শিরোনাম
Loading latest headlines...

রবিবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৯

মুসলিম উম্মার আচার-আচরণে সততা ও সত্যবাদিতার প্রতিষ্ঠা ও মিথ্যা পরিত্যাগ

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে



পাঠ সংক্ষেপ 
খুতবার উদ্দেশ্য : ১-মুসলিম উম্মার আচার-আচরণে সততা ও সত্যবাদিতার প্রতিষ্ঠা, ২-মিথ্যা থেকে হুঁশিয়ার করা, ৩-মানুষের মাঝে আস্থা বীজবপন করা।
প্রথম খুৎবা
الْحَمْدُ لِلَّهِ نَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا، مِنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، أَرْسَلَهُ بِالْحَقِّ بَشِيرًا وَنَذِيرًا بَيْنَ يَدَيِ السَّاعَةِ، مَنْ يُطِعِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ رَشَدَ، وَمَنْ يَعْصِهِمَا فَإِنَّهُ لَا يَضُرُّ إِلَّا نَفْسَهُ وَلَا يَضُرُّ اللهَ شَيْئًا، اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ، أَمَّا بَعْدُ :

মুহতারাম মুসল্লীবৃন্দ! সত্য কথা বলা ও সৎভাবে জীবনযাপন করা মহৎ মানুষের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা কথা বলা ও অসৎ জীবন যাপন করা অসৎ মানুষের লক্ষণ। সত্যবাদিতা হলো ঈমানের পূর্ণতাদানকারী একটি মহৎ গুণ। ইসলামের দাবি হলো সততানির্ভর জীবন, যে জীবনে থাকে না কোনো অসত্যের চিহ্ন। সত্যবাদিতা নির্ভেজাল ও নির্মল ঈমানের জন্ম দেয় এবং সত্যবাদী ব্যক্তিরাই প্রকৃত অর্থে দুনিয়া-আখিরাতে সফলকাম হয়ে থাকে। সত্যবাদী-সত্যাশ্রয়ী ব্যক্তিরাই আল্লাহর ওপর যথোপযুক্ত তাওয়াক্কুল ও ভরসা রাখে দুর্যোগ ও দুর্ভোগের সময় ধৈর্যের পরিচয় দেয় স্বচ্ছলতার সময় ঐকান্তিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। সত্যবাদীরাই কল্যাণকর কাজে পরস্পরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং অকল্যাণকর কাজে তারা হয় প্রতিবাদী-বিদ্রোহী। এ সব কারণেই আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া ও আল্লাহ-ভীতি ও সত্যবাদী লোকদের সংস্রব অবলম্বন করার জোর নির্দেশ দিয়েছেন।
 ইরশাদ হয়েছে :
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ}
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক’ (সূরা আত-তাওবা : ১১৯)।

সাদেকীন অর্থ যারা বোধ ও বিশ্বাসে সত্যবাদী, কাজে-কর্মে সত্যবাদী এবং লেনদেন, বেচাকেনাসহ সকল ক্ষেত্রে সত্যাশ্রয়ী। মুসলিম উম্মাহর সকল সদস্যের জন্য এটা আবশ্যক যে তারা জীবন চর্চার প্রতিটি ক্ষেত্রে সত্যকে ফুটিয়ে তুলবে। সত্যের চর্চা ও অনুশীলকে সার্বক্ষণিক বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে। সত্যবাদিতা ধরে রাখতে গিয়ে যদি আর্থিক ক্ষতিও সহ্য করতে হয় তবু তারা সত্যকে ধরে রাখবে। আর এভাবেই তরা সক্ষম হবে আল্লাহর পক্ষ হতে অফুরান বরকত লাভের। যেমন হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
(الْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا، أَوْ قَالَ حَتَّى يَتَفَرَّقَا، فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا، بُورِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا، وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا، مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا)

‘ ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই (ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়া নাকচ করার) ইখতিয়ার রাখে যতক্ষণ না তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারা যদি সত্য বলে এবং ক্রটি-বিচ্যুতি বলে দেয়, তাহলে উভয়ের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত দেয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং পণ্যের দোষ লুকিয়ে রাখে তাহলে তাদের বেচাকেনার বরকত ধ্বংস করে দেয়া হয়’ (মুসলিম)।

সততা ও সত্যবাদিতা সম্পর্কে কুরআন মাজীদে স্পষ্ট বক্তব্য এসেছে। সত্যবাদী ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে :
{هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا}

‘ আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকার করবে। তাদের জন্য জান্নাতে রয়েছে যার তলদেশে প্রবাহিত হবে নদী। তারা তাতেই থাকবে চিরকাল’ (সূরা আল মায়েদা : ১১৯)।

অর্থাৎ পার্থিব জগতে তাদের সততা পারলৌকিক জীবনে উপকারী হবে। বিচার দিবসে আল্লাহর ভয়াবহ শাস্তি থেকে সত্যবাদিতাই তাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে। ইরশাদ হয়েছে :

{وَبَشِّرِ الَّذِينَ آَمَنُوا أَنَّ لَهُمْ قَدَمَ صِدْقٍ عِنْدَ رَبِّهِمْ}
‘এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ প্রদান কর যে, তাদের রবের নিকট তাদের জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদা’ (ইউনুস : ২)।

যারা সত্যকে ধারণ করে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নেয় তাদেরকে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
{وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ أُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ}
‘আর যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই হলো মুত্তাকী’ (যুমার : ৩৩)।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, শুধু নিজে নিজে সত্যবাদী হলেই চলবে না বরং যারা সত্যবাদী তাদেরকে সত্যবাদী বলে সত্যায়ন করাও জরুরী। কারণ অনেকেই অহংকারবশত বা হিংসার বশবর্তী হয়ে সত্যবাদীকে সত্যায়ন করতে অস্বীকার করে।

সত্যবাদিতা এমন মহৎ গুণ যে আল্লাহ তাআলা নিজেই এ গুণে গুণান্বিত বলে উলে¬খ করেছেন। সত্যবাদিতা হলো আল্লাহর গুণ। ইরশাদ হয়েছে :
{قُلْ صَدَقَ اللَّهُ}
‘বল, ‘আল্লাহ সত্য বলেছেন’ (আল ইমরান: ৯৫)।

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন :
{وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا}
‘আর কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী কে’? (নিসা : ৮৭)।

আমাদের একটি ভুল ধারণা এই যে সত্যবাদিতা শুধু কথার জগতে সীমিত। পক্ষান্তরে সত্যবাদিতার ক্ষেত্র সুদূরবিস্তৃত। অন্যভাবে বলতে গেলে বলা যায়, সত্যবাদিতা মৌলিকভাবে তিন প্রকার-

এক. কথার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা। অথাৎ মানুষের জিহ্বা সত্যবাদিতা শেকড়ে সুদৃঢ়ভাবে স্থির থাকবে যেভাবে স্থির থাকে ধানের শীষ ধান গাছে।

দুই. কর্মের ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা : অর্থাৎ ব্যক্তির আমল ও কর্ম স্থির থাকবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এঁকে দেয়া সীমানার ভেতর যেমন স্থির থাকে মাথা শরীরের ওপরের অংশে।

তিন. সার্বিক অবস্থার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা। অর্থাৎ অন্তরের আমল ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল ইখলাসের ভিত্তিমূলে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে যাওয়া। এই তিন প্রকারের সত্যবাদিতায় নিজকে দাঁড় করাতে পারলেই বলা সঙ্গত হবে যে কোনো ব্যক্তি সিদ্ক বা সততা-সত্যবাদিতা নিয়ে এসেছে বা সত্যবাদিতার গুণে যথার্থভাবে গুণান্বিত হয়েছে। আর এই তিন প্রকারের সত্যবাদিতায় ব্যক্তি যতই অগ্রসর হবে তার সিদ্দীকিয়াতের মাত্রাও ততো বেড়ে যাবে। আবু বকর সিদ্দীক রাযি. এর সিদ্দীকিয়াতের সর্বোচ্চ শেখরে অধিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে এই তিন প্রকারের সত্যবাদিতায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের উৎকর্ষ সাধনই কারণ ছিল। এ তিন প্রকারের সত্যবাদিতার সারমর্ম হলো নিম্নরূপ-

কথার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতার অর্থ- সকল প্রকার মিথ্যা থেকে নিজের যবানকে হিফাযত করা। সদাসর্বাদ সত্য বলা এবং এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা কেননা মানুষ জিহ্বাকে ব্যবহার করে কি কি কথা বলেছে তা কিয়ামতের দিন আল¬াহ তাআলা স্বয়ং জিহ্বাকেই জিজ্ঞাসা করবেন। ইরশাদ হয়েছে :
{يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ}
‘যেদিন তাদের জিহ্বাগুলো, তাদের হাতগুলো ও তাদের পাগুলো তারা যা করত, সে ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে (সূরা আন-নূর : ২৪)।

কর্মে সত্যবাদিতা হলো ব্যক্তির অন্তর ও বহির একরকম হওয়া। ভেতরে একরকম বাইরে অন্যরকম এরূপ না হওয়া। আবদুল ওয়াহেদ ইবনে যায়েদ আল বসরী, হাসান আল বসরী রহ. সম্পর্কে বলেন, হাসান আল বসরী যখন কোনো কাজের নির্দেশ দিতেন তিনি অন্যদের তুলনায় সে কাজে অধিক আমলকারী থাকতেন। আর যদি তিনি কোনো বিষয় থেকে কাউকে বারণ করতেন তবে তিনি অন্যদের তুলনায় সে বিষয়ে অধিক দূরত্বে অবস্থান করতেন। অন্তর ও বহির সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে হাসান আল বসরীর মতো অন্য কোনো মানুষকে আমি দেখিনি’।

সার্বিক অবস্থার ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা হলো সর্বোচ্চ পর্যায়ের সত্যবাদিতা। যেমন ইখলাস ও ভয়, তাওবা ও আশা, যুহদ, আল্লাহ ও তার রাসূলের মহব্বত, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ইত্যাদির ক্ষেত্রে সত্যবাদিতা। এ কারণে ‘আ‘মালুল কুলূব’ বা অন্তরাশ্রিত সকল আমলের মূল হলো সত্যবাদিতা। মুমিন যখন এসব অবস্থায় সত্যবাদী হয় তখন সে উঁচু পর্যায়ে চলে যায়। আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা বেড়ে যায়। 
আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে :
{لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ}

‘ ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে বরং ভালো কাজ হলো যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী’ (সূরা আল বাকারা:১৭৭)।
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ
 
দ্বিতীয় খুৎবা
الْحْمْدُ لِلَّهِ الْمَلِكِ الْقُدُّوْسِ السَّلَامِ، رَفَعَ مَنَارَ الْإِسْلَامِ، وَعَمَّ خَلْقَهُ بِالنِّعَمِ الْعِظَامِ، أَحْمَدُ رَبِّيْ وَأَشْكُرُهُ، وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ وَأَسْتَغْفِرُهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ ذُوْ الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا وَسَيِّدَنَا مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى عَبْدِكَ وَرَسُوْلِكَ مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ ، أَمَّا بَعْدُ: فَاتَّقُوا اللهَ تَعَالَى وَأَطِيْعُوْهُ، وَتَقَرَّبُوْا إِلَيْهِ بِمَا يُرْضِيْهِ.

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! ইসলাম সত্যবাদিতা ও সত্যবাদীদের সম্মান করে, মর্যাদা দেয়। আর যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকে ঘৃণা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নেয়। মিথ্যা ভয়ঙ্কর খিয়ানতের আলামত নিফাক ও কপটতার আলামত। হাদীসে এসেছে :
(آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ، إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ)
‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- সে কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, তার কাছে কিছু আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে’ (বুখারী)।

বরং মিথ্যা ইসলামের সাথে কখনো মিলে না, মিলতে পারে না। মুসলমানের প্রকৃতিতে কখনো মিথ্যাচারিতা থাকতে পারে না। খেয়ানত করার প্রবণতা থাকতে পারে না। ঈমান ও পৌরুষত্ব যতক্ষণ জীবিত থাকে, যতক্ষণ একজন ব্যক্তি দীনের ব্যাপারে, নিজের ইজ্জত-সম্মানের ব্যাপারে সজাগ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মিথ্যার কোনো আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সে যেতে পারে না।

মুহতারাম মুসল্লীবৃন্দ! দুঃখের বিষয় হলো আমরা যদি আজ মুসলমানদের অবস্থার দিকে তাকিয়ে দেখি, তা হলে এ ব্যাপারে চরম উদাসিনতা লক্ষ্য করতে পাই। এর কারণ অধিকাংশ মুসলমানের ঈমানী দুর্বলতা যা উত্তর-আধুনিকতার বর্তমান সময়ে প্রকট আকার ধারণ করেছে। আজ মুসলমানদের মধ্যে পাপ-গুনাহ ছড়িয়ে পড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। মানুষের জীবনে দুনিয়া-প্রীতি বেড়ে গিয়েছে মারাত্মক আকারে। যার কারণে মানুষের কথার জগৎ থেকে সত্যবাদিতা বিদায় হয়েছে। কাজের জগৎ থেকে সত্যবাদিতা বিদায় হয়েছে। যার কারণে এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে যার প্রতি শতভাগ আস্থা রাখা সম্ভব। কেননা সত্যবাদিতাই হলো আস্থার কারণ। হাদীসে এসেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
(فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ، وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ)
‘নিশ্চয় সত্যবাদিতা হলো আস্থার কারণ, আর মিথ্যাবাদিতা হলো সংশয় সন্দেহের কারণ’ (তিরমিযী)।

বর্তমানে প্রচলিত মিথ্যার আকার প্রকৃতি
এক. ছোট বাচ্চাদের সাথে মাতা-পিতার মিথ্যাচারিতা। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো বাচ্চাদেরকে সত্যবাদিতার পবিত্র বলয়ে মানুষ করা। সকল প্রকার মিথ্যা থেকে তাদেরকে দূরে রাখা যাতে বাচ্চারা কথায় ও কাজে সত্যাশ্রিত হয়ে, স্পষ্টবাদী হয়ে, নির্ভীক হয়ে বড় হয়ে ওঠে। আবদুল্লাহ ইবনে আমের রাযি. বর্ণনা করেন, ‘আমার মা আমাকে একদিন ডাকলেন। আমি তখন ছোট। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আমাদের মাঝে বসা। মা আমাকে বললেন,‘এসো, আমি তোমাকে একটি জিনিস দেব। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,‘তুমি ওকে কি দিতে চেয়েছ’? মা বললেন, ‘আমি ওকে খেজুর দিতে চেয়েছি’। তিনি বললেন,‘তুমি যদি ওকে কিছু না দিতে, তাহলে তোমার আমল-নামায় একটি মিথ্যা লিখা হত’। 

আবু হুরাইরা রাযি. বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
(مَنْ قَالَ لِصَبِيٍّ: تَعَالَ هَاكَ ثُمَّ لَمْ يُعْطِهِ، فَهِيَ كِذْبَةٌ)
‘যে ব্যক্তি তার বাচ্চাকে বলল, এসো, নাও। এরপর সে তাকে কিছু দিল না, তবে তা হবে মিথ্যা’ (আহমদ, হাসান)।

