শিরোনাম
Loading latest headlines...

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

  

০১.    অর্থ কী?
‘অর্থ’ শব্দের একটি অর্থ উদ্দেশ্যে বা তাৎপর্য হলেও এখানে অর্থ মানে- ধন দৌলত, পয়সা কড়ি, বিত্ত সম্পত্তি, বিষয় ঐশ্বর্য, সংগতি, পূঁজি। জীবিকা, জীবনোপকরণ, সহায় সম্বল, অবলম্বন।
ইংরেজি ভাষায় অর্থকে বলা হয় wealth, money.
আরবি ভাষায় অর্থ সম্পদ, জীবিকা, জীবন-সামগ্রী ইত্যাদি বুঝানোর জন্যে ব্যবহার হয়- مَالٌ (মাল) বহুবচনে  اَمْوَالٌ। এছাড়া مَتَاعٌ (মাতা’) رِزْقٌ (রিয্ক) শব্দগুলোও ব্যবহার করা হয়। কুরআনে অর্থ সম্পদ ও জীবিকা বুঝানোর জন্যে উক্ত শব্দগুলো ছাড়াও রূপক অর্থে فَضْلُ الله (আল্লাহ্র অনুগ্রহ) এবং نِعْمَةُ اللهِ (আল্লাহ্র দান) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে।
মূলত জীবন ধারণ ও জীবন যাপনের জন্যে মানুষের যেসব উপায় উপকরণ এবং সহায় সম্বল প্রয়োজন হয় সেগুলোকে বা সেগুলোর বিকল্পকেই অর্থ সম্পদ বা জীবিকা বলা হয়।

০২.    অর্থনীতি কী?
অর্থনীতির সংজ্ঞা নির্ণয় করা কঠিন। অর্থনীতি যেহেতু একটি সামাজিক বিজ্ঞান, তাই সমাজ বিশ্লেষণের বিভিন্ন দৃষ্টিভংগিতে সমাজ বিজ্ঞানীগণ অর্থনীতির সংজ্ঞা নির্ণয় করার চেষ্টা করেছেন। সমাজ কাঠামোর একটি ধারা হলো অর্থনৈতিক ধারা। এ ধারার যারা বিশেষজ্ঞ পন্ডিত, তাদের মধ্যে এ্যাডাম স্মিথ (Adam Smith ), অধ্যাপক মর্শাল (Prof. Marshall), অধ্যাপক এল. রবিন্স (Prof. L. Robbins), জন স্টুয়ার্ট মিল, কেয়ার্নক্রস, অধ্যাপক ক্যানান, স্যামুয়েলসন প্রমূখ অর্থনীতির বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
এ্যাডাম স্মিথের মতে: “অর্থনীতি এমন একটি বিজ্ঞান যা জাতিসমূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ সম্পর্কে অনুসন্ধান করে।”
অধ্যাপক মর্শালের মতে : “অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কার্যাবলি আলোচনা করে।”
অধ্যাপক ক্যানান বলেন: “অর্থনীতি হলো মানুষের বস্তুগত কল্যাণের কারণ অনুসন্ধানকারী বিষয়।”
কোয়র্নক্রস বলেন: “মানুষের কার্যক্রমের যে অংশ অর্থের সাথে জড়িত, তার আলোচনাই অর্থনীতির বিষয়বস্তু।”
মূলত: অর্থ সংগ্রহ, অর্জন, আহরণ, বৃদ্ধি, বন্টন, ভোগ, ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে চর্চা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা এবং এ সবের নিয়মনীতির শাস্ত্রকেই অর্থ শাস্ত্র, অর্থ বিদ্যা, অর্থবিজ্ঞান, অর্থতত্ত্ব বা অর্থনীতি (economics) বলা হয়।
অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতিকে ইতিবাচক এবং নীতিবাচক-এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদগণ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
ইতিবাচক পন্থীরা বলতে চান : যা আছে, যা হচ্ছে, এবং যা ঘটছে, তার সমাধান নির্দেশনাই অর্থনীতির কাজ।
নীতিবাচক পন্থীরা বলতে চান: কী হওয়া উচিত, আর কী হওয়া উচিত নয় এবং কী করা উচিত, আর কী করা উচিত নয়, সেই নির্দেশনা প্রদানই অর্থনীতির আলোচ্য বিষয়।

০৩.    অর্থনীতির ইসলামি সংজ্ঞা
ইসলাম অর্থনীতির আলাদা অস্বাভাবিক কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেনা। ইসলাম বলে: সম্পদের মূল মালিক মহান আল্লাহ, মানুষ সম্পদের আমানতদার এবং অর্থ মানব জীবনের অখন্ড ও অবিভাজ্য বিষয় সমূহের একটি মাত্র। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে : “আল্লাহ নির্দেশিত জীবন দর্শনের ভিত্তিতে মানুষের জীবিকা আহরণ, আহরিত সম্পদের ন্যায্য বন্টন এবং সুষ্ঠু ও সুন্দর ব্যয় ও ভোগ ব্যবহারের নির্দেশনাই অর্থনীতি।” আমাদের মতে এটাই অর্থনীতির সঠিক সংজ্ঞা হওয়া উচিত। ইসলামি অর্থনীতি একই সাথে ইতিবাচক এবং নীতিবাচক। ইসলামি অর্থনীতিতে উন্নয়ন ও সমস্যার সমাধান নির্দেশনা প্রদান করা হয় আদর্শ ও ন্যায় নীতির ভিত্তিতে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. এম. নেজাতুল্লাহ সিদ্দীকির মতে : Islamic economics is the Muslim thinkers’ response to the economic challenges of their times. In this endeavour they are aided by the Quran and the Sunnah as well as by reason and experience. (Lectures on Islamic Economic Thoughts, IRTI, Islamic Development Bank, Jeddah, 1992, P 69)

