শিরোনাম
Loading latest headlines...

সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২১

মহিলাদের মসজিদে গমনের শরিয়াতের বিধান-ইসলামিক আলোচনা-৫ম পর্ব

সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

 



মহিলাদের মসজিদে গমনের শরয়ী বিধান

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ ۖ وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ ۚ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا

বাংলা অনুবাদঃ তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করবে-মূর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। নামায কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে। হে নবী পরিবারের সদস্যবর্গ। আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্র রাখতে।

(সূরাঃ আল আহযাব, আয়াতঃ ৩৩)


আল্লাহ তায়ালা নারী-পুরুষ উভয়ের উপর সমভাবে নামায ফরয করেছেন। তবে আদায়ের পদ্ধতি উভয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন রেখেছেন। পদ্ধতি ভিন্ন হলেও সাওয়াব প্রাপ্তির দিক থেকে বরাবর। পুরুষরা নামায পড়বে মসজিদে জামাতের সাথে, আর মহিলারা নামায পড়বে নিজ গৃহে একাকী।

এটাই শরীয়তের মূূল দাবী। যা রাসূল স.-এর যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান আমল। আহলুসসুন্নাহ ওয়াল জামাআতের মত এটাই। ইদানিং মহিলাদের একটি অংশ মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে অধিক উৎসাহী। আর মহল বিশেষ মহিলাদের মসজিদে বৈধ মত ব্যক্ত করে মনগড়া দলীল পেশ করে বিভ্রাান্তি ছড়াচেছ। আর হাতিয়ার হিসেবে তারা রাসূল স. এর হাদিসের দোহাই দিচেছ। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা একান্ত জরুরী। প্রথমে আমরা রাসূল স. থেকে বর্ণিত হাদিস গুলোর ব্যপারে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

মহিলাদের মসজিদে গমনের শরয়ী বিধান

মহিলারা মসজিদে নামায পড়া বা না পড়া সম্পর্কে কয়েক ধরনের হাদীস পাওয়া যায়।

এক-

মসজিদে নাামায আদায় করার অনুমতি সংক্রান্ত হাদীস। যেগুলোতে কোনো শর্তারোপ করা হয়নি।

বুখারি শরিফে আছে-

১. আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের সূত্রে রাসূল স. ইরশাদ করেন –

اذا استاذنت امرأة احدكم الي المساجد فلا يمنعها . (رواه البخاري)

তোমাদের স্ত্রীগণ মসজিদে আসার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করো না। [বুখারী : ৫২৩৮]


২. মুসলিম শরিফে আছে রাসূল স. ইরশাদ করেন-

لا تمنعوا إماء الله مساجدالله. (رواه مسلم)

তোমরা আল্লাহর বান্দীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করো না। [মুসলিম : ৪৪২]


৩. অপর বর্ণনায় ইবনে উমর রা. বলেন, রাসূল স. কে আমি বলতে শুনেছি,

اذا استأذنكم نساءكم الي المساجد فأذنوا لهن. (رواه مسلم)

যখন তোমাদের নিকট মহিলাগণ মসজিদে গমনের অনুমতি চাইবে তোমরা তাদের অনুমতি দিয়ে দিবে। [মুসলিম : ৪৪২]


পর্যলোচনা-

বর্ণিত হাদীসগুলোতে মহিলাদের সম্বোধন করে মসজিদে গমনের কোনো প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি।

এমনকি মসজিদে গমনের স্বাধীনতা ও দেয়া হয়নি। বরং পুরুষের অনুমতি ও সন্তুষ্টি সাপেক্ষে মসজিদ গমনের অনুমোদ দেয়া হয়েছে মাত্র।

‘তারা যারা যারা মসজিদ গমনের অনুমতি চায়’ এ বাক্য দ্বারা সুস্পষ্ট প্রমাণ যে অধিকাংশ মহিলা মসজিদে যেতেন না; আবার কেউ যেতে চাইলেও স্বামীর অনুমতি নিতে সক্ষম না হওয়ায় যেতেন না। হ্যাঁ, স্বামীর অনুমতিতে মসজিদে গমনের অনুমতি দেয়া হয়েছে।

সুতরাং এসব হাদীসের আলোকে মহিলাদের মসজিদ গমন জায়েয বলা গেলেও সুন্নাত বলার কোনো অবকাশ নেই; বরং মসজিদে না যাওয়াই সুন্নাত ও উত্তম। এ কারণেই মসজিদে নববী ছাড়া অন্য কোনো মসজিদে মহিলা গমনের ইতিহাস পাওয়া যায় না।। কিন্তু তাদেরকে রাসূল স. মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামায আদায় করার প্রতি উৎসাহমূলক দিয়েছেন।


দুই-

দ্বিতীয় প্রকারের হাদীস। যেগুলোতে মহিলাদেরকে বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে মসজিদে গমনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে কয়েকটি হাদীস দেখুন।

প্রথম শর্ত- পূর্ণ পর্দা করা

১. আয়েশা রা.বর্ণনা করেন-

كن نساء المؤمنات يشهدن مع رسوالله صلي الله عليه و سلم صلاة الفجر متلفعات بمروطهن ثم ينقلبن الي بيوتهن حين يقضين الصلاة لا يعرفهن أحد من الغرس .

মুমিন নারীগণ মোটা চাদরে আবৃত হয়ে রাসূল স.-এর সাথে ফজরের জামাতে হাযির হতেন । বড় চাদরে তাদের মাথা পা পর্যন্ত ঢাকা থাকতো। নামায শেষে ঘরে ফেরার সময়েও ভোরের অন্ধকারের কারণে কেউ তাদের চিনতে পারতো না। [বুখারী : ৫৭৮]

বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসুলের যুগে যে সব মহিলা স্বামীর অনুমতিক্রমে নামাযে যেতেন তারা পর্দার সাথে যেতেন।

সুতরাং নামায আদায়ের জন্য মসজিদে গমন বৈধ হওয়ার জন্য ঢিলাঢালা বড় মাপের চাদর এবং বোরকা দ্বারা পূর্ণ শরীর আবৃত থাকা জরুরী।


দ্বিতীয় শর্ত- সুগন্ধি সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা।

২. হযরত যায়নাব রা. বর্ণনা করেন –

قال لنا رسول الله صلي الله عليه وسلم اذاشهدت احداكن المسجد فلا تمس طيبا. (مسلم)

রাসূল স. আমাদের সম্বোধন করে বলেন, তোমাদের কেও যদি মসজিদে গমন করে তাহলে সে যেনো সুগন্ধি ব্যবহার না করে। [মুসলিম : ৪৪৩]


৩. আবু হুরাইরা বর্ণিত রাসূল স. ইরশাদ করেন-

انما امرأة اصابت بخورا فلا تشهد معنا العشاء الاخرة. (مسلم)

যে মহিলা শরীরে বুখুর বা সুগন্ধি লাগিয়েছে সে যেনো আমার সাথে (মসজিদে) এশার নামাযে উপস্থিত না হয়। [মুসলিম : ৪৪৪]

এসব হাদীস দ্বারা আরেকটি শর্ত প্রমাণিত হলো যে, মহিলারা মসজিদে সুগন্ধি ব্যবহার করে আসতে পারবেনা।


তৃতীয় শর্ত- সাজ সজ্জা ত্যাগ করা

৪. হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল স. ইরশাদ করেন-

لا تمنعوا إماء الله مساجد الله ولكن ليخرجن وهن تفلات. (رواه أحمد في مسند و اسناده صحيح)

আল্লাহর বান্দীদের মসজিদ থেকে বারণ করো না। তবে তারা সাজসজ্জা পরিপূর্ণ পরিহার করে আসে। [মুসনাদে আহমদ : ৯৬৪৫, আবু দাউদ : ৫৬৫]


৫. হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন-

بينما رسول الله صلي الله عليه وسلم في المسجد. اذ دخلت امرأة من مزينة ترفل في زينة لها في المسجد وقال النبي صلي الله عليه وسلم يا ايها الناس انهوا نساءكم عن لبس الزينة والتبختر في المسجد فإن بني اسرائيل لم يلعنوا حتي ليس نساؤهم الزينة وتبخترون في المساجد. رواه ابن ماجه : الحديث:৪০০১

একদা রাসূল স. মসজিদে বসা ছিলেন। এ সময় মুযাইনা গোত্রের এক মহিলা ঝাকঝমকপূর্ণ পোষাকে সুগন্ধি ব্যবহার করত মসজিদে প্রবেশ করলো। এসব দেখে রাসূল স. ইরশাদ করলেন, হে মানুষ সকল, তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাজসজ্জা অবলম্বন করে দম্ভের সাথে মসজিদে আসা থেকে বারণ করো। (জেনে রাখ) বনী ইরাঈল তখনই অভিশপ্ত হয়েছে, যখন তাদের মহিলারা সেজেগুঁজে দম্ভের সাথে মসজিদে গমন শুরু করেছিলো। [ইবনে মাজাহ শরীফ : ৪০০১]

বুঝা গেলো, মহিলাদের আকর্ষণীয় পোশাকে সজ্জিত হয়ে , চাকচিক্য এমব্রয়ডারিকৃত বোরকা নিয়েও মসজিদে গমন বৈধ নয়।


চতুর্থ শর্ত- মসজিদে ও পথে নারী পুরুষের সংমিশ্রণ না ঘটা

৬. হযরত আবু উসাইদ আনসারী রা. বর্ণনা করেন –

أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ وَهُوَ خَارِجٌ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاخْتَلَطَ الرِّجَالُ مَعَ النِّسَاءِ فِى الطَّرِيقِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- لِلنِّسَاءِ ্র اسْتَأْخِرْنَ فَإِنَّهُ لَيْسَ لَكُنَّ أَنْ تَحْقُقْنَ الطَّرِيقَ عَلَيْكُنَّ بِحَافَاتِ الطَّرِيقِ গ্ধ. فَكَانَتِ الْمَرْأَةُ تَلْتَصِقُ بِالْجِدَارِ حَتَّى إِنَّ ثَوْبَهَا لَيَتَعَلَّقُ بِالْجِدَارِ مِنْ لُصُوقِهَا بِهِ.(ابوداود. الحديث : ৫১৭২)

তিনি বলেন, আমি রাসূল স.কে বলতে শুনেছি ‘মহিলাগণ! তোমরা পেছনে সরে যাও। রাস্তার মধ্যভাগে তোমাদের চলা ঠিক নয়। তোমরা রাস্তার কিনারায় চলবে। বর্ণনাকারী বলেন, এ আদেশের পর মহিলারা রাস্তার কিনারা দিয়ে এমনভাবে চলতেন যে, রাস্তার পাশে নির্মিত ঘরের দেয়ালে তাদের কাপড় আটকে যাওয়ার উপক্রম হতো। [আবু দাউদ : ৫২৭২]


৭. হযরত উম্মে সালমা রা. বর্ণনা করেন –

كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا سلم قام النساء حين يقضى تسليمه ويمكث هو فيمقامه يسيرا قبل ان يقوم. (رواه بخاري : ৮৭০)

রাসূল স. যখন নামায শেষে সালাম ফেরাতেন তখন কোনো প্রকার বিলম্ব না করে মহিলাগণ কাতার থেকে উঠে চলে যেতেন। আর রাসূল স. আপন স্থানে কিছুক্ষণ বসে থাকতেন। (যাতে মহিলাদের সাথে পুরুষের কোনো রকম সংমিশ্রণ না হয়) [বুখারী : হা.৮৭০]

এসব হাদীস থেকে প্রমাণ হয় যে, রাসূল স. চলাচলের পথে পুরুষ-নারীর সংমিশ্রণ না হওয়ার শর্তে মহিলাদের মসজিদে গমনের অনুমতি দিয়েছেন ।

উপরোক্ত হাদীসসমূহ থেকে যা বুঝা গেল

নামায ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মসজিদে নববীতে এক রাকাত নামায অন্য সকল মসজিদের নামাযের চেয়ে এক হাজার গুণ (এক বর্ণনায়) বা পঞ্চাশ হাজার গুণ। (পর বর্ণনা মতে) বেশী সাওয়াব পাওয়া যায়। নবীজী সা.-এর সাথে তারই ইমামতিতে আদায়কৃত একটি নামায জীবনের জন্য সর্বাধিক সৌভাগ্যের ব্যাপার; এবং অনেক বড় পুঁজি। তবে বিপরীতে গোটা পৃথিবীর ধন সম্পদেরও কোনো মূল্য নেই। তার ইমামতিতে অনুষ্ঠিত নামাযে মুক্তাদিগণ ছিলেন, উম্মতের সবচেয়ে পবিত্র জামাত। যাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কেয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য মহান আদর্শ। সে সময়টা ছিলো নতুন নতুন ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময়। আল্লাহর নাযিলকৃত বিধিনিষেধ শুনার জন্য নারী পুরুষ সকলেই থাকতো উদগ্রীব; উৎসুক। দরবারে নববী ছিলো প্রতিনিয়ত লোকে লোকারণ্য। এবং প্রতিটি মানুষের অন্তর ছিলো পবিত্র; পরিচ্ছন্ন নবীপ্রেমে ভরপুর।

এহেন পাক পবিত্র নিষ্কুুলুষ ও নিরাপদ সমাজে রাসূল স. মুসলিম রমনীদের মদীনার মসজিদে নববীতে স্বয়ং তার পিছনে; উম্মতের সর্বোত্তম জামাতের সাথে নামাযের মতো সর্বোত্তম ইবাদাতের জন্য মসজিদে গমন করার জন্য উপরোক্ত শর্তারোপ করেছেন। শর্তগুলো হচ্ছে,

১. মসজিদে যাওয়ার অনুমতি থাকলেও ঘরে নামায আদায় করা সর্বোত্তম।

২. স্বামীর অনুমতি নিতে হবে ।

৩. রাতের অন্ধকারে আসবে যাতে কারো দৃষ্টিগোচর না হয়।

৪. মাথা থেকে পা পর্যন্ত পূর্ণ শরীর সাদাকালো বোরকা দ্বারা আবৃত থাকতে হবে।

৫. সুগন্ধি ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।

৬. সাদামাটা কাপড় পড়ে আসবে । পুরুষ থেকে নিরাপদ দূরুত্তে অবস্থান করবে। যাতে মসজিদ বা পথে পুরুষের সাথে সংমিশ্রণ না হয়।

এসব শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করে কেউ মসজিদে আসতে চাইলে রাসূল স. তাকে বারণ করতে পুরুষদের নিষেধ করেছেন। তথাপি রাসূল স. তার নিজের সন্তুষ্টির কথা এভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, মহিলাদের জন্য মসজিদ অপেক্ষা তাদের বসবাসের ঘরে অন্ধকার স্থান অধিক উত্তম।


তিন-

কিছু হাদীসে এসেছে , সব শর্ত মেনে মসজিদে গমন থেকেও ঘরে নামায আদায় সর্বোত্তম ও রাসূল স.-এর সন্তুষ্টি।


১০. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূল স. ইরশাদ করেন-

্র لاَ تَمْنَعُوا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ وَبُيُوتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ গ্ধ.(رواه ابو داود باسناد صحيح : ৫৬৭)

তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের মসজিদে যেতে বাঁধা দিবে না। তবে (মনে রাখবে) তাদের জন্য তাদের ঘরই নামাযের উত্তম স্থান। [আবু দাউদ : ৫৬৭]


১১. হযরত ইবনে মাসউদ রা.-এর সুত্রে বর্ণিত –

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ عَنِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ ্র صَلاَةُ الْمَرْأَةِ فِى بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلاَتِهَا فِى حُجْرَتِهَا وَصَلاَتُهَا فِى مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلاَتِهَا فِى بَيْتِهَا গ্ধ.(رواه ابو داود : ৫৭০)

