এ দ্বন্দ্বের ফায়সালা করবে।
যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলো। হযরত আলীর রা. পক্ষে আবু মুসা আশয়ারী রা. এবং হযরত মুয়াবিয়ার রা. পক্ষে হযরত ‘আমর ইবনুল ‘আস হাকাম বা সালিশ নিযুক্ত হলেন। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুইজেনের সম্মিলিত ফায়সালা বিরোধী দু’পক্ষই মেনে নেবেন।
‘দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে মুসলমানদের বড় আকারের এক সম্মেলন হয়। কিন্তু সব ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে যে সিদ্ধান্তটি পাওয়া যায় তা হলো, হযরত ‘আমর ইবনুল আস রা. হযরত আবু মুসা আশয়ারীর রা. সাথে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন, শেষ মুহূর্তে তা থেকে সরে আসায় এ সালিশী বোর্ড ‍শান্তি স্থাপনে ব্যর্থ হয়। দুমাতুল জান্দাল থেকে হতাশ হয়ে মুসলমানরা ফিরে গেল।
অতঃপর আলী রা. ও মুয়াবিয়া রা. অনর্থক রক্তপাত বন্ধ করার লক্ষ্যে সন্ধি করলেন। এ দিন থেকে মূলতঃ মুসলিম খিলাফত দু’ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
এ সময় ‘খারেজী’ নামে নতুন একটি দলের জন্ম হয়। প্রথমে তারা ছিল আলী সমর্থক।
কিন্তু পরে তারা এ বিশ্বাস প্রচার করতে থাকে যে, দ্বীনের ব্যাপারে কোন মানুষকে ‘হাকাম’ বা সালিশ নিযুক্ত করা কুফরী কাজ। আলী রা. আবু মুসা আশয়ারীকে রা. ‘হাকাম’ মেনে নিয়ে কুরআনের খেলাফ কাজ করেছেন।
সুতরাং হযরত আলী তাঁর আনুগত্য দাবী করার বৈধতা হারিয়ে ফেলেছেন।
তারা হযরত আলী থেকে পৃথক হয়ে যায়। তারা ছিল অত্যন্ত চরমপন্থী।
তাদের সাথে আলীর রা. একটি যুদ্ধ হয় এবং তাতে বহু লোক হতাহত হয়।
এই খারেজী সম্প্রদায়ের তিন ব্যক্তি আবদুর রহামান মুলজিম, আল-বারাক ইবন
আবদিল্লাহ ও ‘আমের ইবন বকর আত-তামীমী, নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মুসলিম উম্মার অন্তর্কলহের জন্য দায়ী মূলতঃ আলী, মুয়াবিয়া ও ’আমর ইবনুল আস রা.।
সুতরাং এ তিন ব্যক্তিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত মুতাবিক মুলজিম দায়িত্ব নিল আলীর রা. এবং আল-বারাক ও ‘আমর দায়িত্ব নিল যথাক্রমে মুয়াবিয়া ও ‘আমর ইবনুল আসের রা.। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, মারবে নয় তো মরবে।
হিজরী ৪০ সনের ১৭ রমজান ফজরের নামাযের সময়টি এ কাজের জন্য নির্ধারিত হয়।
অতঃপর ইবন মুলজিম কুফা, আল-বারাক দিমাশ্‌ক ও ’আমর মিসরে চলে যায়।
হিজরী ৪০ সনের ১৬ রমজান শুক্রবার দিবাগত রাতে আততায়ীরা আপন আপন স্থানে ওৎ পেতে থাকে।
ফজরের সময় হযরত আলী রা. অভ্যাসমত আস-সালাত বলে মানুষকে নামাযের জন্য ডাকতে ডাকতে যখন মসজিদের দিকে যাচ্ছিলেন, পাপাত্মা ইবন মুলজিম শাণিত তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে আহত করে। আহত অবস্থায় আততায়ীকে ধরার নির্দেশ দিলেন।
সন্তানদের ডেকে অসীয়াত করলেন। চার বছর নয় মাস খিলাফত পরিচালনার পর ১৭ রমজান ৪০ হিজরী শনিবার কুফায় শাহাদাত বরণ করেন।
একই দিন একই সময় হযরত মুয়াবিয়া যখন মসজিদে যাচ্ছিলেন, তাঁরও ওপর হামলা হয়।
কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। তিনি সামান্য আহত হন। অন্য দিকে ‘আমর ইবনুল আস অসুস্থতার কারণে সেদিন মসজিদে যাননি। তার পরিবর্তে পুলিশ বাহিনী প্রধান খারেজ ইবন হুজাফা ইমামতির দায়িত্ব পালনের জন্য মসজিদে যাচ্ছিলেন।
তাঁকেই ‘আমর ইবনুল আস মনে করে হত্যা করা হয়। এভাবে মুয়াবিয়া ও ‘আমর ইবনুল ’আস রা. প্রাণে রক্ষা পান। (তারীখুল উম্মাহ আল–ইসলামিয়্যাঃ খিদরী বেক)
৫ম অংশ
হযরত আলীর রা. নামাযে জানাযার ইমামতি করেন হযরত হাসান ইবন আলী রা.।
কুফা জামে’ মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয।
তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে নাজফে আশরাফে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ‍মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
আততায়ী ইবন মুলজিমকে ধরে আনা হলে আলী রা. নির্দেশ দেনঃ ‘সে কয়েদী।
তার থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা কর। আমি বেঁচে গেলে তাঁকে হত্যা অথবা ক্ষমা করতে পারি। যদি আমি মারা যাই, তোমরা তাকে ঠিক ততটুকু আঘাত করবে যতটুকু সে আমাকে করেছে। তোমরা বাড়াবাড়ি করো না।
যারা বাড়াবাড়ি করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না।’ (তাবাকাতঃ ৩/৩৫)
হযরত আলী রা. পাঁচ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন।
একমাত্র সিরিয়া ও মিসর ছাড়া মক্কা ও মদীনাসহ সব এলাকা তাঁর অধীনে ছিল।
তাঁর সময়টি যেহেতু গৃহযুদ্ধে অতিবাহিত হয়েছে এ কারণে নতুন কোন অঞ্চল বিজিত হয়নি।
হযরত আলী রা. তাঁর পরে অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যাননি।
