রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২
প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে
জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে? কবির এই কবিতার যথার্থতা ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে। “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে৷ আর আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের আমার দিকে ফিরে আসতে হবে৷” ( সূরা আম্বিয়াঃ ৩৫ )
আল্লাহ রাববুল আলামীন কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেনঃ প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। তারপর যাকে দোজখ থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়।(সুরা আল ইমরান: ১৮৫)।
দুনিয়াতে যেই আসে সেই চলে যাবে। এখানে আসার অর্থই তাকে যেতে হবে। আর আসার পর থেকেই যাওয়ার সময় এগুচ্ছে। একজন লোক আসার পর থেকে আমরা দেখছি সে বড় হচ্ছে। কিন্তু আসলে তার যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। যাওয়ার দিকে সে অগ্রসর হচ্ছে। ইসলামী দর্শন এবং ভাবধারায় মৃত্যু একটি নিশ্চিত এবং অবশ্যম্ভাবী ব্যাপার। এর দ্বারা শুধুমাত্র জীবনের পরিসমাপ্তি বুঝায় না বরং এর দ্বারা বুঝায় আত্মার অবস্থার পরিবর্তন। ইসলামী বিশ্বাস মতে সৃষ্টিকর্তা (আল্লাহ) এই জগত এবং জীবন সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে।
মৃত্যুর দ্বারা মানুষের জাগতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে।
মানুষ জানে যে তাকে একদিন মরতে হবে। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে মানবজাতিকে তার মৃত্যুর কথা অবহিত করেছেন। নবী-রাসুলরা তাঁদের উম্মতদের পার্থিব জীবনের পর আরেকটি জীবনের কথা বর্ণনা করেছেন। মানুষের মৃত্যুর কথা অবহিত করার কারণ হলো, যাতে তারা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে। মৃত্যুর পর যদি আর কোনো জীবন না থাকত, তাহলে মৃত্যু নিয়ে কোনো চিন্তার কারণ থাকত না।
মৃত্যু যদি জীবনাবসানের নাম হতো, তবে পৃথিবীতে যার যার ইচ্ছামতো চলার সুযোগ থাকত। কিন্তু মুমিন মাত্রই বিশ্বাস করে যে মৃত্যু মানে এক জীবন থেকে আরেক জীবনে প্রত্যাবর্তন। একটি জীবন শেষ করে আরেকটি নতুন জীবনের সূচনা করা। দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী, আর পরকালের জীবন স্থায়ী। দুনিয়ার সুখ-শান্তি আখিরাতের সুখ-শান্তির তুলনায় তুচ্ছ ও অতি নগণ্য। আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার মৃত্যুর কথা জানিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু কখন, কার কোন জায়গায় মৃত্যু হবে, তা গোপন করেছেন।
হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, মানুষের চোখের দুই ভ্রুর মাঝখানে মৃত্যুর তারিখ লেখা আছে। কিন্তু মানুষ তা দেখতে পায় না। মানুষ থেকে মৃত্যুর তারিখ অজ্ঞাত রাখার কারণ হলো, যদি মানুষ মৃত্যুর নির্দিষ্ট তারিখ জানত, তাহলে এ পৃথিবী অচল হয়ে যেত। মানুষ ঘর-সংসার করত না। মৃত্যুর সময় অজ্ঞাত হওয়ার কারণে মানুষ মনে করে সে দীর্ঘজীবী হবে, এমনকি মৃত্যুর কথাও ভুলে যায়। মানুষ তার মৃত্যুর কথা জানলেও জানেনা তার মৃত্যুর তারিখ ও সময়। মানুষ একেক জন একেক সময় মৃত্যুবরণ করে। তবে তার মৃত্যুর সময় ও তারিখ নির্দিষ্ট। মায়ের জরায়ুতেই তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আমি কোনো জনপদকে ধ্বংস করিনি, কিন্তু তার নির্দিষ্ট সময় লিখিত ছিল। কোনো সম্প্রদায় তার নির্দিষ্ট সময়ের আগে যায় না এবং দেরিও করে না।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৪৫)
দূনিয়াতে সবচেয়ে কষ্টদায়ক হচ্ছে মানুষের মৃত্যু। কারো আপন জনের মৃত্যুতে স্বজনের বিয়োগ ব্যাথাই নয় বরং মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিও প্রচণ্ড শারীরিক কষ্টের সম্মুখীন হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের মৃত্যুকালীন সময়ের এ কষ্টের বিবরণ তাঁর উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন। আবার মৃত্যুর এ ভয়াবহতা থেকে মুক্তি লাভের সুস্পষ্ট আমলও শিখিয়ে গেছেন।
