শিরোনাম
Loading latest headlines...

সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

প্রশ্ন: নামাজে সেজদা থেকে ওঠার সময় টুপি তুলে মাথায় দেই, তা হলে কি নামাজের কোনো ক্ষতি হবে?

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 


প্রশ্ন: নামাজে সেজদা থেকে ওঠার সময় মাথা থেকে টুপি পড়ে যায়। এতে আমার খুব অস্বস্তি লাগে। এই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য আমি যদি সেজদা থেকে ওঠার সময় টুপি তুলে মাথায় দেই, তা হলে কি নামাজের কোনো ক্ষতি হবে?

উত্তর: আপনার প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক এবং এমন সমস্যা অনেক নামাজিরই হয়ে থাকে। নামাজে একাগ্রতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের ছোটখাটো বিষয়গুলো জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।


আপনার ক্ষেত্রে, সেজদা থেকে ওঠার সময় বা বসা অবস্থায় যদি মাথা থেকে পড়ে যাওয়া টুপি এক হাত দিয়ে মাথায় তুলে নেন, তা হলে নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না। বরং এমন পরিস্থিতিতে এক হাত ব্যবহার করে টুপি ঠিক করে নেওয়াই উত্তম। এতে আপনার অস্বস্তিও দূর হবে এবং নামাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন।


তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। টুপি ঠিক করার জন্য কখনোই দুই হাত ব্যবহার করা যাবে না। কারণ, নামাজের মধ্যে অপ্রয়োজনে দুই হাত ব্যবহার করলে তা ‘আমলে কাছির’ (বেশি নড়াচড়া) হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা নামাজ ফাসেদ বা নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে।

অতএব, নির্দ্বিধায় এক হাত দিয়ে টুপি তুলে মাথায় দিতে পারেন, আপনার নামাজে কোনো সমস্যা হবে না।


তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ১/১৫৭; শরহুল মুনইয়া ৪৪২-৪৪৩; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১/৮৫৬৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪০৮




আল-কোরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 


মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। এসকল নবী -রাসূলদেরকে গাইডবুক হিসেবে সহীফা ও কিতাব দিয়েছেন। এসব কিতাব সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কিতাব হচ্ছে আল-কোরআন। পূর্ব পূবর্বর্তী কিতাবসমূহের উপরে ঈমান আনা এবং আল-কোরআনকে মেনে চলা মুসলিমদের উপরে আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন। আল-কোরআন এসেছে বিশ্ব মানবতাকে হিদায়াতের সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘রমযান মাস, যাতে কোরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদের্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’ (সূরা আল-বাকারা-১৮৫)

             হিদায়াতের এই কিতাব আল -কোরআন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ করা হয়েছে। নিম্নে আল-কোরআন শিক্ষা করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেআলোচনা করা হলো আল-কোরআন শিক্ষা করা ফরজ আল-কোরআনের প্রথম বাণী হচ্ছে, ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক-১)

             এখানে ইক্বরা, অর্থ: পড়ো। এ আয়াতের মাধ্যমে প্রত্যেক মুসমুলিমকে আল্লাহ জানিয়ে দিলেন তোমরা যিনার জন্য, বোঝার জন্য এবং সঠিকটা মেনে চলার জন্য পড়া-লেখা করো, অধ্যয়ন করো। অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তায়ালা ফরজ করে দিয়েছেন। আর এটার বাস্তব নির্দেশ দিয়েছেন রাসূল (সা.)।

             আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলসূ (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপরে ফরজ।’ (সূনান ইবনে মাজা) জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আল-কোরআন শিক্ষা করাও প্রত্যেক মুসলমানের উপরে আল্লাহ ফরজ করে দিয়ে ছেন। রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন,

              হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলসূ (সা.) বলেছেন, তোমরা কোরআন ও ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) শিক্ষা করো এবং মানুষদেরকে শিক্ষা দাও কেননা আমাকে উঠিয়ে নেয়া হবে।’ (সূনা সূ ন আত-তিরমিযি) তাই, আমাদের উপরে কর্তব্য আল-কো রআন ও ইলমে ফারায়েজ (উত্তারাধিকার আইন) শিক্ষা করা এবং এর আলোকে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্র পরিচালনা করা। আল-কোরআন শিক্ষা সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত আল-কোরআন অধ্যয়ন করা, কোরআন জানা-বোঝার চেষ্টা করা পৃথিবীর সকল কাজের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাজ। কারণ এ কো রআনের মধ্যে রয়েছে মানুষের জীবন পরিচালনা পদ্ধতি, হিদায়াতের সঠিক পথ। প্রত্যেক কাজ শুরু করার সময় রাসূল (সা.) বিসমিল্লাহ পড়ে (আল্লাহর নাম নিয়ে) শুরু করার কথা বলে ছেন। তবে যেকোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আউযুবিযু ল্লাহি মিনাশ শাইতারিজ রাজীম’ অর্থাৎ শয়তা নের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেননি। তবে একটি কাজ করার আগে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন, সেটা হলো আল-কোরআন তিলাওয়াত বা অধ্যয়নের সময়। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘সুতরাং যখন তুমি কোরআন পড়বে তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান হতে পানাহ চাও।’ (সূরা আন-নাহল-৯৮)

হাদিস হতে কিছু কথাঃ-

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

   خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْاٰنَ وَعَلَّمَهٗ

‘যে কুরআন শরীফ শিক্ষা করে ও শিক্ষা দেয় সে-ই তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ বুখারী

মুসলিম শরীফে আছে :

اَفَلَا يَغْدُوْا اَحَدُكُمْ اِلٰى الْمَسْجِدِ فَيَتَعَلَّمُ مِنْ كِتَابِ اللهِ اٰيَتَيْنِ خَيْرٌ لَّهُ مِنْ نَاقَتَيْنِ وَثَلَاثٌ خَيْرٌلَّهُ مِنْ ثَلِاثٍ وَاَرْبَعٌ خَيْرٌلَّهُ مِنْ اَرْبَعٍ وَمِنْ اَعْدَادِهِنَّ مِنَ الْاِبِلِ.

“তোমাদের মধ্যে কেহ মসজিদে গিয়ে কুরআনের দুইটি আয়াত কেন শিক্ষা লাভ করে লয় না? কুরআনের দুইটি আয়াত শিক্ষা করা দুইটি উট অপেক্ষা অধিক ভাল। এইরূপে তিনটি আয়াত তিনটি উট অপেক্ষা এবং চারটি আয়াত চারটি উট অপেক্ষা অধিক ভাল। এমনিভাবে যত সংখ্যক আয়াত হবে, তত সংখ্যক উট হতে অধিক ভাল।”

             আল-কোরআনের এ বক্তব্য থেকে জানা যায়, শয়তান সকল কাজেই বান্দা কে কুমন্ত্রণা দেয়। তবে কোরআন অধ্যয়নের সময় শয়তান সবচেয়ে বেশি কুমন্ত্রণা দিয়ে মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করে। কোরআনের কথা যেন মানুষ বুঝতে না পারে, সে জন্য শয়তান শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করতে থাকে। মুসলমানরা কোরআন থেকে দূরে সরে থাকলে শয়তান বেশি খুশি হয়। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা কোরআন অধ্যয়নের সময় শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার কথা বলেছেন।

             এজন্য আমাদের উচিত আল- কোরআন জানা ও বোঝার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করা। আল-কোরআন হিদায়াতের একমাত্র কিতাব আল-কোরআন হচ্ছে বিশ্ব মানবাতার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব। এই কোরআনই বিশ্বের সকল মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে, হিদায়াতের আলোয় আলোকিত করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় এ কোরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরপুস্কার। আর যারা আখিরাতে ঈমান রাখে না আমি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব।’ (সূরা বনি ইসরাইল- ৯-১০)

             ‘অবশ্যই তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে আলো ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।’ (সূরাআল-মায়েদা- ১৫-১৬)

             আল-কোরআন ছাড়া অন্য কারো কাছে হিদায়াত অন্বেষণ করা যাবে না। কেউ এটা করলে আল্লাহ নিজে তাকে গুমরাহ করে দিবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্য ক্তি কোরআন ছাড়া অন্য করো কাছে হিদায়াত চাইবে, আল্লাহ তা কে পথভ্রষ্ট করে দিবেন।’ (সূনান আত-তিরমিযি) অতএব, আমাদের জীবন চলার পাথ ইসলামকে সঠিকভাবে জানার জন্য হিদায়াতের একমাত্র কিতাব আল-কোরআন শিক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে।

কুরআন শরীফের আয়াত উট অপেক্ষা অধিক ভাল, ইহা বুঝতে বেশী কিছু চিন্তার দরকার হয় না। কারণ, উট তো একমাত্র দুনিয়াতেই কাজে আসে, আর কুরআনের আয়াত দুনিয়া ও আখেরাত দু-জাহানে কাজে আসে। এখানে উটকে উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। কেননা, আরব দেশের লোকেরা উটকেই বড় সম্পত্তি মনে করে, নতুবা একটি আয়াতের পরিবর্তে সমগ্র বিশ্বেরও কোন মূল্য হয় না।

             এই হাদীস দ্বারা এই উপদেশ লাভ করা যায় যে, সমস্ত কুরআন শরীফ না পড়তে পারলেও যতটুকু পড়–ক না কেন ততটুকুতেই বড় ফযীলত ও অতি বড় নেয়ামত। হাদীসে আছে-

اَلْمَاهِرُ بِالْقُرْاٰنِ مَعَ السَّفَرَةِ الْكِرَامِ الْبَرَرَةِ وَالَّذِىْ يَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَيَتَتَعْتَعُ وَهُوَ عَلَيْهِ شَاقٌّ لَّهٗ اَجْرَانِ. بخارى

             ‘যে ব্যক্তি স্পষ্টভাবে অনায়াসে কুরআন শরীফ পড়তে পারে সে ব্যক্তি ঐ সমস্ত ফেরেশতাদের সঙ্গী হবে, যাঁরা বড়ই পবিত্র, বড়ই সম্মানী এবং যারা লোকের আমলনামা লিখেন। আর যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়ে, কিন্তু মুখে বাধবাধ ঠেকে এবং বড়ই কঠিন বোধ করে, সে-ও দ্বিগুণ সওয়াব পাবে।’ দ্বিগুণ সওয়াবের কারণ এই যে, শুধু পাঠ করার জন্য এক সওয়াব পাবে, আর পড়ার সময় কষ্টের কারণে যে বিরক্ত হয়ে পড়া ক্ষান্ত না করে পড়তে থাকে, তজ্জন্য আর একটি সওয়াব পাবে। -বুখারী শরীফ

             যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ ভালমত পাঠ করতে না পারা সত্তে¡ও বিরক্ত হয়ে পাঠ ছেড়ে দেয় না, তার জন্য এই হাদীস কত বড় খোশখবরী (সুসংবাদ) দেওয়া হয়েছে যে, তাকে দ্বিগুণ সওয়াব দেওয়া হবে। অন্য হাদীসে আছে-

اِنَّ الَّذِىْ لَيْسَ فِىْ جَوْفِه شَىْءٌ مِّنَ الْقُرْاٰنَ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ. ترمذي

             ‘যাহার সিনার মধ্যে (অন্তরে) একটুও কুরআন নাই, সে যেন একখানা উজাড় ঘর।’ -তিরমিযী কোনো মুসলমানের অন্তরই কুরআন শূণ্য থাকা চাই না। হাদীসে আছে-

مَنْ قَرَأَ مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهٗ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ اَمْثَالِهَا لَا اَقُوْلُ الۤمۤ حَرْفٌ بَلْ اَلِفٌ حَرْفٌ وَلَامٌ حَرْفٌ وَمِيْمٌ حَرْفٌ . ترمذي

             ‘যে ব্যক্তি (আল্লাহর কিতাব) কুরআন শরীফের একটি অক্ষর পড়ে, সে একটি নেকি পায়, আর প্রত্যেক নেকি দশ নেকির সমান (এই হিসাবে প্রত্যেক অক্ষরে দশ নেকি করে পাওয়া যায়)। আমি এ কথা বলি না যে, ‘আলিফ-লাম-মীম’ এক অক্ষর; বরং ‘আলিফ’ এক অক্ষর, ‘লাম’ এক অক্ষর এবং ‘মীম’ এক অক্ষর। -তিরমিযী

             এর দৃষ্টান্ত এই যে, যদি কেউ ‘আলহামদু’ পড়ে, তবে এর পাঁচটি অক্ষরের পঞ্চাশ নেকি পাবে। আল্লাহু আকবার! কত বড় ফযীলত। সুতরাং সামান্য একটু কষ্ট ও পরিশ্রম স্বীকার করে যে এত বড় ফযীলত হাসিল না করবে, তার উপর বড়ই আক্ষেপ।

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ الْقُرْاٰنَ وَعَمِلَ بِمَا فِيْهِ اُلْبِسَ وَالِدَاهٗ تَاجًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ضَوْءُهٗ اَحْسَنُ مِنْ ضَوْءِ الشَّمْسِ فِىْ بُيُوْتِ الدُّنْيَا لَوْ كَانَتْ فِيْكُمْ فَمَاظَنُّكُمْ بِالَّذِىْ عَمِلَ بِهٰذَا.

             ‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়েছে এবং উহার হুকুমের উপর আমল করেছে, তার মাতা-পিতাকে কিয়ামতের দিন এমন একটি তাজ (মুকুট) পরান হবে, যার আলোক সূর্যের আলোক হতে অধিকতর উজ্জল হবে- যে আলোক দুনিয়াতে যে সূর্য যখন তোমাদের মধ্যে আসে, তখন তোমাদের ঘরের মধ্যে হয় অর্থাৎ, সূর্য যখন কাছে আসে, তখন তোমাদের ঘরের মধ্যে কত আলো হয়, সেই তাজের আলো ইহা অপেক্ষাও অধিক হবে। যখন মাতা-পিতার এত বড় মর্তবা হবে, তখন যে ব্যক্তি স্বয়ং কুরআন শরীফ পড়বে ও তদনুযায়ী আমল করবে, তার সম্বন্ধে তোমাদের কি ধারণা? অর্থাৎ, তার মর্তবা অসীম ও অতুলনীয়।’

             ছেলে-মেয়েদেরকে যদি সময়াভাবে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ শিক্ষা না-ও দেওয়া যায়, তবে (পারা বা সূরা) যতটুকু হউক না কেন, তাই শিক্ষা দেওয়া নেহায়েত দরকার। যদি হিফজ করতে পারে, তবে তো অফুরন্ত ফযীলত।

             অনেক মুসলমান নিজের সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষার পরিবর্তে জাগতিক শিক্ষা দেওয়াটা অধিক গুরুত্ব ও গৌরবের বিষয় মনে করে। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কুরআন সহীহ-শুদ্ধতার প্রতি লক্ষ্য করা হয় না, একই সাথে কুরআনের প্রতি আদবের শিক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বহীন।

             বর্তমানে মুসলমানদের ঘর ও মসজিদ তিলাওয়াত শূন্য হয়ে গেছে। গুনাহের আসবাব দ্বারা ঘর, দোকান-পাট ভরে গেছে। একসময় মুসলমানদের ঘর-বাড়ি থেকে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ আসত। সেখান থেকে এখন আসছে গান-বাদ্যের আওয়াজ। ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি ও বরকতের জন্য কুরআন মাজীদের তিলাওয়াত করা হতো। এখন দোকান-পাটে টি.ভি. ও ভি. সি.ডি. এবং বাদ্য-বাজনার মাধ্যমে উন্নতি কামনা করা হয়। মসজিদে কুরআন মাজীদ থাকলে তা তালাবদ্ধ আলমারিতে রাখা হয়। অনেক স্থানে শুধু ব্যবস্থাপনার কারণে তিলাওয়াতের সুযোগ হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মসজিদে বা ঘরে কুরআনকে ধরা ছোঁয়ার কেউ নেই। অথচ মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত সম্পর্কে হযরত উকবা ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমরা মসজিদে নববীর সুফ্ফায় বসা ছিলাম। এমন সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কে ইহা পছন্দ কর যে, সকাল বেলা বতহান বা আকীক নামক বাজারে যেয়ে কোন রকম গোনাহ ও আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন না করে দু’টি অতি উত্তম উটনী নিয়ে আসবে? সাহাবায়ে কেরাম রাযি. আরজ করলেন, ইহা তো আমাদের সকলেই পছন্দ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মসজিদে গিয়ে দু’টি আয়াত পড়া বা দু’টি আয়াত শিক্ষা দেওয়া দু’টি উটনী হতে এবং তিনটি আয়াত তিনটি উটনী হতে এমনিভাবে চারটি আয়াত চারটি উটনী হতে উত্তম এবং ঐগুলোর সমপরিমাণ উট হতে উত্তম। -মুসলীম, আবু দাউদ

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

مَنْ قَرَأَ الْقُرْاٰنَ فَاسْتَظْهَرَهٗ فَاَحَلَّ حَلَالَهٗ وَحَرَّمَ حَرَامَهٗ اَدْخَلَهُ اللهُ الْجَنَّةَ وَشَفَّعَهُ فِىْ عَشَرَةٍ مِّنْ اَهْلِ بَيْتِهِ كُلُّهُمْ قَدْ وَجَبَتْ لَهٗ النَّارَ

             ‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফ পড়বে এবং তা হিফজ করবে এবং তার হালালকৃতকে হালাল ও হারামকৃতকে হারাম জেনে চলবে, (অর্থাৎ, কুরআনের খেলাফ যেন কোনো আকীদা না হয়। উপরে আমলের কথা বলা হয়েছিল, এখানে আকীদার কথা বলা হলো।) আল্লাহ তাকে বেহেশতে স্থান দিবেন এবং তার আত্মীয়বর্গের মধ্য হতে দশজন লোকের জন্য তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন যাদের জন্য দোযখ সাব্যস্ত হয়ে ছিল।’ -তিরমিযী

             এই হাদীসে কুরআন শরীফ হিফজ করার ফযীলত আরো বেশী বর্ণনা করা হয়েছে। আর আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী মা-বাবা। অতএব, মা বাবার জন্য যে সুপারিশ ও বখশিশ হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নাই। নিজের ছেলেকে হাফেজ বানাবে যে কত বড় ফযীলত তা এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়।

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

اِنَّ هٰذِهِ الْقُلُوْبَ تَصْدَءُ كَمَا يَصْدَءُ الْحَدِيْدُ اِذَا اَصَابَهُ الْمَاءُ قِيْلَ يَا رَسُوْلَ اللهِ! وَمَا جِلَائُهَا؟ قَالَ كَثْرَةُ ذِكْرِ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةِ الْقُرْاٰنِ. بيهقى

             ‘পানি লাগলে লোহায় যেরূপ মরিচা ধরে, সেই রকম মানুষের দিলেও মরিচা ধরে। (মজলিস হতে) আরজ করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! সেই জিনিস কি যাদ্বারা দিলকে সাফ করা যায়? রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, মৃত্যুকে বেশী স্মরণ করলে এবং কুরআন শরীফ পড়তে থাকলে। (দিল সাফ থাকে, মরিচা ধরে না)।’ -বায়হাকী

وَعَنْ جَابِرٍ قَالَ خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَنَحْنُ نَقْرَأُ الْقُرْاٰنَ وَفِيْنَا الْعَرَبِىُّ وَالْعَجَمِىُّ فَقَالَ اقْرَؤُوْا فَكُلٌّ حَسَنٌ

             ‘হযরত জাবের রাযি. হতে বর্ণিত আছে যে, একবার রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এমতাবস্থায় তাশরীফ আনলেন, যখন আমরা কুরআন শরীফ পাঠ করছিলাম, তখন আমাদের মধ্যে পাড়াগাঁয়ের লোকও ছিল। (আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আরবী লোক ছিল, তারা কুরআন শরীফ শুদ্ধভাবে পড়তে পারত, আর কয়েকজন পাড়াগাঁয়ের লোকও ছিল, যারা শুদ্ধভাবে কুরআন শরীফ পড়তে পারত না।) হযরত বললেন, পড়তে থাক, সবই ভাল।’

             অর্থাৎ চেষ্টা করতে থাক যদি তা সত্তে¡ও ভালো পড়তে না পার তাতে মন ছোট করো না, আর যারা ভালো পড়তে পারে, তারা যেন তোমাদেরকে ঘৃণা না করে। (আল্লাহ তা‘আলা দিল দেখেন।) একথা দ্বারা বুঝা গেল যে, ‘জবান (মুখ) সাফ নয় বা বয়স বেশি হয়ে গিয়েছে, এমতাবস্থায় সহীহ করে (শুদ্ধ করে) পড়তে পারা যাবে না, সুতরাং সওয়াব কি হবে? বরং গোনাহ (পাপ) হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ এমন মনে করা উচিত নয়। বরং রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকলকে সান্তনা দিয়ে পড়তে বললেন।

মিশকাত শরীফে আছে-

مَنِ اسْتَمَعَ اِلٰى اٰيَةٍ مِنْ كِتَابِ اللهِ كَتَبَتْ لَهٗ حَسَنَةٌ مُّضَاعَفَةٌ وَمَنْ تَلَاهَا كَانَتْ لَهٗ نُوْرًا يَّوْمَ الْقِيَامَةِ

             ‘যে ব্যক্তি কুরআন শরীফের একটি আয়াত শুনার জন্যও কান লাগাবে অর্থাৎ মনোযোগের সাথে শুনবে, তাকে এমন একটি নেকি (পূণ্য) দেওয়া হবে, যা সর্বদা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। (কতদূর যে বাড়বে তার কোন সীমা নির্দেশ করেন নাই। অতএব, আল্লাহ তা‘আলার রহমতের দরবারে আশা করা যায় যে, ইহা ধারণাতীত বাড়বে।) আর যে ব্যক্তি সে আয়াতটি পাঠ করবে, তার জন্য সেই আয়াতটি কিয়ামতের দিবসে একটি উজ্জল নূর হবে।’ আহমদ

কুরআন শরীফ কত বরকতের জিনিস। যদি নিজে পড়তে না পারে, তবে কোনো কুরআন পাঠকের পড়ার দিকে কান লাগিয়ে শুনলেও বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। হে আল্লাহর বান্দা! ইহা তো কিছুই কঠিন নয়। (এখনও জাগ, আখেরাতের জন্য একটু চিন্তা কর, অলস্য নিদ্রা পরিত্যাগ কর, আর ঘুমে বিভোর থেকো না।)

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

اِقْرَؤُوْا الْقُرْاٰنَ فَاِنَّهٗ يَأْتِىْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيْعًا لِّاَصْحَابِه – مسلم

             ‘(হে আমার উম্মতগণ!) তোমরা কুরআন শরীফ সর্বদা তিলাওয়াত করতে থাক; কেননা যারা কুরআন শরীফ সর্বদা তিলাওয়াত করবে, কিয়ামতের দিন কুরআন শরীফ তাদের জন্য সুপারিশ করবে (তাদেরকে দোযখ হতে বাঁচিয়ে দিবে)।

রাসুলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন-

يَجِيْئُ صَاحِبُ الْقُرْاٰنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيَقُوْلُ الْقُرْاٰنُ يَا رَبِّ حَلِّه فَيُلْبَسُ تَاجُ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُوْلُ يَا رَبِّ زِدْهُ فَيُلْبَسُ حُلَّةُ الْكَرَامَةِ ثُمَّ يَقُوْلُ يَارَبِّ اِرْضَ عَنْهٗ فَيُرْضٰى عَنْهُ فَيُقَالُ اِقْرَأْ وَارْقَ وَيَزْدَادُ بِكُلِّ اٰيَةٍ حَسَنَةٌ-  ترمذى

             কুরআন শরীফ পাঠকারীগণ কিয়ামতের দিবসে যখন আল্লাহর দরবারে আসবে, তখন কুরআন শরীফ বলবে, ‘হে আল্লাহ! তাদেরকে সম্মানের লেবাস পরিধান করান। অতঃপর তাদেরকে বড় সম্মানের তাজ পরান হবে। অতঃপর কুরআন শরীফ পুনরায় বলবে, ‘হে আল্লাহ! তাদেরকে আরো দিন।’ তখন তাদেরকে আরো সম্মানের লেবাস পরান হবে। পুনরায় কুরআন শরীফ বলবে, ‘হে আল্লাহ! আপনি তাদের উপর চিরকালের জন্য সন্তুষ্ট হয়ে যান।’ অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর চিরকালের জন্য সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন এবং বলবেন: ‘কুরআন শরীফের এক একটি আয়াত পাঠ করো এবং এক একটি উচ্চ দর্জায় আরোহণ করতে থাক।’

             অন্য এক হাদীসে এই পড়া এবং উপরের দর্জায় চড়ার বিস্তৃত বর্ণনা এসেছে। যা এরূপ: ‘যে ভাবে দুনিয়াতে তারতীলের সাথে পড়তে সেই রকম পড়তে ও চড়তে থাকো; যে আয়াতে গিয়ে তোমার পড়া শেষ হবে সেখানেই তোমার থাকার স্থান।’

হে মুসলমানগণ!

             এই সকল হাদীস খুব চিন্তার সাথে পাঠ করুন। কুরআন শরীফ অমূল্য রত্ন , যত্নের সাথে শিক্ষা লাভ করুন এবং নিজের ছেলে-মেয়েদেরকেও শিক্ষা দিতে চেষ্টা করুন। যদি সহীহ করে পড়তে না পারা যায়, তবে ঘাবরানোর কোনো কারণ নাই। চেষ্টা করতে থাকলেও বহু সওয়াব পাওয়া যাবে। যদি হিফজ (কণ্ঠস্থ) না হয়, তবে দেখে দেখে পড়তে ও পড়াতে থাকবে। তাতে অনেক ফযীলত হাসিল হবে। যদি সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ পাঠ শিক্ষা লাভ করার সময় ও সুযোগ না ঘটে, তবে যারা সম্পূর্ণ কুরআন শিক্ষা লাভ করেছেন তাদের নিকট বসে শুনলেও অনেক সওয়াব পাওয়া যাবে।

সকলেরই জানা আছে যে, যে সকল কাজ অত্যন্ত দরকারী তা করাতে সওয়াব পাওয়া যায়, অথচ তা হাসিল করার উপায়গুলি অর্জন করা যেমন জরূরী বা দরকারী, তেমন তাতে অফুরন্ত সওয়াবও নিহিত আছে।

             অতএব, কুরআন শরীফ শিক্ষার বন্দোবস্ত করাও নেহায়েত জরূরী এবং তাতে অশেষ সওয়াব আছে। প্রতি গ্রামে মুসলমান ভাইগণ মিলিতভাবে চেষ্টা করবেন, যাতে গ্রামে গ্রামে, মহল্লায় মহল্লায় কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য মক্তব স্থাপিত হয়। সেই মক্তবে ছেলে-মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার বন্দোবস্ত করা একান্ত দরকার। বয়স্কদেরও কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য কিছু সময় বের করতে হবে। দুনিয়ার সমস্ত কাজ-কর্মের জন্য সময় মিলে, আর আল্লাহর কালাম কুরআন শরীফ শিক্ষার জন্য সময় মিলবে না?

