শিরোনাম
Loading latest headlines...

শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

১০০ সুসাব্যস্ত হাদিস- বিভিন্ন প্রকার সুন্নতসমূহ ( ৭৪-১০০ টি হাদীস) পার্ট-৭

শনিবার, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
বিভিন্ন প্রকার সুন্নতসমূহ  
১০০ সুসাব্যস্ত হাদিস
বিভিন্ন প্রকার সুন্নতসমূহ    
পরিচ্ছেদ ৭৪:
জ্ঞানার্জন করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোন পথে চলে, আল্লাহ্‌ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” (মুসলিম ২৬৯৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৭৫:
প্রবেশ করার পূর্বে তিনবার অনুমতি চাওয়া

আবূ মুসা আশা’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তিনবার অনুমতি চাইবে। অনুমতি দিলে প্রবেশ করবে, অন্যথায় ফিরে যাবে।” (বুখারী ৬২৪৫, মুসলিম ২১৫৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৭৬:
খেজুর ইত্যাদি চিবিয়ে নবজাত শিশুর মুখে দেওয়া

আবূ মুসা আশা’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমার এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহন করলো। আমি তাকে নিয়ে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি তার নাম রাখলেন, ইবরাহীম এবং খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দিয়ে তার জন্য বরকতের দুআ করলেন। (বুখারী ৫৪৬৭, মুসলিম ২১৪৫)
*কোন মিষ্টি জিনিস চিবিয়ে নবজাত শিশুর মুখে দেওয়াকে ‘তাহনীক’ বলা হয়। এটা খেজুর হওয়াই উত্তম।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৭৭:
আক্বীক্বা করা

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মেয়ের পক্ষ থেকে একটি এবং ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল আক্বীক্বা করার। (আহমদ ২৫৭৬৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৭৮:
বৃষ্টির পানি লাগার জন্য শরীরের কোন অংশ খোলা

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে থাকাকালীন আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলে তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর শরীরের কিছু অংশ খুলে ফেললেন যাতে সেখানে বৃষ্টির পানি লাগে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্‌র রাসূলুল্লাহ! এ রকম কেন করলেন? তিনি বললেন, ‘কারণ ইহা (এই বৃষ্টির পানি) স্বীয় প্রতিপালকের নিকট থেকে সদ্য আগত।” (মুসলিম ৮৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৭৯:
রোগীকে দেখতে যাওয়া

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আযাদকৃত গোলাম সাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আযাদকৃত গোলাম সাওবান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায়, সে জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করতে থাকে।” জিজ্ঞেস করা হলো, জান্নাতের ফলমূলে অবস্থান করা কি? তিনি বললেন, “এর ফলমূল সংগ্রহ করা।” (মুসলিম ২৫৬৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮০:
স্নিগ্ধ হাসা

আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বললেন, “কোন ভাল কাজকে তুচ্ছ ভেবো না, যদিও তা তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে সাক্ষাৎ করার কাজ হয়।” (মুসলিম ২৬২৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮১:
আল্লাহ্‌র নিমিত্ত কারো যিয়ারত করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তি তার ভাইকে দেখার জন্য অন্য এক গ্রামে গেলো। আল্লাহ্‌ তা’য়ালা তার জন্য রাস্তায় একজন ফেরেশতা মোতায়েন করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফেরেশতার কাছে পৌঁছলো, তখন ফেরেশতা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে বললো, আমি এই গ্রামে আমার এক ভাইকে দেখার জন্য যাচ্ছি। ফেরেশতা বললেন, তার উপর তোমার কি কোন অনুগ্রহ আছে, যা তুমি আরো বৃদ্ধি করতে চাও? সে বললো, না। আমি তো শুধু আল্লাহ্‌র জন্য তাকে ভালবাসি। ফেরেশতা বললেন, আমি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে তোমার কাছে এ পয়গাম নিয়ে এসেছি যে, আল্লাহ্ তোমাকেও ভালবাসেন, যেমন তুমি তোমার ভাইকে তাঁরই জন্য ভালবাসো।” (মুসলিম ২৫৬৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮২:
মানুষ তার ভাইকে জানিয়ে দেবে যে, সে তাকে ভালবাসে

মিক্বদাদ ইবনে মা’দী কারিবা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম) বলেছেন, “যদি তোমাদের কেউ তার কোন ভাইকে ভালবাসে, তাহলে সে যেন তাকে তার ভালবাসার কথা জানিয়ে দেয়।” (আহমদ ১৬৩০৩)
হাদিসের মান নির্ণীত নয়।

পরিচ্ছেদ ৮৩:
হাই তুলা রোধ করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “হাই শয়তান কর্তৃক আসে। অতএব যখন তোমাদের কারো হাই আসে, তখন সে যেন সাধ্যানুসারে তা রোধ করে। কেননা, যখন তোমাদের কেউ হাই তুলে তখন শয়তান হাসে।” (বুখারী ৩২৮৯, মুসলিম ২৯৯৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৪:
মানুষের ব্যাপারে ভাল ধারণা পোষণ করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, তোমরা (মন্দ) ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, (মন্দ) ধারণাই হচ্ছে সব থেকে বড় মিথ্যা।” (বুখারী ৬০৬৬, মুসলিম ০২৬৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৫:
ঘরের কাজে পরিবারকে সাহায্য করা

আসওয়াদ থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, আমি আয়েশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বাড়িতে কি করেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি বাড়িতে তাঁর পরিবারের কাজে সহযোগিতা করেন। যখন নামাযের সময় এসে উপস্থিত হয়, তখন নামাযের জন্য বেরিয়ে যান। (বুখারী ৬৭৬)

হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৬:
স্বভাবগত অভ্যাস

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “স্বভাবগত অভ্যাস হলো পাঁচটি অথবা পাঁচটি হলো স্বভাবগত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত। খাতনা করা, নাভীর নীচের লোম পরিস্কার করা, বগলের চুল ছিঁড়ে ফেলা, নখ কাটা এবং মোচ খাটো করা।” (বুখারী ৫৮৮৯, মুসলিম ২৫৭)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৭:
এতিমদের দেখাশুনা করা

সাহল ইবনে সা’আদ থেকে বর্ণিতঃ

সাহল ইবনে সা’আদ নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “আমি ও এতীমদের দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এত দূর ব্যবধানে থাকবো। তারপর তিনি নিজের তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুলী দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখালেন।” (বুখারী ৬০০৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৮:
ক্রোধ থেকে বিরত থাকা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

এক ব্যক্তি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললো, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, “রাগ করো না।” সে কয়েকবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করলো। আর তিনি বললেন, “রাগ করো না।” (বুখারী ৬১১৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৮৯:
আল্লাহ্‌র ভয়ে কাঁদা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আবূ হুরায়রা (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “সাত প্রকারের লোককে আল্লাহ্‌ তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, তাদের মধ্যে একজন হলো এমন ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহ্‌কে স্মরণ করে চোখের পানি প্রবাহিত করে।” (বুখারী ৬৬০ মুসলিম ১০৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯০:
সাদক্বায়ে জারীয়া

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের নেকী জারী থাকে। সাদক্বায়ে জারীয়া, ফলপ্রসূ ইল্‌ম এবং সুসন্তান যে তার জন্য দুআ করে।” (মুসলিম ১৬৩১)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯১:
মসজিদ তৈরী করা

উসমান ইবনে আফ্‌ফান (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মসজিদ পুনঃ নির্মাণ করেন, তখন লোকেরা তাঁর সমালোচনা করে। তিনি তাদের জবাবে বললেন, তোমরা অনেক কিছু বললে, কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য একটি মসজিদ তৈরী করবে, আল্লাহ্‌ তাঁর জন্য জান্নাতে অনুরূপ একটি ঘর তৈরী করবেন।” (বুখারী ৪৫০, মুসলিম ৫৩৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯২:
কেনাবেচায় নরম ও সহজ পন্থা অবলম্বন করা

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “সেই ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ্ রহম করুন! যে বিক্রি করার সময়, কিনার সময় এবং স্বীয় অধিকার চাওয়ার সময় সহজ ও নরম পন্থা অবলম্বন করে।” (বুখারী ২০৭৬)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৩:
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেওয়া

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “এক ব্যক্তি পথ চলার সময় পথে একটি কাঁটার ডাল দেখতে পেলে তা রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলো। ফলে আল্লাহ্‌ তার প্রতি অনুগ্রহ করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” (বুখারী ৬৫৪, মুসলিম ১৯১৪)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৪:
সাদক্বাহ করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুরের মুল্য পরিমাণ দান করে– আল্লাহ্‌ তো হালাল বস্তু ব্যতীত অন্য কিছু গ্রহন করেন না- তবে আল্লাহ্ তা তাঁর ডান হাতে গ্রহণ করেন। অতঃপর তাকে তার দানকারীর জন্য বৃদ্ধি করতে থাকেন যেরূপ তোমাদের কেউ তার অশ্বশাবককে লালন-পালন করতে থাকে। অবশেষে একদিন তা পাহাড় সমতুল্য হয়ে যায়।” (বুখারী ১০৮০, মুসলিম ১০১৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৫:
জিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে নেক আমল বেশী বেশী করা

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

ইবনে আব্বাস (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “এই (অর্থাৎ, যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের) দিনগুলোতে যে আমল করা হয় তার চেয়ে উত্তম আর কোন আমল নেই। সাহাবাগন জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি উত্তম নয়? তিনি বললেন, “জিহাদও উত্তম নয়।” তবে সেই ব্যক্তির কথা স্বতন্ত্র, যে নিজের জান ও মাল ধ্বংসের মুখে জেনেও জিহাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না।” (বুখারী ৯৬৯)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৬:
টিকটিকি হত্যা করা

আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতেই টিকটিকি মারতে সক্ষম হবে, তার নেকীর খাতায় একশত নেকী লিখে দেওয়া হবে। আর দ্বিতীয় আঘাতে মারলে, প্রথমের থেকে কম পাবে এবং তৃতীয় আঘাতে মারলে, তার চেয়েও কম পাবে।” (মুসলিম ২২৪০)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৭:
প্রত্যেক শোনা কথা বলে না বেড়ানো

হাফ্‌স ইবনে আ’সেম (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “কোন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে সব শোনা কথা বলে বেড়াবে।” (মুসলিম ৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৮:
নেকীর আশায় পরিবারবর্গের জন্য ব্যয় করা

আবূ মাসউদ বাদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

আবূ মাসউদ বাদরী (রাঃ) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “মুসলিম নেকীর আশায় যা কিছু তার পরিবারবর্গের জন্য ব্যয় করে’ তা সবই তার জন্য সাদক্বায় পরিণত হয়।” (মুসলিম ২৩২২)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ৯৯:
তাওয়াফে রামাল করা

ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম তিন তাওয়াফে রামাল করতেন এবং অবশিষ্ট চার তাওয়াফে স্বাভাবিকভাবে চলতেন।” (বুখারী ১৬৪৪, মুসলিম ১২৬১)
রামাল হলো, ছোট ছোট পদক্ষেপে দ্রুত চলা। আর এটা হজ্জ বা উমরা আদায়কারী মক্কায় পৌঁছে প্রথম যে তাওয়াফ করবে, সেই তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে হবে।
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

পরিচ্ছেদ ১০০:
অব্যাহতভাবে কোন নেক আমল করতে থাকা, যদিও তা স্বল্প হয়

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, আমলের, মধ্যে কোন আমলটি আল্লাহ্‌র নিকট অতীব প্রিয়? তিনি বললেন, “এমন আমল যা অব্যাহত করা হয়, যদিও তা স্বল্প হয়।” (বুখারী ৬৪৬৫, মুসলিম ৭৮৩)
হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস

১০১
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার অলীর সাথে শত্রুতা করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করছি। আমার বান্দার প্রতি যা ফরয করেছি তা দ্বারাই আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে। আমার বান্দা নফল কাজের মাধ্যমেও আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালবেসে ফেলি। যখন আমি তাকে ভালবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে এবং তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে কিছু চাইলে, আমি তাকে তা দেই। সে যদি আমার নিকট আশ্রয় কামনা করে, তাহলে আমি তাকে আশ্রয় দেই। আমি যা করার ইচ্ছা করি, সে ব্যাপারে কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগি না কেবল মু’মিনের আত্নার ব্যাপার ছাড়া। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে, আর আমি তার মন্দকে অপছন্দ করি।’’ (বুখারী ৬৫০২)

হাদিসের মানঃ সহিহ হাদিস



রাসূল (ছাঃ)-এর পুরা জীবনটাই ছিল দাওয়াত ও জিহাদের জীবন

শনিবার, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
বাদশাহদের  নিকটে পত্র প্রেরণ
রাসূল (ছাঃ)-এর পুরা জীবনটাই ছিল দাওয়াত ও জিহাদের জীবন
রাসূল (ছাঃ)-এর পুরা জীবনটাই ছিল দাওয়াত ও জিহাদের জীবন। মাক্কী জীবন ছিল এককভাবে দাওয়াতী জীবন। মাদানী জীবনে সশস্ত্র জিহাদের অনুমতি পেলেও তার মধ্যে তিনি সবসময় দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়েছেন। বিভিন্ন গোত্রে দাওয়াতী কাফেলা পাঠিয়েছেন। কখনও সফল হয়েছেন, কখনো বিফল হয়েছেন। ৪র্থ হিজরীর ছফর মাসে আযাল ও ক্বারাহ গোত্রে আছেম বিন ছাবিত (রাঃ)-এর নেতৃত্বে ১০ জনের এবং নাজদের বনু সুলায়েম গোত্রে মুনযির বিন আমের (রাঃ)-এর নেতৃত্বে ৭০ জনের যে তাবলীগী কাফেলা পাঠান, তারা সবাই আমন্ত্রণকারীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হয়ে যান। শেষোক্তটি বি’রে মাঊনার ঘটনা হিসাবে পরিচিত (সারিইয়া ক্রমিক সংখ্যা ২৪ ও ২৫)। আবার ৬ষ্ঠ হিজরীর শা‘বান মাসে সিরিয়ার দূমাতুল জান্দালের বনু কালব খৃষ্টান গোত্রের নিকটে আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ)-এর নেতৃত্বে যে তাবলীগী কাফেলা পাঠানো হয়, তা সফল হয় এবং খৃষ্টান গোত্র নেতাসহ সবাই মুসলমান হয়ে যান (সারিয়াহ ক্রমিক সংখ্যা ৪৪)। এছাড়া নবী ও ছাহাবীগণ সকলে ব্যক্তিগতভাবে সর্বদা দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতেন। কেননা দাওয়াতই হ’ল ইসলামের প্রচার ও প্রসারের সর্বপ্রধান হাতিয়ার। মাদানী জীবনে
মুশরিক

-মুনাফিক ও ইহুদীদের অবিরতভাবে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধবাদী কর্মকান্ডের ফলে ইসলামের সুস্থ দাওয়াত বাধাগ্রস্ত হয়।

৬ষ্ঠ হিজরীর যুলক্বা‘দাহ মাসে প্রধান প্রতিপক্ষ কুরায়েশদের সাথে হোদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরের ফলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও মুসলমানদের জীবনে অনেকটা স্বস্তি ফিরে আসে। ফলে এই সময়টাকে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ইসলামের দাওয়াত প্রসারের জন্য একটি মহতী সুযোগ হিসাবে কাজে লাগান। এই সময় তৎকালীন আরব ও পার্শ্ববর্তী রাজা-বাদশা ও গোত্রনেতাদের নিকটে পত্র প্রেরণের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত প্রসারে তিনি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন। পত্র বাহকের মাধ্যমে পত্রসমূহ প্রেরিত হয় এবং সে যুগের নিয়ম অনুযায়ী পত্রের শেষে সীলমোহর ব্যবহার করা হয়। রাসূল (ছাঃ)-এর আংটিতে মুদ্রিত সীলমোহরটি ছিল রৌপ্য নির্মিত এবং যাতে ‘মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ’ খোদিত ছিল। নীচে মুহাম্মাদ, তার উপরে রাসূল এবং তার উপরে আল্লাহ এইভাবে লিখিত ছিল (محمد رسول الله)।[1]

মানছূরপুরীর হিসাব মতে ৭ম হিজরীর ১লা মুহাররম তারিখে এইসব পত্র বিভিন্ন প্রাপকের নিকটে প্রেরিত হয়। তবে আমাদের ধারণা মতে সকল পত্র একই দিনে প্রেরণ করা হয়নি। যেমন ওমান সম্রাটের নিকটে পত্রবাহক হিসাবে আমর ইবনুল আছকে পাঠানো হয়। অথচ তিনি ইসলাম গ্রহণের জন্য মদীনায় আসেন ৭ম হিজরীর প্রথম ভাগে। অতএব ওমানের পত্রটি বেশ পরে পাঠানো হয় বলে অনুমিত হয়। এলাকার ভাষায় অভিজ্ঞ এমন ব্যক্তিকেই পত্রবাহক নিযুক্ত করা হ’ত। যাতে তাদের নিকটে তিনি উত্তমভাবে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরতে সক্ষম হন। নিম্নে পত্রসমূহের কিছু নমুনা তুলে ধরা হ’ল:

১. আছহামা নাজাশীর

নিকটে পত্র (الكتاب إلى النجاشي ملك الحبشة) : আমর ইবনে উমাইয়া যামরী (রাঃ)-এর মাধ্যমে হাবশার সম্রাট আছহামা ইবনুল আবজার (أصْحَمَة بن الأبْجَر) -এর নিকটে প্রেরিত পত্রের ভাষ্য ছিল নিম্নরূপ :