রাসূল স. বলেন, মহিলাদের ঘরের অভ্যন্তরে আদায়কৃত নামায ঘরের আঙ্গিনায় আদায়কৃত নামাযের তুলনায় উত্তম। ঘরের ভেতরের ছোট কামরায় আদায়কৃত নামায ঘরের অভ্যন্তরে আদায়কৃত নামাযের তুলনায় উত্তম। [আবু দাউদ : ৫৭০]


১২. হযরত উম্মে সালমা রা. থেকে বর্ণিত –

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ خَيْرُ مَسَاجِدِ النِّسَاءِ قَعْرُ بُيُوتِهِنَّ. (مسند احمد : ২৬৫৪২)

রাসূল সা. ইরশাদ করেন-

মহিলাদের উত্তম মসজিদ তাদের ঘরের অন্দরমহল। [মুসনাদে আহমদ : ২৬৫৪২]


১৩. হযরত উম্মে হুমায়দ রা.থেকে বর্ণিত –

عَنْ أُمِّ حُمَيْدٍ امْرَأَةِ أَبِي حُمَيْدٍ السَّاعِدِيِّ أَنَّهَا جَاءَتْ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَتْ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّي أُحِبُّ الصَّلَاةَ مَعَكَ قَالَ قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي حُجْرَتِكِ وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي دَارِكِ وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِي قَالَ فَأَمَرَتْ فَبُنِيَ لَهَا مَسْجِدٌ فِي أَقْصَى شَيْءٍ مِنْ بَيْتِهَا وَأَظْلَمِهِ فَكَانَتْ تُصَلِّي فِيهِ حَتَّى لَقِيَتْ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ. (رواه احمد ورجاله رجال الصحيح وقال الشيخ حمزة أحمد الزين اسناده صحيح : ২৭০৯০)

তিনি রাসূল স.-এর দরবারে হাযির হয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সা.! আপনার পিছনে নামায আদায় করা আমার প্রবল ইচ্ছা। রাসূল স. বললেন, আমি জানি আমার পিছনে নামায আদায় করতে তুমি বড়ই আগ্রহী। অথচ তোমার জন্য তোমার ঘরের ছোট কামরায় নামায বড় কামরার নামাযের চেয়ে উত্তম। বড় কামরার নামায ঘরের আঙ্গিনার নামাযের চেয়ে উত্তম। ঘরের আঙ্গিনার নামায মহল্লা মসজিদের নামাযের চেয়ে উত্তম। মহল্লা মসজিদের নামায আমার মসজিদের নামায অপেক্ষা উত্তম। বর্ণনাকারী বলেন, (রাসুলের এমন ভাব বুঝে) উম্মে হুমায়েদ ঘরের অভ্যন্তরে নামাযের স্থান বানাতে নির্দেশ দেন। সে মতে ভেতরের এক অন্ধকার কোঠায় নামাযের স্থান বানানো হলো এবং তিনি জীবনভর সে স্থানে নামায আদায় করতে থাকেন। আর এ অবস্থায় তিনি আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে গেলেন। [মুসনাদে আহমাদ : ২৭০৯০]


১৪. হযরত উম্মে সালমা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

عن أم سلمة زوج النبي صلى الله عليه و سلم قالت قال رسول الله صلى الله عليه و سلم صلاة المرأة في بيتها خير من صلاتها في حجرتها وصلاتها في حجرتها خير من صلاتها في دارها وصلاتها في دارها خير من صلاتها خارج. (رواه الطبراني في الاوسط ورجاله رجال الصحيح : ৯১০১)

রাসূল স. ইরশাদ করেন ‘মহিলাদের জন্য নিজের ছোট কামরার নামায বড় কামরার নামাযের চেয়ে উত্তম। বড় কামরার নামায ঘরের আঙ্গিনার নামায থেকে উত্তম। বাড়ির নামায বাড়ির বাইরের নামায থেকে উত্তম। [আল মুজামুল আওসাত : ৯১০১]


১৫. হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল স. ইরশাদ করেন-

عن عائشة قالت قال رسول الله صلى الله عليه وسلم “صلاة المرأة في بيتها خير من صلاتها في حجرتها وصلاتها في حجرتها خير من صلاتها في دارها وصلاتها في دارها خير من صلاتها فيما وراء ذلك” .(التمهيد لابن عبد البر : ৪০১/২৩)

মহিলাদের ছোট কামরার নামায বড় কামরার নামাযের চেয়ে উত্তম। বড় কামরায় নামায ঘরে আঙ্গিনার নামাযের চেয়ে উত্তম। আর ঘরের আঙ্গিনার নামায অন্যান্য জায়গায় নামাযের তুলনায় উত্তম। [আত তামহীদ : খ.২৩ পৃ.৪০১]


১৬. হযরত ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত-

عن ابن عمر عن النبي صلي الله عليه وسلم قال : صلاة المرأة وحدها تفضل على صلاتها في الجمع بخمس وعشرين درجة.(الجامع الصغير :২২৩/৪)

রাসূল স. ইরশাদ করেন, ‘মহিলাদের একাকী নামায জামাতের সাথে আদায়কৃত নামাযের থেকে পঁিচশগুণ বেশী ফযিলতপূর্ণ। [জামেউস সগীর : খ.৪ পৃ.২২৩]


১৭. হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত-

عن عبد الله بن مسعود عن النبي صلى الله عليه و سلم قال : إن أحب صلاة تصليها المرأة إلى الله في أشد مكان في بيتها ظلمة. (رواه ابن خزيمة في صحيحه : ১৬৯১)

রাসূল স. বলেন, আল্লাহর নিকট মহিলাদের ঐ নামায সবচেয়ে প্রিয় যা ঘরের বেশী অন্ধকারময় কামরায় আদায় করা হয়। [সহীহ ইবনে খুযায়মা : ১৬৯১]


৮. আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত-

وعن عبد الله بن مسعود قال : إنما النساء عورة وإن المرأة لتخرج من بيتها وما بها من بأس فيستشرفها الشيطان فيقول : إنك لا تمرين بأحد إلا أعجبتيه وإن المرأة لتلبس ثيابها فيقال : أين تريدين ؟ فتقول : أعود مريضا أو أشهد جنازة أو أصلي في مسجد وما عبدت امرأة ربها مثل أن تعبده في بيته

তিনি বলেন, মহিলারা আপাদমস্তক পর্দায় থাকার বস্তু। নি:সন্দেহে মহিলারা নির্দোষ অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়। অতঃপর শয়তান তার প্রতি কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে, তুমি যার সামনে দিয়েই অতিক্রম করবে তার কাছেই পছন্দনীয় হবে। মহিলারা যখন কাপড় পরিধান করে তখন পরিবারের লোকজন জিজ্ঞেস করে, কোথায় যেতে চাচ্ছ ? তখন সে বলে, কোন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাচ্ছি। অথবা মাইয়্যেতের জানাযা পড়তে যাচ্ছি। অথবা মসজিদে নামায পড়তে যাচ্ছি।

বস্তুত: মহিলাদের অন্দর মহলে ইবাদতের চাইতে কোন ইবাদাতই উত্তম নয়। আল্লামা তবরানী রহ. হাদীসটিকে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণনা করেছেন। (আল-মু‘জামুল কাবীর: খ: ৪ পৃ: ৫৮৭ হাদীস নং ৯৩৬৭)


১৯. ইবনে মাসউদ রা.-এর আমল-

وعنه أيضا أنه كان يحلف فيبلغ في اليمين : ما من مصلى للمرأة خير من بيتها إلا في حج أو عمرة إلا امرأة قد يئست من البعولة وهي في منقليها . قلت : ما منقليها ؟ قال : امرأة عجوز قد تقارب خطوها (رواه الطبراني في الكبير ورجاله موثقون)

তিনি কসম কাটতেন এবং দৃঢ়ভাবে কসম কাটতেন যে, মহিলাদের জন্য তার অন্দর মহল থেকে উত্তম নামাযের কোন স্থান নেই। তবে দুই ধরণের মহিলা ব্যতীত।


ক. হজ এবং ওমরায় গমনকারিনী।

খ. ঐ মহিলা যে তার স্বামী থেকে নিরাশ হয়ে গেছে এবং নিজের মুনকালীন এ আছে। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন, মুনকালীন-এ থাকার অর্থ কী? তিনি বললেন, এমন বৃদ্ধা হয়ে যাওয়া যে, অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণে কাছে কাছে পা পড়ে। আল্লামা তবারানী আল-মু’জামূল কাবীরে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এর প্রত্যেকটি বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। (আল-মু’জামূল কাবীর: ৪/৫৮৬,হাদীস নং ৯৩৬১-৯৩৬২)


২০. হযরত ইবনে মাসউদ র. এর ফাতওয়া-

عن ابن مسعود قال ما صلت المرأة في مكان خير لها من بيتها إلا أن يكون المسجد الحرام أو مسجد النبي صلى الله عليه و سلم إلا امرأة تخرج في منقليها يعني خفيها. (رواه الطبراني في الكبير ورجاله رجال الصحيح : ৯৪৭২)

তিনি বলেন, মহিলাদের নামায আদায়ের জন্য তাদের ঘরের অভ্যন্তরীণ অংশ থেকে উত্তম কোনো স্থান নেই। তবে (হজ্ব ওমরার সময়) মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীর কথা ভিন্ন। হ্যাঁ, যে বয়োবৃদ্ধ মহিলার কদম ছোট হয়ে গেছে তার যাওয়ার অবকাশ আছে। (আল মুজামুল কবীর : ৯৪৭২)


২১. হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর ‘ফাতওয়া’

عن عبد الله بن عباس أن امرأة سألته عن الصلاة في المسجد يوم الجمعة فقال صلاتك في مخدعك أفضل من صلاتك في بيتك وصلاتك في بيتك أفضل من صلاتك في حجرتك وصلاتك في حجرتك أفضل من صلاتك في مسجد قومك .(رواه ابن ابي شيب: ৭৬৯৭)

এক মহিলা ইবনে আব্বাসকে জুমার দিন মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তোমাদের শোয়ার ঘরে নামায আদায় করা ঘরে নামায পড়া থেকে উত্তম। ঘরে নামায পড়া আঙ্গিনার নামায থেকে । মহল্লার মসজিদে নামায আদায় করার চেয়ে। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা : ৭৬৯৭]


বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, উল্লিখিত হাদীসগুলোর সাথে এক, দুই-তে উদ্ধৃত হাদসিগুলোর সংঘর্ষ আছে বলে মনে হতে পারে। মূলত এ দুই ধরনের হাদীসের মাঝে কোনো সংঘর্ষ নেই।

কারণ তিন-এ বর্ণিত হাদীস দ্বারা মসজিদে না যাওয়াই উত্তম বুঝানো হয়েছে। আর এক,দুই-তে উদ্ধৃত হাদীসসমূহ দ্বারা কঠিন শর্তসাপেক্ষে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

মোট কথা, মহিলারা নামাজের জন্য মসজিদে যাওয়া অনুত্তম ; ঘরে পড়া উত্তম। এ দুয়ের মাঝে সংঘর্ষ নেই। যদি কিছূু হাদীসে মসজিদে গমনকে ওয়াজিব বা সুন্নাত বলা হতো আর কিছু হাদীসে ঘরের নামায আদায় জরুরী; মসজিদে যাওয়াকে গুনাহ বলা হতো তাহলে সংঘর্ষ হতো।


কটি প্রশ্ন: ঘরে নামায আদায় করা উত্তম জেনেও কিছু মহিলা কেন মসজিদে যেতেন?

জবাব:- রাসূলের পছন্দনীয় নয় জেনেও তখনকার মহিলারা নিন্মোক্ত কারণে মসজিদে যেতেন।

ক্স অনেক সময় মানুষ নিজস্ব আবেগ অনুভূতির তাড়নায় উত্তম কাজ ছেড়ে অনুত্তম বা জায়েযের উপর আমল করে। এটা মানবীয় প্রবণতা ও ব্যক্তিগত রুচি।

ক্স রাসূলের প্রতি গভীর ভালবাসা এবং তার পেছনে নামায আদায়ের প্রবল আবেগ।

ক্স মাসআলা মাসাইল জানা

ক্স শরীয়তের নতুন নতুন বিধি-নিষেধ সম্পর্কে অবগত হওয়া।

ক্স কিছু সময় রাসূল স.-এর সান্নিধ্যে কাটাতে পারা।

ক্স সমাজটিও পবিত্র সাহাবাদের সমাজ হওয়ায় যাবতীয় শর্ত পালন করা সম্ভব হওয়া।

ক্স ফিতনা ফাসাদের আশঙ্কা কম থাকা।

এসব কারণে তারা এ বৈধ আমলটি পালন করতে সক্ষম ছিলেন।

বর্তমান যুগে এসব কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। যার বিবরণ একটু পরেই পেশ করবো। [ইনামুল বারী : খ.৩ পৃ.৫৫৩]


চার-

আরেক প্রকারের হাদীস হচ্ছে মহিলাদের মসজিদ গমন নিষিদ্ধ বিষয়ক। হাদীসগ্রন্থে অনেক হাদীস পাওয়া যায় যা দ্বারা মহিলাদের মসজিদে গমন নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়।


২২. বুখারী শরীফে আছে-

عن عائشة رضى الله تعالى عنها قالت لو رأى رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أحدث النساء لمنعهن المسجد كما منعت نساء بني إسرائيل.فقلت لعمرة او منعهن؟ قالت نعم. (رواه البخاري في صحيحه : ৮৬৯)

হযরত আয়েশা রা. বলেন, মহিলারা যেরূপ (সাজসজ্জা) সহ কিছু বিষয় বর্তমানে উদ্ভাবন শুরু করেছে তা যদি রাসূল স. প্রত্যক্ষ করতেন; তাহলে অবশ্যই তাদের মসজিদে গমন করতে নিষেধ করতেন। যেমন বনী ইসরাঈলের মহিলাদের নিষেধ করা হয়েছিলো। [বুখারী : ৮৬৯]


২৩. হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত-

عن عائشة قالت كان نساء بني إسرائيل يتخذن أرجلا من خشب يتشرفن للرجال في المساجد فحرم الله عليهن المساجد وسلطت عليهن الحيضة.(اخرجه عبد الرزاق في مصنفه : ৫১২৮)

বনী ইসরাঈলের মহিলারা উঁচু উঁচু কাঠের পা বানিয়ে নিতো। যাতে মসজিদে গিয়ে এগুলো ব্যবহার করে উঁিক মেরে পুরুষদের দেখতে পায়। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা অসুন্তুষ্ট হয়ে তাদের মসজিদে যাওয়া হারাম করে দিয়েছেন এবং তাদের উপর ঋতুস্রাবের সমস্যা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। [মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক : ৫১২৮]


২৪. হযরত ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত-

عن ابن مسعود قال كان الرجال والنساء في بني إسرائيل يصلون جميعا فكانت المرأة إذا كان لها الخليل تلبس القالبين تطول بهما لخليلها فألقى الله عليهن الحيض فكان ابن مسعود يقول : أخروهن حيث أخرهن الله قلنا لأبي بكر : ما القالبين ؟ قال : رقيصتين من خشب.(اخرجه عبد الرزاق في مصنفه : ৫১২৯)

তিনি বলেন, বনী ইসরাঈলের পুরুষ-মহিলা একত্রে নামায আদায় করতো। মহিলাদের কোনো প্রিয় ব্যক্তি যদি জামাতে শরীক থাকতো। তাহলে তারা কাঠের তৈরী উঁচু উঁচু খড়ম পরে নিতো; যাতে লম্বা হয়ে তার প্রিয়জনকে দেখতে পায়। তাদের এ ঘৃণিত কর্মকাণ্ডের কারণে শাস্তিস্বরূপ তাদের উপর ঋতুস্রাবের কষ্ট চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। (অর্থাৎ ঋতুস্রাবের সময় সীমা বৃদ্ধি করে দেয়া হয়েছে) এবং এ কারণে তাদের মসজিদে গমন হারাম করে দেয়া হয়েছে। ইবনে মাসউদ রা. তখন বললেন, ‘তোমরা মহিলাদের ঐ স্থান থেকে পেছনে রাখো যে স্থান থেকে আল্লাহ তায়ালা তাদের পেছনে রেখেছেন। [মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক : ৫১২৯]