০৪.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার মতোই অর্থব্যবস্থাও তিনটি ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সেগুলো হলো :
১.    দর্শনগত ভিত্তির উপর পরিচালিত হওয়া।
২.    মাকাসিদে শরিয়া (শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ) অর্জনের জন্যে তৎপর থাকা।
৩.    হিকমা বা কর্মকৌশল ও প্রজ্ঞার প্রয়োগ।
১. দর্শনগত ভিত্তির অর্থ: দর্শনগত ভিত্তি বলতে বুঝায় বিশ্বাস ও আদর্শের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া দৃষ্টিভংগি ও ধ্যান ধারণা। ইসলামি জীবন ব্যবস্থার দর্শনগত ভিত্তি তিনটি। সেগুলো হলো :
১.    তাওহীদ (আল্লাহ্র একত্ব এবং এক আল্লাহ্র দাসত্ব ও আনুগত্য)।
২.    খিলাফত (প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহ্র প্রতিনিধি)।
৩.    আদল (ন্যায়, নায্য ও সুষমনীতি; Justice)।
এই তিনটি মূলনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাসই মানব জীবনে শক্তি ও প্রেরণার মূল উৎস। তাঁকে মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মালিক ও পরিচালক মেনে নিয়ে তাঁর আনুগত্য ও দাসত্বের জীবন যাপন করাই মানব জীবন সাফল্যের একমাত্র করিডোর। এই পৃথিবী এবং মানুষ তাঁর সৃষ্টির একটি অংশ মাত্র। তিনি কোনো কিছুই অর্থহীন সৃষ্টি করেননি। মানুষের ইহকালীন কর্মতৎপরতাকে তিনি পরকালীন সাফল্যের ভিত্তি বানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং মানুষকে সাফল্যের জন্যে অবশ্যি তাঁর প্রদত্ত বিধানমতো চলতে হবে এবং শুধুমাত্র তাঁরই কাছে চাইতে হবে।
ইসলামে খিলাফতের ধারণাও বিশ্বজনীন। মানুষ পৃথিবীর মূল কর্তা নয়। পৃথিবীতে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। পৃথিবীর সম্পদ ও কর্তৃত্ব মানুষের কাছে আল্লাহর আমানত। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। সুতরাং ক্ষমতা ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো সকল মানুষের কল্যাণে নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদকে নিবেদিত করা। খিলাফতের মূল স্পীরিট হলো :
১.    বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব বোধ : সব মানুষ একই সূত্রে গাঁথা। সবাই এক আল্লাহর সৃষ্টি। সবাই এক আদমের সন্তান।
২.    মানবতার প্রতি সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ।
৩.    ক্ষমতা ও ধনসম্পদ তার কাছে আল্লাহ্র গচ্ছিত আমানত। এগুলোকে মানব কল্যাণে নিয়োজিত করাই তার মূল দায়িত্ব।
৪.    বিনয় ও আনুগত্য। যেহেতু মানুষ পৃথিবীতে কোনো কিছুরই মালিক নয়, আমানতদার, তাই মূল মালিকের প্রতি আনুগত্য এবং বিনয়ী জীবন যাপন করাই তার কর্তব্য।
আদল কথাটিও ব্যাপক অর্থবোধক। এর ইংরেজি অনুবাদ Justice. বাংলায় ন্যায়, নায্য ও সুষমনীতি ও আচরণ বলা যায়। এর তাৎপর্য হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের শক্তি, ক্ষমতা ও সম্পদ মানব কল্যাণে নিয়োজিত করবে। সে তার অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচার ও কল্যাণ কামনা দ্বারা তাড়িত হবে।
অর্থনীতিসহ ইসলামের সকল কাজে এই তিনটি বিশ্বাস ও চিন্তাগত ভাবধারা মানবদেহের অভ্যন্তরে শোনিত ধারার মতো প্রবহমান থাকতে হবে।