هذا كتاب من محمد رسول الله إلى النجاشي، الأصحم عظيم الحبشة، سلام على من اتبع الهدي، وآمن بالله ورسوله، وشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له، لم يتخذ صاحبة ولا ولداً، وأن محمدًا عبده ورسوله، أدعوك بدعاية الإسلام، فإني أنا رسوله، فأسلم تسلم، {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلَمَةٍ سَوَاء بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاَّ نَعْبُدَ إِلاَّ اللهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضاً أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ اللهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوْا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ} فإن أبيت فعليك إثم النصارى من قومك-

‘এটি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ-এর পক্ষ হ’তে প্রেরিত পত্র হাবশার সম্রাট আছহামা নাজাশীর নিকটে। শান্তি বর্ষিত হৌক ঐ ব্যক্তির উপরে যিনি হেদায়াতের অনুসরণ করেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপরে ঈমান আনেন এবং সাক্ষ্য দেন যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি কোন স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করেন না। আর মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। নিশ্চয়ই আমি তাঁর রাসূল। অতএব ইসলাম গ্রহণ করুন। নিরাপদ থাকুন। (আল্লাহ বলেন, হে নবী!) ‘আপনি বলুন, হে কিতাবধারীগণ! এসো এমন একটি কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমান এবং তা এই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারু ইবাদত করব না। আমরা তার সাথে কোন কিছুকে শরীক করব না এবং আল্লাহ ব্যতীত আমরা কাউকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করব না। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তাদের বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থা

যে, আমরা মুসলমান’ (আলে ইমরান ৩/৬৪)। অতঃপর যদি আপনি দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন, তাহ’লে  আপনার উপরে আপনার খৃষ্টান সম্প্রদায়ের পাপ বর্তাবে’।[2] মানছূরপুরী ত্বাবারীর বরাতে যে পত্র উদ্ধৃত করেছেন, তার সাথে অনেকটা গরমিল রয়েছে।

পত্রবাহক আমর ইবনে উমাইয়া যামরী (রাঃ) পত্রখানা বাদশাহ নাজাশীর হাতে সমর্পণ করলে তিনি শ্রদ্ধাভরে পত্রখানা নিজের দু’চোখের উপরে রাখেন। অতঃপর সিংহাসন থেকে নেমে ভূমিতে উপবিষ্ট হয়ে জাফর ইবনে আবু তালিবের হাতে বায়‘আত করে ইসলাম কবুল করেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে জওয়াবী পত্র লেখেন। যা নিম্নরূপ:

بِسْمِ اللهِ الرّحْمَنِ الرّحِيمِ إلَى مُحَمّدٍ رَسُولِ اللهِ مِنَ النّجَاشِيّ أَصْحَمَةَ سَلاَمٌ عَلَيْك يَا نَبِيَّ اللهِ مِنَ اللهِ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ- اللهُ الّذِيْ لاَ إلَهَ إلاَّ هُوَ أَمّا بَعْدُ : فَقَدْ بَلَغَنِي كِتَابُك يَا رَسُولَ اللهِ فِيمَا ذَكَرْتَ مِنْ أَمْرِ عِيسَى فَوَرَبِّ السّمَاءِ وَالْأَرْضِ إنّ عِيسَى لاَ يَزِيْدُ عَلَى مَا ذَكَرْتَ ثُفْرُوْقًا إنّهُ كَمَا ذَكَرْتَ وَقَدْ عَرَفْنَا مَا بُعِثْتَ بِهِ إلَيْنَا وَقَدْ قَرّبْنَا ابْنَ عَمِّك وَأَصْحَابَهُ فَأَشْهَدُ أَنّكَ رَسُولُ اللهِ صَادِقًا مُصَدِّقًا وَقَدْ بَايَعْتُك وَبَايَعْتُ ابْنَ عَمَّك وَأَسْلَمْتُ عَلَى يَدَيْهِ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْن-

‘করুণাময় কৃপানিধান আল্লাহর নামে’- ‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের প্রতি আছহামা নাজাশীর পক্ষ হ’তে। আল্লাহর পক্ষ হ’তে প্রেরিত আল্লাহর নবী! আপনার উপরে শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হৌক। আল্লাহ সেই সত্তা, যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। অতঃপর হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকটে আপনার পত্র পৌঁছেছে, তার মধ্যে আপনি ঈসা সম্পর্কে যা কিছু উল্লেখ করেছেন, আসমান ও যমীনের পালনকর্তার কসম! নিশ্চয়ই ঈসা আপনার বর্ণনার চাইতে কণামাত্র অধিক ছিলেন না। নিশ্চয়ই তিনি সেরূপ ছিলেন, যেরূপ আপনি বলেছেন। অতঃপর আপনি যা কিছু নিয়ে আমাদের নিকটে প্রেরিত হয়েছেন, আমরা তার সবকিছু জেনেছি এবং আপনার চাচাতো ভাই ও তার সাথীদের আমরা নিকটবর্তী করে নিয়েছি। অতঃপর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনি সত্যবাদী ও সত্যায়নকারী। আমি আপনার নিকটে বায়‘আত করেছি এবং বায়‘আত করেছি আপনার চাচাতো ভাইয়ের নিকটে এবং আমি তার হাতে ইসলাম কবুল করেছি বিশ্বপালক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য’।[3]

এখানে পত্রের বক্তব্য হিসাবে ঈসা (আঃ) সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, সেটা রাসূল (ছাঃ)-এর পক্ষে জা‘ফরের বক্তব্য হ’তে পারে। যেমন ইতিপূর্বেকার নাজাশীর প্রশ্নের জবাবে রাসূল (ছাঃ)-এর বরাত দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে, هُوَ عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ وَرُوْحُهُ وَكَلِمَتُهُ أَلْقَاهَا إلَى مَرْيَمَ الْعَذْرَاءِ الْبَتُوْلِ ‘তিনি ছিলেন আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল, তাঁর রূহ ও কলেমা, যা তিনি নিক্ষেপ করেছিলেন কুমারী সতী-সাধ্বী মরিয়ামের প্রতি’।[4] উল্লেখ্য যে, এ সময় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) বিভিন্ন খৃষ্টান নেতার কাছে লিখিত পত্রে পূর্বে বর্ণিত সূরা আলে ইমরানের ৬৪ আয়াতটি উল্লেখ করতেন।[5]

অতঃপর রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ মতে নাজাশী দু’টি নৌকা করে পত্র বাহক আমর বিন উমাইয়া যামরীর সাথে হযরত জাফর, হযরত আবু মূসা আশ‘আরী প্রমুখ ছাহাবীগণকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন। তারা সেখান থেকে খায়বরে গিয়ে রাসূল (ছাঃ)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্রাট আছহামা নাজাশী ৯ম হিজরীর রজব মাসে ইন্তেকাল করলে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তার মৃত্যুর দিনেই সবাইকে অবহিত করেন এবং গায়েবানা জানাযা আদায় করেন’। আর এটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গায়েবানা জানাযা।

ফায়েদা :

তাফসীরবিদগণের আলোচনায় আরেকটি বিষয় প্রতিভাত হয় যে, ৫ম নববী বর্ষে মুহাজিরগণের দ্বিতীয় যে দলটি হাবশায় হিজরত করেন, তাদের সাথে হযরত জাফর বিন আবু তালেব সম্ভবতঃ দু’বছর হাবশায় অবস্থান করেন এবং নাজাশী ও তাঁর সভাসদ মন্ডলী এবং পাদরী-বিশপসহ রাজ্যের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের নিকটে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। এ সময় নাজাশীর দরবারে জাফরের দেওয়া ভাষণ নাজাশী ও তার সভাসদদের অন্তর কেড়ে নেয়। ইসলামের সত্যতা ও শেষনবীর উপরে তাদের বিশ্বাস তখনই বদ্ধমূল হয়ে যায়। অতঃপর হাবশার মুহাজিরগণ যখন মদীনায় যাওয়ার সংকল্প করেন। তখন সম্রাট নাজাশী তাদের সাথে ৭০ জনের একটি ওলামা প্রতিনিধি দল মদীনায় প্রেরণ করেন। যাদের মধ্যে ৬২ জন ছিলেন আবিসিনীয় এবং ৮ জন ছিলেন সিরিয়। এরা ছিলেন খৃষ্টান সম্প্রদায়ের সেরা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। সংসার ত্যাগী দরবেশ সূলভ পোষাকে এই প্রতিনিধিদলটি রাসূলের দরবারে পেঁŠছলে রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে সূরা ইয়াসীন পাঠ করে শুনান। সূরা ইয়াসীন শ্রবণকালে তাদের দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারে অশ্রু প্রবাহিত হ’তে থাকে। তারা বলে ওঠেন ইনজীলের বাণীর সাথে কুরআনের বাণীর কি অদ্ভূত মিল! অতঃপর তারা সবাই অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে রাসূল (ছাঃ)-এর হাতে বায়‘আত করে ইসলাম কবুল করেন।

প্রতিনিধি দলটির প্রত্যাবর্তনের পর সম্রাট নাজাশী প্রকাশ্যে ইসলাম কবুলের ঘোষণা দেন। যদিও প্রথম থেকেই তিনি শেষনবীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কিন্তু ধর্মনেতাদের ভয়ে প্রকাশ করেননি। অতঃপর তিনি একটি পত্র লিখে স্বীয় পুত্রের নেতৃত্বে আরেকটি প্রতিনিধি দল মদীনায় পাঠান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ জাহাযটি পথিমধ্যে ডুবে গেলে আরোহী সকলের মর্মান্তিক সলিল সমাধি ঘটে।

উক্ত খৃষ্টান প্রতিনিধিদলের মদীনায় গমন ও ইসলাম গ্রহণের প্রতি ইঙ্গিত করেই সূরা মায়েদাহ ৮২ হ’তে ৮৫ চারটি আয়াত নাযিল হয়। যেখানে আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

لَتَجِدَنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَدَاوَةً لِلَّذِيْنَ آمَنُوا الْيَهُودَ وَالَّذِيْنَ أَشْرَكُوْا وَلَتَجِدَنَّ أَقْرَبَهُمْ مَوَدَّةً لِلَّذِيْنَ آمَنُوا الَّذِيْنَ قَالُوْا إِنَّا نَصَارَى ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسِّيْسِيْنَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لاَ يَسْتَكْبِرُوْنَ، وَإِذَا سَمِعُوْا مَا أُنْزِلَ إِلَى الرَّسُوْلِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيْضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوْا مِنَ الْحَقِّ يَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا آمَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِيْنَ-

‘নিশ্চয়ই আপনি সব লোকের চাইতে ঈমানদারগণের অধিক শত্রু পাবেন ইহুদী ও মুশরিকদের এবং নিশ্চয়ই আপনি সব লোকের চাইতে ঈমানদারগণের অধিক নিকটবর্তী পাবেন ঐসব লোকদের, যারা বলে আমরা নাছারা। এটা এজন্য যে, তাদের মধ্যে রয়েছে অনেক আলেম ও দরবেশ এবং তারা অহংকার করে না’। ‘আর যখন তারা শ্রবণ করে ঐ বস্ত্ত যা রাসূলের প্রতি নাযিল হয়েছে, তখন আপনি দেখবেন যে, তাদের চক্ষুসমূহ দিয়ে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছে একারণে যে, তারা সত্যকে চিনতে পেরেছে। অতঃপর তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা আমরা ঈমান এনেছি। অতএব তুমি আমাদেরকে ঈমানের সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে লিপিবদ্ধ করে নাও’ (মায়েদাহ ৫/৮২-৮৩)।

সম্রাট নাজাশীর উপরোক্ত পদক্ষেপ সমূহের কারণে এবং তাঁর প্রকাশ্যে ইসলাম কবুলের খবর জানতে না পারায় ও তাঁর প্রেরিত পত্র হস্তগত না হওয়ায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁকে ইসলাম কবুলের আহবান জানিয়ে পত্র লেখেন এবং যা তিনি শ্রদ্ধাভরে কবুল করেন।

মুবারকপুরীর তাহকীক্ব মতে আল্লাহর নবী (ছাঃ) বাদশাহ নাজাশীর নিকটে তিনবারে তিনটি চিঠি লেখেন। প্রথমটি ছিল মক্কায় থাকাকালীন সময়ে ৫ম নববী বর্ষের রজব মাসে যখন সেখানে হযরত ওছমান (রাঃ)-এর নেতৃত্বে ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলার প্রথম হিজরত অনুষ্ঠিত হয়। অতঃপর ৮৩ জন পুরুষ ও ১৯ জন মহিলা হিজরত করেন। পত্র বাহক ছিলেন জা‘ফর ইবনে আবু তালিব (রাঃ)। সেখানে বক্তব্য ছিল, … وَقَدْ بَعَثْتُ إِلَيْكُمْ ابْنَ عَمِّيْ جَعْفَرَاً وَمَعَهُ نَفَرٌ مِّنَ الْمُسْلِمِيْنَ، فَإِذَا جَاءَكَ فَأَقَرَّهُمْ وَدَعِ التَّجْبَرَ ‘আমি আপনার নিকটে আমার চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালেবকে পাঠালাম। তার সাথে মুসলমানদের একটি দল রয়েছে। অতএব যখন সে আপনার নিকটে যাবে, আপনি তাকে আশ্রয় দিবেন এবং কোনরূপ যবরদস্তি করবেন না’।

অতঃপর দ্বিতীয় পত্রটি ছিল ৭ম হিজরীর ১লা মুহাররম তারিখে যা আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি। সবশেষে তৃতীয় পত্রটি ছিল ৯ম হিজরীর রজব মাসে। আছহামা নাজাশীর মৃত্যুর পরে সিংহাসনে আসীন নতুন নাজাশীর নিকটে।

শেষোক্ত পত্রে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) নতুন বাদশাহর নাম উল্লেখ করেননি। তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন কি-না তাও জানা যায়নি।[6]

২. মিসর রাজ মুক্বাউক্বিসের নিকটে পত্র (الكتاب إلى المقوقس ملك مصر) : মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার (الإسكندرية) খৃষ্টান সম্রাট জুরায়েজ বিন মাত্তা (جُرَيْج بن مَتَّي) (ডঃ হামীদুল্লাহ এঁর নাম বলেছেন, বেনিয়ামীন (البنيامين) ওরফে মুক্বাউক্বিসের (المقوقس) নিকটে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি পত্র লেখেন। যার বাহক ছিলেন হযরত হাতেব বিন আবী বালতা‘আহ (রাঃ)। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

بِسْمِ اللهِ الرّحْمَنِ الرّحِيمِ مِنْ مُحَمّدٍ عَبْدِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ إلَى الْمُقَوْقِسِ عَظِيمِ الْقِبْطِ سَلاَمٌ عَلَى مَنْ اتّبَعَ الْهُدَى أَمّا بَعْدُ فَإِنّي أَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ الْإِسْلاَمِ أَسْلِمْ تَسْلَمْ وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللهُ أَجْرَكَ مَرّتَيْنِ فَإِنْ تَوَلّيْت فَإِنّ عَلَيْكَ إثْمَ الْقِبْطِ { يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلاّ نَعْبُدَ إِلاَ اللهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُوْنِ اللهِ فَإِنْ تَوَلّوْا فَقُولُوْا اشْهَدُوْا بِأَنّا مُسْلِمُوْنَ-

‘করুণাময় কৃপানিধান আল্লাহর নামে’- ‘আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে ক্বিবতীদের সম্রাট মুক্বাউক্বিসের প্রতি’। শান্তি বর্ষিত হৌক তাঁর প্রতি, যিনি হেদায়াতের অনুসরণ করেন। অতঃপর আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন। নিরাপদ থাকুন। ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ ছওয়াব দান করবেন। কিন্তু যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহ’লে ক্বিবতীদের (অর্থাৎ মিসরীয়দের ইসলাম গ্রহণ না করার) পাপ আপনার উপরে বর্তাবে। (আল্লাহ বলেন,) ‘হে কেতাবধারীগণ! তোমরা এস…’ (আলে ইমরান ৩/৬৪)।

হযরত হাতেব বিন আবী বালতা‘আহ (রাঃ) পত্র খানা সম্রাটের হাতে সমর্পণ করার পর বললেন, আপনার পূর্বে এই মিসরে এমন একজন শাসক গত হয়ে গেছেন, যিনি বলতেন, أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى، فَأَخَذَهُ اللهُ نَكَالَ الْآخِرَةِ وَالْأُوْلَى  ‘আমিই  তোমাদের বড় পালনকর্তা’। অতঃপর আল্লাহ তাকে পরকালের ও ইহকালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেন’ (নাযে‘আত ৭৯/২৪-২৫)। হাতেব বলেন, فَاعْتَبِرْ بِغَيْرِك وَلاَ يَعْتَبِرُ غَيْرُك بِك   ‘অতএব আপনি অন্যের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুন এবং অন্যেরা যেন আপনার থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করে’। জওয়াবে মুক্বাউক্বিস বললেন, إنّ لَنَا دِيْنًا لَنْ نَدَعَهُ إلاّ لِمَا هُوَ خَيْرٌ مِنْهُ ‘নিশ্চয়ই আমাদের একটি দ্বীন রয়েছে। আমরা তা ছাড়তে পারি না, যতক্ষণ না তার চাইতে উত্তম কিছু পাই’। হাতেব (রাঃ) বললেন, আমরা আপনাকে ইসলামের দিকে আহবান জানাচ্ছি। যার মাধ্যমে আল্লাহ বিগত দ্বীনসমূহের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করেছেন। আমাদের নবী সকল মানুষকে আহবান জানিয়েছেন। কুরায়েশরা শক্তভাবে বিরোধিতা করে, ইহুদীরা শত্রুতা করে। কিন্তু নাছারাগণ নিকটবর্তী থাকে। আমার জীবনের কসম! ঈসার জন্য মূসার সুসংবাদ ছিল যেমন, মুহাম্মাদের জন্য ঈসার সুসংবাদও ছিল তেমন। কুরআনের প্রতি আপনাকে আমাদের আহবান ঐরূপ, যেমন ইনজীলের প্রতি তাওরাত অনুসারীদেরকে আপনার আহবান। যখন কোন নবীর আবির্ভাব ঘটে, তখন সেই যুগের সকল লোক তার উম্মত হিসাবে গণ্য হয়। তখন তাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় তাঁর আনুগত্য করা। আপনি তাদের মধ্যেকার একজন, যিনি বর্তমান নবীর যুগ পেয়েছেন। আমরা মসীহের দ্বীন থেকে আপনাকে নিষেধ করছি না। বরং আমরা তাঁর দ্বীনের প্রতিই আপনাকে দাওয়াত দিচ্ছি’।