লোকেরা যখন তাঁর পুত্র হযরত হাসানকে রা. খলীফা নির্বাচিত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল; তিনি বলেছিলেন, এ ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ অথবা নিষেধ কোনটাই করছিনা।
অন্য এক ব্যক্তি যখন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি আপনার প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাচ্ছেন না কেন? বললেনঃ আমি মুসলিম উম্মাহকে এমনভাবে ছেড়ে যেতে চাই যেমন গিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ সা.।
হযরত আলীর রা. ওফাতের পর ‘দারুল খিলাফা’- রাজধানী কুফার জনগণ হযরত হাসানকে রা. খলীফা নির্বাচন করে। তিনি মুসীলম উম্মার আন্তঃকলহ ও রক্তপাত পছন্দ করলেন না।
এ কারণে, হযরত মুয়াবিয়া ইরাক আক্রমণ করলে তিনি যুদ্ধের পরিবর্তে মুয়াবির রা. হাতে খিলাফতের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া সমীচীন মনে করলেন। এভাবে হযরত হাসানের নজীরবিহীন কুরবানী মুসলিম জাতিকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে মুক্তি দেয়।
খিলাফত থেকে তাঁর পদত্যাগের বছরকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল জামায়াহ’- ঐক্য ও সংহতির বছর নামে অভিহিত করা হয়।
পদত্যাগের পর হযরত হাসান কুফা ত্যাগ করে মদীনা চলে আসেন এবং নয় বছর পর হিজরী পঞ্চাশ সনে ইনতিকাল করেন।
মাত্র ছয়টি মাস তিনি খিলাফত পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন।
হযরত উমার রা. আলী রা. সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ফায়সালাকারী আলী।’
এমন কি রাসূল সা.ও বলেছিলেন, ‘আকদাহুম আলী- তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিচারক আলী।’
তাঁর সঠিক সিদ্ধান্ত লক্ষ্য করে হযরত উমার রা. একাধিকবার বলেছেনঃ ‘লাওলা আলী লাহালাকা উমার- আলী না হলে ’উমার হালাক হয়ে যেত।’
আলী রা. নিজেকে একজন সাধারণ মুসলমানের সমান মনে করতেন এবং যে কোন ভুলের কৈফিয়তের জন্য প্রস্তুত থাকতেন।
একবার এক ইয়াহুদী তাঁর বর্ম চুরি করে নেয়। আলী বাজারে বর্মটি বিক্রি করতে দেখে চিনে ফেলেন।
তিনি ইচ্ছা করলে জোর করে তা নিতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। আইন অনুযায়ী ইয়াহুদীর বিরুদ্ধে কাজীর আদালতে মামলা দায়ের করেন। কাজীও ছিলেন কঠোর ন্যায় বিচারক। তিনি আলী রা. দাবীর সমর্থনে প্রমাণ চাইলেন।
আলী রা. তা দিতে পারলেন না। কাজী ইয়াহুদীর পক্ষে মামলার রায় দিলেন। এই ফায়সালার প্রভাব ইয়াহুদীর ওপর এতখানি পড়েছিল যে, সে মুসলমান হয়ে যায়। সে মন্তব্য করেছিল, ‘এতো নবীদের মত ইনসাফ।
আলী রা. আমীরুল মুমিনীন হয়ে আমাকে কাজীর সামনে উপস্থিত করেছেন এবং তাঁরই নিযুক্ত কাজী তাঁর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।’ তিনি ফাতিমার সাথে বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত রাসূলে কারীমের সা. পরিবারের সাথেই থাকতেন।
বিয়ের পর পৃথক বাড়ীতে বসবাস শুরু করেন। জীবিকার প্রয়োজন দেখা দিল। কিন্তু পুঁজি ও উপকরণ কোথায়? গতরে খেটে এবং গনীমতের হিস্‌সা থেকে জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত উমারের রা. যুগে ভাতা চালু হলে তাঁর ভাতা নির্ধারিত হয় বছরে পাঁচ হাজার দিরহাম।
হযরত হাসান বলেন, মৃত্যুকালে একটি গোলাম খরীদ করার জন্য জমা করা মাত্র সাত শ’ দিরহাম রেখে যান। (তাবাকাতঃ ৩/৩৯)
জীবিকার অনটন আলীর রা. ভাগ্য থেকে কোন দিন দূর হয়নি।
একবার স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, রাসূলুল্লাহর সা. সময়ে ক্ষুধার জ্বালায় পেটে পাথর বেঁধে থেকেছি। (হায়াতুস সাহাবাঃ ৩/৩১২) খলীফা হওয়ার পরেও ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সাথে তাকে লড়তে হয়েছে।
তবে তাঁর অন্তরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। কোন অভাবীকে তিনি ফেরাতেন না। এজন্য তাঁকে অনেক সময় সপরিবারে অভুক্ত থাকতে হয়েছে। তিনি ছিলেন দারুণ বিনয়ী। নিজের হাতেই ঘর-গৃহস্থালীর সব কাজ করতেন।
সর্বদা মোটা পোশাক পরতেন। তাও ছেঁড়া, তালি লাগানো। তিনি ছিলেন জ্ঞানের দরজা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জ্ঞানার্জনের জন্য তাঁর কাছে এসে দেখতে পেত তিনি উটের রাখালী করছেন, ভূমি কুপিয়ে ক্ষেত তৈরী করছেন।
তিনি এতই অনাড়ম্বর ছিলেন যে, সময় সময় শুধু মাটির ওপর শুয়ে যেতেন। একবার তাঁকে রাসূল সা. এ অবস্থায় দেখে সম্বোধন করেছিলেন, ‘ইয়া আবা তুরাব’- ওহে মাটির অধিবাসী প্রাকৃতজন। তাই তিনি পেয়েছিলেন, ‘আবু তুরাব’ লকবটি।
খলীফা হওয়ার পরও তাঁর এ সরল জীবন অব্যাহত থাকে।
হযরত ’উমারের রা. মত সবসময় একটি দুররা বা ছড়ি হাতে নিয়ে চলতেন, লোকদের উপদেশ দিতেন। (আল–ফিতনাতুল কুবরা)