আমাদের উচিত এই পূত-পবিত্র নববী আদর্শের ওপর বাচ্ছাদেরকে মানুষ করা। ইসলামী ভাবধারা ও সংস্কৃতি অনুযায়ী বাচ্চাদেরকে গড়ে তোলা।

দুই. কথায় ও কাজে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া। এরূপ করা নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ, বড় অন্যায়। শুধু তাই নয় বরং এরূপ ব্যক্তি আল্লাহর অভিসম্পাদের উপযোগী। ইরশাদ হয়েছে :
{فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ}
‘মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লা’নত করি’ (সূরা আলে ইমরান:৬১)।
 
আনাস রাযি. থেকে এক বর্ণনায় এসেছে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
(آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ، إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ)

‘মুনাফিকের আলামত তিনটি কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে, আমানত রাখলে খিয়ানত করে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

তিন : ওয়াদা-খলাপি প্রসার পাওয়া। উপরোল্লিখিত হাদীসে ওয়াদা-খেলাপির কথা বলা হয়েছে। আর এ ওয়াদা-খেলাপি বর্তমানে প্রকাশ্য একটি ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এমনকি এমন অনেকেই রয়েছেন যারা ওয়াদা-খেলাপিতে খুবই প্রসিদ্ধ। তাদের নাম আসলেই বলে দেয়া যায় যে তারা ওয়াদাখেলাপ করে অভ্যস্ত। ওয়াদা-খেলাপের কিছু আকার প্রকৃতি নিম্নরূপ-

ওজর ছাড়াই ওয়াদাকৃত কোনো স্থানে বা অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়া। ওয়াদাকৃত সময়ে না এসে দেরি করে আসা। উদাহরণত কোনো ব্যক্তি আপনাকে ওয়াদা দিল যে তিনি আটটার সময় আসবেন, পরে দেখা গেল তিনি আসলেন নয়টার সময়। আর এসে এই ওজর পেশ করলেন যে আসার পথে আমি একটি দোকানে ঢুকে কিছু কেনাকাটি করেছি। আর এটা খুবই দুঃখজনক যে যাদের বাহ্যিক বেশভূষা থেকে তাকওয়া পরহেযগার বলে বিশ্বাস হয়, তারও ওয়াদা ভঙ্গে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। এটা সত্যিই আফসোস ও পরিতাপের বিষয়।

চার. আমানতের খিয়ানত। বর্তমানে এমন অনেককেই দেখা যায় যারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথার্থরূপে পালন করে না। যেমন অফিসের কাজকর্মে ফাঁকি দেয়া। দেরি করে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া। কর্মে ক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়ার পর আলাপচারিত, ফোন করা ইত্যাদিতে সময় কাটিয়ে দেয়া। অসুস্থ না হয়েও অসুস্থতার ছুটি কাটানো। অথচ এমন ব্যক্তিরা মাস শেষে বেতন-ভাতা ঠিকই হাসিল করে নেয়। কর্মক্ষেত্রে এভাবে মিথ্যাচারিতার আশ্রয়ে পরিশেষে নিজের পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব করে বুঝে নেয়ার কোনো অধিকার ইসলামী শরীয়ত কাউকে দেয়নি।

পাঁচ. বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া। যেমন বিক্রেতা তার পণ্যের কোনো দোষ গোপন করে পণ্যটি বিক্রি করে দিল আর এই বলে ওজর পেশ করল যে এটা বিক্রেতার ওপর অর্পিত দায়িত্ব। অথচ বিক্রেতার উদ্দেশ্য হলো তার পণ্যটি ভালো মূল্যে বিক্রি করা। বিক্রেতা এটা ভুলে যায় যে পণ্যের দোষত্র“টি গোপন করার অর্থ হলো বেচাকেনার বরকত চলে যাওয়া। হাকীম ইবনে হিযাম রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
(الْبَيِّعَانِ بِالْخِيَارِ مَا لَمْ يَتَفَرَّقَا، أَوْ قَالَ حَتَّى يَتَفَرَّقَا، فَإِنْ صَدَقَا وَبَيَّنَا، بُورِكَ لَهُمَا فِي بَيْعِهِمَا، وَإِنْ كَتَمَا وَكَذَبَا، مُحِقَتْ بَرَكَةُ بَيْعِهِمَا)
‘ ক্রেতা-বিক্রেতার লেনদেন নাকচ করার অধিকার রয়েছে যতক্ষণ না তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যদি তারা সত্য বলে এবং কোনো কিছু গোপন না রাখে তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ে বরকত দেয়া হয়। আর যদি তারা গোপন করে এবং মিথ্যা বলে তবে তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের বরকত ধ্বংস করে দেয়া হয়’ (বুখারী ও মুসলিম)।

ছয়. সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্য ও প্রয়োজনগ্রস্ততার দাবি করা। আবু হুরায়রা রযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا، فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا.)
‘ যে ব্যক্তি সম্পদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সাওয়াল করল সে যেন একটি তপ্ত অঙ্গার সাওয়াল করল’ (মুসলিম)।

সাত. বিবাহের পূর্বে বর ও কনে উভয়েই নিজ নিজ দোষ গোপন করা। এ দোষ চাই দৈহিক হোক অথবা চারিত্রিক। বরং এর বিপরীতের কেবল ভালো দিকগুলো প্রকাশ করা। আর তা অতিরঞ্জিত আকারে বাড়িয়ে বলা। এ বিষয়টি বিবাহের বরকতকে নস্যাৎ করে দেয়।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আমাদের যুগের ব্যবসায়ীরা অধিক পরিমাণে মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত। তারা ক্রেতাদেরকে ফাঁদে ফেলার জন্য নানা ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেয়। পণ্যের ক্ষেত্রে, দামের ক্ষেত্রে তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। এর চেয়েও মারাত্মক হলো, অনেক ব্যবসায়ী মিথ্যা কসম খেতেও বিন্দুমাত্র ভায় পায় না। অথচ নবী কারীম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিথ্যা কসমকে কবীরা গুনাহর মধ্যে শামিল করেছেন।

হাদীসে এসেছে, ‘কবীরা গুনাহ হলো- আল্লাহর সাথে শরীক করা, মাতা-পিতাকে কষ্ট দেয়া। মানুষ হত্যা করা। কোনো জিনিসকে কেন্দ্র করে মিথ্যা কসম খাওয়া’ (বুখারী)।

ইবনে বাত্তাল রা. বলেন: ‘ইয়ামিনে গামুস এমন কসম যা কোনো বস্তুকে কেন্দ্র করে করা হয়, যদিও সে জানে যে সে মিথ্যা বলছে। আর এ ধরনের কসম খাওয়ার উদ্দেশ্য হলো কাউকে রাজি করানো অথব কানো সম্পদ হাতিয়ে নেয়া। এটা এমন কসম যার কোনো কাফফারা হয় না। উপরšু— যারা পণ্য চালিয়ে দেয়ার জন্য মিথ্যা কসম খায় তাদের ব্যবসায় বরকত হয় না। কেননা বরকত তো ঠিক তখনই হয় যখন ক্রেতা-বিক্রেতা সত্যবাদিতার পরিচয় দেয়, পণ্যে দোষত্র“টি গোপন না করে সব কিছু উন্মুক্ত করে দিয়ে তবেই বিক্রি করে।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আমাদের মধ্যে যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত তাদের উচিত হবে যাদের সাথে তারা ওঠা-বসা করে, লেনদেন করে, তাদের সবার সাথে সত্যবাদিতা বজায় রাখা, সততা বজায় রাখা। তারা যদি এরূপ করতে পারে তবে তাদের রিযক বেড়ে যাবে। ইরশাদ হয়েছে :
(وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آَمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ)
‘ আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের ওপর খুলে দিতাম কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম’ (সূরা আল আরাফ:৯৬)।

আর আল্লাহ তাআলার তাকওয়া অবলম্বন আল্লাহর পক্ষ হতে রিযক লাভের একটি নিশ্চিত মাধ্যম। ইরশাদ হয়েছে:
{وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا. وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ}
‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না’ (সূরা আত-তালাক:২-৩)।

সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা একটি মারাত্মক অপরাধ। মিথ্যা সাক্ষ্য একটি ঘৃণ্য বিষয়। আল্লাহ তাআলা এ জাতীয় কাজ ঘৃণা করেন। ইরশাদ হয়েছে:
{فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ}
‘সুতরাং মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর’ (সূরা আল হাজ্জ:৩০)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :
{وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آَثِمٌ قَلْبُهُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ}
‘আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না এবং যে কেউ তা গোপন করে, অবশ্যই তার অন্তর পাপী। আর তোমরা যা আমল কর, অল্লাহ সে ব্যাপারে সবিশেষ অবহিত’ (সূরা আল বাকারা: ২৮৩)।

সত্যবাদিতার ফায়দা
১-জান্নাতে লাভে ধন্য হওয়া: ‘জান্নাতের আমল কী’? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বলেন,‘সত্যবাদিতা’(আহমদ)। আল কুরআন অনুযায়ী কিয়ামতের দিন সত্যবাদিতাই মানুষের উপকারে আসবে, মানুষকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে নেবে। 
আল্লাহ তাআলা বলেন :
{هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ}
‘ এটা সেই দিন যেদিন সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে। তাদের জন্য আছে জান্নাতসমূহ যার নীচে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ। সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। অল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। এটা মহাসাফল্য। (সূরা আল মায়েদা:১১৯)।

২-কল্যানের দরজা উন্মুক্ত হওয়া এবং আল্লাহর পক্ষ হতে তাওফীক আসা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, কা‘ব ইবনে মালেক রাযি.- তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা তিনজনের একজন- কে উদ্দেশ্য করে বলেন:.
أَمَّا هَذَا فَقَدْ صَدَقَ
‘তবে এ ব্যক্তি, সে নিশ্চয় সত্য বলেছে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

৩-ধ্বংস থেকে বেঁচে যাওয়া ও সমস্যা-সঙ্কট দূরীভূত হওয়া। যে তিন ব্যক্তির গুহার মুখ পাথর দ্বারা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাদের বিষয়ে বর্ণিত হাদীসে এসেছে:
(لَا يُنْجِيكُمْ إِلَّا الصِّدْقُ فَليَدْعُ كُلُّ رَجُلٍ مِنْكُمْ بِمَا يَعْلَمُ أَنَّهُ قَدْ صَدَقَ فِيهِ)
‘ তোমাদেরকে মুক্তি দেবে না তবে তোমাদের সততা। তাই তোমাদের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তি সে যে বিষয়ে সত্যবাদি ছিল বলে জানে তা উল্লে¬খ করে যেন দুআ করে’ (বুখারী)।

৪-অন্তরে শুদ্ধতা আসা। কেননা যে ব্যক্তি বাইরের কাজে সত্যবাদী সে অন্তরবিষয়ক আমলেও সত্যবাদী।

৫-সত্যবাদিতা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কারণ।

 ইরশাদ হয়েছে :
{هَذَا يَوْمُ يَنْفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ}

‘এটা সেই দিন যেদনি সত্যবাদীগণকে তাদের সততা উপকার করবে’ (সূলা আল-মায়েদা:১১৯)।

৬-সত্যবাদিতা আস্থা ও প্রশান্তির কারণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
(فَإِنَّ الصِّدْقَ طُمَأْنِينَةٌ، وَإِنَّ الْكَذِبَ رِيبَةٌ)

‘ নিশ্চয় সত্যবাদিতা হলো আস্থার কারণ, আর মিথ্যাবাদিতা হলো সংশয় সন্দেহের কারণ’ (তিরমিযী)।

৭- ফেতনা সত্যবাদীর কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

৮-সত্যবাদিতা সকল কল্যাণের মূল। আর মিথ্যাচার সকল গোমরাহীর মূল।

৯-মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য হতে সত্যবাদীর নিষ্কৃতি। কেননা মিথ্যা বলা, হাদীস অনুযায়ী, মুনাফিকের একটি আলামত।

১০ সত্যবাদিতা সঠিক দূরদৃষ্টি অর্জনে সাহায্য করে।

তাই ভাইয়েরা আমার! আসুন আমরা সকল ক্ষেত্রে সত্যবাদী হই। সততার পরিচয় দেই। সত্যবাদীদরে সঙ্গ অবলম্বন করি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন।
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সাদিকীনদের দলভুক্ত করুন। কথায়-কাজে-আচরণে আমাদের সবাইকে সততার পরিচয় দেয়ার তাওফীক দান করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যাশ্রয়ী হয়ে জীবনযাপনের তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে মিথ্যা থেকে হিফাযত করুন। কপটতা ও মুনাফিকী থেকে হিফাযত করুন। আমীন ।
عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ. 



বিদায় হজ্জের ভাষণ

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
বিদায় হজ্জের ভাষণ ১০ম হিজরিতে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হজ্জ পালনকালে আরাফাতের ময়দানে ইসলাম ধর্মের শেষ রাসুল মুহাম্মাদ (স:) কর্তৃক প্রদত্ত খুৎবা বা ভাষণ। হজ্জ্বের দ্বিতীয় দিনে আরাফাতের মাঠে অবস্থানকালে অনুচ্চ জাবাল-এ-রাহমাত টিলার শীর্ষে দাঁড়িয়ে উপস্থিত সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে তিনি এই ভাষণ দিয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (স:) জীবিতকালে এটা শেষ ভাষণ ছিলো, তাই সচরাচর এটিকে বিদায় খুৎবা বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।[১] ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে এই ভাষণে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিলো।
 

পরিচ্ছেদসমূহ
  •     সংরক্ষণ
  •     তাৎপর্য
  •     হাদিস সাহিত্যে ভাষণের বর্ণনা
  •     তথ্যসূত্র
  •     বহিঃসংযোগ

সংরক্ষণ
তাৎপর্যসম্পাদনা

ইসলাম ধর্ম যে ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে পূর্ণতা পেয়েছিলো, তারই চূড়ান্ত ঘোষণা ছিলো মুহাম্মাদ (স:) এর এই ভাষণ। এ কারণে সেদিন ভাষণ প্রদানকালে কুরআনের সূরা মায়িদাহ'র ৩ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিলো[৩] : “আজ আমি তোমাদের ধর্মকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকারীকে সুসম্পন্ন করলাম, আর ইসলামকে তোমাদের ধর্ম হিসেবে মনোনীত করলাম।     ”