মুক্বাউক্বিস বললেন, আমি এ নবীর বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমি তাকে পেয়েছি এভাবে যে, তিনি কোন অপসন্দনীয় কাজের নির্দেশ দেন না। আমি তাঁকে ভ্রষ্ট জাদুকর বা মিথ্যুক গণৎকার হিসাবে পাইনি। আমি তাঁর সাথে নবুঅতের এই নিদর্শন পাচ্ছি যে, তিনি গায়েবী খবর প্রকাশ করছেন এবং পরামর্শের (মাধ্যমে কাজ করার) নির্দেশ দিচ্ছেন। অতএব আমি ভেবে দেখব’। অতঃপর তিনি পত্রখানা সসম্মানে হাতীর দাতের দ্বারা নির্মিত একটি বাক্সে রাখলেন এবং সীলমোহর দিয়ে যত্নসহকারে রাখার জন্য দাসীর হাতে দিলেন। অতঃপর আরবী জানা একজন কেরানীকে ডেকে নিম্নোক্ত জওয়াবী পত্র লিখলেন-

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ لِمُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ مِنْ الْمُقَوْقِسِ عَظِيمِ الْقِبْطِ سَلاَمٌ عَلَيْك أَمّا بَعْدُ فَقَدْ قَرَأْتُ كِتَابَك وَفَهِمْتُ مَا ذَكَرْتَ فِيهِ وَمَا تَدْعُو إلَيْهِ وَقَدْ عَلِمْتُ أَنَّ نَبِيًّا بَقِيَ وَكُنْتُ أَظُنُّ أَنّهُ يَخْرُجُ بِالشَّامِ وَقَدْ أَكْرَمْتُ رَسُوْلَك وَبَعَثْتُ إلَيْك بِجَارِيَتَيْنِ لَهُمَا مَكَانٌ فِي الْقِبْطِ عَظِيمٌ وَبِكِسْوَةٍ وَأَهْدَيْتُ إلَيْك بَغْلَةً لِتَرْكَبَهَا وَالسَّلاَمُ عَلَيْك-

‘করুণাময় কৃপানিধান আল্লাহর নামে’ ‘মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর জন্য ক্বিবতীসম্রাট মুক্বাউক্বিসের পক্ষ হ’তে- আপনার উপরে শান্তি বর্ষিত হউক! অতঃপর আমি আপনার পত্র পাঠ করেছি এবং সেখানে আপনি যা বর্ণনা করেছেন ও যেদিকে আহবান জানিয়েছেন, তা অনুধাবন করেছি। আমি জানি যে, একজন নবী আসতে বাকী রয়েছেন। আমি ধারণা করতাম যে, তিনি শাম (সিরিয়া) থেকে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতকে সম্মান করেছি এবং আপনার নিকটে দু’জন দাসী পাঠিয়েছি, ক্বিবতীদের মাঝে যাদের উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। আপনার জন্য পোষাক এবং বাহন হিসাবে ব্যবহারের জন্য একটি খচ্চর উপঢৌকন স্বরূপ পাঠালাম। আপনার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক!’

মুক্বাউক্বিস এর বেশী কিছু লেখেননি, ইসলামও কবুল করেননি। দাসী দু’জন ছিল মারিয়াহ (مَارِيَةُ) এবং শিরীন (سِيْرِينُ)। মারিয়া ক্বিবতিয়ার গর্ভে রাসূল (ছাঃ)-এর শেষ সন্তান ইবরাহীমের জন্ম হয়। শিরীনকে কবি হাসসান বিন ছাবিত আনছারীকে দেওয়া হয়। ‘দুলদুল’ নামক উক্ত খচ্চরটি মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর যামানা পর্যন্ত জীবিত ছিল’।[7]

৩. পারস্য সম্রাট কিসরার নিকটে পত্র (الكتاب إلى كسرى ملك فارس) :

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পারস্য সম্রাট খসরু পারভেযের নিকটে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন, যিনি ছিলেন অর্ধেক প্রাচ্য দুনিয়ার অধিপতি এবং মজূসী বা যারদাশতী ধর্মের অনুসারী, যারা অগ্নিপূজক ছিলেন। পত্রবাহক ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন হুযাফা সাহমী (عَبْدُ اللهِ بْنُ حُذَافَةَ السَّهْمِيُّ)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর পত্রটি ছিল নিম্নরূপ:

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُوْلِ اللهِ إلَى كِسْرَى عَظِيمِ فَارِسَ سَلاَمٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى وَآمَنَ بِاَللهِ وَرَسُوْلِهِ وَشَهِدَ أَنْ لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَنّ مُحَمّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ أَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ اللهِ فَإِنِّيْ أَنَا رَسُوْلُ اللهِ إلَى النَّاسِ كَافّةً لِيُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيًّا وَيَحِقَّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِيْنَ- أَسْلِمْ تَسْلَمْ فَإِنْ أَبَيْتَ فَعَلَيْكَ إثْمُ الْمَجُوْسِ-

‘…আমি আপনাকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাচ্ছি। কেননা আমি আল্লাহর পক্ষ হ’তে সকল মানব জাতির জন্য প্রেরিত রাসূল’। ‘যাতে তিনি জীবিতদের (জাহান্নামের) ভয় প্রদর্শন করেন এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়’ (ইয়াসীন ৩৬/৭০)। ইসলাম কবুল করুন, নিরাপদ থাকুন। যদি অস্বীকার করেন, তাহ’লে মজূসীদের পাপ আপনার উপরে বর্তাবে’।

পত্রবাহক সাহমী (রাঃ) পত্রখানা (কিসরার গভর্ণর) বাহরায়নের শাসকের নিকটে হস্তান্তর করেন। অতঃপর পত্রটি গভর্ণর তার লোকদের মারফত পাঠান, না সাহমী (রাঃ)-কেই পাঠান, সে বিষয়টি সম্পর্কে মুবারকপুরী নিশ্চিত নন। যাই হোক পত্রটি যখন কিসরাকে পাঠ করে শুনানো হয়, তখন তিনি পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন ও দম্ভভরে বলেন, عَبْدٌ حَقِيْرٌ مِنْ رَعِيَّتِيْ يَكْتُبُ اسْمَهُ قَبْلِيْ ‘আমার একজন নিকৃষ্ট প্রজা তার নাম লিখেছে আমার নামের পূর্বে’। এ খবর রাসূল (ছাঃ)-এর নিকটে পৌঁছলে তিনি বলেন, مَزَّقَ اللهُ مُلْكَهُ ‘আল্লাহ তার সাম্রাজ্যকে ছিন্নভিন্ন করুন’! ভবিষ্যতে সেটাই হয়েছিল। কিসরা তার অধীনস্থ ইয়ামনের গভর্ণর বাযান (باذان) -এর কাছে লিখলেন, ‘হেজাযের এই ব্যক্তিটির নিকটে তুমি দু’জন শক্তিশালী লোক পাঠাও। যাতে তারা ঐ ব্যক্তিকে আমার কাছে ধরে নিয়ে আসে’। বাযান সে মোতাবেক দু’জন লোককে একটি পত্রসহ মদীনায় পাঠান, যাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাদের সাথে কিসরার দরবারে চলে যান। তারা গিয়ে রাসূলের সাথে বেশ ধমকের সুরে কথা বলল। রাসূল (ছাঃ) বললেন, বেশ তোমরা কাল এসো। এরি মধ্যে ইরানের রাজধানীতে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে যায়। পুত্র শিরওয়াইহ (شيرويه) পিতা খসরু পারভেযকে হত্যা করে রাতারাতি সিংহাসন দখল করে নেয়। ৭ম হিজরীর ১০ জুমাদাল ঊলা মঙ্গলবারের রাতে এ আকস্মিক ঘটনা ঘটে যায়। পরদিন সকালে ঐ দু’জন লোক রাসূলের দরবারে এসে ঘটনা শুনে অবিশ্বাস করে বলে উঠল, আমরা আপনার এই বাজে কথা সম্রাটের কাছে লিখে পাঠাব’। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, হ্যাঁ। তবে তাকে একথা বলো যে,

وقولا له : إن ديني وسلطاني سيبلغ ما بلغ كسرى وينتهي إلى منتهي الخف والحافر، وقولا له : إن أسلمت أعطيتك ما تحت يدك، وملكتك على قومك من الأبناء-

‘আমার দ্বীন ও শাসন ঐ পর্যন্ত পৌঁছবে, যে পর্যন্ত কিসরা পৌঁছেছেন এবং সেখানে গিয়ে শেষ হবে। যার পরে আর উট ও ঘোড়ার পা যাবে না’। তাকে একথাও বলো যে, ‘যদি তিনি মুসলমান হয়ে যান, তবে তার অধিকারে যা কিছু রয়েছে, সব তাকে দেওয়া হবে এবং তাকে তোমাদের জাতির জন্য বাদশাহ করে দেওয়া হবে’।[8] লক্ষণীয় বিষয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তার পত্রে أَسْلِمْ تَسْلَمْ ‘ইসলাম কবুল করুন, নিরাপদ থাকুন’ কথাটি লিখেছিলেন, যা ছিল এক প্রকার ভবিষ্যদ্বাণী স্বরূপ। কিসরা প্রকাশ্যে অস্বীকার করেন ও পত্রটি ছিঁড়ে ফেলে চরম বেআদবী করেন। ফলে তার রাজনৈতিক নিরাপত্তা দ্রুত ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে একই কথা তিনি খৃষ্টান রাজা নাজাশীকে লিখলে তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং তার রাজ্য নিরাপদ ও সুদৃঢ় হয়। অপর খৃষ্টান রাজা মুক্বাউক্বিস ইসলাম কবুল না করলেও প্রত্যাখ্যান করেননি। বরং তিনি রাসূল (ছাঃ)-এর পত্র ও পত্রবাহক দূতকে সম্মান করেন ও মদীনায় মূল্যবান উপঢৌকনাদি পাঠান। ফলে তার রাজ্য নিরাপদ থাকে।

বলা বাহুল্য যে, রাসূল (ছাঃ)-এর প্রদত্ত উক্ত আগাম খবরে  বাযান ও ইয়ামনে বসবাসরত পারিসকরা সবাই মুসলমান হয়ে যায় ও তাদের শাসিত এলাকার অধিকাংশ লোক মুসলমান হয়ে যায়।

৪. রোম সম্রাট ক্বায়ছার হেরাক্লিয়াসের নিকটে পত্র (الكتاب إلى قيصر ملك الروم) :  রোম সাম্রাজ্যের পূর্ব অংশের শাসক কনষ্ট্যান্টিনোপলের বিখ্যাত খৃষ্টান সম্রাট হেরাকল এ সময় যেরুযালেমে অবস্থান করছিলেন।[9] পত্রবাহক দেহিয়া বিন খালীফা কালবী ওরফে দেহিয়াতুল কালবী (রাঃ) সরাসরি গিয়ে তাকে রাসূলের পত্রটি হস্তান্তর করেন। তবে মুবারকপুরী বলেন, রাসূলের নির্দেশ মতে তিনি পত্রটি বছরার শাসনকর্তার নিকটে হস্তান্তর করেন এবং তিনি এটা রোম সম্রাটকে পৌঁছে দেন। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

بسم الله الرحمن الرحيم. من محمد عبد الله ورسوله إلى هرقل عظيم الروم، سلام على من اتبع الهدي، أسلم تسلم، أسلم يؤتك الله أجرك مرتين، فإن توليت فإن عليك إثم الأريسيين {يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ الخ-

‘… ইসলাম কবুল করুন! নিরাপদ থাকুন। ইসলাম কবুল করুন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ ছওয়াব দান করবেন। যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তাহ’লে আপনার উপরে প্রজাবৃন্দের পাপ বর্তাবে। (আল্লাহ বলেন,) হে কিতাবধারীগণ’!…।

মনছূরপুরীর মতে সম্রাট রাসূল (ছাঃ)-এর দূতকে খুব সমাদর করেন এবং জাঁকজমকপূর্ণ দরবারে তাকে অনেক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) সম্পর্কে অধিক জানার জন্য মক্কা থেকে আগত কোন ব্যবসায়ীকে দরবারে আনার নির্দেশ দেন। ইমাম বুখারী (রহঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) প্রমুখাৎ বর্ণনা করেন যে, ঘটনাক্রমে ঐ সময় আবু সুফিয়ান একটি ব্যবসায়ী কাফেলা নিয়ে শামে অবস্থান করছিলেন। তাঁকে দরবারে ডেকে আনা হয়। হেরাক্বল তার দোভাষীর মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে কথিত নবীর সবচাইতে নিকটাত্মীয় কে? আবু সুফিয়ান বললেন, আমি। আবু সুফিয়ান বলেন, অতঃপর আমাকে তিনি কাছে ডেকে নিলেন এবং আমার সাথীদের পিছনে বসালেন। অতঃপর তিনি আমার সাথীদের বললেন, আমি এঁকে কিছু কথা জিজ্ঞেস করব। মিথ্যা বললে, তোমরা ধরে দিবে’। আবু সুফিয়ান তখন ইসলামের শত্রুদের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি বলেন, যদি আমাকে মিথ্যুক বলে আখ্যায়িত করার ভয় না থাকত, তাহ’লে আমি অবশ্যই মুহাম্মাদ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলতাম। ছহীহ বুখারীতে বর্ণিত হেরাকল ও আবু সুফিয়ানের মধ্যকার কথোপকথন ও হেরাকলের মন্তব্য সমূহ নিম্নে তুলে ধরা হ’ল:

প্রশ্ন-১ : নবীর বংশ মর্যাদা কেমন? উত্তর : উচ্চ বংশীয়।

(হেরাকলের মন্তব্য) : হ্যাঁ। এরূপই হয়ে থাকে। যাতে তাঁর প্রতি আনুগত্যে কারু মনে সংকোচ সৃষ্টি না হয়।

প্রশ্ন-২ : তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে কেউ নবুঅতের দাবী করেছেন কি?

উত্তর : না’। মন্তব্য : হ্যাঁ। এরূপ হ’লে বুঝতাম যে, বাপ-দাদার অনুকরণে এ দাবী করেছেন।

প্রশ্ন-৩ : নবুঅতের দাবী করার পূর্বে ইনি কি কখনো মিথ্যা বলেছেন বা তার উপরে মিথ্যার অপবাদ দেওয়া হয়েছিল?

উত্তর : না’। মন্তব্য : ঠিক। যে ব্যক্তি মানুষকে মিথ্যা বলে না, সে ব্যক্তি আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলতে পারে না।

প্রশ্ন-৪ : নবীর বাপ-দাদাদের মধ্যে কেউ কখনো বাদশাহ ছিলেন কি? উত্তর : না’। মন্তব্য : এটা থাকলে আমি বুঝতাম যে, নবুঅতের বাহানায় বাদশাহী হাছিল করতে চায়।

প্রশ্ন-৫ : তাঁর অনুসারীদের মধ্যে গরীব ও দুর্বল লোকদের সংখ্যা বেশী, না অভিজাত শ্রেণীর লোকদের সংখ্যা বেশী?

উত্তর : গরীব ও দুর্বল লোকদের সংখ্যা বেশী’। মন্তব্য : প্রত্যেক নবীর প্রথম অনুসারী দল দুর্বলেরাই হয়ে থাকে।

প্রশ্ন-৬ : এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, না কমছে?

উত্তর : বাড়ছে’। মন্তব্য : ঈমানের এটাই বৈশিষ্ট্য যে, আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পায় ও ক্রমে পূর্ণতার স্তরে পেঁŠছে যায়।

প্রশ্ন-৭ : কেউ কি তাঁর দ্বীন ত্যাগ করে চলে যায়?

উত্তর : না’। মন্তব্য : ঈমানের প্রভাব এটাই যে, একবার হৃদয়ে বসে গেলে তা আর বের হয় না।

প্রশ্ন-৮ : এই ব্যক্তি কখনো অঙ্গীকার বা চুক্তি ভঙ্গ করেছেন কি?

উত্তর : না’। তবে এ বছর আমরা (হোদায়বিয়ার) সন্ধিচুক্তি করেছি। দেখি তার ফলাফল কি দাঁড়ায়।’ আবু সুফিয়ান বলেন, একথাটুকুই মাত্র যুক্ত করেছিলাম। কিন্তু হেরাকল সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বললেন, নবীরা কখনো চুক্তি ভঙ্গ করেন না। কেবল দুনিয়াদাররাই চুক্তি ভঙ্গ করে থাকে। আর নবীগণ কখনোই দুনিয়াপূজারী হন না।

প্রশ্ন-৯ : এই ব্যক্তির সঙ্গে তোমাদের কখনো যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছি কি?

উত্তর : হয়েছে।

প্রশ্ন-১০ : তার ফলাফল কি ছিল?

উত্তর : কখনো তিনি বিজয়ী হয়েছেন (যেমন বদরে), কখনো আমরা বিজয়ী হয়েছি (যেমন ওহোদে)। মন্তব্য : আল্লাহর নবীদের এই অবস্থাই হয়ে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নবীগণই লাভ করে থাকেন’।

প্রশ্ন-১১ : তাঁর শিক্ষা কি?