তাম্বীহুল গাফেলিনে মৃত্যুকালীন কষ্টের ওপর একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে, হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার হজরত কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, আমাকে মৃত্যুর অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন। তখন হজরত কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মৃত্যু হলো কাঁটাদার গাছের মতো। কাঁটাযুক্ত সে গাছটি যখন মানুষের পেটে ঢোকানোর পর তার প্রতিটি কাঁটা শিরায় শিরায় লেগে যায়। তখন একজন শক্তিশালী মানুষ যদি গাছিটি ধরে জোরে টেনে বের করার চেষ্টা করে। ওই মুহূর্তে শিরায় শিরায় বিদ্ধ হওয়া কাঁটার আঘাতের কষ্ট মানুষটি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে। অনুরূপভাবে মানুষের মৃত্যুকালীন সময়ে মৃত্যুপথযাত্রীর কাছেও মনে হয় যেন, তার শরীরের গোশতগুলো যেন একটি কাঁটার সঙ্গে বেরিয়ে আসছে। সে মৃত্যুযন্ত্রণা মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে থাকে। এ হলো মৃত্যুকালীন সময়ে মানুষের মৃত্যু যন্ত্রণার নমুনা। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে সেভাবে ভয় কর; যেভাবে ভয় করা উচিত। এবং অবশ্যই (সবধান!) মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১০২)
ছোট্ট একটি শব্দ মৃত্যু! এক শব্দে শেষ হয়ে যায় একটি অধ্যায়। মৃত্যু এমনই এক শব্দ, যা আমাদের নিয়ে যায় অজানা কোন রাজ্যে, যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে কেউ যেতে চায় না। কিন্তু যখন মৃত্যুর ডাক এসে যায়, প্রিয়তমা স্ত্রী, আদরের সন্তান, বাবা-মা কেউ তাদের বন্ধন দিয়ে ধরে রাখতে পারে না। আমরা প্রতি মুহূর্তে এই মৃত্যুকে নিজের সাথে বয়ে বেড়াই। কেউ জানি না এক মিনিট পরে এই পৃথিবীতে আর বেঁচে থাকবো কিনা।
মৃত্যু সংক্রান্ত ইসলামী ব্যাখ্যা এতটাই ব্যাপক যেন এটা একটা ছবির মতই পরিষ্কার। মৃত্যু নিয়ে অনেক বছর ধরেই গবেষকরা গবেষণা করে যাচ্ছেন। কেউ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন মৃত্যুর কারণ। কেউ খুঁজছেন মৃত্যু আসন্ন হলে ওই ব্যক্তি কী কী অনুভব করে। কেউ জানার চেষ্টা করছেন মৃত ব্যক্তির অনুভূতি আছে কিনা। মৃত্যু আসন্ন হলে শেষবারের মতো আরেকটু বাঁচার আকুতি জাগে কিনা। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর জানার বাইরেই রয়ে গেছে। তবে ইসলাম মৃত্যুকালীন, মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে বেশ স্পষ্ট করেই বর্ণনা করেছে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, যখন মানুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হয় এবং রূহ বের হবার সময় ঘনিয়ে আসে, তখন চারজন ফেরেশতা তার কাছে উপস্থিত হয়। মৃত্যুর ফেরেশতা (মালাক উল মউত, যাকে আজরাইল ও বলা হয়) মৃত ব্যক্তির রুহ তথা আত্মা শরীর থেকে বের করে নিয়ে যান, এবং তার সাথে থাকেন আরও অন্যান্য ফেরশতারা। মৃত ব্যক্তির জাগতিক জীবনাচারের উপর ভিত্তি করে তার মৃত্যুর আয়োজন ঠিক করা হয়।
মৃত্যুর পূর্বে ৪ জন ফেরেস্তা তার কাছে উপস্থিত হয়ে যেভাবে জানিয়ে দেয় মৃত্যুর আগাম সংবাদঃ
সর্বপ্রথম এক ফেরেশতা উপস্থিত হয়ে বলবেন,আসসালামু আলাইকুম” হে অমুক! আমি তোমার খাদ্য সংস্থানের কাজে নিযুক্ত ছিলাম কিন্তু এখন পৃথিবীর পূর্ব থেক পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত অন্বেষণ করেও তোমার জন্য এক দানা খাদ্য সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং বুঝলাম তোমার মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে হয়ত এখনই তোমাকে মরণ সুধা পান করতে হবে। পৃথিবীতে তুমি আর বেশীক্ষণ থাকবে না।
অত:পর দ্বিতীয় ফেরেশতা এসে সালাম করে বলবেন হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পানীয় সরবরাহের জন্য নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু এখন তোমার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র অন্বেষণ করেও এক ফোঁটা পানি সংগ্রহ করতে পারলাম না। সুতরাং আমি বিদায় হলাম।
অত:পর তৃতীয় ফেরেশতা এসে সালাম করে বলবেন হে আল্লাহর বান্দা! আমি তোমার পদযুগলের তত্ত্বাবধানে নিযুক্ত ছিলাম, কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র ঘুরেও তোমার জন্য একটি মাত্র পদক্ষেপের স্থান পেলাম না। সুতরাং আমি বিদায় নিচ্ছি।
