শিরোনাম
Loading latest headlines...

শুক্রবার, ২৩ মে, ২০২৫

আর রাহীকুল মাখতূম: একটি অনবদ্য সীরাত-গ্রন্থ

শুক্রবার, মে ২৩, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে
আর রাহীকুল মাখতূম: একটি অনবদ্য সীরাত-গ্রন্থ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত পর্যালোচনায়, সীরাতের ঘটনামালার সুসংহত ও মনোজ্ঞ উপস্থাপনায় বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি সত্যিই এক নজিরবিহীন রচনা। আল কুরআনুল কারীম, হাদীসে নববী ও বিশুদ্ধ আছার এবং ঐতিহাসিক বর্ণনার নির্যাস বের করে প্রাজ্ঞ লেখক তাঁর এ বইটি সুবিন্যস্ত করেছেন। সীরাতবিষয়ে লিখিত প্রাচীন গ্রন্থাদি থেকেও তিনি বহু মণিমাণিক্য উপস্থাপন করেছেন যা ত্রুটিরহিত সংক্ষিপ্ততায়, সুখপাঠ্য দীর্ঘ আলোচনায়, অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। সে হিসেবে, বইটি, বন্ধ্যাত্বের এই আধুনিক যুগে পূর্ণাঙ্গ ও পর্যাপ্ত তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছে। বইটি নির্ভরযোগ্যতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড রক্ষা করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সীরাত উপস্থাপন করেছে, যা পাঠকের সামনে উজ্জ্বল করে দেয় সীরাতুল মুস্তাকীমের নিশানাসমগ্র। দেখিয়ে দেয় সীরাতুন্নাবী পাঠের সঠিক পদ্ধতি। এসব কারণে রাবেতায়ে আলামে ইসলামী কর্তৃক সীরাতুন্নবী গ্রন্থ-প্রতিযোগিতায় যুক্তিযুক্তভাবেই বইটি প্রথমস্থান অধিকার করে ১২৯৬ হি.সালে।

   



বুধবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৫

বেসামরিক নাগরিকদের উপর হামলা এবং কাফিরদের উপর ব্যাপক হামলার বিধান

বুধবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

সামরিক-বেসামরিক বলতে কী বোঝায়

  

সামরিক-বেসামরিক বলতে কী বোঝায়?

আমাদের আলোচ্য বিষয় বুঝতে হলে সর্বপ্রথম জানতে হবে সামরিক ও বেসামরিক বলতে কী বুঝায়? বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে কোনো দেশের সামরিক নাগরিক বলতে বোঝায় যারা সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং দেশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত তারা, এমনিভাবে যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তারাও সামরিক। আর বাকি সাধারণ নাগরিক যারা রয়েছে তারা সবাই হলো বেসামরিক নাগরিক। এরা পুরুষ হোক নারী হোক, বৃদ্ধ বা শিশু হোক, সুস্থ-সবল হোক দুর্বল হোক অথবা অসুস্থ হোক, যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলে কিংবা কোনো সামরিক বাহিনীতে না থাকলে বেসামরিক বলেই গণ্য হয়। কিন্তু ইসলাম কি সামরিক-বেসামরিকের এই কনসেপ্ট গ্রহণ করেছে? বর্তমানে প্রচলনে সামরিক-বেসামরিক বলতে যেটা বোঝানো হয় সেটা কি মুসলিমরা মানতে বাধ্য? অসম্ভব, কখনোই নয়। ইসলাম স্বয়ংসম্পূর্ণ ও স্বতন্ত্র দীন। ইসলামী শরীয়তে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যুদ্ধের সময় কাদেরকে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না? আমাদের ফুকাহায়ে কিরাম কোন্ পরিস্থিতিতে কাকে হত্যা করা যাবে এবং কোন্ পরিস্থিতিতে কাকে হত্যা করা যাবে না তার সবকিছু নিয়েই খুলে খুলে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইসলামেরও একটি নিজস্ব সামরিক-বেসামরিক সংজ্ঞা রয়েছে। এজন্য আমাদের প্রথমে জানতে হবে ইসলামের দৃষ্টিতে সামরিক কারা এবং বেসামরিক কারা? যুদ্ধের সময় কাদেরকে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না? মূলত ফিকহের বড় বড় প্রায় সব কিতাবেই 'কিতাবুস সিয়ার' বা 'কিতাবুল জি হা দে' কাফেরদের মধ্যে কাদেরকে যুদ্ধের সময় হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে অল্প জায়গায় খোলাসা উল্লেখ করে সবচেয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন ইমাম আলাউদ্দীন আল কাসানী রহিমাহুল্লাহ তার কালজয়ী ও অনবদ্য গ্রন্থ বাদায়িউস সানায়ি'তে। তিনি বলেন,

[فصل في بيان من يحل قتله من الكفرة ومن لا يحل] وأما بيان من يحل قتله من الكفرة ومن لا يحل، فنقول: الحال لا يخلو إما أن يكون حال القتال، أو حال ما بعد الفراغ من القتال، وهي ما بعد الأخذ والأسر؛


أما حال القتال فلا يحل فيها قتل امرأة ولا صبي، ولا شيخ فان، ولا مقعد ولا يابس الشق، ولا أعمى … ولو قاتل واحد منهم قتل، وكذا لو حرض على القتال، أو دل على عورات المسلمين، أو كان الكفرة ينتفعون برأيه، أو كان مطاعا، وإن كان امرأة أو صغيرا؛ لوجود القتال من حيث المعنى.


وقد روي «أن ربيعة بن رفيع السلمي – رضي الله عنه – أدرك دريد بن الصمة يوم حنين، فقتله وهو شيخ كبير كالقفة، لا ينفع إلا برأيه، فبلغ ذلك رسول الله – صلى الله عليه وسلم – ولم ينكر عليه»


والأصل فيه أن كل من كان من أهل القتال يحل قتله، سواء قاتل أو لم يقاتل، وكل من لم يكن من أهل القتال لا يحل قتله إلا إذا قاتل حقيقة أو معنى بالرأي والطاعة والتحريض، وأشباه ذلك على ما ذكرنا…

অর্থঃ “অধ্যায়: যেসব কা*ফেরকে হ*ত্যা করা জায়েয এবং যাদের হ*ত্যা করা জায়েয নয়ঃ


এ সম্পর্কে আমরা বলব, এক্ষেত্রে দুটি অবস্থা। যুদ্ধরত অবস্থা এবং যুদ্ধ থেকে ফারেগ হওয়ার পর গ্রেফতার ও বন্দী করা অবস্থা।


যুদ্ধ চলাকালে নারী, শিশু, অতিশয় বৃদ্ধ, বিকলাঙ্গ, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং অন্ধকে… হ*ত্যা করা জায়েয নেই। তবে এদের কেউ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করলে তাকে হ*ত্যা করা হবে। এমনিভাবে যদি তাদের কেউ যুদ্ধে উৎসাহ দেয়, মুসলমানদের বিপক্ষে গোয়েন্দাগিরি করে, কা*ফেররা তার মতামত দ্বারা লাভবান হয় অথবা সে অনুসরণীয় (নেতৃস্থানীয়) হয় -হোক সে নারী বা শিশু- (তাহলে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও) পরোক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার কারণে তাকেও হ*ত্যা করা হবে।


এক বর্ণনায় এসেছে, হযরত রবিআ ইবনে রাফি আসসুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু হুনাইন যুদ্ধের দিন দুরাইদ ইবনে সিম্মাহকে বাগে পেয়ে হত্যা করেন। অথচ তখন সে ছিল ক্ষীণকায় ও অতিশয় বৃদ্ধ। তার বুদ্ধি-পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে উপকৃত হওয়ার পথ তাদের ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এ খবর পৌঁছলে তিনি কোন আপত্তি করেননি।


এক্ষেত্রে মূলনীতি হল, যে কেউ যুদ্ধ করার উপযুক্ত, সে যুদ্ধ করুক বা না করুক- তাকে হ*ত্যা করা জায়েয। আর যে যুদ্ধের উপযুক্ত নয়, তাকে হ*ত্যা করা নাজায়েয। তবে যদি তারা সরাসরি যুদ্ধে আসে অথবা বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে, কিংবা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হওয়ার কারণে কিংবা উৎসাহ প্রদান প্রভৃতির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে লড়াইয়ে অংশ নেয়, তাহলে (সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও) তাদেরকে হ*ত্যা করা জায়েয। (বাদায়িউস সানায়ি’: ৯/৩৩৮-৩৪৮, প্রকাশনীঃ দারুল হাদীস)


এটাই হলো, ইসলামের সামরিক বেসামরিক কনসেপ্ট। ইসলাম অন্যদের থেকে ধার করে চলে না। অর্থাৎ ইসলামে সামরিক তারাই যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম, সে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করুক বা না করুক। পক্ষান্তরে যারা যুদ্ধে অক্ষম তারাই হল বেসামরিক। যেমন নারী, শিশু, অতি বৃদ্ধ, এমন পাদ্রী যে সারাজীবন শুধু গির্জাতেই পড়ে থাকে এবং সাধারণ মানুষের সাথে মিশে না, এমন রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যার পক্ষে কোনোভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে এ ধরণের ব্যক্তিরাও যদি যেকোনোভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তাহলে তাদেরকেও  হত্যা করা যাবে। এমনিভাবে যদি তারা এমন মেধাবী হয় যাদের দ্বারা যুদ্ধের কাজে সাহায্য নেওয়া যায় কিংবা পরামর্শ নেওয়া যায় অথবা সে সমাজের নেতা বা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হয় তাহলে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তাদেরকে হত্যা করা যাবে। এটাই ইসলামের সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্ট। ফিকহের বড় বড় সব কিতাবেই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সকল দলীল ও রেফারেন্স একত্র করতে গেলে বিশাল একটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। তাই আপাতত সামান্য কয়েকটি উদাহরণ দেখুন,

আল হিদায়াঃ ২/৩৪০-৩৪১,প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ফাতাহ (কম্পিউটার নুসখা) , আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহঃ ২/২১১, বাবু কাইফিয়্যাতিল কিতাল, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতুল ইত্তিহাদ (দেওবন্দ), তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমঃ ৩/৩৫-৩৬, প্রকাশনীঃ মাকতাবাতু দারিল উলুম, করাচী)


পাঠক লক্ষ্য করে দেখুন, বর্তমানে প্রচলিত সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্টের সাথে ইসলামী শরীয়তের সামরিক-বেসামরিক কনসেপ্টের বিশাল পার্থক্য। এই সহজ বিষয়টা অনেকেই  তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। প্রচলিত অর্থে বেসামরিক নাগরিক হলেই ইসলাম তাদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করে এমন অনর্থক ও ফালতু কথা অনেক বড় বড় ব্যক্তিদেরকেও বলতে শোনা যায়! ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অথচ এটা ইসলামী শরীয়তের একটি প্রসিদ্ধ মাসআলা। ফিকহের একজন সাধারণ থেকে সাধারণ তালিবুল ইলমেরও এই মাসআলা হল (সমাধান) থাকা দরকার ছিলো! অথচ আমাদের পরিচিত ভালো ভালো মেধাবী বড় ভাইদেরও এক্ষেত্রে পদস্খলনের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে। و إلى الله المشتكى


যাইহোক, এটা হলো স্বাভাবিক অবস্থার কথা। অর্থাৎ, ইচ্ছাকৃতভাবে কাদেরকে টার্গেট করে হত্যা করা যাবে এবং কাদেরকে হত্যা করা যাবে না তাদের আলোচনা। কিন্তু যদি কাফের নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ এমনকি মুসলিমরাও একত্রে একটা অঞ্চলে বা একটা জায়গায় থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে হামলা করা জায়েয আছে কি-না? অর্থাৎ আমরা নিশ্চিত যে হামলা করলে অনেক নারী শিশু এমনকি মুসলিমও মারা যেতে পারে এটা জানা সত্ত্বেও তাদেরকে টার্গেট না করে সেই অঞ্চলে বা জায়গায় ব্যাপক হামলা করা যাবে কি-না?


এক্ষেত্রে প্রথমেই আমরা উপমহাদেশের অন্যতম মান্যবর আলেম মুফতী তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহর বক্তব্য তুলে ধরছি! তিনি তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমে একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,

" لا بأس إذن في إصابة النساء و الصبيان. و ليس المراد إباحة قتلهم بطريق القصد إليهم، بل المراد: إذا لم يمكن الوصول إلى الآباء إلا بوطأ الذرية، فإذا أصيبوا لاختلاطهم بهم جاز قتلهم...