অর্থাৎ যে জায়গা (মসজিদ) থেকে আল্লাহ তায়ালা তাদের পেছনে রেখেছেন । হে মুমিনগণ, তোমরাও আল্লাহর নির্দেশের অনুকরণে তাদেরকে সে জায়গা (মসজিদ) থেকে পেছনে রাখো।


২৫. আবু আমর শাইবানী র. বর্ণনা করেন-

أنه رأى ابن مسعود يخرج النساء من المسجد يوم الجمعة ويقول : اخرجن إلى بيوتكن خير لكن. (رواه الطبراني في الكبير : ৯৪৭৫)

তিনি বলেন, আমি হযরত ইবনে মাসউদ রা. কে দেখেছি, তিনি জুমার দিন মহিলাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিচ্ছেন এবং বলছেন, তোমরা ঘরে চলে যাও ওটাই তোমাদের জন্য উত্তম। [মুজামুল কাবীর : ৯৪৭৫]


২৬. ইবনে উমর রা.-এর আমল-

وَكَانَ ابْن عمر، رَضِي الله تَعَالَى عَنْهُمَا، يقوم يحصب النِّسَاء يَوْم الْجُمُعَة يخرجهن من الْمَسْجِد.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. জুমার দিন দাঁিড়য়ে ছোট ছোট কঙ্কর নিক্ষেপ করে মহিলাদের মসজিদ থেকে বের করে দিতেন। [উমদাতুল কারী : খ.৪ পৃ.৬৪৭]

এসব হাদীসসমূহ থেকে যা প্রমাণিত।উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. উম্মতে মুসলিমার করণীয় নির্ধারণ করে দিয়ে বলেছেন, মুসলিম রমনীদের চারিত্রক পবিত্রতা, উৎকষর্তা এবং ইজ্জত -সম্মান হেফাজতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার যেসব শর্তাবলী আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে সেগুলোর দিকে তারা ততোটা ভ্রুক্ষেপ করছেন না। মার্জিত ও উন্নত চরিত্রের যে অনুপম নমুনা তাদের মধ্যে রাসূল স.-এর যুগে বিদ্ধমান ছিলো তা এখন পূর্বের মতো উপস্থিত নেই।

অতএব এ ধরনের চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণে এখন আর মসজিদে গমনের অনুমতি দেয়া যায় না। তাই তিনি এ ভাষায় মসজিদ গমনকে নারীর জন্য নিষেধ করলেন যে স্বয়ং রাসূল স. জীবিত যদি থাকতেন আর মহিলাদের এ পরিবর্তন লক্ষ করতেন তাহলে তিনিই তাদেরকে মসজিদ গমনের বৈধতার বিধান স্থগিত করে অবৈধ হওয়ার বিধান চালু করতেন। এবং মসজিদে যেতে বারণ করতেন। হযরত আয়েশা রা. তার এ সিদ্ধান্তের সমর্থনে বনী ইসরাঈলের মহিলাদের যেসব কারণে মসজিদে যাওয়া হারাম করা হয়েছিলো তাও সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন।


উল্লেখ্য, আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই জানতেন যে, একসময় ফেতনার দ্বারা উম্মুক্ত হবেই । কিন্তু রাসুলের যুগে তার প্রেক্ষাপট তৈরী না হওয়ায় মসজিদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা সুস্পষ্টভাবে অগ্রিম ঘোষণা দেননি। কিন্তু বনী ইসরাঈলের মহিলাদের মসজিদের যাওয়া হারাম করার বিষয়টি রাসূল স.ও উম্মতকে জানিয়ে দিয়ে এ দিকে ইশারা করেছেন যে, ফেতনার দ্বার উম্মুখ হলে –এ উম্মতের মহিলাদের ব্যাপারেও অনুরূপ বিধান আরোপ হবে।

হযরত আয়েশার সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়ে হযরত উমর রা. মহিলাদের মসজিদে গমন নিষিদ্ধ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ , ইবনে উমরসহ অনেক সাহাবী কঙ্কর নিক্ষেপ করেও এ বিধান বাস্তবায়ন করছেন।

হযরত উমর রা.-এর এ সিদ্ধান্তকে সমস্ত সাহাবায়ে কেরাম মেনে নিয়ে ইজমায়ে সাহাবা সংঘটিত হলো।

এসব কারণে চার মাযহাবের ইমামগণ কিছুটা ভিন্ন ভাষায় মহিলাদের এ ফিতনার যুগে মসজিদে গমন করাকে মাকরূহ বলে ফাতওয়া দিলেন।

সুতরাং মহিলাদের মসজিদে গমন বর্তমান যুগেও মাকরূহে তাহরীমা ।




মহিলারা সমবেত হয়ে জামাতের সাথে জুমার/ঈদের নামাজে উপস্থিতি - ইসলামিক আলোচনা-৪র্থ পর্ব

সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

 


জুমার/ঈদের নামাজে মেয়েদের উপস্থিতি জায়েজ নাই

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

মহিলাদের জন্য ঈদগাহে বা মসজিদে গিয়ে জামাতে নামায পড়া মাকরূহ। তবে যদি নামায পড়লে তা আদায় হয়ে যাবে।


নারীদের আসল স্থান হল তাদের বসবাসের ঘর। নারীদের মসজিদে এসে নামায পড়া রাসূল সাঃ পছন্দ করতেন না। তবে যেহেতু রাসূল সাঃ সবার নবী। আর রাসূল সাঃ এর কাছে ওহী নাজিল হতো। তাই নারীরা রাসূল সাঃ এর জমানায় ওহীর বানী শুনার জন্য মসজিদে আসতো। এটি ছিল শুধুই প্রয়োজনের তাগিতে।


যে প্রয়োজন রাসূল সাঃ ইন্তেকালের দ্বারা বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রয়োজনীয় দ্বীন শিখা প্রতিটি নর-নারীর জন্য আবশ্যক। রাসূল সাঃ ছিলেন সেই দ্বীনের বাহক। তাই রাসূল সাঃ এর সময়ে যেহেতু সময়ে সময়ে দ্বীনের বিধান অবতীর্ণ হতো, তাই পুরুষ সাহাবীদের সাথে মহিলা সাহাবীরাও রাসূল সাঃ এর দরবারে এসে সেই দ্বীন শিখতে চেষ্টা করতেন। সেখানে পুরুষ নারী এক সাথে হওয়ার কারনে কোন ফিতনার আশংকা ছিল না।


কিন্তু বর্তমানে সেই আশংকা ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছে। তাই ফুক্বাহায়ে কেরাম নারীদের ঈদগাহে ও মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে নিষেধ করেন। এটা না জায়েজ নয়, তবে মাকরূহ। সেই সাথে ইসলামের মূল স্পিরিটের বিপরীত পদ্ধতি। কারণ ইসলামের মূল থিউরী হল নারীরা থাকবে বাড়িকে সৌন্দর্য মন্ডিত করে। রাস্তাঘাটে অবাধে বিচরণ এটা তাদের কাজ নয়। নিম্নের হাদীসগুলো দেখুন-

عن عبد الله بن سويد الأنصاري عن عمته امرأة أبي حميد الساعدي : أنها جاءت النبي صلى الله عليه و سلم فقالت : يا رسول الله صلى الله عليه و سلم إني أحب الصلاة معك فقال : قد علمت أنك تحبين الصلاة معي و صلاتك في بيتك خير من صلاتك في حجرتك و صلاتك في حجرتك خير من صلاتك في دارك و صلاتك في دارك خير من صلاتك في مسجد قومك و صلاتك في مسجد قومك خير من صلاتك في مسجدي فأمرت فبني لها مسجد في أقصى شيء من بيتها و أظلمه فكانت تصلي فيه حتى لقيت الله عز و جل


আব্দুল্লাহ বিন সুয়াইদ আল আনসারী রাঃ তার চাচা থেকে বর্ণনা করেন যে, আবু হুমাইদ আস সায়িদী এর স্ত্রী রাসূল সাঃ এর কাছে এসে  বললেনহে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আমি আপনার সাথে নামায পড়তে পছন্দ করি। তখন নবীজী সাঃ বললেন-আমি জেনেছি যে, তুমি আমার সাথে নামায পড়তে পছন্দ কর।  অথচ তোমার একান্ত রুমে নামায পড়া উত্তম তোমার জন্য তোমার বসবাসের গৃহে নামায পড়ার চেয়ে। আর তোমার বসবাসের গৃহে নামায পড়া উত্তম তোমার বাড়িতে নামায পড়ার চেয়ে। আর তোমার বাড়িতে নামায পড়া উত্তম তোমার এলাকার মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে। আর তোমার এলাকার মসজিদে নামায পড়া উত্তম আমার মসজিদে [মসজিদে নববীতে] নামায পড়ার চেয়ে।  তারপর তিনি আদেশ দিলেন তার গৃহের কোণে একটি রুম বানাতে। আর সেটিকে অন্ধকারচ্ছন্ন করে ফেললেন। তারপর সেখানেই তিনি নামায পড়তেন মৃত্যু পর্যন্ত।


সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৬৮৯,

ইলাউস সুনান-৩/২৬।

এ হাদীস কি প্রমাণ করছে? মহিলারা মসজিদে না গিয়ে বাড়িতে নামায পড়বে এ নির্দেশ কার? যদি রাসূল সাঃ নারীদের মসজিদে আসাকে অপছন্দ করে থাকেন, তাহলে সেখানে আমি কে যে, তাদের মসজিদে আসা/ঈদগাহে আসা পছন্দ করবো?

আরেকটি হাদীস দেখি

عن أبي عمرو الشيباني أنه رأى بن مسعود يخرج النساء من المسجد ويقول أخرجن إلى بيوتكن خير لكن

হযরত আবু আমর বিন শায়বানী থেকে বর্ণিত। তিনি দেখেছেন-হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ মহিলাদের মসজিদে থেকে বের করে দিতেন। আর বলতেন যে, মসজিদের চেয়ে তোমাদের জন্য ঘরই উত্তম।


মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৫২০১,

মুসান্নাফে ইবনুল জি’দ, হাদীস নং-৪২৯

সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৫৪৪১

আল মুজামুল কাবীর, হাদীস নং-৯৪৭৫।


ভাল করে খেয়াল করুন। আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ অপছন্দ করেন, আমরাও তা অপছন্দ করি। যে বঞ্চনা রাসূল সাঃ এর প্রিয় সাহাবীর আমল। সেটি আমাদের গলার মালা। যদিও সেটি সাহাবা বিদ্বেষীদের অপছন্দ হয়ে থাকে।

عَنْ عَمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّهَا أَخْبَرَتْهُ أَنَّ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- قَالَتْ لَوْ أَدْرَكَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم– مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ الْمَسْجِدَ كَمَا مُنِعَهُ نِسَاءُ بَنِى إِسْرَائِيلَ. قَالَ يَحْيَى فَقُلْتُ لِعَمْرَةَ أَمُنِعَهُ نِسَاءُ بَنِى إِسْرَائِيلَ قَالَتْ نَعَمْ.

হযরত আমরাতা বিনতে আবদির রহমান বলেন-রাসূল সাঃ এর সহধর্মীনী হযরত আয়শা রাঃ বলেছেন-যদি রাসূলুল্লাহ সাঃ মহিলাদের এখনকার অবস্থা জানতেন, তারা কি করে? তাহলে তাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করতেন যেভাবে বনী ইসরাঈলের মহিলাদের নিষেধ করা হয়েছে।


ইয়াহইয়া বলেন-আমি আমরাতাকে বললাম-বনী ইসরাঈলের মহিলাদের কি মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়েছে? তিনি বললেন-হ্যাঁ।


সহিহ মুসলিম -১/১৮৩, হাদীস নং-১০২৭

সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৫৬৯

মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৫৯৮২

মুসনাদুর রাবী, হাদীস নং-২৫৯

সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৫৪০

এবার ভেবে দেখুন-রাসূল সাঃ এর তিরোধানের পর মুসলিম নারীরা এমন কি পোশাক পড়তেন, যার কারনে আম্মাজান হযরত আয়শা রাঃ একথা বলেছেন? আর বর্তমান নারীদের পোশাকের দৃশ্য দেখলে আম্মাজান আয়শা রাঃ কী বলতেন?


উপরোক্ত হাদীসসমূহের আলোকে একথা পরিস্কার যে, মহিলাদের ঈদগাহে ও মসজিদে আসা মাকরূহ।


মহিলারা সমবেত হয়ে জামাতের সাথে মহিলা ইমাম বানিয়ে নামায পড়া প্রসঙ্গ

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

শুধু মহিলাদের জামাত মাকরুহে তাহরীমি। পড়লে নামায আদায় হয়ে যাবে। তবে যদি মহিলারা জামাতের সাথে মহিলা ইমামের পিছনে জানাযা নামায পড়ে তবে তা মাকরুহ ব্যতিতই আদায় হবে।

দলিল:

فى رد المحتار-( و ) يكرهتحريما ( جماعةالنساء ) ولوالتراويحفيغيرصلاةجنازة ( لأنهالمتشرعمكررة ) (رد المحتار-كتابالصلاة،بابالإمامة-2/305)


প্রামান্য গ্রন্থাবলী:

১. ফাতওয়ায়ে শামী-২/৩০৫

২.আন নাহরুল ফায়েক-১/২৪৪

৩. ফাতওয়ায়ে আলমগীরী-১/৮৫

৪. বাদায়েউস সানায়ে’-১/৩৮৮



নারীদের মসজিদে গমন নিয়ে ফিকাহবিদদের মতামত - ইসলামিক আলোচনা-৩য় পর্ব

সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১ 2
বার দেখা হয়েছে

 









নারীদের মসজিদে গমন প্রসঙ্গে কিছু কথা

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

নারীদের মসজিদে গমন নিয়ে ফিকাহবিদদের মতামত :

——————————————————————

প্রথমদিকের কিছু ওলামায়ে কেরাম বৃদ্ধাদের জন্য মাগরিব ও এশার সময় ফিতনামুক্ত হওয়ার কারণে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। পরবর্তী ফিকাহবিদরা ফিতনার ব্যাপকতার কারণে যুবতী ও বৃদ্ধা সবার জন্য সব নামাজে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। (শরহুস সগির : ১/৪৪৬, আল মাজমু : ৪/১৯৮, আল মুগনি : ২/১৯৩)


হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাদায়েউস সানায়ে’ তে বলা হয়েছে যে যুবতী নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনা। (বাদায়েউস সানায়ে : ১/১৫৬)


আল্লামা ইবনে নুজাইম মিসরি ও আল্লামা হাসকাফি.(রহ.) বলেন, বর্তমান যুগে ফিতনার ব্যাপক প্রচলন হওয়ায় ফতোয়া হলো, সব নারীর জন্যই সব নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা মাকরুহে তাহরিমি।

(আল বাহরুর রায়েক : ১/৬২৭-৬২৮, আদ্দুররুল মুখতার : ১/৩৮০)


নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসের ব্যাখ্যা

———————————————————————————

এক. হজরত ইবনে ওমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না। (মুসলিম শরিফ, হাদিস : ৪৪২; আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৬)