২. মাকাসিদে শরিয়া (objectives of shariah) : মাকাসিদ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন মাকসাদ। মাকসাদ মানে- উদ্দেশ্য (objective)। ইসলামের ভিত্তিতে জীবন যাপনের জন্যে আল্লাহ তায়ালা যে নিয়ম কানুন ও বিধি বিধান প্রদান করেছেন, তা-ই একমাত্র মানব কল্যাণের শরিয়া। মানুষের ইহ জাগতিক এবং পারলৌকিক সার্বিক কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যেই মহান আল্লাহ শরিয়া প্রদান করেছেন। ইসলামি শরিয়ার মূল উৎস (source) হলো আল কুরআন ও সুন্নতে রসূল সা.।
কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে মাকাসিদে শরিয়া বা ইসলামি শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ নিম্নরূপ :
১.    ঈমান ও তাওহীদ : অর্থাৎ মুমিনদের ঈমান ও আকিদা-বিশ্বাসের সংরক্ষণ।
২.    আদল : ন্যায় বিচার ও সুষমনীতি নিশ্চিত করণ।
৩.    ইহসান ও ফালাহে ’আম : মানবতার কল্যাণ ও সাফল্য।
৪.    হায়াতে তাইয়্যেবা : সুন্দর ও স্বচ্ছন্দ জীবন যাপন।
৫.    মানবতার কল্যাণ, সাফল্য এবং সুন্দর-স্বচ্ছন্দ জীবন যাপনের জন্যে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধানের প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
৬.    জীবনের নিরাপত্তা।
৭.    মানব বংশ সংরক্ষণ।
৮.    সম্পদের নিরাপত্তা।
৯.    মর্যাদা তথা মান সম্মান ও ইয্যতের নিরাপত্তা।
১০.    মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ও বিকাশের সুবিধা নিশ্চিত করণ।
১১.    চিন্তা, চলাফেরা ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করণ।
১২.    সামগ্রিক মানবাধিকার সংরক্ষণ।
৩. হিকমা (কর্মকৌশল ও প্রজ্ঞা) : শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ অর্জনের জন্যে হিকমা প্রয়োগ অপরিহার্য। হিকমা মানে- যথার্থ জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও কর্মকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালানো। মূলত টিকে থাকা, উন্নয়ন, সাফল্য অর্জনের কৌশল ও সঠিক পদক্ষেপকে হিকমা বলা হয়। কুরআন বলছে, রসূল সা. তাঁর সাথিদের মানবিক ও নৈতিক সত্তার উন্নয়ন এবং কিতাব শিক্ষা দেয়ার সাথে সাথে হিকমাও শিক্ষা দিতেন :
لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ 
অর্থ: অবশ্যি আল্লাহ মুমিনদের প্রতি বিরাট অনুগ্রহ করেছেন তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রসূল পাঠিয়ে, যিনি তাদের প্রতি আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করেন, তাদের তাযকিয়া (মানবিক ও নৈতিক গুণাবলীর উন্নয়ন সাধন) করেন, তাদের আল কিতাব (কুরআন) এবং হিকমা শিক্ষা দান করেন। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৬৪)
মূলত ইসলামের দৃষ্টিতে মানব সমাজের গোটা অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ভিত্তি হলো এই তিনটি। সুতরাং ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তিও এই তিনটি।

০৫.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য সমূহ
ইসলামি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহই এর মূলনীতি। সেগুলো হলো:
০১.    অর্থ সম্পদের মূল মালিক ও যোগানদাতা এই পৃথিবী এবং মহাবিশ্বের স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক মহান আল্লাহ।
০২.    মানুষ সম্পদের মূল মালিক নয়, আমানতদার এবং ব্যবহারকারী বা ভোক্তা মাত্র। সুতরাং সে সম্পদের উৎপাদন, উপার্জন এবং ভোগ ব্যবহার করবে সম্পদের মূল মালিক আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা মাফিক।
০৩.    মানুষের আর্থ সামাজিক বিষয়াদি তার বিশ্বাস, আদর্শ ও মূল্যবোধের সাথে একীভূত ও অবিভাজ্য। সুতরাং তার আর্থ সামাজিক বিষয়াদির উন্নয়ন ও ইতিবাচক নির্দেশনার ভিত্তি হবে নীতিবাচক তথা তার বিশ্বাস, আদর্শ এবং শরিয়া তথা কুরআন, সুন্নাহ, যুক্তি, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা।