উত্তর : এক আল্লাহর ইবাদত কর। বাপ-দাদার তরীকা (মূর্তি পূজা) ছেড়ে দাও। ছালাত, ছিয়াম, সত্যবাদিতা, পবিত্রতা, আত্মীয়তা রক্ষার অপরিহার্যতা অবলম্বন কর।’ মন্তব্য : প্রতিশ্রুত নবীর এইসব নিদর্শনই আমাদের বলা হয়েছে। আমি বুঝতে পারছিলাম যে, নবীর আবির্ভাব ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলাম না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন। শুনে রাখ আবু সুফিয়ান! فَإِنْ كَانَ مَا تَقُوْلُ حَقًّا فَسَيَمْلِكُ مَوْضِعَ قَدَمَيَّ هَاتَيْنِ، فَلَوْ أَنِّيْ أَعْلَمُ أَنِّيْ أَخْلُصُ إِلَيْهِ لَتَجَشَّمْتُ لِقَاءَهُ، وَلَوْ كُنْتُ عِنْدَهُ لَغَسَلْتُ عَنْ قَدَمَيْهِ-  ‘যদি তুমি সত্য কথা বলে থাক, তবে সত্বর তিনি আমার পায়ের তলার মাটিরও (অর্থাৎ শাম ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের) অধিকার লাভ করবেন’। ‘যদি আমি জানতাম যে, আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারব, তাহ’লে আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য সাধ্যমত কষ্ট স্বীকার করতাম’। ‘আর যদি আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারতাম, তাহ’লে আমি তাঁর দু’ পা ধুয়ে দিতাম’।

অতঃপর হেরাক্লিয়াস রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) প্রেরিত পত্রটি নিয়ে পাঠ করলেন। পত্র পাঠ শেষ হ’লে (ভক্তির আবেশে) সভাসদগণের কণ্ঠস্বর ক্রমেই উচ্চ মার্গে উঠতে লাগল এবং এ সময়ে আমাদেরকে চলে যেতে বলা হ’ল।

আবু সুফিয়ান বলেন যে, রাজদরবার থেকে বেরিয়ে এসে আমি সাথীদের বললাম,لَقَدْ أَمِرَ أَمْرُ ابْنِ أَبِيْ كَبْشَةَ إِنَّهُ يَخَافُهُ مَلِكُ بَنِي الْأَصْفَرِ ইবনু আবী কাবশার ব্যাপারটি মযবুত হয়ে গেল। আছফারদের সম্রাট তাকে ভয় পাচ্ছেন’।[10] আবু সুফিয়ান বলেন, এরপর থেকে আমার বিশ্বাস বদ্ধমূল হ’তে থাকল যে, সত্বর তিনি বিজয় লাভ করবেন। অবশেষে আল্লাহ আমার মধ্যে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন’।[11] অর্থাৎ পরের বছর ৮ম হিজরীর ১৭ রামাযানে মক্কা বিজয় হয় এবং আবু সুফিয়ান সেদিনই ইসলাম কবুল করেন।

রাসূল (ছাঃ)-এর পত্র রোম সম্রাটের উপরে কেমন প্রভাব বিস্তার করেছিল, উপরোক্ত ঘটনায় তা প্রতীয়মান হয়। পত্রবাহক দেহিয়া কালবীকে রোম সম্রাট বহুমূল্য উপঢৌকনাদি দিয়ে সম্মানিত করেন এবং রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য মূল্যবান হাদিয়া প্রেরণ করেন। আল্লাহ পাকের এমনই কুদরত যে, রাসূলের দুশমনের মুখ দিয়েই আরেক অবন্ধু সম্রাটের সম্মুখে তার সত্যায়ন করালেন এবং সম্রাটকে হেদায়াত দান করলেন। ফালিল্লাহিল হাম্দ।

৫. বাহরায়নের শাসক মুনযির বিন সাওয়া-র নিকটে পত্র (الكتاب إلى المنذر بن ساوى ملك البحرين ) :

পারস্য সম্রাটের গভর্ণর বাহরায়নের শাসক মুনযির বিন সাওয়ার নিকটে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ‘আলা ইবনুল হাযরামী (রাঃ)-কে পত্রবাহক হিসাবে প্রেরণ করেন। পত্র পেয়ে তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং বাহরায়েনের অধিকাংশ লোক মুসলমান হয়ে যায়। অতঃপর তিনি জবাবী পত্রে রাসূল (ছাঃ)-কে লেখেন, হে রাসূল! বাহরায়েন বাসীদের অনেকে ইসলাম পসন্দ করেছে ও কবুল করেছে, অনেকে অপসন্দ করেছে। আমার এ মাটিতে অনেক মজূসী (অগ্নিউপাসক) ও ইহুদী রয়েছে। অতএব এদের বিষয়ে আপনার নির্দেশ কি আমাকে জানাতে মর্যী হয়। তখন রাসূল (ছাঃ) তার জওয়াবে লিখলেন,

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرّحِيمِ مِنْ مُحَمَّدٍ رَسُولِ اللهِ إلَى الْمُنْذِرِ بْنِ سَاوَى سَلاَمٌ عَلَيْكَ فَإِنّي أَحْمَدُ إلَيْك اللهَ الَّذِيْ لاَ إلَهَ إلاّ هُوَ وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَأَنّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ أَمّا بَعْدُ فَإِنّيْ أُذَكّرُكَ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ فَإِنّهُ مَنْ يَنْصَحْ فَإِنّمَا يَنْصَحُ لِنَفْسِهِ وَإِنّهُ مَنْ يُطِعْ رُسُلِيْ وَيَتَّبِعْ أَمْرَهُمْ فَقَدْ أَطَاعَنِيْ وَمَنْ نَصَحَ لَهُمْ فَقَدْ نَصَحَ لِيْ وَإِنّ رُسُلِيْ قَدْ أَثْنَوْا عَلَيْكَ خَيْرًا وَإِنّي قَدْ شَفَعْتُكَ فِيْ قَوْمِك فَاتْرُكْ لِلْمُسْلِمِيْنَ مَا أَسْلَمُوْا عَلَيْهِ وَعَفَوْتُ عَنْ أَهْلِ الذُّنُوبِ فَاقْبَلْ مِنْهُمْ وَإِنَّكَ مَهْمَا تُصْلِحْ فَلَنْ نَعْزِلَكَ عَنْ عَمَلِك وَمَنْ أَقَامَ عَلَى يَهُوْدِيَّةٍ أَوْ مَجُوْسِيَّةٍ فَعَلَيْهِ الْجِزْيَةُ-

‘করুণাময় কৃপানিধান আল্লাহর নামে। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে মুনযির বিন সাওয়ার প্রতি। আপনার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! অতঃপর আমি আপনার নিকটে আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। অতঃপর আমি আপনাকে মহান আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। কেননা যে ব্যক্তি উপদেশ গ্রহণ করে, সে তার নিজের জন্যই তা করে। যে ব্যক্তি আমার প্রেরিত দূতদের আনুগত্য করে ও তাদের নির্দেশের অনুসরণ করে, সে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করে। যে ব্যক্তি তাদের প্রতি সদাচরণ করে, সে আমার প্রতি সদাচরণ করে। আমার দূতগণ আপনার সম্পর্কে উত্তম প্রশংসা করেছে। আপনার জাতি সম্পর্কে আমি আপনার সুফারিশ কবুল করলাম। অতএব মুসলমানদেরকে তাদের অবস্থার উপরে ছেড়ে দিন। অপরাধীদের আমি ক্ষমা করলাম। আপনিও ক্ষমা করুন। অতঃপর যতদিন আপনি সংশোধনের পথে থাকবেন, ততদিন আমরা আপনাকে দায়িত্ব হ’তে অপসারণ করব না এবং যে ব্যক্তি ইহুদী বা মজূসী ধর্মের উপরে দন্ডায়মান থাকবে, তার উপরে জিযিয়া কর আরোপিত হবে’।[12]

৬. ইয়ামামার খৃষ্টান শাসক হাওযাহ বিন আলীর নিকটে পত্র (الكتاب إلى هَوْذَة بن على صاحب اليمامة) :

পত্রবাহক সালীত্ব বিন আমর আল-আমেরী (রাঃ) রাসূল (ছাঃ)-এর মোহরাংকিত পত্রখানা নিয়ে সরাসরি প্রাপকের হাতে সমর্পণ করেন। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

بِسْمِ اللهِ الرّحْمَنِ الرّحِيمِ مِنْ مُحَمّدٍ رَسُولِ اللّهِ إلَى هَوْذَةَ بْنِ عَلِيّ سَلاَمٌ عَلَى مَنْ اتّبَعَ الْهُدَى وَاعْلَمْ أَنّ دِينِي سَيَظْهَرُ إلَى مُنْتَهَى الْخُفِّ وَالْحَافِرِ فَأَسْلِمْ تَسْلَمْ وَأَجْعَلْ لَكَ مَا تَحْتَ يَدَيْكَ-

‘… আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে হাওযাহ বিন আলীর প্রতি। শান্তি বর্ষিত হৌক ঐ ব্যক্তির উপরে যিনি হেদায়াতের অনুসরণ করেন। আপনি জানুন যে, আমার দ্বীন বিজয়ী হবে যতদূর উট ও ঘোড়া যেতে পারে। অতএব আপনি ইসলাম কবুল করুন, নিরাপদ থাকুন। আপনার অধীনস্থ এলাকা আপনাকে প্রদান করব’।

ওয়াক্বেদী বর্ণনা করেন, এই সময় দামেষ্কের খৃষ্টান নেতা আরকূন (أركون) হাওযাহর নিকটে বসে ছিলেন। তিনি তাকে শেষনবী (ছাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে হাওযাহ বলেন, তাঁর চিঠি আমার কাছে এসেছে। তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। কিন্তু আমি আমার ধর্মে দৃঢ় থাকতে চাই। তাছাড়া আমি আমার জাতির নেতা। যদি আমি তাঁর অনুসারী হই, তাহ’লে নেতৃত্ব হারাবো’। আরকূন বললেন, হ্যাঁ। তবে আল্লাহর কসম! যদি আপনি তাঁর অনুসারী হন, তাহ’লে অবশ্যই তিনি আপনাকে শাসনক্ষমতায় রাখবেন। অতএব আপনার জন্য কল্যাণ রয়েছে তাঁর আনুগত্যের মধ্যে। নিশ্চয়ই তিনি সেই আরবী নবী, যার সুসংবাদ দিয়ে গেছেন ঈসা ইবনে মারিয়াম। আর আমাদের ইনজীলেও লিখিত আছে, মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ’।

অতঃপর হাওযাহ পত্রবাহককে যথাযোগ্য আতিথ্য ও সম্মান প্রদর্শন করেন এবং পত্রের জওয়াবে তিনি লেখেন-

مَا أَحْسَنَ مَا تَدْعُو إلَيْهِ وَأَجْمَلَهُ وَالْعَرَبُ تَهَابُ مَكَانِي فَاجْعَلْ إلَيّ بَعْضَ الْأَمْرِ أَتْبَعُك-

‘কতই না সুন্দর ও উত্তম বিষয়ের দিকে আপনি আমাকে আহবান জানিয়েছেন। আরব জাতি আমার উঁচু স্থানকে ভীতির চোখে দেখে। অতএব আপনার রাজত্বের কিছু অংশ আমাকে দান করুন, তাহ’লে আপনার আনুগত্য করব’। মানছূরপুরী ‘অর্ধেক রাজত্ব (آدهي حكومت) ’ বলেছেন।

অতঃপর হিজরের তৈরী মূল্যবান পোষাক ও উপঢৌকনাদি পত্রবাহককে প্রদান করেন। জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,  لَوْ سَأَلَنِيْ سَيَابَةً مِنْ الْأَرْضِ مَا فَعَلْتُ، بَادَ وَبَادَ مَا فِيْ يَدَيْهِ ‘যদি সে আমার নিকটে এক টুকরা শুকনা মাটিও চায়, তাও আমি তাকে দিব না। সে নিজে ধ্বংস হ’ল এবং যেটুকু তার অধীনে ছিল তাও হারালো’। অর্থাৎ নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়াটাই তার ধ্বংসের কারণ।

পরের বছর মক্কা বিজয় শেষে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন প্রত্যাবর্তন করেন, তখন জিব্রীল (আঃ) এসে তাঁকে খবর দেন যে, হাওযাহ মৃত্যু বরণ করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, أَمَا إنّ الْيَمَامَةَ سَيَخْرُجُ بِهَا كَذّابٌ يَتَنَبّأُ يُقْتَلُ بَعْدِي ‘সত্বর ইয়ামামা হ’তে একজন ভন্ড নবীর আবির্ভাব ঘটবে, আমার পরে যাকে হত্যা করা হবে’। জনৈক ব্যক্তি বলে উঠল, কে তাকে হত্যা করবে? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন,أَنْتَ وَأَصْحَابُك ‘তুমি ও তোমার সাথীরা’।[13] রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সময়ে সেটা বাস্তবায়িত হয়েছিল এবং হামযা (রাঃ)-এর হত্যাকারী ওয়াহ্শী ভন্ডনবী মুসায়লামা কাযযাবকে হত্যা করেন। এদিকে ইঙ্গিত করেই সম্ভবতঃ রাসূল (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়ে জান্নাতবাসী হবে, যা দেখে আল্লাহ হাসবেন’।[14]

৭. দামেষ্কের খৃষ্টান শাসক হারেছ বিন আবু শিম্র আল-গাসসানীর নিকটে পত্র (الكتاب إلى الحارث بن أبي شمر الغساني صاحب دمشق) : সিরিয়ার বনু আসাদ বিন খোযায়মা গোত্রভুক্ত ছাহাবী শুজা বিন ওয়াহাব আল-আসাদীকে পত্রবাহক হিসাবে প্রেরণ করা হয়। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

بِسْمِ اللهِ الرّحْمَنِ الرّحِيْمِ مِنْ مُحَمّدٍ رَسُولِ اللهِ إلَى الْحَارِثِ بْنِ أَبِيْ شِمْرٍ سَلاَمٌ عَلَى مَنْ اتّبَعَ الْهُدَى وَآمَنَ بِاَللهِ وَصَدّقَ وَإِنّي أَدْعُوْكَ إلَى أَنْ تُؤْمِنَ بِاَللهِ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ يَبْقَى لَكَ مُلْكُك-

‘… আমি আপনাকে আহবান জানাচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন। যিনি একক, যার কোন শরীক নেই। তিনি আপনার রাজত্ব বাকী রাখবেন’।

পত্র পাঠে হারেছ সদম্ভে বলে উঠলেন,مَنْ يَّنْزِعُ مُلُكِيْ مِنِّيْ؟ أَنَا سَائِرٌ إِلَيْهِ ‘কে আমার রাজ্য ছিনিয়ে নেবে? আমি তার দিকে সৈন্য পরিচালনা করব’। তিনি ইসলাম কবুল করলেন না।

মানছূরপুরী বলেন, পত্র পাঠে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি বলেছিলেন, আমি মদীনায় হামলা করব’। পরে ঠান্ডা হয়ে পত্রবাহককে সসম্মানে বিদায় করেন। কিন্তু মুসলমান হননি।

৮. ওমানের সম্রাটের নিকটে পত্র (الكتاب إلى ملك عُمَان) : ওমানের খৃষ্টান সম্রাট জায়ফার ও তার ভাই আবদ-এর নামে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) পত্র লেখেন। পত্রবাহক ছিলেন হযরত  আমর ইবনুল আছ (রাঃ)। পত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

بِسْمِ اللهِ الرّحْمَنِ الرّحِيمِ مِنْ مُحَمّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ إلَى جَيْفَرَ وَعَبْدٍ ابْنَيْ الْجُلَنْدَى سَلاَمٌ عَلَى مَنْ اتّبَعَ الْهُدَى أَمّا بَعْدُ فَإِنّي أَدْعُوكُمَا بِدِعَايَةِ الْإِسْلاَمِ أَسْلِمَا تَسْلَمَا فَإِنّي رَسُولُ اللهِ إلَى النّاسِ كَافّةً لِأُنْذِرَ مَنْ كَانَ حَيّا وَيَحِقّ الْقَوْلُ عَلَى الْكَافِرِينَ فَإِنّكُمَا إنْ أَقْرَرْتُمَا بِالْإِسْلاَمِ وَلّيْتُكُمَا وَإِنْ أَبَيْتُمَا أَنْ تُقِرّا بِالْإِسْلاَمِ فَإِنّ مُلْكَكُمَا زَائِلٌ عَنْكُمَا وَخَيْلِيْ تَحُلّ بِسَاحَتِكُمَا وَتَظْهَرُ نُبُوَّتِيْ عَلَى مُلْكِكُمَا-

‘… আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদের পক্ষ হ’তে জালান্দীর দুই পুত্র জায়ফার ও আবদের প্রতি। শান্তি বর্ষিত হৌক ঐ ব্যক্তির উপরে যে হেদায়াতের অনুসরণ করে। অতঃপর আমি আপনাদের দু’জনকে ইসলামের দিকে আহবান জানাচ্ছি। আপনারা ইসলাম কবুল করুন, নিরাপদ থাকুন। আমি মানবজাতির সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি, যাতে আমি জীবিতদের (জাহান্নামের) ভয় দেখাই এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অতঃপর যদি আপনারা ইসলাম কবুল করেন, তবে আপনাদেরকেই আমি গভর্ণর নিযুক্ত করে দেব। আর যদি ইসলাম কবুলে অস্বীকার করেন, তাহ’লে আপনাদের রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে এবং আমার ঘোড়া আপনাদের ময়দানে প্রবেশ করবে এবং আমার নবুঅত আপনাদের রাজ্যে বিজয়ী হবে’।