و به يؤخذ حكم قذف القنابل في زماننا, فإنه يجوز إذا لم يقصد بها النساء و الصبيان. بل أريد بها النكاية في العدو. فإن أصيب بها النساء و الصبيان من غير قصد فلا بأس بها."

অর্থঃ এমন অবস্থায় (অর্থাৎ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী মুশরিকদের উপরে রাতে ব্যাপক ও অতর্কিত হামলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে) নারী এবং শিশুদের হত্যা করলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এর উদ্দেশ্য এই নয় যে, তাদেরকে টার্গেট করে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা বৈধ। বরং উদ্দেশ্য হলো, যদি শিশুদেরকে হত্যা করা ছাড়া বড়দেরকে হত্যা করা সম্ভব না হয়, তাহলে একত্রে মিশে থাকার কারণে তাদেরকে হত্যা করা  হলে তা বৈধ হবে।...

এ থেকে আমাদের যুগে বোমা নিক্ষেপ করার হুকুম গ্রহণ করা যায়। কেননা, নারী ও শিশুদেরকে সরাসরি টার্গেট না করলে তা বৈধ রয়েছে। বরং, এক্ষেত্রে যদি উদ্দেশ্য হয় শত্রুকে পরাস্ত করা এবং এক্ষেত্রে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করা হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিমঃ ৩/৩৫)


বক্তব্য একদম পরিষ্কার। ইসলামী শরীয়তে দৃষ্টিতে যারা বেসামরিক অর্থাৎ যাদেরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা বৈধ নয় তারাও যদি সামরিকদের সাথে (যাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিতে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও হত্যা করা বৈধ তাদের সাথে) একত্রে মিশে থাকে তাহলে তাদের উপরে ব্যাপকভাবে হামলা করা বৈধ। এতে যদি ইসলামের দৃষ্টিতে বেসামরিক নাগরিক মারাও যায় তাতে কোনো সমস্যা নেই। তবে শর্ত হলো তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করে হত্যা করা যাবে না। এই মাসআলাটাও একদম প্রসিদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত মাসআলা। এমনকি ফুকাহায়ে কিরাম সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এমন অবস্থায় যদি কোনো মুসলিম বন্দি বা ব্যবসায়ীও কাফেরদের মাঝে থাকে তবুও ব্যাপকভাবে হামলা করা বৈধ আছে‌। এমনকি যদি তারা মুসলিমদেরকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তাহলে সেক্ষেত্রে আগে মুসলিমকে হত্যা করে তারপর তাদেরকে হত্যা করা বৈধ। তবে উদ্দেশ্য থাকবে কাফেররা। মুসলিমরা উদ্দেশ্য থাকবে না। পরবর্তীতে এই হত্যার কারণে কোনো ধরনের কিসাস বা দিয়ত (রক্তপণ) আসবে না। আহলুল ইলম ও তালিবুল ইলমদের উদ্দেশ্যে ইমাম মারগীনানী রহিমাহুল্লাহর হিদায়ার ইবারত তুলে ধরছি,

" ولا بأس برميهم وإن كان فيهم مسلم أسير أو تاجر " لأن في الرمي دفع الضرر العام بالذب عن بيضة الإسلام وقتل الأسير والتاجر ضرر خاص ولأنه قلما يخلو حصن من مسلم فلو امتنع باعتباره لانسد بابه " وإن تترسوا بصبيان المسلمين أو بالأسارى لم يكفوا عن رميهم " لما بينا " ويقصدون بالرمي الكفار " لأنه إن تعذر التمييز فعلا فلقد أمكن قصدا والطاعة بحسب الطاقة. (الهداية: كتاب السير، باب كيفية القتال، ٣/٤٣٩)

আরো দেখুন,

শরহু মুখতাসারিত তহাবীঃ ৭/২১-২২, আল ফাতাওয়াল হিন্দিয়্যাহঃ ২/২১০, বাদায়িউ সানায়ি': ৩/৩৪৭-৩৪৮


যাইহোক, এ ব্যাপারে সব হাওয়ালা দিতে গেলে পোস্ট আর পোস্ট থাকবে না! কিতাবে পরিণত হয়ে যাবে। পরিশেষে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহর চমৎকার আলোচনা উল্লেখ করছি,


المحرم إنما هو قصد قتلهن فأما إذا قصدنا قصد الرجال بالإغارة أو نرمي بمنجنيق أو فتح شق أو إلقاء نار فتلف بذلك نساء أو صبيان لم نأثم بذلك لحديث الصعب بن جثامة أنه سأل النبي صلى الله عليه وسلم عن أهل الدار من المشركين يبيتون فيصاب الذرية فقال “هم منهم” متفق عليه ولأن النبي صلى الله عليه وسلم رمى أهل الطائف بالمنجنيق مع أنه قد يصيب المرأة والصبي وبكل حال فالمرأة الحربية غير مضمونة بقود ولا دية ولا كفارة لأن النبي صلى الله عليه وسلم لم يأمر من قتل المرأة في مغازيه بشيء من ذلك فهذا ما تفارق به المرأة الذمية


 وإذا قاتلت المرأة الحربية جاز قتلها بالاتفاق لأن النبي صلى الله عليه وسلم علل المنع من قتلها بأنها لم تكن تقاتل فإذا قاتلت وجد المقتضى لقتلها وارتفع المانع. اهـ


“নিষেধ হল- ইচ্ছাকৃত টার্গেট বানিয়ে মহিলাদের হ*ত্যা করা। সুতরাং যদি আমরা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বা কোন অঞ্চল বিজয়ের জন্য অতর্কিত আক্রমণ করি বা মিনজানিক (প্রাচীন ক্ষেপণাস্ত্র) দিয়ে আগুন ইত্যাদি নিক্ষেপ করি, ফলে কিছু নারী বা শিশু ধ্বংসের শিকার হয়, এ কারণে আমরা গুনাহগার হব না। কেননা, সা’ব ইবনে জাসসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি মু*শরিকদের ভূমিতে অতর্কিত আক্রমণের ফলে নিহত শিশুদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ওরা ওদের (মু*শরিকদের)-ই অন্তর্ভুক্ত’। (সহীহ বুখারী ও সহীহ ‍মুসলিম)। এছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তায়েফ বাসীর উপর মিনজানিক হামলা করেছেন। অথচ এর দ্বারা অনেক সময় নারী-শিশু আক্রান্ত হয়ে থাকে।


সর্বোপরি কথা হল, হা*রবী মহিলার কোন কিসাস, দিয়ত বা কাফফারার বিধান নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধসমূহে কোন ব্যক্তি কোন মহিলাকে হ*ত্যা করে থাকলে, তিনি তাকে এসব কিছুর হুকুম দেননি। এটাই হা*রবী ও যিম্মি নারীর পার্থক্য।


হা*রবী মহিলা যদি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তাহলে সকলের ঐকমত্যে তাকে হ*ত্যা করা জায়েয। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হ*ত্যা করা নিষেধ হওয়ার কারণ এই বলেছেন যে, ‘সে তো কি*তাল করে না’। সুতরাং যখন সে কি*তালে লিপ্ত হবে, তখন হত্যার উপযুক্ত কারণ পাওয়া গেল এবং নিষেধাজ্ঞার কারণ বিলুপ্ত হয়ে গেল …।” –আসসারিমুল মাসলূল: ১০৪


যাইহোক বিষয়টি একদম সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার।  এখানে জলঘোলা করার কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি বিপরীত দাবী করে তাহলে তাকে আমরা বলবো,

هاتوا برهانكم ان كنتم صادقين



শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫

পাঁচ কালেমা

শুক্রবার, এপ্রিল ০৪, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



(১) কালেমা তাইয়্যেবা

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ مُحَمَّدُ رَّسُوْ لُ الله

উচ্চারণঃ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ।

অর্থঃ আল্লাহ ভিন্ন ইবাদত বন্দেগীর উপযুক্ত আর কেহই নাই । হযরত মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাঁহার প্রেরিত রসূল ।

(২) কালেমা শাহাদত

اَشْهَدُ اَنْ لاَّ اِلَهَ اِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَه’ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُه’ وَرَسُوْلُه’

উচ্চারণঃ আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওহদাহু লা-শারীকালাহু ওয়াশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাছুলুহু ।

অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে , অল্লাহ ভিন্ন আর কেহই ইবাদতের উপযুক্ত নাই তিনি এক তাঁহার কোন অংশীদার নাই ।আমি আরও সাক্ষ্য দিতেছি যে, হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা এবং তাঁহার প্রেরিত নবী ।

(৩) কালেমা তাওহীদ

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ وَاحِدَ لاَّثَانِىَ لَكَ مُحَمَّدُرَّ سُوْلُ اللهِ اِمَامُ الْمُتَّقِيْنَ رَسُوْ لُرَبِّ الْعَلَمِيْنَ

উচ্চারণ ঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা ওয়াহেদাল্লা ছানীয়ালাকা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লা ইমামুল মোত্তাকীনা রাছুলুরাবি্বল আলামীন ।

অর্থঃ আল্লাহ ভিন্ন কেহ এবাদতের যোগ্য নাই । তিনি এক তাঁহার অংশীদার নাই মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সোত্তাকীনদের (ধর্মভীরুগণের) ইমাম এবং বিশ্বপালকের প্রেরিত ।

(৪) কালেমা তামজীদ

لاَ اِلَهَ اِلاَّ اَنْتَ نُوْرَ يَّهْدِىَ اللهُ لِنُوْرِهِ مَنْ يَّشَاءُ مُحَمَّدُ رَّسَوْ لُ اللهِ اِمَامُ الْمُرْسَلِيْنَ خَا تَمُ النَّبِيِّنَ

উচ্চারণঃ লা-ইলাহা ইল্লা আনতা নুরাইইয়াহ দিয়াল্লাহু লিনুরিহী মাইয়্যাশাউ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহি ইমামূল মুরছালীনা খাতামুন-নাবিয়্যীন ।

অর্থঃ হে খোদা! তুমি ব্যতীত কেহই উপাস্য নাই, তুমি জ্যোতিময় । তুমি যাহাকে ইচ্ছা আপন জ্যোতিঃ প্রদর্শন কর । মুহাম্মদ (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) প্রেরিত পয়গম্বরগণের ইমাম এবং শেষ নবী।

(৫) কালেমা রদ্দেকুফর

اَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ مِنْ اَنْ اُشْرِكَ بِكَ شَيْئً وَاَنَا اعَلَمُ بِهِ وَاَسْتَغْفِرُكَ لِمَا اعَلَمُ بِهِ وَمَا لاَاعَلَمُ بِهِ تُبْتُ عَنْهُ وَتَبَرَّأتُ مِنَ الْكُفْرِ وَالشِّرْكِ وَالْمَعَاصِىْ كُلِّهَا وَاَسْلَمْتُ وَاَمَنْتُ وَاَقُوْلُ اَنْ لاَّاِلَهَ اِلاَّاللهُ مُحَمَّدُ رَّسَوْلُ اللهِ –

উচ্চারণ ঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আন উশরিকা বিকা শাইআও ওয়া আনা আলামু বিহি ওয়া আসতাগ ফিরুকা লিমা আলামু বিহি ওয়ামা লা আলামু বিহি তুবতু আনহু ওয়া তাবাররাতু মিনাল কুফরি ওয়াশ্শির্কি ওয়াল মা আছি কুল্লিহা ওয়া আসলামতু ওয়া আমানতু ওয়া আক্বলু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদু রাসূলুল্লাহ ।

অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশা করছি, যেন কাহাকেও তোমান সহিত অংশীদার না করি । আমার জানা-অজানা গুনাহ হতে ক্ষমা চহিতেছি এবং ইহা হতে তওবা করিতেছি । কুফর, শিরক এবং অন্যান্য সমস্ত গুনাহ হতে বিদুরীত হইতেছি এবং প্রতিজ্ঞা করিতেছি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নাই, মুহাম্মদ মুস্তফা (সাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁহার রাসুল ।



শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে আখেরাত বিশ্বাসের ফলাফল

শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 




عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَا لِي وَلِلدُّنْيَا؟ وَمَا أَنَا وَالدُّنْيَا إِلَّا كَرَاكِبٍ اسْتَظَلَّ تَحْتَ شَجَرَةٍ، ثُمَّ رَاحَ وَتَرَكَهَا-


হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘দুনিয়ায় আমার কি? আমি ও দুনিয়া তো একজন পথিকের মত। যে একটি গাছের ছায়া তলে বসে আছে। ছায়া চলে যাবে এবং তাকে ছেড়ে যাবে’।[1] এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখেরাতের তুলনা সেতুর এ প্রান্ত ও অন্য প্রান্তের ন্যায়। দুনিয়াতে মানুষ প্রতি পদে পদে সেতু পার হয়ে চলেছে। যখন যেখানেই তার মৃত্যু হবে, তখন সেখানেই সে তার জীবন সেতুর শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাবে। আর কবর হ’ল আখেরাতের প্রথম মনযিল। এখানে মুক্তি পেলে সে ক্বিয়ামতের চূড়ান্ত বিচারে মুক্তি পাবে। অতএব বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য অপর প্রান্তে তথা মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছানোর আগেই যথাযথ পাথেয় সঞ্চয় করা। যার মাধ্যমে সে জান্নাতের চিরস্থায়ী ফলাফল পেয়ে ধন্য হবে।


আল্লাহ বলেন, مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ- ‘পুরুষ হৌক নারী হৌক মুমিন অবস্থায় যে সৎকর্ম সম্পাদন করে, আমরা তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং অবশ্যই তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম অপেক্ষা উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করব’ (নাহল ১৬/৯৭)।


সমাজ জীবনে সৎকর্মশীল মানুষের সংখ্যা কম হ’লেও অপ্রাপ্য নয়। বরং বলা চলে যে, কম সংখ্যক এই লোকগুলির জন্যই সমাজ এখনো টিকে আছে। তবে সৎকর্মশীল মানুষের মধ্যে সুখী জীবনের অধিকারী হয় কেবল তারাই যারা আখেরাতে হিসাব দানের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসী হয়। যা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বলতেকি যেকোন পরিস্থিতিতে মানুষকে সৎকর্মশীলতার উপর দৃঢ় রাখে তার আখেরাত বিশ্বাস। এটা না থাকলে ঝুঁকির মুখে পদস্খলন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। নিম্নে আমরা আখেরাত বিশ্বাসের বাস্তব ফলাফল সমূহ উল্লেখ করব।-


১. মানুষ শরী‘আতের ফায়ছালা হাসিমুখে গ্রহণ করে :



মা‘এয আসলামী, গামেদী মহিলা প্রমুখ স্বেচ্ছায় এসে মৃত্যুদন্ডের মত কঠিন শাস্তি চেয়ে নিয়েছেন কেবল আখেরাতে মুক্তি লাভের আশায়।[2] আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর এবং আনুগত্য কর রাসূলের ও তোমাদের নেতৃবৃন্দের। অতঃপর যদি কোন বিষয়ে তোমরা বিতন্ডা কর, তাহ’লে বিষয়টি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। এটাই কল্যাণকর ও পরিণতির দিক দিয়ে সর্বোত্তম’ (নিসা ৪/৫৯)। এখানে ফায়ছালা মেনে নেওয়ার জন্য আখেরাত বিশ্বাসকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেননা আখেরাতের স্বার্থেই মানুষ দুনিয়াবী স্বার্থ ত্যাগ করে।


২. এটি না থাকলে মানুষ সত্য বিমুখ হয় :


সত্যচ্যুত মানুষ পথভ্রষ্ট হয় ও তওবা না করলে জাহান্নামী হয়। আল্লাহ বলেন,إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآخِرَةِ قُلُوبُهُمْ مُنْكِرَةٌ وَهُمْ مُسْتَكْبِرُونَ ‘তোমাদের উপাস্য মাত্র একজন। অতঃপর যারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না তাদের অন্তর হয় সত্যবিমুখ এবং তারা হয় অহংকারী’ (নাহল ১৬/২২)।


খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননরত ক্ষুধাতাড়িত ছাহাবীদের উৎসাহ দিয়ে পেটে পাথর বাঁধা রাসূল উৎসাহ দেন নিম্নোক্ত কবিতা গেয়ে -اللَّهُمَّ لاَ عَيْشَ إِلاَّ عَيْشُ الآخِرَهْ فَاغْفِرْ لِلْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ ‘হে আল্লাহ! কোন আরাম নেই আখেরাতের আরাম ছাড়া’। ‘অতএব তুমি ক্ষমা কর আনছার ও মুহাজিরদেরকে’ (বুখারী হা/৪০৯৮)। এখানে তিনি কোন দুনিয়াবী লাভের কথা বলেননি। স্রেফ আখেরাতের কথা বলেছেন। যাতে তারা সত্যবিমুখ না হয়ে যায়।


৩. নেকীর কাজে একাগ্রতা সৃষ্টি হয় :



দুনিয়াতে বড় কোন সাফল্যের মূলে থাকে সাধনা ও একাগ্রতা। আর সেটি সবচেয়ে যোরদার করে আখেরাতে সাফল্য লাভের আকাংখা। আল্লাহ বলেন, مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ ‘যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে আমরা তার জন্য তার ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমরা তাকে তা থেকে কিছু দিয়ে থাকি। কিন্তু আখেরাতে তার জন্য কোন অংশ থাকে না’ (শূরা ৪২/২০)।


হযরত আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,مَنْ كَانَتِ الآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمْلَهُ وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ ‘আখেরাত যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে, আল্লাহ তার অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দেন। তার বিক্ষিপ্ত বিষয়গুলিকে সমাধান করে দেন। আর দুনিয়া তার কাছে তুচ্ছ হয়। পক্ষান্তরে দুনিয়া যার একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে, আল্লাহ তার অভাবসমূহ সামনে এনে দেন। আর তার সমস্যাগুলিকে বিক্ষিপ্ত করে দেন। অথচ তার নিকট কিছুই আসে না অতটুকু ব্যতীত যতটুকু তার তাক্বদীরে নির্ধারিত আছে’ (তিরমিযী হা/২৪৬৫)।


৪. সৎকর্মে দৃঢ়তা সৃষ্টি করে :


বদরের যুদ্ধে রাসূল (ছাঃ) কম্যান্ড দেন,قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالْأَرْضُ ‘তোমরা দাঁড়িয়ে যাও জান্নাতের পানে। যার প্রশস্ততা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ব্যাপী বিস্তৃত’। এ নির্দেশ শুনে ছাহাবী ওমায়ের ইবনুল হুমাম আনছারী বলে ওঠেন, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতের প্রশস্ততা কি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল ব্যাপী? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ছাড়! ছাড়! (বাখ, বাখ)! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি এরূপ বললে কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতের অধিবাসী হওয়ার আশায়। তিনি বলেন, فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا ‘নিশ্চয়ই তুমি তার অধিবাসী’। তখন ওমায়ের স্বীয় কোষ থেকে কতগুলি খেজুর বের করলেন ও তা খেতে থাকলেন। কিছু পরে বললেন, لَئِنْ أَنَا حَيِيْتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِي إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيلَةٌ، ‘আমি যদি এই খেজুরগুলো খাওয়া পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই সেটি হবে দীর্ঘ হায়াত’। অতঃপর তিনি বাকী খেজুরগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন’।[3]


৫. বিপদে ধৈর্য ধারণের শক্তি বৃদ্ধি পায় :


আল্লাহ বলেন,قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ ‘বল, হে আমার বিশ্বাসী বান্দারা! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর। (মনে রেখ,) যারা এ দুনিয়ায় সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে পুণ্য। আর আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। নিঃসন্দেহে ধৈর্যশীলগণ তাদের পুরস্কার পাবে অপরিমিতভাবে’ (যুমার ৩৯/১০)। মক্কায় নির্যাতিত অবস্থায় ইয়াসির পরিবারকে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, صَبْرًا يَا آلَ يَاسِرٍ، فَإِنَّ مَوْعِدَكُمُ الْجَنَّةُ ‘ধৈর্য ধর হে ইয়াসির পরিবার! নিশ্চয়ই তোমাদের ঠিকানা হ’ল জান্নাত’ (হাকেম হা/৫৬৪৬)। ইমাম আওযাঈ (৮৮-১৫৭ হি.) বলেন, তাদের আমল ওযন করা হবে না ও পরিমাপ করা হবে না’। আল্লাহ বলেন, وَجَزَاهُمْ بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَّحَرِيرًا ‘দুনিয়াতে ধৈর্যধারণের পুরস্কার স্বরূপ সেদিন তিনি তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী পোষাক দান করবেন’ (দাহর ৭৬/১২)। তিনি আরও বলেন,كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে এবং ক্বিয়ামতের দিন তোমরা পূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে হ’ল সফলকাম। বস্ত্ততঃ পার্থিব জীবন প্রতারণার বস্ত্ত ছাড়া কিছুই নয়’ (আলে ইমরান ৩/১৮৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,سَتَجِدُونَ أُثْرَةً شَدِيدَةً فَاصْبِرُوا حَتَّى تَلْقَوُا اللهَ وَرَسُولَهُ -صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- فَإِنِّى عَلَى الْحَوْضِ ‘তোমরা আমার পরে অত্যাচারী শাসকদের পাবে। তখন তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। যতক্ষণ না তোমরা আমাকে হাউয কাওছারের নিকটে সাক্ষাত পাও’ (বুখারী হা/৪৩৩১)।


‘আত্বা বিন আবী রাবাহ বলেন, ইবনু আববাস (রাঃ) আমাকে বলেন, আমি কি তোমাকে একজন জানণাতী মহিলাকে দেখাব না? আমি বললাম, অবশ্যই। তখন তিনি বললেন, এই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাটি, সে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট এসেছিল। অতঃপর বলেছিল, আমি মৃগী রোগে আক্রান্ত হই এবং এ অবস্থায় আমার লজ্জাস্থান খুলে যায়। সুতরাং আপনি আমার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করুন! তখন রাসূল (ছাঃ) তাকে বললেন, তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ করতে পার, তাতে তোমার জন্য রয়েছে জান্নাত। আর তুমি চাইলে আমি আল্লাহর নিকট দো‘আ করতে পারি, যেন তিনি তোমাকে অরোগ্য দান করেন। মহিলাটি বলল, আমি ধৈর্য ধারণ করব। তবে ঐ অবস্থায় যেন আমার লজ্জাস্থান খুলে না যায়, সেজন্য আপনি দো‘আ করুন! তখন রাসূল (ছাঃ) তার জন্য দো‘আ করলেন’।[4]


৬. সর্বাবস্থায় আল্লাহভীতি অর্জন :


আখেরাত বিশ্বাস মানুষকে সর্বাবস্থায় আল্লাহভীরু বানায় এবং সে প্রবৃত্তির তাড়না থেকে সংযত থাকে। আল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى، فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى، ‘পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার প্রভুর সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় করেছে এবং নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামী হ’তে বিরত রেখেছে, জান্নাত তার ঠিকানা হবে’ (নাযে‘আত ৭৯/৪০-৪১)। পাহাড়ের গুহায় আটকে পড়া বনু ইস্রাঈলের তিন যুবকের একজন তার প্রেমিকার সাথে অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে মেয়েটির কথায় আল্লাহ থেকে ভীত হয় এবং বিরত হয়। গুহায় ঐ বিপদের সময় আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে সে বলে,اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنِّى فَعَلْتُ ذَلِكَ مِنْ خَشْيَتِكَ فَفَرِّجْ عَنَّا ‘হে আল্লাহ! যদি তুমি জানো যে আমি কেবল তোমার ভয়ে সেদিন উক্ত অন্যায় কাজ থেকে বিরত হয়ে ছিলাম, তাহ’লে তুমি আমাদেরকে এই কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দাও’। তখন আল্লাহর হুকুমে পাথর সরে যায় এবং গুহা মুখ খুলে যায়। অতঃপর তারা তিনজন বেরিয়ে আসে (বুখারী ফাৎহুল বারী হা/৩৪৬৫)।


ওমর (রাঃ) যখন আততায়ী কর্তৃক যখমী হন এবং জীবন সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়েন, তখন তিনি বলেন,لَوْ أَنَّ لِى طِلاَعَ الأَرْضِ ذَهَبًا لاَفْتَدَيْتُ بِهِ مِنْ عَذَابِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ قَبْلَ أَنْ أَرَاهُ ‘যদি পৃথিবী ভরা স্বর্ণ আমার থাকত এবং তা দিয়ে আখেরাতে আল্লাহর শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যেত, তাহ’লে আমি সেটাই করতাম, উক্ত শাস্তি দেখার পূর্বে’ (বুখারী হা/৩৬৯২)। ইবনুল জাওযী বলেন, ওমরের মত মানুষের আল্লাহভীতি আর তোমাদের মত মানুষের নিশ্চিন্ততা দেখে আমি বিস্মিত হই![5] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا وَلَضَحِكْتُمْ قَلِيلاً- ‘যার হাতে আমার প্রাণ তার কসম করে বলছি, যদি তোমরা জানতে যা আমি জানি, তাহ’লে তোমরা কাঁদতে বেশী, হাসতে কম’।[6]


খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয (৯৯-১০১ হিঃ) একদিন কাঁদতে থাকেন। তখন স্ত্রী ফাতেমা ও পরিবারের সবাই কাঁদতে শুরু করে। এক সময় স্ত্রী তাঁকে বললেন, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন আমি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহর বিচার দেখছি। তিনি একদলকে জান্নাতে পাঠাচ্ছেন ও এক দলকে জাহান্নামে পাঠাচ্ছেন। হায়! যদি আমি সেদিন জাহান্নামীদের দলভুক্ত হয়ে যাই! বলেই তিনি চিৎকার দিয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান’।[7] আল্লাহ বলেন,وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ- ‘আর যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সম্মুখে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দু’টি উদ্যান’ (রহমান ৫৫/৪৬)।


৭. অল্পে তুষ্ট থাকার গুণ অর্জিত হয় :


একদিন ওমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট গেলেন। সে সময় তাঁর মাথার নীচে ছিল একটা খেজুর পাতা ভরা চামড়ার বালিশ। আর পিঠে ও পার্শ্বদেশে ছিল চাটাইয়ের দাগ। এটা দেখে ওমর কেঁদে উঠলেন। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? ওমর বললেন,إِنَّ كِسْرَى وَقَيْصَرَ فِيمَا هُمَا فِيهِ وَأَنْتَ رَسُولُ اللهِ ‘পারস্য সম্রাট কিসরা ও রোম সম্রাট ক্বায়ছার কি অবস্থায় আছে, আর আপনি কি অবস্থায় আছেন। অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল! জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُونَ لَهُمُ الدُّنْيَا وَلَنَا الآخِرَةُ- ‘তুমি কি চাওনা যে, তাদের জন্য হৌক দুনিয়া ও তোমার জন্য হৌক আখেরাত!’[8]


৮. অধিক পাওয়ার আকাংখা দমিত হয় :


একদিন রাসূল (ছাঃ) আব্দুল্লাহ ইবনু ওমরের কাঁধে হাত রেখে বলেন,كُنْ فِى الدُّنْيَا كَأَنَّكَ غَرِيبٌ أَوْ عَابِرُ سَبِيلٍ- وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يَقُولُ : إِذَا أَمْسَيْتَ فَلاَ تَنْتَظِرِ الصَّبَاحَ، وَإِذَا أَصْبَحْتَ فَلاَ تَنْتَظِرِ الْمَسَاءَ، وَخُذْ مِنْ صِحَّتِكَ لِمَرَضِكَ، وَمِنْ حَيَاتِكَ لِمَوْتِكَ- ‘তুমি দুনিয়াতে বসবাস কর একজন আগন্তকের মত অথবা একজন পথিকের মত’। ইবনু ওমর বলতেন, রাত হ’লে তুমি সকালের আশা করো না এবং সকাল হ’লে তুমি রাতের আশা করো না। অসুস্থ হওয়ার পূর্বে তুমি তোমার সুস্থতাকে এবং মৃত্যু আসার আগে তুমি তোমার জীবনকে কাজে লাগাও’।[9]


রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, فَوَاللهِ لاَ الْفَقْرُ أَخْشَى عَلَيْكُمْ، وَلَكِنْ أَخْشَى عَلَيْكُمْ أَنْ تُبْسَطَ عَلَيْكُمُ الدُّنْيَا كَمَا بُسِطَتْ عَلَى مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ، فَتَنَافَسُوهَا كَمَا تَنَافَسُوهَا، وَتُهْلِكُكُمْ كَمَا أَهْلَكَتْهُمْ- ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের দরিদ্রতাকে ভয় পাই না। বরং আমি ভয় পাই তোমাদের উপর দুনিয়ার প্রশস্ততাকে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরে প্রশস্ত হয়েছিল। ফলে তোমরা তা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, যেমন তারা লিপ্ত হয়েছিল। আর তা তোমাদেরকে ধ্বংস করবে, যেমন তাদেরকে ধ্বংস করেছিল’।[10]


তিনি বলেন,مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلاَ فِى غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ الْمَرْءِ عَلَى الْمَالِ وَالشَّرَفِ لِدِيْنِهِ- ‘দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে (রাখাল অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়) ছাগপালের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া অত বেশী ধ্বংসকর নয়, যত না বেশী ধ্বংসকর মাল ও মর্যাদার লোভ মানুষের দ্বীনের জন্য’।[11]



আবু আব্দুর রহমান আস-সালামী বলেন, আলী (রাঃ) একবার কূফায় দেওয়া এক ভাষণে বলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ، إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ طُولُ الْأَمَلِ، وَاتِّبَاعُ الْهَوَى، فَأَمَّا طُولُ الْأَمَلِ فَيُنْسِي الْآخِرَةَ، وَأَمَّا اتِّبَاعُ الْهَوَى فَيُضِلُّ عَنِ الْحَقِّ، أَلاَ إِنَّ الدُّنْيَا قَدْ وَلَّتْ مُدْبِرَةً وَالْآخِرَةُ مُقْبِلَةٌ، وَلِكُلِّ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا بَنُونَ، فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الْآخِرَةِ وَلاَ تَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الدُّنْيَا، فَإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ وَلاَ حِسَابٌ وَغَدًا حِسَابٌ وَلاَ عَمَلٌ- ‘হে জনগণ! আমি তোমাদের দু’টি জিনিসকে সবচেয়ে বেশী ভয় পাই, অধিক পাওয়ার আকাংখা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। অধিক পাওয়ার আকাংখা তোমাদেরকে আখেরাত ভুলিয়ে দিবে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ তোমাদেরকে সত্য গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দিবে। সাবধান! দুনিয়া পিঠ ফিরিয়ে চলে যাচ্ছে এবং আখেরাত এগিয়ে আসছে। আর প্রত্যেকটির জন্য রয়েছে একদল মানুষ। অতএব তোমরা আখেরাতের সন্তান হও, দুনিয়ার গোলাম হয়ো না। কেননা আজকের দিনটি কর্মের দিন, যেখান ফলাফল নেই। আর কালকের দিনটি ফলাফলের দিন, যেখানে কর্ম নেই’ (বায়হাক্বী শো‘আব হা/১০৬১৪)। অতএব তোমরা সম্মুখে আগত চিরস্থায়ী ঠিকানার জন্য কাজ কর এবং যা ফিরে যাচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ো না। ঈসা (আঃ) বলেন,


مَنْ ذَا الَّذِي يَبْنِي عَلَى مَوْجِ الْبَحْرِ دَارًا


تِلْكُمُ الدُّنْيَا فَلاَ تَتَّخِذُوهَا قَرَارًا


‘কোন্ ব্যক্তি আছে যে সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর বাড়ী তৈরী করবে?’ ওগুলি তো দুনিয়া। অতএব তাকে তোমরা স্থায়ী নিবাস হিসাবে গ্রহণ করো না’।[12]


ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) বলতেন,مَا مِنْكُمْ إِلَّا ضَيْفٌ وَعَارِيَةٌ، وَالضَّيْفُ مُرْتَحِلٌ، وَالْعَارِيَةُ مُؤَدَّاةٌ إِلَى أَهْلِهَا- ‘তোমরা সবাই মেহমান। আর তোমাদের সম্পদগুলি সব ধারের বস্ত্ত। মেহমান চলে যাবে, আর সম্পদ সব তার মালিকের কাছে ফিরে যাবে’।[13]



খালীদ আল-‘আছরী বলেন, আমরা সবাই মৃত্যুতে বিশ্বাস রাখি। অথচ তার জন্য কোন প্রস্ত্ততি নেই না। আমরা প্রত্যেকে জান্নাতে বিশ্বাস রাখি। অথচ তার জন্য কোন আমল করি না। আমরা প্রত্যেকে জাহান্নামে বিশ্বাস করি। অথচ তা থেকে বাঁচার জন্য ভীত হই না। তাহলে তোমরা কিসের জন্য অপেক্ষা করছ? মৃত্যুর জন্য? মনে রেখ এটাই তোমাদের জন্য আখেরাতের প্রথম মনযিল। সেখানে তোমাদের ভাল হ’তে পারে, মন্দও হ’তে পারে। অতএব হে আখেরাতের পথিকগণ! তোমরা এগিয়ে চলো তোমাদের প্রতিপালকের দিকে সুন্দরভাবে (ছিফাতুছ ছাফওয়া ৩/২৩১)।


৯. আখেরাত বিশ্বাস মযলূমের জন্য সান্ত্বনার স্থল :


হে যালেম! তুমি ভেবো না যে, আল্লাহ তোমার যুলুম দেখেননি। তুমি ভেবো না যে, আল্লাহ তোমার থেকে উদাসীন! তোমার সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। ঐ শোন তোমার প্রতিপালকের গুরু গম্ভীর সতর্কবাণী,وَلَا تَحْسَبَنَّ اللهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ، مُهْطِعِينَ مُقْنِعِي رُءُوسِهِمْ لَا يَرْتَدُّ إِلَيْهِمْ طَرْفُهُمْ وَأَفْئِدَتُهُمْ هَوَاءٌ- ‘তুমি অবশ্যই একথা ভেবো না যে, যালেমরা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে উদাসীন। তবে তিনি তাদেরকে সেদিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যেদিন তাদের চক্ষুসমূহ বিস্ফারিত হবে। যেদিন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ভীত-বিহবল চিত্তে তারা দৌড়াতে থাকবে। নিজেদের দিকে দৃষ্টি ফেরাবার সময় তাদের হবে না। যেদিন কঠিন ভয়ে তারা শূন্যহৃদয় হয়ে যাবে’ (ইব্রাহীম ১৪/৪২-৪৩)। তিনি বলেন,الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ إِنَّ اللهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ ‘আজ প্রত্যেককে তার কর্মফল দেওয়া হবে। আজ কোন যুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (গাফের/মুমিন ৪০/১৭)।


হযরত জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, সমুদ্রের মুহাজিরগণ (হাবশায় হিজরতকারী প্রথম দল) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট প্রত্যাবর্তন করলে তিনি বলেন, তোমরা হাবশায় যেসব অনিষ্টকারী বিষয় সমূহ দেখেছ তা কি আমার নিকট ব্যক্ত করবে না? তাদের মধ্য থেকে এক যুবক বলল, হে আল্লাহর রাসূল! একদিন আমরা বসা ছিলাম। এমন সময় আমাদের সামনে দিয়ে সেখানকার এক বৃদ্ধা মহিলা মাথায় পানি ভর্তি কলস সহ যাচ্ছিল। এমতাবস্থায় তাদের এক যুবক তার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে ধাক্কা দিল। ফলে সে উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেল এবং কলসটি ভেঙ্গে গেল। তখন বৃদ্ধা উঠে দাঁড়িয়ে যুবকের দিকে তাকিলে বলল, হে প্রতারক! তুমি অচিরেই জানতে পারবে যখন আল্লাহ বিচারের আসনে বসবেন। আগে-পিছের সকল মানুষকে সমবেত করবেন এবং হাত-পাগুলো তাদের কৃতকর্মের বর্ণনা দিবে, তখন তুমিও জানতে পারবে সেদিন তোমার ও আমার অবস্থা কি হবে’। জাবের (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ঐ বৃদ্ধা সত্য বলেছে, সত্য বলেছে। আল্লাহ সেই উম্মতকে কিভাবে পাপ থেকে পবিত্র করবেন, যাদের সবলদের নিকট থেকে দুর্বলদের অধিকার আদায় করে দেওয়া হয় না’।[14]


১০. ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে :


মাক্কী জীবনের অধিকাংশ সূরা নাযিল হয়েছে আখেরাত বিশ্বাসের উপর। যার ফলে আখেরাত পিয়াসী একদল ঈমানদার মানুষ তৈরী হয়। আবুবকর, ওমর, ওছমান, আলী, ইবনু মাস‘ঊদ, বেলাল, খাববাব, আম্মার, মুছ‘আব প্রমুখ জান্নাতপাগল নিখাদ মানুষগুলির হাতেই পুরা আরব জাহানে আমূল পরিবর্তন আসে। যা সর্বাত্মক সমাজ বিপ্লবের সূচনা করে। যার ঢেউ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ইসলাম বিশ্বধর্মে পরিণত হয়। ইনশাআল্লাহ ক্বিয়ামতের আগে সারা বিশ্ব ইসলামের করতলগত হবে। যা সম্ভব হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হবে কেবল আখেরাতে মুক্তি ও জান্নাত লাভের উদগ্র বাসনার কারণে। যখন যে সমাজে সত্যিকারের আখেরাত পিয়াসী একদল মুমিন তৈরী হয়, তখন সেই সমাজে আমূল পরিবর্তন আসে এবং সমাজ বিপ্লব সাধিত হয়।