             শিক্ষক যদি বিনা বেতনে পাওয়া যায়, তবে ভালই। নতুবা সকলে মিলে চাঁদা করে শিক্ষকের জীবিকা নির্বাহের যোগ্য কিছু সম্বল সংগ্রহ করে দেওয়া দরকার। যে সমস্ত ছেলেরা দারিদ্রতার কারণে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ পড়তে পারে না, তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে দেওয়া আবশ্যক। এই প্রথা বাংলাদেশ ব্যতীত অন্যান্য ইসলামী দেশে এখনও প্রচলিত আছে, যেমন- দেওবন্দ, সাহারানপুর, থানাভবন এবং অন্যান্য মাদরাসায় ছাত্রগণ নিশ্চিন্ত হয়ে সম্পূর্ণ কুরআন শরীফ শিক্ষা করতে পারে। আর ছেলেরা মক্তবে যতটুকু শিক্ষা করবে, ততটুকু তারা বাড়ীর মেয়েদেরকে শিক্ষা দিলে স্ত্রী-পুরুষ সকলেই কুরআন শরীফ শিক্ষা করতে পারে। যদি কেউ আমপাড়া দেখে পড়তে না পারে, তবে অন্ততপক্ষে কিছু সংখ্যক সূরা মুখস্ত পড়ে নেওয়া আবশ্যক।

কুরআনে কারীমের প্রতি ইমামে আ‘জমের আযমত

             আবু হানীফা রহ. ইজতিহাদে সবচেয়ে বড় ও বিজ্ঞ ইমাম ছিলেন। এ কারণে তাকে ‘ইমামে আযম’ বলা হয়। তিনি কুরআন শরীফের বড় আশেক ছিলেন। ছিলেন কুরআনী জ্ঞানের মহাপÐিত। কুরআন ও হাদীসের আলোকে ফিক্হের প্রবর্তন করেছেন। তিনি অত্যন্ত খোদাভীরু ও কোমল হৃদয়ের অধীকারী ছিলেন। ইলম ও আলেমদের তিনি খুবই সম্মান করতেন। কুরআন শরীফের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতি আন্তরিক অনুভব করতেন। তাদের প্রতি ছিল তার ঐকান্তিক ভালোবাসা। তাঁদেরকে খুশি করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতেন। তাঁদের সেবায় থাকতেন উৎসর্গিত।

             একদিনের ঘটনা। তাঁর ছেলে যেদিন শিক্ষকের নিকট পবিত্র কুরআনের সবক শুরু করল, সেদিন তিনি ছেলের শিক্ষকের খেদমতে পাঁচ হাজার দিরহাম (রৌপ্য মুদ্রা) উপঢৌকন স্বরূপ পেশ করলেন। এরপর যেদিন তাঁর ছেলে সূরা ফাতিহা শেষ করল, সে দিনও তিনি শিক্ষকের খিদমতে পাঁচ হাজার দেরহাম হাদিয়া স্বরূপ পেশ করলেন এবং অতি ন¤্রতা ও বিনয়ের সঙ্গে আরয করলেন, “আল্লাহর কসম, যদি আমার নিকট এর চেয়েও বেশি দেরহাম থাকত, তবে অবশ্যই তাও আপনার খেদমতে পেশ করতাম।”



হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর জীবনী

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 



জন্ম ও শৈশব

  • হযরত মূসা (আঃ) বনি ইসরাইল গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন।

  • সে সময় মিশরের ফেরাউন ঘোষণা দিয়েছিল, বনি ইসরাইলের প্রতিটি পুরুষ শিশু হত্যা করা হবে, কারণ সে শুনেছিল এক শিশু জন্ম নেবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।

  • মূসা (আঃ)-এর জন্মের পর আল্লাহর নির্দেশে তাঁর মা তাঁকে একটি ছোট বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন

  • বাক্সটি ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার হাতে এসে পৌঁছে। তিনি তাকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেন এবং প্রাসাদে লালনপালন করেন।

  • ছোটবেলায় মূসা (আঃ) ফেরাউনের কোলে বসে তাঁর দাড়ি টেনে ধরেন। ফেরাউন সন্দেহ করলে আগুন ও খেজুরের দানা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। মূসা (আঃ) আগুনের কয়লা মুখে দিয়ে জিভ পুড়িয়ে ফেলেন, ফলে তাঁর কথা কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে যায়।


যৌবন ও ঘটনা

  • যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ স্বভাবের ছিলেন।

  • একদিন তিনি দেখলেন এক মিশরীয় সৈন্য এক ইসরাইলীয়কে নির্যাতন করছে। তিনি তাকে রক্ষা করতে গিয়ে ভুলবশত মিশরীয়কে আঘাত করেন এবং সে মারা যায়

  • এরপর ভয়ে মূসা (আঃ) মিশর ছেড়ে মাদইয়ান নগরে পালিয়ে যান

  • সেখানে তিনি নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং কয়েক বছর তাঁর সেবা করেন।


নবুওত প্রাপ্তি

  • একদিন সীনাই পর্বতের কাছে মূসা (আঃ) আগুন দেখতে পান।

  • কাছে গিয়ে আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলেন। এ কারণেই তাঁকে বলা হয় কালিমুল্লাহ (যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন)।

  • আল্লাহ তাঁকে নবী হিসেবে মনোনীত করেন এবং ফেরাউনের কাছে গিয়ে বনি ইসরাইলকে মুক্ত করার দায়িত্ব দেন।

  • মূসা (আঃ)-কে দুইটি মুজিজা (অলৌকিক নিদর্শন) প্রদান করা হয়:

    1. লাঠি – যা সাপ হয়ে যেত।

    2. হাত – কাপে রাখলে বের হতো উজ্জ্বল আলো।


ফেরাউনের সঙ্গে মোকাবিলা

  • মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সাথে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।

  • ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলে জাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করায়।

  • মূসা (আঃ)-এর লাঠি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে জাদুকরদের জাদু গ্রাস করে নেয়।

  • এতে অনেক জাদুকর ঈমান আনয়ন করে মুসলমান হয়ে যায়, যদিও ফেরাউন তাদের কঠোর শাস্তি দেয়।


বনি ইসরাইল মুক্তি

  • ফেরাউন কোনোভাবেই বনি ইসরাইলকে মুক্তি দিতে রাজি হয়নি।

  • আল্লাহ তাঁর উপর বিভিন্ন আজাব পাঠান (পঙ্গপাল, উকুন, রক্ত, ব্যাঙ ইত্যাদি)।

  • শেষে মূসা (আঃ) বনি ইসরাইলকে নিয়ে মিশর থেকে বেরিয়ে যান।

  • ফেরাউন সেনাবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, আল্লাহর হুকুমে মূসা (আঃ) লাঠি দ্বারা সমুদ্র আঘাত করেন

  • সমুদ্র দুইভাগ হয়ে যায়, বনি ইসরাইল পার হয়ে যায়।

  • ফেরাউন ও তার সেনারা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারে।


তাওরাত প্রাপ্তি

  • মুক্তির পর মূসা (আঃ) সীনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদত করেন।

  • সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত প্রদান করেন – যা বনি ইসরাইলের জন্য হিদায়াতের গ্রন্থ।

  • কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে কিছু লোক বাছুর পূজা শুরু করে। মূসা (আঃ) ফিরে এসে তাদের কঠোরভাবে শাস্তি দেন।


মৃত্যু

  • হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনি ইসরাইলকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে।

  • মৃত্যুর সময় আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (ফিলিস্তিন) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই পৌঁছান।

  • সহিহ হাদিসে আছে, ফেরেশতা তাঁর রূহ কবজ করেন এবং তাঁকে এমন স্থানে কবর দেওয়া হয়, যেখানে আজও সঠিকভাবে চিহ্ন জানা যায় না।


শিক্ষা:
হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবনে আমরা ধৈর্য, সাহস, আল্লাহর উপর আস্থা এবং তাওহীদের প্রতি অটল থাকার শিক্ষা পাই।



হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) – একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ঐতিহাসিক জীবনী

জন্ম ও শৈশবকাল

হযরত মূসা (আঃ) বনী ইসরাইল বংশে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় মিশরের ফেরাউন (রামেসিস বা মির্সা ফেরাউন বলে ইতিহাসে পরিচিত) অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছিল।

  • এক রাতে ফেরাউন স্বপ্ন দেখে বা তার জ্যোতিষীরা তাকে জানায় যে, বনী ইসরাইলের মধ্যে একটি ছেলে জন্মাবে, যে তার রাজত্ব ধ্বংস করবে।

  • তখন ফেরাউন হুকুম দেয়, প্রতিটি নবজাতক পুত্র সন্তানকে হত্যা করতে হবে এবং কেবল কন্যাশিশুদের বাঁচিয়ে রাখা হবে।

মূসা (আঃ) জন্মের পর তাঁর মা ইউখাবিদ ভয় পেয়ে যান। আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম আসে:

"তুমি তাকে দুধ পান করাও, আর যদি ভয় পাও তবে তাকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। আমি তাকে তোমার দিকে ফিরিয়ে দেব এবং নবী বানাব।" (সূরা কাসাস: ৭)

তিনি শিশুকে একটি বাক্সে রেখে নাইল নদীতে ভাসিয়ে দেন। আল্লাহর কুদরত এমনভাবে কাজ করলো যে বাক্সটি গিয়ে পৌঁছায় ফেরাউনের প্রাসাদে। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুজাহিম (যিনি ঈমানদার মহিলা ছিলেন) শিশুটিকে দেখে দয়া করে বলেন:

"এ শিশুটি আমাদের জন্য শীতল চোখ হবে, একে হত্যা করো না।" (সূরা কাসাস: ৯)

ফলে মূসা (আঃ) ফেরাউনের প্রাসাদেই বড় হতে থাকেন।


যৌবন ও মিশরের ঘটনা

যৌবনে মূসা (আঃ) ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী ছিলেন। একদিন দেখলেন এক মিশরীয় (কপ্টি) একজন ইসরাইলীকে অন্যায়ভাবে মারছে। মূসা (আঃ) তাকে রক্ষা করতে গিয়ে আঘাত করেন, এতে লোকটি মারা যায়। (সূরা কাসাস: ১৫)

ভয়ে তিনি প্রার্থনা করেন:

"হে আল্লাহ, আমি নিজের উপর জুলুম করে ফেলেছি, আমাকে ক্ষমা কর।"

আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করেন।

পরের দিন তিনি আবার দেখলেন ঐ একই ইসরাইলী আরেকজনের সাথে ঝগড়া করছে। এবার মূসা (আঃ) তাকে বকাঝকা করলেন। এতে মিশরীয়রা সন্দেহ করে ফেলে। খবর পৌঁছে যায় ফেরাউনের কাছে, এবং তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র হয়।

একজন মিশরীয় মুসলমান (ঐতিহাসিকভাবে মুমিনে আলে ফেরাউন নামে পরিচিত) তাকে সতর্ক করে দেন। তখন মূসা (আঃ) মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ানের দিকে চলে যান


মাদইয়ান জীবন

মাদইয়ান শহরে গিয়ে তিনি এক কূপের পাশে দেখলেন অনেক লোক পশুকে পানি খাওাচ্ছে। দুই তরুণী মেয়েকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি তাদের সাহায্য করেন।
তারা ছিল নবী শুআইব (আঃ)-এর কন্যা। শুআইব (আঃ) মূসা (আঃ)-কে আমন্ত্রণ জানান এবং পরে নিজের কন্যাকে তাঁর সাথে বিবাহ দেন। মূসা (আঃ) প্রায় ৮–১০ বছর মাদইয়ানে বসবাস করেন।


নবুওত প্রাপ্তি

একদিন মূসা (আঃ) পরিবার নিয়ে সিনাই মরুভূমি পেরোচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি তূর পর্বতের কাছে আগুনের শিখা দেখতে পান। আগুন আনতে গেলে আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করেন:

"হে মূসা! আমি তোমার প্রতিপালক। জুতা খুলে ফেল, তুমি পবিত্র উপত্যকা তূয়ায় আছ। আমি তোমাকে নবী বানালাম।" (সূরা ত্বাহা: ১১–১৩)

তাঁকে দুটি মুজিজা দেওয়া হয়:

  1. লাঠি ফেলে দিলে বিশাল সাপে পরিণত হতো।

  2. হাত কাপড়ে রেখে বের করলে উজ্জ্বল আলো ছড়াত।

আল্লাহ তাঁকে আদেশ করলেন: ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করতে হবে।


ফেরাউনের দরবারে দাওয়াত

মূসা (আঃ) ভাই হারুন (আঃ)-কে সঙ্গে নিয়ে ফেরাউনের দরবারে যান।
তিনি বললেন:

"আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল হয়ে এসেছি, বনী ইসরাইলকে আমাদের সাথে পাঠাও।"

ফেরাউন অহংকারভরে বলল:

"আমি তো তোমার লালনপালন করেছি, তবু তুমি অকৃতজ্ঞ! আমিই তো তোমার উপরে প্রভু।"

মূসা (আঃ) অলৌকিক নিদর্শন দেখালেন। কিন্তু ফেরাউন তাকে মিথ্যুক বলল এবং প্রতিযোগিতার জন্য দক্ষ জাদুকরদের একত্র করল।


জাদুকরদের পরাজয়

জাদুকররা লাঠি ও দড়ি নিক্ষেপ করল, সেগুলো মানুষের চোখে সাপের মতো মনে হলো।
মূসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর লাঠি নিক্ষেপ করলেন, সেটি বিশাল সাপে রূপ নিয়ে সব জাদু গ্রাস করল।

জাদুকররা সাথে সাথে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে বলল:

"আমরা মূসা ও হারুনের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছি।"

ফেরাউন রেগে তাদের হুমকি দিলেও অনেকেই ঈমান নিয়ে শহীদ হন।


বনী ইসরাইল মুক্তি

ফেরাউন ক্রমেই জেদ বাড়াতে থাকে। আল্লাহ তার উপর বিভিন্ন আজাব নাজিল করেন – খরা, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত ইত্যাদি। তবুও সে ঈমান আনেনি।

শেষে আল্লাহর নির্দেশে মূসা (আঃ) রাতের অন্ধকারে বনী ইসরাইলকে নিয়ে বেরিয়ে যান।
ফেরাউন সৈন্যবাহিনী নিয়ে তাদের পিছু নিলে, লোহিত সাগরের তীরে মূসা (আঃ) লাঠি আঘাত করলেন। সমুদ্র ফেটে বারোটি রাস্তা বের হলো।

বনী ইসরাইল নিরাপদে পার হলো, কিন্তু ফেরাউন ও তার সৈন্যরা প্রবেশ করলে সমুদ্র মিলিত হয়ে তাদের সবাইকে ডুবিয়ে মারল।

কুরআনে আল্লাহ বলেন: "আজ আমি তোমার দেহকে বাঁচিয়ে রাখব, যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হও।" (সূরা ইউনুস: ৯২)


তাওরাত প্রাপ্তি

মুক্তির পর মূসা (আঃ) সিনাই পর্বতে ৪০ দিন ইবাদতে লিপ্ত হন। সেখানে আল্লাহ তাঁকে তাওরাত দান করেন, যা ছিল বনী ইসরাইলের জন্য হিদায়াত ও শরীয়তের গ্রন্থ।

তবে এ সময় তাঁর অনুপস্থিতিতে সামিরি নামক একজন বাছুরের মূর্তি বানিয়ে অনেককে বিভ্রান্ত করে। তারা বাছুর পূজা শুরু করে।
ফিরে এসে মূসা (আঃ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের তাওবা করতে বাধ্য করেন।


মৃত্যু

হযরত মূসা (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করেন বনী ইসরাইলকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে।
তাঁর শেষ বয়সে আল্লাহ তাঁকে পবিত্র ভূমি (বায়তুল মুকাদ্দাস) প্রবেশের অনুমতি দেননি, বরং সীমান্ত পর্যন্তই নিয়ে আসেন।

সহীহ হাদীসে আছে, মূসা (আঃ)-এর রূহ কবজ করা হয় এবং তাঁকে এমন এক স্থানে দাফন করা হয়, যার সঠিক অবস্থান আজও অজানা।