হযরত আলী রা. ছিলেন নবী খান্দানের সদস্য, যিনি নবীর সা. প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধঅনে শিক্ষা লাভ করেন।
রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আনা মাদীনাতুল ইল্‌ম ওয়া আলী বাবুহা’- আমি জ্ঞানের নগরী, আর আলী সেই নগরীর প্রবেশদ্বার। (তিরমিযী) তিনি ছিলেন কুরআনের হাফিজ এবং একজন শ্রেষ্ঠ মুফাসসির। কিছু হাদীসও সংগ্রহ করেছিলেন।
তবে হাদীস গ্রহণের ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। কেউ তাঁর কাছে কোন হাদীস বর্ণনা করলে, বর্ণনাকারীর নিকট থেকে শপথ নিতেন। (তাযকিরাতুল হুফ্‌ফাজঃ ১/১০) তিনি রাসূলুল্লাহর সা. বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে বহু বিখ্যাত সাহাবী এবং তাবে’ঈ হাদীস বর্ণনা করেছেন। পূর্ববর্তী খলীফাদের যুগে মুহাজিরদের তিনজন ও আনসারদের তিনজন ফাতওয়া দিতেন।
যথাঃ ’উমার, উসমান, আলী উবাই বিন কা’ব, মুয়াজ বিন জাবাল ও যায়িদ বিন সাবিত। মাসরুক থেকে অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে ফাতওয়া দিতেনঃ আলী, ইবন মাসউদ, যায়িদ, উবাই বিন কা’ব, আবু মূসা আল-আশয়ারী। (তাবাকাতঃ ৪/১৬৭, ১৭৫)
আলী ছিলেন একজন সুবক্তা ও ভালো কবি। (কিতাবুল উমদাঃ ইবন রশীকঃ ১/২১) তাঁর কবিতার একটি ‘দিওয়ান’ আমরা পেয়ে থাকি। তাতে অনেকগুলি কবিতায় মোট ১৪০০ শ্লোক আছে। গবেষকদের ধারণা, তাঁর নামে প্রচলিত অনেকগুলি কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। তবে তিনি যে তৎকালীন আরবী কাব্য জগতের একজন বিশিষ্ট দিকপাল, তাতে পণ্ডিতদের কোন সংশয় নেই। ‘নাহজুল বালাগা’ নামে তাঁর বক্তৃতার একটি সংকলন আছে যা তাঁর অতুলনীয় বাগ্মিতার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। (তারীখূল আদাব আল–আরাবীঃ ডঃ উমার ফাররুখ, ১/৩০৯)
খাতুনে জান্নাত নবী কন্যা হযরত ফাতিমার রা. সাথে তাঁর প্রথম বিয়ে হয়। যতদিন ফাতিমা জীবিত ছিলেন, দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। ফাতিমার মৃত্যুর পর একাধিক বিয়ে করেছেন। তাবারীর বর্ণনা মতে, তার চৌদ্দটি ছেলে ও সতেরটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করে। হযরত ফাতিমার গর্ভে তিন পুত্র হাসান, হুসাইন, মুহসিন এবং দু’কন্যা যয়নাব ও উম্মু কুলসুম জন্মলাভ করেন। শৈশবেই মুহসীন মারা যায়। ওয়াকিদীর বর্ণনা মতে, মাত্র পাঁচ ছেলে হাসান, হুসাইন, মুহাম্মাদ (ইবনুল হানাফিয়্যা), আব্বাস, এবং উমার থেকে তাঁর বংশ ধারা চলছে।
ইমাম আহমাদ র. বলেন, আলী রা. মর্যাদা ও ফজীলাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে যত কথা বর্ণিত হয়েছে, অন্য কোন সাহাবী সম্পর্কে তা হয়নি। (আল–ইসাবাঃ ২/৫০৮) ইতিহাসে তাঁর যত গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে, এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে তার কিয়দংশও তুলে ধরা সম্ভব নয়।
রাসূল সা. অসংখ্যবার তাঁর জন্য ও তাঁর সন্তানদের জন্য দুআ করেছেন। রাসূল সা. বলেছেনঃ একমাত্র মুমিনরা ছাড়া তোমাকে কেউ ভালোবাসবে না এবং একমাত্র মুনাফিকরা ছাড়া কেউ তোমাকে হিংসা করবে না।
হযরত আলী এক সাথী হযরত দুরার ইবন দামরা আলী কিনানী একদিন হযরত মুয়াবিয়ার কাছে এলেন। মুয়াবিয়া তাঁকে আলীর রা. গুণাবলী বর্ণনা করতে অনুরোধ করেন। প্রথমে তিনি অস্বীকার করেন।
কিন্তু মুয়াবিয়ার চাপাচাপিতে দীর্ঘ এক বর্ণনা দান করেন। তাতে আলীর রা. গুণাবলী চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। ঐতিহাসিকরা বলছেন এ বর্ণনা শুনে মুয়াবিয়া সহ তার সাথে বৈঠকে উপস্থিত সকলেই কান্নায় ভেংগে পড়েছিলেন।
অতঃপর মুয়াবিয়্যা মন্তব্য করেনঃ ‘আল্লাহর কসম, আবুল হাসান (হাসানের পিতা) এমনই ছিলেন।’ (আল–ইসতিয়াবঃ ৩/৪৪)
১। আলী (রা) পথিককে পাশাপাশি হাঁটতে বাধ্য করলেন
চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ)।
তাঁকে জ্ঞানের দরওয়াজা বলা হতো।
সরলতার তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক।
খলীফা হওয়ার পরও সাধারণ মানুষ এবং তাঁর মধ্যে কোন পার্থক্যই তিনি বরদাশত করতেন না।
একদিনের ঘটনা।
খলীফা আলী(রাঃ) প্রায়ই জনগণের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য বাজারে যেতেন।
একদিন তিনি বাজারে যাচ্ছেন।
পথিমধ্যে এক ব্যক্তি তাঁকে দেখেই তাঁর সম্মানার্থে থেমে যায় এবং তাঁর পিছু পিছু চলতে থাকে।
খলীফা বললেন, “আমার পাশাপাশি চলো।” “আমিরুল মুমিনীন! আপনার মর্যাদা ও সম্মানার্থে পিছে হাঁটছি” – লোকটি বলল।
খলীফা বললেন, “সম্মান ও মর্যাদা প্রদানের এ পন্থা ঠিক নয়।
এতে শাসকদের জন্যে ফিতনা ও মুমিনদের জন্য অপমান রয়েছে।”
বলে তিনি তাকে পাশাপাশি চলতে বাধ্য করলেন।
২। হযরত ফাতেমা রাঃ যেভাবে ঘরের কাজকর্ম করতেন !
