শিরোনাম
Loading latest headlines...

শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

আইয়ূব নবী ও তার স্ত্রীর জীবনী

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

যখন মেসোপটেমিয়ার ব-দ্বীপটির উপরিভাগে সেমিটিক উপনিবেশিকদের প্রধানদল সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠল, তখন তাদের একটি দলের মধ্যে হযরত আইয়ূব জন্মগ্রহণ করলেন। আইয়ূব আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সর্বদা দ্বীনের উপর কায়েম থাকতেন। তার সাত পুত্র সন্তান ও তিন কন্যা সন্তান ছিল। তিনি ছিলেন সম্পদশালী। চাষাবাদের পাশাপাশি পশুপালন ছিল তার আয়ের প্রধান উৎস। মূলতঃ তার এই পশুপাল ও চাষবাসের জন্যে তার প্রচুর দাসদাসীও ছিল। পরিবার ও সন্তানদের মঙ্গলের জন্যে তিনি প্রায়ই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবাণী দিতেন। বলা চলে নিতান্ত সুখের মধ্যে দিয়েই তিনি জীবন-যাপন করছিলেন। তার এই সুখের দিনগুলির বর্ণণা তার নিজের মুখে এরকম-

‘সর্বশক্তিমান খোদা আমার সঙ্গে রয়েছেন, আর আমার সন্তান-সন্তুতিরা আমায় ঘিরে রয়েছে।
আমার জীবন-যাপন আরাম-আয়েশে পূর্ণ।

যখন আমি শহরের ফটকে গিয়ে চকে আসন গ্রহণ করি, তখন যুবকেরা আমায় দেখে সরে দাঁড়ায়,আর বৃদ্ধরা উঠে দাঁড়ায়, নেতাদের গলারস্বর থেমে যায়, আর সকলে আমার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে, আমার পরামর্শের জন্যে নীরব থাকে, আমার কথার পরে তারা আর কথা বলে না।

সকলেই আমার প্রশংসা করে,
যারা আমার কথা শুনে তারা নিজেকে ধন্য মনে করে।
কারণ আমি অন্ধদের দৃষ্টি আর খঞ্জদের শক্তি
অনাথ ও অভাবীদের পিতার মত।

আমি বিদেশীদের পক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করি,
আর দুষ্টদের চোয়াল ভেঙ্গে দিই,
সত্যি বলতে কি, সৈন্যদলের মধ্যে রাজা যেমন,
আমি তেমনই।’

আইয়ূবের খোদা ভক্তি দেখে ইবলিস মনে মনে বলত, ‘ওহে আইয়ূব, তুমি কি এমনি এমনি তাঁকে ভক্তি কর? তিনি কি তোমার গৃহ ও গৃহস্থলীর সবকিছূ তাঁর রহমতে সিক্ত রাখেননি? তাঁর করুণা ও রহমতের কারণে কি তোমার পশুপাল এমন অসাধারণ বৃদ্ধিলাভ করেনি?'

ইবলিস জানত সাধারণ মানুষকে বরবাদ করতে পারলেও কোন নবীকে বরবাদ করার ক্ষমতা তার নেই। তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটবে না। আদমকে দুনিয়াতে পাঠানোর আগে তাকে এটা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমার দাসদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।-(১৭:৬৫) বা, আমার দাসদের ওপর তোমার কোন প্রভাব খাটবে না।’-(১৫:৪২) সুতরাং সে ভাবল- 'আমি তার সন্তান ও সম্পদের উপর একে একে আঘাত করি না কেন! দেখি না সে কেমন করে খোদার উপর বিশ্বাসে অটল থাকে?’

ইবলিস আইয়ূবের উপর একের পর এক আঘাত হানল এবং তাকে একদিনেই হিরো থেকে জিরো করে দিল। এমন একদিনে এই আঘাতগুলো আইয়ূবের উপর দু:স্বপ্ন আকারে এল যেদিন তার সন্তানগণ সকলে নিমন্ত্রণে অন্যত্র ছিল। আর অদ্ভূত ব্যাপার ছিল এই যে, প্রতিটি দু:সংবাদ তার একজন দাস বয়ে নিয়ে এসেছিল, যে কিনা একমাত্র ঐ আঘাত থেকে রক্ষা প্রাপ্ত ব্যক্তি।

প্রথম দু:সংবাদটি আইয়ুব পেলেন দুপুর বেলা। সংবাদ বহনকারী দাস জানাল যে, শিবায়ীয়েরা হানা দিয়ে তার গাধার পাল লুট করেছে, এমনকি জমি চাষে রত ষাড়গুলিও। আর হত্যা করেছে সকল দাসদেরকে। প্রথম দাস তখনও কথা বলছিল ঐসময় দৌঁড়ে এল আরেক দাস। সে জানাল যে, ‘বজ্রপাতে তার ভেড়ার পাল আর দাসেরা নিহত হয়েছে। তারপর এল আর একজন। সে জানাল যে, কলদীয়রা তার উটগুলোকে লুট করেছে আর সকল দাসদের হত্যা করেছে। অত:পর এল মহা দু:সংবাদ। নিমন্ত্রিতের বাড়ীটি ধ্বসে পড়ায় ভোজেরত অবস্থায় তার সকল সন্তান নিহত হয়েছে।

যাহোক, আইয়ূব সব দুঃসংবাদগুলো শান্তভাবে পাথরের মত হয়ে শুনলেন। এসময় আগত দাসেরা একপাশে নিজেদেরকে অপরাধী ভেবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি তা লক্ষ্য করে তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের কুন্ঠিত হবার কোন কারণ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা করেন তা কেবল মঙ্গলের জন্যেই করেন।’

অতঃপর শোকের চিহ্ন হিসেব আইয়ূব তার কাপড় ছিঁড়লেন এবং মাথা কামিয়ে ফেললেন। তারপর খোদার কাছে অন্তরের ভক্তি জানিয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রভু! আমি তোমার শোকর আদায় করি এ কারণে যে, তুমি আমাকে সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি দান করেছিলে। এদের মহব্বত আমার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এরপর এখন আমি এ কারণে শোকর করছি যে, তুমি আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়েছ। আমার ও তোমার মধ্যে এখন কোন অন্তরায় অবশিষ্ট নেই।’

কোন একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইলের সঙ্গে ইবলিসের দেখা হল। জিব্রাইল বলল, ‘হে ইবলিস! আইয়ূব, পুণ্যবানদের একজন। যদিও তুমি বিনা কারণে তার সর্বনাশ করছ, তবুও সে বিশ্বাস ও ভক্তিতে অটল রয়েছে।’

ইবলিস বলল, ‘মানুষের জীবনই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। মানুষ তার নিজ প্রাণ রক্ষার জন্যে তার যাকিছূ আছে সবই দেবে। কিন্তু আল্লাহর নির্বাচিত দাসদের উপর আমার কোন ক্ষমতা নেই। নইলে তার ঈমান ঠিকই বিনষ্ট করে দিতাম।’
জিব্রাইল বলল, ‘তা সত্য। কিন্তু ক্ষমতা যদি তিনি তোমাকে দিতেনও, তদুপরি তাদের ঈমান এমন ঠুনকো নয় যে ইচ্ছে করলেই তুমি তা বিনষ্ট করতে পারতে।'
ইবলিস বলল, 'সেটা আর প্রমান করতে পারছি কৈ! আহা! যদি আমি একটি বারের মত ঐ ক্ষমতা পেতাম!'

আইয়ূব ও তার বন্ধুরা।
তখন ইবলিসকে জানান হল- আইয়ূবের উপর সে (ইবলিস) পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে-প্রাণ হরণ ব্যতিত।এতে ইবলিস আইয়ূবের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য এক পরিকল্পণা করল। সে তার মাথার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত ঘায়ের সৃষ্টি করল। যন্ত্রণায় আইয়ূব অস্থির হয়ে পড়লেন। এদিকে ঘা থেকে পুঁজ বেরিয়ে আসতে লাগল। এসময় তিনি শরীরে ধূলো মেখে বসে থাকতেন আর মাটির পাত্রের ভাঙ্গা টুকরো দিয়ে ঘা থেকে পুঁজ বের করতেন। আস্তে আস্তে তার গায়ের মাংস খসে পড়তে লাগল। দুর্গন্ধে কেউ তার নিকটে যেতে পারত না।

তৈমনীয় ইলীফস, শূহীয় বিল্দদ ও নামাথীয় সোফর -আইয়ূবের এই তিন বন্ধু তার বিপদের কথা শুনতে পেয়েছিল। তখন তারা তাকে সান্তনা দেবার জন্যে এল। তাদের কেউই দূর থেকে আইয়ূবকে চিনতে পারল না এবং কাছে গিয়ে তার অবস্থা দেখে কাঁদতে লাগল এবং নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে আকাশের দিকে ধূলো ছড়াল। তারা তার কষ্ট অনুভব করল এবং সান্তনার ভাষা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকল। এসময় আইয়ূব বিলাপের সুরে বললেন- আমি কেন গর্ভে থাকতে মরিনি? কেনইবা জন্মেই মরলাম না? তা হলে তো আমি এখন, শান্তিতে শুয়ে থাকতে পারতাম; আমি ঘুমাতাম আর বিশ্রাম পেতাম। আজ দীর্ঘ নিঃশ্বাসই আমার সঙ্গী, আমার কষ্ট বর্ষার মত ঝরছে; আমার শান্তি নেই, স্থিরতা নেই, কোন বিশ্রাম নেই, আছে কেবল কষ্ট।’

এসব কথা শুনে তার বন্ধু তৈমনীয় ইলীফস তাকে বলল- 'ভেবে দেখ, কতজনকে তুমি উপদেশ দিয়েছ আর দূর্বল হাতকে সবল করেছ; কিন্তু এখন তোমার নিজের উপরই কষ্ট এসেছে, আর তুমি হতাশ হয়েছ। তুমি যে আল্লাহকে ভক্তিপূর্ণ ভয় কর, তাতে কি তুমি আশ্বাস পাও না? নির্দোষ কখনও কি ধ্বংস হয়েছে? সুতরাং ধন্য সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সংশোধন করেন; কাজেই সর্বশক্তিমানের শাসনকে তুচ্ছ কোরও না। কারণ তিনি ক্ষত করেন আবার বেঁধেও দেন, আর সুস্থ্যতা তাঁরই দয়া।’

তখন আইয়ূব বলতে লাগলেন- ‘আল্লাহর ভয়ংকর কাজগুলো আমার বিরুদ্ধে সাঁরি বেঁধে দাঁড়িয়েছে, নিজেকে সাহায্য করার শক্তি আমার নেই, আমার কাছ থেকে তো আমার সবকিছু দূর করা হয়েছে; পোঁকা আর ঘাঁয়ের মামড়িতে আমার দেহ ঢাকা পড়েছে।আমার চামড়া ফেঁটে গেছে এবং পূঁজ পড়ছে; আমার দিনগুলো তাঁতীর মাকূর চেয়েও তাড়াতাড়ি চলছে, কোন আশা ছাড়াই সেগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। যখন ভাবি আমার শয্যা আমাকে সান্তনা দেবে, তখন নানা দুঃসপ্ন আমাকে ভীত করে তোলে।’

এসময় শূহীয় বিলদদ বলল- ‘ঠিক কথা, আমি জানি এসবই সত্যি। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে কি করে মানুষ নির্দোষ হতে পারে? আমি তো সর্বদাই তাঁর দৃষ্টিতে, কিন্তু আমার দৃষ্টি তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, তিনি যদি ছিনিয়ে নেন, কে তাঁকে বাঁধা দিতে পারে? কে তাঁকে বলতে পারে- তুমি কি করছ?’

