শিরোনাম
Loading latest headlines...

সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২০

'মুহররম মাস'- এ মাস ঘিরে লোক জনের মাঝে কিছু বিভ্রান্ত কথা রয়েছে - ইসলাম কি বলে?

সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 উত্তরআলহামদু লিল্লাহ।.

 
'মুহররম' মাসে তথা যে মাসটি চন্দ্র বছরের প্রথম মাস; সে মাসে বিয়ে করতে বা বিয়ের প্রস্তাব দিতে কোন অসুবিধা নাই। এটি মাকরূহও নয়; হারামও নয়। এ সংক্রান্ত অনেক দলিলের কারণে:

এক:
বৈধতা ও দায়মুক্ততার মূল বিধানের ভিত্তিতে; যে ক্ষেত্রে এমন কোন দলিল উদ্ধৃত হয়নি যা মূল বিধানকে পরিবর্তন করতে পারে। আলেমদের মাঝে মতৈক্যপূর্ণ একটি নীতি হল: "অভ্যাস ও কর্মগুলোর মূল বিধান হল বৈধতা; যতক্ষণ না নিষিদ্ধতার দলিল উদ্ধৃত হয়"। যেহেতু কুরআন-হাদিসে, আলেমদের ইজমা-কিয়াসে এবং সলফে সালেহীনদের উক্তিতে এমন কিছু উদ্ধৃত হয়নি যা 'মুহররম' মাসে বিয়ে করতে বাধা দেয়; সুতরাং মূল বৈধতার বিধানের উপর আমল করা হবে ও ফতোয়া দেওয়া হবে।

দুই:
বৈধতার পক্ষে আলেমগণের ইজমা রয়েছে; নিদেন পক্ষে সেটা ইজমা সুকুতী (নিরবতামূলক ইজমা)। যেহেতু আমরা সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, গ্রহণযোগ্য ইমাম এবং আমাদের যামানা পর্যন্ত তাদের অনুসরণকারী পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি এমন কোন আলেম পাইনি যিনি 'মুহররম' মাসে বিয়ে করাকে বা বিয়ের প্রস্তাব দেয়াকে' হারাম বলেছেন কিংবা মাকরূহ বলেছেন।

যে ব্যক্তি এ মাসে বিয়ে করা থেকে বারণ করেন তার কথা বাতিল ও অশুদ্ধ হওয়ার জন্য দলিল হিসেবে এটাই যথেষ্ট যে এটি এমন ফতোয়া যেটার পক্ষে কোন দলিল নাই এবং কোন আলেমের বক্তব্য নাই।

তিন:
'মুহররম' মাস একটি সম্মানিত ও মর্যাদাবান মাস। এ মাসের ফযিলতের ব্যাপারে উদ্ধৃত হয়েছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: "রমযান মাসের পর সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে মুহররম মাসের রোযা।"[সহিহ মুসলিম (১১৬৩)]

যে মাসকে আল্লাহ্‌নিজের দিকে সম্বোধিত করেছেন (شهر الله المحرم-আল্লাহ্‌র মুহররম মাস) এবং যে মাসে রোযা রাখা অন্য মাসে রোযা রাখার চেয়ে অধিক সওয়াবপূর্ণ এমন মাসে এ ধরণের কাজের ক্ষেত্রে বরকত ও মর্যাদা সন্ধান করা যুক্তিযুক্ত। এমন মাসে বিষাদগ্রস্ত থাকা, বিয়ে করতে ভয় পাওয়া ও বিয়ে করাকে অশুভ মনে করা ঠিক নয়; যা হচ্ছে জাহেলী কুসংস্কার।

চার:
যদি কেউ এই বলে দলিল দিতে চায় যে, এ 'মুহররম' মাস হচ্ছে এমন মাস যে মাসে হুসাইন বিন আলী (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেছেন; যেমনটি কিছু রাফেযিরা করে থাকে; তাহলে তাকে বলা হবে: নিঃসন্দেহে তাঁর শাহাদাতের দিন ইসলামের ইতিহাসে একটি অপূরণীয় ক্ষতির দিন। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেটা সেই দিনে বিয়ে করা বা বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হারাম হওয়াকে আবশ্যক করে না। আমাদের শরিয়তে প্রতি বছর বিষাদকে নবায়ন করা ও শোককে এভাবে জারী রাখা যাতে করে সেটা আনন্দের প্রকাশককে বাধাগ্রস্ত করে এমন কিছু নাই।

যারা এমন বক্তব্য দিচ্ছেন আমাদের এ অধিকার রয়েছে যে, তাদেরকে জিজ্ঞেস করব: যেই দিন রাসূলুল্লাহ্‌সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মারা গেছেন সেই দিন কি উম্মতে মুসলিমার উপর এর চেয়ে বড় মুসীবত অবতীর্ণ হয়নি! তাহলে সেই গোটা রবিউল আউয়াল মাসে কেন বিয়ে করা হারাম করা হয় না?! কোন সাহাবী থেকে, নবী পরিবারের কোন সদস্য থেকে কিংবা তাদের পরবর্তী কোন আলেম থেকে এটি হারাম হওয়া বা মাকরূহ হওয়ার মর্মে কোন উদ্ধৃতি বর্ণিত হল না কেন!!

এভাবে আমরা যদি যেই দিনই কোন নবী পরিবারের সদস্য বা অন্যদের মধ্য থেকে কোন বড় ইমামের মৃত্যুতে বা শাহাদাতের প্রেক্ষিতে আমরা শোককে নবায়ন করতে থাকি তাহলে আনন্দ ও খুশির দিন ও মাসগুলো সংকীর্ণ হয়ে যাবে এবং মানুষ এমন সংকটে পড়ে যাবে যা থেকে উত্তরণের শক্তি তাদের নাই। কোন সন্দেহ নাই ধর্মীয় ক্ষেত্রে নতুন প্রবর্তনের অনিষ্ট সর্বপ্রথম প্রবর্তনকারীদের উপরে বর্তায়; যারা শরিয়তের বরখেলাফ করে এবং শরিয়ত পরিপূর্ণ হওয়া ও আল্লাহ্‌র মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও তারা এতে সংশোধনী দিতে আসে।

কোন কোন ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম এ অভিমত প্রকাশ করেছেন; বরং সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি মুহররম মাসের শুরুতে শোকাবহ দৃশ্যগুলো নবায়ন করার প্রথা চালু করেছেন তিনি হচ্ছেন- শাহ ইসমাইল আস-সাফাভী (৯০৮-৯৩০হিঃ)। ঠিক যেমনটি উল্লেখ করেছেন ড. আলী আল-ওয়ারদি "লামহাতুন ইজতিমাইয়্যা ফি তারিখিল ইরাক্ব" গ্রন্থে (১/৫৯): শাহ ইসমাইল শিয়া মতবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে কেবল ভীতি প্রদর্শনের মধ্যে ক্ষান্ত থাকেনি; বরং আরও একটি মাধ্যম গ্রহণ করেছেন। সেটা হচ্ছে প্রচারণা ও তুষ্টকরণের মাধ্যম। তিনি হুসাইন (রাঃ) এর হত্যা-বার্ষিকী উদযাপনের নির্দেশ দেন ঠিক যে পদ্ধতিতে বর্তমানে পালিত হচ্ছে সে পদ্ধতিতে। ইতিপূর্বে হিজরী চতুর্থ শতকে বাগদাদে বুওয়াইহিদ (Buwayhid) রাজাগণ এ অনুষ্ঠান উদযাপন করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাদের পরবর্তীতে এটি উপেক্ষিত হয় এবং এর গুরুত্ব হ্রাস পায়। অবশেষে এলেন শাহ ইসমাইল। তিনি এ অনুষ্ঠানের আরও উন্নয়ন করেন, এর সাথে তাযিয়া (শোক)-র বৈঠকগুলো যুক্ত করেন; যাতে করে এ অনুষ্ঠান দিলের উপর শক্তিশালী প্রভাব তৈরী করে। এ কথা বললেও ঠিক হবে যে: ইরানে শিয়া মতবাদের বিস্তার লাভে এটাই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি। কেননা এর মধ্যে বিষাদ ও কান্নার বহিঃপ্রকাশ, ব্যাপক হারে পতাকা উড়ানো ও তবলা বাজানো ইত্যাদি কর্মগুলো অন্তরের গভীরে বিশ্বাসকে প্রোথিত করে এবং হৃদয়ের প্রচ্ছন্ন তন্ত্রীগুলোর উপর আঘাত হানে।"[সমাপ্ত]

পাঁচ:
কোন কোন ঐতিহাসিক ফাতিমা (রাঃ) এর সাথে আলী (রাঃ) এর বিবাহ হিজরী তৃতীয় সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত হওয়ার অভিমতকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

ইবনে কাছির (রহঃ) বলেন:
"ইবনে মানদা" রচিত 'আল-মারিফা' গ্রন্থ থেকে বাইহাকী উদ্ধৃত করেছেন যে, আলী (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ) কে বিয়ে করেছেন হিজরতের এক বছর পর এবং তার সাথে ঘর সংসার শুরু করেছেন অন্য বছর। অতএব, আলী (রাঃ) ফতিমা (রাঃ) এর সাথে বাসর করেছেন তৃতীয় হিজরীর প্রথম দিকে।"["আল-বিদায়া আন্‌-নিহায়া" (৩/৪১৯) থেকে সমাপ্ত]

এ মাসয়ালায় আরও কিছু কথাবার্তা রয়েছে। কিন্তু এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল কোন আলেম মুহররম মাসে বিয়ে করার বিপক্ষে বলেননি। বরং যে ব্যক্তি মুহররম মাসে বিয়ে করবে তার জন্য আমীরুল মুমেনীন আলী (রাঃ) ও তাঁর স্ত্রী রাসূলুল্লাহ্‌সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কণ্যা সাইয়্যেদা ফাতিমা (রাঃ) এর বিবাহের উত্তম আদর্শ রয়েছে।           

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।



প্রশ্ন: মুহররম মাসে অধিক রোজা রাখা কি সুন্নত? অন্য মাসের উপর এ মাসের কি কোন বিশেষত্ব আছে?

সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 


আলহামদু লিল্লাহ।.
আরবী মাসগুলোর প্রথম মাস হচ্ছে- মুহররম। এটি চারটি হারাম মাসের একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট, লওহে মাহফুজে (বছরে) মাসের সংখ্যা বারটি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি হারাম (সম্মানিত)। এটাই সরল বিধান। সুতরাং এ মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।”[সূরা তওবা, আয়াত: ৩৬]

সহিহ বুখারি (৩১৬৭) ও সহিহ মুসলিম (১৬) এ আবু বাকরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন: “আল্লাহ আসমান-জমিন সৃষ্টিকালে সময়কে ঠিক যেভাবে সৃষ্টি করেছেন এখন সময় সে অবস্থায় ফিরে এল। বছর হচ্ছে- বার মাস। এর মধ্যে চার মাস- হারাম (নিষিদ্ধ)। চারটির মধ্যে তিনটি ধারাবাহিক: যুলক্বদ, যুলহজ্জ ও মুহররম। আর হচ্ছে- (মুদার গোত্রের) রজব মাস; যেটি জুমাদাল আখেরা ও শাবান মাস এর মধ্যবর্তী।”

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হচ্ছে মুহররম মাসের রোজা। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “রমজানের পর সবচেয়ে উত্তম রোজা হচ্ছে- আল্লাহর মাস ‘মুহররম’ এর রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামায হচ্ছে- রাত্রিকালীন নামায।”[সহিহ মুসলিম (১১৬৩)]

হাদিসে: ‘আল্লাহর মাস’ বলে মাসকে আল্লাহর সাথে সম্বন্ধিত করা হয়েছে মাসটির মর্যাদা তুলে ধরতে। আল-ক্বারী বলেন: হাদিস থেকে বাহ্যতঃ মনে হচ্ছে- গোটা মুহররম মাস (রোজা রাখা) উদ্দেশ্য। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি রমজান ছাড়া আর কোন মাসের গোটা সময় রোজা রাখেননি। তাই এ হাদিসের এ অর্থ গ্রহণ করতে হবে যে, মুহররম মাসে অধিক রোজা রাখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে; গোটা মাস রোজা রাখা নয়।

আল্লাহই ভাল জানেন।



আশুরার ঘটনাবলী মর্মকথা এবং আমল

সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 

 মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই নানা ঘটনাপ্রবাহের ঐতিহ্য বহন করছে পবিত্র মহররম মাস। বিশেষ করে ঐতিহাসিক কারবালার রক্তঝরা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহররম মাস আরও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ১০ মহররম ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে শাহাদতের অমিয় সুধা পান করেন বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.)।

কারবালার সূত্রপাত: ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের ১০ অক্টোবর মোতাবেক ৬১ হিজরির ১০ মহররম ফুরাত নদীর তীরে ইরাকের তৎকালীন রাজধানী কুফার ২৫ মাইল উত্তরে কারবালার মরুপ্রান্তরে এক মর্মন্তুদ ‘কারবালা’ সংঘটিত হয়েছিল। ওইদিন হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) নরপিশাচ সিমারের হাতে শাহাদাতবরণ করেন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় হজরত হোসাইন (রা.) অল্পসংখ্যক সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে জালিম শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন কারবালা প্রান্তরে। সেদিন মরুভূমির উত্তপ্ত বালুকারাশি রক্তে রক্তাক্ত হয়েছিল। জালিম শাসক ইয়াজিদ চেয়েছিল মুসলিমজাহানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে হজরত হোসাইনের (রা.) স্বীকৃতি আদায় করে নিতে। যদি হোসাইন (রা.) ইয়াজিদকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে মেনে নিতেন এবং তার কাছে মাথানত করতেন তাহলে সেই ‘কারবালা’ আর হতো না। কিন্তু হোসাইন (রা.) ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি এবং তার কাছে মাথা নত করেননি। তিনি জালিম শাসকের প্রতি আনুগত্য তথা সমর্থন দেয়ার চেয়ে শহিদ হওয়াই শ্রেয় মনে করেছিলেন। তাই অন্যায়-অসত্য এবং স্বৈরাচারী শাসকের কাছে তিনি মাথা নত করেননি।

আশুরার গুরুত্ব: মহররম মাসে বহু স্মরণীয় ও যুগান্তকারী ঘটনা সংঘটিত হওয়ায় বিভিন্ন দিক দিয়ে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম। মহররমের দশম দিবসে অর্থাৎ আশুরার দিনে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর মধ্যে ১. আকাশ, জমিন, পাহাড়-পর্বত সব কিছুর সৃষ্টি। ২. আদম (আ.) কে সৃষ্টি । ৩. নূহ (আ.) এর মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে অবতরণ। ৪. হজরত ইবরাহিম (আ.) এর নমরুদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ড থেকে মুক্তিলাভ। ৫. দীর্ঘ ১৮ বছর রোগ ভোগের পর হজরত আইয়ুব (আ.) এর দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি লাভ। ৬. হজরত সুলাইমান (আ.) কে পৃথিবীর একচ্ছত্র রাজত্বদান। ৭. হজরত ইউনুস (আ.) কে ৪০ দিন পর দজলা নদীতে মাছের পেট থেকে উদ্ধার। ৮. হজরত মুসা (আ.) কে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা। ৯. হজরত ঈসা (আ.) এর পৃথিবীতে আগমন এবং জীবিতাবস্থায় আসমানে উত্তোলন। ১০. হজরত ইদ্রিস (আ.) কে আসমানে উত্তোলন। ১১. হজরত দাউদ (আ.) কে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করা। ১২. গাজওয়ায়ে খায়বার বিজয় অর্জন। ১৩. মাদায়েন এবং কাদিসিয়ার যুদ্ধে বিজয় অর্জন। ১৪. প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা এবং একই দিনে তাঁর জান্নাতে প্রবেশ। ১৫. হজরত আদম (আ.) কে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় প্রেরণ এবং গুনাহ মার্জনার পর বিবি হাওয়া (আ.) এর সাথে আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতে পুনঃসাক্ষাৎ লাভ। ১৬. হজরত ইয়াকুব (আ.) কর্তৃক হারানো পুত্র হজরত ইউসুফ (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ লাভ। ১৭. সর্বশ্রেষ্ঠ ও প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মক্কা শরিফ থেকে হিজরত করে মদিনা শরিফে আগমন। ১৮. হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তার ৭৭ ঘনিষ্ঠজনের স্বৈরশাসক ইয়াজিদের সৈন্য কর্তৃক কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে শহাদতবরণ। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১/১৩২, উসদুল গাবাহ, ১/২১ ফাতহুল বারী, ৪/২৯১ আর রাহিকুল মাখতুম ১/৬৮)।

আশুরার আমল: আশুরার কারণে মহররম মাসের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় মাস মহররম। মহান আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে বিধান ও গণনা হিসেবে মাস হলো বারোটি আসমান ও জমিন সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি সম্মানিত। সুতরাং এ মাসে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। (সূরা তাওবাহ : ৩৬)।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় আগমন করলেন, দেখলেন মদীনার ইয়াহুদীরা আশুরার দিবসে রোজা পালন করছে। তাদেরকে রোজা রাাখার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তারা বললো, এই দিনটি আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দিনে আল্লাহ তায়ালা মুসা (আ.) এবং তার সম্প্রদায় বনী ইসরাইলকে ফেরআউনের কবল থেকে মুক্ত করেছেন এবং তার উপর বিজয় দান করেছেন। আর তারই শুকরিয়া হিসেবে এদিনে মুসা (আ.) রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোজা রাখি। তখন রাসুল (সা.) বললেন, মুসা (আ.) এর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তোমাদের চেয়ে আমিই বেশি হকদার। তারপর তিনি নিজেও রোজা রাখলেন এবং সাহাবিগণকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। (মুসলিম : ২৬৫৩)। তবে ইয়াহুদিরা আশুরা উপলক্ষে একদিন রোজা রাখে। তাদের রোজার সাথে যেন মুসলমানদের রোজার সাদৃশ্য না হয়, তাই মুসলমানরা আশুরার রোজার সাথে ৯ অথবা ১১ তারিখে আরো একটি রোজা বৃদ্ধি করে মোট দুইটি রোজা রাখবে। হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, রমজানের রোজার পর সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ রোজা হলো মহররমের রোজা। (তিরমিজি : ২৪৩৮)। হজরত মুয়াবিয়া (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, আশুরার রোজা তোমাদের ওপর ফরজ করা হয়নি বটে, কিন্তু আমি এই দিন রোজা রাখবো। যার ইচ্ছা হয় সে এই রোজা রাখতে পারো এবং ইচ্ছে হলে তা ছাড়তেও পারো। (বুখারি : ১৮৬৫)।



১০-ই মহররম / পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও ফযীলত”

সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে
১০-ই মহররম / পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও ফযীলত”

>>—> মতাদর্শে হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে অত্যাচারী শাসক ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)- কে যে নির্মম ভাবে শহীদ করা হয়, সেই হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণেই পালিত হয় আশুরা। মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আরবি ‘আশারা’ অর্থ দশ। সেই সুবাদে ওই তারিখ আশুরা বলে উল্লেখিত হয়ে আসছে।

তাৎপর্য
আল্লাহ পাক এ তারিখে আসমান, জমিন, লওহে কলম সৃষ্টি করেছেন এবং এই ১০ মহররম মহাপ্রলয় বা কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে।
আল্লাহ তায়ালা আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)- কে ১০ মহররম দুনিয়ায় প্রেরণ করেন।
মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ঈমানের মহা কঠিন পরীক্ষা দিতে নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ১০ মহররম।

১০ মহররম খোদাদ্রোহী ফেরাউন বিপুল সেনাবাহিনী নিয়ে নীল দরিয়ার অতল তলে ডুবে মরে আর হযরত মুসা (আঃ) বনি ইসরাইলদের নিয়ে পানির ওপর দিয়ে পার হয়ে যান।
হযরত ইউনুছ (আঃ) ৪০ দিন মাছের পেটে অবস্থানের পর ১০ মহররম নাজাত পেয়েছিলেন।
হযরত নূহ (আঃ) ৪০ দিনের মহাপ্লাবনের পর ১০ মহররম নৌকা থেকে বেলাভূমিতে অবতরণ করেন।
হযরত ঈসা (আঃ) ইহুদিদের অত্যাচার, নির্যাতন শূলদণ্ড থেকে মুক্তি লাভের জন্য সশরীরে চতুর্থ আসমানে উপস্থিত হন ১০ মহররম।
হযরত ইয়াকুব (আঃ) তাঁর হারানো ছেলে হজরত ইউসুফ (আঃ)- কে ফিরে পান এবং দৃষ্টিশক্তি আবার ফিরে পান ১০ মহররম।
ধৈর্য, সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক হযরত আয়ুব (আঃ) ১৮ বছর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত থেকে আল্লাহ পাকের ইচ্ছায় ১০ মহররম আকস্মিকভাবে আরোগ্য লাভ করেন।

কাবাঘরের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল এবং ঐতিহাসিক কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা সংগঠিত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

এই দিনের নেক আমল / নামাজ
> হযরত আলী (রা:) হতে বর্ণিত: রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে ব্যাক্তি মহররমের দশম রাত্র জেগে এবাদত করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম জীবন দান করবেন।

> গাউছুল আজম হযরত আব্দুল কাদের জ্বীলানী (রহ:) বলেন, যে ব্যাক্তি মহররমের দশম রাত্র জেগে এবাদত করবে, তার মৃত্যু হবে কষ্টহীন এবং আরামের।

নামাজের কতিপয় নিয়ম
বুযুর্গনে দ্বীনদের মতে আশুরার রাত্রে ২ রাকাত নামাজ আছে। প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতেহা একবার এবং সুরা এখলাস তিন বার। এভাবে যে দুই রাকাত নামাজ পড়বে আল্লাহতায়ালা তার কবরকে রওশন (আলোকিত) করে দেবেন।
এক নিয়তে চার রাকাত নফল নামাজ যার প্রত্যেক রাকাতে একবার সুরা ফাতেহা এবং পঞ্চাশ বার সুরা এখলাস। এভাবে যে ব্যাক্তি ৪ রাকাত নামাজ পড়বে আল্লাহ তায়ালা তার পঞ্চাশ বছর পূর্বের ও পরের সব গোনাহ মাফ করে দিবেন।

> হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন এক নিয়তে চার রাকাত নফল নামাজ যার প্রত্যেক রাকাতে একবার সুরা ফাতেহা, তিন বার সুরা এখলাস, এবং এক বার আয়তুল কুরসী। এভাবে নামাজ শেষে ১০০ বার সুরা এখলাস পাঠ। এভাবে নামাজ আদায় করলে গুনাহ মাফ হবে এবং জান্নাতের অসীম নেয়ামত হাসেল হবে। রাহাতুল কুলুব গ্রন্থে একবার সুরা ফাতেহা, ১০ বার সুরা এখলাস এবং ৩ বার আয়াতুল কুরসী পড়ার কথা বলা হয়েছে।

-(রাহাতুল কুলুব-পৃষ্ঠা ২২৫)
গুনিয়াতুত ত্বালেবিন গ্রন্থে ১০০ রাকাত নফল নামাজের কথা বলা হয়েছে। দুই দুই রাকাত করে, প্রত্যেক রাকাতে সুরা ফাতেহা ১ বার এবং সুরা এখলাস ১০ বার। এভাবে ১০০ রাকাত নামাজ আদায় করলে সেই ব্যাক্তির উপরে ৭০টি রহমতের নাযিল করবেন। যার মধ্যে সর্ব নিম্নটি হলো গোনাহ মাফ।

রোযা
> আবু হোরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রমজানের রোযার পরে, সবচেয়ে উত্তম রোযা হলো মহররম মাসের (আশুরার) রোযা এবং ফরজ নামাজের পরে সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো রাত্রীকালীন (তাহাজ্জুদ) নামাজ !