হযরত আলী (রাঃ) একদিন জনৈক ব্যক্তিকে বললেন, আমি তোমাদেরকে রাসুল (সাঃ) এর সবচেয়ে স্নেহের কন্য
ফাতিমা (রাঃ) এরর জীবন বৃত্তান্ত বলব- তিনি নিজে আটা পিষতেন যার দরুন তাঁর হাতে দাগ পড়ে গিয়েছিল
এবং নিজেই মশক ভরে পানি আনতেন তাই তার বুকে মশকের রশির দাগ সুস্পষ্ট বিদ্যমান ছিল।
আবার নিজেই ঘর ঝাড় দিতেন যে কারনে পরিধেয় কাপড় ময়লাযুক্ত থাকত।
রাসুল (সাঃ) এর কাছে একবার কিছু গোলাম ও বাঁদী আসলে আমি ফাতিমা (রাঃ) কে বললাম,
তুমি গিয়ে রাসুল (সাঃ) এর কাছ থেকে একজন খাদেম নিয়ে আস।
তোমার কাজ কর্মে তাহলে কিছুটা সাহায্য হবে। হযরত ফাতিমা (রাঃ) রাসুল (সাঃ) এর খিদমতে হাযির হলেন,
তখন সেখানে অনেক লোকজন ছিল (তিনি অতি মাত্রায় লাজুক ছিলেন বিধায়) লোক সম্মুখে কিছু না বলেই ফিরে আসলেন।
দ্বিতীয় দিন রাসুল (সাঃ) স্বয়ং আমাদের ঘরে এসে ইরশাদ করলেন,
ফাতিমা তুমি গতকাল কি জন্য আমার কাছে এসেছিলে?
তিনি লজ্জায় চুপ রইলে আমি আরয করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ফাতিমার অবস্থা
নিজ হাতে চাক্কী চালানোর কারনে হাতে দাগ পড়ে গেছে।
সে নিজেই মশক ভরে পানি আনে, যার দরুন বুকে রশির দাগ পড়ে গেছে।
তদুপরি ঘর দুয়ারে ঝাড় দেয়ার কারন কাপড় চোপড় ময়লা থাকে।
তাই গতকাল বলেছিলাম আপনার খিদমতে গিয়ে একজন খাদেম আনার জন্য।
অন্য বর্ননায় রয়েছে ফাতিমা (রাঃ) বলেছিলেন, আব্বাজান আমার আর আলীর জন্য
মেষের চামড়ার একটি মাত্র বিছানা, আমরা রাত্রি বেলায় এটা বিছিয়ে শয়ন করি আর দিনের
বেলায় এরই মধ্যে উটের বকরীকে খাওয়াতে হয়।
একথা শুনে রাসুল (সাঃ) বলেলেন- ফাতিমা! ধৈর্য্যধারন কর।
হযরত মুসা (আঃ) ও তাঁর স্ত্রীর কাছে দশ বছর যাবত একটি মাত্র বিছানা ছিল।
মূলতঃ তা হযরত মুসা (আঃ) এর জুব্বা ছিল। রাত্রি বেলায় এরই মধ্যে শয়ন করতেন।
অতঃপর রাসুল (সাঃ) বললেন, ফাতিমা আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর হুকুম আহকাম পালন কর,
আর ঘরের কাজ নিজ হাতেই সম্পন্ন করতে থাক আর রাতে যখন শেয়ার জন্য
বিছানায় যাবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ , ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ ও ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়ে শয়ন করবে।
মনে রাখবে এরুপ করা খাদেম হতে অধিক উত্তম।
হযরত ফাতিমা (রাঃ) আরয করলেন, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর রাজী আছি।(আবু দাউদ)
৩। প্রথম বিজয় নিশান উড়লো
নবুওয়াতের গুরু দায়িত্ব নিয়ে ধীর যাত্রা শুরু হয়েছে মহানবীর(সা)এর।
গোটা ধরণীটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত, তিনিই মাত্র আলোর এক শিখা। সমূলে জেঁকে বসা ঐ অন্ধকার তার আপ্রাণ হিংস্রতা নিয়ে আলোর অস্তিত্ব বিনাশে উদ্যত। এরই মধ্যে শুরু হলো আলোর সন্তর্পণ যাত্রা। তিন বছর ধরে প্রচার চললো সংগোপনে।
আলোর কাফিলায় এসে শামিল হলো খাদিজা, আলী, জায়েদ, উম্মে আয়মান, আবুবকর সিদ্দিক, উসমান, জোবায়ের, তালহা, আবু উবায়দা, আব্দুল্লাহ ইবনে মসউদ (রা) প্রমুখ।
কিন্তু প্রকাশের জন্যই যে আলোর আগমন তার আত্মগোপন আর কত? প্রতিক্রিয়ার মুকাবিলা এবং বাঁধার পাহাড় ডিঙ্গানোই যে পথের স্বভাবধর্ম তা কি আত্মপ্রকাশ না করে পারে? পারে কি আপোষ করে চলতে? এল অবশেষে সে প্রকাশের দিন।
নাযিল হলো আল্লাহ তাআলার নির্দেশ…… “তোমার প্রতি যে আদেশ তা তুমি স্পষ্ট করে শুনিয়ে দাও এবং মুশরিকদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না।”
প্রকাশ্য দাওয়াতের প্রথম সম্মেলন মহানবী (সা) ডাকলেন তাঁর বাড়িতেই। মহানবীর দাওয়াতে বনু হাশিম বংশের প্রায় ৪০ জন প্রধান ব্যক্তি হাজির হলেন তাঁর গৃহে। গোপন প্রচারের খবর কেউ কেউ জানতেন, জানতো আবু লাহাবও।
সে আঁচ করতে পেরেছিল নবী কি বলতে চান এ সম্মেলনে। তাই খাওয়া-দাওয়া শেষে যেই বলতে শুরু করলেন, হট্টগোল বাঁধালো আবু লাহাব।
বললো সে, “দেখ মুহাম্মাদ, তোমার চাচা, চাচাত ভাই সকলেই এখানে উপস্থিত, চপলতা ত্যাগ কর। তোমার জানা উচিত, তোমার জন্য সমস্ত আরব দেশের সাথে শত্রুতা করার শক্তি আমাদের নেই। তোমার আত্মীয়-স্বজনের পক্ষে তোমাকে ধরে কারারুদ্ধ করে রাখা উচিত।