আইয়ূব বললেন- ‘তাহলে কেমন করে আমি তাঁর কথার উত্তর দেব? তাঁকে বলার জন্যে কোথায় ভাষা খুঁজে পাব? আমি নিজেকে নির্দোষ ভাবলেও উত্তর দিতে পারিনে, আমি বিচারকের কাছে কেবল দয়াই ভিক্ষে করব।’

নামাথীয় সোফর বলল-‘তুমি বলেছ তোমার ধর্ম বিশ্বাসে কোন খূঁত নেই এবং তাঁর দৃষ্টিতে তুমি খাঁটি। আ-হা, আল্লাহ যেন কথা বলেন, আর জ্ঞানের গোপন বিষয়গুলো তোমাকে জানান; এটা জেনে রেখ, কারও পাপ অনুসারে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন না।’

আইয়ূব উত্তরে বললেন- 'তুমি যা বলেছ কে তা না জানে? পশুদের জিজ্ঞেস কর, তারা তোমাকে শেখাবে, আকাশের পাখীদের বল, তারাও তোমাকে বলে দেবে; পৃথিবীকে, সেও তোমাকে শেখাবে, সাগরের মাছেরাও তোমাকে বলে দেবে এরা সবাই জানে আল্লাহর শক্তিই এসব করেছে।

অন্ধকারের লুকান বিষয়গুলো তিনি প্রকাশ করেন, আর ঘন ছায়াকে আলোতে আনেন। তাঁর মহিমা কি তোমাদের ভয় জাগায় না? তাঁর ভয়ংকরতায় কি তোমরা ভীত হও না? আমি জানি আমার মুক্তিদাতা জীবন্ত, শেষে তিনি পৃথিবীর উপর এসে দাঁড়াবেন আমার চামড়া ধ্বংস হয়ে যাবার পরও আমি জীবন্ত অবস্থায় তাঁকে দেখতে পাব।’

আইয়ূব যখন এসব বলছিলেন তখন তার বন্ধুদের কেউই তার কথার উত্তর দিল না। এসময় রামের বংশের বৃষীয় ইলীহূ ইবনে বারখেল যে আইয়ূবের বন্ধুদের সাথে এসেছিল, বলল-‘কিন্তু আমি আপনাকে বলি এ বিষয়ে আপনার কথা ঠিক না; কারণ মানুষের চেয়ে আল্লাহ মহান। কেন আপনি তাকে এ অভিযোগ জানাচ্ছেন যে, মানুষের কোন কথার উত্তর তিনি দেন না? আসলে আল্লাহ নানাভাবে কথা বলেন, যদিও মানূষ তা বুঝতে পারে না, স্বপ্নের মধ্যে যখন তাদের নিদ্রা গাঢ় হয়, তিনি তখন তাদের কানে কানে কথা বলেন আর সাবধান বাণী দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করেন, যেন মানুষ তার দুস্কর্ম থেকে ফেরে, আর অহংকার থেকে দূরে থাকে।
 
যখন মানুষ রোগ যন্ত্রণায় শাস্তি পায়, তখন ফেরেস্তাগণ চিৎকার করে বলেন- ‘হে আল্লাহ! দোযখের শাস্তি থেকে তাকে রেহাই দাও।’
সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আর তিনি তাকে দয়া করেন, আল্লাহ মানুষের জন্যে বারবার এসব করেন।

আল্লাহ মানুষকে তার কর্মফল দেন; সর্বশক্তিমান কখনও উল্টো বিচার কবেন না, পৃথিবীর ভার কি কেউ তাঁর উপর দিয়েছে? মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর তাঁর দৃষ্টি রয়েছে, তাদের প্রতিটি কর্ম তিনি দেখেন। এমন কোন অন্ধকার জায়গা বা ঘনছায়া নেই যেখানে পাপীরা লুকাতে পারে।

মানুষ যদি পাপ করে তাতে আল্লাহর কি লাভ হবে? সে যদি নির্দোষ হয় তাতেই বা তাঁর কি উপকার হবে? মানুষের কাছ থেকে তিনি কিছুই চান না, তাদের দুষ্টতা কেবল তাদেরই ক্ষতি করে, তাদের নামাজ, রোজা, সততা কেবল তাদেরই সাহায্য করে।আল্লাহ তো তার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মানুষকেই বেশী শিক্ষা দিয়েছেন, আকাশের পক্ষী বা জমিনের পশু কি মানুষের চেয়ে জ্ঞানী? আল্লাহ ক্ষমতায় মহান, তাঁর মত শিক্ষক আর কে আছে?’

এসময় আল্লাহ আইয়ূবকে বললেন,- যখন পৃথিবীর গর্ভ থেকে সমুদ্র বের হয়ে এসেছিল, তখন কে তাকে আবদ্ধ করেছিল? তখন আমি মেঘকে তার পোষাক করেছিলাম, আর তার সীমা ঠিক করেছিলাম, তার দ্বার ও আর্গল আমি স্থাপন করেছিলাম; আর আমি বলেছিলাম, এ পর্যন্ত, আর নয়, এখানেই তোমার গর্বিত ঢেউগুলোকে থামতে হবে।

দোযখ তোমাকে দেখান হয়েছে কি? জগৎটা কত বড় তা কি তুমি ধারণা করতে পার? যে স্থান থেকে আলো ছড়িয়ে যায়, কিংবা যে স্থান থেকে পৃথিবীতে পূবের বায়ূ ছড়িয়ে পড়ে তা কোথায়?
বজ্রপাত ও বৃষ্টির জন্যে কে পথ করেছে? যাতে জনশুণ্য স্থান বৃষ্টি পায়, মরুএলাকা তৃপ্ত হয়, আর সেখানে ঘাস, লতা-গুল্ম উদ্গত হতে পারে?

তুমি কি কৃত্তিকা নামের তাঁরাগুলোকে বাঁধতে পার? কালপুরুষ নামের তাঁরাগুলোর বাঁধন খুলে দিতে পার? তাঁরাপুঞ্জকে তাদের ঋতু অনুসারে বের করে আনতে পার? আকাশের আইন কানুন কি তুমি জান?

কে অন্তরকে জ্ঞান দিয়ে সাঁজিয়েছে? কিংবা মনকে বোঝার শক্তি দিয়েছে? দাঁড় কাকের বাচ্চারা যখন খোদার কাছে কাঁদে, আর খাবারের জন্যে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায়, তখন কে তাদের আহার জোগায়? পাহাড়ী ছাগ কখন বাচ্চা দেয় তা কি তুমি জান? তাদের বাচ্চা কত দিন গর্ভে থাকে তা কি গুনেছ?

তোমার আদেশে কি ঈগল আকাশে উড়ে? সে খাঁড়া পাহাড়ের উপর বাস করে, সেখান থেকে সে খাবারের অন্বেষণ করে, তার দৃষ্টি দূর থেকে তার শিকার খুঁজে নেয়। তাহলে আমার সম্মুখে কে দাঁড়াতে পারে? আমার বিরুদ্ধে এমন কার দাবী আছে যে, তার দাবী আমাকে মানতে হবে? উপরে আকাশ, নীচে জমিন এবং এ দু‘য়ের মাঝে যাকিছু আছে -সবই আমার সৃষ্টি, কোন কিছুই আমার অপরিজ্ঞাত নয়।’

আইয়ূব বললেন,- ‘আমি তো অযোগ্য, আমি কেমন করে তোমাকে উত্তর দেব? কাজেই আমি যা বলেছি তা এখন ফিরিয়ে নিচ্ছি আর ধূলো ও ছাইয়ের মধ্যে অনুতাপ করছি।’
আইয়ূবের বন্ধুরা সাতদিন তার সাথে থাকল, তারপর তারা ফিরে গেল।

উত্তোরোত্তর আইয়ূবের অবস্থার অবনতি হতে লাগল। এতে দুর্গন্ধে কেউ তার কাছে যেতে পারত না। প্রথম পর্যায়ে তার পরিবারের লোকেরা তাকে পরিত্যাগ করল। পরবর্তীতে চাকর-বাকরেরা। ফলে রহিমা স্বামীকে নিয়ে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়ল। কিন্তু এ-ই শেষ ছিল না। প্রতিবেশীরা রহিমাকে হুমকি দিল, ‘তোমার স্বামীকে এখান থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাও। দুর্গন্ধে এখানে আমরা বাস করতে পারছিনে।’
সে বলল, ‘তাকে আমি কোথায় নিয়ে যাব? তোমরা আমাদের প্রতি একটু রহম কর।’
তারা বলল, ‘তোমাদের কারণে আমরাও অসুস্থ্য বা আক্রান্ত হয়ে পড়ি এই কি তোমাদের অভিপ্রায়? তা না হলে আমাদের থেকে দূরে সরে যাও, যেখানে খুশী। আমরা স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেলি।’

প্রতিবেশীরা জোরপূর্বক তাদেরকে বাড়ী থেকে বের করে দিল। তারপর তাদের আবাসগৃহ আসবাবপত্র সব পুড়িয়ে দিল। তখন স্বামীকে নিয়ে রহিমা একটু নির্জন স্থানে গেল। কিন্তু নিকটবর্তী গ্রামবাসীরাও তাদেরকে তাড়িয়ে দিল। তারা এসে বলল, ‘তোমার স্বামীর এই রোগে আমরাও আক্রান্ত হয়ে পড়ব, আর তাতে গ্রামটা উজাড় হয়ে যাবে?’
সে বলল, ‘এই রোগ ছোঁয়াচে নয়, এই তো আমি সম্পূর্ণ সুস্থ্য।’
তারা বলল, ‘সুস্থ্য লোক অসুস্থ্য হতে কতক্ষণ?’

রহিমা স্বামীকে অন্য এক স্থানে নিয়ে গেল। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাদেরকে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দিল। এভাবে একে একে সাতবার স্থান পরিবর্তনের পর অবশেষে জঙ্গলে আশ্রয় নিল তারা। সহায়-সম্বলহীন।

আইয়ূব স্নান করলেন।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে রহিমা নিকটবর্তী গ্রামে গিয়ে সেখান থেকে সে কাজের বিনিময়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে লাগল। একদা যার গৃহ প্রাচূর্যে ভরপুর ছিল, আজ্ঞা পালনে যার ছিল অসংখ্য দাস-দাসী ছিল, আজ সে দাসীর মত অন্যের গৃহে কাজ করছে। কিন্তু রহিমার এতে কোন আক্ষেপ নেই। সে সুবোধ বালিকার মত প্রতিদিন শ্রমের বিনিময়ে আহার সংগ্রহ শেষে ফিরে এসে অবশিষ্ট সময় স্বামীর পরিচর্যা করতে লাগল। 

ইতিমধ্যে দিন, মাস, বৎসর গড়িয়ে যাচেছ। নিকটবর্তী গ্রামে, লোকদের গৃহে গৃহে দাস্যকর্মের দ্বারা খাবার সংগ্রহ করা এখন রহিমার নিত্যদিনের কাজ। একদিন সে যখন খাবার সংগ্রহ শেষে ব্যস্ততা সহকারে গৃহে ফিরছিল, তখন এক বৃদ্ধের বেশে ইবলিস তার ফেরার পথের পাশে বসে রইল। অতঃপর রহিমা যখন নিকটবর্তী হল, তখন সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মা, আমি বড় ক্ষুধার্ত। একমুষ্ঠি খাবার আমাকে দাও।’

রহিমার কাছে যে খাবার ছিল তা তাদের দু‘জনের কোনমতে চলত। বৃদ্ধকে খাবার দিলে তাকে অনাহারে থাকতে হবে, তবুও সে এই ক্ষুধার্ত বৃদ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারল না। সে এগিয়ে এল এবং তার অংশের খাবার বৃদ্ধকে দিল। বৃদ্ধের আরও খাবার বা পানির দরকার হতে পারে ভেবে সে চলে যেতে পারল না। সুতরাং সে একপাশে বসে নীরবে তার খাওয়া দেখতে লাগল, আর তার মন পড়ে রইল অসুস্থ্য স্বামীর কাছে। খেতে খেতে বৃদ্ধ বলল, ‘মা, তোমাকে এত মলিন দেখাচ্ছে কেন?’

রহিমা সংক্ষেপে তাকে তার দুঃখের কথা জানাল। সব শুনে বৃদ্ধ বলল, ‘আমি একটা ঔষধের কথা জানি। কিন্তু তুমি কি তা ব্যাবহার করতে পারবে?’
রহিমা বলল, ‘আমি আমার স্বামীর জন্যে সবকিছু করতে পারব, বাবা।’
বৃদ্ধ বলল, ‘তুমি যদি দ্রাক্ষারস দ্বারা তোমার স্বামীর শরীর ধৌত করে দিতে পার, আর যদি তাকে কিছূ শুকরের মাংস ভক্ষণ করাতে পার, তবে অচিরেই তার রোগের উপশম হবে।’

রহিমা তখন দ্রুত গৃহে ফিরে স্বামীকে সকল কথা বলল এবং তাকে ঐ ঔষধ ব্যাবহারের জন্যে পীড়াপীড়ি করল। আইয়ূব তা করতে অস্বীকার করলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, ‘জীবন থাকতে আমি কখনও নিষিদ্ধ ও অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শেও যাব না। নিশ্চয়ই শয়তান তোমাকে প্ররোচিত করেছে।’
একথা শুনে রহিমা তাকে আর পীড়াপীড়ি করল না।

সাত বৎসর অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের কোন মুহূর্তেই আইয়ূব হা-হুতাশ, অস্থিরতা ও অভিযোগের কোন বাক্য মুখে উচ্চারণ করেননি। তিনি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করেছেন আল্লাহর রহমতের। কিন্তু তিনি নিজের জন্যে আল্লাহর কাছে কোন দোয়া করেননি। তিনি দোয়া করার হিম্মত করতেন না এই ভেবে যে, না জানি সবরের কোন খেলাফ হয়ে যায়। একদিন পত্নী রহিমা তাকে বলল, ‘তোমার কষ্ট অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে নিজের জন্যে প্রার্থণা কর।’

আইয়ূব বললেন, ‘নিজের জন্যে আল্লাহর কাছে এসময় কিছু চাইতে আমার লজ্জা লাগছে। আমি সত্তুর বৎসর সুস্থ্য অবস্থায় আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ও দৌলতের মধ্যে দিনাতিপাত করেছি। এর বিপরীতে মাত্র সাত বৎসর আমি শয়তানের পরীক্ষায়। অন্ততঃপক্ষে সত্তুর বৎসর অতিবাহিত না করে আমি নিজের জন্যে কিভাবে কিছু চাইতে পারি?’