শিক্ষা ও বার্তা

হযরত মূসা (আঃ)-এর জীবন থেকে আমরা পাই –

  • আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রাখা।

  • অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান

  • ধৈর্য ও সাহস

  • তাওহীদ ও শিরক বর্জন

তিনি ছিলেন কুরআনে সর্বাধিক উল্লেখিত নবী, যার ঘটনা থেকে মুসলমানরা প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ করে।



বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বনি ইসরাইলের ইতিহাস ও শিক্ষা

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 


বনি ইসরাইলের ইতিহাস ও শিক্ষা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়। কুরআনে তাদের সম্পর্কে বহুবার আলোচনা এসেছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার।

🕰️ ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

  • উৎপত্তি: “ইসরাইল” নামটি হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর উপাধি। তাঁর বংশধরদের বলা হয় “বনি ইসরাইল”।
  • বংশধারা: হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর দুই পুত্র—ইসমাইল (আঃ) ও ইসহাক (আঃ)। ইসহাক (আঃ)-এর পুত্র ইয়াকুব (আঃ)-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইল জাতির সূচনা।
  • মিসরে আগমন: হযরত ইউসুফ (আঃ)-এর মাধ্যমে বনি ইসরাইলরা মিসরে বসতি স্থাপন করে এবং দীর্ঘকাল শাসন করে।
  • ফিরাউনের অত্যাচার: পরবর্তীতে ফিরাউনদের শাসনে তারা নিপীড়িত হয়। হযরত মূসা (আঃ) তাদের মুক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হন।
  • লোহিত সাগর পার হওয়া: মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে তারা সাগর পার হয়ে মুক্তি লাভ করে এবং সিনাই অঞ্চলে আশ্রয় নেয়।

📚 শিক্ষাগুলো

  1. আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের গুরুত্ব
    তারা বহুবার আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে, যার ফলে শাস্তি পেয়েছে। এটি মুসলিমদের জন্য সতর্কবার্তা।

  2. নবীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুসরণ
    বনি ইসরাইল বহু নবী পেয়েছে, কিন্তু অনেক সময় তাদের অমান্য করেছে। মুসলিমদের উচিত নবীদের আদর্শ অনুসরণ করা।

  3. নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা
    আল্লাহ তাদের অনেক নিয়ামত দিয়েছেন, কিন্তু তারা তা অবহেলা করেছে। কৃতজ্ঞতা না জানালে নিয়ামত হারানোর সম্ভাবনা থাকে।

  4. ঐক্য ও নেতৃত্বের গুরুত্ব
    মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে তারা মুক্তি পেয়েছে, যা নেতৃত্বের গুরুত্ব বোঝায়।

  5. আত্মসমালোচনার শিক্ষা
    কুরআনে তাদের ভুলগুলো তুলে ধরা হয়েছে যেন মুসলিমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।


কুরআনের ধর্মীয় নীতিগুলো শুধু তত্ত্ব নয়—এগুলো জীবনের প্রতিটি স্তরে ব্যবহারযোগ্য একেকটি বাস্তব নির্দেশনা। তুমি যেহেতু বাস্তবভিত্তিক, ব্যবহারিক সমাধানে আগ্রহী, তাই নিচে আমি কুরআনের নীতিগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের ৫টি উপায় দেখাচ্ছি, সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আয়াত ও বাস্তব উদাহরণ:


🧭 ১. নৈতিকতা ও আচরণে প্রয়োগ

আয়াত: “তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।” — সুরা আল ইমরান ৩:১০৪
প্রয়োগ:

  • অফিসে বা পরিবারে অন্যায় দেখলে নম্রভাবে প্রতিবাদ করা।
  • নিজের আচরণে সততা, নম্রতা, ও সহনশীলতা বজায় রাখা।

💼 ২. পেশাগত জীবনে সততা

আয়াত: “তোমরা পরিমাপে কম দিও না।” — সুরা হুদ ১১:৮৪
প্রয়োগ:

  • ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা, অতিরিক্ত দাবি না করা।
  • API ব্যবহারে লাইসেন্স ও কনটেন্টের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা (তোমার নীতির সঙ্গে মিলেই যায়!)।

🕊️ ৩. সম্প্রীতি ও সহনশীলতা

আয়াত: “তোমরা ভালো ও খারাপ সমান করতে পারো না। তুমি ভালো ব্যবহার করো, তাহলে শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হবে।” — সুরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪
প্রয়োগ:

  • পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বে উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা।
  • ভাষা শেখার সময় অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করা (তোমার ভাষা-আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে)।

🕰️ ৪. সময় ও দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা

আয়াত: “সময়ের শপথ, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” — সুরা আসর ১০৩:১–৩
প্রয়োগ:

  • প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা করা (প্রজেক্ট টাইমলাইন, UI/UX টাস্ক ইত্যাদি)।
  • প্রার্থনার সময় ঠিক রাখা—যেমন তুমি প্রার্থনার সময় উইজেট বানিয়েছো!

🧠 ৫. জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার চর্চা

আয়াত: “তারা কি চিন্তা করে না?” — সুরা রুম ৩০:৮
প্রয়োগ:

  • প্রযুক্তি ও ধর্মের সংমিশ্রণে নতুন সমাধান খোঁজা (যেমন বাংলা ভাষায় ইসলামিক কনটেন্ট বা লোকালাইজড ফিচার)।
  • কুরআনের আয়াতগুলোকে UI-তে যুক্ত করে ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

চমৎকার অনুরোধ, aopurbo! কুরআনে বনি ইসরাইল সম্পর্কে বহু আয়াত এসেছে, যেগুলো শুধু ঐতিহাসিক নয়—বরং গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা বহন করে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত তুলে ধরছি, সঙ্গে বিশ্লেষণও:


🕊️ ১. সুরা বাকারা, আয়াত ৪৭

“হে বনি ইসরাইল! আমার সে অনুগ্রহ স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছিলাম এবং তোমাদেরকে বিশ্ববাসীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।”

বিশ্লেষণ:

  • আল্লাহ তাদেরকে নবী, কিতাব, খাদ্য, নিরাপত্তা—সবকিছু দিয়েছিলেন।
  • কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্ব ছিল শর্তসাপেক্ষ: আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তিতে।
  • শিক্ষা: মর্যাদা ধরে রাখতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।

🔥 ২. সুরা বাকারা, আয়াত ১০০

“তারা যখনই কোনো অঙ্গীকার করে, তখনই তা ভঙ্গ করে; বরং তাদের অধিকাংশই বিশ্বাসহীন।”

বিশ্লেষণ:

  • বনি ইসরাইলের মধ্যে চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সাধারণ প্রবণতা।
  • শিক্ষা: মুসলিমদের উচিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।

💰 ৩. সুরা হাশর, আয়াত ১৩

“আসলে তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয়ই বেশি, কারণ তারা অবুঝ সম্প্রদায়।”

বিশ্লেষণ:

  • তারা বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও অন্তরে দুর্বল ছিল।
  • শিক্ষা: প্রকৃত শক্তি আসে আল্লাহর প্রতি ভয় ও তাকওয়া থেকে।

🌍 ৪. সুরা মায়িদা, আয়াত ৬৪

“তারা যতবার যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দিয়েছেন। তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, আর আল্লাহ বিশৃঙ্খল ব্যক্তিদের ভালোবাসেন না।”

বিশ্লেষণ:

  • বনি ইসরাইলের মধ্যে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার প্রবণতা ছিল।
  • শিক্ষা: শান্তি ও সুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের মূলনীতি।

📖 ৫. সুরা ইসরা (বনী ইসরাঈল), আয়াত ৪

“আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে বলে দিয়েছি, তোমরা পৃথিবীতে দু’বার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত অহংকারে লিপ্ত হবে।”

বিশ্লেষণ:

  • ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে বলা হয়েছে, তারা দুইবার বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাবে।
  • শিক্ষা: অহংকার ও অবাধ্যতা জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

কুরআনের ধর্মীয় নীতিগুলো শুধু তত্ত্ব নয়—এগুলো জীবনের প্রতিটি স্তরে ব্যবহারযোগ্য একেকটি বাস্তব নির্দেশনা। তুমি যেহেতু বাস্তবভিত্তিক, ব্যবহারিক সমাধানে আগ্রহী, তাই নিচে আমি কুরআনের নীতিগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগের ৫টি উপায় দেখাচ্ছি, সঙ্গে প্রাসঙ্গিক আয়াত ও বাস্তব উদাহরণ:


🧭 ১. নৈতিকতা ও আচরণে প্রয়োগ

আয়াত: “তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।” — সুরা আল ইমরান ৩:১০৪
প্রয়োগ:

  • অফিসে বা পরিবারে অন্যায় দেখলে নম্রভাবে প্রতিবাদ করা।
  • নিজের আচরণে সততা, নম্রতা, ও সহনশীলতা বজায় রাখা।

💼 ২. পেশাগত জীবনে সততা

আয়াত: “তোমরা পরিমাপে কম দিও না।” — সুরা হুদ ১১:৮৪
প্রয়োগ:

  • ওয়েব ডেভেলপমেন্টে ক্লায়েন্টের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা, অতিরিক্ত দাবি না করা।
  • API ব্যবহারে লাইসেন্স ও কনটেন্টের নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা (তোমার নীতির সঙ্গে মিলেই যায়!)।

🕊️ ৩. সম্প্রীতি ও সহনশীলতা

আয়াত: “তোমরা ভালো ও খারাপ সমান করতে পারো না। তুমি ভালো ব্যবহার করো, তাহলে শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হবে।” — সুরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪
প্রয়োগ:

  • পারিবারিক বা সামাজিক দ্বন্দ্বে উত্তেজনা না বাড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা।
  • ভাষা শেখার সময় অন্য সংস্কৃতিকে সম্মান করা (তোমার ভাষা-আগ্রহের সঙ্গে মিল রেখে)।

🕰️ ৪. সময় ও দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা

আয়াত: “সময়ের শপথ, মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, তবে যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে, এবং সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়।” — সুরা আসর ১০৩:১–৩
প্রয়োগ:

  • প্রতিদিনের কাজের পরিকল্পনা করা (প্রজেক্ট টাইমলাইন, UI/UX টাস্ক ইত্যাদি)।
  • প্রার্থনার সময় ঠিক রাখা—যেমন তুমি প্রার্থনার সময় উইজেট বানিয়েছো!

🧠 ৫. জ্ঞান ও চিন্তাশীলতার চর্চা

আয়াত: “তারা কি চিন্তা করে না?” — সুরা রুম ৩০:৮
প্রয়োগ:

  • প্রযুক্তি ও ধর্মের সংমিশ্রণে নতুন সমাধান খোঁজা (যেমন বাংলা ভাষায় ইসলামিক কনটেন্ট বা লোকালাইজড ফিচার)।
  • কুরআনের আয়াতগুলোকে UI-তে যুক্ত করে ব্যবহারকারীদের জন্য শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা তৈরি করা।





নূহ (আঃ)-এর কাহিনীর আধুনিক নৈতিক শিক্ষা- পর্ব-০৭

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 


অসাধারণ 🌿 এবার আমরা নূহ (আঃ)-এর কাহিনীর আধুনিক নৈতিক শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ করব।

১. দাওয়াত ও অধ্যবসায়

  • নূহ (আঃ) প্রায় ৯৫০ বছর ধৈর্যের সাথে মানুষকে আহ্বান করেছেন।

  • শিক্ষা: সত্য ও ন্যায়ের পথে দাঁড়ালে ফলাফল তৎক্ষণাৎ নাও আসতে পারে, কিন্তু ধৈর্যই হলো দাওয়াতকর্মীর আসল শক্তি।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • সামাজিক সংস্কারক, মানবাধিকারকর্মী বা শিক্ষাবিদদের জন্য অধ্যবসায় অপরিহার্য।

    • অনলাইনে ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে দাওয়াতের ক্ষেত্রেও ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা জরুরি।


২. ঈমান বনাম বংশ

  • তাঁর স্ত্রী ও পুত্র অবিশ্বাসী হওয়ায় ধ্বংস হয়।

  • শিক্ষা: রক্তের সম্পর্ক মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় না, ঈমানই আসল পরিচয়।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • পরিবার, সামাজিক মর্যাদা বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়—নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

    • আধুনিক সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার গুরুত্ব এখানে প্রতিফলিত।


৩. প্রকৃতি ও পরিবেশ সচেতনতা

  • কোরআন বর্ণনা করে, নৌকায় প্রতিটি প্রজাতির জোড়া রাখা হয়েছিল (হুদ ১১:৪০)।

  • শিক্ষা: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আল্লাহর ইচ্ছার অংশ।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা—এসব ক্ষেত্রে নূহ (আঃ)-এর কাহিনী সতর্কবার্তা।

    • টেকসই জীবনধারা ও প্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব মানুষের ওপরই।


৪. প্রযুক্তি ও মানবসৃজনশীলতা

  • নূহ (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে এক বিশাল নৌকা নির্মাণ করেছিলেন।

  • শিক্ষা: প্রযুক্তি আল্লাহর দান, তা ব্যবহার করতে হয় সঠিক উদ্দেশ্যে।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তি ব্যবহার মানবকল্যাণে হওয়া উচিত, ধ্বংসে নয়।

    • আধুনিক জাহাজ, সাবমেরিন, বা মহাকাশযানের দৃষ্টিকোণ থেকেও নূহ (আঃ)-এর কাহিনী প্রযুক্তিগত অনুপ্রেরণা দেয়।


৫. সত্য বনাম সংখ্যাগরিষ্ঠতা

  • বহু বছরের দাওয়াতেও অল্প কয়েকজনই নূহ (আঃ)-এর আহ্বান গ্রহণ করেছিলেন।

  • শিক্ষা: সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • গণমাধ্যম বা জনমতের চাপে সত্যকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না।

    • নৈতিক সাহস আজও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।


৬. আল্লাহর শাস্তি ও সতর্কবার্তা

  • প্লাবন ছিল জুলুম ও অবিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহর চূড়ান্ত শাস্তি।

  • শিক্ষা: অন্যায় অব্যাহত থাকলে কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • দুর্নীতি, বৈষম্য, পরিবেশ ধ্বংস ইত্যাদি সমাজের জন্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

    • প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক অস্থিরতা আল্লাহর সরাসরি শাস্তি হোক বা না হোক, এগুলো নৈতিক পতনের ফলাফল হিসেবে প্রতীকী সতর্কবার্তা।