আমর ইবনুল আছ (রাঃ) বলেন, পত্রটি নিয়ে আমি ওমান গেলাম এবং ছোট ভাই আবদের নিকটে আগে পেঁŠছলাম। কেননা ইনি ছিলেন অধিক দূরদর্শী ও নম্র স্বভাবের মানুষ। আমি তাকে বললাম যে, ‘আমি আপনার ও আপনার ভাইয়ের নিকটে আল্লাহর রাসূলের দূত হিসাবে এসেছি’। তিনি বললেন, বয়সে ও রাজত্বে ভাই আমার চেয়ে বড়। আমি আপনাকে তাঁর নিকটে পৌঁছে দিচ্ছি, যাতে তিনি আপনার পত্র পাঠ করেন। অতঃপর তিনি বললেন, وما تدعو إليه؟ ‘কোন দিকে আপনি আমাদের দাওয়াত দিচ্ছেন’? আমি বললাম, আমি আল্লাহর দিকে আহবান জানাচ্ছি। যিনি একক, যার কোন শরীক নেই এবং তিনি ব্যতীত অন্য সকল উপাস্য হ’তে আপনি পৃথক হয়ে যাবেন এবং সাক্ষ্য দিবেন যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও তাঁর রাসূল। তিনি বললেন, হে আমর! আপনি আপনার গোত্রের নেতার পুত্র। বলুন, আপনার পিতা কেমন আচরণ করেছেন? কেননা তাঁর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় রয়েছে। আমি বললাম, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এমতাবস্থায় যে, মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেননি। কতই না ভাল হ’ত যদি তিনি ইসলাম কবুল করতেন ও রাসূলকে সত্য বলে জানতেন। আমিও তাঁর মতই ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ আমাকে ইসলামের পথ প্রদর্শন করেছেন। তিনি বললেন, কবে আপনি তাঁর অনুসারী হয়েছেন? আমি বললাম, অল্প কিছুদিন পূর্বে।[15]

তিনি বললেন, কোথায় আপনি ইসলাম কবুল করলেন? বললাম, নাজাশীর দরবারে এবং আমি তাকে এটাও বললাম যে, নাজাশীও মুসলমান হয়ে গেছেন। তিনি বললেন, তাঁর রাজত্বের ব্যাপারে তাঁর সম্প্রদায় কি আচরণ করল? আমি বললাম, তারা তাঁকে স্বপদে রেখেছে ও তাঁর অনুসারী (মুসলমান) হয়েছে। তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন, বিশপ ও পাদ্রীগণও তাঁর অনুসারী হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, হে আমর! আপনি কি বলছেন ভেবে-চিন্তে দেখুন। কেননা মিথ্যা বলার চাইতে নিকৃষ্ট স্বভাব মানুষের জন্য আর কিছুই নেই। আমি বললাম, আমি মিথ্যা বলিনি এবং আমাদের ধর্মেও এটা সিদ্ধ নয়। অতঃপর তিনি বললেন, আমার ধারণা হেরাক্বল নাজাশীর ইসলাম কবুলের খবর জানেন না। আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি জানেন। তিনি বললেন, কিভাবে এটা আপনি বুঝলেন? আমি বললাম, নাজাশী ইতিপূর্বে তাঁকে খাজনা দিতেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি বললেন, وَاَللهِ لَوْ سَأَلَنِي دِرْهَمًا وَاحِدًا مَا أَعْطَيْتُهُ ‘আল্লাহর কসম! এখন যদি তিনি আমার নিকটে একটি দিরহামও চান, আমি তাকে দেব না’। হেরাক্বলের নিকটে এখবর পৌঁছে গেলে তার ভাই ‘নিয়াক্ব’ (نياق) তাকে বলেন, আপনি ঐ গোলামটাকে ছেড়ে দেবেন, যে আপনাকে খাজনা দেবে না। আবার আপনার ধর্ম ত্যাগ করে একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করবে? জবাবে হেরাক্বল বললেন, একজন লোক একটি ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে এবং তা নিজের জন্য পসন্দ করেছে। এক্ষণে আমি তার কি করব? وَاَللهِ لَوْلاَ الضَّنَّ بِمُلْكِيْ لَصَنَعْتُ كَمَا صَنَعَ ‘আল্লাহর কসম! যদি আমার রাজত্বের খেয়াল না থাকত, তবে আমিও তাই করতাম, যা সে করেছে’। আবদ বললেন, ভেবে দেখুন আমর আপনি কি বলছেন? আমি বললাম, وَاَللهِ صَدَّقْتُكَ আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে সত্য বলছি’। আব্দ বললেন, এখন আপনি বলুন, তিনি কোন কোন বিষয়ে নির্দেশ দেন ও কোন কোন বিষয়ে নিষেধ করেন? আমি বললাম, তিনি আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দেন এবং তাঁর অবাধ্য হ’তে নিষেধ করেন। তিনি সৎকাজের ও আত্মীয়তা রক্ষার আদেশ দেন এবং যুলুম, সীমা লংঘন, ব্যভিচার, মদ্যপান, পাথর, মূর্তি ও ক্রুশ পূজা হ’তে নিষেধ করেন।

আব্দ বললেন, مَا أَحْسَنَ هَذَا الَّذِيْ يَدْعُو إلَيْهِ ‘ইনি কত সুন্দর বিষয়ের দিকেই না আহবান করেন! যদি আমার ভাই আমার অনুগামী হ’তেন, তাহ’লে আমরা দু’জনে মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দরবারে গিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতাম ও তাঁকে সত্য বলে ঘোষণা করতাম’। কিন্তু আমার ভাই এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলে স্বীয় রাজত্বের জন্য অধিক ক্ষতিকর প্রমাণিত হবেন এবং আপাদ মস্তক গোনাহগার হবেন’। আমি বললাম, যদি তিনি ইসলাম কবুল করেন, তবে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) তাঁকে বাদশাহ হিসাবে বহাল রাখবেন। তিনি কেবল ধনীদের নিকট থেকে ছাদাক্বা গ্রহণ করবেন ও গরীবদের মধ্যে তা বণ্টন করবেন। তিনি বললেন, এটা খুবই সুন্দর আচরণ। তবে ছাদাক্বা কি জিনিষ? তখন আমি তাকে বিভিন্ন মাল-সম্পদের এমনকি উটের যাকাত সম্পর্কে বর্ণনা করলাম, যা আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ফরয করেছেন। তিনি বললেন, হে আমর! আমাদের চতুষ্পদ জন্তু সমূহ থেকেও ছাদাক্বা নেওয়া হবে, যারা স্বাধীনভাবে ঘাস পাতা খেয়ে চরে বেড়ায়? আমি বললাম, হ্যঁা। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমার মনে হয় না যে, আমার  কওম  তাদের  রাজ্যের প্রশস্ততা ও লোক সংখ্যার আধিক্য সত্ত্বেও এটা মেনে নিবে’।

আমর ইবনুল আছ (রাঃ) বলেন, আমি সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করলাম। তিনি তাঁর ভাইয়ের কাছে গেলেন ও আমার ব্যাপারে তাকে সবকিছু অবহিত করলেন। অতঃপর একদিন তিনি (অর্থাৎ সম্রাট) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলে তার প্রহরীগণ আমাকে দু’বাহু ধরে নিয়ে গেল। তিনি বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। আমাকে ছেড়ে দেওয়া হ’ল। আমি বসতে গেলাম। কিন্তু তারা আমাকে বসতে দিল না। আমি তখন সম্রাটের দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, আপনার প্রয়োজন সম্পর্কে বলুন। তখন আমি মোহরাংকিত পত্রটি তাঁর নিকটে দিলাম। তিনি সীলমোহরটি ছিঁড়লেন অতঃপর পত্রটি পড়ে শেষ করলেন। অতঃপর সেটা তার ভাইয়ের হাতে দিলেন। তিনিও সেটা পাঠ করলেন। আমি দেখলাম যে, তার ভাই তার চাইতে অধিকতর কোমল হৃদয়ের।

অতঃপর সম্রাট আমাকে কুরায়েশদের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, تَبِعُوْهُ إمَّا رَاغِبٌ فِي الدِّيْنِ وَإِمَّّا مَقْهُوْرٌ بِالسَّيْفِ ‘তারা তাঁর অনুগত হয়েছে কেউ দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, কেউ তরবারির দ্বারা পরাভূত হয়ে’। তিনি বললেন, তাঁর সাথে কারা আছেন? আমি বললাম, যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং অন্য সবকিছুর উপরে একে স্থান দিয়েছেন এবং আল্লাহ প্রদত্ত হেদায়াতের সাথে সাথে নিজেদের জ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি করেছেন যে, তারা ইতিপূর্বে ভ্রষ্টতার মধ্যে ছিলেন’। এতদঞ্চলে আপনি ব্যতীত আর কেউ (অর্থাৎ আর কোন সম্রাট তার দ্বীনে প্রবেশ করতে) বাকী আছেন বলে আমার জানা নেই। আজ যদি আপনি ইসলাম কবুল না করেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর অনুগামী না হন, তাহ’লে অশ্বারোহী বাহিনী আপনাকে পদদলিত করবে এবং আপনার শস্যক্ষেত সমূহ ধ্বংস করবে। অতএব আপনি ইসলাম কবুল করুন। নিরাপদ থাকুন। আপনাকে আপনার জাতির উপরে তিনি গভর্ণর নিযুক্ত করবেন এবং আপনার এলাকায় অশ্বারোহী বা পদাতিক বাহিনী প্রবেশ করবে না। সম্রাট বললেন, دَعْنِيْ يَوْمِيْ هَذَا وَارْجِعْ إلَيَّ غَدًا ‘আজকের দিনটা আমাকে সময় দিন। কাল আপনি পুনরায় আসুন’।

সম্রাটের দরবার থেকে বেরিয়ে আমি পুনরায় তাঁর ভাইয়ের কাছে ফিরে গেলাম। তিনি বললেন, يَا عَمْرُو إنِّيْ لَأَرْجُو أَنْ يُسْلِمَ إنْ لَمْ يَضِنَّ بِمُلْكِهِ ‘হে আমর! আমি মনে করি সম্রাট মুসলমান হবেন, যদি তাঁর রাজত্বের কোন ক্ষতি না হয়’।

কথামত দ্বিতীয় দিন সকালে আমি দরবারে গেলাম। কিন্তু তিনি অনুমতি দিতে অস্বীকার করলেন। আমি তার ভাইয়ের কাছে ফিরে গিয়ে বিষয়টি বললাম। তখন তিনি আমাকে পৌঁছে দিলেন। তখন সম্রাট আমাকে বললেন, আমি আপনার আবেদনের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। দেখুন: যদি আমি এমন এক ব্যক্তির নিকটে আমার রাজত্ব সমর্পণ করি, যার অশ্বারোহীদল এখনো এখানে পৌঁছেনি, তাহ’লে আমি ‘আরবদের দুর্বলতম ব্যক্তি’ (أَضْعَفُ الْعَرَبِ) হিসাবে পরিগণিত হব। আর যদি তার অশ্বারোহী দল এখানে পৌঁছে যায়, তাহ’লে এমন লড়াইয়ের সম্মুখীন তারা হবে, যা ইতিপূর্বে তারা কখনো হয়নি।’ একথা শুনে আমি বললাম, বেশ, আগামীকাল তাহ’লে আমি চলে যাচ্ছি (فَأَنَا خَارِجٌ غَدًا) ।

অতঃপর যখন তিনি আমার চলে যাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত  হ’লেন, তখন তার ভাইকে নিয়ে একান্তে বৈঠক করলেন। ভাই তাকে বললেন, مَا نَحْنُ فِيْمَا قَدْ ظَهَرَ عَلَيْهِ وَكُلُّ مَنْ أَرْسَلَ إلَيْهِ قَدْ أَجَابَهُ ‘আমরা তাদের তুলনায় কিছুই নই, যাদের উপরে তিনি বিজয়ী হয়েছেন এবং যার নিকটে তিনি দূত পাঠিয়েছেন, তিনি তা কবুল করে নিয়েছেন’।

পরদিন সকালে সম্রাট আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং সম্রাট ও তাঁর ভাই উভয়ে ইসলাম কবুল করলেন ও রাসূল (ছাঃ)-কে সত্য বলে ঘোষণা করলেন। অতঃপর তারা আমাকে ছাদাক্বা গ্রহণ ও এ বিষয়ে লোকদের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য ঢালাও অনুমতি দিলেন এবং আমার বিরুদ্ধাচারীদের বিরুদ্ধে সাহায্যকারী হলেন। অতঃপর প্রজাদের অধিকাংশ মুসলমান হয়ে যায়’।[16]

মুবারকপুরী বলেন, উপরোক্ত ঘটনা পরম্পরায় একথা প্রমাণিত হয় যে, অন্যান্য রাজা-বাদশাদের নিকটে পত্র প্রেরণের অনেক পরে উক্ত দু’ভাইয়ের নিকটে পত্র প্রেরণ করা হয় এবং সর্বাধিক ধারণা মতে এটি মক্কা বিজয়ের পরের ঘটনা (والأغلب أنه كان بعد الفتح)।

এভাবে তৎকালীন বিশ্বের ক্ষমতাধর অধিকাংশ রাজা-বাদশাদের নিকটে পত্রের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। দু’একজন বাদে প্রায় সকলেই তাঁর দাওয়াত কবুল করেছিলেন। যারা অস্বীকার করেছিল, তাদের কাছেও রাসূল ও ইসলাম পরিচিতি লাভ করে। এভাবে ইসলাম সর্বজন পরিচিত বিশ্ব ধর্মে পরিণত হয়।

পরবর্তী অংশ: রাসূল (ছাঃ)-এর নবগঠিত মাদানী রাষ্ট্রে যাকাত আদায়কারী নিয়োগ

লেখক: ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল গালিব

[1] ইমাম বুখারী আনাস (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (ছাঃ)-এর মৃত্যুর পরে উক্ত আংটি হযরত আবুবকর, পরে ওমর এবং তার পরে ওছমান (রাঃ) ব্যবহার করেন। কিন্তু তাঁর খেলাফতের শেষ দিকে এক সময় আংটিটি ‘আরীস’ (اريس) কুয়ায় পড়ে যায়। সাধ্যমত খুঁজেও তা আর পাওয়া যায়নি; বুখারী হা/৫৮৭৩ ‘আংটি খোদাই’ অনুচ্ছেদ।

[2] বায়হাক্বী ইবনু ইসহাক হ’তে।

[3] যাদুল মা‘আদ ৩/৬০৩।

[4] আহমাদ হা/১৭৪০; ফিক্বহুস সীরাহ পৃঃ ১১৫, সনদ ছহীহ; আর-রাহীক্ব পৃঃ ৯৬।

[5] রহমাতুল্লিল ‘আলামীন ১/১৫০।

[6] আর-রাহীক্ব ৩৫৩ পৃঃ।

[7] যাদুল মা‘আদ ৩/৬০৪।

[8] ফিক্বহুস সীরাহ পৃঃ ৩৬২, সনদ যঈফ।

[9] পারস্য সম্রাট খসরু পারভেয স্বীয় পুত্রের হাতে নিহত হওয়ার পর ক্ষমতাসীন কিসরা রোম সম্রাটের সাথে সন্ধি করেন এবং তাদের অধিকৃত এলাকাসমূহ ফেরৎ দেন। এ সময় তাদের ধারণা মতে হযরত ঈসাকে হত্যা করার কাজে ব্যবহৃত ক্রুশটিও ফেরৎ দেওয়া হয়। এই অভাবিত সন্ধিতে খুশী হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের জন্য রোম সম্রাট যেরুযালেম আসেন এবং ক্রুশটিকে স্বস্থানে রেখে দেন। ৭ম হিজরীতে (মোতাবেক ৬২৯ খৃষ্টাব্দে) এ ঘটনা ঘটে।

[10] (ক) ‘আবু কাবশার ছেলে’ বলতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। এই উপনামটি রাসূলের দুধ পিতার অথবা তার দাদা বা নানা কারু ছিল। এটি একটি অপরিচিত নাম। আরবদের নিয়ম ছিল, কাউকে হীনভাবে প্রকাশ করতে চাইলে তার পূর্বপুরুষদের কোন অপরিচিত ব্যক্তির দিকে সম্বন্ধ করে বলা হ’ত। আবু সুফিয়ান সেটাই করেছেন। (খ) ‘বানুল আছফার’ বলতে রোমকদের বুঝানো হয়েছে। ‘আছফার’ অর্থ হলুদ। আর রোমকরা ছিল হলুদ রংয়ের।

[11] বুখারী হা/৭; মুসলিম হা/১৭৭৩।

[12] হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম প্রণীত যাদুল মা‘আদ ৩/৬০৫ পৃষ্ঠা হ’তে উদ্ধৃত উপরোক্ত পত্রটি সম্প্রতি ডঃ হামীদুল্লাহ (প্যারিস) কর্তৃক প্রচারিত মূল পত্রের ফটোকপির সাথে হুবহু মিল রয়েছে। কেবলমাত্র একটি শব্দ ‘হুয়া’-এর পরিবর্তে ‘গায়রুহু’ ব্যতীত। অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লা হুয়া-র পরিবর্তে ফটোকপিতে ‘গায়রুহু’ রয়েছে। উভয়ের অর্থ একই।