-(মুসলিম শরীফ)

মহররম মাসের অন্যান্য বিশেষত্ব
পবিত্র ‘মহররম’ মাসের ৩০ দিনে বিশ্বের ইতিহাসে এমনসব ঘটনার অবতারণা ঘটেছে, যার দিকে দৃষ্টিপাত করলে হতবাক না হয়ে পারা যায় না। এই মাসের ১ম তারিখটি বছরের প্রারম্ভ বলে স্বীকৃত। ৯ ও ১০ তারিখে রোজা রাখার কথা হাদীস শরীফে ঘোষিত হয়েছে। ১০ তারিখে আশুরা বা কারবালা বার্ষিকী পালিত হয়। এই তারিখে ইমাম হযরত হুসাইন ইবনে আলী (রা:) খলীফা ইয়াজীদ ইবনে মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কারবালা প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেন। ১৬ তারিখে বাইতুল মোকাদ্দাসকে কিবলা মনোনয়ন করা হয়েছিল। এই মাসের ১৭ তারিখ আবরাহার হস্তি বাহিনী মক্কার উপকণ্ঠে ছাউনী গেড়েছিল। বিশেষ করে আশুরার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনে হযরত আদম (আ:) দুনিয়ার বুকে পদার্পণ করেছিলেন। হযরত নূহ (আ:)- এর সময়কার মহাপ্লাবনের শুরু এবং শেষও ছিল আশুরার দিনে। হযরত মুসা (আ:) তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন এই দিনে এবং অভিশপ্ত ফেরাউনের ধ্বংসও সাধিত হয়েছিল এইদিনে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) পাপিষ্ঠ নমরূদের অনলকু- হতে নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন এই দিনে। হযরত ইউসুফ (আ:) অন্ধকার কূপ হতে এইদিনে উদ্ধার লাভ করেছিলেন। হযরত ঈসা (আ:) কে আল্লাহ পাক চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলন এই দিনে। হযরত আইয়ুব (আ:) এর আরোগ্য লাভের দিনটি ছিল আশুরা। এই দিনে হযরত ইউনূস (আ:) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এই দিনেই হযরত ইদ্রিস (আ:) সশরীরে জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন। আবার এই দিনেই কেয়ামত সংঘটিত হবে। এতসব ঘটনার চিত্র যে মাস স্বীয় বুকে ধারণ করে আছে এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য যে অপরিসীম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত ‘মহররম’ হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী মাস। ‘আবহমানকাল ধরে চলছে মিথ্যার সাথে সত্যের লড়াই। সৃষ্টির ইতিহাসে এ দুইয়ের বৈরিতা চিরন্তন। তা যেমন শক্ত তেমনি শক্তিশালী। এ দ্বন্দ্ব কখনো মুছে যাওয়ার নয়, কিংবা নয় থেমে থাকারও। সত্যের সাথে শত্রুতা ঘোষণা করেই হয় মিথ্যার জন্ম। আর মিথ্যাকে প্রতিহত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে আসে সত্য।’ এভাবেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিজয় মাল্য লাভে ধন্য হয়। মাহে ‘মহররম’ এই শিক্ষাই দিয়ে যায় বারবার।

কুরআন-হাদীসের আলোকে মহররম মাস

কুরআন মাজীদে ও হাদীস শরীফে মহররম মাস সম্পর্কে যা এসেছে তা হল, এটা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ মাস। কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

> হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোযা হল, সর্বশ্রেষ্ঠ।’
-{সহীহ মুসলিম :: ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী :: ১/১৫৭}

> হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’
-[সহীহ বুখারী :: ১/২১৮]

> হযরত আলী (রা:) কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন ? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবি করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মহররম মাসে রাখ ! কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’

-(জামে তিরমিযী :: ১/১৫৭)

> অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’

-{সহীহ মুসলিম :: ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী :: ১/১৫৮}

> আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদীসে আছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’

-(মুসনাদে আহমদ :: ১/২৪১)

> হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব।’

-[সহীহ মুসলিম :: ১/৩৫৯]

মহররম মাসের অপসংস্কৃতি ও বিধি-নিষেধ

মহররম মাস এলেই এক শ্রেণীর মানুষ তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল বের করা, শোক প্রকাশ্যে নিজের শরীরকে রক্তাক্ত করা প্রভৃতি কাজ করে থাকেন। এ ধরনের কোনো রেওয়াজ ইসলামের কোথাও বর্ণিত হয়নি। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়।
এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো ; তওবা- ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য।
বলাবাহুল্য, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা- ‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’

অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপরায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলি যুগের কথাবার্তা বলে।’

## অতএব শাহাদাতে হুসাইন (রা:) কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলি রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।



রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২০

ধৈর্য দাওয়াতের অন্যতম শর্ত

রবিবার, আগস্ট ৩০, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 


লেখকঃ এ.কে.এম.নাজির আহমদ
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তেরোটি বছর মাক্কায় ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। সত্য-সন্ধানী কিছু সংখ্যক লোক তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন। কিন্তু মুশরিক নেতাদের দাপটের কারণে মক্কার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। এই দিকে ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি বড়ো অংশ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় ইয়াসরিবে ইসলামী দাওয়াতের প্রসার ঘটে।

ياَيُّهَا الَّذِيْنَ امَنُوْا اسْتَعِيْنُوْا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ ج اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ 0
وَلاَ تَقُوْلُوْا لِمَنْ يُّقْتَلُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ اَمْوَاتٌ ج بَلْ اَحْيَاءٌ وَّلكِنْ لاَ تَشْعُرُوْنَ 0
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الاَمْوَالِ وَالاَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ط وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ 0
ভাবানুবাদ
১৫৩. ‘ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবর অবলম্বনকারীদের সঙ্গে আছেন।
১৫৪. আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা ‘মৃত’ বলো না। তারা তো আসলে জীবিত। কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পার না।
১৫৫. এবং আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের লোকসান ঘটিয়ে পরীা করবো। এমতাবস্থায় যারা সবর অবলম্বন করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।’
শানে-নজুল
নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তেরোটি বছর মাক্কায় ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। সত্য-সন্ধানী কিছু সংখ্যক লোক তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন। কিন্তু মুশরিক নেতাদের দাপটের কারণে মক্কার অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেনি। এই দিকে ইয়াসরিবের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি বড়ো অংশ ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় ইয়াসরিবে ইসলামী দাওয়াতের প্রসার ঘটে।
এমতাবস্থায় আল্লাহ রাব্বুল ‘আল আমীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ইয়াসরিবে হিজরাত করার নির্দেশ দেন।
৬২২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইয়াসরিব পৌঁছেন। ইয়াসরিবে গড়ে তোলেন ছোট্ট একটি রাষ্ট্র। তখন থেকে ইয়াসরিব হয় আল মাদিনা।
মাদানী যুগের একেবারে গোড়ার দিকে সূরা আল বাকারার বৃহত্তর অংশ নাজিল হয়। সুদ নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিলো মাদানী যুগের শেষ দিকে। এই আয়াতগুলোকেও এই সূরায় শামিল করা হয়। আবার, যেই আয়াতগুলো দিয়ে এই সূরাটির সমাপ্তি টানা হয়েছে সেই আয়াতগুলো মাক্কী যুগের শেষভাগে মিরাজের সময় নাজিল হয়েছিলো। বিষয়বস্তুর সামঞ্জস্যের কারণে সেই আয়াতগুলো এই সূরায় সংযুক্ত করা হয়।
হিজরাতের পূর্বে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাওয়াতি তৎপরতা পরিচালিত হয়েছে মুশরিকদের মধ্যে। হিজরাতের পর আরেক শ্রেণীর লোক তাঁর সামনে আসে। এরা ছিলো ইয়াহুদি।
আল মাদীনার উপকণ্ঠে তাদের বিভিন্ন গোত্র বসবাস করতো। এরা আত্তাওরাতের অনুসারী বলে দাবি করতো। আসলে তারা আত্তাওরাতকে বিকৃত করে ফেলেছিলো। আত্তাওরাতে তারা মানুষের কথা মিশিয়ে নিয়েছিলো। আত্তাওরাতের যেই সব আয়াত তখনো অবিকৃত ছিলো সেইগুলোকে তারা নিজেদের মনগড়া ব্যাখ্যা দ্বারা বিকৃত করে ফেলেছিলো। এরা ছিলো আসলে বিকৃত মুসলিম।
ইসলামী দাওয়াত মাদানী যুগে প্রবেশ করার পর আরেক শ্রেণীর মানুষের আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে। এরা ছিলো মুনাফিক।
এদের কেউ কেউ ইসলামের সত্যতা স্বীকার করতো, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বে নিয়োজিত হতে তারা প্রস্তুত ছিলো না।
এদের কেউ কেউ ইসলাম ও জাহিলিয়াতের মাঝে দোদুল্যমান অবস্থায় ছিলো।
এদের কেউ কেউ আসলে ইসলামকে অস্বীকারই করতো, কিন্তু ফিতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মুসলিমদের দলে প্রবেশ করতো।
এদের কেউ কেউ একদিকে মুসলিমদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতো, অন্যদিকে ভালো সম্পর্ক রাখতো ইসলামের দুশমনদের সাথে। শেষাবধি যারাই বিজয়ী হোক না কেন, এতে যেনো তাদের স্বার্থ হানি না ঘটে সেই বিষয়ে তারা ছিলো খুবই সজাগ।
সূরা আলবাকারা নাজিলের সময় বিভিন্ন ধরনের মুনাফিকের আত্মপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছিলো মাত্র, তাই এই সূরাতে তাদের সম্পর্কে সংপ্তি বক্তব্য পেশ করা হয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে মুমিনদের চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা এবং আমল-আখলাক পরিশীলিত করার জন্য বিভিন্ন সবক দেয়া হয়েছে।

ব্যাখ্যা
১৫৩ নাম্বার আয়াত
“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। অবশ্যই আল্লাহ সবর অবলম্বনকারীদের সঙ্গে আছেন।”
আল মাদীনা রাষ্ট্রে উত্তরণের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন মুমিনদেরকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দেন। এর মাধ্যমে তাঁদেরকে যে বিরাট রকমের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে ইংগিতে সেই কথা তাঁদেরকে জানিয়ে দেন। সমাজ-সভ্যতার ইসলাহ করতে অগ্রসর হলে তাঁদেরকে যে বড়ো রকমের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হবে সেই কথা তাঁদেরকে জানিয়ে দেন। আর এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য তাঁদেরকে সবর ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার আহ্বান জানান।
সবর অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। মুমিনদেরকে এই গুণে গুণান্বিত হওয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বারবার তাকিদ করেছেন। আল হাদিসেও এই বিষয়ে তাকিদ রয়েছে।
রোগ-ব্যাধির কষ্ট বরদাশত করার নাম সবর।
দুঃখ-বেদনায় ভেঙে না পড়ার নাম সবর।
অনভিপ্রেত কথা ও আচরণে উত্তেজিত না হওয়ার নাম সবর।
পাপের পথে গিয়ে লাভবান হওয়ার চেয়ে পুণ্যের পথে থেকে তিকে মেনে নেয়ার নাম সবর।
মিথ্যা প্রচারণার মুখে অবিচলিত থাকার নাম সবর।
ভীতিপ্রদ পরিস্থিতিতেও সঠিক পথে দৃঢ়পদ থাকার নাম সবর।
ল্য হাসিলের জন্য দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার নাম সবর।
ল্য অর্জন বিলম্বিত হচ্ছে দেখে হতাশ বা নিরাশ না হওয়ার নাম সবর।
বিরোধিতার বীরোচিত মোকাবেলার নাম সবর। ইত্যাদি।
সূরা আল মুদ্দাস্সিরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় আয়াতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবী হিসেবে তাঁর কর্তব্য কী তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ময়দানে তিনি তখনো নামেননি। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন এই সূরারই সপ্তম আয়াতে এই কথাও তাঁকে অগ্রিম জানিয়ে দিলেন যে এই কর্তব্য পালন করতে গেলে তাঁকে বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে। সেই অবস্থার সম্মুখীন হয়ে তাঁকে কর্তব্য কর্মে দৃঢ়পদ থাকতে হবে।
وَلِرَبِّكَ فَاصْبِرْ ০
(এবং তোমার রবের খাতিরে সবর অবলম্বন কর।)
সবর অবলম্বনের তাকিদ দিয়ে সূরা আল মুয্যাম্মিলের ১০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
وَاصْبِرْ عَلى مَا يَقُولُوْنَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيْلاً ০
‘ওরা যেইসব কথা বলে বেড়াচ্ছে তার মোকাবেলায় সবর অবলম্বন কর এবং ভদ্রভাবে তাদেরকে এড়িয়ে চল।’
সূরা আল মা‘আরিজের ৫ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
فَاصْبِرْ صَبْرًا جَمِيْلاً ০
‘অতএব তুমি সবর অবলম্বন কর, সুন্দর সবর।’
সূরা ইউনুসের ১০৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
وَاتَّبِعْ مَا يُوْحى إِلَيْكَ وَاصْبِرْ حَتّى يَحْكُمَ اللهُ ج وَهُوَ خَيْرُ الْحَاكِمِيْنَ০
‘এবং তোমার প্রতি যা ওহি করা হয় তা মেনে চল এবং আল্লাহ ফায়সালা না করে দেয়া পর্যন্ত সবর অবলম্বন কর। আর তিনিই তো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।’
একই রূপ তাকিদ দিয়ে সূরা তা-হা-এর ১৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
‘অতএব ওরা যা কিছু বলে বেড়াচ্ছে তার মোকাবেলায় তুমি সবর অবলম্বন কর, আর সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পূর্বে তোমার রবের প্রশংসাসহ তাসবিহ কর, রাতের বেলায়ও তাসবিহ কর এবং দিনের প্রান্তে। আশা করা যায় তুমি খুশি হবে।
সূরা আল আহকাফের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُوْلُوْا الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلاَ تَسْتَعْجِلْ لَّهُمْ ০
এ হচ্ছে সবর অবলম্বনের তাকিদ সংবলিত বহুসংখ্যক আয়াতের মাত্র কয়েকটি।
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “সবরের চেয়ে উত্তম ও প্রশস্ত আর কিছু কাউকে দেয়া হয়নি।” (আবু সায়িদ আল খুদরী (রা) সাহীহ মুসলিম, সহীহ আল বুখারী।)
সূরা আয্যুমারের ১০ নম্বর আয়াতে সবর অবলম্বনকারীদের প্রতিদান সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন, “সবর অবলম্বনকারীদেরকে অগণিত পুরস্কার পূর্ণভাবে দেয়া হবে।” এই আয়াতের শেষাংশে-
اِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَِ ০
কথাটি জুড়ে দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন সবর নামক গুণটির মাহাত্ম্য তুলে ধরেছেন। অন্য দিকে এই বাক্যাংশের মাধ্যমে তিনি মুমিনদের মনে নিশ্চিন্ততার আমেজ সৃষ্টি করেছেন।
আরেকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সালাত। এটি এমন এক প্রক্রিয়া যার অনুশীলন মুমিনদের মাঝে অনুপম নৈতিক শক্তি সৃষ্টি করে। সেই জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নবুওয়াত প্রদানের সঙ্গে সঙ্গেই জিবরিল (আ) কে পাঠিয়ে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন তাঁকে সালাত আদায়ের পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। মাক্কী ও মাদানী যুগে নাজিলকৃত বহু আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন সালাতের তাকিদ দিয়েছেন। আলোচ্য আয়াতটিতেও আমরা একই রূপ তাকিদ দেখতে পাই।

১৫৪ নম্বর আয়াত
“আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা ‘মৃত’ বলো না। তারা তো আসলে জীবিত। কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পার না।”
আল্লাহর পথে নিহত হওয়াকে ইসলামী পরিভাষায় শাহাদাত বলা হয়। যিনি আল্লাহর পথে নিহত হন, তাঁকে বলা হয় শহীদ।
শাহাদাতবরণ মৃত্যু বটে, কিন্তু অসাধারণ মৃত্যু, মহিমান্বিত মৃত্যু। সেই জন্য আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন শহীদদেরকে ‘মৃত’ বলে আখ্যায়িত করতে নিষেধ করেছেন।
সূরা আলে ইমরানের ১৬৯ থেকে ১৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন শহীদদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তোমরা মৃত মনে করো না। বরং তারা জীবিত। তাদের রবের কাছ থেকে তারা রিজিক পাচ্ছে। আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা কিছু দিয়েছেন, তাতে তারা খুশি ও তৃপ্ত। আর তারা এই বিষয়েও নিশ্চিত, যেই সব মুমিন তাদের পেছনে এখনো দুনিয়ায় রয়ে গেছে, তাদের জন্য কোন ভয় ও দুঃখের কারণ নেই। তারা আল্লাহর নিয়ামত ও অনুগ্রহ লাভ করে আনন্দিত এবং তারা জানতে পেরেছে, অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের পুরস্কার নষ্ট করেন না।” শহীদের মর্যাদা সম্পর্কে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, “জান্নাতে প্রবেশ করার পর দুনিয়ার সমস্ত সামগ্রী তার জন্য নির্ধারিত হলেও কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে ফিরে আসতে চাইবে না। কিন্তু শহীদ এর ব্যতিক্রম। তাকে যেই মর্যাদা দেয়া হবে তা দেখে সে দশবার পৃথিবীতে এসে শহীদ হওয়ার আকাক্সা ব্যক্ত করবে।”
শাহাদাত লাভের পর পরই যাঁরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের সান্নিধ্যে এমনভাবে সমাদৃত হন, তাঁদেরকে ‘মৃত’ বলা আসলেই শোভনীয় নয়।

