শিরোনাম
Loading latest headlines...

বুধবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আখিরাতের প্রতি ইমান

বুধবার, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে
আখিরাতের প্রতি ইমান


আখিরাতের প্রতি ইমান
শায়খ হালিমী (রহ) বলেন- আখিরাতের দিনের প্রতি ইমান আনার অর্থ হলো এই কথার সত্যায়ন করা যে, এই দুনিয়ার দিনের শেষ ও চূড়ান্ত সীমা রয়েছে। অর্থাৎ এই দুনিয়া একদিন টুকরো টুকরো হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আখিরাতের উপর ইমান আনার ব্যাপারে শরহে সদর বা প্রশান্ত চিত্ত হওয়ার জন্য যে বিষয়টি প্রযোজ্য, তা হলো আল্লাহর ভয় বিদ্যমান থাকা। আর এর আলামত হলো দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা কম থাকা। দুনিয়ার কষ্ট ও মুসিবতে হতাশ না হওয়া এবং র্ধৈয ধরা। খাহিশাত বা আসক্তির চাহিদার ব্যাপারে র্ধৈয ধারণ করা। আর আল্লাহ তাআলার নিকট যে প্রতিদান ও সওয়াব রয়েছে তার প্রতি ইয়াকীন রাখা।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ
আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ইমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ইমানদার নয়।– সূরা বাকারা ৮

আমরা বর্ণনা করেছি হযরত উমর (রা) সূত্রে নবী (সা) থেকে। যখন তাকে ইমানের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলো। তিনি বললেন,
أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ
তুমি ইমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসূলগেণের প্রতি, আখিরাত বা শেষ দিবসের প্রতি এবং তাকদীর বা ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি।
 
নবী (সা) ইরশাদ করেন-
بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةُ كَهَاتَيْنِ
আমার প্রেরণ এবং কিয়ামত- এই দুটি আঙ্গুলের মত নিকটর্বতী।
এই হাদীসের অর্থ হলো- আমি শেষ নবী। আমার পর আর কোন নবী আসবে না। তবে কিয়ামত বা পরকাল আসবে। যা আমার পরে খুবই নিকটর্বতী।


সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান

সোমবার, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে
মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান


মৃত্যুর পর পূণরুত্থানের প্রতি ইমান
আল্লাহ তাআলা যে পর্যন্ত চাইবেন মানুষ হাশরের ময়দানে দাড়িয়ে থাকবেন। যখন সেই সময় আসবে, যখন আল্লাহ তাদের থেকে হিসাব নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিবেন আর সমস্ত আমলনামা নিয়ে আসা হবে, যা কিরামান কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয় লোকদের কার্যকলাপ লিপিবদ্ধ করেছিল।

আর তা মানুষদেরকে এভাবে দেয়া হবে যে, কারো আমলনামা সোজা হাতে, কারো আমলনামা উল্টা হাতে আবার করো আমলনামা তার পিছন দিক হতে দেয়া হবে। যাদের আমলনামা সোজা হাতে দেয়া হবে তারা হবে সৌভাগ্যবান। আর যাদের আমলনামা বিপরীত দিক হতে দেয়া হবে তারা হবে হতভাগ্য।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
ألا يظن أولئك أنهم مبعوثون ليوم عظيم يوم يقوم الناس لرب العالمين
তারা কি চিন্তা করে না যে, উহারা পুণরুত্থিত হবে, মহাদিবসে? যেদিন সমস্ত মানুষ দণ্ডায়মান হবে তার প্রতিপালকের সম্মুখে।– সূরা তাতফীফ ৪-৬

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেন-
يقوم الناس يوم القيامة لرب العالمين حتى يغيب أحدهم في رشحه إلى أنصاف أذنيه
কিয়ামতের দিন মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে দন্ডায়মান হবে। এমনকি তারা তাদের কানের লতি পর্যন্ত ঘাম দ্বারা ডুবে যাবে।-রিওয়ায়ায়াত ২৫৭

হযরত মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি-
تدني الشمس يوم القيامة من الخلق حتى تكون منهم كمقدار ميل
কিয়ামতের দিন মানুষকে সূর্যের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। এমনকি তা মানুষের এক মাইলের নিকটবর্তী হয়ে যাবে।

বর্ণনাকারী সুলায়মান ইবনে আমির (রহ) বলেন-  আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, (ميل) মাইল দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, জমীনের দূরত্ব নাকি না (ميل নামক) ঐ শলাকা যা চোখে সুরমা দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়।
মানুষ তাদের আমল অনুসারে ঘামের মাঝে ডুবে থাকেবে। তাদের কারো ঘাম পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত হবে, কেউ হাটু পর্যন্ত ঘামের মধ্যে থাকবে, কেউ কোমর পর্যন্ত আর কারো মুখ পর্যন্ত ঘামে ডুবে যাবে।  
বর্ণনাকারী বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ মুখের প্রতি ইঙ্গিত করলেন।–রিওয়ায়াত ২৫৮
চলেবে..


বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সিহাহ সিত্তাহ এর পরিচয়

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 

সিহাহ সিত্তাহ এর পরিচয়

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কথা, কাজ, বাণী ও মৌনসম্মতিকে হাদিস বলে। রাসূল (সাঃ) এর জীবদ্দশায় হাদিস সংকলন করা নিষিদ্ধ ছিল। তাই রাসূল (সাঃ) এর শেষ জীবন ও পরবর্তী সময়ে হাদিস সংকলন শুরু হয়। আর সেই সংকলনের বিশুদ্ধতম ৬ টি হাদিস গ্রন্থই হলো সিহাহ সিত্তাহ।

সিহাহ সিত্তাহ এর পরিচয়

সহিহ আরবি শব্দ। যার বহুবচন হলো সিহাহ। সিহাহ অর্থ হলো বিশুদ্ধ, নির্ভুল। আর সিত্তা অর্থ হলো ছয়। অর্থাৎ, শব্দ দুটির অর্থ হলো বিশুদ্ধ ছয়খানা অর্থাৎ, হাদিসের ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ।

হাদীসের প্রধান ৬ টি গ্রন্থকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়। এটি দ্বারা “নির্ভুল ৬” বুঝানো হয়।

ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, “হিজরী ৩য় শতাব্দীতে হাদিস গ্রন্থের যে ৬ টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ সংকলন করা হয় তাই সিহাহ সিত্তাহ।

জমহুর মুহাদ্দিসিন-ই-কিরামের মতে, “হাদিস শাস্ত্রের বিশুদ্ধতম ৬ টি সংকলনকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলে।”

মুহাদ্দিসগণ বলেন, “হাদিস শাস্ত্রে যে ৬ খানি সংকলনের বিশুদ্ধতা ও প্রমাণের ব্যাপারে সর্বজন বিদিত ও স্বীকৃত তাই সিহাহ সিত্তাহ।”

এ গ্রন্থগুলো নবী (সাঃ) এর মৃত্যুর ২০০ বছর পর ৬ জন সংগ্রহকারীর দ্বারা সংগৃহীত হয়েছে।


সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থ ও এর সংকলক

সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থ ৬ টি। এগুলো হলো –

গ্রন্থের নাম সংকলকের নাম হাদিসের সংখ্যা

সহিহুল বুখারি -আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল বুখারী-৭২৭৫ টি

সহীহ মুসলিম -আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম-৯২০০ টি

জামিউত তিরমিজী- আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা আত তিরমিজী -৩৬০৮ টি

সুনানে আল নাসাঈ -আবু আব্দুর রহমান আহমদ ইবনে আলী ইবনে শোয়াইব -৫৭৫৮ টি

সুনানে আবু দাউদ  -আবু দাউদ সুলাইমান ইবনে আস আম- ৫১৮৪ টি

সুনানে ইবনে মাজাহ -আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মাজাহ- ৪৩৪১ টি


সহিহ হাদীস সমগ্র সিহাহ সিত্তাহ গ্রন্থ ৬ টি এখানে ক্লিক করুন



সন্তানাদি ও আবাসস্থল নিরাপদের জন্য দো‘আ:

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ০১, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 

সন্তানাদি ও আবাসস্থল নিরাপদের জন্য দো‘আ:


উচ্চারণ: রাববিজ‘আল হা-যা বালাদান্ আ-মিনাওঁ ওয়ারঝুক্ব আহলাহূ মিনাছ্ছামারা-তি মান আ-মানা মিনহুম বিল্লা-হি ওয়াল ইয়াওমিল আ-খিরি।

অর্থ: “পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তির স্থান কর এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও ক্বিয়ামতের প্রতি বিশ্বাস করে তাদেরকে ফলমূল দ্বারা রিযিক দান কর।” [বাক্বারাহ: ১২৬]

উৎস: ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁর শিশুসন্তান ইসমাঈলকে ও তাঁর স্ত্রী হাযেরাকে জনমানবশূন্য প্রান্তর বর্তমান কা‘বা ঘর ও যমযম কূপের সন্নিকটে রেখে আসেন, তখন উক্ত দো‘আ করেন। যাতে করে এই জনমানবহীন মরুপ্রান্তর নিজ পরিবার-পরিজনের জন্য একটি শান্তির শহরে পরিণত হয়, যাতে এখানে বসবাস করা আতংকজনক না হয় এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সহজলভ্য হয়। শহরটি যেন হত্যা, লুণ্ঠন, কাফেরদের অধিকার স্থাপন, বিপদাপদ থেকে সুরক্ষিত ও নিরাপদ হয়। ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আর ফলেই আল্লাহ তা‘আলা মক্কাকে সম্মানিত ও নিরাপদ রেখেছেন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরে দিয়েছেন। 


উৎস: ছহীহ কিতাবুদ দো‘আ, মোঃ নূরুল ইসলাম

*  ইবনু কাছীর, তাফসীর আল-কুরআনুল আযীম, পৃঃ ২২৬; বুখারী হা/৩১২২।



বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার

বুধবার, আগস্ট ৩১, ২০২২ 2
বার দেখা হয়েছে

 

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার

লেখক: আখতারুজ্জামান মোহাম্মাদ সুলাইমান

বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটি সুদৃঢ় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা এর চির স্থায়িত্ব পছন্দ করেন, বিচ্ছেদ অপছন্দ করেন। এরশাদ হচ্ছে: ‘তোমরা কীভাবে তা (মোহরানা) ফেরত নিবে ? অথচ তোমরা পরস্পর শয়ন সঙ্গী হয়েছ এবং তোমাদের নিকট সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।’ [নিসা : ২১]

এ চুক্তিপত্র ও মোহরানার কারণে ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে কতক দায়দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। যা বাস্তবায়নের ফলে দাম্পত্য জীবন সুখী ও স্থায়ী হবে—সন্দেহ নেই। সে সব অধিকারের প্রায় সবগুলোই সংক্ষেপ আকারে বর্ণিত হয়েছে কোরআনের আয়াতে: ‘যেমন নারীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমন তাদের জন্যও অধিকার রয়েছে ন্যায্য-যুক্তিসংগত ও নীতি অনুসারে। তবে নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ [বাকারা : ২২৭]

আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেকের উপর প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে। যদিও আনুগত্য এবং রক্ষনা-বেক্ষন ও অভিভাবকত্বের বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের।এখানে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে বিরাজমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার স্তর ও মানের ভিত্তিতে উল্লেখ করছি।


প্রথমত, যে সব অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সমান:

১. দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সততা, বিশ্বস্ততা ও সদ্ভাব প্রদর্শন করা

যাদের মাঝে নিবিড় বন্ধুত্ব, অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক, অধিক মেলামেশা, সবচেয়ে বেশি আদান-প্রদান তারাই স্বামী এবং স্ত্রী। এ সম্পর্কের চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে ভাল চরিত্র, পরস্পর সম্মান, নম্র-ভাব, হাসি-কৌতুক এবং অহরহ ঘটে যাওয়া ভুলচুক ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা অবশ্যম্ভাবী। এবং এমন সব কাজ, কথা ও ব্যবহার পরিত্যাগ করা, যা উভয়ের সম্পর্কে চির ধরে কিংবা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন: ‘তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর।’ [নিসা : ১৮]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল।’ [ইবনে মাজাহ : ১৯৬৭]

পরস্পর সদ্ভাবে জীবন যাপন একটি ব্যাপক শব্দ। এর মাঝে সমস্ত অধিকার বিদ্যমান।


 ২ পরস্পর একে অপরকে উপভোগ করা

এর জন্য আনুষঙ্গিক যাবতীয় প্রস্তুতি ও সকল উপকরণ গ্রহণ করা। যেমন সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ দুর্গন্ধ ও ময়লা কাপড় পরিহার ইত্যাদি। স্বামী স্ত্রী প্রত্যেকের এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। অধিকন্তু এগুলো সদ্ভাবে জীবন যাপনেরও অংশ।ইবনে আব্বাস রা. বলেনঃ ‘আমি যেমন আমার জন্য স্ত্রীর সাজগোজ কামনা করি, অনুরূপ তার জন্য আমার নিজের সাজগোজও পছন্দ করি।’

তবে পরস্পর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই হারাম সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ বস্তু হতে বিরত থাকতে হবে।


৩ বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা

সাংসারিক সমস্যা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা না করাই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে উপভোগ্য বিষয়গুলো গোপন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্ব-নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং যার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হয়, অতঃপর সে এর গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়।‘ [মুসলিম : ২৫৯৭]


 ৪ পরস্পর শুভ কামনা করা, সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়া

আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপর থেকে উপদেশ পাওয়ার অধিক হকদার।দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা উভয়েরই কর্তব্য।আর এর অন্তরভূক্ত হচ্ছে, পরস্পর নিজ আত্মীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করা ।

সন্তানদের লালন-পালন ও সুশিক্ষার ব্যাপারে উভয়েই সমান, একে অপরের সহযোগী। আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর।’ [মায়েদা : ২]


 দ্বিতীয়ত, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য:

সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গিনী স্ত্রীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।