চতুর্থ ফেরেশতা এসে সালাম করে বলবেন হে আল্লাহ বান্দা!আমি তোমার শ্বাস-প্রস্বাস চালু রাখার কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু আজ পৃথিবীর এমন কোন জায়গা খুঁজে পেলাম না যেখানে গিয়ে তুমি মাত্র এক পলকের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করতে পার। সুতরাং আমি বিদায় নিচ্ছি।
অতঃপর কেরামান কাতেবীন ফেরশতাদ্বয় এসে সালাম করে বলবেন, হে আল্লাহর বান্দা! আমরা তোমার পাপ-পূণ্য লেখার কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু এখন দুনিয়ার সব জায়গা সন্ধান করেও আর কোন পাপ-পূণ্য খুঁজে পেলাম না। সুতরাং আমরা বিদায় নিচ্ছি।এই বলে তারা এক টুকরা কালো লিপি বের করে বলবেন হে আল্লাহর বান্দা!এর দিকে লক্ষ্য কর। সে দিকে লক্ষ্য করা মাত্র তার সর্বাঙ্গে ঘর্মস্রোত প্রবাহিত হবে এবং কেউ যেন ঐ লিপি পড়তে না পারে এজন্য সে ডানে বামে বার বার দেখতে থাকবে। অত:পর কেরাম কাতেবীন প্রস্থান করবেন। তখনই মালাকুল মউত তার ডান পাশে রহমতের ফেরেশতা এবং বাম পাশে আযাবের ফেরেশতা নিয়ে আগমন করবেন। তাদের মধ্যে কেউ আত্মাকে খুব জোরে টানাটানি করবেন, আবার কেউ অতি শান্তির সাথে আত্মা বের করে আনবেন। কন্ঠ পর্যন্ত আত্মা পৌঁছলে স্বয়ং যমদূত তা কবজ করবেন।
মৃত্যুর পর পুনরুত্থানঃ
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেঃঃ ‘যারা মুক্তমন নিয়ে শোনে, তারাই সত্যের ডাকে সাড়া দেয়। মহাবিচার দিবসে আল্লাহ মৃতদের পুনর্জীবিত করবেন। তারপর তারা তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।’ (সূরা আনজাম, আয়াত ৩৬)। অপর এক আয়াতে বলা হয়েছেঃ ‘তিনিই নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উন্মেষ ঘটান আবার প্রাণকে করেন নিষ্প্রাণ। ধূসর জমিনকে তিনিই সজীব করে তোলেন। এমনিভাবে তোমাদেরও মৃত অবস্থা থেকে পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সূরা রুম, আয়াত ১৯)
মৃত্যুর পর শরীরের অনেকগুলি পরিবর্তন ঘটে যা থেকে মৃত্যুর সময় ও কারণ নির্ণয় করা যায়। মৃত্যুর আলামত হলো, নাক একদিকে সামান্য বাঁকা হয়ে যাওয়া। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুতবেগে প্রবাহিত হওয়া ও ঘন ঘন নিঃশ্বাস নেওয়া। পা ঢিলা হয়ে যাওয়া এবং দাঁড়াতে না পারা। কানপট্টি ভেঙে যাওয়া। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/১৮৯, আহকামে মায়্যিত : ২২৬)
মারা যাবার পরপরই পার্শ্ববর্তী পরিবেশের প্রভাবে দেহ ঠান্ডা হয়ে যায়, যাকে বলে Algor mortis। এটাকে মৃত্যুর দ্বিতীয় ধাপও বলা হয়। মারা যাবার পাঁচ থেকে দশ ঘণ্টা পরে কঙ্কালের পেশীগুলো শক্ত হয়ে যায়, যাকে বলে Rigor mortis, এবং এটি তিন-চার দিন পরে শেষ হয়ে যায়। রেখে দেওয়া দেহের নীচের অংশে যে লাল-নীল রঙ দেখা যায়, তাকে বলে Livor mortis; রক্ত জমা হবার কারণে এমন হয়। মৃত্যুর খানিক বাদেই রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে। তারপরে দেহের যে পচন শুরু হয়, তার জন্য দায়ী এনজাইম ও ব্যাক্টেরিয়া। দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিভিন্ন সময়ে মারা যায়। সোমাটিক মৃত্যুর ৫ মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলির মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের কোষগুলি ১৫ মিনিট এবং বৃক্কের কোষগুলি প্রায় ৩০ মিনিট বেঁচে থাকতে পারে।
উপসংহারঃ আল্লাহ তাআলা মানুষকে যেহেতু তার মৃত্যুর কথা জানিয়ে দিয়েছেন, সেহেতু তার উচিত হবে মৃত্যুর জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। আর মুমিন যেহেতু বিশ্বাস করে তার মৃত্যুর পরে আরেকটি জীবন আছে, সেহেতু তার কর্তব্য হলো পারলৌকিক জীবনের সুখের জন্য কাজ করা। তাদের ভাবা দরকার, আমাদের আগে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের অনেকের কবরও খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের অবস্থাও অনুরূপ হবে যে পরবর্তী সম্প্রদায় আমাদের কবরও খুঁজে পাবে না। তাই মুমিনদের উচিত, সর্বপ্রকার গর্ব-অহংকার, অন্যায়-অবিচার, পাপাচার ইত্যাদি অপকর্ম বর্জন করে স্বীয় প্রভুর নির্দেশমতো পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র জীবন লাভ করা এবং আখিরাতের সুখ-শান্তি কামনা করা। সময় বয়ে যাচ্ছে, জন্মের সাথে সাথে জীবন নামক সূর্য ক্রমে অস্তমিত হওয়ার দিক ধাবিত হচ্ছে। আর ভোগ-বিলাস, আনন্দ-আহ্লাদে সময়ক্ষেপণ নয়। এখন থেকেই আখেরাতের প্রস্তুতিতে পাথেয় সংগ্রহে নিজেকে সমর্পণ করে আল্লাহপাক ও রাসুলের (সা.) সন্তুষ্টি, নৈকট্য অর্জনে সময় কাটিয়ে দিই এবং আল্লাহর নির্দেশমতে, কম হাসি এবং বেশি বেশি কাঁদি।