উল্লিখিত হাদিসের ব্যাখ্যা হলো, ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদের নিষেধ করা হতো না। ওই নির্দেশ সাময়িক ও শর্তসাপেক্ষ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের কারণে ও শর্ত না পাওয়ার কারণে এখন নিষেধ করাটাই সুন্নত। কারণ রাসুল (সা.)-এর যুগ ওহি নাজিলের যুগ ছিল। তাই নারীরা যাতে বিভিন্ন সময় অবতীর্ণ আয়াত ও শরিয়তের বিভিন্ন বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ভালোভাবে শিখে নিতে পারেন, সে জন্য নারীদের মসজিদে আসতে নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।


আল্লামা ইবনে হাজর (রহ.) বলেন, এ হাদিসে যদিও স্বামীকে নিষেধ করতে বারণ করা হয়েছে, এ বারণ কঠোর নিষেধ নয়, বরং তা হলো সাধারণ নিষেধ। এ জন্যই স্বামী অনুমতি দিলেও ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান ফিতনার আশঙ্কায়

নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ করতে পারবেন।

(মিরকাতুল মাফাতিহ : ৩/৮৩৬)


দুই. নারীদের মসজিদে যাওয়া সম্পর্কে দ্বিতীয় হাদিস হলো, উম্মে আতিয়া (রা.) বলেন, আমাদের আদেশ করা হয়েছে যে আমরা যেন ঋতুবতী পর্দানশিন নারীদেরও ঈদের ময়দানে নিয়ে যাই। যাতে তাঁরা মুসলমানদের জামাত ও দোয়ায় শরিক থাকতে পারেন। তবে ঋতুবতী

নারীরা নামাজের জায়গা থেকে আলাদা থাকবে। জনৈকা সাহাবিয়া বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের অনেকের তো চাদরও নেই। রাসুল (সা.) বললেন, তাকে যেন তার বান্ধবী নিজ চাদর দিয়ে সাহায্য করে। (বুখারি শরিফ, হাদিস : ৯৭৪)


ব্যাখ্যা : এখানেও আগের উত্তরটি প্রযোজ্য। আর তা হলো, নারীরা যাতে ঈদের দিনের যাবতীয় শরয়ি বিধান সরাসরি রাসুল (সা.) থেকে ও রাসুলের ঈদের খুতবায় যাবতীয় ওয়াজ-নসিহত ও মাসয়ালা-মাসায়েল ভালোভাবে শিখে নিতে পারে, সে জন্য রাসুল (সা.)-এর যুগে ঈদগাহে আসার অনুমতি ছিল। কিন্তু পরে এই প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যাওয়ায় সাহাবায়ে কেরাম নিষেধ করে দেন।


ইমাম তাহাবি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,

ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার অনুমতি ছিল, যাতে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি দেখা যায়। মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য দেখে ইসলামের

দুশমনদের যেন চক্ষুশূল হয়। কিন্তু আজ যেহেতু সেই পরিস্থিতি নেই এবং সংখ্যাধিক্য দেখানোর জন্য পুরুষরাই যথেষ্ট, তাই ওই বিধানও প্রযোজ্য হবে না।

(ফাতহুল বারি : ২/৪৭০)


আল্লামা ইবনুল হাজ মালেকি (রহ.) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিধানটি রাসুল (সা.)-এর যুগের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী যুগের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। (আল মাদখাল : ২/২৮৮)


দুটি সন্দেহ ও তার নিরসন :

সন্দেহ এক. কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, যদি বর্তমান যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনার আশঙ্কায় নিষেধ হয়, তাহলে রাসুল (সা.) স্পষ্ট এ কথা বলে যাননি কেন যে আমার যুগের পর নারীদের মসজিদে আসা নিষেধ?


নিরসন : রাসুল (সা.) শরিয়তের অসংখ্য বিধানাবলির ক্ষেত্রেই এরূপ করে গিয়েছেন যে তা স্পষ্ট করে বলে যাননি। তিনি জানতেন ও বুঝতেন যে প্রিয় সাহাবি তাঁর সব কথার মর্ম ও উদ্দেশ্য বুঝেই পরবর্তী সময়ে আমল করবেন। তাই সব কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

যেমন—রাসুল (সা.)-এর পর আবু বকর (রা.)- কে খলিফা বানানোর কথা স্পষ্ট বলে যাননি। কেননা তিনি জানতেন যে তাঁর সাহাবিরা বিভিন্ন আকার- ইঙ্গিতে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে নিয়েছেন। এখন আর তাদের তা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের আলোচিত বিষয়টিও তদ্রূপ। নারীদের ফিতনা ও নারীদের পর্দা-সংক্রান্ত শত শত হাদিস থাকা সত্ত্বেও সাহাবিরা এ বিষয়ে রাসুল (সা.)-এর ইচ্ছা বুঝবেন না, তা অসম্ভব।


সন্দেহ দুই. অনেক ভাই বলে থাকেন যে মক্কা-মদিনার হারামাইন শরিফে নারীরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন।


নিরসন : আসলে হারামাইনে কিছু বিশেষ প্রয়োজনের কারণে নারীদের জামাতে অংশ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা হলো, নারীদের যেহেতু মক্কার মসজিদে হারামে তাওয়াফের জন্য আসতে হয় এবং মদিনার

মসজিদে নববিতে জিয়ারতের জন্য তাঁরা এসে থাকেন। এ অবস্থায় নামাজের আজান হয়ে গেলে আর বের না হয়ে তাঁরা মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ওলামায়ে কেরাম এর অনুমতি দিয়েছেন। তবে শুধু কেবল

জামাতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে নারীদের হারামাইনে যাওয়ার অনুমতি নেই। বর্তমানে না জেনে অনেক মহিলা শুধু নামাজের জন্যই হারামাইনে উপস্থিত হয়ে থাকেন, তা ঠিক নয়। (ইলাউস সুনান : ৪/২৩১)


উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, বর্তমানে নারীদের মসজিদে আসার স্লোগান এটি মূলত নামাযীদের মনে খারাবী সৃষ্টির ষড়যন্ত্র। যা ইহুদী খৃষ্টানদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের নীল নকশা। মানুষকে ধোকা দেয়ার জন্য যে নোংরামীর গায়ে লেবেল লাগানো হয়েছে দ্বীন আর বঞ্চিত হবার।মুখরোচক স্লোগান।




নারীদের মসজিদে আসার ব্যাপারে সাহাবিদের নিষেধাজ্ঞা - ইসলামিক আলোচনা-২য় পর্ব

সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে


 নারীদের মসজিদে গমন প্রসঙ্গে কিছু কথা

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

উল্লিখিত হাদিসগুলো থেকে এ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যায়—

এক. পুরুষদের দায়িত্ব পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে পড়া, আর মহিলাদের দায়িত্ব হলো ঘরে নামাজ পড়া।


দুই. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের জন্য জামাতে শরিক হওয়া ওয়াজিব, সুন্নাত বা অত্যাবশ্যকীয় ছিল না; বরং শুধু অনুমতি ছিল। তবে সেটিও এমন, অপছন্দের সঙ্গে ও শর্তসাপেক্ষ ছিল।


তিন. হজরত উম্মে হুমাইদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কথার ওপর আমল করার জন্যই মসজিদ ছেড়ে সারা জীবন বাড়ির নির্জন কক্ষে নামাজ আদায় করেছেন। সে যুগের নারীরা সাধারণত এটাই করতেন।


চার. সে যুগের পরিবেশ ভালো ছিল, এ জন্যই কেবল মহিলাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। নচেৎ রাসুল (সা.)-ই কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন।


কঠোর শর্ত সাপেক্ষে নারীদের মসজিদে আসার অনুমতি

——————————————————————————

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে মহিলাদের যে মসজিদে আসার অনুমতি ছিল, তা-ও অনেক শর্তসাপেক্ষ ছিল।

যথা—

(ক)সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে।

(খ) সেজেগুজে খুশবু লাগিয়ে বের না হওয়া।

(গ) বাজনাদার অলংকার, চুড়ি ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না।

(ঘ) অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না।

(ঙ) পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে।

(চ) অপ্রয়োজনে কোনো বেগানা পুরুষের সঙ্গে

কথা বলবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া ফিতনার কারণ হবে না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৫৬৫, আহকামুল কোরআন, থানভি : ৩/৪৭১, বাজলুল মাজহুদ : ৪/১৬১)

কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিদায়ের কিছুদিন পর থেকেই।যখন এই শর্তগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে, তখন রাসুল (সা.)-এর প্রাণ প্রিয় সাহাবিরা তা উপলব্ধি করতে পেরে নারীদের মসজিদে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।


নারীদের মসজিদে আসার ব্যাপারে সাহাবিদের নিষেধাজ্ঞা

——————————————————————————

সাহাবায়ে কেরাম থেকে রাসুল (সা.)-এর আদর্শ বিরোধী কোনো কাজ প্রকাশ পাবে—সেটা কল্পনাও করা যায় না। তাই হাদিস শরিফের পাশাপাশি সাহাবিদের আমলও দলিলরূপে গণ্য। কেননা তাঁরা ছিলেন সত্যের মাপকাঠি।


রাসুল (সা.) সুস্পষ্ট বলেছেন, ‘তোমরা আমার পরে খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে, যেমন মাড়ির দাঁত দিয়ে কোনো জিনিস মজবুত ভাবে ধরা হয়। ’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৭)


হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজ খেলাফত আমলে যখন মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থা দেখেন এবং ফিতনার। আশঙ্কাও দিন দিন বাড়তে থাকে, তখন উম্মুল মুমিনিন

আয়েশা (রা.), ইবনে মাসউদ ও ইবনুজ জুবায়ের (রা.)সহ বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম নারীদের মসজিদে না আসার আদেশ জারি করলেন। অন্য সাহাবায়ে কেরামও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেন। কেননা তাঁরা জানতেন যে

মহিলাদের মসজিদে আসতে নিষেধ করার মধ্যে

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশের বিরোধিতা করা হয়নি; বরং তাঁর ইচ্ছারই প্রতিফলন হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো হুকুমের বিরোধিতা করার কল্পনাও করা যায় না। তা সত্ত্বেও তাঁরা এ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এ জন্যই যে যেসব শর্তের সঙ্গে নারীদের মসজিদে যাওয়ার অনুমতি ছিল,।এখন সেসব শর্ত হারিয়ে যাচ্ছে।


নারীদের মসজিদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞায় সাহাবিদের।যেসব উক্তি বর্ণিত হয়েছে, এর আংশিক নিম্নে উল্লেখ করা হলো—


এক. হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নারীরা যে অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা যদি রাসুল (সা.) জানতেন, তবে বনি ইসরাইলের নারীদের যেমন নিষেধ করা হয়েছিল, তেমনি তাদেরও মসজিদে আসা নিষেধ করে দিতেন। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৬৯)


বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘আয়েশা (রা.)-এর এই মন্তব্য তো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুনিয়া থেকে বিদায়ের কিছুদিন পরের নারীদের সম্পর্কে। অথচ আজকের যুগের নারীদের উগ্রতা আর বেহায়াপনার হাজার ভাগের এক ভাগও সে যুগে ছিল না। তাহলে এ অবস্থা দেখে তিনি কী মন্তব্য করতেন?’ (উমদাতুল কারি : ৬/১৫৮)


এখন আমরা চিন্তা করে দেখতে পারি যে আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) নিজ যুগ তথা হিজরি নবম শতাব্দীর নারীদের সম্পর্কে এ কথা বলেছেন। তাহলে আজ হিজরি পঞ্চদশ শতাব্দীতে সারা বিশ্ব যে অশ্লীলতা আর

উলঙ্গপনার দিকে ছুটে চলেছে, বেপর্দা আর

বেহায়াপনার আজ যে ছড়াছড়ি, মেয়েরা যখন পুরুষের পোশাক পরছে, পেট-পিঠ খুলে রাস্তাঘাটে বেড়াচ্ছে, ঠিক সে মুহূর্তে অবলা মা-বোনদের সওয়াবের স্বপ্ন দেখিয়ে মসজিদে আর ঈদগাহে টেনে আনার অপচেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। অথচ এর জন্য দলিল দেওয়া হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের নারীদের দ্বারা। এ

যুগের নারীরা কি সে যুগের নারীদের মতো?

কস্মিনকালেও নয়। তা সত্ত্বেও সে যুগেই নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে কিভাবে এ যুগের নারীদের মসজিদে ও ঈদগাহে গিয়ে নামাজের জন্য উৎসাহ দেওয়া যায়?


দুই. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, ‘ওমর (রা.)-এর এক স্ত্রী (আতেকা বিনতে জায়েদ) ফজর ও।এশার নামাজে জামাতের জন্য মসজিদে যেতেন। তাঁকে

বলা হলো, ‘আপনি কেন নামাজের জন্য বের হন? অথচ আপনি জানেন যে হজরত ওমর (রা.) তা অপছন্দ করতেন ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিপন্থী মনে করেন?’ তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে ওমর কেন আমাকে সরাসরি নিষেধ করেন না?’ তখন বলা হলো যে রাসুল (সা.)-এর বাণী রয়েছে— তোমরা আল্লাহর বান্দিদের আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ কোরো না—এ কথার কারণে তিনি সরাসরি নিষেধও করছেন না। ’ ’’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯০০)


অন্য বর্ণনায় রয়েছে, স্ত্রী আতেকা বিবাহের সময় ওমর (রা.)-কে মসজিদে নববীতে গিয়ে নামাজের অনুমতি দেওয়ার শর্ত করেছিলেন, এ জন্য ওমর (রা.) অপছন্দ সত্যেও স্ত্রীকে নিষেধ করতে পারছিলেন না। (আল

ইসাবাহ : ৮/২২৮)


তিন. আবু আমর শায়বানি (রহ.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে দেখেছি, তিনি জুমার দিন নারীদের মসজিদ থেকে বের করে দিতেন এবং বলতেন, আপনারা বের হয়ে যান। আপনাদের ঘরই আপনাদের জন্য উত্তম। (আল মু’জামুল কাবির, হাদিস : ৯৪৭৫)

আল্লামা হাইসামি (রহ.) বলেন, এ হাদিসের সব বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য (সেকা)। (মাজমাউজ জাওয়াইদ : ২/৩৫)


চার. হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) তাঁর পরিবারের কোনো নারীকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে যেতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৬ (হাদিসটি সহিহ)]


পাঁচ. হজরত ইবনে ওমর (রা.) তাঁর স্ত্রীদের ঈদগাহে বের হতে দিতেন না। [মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস : ৫৮৪৫ (হাদিসটি সহিহ)]




শনিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২১

ভিডিও ভিত্তিক আলোচনা- মহিলারা কি মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে পারবে?

শনিবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

আলোচনায়- ১। প্রফেসর ড.মুখতার আহমেদ ২।আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ৩। ড.জাকির নায়েক ৪। মাওলানা সাইয়্যেদ কামাল উদ্দিন জাফরী ৫। মিজানুর রহমান আজহারী ৬। শায়েখ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ৭। শায়েখ মুজাফর বিন মুহসিন...।




মহিলাদের মসজিদে নামায আদায় প্রসঙ্গে একটি দলিলভিক্তিক ইসলামিক আলোচনা-১ম পর্ব

শনিবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

 


নারীদের মসজিদে গমন প্রসঙ্গে কিছু কথা

÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷÷

নারীদের ওপর ঈদ ও জুমার নামাজ কোনোটাই ওয়াজিব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্যও নারীদের মসজিদে না গিয়ে ঘরে পড়লেই বেশি সওয়াব। তাঁদের জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া শরিয়ত অনুমোদিত নয়।


পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে নারীদের পর্দা করার অত্যধিক তাগিদ করা

হয়েছে। সেসব আয়াত ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যত দূর সম্ভব নারীদের নিজ গৃহে অবস্থান জরুরি।


মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন কোরো না। তোমরা সালাত কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো। ’

(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৩)

নারীদের মসজিদে আসার প্রতি রাসুল (সা.) এর নিরুৎসাহ প্রদান

———————————————————————————————-

নারীদের নামাজ সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস আছে,

যেগুলোতে তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের মসজিদে আসতে নিরুৎসাহী করা হয়েছে।


এক. হজরত আবদুল্লাহ (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ক্ষুদ্র কক্ষে নারীদের নামাজ বড় কামরার নামাজের তুলনায় উত্তম। ঘরের নির্জন কোণে নামাজ ক্ষুদ্র কক্ষের নামাজের তুলনায় উত্তম। ’

[আবু দাউদ, হাদিস : ৫৭০ (হাদিসটি সহিহ)]


অন্য বর্ণনায় হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নারীদের ঘরে নামাজ পড়া ঘরের বাইরে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম। ’ (আল মু’জামুল আওসাত, হাদিস : ৯১০১).