১. স্বামীর আনুগত্য

স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য। তবে যে কোন আনুগত্যই নয়, বরং যেসব ক্ষেত্রে আনুগত্যের নিম্ন বর্ণিত তিন শর্ত বিদ্যমান থাকবে।

(ক) ভাল ও সৎ কাজ এবং আল্লাহর বিধান বিরোধী নয় এমন সকল বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয়।

(খ) স্ত্রীর সাধ্য ও সামর্থ্যরে উপযোগী বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বারোপ করেন না।

(গ) যে নির্দেশ কিংবা চাহিদা পূরণে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা।

আনুগত্য আবশ্যক করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘নারীদের উপর পুরুষগণ শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী।’ [বাকারা : ২২৭]

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: ‘পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী। কারণ আল্লাহ তাআলা-ই তাদের মাঝে তারতম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের বিধান রেখেছেন। দ্বিতীয়ত পুরুষরাই ব্যয়-ভার গ্রহণ করে।’ [নিসা : ৩৪]

উপরন্তু এ আনুগত্যের দ্বারা বৈবাহিক জীবন স্থায়িত্ব পায়, পরিবার চলে সঠিক পথে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বামীর আনুগত্যকে এবাদতের স্বীকৃতি প্রদান করে বলেন— ‘যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসের রোজা রাখে এবং নিজের লজ্জাস্থান হেফাজত করে ও স্বীয় স্বামীর আনুগত্য করে, সে,নিজের ইচ্ছানুযায়ী জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে।‘ [আহমাদ : ১৫৭৩]

স্বামীর কর্তব্য, এ সকল অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে আল্লাহর বিধানের অনুসরণ করা। স্ত্রীর মননশীলতা ও পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সত্য-কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের উপদেশ প্রদান করা কিংবা হিতাহিত বিবেচনায় বারণ করা।উপদেশ প্রদান ও বারণ করার ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ ও উন্নত মননশীলতার পরিচয় দেয়া । এতে সানন্দ চিত্তে ও স্বাগ্রহে স্ত্রীর আনগত্য পেয়ে যাবে।

২. স্বামী-আলয়ে অবস্থান

নেহায়েত প্রয়োজন ব্যতীত ও অনুমতি ছাড়া স্বামীর বাড়ি থেকে বের হওয়া অনুচিত।মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীদের সম্বোধন করে বলেন—সকল নারীই এর অন্তর্ভুক্তঃ  ‘তোমরা স্ব স্ব গৃহে অবস্থান কর, প্রাচীন যুগের সৌন্দর্য প্রদর্শনের মত নিজেদের কে প্রদর্শন করে বেড়িও না।’ [আহযাব : ৩৩]

স্ত্রীর উপকার নিহিত এবং যেখানে তারও কোন ক্ষতি নেই, এ ধরনের কাজে স্বামীর বাধা সৃষ্টি না করা। যেমন পর্দার সাথে, সুগন্ধি ও সৌন্দর্য প্রদর্শন পরিহার করে বাইরে কোথাও যেতে চাইলে বারণ না করা। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘আল্লাহর বান্দিদেরকে তোমরা আল্লাহর ঘরে যেতে বাধা দিয়ো না।‘ [বুখারী: ৮৪৯ ]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা: এর স্ত্রী যয়নব সাকাফী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলতেন:  ‘তোমাদের কেউ মসজিদে যাওয়ার ইচ্ছে করলে সুগন্ধি ব্যবহার করবে না।‘ [মুসলিম : ৬৭৪]


 ৩. নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা

স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করা। স্বামীর সাধ্যের অতীত এমন কোন আবদার কিংবা প্রয়োজন পেশ না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ  ‘স্ত্রী স্বীয় স্বামীর ঘরের জিম্মাদার। এ জিম্মাদারির ব্যাপারে তাকে জবাবদেহিতার সম্মুখীন করা হবে।’ [বুখারী: ২৫৪৬]


৪. নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা

পূর্বের কোন এক আলোচনায় আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদিস এ মর্মে উল্লেখ করেছি যে, নিজেকে কখনো পরীক্ষা কিংবা ফেতনার সম্মুখীন না করা।


 ৫. স্বামীর অপছন্দনীয় এমন কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়া

হোক না সে নিকট আত্মীয় কিংবা আপনজন। যেমন ভাই-বেরাদার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে বিছানায় জায়গা না দেয়া স্ত্রীদের কর্তব্য।’ [মুসলিম : ২১৩৭]

স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল রোজা না রাখা। কারণ, রোজা নফল—আনুগত্য ফরজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘নারীর জন্য স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখা বৈধ নয়। অনুরূপ ভাবে অনুমতি ব্যতীত তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়াও বৈধ নয়।‘ [বুখারী : ৪৭৬৯]

 তৃতীয়ত: 

স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য, সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গী স্বামীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।

 ১. দেন মোহর

নারীর দেন মোহর পরিশোধ করা ফরজ। এ হক তার নিজের, পিতা-মাতা কিংবা অন্য কারো নয়। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে স্ত্রীদের মোহরানা দিয়ে দাও।’ [নিসা : ৪]

২. ভরন পোষণ

সামর্থ্য ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী স্ত্রীর ভরন-পোষণ করা স্বামীর কর্তব্য। স্বামীর সাধ্য ও স্ত্রীর মর্তবার ভিত্তিতে এ ভরন-পোষণ কম বেশি হতে পারে।অনুরূপ ভাবে সময় ও স্থান ভেদে এর মাঝে তারতম্য হতে পারে।আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘বিত্তশালী স্বীয় বিত্তানুযায়ী ব্যয় করবে। আর যে সীমিত সম্পদের মালিক সে আল্লাহ প্রদত্ত সীমিত সম্পদ হতেই ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে পরিমাণ দিয়েছেন, তারচেয়ে’ বেশি ব্যয় করার আদেশ কাউকে প্রদান করেন না।‘ [তালাক : ৭]

৩. স্ত্রীর প্রতি স্নেহশীল ও দয়া-পরবশ থাকা

স্ত্রীর প্রতি রূঢ় আচরণ না করা। তার সহনীয় ভুলচুকে ধৈর্যধারণ করা। স্বামী হিসেবে সকলের জানা উচিত, নারীরা মর্যাদার সম্ভাব্য সবকটি আসনে অধিষ্ঠিত হলেও, পরিপূর্ণ রূপে সংশোধিত হওয়া সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামী। কারণ, তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্ট। পাঁজরের উপরের হাড়টি সবচে’ বেশি বাঁকা। (যে হাড় দিয়ে নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে) তুমি একে সোজা করতে চাইলে, ভেঙে ফেলবে। আবার এ অবস্থায় রেখে দিলে, বাঁকা হয়েই থাকবে। তাই তোমরা তাদের কল্যাণকামী হও, এবং তাদের ব্যাপারে সৎ-উপদেশ গ্রহণ কর।’ [বুখারী, মুসলিম, রিয়াদুস সলিহীন :: বই ১ :: হাদিস ২৭৩]