তোমার ন্যায় স্ববংশের এমন সর্বনাশ কেউ করেনি।”
সেদিনের সম্মেলন ভেঙে গেল। মহানবী(সা) তাঁর বাড়িতে ইসলামের বাণী প্রচারের জন্য আবার সম্মেলন ডাকলেন- দাওয়াতের দ্বিতীয় সম্মেলন। বনু হাশিমের প্রধানবর্গ আবার হাজির হলেন। হাজির হলেন আবু লাহাবও।
এবার মহানবী(সা) আবু লাহাবকে কোন কূটনীতির সুযোগ দিলেন না। খানা পিনার পরই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর দাওয়াত পেশ করলেন। তিনি বলেন, “সমবেত ব্যক্তিগণ, আমি আপনাদের জন্য ইহকাল- পরকালের এমন কল্যাণ এনেছি যা আরবের কোন ব্যক্তি তাঁর স্বজাতির জন্য আনেনি।
আমি আল্লাহর আদেশে সেই কল্যাণের দিকে আপনাদের আহবান করছি।
সত্যের এ মহা সাধনায়, কর্তব্যের কঠোর পরীক্ষায় আপনাদের মধ্য থেকে কে কে আমার সহায় হবেন, কে আমার সাথী হবেন?”
মজলিশে কারো মুখে কোন কথা নেই। একক এক ব্যক্তির কণ্ঠ থেকে আসা সত্যের বজ্র নির্ঘোষ বনু হাশিমের শক্তিমান প্রবীণদের যেন হতবাক করে দিয়েছে।
বাচাল আবু লাহাবও সে মৌনতা ভাঙতে পারলো না, পারলো না সশব্দে সে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতে। হকের এ কণ্ঠের দাওয়াত যেন শত কণ্ঠের শক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়লো।
অবশেষে মৌনতা ভাঙল। ভাঙলেন আবু তালিব পুত্র মহানবীর চাচাতো ভাই বালক আলী।
সবাইকে শুনিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, “এই মহাব্রত গ্রহণের জন্য আমি প্রস্তুত আছি।”
বনু হাশিমের কোনও প্রধানের মুখে কোন কথাই আর জোগাল না।
শুধু আবু লাহাবই প্রকাশ্য দাওয়াতের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার প্রথম রপকাশ ঘটিয়ে, রাসূলকে নয়, আবু তালিবকে বললেন, “দেখছেন আপনের ভ্রাতুষ্পুত্রের কল্যাণে এখন আপনাকে স্বীয় বালকপুত্রের অনুগত হয়ে চলতে হবে।”
কিন্তু আবু লাহাবের এ প্রতিক্রিয়া বিজয়ীর নয়, বিজিতের।
দাওয়াতে হকের নিশান উড়ল এইভাবেই।
 ১। প্রয়োজন চুক্তির চেয়ে বড় হলো না !
বদর যুদ্ধের জোর প্রস্তুতি চলছিল তখন মদীনায়। মক্কার দিক থেকে অহরহ খবর এসে পৌচছে, বিপুল সজ্জা আর বিরাট বাহিনী ছুটে আসছে মদীনার দিকে। কিন্তু সে তুলনায় মদীনায় যুদ্ধ প্রস্তুতি কিছুমাত্র নেই।
যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম যেমন স্বল্প, তেমনি মুসলিম যোদ্ধা সংখ্যাও নগণ্য। প্রতিটি সাহায্য প্রতিটি সহায়তাকারীকেই তখন সাদরে স্বাগত জানানো হচ্ছে সেখানে। এমন সময়ে হুযায়ফা মরুভূমির দীর্ধ পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় মহানবীর (রা) দরবারে গিয়ে হাজির হলেন।
তিনি গাতফান গোত্রের আবস খান্দানের লোক। মুসলিম তিনি। কুফরের সাথে ইসলামের শক্তি পরীক্ষার প্রথম মহাসাগরে অংশ নেয়ার আকুল বাসনা নিয়ে তিনি মদীনায় এসেছেন।
পথের কত বিপদ মাড়িয়ে, বাধার কত দুর্লঘ্য দেয়াল পেরিয়ে তিনি এসে পৌচেছেন নদীনায়। মদীনায় যুদ্ধ আয়োজন দেখে তাঁর চোখ মন জুড়িয়ে গেল।
শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে পরম প্রশান্তি নিয়ে হুযাই ফা দরবারে নববীতে গিয়ে বসলেন। কুশল বার্তা দিতে গিয়ে মহানবীকে (সা) তিনি পথের বিপদ আপদ ও অভিজ্ঞতার কথা জানালেন।
তিনি বললেন, “পথিমধ্যে কুরাইশরা আমাকে আটক করে বলে মুহাম্মাদের কাছে যাওয়ার অনুমতি নেই।” আমি বললাম, “মুহাম্মাদের কাছে নয়, মদীনায় যাচ্ছি।” অবশেষে তারা বলল, “ঠিক আছে, তোমাকেজ ছাড়তে পারি।
কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে যে, মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদের পক্ষে আমাদের বিরুদ্ধে তুমি যুদ্ধে যোগ দেবে না।”
“আমি তাদের এ শর্তে রাজী হয়েই তাদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে মদীনায় এসেছি।”
হযাইফার শেষ কথাটি শুনেই মহানবী (সা) চোখ তুলে তাঁর দিকে চাইলেন।
বললেন, “তুমি কথা দিয়েছ তাদের যে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেবে না তুমি?”