[13] যাদুল মা‘আদ পৃঃ ৩/৬০৭-৬০৮।

[14] মুত্তাফাক্ব আলইহ, মিশকাত হা/৩৮০৭ ‘জিহাদ’ অধ্যায়।

[15] আর-রাহীক্ব, পৃঃ ৩৪৭ ও টীকা পৃঃ ৩৪৮।

[16] যাদুল মা‘আদ ৩/৬০৬-৬০৭।


শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

আইয়ূব নবী ও তার স্ত্রীর জীবনী

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

যখন মেসোপটেমিয়ার ব-দ্বীপটির উপরিভাগে সেমিটিক উপনিবেশিকদের প্রধানদল সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠল, তখন তাদের একটি দলের মধ্যে হযরত আইয়ূব জন্মগ্রহণ করলেন। আইয়ূব আল্লাহকে ভয় করতেন এবং সর্বদা দ্বীনের উপর কায়েম থাকতেন। তার সাত পুত্র সন্তান ও তিন কন্যা সন্তান ছিল। তিনি ছিলেন সম্পদশালী। চাষাবাদের পাশাপাশি পশুপালন ছিল তার আয়ের প্রধান উৎস। মূলতঃ তার এই পশুপাল ও চাষবাসের জন্যে তার প্রচুর দাসদাসীও ছিল। পরিবার ও সন্তানদের মঙ্গলের জন্যে তিনি প্রায়ই আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কোরবাণী দিতেন। বলা চলে নিতান্ত সুখের মধ্যে দিয়েই তিনি জীবন-যাপন করছিলেন। তার এই সুখের দিনগুলির বর্ণণা তার নিজের মুখে এরকম-

‘সর্বশক্তিমান খোদা আমার সঙ্গে রয়েছেন, আর আমার সন্তান-সন্তুতিরা আমায় ঘিরে রয়েছে।
আমার জীবন-যাপন আরাম-আয়েশে পূর্ণ।

যখন আমি শহরের ফটকে গিয়ে চকে আসন গ্রহণ করি, তখন যুবকেরা আমায় দেখে সরে দাঁড়ায়,আর বৃদ্ধরা উঠে দাঁড়ায়, নেতাদের গলারস্বর থেমে যায়, আর সকলে আমার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করে, আমার পরামর্শের জন্যে নীরব থাকে, আমার কথার পরে তারা আর কথা বলে না।

সকলেই আমার প্রশংসা করে,
যারা আমার কথা শুনে তারা নিজেকে ধন্য মনে করে।
কারণ আমি অন্ধদের দৃষ্টি আর খঞ্জদের শক্তি
অনাথ ও অভাবীদের পিতার মত।

আমি বিদেশীদের পক্ষে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করি,
আর দুষ্টদের চোয়াল ভেঙ্গে দিই,
সত্যি বলতে কি, সৈন্যদলের মধ্যে রাজা যেমন,
আমি তেমনই।’

আইয়ূবের খোদা ভক্তি দেখে ইবলিস মনে মনে বলত, ‘ওহে আইয়ূব, তুমি কি এমনি এমনি তাঁকে ভক্তি কর? তিনি কি তোমার গৃহ ও গৃহস্থলীর সবকিছূ তাঁর রহমতে সিক্ত রাখেননি? তাঁর করুণা ও রহমতের কারণে কি তোমার পশুপাল এমন অসাধারণ বৃদ্ধিলাভ করেনি?'

ইবলিস জানত সাধারণ মানুষকে বরবাদ করতে পারলেও কোন নবীকে বরবাদ করার ক্ষমতা তার নেই। তাদের উপর তার কোন প্রভাব খাটবে না। আদমকে দুনিয়াতে পাঠানোর আগে তাকে এটা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমার দাসদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না। কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।-(১৭:৬৫) বা, আমার দাসদের ওপর তোমার কোন প্রভাব খাটবে না।’-(১৫:৪২) সুতরাং সে ভাবল- 'আমি তার সন্তান ও সম্পদের উপর একে একে আঘাত করি না কেন! দেখি না সে কেমন করে খোদার উপর বিশ্বাসে অটল থাকে?’

ইবলিস আইয়ূবের উপর একের পর এক আঘাত হানল এবং তাকে একদিনেই হিরো থেকে জিরো করে দিল। এমন একদিনে এই আঘাতগুলো আইয়ূবের উপর দু:স্বপ্ন আকারে এল যেদিন তার সন্তানগণ সকলে নিমন্ত্রণে অন্যত্র ছিল। আর অদ্ভূত ব্যাপার ছিল এই যে, প্রতিটি দু:সংবাদ তার একজন দাস বয়ে নিয়ে এসেছিল, যে কিনা একমাত্র ঐ আঘাত থেকে রক্ষা প্রাপ্ত ব্যক্তি।

প্রথম দু:সংবাদটি আইয়ুব পেলেন দুপুর বেলা। সংবাদ বহনকারী দাস জানাল যে, শিবায়ীয়েরা হানা দিয়ে তার গাধার পাল লুট করেছে, এমনকি জমি চাষে রত ষাড়গুলিও। আর হত্যা করেছে সকল দাসদেরকে। প্রথম দাস তখনও কথা বলছিল ঐসময় দৌঁড়ে এল আরেক দাস। সে জানাল যে, ‘বজ্রপাতে তার ভেড়ার পাল আর দাসেরা নিহত হয়েছে। তারপর এল আর একজন। সে জানাল যে, কলদীয়রা তার উটগুলোকে লুট করেছে আর সকল দাসদের হত্যা করেছে। অত:পর এল মহা দু:সংবাদ। নিমন্ত্রিতের বাড়ীটি ধ্বসে পড়ায় ভোজেরত অবস্থায় তার সকল সন্তান নিহত হয়েছে।

যাহোক, আইয়ূব সব দুঃসংবাদগুলো শান্তভাবে পাথরের মত হয়ে শুনলেন। এসময় আগত দাসেরা একপাশে নিজেদেরকে অপরাধী ভেবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি তা লক্ষ্য করে তাদেরকে বললেন, ‘তোমাদের কুন্ঠিত হবার কোন কারণ নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ যা করেন তা কেবল মঙ্গলের জন্যেই করেন।’

অতঃপর শোকের চিহ্ন হিসেব আইয়ূব তার কাপড় ছিঁড়লেন এবং মাথা কামিয়ে ফেললেন। তারপর খোদার কাছে অন্তরের ভক্তি জানিয়ে বললেন, ‘হে আমার প্রভু! আমি তোমার শোকর আদায় করি এ কারণে যে, তুমি আমাকে সহায়-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি দান করেছিলে। এদের মহব্বত আমার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এরপর এখন আমি এ কারণে শোকর করছি যে, তুমি আমাকে এসব থেকে মুক্তি দিয়েছ। আমার ও তোমার মধ্যে এখন কোন অন্তরায় অবশিষ্ট নেই।’

কোন একদিন ফেরেস্তা জিব্রাইলের সঙ্গে ইবলিসের দেখা হল। জিব্রাইল বলল, ‘হে ইবলিস! আইয়ূব, পুণ্যবানদের একজন। যদিও তুমি বিনা কারণে তার সর্বনাশ করছ, তবুও সে বিশ্বাস ও ভক্তিতে অটল রয়েছে।’

ইবলিস বলল, ‘মানুষের জীবনই তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। মানুষ তার নিজ প্রাণ রক্ষার জন্যে তার যাকিছূ আছে সবই দেবে। কিন্তু আল্লাহর নির্বাচিত দাসদের উপর আমার কোন ক্ষমতা নেই। নইলে তার ঈমান ঠিকই বিনষ্ট করে দিতাম।’
জিব্রাইল বলল, ‘তা সত্য। কিন্তু ক্ষমতা যদি তিনি তোমাকে দিতেনও, তদুপরি তাদের ঈমান এমন ঠুনকো নয় যে ইচ্ছে করলেই তুমি তা বিনষ্ট করতে পারতে।'
ইবলিস বলল, 'সেটা আর প্রমান করতে পারছি কৈ! আহা! যদি আমি একটি বারের মত ঐ ক্ষমতা পেতাম!'

আইয়ূব ও তার বন্ধুরা।
তখন ইবলিসকে জানান হল- আইয়ূবের উপর সে (ইবলিস) পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে-প্রাণ হরণ ব্যতিত।এতে ইবলিস আইয়ূবের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য এক পরিকল্পণা করল। সে তার মাথার তালু থেকে পায়ের তলা পর্যন্ত ঘায়ের সৃষ্টি করল। যন্ত্রণায় আইয়ূব অস্থির হয়ে পড়লেন। এদিকে ঘা থেকে পুঁজ বেরিয়ে আসতে লাগল। এসময় তিনি শরীরে ধূলো মেখে বসে থাকতেন আর মাটির পাত্রের ভাঙ্গা টুকরো দিয়ে ঘা থেকে পুঁজ বের করতেন। আস্তে আস্তে তার গায়ের মাংস খসে পড়তে লাগল। দুর্গন্ধে কেউ তার নিকটে যেতে পারত না।

তৈমনীয় ইলীফস, শূহীয় বিল্দদ ও নামাথীয় সোফর -আইয়ূবের এই তিন বন্ধু তার বিপদের কথা শুনতে পেয়েছিল। তখন তারা তাকে সান্তনা দেবার জন্যে এল। তাদের কেউই দূর থেকে আইয়ূবকে চিনতে পারল না এবং কাছে গিয়ে তার অবস্থা দেখে কাঁদতে লাগল এবং নিজেদের কাপড় ছিঁড়ে আকাশের দিকে ধূলো ছড়াল। তারা তার কষ্ট অনুভব করল এবং সান্তনার ভাষা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে থাকল। এসময় আইয়ূব বিলাপের সুরে বললেন- আমি কেন গর্ভে থাকতে মরিনি? কেনইবা জন্মেই মরলাম না? তা হলে তো আমি এখন, শান্তিতে শুয়ে থাকতে পারতাম; আমি ঘুমাতাম আর বিশ্রাম পেতাম। আজ দীর্ঘ নিঃশ্বাসই আমার সঙ্গী, আমার কষ্ট বর্ষার মত ঝরছে; আমার শান্তি নেই, স্থিরতা নেই, কোন বিশ্রাম নেই, আছে কেবল কষ্ট।’

এসব কথা শুনে তার বন্ধু তৈমনীয় ইলীফস তাকে বলল- 'ভেবে দেখ, কতজনকে তুমি উপদেশ দিয়েছ আর দূর্বল হাতকে সবল করেছ; কিন্তু এখন তোমার নিজের উপরই কষ্ট এসেছে, আর তুমি হতাশ হয়েছ। তুমি যে আল্লাহকে ভক্তিপূর্ণ ভয় কর, তাতে কি তুমি আশ্বাস পাও না? নির্দোষ কখনও কি ধ্বংস হয়েছে? সুতরাং ধন্য সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সংশোধন করেন; কাজেই সর্বশক্তিমানের শাসনকে তুচ্ছ কোরও না। কারণ তিনি ক্ষত করেন আবার বেঁধেও দেন, আর সুস্থ্যতা তাঁরই দয়া।’

তখন আইয়ূব বলতে লাগলেন- ‘আল্লাহর ভয়ংকর কাজগুলো আমার বিরুদ্ধে সাঁরি বেঁধে দাঁড়িয়েছে, নিজেকে সাহায্য করার শক্তি আমার নেই, আমার কাছ থেকে তো আমার সবকিছু দূর করা হয়েছে; পোঁকা আর ঘাঁয়ের মামড়িতে আমার দেহ ঢাকা পড়েছে।আমার চামড়া ফেঁটে গেছে এবং পূঁজ পড়ছে; আমার দিনগুলো তাঁতীর মাকূর চেয়েও তাড়াতাড়ি চলছে, কোন আশা ছাড়াই সেগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। যখন ভাবি আমার শয্যা আমাকে সান্তনা দেবে, তখন নানা দুঃসপ্ন আমাকে ভীত করে তোলে।’

এসময় শূহীয় বিলদদ বলল- ‘ঠিক কথা, আমি জানি এসবই সত্যি। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে কি করে মানুষ নির্দোষ হতে পারে? আমি তো সর্বদাই তাঁর দৃষ্টিতে, কিন্তু আমার দৃষ্টি তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, তিনি যদি ছিনিয়ে নেন, কে তাঁকে বাঁধা দিতে পারে? কে তাঁকে বলতে পারে- তুমি কি করছ?’

আইয়ূব বললেন- ‘তাহলে কেমন করে আমি তাঁর কথার উত্তর দেব? তাঁকে বলার জন্যে কোথায় ভাষা খুঁজে পাব? আমি নিজেকে নির্দোষ ভাবলেও উত্তর দিতে পারিনে, আমি বিচারকের কাছে কেবল দয়াই ভিক্ষে করব।’

নামাথীয় সোফর বলল-‘তুমি বলেছ তোমার ধর্ম বিশ্বাসে কোন খূঁত নেই এবং তাঁর দৃষ্টিতে তুমি খাঁটি। আ-হা, আল্লাহ যেন কথা বলেন, আর জ্ঞানের গোপন বিষয়গুলো তোমাকে জানান; এটা জেনে রেখ, কারও পাপ অনুসারে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন না।’

আইয়ূব উত্তরে বললেন- 'তুমি যা বলেছ কে তা না জানে? পশুদের জিজ্ঞেস কর, তারা তোমাকে শেখাবে, আকাশের পাখীদের বল, তারাও তোমাকে বলে দেবে; পৃথিবীকে, সেও তোমাকে শেখাবে, সাগরের মাছেরাও তোমাকে বলে দেবে এরা সবাই জানে আল্লাহর শক্তিই এসব করেছে।

অন্ধকারের লুকান বিষয়গুলো তিনি প্রকাশ করেন, আর ঘন ছায়াকে আলোতে আনেন। তাঁর মহিমা কি তোমাদের ভয় জাগায় না? তাঁর ভয়ংকরতায় কি তোমরা ভীত হও না? আমি জানি আমার মুক্তিদাতা জীবন্ত, শেষে তিনি পৃথিবীর উপর এসে দাঁড়াবেন আমার চামড়া ধ্বংস হয়ে যাবার পরও আমি জীবন্ত অবস্থায় তাঁকে দেখতে পাব।’

আইয়ূব যখন এসব বলছিলেন তখন তার বন্ধুদের কেউই তার কথার উত্তর দিল না। এসময় রামের বংশের বৃষীয় ইলীহূ ইবনে বারখেল যে আইয়ূবের বন্ধুদের সাথে এসেছিল, বলল-‘কিন্তু আমি আপনাকে বলি এ বিষয়ে আপনার কথা ঠিক না; কারণ মানুষের চেয়ে আল্লাহ মহান। কেন আপনি তাকে এ অভিযোগ জানাচ্ছেন যে, মানুষের কোন কথার উত্তর তিনি দেন না? আসলে আল্লাহ নানাভাবে কথা বলেন, যদিও মানূষ তা বুঝতে পারে না, স্বপ্নের মধ্যে যখন তাদের নিদ্রা গাঢ় হয়, তিনি তখন তাদের কানে কানে কথা বলেন আর সাবধান বাণী দিয়ে তাদেরকে সতর্ক করেন, যেন মানুষ তার দুস্কর্ম থেকে ফেরে, আর অহংকার থেকে দূরে থাকে।
 
যখন মানুষ রোগ যন্ত্রণায় শাস্তি পায়, তখন ফেরেস্তাগণ চিৎকার করে বলেন- ‘হে আল্লাহ! দোযখের শাস্তি থেকে তাকে রেহাই দাও।’
সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে আর তিনি তাকে দয়া করেন, আল্লাহ মানুষের জন্যে বারবার এসব করেন।

আল্লাহ মানুষকে তার কর্মফল দেন; সর্বশক্তিমান কখনও উল্টো বিচার কবেন না, পৃথিবীর ভার কি কেউ তাঁর উপর দিয়েছে? মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপের উপর তাঁর দৃষ্টি রয়েছে, তাদের প্রতিটি কর্ম তিনি দেখেন। এমন কোন অন্ধকার জায়গা বা ঘনছায়া নেই যেখানে পাপীরা লুকাতে পারে।

মানুষ যদি পাপ করে তাতে আল্লাহর কি লাভ হবে? সে যদি নির্দোষ হয় তাতেই বা তাঁর কি উপকার হবে? মানুষের কাছ থেকে তিনি কিছুই চান না, তাদের দুষ্টতা কেবল তাদেরই ক্ষতি করে, তাদের নামাজ, রোজা, সততা কেবল তাদেরই সাহায্য করে।আল্লাহ তো তার সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মানুষকেই বেশী শিক্ষা দিয়েছেন, আকাশের পক্ষী বা জমিনের পশু কি মানুষের চেয়ে জ্ঞানী? আল্লাহ ক্ষমতায় মহান, তাঁর মত শিক্ষক আর কে আছে?’

এসময় আল্লাহ আইয়ূবকে বললেন,- যখন পৃথিবীর গর্ভ থেকে সমুদ্র বের হয়ে এসেছিল, তখন কে তাকে আবদ্ধ করেছিল? তখন আমি মেঘকে তার পোষাক করেছিলাম, আর তার সীমা ঠিক করেছিলাম, তার দ্বার ও আর্গল আমি স্থাপন করেছিলাম; আর আমি বলেছিলাম, এ পর্যন্ত, আর নয়, এখানেই তোমার গর্বিত ঢেউগুলোকে থামতে হবে।

দোযখ তোমাকে দেখান হয়েছে কি? জগৎটা কত বড় তা কি তুমি ধারণা করতে পার? যে স্থান থেকে আলো ছড়িয়ে যায়, কিংবা যে স্থান থেকে পৃথিবীতে পূবের বায়ূ ছড়িয়ে পড়ে তা কোথায়?
বজ্রপাত ও বৃষ্টির জন্যে কে পথ করেছে? যাতে জনশুণ্য স্থান বৃষ্টি পায়, মরুএলাকা তৃপ্ত হয়, আর সেখানে ঘাস, লতা-গুল্ম উদ্গত হতে পারে?