এদিকে ইবলিস যখন দেখল যে সে কিছুতেই আইয়ূবের সবরের খেলাফ করতে পারছে না। তখন সে মানুষের বেশে আশে পাশের গ্রামের প্রতিটি গৃহে জানিয়ে দিল-‘তোমাদের এখানে যে স্ত্রীলোকটি মাঝে মাঝে এসে কাজকাম করে খাবার সংগ্রহ করে, তার স্বামী দূরারোগ্য ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত। এখন যদি তোমরা তাকে তোমাদের গৃহের কাজে লাগাও তাহলে তোমরাও ঐ ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। আমি তোমাদের ভালোর জন্যেই বলছি।’

সুতরাং রহিমাকে আর কোন গৃহে কাজের জন্যে নেয়া হল না। সারাদিন লোকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে তিনি যখন ক্লান্ত তখন এক গৃহিনী নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে তাকে কাজে লাগাল এবং বলল, ‘তোমার অসহায় অবস্থা জানি বলেই আজকের মত কাজে লাগালাম। কিন্তু এই শেষ, তুমি আর আমাদের বাড়ীতে আসবে না।’

পরদিন রহিমা অন্য গ্রামে গেল খাবারের সন্ধানে। কিন্তু সেখানকার লোকেরাও তাকে তাড়িয়ে দিল। একসময় ঘুরতে ঘুরতে সে যে বাড়ীতে এল ঐ বাড়ীর কর্ত্রী বলল, ‘তোমার জন্যে আমার বাড়ীতে কোন কাজ নেই।’
রহিমা বলল, ‘আজ কাজ না পেলে আমার অসুস্থ্য স্বামীকে অনাহারে থাকতে হবে। তাই দয়া করে আমাকে কাজ দিন অথবা কিছু ধার দিন। আমি আপনার দেনা পরিশোধ করে দেব।’
সে বলল, ‘তোমার নেই চালচুলো। তোমাকে কিভাবে আমি ধার দেব?’

রহিমার চুলের প্রতি নজর পড়ল তার। তখন সে বলল, ‘তবে তুমি যদি কিছু বিক্রি করতে চাও তা আমি কিনতে পারি।’
রহিমা বলল, ‘আমার কিছুই নেই। আমি কি বিক্রি করব?’
সে বলল, ‘তোমার চুল। আমি খোপা তৈরী করব? বিনিময়ে আমি তোমাকে চাল দেব। তুমি রাজী হলে আমি না হয় কিছু বেশীই দেব। তাতে তেমাদের বেশ কিছুদিন চলে যাবে।’

রহিমা অপূর্ব সুন্দর লম্বা চুলের অধিকারী ছিল, যার প্রশংসা করতেন আইয়ূব সবসময়। তার চোখ ভিজে উঠল। দু‘ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে স্ত্রীলোকটি বলল, ‘তুমি বেঁচতে না চাইলে নাই।’
রহিমা দ্রুত বলল, ‘না, তা নয়। আমার এই চুল ধরে আমার অসুস্থ্য স্বামী উঠে দাঁড়ায়, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যায়।..’
স্ত্রীলোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাহলে বরং তুমি তোমার মাথার অর্ধেকটা চুল বিক্রি কর। তাতে তোমার স্বামীর কাজও চলবে, খাবারও পাবে। আমি তোমাকে ঠকাব না।’
কোন বিকল্প ছিল না। তাই রহিমা রাজী হল এবং মাথার অর্ধেকটা চুলের বিনিময়ে খাবার সংগ্রহ শেষে গৃহ অভিমুখে রওনা হল।

এদিকে শয়তান দেখল রহিমার কারণে আইয়ূব এখনও ঈমানে কায়েম রয়েছে। তাই তাদের দু‘জনের বিশ্বাসের মধ্যে ফাঁটল সৃষ্টির চেষ্টায় মনোযোগ দিল সে। সে এক বৃদ্ধের বেশে আইয়ূবের কাছে এল। অতঃপর তাকে বলল, ‘আপনি আল্লাহর একজন নবী। এত কঠিন বিপদাপন্ন অবস্থায়ও আপনি ঈমানে অটুট রয়েছেন। কিন্তু সবকিছু মাটি হয়ে যাচ্ছে আপনার স্ত্রীর কারণে। আপনি তো খবর রাখতে সক্ষম নন- এই সুযোগে আপনার স্ত্রী আপনাকে হারাম খাবার খাওয়াচ্ছে। গ্রামে গিয়ে সে অসৎ কার্য্য এবং চুরি করে খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। আজ চুরির সময় সে ধরা পড়েছে। আর গ্রামের লোকেরা এই অপরাধে তার মাথার চুল অর্ধেকটা কেটে নিয়েছে।’

একথা শুনে আইয়ূব দু:খ-লজ্জায় মর্মাহত হলেন। তারপর রহিমা যখন ফিরে এল, তিনি দেখতে পেলেন যে তার চুল সত্যিই অর্ধেকটা কাটা। তিনি ভীষণ রেগে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, ‘তোমার চুরি করে আনা কোন খাবার আমি স্পর্শ করব না।’

রহিমা তার স্বামীকে বোঝাতে চেষ্টা করল। কিন্তু আইয়ূব তার কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি এই অপরাধে আমি সুস্থ্য হয়ে তোমাকে অবশ্যই এক‘শ দোররা মারব।’
তিনি রহিমার আনা সমস্ত খাবার ছুঁড়ে ফেললেন।
এত লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের পর সংগ্রহ করে আনা খাবার চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত নয়নে রহিমা সেদিকে তাকিয়ে রইল।

স্বামীর ব্যাবহারে অত্যন্ত দু:খিত হয়ে রহিমা নিজের নির্দোষিতার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থণা করল। আইয়ূব ও তার পরিবারের এমন দূরাবস্থার কথাই যেন কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- তোমরা কি মনে করেছ যে (এমনই কেবল মুখের কথায়) স্বর্গে গমন করবে? অথচ এখনও তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের (নবী ও তার সহচরবর্গের) অবস্থায় উপনীত হওনি। বিপদের উপর বিপদ এবং আঘাতের উপর আঘাত তাদেরকে স্পর্শ করেছিল, (এমন কি তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত সমূলে) প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।-(২:২-১০)

এদিকে দু‘দিন অতিবাহিত হল, উভয়েই অনাহারে। এসময় আল্লাহ জিব্রাইলকে প্রেরণ করলেন। সে এসে আইয়ূবকে সকল ঘটনা অবহিত করার পর বলল, ‘এখন আল্লাহর কাছে তোমার নিজের জন্যে দোয়া কর। তিনি তা কবুল করবেন।’

আইয়ূবের এই অবস্থা যেন যবুরের এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে-

খোদা, তোমার ক্রোধে আমাকে ভর্ৎসনা কোরও না,
তোমার রোষাগ্নিতে আমাকে শাস্তি দিও না।
কেননা তোমার তীরসকল আমাতে বিদ্ধ,
আমার উপর তোমার হস্ত নেমেছে।
তোমার কোপ হেতু আমার অস্থিতে কোন মাংস নেই,
আমার শোক হেতু আমার মনে কোন শান্তি নেই।
কেননা আমার শাস্তিসমূহ আমার মাথার উপর উঠেছে, ভারী বোঝার ন্যায়,
সেসকল আমার শক্তি অপেক্ষা ভারী।
আমার ক্ষতসমূহ দুর্গন্ধ ও গলিত হয়েছে, আমার অজ্ঞানতা প্রযুক্ত।
আমি কুব্জ হয়েছি, অতি নুয়ে পড়েছি, আমি সারাদিন বিষন্ন ঘুরছি।
কেননা আমার কটিদেশে জ্বালা ধরেছে, আমার অস্থিতে কোন মাংস নেই।

আমি অবসন্ন ও অতিক্ষুন্ন হয়েছি, চিত্তের ব্যকুলতায় আর্ত্তনাদ করছি।
হে প্রভু, আমার সমস্ত কামনা তোমার সামনে,
আমার কাতরোক্তি তোমার কাছে গুপ্ত নয়।
আমার হৃদয় ধুঁকছে, আমার শক্তি নি:শেষ হয়েছে,
আমার চোখের জ্যোতিও আমাকে ছেড়ে গিয়েছে।
আমার প্রণয়ীরা ও আমার বন্ধুগণ আমার ব্যাধি হতে দূরে দাঁড়ায়,
আমার জ্ঞাতিবর্গ দূরে সরে থাকে।
যারা আমার প্রাণের অন্বেষণ করে, তারা ফাঁদ পাতে;
যারা আমার অনিষ্ট চায়, তারা বিনাশের কথা কহে,
আর সমস্ত দিন ছলের চিন্তা করে।
কিন্তু বধিরের মত আমি শুনিনে, বোবার মত আমি মুখ খুলিনে।
আমি তার মত, যে শুনতে পায় না, যার মুখে প্রতিবাদ নেই।

কারণ খোদা, আমি তোমারই অপেক্ষা করছি;
হে প্রভু, আমার উপাস্য, তুমিই উত্তর দেবে।
কেননা আমি বললাম, পাছে ওরা আমার বিষয়ে আনন্দ করে,
আমার চরণ টললেই আমার বিপক্ষে দর্প করে।
আমি তো পড়তে পড়তে উদ্যত;
আমার ব্যথা সতত আমার গোচরে রয়েছে।
আমি নিজের অপরাধ স্বীকার করব, আমার পাপের দরুন খেদ করব।
কিন্তু আমার শত্রুগণ সতেজ ও বলবান, অনেকেই অকারণে আমাকে ঘৃণা করে।
আর তারা উপকারের বদলে অপকার করে,
তারা আমার বিপক্ষ, কারণ যা ভাল আমি তারই অনুগামী।
খোদা, আমাকে পরিত্যাগ কোরও না;
আমার প্রতিপালক, আমা হতে দূরে থেক না।
হে প্রভু, আমার পরিত্রাণ, আমাকে সাহায্য করতে সত্ত্বর হও। (৩৮:১-২২)

সবকিছু ফিরে পেলেন আইয়ূব।
অতঃপর স্ত্রীর প্রতি এই অবিচারে আইয়ূব নিদারুণ মানষিক কষ্টে পড়লেন। তিনি তৎক্ষণাৎ শয়তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন এবং নিজের জন্যে প্রার্থণা করলেন, বললেন-‘হে আমার প্রতিপালক! শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তার হাত থেকে বাঁচতে তোমার আশ্রয় প্রার্থণা করছি।’
আল্লাহ তার প্রার্থণা কবুল করলেন এবং তাকে জানালেন- ‘তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, স্নান ও পান করার জন্যে সুশীতল পানি পাবে।’

আইয়ূব পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সেখানে তৎক্ষণাৎ একটি প্রস্রবণের সৃষ্টি হল। তিনি সেই পানিতে স্নান করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ্য হয়ে গেলেন। তার চেহারায় লাবণ্য ও মাধুর্য ফিরে এল। স্নান সেরে পরিস্কার বস্ত্র পরিধান করে তিনি কাছেই এক বৃক্ষতলে বসে কৃতজ্ঞতাভরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় নিমগ্ন হলেন। কোরআনে রয়েছে-‘আমার দাস আইয়ূবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল- ‘শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।’
আমি তাকে বললাম- ‘তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এ তো স্নান ও পান করার জন্যে সুশীতল পানি।’-(৩৮:৪১-৪৩) 

আইয়ূরের সমাধি, লেবানন।
আইয়ূব যখন সুস্থ্য হলেন, তখন তার স্ত্রী সেখানে ছিল না। অনাহারী স্বামীর জন্যে পুনঃরায় খাদ্য জোগাড় করতে সে গ্রামে ফিরে গিয়েছিল। অতঃপর ফিরে এসে যথাস্থানে স্বামীকে না দেখে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে ধারণা করল তার স্বামীকে হয়তঃ কোন বন্যপশুতে খেয়ে ফেলেছে। সেখানে বসে সে বিলাপ করতে লাগল।

ক্রন্দনরত অবস্থায় হঠাৎ চোখ তুলতেই একটু দূরে এক ব্যক্তিকে উপবিষ্ট দেখতে পেল রহিমা। সে তৎক্ষণাৎ সেখানে ছুটে গেল। লোকটি চক্ষু মুদে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। রহিমা তাকে বিলাপের সূরে দ্রুত জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে যে রোগাক্রান্ত লোকটি পড়ে থাকত, আপনি কি তাকে দেখেছেন?’

স্ত্রীর উৎকন্ঠিত কান্নাজড়িত কণ্ঠ শুনে আইয়ূব তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভালকরে দেখ, আমিই তোমার স্বামী। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন এবং আমাকে নতুন স্বাস্থ্য দান করেছেন। এখন কাঁদছ কেন আমাকে বল?’

আইয়ূবের সমাধি মন্দিরের অভ্যান্তরভাগ।
রহিমা তখন তার স্বামীকে চিনতে পেরে তাকে জড়িয়ে ধরল। অতঃপর সে আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল। একসময় আইয়ূব তাকে বললেন, ‘তুমি কি ভুলে গেছ আমার প্রতিজ্ঞার কথা?’