হুযাইফা স্বীকার করলেন। মহানবী (সা) তখন তাঁকে বললেন, “তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি পালন কর। গৃহে ফিরে যাও।
সাহায্য ও বিজয় আল্লাহর হাতে। আমরা তাঁর কাছেই তা চাইব।”
হুযাইফার চোখে নেমে এল আঁধার। আশা ভংগের দুঃখ, জিহাদে যোগ দিতে না পারার বেদনায় মুষড়ে পড়লেন তিনি।
কিন্তু উপায় নেই। মহানবীর (সা) কাছে প্রতিশ্রুতি ভংগের প্রশ্রয় পাবার নেই কোন সামন্য উপায়।
হুযাইফার চোখের সামনেই মদীনা থেকে যুদ্ধযাত্র হলো বদরের দিকে। আর মহানবীর (সা) নির্দেশ শিরে নিয়ে হুযাইফা পা বাড়ালেন বাড়ীর পথে।
২। ধন্য সেই বিধান যা খলীফা পর্যন্ত খাতির করেনা
৬৫৮ সাল। হযরত আলী (রা) খলীফার আসনে।
তাঁর ঢাল চুরি গেল। চুরি করল একজন ইহুদী।
খলীফা আলী কাযীর বিচার প্রার্থী হলেন।কাযী আহবান করলেন দু’পক্ষকেই।
ইহুদি খলিফার অভিযোগ অস্বীকার করল। কাযী খলীফার কাছে সাক্ষী চাইলেন।
খলিফা হাজির করলেন তাঁর এক ছেলেকে এবং চাকরকে।
কিন্তু আইনের চোখে এ ধরণের সাক্ষী অচল। কাযী খলিফার অভিযোগ নাকচ করে দিলেন।
মুসলিম জাহানের খলিফা হয়েও কোন বিশেষ বিবেচনা তিনি পেলেন না।
ইসলামী আইনের চোখে শত্রুমিত্র সব সমান।
ইহুদি বিচার দেখে অবাক হল।
অবাক বিস্ময়ে সে বলে উঠল, “অপূর্ব এই বিচার,ধন্য সেই বিধান যা খলীফাকে পর্যন্ত খাতির করে না,আর ধন্য সেই নবী যার প্ররণায় এরূপ মহৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনের সৃষ্টি হতে পারে।
হে খলিফাতুল মুসলিমিন, ঢালটি সত্যিই আপনার,আমিই তাচুরি করেছিলাম।
এই নিন আপনার ঢাল। শুধু ঢাল নয়, তার সাথে আমার জান-মাল,আমার সবকিছু ইসলামের খেদমতে পেশ করলাম”।
সত্য তার আপন মহিমায় এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে।
৩। শত্রুকে নিজের তরবারি দান
চতুর্থ খলীফা বীরবর আলী। বিস্ময়কর তার শক্তি, সাহস ও ওদার্য।
এক যুদ্ধের ময়দানে বিপুল বিক্রমে তিনি যুদ্ধ করছেন।
একজন বলিষ্ঠ ও সাহসী সৈন্য তার দিকে অগ্রসর হয়ে প্রচন্ড বেগে তাকে আক্রমণ করল।
তুমুল যুদ্ধ চললো। অকস্মাত আলীর আঘাতে শত্রুর তরবারি ভেঙ্গে গেল। শত্রুকে অসহায় দেখে আলী তরবারি কোষ বন্ধ করলেন।
শত্রু মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। আলীকে ক্ষান্ত হতে দেখে সে বিস্মিত হলো।
সে আলীর কাছে আর একখানি তরবারি চাইতেই আলী ততক্ষণাত দ্বিধাহীন চিত্তে নিজের তরবারি খানি তাকে দিয়ে দিলেন।
শত্রু অবাক বিস্ময়ে তার দিকে চেয়ে রইলো . এভাবে নিজেকে অরক্ষিত করে যে বীর অন্যের প্রার্থনা পুর্ণ করে, তার সঙ্গে তো যুদ্ধ অসম্ভব। শত্রু জিজ্ঞাসা করলো, “হে বীর শ্রেষ্ঠ আলী, আপনি কেন এভাবে নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে নিজের তরবারি দান করলেন?”
আলী উত্তর দিলেন, “কিন্তু আমি যে কারও প্রার্থনা অপুর্ণ রাখিনে।”
শত্রু অম্লান বদনে আলীর এই মহত্ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করলো।
সত্যের কাছে অসত্য এমনিভাবে পরাজয় স্বীকার করেছে – যুগে যুগে। সত্যের মহিমা মিথার গর্বকে জয় করেছে।
সত্য-ন্যায়ের শক্তি পশুত্বকে জয় করেছে, অস্রের চাকচিক্য, মৃত্যুর ভ্রুকুটিকে ম্লান করেছে-উপেক্ষা করেছে।
১। উত্তোলিত তলোয়ার কোষবদ্ধ হলো
যুদ্ধের এক ময়দান। মুসলমানদের সাথে কাফিরদের ভীষণ যুদ্ধ চলছে।
হযরত আলী (রা) জনৈক বিপুল বলশালী শত্রুর সাথে যুদ্ধে মত্ত রয়েছেন। বহুক্ষণ যুদ্ধ চলার পর তাকে কাবু করে ভূপাপিত করলেন এবং তাকে আঘাত হানার জন্য তাঁর জুলফিকার উর্ধে উত্তোলন করলেন।
কিন্তু আঘাত হানার আগেই ভুপাতিত শত্রুটি তাঁর চেহারা মুবারকে থুথু নিক্ষেপ করলো।
ক্রোধে হযরত আলীর চেহারা রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। মনে হলো, এই বুঝি তাঁর তরবারি শতগুণ বেশী শক্তি নিয়ে শত্রুকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে। কিন্তু তা হলো না।
যে তরবারিটি আঘাত হানার জন্য উর্ধে উত্তোলিত হয়েছিল এবং যা বিদ্যুৎ গতিতে শত্রুর দেহ লক্ষ্যে ছুটে যাচ্ছিল, তা থেমে গেল। শুধু থেমে গেল নয়, ধীরে ধীরে তা নীচে নেমে এল।
পানি যেমন আগুনকে শীতল করে দেয়, তেমনিভাবে আলীর ক্রোধে লাল হয়ে যাওয়া মুখমন্ডলও শান্ত হয়ে পড়ল।
হযরত আলীর এই আচরণে শত্রুটি বিস্ময় বিমূঢ়।
যে তরবারি এসে তার দেহকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলার কথা, তা আবার কোষবদ্ধ হলো কোন কারণে? বিস্ময়ের ঘোরে শত্রুর মুখ থেকে কিছুক্ষণ কথা সরল না।
এমন ঘটনা সে দেখেনি, শোনেওনি কোনদিন। ধীরে ধীরে শত্রুটি মুখ খুলল। বলল, “আমার মতো মহাশত্রুকে তরবারির নীচে পেয়েও তরবারি কোষবদ্ধ করলেন কেন?”