১৫৫ নম্বর আয়াত
“এবং আমি অবশ্যই ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের লোকসান ঘটিয়ে তোমাদেরকে পরীা করবো। এমতাবস্থায় যারা সবর অবলম্বন করবে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও।”
এই আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন তাঁর একটি শাশ্বত বিধানের কথা মুমিনদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর সেটি হচ্ছে : যাঁরা আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিনের প্রতি নিখাদ ঈমান আনার ঘোষণা দেবেন, তাঁদেরকে তিনি অবশ্যই পরীার সম্মুখীন করবেন। সূরা আল ‘আনকাবুতের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ يُّتْرَكُوْآ اَنْ يَّقُوْلُوْآ امَنَّا وَهُمْ لاَ يُفْتَنُوْنَ ০ وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللهُ الَّذِيْنَ صَدَقُوْا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِيْنَ০
‘লোকেরা কি মনে করেছে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ এই কথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীা করা হবে না? অথচ তাদের পূর্ববর্তীদেরকে আমি পরীা করেছি। আল্লাহকে তো জানতে হবেÑ ঈমানের দাবিতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী।’ পরবর্তীকালে অবতীর্ণ সূরা মুহাম্মাদের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন, “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীা করবো যাতে আমি জেনে নিতে পারি তোমাদের মধ্যে কারা ‘মুজাহিদীন’ এবং কারা ‘সাবেরিন’।” সূরা আলে ইমরানের ১৪২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন, “তোমরা কি ভেবেছো এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদ করে এবং কারা সবর অবলম্বনকারী?” সূরা আত্ তাওবা-র ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন,
اَمْ حَسِبْتُمْ اَنْ تُتْرَكُوْا وَلَمَّا يَعْلَمَ اللهُ الَّذِيْنَ جهَدُوْا مِِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوْا مِنْ دُوْنِ اللهِ وَلاَ رَسُوْلِه وَلاَ الْمُؤْمِنِيْنَ وَلِيْجَةٌ ج وَاللهُ خَبِِيْرٌم بِمَا تَعْمَلُوْنَ ০
‘তোমরা কি ভেবেছো যে তোমাদেরকে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি যে তোমাদের মধ্য থেকে কারা জিহাদে নিবেদিত হয় এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরকে ছাড়া আর কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন না। আর তোমরা যা কিছু কর সেই সম্পর্কে আল্লাহ খবর রাখেন।’
সূরা আল বাকারার ২১৪ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন, “তোমরা কি ভেবেছো যে এমনিতেই তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, অথচ এখনো তোমাদের ঐরূপ অবস্থা আসেনি যেমনটি এসেছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর।”
তাদের ওপর কঠিন অবস্থা আপতিত হয়েছে, মুসিবত এসেছে এবং তাদেরকে কাঁপিয়ে দেয়া হয়েছে যেই পর্যন্ত না রাসূল ও তাঁর সঙ্গীরা বলে উঠেছে, ‘কখন আসবে আল্লাহর সাহায্য!’ তখন তাদেরকে বলা হয়েছে, ‘ওহে, আল্লাহর সাহায্য অতি নিকটেই।’ সূরা আলে ইমরানের ১৪৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন বলেন, “কত নবী গত হয়ে গেছে যারা লড়াই করেছে, তাদের সাথে মিলে লড়াই করেছে বহু আল্লাহওয়ালা লোক। আল্লাহর পথে যতো মুসিবাতই তাদের ওপর আপতিত হয়েছে তারা হতাশ হয়নি, দুর্বলতা দেখায়নি এবং বাতিলের নিকট মাথা নত করেনি। এমন সবর অবলম্বনকারীদেরকেই আল্লাহ ভালোবাসেন।”
ঈমানের দাবি হচ্ছে, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিত হওয়া এবং এই সংগ্রাম চালাতে গিয়ে যত প্রকারের বাধাই আসুক না কেন তার মোকাবেলায় দৃঢ়পদ থাকা।
এই সংগ্রাম চালাতে গিয়ে মুমিনদেরকে অনিবার্যভাবে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, কখনো কখনো অবস্থা এমন সঙ্গিন হতে পারে যে অনাহারে থাকতে হবে, কখনো কখনো বাগ-বাগিচা, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান, ঘরদোরের ওপর হামলা হতে পারে, কখনো কখনো ইসলাম বিদ্বেষীদের হাতে আপনজন ও সহকর্মীদের কেউ কেউ প্রাণ হারাতে পারেন এবং কখনো কখনো আয়-উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এমন সব কঠিন পরিস্থিতিতেও যাঁরা সবর অবলম্বন করতে পারবেন, তাঁদেরকে সুসংবাদ দেয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নির্দেশ দিয়েছেন।

শিক্ষা
১. সমাজ ও সভ্যতার ইসলাহ বা পরিশুদ্ধি করতে গেলে মুমিনদেরকে অবশ্যই বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হবে। এমতাবস্থায় তাঁদেরকে সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইতে থাকতে হবে।
২. আল্লাহর পথে যাঁরা শহীদ হন তাঁদেরকে ‘মৃত’ বলে আখ্যায়িত করা যাবে না।
৩. আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামিন ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি, ক্ষুধা-অনাহার এবং অর্থ-সম্পদ, জান ও আয়-উপার্জনের লোকসান ঘটিয়ে মুমিনদেরকে পরীা করবেন। এমতাবস্থায় যাঁরা দৃঢ়তা-অটলতা-অবিচলতা অবলম্বন করবেন, তাঁদের জন্যই রয়েছে আল্লাহর বিপুল অনুগ্রহ ও রাহমাত।

লেখক : সাবেক নায়েবে আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী



হাবিল ও কাবিল

রবিবার, আগস্ট ৩০, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে



হযরত আদ ও বিবি হাওয়া শয়তাদের কুচক্রে পড়ে বেহেশতচ্যুত হলেন। তাঁরা আল্লাহতা’লার অভিশাপে পৃথিবীতে এসে বাস করতে লাগলেন। ক্রমে তাঁদের সন্তান-সন্ততি জন্মগ্রহণ করতে লাগলো। হযরত আদমের বংশধরগণের মধ্

যে হাবিল ছিলেন অতিশয় ধর্মপ্রাণ। তিনি রাতদিন কেবল খোদার বন্দেগীতে মশগুল হয়ে থাকতেন। অন্য কোন দিকে তাঁর দৃষ্টি ছিলো না।

ইবলিস আদমের ওপরে হাড়ে হাড়ে চটে ছিলো। সে কেবল সুযোগ খুঁজছিলো কি করে এঁর সন্তানগণকে পথভ্রষ্ট করা যায়। অবশেষে অনেক প্রলোভন দিয়ে কাবিল নামক পুত্রকে আপনার অধীনে আনতে সমর্থ হলো। কাবিল শয়তানের ফেরেরীতে পড়ে মুহুর্তের জন্য ভুলেও একবার আল্লাহতা’লার নাম মুখে আনতো না, বরং দিনে দিনে পাপের পথে অধিক অগ্রসর হতে লাগলো।

একদিন হাবিল ও কাবিল মনস্থ করলো যে, তারা উভয়ে আল্লাহতা’লার উদ্দেশ্যে একটা পশুকে কোরবানি দেবে। নির্দিষ্ট দিনে উভয়ে দু’টি পশু জবেহ করলো। ধার্মিক ও পরহেজগার হাবিলের কোরবানি মঞ্জুর হলো, কিন্তু পাপী কাবিলের কোরবানী খোদা মঞ্জুর করলেন না।

কাবিল যখন বুঝতে পারলো যে, আল্লাহ তার কোরবানি গ্রহণ করেননি, তখন সে মনে খুব আঘাত পেলো। সে ভাবলো যে, হাবিলের কারসাজিতেই খোদাতা’লা তার প্রতি বিমুখ হয়েছেন। সে প্রতিহিংসায় উত্তেজিত হয়ে চীৎকার করে বলে উঠলোঃ তেমাকে খুন করবো হাবিল। তোর জন্যই আমার কোরবানি মঞ্জুর হলো না।

কাবিলের কথা শুনে হাবিল তো অবাক! সে কাবিলকে বললোঃ সে কি কাবিল –আমি তোমার কাছে কি অপরাধ করেছি যে, তুমি আমাকে খুন করবে? তুমি যদি আমাকে খুন করো তবে আমার ও তোমার উভয়ের পাপ তোমাকে আজীবন বহন করতে হবে। তার পরে খোদাতা’লা তেমাকে এর শাস্তির জন্য দোজখে পাঠাবেন। তোমার দুর্দশার সীমা থাকবে না। তুমি এমন পাপ কখনো করো না ভাই।

হাবিলের কতায় কাবিল আলো বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলো। সে লাফ দিয়ে হাবিলের বুকের ওপরে ওঠে গলা টিপে ধরলো। ধর্মপ্রাণ হাবিল দম বন্ধ হয়ে মারা গেলো।

হাবিলকে মেরে ফেলে কাবিল ভয়ানগ বিপদে পড়ে গেলো। হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে সে চিন্তা করতে লাগলো। কি করবে, কিছুই স্থির করতে পারলো না। সে পাগলের মতো এদিক-ওদিন ছুটোছুটি করতে লাগলো। হাবিলের লাশটার কি গতি হবে তা সে ভেবে পেলো না।

এই ঘটনার পূর্বে কোন মানুষ মরে নি, খুন খারাবিও কোনো দিন হয়নি। কাজেই মৃতদেহ কিরূপে দাফন-কাফন করতে হয় তা কারুরই জানা ছিলো না।

হাবিলকে খুন করে মাথায় হাত দিয়ে কাবিল আকাশ পাতাল চিন্তা করতে লাগলো। এখন সে কি করে, কোথায় যায়, কার পরামর্শ লয়।

আল্লাহতা’লা কাবিলের বিপদ বুঝতে পেরে একটি কাককে সেই স্থানে পাঠিয়ে দিলেন। কাকটি ঠোট দিয়ে ঠুকরে মাটি খুঁড়তে লাগলো। কাকের এই ব্যাপার দেখে কাবিল যেন অকূলে কুল পেলো। এরূপবাবে মাটি খুঁড়ে হাবিলকে তো অনায়াসে মাটিতে পুতে রাখা যায়। কথাটা মনে হতেই কাবিল একখানা অস্ত্র সংগ্রহ করে এনে মাটি খুঁড়ে হাবিলকে কবর দিলো। তারপর অনুতপ্ত হয়ে ভ্রাতার শোকে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো।



বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২০

স্বর্গ চ্যুতি

বুধবার, আগস্ট ২৬, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


  ন্দে আলী মিয়া

মাটির দ্বারা প্রস্তুত তুচ্ছ মানব আদমের জন্য আজাযিলের এই দুর্দশা ঘটলো।  আজাযিল সেই নিরপরাধ আদমকে জব্দ করবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগলো।

খোদাতা’লা বেহেশতে বিচিত্র উদ্যান রচনা করে নানারকম সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের গাছ সৃষ্টি করলেন। সেই বাগানের দু’টি গাছ সৃষ্ট হলো –তার একটি নাম জীবন-বৃক্ষ, অপরটির নাম জ্ঞান-বৃক্ষ। খোদা আদমকে সেই বাগানে বাস করবার অনুমতি দিলেন। খোদা আদমকে অনুমতি দিলেন –বাগানের সমস্ত গাছের ফল সে খেতে পারে, কিন্তু জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল সে কখনো যেন ভক্ষণ না করে। এই গাছের ফল আহার করামাত্র তার মৃত্যু ঘটবে।

এর পরে অনেক দিন চলে যাবার পর খোদা মনে করলেন আদমেরন একজন সঙ্গিনী সৃষ্টি করা প্রয়োজন। একদিন তিনি সমস্ত পশুপক্ষীকে আদমনের নিকটে এনে তাদের প্রত্যেকের নামকরণ করতে বললেন। আদম প্রত্যেক জীবের আলাদা আলাদা নাম রাখলেন। তারা চলে গেলে আদম চিন্তা করতে লাগলেন, খোদাতা’লা সকল জীবজন্তুকে জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন কেবল মাত্র তিনিই একাকী রয়েছেন।

সেই রাত্রে আদ ঘুমিয়ে পড়লে খোদা তাঁর বাম পাঁজড় থেকে একটা হাড় বের করে নিয়ে তা দিয়ে একটি নারী সৃষ্টি করে তাঁর পাশে শুইয়ে রাখলেন। ঘুম ভাঙলে পাশে একটি সুন্দরী নারীকে দেখে তিনি মনে মনে পরম বিস্ময়বোধ করলেন। এমন সময়ে খোদা বললেনঃ এর নাম বিবি হাওয়া। এ হলো তোমার সঙ্গিনী। তোমরা দু’জনে একত্রে বেহেশতের বাগানে থাকবে, খেলবে, বেড়াবে। কিন্তু সাবধান সেদিন তোমাকে নিষেধ করেছি –আজ আবার তোমাকে ও তোমার সঙ্গিনীকে বলছি, যখন ইচ্ছে হবে এই বাগানের সকল রকম ফল আহার করবে, কিন্তু এই জীবন-বৃক্ষ ও জ্ঞান-বৃক্ষের ফল কখনো আহার করবে না!

সেই দিন থেকে আদম ও হাওয়া মনের সুখে সেই বাগানের নানা রকম ফলমূল খেয়ে বেড়াতে লাগলেন।

একদিন হাওয়া একা একা বাগানে বেড়াচ্ছেন। এই সুযোগে শয়তান একটা সাপের মূর্তি ধরে তাঁর কাছে এলো। সে সময়ে সিংহ, বাঘ, সাপ, গরু, হরিণ, ভেড়া, ছাগল সকলে একসঙ্গে খেলা করতো। কেউ কাউকে হিংসা করতো না। সাপ হাওয়াকে জিজ্ঞাসা করলোঃ তোমরা কি এই বাগানের সব গাছের ফল খাও।

হাওয়া জবাব দিলেনঃ না, দু’টি গাছের ফল খাওয়া আমাদের নিষেধ!

সাপ জিজ্ঞাসা করলোঃ কোন কোন গাছের ফল তোমরা খাও না?
হাওয়া গাছ দু’টি দেখিয়ে দিলেন।
সাপ বললোঃ কেন তোমরা এ দু’টি গাছের ফল খাও না?
হাওয়া বললেনঃ জানি না খোদা বারণ করেছেন।
সাপ বললোঃ খোদা তোমাদের বোকা বানিয়ে এখানে রেখেছেন। এই গাছের ফল খেলে তোমাদের জ্ঞান-চক্ষু খুলে যাবে, তোমাদের ওপরে খোদার আর কোন কারসাজি চলবে না, তাই খোদা তোমাদের এই গাছের ফল খেতে বারণ করেছে, কি সুন্দর আর মিষ্টি এই ফল তা তোমরা জানো না।

সাপের কুপরামর্শে হাওয়ার মন দুলে উঠলো। তিনি ভাবলেন –তাইতো, অমন সুন্দর ফল না জানি কেমন মিষ্টি! তিনি লোভ সামলাতে পারলেন না। একটা ফল ছিঁড়ে নিলেন। আধখানা নিজে খেয়ে অর্ধেক আদমের জন্য নিয়ে গেলেন। আদম হাওয়ার হাত থেকে সেই নতুন রকমের ফলটুকু নিয়ে সাগ্রহে খেলে ফেললেন।

শয়তান উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে মনে মনে হাসতে লাগলো। ফল খাবার পরে তাঁরা সর্বপ্রথম মুঝতে পারলেন যে নিজেরা বস্ত্রহীন। তখন বড় বড় ডুমুরের পাতার সঙ্গে লতা গেঁথে তাঁরা লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করতে লাগলেন। এমন সময়ে খোদাতা’লা আদম ও হাওয়াকে নিকটে ডাকলেন, কিন্তু তাঁরা প্রতিদিনের মতো সমুখে গেলেন না। গাছের আড়ালে গিয়ে লুকোলেন।

খোদাতা’লা বললেনঃ আমি বুঝতে পেরেছি তোমরা জ্ঞান-বৃক্ষের ফল খেয়েছো।
আদম বললেনঃ হাওয়া আমাকে দিয়েছে।
খোদা ক্রুব্ধ কণ্ঠে বললেনঃ আমার আদেশ অমান্য করে যে পাপ আজ তোমরা করলে, বংশ পরম্পরাক্রমে এর ফল সকলকে ভোগ করতে হবে। ত
হাওয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তুমি প্রসব বেদনায় অত্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করবার পর তোমার সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। চিরকাল তোমাকে পুরুষের অধীন হয়ে থাকতে হবে। পুরুষ তোমায় শাসন করবে।
আদমকে তিনি অভিশাপ দিলেনঃ তোমার শস্যক্ষেত্র আগাছা কুগাছা ও নানা কাঁটা গাছে ভর্তি হয়ে যাবে। এক মুষ্টি অন্নের জন্য আ-মরণ তোমাকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হবে।
সাপকে অভিশাপ দিয়ে বললেনঃ নির্বোধ নারীকে কুপরামর্শ দিয়ে পাপ করিয়েছ –এর শাস্তি তোমাকে সারা জীবন ভোগ করতে হবে। যে মাটিতে মানুষ পা দিয়ে চলবে সেই মাটিতে সর্বদা বুক পেতে তুমি চলবে এবং সেই খেয়ে তোমাকে জীবনধারণ করতে হবে। এই নারী বংশই হবে তোমাদের পরম শত্রু! তারা যখনই তোমাকে দেখবে তখনই বধ করার চেষ্টা করবে।

এই কথা বলে খোদা দু’খানা চামড়া তাঁদের পরিয়ে বাগান থেকে বের কের পৃথিবীতে নির্বাসন দিলেন।




আদি মানব ও আজাযিল

বুধবার, আগস্ট ২৬, ২০২০ 2
বার দেখা হয়েছে
আদি মানব ও আজাযিল- বন্দে আলী মিয়া  
বন্দে আলী মিয়া
পৃথিবী সৃষ্টির একেবারে প্রথশ দিকের কথা। তখন এখানে কোন জীবজন্তু, পশুপক্ষী বা কীটপতঙ্গ কিছুই ছিল না। সমস্ত দুনিয়ায় বাস করতো শুধু জিনেরা। তারা কেবলই নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি, মারামার নিয়েই থাকতো, ভুলেও কখনো আল্লাহ তা’লাকে স্মরণ করতো না। একদিন আজাযিল খোদার দরগায় আরজ (প্রার্থনা) করলোঃ হে প্রভু, আমাকে হুকুম দাও, আমি দুনিয়ায় গিয়ে জিনবংশ গারত (ধ্বংস) করে দুনিয়া থেকৈ পাপ দূর করে দেই। খোদা তার আরজ মঞ্জুর করলেন। আজাযিল চল্লিশ হাজার ফেরেশতাকে সঙ্গে নিয়ে নেমে এলো দুনিয়াতে। জিনদের সৎপথে আনবার জন্য অনক সদুপদেশ দিলো, কিন্তু তারা সে কথাতে একেবারে কর্ণপাতই করলো না। আজাযিল কি আর করে। তখন তাদের ধ্বংস করে বেহেশতে ফিরে গেলো। জিনের দল নিশ্চিহ্ন হওয়ায় দুনিয়া খালি পড়ে রইলো।

দোজখ (নরক) সব শুদ্ধ সাতটা। তার মধ্যে যে দোজখে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী গোনাগারদের (পাপিদের) রাখা হয়, তার নাম সিজ্জীন। দুনিয়ার নিচের পাতাল এবং পাতালেরও অনেক নিচে সেই সিজ্জীন দোজখ। সেখানে দিনরাত শুধু দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। এত আগুন হবু সেখানে ভয়ঙ্কর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে আজাযিলের জন্ম হয়। এই আজাযিল ভাল মানুষের দুশমন। দুনিয়ার মধ্যে তার মতো পাপি এখন আর কেউ নাই। সে শুধু নিজে পাপ করে না, প্রলোভন দ্বারা সকলকে পাপের পথে নিয়ে যায়। কিন্তু চিরকাল সে এমন ছিল না। তার মতো ধার্মিক এবং সৎ ফেরেশতারা অবধি হতে পারে নি। সত্যি সত্যি একদিন সে সকল ফেরেশতাদের সরদার ছিলো। খোদার নিকট তার মরতবা (মর্যাদা) অন্য সব ফেরেশতাদের চেয়ে অনেক বেশি ছিলো।
আজাযিল জন্মের পরে কিন্তু অন্য জানোয়ারদের মতো বৃথা সময় নষ্ট করেনি। সে খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে পুরা একটি হাজার বছর কাটিয়ে দিয়েছিল। সমস্ত দোজখে তিল পরিমাণ জায়গাও ছিলো না যেখানে দাঁড়িয়ে খোদার উপাসনা করেনি।
খোদা খুশী হয়ে তাকে সিজ্জীন দোজখ থেকে পাতালে আসবার অনুমতি দিলেন। কিন্তু এখানে এসেও তার অহঙ্কারের লেশমাত্র দেখা দিলো না। বরষ্ন খোদাতা’লার এবাদতে আরো অধিক মনোযোগ প্রদান করলো। দেখতে দেখতে হাজারবছর কেটে গেলো এবং এমন এতটুকু জায়গা ফাঁক রইলো না, যেখানে দাঁড়িয়ে সে খোদার উপাসনা করলো না। এমনি করে আরো হাজার বছর কেটে গেলো। খোদা তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দুনিয়ার উপরে নিয়ে এলেন। কিন্তু এত উন্নতি করেও সে খোদাকে ক্ষণকালের জন্যও ভুললো না। দিনরাত খোদার এবাদতে মশগুল হয়ে রইলো। করুনাময় খোদাতা’লা এবার তাকে প্রথম আসমানে তুলে নিলেন।

এমনিভাবে খোদাকে স্তবস্তূতিতে খুশী করে এক ধাপ এক ধাপ করে সে একেবারে আসমানে উঠতে লাগলো। এক এক আসমানে হাজার বছর করে সাত হাজার বছর ধরে আহার নেই, নিদ্রা নেই, দিনরাত কেবল রোজা আর নামাজ, নামাজ আর রোজা করে সে কাটালো। কোনো দিকে তার লক্ষ্য নেই, একম মনে এক প্রাণে খোদার উপাসনায় মশগুল হয়ে রইলো। খোদা তার ওপরে খুব খুশী হয়ে দোজখের না-পাক (অপবিত্র) জানোয়ারকে বেহেশতে আসবার অনুমতি দিলেন।