এই ভাষণে ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছিলো। মুসলিম জাতির সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে মুহাম্মদ (স:) চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই ঐতিহাসিক ভাষণ কেবল উপাসনামূলক অনুশাসন ছিলো না, বরং মানবসমাজের জন্য করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভাষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশও এতে ছিলো। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তার সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি, মানবজাতির ঐক্য, আধ্যাত্মিক ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক সাম্য ইত্যাদি সমাজ বিনির্মাণের অন্যতম সব বিষয়ই এই ভাষণের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এই ভাষণে তাকওয়া বা দায়িত্বনিষ্ঠতার কথা গুরুত্ব দেয়া হয়েছিলো এবং পাপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল্লাহ ও মানবসম্প্রদায়ের প্রতি দায়িত্ব বা হক্কুল ইবাদের মধ্যে সীমারেখা টেনে দেয়া হয়েছিলো। মুহাম্মদ [স.] এই ভাষণে সমাজ ও রাষ্ট্রে অরাজকতা, বিদ্রোহ এবং কুপরামর্শ প্রদানকারী শয়তানদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে বলেছেন। এই ভাষণে বিভিন্ন ধরনের সুদপ্রথা রহিত করে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিলো। নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারকে নিশ্চিত করার জন্য মুসলমানদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো এই ভাষণে। মানুষে মানুষে আত্মীয়তার বন্ধন, বিশেষ করে রক্তের সম্পর্কের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সামাজিক কুসংস্কার থেকে মানুষের মুক্তি লাভের ওপর জোর দেয়া হয়েছিলো। মুহাম্মদ [স.]-এর এই ঐতিহাসিক ভাষণে স্বর্গ-মর্তের সকল কিছুর ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা হয়েছিলো এবং মানুষকে এসবকিছুর আমানতদার হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। আল্লাহর মালিকানায় সবার অধিকার স্বীকৃত বলে উত্তরাধিকার আইনের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছিলো। আমানতের খেয়ানতকারীর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছিলো। মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো। সাম্য, স্বাধীনতা, ন্যায়পরায়ণতা, ভ্রাতৃত্ব এবং বদান্যতা ও মানবতার পরম ধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিলো।[৪]
হাদিস সাহিত্যে ভাষণের বর্ণনাসম্পাদনা


সহিহ মুসলিম[৫], তিরমিজি[৬], সুনান আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ[৭], সুনান ইবনে মাজাহ[৮] গ্রন্থে উল্লেখিত যাবির ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত বিদায় হজ্বের ভাষণের নিম্নোক্ত দীর্ঘ বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়াও ইবনে ইসহাক ও আল জাহিজও প্রায় অপরিবর্তিতভাবে একই বর্ণনা প্রদান করেছেন।
উপস্থিত জনমণ্ডলী! আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। হয়তো আমি আর কখনো এখানে তোমাদের সঙ্গে একত্রিত হতে পারব না।
 
হে জনমণ্ডলী! আজকের এই দিন (জুমার দিন), এই মাস (জিলহজ মাস) ও এই শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র; তোমাদের জানমাল, ইজ্জত-আবরু, মান-সম্মান কিয়ামত পর্যন্ত এমনই পবিত্র। কারো কাছে যদি কোনো আমানত রক্ষিত থাকে, তাহলে সে যেন তা আমানতকারীর কাছে পৌঁছে দেয়। আজ থেকে সব ধরনের সুদ রহিত করা হলো। তোমাদের কেবল মূলধনের ওপর অধিকার রইল। তোমরা অন্যের ওপর অত্যাচার করবে না, নিজেরাও অত্যাচারিত হবে না। সর্বপ্রথম আমি হজরত আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সুদ রহিত করছি। অন্ধকার যুগের সব কৌলীন্য বিলুপ্ত করা হলো। শুধু কাবাঘরের তত্ত্বাবধান ও হাজিদের পানি পান করানো ছাড়া। আজকের পর তোমাদের ভূখণ্ডে শয়তানের উপাসনার ব্যাপারে সে নিরাশ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু ব্যাপার, যেগুলোকে তোমরা বড় পাপ মনেই করো না। তার অনুসরণ করলে শয়তান খুশি হবে। জনমণ্ডলী! তোমাদের নিজ স্ত্রীদের ওপর যেমন তোমাদের অধিকার রয়েছে, তদ্রূপ তাদেরও তোমাদের ওপর অধিকার রয়েছে। স্ত্রীদের ওপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে, তারা যেন নিজ স্বামী ছাড়া পরপুরুষের সঙ্গে ভোগে লিপ্ত না হয়। যদি তারা তা করে তাহলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের তাদের প্রতি কঠোরতা করার অনুমতি দিয়েছেন। এমতাবস্থায় তোমরা তাদের শয্যা পৃথক করে দেবে। এবং মৃদু প্রহার করবে। তাতে তারা বিরত হলে নিয়মমাফিক তাদের ভরণপোষণের প্রতি লক্ষ রাখবে। স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। তারা তোমাদের সাহায্যকারিণী। তোমরা তাদের আল্লাহর নির্ধারিত কালিমা বাক্যের (ইজাব-কবুল) মাধ্যমে নিজেদের জন্য হালাল করেছো। সুতরাং তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো। জনমণ্ডলী! সব মুমিন পরস্পর ভাই ভাই। কারো জন্য অন্যের সম্পদ বৈধ নয়। তবে যদি কেউ স্বেচ্ছায় কাউকে কিছু দেয়, তাহলে সেটা স্বতন্ত্র ব্যাপার। আমার পর তোমরা কুফরিতে ফিরে যেও না। পরস্পর খুনাখুনি করো না। আমি তোমাদের মাঝে এমন দুটি জিনিস রেখে গেলাম, তোমরা তা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে কখনো বিভ্রান্ত হবে না। তা হচ্ছে_আল্লাহর কিতাব (পবিত্র কোরআন) ও তাঁর রাসুলের হাদিস। জনমণ্ডলী! তোমাদের প্রভু একজন। তোমাদের পিতাও একজন। তোমরা সবাই আদম থেকে আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। তোমাদের মাঝে যারা সর্বাধিক মুত্তাকি, খোদাভীরু তারাই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাবান। তাকওয়া ছাড়া কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। জনমণ্ডলী : আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। উত্তরাধিকারীর জন্য কোনো ওসিয়ত প্রযোজ্য নয়। অন্যদের জন্য এক-তৃতীয়াংশের অধিক ওসিয়ত করা বৈধ নয়। আমাদের কিয়ামত দিবসে জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমাদেরও জিজ্ঞাসা করা হবে। তখন তোমরা আমার ব্যাপারে কী বলবে? আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌছে দিয়েছি? উপস্থিত সাহাবায়েকেরাম উত্তর দিলেন, আমরা সাক্ষ্য দেব যে আপনি আপনার দায়িত্ব পৌঁছে দিয়েছেন। হিত কামনা করেছেন। অতঃপর রাসুল (সা.) আকাশের দিকে হাত তুলে তিনবার বললেন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন। তারপর বললেন, তোমরা এখানে যারা উপস্থিত আছো তারা অনুপস্থিতদের কাছে (কথাগুলো) পৌঁছে দেবে।

সহিহ মুসলিমের বর্ণনাটি নিম্নরূপঃ[৫]
 “হে মানব মন্ডলী!
তোমরা হৃদয়ের কর্ণে ও মনোযোগ সহকারে আমার বক্তব্য শ্রবণ কর। আমি জানিনা, আগামী বছর এ সময়ে, এ- স্থানে, এ-নগরীতে সম্ভবত তোমাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ আর হবে কি না। “হে মানব সকল! সাবধান! সকল প্রকার জাহেলিয়াতকে আমার দুপায়ের নিচে পিষ্ঠ করে যাচ্ছি। নিরাপরাধ মানুষের রক্তপাত চিরতরে হারাম ঘোষিত হল। প্রথমে আমি আমার বংশের পক্ষ থেকে রবিয়া বিন হারেস বিন আবদুল মোত্তালিবের রক্তের দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। সে বনি লাইস গোত্রে দুধ পান করেছে, হুযাইল তাকে হত্যা করেছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে ’সুদ’ কে চির দিনের জন্য হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। আমি আজ আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মোত্তালিবের যাবতীয় সুদের দাবী প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। হে লোক সকল! বল আজ কোন দিন? সকলে বলল “আজ মহান আরাফার দিন, আজ হজ্বের বড় দিন” সাবধান! তোমাদের একের জন্য অপরের রক্ত তার মাল সম্পদ, তার ইজ্জত-সম্মান আজকের দিনের মত, এই হারাম মাসের মত, এ সম্মানিত নগরীর মত পবিত্র আমানত। সাবধান! মানুষের আমানত প্রকৃত মালিকের নিকট পৌঁছে দেবে। হে মানব সকল! নিশ্চয়ই তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ একজন, তোমাদের সকলের পিতা হযরত আদম (আঃ)। আরবের উপর অনারবের এবং অনারবের উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, সাদার উপর কালোর আর কালোর উপর সাদার কোন মর্যাদা নেই। ‘তাকওয়াই’ শুধু পার্থক্য নির্ণয় করবে। হে লোক সকল! পুরুষদেরকে নারী জাতীর উপর নেতৃত্বের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। তবে নারীদের বিষয়ে তোমরা আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় কর। নারীদের উপর যেমন পুরুষদের অধিকার রয়েছে তেমনি পুরুষদের উপর রয়েছে নারীদের অধিকার। তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামিনে গ্রহণ করেছ। তাদের উপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে নারীরা স্বামীর গৃহে ও তার সতীত্বের মধ্যে অন্য কাউকেও শরিক করবেনা, যদি কোন নারী এ ব্যপারে সীমা লংঘন করে, তবে স্বামীদেরকে এ ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে যে, তারা স্ত্রীদের থেকে বিছানা আলাদা করবে ও দৈহিক শাস্তি দেবে, তবে তাদের চেহারায় আঘাত করবে না। আর নারীগণ স্বামী থেকে উত্তম ভরণ পোষণের অধিকার লাভ করবে, তোমরা তাদেরকে উপদেশ দেবে ও তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করবে। হে উপস্থিতি! মুমিনেরা পরষ্পর ভাই আর তারা সকলে মিলে এক অখন্ড মুসলিম ভ্রাতৃ সমাজ। এক ভাইয়ের ধন-সম্পদ তার অনুমতি ব্যতিরেকে ভক্ষণ করবে না। তোমরা একে অপরের উপর জুলুম করবেনা। হে মানুষেরা! শয়তান আজ নিরাশ হয়ে পড়েছে। বড় বড় বিষয়ে সে তোমাদের পথ ভ্রষ্ট করতে সমর্থ হবে না, তবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তোমরা সর্তক থাকবে ও তার অনুসারী হবেনা। তোমরা আল্লাহর বন্দেগী করবে, দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, রমজান মাসের সিয়াম পালন করবে, যাকাত আদায় করবে ও তোমাদের নেতার আদেশ মেনে চলবে, তবেই তোমরা জান্নাত লাভ করবে। সাবধান! তোমাদের গোলাম ও অধীনস্তদের বিষয়ে আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খেতে দেবে। তোমরা যা পরবে তাদেরকেও সেভাবে পরতে দেবে। হে লোক সকল! আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহ তা’আলার পয়গাম পৌছে দিয়েছি? লোকেরা বলল, “হ্যা” তিনি বললেন “আমার বিষয়ে তোমাদের জিঞ্জাসা করা হবে, সে দিন তোমরা কি সাক্ষ্য দিবে, সকলে এক বাক্যে বললেন, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আমাদের নিকট রিসালাতের পয়গাম পৌঁছে দিয়েছেন, উম্মতকে সকল বিষয়ে উপদেশ দিয়েছেন, সমস্ত গোমরাহির আবরণ ছিন্ন করে দিয়েছেন এবং অহীর আমানত পরিপূর্ণ ভাবে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন” অত:পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিজ শাহাদাত আঙ্গুলি আকাশে তুলে তিনবার বললেন, “হে আল্লাহ তা’আলা আপনি সাক্ষী থাকুন, আপনি স্বাক্ষী থাকুন, আপনি সাক্ষী থাকুন”। হে মানুষেরা! আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সম্পদের মিরাস নির্দিষ্টভাবে বন্টন করে দিয়েছেন। তার থেকে কম বেশি করবেনা। সাবধান! সম্পদের তিন ভাগের এক অংশের চেয়ে অতিরিক্ত কোন অসিয়ত বৈধ নয়। সন্তান যার বিছনায় জন্ম গ্রহণ করবে, সে তারই হবে। ব্যভিচারের শাস্তি হচ্ছে প্রস্তরাঘাত। (অর্থাৎ সন্তানের জন্য শর্ত হলো তা বিবাহিত দম্পতির হতে হবে। ব্যভিচারীর সন্তানের অধিকার নেই)। যে সন্তান আপন পিতা ব্যতীত অন্যকে পিতা এবং যে দাস নিজের মালিক ব্যতীত অন্য কাউকে মালিক বলে স্বীকার করে, তাদের উপর আল্লাহ তা’আলা, ফেরেশতাকুল এবং সমগ্র মানব জাতির অভিশাপ এবং তার কোন ফরয ও নফল ইবাদত কবুল হবে না। হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা দুনিয়ার মানুষের বোঝা নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন কিয়ামতে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ না কর। কেননা আমি আল্লাহর আযাবের মোকাবিলায় তোমাদের কোন উপকার করতে পারবো না। তোমাদের দেখেই লোকেরা আমল করে থাকবে। মনে রেখ! সকলকে একদিন আল্লাহ তা’আলার নিকট হাজির হতে হবে। সে দিন তিনি প্রতিটি কর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন। তোমরা আমার পরে গোমরাহিতে লিপ্ত হবে না, পরস্পর হানাহানিতে মেতে উঠবনা। আমি আখেরী নবী, আমার পরে আর কোন নবী আসবেনা। আমার সাথে অহীর পরিসমাপ্তি হতে যাচ্ছে। হে মানুষেরা! আমি নিঃসন্দেহে একজন মানুষ। আমাকেও আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হবে। আমি তোমাদের জন্য দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি যতদিন তোমরা এই দুটি বস্তু আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা নিঃসন্দেহে পথভ্রষ্ট হবে না। একটি আল্লাহর কিতাব ও অপরটি রাসূলের (সঃ) সুন্নাহ। হে মানব মন্ডলী! তোমরা আমির বা নেতার আনুগত্য করো এবং তার কথা শ্রবণ করো যদিও তিনি হন হাবশী ক্রীতদাস। যতদিন পর্যন্ত তিনি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করেন, ততদিন অবশ্যই তাঁর কথা শুনবে, তাঁর নির্দেশ মানবে ও তাঁর প্রতি আনুগত্য করবে। আর যখন তিনি আল্লাহর কিতাবের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করবে, তখন থেকে তাঁর কথাও শুনবেনা এবং তাঁর আনুগত্যও করা যাবেনা। সাবধান! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। জেনে রেখো, তোমাদের পূর্ববর্তীগণ এই বাড়াবড়ির কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। (এ নির্দেশনাটি হচ্ছে অমুসলিমদের ক্ষেত্রে অর্থাৎ কোন বিধর্মীকে বাড়াবাড়ি বা জোরজবস্তি করে ইসলামে দীক্ষা দেয়া যাবে না। তবে একজন মুসলমানকে অবশ্যই পরিপূর্ণ ইসলামী জীন্দেগী অবলম্বন করে জীবন যাপন করতে হবে। এক্ষেত্রে সুবিধাবাদের কোন সুযোগ নেই)। আবার বললেন, আমি কি তোমাদের নিকট আল্লাহর দ্বীন পৌছে দিয়েছি? সকলে বললেন, “নিশ্চয়ই”। হে উপস্থিতগণ! অনুপস্থিতদের নিকট আমার এ পয়গাম পৌছে দেবে। হয়তো তাদের মধ্যে কেউ এ নসিহতের উপর তোমাদের চেয়ে বেশী গুরুত্বের সাথে আমল করবে। “তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক” বিদায়।