০৪.    ইসলামি অর্থনীতির অন্যতম মূল নীতি হলো, জাতি ধর্ম, ভাষা বর্ণ এবং কুল গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ সাধন বা মানব কল্যাণ।
০৫.    ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আদল তথা ইনসাফ, সুবিচার ও ভারসম্যপূর্ণতা (Justice and balance)।
০৬.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সংঘাত নয়, বরং পারস্পারিক সহমর্মিতা, সহানুভূতি, সহযোগিতা ও কল্যাণকামিতা (ইহ্সান)।
০৭.    ইসলামি অর্থ ব্যবস্থায় যুল্ম ও নিবর্তনমূলক সকল পন্থা ও প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ।
০৮.    ইসলামি অর্থব্যবস্থা উৎপাদন, উপার্জন ও উন্নয়নমুখী।
০৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থায় অর্থ সম্পদের কৃপণতা, অলস পূঞ্জীভূত করণ এবং অনুৎপাদনশীল সঞ্চয় নিষিদ্ধ।
১০.    ইসলামি অর্থনীতিতে সম্পদের অপব্যবহার, অপব্যয় এবং অপচয় নিষিদ্ধ।
১১.    ইসলামি অর্থনীতি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।
১২.    ব্যক্তির সম্পদে সমাজের অধিকারের স্বীকৃতি।
১৩.    ইসলামি অর্থব্যবস্থা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণের নির্দেশনা সম্বলিত সার্বজনীন জনহিতৈষী ব্যবস্থা।
১৪.    অর্থ হবে ধ্বংস ও অকল্যাণ থেকে মানুষ ও মানবতার মুক্তির হাতিয়ার।
১৫.    ব্যক্তি মালিকানার অধিকার। পুরুষ নারী প্রত্যেকেই বৈধ পন্থায় অর্জিত নিজ সম্পদের স্বত্বাধিকারী সে নিজে। বৈধ অন্থায় স্বাধীনভাবে এর বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যহারের অধিকার তার জন্যে সংরক্ষিত।
১৬.    যাকাত : অভাবী ও বিপদগ্রস্তদের অধিকার হিসেবে ধনীদের নগদ ও বিনিয়োগকৃত অর্থ, ফল ফসল এবং গবাদি পশুসহ সর্বপ্রকার বর্ধনশীল সম্পদের যাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক।
১৭.    সুদ ও সুদী কারাবার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
১৮.    উত্তরাধিকার বিধান : শরিয়া নির্ধারিত নিকট আত্মীয়দের মধ্যে উত্তরাধিকার বন্টন বাধ্যতা মূলক।
১৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার সামগ্রিক উদ্দেশ্য হলো, মাকাসিদে শরিয়া বা ইসলামি শরিয়ার উদ্দেশ্য সমূহ বাস্তবায়ন।
২০.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো, বিশ্বাসী হিসেবে দুনিয়ায় সুন্দর, স্বচ্ছন্দ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবন যাপনের মাধ্যমে আখিরাতের সাফল্য অর্জন।
ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য নীতিমালা সংক্রান্ত ধারণা বিষয়ে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো :
لَهُ مَقَالِيدُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ وَيَقْدِرُ ۚ إِنَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ 
অর্থ: মহাবিশ্ব এবং পৃথিবীর ভান্ডারের চাবিকাঠির মালিকানা ও কর্তৃত্ব আল্লাহ্র। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তার জীবিকায় (অর্থ সম্পদে) প্রশস্ততা দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা সীমিত দিয়ে থাকেন। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞানী। (সূরা ৪২ আশ শূরা : আয়াত ১২)
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا 
অর্থ: আল্লাহ সেই মহানুভব সত্ত্বা যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৯)
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الْأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ 
অর্থ: (হে মানুষ!) আমরা পৃথিবীতে তোমাদের কর্তৃত্ব দান করেছি এবং সেখানেই রেখে দিয়েছি তোমাদের জীবনের উপকরণ (অর্থাৎ পৃথিবীর বুকেই তোমরা জীবিকা সন্ধান সংগ্রহ করো)। (সূরা ৭ আল আ’রাফ : আয়াত ১০)
وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ ۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا ۖ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ ۚ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا 
অর্থ: আল্লাহ যেসব জিনিস দিয়ে তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেটার জন্যে তোমরা লালসা করোনা। পুরুষ যা উপার্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আল্লাহর কাছে তার অনুগ্রহ (অর্থ সম্পদ, সহায় সম্বল) প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে জ্ঞানী। (সূরা ৪ আন্নিসা : আয়াত ৩২)
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
অর্থ: এবং তাদের (বিত্তবানদের) অর্থ সম্পদে অধিকার রয়েছে সাহায্যপ্রার্থী এবং বঞ্চিতদের। (সূরা ৫১ আয্ যারিয়াত : আয়াত ২৯)
مَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَىٰ فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ 
অর্থ: আল্লাহ জনপদবাসীদের থেকে তাঁর রসূলকে যা  (যে সম্পদ) দিয়েছেন- তা আল্লাহর, আল্লাহর রসূলের, রসূলের স্বজনদের, এতিমদের, অভাবীদের এবং পথচারীদের জন্যে। এর উদ্দেশ্য হলো, অর্থ সম্পদ যেনো কেবল তোমাদের মধ্যকার বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়। (সূরা ৫৯ আল হাশর: আয়াতাংশ ৭)
إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ 
অর্থ: তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে লেনদেনের (ঋণ দেয়া নেয়ার) ফায়সালা করবে, তখন তা লিখিতভাবে করবে। (সূরা ২ আল বাকারা ; আয়াত ২৮২)
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ وَرَفَعَ بَعْضَكُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ 
অর্থ: তিনিই মহান আল্লাহ, যিনি পৃথিবীতে তোমাদের প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং তোমাদের একজনকে আরেকজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হলো, তিনি তোমাদের যা কিছু দিয়েছেন তার মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করবেন। (সূরা ৬ আল আন’আম : আয়াত ১৬৫)
قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ 
অর্থ: ওদের জিজ্ঞেস করো, কে হারাম করলো আল্লাহ্র সেই সব সৌন্দর্যকে, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্যে উৎপন্ন করেছেন এবং উত্তম জীবনোপকরণ সমূহকে? (সূরা ৭ আ’রাফ : আয়াত ৩২)
إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ 
অর্থ: তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তাও ভালো। আর যদি গোপনে দরিদ্রদের দাও, তবে তা অধিকতর ভালো। এমনটি করলে তোমাদের বহু পাপ মুছে দেয়া হবে। তোমরা যাই করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (সূরা ২ বাকারা : ২৭১)
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ ۖ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ 
অর্থ: এই সাদাকা (যাকাত) নির্দিষ্ট করে দেয়া হলো ফকিরদের জন্যে, মিসকিনদের জন্যে, সাদাকা আদায়-বন্টন বিভাগের কর্মচারীদের জন্যে, তাদের জন্যে (ইসলামের পক্ষে) যাদের মন আকৃষ্ট করা উদ্দেশ্য হবে, দাস মুক্তির জন্যে, ঋণে নিমজ্জিতদের সাহায্যের জন্যে, আল্লাহর পথে এবং পথিকদের সাহায্যের জন্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আরোপিত একটি ফরয। (সূরা ৯ তাওবা : ৬০)
وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا  إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ 