৪. স্ত্রীর ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল হওয়া

হাতে ধরে ধরে তাদেরকে হেফাজত ও সুপথে পরিচালিত করা। কারণ, তারা সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল, স্বামীর যে কোন উদাসীনতায় নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর ফেতনা হতে খুব যত্ন সহকারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘আমার অবর্তমানে পুরুষদের জন্য নারীদের চে’ বেশি ক্ষতিকর কোন ফেতনা রেখে আসিনি।’ [বুখারী:৪৭০৬]

নারীদের ব্যাপারে আত্মম্ভরিতার প্রতি লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ  ‘তোমরা সা’আদ এর আবেগ ও আত্মসম্মানবোধ দেখে আশ্চর্যান্বিত হচ্ছ। আমি তার চে’ বেশি আত্মসম্মানবোধ করি,আবার আল্লাহ আমারচে’ বেশি অহমিকা সম্পন্ন।’ [মুসলিম : ২৭৫৫]

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, যার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ নেই সে দাইয়ূছ (অসতী নারীর স্বামী, যে নিজ স্ত্রীর অপকর্ম সহ্য করে)। হাদিসে এসেছেঃ ‘দাইয়ূছ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ [দারামি : ৩৩৯৭]

মানুষের সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদার বিষয় নিজের পরিবার। এর ভেতর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত স্বীয় স্ত্রী। অতঃপর অন্যান্য আত্মীয় স্বজন এবং অধীনস্থগণ।

পরিশেষে নির্ঘাত বাস্তবতার কথা স্বীকার করে বলতে হয়, কোন পরিবার সমস্যাহীন কিংবা মতবিরোধ মুক্ত নয়। এটাই মানুষের প্রকৃতি ও মজ্জাগত স্বভাব। এর বিপরীতে কেউ স্বীয় পরিবারকে নিষ্কণ্টক অথবা ঝামেলা মুক্ত কিংবা ফ্রেশ মনে করলে, ভুল করবে। কারণ, এ ধরাতে সর্বোত্তম পরিবার কিংবা সুখী ফ্যামিলির একমাত্র উদাহরণ আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবার ও ফ্যামিলি। সেখানেও আমরা মানবিক দোষ-ত্রুটির চিত্র দেখতে পাই, অন্য পরিবারের পবিত্রতা কোথায় ?

জ্ঞানী-গুণীজনের স্বভাব ভেবে-চিন্তে কাজ করা, ত্বরা প্রবণতা পরিহার করা, ক্রোধ ও প্রবৃত্তিকে সংযমশীলতার সাথে মোকাবিলা করা।কারণ, তারা জানে যে কোন মুহূর্তে ক্রোধ ও শয়তানের প্ররোচনায় আত্মমর্যাদার ছদ্মাবরণে মারাত্মক ও কঠিন গুনাহ হয়ে যেতে পারে।যার পরিণতি অনুসূচনা বৈকি? আবার এমনও নয় যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত কল্যাণ ও সুপথ বান্দার নখদর্পে করে দিয়েছেন। তবে অবশ্যই তাকে মেধা, কৌশল ও বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে।


সমাপ্ত



আপনার সন্তান থেকে আপনি কী চান?

বুধবার, আগস্ট ৩১, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 

আপনার সন্তান থেকে আপনি কী চান?


লেখকঃ আহমেদ রফিক

গাজিপুর থেকে ঢাকা ফিরছিলাম। বাসে উঠে বসলাম। কিছুক্ষন পর এক মুরব্বী উঠে আমার পাশেই বসলেন। আমি সালাম দিলাম। স্নিগ্ধ কোমল চেহারা। শ্বেত-শুভ্র লম্বা দাড়ি। দেখলেই শ্রদ্ধা করতে ইচ্ছা করে। বয়সের ভারে বেশ ন্যুজ বোঝা যায়। যেন জোর করেই লুকোনোর চেষ্টা। কালো প্যান্ট সাদা শার্ট পরা। ইন করা। হাতে একটি এক্সিকিউটিভ ফাইল। কাগজ-পত্র ভরা। কিছুক্ষন পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা আপনার নাম? নাম বললাম। জিজ্ঞেস করলেন কী করেন? সংক্ষেপে বললাম। জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় থাকেন। বললাম। জানতে চাইলেন বাসায় কে কে আছে।

বললাম, আলহামদু লিল্লাহ সবাই আছে। বাবা-মা, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে।

প্রশ্ন করলেন, ছেলে মেয়ে ক’টা? বললাম, আলহামদু লিল্লাহ আমার মোট ছয় ছেলে-মেয়ে। চারটা ছোট, আর দু’জন বড়।

মনে হয় তিনি পুরো কথাটা ধরতে পারেননি। বললেন, কী বলছেন?

বললাম, হ্যা চাচা, আমার নিজের চার ছেলে-মেয়ে। দুই মেয়ে, দুই ছেলে। আর বুড়ো দুই সন্তান হলেন আমার বাবা মা।

জিজ্ঞেস করলেন, বাবা মা কি আপনার সাথেই থাকেন?

বললাম, সব সময় থাকেন না। মানুষের ভীড়ে ঢাকা শহরে বাবার না কি দম বন্ধ হয়ে আসে। উনি গ্রামেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। তাই বাবা মা গ্রামেই থাকেন। কিন্তু নাতীদের টানে আবার গ্রামেও তাদের মন টেকে না। তাই এখন এখানেই আছেন। সারাক্ষন নাতী-নাতনীদের নিয়ে থাকেন। দেখছি, এখানেই ওনারা বেশ আনন্দে আছেন আলহামদু লিল্লাহ। তাই আমিও ওনাদেরকে আর গ্রামে যেতে দিতে চাই না। মাঝে-মধ্যে গ্রামের বাড়িঘর, জায়গা-জমি দেখা শোনার জন্য গিয়ে কিছু দিন থেকে আবার চলে আসবেন। বললাম, চাচা আপনি আমার বাবার চেয়েও বয়সে অনেক বড় হবেন মনে হয়। আমাকে তুমি করে বলেন। আপনার মুখে ‘আপনি’ করে শুনতে আমার আন-ইজি লাগছে। বললেন, আচ্ছা আচ্ছা, থ্যাংক ইউ।

কথা বলতে বেশ ভালোই লাগছিলো ভদ্রলোকের সাথে। দেখলাম, উনি আর কিছু জিজ্ঞেস করছেন না। অগত্যা আমিই জানতে চাইলাম ওনার কথা। কী করেন, ছেলে-মেয়ে ক’টা, কী করে ইত্যাদি।

ছেলে-মেয়েদের কথা বললেন। বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, অ্যামেরিকাতে থাকে। মেঝ ছেলে এই দেশেরই একজন উপ-সচিব। এর পর তার আরেকটি মেয়েও আছে। সে যুক্তরাজ্যে স্বামীর সাথে থাকে; সেখানকার নাম করা একটি কলেজের শিক্ষক। তিনি নিজে একটি সি.এ ফার্মে অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কাজ করেন।

এরপর কিছুক্ষন নিরবে কেটে গেলো। আমি মনে হয় অন্য কিছু চিন্তা করছিলাম, না যেন ফোনে কথা বলছিলাম।

হঠাৎ ফিরে দেখলাম ভদ্রলোক চোখ মুছছেন। পানি বেয়ে পড়ছে গণ্ড বেয়ে। আমি ভাবলাম, শরীরে কোনো আঘাত-টাঘাত পেয়েছেন হয়তো। বললাম, চাচা কী হয়েছে? বললেন, কিছু না বাবা। আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। কী করবো, কী বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। বললাম, চাচা কিছু মনে না করলে আমাকে বলুন কী হয়েছে? কিছুক্ষণ হাতের রুমালে চোখ চেপে রেখে, কী হয়েছে সেটা না বলে তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা-মা সত্যিই সৌভাগ্যবান’।

বললাম, আলহামদু লিল্লাহ। দোয়া করবেন, যেন আজীবন ওনাদের খিদমত করে যেতে পারি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আপনার এই বয়সে এভাবে বাসে দৌড়-ঝাপ করে চলাফেরা করতে কষ্ট হয় না? কেনই বা করেন? আপনার ছেলে-মেয়েরা তো সব সুপ্রতিষ্ঠিত, স্বচ্ছল!