৭. বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য

  • নূহ (আঃ)-এর কাহিনী বাইবেল, তাওরাত ও কুরআনে সাধারণভাবে পাওয়া যায়।

  • শিক্ষা: মানবজাতির ধর্মীয় ঐতিহ্যের এক সাধারণ শেকড় রয়েছে।

  • সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

    • আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও বৈশ্বিক শান্তির জন্য নূহ (আঃ)-এর কাহিনী একটি মিলনবিন্দু।


সারসংক্ষেপ

নূহ (আঃ)-এর কাহিনী শুধু প্রাচীন ইতিহাস নয়, বরং আজকের পৃথিবীর জন্য গভীর বার্তা বহন করে:

  • ধৈর্য, নৈতিক সাহস, ও ঈমানের দৃঢ়তা।

  • প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সঠিক ব্যবহার।

  • পরিবেশ সচেতনতা ও মানবসমাজের ঐক্য।

  • সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থেকে যেকোনো সামাজিক চাপ মোকাবিলা।





নুহ (আঃ)-এর পরিবার — কোরআনিক ও তাফসীরি বিশ্লেষণ-পর্ব-০৬

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



নুহ (আঃ)-এর পরিবার বিষয়টি গবেষণাধর্মীভাবে বিশদে তুলে ধরছি—বিশেষত তাঁর স্ত্রী ও অবিশ্বাসী পুত্রের প্রসঙ্গ।


১. পরিবার নিয়ে কোরআনের সরাসরি উল্লেখ

(ক) পুত্র

সূরা হুদ (১১:৪২–৪৩):

“নৌকাটি পাহাড়সম ঢেউয়ের মধ্যে ভেসে যাচ্ছিল। আর নূহ তাঁর পুত্রকে ডাকলেন, যে দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, ‘হে আমার সন্তান! আমাদের সাথে ওঠো, কাফিরদের সাথে থেকো না।’
সে বলল, ‘আমি কোনো পাহাড়ে আশ্রয় নেব; তা আমাকে রক্ষা করবে পানি থেকে।’
নূহ বললেন, ‘আজ আল্লাহর আদেশ থেকে রক্ষাকারী নেই, তিনি যাকে দয়া করেন সে ছাড়া।’
তাদের মধ্যে ঢেউ এসে পড়ল, ফলে সে ডুবে গেল।”

এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়—

  • নুহ (আঃ)-এর এক পুত্র অবিশ্বাসী ছিল।

  • আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য পাহাড়ে আশ্রয় নেবে ভেবেছিল।

  • অবশেষে সে প্লাবনে ধ্বংস হয়।

(খ) স্ত্রী

সূরা আত-তাহরীম (৬৬:১০):

“আল্লাহ কাফিরদের জন্য উদাহরণ দিয়েছেন নূহের স্ত্রী ও লূতের স্ত্রীকে। তারা দুইজনই আমাদের বান্দাদের একজন নেক বান্দার অধীনে ছিল, কিন্তু তারা তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে তারা স্বামীদের কোনো উপকারে আসেনি, আর বলা হলো—‘তোমরা আগুনে প্রবেশকারীদের সাথে প্রবেশ করো।’”

এখানে শিক্ষা:

  • নুহ (আঃ)-এর স্ত্রীও অবিশ্বাসী ছিলেন।

  • নবীর ঘরে জন্মালেও ঈমান না থাকলে কোনো উপকার হয় না।


২. ক্লাসিকাল তাফসীরের ব্যাখ্যা

  1. পুত্র

    • তাফসীর ইবন কাসীর, তাবারি, কুরতুবি ইত্যাদিতে বলা হয়, তাঁর নাম ছিল কান‘আন বা ইয়াম (ইস্রাঈলীয়াত সূত্রে)।

    • কোরআনে নাম উল্লেখ করা হয়নি।

    • আল্লাহ তাঁকে “তোমার পরিবার নয়” (ইন্নাহু লয়সা মিন আহলিক, হুদ ১১:৪৬) বলেছেন—অর্থাৎ রক্তসম্পর্ক নয়, ঈমানই প্রকৃত সম্পর্ক।

  2. স্ত্রী

    • তাফসীরে বলা হয়, নুহের স্ত্রী গোপনে তাঁর দাওয়াতের বিরুদ্ধে কাজ করতেন।

    • কেউ কেউ বলেন, তিনি গোপনে কাফিরদের কাছে নুহের খবর পৌঁছে দিতেন।

    • ফলে তিনি “খিয়ানতকারী” (خانتاهما) হিসেবে চিহ্নিত।

    • তবে এ খিয়ানত নৈতিক/আক্বিদাগত ছিল, ব্যভিচার নয় (সব মুফাস্সিরের ঐকমত্য)।


৩. হাদীসের ইঙ্গিত

  • সহীহ হাদীসে সরাসরি তাঁর পুত্র/স্ত্রীর নাম বা আচরণ বিস্তারিত নেই।

  • তবে হাদীসগুলো সাধারণত শিক্ষা দেয় যে, নবীর আত্মীয়তার কারণে কারো মুক্তি নিশ্চিত নয়।


৪. ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা

  1. ঈমান-সম্পর্ক বনাম রক্ত-সম্পর্ক

    • কোরআন শিক্ষা দেয়: আসল পরিবার হলো ঈমানের পরিবার

    • নবীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেও অবিশ্বাসী হলে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা নেই।

  2. নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষা

    • নূহ ও লূতের স্ত্রীদের উদাহরণ কাফিরদের জন্য সতর্কবার্তা।

    • আর ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়ার উদাহরণ (সূরা তাহরীম ৬৬:১১) ঈমানদার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা।

  3. দাওয়াতকারীদের জন্য শিক্ষা

    • পরিবারকেও দাওয়াত দিতে হয়, কিন্তু তারা যদি না মানে তবে নবীও তাদের বাঁচাতে পারেন না।

    • তাই দাওয়াতকর্মীর দায়িত্ব হলো পৌঁছে দেওয়া, হেদায়েত দেওয়া আল্লাহর হাতে।


৫. তুলনামূলক দিক (বাইবেল বনাম কোরআন)

  • বাইবেল (Genesis) এ নূহের স্ত্রী ও ছেলেদের সবাই নৌকায় উঠে রক্ষা পেয়েছিল।

  • কোরআনে পার্থক্য—একজন স্ত্রী ও এক পুত্র ধ্বংস হয়েছিল।

  • ইসলামী বর্ণনা বেশি নৈতিক/আক্বিদাগত শিক্ষা প্রদান করে।


সারকথা:
নুহ (আঃ)-এর পরিবার তাঁর দাওয়াতের প্রতিচ্ছবি—

  • স্ত্রী: অবিশ্বাস ও খিয়ানতের প্রতীক।

  • পুত্র: দুনিয়াবী ভরসায় আল্লাহর আদেশ অমান্যের পরিণতি।

  • শিক্ষা: ঈমান ছাড়া রক্তের সম্পর্ক কোনো কাজে আসবে না; প্রকৃত সম্পর্ক হলো ঈমানের।


আপনি কি চান আমি এবার নুহ (আঃ)-এর কাহিনীর আধুনিক নৈতিক শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা প্রসারিত করে উপস্থাপন করি?



মহাপ্লাবন — কোরআনিক বর্ণনা বনাম আধুনিক গবেষণা -পর্ব-০৫

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 মহাপ্লাবনের প্রকৃতি (গ্লোবাল নাকি লোকাল) এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিতর্ক বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি।

কোরআনিক বর্ণনা

কোরআন মহাপ্লাবনকে এক মহাবিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরে:

  • সূরা হুদ (১১:৪৪):

    “আর বলা হলো, ‘হে পৃথিবী! তোমার পানি গিলে নাও, আর হে আকাশ! তুমি থেমে যাও।’ অতঃপর পানি সরে গেল, আদেশ পূর্ণ হলো, আর জাহাজ জুদী পাহাড়ে থামল...”

  • সূরা আল-কামার (৫৪:১১–১২):

    “আমি আকাশের দরজা খুলে দিলাম প্রবল বৃষ্টির জন্য। আর আমি পৃথিবীকে ফোয়ারার মতো বিস্ফোরিত করলাম, ফলে পানি মিলিত হলো নির্ধারিত কর্ম সিদ্ধির জন্য।”

এখানে স্পষ্ট বোঝা যায়—

  1. আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টি।

  2. পৃথিবী থেকে ফোয়ারার মতো পানি নির্গমন।

  3. পানি মিলিত হয়ে এক বিশাল প্লাবন সৃষ্টি করে।

তবে কোরআন সরাসরি “সমগ্র পৃথিবী প্লাবিত হয়েছিল” তা উল্লেখ করে না; শুধু নূহের কওম ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ধ্বংস হয়েছিল বলে বলে।


ইসলামী ক্লাসিকাল ব্যাখ্যা

  • ইবন কাসীর: প্লাবনকে “বিশ্বব্যাপী” বলেছেন। তাঁর মতে, কেবল নুহ (আঃ)-এর সঙ্গী ও নৌকায় থাকা জীবজন্তু ছাড়া সব প্রাণী ধ্বংস হয়েছিল।

  • তাবারি ও কুরতুবি: অনেকটা একই মত, তবে কেউ কেউ আঞ্চলিক ধারণাও রেখেছেন।

  • হাদীস সাহিত্য: সরাসরি গ্লোবাল/লোকাল পার্থক্য করা হয়নি; মূলত “অবিশ্বাসীদের ধ্বংস” বিষয়ক শিক্ষা জোর দেওয়া হয়েছে।


আধুনিক বৈজ্ঞানিক বিতর্ক

1. গ্লোবাল ফ্লাড (Global Flood) তত্ত্ব

  • প্রাচীন ও মধ্যযুগে উভয় ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম আলেমরা সাধারণত গ্লোবাল প্লাবন মেনে নিয়েছেন।

  • তবে আধুনিক ভূতাত্ত্বিকরা বলেন, পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক স্তর বা জীবাশ্ম নথিতে এর প্রমাণ নেই।

  • সমস্ত পৃথিবী প্লাবিত হলে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার হতো না, যা জৈববিদ্যার সাথে মেলে না।

2. লোকাল ফ্লাড (Local Flood) তত্ত্ব

  • অনেক সমসাময়িক মুসলিম গবেষক বলেন, কোরআন আসলে “পুরো পৃথিবী” নয়, বরং “নুহের কওমের পৃথিবী”—অর্থাৎ তারা যেখানে বাস করত (সম্ভবত মেসোপটেমিয়া অঞ্চল)—তা ধ্বংস হয়েছিল।

  • ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা, প্রাচীনকালে টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী উপত্যকায় ভয়াবহ প্লাবন ঘটেছিল, যা লোকাল হলেও এত বিশাল ছিল যে তা পুরো পৃথিবীর মতো মনে হতো।

  • এই লোকাল ফ্লাড তত্ত্ব কোরআনের শব্দচয়ন (যেমন “তোমার কওম”, “তাদের উপর শাস্তি”) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

3. প্রতীকী/আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি

  • কিছু আধুনিক চিন্তাবিদ বলেন, এটি ইতিহাস নয় বরং একটি প্রতীকী ঘটনা—যা মানুষের অবাধ্যতা বনাম আল্লাহর ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়।

  • তবে মুসলিম ঐতিহ্যে এটি একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে গৃহীত।


তুলনামূলক দিক (বাইবেল বনাম কোরআন)

  • বাইবেল (Genesis 7:19–20): বলে যে পানি সমস্ত পৃথিবী ঢেকে দেয়, এমনকি সব পাহাড়কেও।

  • কোরআন: এত স্পষ্ট গ্লোবাল দাবি করে না, বরং শুধু নুহের জাতিকে কেন্দ্র করে।

  • তাই কিছু মুসলিম পণ্ডিত মনে করেন, কোরআনের বিবরণ লোকাল ফ্লাড ধারণার সাথে বেশি মানানসই।


আর্কিওলজিকাল অনুসন্ধান

  • আরারাত পর্বত (তুরস্ক) ও জুদী পাহাড়ে বিভিন্ন সময়ে নৌকার অবশিষ্টাংশের দাবি করা হয়েছে।

  • কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

  • প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, যদিও প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় ভয়াবহ প্লাবনের নিদর্শন আছে, তবুও “নুহের নৌকা”র কোনো চূড়ান্ত প্রত্নপ্রমাণ নেই।


ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষা

  • গ্লোবাল বা লোকাল—যেভাবেই দেখা হোক, মূল বার্তা হলো:

    • অবিশ্বাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর শাস্তি অনিবার্য।

    • ঈমানদাররা আল্লাহর সুরক্ষায় রক্ষা পায়।

    • দাওয়াতের দীর্ঘ ব্যর্থতা শেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় নিশ্চিত।


সারসংক্ষেপ:

  • কোরআন ঘটনাটিকে এক মহাপ্লাবন বলে, তবে স্পষ্টভাবে গ্লোবাল বলে না।

  • ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যা গ্লোবাল দিকে ঝোঁক, কিন্তু আধুনিক মুসলিম গবেষকরা অনেক সময় লোকাল ব্যাখ্যা করেন।

  • বৈজ্ঞানিকভাবে গ্লোবাল ফ্লাডের প্রমাণ নেই, তবে লোকাল মেসোপটেমীয় বন্যার প্রমাণ শক্তিশালী।

  • ধর্মীয় শিক্ষা অপরিবর্তিত থাকে—ঈমানের মাধ্যমে মুক্তি, অবিশ্বাসের মাধ্যমে ধ্বংস।






নুহ (আঃ) নৌকা নির্মাণ — কোরআন, তাফসীর ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি -পর্ব-০৪

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



👍 এবার আমি -নুহ (আঃ)এর নৌকা নির্মাণ প্রসঙ্গে গভীর গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণ তুলে ধরছি।

কোরআনের বর্ণনা

কোরআন একাধিক স্থানে নৌকা (الفلك / السفينة) নির্মাণের কথা বলেছে:

  • সূরা হুদ (১১:৩৭):

    “আমার তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে তুমি নৌকা নির্মাণ করো। আর যারা যালিম, তাদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বলো না; তারা অবশ্যই ডুবে যাবে।”

  • সূরা মু’মিনুন (২৩:২৭):

    “আমরা তাঁর প্রতি ওহি করলাম, ‘আমার তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশে নৌকা বানাও। অতঃপর যখন আমার নির্দেশ আসবে এবং উৎসমূহ প্রবাহিত হবে, তখন তুমি এতে প্রত্যেক জোড়া জোড়া প্রাণী এবং তোমার পরিবারকে উঠাবে, তবে যাদের বিরুদ্ধে পূর্বে হুকুম হয়েছে তাদের বাদ দিয়ে।’”