তাহলে তোমরা দেখছো, না-পাক জানোয়ারও নিজের সাধনার বলে মত উন্নতি করতে পারলো। কোথায় ছিলো আর কোথায় এলো। বেহেশতে এসে তার মনে এতটুকু দেমাগ বা এতটুকু অহঙ্কার দেখা দিল না। ফেরেশতাগণ যখন হাসিখুশী ও আমোদ-প্রমোদে রত থাকতো, তখন আজাযিল খোদার এবাদতে মগ্ন হয়ে থাকতো। মনে তার সুখ নেই –শান্তি নেই, চোখ দিয়ে কেবল ঝর-ঝর ধারায় পানি পড়তো। সে খোদার কাছে এই আরজ করতোঃ হে এলাহী আলমিন, তোমার এবাদত বন্দেগী কিছুই করতে পারলাম না। আমার গোনাহ মাফ করো। আমি বেহেশত চাই না –আমি চাই তোমাকে।

এইরূপ বেহেশতের আমোদ-আহলাদ, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সমস্ত অগ্রাহ্য করে সে আরো হাজার বছর খোদার এবাদতে কাটিয়ে দিলো। এবার খোদাতা’লা তার ওপর অতিশয় সদয় হয়ে ফেরেশতাদের সরদার করে বেহেশতের খাজাঞ্চী করে দিলেন।

হলে কি হবে, তথাপি সে আল্লাহকে এক মুহুর্তের জন্যও ভুললো না। দিনরাত আল্লাহর নামে মশগুল হয়ে রইল, আর মাঝে মাঝে বেহেশতের মিনারের ওপরে উঠে আল্লাহতা’লার উপাসনার উপকারিতা সম্বন্ধে ফেরেশতাদের উপদেশ দিতে লাগলো। ফেরেশতাগণ তার জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলোঃ আজাযিল খোদার অতিশয় পিয়ারা (প্রিয়)। যদি আমরা খোদার কাছে কখনো কোন প্রকার বেয়াদবি করে ফেলি, তাহলে তার সুপারিশে আমরা বেঁচে যাবো। খোদা তার কতা না শুনে পারবেন না। এমনই করে ফেরেশতাদের মধ্যে মরতবা দিনে দিনে বেড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু যার এত মরতবা তার আশা এখনো মিটলো না। এখনো খোদার এবাদত ছাড়া আর কোন দিক লক্ষ্য নেই। নিরালায় বসে কেবল খোদার যিকির করতে লাগলো। এইরূপে আরো হাজার বছর কেটে গেলো। সজল নয়নে কেবলই সে খোদার কাছে আরজ করতে লাগলোঃ হে রহমান, তুমি আমাকে দোজখ থেকে বেহেশতে এনেছো। এখন আমাকে মেহেরবানি করে একবার ‘লওহে মহফুযে’ তুলে নাও।

খোদা তার আরজ মঞ্জুর করলেন। সেখানে দিয়েও খোদার নাম ছাড়া অন্য কিছুই মনের মধ্যে সে স্থান দিলো না –দিনরাত খোদার উপাসনায় একেবারে ডুবে রইলো। একদিন সে দেখতে পেলো ‘লওহে-মহফুযের’ এক জায়গায় লেখা রয়েছে, “একজন ফেরেশতা ছয় লক্ষ বৎসর খোদার উপাসনা করিবার পরও যদি সে একটিবার খোদার আদেশ অমান্য করে, তা হলে সে চরম দুর্দশাপ্রাপ্ত হবে। তখন থেকে তার নাম হবে ইবলিশ”। আজাযিল ভয়ে কাঁপতে লাগলো! তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো। কোন দিক তার হুঁশ নেই –ধীর স্থিরভাবে পাথরের মুর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খোদার দরগায় আরজ করতে লাগলো।

এমনিভাবে পাঁচ লক্ষ বছর কেটে গেলো। একদিন খোদা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন আজাযিল, এখানে কেউ যদি আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করে, তবে তাকে কি শাস্তি দেওয়া উচিত?

আজাযিল প্রত্যুত্তর করলোঃ কেউ যদি আপনার আদেশ অমান্য করে, তাহলে তাকে আপনার দরবার থেকে চিরদিনের জন্য দূর করে দেওয়া উচিত।

খোদা বললেনঃ বেশ কথা। তুমি এখানে ঐ কথাগুলি লিখে রাখ।
আজাযিল খোদার হুকুম পালন করলো!

তোমাদের হয়তো স্মরণ আছে, আল্লাহর নির্দেশে আজাযিল জিনবংশ গারত করবার পরে দুনিয়া খালি পড়ে থাকে। খোদার বোধ হয় খেয়াল হলো যে, তিনি জিনদের বদলে মানুষ দ্বারা দুনিয়া পূর্ণ করবেন। তিনি সে কথা ফেরেশতাদের বললেন। তারা জবাব দিলোঃ হে পরোয়ারদিগার, একবার তুমি জিন পয়দা করে ঠকেছো। তারা কেবল ঝগড়াঝাটি মারামারি করে দিন কাটিয়েছে। আবার এখন মানুষ সৃষ্টি করে ফ্যাসাদ বাড়িয়ে কি লাভ! আমরা তো তোমার এবাদতে মশগুল আছি।

খোদা হেসে বললেনঃ দেখ ফেরেশতাগণ, আমি কি তোমাদের চেয়ে বেশি বুঝিনা।
এই কথা শুনে তারা খুব লজ্জা পেলো। তার বিনয়ের সঙ্গে বললোঃ হে রহমানুর রহিম। তোমার খেয়াল বুঝবার ক্ষমতা কারো নেই।

খোদতা’লা হযরত আদমকে সৃষ্টি করবার ব্যবস্থা করলেন। তিনি দুনিয়া থেকে একমুষ্টি মাটি নিয়ে হযরত আদমের শরীর সৃষ্টি করবার হুকুম দিলেন এবং দেহের মধ্যে আত্মা প্রবেশ করবার পূর্বে মাটিটুকুকে বেহেশতের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দেবার ব্যবস্থা করলেন?

একদিন আজাযিল ফেরেশতাদের সঙ্গে বেড়াতে বেড়াতে সেখানে এসে হাজিল। আদমের চেহারা দেখে সে খুব হাসতে লাগলো। তারপর তাঁকে নিয়ে এমন বিদ্রূপ শুরু করলো যে, ফেরেশতারা তাকে বললোঃ দেখ আজাযিল! খোদা যাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবার জন্য পয়দা করেছেন, তাঁকে নিয়ে তোমার এরূপ বেয়াদবি করা উচিত নয়।

ফেরেশতাদের কথায় আজাযিল কিছুমাত্র লজ্জাবোধ করলো না, বরং অবজ্ঞাভরে বললোঃ বলো কি, খোদা এই মাটির ঢেলাকে খলিফারূপে দুনিয়ায় পাঠাবেন! তিনি যদি একে আমার অধীন করে দেন, তাহলে আমি এক্ষুণি একে গলা টিপে মেরে ফেলবো; আর আমাকে যদি এর অধীন করে দেন তবে আমি কিছুতেই মানবো না।

আজাযিলের স্পর্ধা দেখে ফেরেশতারা অসন্তুষ্ট হয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। আজাযিল সেই মাটির মূর্তিটির সুমুখে খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কি চিন্তা করলো, তারপর তার নাক দিয়ে তার শরীরের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে বড় মুস্কিলে পড়লো। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বের হয়ে এসে সেই মূর্তির গায়ে থুথু দিয়ে সেখানে থেকে চলে গেল।

খোদার আদেশে এক শুভ মুহুর্তে হযরত আদমের আত্মা তাঁর শরীরে প্রবেশ করলো। তারপর তাকে বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত করে একটি অনিন্দ-সুন্দর সিংহাসনে বসানো হলো। এইরূপে নিজের খলিফাকে সৃষ্টি করে খোদাতা’লা ফেরেশতাদের বললেনঃ আমি হযরত আদমকে তোমাদের চেয়ে বড় করে পয়দা করেছি। তোমরা এসে সেজদা (প্রণাম) করো।

খোদার আদেশ পেয়ে ফেরেশতারা অতিশয় ভক্তিতে ও শ্রদ্ধায় আদম আলাইহিসসালামকে সেজদা করলো। কিন্তু আজাযিল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। সেজদা তো করলোই না –এমন কি মাথা পর্যন্ত নোয়াল না।

ফেরেশতারা আজাযিলের এই স্পর্ধা দেখে তাজ্জব হয়ে গেলো।
খোদা আজাযিলকে বললেনঃ আজাযিল! আমার হুকুমে ফেরেশতাগণ আদমকে সেজদা করলো, কিন্তু তুমি তাকে সেজদা করলে না কেন?

আজাযিল জবাবা দিলোঃ হে খোদা! আদমকে দুনিয়ার না-পাক মাটি থেকে পয়দা করছো, কিন্তু তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করছো। আমি তাকে সেজদা করিতে পারি না।

অতিশয় অসন্তুষ্ট হয়ে খোদা বললেনঃ রে মুর্খ, আত্ম-অহঙ্কারে তুই আমার হুকুম অমান্য করেছিস! জানিস তাকে মাটি থেকে পয়দা করবার ব্যবস্থা আমিই করেছি –আমিই তাকে ফেরেশতাদের বড় করেছি, আর আমিই তাকে সেজদা করতে বলেছি। কিন্তু এত স্পর্ধা তোর কিসে হলো? তুই এতদিন আমার এবাদত করেছিস সেই জন্য কি? কিন্তু তুই-ই না লওহে-মহফুযে’ লিখে রেখেছিস লক্ষ লক্ষ বৎসর আমার এবাদতে মশগুল হয়ে থাকলেও আমার একটি মাত্র আদেশ অমান্য করলে সমস্ত এবাদত পণ্ড হয়ে যাবে? তুই আজ থেকে মরদুদ হয়ে গেলি। তুই আমার দরবার থেকে দূর হয়ে যা।

খোদা এই কথা বলবার সঙ্গে সঙ্গে আজাযিলের চেহারা বিশ্রীরূপে পরিবর্তিত হয়ে গেলো। তার পায়ের রং হলো অত্যন্ত কালো, মুখ হলো শুকরের মুখের মতো। চোখ দু’টি কপাল থেকে বুকের ওপর নেমে এলো। তার নাম হলো ইবলিস।

আজাযিল নিজের দুর্দশা দেখে মনে মনে খুব ভয় পেলো, কিন্তু বাইরে সে ভাব মোটেই প্রকাশ করলো না। খোদার দরগায় আরজ করলোঃ হে খোদা! আমি নিজের অহম্মকিতে যে পাপ করেছি তার শাস্তি ভোগ আমাকে করতেই হবে‍! তার জন্য আমাকে যে দোজখী করেছ, তাও আমাকে মানতে হবে। আমি জানি, হাজার চেষ্টা করলেও আমার এ কসুর মাফ হবে না। তোমার দরবার থেকে চিরকালের জন্য চলে যাবার আগে আমি গোটা কয়েক আরজ পেশ করতে ইচ্ছা করি। আশা করি তুমি তা মঞ্জুর করবে।

খোদা বললেনঃ বল তোর কি আরজ আছে?
ইবলিস বললোঃ আমার প্রথম আরজ এই যে, আমাকে কেয়ামত (শেষদিন) পর্যন্ত স্বাধীনতা দাও।
খোদা সে আরজ মঞ্জুর করলেন।
ইবলিস তার দ্বিতীয় আবেদন পেশ করলো। বললোঃ আমাকে লোকচক্ষে অদৃশ্য করে দাও। আর কেউ জানতে না পারে এমনি করে সকলের হাড় মাংস স্নায়ু মজ্জা শরীরের মধ্যে প্রবেশ করবার ক্ষমতা দাও।
খোদা তাও মঞ্জুর করলেন।
তারপর ইবলিস বললোঃ লক্ষ লক্ষ বছর তোমার এবাদতে মশগুল থেকে সিজ্জীন দোজখ হতে বেহেশতে আসবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিলো। কিন্তু তোমার তৈয়ারী সামান্য বান্দার ওপর বেয়াদবি করার জন্য আমাকে শাস্তি দিলে। তোমার প্রিয় মানবের ওপর আমি তার প্রতিশোধ নেবো। তুমি আমাকে শয়তান করলে। আমি তোমার বান্দাকে শয়তান করে তৈরী করবো! যেমন সামান্য একটু কসুরে আমাকে নারকী করলে, তেমনি তোমার প্রিয় মানুষেরা দিন রাত তোমার রোজা নামাজ করলেও আমি বান্দাকে দোজখে পাঠাবার ব্যবস্থা আমি করবো, আর তুমি তাদের সৎপথে চালিত করবার জন্য অনেক নবী ও পয়গম্বর পাঠাবে। তারা তাদের উদ্ধারের জন্য অনেক পরামর্শ, অনেক উপদেশ দান করবেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না। আজ থেকে তোমার মানবের অনিষ্ট করাই হবে আমার একমাত্র কাজ।

এই বলে ইবলিস ডানা মেলে দুনিয়ার দিকে উড়ে গেলো। সেই থেকে সে শয়তান। তার প্রতিজ্ঞা কেমন করে পূরণ করছে তা তোমরা দিন রাত দেখতে পাচ্ছ। খোদার ঈমানদারের চেয়ে শতাদের বেঈমানদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তাহলে তোমরা দেখতে পেলে, ইবলিস লক্ষ লক্ষ বছর খোদার উপাসনা করে কত উন্নতি করেছিলো। একদিনের সামান্য একটু কসুরে তা সমস্ত নষ্ট হয়ে তার কত অধঃপতন হলো। সুতরাং তোমার জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ন্যায় ধর্ম ও সত্য পথে চলতে চেষ্টা করবে। কখনো ভুলেও এক নিমিষের জন্য একটুও ত্রুটি করবে না। জীবরেন একটু কসুরও খোদা মাফ করেন না। তোমরা হয়ত মনে করবে, প্রথমে একটু আধটু কসুর করে ভাল ভাল কাজ করবে, কিন্তু তা হয় না।



শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২০

কোরআন ও আধনিক বিজ্ঞানঃ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ

শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে
কোরআন ও আধনিক বিজ্ঞানঃ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ

ডঃ ইমাদ আল দীন খলিল
সতর্কতার সঙ্গে পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করলে এবং বিজ্ঞানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি জানার প্রচেষ্টা চালালে দেখতে পাওয়া যায় এমন বহুসংখ্যক আয়াত আছে, যাদে বিজ্ঞান নিয়ে সার্বিক আলোচনা করা হয়েছে। এগুলি চারটি শ্রেণীতে পড়ে যা বিজ্ঞানের চারটি ক্ষেত্রের অনুরূপ। প্রথম শ্রেণীতে আলোচনা করা হয়েছে বিজ্ঞানের বাস্তবতা, তার পরিধি ও লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে, যেগুলি বিজ্ঞানের দর্শন হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কারের পদ্ধতি বিজ্ঞান। তৃতীয় ভাগে রয়েছে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্র বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বেলায় প্রযোজ্য আইন। চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে আবিস্কৃত সূত্র সমূহ যে গুলোতে জীবনযাত্রার উন্নয়নে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা হিসেবে মানুষ কাজে লাগাবে। এই ক্ষেত্রটি ফলিত বিজ্ঞান হিসেবে পরিচিত।

সন্দেহ নেই, এর প্রত্যেক শ্রেণীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিজ্ঞানের দর্শন, বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে, অপরদিকে পদ্ধতি বিজ্ঞান সত্য উদঘাটনের কার্য প্রণালী প্রণয়ন করে যেমন সুনান বা বিশ্বজগতের প্রকৃতি ও আইন- যা দুনিয়া জাহান, বিশ্ব ও জীবনযাত্রা পরিচালিত করে এবং যথাসময়ে তাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। পরিণামে এসব আইন ও পদ্ধতি এমন ফর্মুলা দেয় যা তাকে সৃষ্টির বৈচিত্র অনুসন্ধানে সক্ষম করে তোলে। ফলে মানবতার অগ্রগতি ও কল্যাণের জন্য এগুলি হয় উপকরণ; হয় পৃথিবীতে বেচেঁ থাকার জন্য দৈনন্দিন একঘেয়েমী থেকে মুক্ত হওয়ার মাধ্যম এবং তার আধ্যাত্নিক প্রয়োজন পূরণে সক্ষম হয় বেশী পরিমাণে, যা তাকে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে পৃথক করেছে। এভাবে সে আল্লাহর খলিফা হিসেবে এবং বিশ্বের সভ্যতা ও কল্যাণ আনয়নে তার ভূমিকা পালনে আরও বেশী সক্ষম হয়।

এ কথা সত্য যে, পবিত্র কোরআন বিজ্ঞান গ্রন্থ অথবা অন্য কোন পাঠ্য বই হিসেবে নাজিল হয়নি। একইভাবে এটাও সত্য যে, কতিপয় আধুনিক চিন্তাবিদ জোর দিয়ে বলতে চান যে, কোন কোন আয়াতের বৈজ্ঞানিক অর্থ ও ব্যাখ্যা রয়েছে যা তার লেখকের (আল্লাহর) ইচ্ছা ছিল না। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে কতিপয় চিন্তাবিদ আরেক চরম পর্যায়ে গিয়ে বলেন, বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে কোরআনের কোন সম্পর্ক নেই।

এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, কোরআনী এবং বৈজ্ঞানিক উপাত্ত (data) সামঞ্জস্যপূর্ণ ও একই ধরনের ( সাধারণ অর্থে এবং আপেক্ষিক বাস্তবতার বাইরে ও পরিবর্তন শীল) এবং এটা সুস্পষ্ট যে, এদের মধ্যে কোন মতানৈক্য বা বিরোধ নেই।  সর্বোপরি এগুলো এসছে অভিন্ন উৎস আল্লাহ থেকে। আর আল্লাহ হচ্ছেন এই বিশ্ব জাহান ও তার মহাজাগতিক বিধি ও পদ্ধতির উদগাতা, কোরআন নাযিলকারী এবং মানুষের সৃষ্টিকর্তা। তদুপরি আইন প্রনয়ন ও কোরআন নাজিল প্রক্রিয়ায় মানুষ একটি পক্ষ। সে হচ্ছে পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা যে আল্লাহর জন্যই সভ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়। কোরআনের বাণী এবং মহাজাগতিক বিধির মধ্যেকার অপরিহার্য সম্পর্কের প্রকৃতির ব্যাপারে কোরআন গুরুত্ব আরোপ করে। এই বিশ্ব জগত সম্পর্কে অনুধাবন এবং তার আইন ও পদ্ধতি খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা না চালানো পর্যন্ত কোরআনের শিক্ষা কাঠামোয় আওতায় মানুষ পৃথিবীতে তার ভূমিকা পালন করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, বিগত কয়েক শতাব্দীর তুলনায় আধুনিক বিজ্ঞান ধর্মীয় বিধানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ বা প্রত্যাখ্যান করে না। বিজ্ঞান স্বীকার করে যে, বিষয় তার ধারণার চাইতে ব্যাপক হতে পারে সে ব্যাপারে চূড়ান্ত কথা বলার সুযোগ তার নেই।

এ কথা স্বীকার করার পর বিজ্ঞান তার সীমিত পরিসরে আরো নিশ্চিতভাবে বলে, মানব জীবন উদ্দেশ্যহীন যদি তার এক বৃহৎ পরিসর ছিনিয়ে নেয়া হয় যা বস্তু ও গতির বাইরে বিস্তৃত। বিজ্ঞান এখন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁচেছে যে, সে এখন ধর্মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করে।

সাম্প্রতিক আবিষ্কার বিশেষ করে প্রাকৃতি ও পরমাণু বিজ্ঞানের আবিষ্কারসমূহ এবং মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধিতি সম্বন্ধে মানুষের অনুধাবনের ফলে বিজ্ঞান দর্শনে এই বিরাট বিপ্লব ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে পরমাণুর কেন্দ্রবিন্দু (Core) আবিষ্কার করতে গিয়ে গবেষণায় দেখা গেল বস্তুগত প্রতিবন্ধক (Material barrier) ভেঙ্গে গেছে এবং ফলতঃ প্রাকৃতিক বিশ্বের কাঠামো ও গঠনের পশ্চাতে সামঞ্জস্য খুঁজে পেলো। [২৬] সুতরাং বিজ্ঞানের চারটি ক্ষেত্র এবং কোরআনে বিধৃত উপাত্তের (data) মধ্যেকার সম্পর্কের প্রতি আমরা একটুখানি দৃষ্টিপাত করলে কি দেখতে পাই? [২৯]

(১) বিজ্ঞান দর্শন, তার লক্ষ্য এবং ইসলামের মৌলনীতিঃ

বিজ্ঞান যা অর্জন করতে চায় এবং প্রথমতঃ মানুষের সভ্যতা গড়ে তোলার প্রচেষ্টার সাথে তার সম্পর্ক এবং দ্বিতীয়তঃ এই বিশ্বজাহান, যে বিশ্বে সে বাস করে তার প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা সাথে বিজ্ঞান দর্শন জড়িত। বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং পরীক্ষামূলক পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় বিষয় কোন বিলাসিতা বা গঠন বিষয় নয়। এর কারণ হলো উম্মাহর কার্যক্রম, পৃথিবীতে তার মিলনের প্রকৃতির এবং বিশ্বজাহান জীবন, বিশ্ব ও মানুষের ব্যাপারে তার সার্বিক বিশ্বাসের সাথে এগুলি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