আমাদের মন-প্রাণ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর সমর্পণ করি। মৃত্যুর ভয় নয়, সময় থাকতে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আল্লাহপাক ও রাসুলের (সাঃ) এর পবিত্র কোরআন-হাদিসের আলোকে কায়মনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইবাদত-বন্দেগি ও আমলে সালেহ সৎকর্ম করি এবং পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামের আলোকে জীবন পরিচালনা করি। এতে আমরা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করে আখেরাতে নাজাত লাভে সমর্থ হব। আল্লাহ তাআলা আমাদের পরকালের সুখ-শান্তির জন্য বেশি বেশি করে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্রঃ মাসিক আল কা্উসার
আপনজন মারা গেলে যেসব কাজ করা নিষিদ্ধ
জীবন যার আছে, তাকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে। এটাই চিরন্তন সত্য। জন্মেছে কিন্তু আর মরবে না এমনটি চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা মহান আল্লাহ কোরআনুল কারিমের একাধিক আয়াতে মৃত্যুর বিষয়টি সুনিশ্চিত করেছেন এভাবে-
کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ
‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ১৮৫)
মৃত্যুর পর আপনজন কান্নাকাটি ও বিলাপ করে থাকে। কিন্তু আপনজন মৃত্যুবরণ করার পর তার ছেলে-সন্তানসহ নিকট আত্মীয়দের জন্য এমন কিছু কাজ-কর্ম হারাম বা নিষিদ্ধ। যা সাধারণত তারা করে থাকে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কিছু বিষয় হারাম করেছেন। যে কাজগুলো মানুষ করে থাকে, যখন তাদের আপনজনদের কেউ মারা যায়। তাহলো-
১. মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ বা সুর করে কাঁদা। নবিজি বলেছেন, মানুষের মাঝে দুটি বিষয় রয়েছে যাতে তারা কুফরি করে- ক. বংশের খোঁটা দেয়া, খ. মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে কাঁদা। এগুলো নিষেধ।
২. গালে বা শরীরে আঘাত করা।
৩. জামা- কাপড় ছেঁড়া। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি গাল চাপড়ায় বা জামার গলা বা পকেট ছিঁড়ে ফেলে এবং জাহিলিয়াতের মতো আচরণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়।
৪. কারো মৃত্যুতে চুল কামিয়ে ফেলা বা মাথা মুণ্ডন করা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুর ভয়ে উচ্চ আওয়াজকারীনী নারী থেকে এবং মাথামুণ্ডনকারীনী নারী থেকে এবং অধিক কঠিনতা অবলম্বনকারীনী নারী থেকে পবিত্র ছিলেন।
৫. কারো মৃত্যুতে কবিতা বা কাসিদা প্রকাশ করা।
৬. দিনের কিছু সময় মৃত ব্যক্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে জন্য কবিতা আবৃত্তি করা।
৭. মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর সংবাদ তার পক্ষ থেকে প্রচার করা। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শোকসংবাদ ঘোষণায় নিষেধ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সবাইকে আপনজনের মৃত্যুতে ধৈর্যধারণ করার তাওফিক দান করুন। উল্লেখিত বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সুত্র : অনলাইন নিউজ
বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২
ওসীয়্যতের নির্দেশ
মানুষের অঙ্গ–প্রত্যঙ্গ তার বিরুদ্ধ সাক্ষ্য দিবে
ওসীয়্যত প্রসঙ্গে
আমলনামা লিখার জন্য ফেরেশতা নির্ধারিত
আখিরাতের প্রতি ইমান
সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২
মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান
বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২
সিহাহ সিত্তাহ এর পরিচয়
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথা, কাজ, বাণী ও মৌনসম্মতিকে হাদিস বলে। রাসূল (সাঃ) এর জীবদ্দশায় হাদিস সংকলন করা নিষিদ্ধ ছিল। তাই রাসূল (সাঃ) এর শেষ জীবন ও পরবর্তী সময়ে হাদিস সংকলন শুরু হয়। আর সেই সংকলনের বিশুদ্ধতম ৬ টি হাদিস গ্রন্থই হলো সিহাহ সিত্তাহ।
সিহাহ সিত্তাহ এর পরিচয়