আল্লাহ বলেন,وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَا كَسَبَتْ وَهُمْ لاَ يُظْلَمُونَ ‘আর তোমরা ঐ দিনকে ভয় কর, যেদিন তোমরা সকলে আল্লাহর নিকটে ফিরে যাবে। অতঃপর সেদিন প্রত্যেকে স্ব স্ব কর্মের ফল পুরোপুরি পাবে এবং তাদের প্রতি কোনরূপ অবিচার করা হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৮১)।



বস্ত্ততঃ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর মৃত্যুর ৭ দিন মতান্তরে ২১ দিন পূর্বে এটাই ছিল পবিত্র  কুরআনের সর্বশেষ আয়াত। অতএব হে মানুষ শেষ বিচারের দিনকে ভয় কর। সেদিন তোমার সকল কর্মের কড়ায়-গন্ডায় হিসাব দিতে হবে। যেদিন তোমার ঈমান ও আমল ছাড়া কোন কিছুই কাজে আসবে না।


কবি আবুল ‘আতাহিয়াহ (১৩০-২১৩ হি.) বলেন,


إِنَّ يَومَ الحِسابِ يَومٌ عَسيرُ + لَيسَ لِلظالِمينَ فيهِ نَصيرُ


فَاِتَّخِذْ عُدَّةً لِمُطَّلَعِ القَبرِ + وَهَولِ الصِراطِ يا مَنصورُ


‘নিশ্চয়ই শেষ বিচারের দিন বড়ই কঠিন দিন, সেদিন


যালেমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’। ‘অতএব


হে বিজয়ী! তুমি কবরে যাওয়ার পূর্বে এবং পুলছিরাতের ভয়াবহ


দৃশ্য আসার পূর্বে পাথেয় সঞ্চয় কর’।


হে আল্লাহ! তুমি আমাদের আখেরাত বিশ্বাসকে দৃঢ় কর এবং তার জন্য আমাদেরকে দ্রুত পাথেয় সঞ্চয়ের তাওফীক দাও- আমীন!


– প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব


[1]. তিরমিযী হা/২৩৭৭; ইবনু মাজাহ হা/৪১০৯; মিশকাত হা/৫১৮৮।[2]. মুসলিম হা/১৬৯৫; মিশকাত হা/৩৫৬২ ‘দন্ডবিধিসমূহ’ অধ্যায়; সীরাতুর রাসূল (ছাঃ) ৩য় মুদ্রণ ৭৯৮-৯৯ পৃ.।

[3]. মুসলিম হা/১৯০১ (১৪৫); মিশকাত হা/৩৮১০, রাবী আনাস (রাঃ)।

[4]. বুখারী হা/৫৬৫২; মুসলিম হা/২৫৭৬; আল-আদাবুল মুফরাদ হা/৫০৫।

[5]. আবু নু‘আইম ইছফাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৫/৩১৪।

[6]. বুখারী হা/৬৬৩৭; মিশকাত হা/৫৩৩৯, রাবী আবু হুরায়রা (রাঃ)।

[7]. ইবনুল জাওযী, ছিফাতুছ ছাফওয়া ১/৩৬৮।

[8]. বুখারী হা/৪৯১৩; মুসলিম হা/১৪৭৯; মিশকাত হা/৫২৪০।

[9]. বুখারী হা/৬৪১৬; মিশকাত হা/১৬০৪, রাবী আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রাঃ)।

[10]. বুখারী হা/৬৪২৫; মুসলিম হা/২৯৬১; মিশকাত হা/৫১৬৩, রাবী আমর বিন ‘আওফ (রাঃ)।

[11]. তিরমিযী হা/২৩৭৬; মিশকাত হা/৫১৮১, সনদ ছহীহ।

[12]. ইবনু আবীদ্দুনিয়া, আয-যুহ্দ ক্রমিক ৩৪৭, পৃ. ১৫৯।

[13].ত্বাবারাণী কাবীর হা/৮৫৩৩; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ হা/৩৫৬৯৯।

[14]. ইবনু মাজাহ হা/৪০১০; ছহীহ ইবনু হিববান হা/৫০৫৮।



মঙ্গলবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

"চাইতে হবে আল্লাহর কাছেই"

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৪ 1
বার দেখা হয়েছে




- মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

 

আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার দিক হচ্ছে সে কোনো না কোনোভাবে নিয়ম ভঙ্গের ফাঁদে পড়ে। যে ফাঁদ শয়তানের প্ররোচনা, কুপ্রবৃত্তির টান কিংবা মানবীয় দুর্বলতার কারণেই ঘটে থাকে। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের জন্য যে বিধিবিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন, ফাঁদে পড়ে মানুষ প্রতিদিন কোনো না কোনো বিধান লঙ্ঘন করে ছোট কিংবা বড় পাপ করতে থাকে। এসব পাপ জমা হতে হতে পাপের ভারে মানুষের হৃদয় হয় কলুষিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এক সময় মহান আল্লাহ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহের পথ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। মানুষ দূরে সরে গেলেও আল্লাহ যেহেতু ভালোবেসে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাই তিনি তার বান্দাহর প্রতি ক্ষমার হাত বাড়িয়ে দেন। বান্দাহ যদি তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে কায়মনোবাক্যে ঐকান্তিকতা ও একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর কাছে পাপ মোচনের ক্ষমা চায় তাহলে সে আল্লাহর ক্ষমা লাভে সক্ষম হয়।


বান্দাহর ধর্মই হচ্ছে আল্লাহর কাছে চাওয়া বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা। রাসূল সা. দিনে ৭০ বারেরও বেশি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতেন, তাওবা করতেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছে রাসূল সা. বলেন, আল্লাহর কসম আমি দিনের মধ্যে ৭০ বারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি। (বুখারি)। আগার আল-মুযানি রা. থেকে বর্ণিত অপর এক হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, হে মানুষেরা তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর নিশ্চয়ই আমি একদিনের মধ্যে একশ’ বার আল্লাহর নিকট তাওবা করি বা ইস্তেগফার করি। (মুসলিম)। যিনি আল্লাহর প্রকৃত বান্দাহ, যিনি মুমিন মুসলমান তিনি সব বিষয়ে মহান আল্লাহর কাছেই চাইবেন এটাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু দোয়া বা আল্লাহর কাছে চাওয়ার ক্ষেত্রে কখনো কখনো ব্যতিক্রম দেখা যায়। বান্দাহ খুব বড় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে আল্লাহর কাছে চায় ছোটখাটো বিষয়ে চায় না। এমনকি অনেকের নিকট এই ধারণাও অনুপস্থিত যে ছোটখাটো বিষয়েও আল্লাহর কাছেই চাইতে হয়। ছোট বড়, গুরুত্ব কম হোক বা বেশি সব কিছুই চাইতে হবে আল্লাহর কাছেই। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রা. বলেন, তোমার যা কিছু প্রয়োজন তা আল্লাহর কাছে চাও। যদিও তা একটি জুতার ফিতাও হয়ে থাকে। কারণ আল্লাহ যদি তোমার জন্য এটি সহজ না করেন তাহলে এটি পাওয়া তোমার জন্য সম্ভব হবে না (তিরমিজি)। হযরত আনাস রা. বর্ণিত অপর হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা তোমাদের সকল প্রয়োজন আল্লাহর কাছে চাইবে, এমনকি যদি জুতার ফিতা ছিঁড়ে যায় তাহলে তাও তাঁর কাছেই চাইবে। এমনকি লবণও তার কাছেই চাইবে। (তিরমিজি)


সকল প্রয়োজন পূরণে চাইতে হবে আল্লাহর নিকটে, রিজিকের জন্যও চাইতে হবে আল্লাহর নিকট। ছোট প্রয়োজন বড় প্রয়োজন কম গুরুত্বপূর্ণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ সবই চাইতে হবে অসীম ক্ষমতাবান আল্লাহর কাছে। কারণ ছোট হোক কিংবা বড় সকল চাওয়া পাওয়া পূরণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। বান্দাহর জন্য যা বরাদ্দ তা আল্লাহই করে থাকেন। দুনিয়ার কারো কাছে চেয়ে সেই বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব নয়। আল্লাহ যদি কিছুই বরাদ্দ না রাখেন তাহলে দুনিয়ার কারো কাছে শতবার চাইলেও সামান্য দানা পরিমাণ বরাদ্দও কেউ দিতে পারবে না। তাই সব বিষয়ে চাইতে হবে আল্লাহরই কাছে। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, যখন তুমি প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে এবং যখন তুমি সাহায্য চাইবে তখন তুমি আল্লাহরই সাহায্য চাইবে। আর জেনে রাখো, যদি সকল সৃষ্টি একত্রিত হয় তোমার কল্যাণ করতে তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিপিবদ্ধ করেছেন তার অতিরিক্ত কোনো কল্যাণ তারা তোমার জন্য করতে পারবে না। এবং যদি সকল সৃষ্টি তোমার ক্ষতি করতে একত্রিত হয় তবে আল্লাহ তোমার বিরুদ্ধে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তার অতিরিক্ত কোন ক্ষতি তারা তোমার করতে পারবে না। (তিরমিজি)


কল্যাণ এবং অকল্যাণ সব কিছুরই মালিক আল্লাহ। সুতরাং কল্যাণ কামনা করে যেমন আল্লাহর কাছে চাইতে হবে তেমনি অকল্যাণ থেকে বাঁচার জন্যও চাইতে হবে আল্লাহর নিকট। মুমিন বান্দাহর গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হলো, বিপদ আপদ মুসিবতে মুমিন যেমন আল্লাহর কাছে চাইবে তেমনি কল্যাণ ও নিয়ামাতের মধ্যে থাকলেও আল্লাহর কাছে কল্যাণের স্থায়িত্ব ও সমৃদ্ধির জন্য চাইবে। কেউ কেউ এমন আছেন বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে চায় নিয়ামাতের মধ্যে বা ভালো অবস্থায় থাকলে চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এমন আচরণ মুমিনের কাম্য নয়। ভালো অবস্থা বা নিয়ামাতের মধ্যে থেকেও কেন আল্লাহর কাছে চাইতে হবে এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে সে কঠিন বিপদ ও যন্ত্রণা দুর্দশার সময় আল্লাহ তার প্রার্থনায় সাড়া দিবেন, সে যেন সুখ শান্তি ও সচ্ছলতার সময়ও বেশি বেশি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। (তিরমিজি)


কিন্তু মানুষের সহজাত একটি প্রবৃত্তি হলো, মানুষ অসহায় অবস্থায় পড়লে আল্লাহকে ডাকে সচ্ছলতায় ভুলে যায়। মানুষ বিপদে পতিত হলে আল্লাহকে ব্যাপকভাবে স্মরণ করে বারবার একনিষ্ঠভাবে দোয়া করে। সুন্দর ভাবে তাওবা করার নিয়ম জানতে হবে। আবার যখন বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত হয়ে যায় যখন সে কল্যাণের মধ্যে ফিরে আসে তখন সে বেমালুম আল্লাহকে ভুলে যায়।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বান্দাহর এমন অকৃতজ্ঞ আচরণের সমালোচনা করে জাহান্নামি হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, মানুষকে যখন দুঃখ দুর্দশা স্পর্শ করে তখন সে তার প্রভুকে ডাকে একনিষ্ঠ মনোভাব নিয়ে। অতঃপর যখন তিনি তার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তখন সে ভুলে যায় যেমন সে তাঁকে একনিষ্ঠভাবে ডেকেছিল। সে আল্লাহর শরিক দাঁড় করায় যে সে তাকে আল্লাহর পথ থেকে বিভ্রান্ত করে। বলো : কুফরি নিয়ে জীবনটাকে কয়টা দিন ভোগ করো। জেনে রাখো তুমি জাহান্নামি। (সূরা যুমার : ৮)। আল্লাহর কাছে বিপদ থেকে মুক্তি চেয়ে উদ্ধারের পর এমন আচরণ বান্দাহকে জাহান্নামে নিপতিত করে, এমন আচরণ কখনো কাম্য নয়। এ প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে- মাঝ নদীতে থাকা কোন নৌযান যদি ঝড়-তুফানের কবলে পড়ে তখন উদ্ধার পাওয়ার জন্য যাত্রীরা সবাই আল্লাহর নাম জপতে থাকে, ঝড়ের কবল থেকে বাঁচার জন্য একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে চাইতে থাকে। কিন্তু ঠিক যখন ঝড় থেমে যায় কিংবা নিরাপদে কূলে ভিড়ে তখন তারা আল্লাহর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সব বাহবা জানায় নাবিককে। এক ধরনের আল্লাহর সাথে শরিক করার নামান্তর। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ কুরআনে বলেন, তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে তখন আন্তরিক নিষ্ঠার সাথে তারা আল্লাহকে ডাকে, তারপর যখন তিনি তাদেরকে নাজাত দিয়ে কূলে নিয়ে আসেন তখন তারা শিরক করতে থাকে। (সূরা আনকাবুত : ৬৫)