দুই. উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণ। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৬৫৪২ (হাদিসটি হাসান)]


তিন. আবু হুমাইদ আল সাঈদি থেকে বর্ণিত, একবার উম্মে হুমাইদ নামক একজন মহিলা সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে আগ্রহী। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে পছন্দ করো। কিন্তু তোমার জন্য বড় কামরার তুলনায় গৃহের অন্দরমহলে নামাজ পড়া উত্তম। আবার বড় কামরায় নামাজ পড়া উত্তম বারান্দায় নামাজ পড়ার চেয়ে। বারান্দায় নামাজ আদায় করা উত্তম তোমার মহল্লার মসজিদের চেয়ে। মহল্লার মসজিদ উত্তম আমার মসজিদ (মসজিদে নববী) থেকে। ’ এ কথা শোনার পর উম্মে হুমাইদ (রা.) তাঁর গৃহের নির্জন স্থানে একটি নামাজের স্থান বানাতে নির্দেশ দিলেন। সেখানেই আজীবন নামাজ আদায় করতে লাগলেন। এ অবস্থায় তিনি ইন্তিকাল করেন। [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২৭০৯০; সহিহ ইবনে

খুজাইমা, হাদিস : ১৬৮৯ {হাফেজ ইবনে হাজার (রহ.)-এর মতে, হাদিসটি হাসান। ফাতহুল বারি : ২/২৯০}]


চার. যেসব পুরুষ প্রয়োজন ছাড়া মসজিদে না এসে ঘরে নামাজ পড়ে, তাদের বিষয়ে রাগান্বিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি ঘরগুলোতে নারী ও শিশুরা না থাকত, তাহলে আমি এশার নামাজের ইমামতির দায়িত্ব অন্যজনকে দিয়ে কিছু যুবকদল দিয়ে তাদের ঘরের সব কিছু

জ্বালিয়ে দিতাম। ’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৮৭৯৬)

এতে বোঝা যায়, যখন নামাজের জামাত চলতে থাকে, তখন নারীরা ঘরে থাকে।


পাঁচ. আবু মুসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জামাতে জুমার নামাজ পড়া প্রত্যেক মুসলমানের ওপর অকাট্য ওয়াজিব, তবে ক্রীতদাস, নারী, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব নয়। ’

[আবু দাউদ, হাদিস : ১০৬৭

(হাদিসটি ইমাম বুখারি ও মুসলিম (রহ.)-এর শর্ত অনুযায়ী সহিহ)। আল মুস্তাদরাক : ১/২৮৮]


ছয়. হজরত মুহাম্মদ ইবনে কাব আল কুরাজি (রহ.) বলেন,, রাসুল (সা.) বলেন, ‘নারী ও দাসের ওপর জুমার নামাজ নাই। ’

[মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৯৬

(হাদিসটি সহিহ)]




নিজে বাঁচুন এবং পরিবারকে বাঁচান!

শনিবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

 


সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে- তাদেরকে আর্দশ সন্তান হিসাবে গড়ে তোলা। আর ছেলে-মেয়েকে শিক্ষিত ও আদর্শবান করে গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য হবে তাদেরকে জাহান্নাম হ’তে রক্ষা করা। মহান আল্লাহ বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَاراً وَقُوْدُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلاَئِكَةٌ غِلاَظٌ شِدَادٌ لاَ يَعْصُوْنَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤْمَرُوْنَ-

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে ও স্বীয় পরিবারবর্গকে আগুন (জাহান্নাম) হ’তে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। সেখানে অত্যন্ত কর্কশ, রূঢ় ও নির্মম স্বভাবের ফেরেশতা নিয়োজিত থাকবে, যারা কখনই আল্লাহর কথা অমান্য করে না এবং নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করে’ (তাহরীম ৬)।

আজকাল পিতা-মাতা তাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা দানের জন্য অনেক চেষ্টা করে থাকেন। এমনকি তারা সন্তানকে শুধু স্কুলে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হন না; বরং ক্লাসের পরে প্রাইভেট, কোচিং ইত্যাদির মাধ্যমে সন্তানদেরকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন হচ্ছে অভিভাবকরা কি কখনো চিন্তা করে দেখেছেন যে, তাদের সন্তানের উপর আল্লাহ কোন বিদ্যা শিক্ষা করা ফরয করেছেন?


আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِيْ خَلَقَ ‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’ (আলাক্ব ১)।

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ  ‘বিদ্যা শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরয’।[1] আর সেটা হ’ল কুরআন ও ছহীহ হাদীছের শিক্ষা তথা দ্বীনী শিক্ষা। এ শিক্ষায় যদি সন্তানদের শিক্ষিত করে না তোলা হয়, তাহ’লে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে। কেননা দুনিয়াবী শিক্ষা হচ্ছে বস্ত্তবাদী শিক্ষা। আর দ্বীনী শিক্ষা হচ্ছে আখেরাতমুখী শিক্ষা। যে শিক্ষা মানুষকে তার স্রষ্টার সন্ধান দেয় এবং পরকালে চূড়ান্ত সফলতার দিকে মানুষকে ধাবিত করে। দ্বীনী শিক্ষা ঠিক রেখে অপরাপর জ্ঞানার্জন করা যেতে পারে। তবে কখনো দ্বীনী শিক্ষাকে উপেক্ষা করে অন্য কোন বিদ্যা অর্জন করা সমীচীন নয়। এতে বরং পদচ্যুত ও পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই থেকে যায়।


সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত ও আদর্শবান করে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতাই প্রধানত দায়িত্বশীল। কেননা পারিবারিক স্কুলেই তার শিক্ষার হাতে খড়ি। সেকারণ পিতা-মাতাকে দায়িত্ব সচেতন হ’তে হবে। অন্যথা ক্বিয়ামতের দিনে লা জওয়াব হয়ে যেতে হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,

أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ فَالأَمِيْرُ الَّذِىْ عَلَى النَّاسِ رَاعٍ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْهُمْ، وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ بَعْلِهَا وَوَلَدِهِ وَهِىَ مَسْئُوْلَةٌ عَنْهُمْ، وَالْعَبْدُ رَاعٍ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْئُوْلٌ عَنْهُ أَلاَ فَكُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ-

‘সাবধান তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং শাসক জনগণের দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, তাকে পরিবারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। স্ত্রী তার স্বামীর সংসার এবং সন্তানের উপর দায়িত্বশীল। ক্বিয়ামতের দিন তাকে এ দায়িতব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। এমনকি দাস-দাসীও তার মালিকের সম্পদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সেইদিন তাকেও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। অতএব মনে রেখো, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই ক্বিয়ামতের দিন এই দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’।[2]


অতীব দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, আজকাল অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত না করে দুনিয়াবী বিষয়ে শিক্ষা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আমাদের উচিৎ দুনিয়াবী শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনী শিক্ষায় সন্তানদেরকে শিক্ষিত করা। কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদীছে আল্লাহ জাহান্নামের ভয়াবহতা পেশ করেছেন এবং পরিবারের প্রধানকে কঠোরভাবে সাবধান করেছেন এবং পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং পিতা-মাতার পক্ষ থেকে সন্তান-সন্ততির প্রতি সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ হচ্ছে, তাদেরকে সুশিক্ষা ও সদুপদেশ দিয়ে, আল্লাহর ভয় দেখিয়ে ভাল কাজ-কর্মে অভ্যস্ত করা এবং এর মাধ্যমে পরকালে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা। এ প্রসঙ্গে কুরআনে উল্লিখিত লোক্বমান কর্তৃক স্বীয় পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশবাণী বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। উপদেশগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হ’ল-


(১) লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে শিরক থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। যা কুরআনে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে-

وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لاَ تُشْرِكْ بِاللهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيْمٌ.

‘স্মরণ কর, যখন লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বললেন, হে প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় যুলুম’ (লোক্বমান ১৩)। উল্লেখ্য যে, শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّهُ مَنْ يُّشْرِكْ بِاللهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِنْ أَنْصَارٍ. ‘নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না’ (মায়েদাহ ৭২)। তিনি আরো বলেন, إِنَّ اللهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُّشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذَلِكَ لِمَنْ يَّشَاءُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গোনাহ ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন’ (নিসা ৪৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَلَقَدْ أُوْحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُوْنَنَّ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ – ‘তোমার প্রতি ও তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই অহী হয়েছে, তুমি আল্লাহর সাথে শরীক স্থির করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (যুমার ৬৫)।


(২) লোকবমান তাঁর ছেলেকে সব ধরনের শিরক পরিহার করার উপদেশ প্রদানের পর আল্লাহর ক্ষমতা অবহিত করেন। আল্লাহর জ্ঞান অসীম। তিনি সবকিছু অবগত। তোমাকে সর্বপ্রকার গোপন ও প্রকাশ্য অন্যায় থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরকালে বিচারের দিনে অণু পরিমাণ ভাল কিংবা মন্দ কাজের ফল ভোগ করার জন্যও প্রস্ত্তত থাকতে হবে। লোক্বমান বলেন, يَا بُنَيَّ إِنَّهَا إِنْ تَكُ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ فَتَكُنْ فِيْ صَخْرَةٍ أَوْ فِي السَّمَاوَاتِ أَوْ فِي الْأَرْضِ يَأْتِ بِهَا اللهُ إِنَّ اللهَ لَطِيْفٌ خَبِيْرٌ. ‘হে বৎস! ক্ষুদ্র বস্ত্তটি যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা যদি থাকে শিলাগর্ভে অথবা আকাশে কিংবা মৃত্তিকার নীচে, আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত’ (লোক্বমান ১৭)।


(৩) দুনিয়াতে যে কাজ একান্ত যরূরী তা হচ্ছে ছালাত আদায় করা। লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে ছালাতের উপদেশ দিয়ে বলেন, يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلاَةَ ‘হে প্রিয় বৎস! ছালাত কায়েম কর’ (লোক্বমান ১৭)। উল্লেখ্য যে, এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা রাসূল (ছাঃ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন,وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلاَةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا  ‘আপনি আপনার পরিবারকে ছালাতের আদেশ দিন এবং নিজেও এর উপর অবিচল থাকুন’ (ত্ব-হা ১৩২)।


উপরোক্ত আয়াত দু’টিতে আল্লাহ তা‘আলা পিতা-মাতাকে সন্তানদের উত্তম শিষ্টাচার শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে ছালাত শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে তাকীদ করেছেন। কেননা ছালাত অশ্লীল কাজ হ’তে মানুষকে বিরত রাখে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, إِنَّ الصَّلاَةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ‘নিশ্চয়ই ছালাত অশ্লীল এবং মন্দ কাজ হ’তে বিরত রাখে’ (আন‘কাবূত ৪৫)। যদি কেউ সঠিকভাবে ছালাত আদায় করে, তাহ’লে সে সহজে মন্দ কাজ করতে পারবে না।


(৪) ভালকাজের আদেশ ও মন্দকাজের নিষেধ করার উপদেশ দিয়ে লোক্বমান তাঁর প্রিয় পুত্রকে বলেন, وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوْفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ ‘ভাল কাজের আদেশ দাও এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ কর’ (লোক্বমান ১৭)।


ঈমানদার ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকতে পারে না। বরং পরিবার, সমাজ ও জাতির ভাল-মন্দ সম্পর্কে লক্ষ্য রাখা তার কর্তব্য। তার অন্যতম দায়িত্ব হ’ল সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। আর সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার কারণে তাকে নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ও লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তারা যাতে হক্বের উপরে সুদৃঢ় থাকে এবং সাহসিকতার সাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এমন শিক্ষা দিতে হবে। শক্তিধর যালিমদের মুখোমুখি দাঁড়াতেও যেন তারা ভয় না পায়। অন্যায়কে নীরবে সহ্য করার মতো কাপরুষতা যেন তাদের ভিতরে কখনো প্রবেশ করতে না পারে, এ শিক্ষাও সন্তানদেরকে দিতে হবে।


(৫) ছবর বা ধৈর্য-সহিষ্ণুতার নির্দেশ দিয়ে লোক্বমান তাঁর পুত্রকে বলেন, وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُوْرِ ‘আপদে-বিপদে ধৈর্য ধারণ কর। এটাতো দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ (লোক্বমান ১৭)। বিপদে-আপদে মুষড়ে না পড়ে সন্তানরা যেন ধৈর্য ধারণ করে এ দীক্ষা তাদেরকে দিতে হবে।


(৬) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে মানুষ থেকে বিমুখ না হওয়ার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَلاَ تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ  ‘তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না’ (লোক্বমান ১৮)।


মূলতঃ সন্তানকে এ শিক্ষা দিতে হবে যে, তারা যেন নিজেদেরকে সাধারণ মানুষ মনে করে। নিজেকে বড় ভেবে কখনো যেন অন্যের দিক হ’তে মুখ ফিরিয়ে না নেয়। কেননা অন্যকে অবজ্ঞা করে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অহংকারের নামান্তর। আর অহংকার মানুষকে সত্য হ’তে বিমুখ রাখে। যেমন অহংকারের কারণে সত্য হ’তে বিমুখ হয়েছিল ইবলীস। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلاَئِكَةِ اسْجُدُوْا لِآدَمَ فَسَجَدُوْا إِلاَّ إِبْلِيْسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِيْنَ– ‘আর আমি যখন ফিরিশতাগণকে বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলীস ব্যতীত সকলে সিজদা করল, সে অগ্রাহ্য এবং অহংকার করল। আর কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল’ (বাক্বারাহ ৩৪)।


(৭) লোক্বমান স্বীয় পুত্রকে অহংকার না করার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَلاَ تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللهَ لاَ يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُوْرٍ ‘যমীনের উপর অহংকার বশে চলাফেরা কর না। আল্লাহ কোন আত্মগর্বী ও দাম্ভিককে পসন্দ করেন না’ (লোক্বমান ১৮)। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে, দাম্ভিক ও অহংকারীরা আল্লাহর ভালবাসা লাভ করতে পারে না।


অহংকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, وَلاَ تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُوْلاً ‘তুমি যমীনে দম্ভ ভরে চলাফেরা করো না। তুমি পদভারে কখনোই যমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনই পর্বত প্রমাণ হ’তে পারবে না’ (বাণী ইসরাঈল ৩৭)।


(৮) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে মধ্যপন্থা অবলম্বনের উপদেশ দিয়ে বলেন, وَاقْصِدْ فِيْ مَشْيِكَ ‘আর তুমি তোমার চাল চলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর’ (লোক্বমান ১৯)। মধ্যম পন্থায় চলাচলের কারণে মানুষ সম্মানিত হয়। তাই সন্তানদেরকে মধ্যম পন্থা অবলম্বনের উপদেশ দিতে হবে।