এখানে ইসলামিক জীবন ধারা এবং বিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে কতিপয় মৌলিক নীতি উল্লেখ করা সম্ভবতঃ প্রয়োজন। কারণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্যের সাহায্যে অনাবিস্কৃত বিধি ও পদ্ধতি এবং যে সব পন্থায় এগুলি বাস্তবায়ন করা হয়-এসব নীতি তার ব্যহার সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়। এসব নীতি জোরদার করতে, বিশ্বব্যাপী ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক উপাদানসমূহের ঘোষণা করা, বিশ্বের সাথে এগুলির সংযোগ সাধন এবং সভ্যতার প্রতি সক্রিয় অবদান রাখার উপযোগী করার ক্ষেত্রে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের মতে বৈজ্ঞানিক তৎপরতার সাথে চারটি মৌলিক নীতি রয়েছেঃ

(ক) ইসতিখালফ (খলিফা)

মানুষের কাছে যে ঐশী আমানত রয়েছে সেটাই হচ্ছে খেলাফাত অর্থাৎ মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি। পবিত্র কোরআন ও হাদীসে উল্লিখিত খলিফার নীতি হচ্ছে সেই সব নীতির অন্যতম যা বিজ্ঞান বাস্তবতা হিসেবে সমুন্নত রেখেছে।

মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর বিকাশ, সভ্যতার সৃষ্টি, তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, অভাব মুক্ত নিরাপদ জীবনের পরিবেশ সৃষ্টি যা আরো উচ্চতর সাফল্য সহ সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে যাওয়ার অনুকূল হতে পারে ইত্যাদি করতে পারে।

মানুষ পূর্বে উল্লিখিত মহাজাগতিক বা ঐশী সুনান আবিষ্কার করার লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার না করা পর্যন্ত খলিফা হিসেবে তার দায়িত্ব পালন অথবা অব্যাহত অগ্রগতি অর্জনের লক্ষ্যে যথেষ্ট নিশ্চয়তা এবং সাহায্য লাভ করতে পারে না। শুধুমাত্র তক্ষুণি সে জ্বালানীর রিজার্ভে প্লাগ লাগাতে পারে এবং তার পরিবেশ ও তার মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয় ঘটাতে পারে। এটা ছাড়া খলিফার নীতি শূণ্য শুধু তত্ত্বকথা হিসেবেই রয়ে যাবে।

(খ) তাওয়াজুন (ভারসাম্য)

ইসলামী জীবন ও চিন্তার অন্যতম নীতি হচ্ছে মানুষের আধ্যাত্নিক ও জাগতিক প্রয়োজনের মধ্যে তাওয়াজুন বা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। এটা কোরআন সুন্নাহ গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে এবং আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ধাঁচে ও প্রকারে তা আলোচিত হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতঃপ্রকাশিত তথ্য উপেক্ষা করে এসেছি। তা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালা মানুষের দায়িত্বের সাথে সঙ্গতি রেখে পৃথিবীকে তার অধীন করে দিয়েছেন। আল্লাহ মানুষকে একটি বিশেষ প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার চাহিদা পূরণের জন্য পৃথিবীকে তার অনুগত করে দিয়েছেন অথচ অন্যান্য ঐশী ধর্ম আধ্যাত্নিক ও জাগতিক প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য রেখা টেনে দিয়েছে-ইসলাম এ মত সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। এরূপ করতে গিয়ে তারা আধ্যাত্নিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে মানুষের মন-মেজাজের চাহিদা এবং তার প্রতি অনুগত করে দেয়া পৃথিবীর নেয়ামত এবং সুযোগ-সুবিধার মধ্যে প্রতিবন্ধকতা টেনে দেয়া হয়েছে।

সত্য কথা এই যে, মানুষের এই দু প্রকার চাহিদার মধ্যে সুষ্ঠু ভারসাম্য ছাড়া ইসলামী জীবন চলতে পারে না। তবে ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাস্তবতার মধ্যে বাস করা এবং উত্তেজনা, বিচ্যুতি বা নির্যাতনমুক্ত থেকে একটি ভারসাম্য পূর্ণ মানব জীবন গঠন করা যা হবে কর্মতৎপর, পরিবর্তনশীল ও গতিময়। এতদসত্বেও এই ভারসাম্যপূ্র্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যা পৃথিবীর আর কোন মতবাদ বা ধর্ম একই রকম সার্বজনীনতা ও অঙ্গীকার নিয়ে গ্রহণ করেনি। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রয়োগ ব্যতিরেকে বাস্তবায়িত হতে পারে না।

(গ) তাসখীর (আনুগত্য)

বিশ্ব জগত এবং জীবন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির একটি আরেক মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন করার ও তার মহান সুপ্ত শক্তির অনুধাবনের আগেই নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান প্রয়োজন। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে প্রকৃতি ও বিশ্ব জগতে মানুষের অনুগত করে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীতে প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের  মৌলিক কর্তব্যের উপযোগী করে এবং প্রকৃতির সঙ্গে বাস্তব ও কার্যকর পন্থায় মিথস্ক্রিয়ার যোগ্যতা অনুসারে আল্লাহ তার আইন, পদ্ধতি ও সামর্থরের বিধান জারি করেছেন।

এই মিথস্ক্রিয়া প্রসঙ্গে ইসলাম একটি মধ্যম পন্থার প্রস্তাব দেয়ার পক্ষপাতি। এটা মানবতাকে এই নীতি জানাতে চায় যে, প্রকৃতি মানবিক প্রয়োজনের সেবায় নিয়োজিত। তবে একই সাথে মূল্যবোধ, নীতি ও কনভেনশান প্রতিষ্ঠার সাহায্যে মানুষের প্রয়োজনের দুইদিকের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার একটি স্থিতিমাপ (Parameter) নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের উচ্চাকাংখা, নীতি ও বিশ্বজগতে তার অবস্থানের সাথে সঙ্গতি রেখে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ উদ্ভাবন ও সভ্যতার গুনাগুণ অনুপ্রবেশ করিয়ে দেয়।

এতেও যদি বিজ্ঞানের সুপ্তশক্তি তথা পদ্ধতি বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের তথ্য ও প্রয়োগের সদ্ব্যবহার করা না যায়, তাহলে কোন ইসলামী সমাজ তাসখীর এর নীতি বাস্তবায়ন এবং তাকে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করতে পারবে না।

(ঘ) সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে প্রয়োজনীয় সম্পর্ক

বিশেষভাবে ইসলামী জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সাধারণভাবে ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নে বিজ্ঞানকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। সৃষ্টির আশ্চর্যজনক পদ্ধতি এবং স্রষ্টার অস্তিত্বের মধ্যে এটা প্রয়োজনীয় সম্পর্ক। এই সম্পর্ক প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বিজ্ঞান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। অনেকেই সৃষ্টির মুজিজা সম্পর্কে লিখেছেন। বহু বিজ্ঞানী ও পন্ডিত বিজ্ঞানের একটি অমোঘ সত্য উদঘাটনে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এবং সে সত্য হচ্ছেঃ সৃষ্টির একজন স্রষ্টা রয়েছে। এই বিষয়টির চূড়ান্তভাবে সমাধান করা হয়েছে এবং এ ব্যাপারে কোন প্রশ্ন রাখা হয়নি।

যেহেতু বিশ্বজগত পরিচালিত হয় সাংগঠনিক কার্যক্রম, নির্ভুল ও সামঞ্জস্যপূর্ণ গতি ও গঠনমূলক আন্তঃসম্পর্ক দ্বারা, আর সবই সমাধান হয় গাণিতিক সতর্ক বিচার ও বৈজ্ঞানিক ফর্মুলার সাহায্যে, তাই অসংখ্য প্রমাণ ও বেশুমার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, এটি একটি অতি প্রাকৃতিক, সর্বাত্নক ক্ষমতার অধিকারী এবং মহানির্দেশকের ইচ্ছা (Directing Will) থেকে সূচিত। [২৮]

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় যতদিন বিশ্বজগত, পৃথিবী ও জীবনের গোপন রহস্য অনুসন্ধানে জটিল তৎপরতায় নিয়োজিত থাকবে ততদিন ইসলামী জীবনের জন্য তা অপনিহার্য হয়ে থাকবে। তাছাড়া অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে এটা বিশ্বজাহানের স্রষ্টার কাছে নিয়ে যায় এবং স্রষ্টামুখী হলেই তা এবাদতের কার্যক্রম চলে যায়।

(২) পদ্ধতি বিজ্ঞান

এই প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন বিশ্বজগতের বিধি-বিধান আবিস্কারের জন্য একটি পদ্ধতি বিজ্ঞানের কথা ব্যাখ্যা করে। এটা একটি নমনীয়, চূড়ান্ত পদ্ধতি বিজ্ঞান যা সময় এবং স্থানের প্রেক্ষাপটে কখনও অস্থিতি হয় না। কারণ এটা মূলতঃ গবেষণা ও অনুসন্ধানের জন্য একটি পদ্ধতি বা হাতিয়ার। সুতরাং এটা আপেক্ষিক পরিবর্তনে উর্দ্ধে থাকে এবং প্রত্যেক যুগে ও পরিবেশ অক্ষুন্ন থাকে। পবিত্র কোরআন মানুষকে তাদের অস্তিত্ব এবং বিশ্বজগতে তাদের স্থান সম্পর্কে অন্তদৃষ্টি নিয়ে চিন্তার আহ্বান জানায়। এ জন্যে তাদেরকে জমিনের ওপর দাঁড়িয়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে মন ও বিশ্বজগতের দিগন্ত ঈমানের উচ্চতর পরিধিতে মানুষের কি চমৎকার মনোভাব তা পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের চেতনা কাজে লাগাবার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাছাড়া পবিত্র কোরআন গবেষণা, ধ্যান, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে মুসলমানদের গৃহীত পদক্ষেপের ব্যাপারে চেতনাসমূহের প্রতি মৌলিক দায়িত্ব দিয়েছে।

পবিত্র কোরআন আরো একধাপ অগ্রসর হয়ে মানুষকে তার সকল ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগিয়ে অফুরন্ত উপাত্ত (data) গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে যাতে করে তার উপলব্ধিজাত ক্ষমতা মহাসত্যের কাছে পৌঁছার লক্ষ্যে তাদেরকে তালিকাভুক্ত, বাছাই, গ্রহণ বা বর্জন করতে পারে। মহাসত্যের নিয়মে বিশ্বজগতে আইনের ঐক্যতান রয়েছে।

অনুসন্ধান, পরীক্ষা, আরোহী যুক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে মেধা ও ইন্দ্রিয়সমূহ যৌথভাবে কার্যকর। এই কার্যকারিতার দায়িত্বের ভিত্তিতে মানুষকে পরীক্ষা করা হবে, কেননা অন্যান্য জীবিত প্রাণী থেকে অপরিহার্যরূপেই পৃথক। পবিত্র কোরআনে বহু আয়াত রয়েছে যেখানে বারবার বলা হয়েছে শ্রবণ, দর্শন ও হৃদয়ের অনুভূতি (আল ফুয়াদ) যৌথভাবে মানব জীবনকে তার মূল্য ও অনন্যতা দান করেছে। মানুষ যদি এসব শক্তিকে সক্রিয় করে তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে তাহলে সে বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাবে। এর ফলে সে বিশ্ব জগতের প্রভু বনে যাবে এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে তার অবস্থান সুদৃঢ় করবে। অপরদিকে, সে যদি এসব শক্তিকে কাজে না লাগায় তাহলে তার পর্যায় হবে নিকৃষ্টতম এবং আল্লাহ যখন তাকে শ্রবণ, দর্শন ও হৃদয়ের অনুভূতিসহ পৃথিবীতে পাঠান তখন এ ধরনের অবস্থা তার জন্য নির্ধারণ করে দেননি।

এছাড়া প্রায় পঞ্চাশটি আয়াত রয়েছে যাতে মানুষকে তার বুদ্ধিবৃত্তি শাণিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বুদ্ধিবৃত্তি হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ যার সাহায্যে তার প্রতি ঈমান বৃদ্ধি করা যায়। তদুপরি এসব আয়াতে মানুষকে তার চারপাশের ঘটনাবলী গভীরভাবে উপলব্ধি ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে চিন্তাভাবনা করার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

গভীর চিন্তার ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তা জ্ঞানার্জনের বেলায়ও প্রযোজ্য; কারণ এটা হচ্ছে গভীর চিন্তার বাইরে একটি বুদ্ধবৃত্তিক পদক্ষেপ এবং এর ফলাফল মাত্র। জ্ঞানার্জনের ফলে মানুষ তার চারপাশের অবস্থা সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা লাভ করে এবং তার সত্তা ও বিশ্বজগতের সাথে তার সম্পর্কের পরিধির ব্যাপারে গভীর উপলব্ধি অর্জন করে। এর ফলে তার উপলব্ধির ক্ষমতা সবসময়ের জন্য খুলে যায় এবং তার সামনে উপস্থাপিত প্রত্যেক সমস্যা, ঘটনাবলী বা বিষয় দায়িত্বশীলতার সাথে সমাধানের পথ নিশ্চিত হয়।

মানুষ যাতে আরোহ, তুলনা, ভারসাম্য ও পরীক্ষার মাধ্যমে এবং সম্মত বাহ্যিক উপাত্তের (Agreed external data) সমর্থনে ও অধিকতর যোগ্য ব্যক্তিদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিক ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে সুষ্ঠু ফলাফল লাভ করতে পারে সে জন্য পবিত্র কোরআন পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যুক্তি প্রমাণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের ন্যায় পদ্ধতি সমূহের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পবিত্র কোরআন. ইলম (জ্ঞান বিজ্ঞান) শব্দটি ব্যবহার করেছে কয়েকটি অর্থেঃ (ক) দ্বীন [৩০] (ধর্ম জীবন ব্যবস্থা)-যা আল্লাহ তার নবী রসূলদের উপর জারি করেছেন এবং মহাসত্যসমূহ-যা এ আয়াতসমূহে বিধৃত। নাযিলকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের লক্ষণ হিসেবেও ইলম এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

এভাবে কোরআনের ভাষায় ইলম এবং দ্বীন একই ধরনের শব্দার্থ বহন করে। আল্লাহর আয়াত এ শিক্ষাই দিয়েছে এবং আমাদের কে ব্যাপক আন্তঃসম্পর্কযুক্ত চেতনা অনুধাবনে সক্ষম করে তোলে যা প্রত্যক্ষবাদীদের (positivists) তথ্যানভিজ্ঞ ও বিদ্বেষদুষ্ট উৎপন্ন অর্থের পরিবর্তে ইলম ও দ্বীন এর অর্থ প্রচারিত হোক বলে তিনি চান। সাড়ে সাতশোরও বেশী আয়াতে ইলম শব্দের বিবিধ শব্দরূপ ও ব্যুৎপন্ন শব্দ রয়েছে।

প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী অধ্যয়নে পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের উপর পবিত্র কোরআন জোর দিয়েছে এবং বিদ্বেষপ্রসূত, তথ্যাভিজ্ঞ মতামত, যাদু ও কুসংস্কারের ন্যায় দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে নেতিবাচক ক্রিয়া করে এমন প্রতিটি বিষয় সে দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। দ্বীন মানুষকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে সিরাতুল মোস্তাকিমের পথে চলার আহ্বান জানায়, এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সবগুলি সত্য পথ থেকে বিচ্যুত। আমরা সবাই জানি, সরল পথ হচ্ছে দুটি পয়েন্টের মধ্যেকার সংক্ষিপ্ততম দূরত্ব। সুতরাং এ থেকে কোন প্রকার বক্রতা সৃষ্টি হলে দূরত্ব ও কষ্ট বাড়ায় এবং পর্যটকদের এতটা বিভ্রান্ত করতে পারে যে, তারা কখনো গন্তব্যস্থলে নাও পৌঁছতে পারে। পবিত্র কোরআন পুনঃপুনঃ একটি সুস্পষ্ট ও পরিস্কার তথ্যের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলে যে বিদ্বেষ থেকে অর্থহীনত্ব ও নির্বুদ্ধিতার সৃষ্টি হয় এবং সত্যের একমাত্র বিকল্প হচ্ছে ভুল।

 

৩. ঘটনাসমূহ

পবিত্র কোরআনের পেশ করা তৃতীয় ব্যাপ্তির (dimension) মধ্যে রয়েছে ঘটনাসমূহ ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন পদ্ধতির সমাহারঃ জ্যোতির্বিদ্যা, ভূগোল, জীববিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, মানুষের শরীরতত্ত্ব—–। এ ক্ষেত্রে বহু আধুনিক চিন্তানায়ক দুটি বিরোধপূর্ণ অবস্থার যে কোন একটি গ্রহণ করেন। প্রথম পর্যায়ে কোরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় আধুনিক বৈজ্ঞানিক উপাত্তের (data) ব্যবহারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা যায়। ফলে পদ্ধতিগত ভূল ভ্রান্তি থেকে যায়। অপরদিকে আংশিক উপাত্ত (partial data) ব্যবহার করা হয় একটি সাধারণ রূলিং এর জন্য, পরিবর্তনশীল উপাত্ত কালে লাগানো হয় স্থায়ী রূলিং দানের জন্য, এবং আপেক্ষক উপাত্ত (relative data) ব্যাবহার করা হয় নিরঙ্কুশ রুলিং দানের জন্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির দুর্বল দিক হচ্ছে যদি এসব আংশিক ও আপেক্ষিক বৈজ্ঞানিক উপাত্তের পরিবর্তন হয় এবং স্বয়ং বৈজ্ঞানিকরাই স্বীকার করেন যে এটা হচ্ছে তাদের স্বাভাবিক ধর্ম যে ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের প্রবক্তারা এ ধরনের মানসিক যন্ত্রণায় ভুগবেন।

এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াবার প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় অবস্থানও (position) সম্পূর্ণভাবে বৈজ্ঞানিক উপাত্ত প্রত্যাখ্যান করে ভ্রান্ত চিন্তাধারার ফাঁদে পড়ে যায়।

সুস্থ পদ্ধতি বিজ্ঞানের নিকটতম দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে মধ্যম পন্থা যা কোরআন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে অনুসরণ করতে শিক্ষা দেয়। পরিবর্তনীয় উপাত্ত সহ (variable data) বিজ্ঞানের প্রতি কখনই পরিপূর্ণ অঙ্গিকারবদ্ধ হয় না এবং এরই সাথে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ভূমিকা রয়েছে তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যনও করে না। পবিত্র কোরআনের সমকালীন দক্ষ চিন্তানায়ককে কোরআনের আয়াত এবং বৈজ্ঞানিক অভিসন্দর্ভ সমীকরণের প্রকৃতি অনুধাবনের জন্য নিজেস্ব বিশেষায়িত ক্ষেত্রে তার মেধা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে সক্ষম হবে। তদুপরি সম্প্রতি প্রকাশিত কোরআনের তাফসীরের কতিপয় আধুনিক ধারা সম্পর্কে তাকে অবহিত হতে হবে। এসব ধারায় কোরআনের অর্থ ও বিষয়বস্তু অনুধাবনের জন্য কোরআনের পরিভাষা ও চিত্রকল্পের ব্যবহার করে-যা আল তাফসীর আল বায়ানী লী আল কোরআন নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে বাস্তব নিশ্চয়তা রয়েছে যা বাক্য ও বাকধারার কাংখিত অর্থলাভের প্রচেষ্টায় তাফসীরকারককে অতিরঞ্জন বা ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে। বৈজ্ঞানিক বিশেষায়ন ও আল তাফসীর আল বায়ান-এর মধ্যেকার এই ভারসাম্য কোরআনের বৈজ্ঞানিক আয়াতের কাংখিত অর্থ প্রকাশের প্রচেষ্টা আধুনিক চিন্তাবিদকে সক্ষম করে তোলে। এমন কতিপয় বৈজ্ঞানিক ঘটনা রয়েছে যা চূড়ান্তভাবে অথবা অবিসংবাদী, স্বতঃপ্রকাশিত সত্য হিসেবে বিধানে পরিণত হয়েছে। যেমন বৃষ্টি আনার ক্ষেত্রে বাতাসের ভূমিকা, সৌরজগতের পরিক্রমায় মাধ্যাকর্ষণের ভূমিকা, ভ্রুণের গঠনে বিভিন্ন পর্যায়, ভূ পৃষ্ঠ থেকে গ্যাসীয় পদার্থের দূরত্ব হ্রাস বৃদ্ধির ফলে অনুপাতের পরিবর্তন। এগুলি ছাড়াও আরও বহু তথ্য রয়েছে যার বৈজ্ঞানিক প্রকৃতির সাথে কোরআন নাজিলের সময়কার আরবরা পরিচিত ছিল না। এসব তথ্য সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতের তাফসীরকালে গত কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত স্বতঃপ্রকাশিত বৈজ্ঞানিক ঘটনাবলীর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে এবং এজন্যে কোরআনের বহু আশ্চর্যজনক দিকের একটি প্রকাশ করেছে।