মহান আল্লাহ বান্দাহর ডাকে সাড়া দেন বলেই বান্দাহকে তার বরের নিকটই চাইতে হবে। কিছু বান্দাহ এমন আছেন যারা নিজের জন্য নিজে আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করার চাইতে অন্য কোনো নেক আমলদার বুজুর্গকে দিয়ে দোয়া করানোকেই বেশি ফলদায়ক মনে করেন। তারা মনে করেন নিজের জন্য নিজে আল্লাহর কাছে দোয়া করার চাইতে বুজুর্গকে দিয়ে দোয়া করালে কবুল হবে বেশি। আবার সমাজে কিছু মানুষ মাজারে গিয়ে মৃত মানুষের কাছে চাওয়ার মতো গোমরাহিতেও লিপ্ত আছেন। তারা জানেন না যে মৃত ব্যক্তির কিছুই করার ক্ষমতা নাই। নেককার, বুজুর্গ, আলেম, ওস্তাদ, মুজাহিদ, মুসাফির, অসুস্থ ব্যক্তি এবং পিতা-মাতার কাছে দোয়া চাওয়া জায়েজ। কারো কারো ক্ষেত্রে তাদের নিকট গিয়ে দোয়া চাওয়ার হাদিসও রয়েছে। তবে নিজের জন্য নিজেই একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়াকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে। কারণ বান্দাহ যখন আল্লাহর কাছে কিছু চেয়ে দোয়া করবেন তখন তার চাহিদার কথা আকুতি মিনতি করে যথার্থভাবে তিনিই নিজেই সবচেয়ে বেশি ভালো বলতে পারবেন।


হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমি রাসূল সা.কে প্রশ্ন করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল, সর্বোত্তম দোয়া কী?” তিনি উত্তরে বললেন, “মানুষ নিজের জন্য নিজে দোয়া করা।” (মাজমাউয যাওয়াইদ)। যেহেতু সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দোয়া অবশ্যই কবুল হয় তাই তাদের কাছে দোয়া চাওয়া এবং দোয়া পাওয়ার উপযুক্ত আচরণ করা উচিত। তাছাড়া অসুস্থ ব্যক্তির কাছেও দোয়া চাইতে আল্লাহর রাসূল ইরশাদ করেছেন। মজলুম মুসাফির এবং পিতা-মাতার দোয়া কবুল হওয়া সংক্রান্ত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেন, তিনটি দোয়া এমন যেগুলো অবশ্যই কবুল করা হয়। এতে কোনো সন্দেহ নাই, মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের উপর তার পিতা-মাতার দোয়া। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)। অসুস্থ ব্যক্তির নিকট দোয়া চাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে রাসূল সা. বলেন, যদি তুমি কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাও তখন তাকে বলো তোমার জন্য দোয়া করতে, কারণ অসুস্থ ব্যক্তির দোয়া ফেরেস্তাদের দোয়ার মতো কার্যকর হয় বা কবুল হয়। (ইবনে মাজাহ)। হজ ও ওমরাহ পালনকারীর নিকট দোয়া চাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে হযরত ওমর রা. বলেন, তোমরা হজ পালনকারী, ওমরাহ পালনকারী এবং যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের সাথে সাক্ষাৎ করবে (দোয়া চাইবে), যেন তারা পূত-পবিত্রতা হারানোর আগেই তোমার জন্য দোয়া করে। (মুসনাদে ইবনে আবি শাইবা)।

মুমিন মুসলমান যিনি তিনি শুধু নিজের জন্যই দোয়া করবেন না বরং নিজের পাশাপাশি অপরের জন্যও দেয়া করবেন। নিজের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি, আত্মীয়-স্বজন পরিবার পরিজনের জন্য দোয়া করবেন। পাশাপাশি অপর মুসলিম ভাইবোন এবং বিশে^র নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্যও দোয়া করবেন। এ ব্যাপারে কুরআনে অনেক দোয়া উল্লেখ রয়েছে। কুরআনে একটি দোয়া এভাবে উল্লেখ হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রভু আপনি আমাদের ক্ষমা করুন এবং ঈমানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভাইদের ক্ষমা করুন। আর আপনি আমাদের অন্তরে মুমিনগণের বিরুদ্ধে কোন হিংসা বিদ্বেষ বা অমঙ্গলের ইচ্ছা রাখবেন না। হে আমাদের প্রভু, নিশ্চয় আপনি মহা করুণাময় ও পরম দয়ালু।’ (সূরা হাশর : ১০)


মুমিন তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্যও দোয়া করবে। নিজের কল্যাণ কামনা করে যেমন দোয়া করবে তেমনি অপর মুমিন ভাইয়ের জন্যও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করবে। নিজে যেমন অকল্যাণ থেকে পানাহ চাইবে তেমনি অপর মুমিন ভাইয়ের অকল্যাণ থেকে মুক্তি কামনা করবে। অপরের জন্য দোয়া করলে পক্ষান্তরের সেই দোয়া নিজের জন্যও করা হয়। কারণ মুমিন তার ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে উক্ত দোয়া কবুল করে দোয়াকারীকেও আল্লাহ উক্ত নিয়ামাত দান করেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, “কোনো মুসলিম যখন তার কোন অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করে তখন আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করেন। তার মাথার কাছে একজন ফিরিস্তা নিয়োজিত থাকেন, যখনই সে মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য কোনো কল্যাণ চায় তখনই ফিরিস্তা বলেন; আমিন এবং আপনার জন্যও অনুরূপ (অর্থাৎ আল্লাহ আপনাকেও প্রার্থিত বিষয়ের অনুরূপ দান করুন)। (মুসলিম)


আল্লাহর কাছে চাওয়ার মাধ্যমে মূলত আল্লাহকে পাওয়া হয়। আল্লাহর কাছে চাওয়া বা দোয়া করার মাধ্যমে মহান রবের নৈকট্য অর্জনের পথ প্রসারিত হয়। কারণ দোয়া একটি ইবাদাত এবং অপরিসীম সাওয়াবের কাজ। আল্লাহর কাছে দোয়া করা বা চাওয়ারও অনেক মর্যাদা বা তাৎপর্য রয়েছে। হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানিত আর কিছুই নেই। (তিরমিজি) দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে বান্দাহর সম্পর্কের একটি সেতুবন্ধ তৈরি হয়। এ বন্ধনকে সুদূঢ় ও মজবুত করার মাধ্যম বারবার আল্লাহকে ডাকা। আর আল্লাহ তার বান্দাহর খুব নিকটেই থাকেন। আল্লাহও কামনা করেন তার বান্দাহ তার কাছেই বারবার চাইবে। এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে জানতে চান ইয়া রাসূলাল্লাহ আমাদের প্রভু কি আমাদের কাছে না দূরে? যদি কাছে হন তবে আমরা তাঁর সাথে মুনাজাত করবো বা চুপে চুপে কথা বলব। আর যদি তিনি দূরে হন তাহলে আমরা জোরে জোরে তাকে ডাকবো জবাবে আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমের সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াত নাযিল করেন এবং যখন আমার বান্দাগণ আপনাকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করে তখন তাদের জানিয়ে দিন আমি তাদের নিকটবর্তী। (ইবনে কাসির)


আল্লাহ যখন বান্দাহর নিকটবর্তী তখন বান্দাহর উচিত বেশি বেশি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় দোয়া করেই আমরা হা-হুতাশ করি। ত্বরিত ফল পাওয়ার প্রত্যাশা করি। ফল না পেলে হতাশ হয়ে যাই। দু’চার বার দোয়া করার পর ফলাফল না পেলে দোয়া করাই ছেড়ে দেই। অথচ কোন মুসলিমকে আল্লাহ খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। দোয়া কখনো নিষ্ফল হয় না, শূন্য হাতে বান্দাহকে ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ নিজেই লজ্জা পান। হযরত সালমান ফার্সি রা. হতে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন, যখন কোন মানুষ তার দিকে দু’খানা হাত ওঠায় তখন তিনি তা ব্যর্থ ও শূন্যভাবে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা পান। (তিরমিজি)

আল্লাহর কাছে বান্দাহ যদি পাপ বা ক্ষতিকারক কিছু না চায় তাহলে সেই চাওয়া আল্লাহ কবুল করেন। হযরত উবাদাহ ইবনু সামিত রা. বলেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন জমিনের বুকে যে কোন মুসলিম আল্লাহর কাছে কোন দোয়া করলে- যে দোয়ায় কোন পাপ বা আত্মীয়তার ক্ষতিকারক কিছু না চায়- তাহলে আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করবেনই। হয় তাকে তার প্রার্থিত বস্তু দিবেন অথবা তদনুযায়ী তার কোনো বিপদ কাটিয়ে দিবেন। (তিরমিজি)। দোয়া করেই ত্বরিত ফল চাইতে গিয়ে যদি হতাশা প্রকাশ কিংবা হা-হুতাশ করতে থাকি তবে তা হবে হিতে বিপরীত বা ক্ষতিকারক। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন, বান্দাহ যতক্ষণ পাপ বা আত্মীয়তার ক্ষতিকারক কোন কিছু প্রার্থনা না করে ততক্ষণ তার দোয়া কবুল করা হয়, যদি না সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বলা হলো ইয়া রাসূলাল্লাহ ব্যস্ততা কিরূপ? তিনি বললেন: দোয়াকারী বলতে থাকে- দোয়াতো করলাম, দোয়া তো করলাম, মনে হয় আমার দোয়া কবুল হলো না। এভাবে সে হতাশ হয়ে পড়ে তখন দোয়া করা ছেড়ে দেয় (মুসলিম)

দোয়ার ব্যাপারে এটি নিশ্চিত যে বান্দাহ আল্লাহর কাছে চাইলে দোয়া করলে মুমিন মুসলমানের দোয়া আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন না। হয় তিনি তা বান্দাহকে সাথে সাথে দিবেন নতুবা পরকালের জন্য তা জমা রাখবেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন- যে কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে মুখ তুলে কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে তা দেবেনই। হয় তাকে তা সাথে সাথে দিবেন অথবা (আখিরাতের জন্য) তা জমা করে রাখবেন। (মুসনাদ আহমদ)


অপর একটি হাদিসে এসেছে দোয়া করলে তিন বিষয়ের অন্তত একটি আল্লাহ বান্দাহকে প্রদান করবেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেন- যখনই কোনো মুসলিম পাপ ও আত্মীয়তা নষ্ট করা ছাড়া অন্য যে কোন বিষয় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে তখনই আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করে তাকে তিনটি বিষয়ের একটি দান করেন, হয় তার প্রার্থিত বস্তুই তাকে সঙ্গে সঙ্গে প্রদান করেন, অথবা তার প্রার্থনাকে (প্রার্থনার সাওয়াব) আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন, অথবা দোয়ার সমপরিমাণ তার অন্য কোন বিপদ তিনি দূর করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবিগণ বলেন: হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা বেশি বেশি দোয়া করব। তিনি উত্তরে বললেন: আল্লাহ তায়ালা আরো বেশি বেশি দোয়া কবুল করবেন। (তিরমিজি)

দোয়া কবুলের জন্য পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট না করা, আল্লাহর সাথে শিরক না করার নির্দেশনা রাসূল সা. দিয়েছেন। তার পাশাপাশি হারাম থেকেও বেঁচে থাকার কথা রাসূল সা. বলেছেন। রাসূল সা. এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার মাথার চুল বিক্ষিপ্ত অবিন্যস্ত ও ধুলোয় মলিন। সে আসমানের দিকে হাত প্রশস্ত করে বলে (দোয়া করে) হে আমার প্রভু! হে আমার প্রতিপালক! অথচ তার খাদ্য ও পানীয় হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবন-জীবিকাও হারাম। এমন অবস্থায় তার দোয়া কিভাবে কবুল হতে পারে? (তিরমিজি)। ব্যক্তিগত জীবনে হালাল জীবন জীবিকা ছাড়া দোয়া কবুল করা হবে না আর সামষ্টিক জীবনে মানুষ যদি আমর বিন মারুফ নাহি আনিল মুনকার তথা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান না করে তাহলে এমন সময় আসবে তখন বান্দাদের ডাকে আল্লাহ সাড়া দেবেন না। রাসূল সা. বলেছেন, শপথ সেই সত্তার যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই ভালো কাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজ হতে বাধা প্রদান করবে। নতুবা অচিরেই এর ফলে আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমার কাছে দোয়া করবে কিন্তু তোমাদের দোয়ায় সাড়া দেয়া হবে না। (তিরমিজি)