সহিহ আরবি শব্দ। যার বহুবচন হলো সিহাহ। সিহাহ অর্থ হলো বিশুদ্ধ, নির্ভুল। আর সিত্তা অর্থ হলো ছয়। অর্থাৎ, শব্দ দুটির অর্থ হলো বিশুদ্ধ ছয়খানা অর্থাৎ, হাদিসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ।
হাদীসের প্রধান ৬ টি গ্রন্থকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়। এটি দ্বারা “নির্ভুল ৬” বুঝানো হয়।
ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, “হিজরী ৩য় শতাব্দীতে হাদিস গ্রন্থের যে ৬ টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ সংকলন করা হয় তাই সিহাহ সিত্তাহ।
জমহুর মুহাদ্দিসিন-ই-কিরামের মতে, “হাদিস শাস্ত্রের বিশুদ্ধতম ৬ টি সংকলনকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলে।”
মুহাদ্দিসগণ বলেন, “হাদিস শাস্ত্রে যে ৬ খানি সংকলনের বিশুদ্ধতা ও প্রমাণের ব্যাপারে সর্বজন বিদিত ও স্বীকৃত তাই সিহাহ সিত্তাহ।”
এ গ্রন্থগুলো নবী (সাঃ) এর মৃত্যুর ২০০ বছর পর ৬ জন সংগ্রহকারীর দ্বারা সংগৃহীত হয়েছে।
সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থ ও এর সংকলক
সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থ ৬ টি। এগুলো হলো –
গ্রন্থের নাম সংকলকের নাম হাদিসের সংখ্যা
সহিহুল বুখারি -আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারী-৭২৭৫ টি
সহীহ মুসলিম -আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম-৯২০০ টি
জামিউত তিরমিজী- আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত তিরমিজী -৩৬০৮ টি
সুনানে আল নাসাঈ -আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইবনে আলী ইবনে শোয়াইব -৫৭৫৮ টি
সুনানে আবু দাউদ -আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে আস আম- ৫১৮৪ টি
সুনানে ইবনে মাজাহ -আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মাজাহ- ৪৩৪১ টি
সন্তানাদি ও আবাসস্থল নিরাপদের জন্য দো‘আ:
উচ্চারণ: রাববিজ‘আল হা-যা বালাদান্ আ-মিনাওঁ ওয়ারঝুক্ব আহলাহূ মিনাছ্ছামারা-তি মান আ-মানা মিনহুম বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি।
অর্থ: “পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তির স্থান কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও ক্বিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস করে তাদেরকে ফলমূল দ্বারা রিযিক দান কর।” [বাক্বারাহ: ১২৬]
উৎস: ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁর শিশুসন্তান ইসমাঈলকে ও তাঁর স্ত্রী হাযেরাকে জনমানবশূন্য প্রান্তর বর্তমান কা‘বা ঘর ও যমযম কূপের সন্নিকটে রেখে আসেন, তখন উক্ত দো‘আ করেন। যাতে করে এই জনমানবহীন মরুপ্রান্তর নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য একটি শান্তির শহরে পরিণত হয়, যাতে এখানে বসবাস করা আতংকজনক না হয় এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়। শহরটি যেন হত্যা, লুণ্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ হয়। ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আর ফলেই আল্লাহ তা‘আলা মক্কাকে সম্মানিত ও নিরাপদ রেখেছেন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে দিয়েছেন।
উৎস: ছহীহ কিতাবুদ দো‘আ, মোঃ নূরুল ইসলাম
* ইবনু কাছীর, তাফসীর আল-কুরআনুল আযীম, পৃঃ ২২৬; বুখারী হা/৩১২২।
বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২
স্বামী-স্ত্রীর অধিকার
লেখক: আখতারুজ্জামান মোহাম্মাদ সুলাইমান
বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটি সুদৃঢ় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা এর চির স্থায়িত্ব পছন্দ করেন, বিচ্ছেদ অপছন্দ করেন। এরশাদ হচ্ছে: ‘তোমরা কীভাবে তা (মোহরানা) ফেরত নিবে ? অথচ তোমরা পরস্পর শয়ন সঙ্গী হয়েছ এবং তোমাদের নিকট সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।’ [নিসা : ২১]
এ চুক্তিপত্র ও মোহরানার কারণে ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে কতক দায়দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। যা বাস্তবায়নের ফলে দাম্পত্য জীবন সুখী ও স্থায়ী হবে—সন্দেহ নেই। সে সব অধিকারের প্রায় সবগুলোই সংক্ষেপ আকারে বর্ণিত হয়েছে কোরআনের আয়াতে: ‘যেমন নারীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমন তাদের জন্যও অধিকার রয়েছে ন্যায্য-যুক্তিসংগত ও নীতি অনুসারে। তবে নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ [বাকারা : ২২৭]