রহিমা খুশীমনে তার স্বামীকে তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে বলল। তখন আল্লাহ আইয়ূবকে জানালেন -‘এই ধৈর্য্যশীলা, কৃতজ্ঞা ও পতিপরায়ণা স্ত্রী কখনও শাস্তির যোগ্য নয়। তবে শপথ ভঙ্গ কোরও না। একমুষ্ঠি তৃণ নাও ও তার দ্বারা মৃদু আঘাত করে প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর।’ কোরআনে রয়েছে- আমি তাকে আদেশ করলাম- ‘এক মুষ্ঠি তৃণ নাও ও তার দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ কোরও না।’
আমি তাকে ধৈর্য্যশীল পেলাম। সে কত উত্তম দাস, সে আমার অভিমুখী ছিল।(৩৮:৪৪-৪৫)   

আল্লাহ আইয়ূবের অবস্থা ফিরিয়ে দিলেন, ফিরিয়ে দিলেন সবকিছু পূর্বের চেয়ে কয়েক গুণে। তার ভ্রাতা-ভগ্নিরা এবং যারা তাকে ইতিপূর্বে পরিত্যাগ করেছিলে তারাও আবার ফিরে এল। তার গৃহ আবার সন্তান-সন্তুতিতে ভরে গেল। একে একে তার সাত পুত্র ও তিন কন্যার জন্ম হল। কোরআনে রয়েছে- ‘আমি আমার অনুগ্রহস্বরূপ ও বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্যে উপদেশস্বরূপ তাকে (আইয়ূবকে) আবার দিলাম তার পরিজনবর্গ ও তাদের মত আরও বহুকিছু।’-(৩৮:৪৩)
যতদূর জানা যায়, সুস্থ্য হবার পর আইয়ূব আরও এক’শ চল্লিশ বৎসর আয়ূ লাভ করেছিলেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

বিদ্র: অবশ্য প্রশ্ন একটা থেকে যায়- আইয়ূব যিনি কিনা একজন নবী, তিনি স্ত্রীর পূর্ণ বক্তব্য না শুনে অর্থাৎ ঘটনার তত্ত্ব তালাশ না করে, অপরিচিত ব্যক্তির কথাকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে স্ত্রীকে দোররা মারতে চাইলেন কেন? তাহলে কি তার স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসে ঘাটতি ছিল? (অবশ্য কেউ হয়ত: বলতে পারেন উক্ত ব্যক্তি আইয়ূবের নিকটাত্মীয়দেরই একজন ছিলেন, যার কথাকে তিনি অবিশ্বাস করতে পারেননি।)

যাইহোক না কেন, মূল বিষয় হচ্ছে, কাহিনী এমনই, তবে কিছু তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতায় অথবা আমার উপস্থাপনায় বিশেষ ঘাটতি রয়েছে। 

সংগ্রহ: রফিকুজ্জামান



স্বামীর নামে স্ত্রীর নামকরণ কঠিন গুনাহ

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

স্বামীর নামে নামকরণ শক্ত গুনাহ
মুসলিম নারীদের অনেকেই বিয়ের পরে নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামকে নিজের নামের অংশ বানিয়ে ফেলে। হাল জামানায় এটি একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যেমন : একজন মেয়ের বাবার দেয়া নাম ফাতেমা। রফিক নামে একজনের সাথে বিয়ের পর তার নাম হয়ে যায় মিসেস রফিক বা ফাতেমা রফিক। ইসলামি শরিয়ার দৃষ্টিতে এটি ঠিক নয়। মুসলিম নারীদের উচিত বিয়ের পরও তার পৈতৃক নাম ঠিক রাখা। কারণ এটি তার একেবারেই নিজস্ব এখানে স্বামীর কোনো শেয়ার নেই। নামই তার বংশ পরিচয় বহন করে।

আমরা বিদেশী সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুকরণ করছি যেগুলোর বিষয়ে ইসলামি শরিয়ার কোনো ভিত্তি নেই বরং সেগুলো একান্তই তাদের চর্বিত বিষয়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন। অনুরূপভাবে সাহাবি রা: ও তাবেয়িনদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি যাকে শরিয়ার পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’ বলা হয়। ইসলামি শরিয়ার এ দু’টি অন্যতম প্রধান উৎসের কোথাও এর অনুমোদন বা সমর্থন পাওয়া যায়নি। মহানবী সা: বা সাহাবিদের রা: জীবনাচারেও এর কোনো নজির নেই। যদি স্বামীর নামে পরিচিত হওয়া বা স্বামীর নাম নিজের নামের সাথে যুক্ত করা আভিজাত্য বা মর্যাদার ব্যাপার হতো তাহলে আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর স্ত্রীগণ বা উম্মাহতুল মুমিনিনরাও তাদের নামের সাথে হজরত সা:-এর নাম যুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের কেউই তা করেননি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের পিতার নামেই পরিচিত ছিলেন যদিও তাদের কারো কারো পিতা কাফের ছিল। সুতরাং আমরা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এমন কোনো বিষয় অবলম্বন করতে পারি না যার অনুমোদন উত্তম যুগে ছিল না। হজরত আশেয়া সিদ্দিকা রা: বিয়ের পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে আয়েশা মুহাম্মদ রাখেননি এবং তিনি তাঁর পিতা আবুবকর সিদ্দিক রা: পরিচয় অক্ষুন্ন রেখেছেন।

বাবাকর্তৃক প্রদত্ত নাম ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ওই নামটি ব্যক্তির বংশের পরিচায়ক। কুরআন বলছে : ‘তোমরা তাদেরকে তাদের বাবার নামে ডাক’। (আল-কুরআন) এই আয়াতটি যদিও পালকপুত্রদের তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা বর্তমানে তাদের লালন-পালন করছেন বা ভরণ-পোষণ জোগান দিচ্ছেন তারা তাদের পিতা নন। বরং যারা তাদের জন্ম দিয়েছেন তারাই তাদের পিতা। অনুরূপভাবে মেয়েরাও তাদের পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবেন স্বামীর পরিচয়ে নন। তা ছাড়া পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ প্রমাণ করে স্ত্রীদেরও তাদের পিতার নামে ডাকতে হবে।

হজরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের হজরত ইবন আব্বাস রা:-কে বলতে শুনেছেন যে, রাসূল সা: বলেছেন : ‘যে কেহ নিজেকে বাবার নাম ছাড়া অন্য নামে ডাকবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত বর্ষিত হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ) ইমাম বুখারিও রা: সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হজরত সাদ, হজরত আবু বাকরা রা: থেকে বর্ণিত, তারা প্রত্যেকে বলেছেন : ‘আমার দু’কান শুনেছে এবং আমার অন্তর মুহাম্মদ সাা:-এর এ কথা সংরক্ষণ করেছে’, মহানবী সা: বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সংযুক্ত করে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে’। (ইবনে মাজাহ)

হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সা: বলেছেন, ‘যে কেউ নিজের বাবা ছাড়া অন্যের পরিচয়ে পরিচয় দেয় সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ ৭০ বছর হাঁটার রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

এমন অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে মহানবী সা: নারীদের তাদের পিতার নামে ডেকেছেন। যখন পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন’। (আল-কুরআন : ২১৪) নাজিল হয় তখন মহানবী সা: তাঁর আত্মীয়দের প্রত্যেককে ডেকে ডেকে বলেছিলেন : ‘হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি পরকালে তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে অমুকের মেয়ে অমুক! আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসব না।’ (আল-কাশফুল মুবদি) কিয়ামতের মাঠেও প্রত্যেককে তার বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। হাদিসের কিতাবগুলোয় এ সংক্রান্ত অনেক হাদিস রয়েছে।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে। তা হলো তিনি এক রাতে যখন প্রজাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য বের হলেন তখন একজন মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি স্বামীর বিরহে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন। তিনি পরদিন সকালে মহিলাটির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁকে বলা হলো এ মহিলা হলেন অমুকের মেয়ে অমুক। তার স্বামী আল্লাহ রাস্তায় জেহাদে রয়েছেন। (সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর) এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, মহিলাটি বিবাহিত হলেও তার পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হলো অমুকের মেয়ে অমুক; একথা বলা হলো না যে, অমুতের স্ত্রী অমুক।

আরো যে সব কারণে নারীদের বাবার নামে পরিচিত হওয়া উচিত নয় তা হলো : ০১. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো রক্ত সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু বাবা মেয়ের রক্ত সম্পর্ক চিরদিনের। ০২. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মনোমালিন্য হলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। তখন এই নাম থাকে না। ০৩. স্বামী মারা গেল স্ত্রী অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে পারে। তখন এই নামের কী দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। ০৪. স্বামী তো বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে না, তাহলে নারী কেন করবে? এটি কি নারী অধিকারের লঙ্ঘন নয়? আলোচ্য প্রবন্ধে নতুন একটি বিষয়কে অত্যন্ত ুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো। মুসলিম সমাজের উচিত ইসলামকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর যারা পরিপূর্ণ মানতে চায় তাদের উচিত এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা। যাতে করে কোনো অজুহাতেই অভিশপ্ত শয়তান কোনোভাবেই আমাদের সত্য ও সঠিক পথ ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

লেখক : ড. ইউসুফ ইবন হোছাইন (অধ্যাপক, ঢাবি)



ইসলামের আলোয় আলোকিত করলেন হিন্দু থেকে মুসলিম সিন্ধুর দ্বীন মোহাম্মদ শেখ

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
ইসলামের আলোয় আলোকিত করলেন হিন্দু থেকে মুসলিম সিন্ধুর দ্বীন মোহাম্মদ শেখ

আলোচিত এই ব্যক্তি হলেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের দ্বীন মোহাম্মদ শেখ। ১৯৪২ সালে একটি হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া এ ব্যক্তি ১৯৮৯ সালে ৪৭ বছর বয়সে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি উদ্যোগী হন দ্বীনপ্রচারে। ইতিমধ্যেই তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাযার মানুষ।

জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। ইসলামের প্রতি এমন অনুরাগ দেখে তার মা ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পরও ইসলাম সম্পর্কে তার কৌতুহল একটুও কমেনি। ইসলাম সম্পর্কে জানতে তিনি এক মুসলিম উস্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার নিকটে নিয়মিত কুরআন ও হাদীছের বাণী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন দ্বীন মুহাম্মাদ। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, তাঁর দাওয়াতে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮ হাযার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

দ্বীন মুহাম্মদ শেখ স্থানীয় আল্লাহওয়ালী জামে মসজিদের সভাপতি। তিনি অসহায় ইসলাম গ্রহণকারীদের আবাসনের জন্য প্রায় ৯ একর জায়গারও ব্যবস্থা করেছেন।

তাঁর ধর্ম প্রচারের কথা পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ায় অনেক দূর-দূন্ত থেকে মানুষ তার কাছে এসেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই বাড়ির মসজিদে নও মুসলিম শিশু-কিশোর ও নারী- পুরুষের জন্য ১৫ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ছালাত ও কুরআন তেলাওয়াত শেখার ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি।



বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

জীবনে সুস্থ থাকতে চাইলে বিয়ে করুন সঠিক বয়সে

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
বিয়ে হল একটি সামাজিক বন্ধন বা বৈধ চুক্তি যার মাধ্যমে দু’জন মানুষের মধ্যে দাম্পত্য স'ম্পর্ক স্থাপিত হয়।
বিবাহ এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার মাধ্যমে দু’জন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও যৌ'ন স'ম্পর্ক সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে।
বিয়ে শুধু একটি সামাজিক বন্ধনই না। বিয়ে দুটি মানুষকে একত্রে বেধে ফেলে।
বিয়ের ফলে দুটি মানুষের মনের আদান প্রদান হয়। যার ফলে দুটি মানুষ তাদের চিন্তা চেতনাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করতে পারে। যার ফলে একাকিত্ব মনোভাব, হতাশা, ক্লান্তি সবই দূর করা সম্ভব। তাই সুস্থ থাকতে বিয়ে করা জরুরি।
সম্প্রতি স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে এমন তথ্য। বিয়ে এবং সুস্থ্ এই দুই নিয়ে কি বলা হয়েছে তা জেনে নিন-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: বিয়ের ফলে স্বামী-স্ত্রী'র মধ্যে নিয়মিত শারীরিক স'ম্পর্ক স্থাপিত হয়। যার ফলে দম্পতির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
নারীর মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণ: স্বাভাবিক যৌ'নজীবন নারীর মূত্রাশয়ের মাংসপেশীকে সক্রিয় রাখে। বিশেষ করে ‘অর্গাজমের’ সময় ‘পেলভিক ফ্লোরের’ মাংসপেশী সংকুচিত হয়, যা একটি ভালো ব্যায়ামও বটে। কারণ প্রায় ৩০ শতাংশ নারীর কোনো না কোনো সময় মূত্রাশয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
র'ক্তচাপ কমায়: নিয়মিত শারীরিক স'ম্পর্ক স্থাপিত হলে র'ক্তচাপ কমে বলে মনে করেন গবেষক জোসেফ জে. পিনসন। গবেষণা বলছে, শারীরিক স'ম্পর্ক র'ক্তচাপ কমায়।
ব্যায়াম: নিয়মিত শারীরিক স'ম্পর্কে প্রতি মিনিটে পাঁচ ক্যালোরি খরচ হয়। গবেষকরা জানান, শারীরিক মিলনে দু’ধরনের উপকার পাওয়া যায়। এক. হৃদকম্পনে গতি আনে, দুই. একই সঙ্গে অনেক মাংসপেশীকে সক্রিয় করে।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁ'কি: শারীরিক স'ম্পর্ক হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারি। হার্ট রেট ভালো রাখার পাশাপাশি ‘এস্ট্রোজেন’ এবং ‘টেস্টোস্টেরনের’ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষকরা জানান, যারা সপ্তাহে অন্তত দু’দিন শারীরিক স'ম্পর্কে লিপ্ত হন তাদের হার্ট অ্যাটাকে মৃ'ত্যুর আশ'ঙ্কা কম।
ব্যথা কমায়: ব্যথা কমাতে ‘অর্গাজম’ বেশি কার্যকর। অধ্যাপক বেরি আর. কমিসারুক জানান, অর্গাজম ব্যথা বন্ধ করতে পারে। কারণ এতে যে হরমোন নিঃসৃত হয়, তা শরীরের ব্যথা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
ঘুম: শারীরিক স'ম্পর্কের পর দ্রুত ঘুমাতে পারবেন। কারণ অর্গাজমের সময় যে হরমোন নিঃসৃত হয়, তা দেহকে শিথিল করে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে আসে।
মানসিক চাপ: সঙ্গীর ঘনিষ্ঠতা মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ কমাতে পারে। গবেষকরা জানান, সুস্থ জীবনের জন্য শারীরিক ঘনিষ্ঠতা অ'ত্যন্ত জরুরি।