বললেন, কষ্ট তো হয়ই বাবা, কিন্তু না করেও তো উপায় নেই!

বললাম, কেন, আপনার সন্তানরা…?

বললেন, তাদের সময় নেই খোজ খবর নেওয়ার। তারা তাদের নিজেদের জীবন-ক্যারিয়ার নিয়ে এতো ব্যাস্ত যে সময়ই পায় না। টাকা-পয়সাও পাঠায় না। আমার তো স্ত্রী আছে। আমার ও তার জীবনধারণের জন্য হলেও আমাকে এই বয়সে চাকুরি করতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়েরা বলে, আমি বসে থাকলে নাকি অসুস্থ অচল হয়ে পড়বো, ডায়াবেটিক প্রেসারে আক্রান্ত হবো। অতএব আমার খেটে খাওয়া উচিৎ।

আমি যেন বোবা হয়ে গেলাম। শান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুজে পাচ্ছিলাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম কতোক্ষণ। অসহায়ের মতো। ভাবছিলাম এই আধুনিক বস্তুবাদী সেক্যুলার সমাজব্যবস্থার কথা। এখান থেকে কী তৈরি হচ্ছে! এতো মানুষকে জন্তু জানোয়ার বানানোর কারখানা হয়ে দাড়িয়েছে! কোথায় যাচ্ছি আমরা! কিসের পেছনে ছুটে চলছি। কোথায় হারিয়ে গেলো আমাদের শান্তির সুখ পাখিটি? কোথায়? কে দায়ভার নেবে এই অসহায় বৃদ্ধার? কে তাকে শান্তনা দেবে? কে রুমালটা এগিয়ে দেবে অন্তত, তার চোখের জলটুকু মোছার?

বললাম, চাচা দোয়া করেন ছেলে-মেয়েদের জন্য, আল্লাহ ওদেরকে সঠিক বুঝ দান করবেন। চাচা বললেন, দোয়া তো করি, কিন্তু দোয়া তো কবুল হচ্ছে না…।. বললাম চাচা দোয়া করতে থাকেন। দোয়া আল্লাহ নিশ্চয়ই কবুল করেন; যদি তা সঠিকভাবে হয়। এই দেখুন, আমার বাবাকে আমি ছোট সময় থেকে দেখেছি, তিনি আল্লাহর কাছে কেবল একটিই দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানকে খাটি মুসলিম বানাও, দ্বীনদার বানাও। আমি কতোটুকু দ্বীনদার খাটি মুসলিম হতে পেরেছি তা জানি না। ভুল-ত্রুটি, গুনাহ খাতা তো হর হামেশাই করে ফেলি। কিন্তু বাবা-মায়ের খেদমত করার চেষ্টা করি আপ্রান। এটা শুধু বাবা-মা’র সন্তুষ্টির জন্যই যে করি—তা নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করি মুলত। কারণ আমার দ্বীন, আমার ইসলাম আমাকে এটা শিখিয়েছে চাচা। আমার দ্বীনই আমাকে শিখিয়েছে যে, বাবা মা যে সন্তানের উপর সন্তুষ্ট নয় আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট নন।

দেখুন চাচা, আমার বাবা অনেক পয়সাওয়ালা মানুষ ছিলেন না। অনেক আবদারই অনেক সময় পুরণ করতে পারেন নি। তথাকথিত নামি-দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও লেখা-পড়া করাতে পারেননি হয়তো। সামর্থ্যে যতোটুকু ছিলো চেষ্টা করেছেন। আমি হয়তো অ্যামেরিকান কোনো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হয়নি, অন্তত বাবা-মা’র চক্ষু-শীতলকারী সন্তান হতে পেরেছি, আলহামদু লিল্লাহ। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন আজীবন ওনাদের চক্ষু শীতলকারী হয়ে থাকতে পারি।

চাচা অপলক তাকিয়ে আছেন। বললাম, চাচা, আপনার দোয়াও নিশ্চয়ই কবুল হয়েছে। আপনি মনে করুন তো, আপনার সেই তরুণ বয়সের কথা। যখন আপনার সন্তানগুলো জন্মগ্রহণ করেছিলো। আপনি তাদের লেখা-পড়া, ভবিষ্যত নিয়ে কতো চিন্তিতো ছিলেন! কতো উদ্বিগ্ন! দোয়া কি করতেন না তখন? অবশ্যই করতেন। মনে করুন তো কী দোয়া করতেন?

চাচা বললেন, হ্যা বাবা! দোয়া করতাম তারা যেন বড় হয়, শিক্ষিত হয়। সমাজে আমার মুখ উজ্জ্বল করে। সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারে…।

বললাম, চাচা দেখেন, আপনার দোয়া কিন্তু কবুল হয়েছে! আপনি যা চেয়েছিলেন তা কিন্তু হয়েছে। তারা বড় শিক্ষিত হয়েছে, সমাজে আপনার মুখও উজ্জ্বল করেছে। ভালো করে মনে করে দেখেন চাচা, আপনার সন্তানদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে কিন্তু আপনি গুরুত্ব দেননি। তাদেরকে মহান স্রষ্টা আল্লাহর সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়াকে গুরুত্ব দেননি। কখনো হাত তুলে এই বলে কান্নাকাটি করেননি যে, হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তানদেরকে ভালো দ্বীনদার বানাও, ভালো মুসলিম বানাও, ঈমানদার বানাও। কখনো বলেননি, রব্বানা, হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউন, ওয়াজ ‘আলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা।

চাচা দেখুন, আমরা যারা পিতা-মাতা, আমরা কিন্তু দাতা নই, আয়োজক মাত্র। আমরা আমাদের সন্তানদেরকে খাদ্য-খাবার, পোষাক আশাক যা কিছুই দেই না কেন, আমরা কিন্তু নিছক ব্যবস্থাপক। মুল দাতা হলেন মহান দয়ালু ও রিজিকদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। আমরা যদি মুল মালিকের প্রতি তাদেরকে কৃতজ্ঞ হতে না শিখাই, তাহলে কিভাবে আশা করতে পারি যে, তারা আমাদের প্রতি শেষ পর্যন্ত কৃতজ্ঞ থাকবে?