(৯) লোক্বমান তাঁর পুত্রকে নিম্নস্বরে কথা বলার উপদেশ দিয়ে বলেন, وَاغْضُضْ مِنْ صَوْتِكَ إِنَّ أَنْكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيْرِ ‘আর তোমার কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিশ্চয়ই স্বরের মধ্যে সবচেয়ে কর্কশ আওয়াজ হ’ল গাধার আওয়াজ’ (লোক্বমান ১৯)।


উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা শালীনতা বিরোধী। সভ্য সমাজ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা পসন্দ করে না। তাই সন্তানদেরকে নরম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা শিক্ষা দিতে হবে।


পিতা-মাতার দায়িত্ব হ’ল, সন্তানকে লোক্বমানের ন্যায় উপদেশ দেয়া, যা তিনি তার প্রিয় পুত্রকে দিয়েছিলেন। এ দায়িত্ব পালন করা পিতা-মাতার একান্ত কর্তব্য। হাদীছে এসেছে,

 عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم كُلُّ نَفْسٍ مِنْ بَنِيْ آدَمَ سَيِّدٌ، فَالرَّجُلُ سَيِّدُ أَهْلِهِ، وَالْمَرْأَةُ سَيِّدَةُ بَيْتِهَا–

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আদম সন্তান প্রত্যেকেই কর্তা। সুতরাং পুরুষ তার পরিবারের কর্তা এবং নারী তার ঘরের কর্তী’।[3]


এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, সন্তানকে আদর্শ সন্তান রূপে গড়ে তোলার দায়িত্ব পিতা-মাতার। পিতা-মাতার কারণে  সন্তান আদর্শবান হয় এবং তাদের কারণেই সন্তান দুশ্চরিত্রের অধিকারী হয়। তেমনি পিতা-মাতার কারণে সন্তান বিভিন্ন ধর্ম গ্রহণ করে থাকে। যেমন হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّهُ كَانَ يَقُوْلُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم مَا مِنْ مَوْلُوْدٍ إِلاَّ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ وَيُمَجِّسَانِهِ-

আবু হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তান ইসলামী স্বভাবের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইহুদী, খৃষ্টান ও অগ্নি উপাসক রূপে গড়ে তোলে’।[4]


অপরদিকে সন্তানকে আদর্শবান রূপে গড়ে তুলতে পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হ’ল তাদের জন্য সৎ সঙ্গী খুঁজে বের করা। যেমন বলা হয়ে থাকে, সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

عَنْ أَبِىْ مُوْسَى رضى الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيْرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيْحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيْحًا خَبِيْثَةً-

আবু মূসা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘উত্তম সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মিশক আম্বর ও হাপর ওয়ালার ন্যায়। মিশক আম্বর ওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে অথবা তার কাছ থেকে কিছু ক্রয় করতে পারবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি সুগন্ধি লাভ করবে। আর হাপর ওয়ালা তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দিবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি দুর্গন্ধ পাবে’।[5] এই হাদীছ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সঙ্গীর কারণে সন্তান বিভিন্ন স্বভাবের হ’তে পারে। তাই এই দিকে পিতা-মাতার বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিৎ।


পরিশেষে বলব, পিতা-মাতা সন্তান নিয়ে পরিবার। পিতা-মাতা পরিবারের মূল। সন্তানকে আদর্শবান করে গড়ে তোলার দায়িত্ব তাদেরই। তাই তাদেরকে এ বিষয়ে যত্নবান হ’তে হবে। আর সন্তান আদর্শবান ও ইসলামী মন-মানসিকতায় গড়ে উঠে যথাযথ ইবাদত করতে পারলে জান্নাতে যেতে পারবে। তাই প্রত্যেক পিতা-মাতাকে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের অনুসারী হয়ে নিজেকে ও তার পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!


[1]. ইবনু মাজাহ, শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/২১৮।

[2]. বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫।

[3]. ছহীহুল জামে‘ হা/৪৫৬৫; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০৪১।

[4]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০।

[5]. বুখারী হা/৫৫৩৪।


সংগৃহীত

হাজেরা বিনতে ইবরাহীম

শিক্ষিকা, বেলটিয়া কামিল মাদরাসা, জামালপুর।



শুক্রবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২১

নারী ও পুরুষের নামাজের মধ্য পার্থক্য আলোচনা-

শুক্রবার, জানুয়ারি ১৫, ২০২১ 0
বার দেখা হয়েছে

 


মুফতি লুৎফুর রহমান কাসিমী: ইসলাম পূর্ণাঙ্গ একটি ধর্ম। ইসলামের সব বিষয়ে নির্দিষ্ট হুকুম রয়েছে। অন্য বিষয়গুলোর মতো পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতিগত পার্থক্যের বিষয়টিও এর ব্যতিক্রম নয়।

নবীজি সা.-এর সময় থেকে সবাই এ পার্থক্য মেনে নামাজ আদায় করতেন। ঐকমত্যে পার্থক্যের বিপরীতে নতুন পদ্ধতি সামনে এলে তা নিঃসংকোচে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন, যাতে মানুষ ধোঁকায় না পড়ে। মূলকথা হলো, পুরুষ-নারীর মাঝে মৌলিক যে তিনটি পার্থক্য করা হয় তার মধ্যে অন্যতম অবস্থান ও কর্মস্থলের পার্থক্য।

পুরুষের কর্মস্থল বাইরে আর নারীর অন্দরে।এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে মূলত নারীর নামাজ পুরুষ থেকে ভিন্ন রাখা হয়েছে। নবীজি সা.-এর সময় থেকে সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িনগণ বিষয়টি খুব সহজভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং নবীজি সা. নির্দেশিত নারীদের নামাজের পার্থক্য অকপটে মেনে নিয়েছেন। এমনকি চার ইমামও এই পার্থক্যের ব্যাপারে একমত।

ইমাম বাইহাকী রহ. বিষয়টি সুনানে কুবরায় এভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, নামাজের বিভিন্ন বিধানের ক্ষেত্রে পুরুষ-নারীর নামাজে পদ্ধতিগত ভিন্নতার প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো ‘সতর’, অর্থাৎ নারীর জন্য শরিয়তের হুকুম হলো এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা, যা তাকে সর্বোচ্চ পর্দায় রাখে।

নিম্নে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করা হলো-

সালাত পদ্ধতিতে নারীদের ক্ষেত্রে মৌলিকভাবে দুটি পার্থক্য রয়েছে। আর তা হলো- ১. সতর বা পর্দাকেন্দ্রিক পার্থক্য : অর্থাৎ যতটুকু সম্ভব গোপনীয়তার মাধ্যমে নারীরা সালাত আদায় করবে।

এই মর্মে আল্লাহ মহান পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا

তোমরা গৃহাভন্তরে অবস্থান করবে-মুর্খতা যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন করবে না। [সুরা আল আহযাব, আয়াত ৩৩]

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, হুজুর সা. এরশাদ করেন, নারীদের নিজকক্ষে নামাজ পড়া বাড়িতে নামাজ পড়ার তুলনায় উত্তম, আর নির্জন ও অন্দরকক্ষে নামাজ পড়া ঘরের সমুখকক্ষে নামাজ পড়া থেকে উত্তম। [হাদিসটি সহিহ, আবু দাউদ ১/৩৮৩, মুসতাদরাকে হাকেম ১/৩২৮]

হজরত আয়েশা রা. রাসুল সা. থেকে বর্ণনা করেন, ওড়না বা চাদর ছাড়া নারীদের নামাজ কবুল হবে না। [আবু দাউদ ১/৪২১ তিরমিজী ২/২১৫-মুসতাদরাকে হাকিম ১/৫১]

উল্লেখিত আয়াত ও হাদিস দ্বারা এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, নারীদের সব সময় পর্দার আড়ালেই থাকা প্রয়োজন। আর নামাজ ইসলামের অন্যতম একটি বিধান সুতরাং নারীর নামাজ অধিক পর্দায় হবে- এটাই বিবেকের দাবী।

আমরা দেখলাম পর্দার ক্ষেত্রে নামাজ পড়ার সময় পুরুষ ও নারীদের কি পার্থক্য আছে, এখন আমরা দেখব নামাজের রুকন বা পড়ার পদ্ধতির ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীদের নামাজের মাঝে কি পার্থক্য আছে।

রোকন বা পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য : চার ধরনের দলীলের আলোকে সংক্ষিপ্তভাবে পদ্ধতিগত এই পার্থক্য তুলে ধরা হলো-

১. হাদিসের আলোকে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য :

নামাজি নারীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী ব্যক্তিকে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে করণীয় কি?

রাসুল সা. এ প্রসঙ্গে বলেন, পুরুষদের জন্য হলো তাসবিহ বলা আর নারীদের জন্য হাতে আওয়াজ করা। [সহীহ বুখারী ১/৪০৩]

ইয়াজিদ ইবনে আবি হাবীব রা. বলেন, একবার রাসুল সা. নামাজরত দুই নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদেরকে (সংশোধনের উদ্দেশ্য) বললেন, যখন সিজদা করবে তখন শরীর জমিনের সাথে মিলিয়ে দিবে, কেননা নারীরা এ ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়। [কিতাবুল মারাসিল-ইমাম আবু দাউদ : পৃঃ১১৭] হাদিসটি “সহীহ”। [তালীক আলা মারাসিলে আবী দাউদ পৃঃ ১১৭]

উল্লেখ্য, এইসব হাদিসের সমর্থনে নারী ও পুরুষের নামাজ আদায়ের পদ্ধতিগত পার্থক্য ও ভিন্নতাকে নির্দেশ করে । এমন আরো অনেক হাদিস রয়েছে। পক্ষান্তরে এগুলোর সাথে বিরোধ পুর্ন একটি হাদিসও কোথাও পাওয়া যাবে না, যাতে বলা রয়েছে যে, পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতিতে কোন পার্থক্য নেই।

. সাহাবায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য :

হজরত নাফেয় রহ. ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণনা করেন, তাকে রাসুল সা. -এর সময়ে নারীদের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, প্রথমত তারা চার পা হয়ে বসত অতপর এক পক্ষ হয়ে বসার জন্য বলা হলো। আসারটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহীহ। [জামেউল মাসানীদ-ইমাম আবু হানীফা [রহ.], খণ্ড ১/৪০০]

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তাকে নারীদের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, নারীরা বৈঠকে আংগুলসমূহ মিলিয়ে ও সমবেতভাবে বসবে। [এই হাদিসের সমস্ত রাবী সিকাহ- সুতারাং হাদিস সহীহ, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-খণ্ড ১/২৪২]

৩. তাবেয়ী ইমামগণের ঐক্যমতের আলোকে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য :

হজরত হাসান বসরী ও হজরত কাতাদা রহ. বলেন, নারীরা যখন সিজদা করবে তখন তারা যথাসম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ফাঁকা রেখে সিজদা দেবে না, যাতে কোমর উঁচু হয়ে না থাকে। [ হাদিসটি সহীহ, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, খণ্ড ৩/১৩৭-ইবনে আবী শাইবা ১/৪২]

কুফাবসীদের ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী রহ. বলেন, নারীরা বসা অবস্থায় এক পক্ষ হয়ে বসবে । [সহীহ, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, খণ্ড ১/৪৩]

মক্কা বাসীদের ইমাম আতা ইবনে আবী রাবাহ রহ. বর্ণনা করেন, নারী যখন রুকুতে যাবে অত্যন্ত সংকুচিতভাবে যাবে এবং হাতদ্বয় পেটের সাথে মিলিয়ে রাখবে। [সহীহ মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৩/১৩৭]

খালেদ ইবনে লাজলাজ সিরিয়া বাসীদের ইমাম , তিনি বলেন নারীদের আদেশ করা হতো, তারা যেন নামাযে দুই পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের উপর বসে। পুরুষদের মতো না বসে । আবরণযোগ্য কোন কিছু প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশংকায় নারীদেরকে এমনটি করতে হয়। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ২/৫০৫]

মোট কথা তাবেয়ীদের যুগে যারা ইমাম এবং ইসলামি বিধি বিধানের ক্ষেত্রে অনুসরনীয় তাদের মতামত থেকে প্রমানিত হয় যে, নারী ও পুরুষের নামাযের পদ্ধতি অভিন্ন মনে করা সম্পুর্ন ভুল । সাহাবি ও তাবেয়ীদের মতামতের সাথে এই ধারনার কোনই মিল নেই।

৪. ইমামদের ফিকহের আলোকে নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য :

ফিকহে হানাফি : ইমাম আবু হানিফা রহ. -এর অন্যতম শাগরেদ ইমাম মুহাম্মদ রহ. বলেন, আমাদের নিকট নারীদের নামাজে বসার পছন্দনীয় পদ্ধতি হলো, উভয় পা এক পাশে মিলিয়ে রাখবে, পুরুষের মতো এক পা দাঁড় করিয়ে রখবে না। [কিতাবুরল আসার ১/৬০৯, আরো দ্রষ্টব্য- হিদায়াঃ ১/১০০-১১০-১১১- ফাতওয়ায়ে শামী ১/৫০৪- ফাতওয়ায়ে আলমগীরি-১/৭৩]

ফিকহে শাফেয়ি : ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, আল্লাহ পাক নারীদেরকে পুরোপুরি পর্দায় থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। এবং রাসুলও সা. অনুরূপ শিক্ষা দিয়েছেন। তাই আমার নিকট পছন্দনীয় হলো, সিজদা অবস্থায় নারীরা এক অঙ্গের সাথে অপর অঙ্গকে মিলিয়ে রাখবে, পেট উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে এবং সিজদা এমনভাবে করবে যাতে সতরের অধিক হেফাজত হয়। [যাখীরা, ইমাম কারাফী ২/১৯৩]

ফিকহে হাম্বলি : তাকবিরে নারীদের হাত ওঠানো সম্পর্কে ইমাম আহমাদ রহ. বলেন, হাত তুলনামূলক কম ওঠাবে। [আল মুগনী -২/১৩৯]

এ পর্যন্ত হাদিস, আসারে সাহাবা, আসারে তাবেয়ীন ও ইমামদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আলোকে এ কথা সুস্পষ্ট হলো যে, পুরুষ ও নারীর নামাজের পদ্ধতির অভিন্ন নয় বরং ভিন্ন।।

মৌলিকভাবে নারী ও পুরুষের নামাজের মাঝে পাঁচটি ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে-

১. তাকবিরে তাহরিমার সময় হাত ওঠানো। ২. হাত বাঁধার স্থান। ৩. রুকুতে সামান্য ঝোঁকা। ৪. সিজদা জড়সড় হয়ে করা। ৫. বৈঠকে পার্থক্য।

প্রথম পার্থক্য : তাকবিরে তাহরিমার সময় হাত ওঠানো

এক. ‘ওয়ায়েল ইবনে হুজর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজি সা.-এর নিকট এলাম, তিনি আমাকে বললেন, হে ওয়ায়েল ইবনে হুজর! যখন তুমি নামাজ পড়বে তখন তুমি তোমার হাত কান পর্যন্ত ওঠাবে আর নারীরা তাদের হাত বুকের ওপর বাঁধবে।

হাইসামি রহ. বলেন, ‘এই হাদিসের সমস্ত রাবী নির্ভরযোগ্য, উম্মে ইয়াহইয়া ব্যতীত। কিন্তু পরবর্তী মুহাদ্দিসগণের নিকট উম্মে ইয়াহইয়াও প্রসিদ্ধ।

দুই. ইমাম যুহরী রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নারীরা কাঁধ পর্যন্ত হাত ওঠাবে। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/২৭০]

দ্বিতীয় পার্থক্য: হাত বাঁধা ।

ইমাম তহাবী রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : নারীরা তাদের উভয় হাতকে বুকের ওপর রেখে দেবে, আর এটাই তাদের জন্য যথোপযুক্ত সতর। (আসসিআয়া : ২/১৫৬, ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৫০৪, আল মাবসুত সারাখসী : ১/২৫)