অর্থ: আত্মীয় স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও এবং অভাবী ও পথিকদের দাও তাদের প্রাপ্য। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অপব্যয় করোনা। কারণ অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ২৬-২৭)
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ 
অর্থ: হে আদম সন্তান! সালাত আদায়কালে তোমাদের উত্তম পবিত্র পোশাক পরে সৌন্দর্য গ্রহণ করো। আর আহার করো, পান করো, কিন্তু অপচয় করোনা। আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা ৭ আল আ’রাফ: আয়াত ৩১)
وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَىٰ عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطْهَا كُلَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا مَّحْسُورًا 
অর্থ: তুমি (কার্পণ্য করে) নিজের হাতকে গলায় বেঁধে রেখোনা, আবার (উজাড় করে খরচ করে ফেলার জন্যে) তা সম্পূর্ণ প্রসারিত করেও দিওনা। এমনটি করলে তিরস্কৃত হবে এবং খালি হাতে বসে পড়বে। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ২৯)
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَ‌ٰلِكَ قَوَامًا 
অর্থ: (আল্লাহ্র প্রিয় লোকদের বৈশিষ্ট্য হলো:) তারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপচয়-অপব্যয় করেনা, আবার কার্পণ্যও করেনা; বরং উভয় চরম পন্থার মাঝখানে তারা মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। (সূরা ২৫ আল ফুরকান : আয়াত ৬৭)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ
অর্থ: হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল এবং উত্তম পবিত্র। তোমরা তাই খাও- ভোগ করো। তবে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করোনা। (সূরা ০২ : ১৬৮)

০৬.    ইসলামি অর্থনীতির উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য
ইসলামি অর্থনীতি মানব কল্যাণের অন্যতম উপাদান। সমাজ থেকে অকল্যাণের পথ বন্ধ করে কল্যাণের স্রোতধারা বইয়ে দেয়াই ইসলামি অর্থনীতির কাজ। নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যাবলি হাসিলের প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুটি এবং আখিরাতের সাফল্য অর্জনই ইসলামি অর্থনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য :
১.    ফালাহ: ব্যাক্তির সাফল্য ও কল্যাণ সাধন,
২.    ইহ্সান: মানবতার কল্যাণ সাধন,
৩.    আদল: সমাজে অর্থ সম্পদের ন্যায্য ও সুষম প্রবাহ সৃষ্টি,
৪.    সমাজে ন্যায়নীতির প্রচলন,
৫.    দেশ ও সমাজকে ফিতনা ফাসাদ তথা ধ্বংসকর কর্মকান্ড থেকে রক্ষা করা।
এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের নিমোক্ত আয়াতগুলো অকাট্য দলিল :
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ 
অর্থ: আল্লাহ তোমাকে যে অর্থ সম্পদ দিয়েছেন তার দ্বারা আখিরাতের আবাস (জান্নাত) অনুসন্ধান করো এবং পার্থিব জীবনে তোমার বৈধ (ভোগের) অংশও ভুলে থেকোনা। (মানুষের) কল্যাণ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। আর (অর্থ সম্পদ দ্বারা) দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করোনা। বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না। (সূরা ২৮ আল কাসাস : আয়াত ৭৭)
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ 
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন আদল ও ইহসান করার এবং নিকটাত্মীয়দের দান করার। আর তিনি নিষেধ করছেন অশ্লীলতা, অসৎকর্ম এবং সীমালংঘন থেকে। তিনি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। (সূরা ১৬ আন্ নহল : আয়াত ৯০)
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ: সালাত সমাপ্ত হলে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং (কাজ ও শ্রম দানের মাধ্যমে) আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা, অর্থ-সম্পদ) সন্ধান (সংগ্রহ) করো, আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আশা করা যায় তোমারা ফালাহ (কল্যাণ) লাভ করবে। (সূরা ৬২ আল জুমুয়া : আয়াত ১০)
وَأَنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ۛ وَأَحْسِنُوا ۛ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ: তোমারা আল্লাহর পথে ব্যয় করো, আল্লাহর পথে খরচ না করে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা। মানুষের প্রতি ইহসান করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের (কল্যাণকারীদের) ভালোবাসেন। (সূরা ২ বাকারা : আয়াত ১৯৫)

০৭.    ইসলামে অর্থ উপার্জনের তাকিদ
প্রধানত তিনটি সূত্রে মানুষ অর্থ সম্পদ অর্জন করে। সেগুলো হলো :
১.    উত্তরাধিকার সূত্রে
২.    ব্যবসা বাণিজ্য, চাকুরি বাকুরি তথা কাজ করে উপার্জনের মাধ্যমে,
৩.    দান লাভের মাধ্যমে।
যারা শুধু প্রথমটির উপর নির্ভর করে, সেই সাথে দ্বিতীয় মাধ্যমটি গ্রহণ করেনা, তারা কর্মবিমূখ-অলস। ইসলামে এ ধরণের লোকেরা নিন্দনীয়। এরা ক্রমান্বয়ে তৃতীয় মাধ্যমটি অবলম্বনের দিকে অগ্রসর হয়।
সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যারা ব্যবসা না করে, বা কাজ না করে, বা শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন না করে শুধু দান লাভ বা ভিক্ষাবৃত্তির উপর নির্ভর করে, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা খুবই নিন্দা ও তিরস্কারযোগ্য।
ইসলামে প্রশংসনীয় লোক হলো তারা, যারা দ্বিতীয় মাধ্যমটি গ্রহণ করে। অর্থাৎ যারা ব্যবসা বাণিজ্য ও চাকুরি বাকুরির মাধ্যমে কিংবা শ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করে।
অর্থ উপার্জনে আত্মনিয়োগ করা মুমিনদের জন্যে অত্যাবশ্যক। এর নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَىٰ ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ۚ ذَ‌ٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ  فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِن فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَّعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ 
অর্থ: হে মুমিনরা! জুমাবারে যখন  সালাতের দিকে ডাকা (আযান দেয়া) হয়, তখন তোমরা বিজনেস রেখে দ্রুত আল্লাহ্র যিক্র (সালাত)-এর দিকে আসো। এতেই রয়েছে তোমাদের জন্যে কল্যাণ যদি তোমরা জ্ঞান খাটাও। অতপর সালাত শেষ হবার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়ো জমিনে (তোমাদের পেশায়) এবং সন্ধান করো আল্লাহ্র অনুগ্রহ (জীবিকা), আর বেশি বেশি আলোচনা করো আল্লাহ্র কথা। এভাবেই অর্জন করবে তোমরা ফালাহ (কল্যাণ ও সাফল্য)। (সূরা ৬২ জুমুয়া : আয়াত ৯-১০)
নিদ্রা এবং রাত দিন সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন :
وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا  وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا  وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا
অর্থ : আমি তোমাদের নিদ্রাকে বানিয়ে দিয়েছি বিশ্রাম ও প্রশান্তি লাভের উপায়। রাতকে বানিয়ে দিয়েছি আবরণ। আর দিনকে বানিয়ে দিয়েছি জীবিকা উপার্জনের উপযুক্ত সময়। (সূরা ৭৮ জুমুয়া : আয়াত ৯-১১)
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
مَا اَكَلَ اَحَدٌ طَعَامًا خَيْرًا مِنْ انْ يَأكُلَ مِنْ عَمَلٌ يَدَيْهِ 
অর্থ: “নিজের উপার্জনের চাইতে উত্তম জীবিকা কেউ কখনো ভোগ করেনি।” (সহীহ বুখারি)
اِنَّ اَطْيَبَ مَا اَكَلْتُمْ مِنْ كَسْبَِكُمْ وَاِنَّ اَوْلاَدِكُمْ مِنْ كَسَبِكُمْ 
অর্থ: “তোমাদের সর্বোত্তম জীবিকা নিজের উপার্জন। আর তোমাদের সন্তানের উপার্জনও তোমাদের উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।” (তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, আবু দাউদ)