মুমিনের গুণাবলী

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
মুমিনের গুণাবলী
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৩

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، قَالَ حَدَّثَنَا يَحْيَى، عَنْ شُعْبَةَ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَنَسٍ ـ رضى الله عنه ـ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم‏.‏
وَعَنْ حُسَيْنٍ الْمُعَلِّمِ، قَالَ حَدَّثَنَا قَتَادَةُ، عَنْ أَنَسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ لا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।

 (মুসলিম ১/১৭ হাঃ ৪৫, আহমাদ ১২৮০১, ১৩৮৭৫) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ১২, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১২) 
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৪
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، قَالَ حَدَّثَنَا أَبُو الزِّنَادِ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ  সেই আল্লাহর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষন না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালবাসার পাত্র হই।

(আধুনিক প্রকাশনীঃ ১৩, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ১৩)
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস


ইসলামের রুকন বা খুঁটি

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
ইসলামের রুকন বা খুঁটি

حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ بْنُ مُوسَى، قَالَ أَخْبَرَنَا حَنْظَلَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ، عَنْ عِكْرِمَةَ بْنِ خَالِدٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ـ رضى الله عنهما ـ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّه
 صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ، وَالْحَجِّ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ ‏

ইবন ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। 
১. আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। 
২. সলাত কায়িম করা। 
৩. যাকাত আদায় করা। 
৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং 
৫. রমযানের সিয়ামব্রত পালন করা (রোজা রাখা)।

(৪৫১৪; মুসলিম ১/৫ হাঃ ১৬, আহমাদ ৬০২২, ৬৩০৯) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৭, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৭)


ফুটনোটঃ
[১] কোন কোন ফকীহদের নিকট ঈমান বাড়েও না কমেও না। বরং সমান থাকে। তাদের নিকট একজন নবীর ঈমান ও ইবলিসের ঈমান এক সমান। তাদের এই ‘আকীদাহ কুরআন ও সুন্নাহ বিরোধী। এটা মুরজি’আহ সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত ‘আকীদাহর অন্তর্ভুক্ত। 

সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৮
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস


অভিশপ্ত যারা কোরআনের ভাষায়

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
অভিশপ্ত যারা কোরআনের ভাষায়
ভালো-মন্দ দুটোই আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। তবে ভালো কাজ করতে তিনি বান্দাদের আদেশ দিয়েছেন। মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। কিছু মন্দ কাজ খুবই নিকৃষ্টমানের। এসব কাজ যারা করে আল্লাহ তাদের প্রতি লানত করেছেন; তাদের ধ্বংস কামনা করেছেন। কোরআনের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহ তাআলা সেসব মানুষের বিবরণ দিয়েছেন।
কোরআনের ভাষায় অভিশপ্ত যারা
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অভিশপ্তদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো :
ক. কাফির
খ. আল্লাহর কিতাব বিকৃতকারী
গ. মিথ্যুক
ঘ. সত্য ও ইসলামের প্রমাণ গোপনকারী
ঙ. মুনাফিক
চ. অত্যাচারী
ছ. আল্লাহর ব্যাপারে অপবাদদাতা
জ. আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গকারী
ঝ. সম্মানিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং অপবাদ দেওয়া
ঞ. আল্লাহ ও রাসুলের অসন্তুষ্টিজনক কথা বলা
ট. আল্লাহর ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা।
এই তালিকা দেখে নির্দ্বিধায় বলা যায়, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করে তাদের জন্যই আল্লাহর অভিশাপ নির্দিষ্ট নয়। বরং মিথ্যুক, প্রতারক, মুনাফিক ও আল্লাহর ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণকারীদের জন্যও তা প্রযোজ্য। তাদের পরিণামও হবে ভয়াবহ।
অভিশপ্তদের পরিণাম
আল্লাহ যাদের অভিশাপ দিয়েছেন তাদের নিকৃষ্ট পরিণতির কথা কোরআনে তিনি উল্লেখ করেছেন। পার্থিব জীবনে আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন না। পরকালে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি এবং নিকৃষ্ট পরিণাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরাই তারা, যাদের আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন। আল্লাহ যাকে অভিশাপ দেন কখনো তুমি তার কোনো সাহায্যকারী পাবে না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫২)
তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন। তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জাহান্নাম। তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল!’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত: ৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের আবাসস্থল হবে জাহান্নাম। তোমার কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সুরা : জাসিয়া, আয়াত : ৩৪)
আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের জন্য রয়েছে অভিশাপ। তাদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্ট আবাস।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৫২)
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তাদের দুনিয়া-আখিরাতে অভিশপ্ত করেন। তাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত: ৫৭)
অন্য আয়াতে বলেন, ‘তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জ্বলন্ত আগুন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬৪)
অভিশপ্ত হওয়ার কারণ
কুফর : আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে অস্বীকার করার নাম কুফর। কাফিরদের জন্য রয়েছে আল্লাহর অভিশাপ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা কুফরি করে এবং কাফিররূপে মারা যায় তাদের প্রতি আল্লাহ, সব ফেরেশতা ও মানুষের অভিশাপ।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬১)
মিথ্যাবাদিতা : মিথ্যা কথা বলা খুবই জঘন্য কাজ। মিথ্যুকদের আল্লাহর অভিশাপ অনিবার্য। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার কাছে জ্ঞান আসার পর যে ব্যক্তি এ বিষয়ে তোমার সঙ্গে তর্ক করে তাকে বলো, এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের, আমাদের নারীদের এবং তোমাদের নারীদের, আমাদের নিজেদের এবং তোমাদের নিজেদের। তারপর আমরা বিনীত আবেদন করি এবং মিথ্যুকদের দিই আল্লাহর অভিশাপ।’ (সুরা আলে-ইমরান, আয়াত : ৬১)
হত্যা ও খুনাখুনি : হত্যা ও খুনাখুনি আল্লাহ মোটেও পছন্দ করেন না। তাই তিনি হন্তারককে অভিশপ্ত বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘ইচ্ছা করে কেউ কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন। তাকে অভিশাপ দেবেন। তার জন্য প্রস্তুত রাখবেন মহাশাস্তি।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯৩)
বিশ্বাসঘাতকতা : বিশ্বাসঘাতকতা এক অমার্জনীয় অপরাধ—আল্লাহর কাছেও, মানুষের কাছেও। তাই বিশ্বাস ভঙ্গকারী অভিশপ্ত। আল্লাহ বলেন, ‘অঙ্গীকার ভাঙার জন্য আমি তাদের অভিশাপ দিয়েছি। তাদের হৃদয় কঠোর করেছি। তারা শব্দগুলোর আসল অর্থ বিকৃত করে। তাদের যা উপদেশ দেওয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে। তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক ছাড়া সবাইকে তুমি সর্বদা বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখবে। তাদের ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো। আল্লাহ সৎ লোকদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১৩)
মুনাফিকি : দুমুখো কপট মানুষ খুবই ইতর প্রকৃতির লোক। তাই মুখে ঈমান রেখে অন্তরে কুফরি গোপন করা মুনাফিকদের আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মুনাফিক নারী-পুরুষ ও কাফিরদের আল্লাহ জাহান্নামের আগুনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৮)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা : মানুষকে আল্লাহ সামাজিক জীব হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। সমাজের ভারসাম্য রক্ষায় এ বন্ধন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ ইসলামে অপরিসীম। তাই এ সম্পর্ক ছিন্ন করা অভিশপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ় অঙ্গীকার করার পর যারা তা ভাঙে, যে সম্পর্ক আল্লাহ অক্ষুণ্ন রাখতে আদেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে, তাদের জন্য রয়েছে অভিশাপ এবং তাদের জন্য রয়েছে মন্দ নিবাস।’ (সুরা : রাদ, আয়াত : ২৫)
সাধ্বী নারীদের অপবাদ দেওয়া : নারীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে। তাদের সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে ইসলামে অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া কোনো নারীর প্রতি কেউ অভিযোগের আঙুল তুললে তার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অপবাদদাতা ব্যক্তিকে আল্লাহ অভিশপ্ত ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘সাধ্বী, সরলমনা ও ঈমানদার নারীদের প্রতি যারা অপবাদ দেয় তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। তাদের জন্য রয়েছে মহা শাস্তি।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২৩)
রাসুল (সা.)-কে কষ্ট দেওয়া : শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর প্রিয়তম বান্দা। তাঁর অনন্য-অতুলনীয় আখলাক-শিষ্টাচারের নজির সৃষ্টির ইতিহাসে আর নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলা আল্লাহর অভিশাপ-অসন্তুষ্টির অন্যতম কারণ। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ও রাসুলকে যারা পীড়া দেয়, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশাপ দেন। তাদের জন্য তিনি প্রস্তুত রেখেছেন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৭)
আল্লাহর অভিশাপ থেকে বাঁচতে হলে, জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই এসব মন্দ কাজ পরিত্যাগ করতে হবে। নিজেকে রাঙাতে হবে ইসলামের আলোয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁর অভিশাপ থেকে রক্ষা করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দিন। আমিন।


বুধবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

পাথরকুচি পাতার গুনাগুণ

বুধবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

মূত্রনালির যেকোনো সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের পথ্য হিসেবে এই পাতার গুনাগুণ অতুলনীয়। এছাড়া ব্রণ, ক্ষত ও মাংসপেশী থেঁতলে গেলে এই পাতার রস আগুনে সেঁকে লাগালে উপকার পাওয়া যায়।
পাথরকুচি পাতার গুনাগুণ-
সর্দি হলে: সর্দি বসে গেলে বা পুরাতন হয়ে গেলে পাথরকুচি পাতা ছেঁচে রস করে এবং তা গরম করে ২ চা চামচ পরিমাণ সকাল-বিকেল ২ বার পান করতে হবে।
রক্তপিত্তে: পিত্ত জনিত ব্যাথায় রক্ত ক্ষরণ হলে সকাল-বিকেল ২ বার পাথরকুচি পাতার রস পান করলে এ সমস্যা দূর হবে।
মেহ: ঠাণ্ডা-সর্দির কারণে অনেক সময় শরীরে ফোঁড়া হয় এবং ব্যাথা করে। একেই বলে মেহ। এমতাবস্থায় পাথরকুচি পাতার রস এক চা চামচ করে টানা এক সপ্তাহ পান করলে মেহ ভাল হবে।
কাটা-ছিড়া: অনেক সময় কেটে গেলে বা চাপ খেয়ে থেঁতলে গেলে টাটকা পাথরকুচি পাতা হালকা তাপে গরম করে কাটা-ছিড়ার স্থানে সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায় ও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।
পেট ফাঁপা হলে: পেট ফেঁপে গেলে পেট ফুলে যায়, হালকা বায়ু, প্রস্রাব আটকে যায় এক্ষেত্রে আধা চামচ পাথরকুচি পাতার রস অল্প পরিমাণ চিনির সঙ্গে মিশিয়ে গরম করে অল্প পানির সঙ্গে মিশিয়ে রোগীকে পান করাতে হবে। তাহলে এধরনের সমস্যা দূর হবে।
মৃগী রোগ হলে: মৃগী ব্যারাম উঠার সঙ্গে সঙ্গে ৮-১০ ফোটা পাথরকুচি পাতার রস রোগীর মুখে দিলে সাথে সাথে উপকার লক্ষ্য করা যায়।
শিশুদের পেট ব্যাথা হলে: অনেক সময় শিশুদের পেটে ব্যাথা করে। এক্ষেত্রে পাথরকুচি পাতার রস ৩০-৪০ ফোটা হালকা গরম করে শিশুর পেটে মালিশ করলে পেট ব্যাথা ভাল হয়ে যাবে। তবে পেট ব্যাথা কি না তা নিশ্চিত হতে হবে।
কিডনিতে পাথর হলে: তবে পাথরকুচির সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধী গুণাগুণ হল কিডনী এবং গলব্লাডারে পাথর হলে ২-৩ টি পাথরকুচি পাতা রস করে অথবা চিবিয়ে খেলে পাথর আস্তে আস্তে অপসারণ হয়ে যাবে।
জন্ডিস হলে: জন্ডিস বা লিভারের যে কোনো সমস্যায় পাথরকুচি পাতার রস খুব উপকারী।
উচ্চ রক্তচাপ: মূত্রথলির সমস্যা এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পাথরকুচি খুব উপকার করে।
পাইলস: শুধু পাইলস নয় অর্শ্ব-গেজ হলেও পাথরকুচি পাতা খুব উপকারী। এক্ষেত্রে পাথরকুচি পাতার রসের সঙ্গে অল্প পরিমাণ গোল মরিচ মিশিয়ে পান করতে হবে।
ডায়রিয়া, কলেরা বা আমাশয় হলে: এ ধরনের সমস্যায় ৩ মিলি. পাথরকুচি পাতার রসের সঙ্গে সমপরিমাণ জিরা এবং ৬ গ্রাম ঘি মিশিয়ে একটানা কয়েকদিন খেলে উপকার হবে।
বিষাক্ত পোকায় কামড়ালে: মৌমাছি, ভ্রমরা, বিচ্ছু ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত কোনো পোকায় কামড়ালে পাথরকুচি পাতার রস গরম করে কামড়ানো স্থানে সেঁক দিলে ব্যাথা সেরে যাবে।