দোয়া কবুলের জন্য অন্তরের গভীর থেকে দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে, মনের আকুতি মিশিয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। ইবনে ওমর রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, হে মানুষেরা তোমরা যখন আল্লাহর কাছে চাইবে তখন কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে চাইবে, কারণ কোনো বান্দাহ অমনোযোগী অন্তরে দোয়া করলে আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন না। (সহিহ তারগিব)। একনিষ্ঠভাবে সচেতনভাবে কল্যাণ কামনায় দোয়া চাইতে হবে। ক্ষতিকর বিষয়ে দোয়া চাইলে তা হবে হিতে বিপরীত। হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন তোমাদের কেউ যখন কোন কিছু কামনা করবে তখন সে কি চাচ্ছে তা যেন ভালো করে দেখে; কারণ তার কোনো বাসনা বা প্রার্থনা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যাচ্ছে তা সে জানে না। (মাজমাউয যাওয়াইদ)। উম্মে সালামাহ রা. বলেন, রাসূল সা. বলেছেন- তোমরা নিজেদের উপর কখনো ভালো ছাড়া খারাপ দোয়া করবে না। কারণ ফিরিস্তাগণ তোমাদের দোয়ার সাথে আমিন, আমিন বলেন। (মুসলিম)। অনেক সময় আমরা দুঃখ কষ্ট যাতনায় কিংবা অন্য কোনো কারণে অতিষ্ঠ হয়ে সন্তান-সন্ততি এমনকি নিজের মাল-সম্পদেরও ক্ষতি কামনা করি। এ প্রসঙ্গে জাবির রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা কখনো নিজেদের বা তোমাদের সন্তানদের বা তোমাদের মান সম্মানের অমঙ্গল বা ক্ষতি চেয়ে বদ দোয়া করবে না। কারণ হয়তো এমন হতে পারে, যে সময় তোমরা বদ দোয়া করলে সে সময়টি এমন সময় যখন আল্লাহ বান্দাহর সকল প্রার্থনা কবুল করেন এবং যে যা চায় তাকে তা প্রদান করেন। এভাবে তখন তোমাদের বদ দোয়াও তিনি কবুল করে নিবেন। (মুসলিম)


বান্দাদের মধ্যে এমনও ব্যতিক্রম কেউ কেউ আছেন আল্লাহর কাছে দোয়াই চান না। কেউ আছেন অন্যায় জুলুমের শিকার হলে, ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বিপদ আপদ মুসিবতে পতিত হলে আল্লাহর কাছে দোয়া করা প্রয়োজন মনে করেন না। তারা ধারণা করেন আল্লাহ তো তার সবকিছুই দেখছেন, শুনছেন, তিনিই নিশ্চয়ই পানাহ দিবেন কিংবা উদ্ধার করবেন দোয়া চাওয়ার প্রয়োজন কী। এ প্রসঙ্গে আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, সবচেয়ে অক্ষম সে ব্যক্তি যে দোয়া করতেও অক্ষম। (জামিউস সাজির)। আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত অপর হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না আল্লাহ তার উপর ক্রোধান্বিত হন। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)


আসুন আমরা অসীম দয়ার সাগর আল্লাহর নিকটই একনিষ্ঠভাবে আমাদের সব চাওয়া বেশি বেশি করে পেশ করি। পাপ মোচনের জন্য প্রার্থনা করি। প্রয়োজন পূরণে প্রার্থনা করি। বিপদ আপদ মুসিবত থেকে উদ্ধারের জন্য নিবেদন করি। সুস্থতা কামনায় মোনাজাত করি। স্ত্রী-সন্তান পিতা-মাতা পরিবার পরিজন, জীবিত মৃত মুমিন মুসলমানদের জন্য দোয়া করি। সমৃদ্ধি ও কল্যাণের জন্য দোয়া চাই। দোয়া, মুনাজাতে আকুতি মিনতি ও ক্রন্দনের মাধ্যমে হৃদয়কে পবিত্র করি। দূরে সরে যাওয়া সত্তাটাকে আল্লাহর আরো বেশি নৈকট্য, সন্তুষ্টি এবং রহম লাভের উপযুক্ত করি। আল্লাহুম্মা আমিন।


লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট



সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

সাহাবির বিয়ের মোহরানা "কোরআন তোমার মুখস্থ "

সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 


হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.)-এর বরাতে একটি হাদিসের বর্ণনা আছে।


এক নারী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার জীবন আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি।’


নবী (সা.) তাঁর দিকে তাকিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে তাঁর আপাদমস্তক দেখলেন। তারপর মাথা নিচু করে রইলেন। ওই নারী যখন দেখলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো ফয়সালা দিচ্ছেন না, তখন তিনি বসে পড়লেন।


সাহাবিদের মধ্য থেকে একজন দাঁড়িয়ে তখন বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে এই নারীকে বিয়ে দিয়ে দিন।’


রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে কী আছে?’


সাহাবিটি উত্তর দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার কাছে কিছুই নেই।’


রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ, কিছু পাও কি না।’



সাহাবি চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি কিছুই পাইনি।’


রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘আবার গিয়ে লোহার একটি আংটিও পাও কিনা দ্যাখো।’


সাহাবি আবারও ফিরে গেলেন। এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তা–ও পেলাম না। এই আমার বস্ত্র। শুধু এটাই আছে।’ তাঁর কাছে কোনো চাদরও ছিল না। লোকটি তার অর্ধেক নারীটিকে দিতে চাইলেন।


রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার বস্ত্র দিয়ে সে কী করবে? তুমি যদি এটি পরো, তাহলে তার কোনো কাজে আসবে না; আর যদি সে পরে, তাহলে তোমার কোনো কাজে আসবে না।’


সাহাবিটি বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকলেন। এর পর উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে উদ্যত হলেন। নবী (সা.) তখন তাঁকে ডেকে এনে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কি কোরআন মুখস্থ আছে?’


তিনি বললেন, ‘অমুক অমুক সুরা আমার মুখস্থ।’


রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘এগুলো কি তোমার মুখস্থ।’


তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’


রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন বললেন, ‘যে পরিমাণ কোরআন তোমার মুখস্থ আছে, তার বিনিময়ে তোমার কাছে এই নারীকে আমি বিয়ে দিলাম।’ (বুলুগুল মারাম, হাদিস: ৯৭৯)


বেশ বৈচিত্র্যময় সাহাবিদের যুগে বিয়ে ছিল



পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ কোরো না

সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 




আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, তোমরা অপরের গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না। (সুরা হুজরাত, আয়াত: ১২)


কোরআনে আছে, ‘যারা বিনা অপরাধে বিশ্বাসী পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা অবশ্যই মিথ্যা অপবাদ আর স্পষ্ট অপরাধের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহযাব, আয়াত: ৫৮)


হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-র বরাতে একটি হাদিসের বর্ণনা আছে। তিনি জানিয়েছেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা মন্দ ধারণা পোষণ করা থেকে বিরত থাক। কারণ, মন্দ ধারণা সবচেয়ে বড় মিথ্যা। অন্যের গোপন দোষ খুঁজে বেড়িও না, অন্যের গোয়েন্দাগিরি করো না, একে অন্যের সঙ্গে (অসৎ কাজে) প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোরো না, পরস্পরকে হিংসা কোরো না, অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, একে অন্যের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ কোরো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও—যেমনটা তিনি তোমাদের আদেশ দিয়েছেন।



এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। একজন আরেকজনকে অত্যাচার কোরো না, অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিও না এবং তাকে তুচ্ছ ভেবো না। এখানে আল্লাহভীতি রয়েছে (তিনি নিজের বুকের দিকে ইঙ্গিত করলেন।) কোনো মুসলমান ভাইকে তুচ্ছ ভাবা আরেকজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রত্যেক মুসলিমের রক্ত, সম্ভ্রম আর সম্পদ আরেক মুসলমানের ওপর হারাম। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ আর আকার-আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।


আরেক বর্ণনায় আছে: তোমরা পরস্পরকে হিংসা কোরো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, অন্যের গোয়েন্দাগিরি কোরো না, অন্যের গোপন দোষ খুঁজে বেড়িও না, পরস্পরের পণ্যদ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দিয়ো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।




অন্য আরেক বর্ণনায় আছে: তোমরা পরস্পর সম্পর্কচ্ছেদ কোরো না, একে অন্যের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন হয়ো না, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, পরস্পর হিংসা কোরো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা, ভাই ভাই হয়ে যাও।


অন্য আরও একটি বর্ণনায় আছে: তোমরা একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন কোরো না এবং অন্যের কেনাবেচার ওপর কেনাবেচা কোরো না।


 বুখারি, হাদিস: ৫,১৪৩



সুরা ইউসুফের সারকথা

সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 


সুরা ইউসুফ পবিত্র কোরআনের ১২তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ১১১। রুকু ১২টি। সুরা ইউসুফ পবিত্র নগরী মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ সুরায় ধারাবাহিকভাবে হজরত ইউসুফ (আ.)–এর জীবনকথা বর্ণনা করা হয়েছে। তা থেকে আমরা আল্লাহর মহিমা সম্পর্কে জানতে পারি এবং আমাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।


সুরা ইউসুফের মর্মবস্তু হলো ধৈর্যের সুফল। এ সুরায় মানবজাতির জন্য বিশেষ নির্দেশনা ও শিক্ষা নিহিত রয়েছে।



হজরত ইয়াকুব (আ.)–এর ১২ ছেলে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন অতি রূপবান। তাঁর স্বভাবও ছিল অপূর্ব। ইউসুফ (আ.)–এর প্রতি হজরত ইয়াকুব (আ.)–এর ভালোবাসা ছিল প্রকাশ্য। এ কারণে ভাইয়েরা তাঁকে হিংসা করতেন। একবার খেলাধুলার কথা বলে ভাইয়েরা তাঁকে কুয়ায় ফেলে দেন। পরে কুয়ার পাশ দিয়ে একটি কাফেলা যাওয়ার সময় তারা পানি নেওয়ার জন্য তাতে বালতি ফেললে ভেতর থেকে ইউসুফ (আ.) বের হয়ে আসেন।



কাফেলার লোকেরা ইউসুফ (আ.)–কে বিক্রি করে দেন। মিসরের এক মন্ত্রী তাঁকে কিনে বাড়িতে নিয়ে যান। ইউসুফ (আ.) যৌবনে পদার্পণ করলে মন্ত্রীর স্ত্রী জোলেখা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করেন। ইউসুফ (আ.) তাঁর প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করেন। এ ঘটনার পরম্পরায় ইউসুফ (আ.)–কে জেলে বন্দী করা হয়।


জেলখানায় ইউসুফ (আ.) তাওহিদের দাওয়াত দেন। বন্দীরা তাঁকে সম্মান করত। সে সময় মিসরের বাদশাহ একবার স্বপ্ন দেখেন। বাদশাহর সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেন না। কিন্তু জেলবন্দী ইউসুফ (আ.) অর্থপূর্ণভাবে সে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন। বাদশাহ এতে সন্তুষ্ট ও উপকৃত হন। ইউসুফ (আ.)–কে তিনি দেশের খাদ্যভান্ডার, ব্যবসা-বাণিজ্য তদারক করার জন্য উজির পদে নিয়োগ করেন।


কিছুদিন পর মিসর ও আশপাশে প্রবল দুর্ভিক্ষ হয়। ইউসুফ (আ.)–এর দুর্ভিক্ষপীড়িত ভাইয়েরা ত্রাণ নিতে মিসর আসেন। ভাইদের সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাতের পর ইউসুফ (আ.) নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁদের বলেন, ‘আমি তোমাদের ভাই ইউসুফ।’ এরপর তাঁরা মা–বাবাসহ মিসরে বসবাস করতে থাকেন।