তথ্যসূত্রসম্পাদনা
Last Sermon of our Beloved Prophet (saw)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
The Last Sermon of the Prophet Khutbatul Wada
The Farewell Sermon[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
The Farewell Address of the Holy Prophet Muhammad PBUH
Sahih Muslim. Kitab al-Hajj. Hadith 159. Sunnah.com
Al-Tirmidhi Hadith, Number 104
Musnad Ahmad।
"সংরক্ষণাগারভুক্ত অনুলিপি"। ২০১৪-০১-১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২০১৪-০১-১৪।
বহিঃসংযোগ


হালাল রিযিক উপার্জন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
হালাল রিযিক উপার্জন এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা
পাঠ সংক্ষেপ
হালাল রিযক উপার্জন-অন্বেষণ একটি আবশ্যিক বিষয়। কেননা কিয়ামতের দিন মানুষকে তার জায়গা থেকে সামান্যতম সরতে দেয়া হবে না যতক্ষণ না তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তার সম্পদের উৎস ও ব্যয়ের খাত সম্পর্কে। অতএব নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানের জন্য জরুরি হালাল ও পবিত্র উপার্জন বেছে নেয়া, সৎপথে সম্পদ আহরণ করা। হালাল ও বৈধ পথে ব্যয় করা। আর যা কিছু হারাম বা সন্দেহযুক্ত তা থেকে দূরে থাকা। কারণ হারাম উপার্জন ভক্ষণ থেকে যে শরীর বেড়ে ওঠে তার নিশ্চিত ঠিকানা হলো জাহান্নাম।


প্রথম খুৎবা

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَتُوْبُ إِلَيْهِ وَنَعُوْذُ بِاللهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا وَسَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلَا هَادِيَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ، أَمَّا بَعْدُ :

সুপ্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহ তাআলা আপনাকে আমাকে অঢেল নিয়ামতের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছেন। খাদ্য-পানীয়,আলো-বাতাস, জীবন জীবিকা সবই তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন সুচারুরূপে। তিনি আমাদেরকে এতোই দিয়েছেন যা গুণে কখনো শেষ করা যাবে না। এমনকি আমরা যদি তাঁর নেয়ামত-সামগ্রী গণনা করতে যাই তাহলে শেষ তো করতে পারবই না বরং আমরা নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে পড়বো। আর এসব নিয়ামতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত হলো ইসলামের নিয়ামত, হিদায়েতের নিয়ামত, সিরাতুল মুস্তাকীমের পথ দেখানোর নিয়ামত যা মানুষকে রেখে দেয় দুনিয়া ও আখিরাত - উভয় জগতের সুখ-সমৃদ্ধি ও অফুরান্ত কল্যাণের মধ্যখানে।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমাদের মধ্যে কে না চায় দুনিয়া-আখেরাতে উত্তম জীবন পেতে, দুনিয়া-আখিরাতে সৌভাগ্যবান হতে? কে না চায় আপদম্ক্তু-নিষ্কন্টক জীবনযাপন করতে? আমাদের মধ্যে কেউ কি চায় অন্যের গলগ্রহ হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে? তাহলে আসুন এমন একটি বিষয় আমরা মনেপ্রাণে গ্রহণ করি, যাতে রয়েছে দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ। আর তা হলো হালাল রিযক তালাশ করা।

প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলা যা কিছু তাইয়িব বা পবিত্র তা আমাদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন। আর যা কিছু অপবিত্র বা খাবায়েছ তা থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে বলেছেন। পবিত্র বলতে বুঝায় যা নিজে পবিত্র হওয়ার পাশাপাশি হালাল পন্থায় উপার্জিত এবং যাতে শরীর অথবা আকল-বুদ্ধির জন্য নেই কোনো ক্ষতিকর দিক।

প্রিয় ভাইয়েরা! রিযক অন্বেষণ করা, জীবনধারণের উপকরণ সন্ধান করা, ইসলামী শরীয়তের একটি স্পষ্ট নির্দেশ। মানবাত্মাও প্রকৃতিগতভাবে রিযক অন্বেষণের পেছনে ছুটে চলে। আর আল্লাহ তাআলা দিনকে করেছেন জীবিকা অর্জনের সময়কাল। তিনি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন ভূপৃষ্ঠে বিচরণ করতে এবং তাঁর দেয়া রিযক ভোগ করতে। শুধু তাই নয়, বরং যারা পৃথিবীর বুকে আল্লাহর দেয়া রিযকের সন্ধানে বিচরণ করে তাদেরকে তিনি বিজাতীয় শত্র দের বিরুদ্ধে পবিত্র যুদ্ধে নিয়োজিত মুজাহিদদের সাথে যুক্ত করে একই আয়াতে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে :
{وَآَخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَآَخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنْهُ}

আর কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে পৃথিবীতে ভ্রমণ করবে, আর কেউ কেউ আল্লাহর পথে লড়াই করবে। অতএব তোমরা কুরআন থেকে যতটুকু সহজ ততটুকু পড় (সূরা আল-মুযযাম্মিল:২০)।

শরীয়তের দৃষ্টিতে রিযক অন্বেষণে শ্রম ব্যয়ের গুরুত্ব এখান থেকেও বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যকে সর্বোত্তম খাদ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(مَا أَكَلَ أَحَدٌ طَعَامًا قَطُّ، خَيْرًا مِنْ أَنْ يَأْكُلَ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ، وَإِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ دَاوُدَ عَلَيْهِ السَّلَامِ، كَانَ يَأْكُلُ مِنْ عَمَلِ يَدِهِ)

নিজ হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ খায়নি। আর নিশ্চয় আল্লাহর নবী দাউদ আ. নিজ হাতের উপার্জন থেকেই খেতেন (বুখারী)।

প্রিয় ভাইয়েরা! হালাল রিযক উপার্জন করে মানুষের দ্বারস্থ হওয়া থেকে বেঁচে থাকাই বিশাল সম্মাান ও মর্যাদার বিষয়। এমনকী উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেন :
مَا مِنْ مَوْضِعِ يَأْتِيْنِي الْمَوْتُ فِيْهِ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ مَوْطِنٍ أَتَسَوَّقُ فِيْهِ لِأَهْلِيْ؛ أَبِيْعُ وَأَشْتَرِيْ.

আমার মৃত্যু এমন জায়গায় আসার চেয়ে অধিক প্রিয় জায়গা আর নেই যেখানে আমি আমার পরিবারের জন্য বাজার করা তথা কেনা- বেচায় রত থাকব।

লুকমান হাকীমের একটি প্রজ্ঞাময় উপদেশ এ রকম, হে বৎস, তুমি হালাল রিযক উপার্জন করে দারিদ্র্য থেকে ধনাঢ্যতা অর্জন করো। কেননা কোনো ব্যক্তির দরিদ্র হওয়ার অর্থই হল তিনটি বদগুণে জড়িয়ে যাওয়া- এক. দীন পালনে ক্ষীণতা। দুই. আকল-বুদ্ধির দুর্বলতা। তিন. পৌরুষত্বের বিদায়।

প্রিয় ভাইয়েরা! নিশ্চয় পবিত্র উপার্জন ও নির্ভেজাল সম্পদ আহরণে নিহিত রয়েছে দীনদারী ত্র&ldquoটিমুক্ত হওয়া, মানসম্মানের সুরক্ষা, মন ও হৃদয়ের প্রফুল্লতা, চেহারার বিমর্ষহীনতা ও ইজ্জতের মাকাম অর্জনে ধন্য হওয়া।

তবে যে বিষয়টি আমাদেরকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে তা হলো, আমারা যা উপার্জন করছি পবিত্র কি না, হালাল কি না। কেননা আল্লাহ তাআলা যা পবিত্র ও হালাল কেবল তাই ভক্ষণ করার। নির্দেশ দিয়েছেন। আর যা অপবিত্র ও হারাম তা থেকে আমাদেরকে বিরত থাকতে বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
{يا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُواْ مِنَ الطَّيّبَاتِ وَاعْمَلُواْ صَالِحاً نى بما تعملون عليم}

হে রাসূলগণ, তোমরা পবিত্র ও ভালো বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে সর্ম্পকে আমি সম্যক জ্ঞাত (সূরা আল মুমিনূন:৫১)।

আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন :
{يا أَيُّهَا الَّذِينَ ءامَنُواْ كُلُواْ مِن طَيّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُواْ للَّهِ إِن كُنتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ.}

হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিযক দিয়েছি তা থেকে এবং আ¬ল্লাহর জন্য শোকর কর, যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত কর (সূরা আল বাকারা:১৭২)।

আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্যসমূহের একটি হলো, যা কিছু পবিত্র তা হালাল বলে ঘোষণা দেয়া। আর যা কিছু অপবিত্র-খাবীছ তা হারাম বলে ঘোষণা দেয়া। ইরশাদ হয়েছে :
{وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ}

এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে (সূরা আল আরাফ:১৫৭)।

উপর ন্তু যারা পবিত্র ও উত্তম কেবল তাদের জন্যই তো রয়েছে পরকালে জান্নাতের ঘোষণা। ইরশাদ হয়েছে :
{الَّذِينَ تَتَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ طَيّبِينَ يَقُولُونَ سَلامٌ عَلَيْكُمُ ادْخُلُواْ الْجَنَّةَ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ.}

ফেরেশতারা যাদের মৃত্যু ঘটায় উত্তম অবস্থায়, তারা বলে, তোমাদের ওপর সালাম। জান্নাতে প্রবেশ কর, যে আমল তোমরা করতে তার কারণে (সূরা আন নাহল:৩২)।

প্রিয় ভাইয়েরা! পবিত্র ও হালাল রিযক অন্বেষণ-উপার্জন করা আদৌ কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়। তা রবং এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক বিষয়। কেননা কাল কিয়ামতের ময়দানে বান্দাকে তার জায়গা থেকে সরতে দেয়া হবে না যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে যে, সে তার জীবিকা কোত্থেকে অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করে ছে। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(لَنْ تَزُولَ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يَسْأَلَ عَنْ أَرْبَعٍ: عَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاهُ، وَعَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ، وَعَنْ مَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ، وَفِيمَا أَنْفَقَهُ)

বান্দার দুপা তার জায়গা থেকে সরবে না যতক্ষণ না তাকে চারটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে : 
(এক) তার জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, সে কিসে তা কাটিয়েছে (দুই) তার যৌবন সম্পর্কে যে, সে তা কিসে জীর্ণ করেছে (তিন) তার সম্পদ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, সে তা কোথা হতে অর্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে (চার) তার ইলম সম্পর্কে যে, সে তার ইলম অনুযায়ী কী আমল করেছে (তাবারানী, হাসান)।

তাই প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য হলো গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা যে, সে তার জীবিকা কোত্থেকে কীভাবে উপার্জন করছে। সে যা উপার্জন করছে তা হালাল কি না, পবিত্র কি না তা অবশ্যই যাচাই করে দেখতে হবে, যাতে সে হালাল খেতে সক্ষম হয় এবং হালাল পথে ব্যয় করতে সক্ষম হয়।

আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর একটি ঘটনা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। একদা আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর এক চাকর তাঁকে কিছু খাবার দিল। খাওয়া শেষ হলে এটা কোথা থেকে এসেছে এ প্রশ্নের জবাবে সে বলল, আমি জাহিলী যুগে এক ব্যক্তির ভাগ্য গণনা করেছি। অথচ আমি ভাগ্য গণনায় পারদর্শী নই। আমি লোকটিকে ধোঁকা দিয়েছি। আর সে আমাকে এটা দিয়েছে। আর তাই আপনি এইমাত্র খেলেন। এ কথা শুনে আবু বকর সিদ্দীক রাযি. নিজ মুখে হাত ঢুকিয়ে বমি করে দিলেন। পেটে যা ছিল সব বের করে দিলেন(জাওয়ামিউল কালিম: হাদীস নং ১৪৩২)।

অন্য এক বর্ণনানুযায়ী। আবু বকর সিদ্দীক রাযি. তখন বলেলেন :

لَوْ لَمْ تَخْرُجْ إِلا مَعَ نَفْسِي لأَخْرَجْتُهَا
যদি তা বের করতে গিয়ে আমার জীবন দিতে হতো তবে আমি তাই করতাম (জাওয়ামিউল কালিম: হাদীস নং ৬৪)।

উমর রাযি. একবার কিছু দুধ পান করলেন। তিনি তা খুব ভালো মনে করলেন। যে লোকটি তাঁকে পান করতে দিয়েছিল তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দুধ তুমি কোথায় পেয়েছ? উত্তরে লোকটি বলল,আমি যাকাতের উটের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সেগুলো তখন পানির কাছে ছিল। অতঃপর আমি তাদের দুধ থেকে কিছু নিলাম। এ কথা শুনে উমর রাযি. তাঁর হাত মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে বমি করে দিলেন।

জনৈক নেককার ব্যক্তির স্ত্রী তাঁকে উপদেশ দিয়ে বলেন, হে অমুক! আমাদের রিযকের ব্যাপারে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। কেননা আমরা ক্ষুধায় ধৈর্যধারণ করতে পারব, কিন্তু জাহান্নামে ধৈর্যধারণ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! এই তো ছিল সালাফে সালিহীনদের অবস্থা। হারাম বা সন্দেহযুক্ত কোনো কিছু, এমনকি তাঁদের অজ্ঞাতসারে উদরে প্রবেশ করলেও তাঁরা তা বমি করে বের করে দিতেন। পক্ষান্তরে আমাদের বর্তমান যুগের অবস্থা তো এর ঠিক উল্টো। বর্তমান যুগে তো হারাম খাওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলে। কলাকৌশলে যে যত বেশি সম্পদ একত্রিত করতে পারে মানুষ তাকে তত বেশি চালাক ও বিচক্ষণ বলে। আর হালাল খেয়ে অল্পে তুষ্ট থাকা মানুষকে বর্তমান সমাজে বোকা বলে অভিহিত করা হয়। এমনকি বর্তমান যুগের স্ত্রীরাও তাদের পুরুষদেরকে হারাম সম্পদ দু হাতে লুটে নিতে উৎসাহ যোগায়, প্ররোচনা দেয়। বর্তমান যুগে হারাম খেয়ে কেউ বমি করা তো দূরে থাক, সবাই বরং তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! ব্যক্তি ও সমাজের ওপর হারাম উপার্জনের প্রভাব খুবই মারাত্মক। হারাম উপার্জনের ফলে সকল প্রকার বরকত ছিনিয়ে নেয়া হয়। রোগ-ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। আর্থিক অনটন-সঙ্কট দেশে-সমাজে শক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসে । বেকারত্ব বেড়ে যায়। যুলম অন্যায়, প্রতিহিংসা ও রেশারেশির সয়লাব ঘটে।

প্রিয় মুসল্লীবৃন্দ! যারা হারাম খায়, পরিবার-পরিজন ছেলে-সন্তানদের হারাম অর্থে লালন করে, তারা মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত হয়। তাদের উদাহরণ সাগরের পানি পানকারীর মতো। যতই সে পান করে ততোই তার তেষ্টায় আগুণ ধরে। এরা অল্পে তুষ্ট হতে নারাজ আবার অধিক পেয়েও থেকে যায় অখুশি। এরা হারামকে মনে করে সুস্বাদু-সুখাদ্য। হারাম উপার্জনের জন্য এরা অবলম্বন করে চলে সকল বক্রপথ। সুদ, জুয়া, ছিনতাই, চুরি, মাপে কম দেয়া, পণ্যের দোষত্রটি লুকিয়ে রাখা, যাদু, ভেলকিবাজি, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ, মিথ্যা-কসম, ধোঁকাবাজিসহ হেন কাজ নেই যা এরা করে না। একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে চমৎকারভাবে ভবিষদ্বাণী করেছেন।