তুমি কি কৃত্তিকা নামের তাঁরাগুলোকে বাঁধতে পার? কালপুরুষ নামের তাঁরাগুলোর বাঁধন খুলে দিতে পার? তাঁরাপুঞ্জকে তাদের ঋতু অনুসারে বের করে আনতে পার? আকাশের আইন কানুন কি তুমি জান?

কে অন্তরকে জ্ঞান দিয়ে সাঁজিয়েছে? কিংবা মনকে বোঝার শক্তি দিয়েছে? দাঁড় কাকের বাচ্চারা যখন খোদার কাছে কাঁদে, আর খাবারের জন্যে ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ায়, তখন কে তাদের আহার জোগায়? পাহাড়ী ছাগ কখন বাচ্চা দেয় তা কি তুমি জান? তাদের বাচ্চা কত দিন গর্ভে থাকে তা কি গুনেছ?

তোমার আদেশে কি ঈগল আকাশে উড়ে? সে খাঁড়া পাহাড়ের উপর বাস করে, সেখান থেকে সে খাবারের অন্বেষণ করে, তার দৃষ্টি দূর থেকে তার শিকার খুঁজে নেয়। তাহলে আমার সম্মুখে কে দাঁড়াতে পারে? আমার বিরুদ্ধে এমন কার দাবী আছে যে, তার দাবী আমাকে মানতে হবে? উপরে আকাশ, নীচে জমিন এবং এ দু‘য়ের মাঝে যাকিছু আছে -সবই আমার সৃষ্টি, কোন কিছুই আমার অপরিজ্ঞাত নয়।’

আইয়ূব বললেন,- ‘আমি তো অযোগ্য, আমি কেমন করে তোমাকে উত্তর দেব? কাজেই আমি যা বলেছি তা এখন ফিরিয়ে নিচ্ছি আর ধূলো ও ছাইয়ের মধ্যে অনুতাপ করছি।’
আইয়ূবের বন্ধুরা সাতদিন তার সাথে থাকল, তারপর তারা ফিরে গেল।

উত্তোরোত্তর আইয়ূবের অবস্থার অবনতি হতে লাগল। এতে দুর্গন্ধে কেউ তার কাছে যেতে পারত না। প্রথম পর্যায়ে তার পরিবারের লোকেরা তাকে পরিত্যাগ করল। পরবর্তীতে চাকর-বাকরেরা। ফলে রহিমা স্বামীকে নিয়ে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে পড়ল। কিন্তু এ-ই শেষ ছিল না। প্রতিবেশীরা রহিমাকে হুমকি দিল, ‘তোমার স্বামীকে এখান থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যাও। দুর্গন্ধে এখানে আমরা বাস করতে পারছিনে।’
সে বলল, ‘তাকে আমি কোথায় নিয়ে যাব? তোমরা আমাদের প্রতি একটু রহম কর।’
তারা বলল, ‘তোমাদের কারণে আমরাও অসুস্থ্য বা আক্রান্ত হয়ে পড়ি এই কি তোমাদের অভিপ্রায়? তা না হলে আমাদের থেকে দূরে সরে যাও, যেখানে খুশী। আমরা স্বস্তিতে নিশ্বাস ফেলি।’

প্রতিবেশীরা জোরপূর্বক তাদেরকে বাড়ী থেকে বের করে দিল। তারপর তাদের আবাসগৃহ আসবাবপত্র সব পুড়িয়ে দিল। তখন স্বামীকে নিয়ে রহিমা একটু নির্জন স্থানে গেল। কিন্তু নিকটবর্তী গ্রামবাসীরাও তাদেরকে তাড়িয়ে দিল। তারা এসে বলল, ‘তোমার স্বামীর এই রোগে আমরাও আক্রান্ত হয়ে পড়ব, আর তাতে গ্রামটা উজাড় হয়ে যাবে?’
সে বলল, ‘এই রোগ ছোঁয়াচে নয়, এই তো আমি সম্পূর্ণ সুস্থ্য।’
তারা বলল, ‘সুস্থ্য লোক অসুস্থ্য হতে কতক্ষণ?’

রহিমা স্বামীকে অন্য এক স্থানে নিয়ে গেল। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাদেরকে সেখান থেকেও তাড়িয়ে দিল। এভাবে একে একে সাতবার স্থান পরিবর্তনের পর অবশেষে জঙ্গলে আশ্রয় নিল তারা। সহায়-সম্বলহীন।

আইয়ূব স্নান করলেন।
নিজের পরিচয় গোপন রেখে রহিমা নিকটবর্তী গ্রামে গিয়ে সেখান থেকে সে কাজের বিনিময়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে লাগল। একদা যার গৃহ প্রাচূর্যে ভরপুর ছিল, আজ্ঞা পালনে যার ছিল অসংখ্য দাস-দাসী ছিল, আজ সে দাসীর মত অন্যের গৃহে কাজ করছে। কিন্তু রহিমার এতে কোন আক্ষেপ নেই। সে সুবোধ বালিকার মত প্রতিদিন শ্রমের বিনিময়ে আহার সংগ্রহ শেষে ফিরে এসে অবশিষ্ট সময় স্বামীর পরিচর্যা করতে লাগল। 

ইতিমধ্যে দিন, মাস, বৎসর গড়িয়ে যাচেছ। নিকটবর্তী গ্রামে, লোকদের গৃহে গৃহে দাস্যকর্মের দ্বারা খাবার সংগ্রহ করা এখন রহিমার নিত্যদিনের কাজ। একদিন সে যখন খাবার সংগ্রহ শেষে ব্যস্ততা সহকারে গৃহে ফিরছিল, তখন এক বৃদ্ধের বেশে ইবলিস তার ফেরার পথের পাশে বসে রইল। অতঃপর রহিমা যখন নিকটবর্তী হল, তখন সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মা, আমি বড় ক্ষুধার্ত। একমুষ্ঠি খাবার আমাকে দাও।’

রহিমার কাছে যে খাবার ছিল তা তাদের দু‘জনের কোনমতে চলত। বৃদ্ধকে খাবার দিলে তাকে অনাহারে থাকতে হবে, তবুও সে এই ক্ষুধার্ত বৃদ্ধকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারল না। সে এগিয়ে এল এবং তার অংশের খাবার বৃদ্ধকে দিল। বৃদ্ধের আরও খাবার বা পানির দরকার হতে পারে ভেবে সে চলে যেতে পারল না। সুতরাং সে একপাশে বসে নীরবে তার খাওয়া দেখতে লাগল, আর তার মন পড়ে রইল অসুস্থ্য স্বামীর কাছে। খেতে খেতে বৃদ্ধ বলল, ‘মা, তোমাকে এত মলিন দেখাচ্ছে কেন?’

রহিমা সংক্ষেপে তাকে তার দুঃখের কথা জানাল। সব শুনে বৃদ্ধ বলল, ‘আমি একটা ঔষধের কথা জানি। কিন্তু তুমি কি তা ব্যাবহার করতে পারবে?’
রহিমা বলল, ‘আমি আমার স্বামীর জন্যে সবকিছু করতে পারব, বাবা।’
বৃদ্ধ বলল, ‘তুমি যদি দ্রাক্ষারস দ্বারা তোমার স্বামীর শরীর ধৌত করে দিতে পার, আর যদি তাকে কিছূ শুকরের মাংস ভক্ষণ করাতে পার, তবে অচিরেই তার রোগের উপশম হবে।’

রহিমা তখন দ্রুত গৃহে ফিরে স্বামীকে সকল কথা বলল এবং তাকে ঐ ঔষধ ব্যাবহারের জন্যে পীড়াপীড়ি করল। আইয়ূব তা করতে অস্বীকার করলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, ‘জীবন থাকতে আমি কখনও নিষিদ্ধ ও অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শেও যাব না। নিশ্চয়ই শয়তান তোমাকে প্ররোচিত করেছে।’
একথা শুনে রহিমা তাকে আর পীড়াপীড়ি করল না।

সাত বৎসর অতিবাহিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের কোন মুহূর্তেই আইয়ূব হা-হুতাশ, অস্থিরতা ও অভিযোগের কোন বাক্য মুখে উচ্চারণ করেননি। তিনি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করেছেন আল্লাহর রহমতের। কিন্তু তিনি নিজের জন্যে আল্লাহর কাছে কোন দোয়া করেননি। তিনি দোয়া করার হিম্মত করতেন না এই ভেবে যে, না জানি সবরের কোন খেলাফ হয়ে যায়। একদিন পত্নী রহিমা তাকে বলল, ‘তোমার কষ্ট অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে নিজের জন্যে প্রার্থণা কর।’

আইয়ূব বললেন, ‘নিজের জন্যে আল্লাহর কাছে এসময় কিছু চাইতে আমার লজ্জা লাগছে। আমি সত্তুর বৎসর সুস্থ্য অবস্থায় আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত ও দৌলতের মধ্যে দিনাতিপাত করেছি। এর বিপরীতে মাত্র সাত বৎসর আমি শয়তানের পরীক্ষায়। অন্ততঃপক্ষে সত্তুর বৎসর অতিবাহিত না করে আমি নিজের জন্যে কিভাবে কিছু চাইতে পারি?’

এদিকে ইবলিস যখন দেখল যে সে কিছুতেই আইয়ূবের সবরের খেলাফ করতে পারছে না। তখন সে মানুষের বেশে আশে পাশের গ্রামের প্রতিটি গৃহে জানিয়ে দিল-‘তোমাদের এখানে যে স্ত্রীলোকটি মাঝে মাঝে এসে কাজকাম করে খাবার সংগ্রহ করে, তার স্বামী দূরারোগ্য ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত। এখন যদি তোমরা তাকে তোমাদের গৃহের কাজে লাগাও তাহলে তোমরাও ঐ ব্যাধিতে আক্রান্ত হবে। আমি তোমাদের ভালোর জন্যেই বলছি।’

সুতরাং রহিমাকে আর কোন গৃহে কাজের জন্যে নেয়া হল না। সারাদিন লোকের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে তিনি যখন ক্লান্ত তখন এক গৃহিনী নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে তাকে কাজে লাগাল এবং বলল, ‘তোমার অসহায় অবস্থা জানি বলেই আজকের মত কাজে লাগালাম। কিন্তু এই শেষ, তুমি আর আমাদের বাড়ীতে আসবে না।’

পরদিন রহিমা অন্য গ্রামে গেল খাবারের সন্ধানে। কিন্তু সেখানকার লোকেরাও তাকে তাড়িয়ে দিল। একসময় ঘুরতে ঘুরতে সে যে বাড়ীতে এল ঐ বাড়ীর কর্ত্রী বলল, ‘তোমার জন্যে আমার বাড়ীতে কোন কাজ নেই।’
রহিমা বলল, ‘আজ কাজ না পেলে আমার অসুস্থ্য স্বামীকে অনাহারে থাকতে হবে। তাই দয়া করে আমাকে কাজ দিন অথবা কিছু ধার দিন। আমি আপনার দেনা পরিশোধ করে দেব।’
সে বলল, ‘তোমার নেই চালচুলো। তোমাকে কিভাবে আমি ধার দেব?’

রহিমার চুলের প্রতি নজর পড়ল তার। তখন সে বলল, ‘তবে তুমি যদি কিছু বিক্রি করতে চাও তা আমি কিনতে পারি।’
রহিমা বলল, ‘আমার কিছুই নেই। আমি কি বিক্রি করব?’
সে বলল, ‘তোমার চুল। আমি খোপা তৈরী করব? বিনিময়ে আমি তোমাকে চাল দেব। তুমি রাজী হলে আমি না হয় কিছু বেশীই দেব। তাতে তেমাদের বেশ কিছুদিন চলে যাবে।’

রহিমা অপূর্ব সুন্দর লম্বা চুলের অধিকারী ছিল, যার প্রশংসা করতেন আইয়ূব সবসময়। তার চোখ ভিজে উঠল। দু‘ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তা দেখে স্ত্রীলোকটি বলল, ‘তুমি বেঁচতে না চাইলে নাই।’
রহিমা দ্রুত বলল, ‘না, তা নয়। আমার এই চুল ধরে আমার অসুস্থ্য স্বামী উঠে দাঁড়ায়, একস্থান থেকে অন্যস্থানে যায়।..’
স্ত্রীলোকটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাহলে বরং তুমি তোমার মাথার অর্ধেকটা চুল বিক্রি কর। তাতে তোমার স্বামীর কাজও চলবে, খাবারও পাবে। আমি তোমাকে ঠকাব না।’
কোন বিকল্প ছিল না। তাই রহিমা রাজী হল এবং মাথার অর্ধেকটা চুলের বিনিময়ে খাবার সংগ্রহ শেষে গৃহ অভিমুখে রওনা হল।

এদিকে শয়তান দেখল রহিমার কারণে আইয়ূব এখনও ঈমানে কায়েম রয়েছে। তাই তাদের দু‘জনের বিশ্বাসের মধ্যে ফাঁটল সৃষ্টির চেষ্টায় মনোযোগ দিল সে। সে এক বৃদ্ধের বেশে আইয়ূবের কাছে এল। অতঃপর তাকে বলল, ‘আপনি আল্লাহর একজন নবী। এত কঠিন বিপদাপন্ন অবস্থায়ও আপনি ঈমানে অটুট রয়েছেন। কিন্তু সবকিছু মাটি হয়ে যাচ্ছে আপনার স্ত্রীর কারণে। আপনি তো খবর রাখতে সক্ষম নন- এই সুযোগে আপনার স্ত্রী আপনাকে হারাম খাবার খাওয়াচ্ছে। গ্রামে গিয়ে সে অসৎ কার্য্য এবং চুরি করে খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। আজ চুরির সময় সে ধরা পড়েছে। আর গ্রামের লোকেরা এই অপরাধে তার মাথার চুল অর্ধেকটা কেটে নিয়েছে।’

একথা শুনে আইয়ূব দু:খ-লজ্জায় মর্মাহত হলেন। তারপর রহিমা যখন ফিরে এল, তিনি দেখতে পেলেন যে তার চুল সত্যিই অর্ধেকটা কাটা। তিনি ভীষণ রেগে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, ‘তোমার চুরি করে আনা কোন খাবার আমি স্পর্শ করব না।’

রহিমা তার স্বামীকে বোঝাতে চেষ্টা করল। কিন্তু আইয়ূব তার কোন কথাই শুনতে চাইলেন না। তিনি স্ত্রীকে বললেন, ‘আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি এই অপরাধে আমি সুস্থ্য হয়ে তোমাকে অবশ্যই এক‘শ দোররা মারব।’
তিনি রহিমার আনা সমস্ত খাবার ছুঁড়ে ফেললেন।
এত লাঞ্ছনা ও দুর্ভোগের পর সংগ্রহ করে আনা খাবার চারিদিকে ছড়িয়ে গেল। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত নয়নে রহিমা সেদিকে তাকিয়ে রইল।

স্বামীর ব্যাবহারে অত্যন্ত দু:খিত হয়ে রহিমা নিজের নির্দোষিতার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থণা করল। আইয়ূব ও তার পরিবারের এমন দূরাবস্থার কথাই যেন কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে- তোমরা কি মনে করেছ যে (এমনই কেবল মুখের কথায়) স্বর্গে গমন করবে? অথচ এখনও তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের (নবী ও তার সহচরবর্গের) অবস্থায় উপনীত হওনি। বিপদের উপর বিপদ এবং আঘাতের উপর আঘাত তাদেরকে স্পর্শ করেছিল, (এমন কি তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত সমূলে) প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।-(২:২-১০)

এদিকে দু‘দিন অতিবাহিত হল, উভয়েই অনাহারে। এসময় আল্লাহ জিব্রাইলকে প্রেরণ করলেন। সে এসে আইয়ূবকে সকল ঘটনা অবহিত করার পর বলল, ‘এখন আল্লাহর কাছে তোমার নিজের জন্যে দোয়া কর। তিনি তা কবুল করবেন।’

আইয়ূবের এই অবস্থা যেন যবুরের এই সূরাতে বর্ণনা করা হয়েছে-

খোদা, তোমার ক্রোধে আমাকে ভর্ৎসনা কোরও না,
তোমার রোষাগ্নিতে আমাকে শাস্তি দিও না।
কেননা তোমার তীরসকল আমাতে বিদ্ধ,
আমার উপর তোমার হস্ত নেমেছে।
তোমার কোপ হেতু আমার অস্থিতে কোন মাংস নেই,
আমার শোক হেতু আমার মনে কোন শান্তি নেই।
কেননা আমার শাস্তিসমূহ আমার মাথার উপর উঠেছে, ভারী বোঝার ন্যায়,
সেসকল আমার শক্তি অপেক্ষা ভারী।
আমার ক্ষতসমূহ দুর্গন্ধ ও গলিত হয়েছে, আমার অজ্ঞানতা প্রযুক্ত।
আমি কুব্জ হয়েছি, অতি নুয়ে পড়েছি, আমি সারাদিন বিষন্ন ঘুরছি।
কেননা আমার কটিদেশে জ্বালা ধরেছে, আমার অস্থিতে কোন মাংস নেই।

আমি অবসন্ন ও অতিক্ষুন্ন হয়েছি, চিত্তের ব্যকুলতায় আর্ত্তনাদ করছি।
হে প্রভু, আমার সমস্ত কামনা তোমার সামনে,
আমার কাতরোক্তি তোমার কাছে গুপ্ত নয়।
আমার হৃদয় ধুঁকছে, আমার শক্তি নি:শেষ হয়েছে,
আমার চোখের জ্যোতিও আমাকে ছেড়ে গিয়েছে।
আমার প্রণয়ীরা ও আমার বন্ধুগণ আমার ব্যাধি হতে দূরে দাঁড়ায়,
আমার জ্ঞাতিবর্গ দূরে সরে থাকে।
যারা আমার প্রাণের অন্বেষণ করে, তারা ফাঁদ পাতে;
যারা আমার অনিষ্ট চায়, তারা বিনাশের কথা কহে,
আর সমস্ত দিন ছলের চিন্তা করে।
কিন্তু বধিরের মত আমি শুনিনে, বোবার মত আমি মুখ খুলিনে।
আমি তার মত, যে শুনতে পায় না, যার মুখে প্রতিবাদ নেই।