এখানে আল্লাহ নিজে “আমার তত্ত্বাবধানে” (بأعيننا) শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ নৌকাটি শুধু একটি কারিগরি কাজ ছিল না, বরং আল্লাহর নির্দেশনানুযায়ী বিশেষ সুরক্ষা ও প্রভিডেন্সের অধীনে।


ক্লাসিকাল তাফসীরের ব্যাখ্যা

  1. উপাদান ও নির্মাণপদ্ধতি

    • ইবন কাসীর (তাফসীর ইবন কাসীর): নৌকাটি কাঠ দিয়ে তৈরি হয় এবং পিচ/তার জাতীয় পদার্থ দিয়ে সিল করা হয়।

    • তাবারি: বলেন, নৌকা বানাতে নুহ (আঃ)-এর আগে কোনো মানব অভিজ্ঞতা ছিল না; সবকিছুই আল্লাহর শিক্ষা ও অনুপ্রেরণায় সম্পন্ন হয়।

  2. আকার ও মাপ (ইস্রাঈলীয়াতভিত্তিক বর্ণনা)

    • কিছু রেওয়ায়েতে বলা হয়, দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩০০ হাত, প্রস্থ ৫০ হাত এবং উচ্চতা ৩০ হাত।

    • এতে তিনটি ডেক বা তলা ছিল: একটিতে মানুষ, একটিতে পশু-পাখি, আরেকটিতে খাবার/সরঞ্জাম।

    • তবে এগুলো কোরআন বা সহীহ হাদীসে নেই, বরং বাইবেল ও ইস্রাঈলীয়াত থেকে প্রভাবিত।

  3. উপহাস ও প্রতিক্রিয়া

    • কোরআনে উল্লেখ আছে, নৌকা বানানোর সময় কওম নুহ (আঃ)-কে বিদ্রূপ করত:
      “তুমি যদি আমাদের উপহাস করো, আমরা একদিন তোমাদের উপহাস করব।” (সূরা হুদ ১১:৩৮)


বাইবেলিক তুলনা

বাইবেল (Genesis 6:14–16) নৌকার উপকরণ, মাপ ও নির্মাণ-পদ্ধতি বিশদে বলে:

  • গফার কাঠ ব্যবহার,

  • দৈর্ঘ্য ৩০০ কিউবিট (প্রায় ১৩৫ মিটার), প্রস্থ ৫০ কিউবিট (২২ মিটার), উচ্চতা ৩০ কিউবিট (১৩.৫ মিটার)।

  • ভেতরে তিনটি তলা।

কোরআন এরূপ কারিগরি বিবরণ না দিয়ে মূলত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা কেন্দ্রিক থাকে।


আধুনিক গবেষণা ও বিতর্ক

  1. নৌকাটি বাস্তবে সম্ভব কি না?

    • ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণা অনুযায়ী, বাইবেলিক মাপের (প্রায় ১৩৫ × ২২ × ১৩.৫ মিটার) কাঠের নৌকা তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও প্রচণ্ড জটিল।

    • বিশাল আকারের কাঠের জাহাজে কাঠ বাঁকা হয়ে যাওয়া, জল চুঁইয়ে পড়া ইত্যাদি সমস্যা হতো।

    • তাই অনেক গবেষক মনে করেন, এটি আল্লাহর অলৌকিক সহায়তায় সম্ভব হয়েছে।

  2. গ্লোবাল নাকি লোকাল বন্যা?

    • ঐতিহ্যগত ইসলামী ব্যাখ্যায় এটি বিশ্বব্যাপী প্লাবন।

    • তবে আধুনিক কিছু গবেষকরা মনে করেন, এটি একটি আঞ্চলিক (Mesopotamian) বন্যার বিবরণ হতে পারে, যা পরে ধর্মীয় আখ্যান হিসেবে সর্বজনীন অর্থ পেয়েছে।

  3. আর্কিওলজিকাল অনুসন্ধান

    • আরারাত পর্বত (তুরস্ক) ও জুদী পাহাড়ে বহুবার “নৌকার অবশিষ্টাংশ” পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে, তবে কোনো দাবিই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।

    • মুসলিম গবেষকরা সাধারণত এসব দাবির ব্যাপারে সতর্ক থাকেন, কারণ কোরআন কেবল “জুদী পাহাড়” (جودي) বলেছে, নির্দিষ্ট স্থান নয়।


তাত্ত্বিক ও নৈতিক শিক্ষা

  • নৌকাটি শুধু একটি যানবাহন ছিল না; এটি ছিল আল্লাহর নির্দেশে মুক্তির প্রতীক

  • ঈমানদার ও অবিশ্বাসীর পার্থক্য আল্লাহর সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়।

  • কওমের উপহাস সত্ত্বেও নুহ (আঃ)-এর ধৈর্য—দাওয়াতকর্মীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।


সারকথা: নৌকার প্রযুক্তিগত বাস্তবতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, কোরআনের ফোকাস হলো—আল্লাহর নির্দেশ মানলে মুক্তি আছে, অমান্য করলে ধ্বংস অনিবার্য।




নূহ (আঃ) “৯৫০ বছর” — বিশদ বিশ্লেষণ পর্ব-০৩

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে


 


কুরআনের আয়াত

সূরা আল-আনকাবুত (২৯:১৪):

“আর নিশ্চয়ই আমরা নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি তাদের মধ্যে অবস্থান করেছিলেন এক হাজার বছর থেকে পঞ্চাশ বছর কম; অতঃপর তাদেরকে প্লাবন আঘাত করেছিল, যখন তারা ছিল জালিম।”

ব্যাখ্যা (ক্লাসিকাল তাফসীর থেকে)

  1. আক্ষরিক অর্থে সময়কাল

    • ইবন কাসীর, আল-তাবারি ও কুরতুবির মতো ক্লাসিক মুফাস্সিরীন সাধারণত এটি আক্ষরিক অর্থে নিয়েছেন।

    • তাদের মতে, নূহ (আঃ) তাঁর জাতিকে প্রায় ৯৫০ বছর ধরে দাওয়াত দিয়েছেন। এটি তাঁর মোট জীবনকাল নয়, বরং দাওয়াতের সময়কাল।

    • কিছু বর্ণনায় বলা হয়, তাঁর পুরো আয়ুষ্কাল ছিল ১০৫০ বছর বা তার বেশি (দাওয়াত-পূর্ব ও পরবর্তী সময়সহ)।

  2. জীবনকাল নির্দেশ করছে

    • কিছু আলেম মনে করেন, এটি তাঁর মোট আয়ুষ্কালকে বোঝায়। যদিও এখানে সংখ্যাটির সাথে “অবস্থান করেছিলেন” (labitha) শব্দটি যুক্ত, যা অধিকাংশ আলেম দাওয়াতের সময়কাল হিসেবে নেন।

  3. রূপক বা প্রতীকী অর্থ

    • কিছু আধুনিক গবেষকরা মনে করেন, “৯৫০ বছর” আসলে প্রতীকী সংখ্যা।

    • প্রাচীন সেমিটিক সাহিত্যে হাজার সংখ্যা অনেক সময় দীর্ঘতা বা অনন্তকাল বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। তাই এটি হয়তো “অত্যন্ত দীর্ঘ সময়” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।


হাদীস ও অন্যান্য রেফারেন্স

  • সরাসরি “৯৫০ বছর” নিয়ে সহীহ হাদীসে অতিরিক্ত বিস্তারিত নেই।

  • তবে বর্ণনা আছে, নূহ (আঃ)-এর মৃত্যু সময়ে তিনি তাঁর সন্তানদের তাওহীদের উপদেশ দেন এবং দুনিয়াকে “একটি ছায়াঘর” হিসেবে বর্ণনা করেন (মুসলিম শরীফ, কিতাবুল ফিতান)।


তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি (বাইবেলিক টেক্সট)

  • বাইবেলে (Genesis 9:29) বলা আছে, নূহের আয়ুষ্কাল ছিল ৯৫০ বছর

  • তবে পার্থক্য হলো:

    • কুরআনে এই সময়কে “তাঁর জাতির মাঝে অবস্থান/দাওয়াত” হিসেবে বলা হয়েছে।

    • বাইবেলে সরাসরি এটি তাঁর জীবনকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


আধুনিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি

  • অনেকে বলেন, প্রাচীন মানুষের আয়ুষ্কাল এখনকার তুলনায় বেশি হতে পারে।

  • জেনেটিক ও পরিবেশগত অবস্থার কারণে মানবজীবনের প্রাথমিক যুগে দীর্ঘায়ু সম্ভব ছিল—এমন তত্ত্ব কিছু ইসলামি চিন্তাবিদ তুলে ধরেছেন।

  • আধুনিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে প্রতীকী বা মিথোলজিকাল সময়রেখা বলা হয়, তবে মুসলিম আলেমগণ একে বাস্তব সত্য বলে মানেন।


শিক্ষণীয় দিক:

  • সংখ্যাটি যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, আসল বার্তা হলো:

    • নূহ (আঃ) চরম ধৈর্য ও অধ্যবসায় নিয়ে শত শত বছর মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতে থেকেছেন।

    • এটি দাওয়াতের কাজে ধৈর্যের চূড়ান্ত উদাহরণ।





নূহ (আঃ) — একটি গভীর, গবেষণাধর্মী জীবনী -পর্ব-০২

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে

 



উদ্দেশ্য ও পরিধি:
এই নথিটি কোরআনীয় বর্ণনা, ক্লাসিকাল তাফসীর-রচনাগুলি (সনদের বিচারে নয় বরং বর্ণনামূলক), হাদীস সাহিত্যের সারসংক্ষেপ এবং ইস্রাঈলীয়াত/বাইবেলিক ঐতিহ্যের তুলনামূলক পর্যালোচনার আলোকে নুহ (আঃ)-এর জীবনীকে গবেষণামুখীভাবে উপস্থাপন করে। এখানে ইতিহাস, দার্শনিক ও থিওলজিকাল পাঠ, এবং আধুনিক বিতর্ক—সবকিছুই সংহতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। লক্ষ্য হলো কেবল গল্প বলা নয়, বরং উৎসসমূহ ও তাদের ব্যাখ্যার ভিন্নতা তুলে ধরা।


সূচিপত্র

  1. সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও কোরআনিক উৎস

  2. উৎস ও পাঠ্যভিত্তি (কোরআন, তাফসীর, হাদীস, ইস্রাঈলীয়াত)

  3. বংশপরিচয়, কালক্রম ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

  4. দাওয়াত: বিষয়বস্তু, পদ্ধতি ও প্রতিক্রিয়া

  5. "৯৫০ বছর"—অর্থ ও ব্যাখ্যা

  6. কিশ্তি/নৌকা: নির্দেশ, নির্মাণ ও যৌক্তিকতা

  7. মহাপ্লাবন: ঘটনা-প্রবাহ ও ফলাফল

  8. নোহের পরিবার ও যাদের রক্ষা/ধ্বংস

  9. কণ্ঠস্বরসমূহ: ক্লাসিকাল তাফসীরের বর্ণনা

  10. তুলনামূলক অধ্যায়—বাইবেল বনাম কোরআনিক বর্ণনা

  11. আধুনিক বিতর্ক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্নাবলী

  12. থিয়োলজিক্যাল পাঠ ও আইনি/নৈতিক প্রভাব

  13. উপসংহার

  14. পরামর্শিত পাঠ


1. সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও কোরআনিক উৎস

নুহ (আঃ) কোরআনে বারবার বর্ণিত একজন অনুপ্রেরিত রসূল—যাঁকে আল্লাহ বহু বৎসর ধরে তাঁর কওমকে তাওহীদে (একত্ববাদে) আহ্বান করতে পাঠিয়েছিলেন। কোরআনে নুহকে আল্লাহর কাছে সাবুর (ধৈর্যশীল) ও আলোচ্য দাইয়্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রধান কোরআনিক সূরা-সমূহ যেখানে নোহের কাহিনী আসে: সূরা নূহ (৭১), সূরা হুদ (১১), সূরা আল-আনকাবুত (২৯ — বিশেষত আয়াত ১৪), সূরা আস-সাফফাত (৩৭), সূরা আল-কামার (৫৪) এবং সূরা আল-রূহ (উল্লেখযোগ্য অংশ)। এছাড়া নুহের ঘটনাক্রম সম্পর্কে হাদীস ও তফসীর-গ্রন্থগুলিতেও বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়।

2. উৎস ও পাঠ্যভিতি (সংক্ষেপে)

  • কোরআন: মুখ্য ও অবিচলিত উৎস; বুনিয়াদী বিবরণ ও মূল বার্তা কোরআনে।

  • তাফসীর: ইবন কাসীর, আল-তাবারি, আল-কুরতুবি প্রভৃতি ক্লাসিকাল তাফসীর বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে—অনেকে কোরআনিক আয়াতের সাথে ইস্রাঈলীয়াত (প্রাচীন ইয়াহুদী/খ্রিস্টীয় রীতির কাহিনী) যোগ করে অতিরিক্ত বিবরণ যোগ করেছেন।

  • হাদীস সাহিত্য: সরাসরি নোহ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস দেখা যায়—বিশেষত তাফসীরশ্রেণীতে উদ্ধৃত। হাদীসগুলো প্রধানত নৌকার অবতরণস্থল ও নুহের কিছু গুণের উপর আলোকপাত করে।

  • ইস্রাঈলীয়াত / বাইবেল: কেবল ইতিচ্ছুক তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য ব্যবহৃত; বাইবেলে (জেনেসিস) নোহের গল্প আছে, তবে কোরআনিক বিবরণ ও বিবরণীর ভঙ্গি আল্লাহ-প্রেরিত নূর ও শাস্ত্রীয় দাবির আলাদা কাঠামো অনুসরণ করে।

3. বংশপরিচয়, কালক্রম ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কোরআন সরাসরি নুহের ঐতিহাসিক তারিখ বা সমকালীন কাল নির্দিষ্ট করে না। মুসলিম ঐতিহ্যে প্রায়শই তাঁর পিতার নাম লামিক ইত্যাদি হিসেবে চিহ্নিত হয়—কিন্তু এগুলো মূল কোরআনিক তথ্য নয় এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যভিত্তিক বর্ণনায় পরিবর্তিত হতে দেখা যায়। ঐতিহাসিক-প্যালিওলজিক্যাল (প্রাগৈতিহাসিক) প্রেক্ষাপট হিসেবে নুহকে সাধারণত প্রাচীন সময়ের একজন মহান রসূল হিসেবে ধরা হয়—যিনি সমাজের ব্যাপক শিরক-প্রবণতা (মূর্তিপূজা, বহু-ঋতুবাদী আচার) বিনষ্ট করতে আহ্বান করেন।