নামাজের হেকমত ও গুরুত্ব আলোচনা

বুধবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
নামাজের হেকমত ও গুরুত্ব আলোচনা
পাঠ সংক্ষেপসালাত দ্বীনের স্তম্ভ ও কালেমার পর সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ রোকন। কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম এ বিষয়টির হিসাব হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুকালীন সময়ে নামাজের বিষয়ে উম্মতকে অসিয়ত করে গিয়েছেন। সাহাবাগণ নামাজের জামাআত থেকে যারা দূরে থাকত তাদেরকে মুনাফিক হিসাবে সাব্যস্ত করতেন, নামাজ গুরুত্বপর্ণ হওয়ার সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি কোন মাধ্যম ছাড়াই সাত আসমানের উপর ফরজ করা হয়েছে। খুতবায় বিষয়টি বিস্তারিতভাবে দলিল-প্রমাণ সহ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ جَعَلَ الصَّلَاةَ عِمَادَ الدِّيْنِ، وَجَعَلَهَا كِتَاباً مَوْقُوْتاً عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ فَقَالَ وَهُوَ أَصْدَقُ الْقَائِلِيْنَ :
{حَافَظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُوْمُوْا لِلَّهِ قَانِتِيْنَ } (سورة البقرة : 238)
وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ :
নামাজ পড়ো নামাজ ধরো মুমিন মুসলমান

খুশুখুজুর শিখা নিয়ে থাকো অনির্বাণ।
প্রিয় উপস্থিতি!
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা দীন-ইসলাম দ্বারা এই উম্মতকে সম্মানিত করেছেন। তিনি এই দীনকে পূর্ণতা দিয়েছেন এবং মানুষের জন্য একমাত্র বিধানরূপে সাব্যস্ত করেছেন। যারা এই দীন মোতাবেক চলবে তাদেরকে তিনি এমন উত্তম বদলা ও মনোমুগ্ধকর বাসস্থান দান করবেন, যা প্রতিটি হৃদয় কামনা করে এবং যা দেখে প্রতিটি চক্ষু শীতল হবে।

এই দীন কতিপয় মজবুত ও শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো নামাজ। নামাজ ইসলামের খুঁটি এবং ঈমানের পর অতি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। যারা সুন্দরভাবে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অসংখ্য পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন। হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এক নামাজের পর আরেক নামাজ, এ দুয়ের মধ্যখানে কোনো অনর্থক কাজকর্ম না হলে, তা ঊর্ধ্বজগতে লিখা হয় (আবু দাউদ, হাসান)।

অন্য এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নামাজ সর্বোত্তম বিষয়। অতএব যে চায় সে যেন তা বাড়িয়ে নেয় (তাবারানী, হাসান)।নামাজ কল্যাণের আধার। তাই যারা কল্যাণপ্রার্থী, যারা কল্যাণের পাল্লা ভারী করতে চায়, তাদের উচিত নামাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। নামাজ আদায়কে জীবনের অন্যতম মিশন হিসেবে গ্রহন করা।

মুমিন কখনো নামাজে অবহেলা করতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে:
{حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِين }
‘তোমরা সমস্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের প্রতি’ (সূরা বাকারা : ২৩৮)।
আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার কাছে সবচে’ প্রিয় জিনিস হলো, নারী ও সুগন্ধি। আর আমার চোখের শীতলতা নামাজের মধ্যে নিহিত’ (বুখারী)।

সুপ্রিয় মুসল্লিয়ান! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমনিভাবে নামাজকে চক্ষু শীতলকারী বস্তুরূপে গ্রহণ করেছেন তেমনি আপনারাও নামাজকে চক্ষু শীতলকারী বস্তুরূপে গ্রহণ করুন।বস্তুত নামাজে রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি ও হৃদয়ের স্থিরতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বিলাল রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে বিলাল! তুমি আমাদেরকে নামাজের মাধ্যমে আরাম দাও’ (তাবারানী: আল মু‘জামুল কাবীর, সহীহ)।

নামাজ প্রথম ইবাদত যা বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন এবং নামাজের ব্যাপারেই কিয়ামতের ময়দানে সর্বপ্রথম হিসাব নেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের সময় উম্মতকে যে সর্বশেষ অসিয়ত করে গেছেন, তা হল নামাজ। মানুষের ইবাদত বন্দেগীর তালিকা থেকে সর্বশেষে বিলুপ্ত হবে নামাজ। আর নামাজ বিলুপ্ত হলে দীনচর্চার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

নামাজ মানুষকে অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। নামাজ সমাজকে সকল প্রকার অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বাঁচায় । ইরশাদ হয়েছে:
{ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ }
‘নিশ্চয় নামাজ যাবতীয় অন্যায় ও অশ্লীল-অপকর্ম থেকে বিরত রাখে’ (সূরা আনকাবুত: ৪৫)।
নামাজ এমন একটি ইবাদত যা সপ্তাকাশের উপরে জিবরীল (আ)-এর মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি ফরয হয়েছে। নামাজ আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এক সেতুবন্ধন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মুসল্লীদের মধ্যে এমন অনেককে দেখা যায়, যারা নামাজের সময় কাকের মতো ঠোকর মারে। অতি দ্রুত নামাজ শেষ করে বের হয়ে যায়। নামাজে তারা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করে না। বস্তুত তারা নামাজের মধ্যে কোনোরূপ স্বাদ ও তৃপ্তি অনুভব করতে ব্যর্থ হয়। নামাজে তারা আল্লাহ তা*আলাকে খুব কমই স্মরণ করে।

নামাজের মধ্যে বারবার এদিক-সেদিক তাকানো, শরীর চুলকানো, নামাজ অবস্থায় স্বীয় মাল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার চিন্তা করা ইত্যাদি নামাজের পরিপন্থি বিষয়। হাদীসে এসেছে:
(أَنَّ رَجُلًا دَخَلَ الْمَسْجِدَ، وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ فِي نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ فَصَلَّى، ثُمَّ جَاءَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ، ارْجِعْ فَصَلِّ فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ، فَرَجَعَ فَصَلَّى، ثُمَّ جَاءَ فَسَلَّمَ، فَقَالَ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ، فَارْجِعْ فَصَلِّ، فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ "، فَقَالَ فِي الثَّانِيَةِ أَوْ فِي الَّتِي بَعْدَهَا: عَلِّمْنِي يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَقَالَ: إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوءَ، ثُمَّ اسْتَقْبِلِ الْقِبْلَةَ فَكَبِّرْ، ثُمَّ اقْرَأْ بِمَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ، ثُمَّ ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَسْتَوِيَ قَائِمًا، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا، ثُمَّ افْعَلْ ذَلِكَ فِي صَلَاتِكَ كُلِّهَا)
‘এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদের এক প্রান্তে বসা ছিলেন। লোকটি নামাজ পড়ে এসে ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ওয়া আলাইকাস সালাম, তুমি ফিরে যাও, নামাজ পড়। কারণ তুমি নামাজ পড়নি’। সে ফিরে গেল, নামাজ পড়ল তারপর এসে সালাম করল। তিনি বললনে, ‘ওয়া আলাইকাস সালাম, তুমি ফিরে যাও, নামাজ পড়। তুমিতো নামাজ পড়নি। দ্বিতীয়বার অথবা তার পরের বার লোকটি বলল, ‘আমাকে শিখিয়ে দিন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললনে, ‘যখন তুমি নামাজে দাঁড়াতে মনস্থ করবে, ভালভাবে অজু করবে। তারপর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলবে। তারপর তোমার সাধ্যমত কুরআন পড়বে। তারপর রুকুতে যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে রুকু করবে। তারপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। তারপর সিজদায় যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে সিজদা করবে। এরপর মাথা উঠিয়ে ধীরস্থিরভাবে বসবে। অতঃপর আবার সিজদায় যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে সিজদা করবে। এরপর সিজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসবে। অতঃপর পুরা নামাজেই তুমি এরূপ করবে’ (বুখারী)।

মুহতারাম উপস্থিতি! নামাজকে অর্থবহ করে তোলার জন্য, নামাজকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য, নামাজে হৃদয়ের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করার জন্য, নামাজে যা পড়া হয় অথবা করা হয় তার অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ে হাজির করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যখন নামাজ পড়ার সময় তাকবীর বলে এবং দু’হাত উত্তোলন করে তখন এর দ্বারা সে আল্লাহ তাআলাকে তাযীম তথা সম্মান প্রদর্শন করে। সে যখন বাম হাতের উপর ডান হাত রাখে, তখন সে আল্লাহর সামনে নিজের দীনতা ও হীনতা প্রদর্শন করে। যখন সে রুকু করে তখন সে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করে। যখন সিজদা করে তখন সে মহান আল্লাহর সামনে পূর্ণমাত্রায় বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে। যখন সে বলে
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ
তখন আল্লাহ তাআলা আরশে আযীমের উপর থেকে বলতে থাকেনÑ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। যখন সে বলে
الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে। যখন সে বলে
مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা বর্ণনা করেছে। যখন সে বলে
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বিভক্ত। আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা সে পাবে। আর যখন
إِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيْمَ
থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করে তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা শুধু আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা সে পাবে। আপনি যখন
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمْ، سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
বলেন, যদিও আপনি খুব ক্ষীণ আওয়াজে বলেন তথাপি আল্লাহ তাআলা তা শুনতে পান। কেননা আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রকাশ্য-গোপনীয় সব কথা শোনেন এবং সব কাজই দেখেন তা যত ক্ষদ্র কাজই হোক না কেন। এমনিভাবে আপনি যত ছোট বিষয় নিয়েই চিন্তা-ফিকির করেন না কেন, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে অবহিত। আপনি যখন নামাজের মধ্যে সিজদার স্থানে দৃষ্টিপাত করেন তখন আল্লাহ তাআলা আপনাকে দেখেন। আপনি তাশাহহুদ পড়ার সময় যখন আঙ্গুল নেড়ে ইশারা করেন, তখন আল্লাহ আল্লাহ তাআলা আপনার ইশারাও দেখতে পান। কেননা তিনি তার বান্দাকে স্বীয় ইলম ও কুদরত দ্বারা চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে আছেন।

অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করার পাশাপাশি নামাজসহ আমাদের যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী যাতে বিশুদ্ধভাবে, সুন্দরভাবে আদায় করা সম্ভব হয় সে জন্য আমাদেরকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। এ ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সাহাবী মুআয রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
( اللَّهُمَّ أَعِنِّيْ عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحَسُنِ عِبَادَتِكَ )
‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার যিকর, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন’ (আহমদ, আবু দাউদ)।

নামাজে ধীরস্থিরতা, খুশু ও বিনয় নম্রতা অবলম্বন করার গুরুত্ব এখান থেকেও বুঝা যায় যে, মুমিনদের মধ্যে যারা খুশুর সাথে নামাজ আদায় করেন তাদের সফলকাম হওয়ার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সাক্ষী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ . الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ . إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ . فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ . }
‘মুমিনগণ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র। যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত। যারা যাকাত প্রদানে সক্রিয় এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ছাড়া এতে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। আর যারা আমানাত ও অঙ্গীকার রা করে। যারা তাদের নামাজসমূহে যতœবান থাকে। তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে তাঁরা ফিরদাওসের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে’ (সূরা মুমিনূন : ১-১১)।
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن ِالْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر ِالحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو َالْغَفُور ُالرَّحِيْمْ

দ্বিতীয় খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ جَعَلَ الصَّلَاةَ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتَاباً مَّوْقُوْتاً، وَوَعَدَ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا بِجَزِيْلِ الثَّوَابِ، وَتَوَعَّدَ مِنْ تهَاوَنَ بِهَا بَأَلِيمِ الْعِقَابِ. وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِهِ فِي الصَّلَاةِ، أَمَّا بَعْدُ:

প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! বর্তমান সমাজে নামাজের প্রতি অবহেলা তীব্র আকার ধারণ করেছে। অথচ নামাজ মুসলমানের পরিচয়, ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারক একটি ইবাদত। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ ঈমান ও কুফরের মধ্যে তফাৎ হল নামাজ না পড়া’ (মুসলিম)।

বুরাইদা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আমাদের ও তোমাদের মাধ্যে যে অঙ্গীকার, তা হলো নামাজ। অতএব যে ব্যক্তি নামাজ পরিত্যাগ করল, সে কুফরী করল’ (আহমদ, আবু দাঊদ, নাসাঈ, তিরমিযি)।

ছাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হল নামাজ। যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দিল সে শিরক করল’ (তাবারানী, সহীহ)।

আবদুল্লাহ ইবন শাকীক আল উকাইলি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীগণ নামাজ পরিত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনো আমল পরিত্যাগ করাকে কুফরী বলে মনে করতেন না (তিরমিযী আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।মুহতারাম মুসল্লিয়ান! ফরয নামাজ পুরুষের জন্য জামাতের সাথে আদায় করা অত্যাবশ্যক। শরঈ ওযর ছাড়া একাকী নামাজ পড়লে শুধু যে ছাওয়াব কম হয় তাই নয়, বরং নামাজই কবুল হয় না বলে হাদীসে সতর্কবাণী এসেছে।আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি আযান শোনার পর কোনোরূপ ওযর ছাড়াই জামাতে শরীক হয় না, (বরং আপন স্থানে নামাজ পড়ে নেয়) তার নামাজ কবুল হয় না (ইবনে মাজাহ, হাকিম)।আবুদ-দারদা রাযি. বলেন, আমি রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে গ্রামে বা মাঠে কমপে তিনজন লোক থাকে অথচ তারা সেখানে জামাতে নামাজ পড়ে না, শয়তান তাদের উপর সওয়ার হয়। অতএব জামাতকে আঁকড়ে ধরো। কেননা দলত্যাগকারী বকরীকেই বাঘে খেয়ে ফেলে (আহমদ, নাসায়ী, আবু দাউদ)।