তিনি বলেন :

(يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ، لَا يُبَالِي الْمَرْءُ مَا أَخَذَ مِنْهُ، أَمِنَ الْحَلَالِ أَمْ مِنَ الْحَرَامِ؟.)
এমন এক সময় আসবে যখন ব্যক্তি কোত্থেকে নিচ্ছে- হালাল থেকে, না হারাম থেকে তার গুরুত্ব দেবে না (বুখারী)।

হে চাকরিজীবী ভাইয়েরা, হে ব্যবসায়ী ভাইয়েরা, হে ঠিকাদার ভাইয়েরা, হে মুসলিম ভাই ও পর্দার আড়লে থাকা মা-বোনেরা! আসুন আমরা হারাম উপার্জন ও হারাম সম্পদ ভক্ষণ করা থেকে বিরত থাকি। সন্দেহযুক্ত সম্পদ থেকে ফিরে আসি। মানুষের হক যথাযথভাবে ফিরিয়ে দিই। আমরা আমাদের যার যার দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন করি। অফিসে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, যে যেখানে আছি নিজ দায়িত্ব উত্তমরূপে পালন করি। বেতন-ভাতা হালাল করে নিই। ওয়াদা-অঙ্গীকার রক্ষা করে চলি। পণ্যে ভেজাল মেশানো বন্ধ করি। আসুন আমরা আল্লাহ তাআলা কে ভয় করার মতো ভয় করি। হালাল রিযক হলো পবিত্র রিযক। হালাল রিযক হৃদয়কে করে পুষ্পিত-আলোকিত। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে করে সতেজ। হালাল রিযকের মাধ্যমে দুরুস্ত হয় মানুষের জীবন ও জগৎ। সুস্থ হয় মন ও শরীর। কবুল হয় বান্দার দুআ।

ভাইয়েরা আমার! যুহদ বা দুনিয়াবিরাগ মুমিনের একটি বড় গুণ। আর সবচে বড় যুহদ হলো হারাম পরিত্যাগ করা। হারাম থেকে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি হারাম খায়। হারাম লেনদেন করে। মানুষকে যুলম করে তার কোনো তাকওয়াও নেই, যুহদও নেই।

আবু হুরাইরা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন- :
(مَنْ كَانَتْ يَعْنِي عِنْدَهُ مَظْلَمَةٌ فِي مَالِهِ أَوْ عِرْضِهِ، فَلْيَأْتِهِ فَلْيَسْتَحِلَّهَا مِنْهُ قَبْلَ أَنْ يُؤْخَذَ أَوْ تُؤْخَذَ، وَلَيْسَ عِنْدَهُ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ، فَإِنْ كَانَتْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ حَسَنَاتِهِ فَأُعْطِيَهَا هَذَا، وَإِلَّا أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ هَذَا فَأُلْقِيَ عَلَيْهِ)

যদি কেউ তার ভাইয়ের ওপর যুলম করে থাকে, হোক তা মান-ইজ্জত অথবা সম্পদ বিষয়ক, সে যেন আজই তা থেকে দায়মুক্ত হয়ে নেয়, সে দিন আসার পূর্বে যখন কোনো টাকা পয়সার লেনদেন হবে না। সেদিন যদি তার নেক আমল থেকে থাকে তবে যুলম পরিমাণ নেক আমল তার কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হবে। আর যদি নেক আমল না থাকে তবে মাযলুম ব্যক্তির গুনাহ নিয়ে তার ওপর চাপানো হবে (আহমদ, সহীহ)।

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ، أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .


দ্বিতীয় খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ عَظِيْمِ الْإِحْسَانِ وَاسِعِ الْفَضْلِ وَالْجُوْدِ وَ الِامْتِنَانِ وَ أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّىَ اللهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِيْنَ. أَمَّا بَعْدُ:

মুহতারাম হাযেরীন! দুনিয়ার মায়াজালে জড়িয়ে পড়ার ফেতনা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। একজন মুসলমানের প্রেরণা-উদ্দীপনা-উৎকণ্ঠার উৎস হবে দুনিয়া, তা কখনো মেনে নেয়া যায় না। বরং মুসলমানের উচিত দুনিয়াকে আখিরাতের ফসল ফলানোর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা। হাদীসে এসেছে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

(تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ، وَعَبْدُ الدِّرْهَمِ، وَعَبْدُ الْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ سَخِطَ، تَعِسَ وَانْتَكَسَ، وَإِذَا شِيكَ فَلا انْتَقَشَ، طُوبَى لِعَبْدٍ آخِذٍ بِعِنَانِ فَرَسِهِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، أَشْعَثَ رَأْسُهُ، مُغْبَرَّةٍ قَدَمَاهُ، إِنْ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ كَانَ فِي الْحِرَاسَةِ، وَإِنْ كَانَ فِي السَّاقَةِ كَانَ فِي السَّاقَةِ، إِنْ اسْتَأْذَنَ لَمْ يُؤْذَنْ لَهُ، وَإِنْ شَفَعَ لَمْ يُشَفَّع)

দীনারের পূজারী, দিরহামের পুজারী ও পোশাকের পূজারী ধ্বংস হোক! তাকে দেয়া হলে সে খুশি। আর না দিলে নারাজ। সে ধ্বংস হোক, অধঃপতিত হোক। সে কাঁটাবিদ্ধ হলে তা আর বের করা হয় না। শুভ সংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে তার ঘোড়ার লাগাম ধরা অবস্থায় আছে, ধূলায়-ধুসর কেশ নিয়ে, ধূলোমলিন দুই পা নিয়ে। যদি সে প্রহরার দায়িত্বে থাকে তবে সে পাহারা দেয়। যদি সৈন্যবাহিনীর পশ্চদ্ভাগে থাকা তার দায়িত্ব হয়ে থাকে তবে সে পশ্চাদ্ভাগে থাকে। যদি সে অনুমতি চায়, তাকে অনুমতি দেয়া হয় না। যদি সে সুপারিশ করে, তার সুপারিশ কবুল করা হয় না (বুখারী)।

হাদীসে উল্লেখিত দ্বিতীয় প্রকার ব্যক্তি দুনিয়ার লোভ লালসা মুক্ত হয়ে আল্লাহর পথে নিজকে নিবেদিত করে রাখে। দীন রক্ষার ক্ষেত্রে তাকে যখন যে দায়িত্ব দেয়া হয় যথার্থরূপে সে তার দায়িত্ব পালন করে। শত্রর গতিবিধি দেখার জন্য যদি তাকে পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে সে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে নির্ঘুম রজনী যাপন করে। কখনো বলে না, এ কঠিন দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি তাকে সৈন্যবাহিনীর পশ্চাদ্ভাগে থাকার দায়িত্ব দেয়া হয়, তবে সে তাই মেনে নেয়। বলে না, এখানে থাকলে আমার কোনো নাম-দাম হবে না। এ ব্যক্তির অর্থের প্রতি লোভ থাকে না। দুনিয়ার জৌলুস অর্জনের প্রতি লোভ থাকে না। নেতৃত্ব অর্জনের প্রতি লোভ থাকে না। সে নীরবে আল্লাহর পথে কাজ করে যায়। সচেতনভাবে নিজ দায়িত্ব পালন করে যায। ফলে মানুষের কাছে সে থেকে যায় অপরিচিত। তাই যদি সে কোনো নেতার দরবারে প্রবেশের অনুমতি চায়, তাকে গুরুত্বহীন মনে করে অনুমতি দেয়া হয় না। সে যদি কারো জন্য সুপারিশ করে তার সুপারিশ আদৌ কোনো গুরুত্ব পায় না। এ হলো সে ব্যক্তি যার কোনো দাবি আল্লাহ তাআলা প্রত্যাখ্যান করেন না।

দুনিয়ার প্রতি মোহাবিষ্ট থাকার একটি অশুভ পরিণতি হলো, হালাল-হারামের বাছ-বিচার না করা। যা সামনে পাওয়া যায়, কোনো রকম যাচাই-বাচাই না করেই তা লুফে নেয়া। আরেকটি অশুভ পরিণতি হলো, ঈমান ও কুফরের দোলাচলে দুলতে থাকা। দুনিয়ার মোহে পড়ে, মানুষ তার ঈমান বিকিয়ে দেয়। দুনিয়ার মোহাবিষ্ট অনেক ব্যক্তিই যদি মুমিন অবস্থায় সকালে উপনীত হয় তবে সন্ধ্যা বেলায় সে কাফের হয়ে যায়। কাফের অবস্থায় সন্ধ্যায় উপনীত হলে সকাল বেলায় সে মুমিন হয়ে যায়। দুনিয়ার প্রতি মোহাবিষ্ট ব্যক্তি আদর্শিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলে। সে টাকা পয়সার অনুরক্ত দাসে পরিণত হয়। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করতে বলেছেন। দুনিয়ায় অপরিচিত অথবা মুসাফিরের মতো থাকতে বলেছেন।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! রিযক যার ভাগ্যে যেটুকু লেখা আছে তা শেষ না করে কেউ এ ধরাধাম পরিত্যাগ করে যাবে না। তাই আসুন, আমরা যথার্তরূপে আল্লাহর তাকওয়া ধারণ করি। পবিত্র ও উত্তম পন্থায় রিযকের সন্ধান করি।

 জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(لا تَسْتَبْطِئُوا الرِّزْقَ، فَإِنَّهُ لَنْ يَمُوتَ الْعَبْدُ حَتَّى يَبْلُغَهُ آخِرُ رِزْقٍ هُوَ لَهُ، فَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ: أَخَذِ الْحَلالِ، وَتَرَكِ الْحَرَامِ)
রিযক দেরিতে আসছে বলে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করো না। কেননা কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মারা যায় না যতক্ষণ না তার নির্ধারিত শেষ রিযক তার কাছে পৌঁছে যায়। অতঃপর তোমরা হালাল রিযক সুন্দরভাবে তালাশ করো। আর হারাম থেকে বিরত হও (ইবনে হাব্বান, সহীহ)।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহ তাআলার তাকওয়া ও ভয়ই সেই মহামূল্যবান চাবি যা বান্দার জন্য সকল রহমত ও বরকতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। তাকওয়াই হলো অঢেল নিয়ামত-উপঢৌকন পাওয়ার পরীক্ষিত হাতিয়ার।

ইরশাদ হয়েছে :
{وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ}

আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের ওপর খুলে দিতাম কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম (সূরা আল আরাফ:৯৬)।

তাকওয়া হলো সকল খায়ের-ভালাই-র প্রস্রবণ। সকল কল্যাণের আধার। যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে আল্লাহ তাকে সকল দুশ্চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার পথ করে দেন। সকল সঙ্কট থেকে মুক্তি লাভের উপায় বের করে দেন। তিনি তাকে এমন জায়গা থেকে রিযকের ব্যবস্থা করেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে। তাকওয়া অবলম্বন করে দুনিয়া তার জন্য কখনো সঙ্কীর্ণ হয় না। জীবন-জীবিকা, রিযক-দৌলত তার জন্য সঙ্কুচিত হয় না।

 ইরশাদ হয়েছে- :

{وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا}
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন (সূরা তালাক : ২)।

হে আল্লাহর বান্দারা! বরকত ও রহমত হাসিলের আরেকটি কার্যকর মাধ্যম হলো দুআ-প্রার্থনা, আল্লাহর আশ্রয়ে নিজকে সঁপে দেয়া। কেননা তিনি ছাড়া মানুষের জন্য অন্য কোনো আশ্রয়স্থল নেই। তাই যদি রিযকের সঙ্কট দেখা দেয়, রিযকের ব্যাপারে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়, আপনার ধার-দেনা বেড়ে যায়, তবে আপনি আল্লাহর পানে ধাবিত হোন। আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়ন। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়ে, আল্লাহ তাঁকে নিরাশ করেন না। তাই আসুন, আমরা আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে নিই। কেননা এমন কেউ নেই, যে তাঁর দরজায় নাছোড়বান্দা হয়ে দাঁড়িয়েছে অথচ তিনি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিযক অন্বেষণের তাওফীক দান করুন। হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দিন।

الْلَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلى آلِ إِبْرَاهِيْم إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنَ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সবাইকে হালাল রিযক উপার্জনের তাওফীক দান করুন। হারাম থেকে আমাদের সবাইকে বাঁচান। হালাল রিযকের সকল দরজা আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিন। হে আল্লাহ আপনি আমাদের যথার্থরূপে তাকওয়া অবলম্বনের তাওফীক দিন এবং আমাদের আর্থিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ করে দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.



গুনাহ থেকে তাওবা করা

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে
গুনাহ থেকে তাওবা করা
(পাঠ সংক্ষেপকাপড়ের ওপর যদি একের পর এক ময়লা জমতে থাকে আর তা ধোয়া না হয় তাহলে কী অবস্থা হবে আপনারাই বলুন! অন্তরের অবস্থা ঠিক একই রকম। যদি গুনাহ জমতে থাকে আর তাওবা করা না হয়, ইস্তিগফার করা না হয়, তাহলে না-ধোয়া কাপড়ের মতোই তা ময়লায় ভারাক্রান্ত ও আচ্ছাদিত হয়ে যাবে।)

প্রথম খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الْمَلِكِ الْوَهَّابِ الرَّحِيْمِ التَّوَّابِ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ بِلَا شَكٍّ وَلَا ارْتِيَابٍ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الْمَآبِ وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْراً، أَمَّا بَعْدُ:

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! এ পৃথিবীতে মানুষের দায়িত্ব হলো আল্লাহর ইবাদত করা। মানুষকে এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই কেউ যদি কোনো ভালো কাজ করে তবে সে তা নিজের উপকারের জন্যই করে। তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আদায়ের অংশ হিসেবেই করে। পক্ষান্তরে কেউ যদি গুনাহের কাজ করে তবে সে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বে অবহেলার কারণেই করে। তার নিজের ক্ষতি হিসেবেই তা করে। মানুষের গুনাহ যতোই বাড়ুক তা আল্লাহর শানে আদৌ কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারে না। অনুরূপভাবে নেক আমলও আল্লাহর কোনো উপকারে আসে না।

প্রিয় ভাইয়েরা! গুনাহ হলো ঘৃণ্য আবর্জনা যা সর্বাবস্থায় বর্জন করা আবশ্যক। গুনাহের এ আবর্জনা আমরা যদিও চোখে দেখি না, তার গন্ধ অনুভব করি না কিন্তু মানুষের অন্তরে এর প্রভাব লক্ষণীয়। মানুষ পাপের পর পাপ করতে থাকে এবং এক সময় তার অন্তর ঢেকে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন :
{كَلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَّا كَانُواْ يَكْسِبُونَ}
‘ কখনো নয়, বরং তারা যা অর্জন করত তাই তাদের অন্তরসমূহকে ঢেকে দিয়েছে’ (সূরা আল-মুতাফফিফীন:১৪)।


রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ، فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ، صُقِلَ قَلْبُهُ، فَإِنْ زَادَ زَادَتْ، فَذَلِكَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ)
‘ মুমিন বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। আর যদি সে তাওবা করে নেয়, বিরত হয়ে যায়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে তার অন্তর মসৃণ হয়ে যায়। আর যদি সে আরো করে তবে দাগ আরো বেড়ে যায়, এটাই হলো অন্তর আচ্ছাদিত হয়ে যাওয়া যার উল্লেখ আল্লাহ তাঁর কিতাবে করেছেন’ (ইবনে মাজাহ, হাসান)।


এসব গুনাহ, যারপর বান্দা তাওবা করে না, ইস্তিগফার করে না, বান্দার অন্তরে স্তুপীকৃত হতে থাকে এমনকি এক পর্যায়ে কঠিন আবরণের রূপ পরিগ্রহ করে, যা অন্তরকে একেবারে ঢেকে ফেলে।


প্রিয় ভাইয়েরা! কাপড়ের ওপর যদি একের পর এক ময়লা জমতে থাকে আর তা ধোয়া না হয় তাহলে কী অবস্থা হবে আপনারাই বলুন! অন্তরের অবস্থা ঠিক একই রকম। যদি গুনাহ জমতে থাকে আর তাওবা করা না হয়, ইস্তিগফার করা না হয়, তাহলে না-ধোয়া কাপড়ের মতোই তা ময়লায় ভারাক্রান্ত ও আচ্ছাদিত হয়ে যাবে।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আমরা তো রাতদিন পাপ করেই যাচ্ছি। পাপ করার পর হয়তো অনেক দিন গুজরে যায়, অথচ তাওবা করা হয় না, ইস্তিগফারের জন্য আল্লাহর কাছে হাত দরায করা হয় না। গুনাহ থেকে মাফ চাওয়া হয় না। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। নিশ্চয় পবিত্রতা ও প্রকৃত পরিচ্ছন্নতা হলো অন্তরের পবিত্রতা, অনন্তরের পরিচ্ছন্নতা।কাপড়ের পরিচ্ছন্নতা দিয়ে কী হবে, যদি পাপের বোঝায় ভারাক্রান্ত থাকে হৃদয় পাপের ময়লায় আচ্ছাদিত থাকে অন্তরাত্মা?

এমন তো অনেকেই আছে যাদের কাপড় অনেক পরিষ্কার কিন্তু তাদের অন্তর আবর্জনায় পরিপূর্ণ। পাপের আধিক্যে দুর্গন্ধময়। তাদের অন্তর গুনাহের ময়লায় মলিন। তারা একের পর এক পাপ করে চলে, অন্যায় করে চলে কিন্তু তাওবা থেকে গাফেল থাকে, ইস্তিগফার থেকে গাফেল থাকে। মানুষ যদি তার প্রকৃত চেহারা উম্মোচিত করে, তাহলে তার নিজের কাছে ও মানুষের কাছে তার কি আদৌ কোনো মূল্য থাকবে? আর কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তাআলার কাছে তার কোনো মূল্য থাকার প্রশ্নই ওঠে না।


প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! সকল মানুষই পাপ করে, গুনাহ করে। তবে পার্থক্য হলো কেউ কেউ পাপ করার সাথে সাথে তাওবা করে নেয়। নিজের অন্তরকে পবিত্র করে নেয়। লজ্জিত হয়ে, অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, কৃত পাপের জন্য ক্ষমা চায়। পক্ষান্তনে অনেকেই এমন আছে যাদের অন্তরে পাপ স্তুপীকৃত হতে থাকে অথচ সে তাওবা করে নিজকে পবিত্র করে না। আল্লাহর কাছে ঐকান্তিকভাবে ক্ষমা চেয়ে নিজের অন্তরকে মসৃণ করে না।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চাওয়ার দরজা সদা উন্মুক্ত। ইস্তিগফারের দরজা সদা উন্মুক্ত, যাতে আমরা তাওবা করে অন্তরের আবর্জনা থেকে নিজদেরকে পবিত্র করে নিতে পারি। আল্লাহ তো আমাদেরকে তাওবা করতে আহ্বান করছেন। কৃত গুনাহের ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলছেন, যাতে আমাদের অন্তর ভারমুক্ত হয়। গুনাহের বোঝা মুক্ত হয়। অন্তরের প্রশান্তি ফিরে আসে। হৃদয়ের শান্তভাব ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন :
{قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ .}
‘ বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আয-যুমার:৫৩)।


প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে দু’টি নাম
الْغَفُوْرُ التَّوَّابُ
পরম ক্ষমশীল, তাওবা কবুলকারী। মহামহিম আল্লাহ তাআলার এ মহান নাম দু’টি তাঁর ক্ষমা ও তাওবা কবুল করার অর্থ জ্ঞাপক। পবিত্র মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং তাদেও ত্র“টি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন। মূসা আলাইহিস সালাম অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে তাওবা করেছিলেন আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন :
{قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ}
‘ সে বলল, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমি আমার নফ্সের প্রতি যুলম করেছি, সুতরাং আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন’। অতঃপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-কাসাস:১৬)।


আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন :
{ثُمَّ اجْتَبَاهُ رَبُّهُ فَتَابَ عَلَيْهِ وَهَدَى وَعَصَى آَدَمُ رَبَّهُ فَغَوَى}
‘এবং আদম তার রবের হুকুম অমান্য করল ফলে সে বিভ্রান্ত হল। এরপর তার রব তাকে মনোনীত করলেন, অতঃপর তার তাওবা কবুল করলেন এবং তাকে পথনির্দেশ করলেন’ (সূরা তাহা:১২১-১২২)।

আল্লাহ তাআলা বান্দার তাওবা কবুল করেন এবং গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ}
‘আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তিনি তা জানেন’ (সূরা আশ-শূরা:২৫)।

তাওবা বান্দাকে পরিচ্ছন্ন করে সফলতার পথে নিয়ে যায়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:
{وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعاً أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}
‘হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার’ (সূরা আন-নূর:৩১)।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَار.}
‘ হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাটি তাওবা আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত’ (সূরা আত-তাহরীম:৮)।

যারা তাওবাকারী, পবিত্রতা অর্জনকারী আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পছন্দ করেন। ইরশাদ হয়েছে:
{إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ}

‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং তিনি পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকেও ভালবাসেন’ (সূরা আল বাকারা:২২২)।

আম্মার বিন ইয়াসির রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘হে মানব জাতি! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, আমি প্রতি দিন একশতবার তাওবা করি’ (মুসলিম)।

আবু হুরায়রা রাযি. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু. কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, আমি তার কাছে দৈনিক সত্তরবারের বেশি তাওবা করি’ (বুখারী)।

আনাস রাযি থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাঁর বান্দার তাওবার কারণে খুব খুশি হন। যখন বান্দা তার কাছে তাওবা করে তখন বান্দা যে অবস্থায় থাকুক না কেন আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন।

(ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘আদম সন্তান একটি স্বর্ণের উপত্যকার মালিক হলে, আরো দু’টি স্বর্ণের উপত্যকার মালিক হওয়ার আশা পোষণ করবে, তবুও তার মুখ পূর্ণ হবে না একমাত্র মাটি ছাড়া। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক তাওবাকারীকে ক্ষমা করে দেন’ (বুখারী)।

আর তাওবা কেবল আল্লাহ তাআলাই কবুল করতে পারেন, অন্য কারো তাওবা কবুল অথবা গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন :
{أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ}
‘ তারা কি জানে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবূল করেন এবং সাদকা গ্রহণ করেন। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু’ (সূরা আত-তাওবা:১০৪)।

হাদীসে এসেছে। আবূ মূসা আল আশআরী রযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
(إِنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا)
‘আল্লাহ তাআলা রাতের বেলায় তাঁর হাত প্রসারিত করেন যাতে দিনের বেলার গুনাহগাররা তাওবা করতে পারে এবং দিনের বেলা তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের গুনাহগারর তাওবা করতে পারে। সূর্য পশ্চিম আকাশ থেকে উদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এরূপ করবেন’ (মুসলিম)।

আল্লাহ তাআলার ‘আল গাফুর’ ও ‘আত-তাওয়াব’ নামের প্রতি ঈমান আনয়নের চাহিদাই হলো আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া, আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি প্রকাশ করা, তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও তাওবা করা এবং তার রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া।

তাওবা দ্রুত করা আবশ্যক, বিলম্ব করা কোনক্রমেই সমীচীন নয়। আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসসাল্লাম) তাওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ দ্রুততার সাথে পালন করা উচিত। কারণ, বান্দা জানে না দেরি করলে তার তাওবা করার সুযোগ হবে কি না। যেহেতু যেকোনো সময় তার মৃত্যু এসে যেতে পারে, তাই তাওবার সুযোগ নাও হতে পারে। অন্যায় কাজ বারবার করার মাধ্যমে অন্তর কঠিন হয়ে যায় এবং আল্লাহ থেকে দূরত্বের সৃষ্টি হয়, ঈমান দুর্বল হয়ে যায়। কারণ, ঈমান আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং অবাধ্যতার মাধ্যমে হ্রাস পায়। বারবার অপরাধ করার দ্বারা অপরাধ করার মানসিকতা তৈরি হয়। কেউ যদি কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে ফেলে, তবে তা থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, তার ওপর শয়তান বিজয়ী হয়ে যায় এবং বড়-বড় অপরাধ করার প্রেরণা দেয়। এ জন্য উলামায়ে কিরাম বলেন, সকল ধরনের অপরাধ কুফরী বৃদ্ধি করে। মানুষ ধাপে ধাপে এক অপরাধ থেকে আরেক অপরাধে পা রাখে। এক পর্যায়ে দীন থেকে সে সম্পূর্ণভাবে বিচ্যুত হয়ে পড়ে।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে খাঁটিভাবে তাওবা করতে বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে :
{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحاً}
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাঁটি তাওবা’ (সূরা আত-তাহরীম:৮)।

হাফেয ইবনে কাছীর রহ. তাওবায়ে নাসুহা তথা খাঁটি তাওবার সংজ্ঞায় বলেন, ‘সত্য ও দৃঢ় তাওবা, যা মানুষের পাপসমূহ মুছে দেয়, এবং বিক্ষিপ্ত অবস্থাকে একত্রিত করে ঠিক করে দেয়। আর সে যেসব নিচু কাজ করত তা থেকে ফিরিয়ে আনে’।

উমর রাযি. বলেন, ‘যে তাওবার ফলে মানুষ গুনাহের দিকে আর ফিরে যায় না’। সংক্ষেপে বলা যায় তাওবায়ে নাসূহা হলো, যে তাওবায় নিম্নবর্ণিত পাঁচটি গুণ পাওয়া যায় :

এক. একনিষ্ঠতার সাথে তাওবা করা। তাওবায় আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ও তাঁর মাহাত্ম্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁর কাছে কল্যাণের আশা করা এবং তাঁর শাস্তি থেকে ভয় পাওয়া ইত্যাদির উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরী। এ ছাড়া তাওবা দ্বারা পার্থিব কোন বস্তু কামনা না করা অথবা সৃষ্টজীবের কাছে কিছু প্রার্থনা না করা। যদি এরূপ করা হয় তবে সে ব্যক্তির তাওবা কবুল হবে না, বরং ধরা হবে যে, সে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তাওবা করেছে। সে আল্লাহর কাছে ঐকান্তিকভাবে তাওবা করেনি বরং সে একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেকে কেন্দ্র করে তাওবা করেছে।

দুই. কৃত গুনাহের জন্য লজ্জিত হওয়া ও হীনতা প্রকাশ করা এবং এ মনোভাব প্রকাশ করা যে, এ তাওবা কবুল না হলে পুরো জীবনটাই বৃথা যাবে। সাথে সাথে আল্লাহ তাআলা গুনাহের জন্য যে শাস্তি নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা স্মরণ করা এবং সে ব্যাপারে আতঙ্কিত হওয়া।

তৃতীয়. অতি দ্রুত গুনাহের কাজ ত্যাগ করা। কেননা বিলম্ব হলে অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থেকে যায়। যদি কোন ফরয বা ওয়াজিব ছেড়ে দিয়ে থাকে, তবে অবশ্যই তা সম্পাদন করে নিবে। যেমন যাকাত, হজ ইত্যাদি। কোনো গুনাহে নিমজ্জিত থাকাবস্থায় তাওবা করে কোনো লাভ নেই। যেমন কেউ সুদ খাওয়া থেকে তাওবা করল কিন্তু সর্বদা সুদের কাজ-কর্মে জড়িত রইল এ ধরনের তাওবা দ্বারা কোন লাভ হবে না বরং তার তাওবা হবে হাসি-তামাশা ও বিদ্রুপের নামান্তর। এর দ্বারা সে আল্লাহ ও তাঁর আয়াতসমূহের সাথে তাচ্ছিল্যপুর্ণ আচরণ করল, যা তাকে আল্লাহর রহমত থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেবে। কিংবা কেউ তাওবা করল যে, কখনো সে জামাতের সাথে নামায ত্যাগ করবে না, তার পরেও সে জামাত ত্যাগ করতে থাকলো, এমতাবস্থায় তার এ তাওবায় আদৌ কোনো ফল হবে না।

যদি কেউ মানুষের কোন হক নষ্ট করে থাকে, তবে সে হক আদায় করার পরই তাকে তাওবা করতে হবে, অন্যথায় তার তাওবা সঠিক বলে গণ্য হবে না। যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে হস্তগত করে অথবা তার কাছে থাকা অন্যের সম্পদ অস্বীকার করে, তবে উক্ত ব্যক্তির সম্পদ ফিরিয়ে না দেয়া পর্যন্ত তাওবা শুদ্ধ হয়েছে বলে গণ্য হবে না। যদি উক্ত সম্পদের মালিক মারা গিয়ে থাকে, তবে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে তা ফিরিয়ে দিতে হবে। কোনো উত্তরাধিকারী জীবিত না থাকলে বাইতুল মালে তা জমা করতে হবে। আর যদি কোনো উপায় খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে ওই ব্যক্তির নামে তা সদকা করে দিতে হবে। যদি কোনো মুসলমানের গীবত করে অপরাধ করে থাকে, তবে তার গীবত ত্যাগ করে তারপর তাওবা করা জরুরী।

চার. কৃত অপরাধে পুনরায় ফিরে না যাওয়ার সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি কেউ বলে, আমি তাওবা করেছি এবং সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আর কখনো ওই অপরাধ করব না, কিন্তু সে বারবার একই অপরাধ করতে থাকে, তবে তার তাওবা কবুলযোগ্য হবে না। কারণ, তার এ তাওবা হচ্ছে সাময়িক তাওবা, যার দ্বারা দীন বা দুনিয়ার কোনো উপকারের সম্ভাবনা নেই।

পাঁচ. তাওবা কবুলের সময় শেষ হওয়ার আগেই তাওবা করা। তাওবা কবুলের সময় শেষ হয় দু’ভাবে: সবার জন্য এক সাথে। নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির জন্য এককভাবে।

ক) পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয় হলে সবার ক্ষেত্রে তাওবার সময় শেষ হয়ে যাবে। তখন আর কারো তাওবা কাজে আসবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :
{يَوْمَ يَأْتِي بَعْضُ آيَاتِ رَبِّكَ لا يَنْفَعُ نَفْساً إِيمَانُهَا لَمْ تَكُنْ آمَنَتْ مِنْ قَبْلُ أَوْ كَسَبَتْ فِي إِيمَانِهَا خَيْراً}
‘ যেদিন তোমার রবের নিদর্শনসমূহের কিছু প্রকাশ পাবে, সেদিন কোন ব্যক্তিরই তার ঈমান উপকারে আসবে না, যে পূর্বে ঈমান আনেনি, কিংবা সে তার ঈমানে কোন কল্যাণ অর্জন করেনি’ (সূরা আল আনআম:১৫৮)।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি পশ্চিম দিকে সূর্য উদয় হওয়ার আগে তাওবা করবে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করবেন’ (মুসলিম)।

খ) মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে আর তাওবা কবুলের সুযোগ থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{وَلَيْسَتِ التَّوْبَةُ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ حَتَّى إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ إِنِّي تُبْتُ الْآن}
‘ আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন সে বলে, আমি এখন তাওবা করলাম’ (সূরা আন-নিসা:১৮)।

আবদুল্লাহ ইবন উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করে থাকেন যতক্ষণ না রুহ বের হয়ে যাওয়ার গরগর শব্দ শুরু হয়’ (তিরমিযী)।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাওবা করার সময় উযু করে দু’রাকাত নামায পড়ার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘কোনো ব্যক্তি যদি গুনাহ করার পর উত্তমরূপে উযু করে, অতঃপর দু’রাকাত নামায পড়ে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে আল্লাহ তাকে অবশ্যই মাফ করে দিবেন’ (আহমদ)। এ হাদীসের সত্যতার পক্ষে আরেকটি হাদীস রয়েছে। আর তা হলো- উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমাদের মধ্যে যদি কেউ উত্তমরূপে উযু করে, এবং বলে :
(أَشْهَدُ أنَّ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ)
তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য বেহেশতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেন’ (মুসলিম)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওবা করার তাওফীক দান করুন।
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .

দ্বিতীয় খুৎবা
اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى المَبْعُوْثِ رَحْمَةً لِلْعَالَمِيْنَ، نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ الصَّادِقِ الْأَمِينِ، وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ، وَالتَّابِعِيْنَ وَتَابِعِيْهِمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ، أَمَّا بَعْدُ:

তাওবার ফলাফল
প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! তাওবা মানুষকে পরিশুদ্ধ করে শাশ্বত সৌভাগ্য এবং দুনিয়া ও আখেরাতে হায়াতে তাইয়েবার অধিকারী বানায়। ইরশাদ হয়েছে :
{مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ}
‘ যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব’ (সূরা আন-নাহল:৯৭)।

পবিত্র কুরআনের উল্লিখিত আয়াতে নেক আমলের কথা বলা হয়েছে। আর নেক আমল হলো যার মধ্যে নিম্নলিখিত তিনটি শর্ত পাওয়া যায় :

এক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মুতাবিক হওয়া। ইরশাদ হয়েছে :
{وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ}
‘ রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর’ (সূরা আল হাশর:৭)।

দুই. একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে একনিষ্ঠ হয়ে আমল করা। ইরশাদ হয়েছে :
{وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ}
‘আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে’ (সূরা আল বাইয়িনাহ:৫)

তিন. সঠিক আকীদা পোষণ করে আমল করা। ইরশাদ হয়েছে :
{مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ}
‘ যে মুমিন অবস্থায় নেক আমল করবে, পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যা করত তার তুলনায় অবশ্যই আমি তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেব’ (সূরা আন-নাহল:৯৬)।

উক্ত আয়াতে নেক আমল করার সাথে সাথে মুমিন হওয়ার শর্ত করা হয়েছে। আর মুমিন হলো সে, যার আকীদাগত সঠিক ভিত্তি রয়েছে।

তাওবার একটি সুফল হলো : নিরাপত্তা ও হিদায়াত লাভ। ইরশাদ হয়েছে :
{الَّذِينَ آَمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ}
‘ যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত’ (সূরা আল আনআম:৮২)।

পাপকর্ম পূন্যে রূপান্তরিত হওয়া তাওবার আরেকটি সুফল: ইরশাদ হয়েছে :
{إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا}
‘ আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে তবে নিশ্চয় সে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে’ (সূরা আল ফুরকান: ৭০)।

আল্লাহর রেযামন্দী অর্জনে ধন্য হওয়াও তাওবার একটি সুফল: ইরশাদ হয়েছে :
{وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ}
‘ আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে ? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না’ (সূরা আলে ইমরান:১৩৫)।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! সঠিকভাবে তাওবা করতে পারলে আল্লাহ তাআলা বান্দার সকল পাপ মোচন করে দেন। কেননা তিনি গাফূর ও গাফ্ফার তিনি রহমান ও রাহীম। ইরশাদ হয়েছে :
{قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ}
‘ বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দিবেন, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আয-যুমার:৫৩)।

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কবীরা গুনাহে অপরাধী ব্যক্তি- মুসলমান, কাফির নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
{وَمَنْ يَعْمَلْ سُوءاً أَوْ يَظْلِمْ نَفْسَهُ ثُمَّ يَسْتَغْفِرِ اللَّهَ يَجِدِ اللَّهَ غَفُوراً رَحِيماً}
‘আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করবে কিংবা নিজের প্রতি যুলম করবে তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, সে আল্লাহকে পাবে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আন-নিসা:১১০)।

অতএব, আমার ভাইয়েরা! আমরা যারা গুনাহে লিপ্ত, চলুন অতি দ্রুত তাওবা করে নিই। আল্লাহর কাছে সকল অন্যায় অপরাধের জন্য ক্ষমা চাই। নিশ্চয় তিনি অতি দয়ালু পরম ক্ষমাশীল।
اَللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الطِّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الْرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ, আমাদেরকে আপনি তাওবায়ে নাসূহার তাওফীক দান করুন। আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন। আমাদেরকে আপনি পূত-পবিত্র করুন। আমাদের গুনাহগুলোকে আপনি ছাওয়াবে রূপান্তরিত করুন। আমাদেরকে সিরাতুল মুস্তাকীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.


ইসলামে আক্বীদার গুরুত্বের সম্পর্কে আলোচনা

রবিবার, ডিসেম্বর ০১, ২০১৯ 0
বার দেখা হয়েছে


অনেকগুলো বিষয়ের মাধ্যমে ইসলামী আক্বীদার গুরুত্ব প্রকাশ পায়, তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল:

১- আমাদের জীবনে সর্বাধিক প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আক্বীদাহ্‌। কেননা, অন্তর যদি তার সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আ’লামীনের ইবাদাত না করে তবে তা সুখ, শান্তি ও নিয়ামত পাবে না। 

২- ইসলামী আক্বীদাহ্‌ সব চেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ফরয। এ জন্য কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলে তার নিকটে সর্বপ্রথম ইসলামী আক্বীদার স্বীকারোক্তি চাওয়া হয়। যেমন আল্লাহর রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله
অর্থ: মানুষ যতক্ষন “আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল” এ কথার সাক্ষ্য না দিবে আমি ততক্ষন তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। বুখারী ও মুসলিম।

৩- ইসলামী আক্বীদাই একমাত্র আক্বীদাহ্‌ যা নিরাপত্তা, শান্তি, সুখ এবং আনন্দ কায়েম করে। আল্লাহ্‌ বলেন:
بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِنْدَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ﴾ [البقرة : 112
অর্থ: হাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার রয়েছে। তাদের ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। সূরাহ্‌ বাক্বারাহ্‌  ১১২। ইসলামী আক্বীদাই কেবল সুস্থতা ও সুখ-সমৃদ্ধি প্রতিা করতে পারে। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ  الأعراف : 96
অর্থ:  আর যদি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া (পরহেযগারী) অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের প্রতি আসমানী ও পার্থিব নিয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। সূরাহ্‌ আল আরাফ আয়াত ৯৬।

৪- ইসলামী আক্বীদাই পৃথিবীতে ক্ষমতা লাভ এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টার মাধ্যম। আল্লাহ্‌ (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) বলেন:
وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِنْ بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ الأنبياء : 105
অর্থ: আমি উপদেশের পর যাবুরে লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে। সূরাহ্‌ আল আম্বিয়া আয়াত ১০৫।

আল্লাহর প্রতি ঈমান:
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ: আল্লাহর অস্তিত্বকে নিশ্চিত ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা। প্রভুত্ব, ইবাদাত এবং নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকার করা। আল্লাহর প্রতি ঈমান চারটি বিষয়কে শামিল করে:
১- আল্লাহর  অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করা।
২- আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা।
৩- আল্লাহই একমাত্র সত্য ইলাহ্‌ ও ইবাদাতের যোগ্য এ বিশ্বাস রাখা।
৪- আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর উপর বিশ্বাসরাখা।
এ চারটি বিষয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ইনশা আল্লাহ্‌। (চলবে)


১- আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা:
ক- আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস স্থাপন করা মানুষে  স্বভাবজাত বিষয়। অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী। সামান্য সংখ্যক নাস্তিক ব্যতীত কেউ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি। প্রত্যেক সৃষ্টি জীবই পূর্ব তা’লীম ছাড়াই তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে ঈমানের উপর সৃষ্ট। যেমন আমরা আহ্বানকারীদের আহ্বানে সাড়া দেওয়া এবং প্রার্থনাকারীদের প্রার্থীত বস্তু প্রাপ্তির কথা শুনি ও দেখে থাকি, যা আল্লাহর অস্তিত্বের উপর স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
﴿إِذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ فَاسْتَجَابَ لَكُمْ﴾
অর্থ: তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পালনকর্তার নিকট। তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন। সূরাহ্‌ আল আন্‌ফাল আয়াত ৯।

খ- প্রত্যেকেই জানে কোন কিছু সংঘটিত হলে তার সম্পাদনকারী বা সংগঠক থাকা আবশ্যক। অসংখ্য সৃষ্টিজীব এবং প্রতিনিয়ত আমরা দুনিয়াতে যা দেখছি তারও একজন স্রষ্টা দরকার যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। তিনিই হলেন আল্লাহ। কেননা স্রষ্টা বিহীন সৃষ্টি আসতে পারেনা। তেমনি এটাও অসম্ভব যে কেউ নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করবে, কেননা কোন বস্তু নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করতে পারে না। আল্লাহ বলেন:
﴿أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ﴾ [الطور : 35[
অর্থ: তারা কি আপনা-আপনিই সৃজিত হয়ে গেছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? সূরাহ্‌ আত্‌ ত্বুর আয়াত ৩৪।
আয়াতের অর্থ হল: তারা স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্ট হয়নি, আর তারা নিজেরাও নিজেদেরকে সৃষ্টি করেনি, তাহলে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাদের স্রষ্টা হলেন মহান আল্লাহ।

গ- আসমান, যমীন, চন্দ্র, সূর্য, তারকা এবং গাছ-পালাসহ সুশৃঙ্খল এ দুনিয়া নিশ্চিতরূপে প্রমাণ করে যে এই পৃথিবীর একজন একক স্রষ্টা রয়েছেন। আর তিনিই হলেন মহান রব্বুল আ’লামীন। তিনি বলেন:
 ﴿ صُنْعَ اللَّهِ الَّذِي أَتْقَنَ كُلَّ شَيْءٍ ﴾ النمل-88
অর্থ: এটা আল্লাহর কারিগরী, যিনি সবকিছুকে করেছেন সুসংহত। সূরাহ্‌ আন্‌ নামল আয়াত ৮৮।

তারকা ও নক্ষত্রসমূহ নির্দিষ্ট নিয়মে চলা-ফেরা করছে, নিজ কক্ষ পথ থেকে বিচ্যুত হয় না। প্রত্যেকটি নক্ষত্র নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলে এবং তা কখনও অতিক্রম করে না। আল্লাহ বলেন:
﴿لاَا لشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا اللَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ﴾ [يس : 40[
অর্থ: সূর্য নাগাল পেতে পারে না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের, প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণ করে। সূরাহ্‌ ইয়াসীন আয়াত ৪০।

২- আল্লাহর প্রভূত্বে বিশ্বাস:
ক- আল্লাহর প্রভূত্বে বিশ্বাসের অর্থ: এ কথা  স্বীকার  করা যে আল্লাহ সব কিছুর পালনকর্তা, মালিক, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, তিনি জীবন ও মৃত্যু দেন, উপকার ও ক্ষতি পৌছান, সব কিছুই তাঁর, তাঁর হাতে সকল কল্যাণ, তিনি সব কিছু করতে পারেন। এসকল ক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক বা অংশীদার নেই।
আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস হল: দৃঢ় এ বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ্‌ তায়ালাই একমাত্র রব বা প্রতিপালক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আল্লাহর কাজে তাঁকে একক হিসেবে বিশ্বাস করা। যেমন: এ আক্বীদাহ্‌ পোষণ করা যে এ পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা হলেন একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ্‌ তায়া’লা বলেন:
﴿اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ﴾ [الزمر : 62[
অর্থ: আল্লাহ্‌ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সূরাহ্‌ আয যুমার আয়াত ৬২। তিনিই সকল সৃষ্টিজীবের রিযিক্বদাতা। আল্লাহ্‌ বলেন:
﴿وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا﴾ [هود : 6[
অর্থ: আর পৃথিবীতে কোন বিচরণশীল নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই (অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল জীবের রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর উপর)। সূরাহ্‌ হুদ আয়াত ৬।
আল্লাহ্‌ সবকিছুর মালিক। তিনি বলেন:
﴿لِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا فِيهِنَّ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ﴾ [المائدة : 120[
অর্থ: নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এবং এতদুভয়ে অবস্থিত সবকিছুর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। সূরাহ্‌ আল মায়িদাহ্‌ আয়াত ১২০।

খ- আল্লাহ্‌ তায়ালা এককভাবে সকল সৃষ্টিজীবের পালনকর্তা। তিনি বলেন: ﴿ الْحَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ (الفاتحة-2)
অর্থ: যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্‌ তায়ালার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা। সূরাহ্‌ আল ফাতিহা আয়াত ২।
রব্বুল আলামীনের অর্থ: তিনি সকল সৃষ্টিজীবের সৃষ্টিকর্তা, মালিক, কল্যাণকারী । বিভিন্ন নিয়ামত ও অনুগ্রহের দ্বারা তিনি তাদেরকে লালন পালন করেন।