এমন বহু বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে যা বাস্তবতার একাধিক বিষয় প্রকাশ করে। তবে এসব বিষয় একটি একক, নমনীয় কাঠামোর মধ্যে বিদ্যমান। এটা কোন কোন সময় কোরআনের অন্যান্য আয়াতের সঙ্গে প্রসঙ্গক্রমে নির্দেশ করা যায় অন্য আয়াতের সম্পর্কে তার তাৎপর্য অনুধাবনের জন্য। এর ফলে বিশ্ব জগতের বিশ্বয়কর কাঠামো জোটবদ্ধ রয়েছে এবং একটি পদ্ধতির সাহায্যে বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে প্রমাণিত বিধি ও স্বতঃপ্রকাশিত সত্যের বাইরে যেসব তত্ত্ব এখনও আলোচনা ও মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেগুলি খুব সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে এবং আধুনিক চিন্তাবিদদের উচিৎ হবে না আলোচিত আয়াতের ব্যাপারে কোন প্রকার আলোকপাত করা।

নিয়ত বৈজ্ঞানিক উপাত্তের (data) ক্ষেত্রে সমাধানে অগ্রসর হতে হবে এবং (ক) বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রতি পূর্ণ অঙ্গিকার এবং (খ) পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের সম্ভাব্য ভ্রান্তি এড়াতে হবে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার প্রতি পুরোপুরি অঙ্গিকারের ফলে সুষ্ঠু অনুধাবন, সচেতনতা এবং সকল পর্যায়ে আরো অনুসন্ধান ব্যাহত হবে। অপরদিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের ফলে অনুধাবনের ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং আধুনিক মানুষ ও কোরআনের তথ্যের এক বিষয়ের মধ্যে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল দাঁড় করাবে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস অর্জনের জন্য প্রমাণ হিসেবে উদ্ভাবিত বিজ্ঞানভিত্তিক উপাত্ত পবিত্র কোরআনের সর্বত্র ব্যাপকভাবে দেখতে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য যে, কোরআনেরর উল্লিখিত প্রতিটি বৈজ্ঞানিক বিষয় ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য মুজিজা হবে, এমন কথা নেই। অথবা নাজিলেন সময় এ বিষয়টি অজ্ঞাত ছিল এমন নয়। দু ধরনের আয়াত রয়েছে, এক ধরনের আয়াতে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে এবং মহাকাশ, বিশ্ব এবং জীবন আল্লাহর এই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এ ধরনের আয়াত প্রত্যেক যুগের ন্যায় কোরআন নাজিলের সময় অপরিচিত বৈজ্ঞানিক তথ্য, পদ্ধতি এবং সুনানের নির্দেশক যা বিজ্ঞান পরবর্তীকালে প্রকাশ করে দিয়েছে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকেই কোরআনের বৈজ্ঞানিক মুজিজা ও বিস্ময়কর প্রকৃতি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

স্মরণ রাখতে হবে, কোরআন যেহেতু বৈজ্ঞানিক পাঠ্য গ্রন্থ নয়, সেজন্য সবরকম বৈজ্ঞানিক তথ্য এতে বিধৃত নেই। তবে একে কতিপয় তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং অন্যান্য ব্যাপারে ইংগিত দেওয়া হয়েছে। এতে গবেষকদের উপযোগী মনস্তাত্ত্বি পরিবেশ সৃষ্টি করে, ফলে মানুষ আরো ব্যাপক তথ্যাদি আবিষ্কার করার স্বাধীনতা পায়। তবে কোরআনের মতে, মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাস ও অঙ্গিকারের এসব আবিষ্কার করতে পারে।

৪. প্রয়োগ

কোরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যেকার সম্পর্কে চতুর্থ বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায় কোরআন জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং প্রতিটি স্তরে মানব সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে বৈজ্ঞানিক তথ্য ও আবিষ্কার কাজে লাগানোর জন্য অহর্নিশ তাগিদ দিয়েছে। এটা এক প্রশস্ত, নমনীয় ও অহর্নিশ অবস্থা যা মানুষের প্রতি আহবান জানায় স্থান-কাল নির্বিশেষে বৈজ্ঞানিক উপাত্ত থেকে উপকৃত হবার এবং সমকালীন সভ্যতায় তার কাজে লাগাবার জন্য। যদি এরকম ঘটে এবং পরিচিত বৈজ্ঞানিক ঘটনা ও সভ্যতার কোন প্রকার উন্নয়ন হয় তাহলে কোরআন কার্যকরভাবে আবেদন জানাবে প্রত্যেক বংশধরকে নতুন ঘটনা ও নতুন পরিস্থিতির আলোকে পরিবর্তন সাধনের জন্য। কোরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যেকার এই সম্পর্কের চতুর্থ ব্যাপ্তিতে দেখা যায় কোরআন অহর্নিশ ও নিঃশর্তভাবে ঈমানদারদের প্রতি আহ্বান জানায়, বৈজ্ঞানিক তথ্য, আবিষ্কার ও ফর্মূলার অধিকতর সদ্ব্যবহার করতে। নিজেদের মালামাল রক্ষা এবং পৃথিবীতে তাদের ভূমিকা সমুন্নত রাখান জন্য কোরআন শত্রুদের মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার এবং তাদের প্রতি তীব্র আঘাত হানার আহবান জানায়নি। এ থেকে কি প্রশ্বস্ত, নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটেনা, যদ্দরুন তাৎক্ষণিকতার সাথে সার্বজনীনতার এবং স্থায়ীত্বের সাথে ক্ষণস্থায়ীত্বের সমন্বয় ঘটিয়ে প্রতিটি কাল ও স্থানে প্রয়োগ করা যায়?

আর তোমরা যতদূর সম্ভব বেশী শক্তিশালী ও সদাসজ্জিত বাঁধা ঘোড়া তাদের সঙ্গে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত করে রাখ যেন তার সাহায্যে আল্লাহর এবং নিজের শত্রুদের ভীত শংকিত করতে পার (৮:৬০)।

নিরঙ্কুশ শক্তি ও যুদ্ধাস্ত্রকে ও সময়ের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের লৌহ (সুরাহ হাদিদ) অধ্যায়ের এই খনিজ ধাতুকে শান্তি ও যুদ্ধকালে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে এর ব্যবহার ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছেঃ

আমরা আমাদের রসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি ও হেদায়াতসহ পাঠিয়েছি এবং সেই সঙ্গে কিতাব ও মানদন্ড নাজিল করেছি যেন, লোকেরা ইনসাফ ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এবং আমরা লোহাও অবর্তীণ করেছি উহা যুদ্ধের জন্য (উপকরণ) এবং লোকদের জন্য এতে বিপুল কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর উদ্দেশ্য এই, যেন আল্লাহ তায়ালা জানতে পারেন কে তাকে না দেখেই তার ও তার রসূলগণকে সহযোগিতা করে। নিঃসন্দেহে খোদা বড়ই শক্তিমান ও মহাপরাক্রমশালী (৫৭:২৫)।

একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ধাতুর নামে একটি সমগ্র সূরারা নামকরণের ফলে পৃথিবীর সাথে মুসলমানদের সম্পর্কের এর চেয়ে বড় প্রমাণ কি আর হতে পারে? বিজ্ঞানীর অন্তরে যে ঈমান পোষণ করা দরকার, সে ঈমান থেকে উৎসারিত আচরণ ও নীতিকে ইসলাম একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গণ্য করেছে এবং উপরোক্ত আয়াতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং সৃজনশীল ও শিক্ষিত মার্জিত রুচি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এর চেয়ে সুস্পষ্ট অনুমোদন কি হতে পারে? তদুপরি এই আয়াতে লৌহকে বান্দাদের প্রতি আল্লাহর মহা দান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সাথে এতে লোহার দুটি সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছেঃ ভয়াবহ যুদ্ধের উপকরণ হিসেবে লোহা যখন অস্ত্র তৈরী ও সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয় এবং সুবিধাদি (benefits) (মানুষ শান্তিকালীন গঠনমূলক তৎপরতায় এই খনিজ থেকে যে সুবিধা পেয়ে থাকে) যুগ যুগ ধরে শান্তি ও যুদ্ধকালে লোহার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সম্পর্কে আর কি বলার প্রয়োজন আছে? বর্তমান কালে মানবতার কল্যাণে অথবা ধ্বংসাত্নক তৎপরতায় এটা অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণে পরিণত হয়েছে। লৌহ সমৃদ্ধ যে কোন আধুনিক দেশ শত্রুর গভীর অভ্যন্তরে আঘাত হানতে পারে। কারণ অস্ত্র তৈরীতে লোহার রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় শক্তি। তাছাড়া শিল্প ও সম্পদের চালিকাশক্তি হিসেবে এই দেশ একই সাথে প্রধান প্রধান শিল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে।

লৌহের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা দেখছি একটি সূরাহর নামকরণ করা হয়েছে। স্মরণ রাখতে হবে সূরা সাবার আয়াতসমূহ। এই সূরায় আল্লাহ তায়ালা হযরত দাউদকে (আঃ) লোহা নমনীয় করার শিক্ষাদান প্রসঙ্গে তার রহমতের কথা উল্লেখ করেছেন। মানবতাকে উন্নত কলাকৌশল শিক্ষাদান প্রসঙ্গে এ উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জুলকারনায়েন এর দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে। মজলুম জনগণের সামনে ভাষণ দিতে গিয়ে এবং আসন্ন হামলা থেকে তাদের রক্ষা করার তাওফিক কামনা করে তিনি বলেন,

আমার খোদা আমাকে যাহা কিছু দিয়েছেন তাহা প্রচুর। তোমরা শুধু খাটুনী করে আমার সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ করে দিচ্ছি। আমাকে লৌহখন্ড এনে দাও। শেষ পর্যন্ত তিনি যখন উভয় পাহাড়ের মধ্যবর্তী পূন্যস্থান, পূর্ণরূপে ভরে দিলেন তখন লোকদের বললেন, এখন আগুনের কুন্ডলী উত্তপ্ত কর। শেষ পর্যন্ত যখন (এই লৌহ প্রাচীর) সম্পূর্ণরূপে আগুনের মতো লাল হয়ে উঠলো তখন তিনি বললেন, আনো, আমি এখন ইহার উপর গলিত তামা ঢেলে দিব। এভাবে তা লংঘন করার অথবা তা খোঁড়ার ক্ষমতা তাদের রইলো না (১৮:৯৫-৯৭)।

পবিত্র কোরআন মানুষ, প্রকৃতি ও অতি প্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে এক অনন্য সমন্বয়ের চিত্র এঁকেছে। এতে মানুষের সেবায় পার্থিব শক্তির আনুগত্য ও রূপান্তর এবং আল্লাহর এবাদত সম্পর্কে এক ভারসাম্য টানা হয়েছে। এতে সৌন্দর্যতত্ত্ব ও প্রকৃতির বাস্তব দিকের ব্যাপক বৈপরীত্য দেখানো হয়েছে। একদিকে মানুষের শক্তি ও বাস্তব সম্ভাবনা এবং অন্যদিকে প্রাণীকূলের তুলনায় তার অবস্থান, তার দূর্বলতা এবং আল্লাহর ওপর স্থায়ী নির্ভরশীলতা দেখানো হয়েছে। মানুষের বস্তুগত ও স্বাভাবিক প্রয়োজন পূরণে নীতিভ্রষ্ট হওয়ার প্রবনতাকে সংঘত প্রহরায় রাখার প্রয়োজনের ওপর কোরআন সবসময় গুরুত্ব দিয়েছে।

আমরা দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম এই আদেশ মর্মে যে, হে পর্বতমালা তোমরা দাউদের সাথে আমার পবিত্রতা ঘোষণা কর এবং হে পক্ষী সকল তোমরাও। আমি তার জন্য লৌহকে গরম করেছিলাম। এবং তাকে বলেছিলাম, প্রশস্ত বর্ম তৈরী কর, কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত কর এবং সৎকর্ম সম্পাদন কর। তোমরা যা কিছু কর, আমরা তা দেখি। আর আমরাও সোলায়মানের অধীন করেছিলাম বায়ুকে যা সকালে এক মাসের পথ এবং বিকেলে এক মাসের পথ অতিক্রম করতো। আমরা তার জন্য গলিত তামার এক ঝরণার প্রবাহিত করেছিলাম। কতিপয় জ্বিন তার সামনে কাজ করতো তার পালনকর্তার আদেশে। তাদের যে কেউ আমার আদেশ অমান্য করবে, জ্বলন্ত অগ্নির শাস্তির আস্বাদন করাব। তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউস, সুদৃশ্য বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লীর উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করতো। হে দাউদ পরিবার কৃতজ্ঞতা সহকারে তোমার কাজ করে যাও। আমার বান্দাদের মধ্যে অল্প সংখ্যকই কৃতজ্ঞ। যখন আমরা সোলায়মানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন শুধু ঘুন পোকাই জ্বিনদেরকে তার মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত করলো। সোলায়মান যখন মাটিতে পড়ে গেলেন, তখন জ্বিনেরা বুঝতে পারলো যে, অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান থাকলে তারা এই লাঞ্ছনাপূর্ণ শাস্তিতে আবদ্ধ থাকতো না। (৩৪:১০-১৪)

অপর এক সূরায় বলা হয়েছে:

সোলায়মান বললো, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন এক সাম্রাজ্য দান করুন যা আমার পরে কেউ পেতে না পারে। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা। তখন আমি বাতাসকে তার অনুগত করেছিলাম যা তার হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো যেখানে সে পৌঁছতে চাইতো। আর সকল শয়তানকে তার অধীন করে দিলাম অর্থাৎ যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরী এবং অন্য আরো অনেককে অধীন করে দিলাম যারা আবদ্ধ থাকতো শৃঙ্খলে। এগুলো আমার অনুগ্রহ; অতএব কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও-এর কোন হিসাব দিতে হবে না (৩৮-৩৫-৩৯)।

কোরআনে আরও বলা হয়েছে:

অতঃপর আমরা সোলায়মানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম। আমরা পর্বত ও পরীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো। এ সমস্ত আমরাই করেছিলাম। আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি শোকর গুজার হবে? এবং সোলায়মানের অধীন করে দিয়েছিলাম প্রবল বায়ুকে; তা তার আদেশে প্রবাহিত হতো ঐ দেশের দিকে, যেখানে আমরা কল্যাণ দান করেছি। আমরা সব বিষয়েই সম্যক অবগত আছি। এবং অধীন করেছি শয়তানের কতককে যারা তার জন্য ডুবুরীর কাজ করতো এবং এ ছাড়া অন্য আরো অনেক কাজ করতো। এদের নিয়ন্ত্রণে আমরাই ছিলাম। (২১:৭৯-৮২)

এসব আয়াত হচ্ছে কয়েকটি দৃষ্টান্ত যা আল্লাহর ইচ্ছার ব্যাপারে সক্রিয় সাড়া দিয়ে গায়েব (Unseen) , খোদার ক্ষমতা, প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সমাজ বিকাশের পদ্ধতির প্রতি সর্বোচ্চ সংহতি প্রকাশ করছে। এখানে মানুষের সেবায় গায়েবী শক্তি সুশৃঙ্খল সমন্বয়ে কাজ করছে, আর মানুষ এসব অকৃপণ দানের জন্য তার ইবাদত, প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা রুজু করছে আল্লাহর প্রতি যাতে পৃথিবীতে যে জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল সেই মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হয়।

আমি জ্বিন ও মানুষকে অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি, কেবল এজন্য সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার বন্দেগী করবে। আমি তাদের নিকট কোন রিজক চাইনা, এও চাইনা যে, তারা আমাকে খাওয়াবে (৫১:৫৬-৫৭)।

এখানে আমরা আল্লাহর দু জন নবী দাউদ ও সোলায়মান (আঃ)এর সাক্ষ্য পেলাম। প্রকৃতির অফুরন্ত শক্তি ও মানুষের অনুগত করে দেয়া হয়েছে। একই কথা প্রযোজ্য খোদার শক্তির ক্ষেত্রে যেখানে কোন সময়সীমা (Time limit) বা স্থানের প্রতিবন্ধকতা (Place barrier) নেই এবং এর সামনে বিজ্ঞান চূড়ান্ত পর্যায়ে অসহায়। লৌহ, বায়ু, গলিত তাম্র জ্বিন-এসব শক্তিকে অনুগত করে দেয়া হয়েছে যাদে দায়িত্বশীল, খোদাভীরু মানুষের নির্দেশে এগুলো পরিচালিত হতে পারে এবং শিল্প ও শিল্পকর্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজ বিকাশের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন। লোহা ও তামার সুস্পষ্ট প্রসঙ্গে টেনে পবিত্র কোরআনে কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, যা আজ বিংশ শতাব্দীতে আমাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং নির্মাণ, শিল্পায়ন ও প্রতি ক্ষেত্রে উৎকর্ষ সাধনে আগ্রহী আধুনিক সভ্যতা বা যে কোন সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আরো দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ হযরত দাউদকে (আঃ) অকারণেই লৌহ দান করেন নি; তিনি শিক্ষা দিয়েছেলেন কিভাবে তা ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হবে। তদুপরি বায়ুর প্রসঙ্গ ভুলে গেলে চলবে না। ভৌগলিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে প্রাণের বর্ধন ও বিকাশের জন্য বায়ু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ।

অন্যান্য বহু আয়াতের ন্যায় এসব আয়াতে তাদের প্রতি চূড়ান্ত জবাবস্বরূপ যারা অভিযোগ করেন যে, ঐশী ধর্মের একমাত্র কাজ হলো তার অনুসারীদের বিচ্ছিন্ন ও নিষ্ক্রিয়তার দিকে পরিচালিত করা এবং তাদেরকে এভাবে প্ররোচিত করে যে গড়ে তোলার জন্য নয়, বরং এই পৃথিবী হচ্ছে কোনক্রমে কাল ক্ষেপণের গলিপথ, এসব লোকের কাছে ধর্ম হচ্ছে সভ্যতা বিরোধী এবং ঈমান হচ্ছে সৃজনশীলতা, আবিষ্কার নব জীবনের প্রতি বাধাস্বরূপ। তারা আরো বলেন, মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যেকার সম্পর্কের ফলে নিষ্ক্রিয়তার সৃষ্টি হয়। তারা দাবী করেন জীবনের বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য নৈয়ায়িত প্রত্যক্ষবাদী ধারাই (Positive School) রয়েছে গতিশীল ভূমিকা। এই ধারণা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

এই সমীক্ষায় এমন বহু উদাহরণ পেশ করা হয়েছে যাতে প্রমাণিত হয় কোরআন পুরোপুরি পরাজিত মনোভাব ও নিষ্ক্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ তা ধর্ম ও প্রগতিকে শত্রুতে পরিণত করার পরিবেশ সৃষ্টি করে। প্রকৃতপক্ষে খোদাভীরু হওয়ার অর্থ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে সরে যাওয়া বুঝায় না কিংবা এমন কাজ করতে হয় যার কোন প্রতিযোগিতা মূল্য নেই। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে জীবন যাত্রার মান উন্নত করা। এক্ষেত্রে ইসলাম জীবন ও ইতিহাস প্রক্রিয়ার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

টীকা:

১। সুবহানাহু ওয়া তায়ালাঃ আল্লাহর প্রশংসা এবং তার সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন থাকুক। আল্লাহ প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়।

২। সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামঃ মহানবীর (সাঃ)ওপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নামোচ্চারণের সময় এই দরুদ পাঠ করা হয়।

৩। আলাইহিস সালামঃ তাঁর প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। অন্যান্য নবীদের বেলায় এই দোয়া পাঠ করতে হয়।

৪। আয়াতঃ কুরআনের আয়াত। খোদার কুদরত অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

৫। ফকিহ (বহুবচন ফুকাহা): ফিকাহ শাস্ত্রে পন্ডিত ব্যক্তি, এরূপ আলিম (বহুবচন উলামা) অর্থ পন্ডিত।

৬। আল নাসিখ (বাতিল): কোরআনের এমন আয়াত যার বিষয়বস্তু অন্য একটি আয়াত দ্বারা বাতিল হয়েছে, এ জন্য এদের বলা হয় মানসুখ।

৭। বিন আশুর: শায়খ মুহাম্মদ আল তাহার; তাফসীর আল তাহরীর ওয়া আল তানবীর, আল দার আল তিউনিসিয়া, তিউনিস, ১৯৮৪ পৃ: ২৮-২৯।

৮। ফিকাহ: আইন কানুনের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞান; ইসলামের আইন জ্ঞান; উসূলে ফিকাহ; ইসলামী জুরিস প্রুডেন্স বিজ্ঞান অর্থাৎ ইসলামী আইনের উৎস থেকে আইন প্রণয়ন পদ্ধতি এবং এসব আইনের আওতা বা পরিধি নির্ণয়।

৯। হাদিস (বহুবচন আহাদিস) রসূলে করিম (সঃ) এর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাক্য ও কর্মের সমষ্ঠির নাম হাদিস। ইংরেজী H (Capital – H) অক্ষর দ্বারা রসূলে হাদিসের সমষ্ঠি বুঝায়। হাদিসের পন্ডিতদের মুহাদ্দিসীন বলা হয়।

১০। বিন আশুর; প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা-১২

১১। উসুলিয়ুন: মৌলবাদী হিসেবে কদর্থ করা হয় এবং বিশুদ্ধবাদী হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। এর প্রকৃত অর্থ, বিশুদ্ধ এবং তাদেরকেই এ বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়, যারা কোরআন ও সুন্নাহর ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যার প্রতি অনুরুক্ত এবং যারা ইজতিহাদ এর প্রতি অনুরক্ত নন (১৬ নম্বর টীকা দেখুন)।

১২। বিন আশুর, প্রাগুক্ত পৃ: ৪৪

১৩। তাওহীদ; খোদার একত্ববাদ; এই ধারণার পোষণ করা যে, আল্লাহ এক, সার্বভৌম, বিশ্ব জাহানের সৃষ্টিকর্তা, সমস্ত সৃষ্টিকূলের মালিক। তাওহীদ হচ্ছে ইসলামের নির্যাস।

১৪। সুন্নাহ: রসূলে করিমের (স) কথিত, সম্পাদিত ও অনুমোদিত বা অনুনোমদিত কে কাজের সমষ্টি।

১৫। Methods of understanding the Quran, IIIT Virgina, 1991 Herndon.