চাচা এই যে বৃদ্ধ বাবা-মা’র যত্ন না নেওয়া এটা কি মানবতার জন্য একটি বিপর্যয় নয়?

চাচা বললেন, এটা শুধু বিপর্যয় নয়, মহা বিপর্যয়। এটা মানুষত্যের মর্যাদা থেকে মানুষের পশুর পর্যায়ে নেমে যাওয়ার নামান্তর।

এই অসভ্যতা কোত্থেকে আমাদের মুসলিম সমাজে এসেছে জানেন চাচা? এসেছে বস্তুবাদীতা থেকে, পশ্চিমা অসভ্যতা থেকে। মুসলিম দেশে কখনো কোনো মানুষ পালার খোয়াড় ছিলো না। আজ আমরা তাদেরকে আমাদের চরম পরম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমাদের দেশেও এখন এই খোয়াড় ব্যবস্থা এসেছে। গুড়োদের খোয়াড়, বুড়োদের খোয়াড়। বাংলায় বললে কেমন যেন অসভ্যতা নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে যায়। তাই আদুরে নামে এরা ইংলিশে বলে ‘ডে কেয়ার’ বা ‘ওল্ড হোম’।. শিশুকালে আপনি সন্তানকে ডে কেয়ারে রাখবেন, বুড়ো হলে তারা আপনাদেরকে ওল্ড হোমে রেখে আসবে।

দ্বীনদার না হওয়া সত্ত্বেও অনেকে হয়তো মানবিক বোধ থেকে বাবা মা’র খোজ-খবর রাখতে পারেন, দেখা-শোনা করতে পারেন। কিন্তু একজন দ্বীনদার সন্তানের কাছ থেকে বাবা সত্যি কেমন আদর-যত্ন ও সম্মান শ্রদ্ধা পেতে পারেন তা কেবল সেই বাবা-মা’রাই জানেন, যাদের দ্বীনদার সন্তান আছে। ঢাকায় আমি আমার স্টপেজের কাছে এসে চাচার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। বললাম, চাচা আপনি মুরব্বী মানুষ, অনেক কথা বলেছি, ভুলত্রুটি মাফ করে দিয়েন। চাচার চোখ আবার ছলছল করে উঠলো। ক্ষণিকের পরিচয়ে মনে হয় অনেক আপন হয়ে পড়েছিলাম। বাস থেকে নেমেও দেখলাম, চাচা তাকিয়ে আছেন জানালা দিয়ে। আবারো হাত নাড়লাম। দোয়া করলাম, হে আল্লাহ! তুমি ভালো রেখো চাচাকে।

এ সমস্যা শুধু বাসে দেখা হওয়া এই চাচারই নয়। তিনি এই সমাজের একটি দর্পনমাত্র। আমি এমন আরো অনেক দেখেছি। আপনিও দেখেছেন নিশ্চয়ই অনেক। আপনার একই বিল্ডিং এ, পাড়ায়, মহল্লায়, আত্মিয় ও বন্ধু বান্ধবের পরিবারে। মাতাল, হিরোইন, গাজা, ডাইল সহ নানা রকম মাদকসেবী সন্তানদের ঘটনা তো অহরহ দেখবেন আপনার চারপাশে। এদের কথা না হয় বাদই দিলাম। আমার নানা বাড়ি এলাকায় এক উকিল সাহেব ছিলেন। নাম আতাহার আলী। ছেলেকে পাঠিয়েছিলেন আমেরিকায় লেখাপড়া করতে। ছেলেকে টাকা পাঠাতে পাঠাতে তিনি একরকম নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। ওদিকে ছেলে এক সাদা মেয়েকে বিয়ে করে মৌজ মাস্তিতে ব্যাস্ত। বাবা ছেলের দুঃখে কাদতে কাদতে মারা গেছেন। বাবাকে দেখতেও আসেনি সে। অনেক দিন পর তার অ্যামেরিকান বৌ নিয়ে বেড়াতে এসেছিলো মাকে দেখতে। ঘন্টা দুয়েক গ্রামের বাড়িতে থেকে তার সাদা বৌ ক্লান্ত। স্বামীকে ধমক দিয়ে বলেছিলো, ‘ইট ইজ ঠু লেইট, লেটস গো…’

আপনি আপনার সন্তানকে ডাক্তার বানান, ইঞ্জিনিয়ার বানান, প্রফেসর বানান, বিজ্ঞানী বানান—কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সবার আগে যদি ভালো মুসলিম না বানান তাহলে প্রস্তুত থাকুন সে দিনের জন্য যেদিনের কান্নার কোনো শেষ নেই। এ কান্না অনেকের এই চাচার মতো, এই উকিল সাহেবের মতো দুনিয়াতেই শুরু হয়ে যায়। কারো ভাগ্যক্রমে দুনিয়াতে শুরু নাও হতে পারে। কারণ দুনিয়া মুলত সাধারণভাবে শাস্তির জায়গা নয়। শাস্তির জায়গা হলো আখিরাত। দুনিয়াতে কাউকে কাউকে আল্লাহ শাস্তি দিয়ে দেখান, যাতে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে। আল্লাহ তা ‘আলা বলেন: “জলেস্থলে যতো বিপর্যয়/অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা মানুষেরই হাতের কামাই। এর উদ্দেশ্য হলো তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের কিছু ফল ভোগ করানো, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সুরা আর রূম, আয়াত ৪১]

দুনিয়াতে বেচে গেলেও আপনার এই প্রানপ্রিয় সন্তানেরা কিন্তু আখিরাতে আপনারই বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে আল্লাহর দরবারে। কেন আপনি তাদেরকে দ্বীন শিখাননি!

আপনার সন্তান, আপনারই সিদ্ধান্ত। তাদেরকে কি আপনি আপনার দুনিয়ার শান্তি ও জান্নাতের উসিলা বানাবেন, নাকি দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর আখিরাতের শাস্তির কারণ বানাবেন। সেটা একান্তই আপনার সিদ্ধান্ত! হ্যা একান্তই আপনার!!!

পোস্ট- সংগ্রহীত



সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০২২

সৎ ও চরিত্রবান যুবসমাজ গড়ে তুলতে পিতা-মাতার দায়িত্ব

সোমবার, আগস্ট ২৯, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 


বিশ্বজগৎ একটি নিয়ম ও নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই নিয়ম-নীতির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তাআলা। সূর্যও চন্দ্র আপন গতিতে নিজ নিজ কক্ষপথে চলে। যখনই এর ব্যত্যয় ঘটবে, পৃথিবী ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

মানুষ তার জীবনের উন্নতি সাধন করত চাইলে, সকল প্রকার কাজ-কর্মে আল্লাহ তাআলার নির্দেশগুলো অবশ্যই সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে, তা না হয় নিজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং জাতিও ধ্বংসের দিকে ধাবিত হবে। তাই আল্লাহর নির্দেশ: “হে মানুষ, স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদত কর, যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করেছেন,সম্ভবত: তোমরা মুত্তকী হতে পার।” [সূরা বাকারা-২১]