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেকের উপর প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে। যদিও আনুগত্য এবং রক্ষনা-বেক্ষন ও অভিভাবকত্বের বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের।এখানে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে বিরাজমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার স্তর ও মানের ভিত্তিতে উল্লেখ করছি।
প্রথমত, যে সব অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সমান:
১. দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সততা, বিশ্বস্ততা ও সদ্ভাব প্রদর্শন করা
যাদের মাঝে নিবিড় বন্ধুত্ব, অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক, অধিক মেলামেশা, সবচেয়ে বেশি আদান-প্রদান তারাই স্বামী এবং স্ত্রী। এ সম্পর্কের চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে ভাল চরিত্র, পরস্পর সম্মান, নম্র-ভাব, হাসি-কৌতুক এবং অহরহ ঘটে যাওয়া ভুলচুক ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা অবশ্যম্ভাবী। এবং এমন সব কাজ, কথা ও ব্যবহার পরিত্যাগ করা, যা উভয়ের সম্পর্কে চির ধরে কিংবা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন: ‘তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর।’ [নিসা : ১৮]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল।’ [ইবনে মাজাহ : ১৯৬৭]
পরস্পর সদ্ভাবে জীবন যাপন একটি ব্যাপক শব্দ। এর মাঝে সমস্ত অধিকার বিদ্যমান।
২ পরস্পর একে অপরকে উপভোগ করা
এর জন্য আনুষঙ্গিক যাবতীয় প্রস্তুতি ও সকল উপকরণ গ্রহণ করা। যেমন সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ দুর্গন্ধ ও ময়লা কাপড় পরিহার ইত্যাদি। স্বামী স্ত্রী প্রত্যেকের এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। অধিকন্তু এগুলো সদ্ভাবে জীবন যাপনেরও অংশ।ইবনে আব্বাস রা. বলেনঃ ‘আমি যেমন আমার জন্য স্ত্রীর সাজগোজ কামনা করি, অনুরূপ তার জন্য আমার নিজের সাজগোজও পছন্দ করি।’
তবে পরস্পর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই হারাম সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ বস্তু হতে বিরত থাকতে হবে।
৩ বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা
সাংসারিক সমস্যা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা না করাই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে উপভোগ্য বিষয়গুলো গোপন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্ব-নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং যার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হয়, অতঃপর সে এর গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়।‘ [মুসলিম : ২৫৯৭]
৪ পরস্পর শুভ কামনা করা, সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়া
আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপর থেকে উপদেশ পাওয়ার অধিক হকদার।দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা উভয়েরই কর্তব্য।আর এর অন্তরভূক্ত হচ্ছে, পরস্পর নিজ আত্মীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করা ।
সন্তানদের লালন-পালন ও সুশিক্ষার ব্যাপারে উভয়েই সমান, একে অপরের সহযোগী। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।’ [মায়েদা : ২]
দ্বিতীয়ত, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য:
সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গিনী স্ত্রীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।
১. স্বামীর আনুগত্য
স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য। তবে যে কোন আনুগত্যই নয়, বরং যেসব ক্ষেত্রে আনুগত্যের নিম্ন বর্ণিত তিন শর্ত বিদ্যমান থাকবে।
(ক) ভাল ও সৎ কাজ এবং আল্লাহর বিধান বিরোধী নয় এমন সকল বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয়।
(খ) স্ত্রীর সাধ্য ও সামর্থ্যরে উপযোগী বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বারোপ করেন না।