তৃতীয় পার্থক্য: রুকুতে কম ঝোঁকা।

যখন নারী রুকুতে যাবে তখন হাতদ্বয় পেটের দিকে উঠিয়ে যথাসম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে, আর যখন সিজদা করবে তখন হাতদ্বয় শরীরের সাথে এবং পেট ও সিনাকে রানের সাথে মিলিয়ে দেবে এবং যথাসম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে।

চতুর্থ পার্থক্য: সিজদা জড়সড় হয়ে করা ।

বিখ্যাত তাবেঈ ইয়াযীদ ইবনে আবী হাবীব বলেন, একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজরত দুই নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তাদেরকে (সংশোধনের উদ্দেশ্যে) বললেন, যখন সিজদা করবে তখন শরীর জমিনের সাথে মিশিয়ে দেবে। কেননা নারীরা এ ক্ষেত্রে পুরুষদের মতো নয়। [কিতাবুল মারাসীল ইমাম আবু দাউদ হা. নং ৮০]

আবু দাউদ রহ.-এর উক্ত হাদিস সম্পর্কে গায়েবে মুকাল্লিদদের বিখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান ‘আউনুল বারী’ ১/৫২০-এ লিখেছেন, এই মুরসাল হাদিসটি সকল ইমামের উসুল ও মূলনীতি অনুযায়ী দলিল হওয়ার যোগ্য।

হজরত মুজাহিদ ইবনে জাবর রহ. পুরুষদের জন্য নারীদের মতো ঊরুর সাথে পেট লাগিয়ে সিজদা করাকে অপছন্দ করতেন। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/৩০৩]

হজরত হাসান বসরী ও কাতাদাহ রহ. বলেন, নারী যখন সিজদা করবে তখন সে যথাসম্ভব জড়সড় হয়ে থাকবে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফাঁকা রেখে সিজদা করবে না, যাতে কোমর উঁচু হয়ে থাকে। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/৩০৩]

পঞ্চম পার্থক্য: বৈঠকের ক্ষেত্রে নারীগণ উভয় পা বাঁ পাশ দিয়ে বের করে দিয়ে বসা।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেছেন, নারী যখন নামাজের মধ্যে বসবে তখন যেন এক ঊরু (ডান ঊরু) আরেক ঊরুর ওপর রাখে, আর যখন সিজদা করবে তখন যেন পেট ঊরুর সাথে মিলিয়ে রাখে, যা তার সতরের জন্য অধিক উপযুক্ত হয়। [সুনানে কুবরা বাইহাকী : ২/২২৩]

হজরত খালেদ ইবনে লাজলাজ রহ. বলেন, নারীদেরকে আদেশ করা হতো তারা যেন নামাজে দুই পা ডান দিক দিয়ে বের করে নিতম্বের ওপর বসে, পুরুষদের মতো না বসে, আবরণীয় কোনো কিছু প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নারীদেরকে এমনটি করতে হয়। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/৩০৩)

ইবনে আব্বাস রা.-কে জিজ্ঞেস করা হলো যে, নারীরা কিভাবে নামাজ আদায় করবে? তিনি বললেন, খুব জড়সড় হয়ে অঙ্গের সাথে অঙ্গ মিলিয়ে নামাজ আদায় করবে। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ১/৩০২]

উপর্যুক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা একটু মনোযোগের সাথে পাঠ করলে একজন ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের পাঠক সহজে অনুমান করতে সক্ষম হবেন যে, নারীদের নামাজের পার্থক্যের বিষয়টি নবীজি সা. এবং সাহাবীদের যুগ থেকেই চলে আসছে এবং -এর পক্ষে অনেক শক্তিশালী দলিল রয়েছে।

সুতরাং নামাযের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে মহিলারা পুরুষদের থেকে আলাদা এটাই দলীল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে মেনে নেবার তৌফিক দান করুন। আমীন।

প্রধান মুফতী, মাদানী একাডেমী রিসার্চ সেন্টার , নিউ ইয়র্ক আমেরিকা ।



শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২০

আল-ফাতিহার প্রথম আয়াতের বিশ্লেষণ

শুক্রবার, নভেম্বর ০৬, ২০২০ 1
বার দেখা হয়েছে

১:১ بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে। আল-বায়ান
(আরম্ভ করছি) পরম করুণাময় অসীম দয়াময় আল্লাহর নামে। তাইসিরুল
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)। মুজিবুর রহমান
In the name of Allah, the Entirely Merciful, the Especially Merciful. Sahih International

১. রহমান, রহীম(১) আল্লাহর নামে।(২)

১. সাধারণত আয়াতের অনুবাদে বলা হয়ে থাকে, পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এ অনুবাদ বিশুদ্ধ হলেও এর মাধ্যমে এ আয়াতখানির পূর্ণভাব প্রকাশিত হয় না। কারণ, আয়াতটি আরও বিস্তারিত বর্ণনার দাবী রাখে। প্রথমে লক্ষণীয় যে, আয়াতে আল্লাহর নিজস্ব গুণবাচক নামসমূহের মধ্য হতে ‘আর-রাহমান ও আর-রাহীম’ এ দু'টি নামই এক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। ‘রহম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই ‘রহম’ ধাতু হতেই ‘রহমান’ ও ‘রহীম' শব্দদ্বয় নির্গত ও গঠিত হয়েছে। রহমান শব্দটি মহান আল্লাহর এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। (তাবারী) কুরআন ও হাদীসে এমনকি আরবদের সাহিত্যেও এটি আল্লাহ ছাড়া আর কারও গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। পক্ষান্তরে ‘রহীম’ শব্দটি আল্লাহর গুণ হলেও এটি অন্যান্য সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহর গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা সে একই অর্থে হতে হবে এমন কোন কথা নেই। প্রত্যেক সত্তা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। এখানে একই স্থানে এ দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন যে, আল্লাহ ‘রহমান’ হচ্ছেন এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে, আর ‘রাহীম’ হচ্ছেন আখেরাতের হিসেবে। [বাগভী]

(১) অনন্ত করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে (আরম্ভ করছি)।

‘বিসমিল্লাহ’র পূর্বে ‘আক্বরাউ’ ‘আবদাউ’ অথবা ‘আতলু’ ফে’ল (ক্রিয়া) উহ্য আছে। অর্থাৎ, আল্লাহর নাম নিয়ে পড়ছি অথবা শুরু করছি কিংবা তেলাঅত আরম্ভ করছি। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আরম্ভ করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ার প্রতি তাকীদ করা হয়েছে। সুতরাং নির্দেশ করা হয়েছে যে, খাওয়া, যবেহ করা, ওযু করা এবং সহবাস করার পূর্বে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়। অবশ্য ক্বুরআনে করীম তেলাঅত করার সময় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ পড়ার পূর্বে ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ্শায়ত্বানির রাজীম’ পড়াও অত্যাবশ্যক। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘‘অতএব যখন তুমি ক্বুরআন পাঠ করবে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর।’’ (সূরা নাহল ৯৮ আয়াত)।

২. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সর্বপ্রথম ‘ইকরা বিসমে’ বা সূরা আল-আলাক এর প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিল। এতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠ শুরু করতে বলা হয়েছিল। সম্ভবত এজন্যই আল্লাহর এই প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী কুরআনের প্রত্যেক সূরার প্রথমেই তা স্থাপন করে সেটাকে রীতিমত পাঠ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। বস্তুতঃ বিসমিল্লাহ প্রত্যেকটি সূরার উপরিভাগে অর্থ ও বাহ্যিক আঙ্গিকতার দিক দিয়ে একটি স্বর্ণমুকুটের ন্যায় স্থাপিত রয়েছে। বিশেষ করে এর সাহায্যে প্রত্যেক দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করাও অতীব সহজ হয়েছে। হাদীসেও এসেছে, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূরার শেষ তখনই বুঝতে পারতেন যখন বিসমিল্লাহ নাযিল করা হতো” [আবু দাউদ: ৭৮৮] তবে প্রত্যেক সূরার প্রথমে ও কুরআন পাঠের পূর্বে এ বাক্য পাঠ করার অর্থ শুধু এ নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহর নাম নিয়ে কুরআন তিলাওয়াতে শুরু করার সংবাদ দেয়া হচ্ছে। বরং এর দ্বারা স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করা হয় যে, দুনিয়া জাহানের সমস্ত নিয়ামত আল্লাহর তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে এ কথাও মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রতি যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন বিশেষ করে দ্বীন ও শরীয়াতের যে অপূর্ব ও অতুলনীয় নিয়ামত আমাদের প্রতি নাযিল করেছেন, তা আমাদের জন্মগত কোন অধিকারের ফল নয়। বরং তা হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার নিজস্ব বিশেষ মেহেরবানীর ফল।


তাছাড়া এই বাক্য দ্বারা আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনাও করা হয় যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্বক তার কালামে-পাক বুঝবার ও তদনুযায়ী জীবন যাপন করার তওফীক দান করেন। এ ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা এটাই। তাই শুধু কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বেই নয় প্রত্যেক জায়েয কাজ আরম্ভ করার সময়ই এটি পাঠ করার জন্য ইসলামী শরীয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে। কারণ প্রত্যেক কাজের পূর্বে এটি উচ্চারণ না করলে উহার মঙ্গলময় পরিণাম লাভে সমর্থ হওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকে না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বিভিন্ন কথা ও কাজে এই কথাই ঘোষণা করেছেন। যেমন, তিনি প্রতিদিন সকাল বিকাল বলতেন, بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ “আমি সে আল্লাহর নামে শুরু করছি যার নামে শুরু করলে যমীন ও আসমানে কেউ কোন ক্ষতি করতে পারে না, আর আল্লাহ তো সব কিছু শুনেন ও সবকিছু দেখেন।” [আবু দাউদ: ৫০৮৮, ইবনে মাজাহ: ৩৮৬৯]


অনুরূপভাবে যখন তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন তাতে বিসমিল্লাহ লিখেছিলেন [বুখারী, ৭]

তাছাড়া তিনি যে কোন ভাল কাজে বিসমিল্লাহ বলার জন্য নির্দেশ দিতেন। যেমন, খাবার খেতে, [বুখারী ৫৩৭৬, মুসলিম: ২০১৭, ২০২২]

দরজা বন্ধ করতে, আলো নিভাতে, পাত্র ঢাকতে, পান-পাত্র বন্ধ করতে [বুখারী ৩২৮০]
কাপড় খুলতে [ইবনে মাজাহ ২৯৭, তিরমিযী: ৬০৬)
স্ত্রী সহবাসের পূর্বে [বুখারী: ৬৩৮৮, মুসলিম: ১৪৩৪],
ঘুমানোর সময় [আবু দাউদ: ৫০৫৪],
ঘর থেকে বের হতে [আবু দাউদ: ৫০৯৫],
চুক্তিপত্র/ বেচা-কেনা লিখার সময় [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৩২৮],
চলার সময় হোঁচট খেলে [মুসনাদে আহমাদ: ৫/৫৯],
বাহনে উঠতে [আবু দাউদ: ২৬০২]
মসজিদে ঢুকতে [ইবনে মাজাহ: ৭৭১, মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৮৩],
বাথরুমে প্রবেশ করতে [ইবনে আবি শাইবাহ: ১/১১],
হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী: ৫/৭৯]
যুদ্ধ শুরু করার সময় [তিরমিযী: ১৭১৫]
শক্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাথা পেলে বা কেটে গেলে [নাসায়ী: ৩১৪৯]
ব্যাথার স্থানে ঝাড়-ফুঁক দিতে [মুসলিম: ২২০২]
মৃতকে কবরে দিতে তিরমিযী: ১০৪৬]।
এ ব্যাপারে আরও বহু সহীহ হাদীস এসেছে। আবার কোথাও কোথাও ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ওয়াজিবও বটে যেমন, যবাই করতে [বুখারী: ৯৮৫, মুসলিম: ১৯৬০]

যেহেতু মানুষের শক্তি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, সে যে কাজই শুরু করুক না কেন, তা যে সে নিজে আশানুরূপে সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এমতাবস্থায় সে যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করে এবং আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি হৃদয়-মনে অকুণ্ঠ বিশ্বাস জাগরুক রেখে তার রহমত কামনা করে, তবে এর অর্থ এ-ই হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সে নিজের ক্ষমতা যোগ্যতা ও তদবীর অপেক্ষা আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের উপরই অধিক নির্ভর ও ভরসা করে এবং তা লাভ করার জন্য তারই নিকট প্রার্থনা করে।


তাফসীরে জাকারিয়া




নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের আগমন-নির্গমন এর কৈফিয়ত

শুক্রবার, নভেম্বর ০৬, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


হে মানুষ! তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের মালিক কে? তুমি কি জান কিভাবে তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের আগমন-নির্গমন হয়? কে সেটি নিয়ন্ত্রণ করেন? তুমি কি জানো তোমার নিঃশ্বাসটুকুর মূল্য কত? ওটা বন্ধ হয়ে গেলেই তুমি মৃত লাশে পরিণত হবে। তুমি সবই জানো। আবার কিছুই জানো না। পাগলের মত দৌড়াচ্ছ দুনিয়া লাভের আশায়। অথচ সেটি মরীচিকা মাত্র। যা তোমার ভাগ্যে নির্ধারিত আছে, তা তোমার জন্য আসবেই। তুমি কেবল দেখবে, যার জন্য দৌড়াচ্ছ, সেটি আল্লাহর বিধানে বৈধ, না অবৈধ। যদি বৈধ হয়, তাহ’লে বৈধভাবে চেষ্টা কর। মধ্যমপন্থায় কর, চরমপন্থায় নয়। পেলে আল্লাহর প্রশংসা কর এবং তাঁর ও তাঁর পথে সাহায্যকারী বান্দার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর। আর না পেলে দিশেহারা হয়ো না। ধৈর্য ধারণ কর ও এটাকেই আল্লাহর পূর্ব নির্ধারণ বা ভাগ্য বলে ধরে নাও। আল্লাহর অননুমোদিত পথে চেষ্টাকারীদের মন্দফল সম্পর্কে আল্লাহ কি বলেন শুনে রাখ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা অবিশ্বাসী, তাদের কর্মসমূহ মরুভূমির বুকে মরীচিকা সদৃশ। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি যাকে পানি মনে করে। অবশেষে যখন সে তার নিকটে আসে, তখন সেখানে কিছুই পায় না। কেবল আল্লাহকে পায়। অতঃপর আল্লাহ তার পূর্ণ কর্মফল দিয়ে দেন (অর্থাৎ জাহান্নামে নিক্ষেপ করেন)। বস্ত্ততঃ আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী’ (নূর ২৪/৩৯)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের বুঝ দান করেন’