অর্থাৎ তোমারা সকল প্রকার পাপকার্য হতে বিরত থাকতে সক্ষমতা লাভ করতে পারবে। ইবাদতের অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা এবং যাবতীয় অন্যায় কাজ ও অপকর্ম থেকে বিরত থাকা। যে সব কাজ ও কর্মে শয়তানের পথ অনুসরণ করা হয় তা থেকে বেঁচে থাকা এবং যেসব অপকর্ম মানসিক বিকৃতি ঘটিয়ে মদপান, জুয়া খেলা ও নেশার দ্রব্য পানে এবং মাদকাশক্তিতে উৎসাহিত করে, তা পরিত্যাগ করা। এর ব্যত্যয়ে মানব জাতির জীবনীশক্তি ধ্বংস হয় এবং তারা শয়তানের পথে অধিকতর অগ্রসর হয়।

পৃথিবীর মানুষ উন্নতির দিকে যাচ্ছে এবং চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত হয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশের সোনার মানুষ, ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্খার ফসল এবং জাতির ভবিষ্যত কর্ণধার,পরিচালনায় নেতৃত্বদানকারী গৌরবোজ্জ্বল সন্তানেরা, ধনী-নির্ধন সকল অভিভাবকের আদরের দুলাল-দুলালী, তরুণ-তরুণী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত যুবক-যুবতী সম্প্রদায় নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে মাদকদ্রব্য সেবন করছে। যা তাদের জীবনী শক্তি নি:শেষ করে দিচ্ছে।

এদের প্রত্যেকের পিতা-মাতার আশা-ভরসা এবং ভবিষ্যৎ চিন্তা, ওরা মানুষ হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করবে এবং মাতা-পিতার মুখ উজ্জ্বল করবে ও নিজের জীবনে শান্তির পায়রা উড়াবে। এইসব উজ্জ্বল নক্ষত্র সন্তানরা শুধু শুধু নিজের জীবনেই ধ্বংস করছে না বরং দেশের সার্বিক কল্যাণের বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। কেননা, এরা সরকারের কোন আইন মানছে না এবং সমাজের নিয়েম কানুনের তোয়াক্কা করছে না, এরা মাতা-পিতার শুধু অবাধ্যই নয় বরং জমি-বাড়ি বিক্রি করে তাদের মাদকাসক্তির চাহিদা পূরণ করতে পিতা-মাতা বাধ্য হচ্ছে অন্যথায় জীবন বিসর্জন দিতে হচেছ।

নিজের জীবন অথবা মাতা-পিতার জীবন দিতে হচ্ছে এর অনেক প্রমাণ বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামই যথেষ্ট। এর জন্য শুধু সোনার টুকরো সন্তানগণই দায়ী নয়। মাতা-পিতা, অভিভাবক ও সমাজের সকল স্তরের লোকই এর জন্য দায়ী। এদের প্রতি শুধু শাসনই নয় বরং সোহাগেরও প্রয়োজন ছিল এবং আছে। সকলেরই দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্বে যাদের অবহেলা আছে তারাও দায়ী হবে। এমনকি স্বয়ং সরকারও। দেশের জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হলে এর জন্য সর্বস্তরের মানুষেই দায়ী হবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন: “সাবধান! তোমরা প্রত্যকেরই নিজ দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং নেতা, যিনি জনগণের তত্ত্বাবধায়ক, তিনি স্বীয় অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। প্রত্যেক পুরুষ নিজ পরিবারের লোকদের তত্ত্বাবধায়ক এবং নিজের অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। আর প্রত্যেক মহিলা তার স্বামীর পরিবারের লোকদের ও তার সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক এবং তিনি তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। কোন ব্যক্তির কর্মচারী স্বীয় মনিবের সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক এবং সে সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেকেই নিজের অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [বুখারী, মুসলিম]

অতএব, মানবচরিত্র ও মানুষের আত্মা ও দেহের সর্বনাশকারী জীবনীশক্তি ধ্বংসকারী মাদকদ্রব্যের প্রচার- প্রসার, সংগ্রহকারী, সেবনকারী ও বিক্রয়করীদের প্রতিরোধে দেশের সকল স্তরের সম্পৃক্ততা লোকের সাহায্য-সহায়তা ও সরকারের প্রশাসনের বিশেষ নজরদারীর প্রয়োজন। তা না হলে এই মরণ ব্যাধি হতে দেশ ও জাতির মহামূল্যবান জীবনগুলো কোনো মতেই রক্ষা পাবে না। এই ব্যাধিতে যারা আক্রান্ত তাদরে প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং অভিভাবকদের সচেতন হয়ে তাদের গতিবিধির প্রতি কঠোরভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। অভিভাবকদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হচ্ছে যে: “হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের এবং পরিবারবর্গকে আগুন হতে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।” [সূরা তাহরীম, ০৬]


সমাপ্ত



Madina Live Tv Online

সোমবার, আগস্ট ২৯, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে Live Madina TV

বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

সফল জীবন (আলকামা)

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে

 

সফল জীবন (আলকামা)

তিনি রাসূলকে (সা) পাননি। পাননি প্রিয় নবীজীর সান্নিধ্য। কিন্তু তাতে কি! তার সেই অপূর্ণতা তিনি নিজের চেষ্টা, সাধনা, ত্যাগ আর রাসূলের (সা) প্রতি প্রতি ভালবাসায় পুশিয়ে নিয়েছিলেন নবীজীর প্রিয় সাহাবীদের মাধ্যমে।


এই আলোকিত মানুষটির নাম আলকামা।

আলকামা হযরত উমর, আলী, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদসহ অনেক সাহাবীর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তাদের জ্ঞান সমুদ্র থেকে কলস ভরে তুলে নিয়েছিলেন জীবন চলার পাথেয়। নিবারণ করেছিলেন তৃষ্ণা।

সত্যের পিপাসা তো এমনিই।

সেই পিপাসা একমাত্র জ্ঞারে সুপেয়, সুনির্মল স্বচ্ছ পানি ছাড়া আর কিছুতেই মেটে না।

আলকামার জ্ঞান তৃষ্ণা ছিল প্রচণ্ড।

ছিল সত্যের প্রতি আনুগত্য এবং অনুরাগ।

আর অঢেল ভালবাসা ছিল আল্লাহর রাসূলের (সা) প্রতি।

ফলে আর শঙ্কা কিসের?

কিসের অভবা?