কারণ খোদা, আমি তোমারই অপেক্ষা করছি;
হে প্রভু, আমার উপাস্য, তুমিই উত্তর দেবে।
কেননা আমি বললাম, পাছে ওরা আমার বিষয়ে আনন্দ করে,
আমার চরণ টললেই আমার বিপক্ষে দর্প করে।
আমি তো পড়তে পড়তে উদ্যত;
আমার ব্যথা সতত আমার গোচরে রয়েছে।
আমি নিজের অপরাধ স্বীকার করব, আমার পাপের দরুন খেদ করব।
কিন্তু আমার শত্রুগণ সতেজ ও বলবান, অনেকেই অকারণে আমাকে ঘৃণা করে।
আর তারা উপকারের বদলে অপকার করে,
তারা আমার বিপক্ষ, কারণ যা ভাল আমি তারই অনুগামী।
খোদা, আমাকে পরিত্যাগ কোরও না;
আমার প্রতিপালক, আমা হতে দূরে থেক না।
হে প্রভু, আমার পরিত্রাণ, আমাকে সাহায্য করতে সত্ত্বর হও। (৩৮:১-২২)

সবকিছু ফিরে পেলেন আইয়ূব।
অতঃপর স্ত্রীর প্রতি এই অবিচারে আইয়ূব নিদারুণ মানষিক কষ্টে পড়লেন। তিনি তৎক্ষণাৎ শয়তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন এবং নিজের জন্যে প্রার্থণা করলেন, বললেন-‘হে আমার প্রতিপালক! শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে। আমি তার হাত থেকে বাঁচতে তোমার আশ্রয় প্রার্থণা করছি।’
আল্লাহ তার প্রার্থণা কবুল করলেন এবং তাকে জানালেন- ‘তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, স্নান ও পান করার জন্যে সুশীতল পানি পাবে।’

আইয়ূব পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন। সেখানে তৎক্ষণাৎ একটি প্রস্রবণের সৃষ্টি হল। তিনি সেই পানিতে স্নান করলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সুস্থ্য হয়ে গেলেন। তার চেহারায় লাবণ্য ও মাধুর্য ফিরে এল। স্নান সেরে পরিস্কার বস্ত্র পরিধান করে তিনি কাছেই এক বৃক্ষতলে বসে কৃতজ্ঞতাভরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনায় নিমগ্ন হলেন। কোরআনে রয়েছে-‘আমার দাস আইয়ূবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল- ‘শয়তান তো আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টে ফেলেছে।’
আমি তাকে বললাম- ‘তুমি তোমার পা দ্বারা ভূমিতে আঘাত কর, এ তো স্নান ও পান করার জন্যে সুশীতল পানি।’-(৩৮:৪১-৪৩) 

আইয়ূরের সমাধি, লেবানন।
আইয়ূব যখন সুস্থ্য হলেন, তখন তার স্ত্রী সেখানে ছিল না। অনাহারী স্বামীর জন্যে পুনঃরায় খাদ্য জোগাড় করতে সে গ্রামে ফিরে গিয়েছিল। অতঃপর ফিরে এসে যথাস্থানে স্বামীকে না দেখে সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। সে ধারণা করল তার স্বামীকে হয়তঃ কোন বন্যপশুতে খেয়ে ফেলেছে। সেখানে বসে সে বিলাপ করতে লাগল।

ক্রন্দনরত অবস্থায় হঠাৎ চোখ তুলতেই একটু দূরে এক ব্যক্তিকে উপবিষ্ট দেখতে পেল রহিমা। সে তৎক্ষণাৎ সেখানে ছুটে গেল। লোকটি চক্ষু মুদে ধ্যানমগ্ন ছিলেন। রহিমা তাকে বিলাপের সূরে দ্রুত জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে যে রোগাক্রান্ত লোকটি পড়ে থাকত, আপনি কি তাকে দেখেছেন?’

স্ত্রীর উৎকন্ঠিত কান্নাজড়িত কণ্ঠ শুনে আইয়ূব তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভালকরে দেখ, আমিই তোমার স্বামী। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন এবং আমাকে নতুন স্বাস্থ্য দান করেছেন। এখন কাঁদছ কেন আমাকে বল?’

আইয়ূবের সমাধি মন্দিরের অভ্যান্তরভাগ।
রহিমা তখন তার স্বামীকে চিনতে পেরে তাকে জড়িয়ে ধরল। অতঃপর সে আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল। একসময় আইয়ূব তাকে বললেন, ‘তুমি কি ভুলে গেছ আমার প্রতিজ্ঞার কথা?’

রহিমা খুশীমনে তার স্বামীকে তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে বলল। তখন আল্লাহ আইয়ূবকে জানালেন -‘এই ধৈর্য্যশীলা, কৃতজ্ঞা ও পতিপরায়ণা স্ত্রী কখনও শাস্তির যোগ্য নয়। তবে শপথ ভঙ্গ কোরও না। একমুষ্ঠি তৃণ নাও ও তার দ্বারা মৃদু আঘাত করে প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর।’ কোরআনে রয়েছে- আমি তাকে আদেশ করলাম- ‘এক মুষ্ঠি তৃণ নাও ও তার দ্বারা আঘাত কর এবং শপথ ভঙ্গ কোরও না।’
আমি তাকে ধৈর্য্যশীল পেলাম। সে কত উত্তম দাস, সে আমার অভিমুখী ছিল।(৩৮:৪৪-৪৫)   

আল্লাহ আইয়ূবের অবস্থা ফিরিয়ে দিলেন, ফিরিয়ে দিলেন সবকিছু পূর্বের চেয়ে কয়েক গুণে। তার ভ্রাতা-ভগ্নিরা এবং যারা তাকে ইতিপূর্বে পরিত্যাগ করেছিলে তারাও আবার ফিরে এল। তার গৃহ আবার সন্তান-সন্তুতিতে ভরে গেল। একে একে তার সাত পুত্র ও তিন কন্যার জন্ম হল। কোরআনে রয়েছে- ‘আমি আমার অনুগ্রহস্বরূপ ও বোধশক্তিসম্পন্ন লোকদের জন্যে উপদেশস্বরূপ তাকে (আইয়ূবকে) আবার দিলাম তার পরিজনবর্গ ও তাদের মত আরও বহুকিছু।’-(৩৮:৪৩)
যতদূর জানা যায়, সুস্থ্য হবার পর আইয়ূব আরও এক’শ চল্লিশ বৎসর আয়ূ লাভ করেছিলেন।

সমাপ্ত।
সংশোধিত নয়।

বিদ্র: অবশ্য প্রশ্ন একটা থেকে যায়- আইয়ূব যিনি কিনা একজন নবী, তিনি স্ত্রীর পূর্ণ বক্তব্য না শুনে অর্থাৎ ঘটনার তত্ত্ব তালাশ না করে, অপরিচিত ব্যক্তির কথাকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে স্ত্রীকে দোররা মারতে চাইলেন কেন? তাহলে কি তার স্ত্রীর প্রতি বিশ্বাসে ঘাটতি ছিল? (অবশ্য কেউ হয়ত: বলতে পারেন উক্ত ব্যক্তি আইয়ূবের নিকটাত্মীয়দেরই একজন ছিলেন, যার কথাকে তিনি অবিশ্বাস করতে পারেননি।)

যাইহোক না কেন, মূল বিষয় হচ্ছে, কাহিনী এমনই, তবে কিছু তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতায় অথবা আমার উপস্থাপনায় বিশেষ ঘাটতি রয়েছে। 

সংগ্রহ: রফিকুজ্জামান



স্বামীর নামে স্ত্রীর নামকরণ কঠিন গুনাহ

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে

স্বামীর নামে নামকরণ শক্ত গুনাহ
মুসলিম নারীদের অনেকেই বিয়ের পরে নিজের নাম পরিবর্তন করে স্বামীর নামকে নিজের নামের অংশ বানিয়ে ফেলে। হাল জামানায় এটি একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। যেমন : একজন মেয়ের বাবার দেয়া নাম ফাতেমা। রফিক নামে একজনের সাথে বিয়ের পর তার নাম হয়ে যায় মিসেস রফিক বা ফাতেমা রফিক। ইসলামি শরিয়ার দৃষ্টিতে এটি ঠিক নয়। মুসলিম নারীদের উচিত বিয়ের পরও তার পৈতৃক নাম ঠিক রাখা। কারণ এটি তার একেবারেই নিজস্ব এখানে স্বামীর কোনো শেয়ার নেই। নামই তার বংশ পরিচয় বহন করে।

আমরা বিদেশী সংস্কৃতি বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বকে অনুসরণ করতে গিয়ে এমন অনেক বিষয় অনুকরণ করছি যেগুলোর বিষয়ে ইসলামি শরিয়ার কোনো ভিত্তি নেই বরং সেগুলো একান্তই তাদের চর্বিত বিষয়। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন এবং সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বাণী, কর্ম ও অনুমোদন। অনুরূপভাবে সাহাবি রা: ও তাবেয়িনদের কথা, কাজ ও মৌনসম্মতি যাকে শরিয়ার পরিভাষায় ‘সুন্নাহ’ বলা হয়। ইসলামি শরিয়ার এ দু’টি অন্যতম প্রধান উৎসের কোথাও এর অনুমোদন বা সমর্থন পাওয়া যায়নি। মহানবী সা: বা সাহাবিদের রা: জীবনাচারেও এর কোনো নজির নেই। যদি স্বামীর নামে পরিচিত হওয়া বা স্বামীর নাম নিজের নামের সাথে যুক্ত করা আভিজাত্য বা মর্যাদার ব্যাপার হতো তাহলে আমাদের প্রিয় নবী সা:-এর স্ত্রীগণ বা উম্মাহতুল মুমিনিনরাও তাদের নামের সাথে হজরত সা:-এর নাম যুক্ত করতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাদের কেউই তা করেননি। বরং প্রত্যেকে নিজেদের পিতার নামেই পরিচিত ছিলেন যদিও তাদের কারো কারো পিতা কাফের ছিল। সুতরাং আমরা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এমন কোনো বিষয় অবলম্বন করতে পারি না যার অনুমোদন উত্তম যুগে ছিল না। হজরত আশেয়া সিদ্দিকা রা: বিয়ের পর তাঁর নাম পরিবর্তন করে আয়েশা মুহাম্মদ রাখেননি এবং তিনি তাঁর পিতা আবুবকর সিদ্দিক রা: পরিচয় অক্ষুন্ন রেখেছেন।

বাবাকর্তৃক প্রদত্ত নাম ঠিক রাখার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ওই নামটি ব্যক্তির বংশের পরিচায়ক। কুরআন বলছে : ‘তোমরা তাদেরকে তাদের বাবার নামে ডাক’। (আল-কুরআন) এই আয়াতটি যদিও পালকপুত্রদের তাদের প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা বর্তমানে তাদের লালন-পালন করছেন বা ভরণ-পোষণ জোগান দিচ্ছেন তারা তাদের পিতা নন। বরং যারা তাদের জন্ম দিয়েছেন তারাই তাদের পিতা। অনুরূপভাবে মেয়েরাও তাদের পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবেন স্বামীর পরিচয়ে নন। তা ছাড়া পালক পুত্রকে প্রকৃত পিতার নামে ডাকার নির্দেশ প্রমাণ করে স্ত্রীদেরও তাদের পিতার নামে ডাকতে হবে।

হজরত সাঈদ ইবনে যুবায়ের হজরত ইবন আব্বাস রা:-কে বলতে শুনেছেন যে, রাসূল সা: বলেছেন : ‘যে কেহ নিজেকে বাবার নাম ছাড়া অন্য নামে ডাকবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত বর্ষিত হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ) ইমাম বুখারিও রা: সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
হজরত সাদ, হজরত আবু বাকরা রা: থেকে বর্ণিত, তারা প্রত্যেকে বলেছেন : ‘আমার দু’কান শুনেছে এবং আমার অন্তর মুহাম্মদ সাা:-এর এ কথা সংরক্ষণ করেছে’, মহানবী সা: বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেকে নিজের পিতা ছাড়া অন্যের সাথে সংযুক্ত করে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যাবে’। (ইবনে মাজাহ)

হজরত আবদুল্লাহ ইবন আমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সা: বলেছেন, ‘যে কেউ নিজের বাবা ছাড়া অন্যের পরিচয়ে পরিচয় দেয় সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুঘ্রাণ ৭০ বছর হাঁটার রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

এমন অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে মহানবী সা: নারীদের তাদের পিতার নামে ডেকেছেন। যখন পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘আপনি আপনার নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন’। (আল-কুরআন : ২১৪) নাজিল হয় তখন মহানবী সা: তাঁর আত্মীয়দের প্রত্যেককে ডেকে ডেকে বলেছিলেন : ‘হে অমুকের ছেলে অমুক! আমি পরকালে তোমার কোনো উপকার করতে পারব না। হে অমুকের মেয়ে অমুক! আমি কিয়ামতের দিন তোমাদের কোনো কাজে আসব না।’ (আল-কাশফুল মুবদি) কিয়ামতের মাঠেও প্রত্যেককে তার বাবার নাম ধরে ডাকা হবে। হাদিসের কিতাবগুলোয় এ সংক্রান্ত অনেক হাদিস রয়েছে।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর রা:-এর শাসনামলের একটি বিখ্যাত ঘটনা হাদিসের বর্ণনায় এসেছে। তা হলো তিনি এক রাতে যখন প্রজাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য বের হলেন তখন একজন মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিনি স্বামীর বিরহে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলেন। তিনি পরদিন সকালে মহিলাটির খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য লোক পাঠালেন। তাঁকে বলা হলো এ মহিলা হলেন অমুকের মেয়ে অমুক। তার স্বামী আল্লাহ রাস্তায় জেহাদে রয়েছেন। (সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর) এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হলো, মহিলাটি বিবাহিত হলেও তার পরিচয়ের ক্ষেত্রে বলা হলো অমুকের মেয়ে অমুক; একথা বলা হলো না যে, অমুতের স্ত্রী অমুক।

আরো যে সব কারণে নারীদের বাবার নামে পরিচিত হওয়া উচিত নয় তা হলো : ০১. স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কোনো রক্ত সম্পর্ক থাকে না। কিন্তু বাবা মেয়ের রক্ত সম্পর্ক চিরদিনের। ০২. স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মনোমালিন্য হলে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতে পারে। তখন এই নাম থাকে না। ০৩. স্বামী মারা গেল স্ত্রী অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে পারে। তখন এই নামের কী দশা হবে তা সহজেই অনুমেয়। ০৪. স্বামী তো বিয়ের পর নিজের নাম পরিবর্তন করে না, তাহলে নারী কেন করবে? এটি কি নারী অধিকারের লঙ্ঘন নয়? আলোচ্য প্রবন্ধে নতুন একটি বিষয়কে অত্যন্ত ুদ্র পরিসরে আলোচনা করা হলো। মুসলিম সমাজের উচিত ইসলামকে পুরোপুরি অনুসরণ করা। আর যারা পরিপূর্ণ মানতে চায় তাদের উচিত এসব বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকা। যাতে করে কোনো অজুহাতেই অভিশপ্ত শয়তান কোনোভাবেই আমাদের সত্য ও সঠিক পথ ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

লেখক : ড. ইউসুফ ইবন হোছাইন (অধ্যাপক, ঢাবি)



ইসলামের আলোয় আলোকিত করলেন হিন্দু থেকে মুসলিম সিন্ধুর দ্বীন মোহাম্মদ শেখ

শুক্রবার, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
ইসলামের আলোয় আলোকিত করলেন হিন্দু থেকে মুসলিম সিন্ধুর দ্বীন মোহাম্মদ শেখ

আলোচিত এই ব্যক্তি হলেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের দ্বীন মোহাম্মদ শেখ। ১৯৪২ সালে একটি হিন্দু পরিবারে জন্ম নেয়া এ ব্যক্তি ১৯৮৯ সালে ৪৭ বছর বয়সে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এরপর থেকেই তিনি উদ্যোগী হন দ্বীনপ্রচারে। ইতিমধ্যেই তার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাযার মানুষ।

জন্মগতভাবে ইসলাম সম্পর্কে ছিল তার ব্যাপক আগ্রহ। ইসলামের প্রতি এমন অনুরাগ দেখে তার মা ১৫ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পরও ইসলাম সম্পর্কে তার কৌতুহল একটুও কমেনি। ইসলাম সম্পর্কে জানতে তিনি এক মুসলিম উস্তাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার নিকটে নিয়মিত কুরআন ও হাদীছের বাণী সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন দ্বীন মুহাম্মাদ। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, তাঁর দাওয়াতে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৮ হাযার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

দ্বীন মুহাম্মদ শেখ স্থানীয় আল্লাহওয়ালী জামে মসজিদের সভাপতি। তিনি অসহায় ইসলাম গ্রহণকারীদের আবাসনের জন্য প্রায় ৯ একর জায়গারও ব্যবস্থা করেছেন।

তাঁর ধর্ম প্রচারের কথা পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ায় অনেক দূর-দূন্ত থেকে মানুষ তার কাছে এসেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই বাড়ির মসজিদে নও মুসলিম শিশু-কিশোর ও নারী- পুরুষের জন্য ১৫ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়ে ছালাত ও কুরআন তেলাওয়াত শেখার ব্যবস্থা রেখেছেন তিনি।



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png