গ- আল্লাহ্‌ তায়ালা সকল সৃষ্টিজীবকে তাঁর প্রভুত্বের বিশ্বাস দিয়েই সৃষ্টি করেছেন, এমনকি রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যামানার আরবীয় মুশরিকদেরকেও। আল্লাহ বলেন:
﴿قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ (86) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ (87) قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (88) سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ﴾ [المؤمنون : 86 – 89[
অর্থ: বলুন: সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? অবশ্যই তারা বলবে: আল্লাহ। বলুন: তবুও কি তোমরা ভয় করবে না?
বলুন: তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্র্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না ? অবশ্যই তারা বলবে: আল্লাহর। বলুন: তাহলে কোথা থেকে তোমাদেরকে জাদু করা হচ্ছে? সূরাহ্‌ আল মু’মিনূন আয়াত ৮৬-৮৯।
আল্লাহ্‌ তায়ালার প্রভুত্বে বিশ্বাস করলেই কেউ মুসলিম হয়ে যায় না। বরং অবশ্যই তাকে আল্লাহর উলুহিয়্যাতে (ইবাদাতের ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদে) বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। কেননা, আল্লাহর প্রভুত্বে বিশ্বাস স্থাপনের পরও রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার ক্বুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করেছেন।

ঘ- আসমান-যমীন, গ্রহ-উপগ্রহ, তারকা, গাছ-পালা এবং মানুষ ও জ্বিনসহ সারা বিশ্ব মহান আল্লাহর অনুগত ও অধীনে রয়েছে। আল্লাহ বলেন:
 ﴿وَلَهُ أَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَإِلَيْهِ يُرْجَعُونَ﴾ [آل عمران 83[
অর্থ: আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, তাঁরই অনুগত হবে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে। সূরাহ্‌ আল ইমরান আয়াত ৮৩। অতএব, কোন সৃষ্টি জীবই আল্লাহর শক্তি ও নির্ধারিত তাক্বদীর হতে বের হতে পারবে না।
কেননা, আল্লাহ্‌ তায়ালাই হলেন তাদের মালিক, তিনি নিজের হিকমত অনুযায়ী যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে পরিচালনা করেন। তিনি সকল জীবের সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ্‌ ব্যতীত সবকিছু তাঁর তৈরী, দরীদ্র এবং তাদের সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আলামীনের নিকটে মুখাপেক্ষী।

ঙ- যখন এটা নিশ্চিত হলো যে আল্লাহ্‌ তায়ালাই সবকিছুর মালিক তখন জানাগেল, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা নেই। একমাত্র আল্লাহই সারা বিশ্বের পরিচালনাকারী। অতএব, আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত একটা পিপিলিকাও নড়ে না। তাই আমাদের জন্য ওয়াজিব হলো আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখব, বিপদাপদে তাঁর নিকটেই প্রার্থনা করব, তাঁর উপর ভরসা রাখবো। কেননা, আল্লাহ হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা এবং মালিক।

৩- আল্লাহর উলূহিয়্যার প্রতি বিশ্বাস:
ক- ইলাহ্‌ (মাবূদ) হিসেবে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ: এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে কেবল মাত্র আল্লাহ প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য সকল প্রকার ইবাদাতের হক্বদার এবং যোগ্য। যেমন: দুয়া’, ভয়, ভরসা, সহযোগিতা প্রার্থনা করা, সালাত, যাকাত, সিয়াম (রোযা) ইত্যাদি। নিশ্চিতভাবে বান্দার জানা উচিৎ আল্লাহ্‌ তায়ালাই হলেন প্রকৃত মা’বূদ বা ইবাদাতের যোগ্য, তাঁর কোন শরীক নেই। অতএব, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা’বূদ-উপাস্য নেই। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন:
﴿وَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ﴾  [البقرة : 163[
অর্থ: আর তোমাদের মা’বূদ তো এক-ই মা’বূদ, তিনি ছাড়া আর কোন সত্য মা’বূদ নেই, তিনি করুণাময় ও মহান দয়ালু। সূরাহ্‌ আল বাক্বারাহ্‌ আয়াত ১৬৩।
আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন উপাস্য এবং মা’বূদ হলেন একজন। অতএব, আল্লাহ্‌ ব্যতীত কাউকে ইলাহ্‌ হিসেবে গ্রহণ করা এবং তিনি ব্যতীত কারও ইবাদত করা জায়েয নয়।

খ- আল্লাহর উলূহিয়্যাতে বিশ্বাস: তা হলো এ কথা স্বীকার করা যে আল্লাহ একমাত্র সত্য মা’বূদ, তাঁর কোন শরীক নেই। ইলাহ্‌ শব্দের অর্থ মালুহ অর্থাৎ ভালবাসা ও সম্মান সহকারে যার ইবাদাত করা হয়। অতএব, উলুহিয়্যাহ্‌ হলো, সকল প্রকার ইবাদাতে আল্লাহর একত্ববাদ।
তাই আমরা আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যকে ডাকিনা, তিনি ব্যতীত কাউকে ভয় করি না।
আমরা কেবল তাঁর  উপরই ভরসা করি, তাঁকেই সিজদাহ্‌ করি, তাঁর নিকটেই নত হই। সঙ্গত কারনেই আল্লাহ ব্যতীত কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়। এ কথারই প্রমাণ মেলে আল্লাহ তায়ালার বাণী:
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ﴾ الفاتحة-5 ﴿
অর্থ: আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। সূরাহ্‌ ফাতিহা আয়াত ৫।

গ- উলূহিয়্যাহ্‌ বা ইবাদাতে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাসের গুরুত্ব: নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে আল্লাহর উলূহিয়্যাতের গুরুত্ব বুঝা যায়:
* মানুষ এবং জ্বিন সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য হলো এক অদ্বিতীয়, লাশারীক আল্লাহর ইবাদাত করা। আল্লাহ বলেন:
﴿وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ﴾ [الذاريات : 56[
অর্থ: আমার ইবাদাত করার জন্যই আমি মানব ও জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি। সূরাহ্‌ আয্‌-যারিয়াত আয়াত ৫৬।
* রাসূলগণ (আলাইহিমুস্‌ সালাম) এবং আসমানি কিতাবসমূহ প্রেরণের উদ্দেশ্য হলো এ কথার স্বীকৃতি দেওয়া যে আল্লাহ্‌ তায়ালাই একমাত্র সত্য মা’বূদ। আল্লাহ বলেন:
﴿وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ﴾ [النحل : 36[
অর্থ: আমি প্রত্যেক উম্মাতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং ত্বাগুত থেকে নিরাপদ থাক। সূরাহ্‌ আন্‌ নাহ্‌ল আয়াত ৩৬।
* প্রত্যেক ব্যক্তির উপর সর্ব প্রথম আল্লাহ তায়ালার উলূহিয়্যাতে বিশ্বাস স্থাপন করা ফরয। যেমন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মুয়ায বিন জাবাল t কে ইয়েমেনে পাঠান তখন তাঁকে যে ওসিয়ত করেন তা হল:
﴿إِنَّكَ تَقْدَمُ عَلَى قَوْمٍ أَهْلِ كِتَابٍ فَلْيَكُنْ أَوَّلَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ عِبَادَةُ اللَّهِ﴾
অর্থ: তুমি এমন জাতির নিকটে যাচ্ছ যারা আহ্‌লে কিতাব। অতএব, তাদেরকে সর্বপ্রথম আল্লাহর ইবাদাতের  প্রতি দাওয়াত দিবে। বুখারী ও মুসলিম। অর্থাৎ: সকল প্রকার ইবাদাতে আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান করবে।

ঘ- (لاإله إلاالله ) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর গুরুত্ব: জীবনের প্রথম ও শেষে এই মর্যাদাপূর্ণ বাক্য বা কালিমাটি পাঠ ও বিশ্বাস করা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ওয়াজিব। যে ব্যক্তি এ কালিমার উপর ( বিশ্বাস সহকারে) মৃত্যু বরণ করবে তিনি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। নবী কারীম (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
﴿مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ﴾
অর্থ: আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই, একথা জানা ও বিশ্বাস করা অবস্থায় যে ব্যক্তি ইন্তেকাল করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সহীহ্‌ মুসলিম ১/১২৫।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে ইহা স্পষ্ট যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ (আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই) এর জ্ঞানার্জন করা সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ন ওয়াজিব। (চলবে)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ (لاإله الاالله  ) এর অর্থ: এক আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই। এখানে আল্লাহ্‌ ছাড়া সকলের থেকে উলূহিয়্যাহ্‌ বা ইবাদাতের যোগ্যতাকে অস্বীকার করা হয়েছে। অপর দিকে সকল প্রকার ইবাদাতকে একমাত্র লাশারীক আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইলাহ্‌ শব্দের অর্থ: মা’বূদ বা যার ইবাদত করা হয়। অতএব, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকারো ইবাদাত করল, সে তাকে ইলাহ্‌ বা মা’বূদ হিসেবে গ্রহণ করল। এক অদ্বিতীয় আল্লাহ্‌ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করা হয় তারা বাতিল। আল্লাহ্‌ তায়া’লাই একমাত্র ইলাহ্‌, অন্তরসমূহ ভালবাসা, সম্মান, বিনয়, নম্রতা, ভয়-ভরসা এবং দুআ’র মাধ্যমে যার ইবাদাত করবে।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর অর্থ বাস্তবায়ন ব্যতীত কোন অন্তর খুশী, সুখী ও সৌভাগ্যশীল হতে পারে না। কেননা, কেবল মাত্র এক আল্লাহর ইবাদাতেই রয়েছে পূর্ণ সুখ, শান্তি, নিয়ামত এবং সুন্দর জীবন।

O-اركان لاإله الا الله  : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর ভিত্তিসমূহ: এই মর্যাদাপূর্ণ কালিমাটির দু’টি রোকন বা ভিত্তি রয়েছে, তা হল: না বোধক এবং হাঁ বোধক।

প্রথম রুকন:  لاإله) ( লা-ইলাহা: আর ইহা হলো আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্যের ইবাদাতকে অস্বীকার করা, শির্‌ককে বাতিল হিসেবে বিশ্বাস করা এবং অত্যাবশ্যকভাবে আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করা হয় তা কুফরী বলে জানা।
দ্বিতীয় রুকন: (إِلَّا اللَّه) ইল্লাল্লাহ্‌: ইহা হলো সকল প্রকার ইবাদাত এক আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা এবং তা কেবলমাত্র আল্লাহর নিমিত্তেই সম্পাদন করা। এর দলীল হলো আল্লাহর বাণী:
﴿فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى﴾ [البقرة : 256[
অর্থ: যারা গোমরাহ্‌কারী ত্বাগুতদেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল। সূরাহ্‌ আল বাক্বারাহ্‌ আয়াত ২৫৬।
আল্লাহর বাণী: فَمَنْ يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ হলো প্রথম রুকন লা-ইলাহার অর্থ। وَيُؤْمِنْ بِاللَّهِ দ্বিতীয় রোকনের তথা ইল্লাল্লাহর অর্থ।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহের শর্তাবলী:
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহের সাতটি শর্ত রয়েছে যা একসাথে পাওয়া আবশ্যক। একসাথে সাতটি শর্ত পাওয়া না গেলে তা পাঠকারীর কোন উপকারে আসবে না।

শর্তগুলো নিম্নরুপ:
১- العلم আল্‌ ইলম: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌) এর অর্থ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা। আল্লাহ বলেন:
﴿فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ﴾  (سورة محمد 19)
অর্থ: জেনে রাখুন, আল্লাহ্‌ ব্যতীত (সত্য) কোন উপাস্য নেই। সূরাহ্‌ মুহাম্মাদ আয়াত ১৯।

2-اليقين  (দৃঢ় বিশ্বাস): এ কালিমা যে সকল বিষয়ের উপর প্রমাণ বহন করে তাতে দৃঢ় বিশ্বাসী হওয়া। যদি তাতে সন্দিহান ও দোদুল্যমান হয় তবে এ কালিমা তার উপকারে আসবে না। আল্লাহ বলেন:
﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا﴾
অর্থ: তারাই মু’মিন, যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর সন্দেহ পোষণ করে না। সূরাহ্‌ আল্‌ হুজরাত ১৫।
৩- القبول (গ্রহণ করা): এ কালিমা একমাত্র আল্লাহ্‌ তায়া’লার যে সকল ইবাদাত করা এবং তিনি (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) ব্যতীত  অন্যের ইবাদাত পরিত্যাগ করার প্রমাণ বহন করে তা গ্রহণ করা। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এ কালিমা পাঠ করতঃ এক আল্লাহর ইবাদাত গ্রহণ না করে, তাহলে সে ঐ সকল লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন:-
﴿إِنَّهُمْ كَانُوا إِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَسْتَكْبِرُونَ (35) وَيَقُولُونَ أَئِنَّا لَتَارِكُو آلِهَتِنَا لِشَاعِرٍ مَجْنُونٍ (36)﴾[الصافات:]
অর্থ: তাদের যখন বলা হত, আল্লাহ্‌ ব্যতীত সত্য কোন উপাস্য নেই, তখন তারা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত এবং বলত, আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগ করব। সূরাহ্‌ আস্‌ সাফ্‌ফাত আয়াত ৩৫-৩৬।

৪- الإنقياد)   (G কালিমা যে সকল বিষয়ের উপর প্রমাণ বহন করে তা স্বীকার করা: আল্লাহ বলেন:
 ﴿وَمَنْ يُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى وَإِلَى اللَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ﴾  [لقمان : 22 [
অর্থ: যে ব্যক্তি সৎকর্মপরায়ণ হয়ে স্বীয় মুখমন্ডলকে আল্লাহ্‌ অভিমূখী করে, সে এক মজবুত হাতল ধারণ করে, সকল কর্মের পরিণাম আল্লাহর দিকে। সূরাহ্‌ লুক্বমান আয়াত ২২। يُسْلِمْ وَجْهَهُ এর অর্থ: স্বীকার করা ও বিনয়ী হওয়া। الْعُرْوَةِ الْوُثْقَى হল: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ যার অর্থ: আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই।

৫- الصدق )) সত্যবাদীতা: তা হলো এ কালিমা সত্যিকার অর্থে অন্তর থেকে পাঠ করা। রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
﴿مَا مِنْ عَبْدٍ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ إِلَّا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ﴾
অর্থ: (যে ব্যক্তিই সত্যিকার অর্থে অন্তর থেকে সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্য কোন মা’বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ্‌ তাকে জাহান্নামের উপর হারাম করে দিবেন। বুখারী ও মুসলিম।
৬- (الإخلاص) খাঁটি একনিতা: তা হলো আমলকে সকল প্রকার শিরক থেকে মুক্ত করা। ফলে মুখলেস ব্যক্তি এ কালিমা পাঠের মাধ্যমে দুনিয়ার কোন লোভ লালসা করবে না। রাসূল (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
﴿إِنَّ اللَّهَ قَدْ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ﴾
অর্থ: নিশ্চয় যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ পাঠ করে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দেন। বুখারী ও মুসলিম।

৭- المحبة) ( ভালবাসা: এ কালিমা ও যে সকল বিষয়ের উপর তা প্রমাণ বহন করে এবং এর প্রতি আমলকারীগণের  প্রতি ভালবাসা থাকা। আল্লাহ বলেন:
﴿وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ﴾ [البقرة : 165[
অর্থ: আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তূ যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী।
অতএব, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ পাঠকারী মু’মিনগণ আল্লাহকে খালেসভাবে ভালবাসেন। আর মুশরিকরা আল্লাহর সাথে তিনি ব্যতীত অন্য মা’বূদদেরকেও ভালবাসে। আর ইহা (আল্লাহর সাথে অন্য মা’বূদকে ভালবাসা) লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্‌ এর পরিপন্থি ও তা ভঙ্গকারী বিষয়।



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png