না, কোনো শঙ্কা নয়। বরং গভীর নিষ্ঠা আর একাগ্রতায় তিনি আল্লাহর কুরআন, রাসূলের আদর্শ এবং তাঁর সার্বিক জ্ঞানে তিনি এতই সমৃদ্ধহয়েওঠেন যে তার অন্যতম শিক্ষক ইবন মাসউদ বলতে বাধ্য হন, ‘আমি যত কিছু পড়েছি ও জেনেছি, তা সবই আলকামা পড়েছে ও জেনেছে।’


আলকামার ছিল অসাধারণ স্মৃতি শক্তি।

অত্যন্ত প্রখর ছিল তার ধারণ-ক্ষমতা।

কোনো কিছু একবার মুখস্থ করলে তা আর ভুলতেন না। সেটা সমুদ্রিত গ্রন্থের মতই রয়ে যেত তার হৃদয়ে।

আলকামা এ প্রসঙ্গে নিজেই বলতেন,

‘যে জিনিস আমি আমার যৌবনে মুখস্থ করেছি তা এখনও আমার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে আছে, যে তা যখন পাঠ করি, তখন মনে হয় বই দেখে পড়ছি।’

মহান আল্লাহ পাক যাকে জ্ঞানভান্ডার ও মেধা দান করেন, তিনি অবশ্যই ধন্য। আল্লাহর পক্ষ থেকে এ এক বিশাল নিয়ামত।

আলকামাও আল্লাহর এই বিশেষ নিয়ামত পেয়ে ধন্য হয়েছিলেন।

সামান্য কিছু নয়, বরং পুরো হাদিসে হাফেজ ছিলেন। সেই সাথে আল কুরআন এবং আল ফিকাহর জ্ঞানেও ছিলেন সমৃদ্ধ।

আলকামা ছিলেন একজন বড় তাবেঈ। অসাধারণ ছিল তার জ্ঞানভান্ডার। ছিলেণ হাদিসে মুহাদ্দিস এবং হাফেজ।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতবড় একজন হাদিসে হাফেজ ও মুহাদ্দিস নিজেকে কখনই বড় মনে করতেন না। এমনকি মুহাদ্দিস হিসাবে নিজেকে পরিচিত করতেও ছিলেন কুণ্ঠিত ও লজ্জিত।

একেই বলে প্রকৃত জ্ঞানী।

যে গাছে ফল যত বেশি, সেই গাছের ডালগুলি ততোই নুয়ে পড়ে। জ্ঞানীর ক্ষেত্রেও কথাটি সমান প্রযোজ্য।

কিন্তু আজকের চিত্র ভিন্ন। খালি কলস বাজে বেশি- এমন অবস্থা।

আলকামা ছিলেন যেমন জ্ঞানী, তেমনি সত্যনিষ্ঠ ও বিনীয়।

রাসূলের (সা) আদর্শে তিনি তার জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন।

সাহাবীরা (রা) ছিলেন তার সামনে রাসূলের (সা) জীবন্ত প্রতিনিধি।

প্রকৃত অর্থে একজন ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির মতই তিনি সাহাবীদের (রা) কাছ থেকে আহরণ করেছেন জ্ঞান ও আত্মার খোরাক।


কী চমৎকার এক নিদর্শন!

যারা রাসূলকে (সা) দেখেনি, তারা ইবন মাসউদকে দেখেই রাসূলের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা নিতে পারতো।

আবার যারা ইবন মাসউদকে দেখেনি, তারা আলকামাকে দেখে রাসূল (সা) ও ইবন মাসউদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অনেক বেশি অবগত হতে পারতো। এটা নিশ্চয়ই কম কথা নয়।

আলকামার এই স্বভাব চরিত্র যেমন ছিল তার হৃদয়ে, তেমনি ছিল তার চাল-চলনে ও নৈমিত্তিক যাপিত জীবনে।

আলকামা আল কুরআনকে তার প্রতিটি কাজের বাহনে রূপ দিয়েছিলেন। ঠিক সেইভাবে রাসূলের (সা) আদর্শকেও জীবনের সকল ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতেন।

জ্ঞঅন চর্চার পাশাপাশি আলকামা ছিলেন জিহাদের ব্যাপারেও সমান সতর্ক। জিহাদের জন্য তিনি ছিলেন পিপাসায় কাতর।


তার ভেতরে ছিল এক সাহসের ফুলকি।

ছিল সমুদ্রে মত গর্জনমুখর।

সেই গর্জন কেবলি ফুঁসে উঠতো তার মধ্যে।

হিজরি বত্রিশ সন।

আমীর মুয়াবিয়ার  সময়কাল।

সামনে কনস্টান্টিনোপল অভিযান সম্পর্কে রাসূলের (সা) একটি ভবিষ্যৎ বাণী ছিল।

এই বাহিনীতে যোগ দিলেন আলকামা।

বাহিনীর সবাই বিজয়ের অংশীদার ও সাক্ষী হওয়ার জন্য শাহাদাতের প্রবল প্রেরণায় ছিলেন উজ্জীবিত।

আর আলকামা?

তিনি তো শহীদি জীবনকে কামনা করেন সর্বক্ষণ।


শুরু হলো জিহাদের যাত্রা। সে ছিল এক দুঃসাহসী অভিযান।

বাহিনীর সবাই প্রাণবন্ত।

একজন মুজাহিদ। নাম ‍মুদিদ। তিনি একটি কিল্লার ওপর আক্রমণের সময় মাথায় বাঁধার জন্য চেয়ে নিলেন আলকামার চাদরটি।

মুজাহিদটি শহীদ হলেন এক পর্যায়ে।

আলকামার চাদরটিও হয়ে উঠলো শহীদের রক্তে লালে লাল!


এই রক্তে রাঙা চাদরটিকে আলকামা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে কাঁধে ঝুলিয়ে রাখতেন।

যেতেন জুমআর নামাজেও।

বলতেন, ‘আমি এই চাদরটি আমা কাঁধে এজন্য ঝুলিয়ে রাখি যে, এতে একজন শহীদের খুনের স্পর্শ আছে।’

আহ! কী মমতাভরা উচ্চারণ তার! এত বড় একজন জ্ঞানী তাবেঈ। কত তার মর্যাদা! অথচ তিনি খ্যাতি থেকে তিনি সর্বদা নিজেকে দূরে রাখতেন। গুটিয়ে রাখতেন নিজেকে। মনে-প্রাণে তিনি এটাকে ঘৃণা করতেন। এজন্য এড়িয়ে চলতেন সম্ভাব্য খ্যাতি ও প্রাচারণার পথগুলো।


হযরত আলকামা!

কী অসাধারণ ছিল তার শিক্ষা ও জ্ঞানের বহর!

কী অসাধারণ ছিল তার মানসিক ও নৈতিম শক্তি।

সন্দেহ নেই, এমন ব্যক্তিই তো আল্লাহর পছন্দ। পছন্দ রাসূলেরও (সা)। প্রকৃত অর্থে, আল্লাহ এবং রাসূলকে (সা) ভালবেসে সাহসের পর্বতে সুদৃঢ়ভাবে অবিচল থাকতে পারলেই কেবল অর্জন করা যায় হযরত আলকামা (রহ) মত সফল জীবন।



ঈমান

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে
ঈমান


ইবন ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি।

১. আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা।

২. সালাত কায়িম করা।

৩. যাকাত আদায় করা।

৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং

৫. রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা।


(সহীহ বুখারী , অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নম্বরঃ ৮)


ঈমান



প্রকৃত সে-ই মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।

বুধবার, এপ্রিল ২৭, ২০২২ 0
বার দেখা হয়েছে
সে-ই মুসলিম, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।


 আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ এবং সে-ই প্রকৃত মুহাজির, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা যে ত্যাগ করে।


(সহীহ বুখারী , অধ্যায়ঃ ২, হাদিস নম্বরঃ ১০)।



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png