(গ) যে নির্দেশ কিংবা চাহিদা পূরণে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা।
আনুগত্য আবশ্যক করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘নারীদের উপর পুরুষগণ শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী।’ [বাকারা : ২২৭]
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: ‘পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী। কারণ আল্লাহ তাআলা-ই তাদের মাঝে তারতম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের বিধান রেখেছেন। দ্বিতীয়ত পুরুষরাই ব্যয়-ভার গ্রহণ করে।’ [নিসা : ৩৪]
উপরন্তু এ আনুগত্যের দ্বারা বৈবাহিক জীবন স্থায়িত্ব পায়, পরিবার চলে সঠিক পথে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বামীর আনুগত্যকে এবাদতের স্বীকৃতি প্রদান করে বলেন— ‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসের রোজা রাখে এবং নিজের লজ্জাস্থান হেফাজত করে ও স্বীয় স্বামীর আনুগত্য করে, সে,নিজের ইচ্ছানুযায়ী জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে।‘ [আহমাদ : ১৫৭৩]
স্বামীর কর্তব্য, এ সকল অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে আল্লাহর বিধানের অনুসরণ করা। স্ত্রীর মননশীলতা ও পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সত্য-কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের উপদেশ প্রদান করা কিংবা হিতাহিত বিবেচনায় বারণ করা।উপদেশ প্রদান ও বারণ করার ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ ও উন্নত মননশীলতার পরিচয় দেয়া । এতে সানন্দ চিত্তে ও স্বাগ্রহে স্ত্রীর আনগত্য পেয়ে যাবে।
২. স্বামী-আলয়ে অবস্থান
নেহায়েত প্রয়োজন ব্যতীত ও অনুমতি ছাড়া স্বামীর বাড়ি থেকে বের হওয়া অনুচিত।মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীদের সম্বোধন করে বলেন—সকল নারীই এর অন্তর্ভুক্তঃ ‘তোমরা স্ব স্ব গৃহে অবস্থান কর, প্রাচীন যুগের সৌন্দর্য প্রদর্শনের মত নিজেদের কে প্রদর্শন করে বেড়িও না।’ [আহযাব : ৩৩]
স্ত্রীর উপকার নিহিত এবং যেখানে তারও কোন ক্ষতি নেই, এ ধরনের কাজে স্বামীর বাধা সৃষ্টি না করা। যেমন পর্দার সাথে, সুগন্ধি ও সৌন্দর্য প্রদর্শন পরিহার করে বাইরে কোথাও যেতে চাইলে বারণ না করা। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহর বান্দিদেরকে তোমরা আল্লাহর ঘরে যেতে বাধা দিয়ো না।‘ [বুখারী: ৮৪৯ ]
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা: এর স্ত্রী যয়নব সাকাফী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলতেন: ‘তোমাদের কেউ মসজিদে যাওয়ার ইচ্ছে করলে সুগন্ধি ব্যবহার করবে না।‘ [মুসলিম : ৬৭৪]
৩. নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা
স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করা। স্বামীর সাধ্যের অতীত এমন কোন আবদার কিংবা প্রয়োজন পেশ না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘স্ত্রী স্বীয় স্বামীর ঘরের জিম্মাদার। এ জিম্মাদারির ব্যাপারে তাকে জবাবদেহিতার সম্মুখীন করা হবে।’ [বুখারী: ২৫৪৬]
৪. নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা
পূর্বের কোন এক আলোচনায় আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদিস এ মর্মে উল্লেখ করেছি যে, নিজেকে কখনো পরীক্ষা কিংবা ফেতনার সম্মুখীন না করা।
৫. স্বামীর অপছন্দনীয় এমন কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়া
হোক না সে নিকট আত্মীয় কিংবা আপনজন। যেমন ভাই-বেরাদার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে বিছানায় জায়গা না দেয়া স্ত্রীদের কর্তব্য।’ [মুসলিম : ২১৩৭]
স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল রোজা না রাখা। কারণ, রোজা নফল—আনুগত্য ফরজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘নারীর জন্য স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখা বৈধ নয়। অনুরূপ ভাবে অনুমতি ব্যতীত তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়াও বৈধ নয়।‘ [বুখারী : ৪৭৬৯]
তৃতীয়ত:
স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য, সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গী স্বামীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।