4. দাওয়াত: বিষয়বস্তু, পদ্ধতি ও প্রতিক্রিয়া

নুহের দাওয়াতের মূল অনুভূতিগুলি কোরআনে স্পষ্ট:

  • তাওহীদ (দিব্য একত্ববাদ): আল্লাহ বাদে আর কাউকে ইবাদতের যোগ্য নয়—এটাই তাঁর মূল আহ্বান।

  • নৈতিক সংস্কৃতি-সংস্কার: বিশৃঙ্খলতা, দুনিয়াবাদী আচরণ, অন্যায় প্রভৃতির বিরুদ্ধে আপত্তি।

  • ধৈর্য ও সততা: নুহ বারবার দীর্ঘকালীন ধৈর্য দেখান; কোরআন তার ত্যাগ ও মজবুত ইমানের কথা বারবার স্মরণ করে।

পদ্ধতি: গোপনে ও প্রকাশ্যে আহ্বান, যুক্তি-তর্ক, অভিজ্ঞতা-ঘটনার স্মরণ (পূর্বপুরুষদের অবস্থার বর্ণনা), এবং ধৈর্যশীলতা।

পার্থক্য/প্রতিক্রিয়া: একটি ক্ষুদ্র ঈমানদার সম্প্রদায় ছাড়া অধিকাংশ কওম তাঁকে প্রত্যাখ্যান করে—উপহাস, অবমাননা, এবং তৎপর বাধা।

5. "৯৫০ বছর"—অর্থ ও ব্যাখ্যা

কোরআন (সূরা আল-আনকাবুত 29:14) বলেছে (প্রাথমিক অনুবাদ): “আমরা নিশ্চিতভাবেই নূহকে তাঁর কওমের মাঝে প্রেরণ করেছিলাম; অতঃপর তিনি তাদের মাঝে এক হাজার বছর ঘটনাকাল (অর্থাৎ ৯৫০ বছর) অবস্থান করেছিলেন।”

ব্যাখ্যার ভিন্নতা:

  1. মিশন-দৈর্ঘ্য হিসেবে গ্রহণ: ক্লাসিকাল তাফসীর অনেকে বলেন এ সংখ্যা তাঁর দাওয়াতের মোট সময়কাল নির্দেশ করে—অর্থাৎ তিনি প্রায় ৯৫০ বছর পর্যন্ত প্রচার চালিয়েছিলেন।

  2. জীবনকাল হিসেবে ব্যাখ্যা: অনেকে এটিকে তাঁর মোট আয়ুষ্কাল বা একটি বড়াংশ হিসেবে দেখেন।

  3. রূপক বা ঐতিহাসিক রেকর্ড-সংকেত: কিছু আধুনিক পণ্ডিত সংখ্যা-টিকে আংশিক রূপকে বা ঐতিহাসিক রেকর্ডে ব্যবহৃত দীর্ঘ অনুসৃত কাল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তাফসীরী ঐতিহ্য কোরআনিক সংখ্যাকে সাধারণত আক্ষরিকভাবে নেয় এবং নুহের ধৈর্য ও দীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা প্রদর্শনের জন্য এটি উদ্ধৃত করে। ইতিহাসগত নির্দিষ্ট বছর-চক্র নির্ধারণ করা কোরআন থেকেই সরাসরি সম্ভব নয়—তাই বিবিধ ব্যাখ্যা আছে।

6. কিশ্তি/নৌকা: নির্দেশ, নির্মাণ ও যৌক্তিকতা

কোরআনীয় বর্ণনায় আল্লাহ নুহকে নৌকা বানানোর নির্দেশ দেন। কোরআন কিভাবে বানাতে হবে তা বিস্তারিত দেয় না—তবে হাদীস ও ইস্রাঈলীয়াতভিত্তিক তাফসীরে নৌকার উপকরণ, বৃহত্তর আকৃতি ও নির্মাণের উপায় সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনা প্রচলিত আছে।

কিছু গবেষণামূলক পয়েন্ট:

  • আদেশগত মূলনীতি: কোরআন নির্দেশ দেয়—নির্দেশ মেনে বানান, মানুষের উপহাস থাকুক বা না থাকুক তিনি অবশ্যই বানান।

  • প্রযুক্তিগত বাস্তবতা: কোরআন নৌকার নির্মাণকে অলৌকিক আদেশ-সম্পন্ন এক কর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে—বিজ্ঞানের দিক থেকে এটি তত্ত্ব-পরীক্ষার বিষয় নয়; বরং এটি ঐতিহাসিক-ঐক্যবাদী বর্ণনা।

  • জীবজন্তু নিয়ে প্রবেশ: কোরআন বলেছে প্রত্যেক প্রজাতির থেকে জোড়া জোড়া নেয়া হয়—ক্লাসিক তফসীরে এটি ব্যাখ্যা করা হয় যে আল্লাহ উপায় করে দেন যাতে প্রয়োজনীয় প্রাণীরা জাহাজে পৌঁছাতে পারে।

7. মহাপ্লাবন: ঘটনা-প্রবাহ ও ফলাফল

কোরআনীয় বর্ণনা অনুসারে প্লাবনের প্রধান পয়েন্টগুলো:

  • আকাশ থেকে ভারী বর্ষণ।

  • মাটি থেকে উৎসের (ফোয়ারা) উদ্গীরণ—(কোরআনে আসমান ও আরজ উভয়ই পানি ছাড়ে বলা হয়)।

  • জাহাজ ভাসতে থাকে ও আল্লাহর নির্ধারিত অন্যান্য ব্যক্তিরাও তাতে উঠে যায়।

  • অপজ্ঞীনরা ডুবে যায়—এদের মধ্যে কোরআনীয় বিবরণে এমন এক পুত্র ও কিছু ঘনিষ্ঠ লোকও ছিলেন যারা ডুবে মারা যান।

  • শেষ পর্যায়ে জাহাজ জুডী পর্বতে থামে (কোরআনি বর্ণনা অনুযায়ী)।

এই ঘটনার উদ্দেশ্য কোরআনে হলো—দোষী জাতিকে শাস্তি, ঈমানদারগণের রক্ষা এবং আল্লাহর ক্ষমতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা।

8. নোহের পরিবার: রক্ষা ও ধ্বংস

কোরআন স্পষ্টভাবে জানায় যে নুহের সকল আত্মীয়রাই রক্ষা পায়নি—একজন পুত্র (কিছু তাফসীরে নামকরণ করা হয়, তবে কোরআনে নাম প্রদান নেই) যারা ডুবে যায় এবং ছিলেন অবিশ্বাসী। কিছু তফসীর ও ঐতিহ্যে তাঁর পত্নীও অবিশ্বাসীরূপে বর্ণিত হয়েছে—কিন্তু কোরআন প্রধানত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও ইমানের গুরুত্বকে জোর দেয়।

9. কোরআন ও তাফসীর: ক্লাসিকাল বর্ণনা ও ভিন্নমত

ক্লাসিকাল মুফাস্সিরীন (যেমন ইবন কাসীর, আল-তাবারি, আল-কুরতুবি) কাহিনীটিকে কোরআনকেন্দ্রিক রেখে ইস্রাঈলীয়াত থেকে অতিরিক্ত বিবরণ যোগ করেছেন—যেমন নৌকার ডাইমেনশন, প্রাণীর তালিকা, কুসংস্কারমুখী কওমের রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্র ইত্যাদি। এই অতিরিক্ত বিবরণ কখনো কখনো তফসীরের মধ্যে বিতর্কিত; আধুনিক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর সরাসরি মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।

10. তুলনামূলক অধ্যায়: বাইবেল বনাম কোরআনিক বর্ণনা

  • সাদৃশ্য: উভয় সূত্রেই—দাওয়াত, প্রত্যাখ্যান, নৌকা, পশুপাখির জোড়া, প্লাবন ও নৌকার স্থলাভিষ্কার—মিল আছে।

  • ভিন্নতা: কোরআন কখনো কখনো নোহের ব্যক্তিগত জীবন বা নৌকার প্রযুক্তিগত বিবরণে সংক্ষিপ্ত; এটি মূলত নৈতিক ও ঈমান-সম্পর্কিত দিকগুলোতে গুরুত্ব দেয়। বাইবেলায় (জেনেসিস) কিছু অতিরিক্ত বিচিত্র নাম ও বিবরণের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

11. আধুনিক বিতর্ক ও বৈজ্ঞানিক প্রশ্নাবলী

  • গ্লোবাল বনাম লোকাল প্লাবন: ঐতিহ্যগত ইসলামী ব্যাখ্যাগুলোতে প্লাবনকে বিশ্বব্যাপী (global) ভাবা হয়েছিল; তবে আধুনিক আলোচনা-সমষ্টিতে কিছু পণ্ডিত লোকাল ভৌগোলিক প্লাবনও সম্ভাব্য বিবেচনা করেন—কিন্তু ধর্মীয় পাঠ্য নিজের দর্শনিক লক্ষ্যই প্রধানত।

  • নৌকার ভৌত বাস্তবতা: আধুনিক পূর্ণবৃন্তীয় নৌবিজ্ঞান থেকে নৌকার একাধিক বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়; কিন্তু অনেকে এটিকে অলৌকিক অলঙ্কার হিসেবে দেখেন—অর্থাৎ আল্লাহর ইচ্ছায় ব্যবস্থা হয়।

  • আর্কিওলজিক্যাল অনুসন্ধান: বাইবেলের প্রেক্ষিতে আরাট/জুডি পর্বতের আশেপাশে নানা অনুসন্ধান হয়েছিল; মুসলিম বিশ্লেষকরা সতর্ক—কিন্তু সব অনুসন্ধান নির্ধারক প্রমাণ এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

অতএব আধুনিক বৈজ্ঞানিক আলোচনা ও কোরআনিক আখ্যান একে অপরকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করে না—তারা ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করে: কোরআন দার্শনিক-এথিক্যাল শাস্ত্র, আর বিজ্ঞান প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা। অনেক মসনদে উভয় প্রশ্নকে আলাদা রেখে সংহত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যায়।

12. থিওলজিক্যাল পাঠ ও আইনি/নৈতিক প্রভাব

নুহ (আঃ)-এর গল্প থেকে ইসলামি তত্ত্ব ও আইন—বিশেষত দাওয়াত-ইলাল (دعوة), ধৈর্য, সম্প্রদায়গত ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রয়োগ, এবং আল্লাহর শাস্তি ও রহমতের সম্পর্ক—এগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ পাওয়া যায়। এ ছাড়া নুহের ধৈর্য ও অবিচলিত আমল দাওয়াতকর্মীদের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা।

13. উপসংহার

নুহ (আঃ)-এর কাহিনী কোরআনিক ন্যারেটিভে কেবল অতীতের এক ঘটনা নয়—এটি বর্তমান ও ভবিষ্যৎকেও হুমকি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে নির্দেশ দেয়: সমাজ যখন নৈতিক ও ধর্মীয় শৃঙ্খলা হারায়, তখন আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করবে এমন ব্যক্তিদের রক্ষা ও দুষ্টদের পুনরায় সংশোধন বা শাস্তি—এই মৌলিক থিমগুলো বারবার উঠে আসে।

14. পরামর্শিত পাঠ (বৃহত্তর মনোযোগের জন্য)

  • কোরআন অধ্যয়ন (সূরা নূহ, সূরা হুদ, সূরা আল-আনকাবুত, সূরা আস-সাফফাত, সূরা আল-কামার) — আয়াতগুলোর তাফসীরসহ।

  • তাফসীর: Tafsir Ibn Kathir, Tafsir al-Tabari, Al-Qurtubi (AR্মান/ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া গেলে)।

  • আধুনিক বিশ্লেষণ: কোরআন-তাফসীর ভিত্তিক সমকালের গবেষণা পত্র ও ইসলামী থিওলজি সংক্রান্ত গবেষণা।


চূড়ান্ত মন্তব্য

এই দস্তাবেজটি কোরআন-ভিত্তিক ব্যাখ্যা, ক্লাসিকাল তাফসীর ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব মিশ্রিতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে—ইতিহাসিক/বৈজ্ঞানিক দাবি এখানে সরাসরি প্রমাণের দাবি করে না; বরং এটি ধর্মীয় পাঠ্য ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন স্তরকে আলোকপাত করে। আপনি চাইলে আমি কোনো নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: কিশ্তি-নির্মাণ সম্পর্কিত তফসীর, ‘৯৫০ বছর’ এর পৃথক তফসীরসমূহ, অথবা বাইবেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণ) আরও গভীরভাবে প্রসারিত করে সূত্র-সহ উপস্থাপন করব।



নুহ (আঃ)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী (সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন) পর্ব-০১

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



নবী নুহ (আঃ) ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাসূল। কুরআন মাজীদে তাঁর কাহিনী বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

জন্ম ও পরিচয়
নুহ (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল লামিক।

তিনি আদম (আঃ)-এর দশম পুরুষ বংশধর।

আল্লাহ তাঁকে এমন এক জাতির কাছে প্রেরণ করেছিলেন, যারা বহু দেব-দেবী পূজা করত। তারা ওয়াদ, সুওয়া, ইয়াগুছ, ইয়াউক ও নাসর নামক মূর্তির পূজা করত (সূরা নূহ 71:23)।

দাওয়াত ও সংগ্রাম
নুহ (আঃ) তাঁর কওমকে আল্লাহর একত্ববাদে দাওয়াত দেন।

তিনি প্রায় ৯৫০ বছর মানুষকে দাওয়াত দিয়ে গেছেন (সূরা আনকাবুত 29:14)।

দিন-রাত, গোপনে-প্রকাশ্যে তিনি মানুষকে তাওহীদে আহ্বান করতেন।

কিন্তু অল্প কিছু মানুষ ব্যতীত অধিকাংশই তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, তাঁকে উপহাস ও অবজ্ঞা করে।

নৌকা নির্মাণ
আল্লাহ নুহ (আঃ)-কে নির্দেশ দেন একটি নৌকা (কিশ্তি/জাহাজ) বানাতে।

কাফিররা তাঁকে নিয়ে উপহাস করত।
আল্লাহর নির্দেশে তিনি নৌকায় তাঁর পরিবার, ঈমানদারগণ এবং প্রত্যেক প্রাণীর জোড়া জোড়া তুলে নেন।

মহাপ্লাবন
অবশেষে আল্লাহ আকাশ থেকে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং ভূমি থেকে পানি উথলে ওঠে।

পুরো পৃথিবী প্লাবিত হয়।
নৌকায় যারা ছিল তারা রক্ষা পায়, আর যারা অবিশ্বাসী ছিল তারা সবাই ডুবে যায়।
এমনকি তাঁর এক পুত্র (কানআন) অবিশ্বাসের কারণে ডুবে মারা যায় (সূরা হুদ 11:42–43)।

প্লাবনের পর
পানি নেমে গেলে নৌকা জুদী পাহাড়ে (বর্তমান তুরস্কের আরারাত অঞ্চলে) থামে।
এরপর নুহ (আঃ) ও তাঁর অনুসারীরা নতুন করে মানব সভ্যতার সূচনা করেন।

মৃত্যুবরণ
নুহ (আঃ) দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করার পর মৃত্যুবরণ করেন।

হাদীস অনুযায়ী, মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর সন্তানদের তাওহীদের দাওয়াত আঁকড়ে ধরার ও শিরক থেকে বাঁচার উপদেশ দিয়ে যান।

কুরআনে নুহ (আঃ)
কুরআনের বিভিন্ন সূরায় নুহ (আঃ)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে:

সূরা হুদ (১১)
সূরা আশ-শু'আরা (২৬)
সূরা আল-আনকাবুত (২৯)
সূরা আস-সাফফাত (৩৭)
সূরা আল-কামার (৫৪)

সূরা নূহ (৭১)

✅ শিক্ষা:
নুহ (আঃ)-এর জীবনী থেকে আমরা শিখি—

সত্য পথে দৃঢ় থাকতে হবে।
দীর্ঘ ধৈর্য ও ত্যাগ ছাড়া দাওয়াতের কাজ সফল হয় না।
ঈমানদারদের রক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত, আর কাফিরদের পরিণতি ধ্বংস।

আপনি কি চান আমি তাঁর জীবনীটি গল্প আকারে শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় লিখে দিই, নাকি গভীর গবেষণাধর্মীভাবে বিস্তারিত তুলে ধরি?