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন, ‘আমার মনে চায়, আমার কিছু যুবককে এক বোঝা লাকড়ি সংগ্রহ করতে আদেশ দিই, তারপর আমি ঐসব লোকের নিকট যাই যারা বিনা ওযরে ঘরেই নামাজ আদায় করে। এবং গিয়ে তাদের বাড়ীঘর আগুনে পুড়িয়ে দেই’।

এই হাদীস বর্ণনাকারী ইয়াযীদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এ সতর্কবাণী কি শুধু জুমআর নামাজের জন্য, নাকি সব নামাজের জন্য? উত্তরে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা রাযি. উল্লেখ করেননি যে, এটা শুধু জুমআর নামাজের জন্য নাকি সব নামাজের জন্য। যদি আমি তার কাছ থেকে এ হাদীস না শুনে থাকি তাহলে আমার কর্ণদ্বয় বধির হয়ে যাক (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)।

ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, ‘তোমরা যদি অমুক ব্যক্তির ন্যায় ঘরেই নামাজ পড়তে আরম্ভ কর তবে তোমরা নবীজির সুন্নত তরককারী বলে গণ্য হবে। আর যদি তোমরা নবীজির সুন্নত ছেড়ে দাও তবে তোমরা নিশ্চিত গোমরাহ হয়ে যাবে (মুসলিম)।

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! নামাজ আল্লাহ তাআলার প থেকে ফরয করে দেয়া একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই নিজেরা নামাজ পড়ার সাথে সাথে পরিবারের সকল সদস্যকে নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে হবে। নিজদেরকে জাহান্নামের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচানোর সাথে সাথে পরিবারের সকল সদস্যকে দোযখ থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ইরশাদ হয়েছে:

{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا }

‘হে মুমিনগন! তোমরা নিজ এবং তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও’ (সূরা আত-তাহরীম: ৬১)।

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
{وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا }
‘তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং তুমি নিজেও এতে অবিচল থাক’ (সূরা তাহা:১৩২)।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বৎসরে উপনীত হলে তোমরা তাদেরকে নামাজের আদেশ করো। তাদের বয়স দশ বৎসরে উপনীত হওয়ার পরও তারা নামাজ না পড়লে তাদেরকে প্রহার করো (আহমদ, আবু দাউদ)।

প্রিয় মুসল্লিয়ান! আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাঁর নবীর উপর দরূদ পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
{ إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَـٰئِكَـتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِىّ يٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيْهِ وَسَلِّمُواْ تَسْلِيماً }
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফিরিশতাগণ নবীর জন্য দু‘আ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করো’ (সূরা আল আহযাব: ৫৬)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পড়বে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন (মুসলিম)।

হে করুণার আধার! আপনি আমাদের আপন আপন দেশে নিরাপত্তা দিন। ইসলাম, মুসলমান ও দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে এমন নেতৃত্ব আমাদেরকে দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করো। যারা এ পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের থেকে আমাদেরকে দূরে রাখুন। হে করুণাময় আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে চাই যে আপনি আমাদের সমাজ থেকে সুদ, ঘুষ, ব্যাভিচার এবং এগুলোর যাবতীয় আসবাব-উপকরণ উঠিয়ে নিন। আপনি আমাদেরকে, আমাদের দেশকে এবং গোটা মুসলিম বিশ্বকে হিফাযত করুন ভুমিকম্প ও প্রকাশ্য-গোপনীয় যাবতীয় ফিতনা থেকে। হে দয়াময় প্রভু! আমরা সবাই আপনার কাছে সঠিক পথ প্রার্থনা করি। অতএব হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, আলেম-উলামা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত করো।
عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : ( إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ والْمُنْكرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.




সৎসঙ্গ অবলম্বন এবং ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাব আলোচনা

বুধবার, ডিসেম্বর ০৪, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
পাঠ সংক্ষেপ
সৎসঙ্গ অবলম্বন এবং ব্যক্তি জীবনে তার প্রভাব আলোচনা

খুতবার উদ্দেশ্য : ১ - ইসলামী মূল্যবোধ ও আখলাককেন্দ্রিক তরবিয়ত, ২- অসৎ সঙ্গী থেকে হুঁশিয়ার করা ও মুমিনদের সঙ্গ অবলম্বনের নির্দেশ, ৩ - কন্যা সন্তানের তরবিয়ত ও চরিত্রগঠন এবং তাদের সঙ্গ দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ


প্রথম খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ؛ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الْدِّيْنِ كُلِّهِ، وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ. وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ :
সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস
অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।
মুসল্লিয়ানে কেরাম! ইসলাম একটি স্বভাবজাত ধর্ম। যাদের সৃষ্টিগত ফিতরত অপরিবর্তনীয় রয়েছে এবং যাদেরটা বদলে গেছে উভয়ের জন্যই ইসলাম সমানভাবে উপযোগী। উপরন্তু উভয় প্রকার স্বভাবের জন্য ইসলাম একটি প্রতিষেধকও বটে। সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
كُلُّ مَوْلُوْدٍ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ وَإِنَّمَا أَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ وَيُمَجِّسَانِهِ
‘প্রতিটি সন্তান ফিতরত তথা ইসলাম নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহূদি, খৃস্টান বা অগ্নীপূজক বানায়।’এর দ্বারা বুঝা যাচ্ছে যে সঙ্গদোষে মানুষের স্বভাবজাত ফিতরতে পরিবর্তন আসে। ফিতরত তার স্বচ্ছতা হারিয়ে, সরল পথ হারিয়ে ভিন্ন পথে চলতে শুরু করে।

মানুষ সঙ্গীবিহীন একাকী জীবনযাপন করতে পারে না। সে কারণেই মানুষকে সামাজিক জীব বলা হয়। মানবপ্রকৃতি সঙ্গী তালাশ করে। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা আদম আ. এর জন্য মা হাওয়া কে সৃষ্টি করেন, যাতে তিনি তার কাছে মানসিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন। তিনি তাকে একা রাখেননি। তিনি ইরশাদ করেন:
{هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا}
‘তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, ’ (সূরা আল আরাফ : ১৮৯)।

মানুষ অন্যদের সাথে মিলেমিশে থাকতে চায়। অন্যদের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ জীবনযাপন করতে চায়। ইসলাম মানুষের এই স্বভাবকে বাতিল করে দেয়নি, বরং তা আরো বেশী করে লালন করেছে। আরো জোরদার করার পদক্ষেপ নিয়েছে। সামাজিকভাবে পালনীয় ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধানসমূহ এদিকেই ইঙ্গিত করে। যেমন জুমার নামায , জামাআতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়, দুই ঈদ ও কুসূফের নামায ইত্যাদি। উল্লিখিত সকল ক্ষেত্রেই অন্যদের সাথে একত্রিত হতে হয়, মিলিত হতে হয়। বিষয়টি এরকম নয় যে, ইচ্ছে হলে মিশব ইচ্ছে না হলে মিশব না। বরং বিষয়টি এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জামাতে শরীক হয়ে মিলিতভাবে নামায আদায় করার বিষয়টি আমরা সবাই জানি। এমনকি যেসব লোক জামাতে শরীক হয় না রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন।

বুখারী ও মুসলিমে আবূ হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার ইচ্ছা হয়, আমি মুআজ্জিনকে আযান দিতে বলি। অতঃপর আমি কাউকে নির্দেশ দেই সে যেন লোকদেরকে নিয়ে জামাতে নামায পড়ে। তারপর আমি লাকড়ির বোঝাসহ কতিপয় লোককে নিয়ে ঐ সমস্ত কওমের কাছে যাই যারা জামাতে নামায পড়ে না। এবং সেখানে গিয়ে তাদের বাড়ীঘর আগুনে জ্বালিয়ে দিই।

অনুরূপভাবে মুসাফিরকে একাকী নয় বরং দলের সাথে সফর করতে উৎসাহিত করা এবং যে ব্যক্তি একাকী সফর করবে তাকে শয়তান বলে অভিহিত করার দ্বারাও সঙ্গী নির্বাচন করার বিষয়টি পরিস্কার হয়ে ওঠে। আমর ইবনে শুআইব রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে:
( الرَّاكِبُ شَيْطَانٌ، وَالرَّاكِبَانِ شَيْطَانَانِ، وَالثَّلاثَةُ رَكْبٌ )
‘‘ একা সফরকারী এক শয়তান, দুই জন সফরকারী দুই শয়তান এবং তিন জন সফরকারী একটি যাত্রীদল বা কাফেলা’ (তিরমিযী, আবূ দাউদ, নাসাঈ)।
অতএব মানবজীবনের একটি অপরিহার্য বিষয় হলো, এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা, যে বা যারা তাকে ভুলে গেলে স্মরণ করিয়ে দিবে, অমনোযোগী হলে সতর্ক করবে এবং কোনো কিছু না জানলে শিখিয়ে দিবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর দীন, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার বিধান দিয়েছেন যেমনটি তিনি নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর ও তাঁর রাসূলের অপছন্দনীয় যাবতীয় কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে।

সুপ্রিয় মুসল্লিয়ান! বন্ধু বা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর তা হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের সাথেই কেবল বন্ধুত্ব করা। যারা আল্লাহর শত্র“, রাসূলের শত্র“ তাদের সাথে সম্পর্ক বর্জন করা। ইরশাদ হয়েছে:
{ إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آَمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ }
‘ তোমাদের বন্ধু কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ, যারা নামায কায়েম করে এবং যাকাত প্রদান করে বিনীত হয়ে’ (সূরা আল মায়েদা: ৫৫)।

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:
{ وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آَمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ}
‘আর যে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনদের সাথে বন্ধুত্ব করে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ দলই বিজয়ী’ (সূরা আল মায়েদা: ৫৬)।
এ আয়াতের প্রতি ঈমানের একটি দাবি হল, সৎসঙ্গী গ্রহণ করা। যারা অসৎ, যারা আল্লাহ-বিদ্বেষী, রাসূল বিদ্বেষী, ইসলাম বিদ্বেষী তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা।

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
{ لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آَبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ }
‘ যারা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান আনে তুমি পাবে না এমন জাতিকে এমন লোকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধীতা করে, যদি সেই বিরুদ্ধবাদীরা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই অথবা জ্ঞাতিÑগোষ্ঠী হয় তবুও ’ (সূরা আল মুজাদালাহ: ২২)।

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলার শত্র“দেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা থেকে স্পষ্টভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বিষয়টি অন্যান্য আয়াতে আরো পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআ‘লার বাণী:
{ قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآَءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ }
‘ ইবরাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। তারা যখন স্বীয় সম্প্রদায়কে বলছিল, ‘তোমাদের সাথে এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যা কিছুর উপাসনা কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি এবং উদ্রেক হল আমাদের- তোমাদের মাঝে শত্র“তা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আন। ’ (সূরা মুমতাহিনাঃ ৪)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
{ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ }
‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর। নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল’(সূরা আল ফাতহ: ২৯)।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :
{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ }
‘হে মুমিনগণ! তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার দীন থেকে ফিরে যাবে তাহলে অচিরেই আল্লাহ এমন এক কাওমকে আনবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনম্র এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে’ (সূরা মায়িদা : ৫৪)।

আরো ইরশাদ হয়েছে :
{ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ جَاهِدِ الْكُفَّارَ وَالْمُنَافِقِينَ وَاغْلُظْ عَلَيْهِمْ }
‘হে নবী, কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর এবং তাদের ওপর কঠোর হও, আর তাদের ঠিকানা হল জাহান্নাম আর তা কতইনা নিকৃষ্ট স্থান ’ (সূরা তাওবা ঃ ৭৩)।
উল্লিখিত আয়াতগুলোর বক্তব্য একটিই। আর তা হলো, সৎ ও মুমিন ব্যক্তিদেরকেই বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা। যারা অসৎ এবং আল্লাহ ও রাসূলের শত্র“ তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা।

মানুষ যেমন বাঘ থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে ঠিক তেমনি বুদ্ধিমান লোকেরা সব সময় খারাপ ও অসৎ লোকদের থেকে দূরে অবস্থান করে। কেননা খারাপ ও অসৎ লোকদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। শুধু তাই নয়, অসৎ ও মন্দলোকেরা এমন এক হতভাগার দল, যাদের সাথে উঠাবসাকারীরাও হতভাগায় পরিণত হয়। ইরশাদ হয়েছে:
{ وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا. يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا. لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولًا. }
‘আর সেদিন যালিম নিজের হাত দু’টো কামড়িয়ে বলবে, ‘হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে কোন পথ অবলম্বন করতাম’! ‘হায় আমার দুর্ভোগ, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম’। ‘অবশ্যই সে তো আমাকে উপদেশবাণী থেকে বিভ্রান্ত করেছিল, আমার কাছে তা আসার পর। আর শয়তান তো মানুষের জন্য চরম প্রতারক’ (সূরা ফুরকান : ২৭-২৯)।