১. দেন মোহর
নারীর দেন মোহর পরিশোধ করা ফরজ। এ হক তার নিজের, পিতা-মাতা কিংবা অন্য কারো নয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে স্ত্রীদের মোহরানা দিয়ে দাও।’ [নিসা : ৪]
২. ভরন পোষণ
সামর্থ্য ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী স্ত্রীর ভরন-পোষণ করা স্বামীর কর্তব্য। স্বামীর সাধ্য ও স্ত্রীর মর্তবার ভিত্তিতে এ ভরন-পোষণ কম বেশি হতে পারে।অনুরূপ ভাবে সময় ও স্থান ভেদে এর মাঝে তারতম্য হতে পারে।আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘বিত্তশালী স্বীয় বিত্তানুযায়ী ব্যয় করবে। আর যে সীমিত সম্পদের মালিক সে আল্লাহ প্রদত্ত সীমিত সম্পদ হতেই ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে পরিমাণ দিয়েছেন, তারচেয়ে’ বেশি ব্যয় করার আদেশ কাউকে প্রদান করেন না।‘ [তালাক : ৭]
৩. স্ত্রীর প্রতি স্নেহশীল ও দয়া-পরবশ থাকা
স্ত্রীর প্রতি রূঢ় আচরণ না করা। তার সহনীয় ভুলচুকে ধৈর্যধারণ করা। স্বামী হিসেবে সকলের জানা উচিত, নারীরা মর্যাদার সম্ভাব্য সবকটি আসনে অধিষ্ঠিত হলেও, পরিপূর্ণ রূপে সংশোধিত হওয়া সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামী। কারণ, তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্ট। পাঁজরের উপরের হাড়টি সবচে’ বেশি বাঁকা। (যে হাড় দিয়ে নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে) তুমি একে সোজা করতে চাইলে, ভেঙে ফেলবে। আবার এ অবস্থায় রেখে দিলে, বাঁকা হয়েই থাকবে। তাই তোমরা তাদের কল্যাণকামী হও, এবং তাদের ব্যাপারে সৎ-উপদেশ গ্রহণ কর।’ [বুখারী, মুসলিম, রিয়াদুস সলিহীন :: বই ১ :: হাদিস ২৭৩]
৪. স্ত্রীর ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল হওয়া
হাতে ধরে ধরে তাদেরকে হেফাজত ও সুপথে পরিচালিত করা। কারণ, তারা সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল, স্বামীর যে কোন উদাসীনতায় নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর ফেতনা হতে খুব যত্ন সহকারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘আমার অবর্তমানে পুরুষদের জন্য নারীদের চে’ বেশি ক্ষতিকর কোন ফেতনা রেখে আসিনি।’ [বুখারী:৪৭০৬]
নারীদের ব্যাপারে আত্মম্ভরিতার প্রতি লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘তোমরা সা’আদ এর আবেগ ও আত্মসম্মানবোধ দেখে আশ্চর্যান্বিত হচ্ছ। আমি তার চে’ বেশি আত্মসম্মানবোধ করি,আবার আল্লাহ আমারচে’ বেশি অহমিকা সম্পন্ন।’ [মুসলিম : ২৭৫৫]
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, যার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ নেই সে দাইয়ূছ (অসতী নারীর স্বামী, যে নিজ স্ত্রীর অপকর্ম সহ্য করে)। হাদিসে এসেছেঃ ‘দাইয়ূছ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ [দারামি : ৩৩৯৭]
মানুষের সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদার বিষয় নিজের পরিবার। এর ভেতর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত স্বীয় স্ত্রী। অতঃপর অন্যান্য আত্মীয় স্বজন এবং অধীনস্থগণ।
পরিশেষে নির্ঘাত বাস্তবতার কথা স্বীকার করে বলতে হয়, কোন পরিবার সমস্যাহীন কিংবা মতবিরোধ মুক্ত নয়। এটাই মানুষের প্রকৃতি ও মজ্জাগত স্বভাব। এর বিপরীতে কেউ স্বীয় পরিবারকে নিষ্কণ্টক অথবা ঝামেলা মুক্ত কিংবা ফ্রেশ মনে করলে, ভুল করবে। কারণ, এ ধরাতে সর্বোত্তম পরিবার কিংবা সুখী ফ্যামিলির একমাত্র উদাহরণ আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবার ও ফ্যামিলি। সেখানেও আমরা মানবিক দোষ-ত্রুটির চিত্র দেখতে পাই, অন্য পরিবারের পবিত্রতা কোথায় ?
জ্ঞানী-গুণীজনের স্বভাব ভেবে-চিন্তে কাজ করা, ত্বরা প্রবণতা পরিহার করা, ক্রোধ ও প্রবৃত্তিকে সংযমশীলতার সাথে মোকাবিলা করা।কারণ, তারা জানে যে কোন মুহূর্তে ক্রোধ ও শয়তানের প্ররোচনায় আত্মমর্যাদার ছদ্মাবরণে মারাত্মক ও কঠিন গুনাহ হয়ে যেতে পারে।যার পরিণতি অনুসূচনা বৈকি? আবার এমনও নয় যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত কল্যাণ ও সুপথ বান্দার নখদর্পে করে দিয়েছেন। তবে অবশ্যই তাকে মেধা, কৌশল ও বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে।
সমাপ্ত