(বুখারী হা/৭১)। অতএব দ্বীন বিরোধী কোন জ্ঞানে ও কর্মে মানবতার কোন কল্যাণ নেই।

শয়তানের কুহকে পড়ে মানুষ ছুটছে তার পিছনে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে। অথচ আল্লাহ মূলতঃ মানুষের জ্ঞানেরই পরীক্ষা নিবেন ক্বিয়ামতের দিন। সেদিন শিশু বা পাগলের কোন পরীক্ষা হবে না। অতএব হে জ্ঞানীগণ! আপনাকে যিনি জ্ঞান সম্পদ দান করেছেন, তার কাছে এই সম্পদের ব্যবহার সম্পর্কে জওয়াবদিহি করার জন্য প্রস্ত্তত হৌন! চোখে ছানি পড়লে যেমন মানুষ চোখ থাকতেও অন্ধ হয়, নিজের মধ্যে জ্ঞান সম্পদ থাকলেও মানুষ দুনিয়াবী স্বার্থে অন্ধ হয়ে যায়। অতএব জ্ঞানের চক্ষু পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য আপনাকে জ্ঞানদাতা আল্লাহর বিধান সমূহ জানতে হবে। তাঁর প্রেরিত নিষ্পাপ রাসূলের জীবন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। দেখবেন জ্ঞান চক্ষুর ছানি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নইলে এক অন্ধ আরেক অন্ধের কাছে চোখের চিকিৎসা নিতে পারেন না। মনে রাখবেন, বিশুদ্ধ জ্ঞান কখনো বিশুদ্ধ হাদীছের প্রতিকূলে নয়। তাই আপনার জ্ঞান যদি অহি-র জ্ঞানের বিপরীত হয়, তাহ’লে নিজের জ্ঞানকে অহি-র জ্ঞানের কাছে সারেন্ডার করে দিন ও সেটাকে সাদরে বরণ করুন। এতেই আপনার জন্য মঙ্গল রয়েছে ইহজীবনে ও পরজীবনে।


আপনি কি জানেন কতদিনের আয়ুষ্কাল নিয়ে আপনি পৃথিবীতে এসেছেন? আপনি কি জানেন, আলোর গতির হিসাবে প্রতি সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বেগে আপনি আপনার চূড়ান্ত মেয়াদের দিকে এগিয়ে চলেছেন?
অধিক পাওয়ার লোভে বুঁদ হয়ে আপনি ছুটে চলেছেন কবরস্থানের দিকে। কিন্তু সেখানে কি নিয়ে যাচ্ছেন? তার জন্য কি কি পাথেয় সঞ্চয় করেছেন? আপনি নিজেকে ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পণকারী বলে দাবী করেন। অথচ আপনার ধর্মীয় জীবন ও বৈষয়িক জীবন চলছে পৃথক পৃথক রব-এর অধীনে। আপনি কবরস্থ ব্যক্তির নিকট যাচ্ছেন মাইয়েতের অসীলা ধরার জন্য তার করুণার ভিখারী হয়ে। আপনি মসজিদে যাচ্ছেন ও কা‘বাগৃহ যেয়ারতে যাচ্ছেন আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায়। আবার নিজেদের মনগড়া বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য জান-মাল, সময় ও শ্রম ব্যয় করছেন উন্মাদের মত। তাহ’লে আপনার জীবনের লক্ষ্যপথ কোনটি? নিজের বিবেককে জিজ্ঞেস করুন। বহুমুখী পথের দিশাহীন গাড়ী অবশ্যই খাদে পড়বে। অতএব জীবনকে স্রেফ আল্লাহমুখী করুন। তিনিই আপনাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন। কেননা তাঁর উপরে নির্ভরশীল ব্যক্তি কখনোই বঞ্চিত হয় না। কখনোই নৈরাশ্যের আঁধারে হাবুডুবু খায় না। নিজের জ্ঞানকে যিনি চূড়ান্ত ভাবেন, তিনি যেকোন সময় পদস্খলিত হবেন। যদি না তার সামনে অসীম জ্ঞানের হেদায়াত মওজূদ থাকে। ঠিক যেমন অথৈ সাগরে জাহাযের নাবিক ও নিঃসীম নীলিমায় তীব্র বেগে ধাবমান রকেট-উড়োজাহাযের ক্যাপ্টেন আল্লাহ সৃষ্ট ধ্রুবতারাকে উত্তরে রেখে স্ব স্ব গন্তব্যে ছুটে চলে। জ্ঞানী মানুষ তেমনি জীবনের বাঁকে বাঁকে আল্লাহ প্রেরিত অহি পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী পথ চলবে। নইলে সে পথভ্রষ্ট হবেই। যেমনটি হয়েছেন বর্তমানে তাবৎ বিশ্বনেতারা। যাদের কাছ থেকে মানুষ পেয়েছে কেবলি হতাশা ও নৈরাশ্য।


কারু আয়ু বৃদ্ধি তার জন্য পরীক্ষা মাত্র। এক সময় হঠাৎ তাকে বিদায় নিতে হবে ইহজগত থেকে। তার আত্মার সঙ্গে চলে যাবে তার সারা জীবনের কর্ম সমূহের রেকর্ড। যার ফলাফল তাকে পেতেই হবে পরকালে। ঠিক যেভাবে দুনিয়াতে ভেজাল খাদ্য-পানীয় ও দূষিত বায়ু সেবনের ফলাফল

সে সঙ্গে সঙ্গে পায় বদ হযম ও নানা রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে। দুনিয়াতে রোগ সারলে সুস্থ হওয়া যায়। কিন্তু নিঃশ্বাস চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না। নিজেকে সংশোধনের সুযোগ আর থাকে না। তখন হাযারো ফাতেহাখানী ও কুলখানীতে কোন কাজ হবে না। নিঃশ্বাসের যিনি মালিক, তার কাছে প্রতিটি নিঃশ্বাসের কৈফিয়ত দিতে হবে। সেখানে ব্যর্থ হ’লে জাহান্নামে দগ্ধীভূত হ’তে হবে। সফল হ’লে জান্নাতের সুখ-সম্ভার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

হে রঙিন আশার বংশীবাদক! মানুষের দাসত্ব বরণের জন্য বা মানুষের উপর প্রভুত্ব করার জন্য ছুটে চলো না। মনে রেখ, তোমার কোন উপকার বা ক্ষতি করার ক্ষমতা কারু নেই আল্লাহর হুকুম ব্যতীত। অতএব মানুষের টাকা বেড়েছে কত, সেটা নয়; বরং মানুষের সুখ বেড়েছে কতটুক, সেটাই দেখ। সর্বাবস্থায় শয়তানের দাসত্ব বর্জন কর। নিজের জীবনে ও সমাজের সর্বত্র আল্লাহর দাসত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা কর। প্রতিটি নিঃশ্বাসকে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে ব্যয় কর। তাহ’লে পরকালের স্থায়ী জীবনে তুমি চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সর্বাবস্থায় তাঁর দাসত্ব করার তাওফীক দান করুন- আমীন!



বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২০

সেকুলার ধর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভণ্ডামি

বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে
 
শুধু বাংলাদেশ না দুনিয়াব্যাপী সেকুলারদের একটা বয়ান হচ্ছে ফ্রান্স হচ্ছে গণতন্ত্র এবং লিবার্টি বা স্বাধীনতার ধারক-বাহক।

আসলেই কী তাই? মোজাম্মেল হোসেন তোহা ভাইয়ের একটা লেখা থেকে কিছুটা অংশ তুলে দিচ্ছি –

ফ্রান্স টিকেই আছে আফ্রিকাকে শোষণ করার মধ্য দিয়ে। এটা গোপন কিছু না। সময়ে সময়ে ফরাসিরা নিজেরাও এটা স্বীকার করে। ১৯৫৭ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেঁরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আফ্রিকার উপর নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতে না পারলে একবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে ফ্রান্সের কোনো জায়গা থাকবে না।

পাঁচ দশক পর তার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক ২০০৮ সালে সেটা আবারও নিশ্চিত করে বলেছিলেন, আফ্রিকা না থাকলে ফ্রান্স তৃতীয় বিশ্বের তালিকায় ছিটকে পড়ত। তিনি পরিষ্কারভাবেই স্বীকার করেছিলেন, ফ্রান্সের ব্যাঙ্কগুলোতে যে টাকা আছে, তার একটা বড় অংশ আসে আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোকে শোষণ করার মধ্য দিয়ে।

কীভাবে ফ্রান্স আফ্রিকাকে শোষণ করছে? প্রধানত কলোনিয়াল মুদ্রা সিএফএ ফ্রাঙ্কের (CFA Franc – Franc of the French Colonies in Africa) মাধ্যমে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন আফ্রিকাজুড়ে কলোনিগুলো স্বাধীনতা দাবি করে, তখন ব্রিটিশ, স্প্যানিয়ার্ড এবং ইতালিয়ানরা তুলনামূলকভাবে সহজেই তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে ফিরে যায়। কিন্তু ফ্রান্স ছিল ব্যতিক্রম। তারা তাদের কলোনিগুলোকে স্বাধীনতা দেয় এই শর্তে যে, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে তারা অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক থেকে “সহযোগিতা” করবে।

সামরিক ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার অর্থ ছিল, ফরাসি সেনাবাহিনী স্বাধীনতার পরেও আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোতে অবস্থান করবে, তাদের পুলিশ এবং সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিবে, বিনিময়ে রাষ্ট্রগুলোকে তাদের সকল অস্ত্র ক্রয় করতে হবে কেবলমাত্র ফ্রান্সের কাছ থেকে।

আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার অর্থ ছিল, স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে তাদের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করতে হবে সিএফএ ফ্রাঙ্ক। শুধু তাই না, রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে, যেকোনো বড় প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আগে ফ্রান্সকে প্রস্তাব দিতে হবে।

সিএফএ ফ্রাঙ্ক মুদ্রাটি নিয়ন্ত্রণ করে ফ্রেঞ্চ ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। আর সে কারণে আফ্রিকায় ফ্রান্সের ১৪টি সাবেক কলোনিকে আজও তাদের ফরেন রিজার্ভের অর্ধেক (আগে ছিল ৬৫%, তারও আগে ৮৫%) জমা রাখতে হয় ফ্রেঞ্চ ট্রেজারির কাছে।

দেশ চালানোর জন্য তাদের যদি অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে তাদেরকে সেটা ঋণ নিতে হয় ফ্রান্সের কাছ থেকেই। এবং সেই ঋণের সুদ শোধ করতে করতেই তাদের বাকি জীবন অতিবাহিত হয়। চক্রে আটকা পড়ে যায় তাদের জীবন।
ভাবতে পারেন, আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলো কেন এই ব্যবস্থা মেনে নিচ্ছে? কেন তারা এই সিস্টেম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে না? উত্তরটা হচ্ছে, অনেকেই চেষ্টা করেছিল। তাদের পরিণতি ভালো হয়নি।

স্বাধীনতার পর সেকু তুরের নেতৃত্বে গিনি ফ্রান্সের আধিপত্য মেনে নিতে রাজি হয়নি। ১৯৬০ সালে তারা ফ্রাঙ্ক জোন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফ্রেঞ্চ সিক্রেট সার্ভিস জাল মুদ্রা সরবরাহ করে গিনির অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
সিলভানাস অলিম্পিওর নেতৃত্তে টোগোও স্বাধীনভাবে পথ চলার উদ্যোগ নেয়। স্বতন্ত্র টোগোলিজ মুদ্রা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৬৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। পরের দিন সকালে ফরাসিদের দ্বারা প্রশিক্ষিত টোগোলিজ সেনারা অলিম্পিওকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে।
এটা ছিল সাবেক কলোনিগুলোতে সংঘটিত ফ্রান্সের প্রথম ক্যু, পরবর্তীতে যার পুনরাবৃত্তি হয়েছে অনেকবার।

আফ্রিকার প্রতিটি সাবেক কলোনিতে ক্যু এবং পাল্টা ক্যুয়ের মাধ্যমে ফ্রান্স নিজেদের অনুগত স্বৈরশাসকদেরকে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছে, আর তাদের মাধ্যমে খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ আফ্রিকার সম্পত্তি লুট করে যাচ্ছে।

১৯৬৪ সালে ফ্রান্স গ্যাবনে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ওমার বঙ্গোকে ক্ষমতায় বসায়, যার শাসনব্যবস্থা চলে পরবর্তী ৪২ বছর পর্যন্ত। গ্যাবনের গুরুত্ব কী? গ্যাবনে আছে বিশাল ইউরেনিয়ামের মজুদ। আর ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোর জন্য দরকার এই ইউরেনিয়াম।

ওমারের মৃত্যুর পর আজও গ্যাবনের ক্ষমতায় আছে তার ছেলে আলি ওমার বঙ্গো। ফ্রান্সের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়টা প্রকাশ পায় ওমার বাঙ্গোর একটা উক্তি থেকে। যেখানে জ্যাক শিরাক নিজেই আ

রিকাকে শোষণের কথা স্বীকার করেছিলেন, সেখানে বাঙ্গো বলেছিলেন, গ্যাবনকে ছাড়া ফ্রান্স হচ্ছে ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির মতো, আর ফ্রান্সকে ছাড়া গ্যাবন হচ্ছে জ্বালানী ছাড়া গাড়ির মতো।
অথচ বাস্তবে ফ্রান্সই দশকের পর দশক ধরে গ্যাবনের কাছ থেকে ইউরেনিয়াম জ্বালানি আদায় করে নিচ্ছে অত্যন্ত সুলভ মূল্যে।

এই সুলভ মূল্যে যদি কেউ রাজি না হয়, তাহলে তার ভাগ্যেও জুটতে পারে অভ্যুত্থান। সেটাই ঘটেছিল নাইজারের প্রেসিডেন্ট মামাদু তানজার ভাগ্যে। ফ্রান্সের দেওয়া মূল্য কম মনে হওয়ায় ২০০৯ সালে তিনি ইউরেনিয়ামের মূল্যের ব্যাপারে চীনের সাথে দরদাম শুরু করেছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে বিদায় নিতে হয়।
২০১১ সালে বিদায় নিতে হয় আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্টকেও। সেখানেও একই কারণ। তবে ইউরেনিয়াম না, আইভরি কোস্ট হচ্ছে ফ্রান্সের প্রধান কফি এবং কোকো সরবরাহকারী রাষ্ট্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ফ্রান্স এ পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। আফ্রিকার প্রায় প্রতিটা অভ্যুত্থান, প্রতিটা গুপ্তহত্যার পেছনে ফ্রান্সের কোনো না কোনো ভূমিকা আছে।

এবং এটা শুধু মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না। ২০১১ সালে গাদ্দাফিকে উৎখাত করার পেছনেও প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল ফ্রান্স। সে সময় আমেরিকার ভূমিকা ছিল লিডিং ফ্রম বিহান্ড। ওবামা প্রশাসন ছিল দ্বিধাবিভক্ত। কিন্তু ফ্রান্স একেবারেই শুরু থেকেই ছিল আগ্রা
সী।

ফ্রান্সই সর্বপ্রথম লিবিয়ার বিদ্রোহীদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ফ্রান্সই জাতিসংঘের রেজোল্যুশন ড্রাফট করেছিল। এবং সেই রেজোল্যুশন পাশ হওয়ার আগেই ফ্রান্স তার যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে দিয়েছিল বেনগাজির দিকে অগ্রসর হতে থাকা গাদ্দাফির বাহিনীর উপর হামলা করার জন্য।

গাদ্দাফির মৃত্যুর পরে আমেরিকা লিবিয়া থেকে নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ফ্রান্স দিনে দিনে তার ইনভলভমেন্ট আরো বৃদ্ধি করেছে। আমেরিকার অক্সিডেন্টাল অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লিবিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় নিজেদের শেয়ার বিক্রি গেছে ফ্রান্সের টোটালের কাছে।

কিন্তু এটা ঘটেছে বৈধভাবে। আর অবৈধভাবে ফ্রান্স লিবিয়ার দক্ষিণে স্বর্ণের খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলন এবং চোরাচালান করে নিয়ে যাচ্ছে কোনো নজরদারি ছাড়াই। প্রায় কোনো মিডিয়াতেই এটা পাওয়া যায় না, কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় লিবিয়ানদের কাছ থেকে শোনা যায়, সেখানে আফ্রিকানদেরকে দিয়ে স্বর্ণ উত্তোলন করানোর এই কার্যক্রমের পেছনে ফরাসি কোম্পানিগুলোই দায়ী।
সেকুলার ধর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভণ্ডামি। মিলিয়ে দেখেন।
– Sharif Abu Hayat Opu



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png