হযরত আলী বললেন, “আমরা নিজের জন্য কিংবা নিজের কোন খেয়াল খুশী চরিতার্থের জন্য যুদ্ধ করিনা। আমরা আল্লাহর পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য যুদ্ধ করি।
কিন্তু আপনি যখন আমার মুখে থুথু নিক্ষেপ করলেন তখন প্রতিশোধ গ্রহণের ক্রোধ আমার কাছে বড় হয়ে উঠল। এ অবস্থায় আপনাকে হত্যা করলে সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য হতোনা।
বরং তা আমার প্রতিশোধ গ্রহণ হতো। আমি আমার জন্য হত্যা করতে চাইনি বলেই উত্তোলিত তরবারি ফিরিয়ে নিয়েছি।
ব্যক্তিস্বার্থ এসে আমারকে জিহাদের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করুক, তা আমি চাইনা।”
শত্রু বলল, “আমি দূর থেকে এতদিন আপনাদের উদারতা, মহানুভবতা ও সত্যনিষ্ঠার কথা শুনেছি, আজ তা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম।”
শত্রুটি ভূমি শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সংগে সংগে তাওবা করে ইসলাম কবুল করল।
এমন অদম্য অতুল্য বীরের ক্ষুদ্ধ হৃদয়েও এত বেশী ক্ষমা এবং স্বস্তি গুণ বিদ্যমান থাকে, এত বড় যোদ্ধা চরম মুহূর্তেও এমন ভীষণ শত্রুকে এতটুকু কর্তব্য বোধে ছেড়ে দিতে পারেন, এত বাড় জিতেন্দ্রীয় এত বড় ক্ষমাশীলের ইতিহাস আজ পর্যন্ত রচিত হয়নি-একথা শত্রু অকুণ্ঠ চিত্তেই স্বীকার করে নিল। এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন।
২। সেদিন গভীর নিশীথে মহানবী (সা) হিজরত করেছেন। তাঁর ঘরে তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন হযরত আলী (রা)।
মহানবীর কাছে গচ্ছিত রাখা কিছু জিনিস মালিকদের ফেরত দেবার জন্য মহানবী (সা) হযরত আলীকে (রা) তরবারির খোঁচায় জাগিয়ে বললো, “এই, মুহাম্মদ কোথায়?”
নির্ভীক তরুন হযরত আলী উত্তর দিলেন, “আমি সারারাত ঘুমিয়েছি, আর তোমরা পাহারা দিয়েছো। সুতরাং আমার চেয়ে তোমরাই সেটা ভালো জান।”
হযরত আলীর উত্তর তাদের ক্রোধে ঘৃতাহূতি দিল। তারা তাঁকে শাসিয়ে বলল, “মুহাম্মাদের সন্ধান তারাতারি বল, নতুবা তোর রক্ষা নেই।
হযরত আলীও কঠোর কণ্ঠে বললেন, “আমি কি তোমাদের চাকর যে তোমাদের শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রেখেছি? কেন তোমরা আমাকে বিরক্ত করছো?”
একটু থেমে আলী কয়েকজনের নাম ধরে ডেকে বললেন, “তোমরা আমার সাথে এস। তোমাদের জন্য শুভ সংবাদ আছে।” কথা শেষ করে হযরত আলী পথ ধরলেন।
যাদের নাম উল্লেখ করলেন তিনি, তারাও তাঁর পিছু পিছু চললো। তাদের হাতে উলঙ্গ তরবারি।
তাদ্র মনে একটি ক্ষীণ আশা, হয়ত হযরত আলী তাদেরকে মুহাম্মাদ (সা) সন্ধান দিতে নিয়্যে চলেছেন।
হযরত আলী এক গৃহদ্বারে গিয়ে দাঁড়ালেন। পিছনে ফিরে ওদের বললেন, “দাঁড়াও, আমি আসছি।” বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন।
পেছনে কয়েকজনের অন্তরে তখন ‘কি হবে না হবে’ অপরিসীম দোলা। তাদের মনে আশঙ্কাও।
উলংগ তরবারি হাতে তারা পরিস্থিতি মুকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
এমন সময় হযরত আলী বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাতে কয়েকটা ধন-রত্নের তোড়া। তিনি তাদ্র সামনে উপস্থিত হয়ে ধন-রত্নের তোড়া তাদের সামনে ধরে বললেন, “নাও, তোমরা নাকি বহুদিন পূর্বে তোমাদের ধন-রত্নাদি হযরত মুহাম্মাদের (সা) কাছে গচ্ছিত রেখেছিলে?