১৬। ইজতিহাদ: ইসলামের বিচার সংক্রান্ত উৎস, সর্বকাল ও স্থানের জন্য অপরিবর্তনীয়। মুসলিম সমাজের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে এ সমস্ত সূত্রের সুশৃঙ্খল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টাকে ইজতিহাদ বলা যেতে পারে।

১৭। ইমাম (আ ইম্মাহ বহুবচন): ইসলামী জ্ঞানের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ধর্মীয় ও পার্থিব বিষয়ের সমাজ নেতা, ইসলামী আইনের ব্যাখ্যাকারীকেও ইমাম বলা হয়।

১৮। সনদ (আসানিদ বহুবচন): কোন সুনির্দিষ্ট হাদিসের বর্ণনাকারী দল। আল মুসনাদ; হাদিসের বর্ণনাকারীদের ক্রমানুসারে যে কোন হাদিসের সংকলন; যেমন মুসনাদ আবু দাউদ।

১৯। মুহাদ্দেসীন: ৯নং টীকা দেখুন।

২০। মুনতাহিদুন: ১৬ নং টীকা দেখুন।

২১। আহাদ: যে সমস্ত হাদীস শুধু একজন বর্ণনাকারী সূত্রে বর্ণিত।

২২। ফতওয়া: ইসলামী আইনের সাথে সম্পৃক্ত কোন আলেম, মুফতি বা মুজতাহিদের দেয়া আইনানুগ রায়।

২৩। কায়রো ও বৈরুতের দারুর সুরূক প্রকাশিত।

২৪। সীরাত: মহানবীর (সঃ) এ জীবন গ্রন্থ।

২৫। সঠিক স্দ্ধিান্তে পৌঁছতে সুন্নাহর ব্যাপারে গবেষণা পরিচালনার নীতি অনুসারে ইনস্টিটিউট আম্মান ভিত্তিক রয়্যাল সোসাইটি ফর দি স্টাডি অব ইসলামিক সিভিলাইজেশন-এর সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে। ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে সোসাইটির ৭ম সাধারণ সম্মেলনকালে মহানবীর সুন্নাহ ও সভ্যতা বিনির্মাণে তার পদ্ধতি বিষয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে ১২৬ জন পন্ডিত, অধ্যাপক এবং গবেষক যোগ দেন সেমিনার আলোচিত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে শেখ আল গাজালীর এবং ড. আল কারদাবীর সুন্নাহ সম্পর্কে ইতিপূর্বে প্রকাশিত দুটি গ্রন্থ ( আগে উল্লেখিত) এবং অন্যান্য নিবন্ধও ছিল।

২৬। এসব বিষয়ে আমার আলম ফি মুয়াজাহাত আর মাদ্দিয়াহ ( বস্তুবাদের মুখোমুখি বিজ্ঞান) গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে বৈরুতে মুয়াসাসাত আল রিসালাহ, ১৯৮৬।

২৭। আরো বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন মদীয় গ্রন্থ মাদখাল ইলা মাওফীক আল কোরআনুল করিম মিনাল ইলম ( বিজ্ঞানের প্রতি কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গির ভুমিকা) বৈরুত, মুয়াসাসাত আল রিসালাহ, ১৯৮৩, এখানে পাঠক বিষয়ভিত্তিক কোরআনের পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স পাবেন।

২৮। খিলাফাহ: মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি, রসূলে করিম (সঃ) এর পার্থিব সরকারের ধারাবাহিকতায় সরকারের বিধান। খলিফাহ (খুলাফাহ বহুবচনে): আল্লাহর প্রতিনিধি।

২৯। ঈমান: আল্লাহ-ই একমাত্র খোদা এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তার শেষ নবী-এই বিশ্বাস রাখা।

৩০। দ্বীন: মানুষের জন্য জারী করা আল্লাহর স্বাভাবিক বা প্রকৃত ধর্ম যাতে রয়েছে ঈমান, নীতি, আইন, ভক্তি, বিধি-বিধান ও বিচার।

                                                                 –– সম্পাপ্ত —



কোরআন ও সুন্নাহ, স্থান – কাল প্রেক্ষিত

শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

 

কোরআন ও সুন্নাহ, স্থান – কাল প্রেক্ষিত

সুন্নাহর যথাযথ অধ্যয়ন প্রসঙ্গে
ডঃ তাহা জাবির আল আলওয়ানী


ইসলামের শুরু থেকে পন্ডিত ও মুজতাহিদগণের পরিচিতি বিধিসমূহের কাঠামো অনুসারে সুন্নাহর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এর নির্ভরযোগ্যতা আল-কোরআনের পরেই, দ্বিতীয় স্থানীয়। কার্যতঃ এ দুটোকে পৃথক করা যায় না। কারণ , সুন্নাহ আল-কোরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে এবং কোরআনের শিক্ষা ও পদ্ধতির বাস্তবায়ন করে।

সুতরাং সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা ইসলামের একটি অপরিহার্য অংগ-যে ব্যাপারে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের কেউ কখনো প্রশ্ন উঠায়নি। তবে পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে স্বল্প জ্ঞান এবং হিকমত সম্পন্ন এমন অনেক লোক ছিল যারা রসূলের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত হাদীস তথা সুন্নাহর সাথে প্রাথমিক যুগের কাহিনী এবং সংক্ষিপ্ত ঘটনাপুঞ্জির মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনি। তারা জানেনা এধরনের ঐহিহাসিক  অথবা সংক্ষিপ্ত রিপোর্টসমূহের কতটুকু প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য করা যায়; মানুষের জ্ঞানের পরিস্ফুটনের মাধ্যম হিসেবে এগুলি কি রকম মূল্যবান; অথবা যুক্তিধর্মী চিন্তাধারা বা বাস্তব প্রমাণে সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার পরেও এগুলিকে প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য করা হবে কি না। এসব অল্প জ্ঞান সম্পন্ন লোক ধারণা করা যে, এই পদ্ধতিগত দার্শনিক বিষয়ের আলোচনা খোদ সুন্নাহর সাথে বিরোধপূর্ণ। তারা সুনানকে (আচরণ ও কর্মকান্ড) বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিবরণ হিসেবে এবং এই বিবরণকে মনে করে শুধু মাত্র বিবরণী হিসেবে এবং অধিকাংশ বিরোধ কেন্দ্রীভুত হয় বিবরণীসমূহের উপর। তারা মহানবী (সঃ) এর সুন্নাহ ও দিক নির্দেশনার এবং যে পন্থায় এগুলি (পরবর্তী পর্যায়ে) প্রচারিত হয়েছে তার মধ্যকার ব্যাপব ব্যাবধান অনুধাবন করতে ব্যার্থ হয়েছেন। তদুপরি রসূলের কার্যক্রম, কর্ম এবং বক্তব্যের রিপোর্ট করার পদ্ধতি এবং অপরাপর লোকদের ব্যাপারে রিপোর্টিং-এর মধ্যে তারা কোন পার্থক্য দেখতে পায়নি। এই দুঃখজনক বিভ্রান্তির ফলে, খোদ সুন্নাহর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে যার ফলে উসুল ও হাদীসের গবেষণা সংক্রান্ত গ্রন্থাদিতে বিস্তর আলোচনা স্থান পেয়েছে। এই শ্রম অনাসয়ে কাজে লাগনো যেতো সুন্নাহর অনুধাবন, ব্যাখ্যা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার লক্ষ্যে সঠিক পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে, এভাবে প্রতি যুগের ও স্থানের মুসলমানদেরকে এর শিক্ষার আলোকে চিন্তাধারা ও জীবন পদ্ধতি গড়ে তুলতে সাহায্য করা যেতো।

কোরআন ও আধনিক বিজ্ঞানঃ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ

সাধারণভাবে রিপোর্টসমূহ এবং বিশেষভাবে আহাদ এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অহেতুক ও ইচ্ছকৃত খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের ফলে নেতিবাচক, অত্যন্ত মারাত্নক ও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে মুসলমানদেরকে মধ্যে মত পার্থক্য এবং বিতর্ক ঘনীভূত হয়েছে। এবং পরিণতিতে বহু গ্রন্থ বিমূর্ত ও অস্পষ্ট আলোচনায় পর্যবসিত হয়েছে যার কোন ইতিবাচক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা বাস্তব প্রভাব ছিল না। কোরআনের প্রেক্ষাপটে সুন্নাহর মর্যাদা এবং কোরআন কর্তৃক সুন্নাহ বাতিল প্রভৃতি বিতর্কে মুসলমানরা অহেতুক দীর্ঘ ও পুনঃপৌনক সমালোচনা এবং ঐতিহাসিক রিপোর্ট, বর্ণনাকরী এবং কর্তৃত্বের ধারাক্রমের (Chains of authority) প্রামাণ্যতার পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লিপ্ত হয়। মূল গ্রন্থের সমীক্ষা, বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের পদ্ধতিসমূহ এবং সময়-কাল পরিবেশ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে হাদীছ পরিবেশন, তারপর সনদ পর্যালোচনায় নিবেদিক ব্যাপক প্রচেষ্টা ও বহুসংখ্যক গ্রন্থের সাথে তুলনা করা হলে যে কেউ তৎপরবর্তী সমস্যা ও বিভ্রান্তির প্রকৃতি অনুধাবন করতে পারতো।

অবশ্য আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে মূল্যবান গ্রন্থ রচনায় যথেষ্ট শক্তি ব্যয় করতে হয়েছে। এধরনের গ্রন্থে শুধু আইনগত দিক আলোচিত না হয়ে সুন্নাহর সকল দিক স্থান পেলে উম্মাহর প্রয়োজন আরো বেশি করে পূরণ হতো। যেহেতু সুন্নাহ সার্বিকভাবে বিশেষ ধরনের আদর্শিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপটে কোরআনের পদ্ধতিগত বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্দেশনার ধারারক্রমের প্রতিনিধিত্ব করে সেজন্য সুন্নাহ অনুধাবনের পদ্ধতিগত সমীক্ষা হচ্ছে উসুল হাদীস শিক্ষার অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় দিক। এসময় ইসলামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে বাস্তবায়িত করা হচ্ছিল এবং ইসলামের আদর্শ বাস্তবে রূপ দিতে এবং ইতিহাসের এই কালকে (সময়) এমন যুগে পরিণত করতে পবিত্র কোরআন স্বয়ং নেতৃত্বস্থানী ভুমিকা পালন করে যাদে ভাবী বংশধরদের অনুসরণের জন্য এটা হয় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এভাবে আল্লাহর বাণী বাস্তবায়নে সুন্নাহ উচ্চতম, সর্বাধিক স্বচ্ছ, উত্তম ও সত্যিকারের ধারার প্রতিনিধিত্ব করে। আল কোরআনের নিয়ম সম্পর্কিত বিজ্ঞানের এটা একটা বাস্তববাদী, বিদগ্ধ ও সার্বিক প্রতীক। কোরআন নাযিলের সময় যেভাবে যে রূপে ছিল তা সংরক্ষন এবং কোন রকম বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করাই বোধ হয় খোদা তায়ালার ইচ্ছার অনুকূলে কাজ করেছে। মহানবী (সঃ) স্বয়ং কোরআনের প্রতিটি অক্ষর সংরক্ষনের অত্যন্ত দৃঢ়তা দেখিয়েছন এবং প্রতিটি স্বরবর্ণ ও যতি চিহ্ন বহাল রেখেছেন। এ জন্য অব্যাহ হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে যে, কোরআনের প্রতিটি অক্ষর নাযিল কালের মতই অক্ষুণ্ন রেখে প্রচার করতে হবে-শব্দান্তরিত আকারে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কিন্তু সুন্নাহর বিষয়টি এরকম নয়। সুন্নাহর সংরক্ষন করা হলেও তার উপর উপরোক্ত কড়াকড়ি আরোপ করা হয়নি। তাছাড়া পবিত্র কোরআনের ন্যায় মহানবী (সঃ) হাদীস লিখে রাখাও ব্যবস্থা করেননি। এছাড়া তিনি কোরআনের ন্যায় জিবরাঈলের সাথে এ নিয়ে মুখ আওড়াননি (কন্ঠস্থ করেননি) দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্যের কারণ হচ্ছে মহানবীর মত মানব সামর্থের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুন্নাহ বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে বিরাজ করুক। মহানবী (সঃ) আল কোরআনের অনুসরণ করেছেন সর্বাত্নকও চূড়ান্ত রূপে। বস্তুতঃ দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে এবং সকল পার্থিব কার্যক্রমে তিনি এর নিযম সংক্রান্ত বিজ্ঞান প্রয়োগ করেছেনঃ করেছেন ধর্মপ্রচার, শিক্ষাদান, নিষেধাজ্ঞা দান, উপভোগ, পরামর্শ, ও উপদেশ দান, বিচার কারর্য, ফতোয়া দান, নির্দেশ দান, শৃঙ্খলা বিধান, যুদ্ধ পরিচালনা, শান্তি স্থাপন ,চুক্তি সম্পাদন, ক্রয় বিক্রয়, বার্তা বিনিময়, বিবাহ, তালাক, নির্মাণ, ধ্বংস, ভ্রমণ প্রভৃতিতে।

আল কোরআনের নিয়ম সংক্রান্ত বিজ্ঞান নবীজীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অনুরসণ করেছে। কোরআনের অনেক আয়াত এই নিয়ম বিজ্ঞানের মূল্যায়ন করেছে এবং প্রয়োজনবোধে সমালোচনা, বিশ্লেষণ ও সংশোধন ও পরিচালিত করেছে। কারণ প্রয়োগ প্রক্রিয়া মানবিক সীমাবদ্ধতা ও সময় স্থানের দরুন শর্তাধীন ছিল। এজন্য আল্লাহ বলেন, যতদূর পার, আল্লাহর  স্মরণে থাক।

নবী করীম (সঃ) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি কোরআনের নিয়ম বিজ্ঞান প্রয়োগ করার সময় নবী করীম (সাঃ) এর প্রয়োগ পদ্ধতির সাথে তুলনা করে মূল্যায়ন করা উচিৎ। কারণ মহানবী (সঃ) ছাড়া অন্য কোর ব্যক্তি ব্যক্তিগত ঝোঁকপ্রবণতা ও স্বতস্ফূর্ত প্রভাবে সংবেদনশীল হতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জনসাধারণ নামাজ কালামের ক্ষেত্রে নবী করীম (সাঃ) কেই অনুসরণ করেছে। অনুসরণ করার পরিবর্তে তারা তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতো। কারণ কোন দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার অর্থ হচ্ছে মেধাকে সংশ্লিষ্ট করে একটা সচেতন কর্মতৎপরতা-এজন্য প্রয়োজনে এই দৃষ্টান্তকে কেন্দ্র করে সকল উপকরণের বিষয়কে সচেতনতার সাথে অনুসরণ করা। ইন্টান্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইসলামিক থ্যাট (International Institute O Islamic Thought)) বর্তমানে মুসলিম পন্ডিতদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় হিসেবে ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির উৎস ব্যবহারের জন্য সুন্নাহর অনুধাবন, এর ব্যাপক ও চূড়ান্ত বিশ্লেষণ এবং যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। এটা বিশেষভাবে এ জন্য প্রয়োজন যে মুসলিম জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার পুনর্গঠনে মৌলিক পূর্বশর্ত হিসেবে ইসলামের ভিত্তি ও উৎস এবং যেগুলি অনুধাবনের পন্থা ব্যাখ্যা করা জরুরী। এ লক্ষ্য অর্জনে ইনস্টিটিউট কতিপয় কর্মসূচী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

প্রথমতঃ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে যেসব বিষয়ে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত মূলক আলোচনা করা হয়েছে তার পরিবর্তে এখন পর্যন্ত অমিংমাংসিত বিষয় এবং যার সমাধান প্রয়োজন তার প্রতি উসূল ও হাদীস শিক্ষার দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইনষ্টিটিউট মনে করে, যেহেতু আল্লাহ ও রসূলের প্রতি আস্থাশীল কোন মুসলমান সুন্নাহর কর্তৃত্ব অস্বীকার করতে পারেনা, সেজন্য সুন্নাহর কর্তৃত্বের প্রশ্নটা চূড়ান্তভাবে আলোচিত হয়েছে। ইনস্টিটিউট প্রখ্যাত উসুল বিশেষজ্ঞ শেখ আব্দুল গনি আব্দুল খালেক প্রণীত হুজিয়াত আল সুন্নাহ (সুন্নাহর আইনগত কর্তৃত্ব) গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে। গ্রন্থটি এ বিষয়ের উপর একটি মূল্যবান পান্ডিত্যপূর্ণ বিষয় এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং ইনস্টিটিউট এটিকে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করে।

ইতিমধ্যে ইনস্টিটিউট বিভিন্ন বিষয়ে পন্ডিত ও গবেষকদের কাছে সুন্নাহকে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য এক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের প্রতি গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষনের প্রয়াস চালিয়েছে। ইনস্টিটিউট এ লক্ষ্যে কর্মরত বহু পন্ডিতকে ইতিমধ্যে সহযোগিতা দিয়েছে।

তাছাড়া ইনস্টিটিউট বিষয়গতভাবে সুন্নাহর শ্রেণী বিন্যাস শুরু করেছে। শুধু ফিকাহর উৎস হিসেবে সীমিত না রেখে সুন্নাহকে সমাজ বিজ্ঞানের জ্ঞানের উৎস হিসেবে পরিণত করার আমাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক যে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের সাথেও সংশ্লিষ্ট হয়েছে।

চূড়ান্ত পর্যায়ে (Finally) ইনস্টিটিউট বিশিষ্ট পন্ডিতদের ইসলামী সভ্যতা পুনর্গঠনে সুন্নাহর বিভিন্ন দিক এবং তার ভূমিকা সংক্রান্ত গ্রন্থ রচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর কাজ শুরু করেছে। সুবিখ্যাত পন্ডিত শেখ মুহাম্মদ আল গাজালীর ইতিমধ্যে একটি সাড়া জাগানো গ্রন্থঃ আল সুন্নাহ আল বায়না আহলাল ফিকাহ ওয়া আহলাল হাদীস ( ফিকাহ বিশেষজ্ঞ ও হাদীছ বিশেষজ্ঞদের মাঝে সুন্নাহ) রচনা করেছেন গ্রন্থটিকে সুন্নাহ অনুধাবনের পদ্ধতি সম্পর্কে দেয়া হয়েছে এবং যারা সনদের কাঠামো ও রিপোর্ট নিয়ে যারা সংশ্লিষ্ট ও যারা সুন্নাহ অনুধাবনের আগ্রহী ও তা থেকে শিক্ষা নিতে চায়, তাদের মধ্যেকার পার্থক্য টানা হয়েছে। ইনস্টিটিউটের মতে, এই বিদগ্ধ পন্ডিত গ্রন্থ রচনায় এত অভিজ্ঞ ও জ্ঞানী যে, গ্রন্থ প্রনয়নে কারো নির্দেশ বা ভুল ত্রুটি সংশোধনে কারো নির্দেশের প্রয়োজন বোধ করেনা। তবে তার গ্রন্থে সন্নিবেশিত কতিপয় বিস্তারিত তথ্য ও ব্যবহৃত উদাহরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এ ব্যাপারে হৈ চৈ এত বেশী হয়েছে যে, এসব তুচ্ছ বিবরণের জন্য গ্রন্থটি মূল মর্মবাণী প্রায় তলিয়ে গেছে।

এ গ্রন্থটি মূলতঃ রচিত হয়েছিল সেই সব লোকদের জন্য যাদের শরীয়া এবং গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান নেই এবং যাদের ইতিহাস, সীরাহ ফিকাহ ও আরবী জ্ঞান শুদ্ধরূপে হাদীস অনুধাবনের জন্য যথেষ্ট নয়। বহু লোক হাদীস অধ্যয়ন শুরু করে এবং তার প্রকৃতি অথবা নবী করীম (সঃ) এর বক্তব্যের বা কাজের কথিত কারণ না বুঝে অথবা হাদীসে সাধারণ ভাষ্য অনুধাবন না করেই পড়ে যায়। তাদের এ অনুধাবন ত্রটিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর এবং এর ফলে তারা হাদীসের একটি বিকৃতি ধারণা লাভ করে এবং এটা তারা সর্বসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। এসব লোক এতদূর পান্ডিত্যের দাবী করে যে, কোরআনের উপরে রয়েছে সুন্নাহর প্রাধান্য এবং তা স্থগিত করতে পারে। তদুপরি যদি তারা কোন অধিকতর সহী হাদীসের সম্মুখীন হয় যা তাদের যুক্তির বিপক্ষে যায় তখন তারা তার মত দ্বৈধতার প্রকৃতি বুঝতে পারে না। এ ধরনের হাদীস মুল্যায়নের পন্থা-এমনকি আলোচ্য হাদীস অনুধাবনের জন্য সঠিক পদ্ধতি ও বিধিও বুঝতে পারে না।

গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল সুন্নাহ অধ্যয়নে নিয়োজিত পন্ডিত ও গবেষকদের উদ্দেশ্যে। তাদের পরামর্শ দেয়া হয় সুন্নাহর অনুধাবনের সুষ্ঠু পদ্ধতির জন্য তারা যেন কিছুটা দৃষ্টি দেন। কারণ সুষ্ঠু উপলব্ধি ছাড়া কোন হাদীস নেই এবং সুন্নাহ ছাড়া কোন ফিকাহ, ইসলামী সভ্যতা বা সত্যিকার জ্ঞান থাকতে পারে না।

শেখ আল গাজালীর গ্রন্থের বিভ্রান্তির ব্যাপারে ইনস্টিটিউট সচেতন হয়ে তারা ডঃ ইউসুফ আল কারা দায়ীকে অনুরোধ করেন দুটি বিস্তারিত গ্রন্থ লিখতে। এর একটি হচ্ছে সুন্নাহ অনুধাবনের পন্থা এবং অপরটি জ্ঞানের উৎস হিসেবে সুন্নাহ। প্রথমটি ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে কায়ফা নাতা আমল মাআল সুন্নাহ আল নাবাবিয়াহ (সুন্নাহ অনুধাবনের পন্থা) এই শিরোনামে এবং দ্বিতীয়টি যথাসময়ে প্রকাশিত হবে ইনশাআল্লাহ।

সমকালীন ইসলামিক জীবন ধারা বিনির্মানে সুন্নাহর ইতিবাচক ও সক্রিয় ভুমিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জ্ন্য যেসব বিষয় সিদ্ধান্তমূলকভাবে ইতিমধ্যে আলোচিত হয়েছে তার পরিবর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ইসলামী উচ্চতর শিক্ষার ক্ষেত্রে হাদীস শিক্ষার পাঠ্যক্রমে সুন্নাহর পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা।

আশা করা যায় যে, মুসলমানরা সুন্নাহর উপলব্ধির জন্য ক্রমবর্ধমান অধিকতর আগ্রহ দেখাবে। এ ধরনের উপলব্ধির বিধি বিধান (Rules and conditions of such understanding) তাদেরকে জানতে হবে ও প্রচার করতে হবে এবং সুন্নাহর সম্পর্কে ভুল বুঝাবুঝির কারণ জানার জন্যও গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। তাদেরকে অনুধাবন করতে হবে এই উপলব্ধির ক্ষেত্রে যুগপৎ সংগঠিত ঘটনাবলী (Overlapping issues) কেন সংকটের সৃষ্টি করেছে এবং কেমন করে এই সংকটের ফলে সুন্নাহর কর্তৃত্ব সংক্রান্ত বিতর্কে দার্শনিক যুক্তি প্রয়োগ শুরু হয়েছে। সুন্নাহর উপলব্ধির জন্য একটি সার্বিক পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তিনটি প্রশ্নের সুগভীর গবেষণা প্রয়োজন।

(ক) উপলব্ধির শর্তাবলী

যদি শুদ্ধরূপে উপলব্ধির প্রশ্নটি সুন্নাহর ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে মতানৈক্য ও বিভ্রান্তিকর কারণগুলি কি? সুষ্ঠু অধ্যয়ন ও উপলব্ধির জন্য কি ধরণের গুণাগুন ও যোগ্যতার প্রয়োজন? ইসলামের প্রতি অস্বীকার উপলব্ধির জন্য পূর্ব শর্ত কি? কারো সার্বিক অন্তর্দৃষ্টির কমতি কেমন করে পূরণ করা যাবে? কেমন করে আমরা এই সংকটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা করতে পারবো? কেমন করে আংশিক চাপা সমস্যাবলীর প্রশ্নে সমাধান করবো যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে এবং যা অনেক গবেষকের মতে, সুন্নাহর সার্বিক বিষয়ে না হলেও আংশিকভাবে কর্তৃত্বে (Authority) ব্যাপারে বিতর্ব সৃষ্টি করেছে? এই বিতর্কের ফলে যুক্তিতর্ক ও অহংকারীদের পক্ষে অজুহাত দাঁড় করাবার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য ইসলামরে ইতিহাসে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে এই বিষয়টি কখনই সমস্যা সৃষ্টি করেনি।

(খ) মতপার্থক্য ও বিভাগ

উম্মাহ কেন ও কি জন্য নানা ফেরকা ও তরিকায় বিভক্ত হয়ে গেল? সুন্নাহ ওতার কর্তৃত্বের ব্যাখ্যা, অনুধাবন ও প্রচারকে কেন্দ্র করে কিভাবে বিভিন্ন ফেরকা সৃষ্টি হলো? সুন্নাহ কিভাবে বিভিন্ন ফেরকা ও তরিকার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হলো? জাল হাদীস  হাদীসের অসম্পুর্ণ উপলব্ধি এবং সুন্নাহ থেকে আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠলো কেন? এসব ঘটনা বিভিন্ন গ্রুপের বিকাশে কি প্রভাব ফেলেছে এবং হাদীস অধ্যয়ন ও রাবীদের (হাদীস বর্ণনাকারী) বন্ণা পরষ্পর বিশ্লেষণে বিশেষ প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে? পূর্বেকার উসূল এর পন্ডিতবর্গও খুঁটিনাটি বিষয়ে ধর্মতাত্বিকদের (Scholastic theologians) আলোচিত ব্যাপারে সুন্নাহর অধ্যয়নে এসব বিষয় সম্পৃক্ত হলো কেমন করে? এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে, সুন্নাহর কর্তৃত্ব, কোরআনের প্রেক্ষাপটে তার মর্যাদা, কতিপয় আয়াত মনসুখ হওয়া, কোরআনের আলোচনায় তার ব্যাখ্যা ও সীমা নির্দেশ করা, মহানবীর (সঃ) ইজতিহাদ, এই সম্পর্কেও বর্ণিত হাদীস (Spoken Sunnah) এবং এসব ব্যাপারে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের মূল্যায়ন ইত্যাদি।

এখন এসব বিষয় বুদ্ধিবৃত্তি ও শিক্ষাগত দৃষ্টি ভঙ্গিতে মুসলিম মানসের ওপর কি প্রতিক্রিয়া ফেলেছে? কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে এসব সম্যাসার সৃষ্টি হয়েছে? এর বুদ্ধিবৃত্তি তাৎপর্য এবং এগুলি এপর্যন্ত কি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে? আধুনিক সুন্নাহ সমীক্ষায় এবং এ ধরনের সমীক্ষার জন্য পাঠক্রম প্রণয়নের সর্বোত্তম উপায় কি? মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং সভ্যতার পুনর্নিমাণে উম্মাহকে উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে এসব বিষয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কিভাবে সর্বোত্তম দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা সম্ভব।

(গ) সুন্নাহ উপলব্ধিতে স্থান ও কালেন গুরুত্ব

প্রথম প্রজন্মের মুসলমানের ন্যায় উসুলিয়াগণ মহানবী (সঃ)-এর কার্যক্রম ও বক্তব্য এবং তার অভিজ্ঞতা মানবিক দিকের বিশেষ ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষিতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনা করার জন্য কতিপয় বিধি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের হাদীস অধ্যয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা কি কতিপয় নির্দেশনা প্রণয়ন করতে পারেন? এ প্রসঙ্গে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এবং এসব রূপরেখার ব্যাখ্যায় আধুনিক হাদীস সমীক্ষার ভূমিকা কি?

একদিকে ফকিহদের আলোচিত ছোটখাট বিষয় এবং চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মোতাকাল্লিমদের আলোচিত বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় এবং অন্যদিকে সমাজ বিজ্ঞানীদের আলোচিত সামাজিক কার্যক্রমের ব্যাপারে অপরিহার্য পার্থক্য জ্ঞানের জন্য প্রয়োজন সুন্নাহর অনুধাবন ও প্রয়োগের বহুবিদ পন্থা ও পদ্ধতি। ফকিহদের আওতাভুক্ত একটি ছোটখাট বিষয় সংক্রান্ত হাদীস থেকে সাধারণ সামাজিক বিষয়ের হাদীস আলাদা ধরণের। এ ধরণের হাদীসের ব্যাখ্যায় এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সামাজিক দিক বিবেচনায় আনতে হবে এবং সমাজ বিজ্ঞানী তার বিশ্লেষণেও এ বিষয়টি দেখবেন। উম্মাহর দীর্ঘস্থায়ী বিবেধ থেকে আমরা কিভাবে মুক্তি পাব? এ বিভেদের ফলে একই হাদীস প্রতিদ্বন্ধী ধারণার সমর্থনে অপ্রয়োগ করা হয়। একেক গ্রুপ তাদের বিশ্বাসের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে কেমন করে রেহাই পাবে? ইসলামী চিন্তাধারার পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি আমরা কিভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারব এবং দুষ্ট চক্র থেকে রেহাই পাব। যে সময় সুন্নাহ (হাদীস) সংগ্রহ করা এবং পান্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা ও বিতর্কানুষ্ঠান এবং এই লক্ষ্যে যৌথ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়টি সহজতর হয়ে পড়েছে?

উম্মাহর সমস্যা সমাধানে সুন্নাহর ভূমিকা
সাধারণভাবে ইসলামী বিশ্ব এবং বিশেষভাবে আরব বিশ্ব নানা সংকটে ভুগছে, যার ফলে ইসলামী চিন্তাধারার সন্ধিক্ষন চলছে। এই সন্ধিক্ষণ নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। এর ভিতর গুরুত্বপূর্ণগুলো হচ্ছেঃ

ক. উম্মাহর বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে সংহতির অভাব, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, উপদলীয় রাজনৈতিক বিষয়ে বিরোধপূর্ণ চেতনা, উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী আদর্শের পুনরুজ্জীবন অথবা পূর্বে ছিল না এমন আদর্শের উদ্ভাবন।

খ. অন্যান্য সামাজিক আঞ্চলিক স্থিতিশীল উপাদানের ঘাটতি, স্বার্থপর, একদেশদর্শী ও উপদলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ এবং বর্তমান সম্পর্কে নৈরাশ্যভাবে বিদ্যমান ইতিবাচক কাজের ব্যাপারে উদ্যোগের অভাব এবং বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রাধাণ্য-এর ফলে উদ্যোগী মনোভাব পড়ে থাকে এবং বিরোধের স্বপক্ষে বিতর্ক সৃষ্টির চেতনার জন্য নেয়।

গ. উম্মাহর সামাজিক সমস্যাবলীর যথার্থ প্রকৃতি সম্বন্ধে সচেতনতার এবং ইতিহাসের সাথে তার সম্পর্কের অভাব। সামগ্রিক ও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে ভাসাভাসা, সংকীর্ণ ও আবেগপ্রবণ মতামতের প্রাধাণ্য এবং এ সময় মুসলিম মানসের যাচাই বাচাই ছাড়া বা ভুলে দরুণ যে কোন জিনিস গ্রহণে আগ্রহ। এ ছাড়া আরো নেতীবাচক ঘটনাবলী রয়েছে যা সংখ্যায় এত অধিক যে তার বিস্তারিত তালিকা প্রনণয়ন দুস্কর।সুতরাং উম্মাহর সমস্যার প্রকৃত জবাব দানের জন্য প্রয়োজনীয় সুস্থ জীবন মন এবং দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা অর্জন এবং উম্মাহর সমস্যাবলী সমাধানে সহায়তার লক্ষ্যে সুন্নাহকে আমরা কিভাবে প্রয়োগ করতে পারি? ইসলামী লক্ষের পানে মুসলমানের কাজ করতে ও সংগঠিত হতে এবং সামাজিক চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করতে এটাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়? এর ফলে উম্মাহর মধ্যে প্রাণস্পন্দন ও সজীবতা ফিরে আসবে। তদুপরি উম্মাহকে সাংস্কৃতিক বিকল্প ও বাস্তব সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচী খুঁজে পেতে উদ্বুদ্ধ করবে। এর ফলে তার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গভীরভাবে প্রথিত ও মহান সভ্যতা ও ইতিহাসের অঙ্গীভুত হওয়ার চেতনা জোরদার করবে।

সুন্নাহর অতি আক্ষরিক ব্যাখ্যায় বিপদ
মহানবীর সময়ে জনসাধারণ তাদের দৈনন্দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে সুন্নাহ বাস্তবায়ন করেছে এবং এর মাধ্যমে তারা পবিত্র কোরআন অনুধাবন করেছে সম্পূর্ণরূপে। কোরআনের এই মুজিজার প্রভাব দৃশ্যঃত প্রতিভাত হয়েছে উম্মাতুন ওয়াসাতান, (মধ্যমপন্থী জাতি) গঠনে- এটা অন্যদের জন্য সাক্ষী ও পথ প্রদর্শক যাতে রয়েছে কল্যাণের সমাহার এবং যা কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম। কালক্রমে জনগণের সুন্নাহর অনুধাবন যোগ্যতা হ্রাস।

পেলো, অপরদিকে অভিধান ভিত্তিক (Dictionary based)  সংস্কৃতি অন্যান্য ব্যাখ্যা ও টিকা-টিপ্পনীর উপরে প্রাধান্য  পেল এবং এটাই একমাত্র মাধ্যম হয়ে পড়লো। ফলে আক্ষরিক দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হলো যা অভিধান সমন্বিত ব্যাখ্যার উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। বিষয়টি এতই বেড়ে গেল যে, এ ধরনের অভিধান ভিত্তিক প্রবণতা স্থান কালেন বিষয়টিকে বিবেচনায় আনেনি। পরিণামে বিভ্রান্তি, কুটতর্ক ও বিরোধ সৃষ্টির মাধ্যমে উম্মাহর রেঁনেসাকে বাধাগ্রস্থ করার প্রবণতা জোরদার করেছে।তারা ইসলামকে পুরোনো ভাবমূর্তির সমষ্টি (Collection) হিসেবে গণ্য করতে নিদিত্ত স্বরূপ কাজ করেছে, তারা অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে অনভিপ্রেত ভিত্তির উপর এবং তারা মনে করেছে যে সত্যিকার পরিস্থিতিতে যে একটি হাদীস রচিত হয়েছে তা বারবার সংগঠিত হতে পারে যেটা বাস্তব জীবনে আসলে অসম্ভব। তাহলে আধুনিক সুন্নাহ বিশেষজ্ঞগণ কিভাবে এ বিষয়টি সামলাবেন এবং মুসলিম মানসকে তার বিপদ থেকে রক্ষা করবেন? যারা ইসলামের বাণীকে তার বিষয়বস্তু থেকে অন্তসারশূণ্য করে তুলতে এবং তার সর্বাধিক সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার ভূমিকা পরিহার করার ক্ষেত্রে প্রায় সাফল্য অর্জন করেছিল তাদের প্রতিক্রিয়া থেকে মুসলিম মানসকে কিভাবে রক্ষা করা যাবে? সত্যি কথা এই যে, এসব লোক ইসলামকে ব্যক্তিগত ও আচরণগত বিষয়ে সীমিত করে এনেছে এবং তুচ্ছ ও ভাষা ধারণায় তার দৃষ্টিভঙ্গির সীমা টেনে দিয়েছে এবং প্রথা সর্বস্ব ধর্মে পরিণত করেছে। এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিকার ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা ধর্মে, জনগণের ঐক্য অথবা সভ্যতা নির্মাণে অনুকূল নয়।

উম্মাহর পুনরুজ্জীবনে সুন্নাহর ভূমিকা
নিঃসন্দেহে আমাদের উম্মাহ রেনেসাঁর জন্য একটি চূড়ান্ত পরিকল্পনার অত্যন্ত প্রয়োজন বোধ করছে, যা তাকে মানবতার অগ্রণী দল হিসেবে মধ্যমপন্থী জাতির অবস্থানে পুনঃপ্রতিষ্ঠ করবে। মুসলিম সমাজ প্রয়োজনীয় পূর্ব শর্ত পূরণ করা ব্যতীত এটা অর্জিত হবে না। এর প্রথম কাজ হচ্ছে ইসলামী রেনেসাঁর জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রূপরেখা প্রণয়ন করা।

আজ উম্মাহ দুটি সংস্কৃতির ধারায় প্রতিষ্ঠিত। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সংস্কৃতি-যা ঐতিহাসিক যুগের বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশমন্ডিত এবং আমদানি করা বিদেশী সংস্কৃতি। মুসলিম মানস এই দুই সংস্কৃতির ব্যাপারে নিস্পৃহ-তাদের পণ্য ব্যবহারেই সন্তুষ্ট এবং নিজের কোন মৌলিক অবদান রাখতে অক্ষম।

উম্মাহর ইসলামী জীবন পদ্ধতির সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্য ও কর্মপন্থার সংযোগ সাধনের ফলে মুসলিম বিশ্বের কর্মপ্রচেষ্ঠা সংগঠন ব্যাপকভাবে সহায়ক হবে পরিণামে প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন আনায়ন সম্ভব হবে, আর উম্মাহকে এই গুরুদায়িত্ব বহনে সহায়তা  করবে।

ইসলামী চিন্তাধারায় বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্চ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও শক্তিমত্তা অর্জন করতে এবং উম্মাহর স্বর্ণযুগের সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান পুনরুদ্ধারে আমাদেরকে অবশ্যই ইসলাম, কোরআন ও সুন্নাহর অফুরন্ত উৎসের প্রতি পুনরায় নজর দিতে হবে এবং সেগুলো পুনরায় বিস্তারিত ও সতর্কতার সাথে এবং সমসাময়িক ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে অধ্যয়ন করতে হবে। এধরনের দৃষ্টিভঙ্গির জন্য প্রয়োজন দুরদৃষ্টি এবং প্রভাব বিস্তারকারী উপকরণ আর বিভিন্ন দিককে বিবেচনায় আনার মত ঔদার্য। এর লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে হবে, মৌলনীতির সংজ্ঞা দিতে হবে এবং জরুরী প্রয়োজন মিটানো এবং উম্মাহর ভিত্তি যেসব উপাদান নিয়ে গঠিত সেগুলি পনর্গঠনের জন্য পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে।

পবিত্র কোরআন আমাদের পূর্বপুরুষদের একটি চমৎকার বুদ্ধবৃত্তিক কাঠামো দিয়েছিল। এর ফলে তারা বিভিন্ন জাতির উত্থান, সভ্যতার উত্থান ও পতন সংক্রান্ত আইন অনুধাবন ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হন। যার ফলে তারা বস্তুনিষ্ঠ উপায়ে ও গভীরভাবে তথ্যাদি যাচাই করতে সক্ষম হয়েছিলো। এটা ছিল এব যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি যা কল্পনা নয় বাস্তবতাকে সমন্বিত ও তর্কাতীকভাবে আলোচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাসের গতিময়তাকে সামনে রেখে সমাজের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা ব্যাখ্যা করতে কখন ও কিভাবে এগুলি ঘটে, ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা কিভাবে করা যেতে পারে, এগুলি থেকে কিভাবে শিক্ষাগ্রহণ করা যায় এবং এগুলি কিভাবে ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দিতে পারে এবং সম্ভাব্য ঘটনা ঘটার আগেই উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম করে তোলে সেই দৃষ্টিভঙ্গি রাখা।

উপসংহার

মহানবীর (স) সুন্নাহ, তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের জীবনধারা সেই লক্ষ্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর বাস্তব প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করে। এটা সমসাময়িক ইসলামী চিন্তাধারা বাদবাকী সৃষ্টিকূলের সাথে সঙ্গতি রেখে মানুষের জীবন সংগঠন ও নির্দেশনা দিতে সক্ষম একটি চূড়ান্ত পদ্ধতির মাধ্যমে এক সুষ্ঠু যুক্তিধর্মী মন নিয়ে কোরআন অধ্যয়ন করলেই বুদ্ধবৃত্তিক মহাসংকটের সমাধান আমাদের আওতায় আসবে।

একই ভাবে সুন্নাহ এবং মহানবী (সঃ) কর্তৃক পবিত্র কোরআনের বাণীর ও মানুষের জীবনে তার হুবহু রূপায়নের উদ্দেশ্যের সঠিক অধ্যয়ন আমাদের উম্মাহর অজ্ঞতা, ঘৃণা, বিরোধ এবং শক্তির অপচয়ের অবসান ঘটাবে। এভাবে সমকালীন মুসমানেরা আধুনিক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক জটিলতা দেখে আমাদের স্ব-আরোপিত অসামর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারবে এবং সঠিক ও চূড়ান্ত ইসলামী শিক্ষার অনুধাবনের মাধ্যমে মানবতাকে সত্যিকার নির্দেশনা ও কল্যাণ উপহার দিতে পারবে। এ ধরণের অনুধাবন অভিযোজিত বিধিমালা থেকে অপরিবর্তনীয় নীতির পার্থক্য করতে সহায়তা করবে এবং লক্ষ্য ও উপায় নির্দেশ করবে।



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png