মঙ্গলবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আজকের নামাজের সময়সূচী

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫ 0
আজকের নামাজের সময়সূচী
বার দেখা হয়েছে .
Prayer Times
Imsak
Fajr
Dhuhr
Asr
Maghrib
Isha


সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ইমাম মাহাদী আগমন বিস্তারিত বর্ণনা

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে


ক্রম ঘটনা/আলামত বিস্তারিত বর্ণনা
পৃথিবীতে জুলুম ও ফিতনা মানুষ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাবে, অন্যায় ও হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে, মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি।
আরব অঞ্চলে যুদ্ধ ও অস্থিরতা মক্কা, মদিনা ও সিরিয়ার চারপাশে বড় যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা।
খলিফার মৃত্যু ও উত্তরাধিকার বিরোধ একজন খলিফা মারা যাবে, উত্তরাধিকারের বিষয়ে মতভেদ ও বিবাদ সৃষ্টি হবে।
কালো পতাকা ও খোরাসান বাহিনী পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকা উত্থিত হবে, যা ইমাম মাহদীর আগমনের সংকেত।
সাফিয়ানির আবির্ভাব সিরিয়ার একজন দুষ্ট নেতা (সাফিয়ানি) বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।
ইমাম মাহদীর আগমন মক্কায় মানুষ তাঁকে বায়াত করবে, তিনি পৃথিবীতে ন্যায় ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করবেন।
দাজ্জালের আবির্ভাব দাজ্জাল ফিতনা ছড়াবে, মানুষের ঈমান নষ্ট করার চেষ্টা করবে।
নবী ঈসা (আ.)-এর অবতরণ ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতরণ করবেন, মাহদীর পেছনে নামাজ আদায় করবেন এবং দাজ্জালকে পরাজিত করবেন।
শান্তি ও ন্যায়পরায়ণ শাসন পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায়বিচার ও সম্পদ সমৃদ্ধি। ইসলাম সর্বত্র বিস্তার লাভ করবে।
১০ শাসনকাল মাহদীর শাসনকাল সাধারণত ৭–৯ বছর, কিছু বর্ণনায় আরও বেশি।


দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার উপায়

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



হাদিসে খুব স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। নিচে মূল বিষয়গুলো দিলাম—


📖 ১. সূরা কাহফ পাঠ করা

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

    "যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাবে।"
    (সহিহ মুসলিম)

👉 অন্য বর্ণনায় আছে: সূরা কাহফের শেষের ১০ আয়াত পাঠ করলেও দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।

সূরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াত (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ) দিচ্ছি। এগুলো মুখস্থ ও নিয়মিত পাঠ করলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।


📖 সূরা কাহফ (১৮:১-১০)

১.

ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ عَلَىٰ عَبۡدِهِ ٱلۡكِتَـٰبَ وَلَمۡ يَجۡعَل لَّهُۥ عِوَجَاۜ ١
উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাযী আঞ্জালা ‘আলা ‘আবদিহিল কিতাবা, ওয়া লাম ইয়াজ‘আল লাহূ ‘ইওয়াজা।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।


২.

قَيِّمٗا لِّيُنذِرَ بَأۡسٗا شَدِيدٗا مِّن لَّدُنۡهُ وَيُبَشِّرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّـٰلِحَـٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرًا حَسَنٗا ٢
উচ্চারণ: কাইয়্যিমান লিইউনযিরা বা’সান শাদীদাম মিন লাদুনহু, ওয়া ইউবাশশিরাল মুমিনীনাল্লাযীনা ইয়ামালুনাস-সালিহাতি আন্না লাহুম আজরান হাসানা।
অর্থ: সোজাসাপ্টা (গ্রন্থ), যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তির সতর্কতা দিতে পারেন এবং সৎকর্মশীল মুমিনদেরকে সুসংবাদ দিতে পারেন যে, তাদের জন্য রয়েছে উত্তম পুরস্কার।


৩.

مَّـٰكِثِينَ فِيهِ أَبَدٗا ٣
উচ্চারণ: মাকিসীনা ফীহি আবাদা।
অর্থ: তারা তাতে চিরকাল অবস্থান করবে।


৪.

وَيُنذِرَ ٱلَّذِينَ قَالُواْ ٱتَّخَذَ ٱللَّهُ وَلَدٗا ٤
উচ্চারণ: ওয়া ইউনযিরাল্লাযীনা কালূত্তাখাযাল্লাহু ওয়ালাদা।
অর্থ: এবং তিনি তাদের সতর্ক করবেন যারা বলে, "আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন।"


৫.

مَّا لَهُم بِهِۦ مِنۡ عِلۡمٖ وَلَا لِأٓبَآئِهِمۡۚ كَبُرَتۡ كَلِمَةٗ تَخۡرُجُ مِنۡ أَفۡوَٲهِهِمۡۚ إِن يَقُولُونَ إِلَّا كَذِبٗا ٥
উচ্চারণ: মা লাহুম বিহি মিন ‘ইলমিন ওয়া লা লিআবাইহিম; কাবুরাত কালিমাতান তাকহারুজু মিন আফওয়াহিহিম; ইন্যা কূলূনা ইল্লা কাজিবা।
অর্থ: এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, আর তাদের পূর্বপুরুষদেরও ছিল না। তাদের মুখ থেকে যে কথা বের হয় তা গুরুতর মিথ্যা। তারা শুধু মিথ্যাই বলে।


৬.

فَلَعَلَّكَ بَـٰخِعٞ نَّفۡسَكَ عَلَىٰٓ ءَاثَـٰرِهِمۡ إِن لَّمۡ يُؤۡمِنُواْ بِهَـٰذَا ٱلۡحَدِيثِ أَسَفًا ٦
উচ্চারণ: ফা-লা‘আল্লাকা বাখিঅুন নাফসাকা ‘আলা আ’সারিহিম ইল্লাম ইউমিনূ বিহাযাল হাদীসি আসাফা।
অর্থ: (হে মুহাম্মদ ﷺ) হয়তো তুমি এ কথায় দুঃখে নিজের প্রাণ ধ্বংস করে ফেলবে যদি তারা এতে ঈমান না আনে।


৭.

إِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَى ٱلۡأَرۡضِ زِينَةٗ لَّهَا لِنَبۡلُوَهُمۡ أَيُّهُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗا ٧
উচ্চারণ: ইন্না জা‘আলনা মা ‘আলাল আরদি জীনাতাল্লাহা লিনাবলুয়াহুম আয়্যুহুম আহসানু ‘আমালা।
অর্থ: আমি পৃথিবীর যা কিছু আছে তা সৌন্দর্য করেছি, যাতে আমি পরীক্ষা করতে পারি তাদের মধ্যে কে উত্তম কাজ করে।


৮.

وَإِنَّا لَجَـٰعِلُونَ مَا عَلَيۡهَا صَعِيدٗا جُرُزًا ٨
উচ্চারণ: ওয়া ইন্না লাজা‘ইলূনা মা ‘আলাইহা সা‘ঈদান জুরুজা।
অর্থ: আর অবশ্যই আমি তাতে যা কিছু আছে সবকে একদিন ধূলিসাৎ করে দেব।


৯.

أَمۡ حَسِبۡتَ أَنَّ أَصۡحَـٰبَ ٱلۡكَهۡفِ وَٱلرَّقِيمِ كَانُواْ مِنۡ ءَايَـٰتِنَا عَجَبًا ٩
উচ্চারণ: আম হাসিবতা আন্না আসহাবাল কাহফি ওয়ার রাকীমি কাআনূ মিন আয়াতিনা ‘আজাবা।
অর্থ: তুমি কি মনে করো যে গুহাবাসী ও রাকীম আমার নিদর্শনসমূহের মধ্যে আশ্চর্যজনক ছিল?


১০.

إِذۡ أَوَى ٱلۡفِتۡيَةُ إِلَى ٱلۡكَهۡفِ فَقَالُواْ رَبَّنَآ ءَاتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحۡمَةٗ وَهَيِّئۡ لَنَا مِنۡ أَمۡرِنَا رَشَدٗا ١٠
উচ্চারণ: ইয আওয়াল ফিতইয়াতু ইলাল কাহফি ফাকালূ রাব্বানা আ-তিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইই লানা মিন আমরিনা রাশাদা।
অর্থ: যখন ওই যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলল: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের প্রতি তোমার পক্ষ থেকে দয়া বর্ষণ কর এবং আমাদের ব্যাপারে সঠিক পথ প্রস্তুত করে দাও।”


🌿 এগুলো প্রতিদিন পড়া ও মুখস্থ করার চেষ্টা করলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।


🤲 ২. দোয়া পাঠ করা

নবী করীম ﷺ প্রতিটি নামাজের শেষে (তাশাহ্‌হুদের পরে) এই দোয়া পড়তে বলেছেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ

উচ্চারণ:
"আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিন ‘আযাবি জাহান্নাম, ওয়া মিন ‘আযাবিল কবর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত, ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল।"

অর্থ:
হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় চাই তোমার কাছে জাহান্নামের শাস্তি থেকে, কবরের শাস্তি থেকে, জীবিত থাকা ও মৃত্যুকালের ফিতনা থেকে, আর মসীহ দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে।

(সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি)


🕋 ৩. মক্কা-মদিনায় দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না

  • রাসূল ﷺ বলেছেন, মদিনার পথে ফেরেশতারা পাহারা দেবে। তাই দাজ্জাল কখনোই মক্কা ও মদিনায় ঢুকতে পারবে না।

🛡 ৪. দৃঢ় ঈমান রাখা

  • দাজ্জাল মানুষের ঈমান নষ্ট করার চেষ্টা করবে। তাই আল্লাহর তাওহীদে দৃঢ় বিশ্বাসরাসূল ﷺ এর সুন্নাহ অনুসরণ করা সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

✨ সারকথা:
দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচতে চাইলে —

  • সূরা কাহফের প্রথম বা শেষ ১০ আয়াত পড়া/মুখস্থ রাখা
  • প্রতিদিন নামাজ শেষে দোয়া পড়া
  • দৃঢ় ঈমান বজায় রাখা


দাজ্জালের আগমন সম্পর্কিত কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত লক্ষণগুলো সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরা হলো

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৫ 0
বার দেখা হয়েছে



📌 দাজ্জালের বৈশিষ্ট্য

  1. এক চোখ অন্ধ থাকবে – হাদিসে এসেছে, তার ডান চোখ অন্ধ হবে এবং অন্য চোখ আঙুরের মতো বের হবে।
  2. কপালে লেখা থাকবে "কাফির (ك ف ر)" – মুমিনরা সেটা সহজেই চিনতে পারবে, অশিক্ষিত হলেও।
  3. বিশাল দেহ ও অস্বাভাবিক শক্তি থাকবে।
  4. অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করবে – যেমন বৃষ্টি নামানো, ফসল ফলানো, বা মানুষকে ধন-সম্পদ দেওয়া।
  5. নিজেকে খোদা দাবি করবে।

📌 দাজ্জালের আগমনকালে অবস্থা

  1. পৃথিবীতে ভয়াবহ ফিতনা দেখা দেবে।
  2. খরা ও দুর্ভিক্ষ হবে – মানুষ পানীয় জল ও খাদ্যের জন্য কষ্ট পাবে।
  3. দাজ্জাল মানুষকে প্রতারণা করবে—যারা তার অনুসারী হবে তাদের খাওয়া-দাওয়া দিবে, আর যারা অস্বীকার করবে তাদের কষ্ট পেতে হবে।

📌 দাজ্জালের আগমন সম্পর্কিত স্থান

  • হাদিসে এসেছে, দাজ্জাল খোরাসান অঞ্চলের (বর্তমান ইরান/আফগানিস্তান) দিক থেকে বের হবে।
  • সে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করবে, মক্কা ও মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না

📌 দাজ্জালের মৃত্যু

  • অবশেষে ঈসা (আঃ) পৃথিবীতে অবতীর্ণ হবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করবেন।
  • স্থানটি হবে লুদ দ্বারে (বর্তমান ফিলিস্তিনে)।

🔖 হাদিস সূত্র:

  • সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারি, আবু দাউদ, তিরমিজি প্রভৃতি গ্রন্থে দাজ্জালের উল্লেখ আছে।

👉 সংক্ষেপে: দাজ্জাল এখনো আসেনি, তবে হাদিস অনুযায়ী তার আগমন হবে কিয়ামতের বড় নিদর্শনগুলোর একটি।



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png