পবিত্র কোরআনের ১২ নম্বর সুরা হলো সুরা ইউসুফ। সুরা ইউসুফে ইউসুফ (আ.)–এর কাহিনিকে ১২ ভাগে বিভক্ত করা যায়। ১. হজরত ইউসুফ (আ.) স্বপ্ন দেখলেন। ২. ইউসুফ (আ.)–এর ভাইয়েরা তাঁর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করলেন। ৩. মন্ত্রীর স্ত্রী জোলেখা ইউসুফ (আ.)–এর সঙ্গে তাঁর বাসনা পূরণ করতে চাইলেন। ৪. জোলেখার সহচরীরা ইউসুফ (আ.)–এর রূপে বিবশ হয়ে আপেলের বদলে নিজেদের আঙুল কেটে ফেললেন। ৫. ইউসুফ (আ.)–কে জেলে পাঠানো হলো। ৬. মিসরের বাদশাহ রহস্যময় একটি স্বপ্ন দেখলেন। ৭. ইউসুফ (আ.) বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন। ৮. ইউসুফ (আ.)–কে জেল থেকে বের করা হলো। ৯. জোলেখার সহচরীরা নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন। ১০. জোলেখা নিজের দোষ স্বীকার করলেন। ১১. ইউসুফ (আ.)–এর ভাইয়েরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলেন। ১২. বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যার মর্ম বোঝা গেল। এখানে আরেকটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়: ১ নম্বরের (ইউসুফ (আ.) স্বপ্ন দেখলেন) সঙ্গে ১২ নম্বরের (বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যার মর্ম বোঝা গেল) মিল পাওয়া যায়। ২ নম্বরের (ইউসুফ (আ.)–এর ভাইয়েরা তাঁর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করলেন) সঙ্গে ১১ নম্বরের (ইউসুফ (আ.)–এর ভাইয়েরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলেন) মিল পাওয়া যায়। ৩ নম্বরের (মন্ত্রীর স্ত্রী জোলেখা ইউসুফ (আ.)–এর সঙ্গে তাঁর বাসনা পূরণ করতে চাইলেন) সঙ্গে ১০ নম্বরের (জোলেখা নিজের দোষ স্বীকার করলেন) মিল পাওয়া যায়। ৪ নম্বরের (জোলেখার সহচরীরা ইউসুফ (আ.)–এর রূপে বিবশ হয়ে আপেলের বদলে নিজেদের আঙুল কেটে ফেললেন) সঙ্গে ৯ নম্বরের (জোলেখার সহচরীরা নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন) মিল পাওয়া যায়। ৫ নম্বরের (ইউসুফ (আ.)–কে জেলে পাঠানো হলো) সঙ্গে ৮ নম্বরের (ইউসুফ (আ.)–কে জেল থেকে বের করা হলো) মিল পাওয়া যায়। ৬ নম্বরের (মিসরের বাদশাহ রহস্যময় একটি স্বপ্ন দেখলেন) সঙ্গে মিল পাওয়া যায় ৭ নম্বরের (ইউসুফ (আ.) বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিলেন)।



বেশ বৈচিত্র্যময় সাহাবিদের যুগে বিয়ে ছিল

সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে

 



সাহাবিদের যুগে বিয়ে ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। বিয়ের আয়োজন ছিল সাদামাটা, প্রস্তুতি ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টার। সকালবেলা একজন সাহাবি ছিলেন অবিবাহিত। কবে বিয়ে করবেন, কাকে বিয়ে করবেন, সেটা সকালেও জানা ছিল না। সন্ধ্যায় তিনি সংসার শুরু করতেন! বিয়ের কারণে পাড়াপড়শির নির্ঘুম বিরক্তি সাহাবিদের যুগে ছিল না।


বিয়ের প্রথম ধাপ হচ্ছে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া। পুরুষ সাহাবিরা নিজেদের বিয়ের প্রস্তাব সরাসরি পাত্রীপক্ষের কাছে নিয়ে যেতেন। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান। তিনি প্রথমে সংকোচ বোধ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে অভয় দেন। এরপর নবী–কন্যা ফাতেমাকে (রা.) বিয়ে করেন আলী (রা.)।



সম্ভ্রান্ত নারীরাও কারও মাধ্যমে নিজেদের বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারতেন। খাদিজা (রা.) তাঁর বান্ধবী নাফিসা (রা.)-র মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এমনকি কয়েকজন নারী সাহাবিও সরাসরি এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এমন একজন প্রস্তাবকারী ছিলেন খাওলা বিনতে হাকিম (রা.)। তাঁর স্বামী উসমান ইবনে মাজউন (রা.) ইন্তেকালের পর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বিয়ে করেননি।


একজন নারীর রাসুল (সা.)–কে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনা চৌদ্দ শ বছর পর বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু সাহাবিদের সময় এটা ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সাহাবিরা যখন তাঁদের সন্তানদের কাছে ঘটনাটি বলেন, তাঁরা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করেন, সেই নারী কীভাবে রাসুল (সা.)–কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন!



বিয়ের মোহরানা ছিল একেক জনের একেক রকম। যাঁর যাঁর সামর্থ্য ও পাত্রীর সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী মোহরানা নির্ধারিত হতো। এক সাহাবির মোহরানা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তাঁর মুখস্থ কোরআনকে মোহরানা হিসেবে ধার্য করা হয়, যা তিনি স্ত্রীকে শেখাবেন।


সাহাবিদের যুগে পাত্রীরাও চাইলে মোহরানার প্রস্তাব দিতে পারতেন। রুমাইসা বিনতে মিলহান (রা.) আবু তালহা (রা.)-কে বিয়ে করার সময় নিজের মোহরানা নির্ধারণ করেন স্বামীর ইসলাম গ্রহণ। তিনি শর্ত জুড়ে দেন, তাঁকে বিয়ে করতে চাইলে আবু তালহাকে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। আবু তালহা কয়েক মিনিট চিন্তা করে বিয়েতে রাজি হন।


আলী ও ফাতেমা (রা.)-র বিয়ের মোহরানা ছিল ৪৬০ দিরহাম। সাহাবিদের যুগের ৪৬০ দিরহাম বর্তমান সময়ে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা।


সে যুগে মেয়েদের জোর করে বিয়ে দেওয়া হতো না। বিয়েতে মেয়ের মতামতকে অসম্ভব গুরুত্ব দেওয়া হতো। এমনকি বিয়ের পরও যদি পাত্রী জানাতেন যে সে বিয়েতে অসম্মত ছিলেন, তাহলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সে বিয়ে বাতিল করে দিতেন।


নারীরা নিজেদের বিয়ে নিয়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারতেন। কোনো কারণে পাত্র পছন্দ না হলে ‘না’ করে দিতে পারতেন। পাত্র ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক মর্যাদার অধিকারী হলেও নারীদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হতো।


ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি, খলিফাতুল মুসলিমিন। তিনি আবু বকর (রা.)-র মেয়ে উম্মে কুলসুম (রাহি.)-কে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু ওমরের (রা.) মেজাজের কারণে সে নারী বিয়েতে রাজি না হয়ে সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব পরে অন্য এক উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন আলীর (রা.) মেয়ে উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (রাহি.)।


সাহাবিদের বিয়েতে প্রথমদিকে মোহরানা অনেক কম ছিল। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলিফা হওয়ার পর মুসলমানদের অর্থনৈতিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। তখন বিয়েতে মোহরানার পরিমাণ বেড়ে যায়। খলিফা মোহরানা কমানোর জন্য রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করতে চেয়েছিলেন। তাতে এক নারী আপত্তি জানান। তিনি কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এটা তিনি করতে পারেন না। খলিফা সেই নারীর আপত্তি আমলে নিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ মোহরানা নির্ধারণ করা থেকে বিরত থাকেন।


তিনি উম্মে কুলসুম বিনতে আলীকে বিয়ে করার সময় মোহরানা হিসেবে ৪০ হাজার দিরহাম দেন। সাহাবিদের যুগে ১২ দিরহাম দিয়ে একটি ভেড়া কেনা যেত।


সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম ধনী সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) স্ত্রীকে মোহরানা বাবদ ৩০ হাজার দিরহাম দিয়েছিলেন।



সাবিত ইবনে কায়স (রা.) তাঁর স্ত্রীকে মোহরানা হিসেবে একটি বাগান দেন, যা সেই যুগ হিসেবে মোটা অঙ্কের মোহরানা।


সাহাবিদের যুগে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছিল সীমিত। এ কারণে বিয়ে ছিল সহজ। বিয়েতে সবাইকে দাওয়াত দিতে হবে, না দিলে কে কী মনে করবেন—এমন মনোভাব তখন ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সাহাবিদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। তাই বলে রাসুলুল্লাহকে (সা.) প্রত্যেক সাহাবিই বাধ্যতামূলকভাবে বিয়েতে দাওয়াত দিতেন না। কখনো কখনো এমনও হতো, কোনো সাহাবির বিয়ের কয়েক দিন পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সে খবর পেতেন। এমনটা হয়েছিল আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) এবং জাবির ইবনে আব্দিল্লাহ (রা.)-র সঙ্গে।


রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও মোটেই এ প্রত্যাশা করতেন না যে প্রত্যেক সাহাবিই তাঁকে বিয়ের দাওয়াত দেবেন বা তাঁকে জানিয়ে বিয়ে করবেন। এ যুগে যেসব সামাজিক বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে আমরা বিয়ের আয়োজন করি, সে সময় মোটেও সেসব ছিল না।


আরিফুল ইসলাম: লেখক



শুক্রবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৪

ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত বইসমূহ

শুক্রবার, আগস্ট ১৬, ২০২৪ 0
বার দেখা হয়েছে


ড. খোন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রচিত/অনূদিত বইসমূহ



 বাংলাদেশের আলেম সমাজের অন্যতম প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। ইসলাম সম্পর্কে তাঁর সুগভীর পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানগর্ভ আলোচনার কারণে তিনি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের সব ধরনের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু যুগে যুগে বিখ্যাত ব্যক্তিরা ক্ষণজন্মা হয়ে থাকে। আর প্রকৃতির সেই আমক সত্যকে বাস্তবে রূপদান করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সবার মন জয় করে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ডঃ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। কিন্তু তিনি ইসলামের সেবায় তার অবিনশ্বর কীর্তির মাধ্যমে চিরজীবন আমাদের মনের মনিকোঠায় বসবাস করবেন।


ড. জাহাঙ্গীর ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মায়ের নাম বেগম লুৎফুন্নাহার।


তিনি ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৩ সালে দাখিল, ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদিস বিভাগ থেকে কামিল পাস করেন। এরপর তিনি সৌদি আরবের রিয়াদের ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাঊদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।


রিয়াদের অধ্যয়নবালে তিনি বর্তমান সৌদি বাদশা ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্নর সালমানের হাত থেকে পর পর দু’বার সেরা ছাত্রের পুরস্কার গ্রহণ করেন। সৌদিতে তিনি শায়খ বিন বায, বিন উসায়মিন, আল জিবরিন ও আল ফাউজানসহ বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের সান্নিধ্যে থেকে ইসলাম প্রচারে বিশেষ দীক্ষা গ্রহণ করেন।


রিয়াদে অধ্যয়নকালে তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামি সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে প্রায় তিন বছর কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।


ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর সৌদি আরবে শিক্ষা শেষে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব উপেক্ষা করে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে ফিরে আসেন বাংলাদেশে।


দেশে এসে ইসলাম প্রচারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। পেশায় তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক। ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৯ সালে তিনি একই বিভাগে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। এছাড়াও তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দারুস সালাম মাদ্রাসায় খণ্ডকালীন শায়খুল হাদিস হিসেবে সহিহ বোখারির ক্লাস নিতেন। তিনি ওয়াজ মাহফিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আলোচক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তিনি মানুষকে শোনাতেন শাশ্বত ইসলামের বিশুদ্ধ বাণী।


বাংলা ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাজ সংস্কার, গবেষণা ও শিক্ষামূলক প্রায় পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- এহয়াউস সুনান, তরিকে বেলায়েত, হাদিসের নামে জালিয়াতি, ইসলামের নামে জঙ্গীবাদ ইত্যাদি।


মরহুম আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ব্যক্তিজীবনে অত্যন্ত সদালাপী, বিনয়ী, উম্মাহর জন্য দরদী, মুখলিস, পরমত সম্মানকারী, যুগসচেতন, ভারসাম্যপূর্ণ, উম্মাহর ঐক্য ভাবনায় বিভোর, প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত হিসেবে সব মহলে সমাদৃত ছিলেন।


ফুরফুরা শরীফের পীর আবদুল কাহহার সিদ্দীকির মেয়ে ফাতেমার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে তিন মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।


বই ডাউনলোড করুন:




ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png