তাফসীরকারকদের নিকট একথা প্রসিদ্ধ যে, যে জালেমের ব্যাপারে এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল সে হলো, উকবা ইবনে আবী মু‘আইত। আর যে তাকে পথভ্রষ্ট করেছিল সে হলো উমাইয়া ইবনে খাল্ফ ও তার ভাই উবাই ইবনে খাল্ফ।সুতরাং যে ব্যক্তি তার বন্ধুকে কুফরীর ক্ষেত্রে অনুসরণ করবে এবং কুফরী অবস্থায়ই মারা যাবে সে উকবা ইবনে আবী মু‘আইতের মতোই শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তা থেকে হিফাযত করুন।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিকে যেমন সৎসঙ্গী অবলম্বন করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন, ঠিক অন্যদিকে তেমনি অসৎসঙ্গী থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। যেমন আবূ মূসা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে:
( إِنَّمَا مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السُّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيْرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُهْدِيَكَ وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيْحاً طَيِّبَةً وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيْحاً خَبِيْثَةً )
‘ সৎসঙ্গী ও অসৎসঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো আতর বহনকারী ও হাপরে ফুঁকদানকারী কামারের ন্যায়। আতরওয়ালার কাছে গেলে সে হয়তো তোমাকে বিনামূল্যে কিছু আতর হাদিয়া দিবে, অথবা তার কাছ থেকে তুমি আতর ক্রয় করবে অথবা তার কাছ থেকে সুঘ্রাণ পাবে। পক্ষান্তরে কামারেরর কাছে গেলে হয়তো তোমার কাপড় পুড়বে নতুবা তোমার নাকে দুর্গন্ধ লাগবে’ ( বুখারী)।

মুহাল্লাব রহ. বলেন, এ হাদীসে নেক লোকদের সাথে উঠাবসার বরকতের বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলেম-উলামাদের সাথে উঠাবসা এবং তালীম ও যিকিরের হালকার সাথে জড়িত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সৎসঙ্গীকে আতরওয়ালার সাথে উপমা দিয়েছেন। বলেছেন, আতরওয়ালার কাছে গেলে তার কাছে থাকা সামগ্রী না পাওয়া গেলেও সুঘ্রাণ পাওয়া থেকে অবশ্যই বঞ্চিত হবে না।

প্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! লুকমান আ. তার সন্তানকে উপদেশ দিয়ে বলেন, প্রিয় বৎস! উলামায়ে কিরামের সাথে উঠাবসা করো এবং তাদের সঙ্গ অবলম্বনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো। কেননা আল্লাহ তাআলা হেকমতের নূর দ্বারা অন্তরসমূহকে সজীব করেন যেমন সজীব করেন আকাশের বৃষ্টি দ্বারা মৃত যমীনকে।
তিনি আরো বলেন,তুমি তাদের সঙ্গদেওয়ার সময় হয়তো আল্লাহর রহমত তাদেরকে স্পর্শ করবে, আর তাদের সাথে তোমাকেও তা স্পর্শ করবে। এটা হলো তাকওয়া ও পরহেজগারিতে অগ্রণী ব্যক্তিদের সঙ্গ অবলম্বনের ফলাফল।

কোনো এক আলেমের উদ্ধৃতি দিয়ে আল্লামা আইনী রহ. বলেন, যাদের কাছে বসলে তোমার দীনী উপকার হয়, ইলমী ও আমলী ফায়েদা হয়, চরিত্র সুন্দর হয়, এমন লোকদের মজলিসে বসার নির্দেশ লুকমান আ.-এর বক্তব্যে রয়েছে। অতএব কোনো মানুষ যখন এমন কোনো লোকের কাছে বসে, যার কাছে বসলে আখেরাতের কথা স্মরণ হয় তখন তার উচিত খুব বেশি পরিমাণে ও বেশী সময় এ ধরনের লোকের কাছে বসা। সর্বোপরি যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে সঙ্গী বানিয়ে নেয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সৎসঙ্গ অবলম্বন করার এবং অসৎসঙ্গ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দিন। আমীন।
أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الْشَّيْطَانِ الْرَّجِيْمِ : {مَنْ عَمِلَ صَالِحاً فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ أَسَاء فَعَلَيْهَا وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لّلْعَبِيدِ} ( سورة فصلت : 46)
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .

দ্বিতীয় খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَلِيِّ الْمُؤْمِنِيْنَ وَالصَّالِحِيْنَ، وَالْصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِيْنَ، أَمَّا بَعْدُ :
মুহতারাম হাযেরীন! এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে সৎসঙ্গী বেছে নেওয়ার ফল অপরিসীম। সৎসঙ্গী বেছে নেওয়ার দ্বারা সর্বপ্রথম ব্যক্তিজীবন সুন্দর হয়। আর ব্যক্তিজীবন সুন্দর হওয়ার দ্বারা আদর্শ সমাজ গড়ে উঠে। আর এটা তো পরিস্কার কথা যে, যখন কোনো সমাজ আদর্শ সমাজে পরিণত হয়, তখন সেখানে অবিরত ধারায় আসমান ও যমীন থেকে আল্লাহ তাআলা বরকত নাযিল করতে থাকেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
{ وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آَمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ. }
‘ আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের ওপর খুলে দিতাম’ (সূরা আল আরাফ:৯৬)।

ইমাম বাগাভী রহ. বলেন, আসমান ও যমীনের বরকত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আসমান থেকে পরিমিত বৃষ্টি বর্ষিত হওয়া এবং যমীন থেকে প্রয়োজনীয় ফসল ও উদ্ভিদ উৎপন্ন হওয়া। দুর্ভিক্ষ ও অনুর্বরতা না থাকা।জান্নাতবাসীগণ সকলেই সৎসঙ্গী লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{ إِنَّ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا }
‘ নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস’ (সূরা আল কাহাফ: ১০৭)।

তিনি আরো বলেন:
{ وَنَزَعْنَا مَا فِي صُدُورِهِمْ مِنْ غِلٍّ إِخْوَانًا عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ. لَا يَمَسُّهُمْ فِيهَا نَصَبٌ وَمَا هُمْ مِنْهَا بِمُخْرَجِينَ. }
‘ আর আমি তাদের অন্তর থেকে হিংসা বিদ্বেষ বের করে ফেলব, তারা সেখানে ভাই ভাই হয়ে আসনে মুখোমুখি বসবে। সেখানে তাদেরকে ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিষ্কৃতও হবে না ’ (সূরা হিজর : ৪৭-৪৮)।

সুপ্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! সাহাবায়ে কিরাম ও আমাদের পূর্বসূরীগণ ছিলেন সৎসঙ্গীর উত্তম নমুনা। সহীহ বুখারীতে আবূ জুহাইফা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখ হয়েছে:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালমান রাযি. ও আবূদ-দারদা রাযি. ভ্রাতৃত্বেরবন্ধনে আবদ্ধ করেন। একদিন সালমান রাযি. আবূদ-দারদা রাযি. এর সাক্ষাতে গেলেন। তখন তিনি আবূদ-দারদা রাযি. এর স্ত্রীকে জীর্ণ পোশাক ও বিষন্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার একি অবস্থা? উত্তরে আবূ দারদা রাযি. এর স্ত্রী বললেন, আপনার ভাই আবূদ-দারদার তো দুনিয়ার আরাম-আয়শের প্রতি মোটেও মনোযোগ নেই।

এমন সময় আবূদ-দারদা রাযি. বাড়ীতে এসে সালমান রাযি. এর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলেন এবং বললেন, আমি রোযা রেখেছি। আপনি আহার গ্রহণ করুন। সালমান রাযি. বললেন, আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত আহার গ্রহণ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আহার গ্রহণ করব না। একথা শুনে আবূদ-দারদা রাযি রোযা ভঙ্গ করে সালমান রাযি.-এর সাথে আহার গ্রহণ করলেন।

রাতে যখন ঘুমানোর সময় হলো তখন আবূদ-দারদ রাযি. নামায পড়তে উদ্যত হলেন। সালমান রাযি. তাকে বললেন, এখন ঘুমিয়ে পড়ুন। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। একটু পর আবার তিনি নামায পড়তে উদ্যত হলেন। সালমান রাযি. বললেন, আরো ঘুমান। তিনি ঘুমিয়ে গেলেন। অতঃপর রাত যখন শেষভাগে উপনীত হলো তখন সালমান রাযি. বললেন, এবার উঠুন।

তারপর তারা উভয়ে নামায পড়লেন। নামায শেষে সালমান রাযি. বললেন, নিশ্চয় আপনার ওপর আপনার প্রতিপালকের হক রয়েছে। অনুরূপভাবে আপনার ওপর আপনার নিজ দেহের হক রয়েছে। আপনার ওপর আপনার স্ত্রীরও হক রয়েছে। অতএব আপনি প্রত্যেকের হক আদায় করুন।পরদিন আবূদ-দারদা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে সালমান রাযি.-এর বক্তব্য পেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সালমান সত্য বলেছে।

অতএব হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা লক্ষ্য করে দেখুন, সাহাবায়ে কেরাম সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যাপারে একে অপরকে কীরূপ সহযোগিতা করতেন। সৎসঙ্গের উপকারিতা এরূপই হয়ে থাকে।পক্ষান্তরে অসৎসঙ্গ অবলম্বনের দ্বারা কোনো উপকার তো হয়-ই না বরং তা মানুষকে আল্লাহবিমুখ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের র চাচা আবূ তালিবের ঘটনা এ ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। সহীহ বুখারীতে সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব রহ. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে:

যখন আবূ তালেবের মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট উপস্থিত হলেন এবং সেখানে আবূ জাহ্ল, আবদুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়াকে পেলেন। তিনি আবূ তালেবকে লক্ষ্য করে বললেন, চাচা! আপনি বলুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এটা এমন এক কালেমা যদ্বারা আমি আল্লাহর কাছে আপনার পক্ষে সুপারিশ করব।একথা শুনে আবূ জাহ্ল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয় আবূ তালেবকে বলল, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? এরপর অনেকক্ষণ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাচা আবূ তালেবকে কালেমা পড়তে বলছিলেন আর আবূ জাহ্ল ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়া তাকে আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কথাটি পুনরাবৃত্তি করছিল।

পরিশেষে আবূ তালেব কালেমা পড়তে অস্বীকার করল এবং আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপরই অটল থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করল।তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহর কসম! যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে বারণ না করা হবে ততক্ষণ আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তখন আল্লাহ তাআলা আবূ তালেবের ব্যাপারে এই আয়াত নাযিল করলেন:
{ مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى }
‘ নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে। যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয় তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী’ (সূরা আত ত্ওাবা: ১১৩)।

আর আবূ তালেবের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে খেতাব করে আল্লাহ তাআলা বললেন:
{ إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ }
‘নিশ্চয় তুমি যাকে ভালবাস তাকে তুমি হিদায়াত দিতে পারবে না বরং আল্লাহই যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন। আর হিদায়াতপ্রাপ্তদের ব্যাপারে তিনি ভাল জানেন’ (সূরা আল কাসাস: ৫৬)।

পিতা ও অভিভাবকদেরকে লক্ষ্য করে বলছি, আপনাদের প্রত্যেকেই রক্ষক আর আপনাদের প্রত্যেককেই তার রক্ষণাবেক্ষণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। হাদীসে এসেছে :
( كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ )
‘ তোমাদের প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক, আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার তত্ত্বাবধান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’।

তাই আপনাদের কর্তব্য হলো, আপনাদের সন্তানদের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা। তারা কোথায় গেল, কোথায় খেল, কোথায় রাত্রিযাপন করল এবং মোবাইলে কার কার সাথে কথা বলল এ সব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। যদি আপনারা আপনাদের সন্তানদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর না রাখেন, তারা কোথায় যাচ্ছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, সেদিকে নযর না দেন এবং পরিশেষে যদি তারা খারাপ স্বভাব ও মন্দ আচরণে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে তাহলে এর দায়ভার কিন্তু অবশ্যই আপনাদেরকে বহন করতে হবে। তাই আসুন, আমরা নিজেরা সৎসঙ্গ অবলম্বন করি এবং যে কোনো মূল্যে অসৎসঙ্গ পরিহার করি। সেই সাথে নিজেদের ছেলেমেয়ে ও অধীনস্থদের ক্ষেত্রেও এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

{إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَـٰئِكَـتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِىّ يٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيْهِ وَسَلّمُواْ تَسْلِيماً } ( الأحزاب : 56 )
اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الْرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الْطَّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنْ الْصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الْدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الْرَّاحِمِيْنَ
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সৎ সঙ্গ অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। অসৎ সঙ্গ থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রাখুন। মুমিন, মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তিদের সঙ্গ অবলম্বনের তাওফীক দিন। সৎ সঙ্গের সুফলসমূহ ভোগ করার তাওফীক দিন।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে নেক আমল করার তাওফীক দিন। আপনি যে সব আমল পছন্দ করেন এবং আপনার রেজামন্দী অর্জনে সহায়তা করে আপনি আমাদের সে সব আমল বেশি বেশি করার তাওফীক দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জীবনের সকল গুনাহ মাফ করে দিন। আমাদেরকে সকল বালামুসিবত থেকে হিফাযত করুন। আমাদের জীবনকে সকল প্রকার কল্যাণে ভরে দিন। আমীন। ইয়া রাব্বাল আলামীন।
عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png