ভেবেছিলে, গচ্ছিত ধন আর আর পাবেন। আজ তিনি তোমাদের অত্যাচারেই দেশত্যাগী হয়েছেন।
কিন্তু তোমাদের গচ্ছিত সম্পদ তোমাদের হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে গেছেন। এই নাও তোমাদের গচ্ছিত ধন।”
এই কুরাইশরা যে এত শত্রুতার পরও তাদের ধন-রত্ন ফিরে পাবে, সসে কথা কল্পনাও করেনি।
তাই তারা বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে পরস্পর বলাবলি করতে লাগলঃ ‘সত্যই কি আল-আমীনের ন্যায় বিশ্বাসী ও সত্যবাদী লোক বিশ্বে আর নেই? তবে কি তিনি সত্য পথেই আছেন? আমরাই ভ্রান্ত পথে আছি? তাঁকে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে পেয়েছি নিঃস্বার্থ প্রেমের আহবান-মানুষ হবার উপদেশ।
আজ তাঁর প্রাণ নিতে এসেছিলাম, প্রাণ দিতে না পেরে দিয়ে গেলেন গচ্ছিত ধন-রত্ন?
আহ! মুহাম্মাদ (সা) যদি আমাদের ধর্মদ্রোহী না হতেন, তাঁর পদানত দাস হয়ে থাকতেও আমাদের কিছু মাত্র আপত্তি ছিলনা।’

৩। শিক্ষনীয় ঘটনা ও তওবার উপকারিতা!
তিনজন লোক হুসাইন বিন আলী (রা:) এর নিকট আসল ।
প্রথমজন অনাবৃষ্টির অভিযোগ করে বলল “অনেকদিন বৃষ্টি হচ্ছে না” । একথা শুনে হুসাইন বিন আলী (রা;) বললেন “বেশী করে তওবা কর” ।
দ্বিতীয়জন অভিযোগ করল “আমার কোনো সন্তান নেই, আমি সন্তান পেতে আগ্রহী” । একথা শুনে হুসাইন বিন আলী (রা;) বললেন “বেশী করে তওবা কর” ।
৩য়জন ব্যক্তি অভিযোগ করল “এলাকায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে , ফসল উৎপন্ন হচ্ছে না” । তখনও হুসাইন বিন আলী (রা;) বললেন “বেশী করে তওবা কর” ।
তার সামনে যারা বসা ছিল তারা বলল “হে রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ) এর নাতি , তিনজন ৩ ধরনের অভিযোগ করল আর আপনি একই উত্তর দিলেন ?
তিনি একথা শুনে বললেন “তোমরা কি আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার এই বানী পড় নাই ? ”
“স্বীয় প্রভুর নিকট তাওবা কর , নি:সন্দেহে তিনি তাওবা কবুলকারী , তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন , তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তুতিতে এবং তোমাদের জন্য স্হাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত নদী-নালা 

হযরত আলী (রাঃ) এর জীবনের অবিস্মরণীয় সেই ঘটনা!
নবী জামাতা হজরত আলী রা.। তিনি তখন রাষ্ট্র প্রধান। মুসলিম বিশ্বের অধিপতি। হজরত আলীর একটি লৌহবর্ম হারিয়ে যায়। পান একজন ইহুদি। তাও সেই ইহুদি কুফার বাজারে লৌহবর্মটি বিক্রি করছে।
হজরত আলী নিজের লৌহর্বম বিক্রি করতে দেখে ইহুদিকে বলেন, ‘লৌহবর্মটি তো আমার। আমি এটা কারও কাছে বেচিওনি, কাউকে দানও করিনি। এটা আমার উটের পিঠ থেকে অমুক দিন অমুক স্থানে পড়ে গিয়েছিল। সুতরাং লৌহবর্মটি ফিরিয়ে দিন’। ইহুদি বলল এটা আমার জিনিস, আমার হাতে। হজরত আলী বললেন লৌহবর্মটি আমাকে ফিরিয়ে দিন! বর্মটি আমারই!
ইহুদির সঙ্গে রাজ্যপ্রধানের তর্কে সমাধান হচ্ছে না। হজরত আলী বললেন চলো তাহলে বিচারপতির আদালতে! আইনি লড়াইয়ে সমাধান করে আসি। উভয়ে মদিনার বিচারপতি হজরত সুরাইহ রা. আদালতে হাজির। হজরত আলী রা. কে বিচারপতি জিজ্ঞাসা করলেন, আমিরুল মুমিনিন! আপনার বক্তব্য কী? তিনি বললেন তার কাছে যে বর্মটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটা আমার। এটা আমার উটের পিঠ থেকে অমুক দিন অমুক স্থানে পড়ে গিয়েছিল। বিচারপতি হজরত সুরাইহ রা. ইহুদির কাছে তার বক্তব্য জানতে চান। ইহুদি বলেন দেখুন এটা আমারই। কারণ আমার দখলেই তা রয়েছে। দখল যার সম্পদ তার!
সব শোনার পর বিচারপতি সুরাইহ বললেন আমিরুল মুমিনিন সাক্ষি পেশ করুন! হজরত আলী বললেন আমার ছেলে হাসান এবং আমার আজাদ করা ক্রীতদাস কুনবুর সাক্ষি!
বিচারপতি হজরত সুরাইহ রা. বললেন আমিরুল মুমিনিন পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্য এবং মনিবের পক্ষে গোলামের সাক্ষ্য গ্রণযোগ্য নয়। তারপর বিচারপতি হজরত সুরাইহ রা. ইহুদির পক্ষে রায় দেন।
আইনি লড়াই হেরে গেলেন হজরত আলী রা.! তবে জয় হয়েছে ইসলামের। রায় শুনে সেদিন এই ইহুদি বলেছিলেন আমিরুল মুমিনিন আমাকে আদালতে নিয়ে এলেন। আদালত আপনার বিপক্ষে রায় দিল। অথচ আপনি রাষ্ট্র প্রধান। বাইশ লক্ষবর্গ মাইলের মুসলিম বিশ্বের অধিপতি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি ইসলাম সত্যধর্ম। আমাকে এই সত্যধর্মের কালিমা পড়িয়ে দিন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর বান্দা ও রাসুল! আমিরুল মুমিন! এই লৌহবর্ম আপনার। রাতের অন্ধকারে পড়ে গিয়েছিল।
--------*****---------




ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png