অর্থ উপার্জন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, রসূলুল্লাহর সা. এ হাদিসটি তার নির্দেশক :
طَلَبُ كَسَبِ الْحَلاَلِ فَرِيْضَةٌ بَعْدَ الْفَرِيْضَةٌ 
অর্থ: “অন্যান্য ফরযের মতোই হালাল উপার্জনও একটি ফরয।” হাদিসটি বায়হাকি তাঁর শোয়াবুল ঈমানে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণনা বর্ণনা করেছেন।
মুসনাদে আহমদে রাফে বিন খাদিজ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করা হলো : কোন্ ধরণের উপার্জন সর্বোত্তম? তিনি বললেন : “ব্যক্তির সশ্রমে হালাল ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন।”

০৮.    হালাল ও বৈধ উপার্জনকারীর পরকালীন সাফল্য

হালাল উপার্জন একটি ইবাদত। কারণ হালাল উপার্জনকারী আল্লাহ্র হুকুম পালন করে। আল্লাহ যা কিছু হারাম করেছেন এবং যা কিছু নিষেধ করেছেন, সে সেগুলো পরিত্যাগ করে। যেসব মুমিন ব্যক্তি হালাল ও বৈধ পন্থায় জীবিকা তথা অর্থ সম্পদ উপার্জন করে, পরকালে আল্লাহ তায়ালা তাদের মর্যাদা দান করবেন। জাবির রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
رَحِمَ اللهُ رَجُلاً سَمْحًا اِذَا بَاعَ وَاِذَا شْتَرٰى وَاِذَا قْتَضٰى 
অর্থ: আল্লাহ তায়ালা ঐ উপার্জনকারীর প্রতি রহম করেন, যে বেচা কেনা এবং পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে সহনশীল হয়। (সহীহ বুখারি : ব্যবসা বাণিজ্য অধ্যায়)
আলী রা. বর্ণনা করেন, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি : “যেদিন আল্লাহ্র আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবেনা, সেদিন সেই ছায়ায় ঐ ব্যক্তিকে স্থান দেয়া হবে, যে আল্লাহ্র অনুগ্রহ (জীবিকার) সন্ধানে বের হয় এবং তা সংগ্রহ করে পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে আসে।” (মুসনাদে যায়েদ ইবনে আলী, Economic Teaching of Prophet Muhammad 3:3)
আবু সায়ীদ খুদরি রা. বলেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
اَلتَّاجِرُ الصَّدُوْقُ الْاَمِيْنُ مَعَ النَّبِيِّيْنَ وَالصِّدِّقِيْنَ وَالشُّهَدَاءِ 
অর্থ: সত্যবাদী বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (পরকালে) নবী, সিদ্দিক এবং শহীদগণের সংগি হবে।” (তিরমিযি, দারেমি, দারু কুতনি, ইবনে মাজাহ। মিশকাত শরীফ হাদিস নম্বর : ২৬৭৪)

০৯.    হারাম ও অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি
কুরআন মজিদে অবৈধ উপার্জনকারীদের ভয়াবহ পরকালীন শাস্তির কথা উল্লেখ হয়েছে। রসূলুল্লাহ সা.-এর হাদিসেও অবৈধ উপার্জনের চরম নিন্দা করা হয়েছে। এখানে আমরা দুটি হাদিস উল্লেখ করছি। আবু বকর রা. বর্ণনা করেন রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِىَ بِالْحَرَامِ 
অর্থ: যে শরীর (যে ব্যক্তি) হারাম (উপার্জন ভোগ) দ্বারা লালিত ও বিকশিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবেনা। (বায়হাকি, মিশকাত হাদিস নম্বর ২৬৬৭)
আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন :
اِنَّ اللهَ طَيِّبٌ لاَّ يَقْبَلُ اِلاَّ طَيِّبًا وَاِنَّ اللهَ اَمَرَ الْمُؤمِنِيْنَ بِمَا اَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِيْنَ  فَقَالَ يٰاَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَعْمَلُوْا صَالِحًا وَّقَالَ يٰاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَكُمْ ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلُ يُطِيْلُ السَّفَرَ اَشْعَثَ اَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ اِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَ مَطْعَمُه حَرَامٌ وَّمَشْرَبُه حَرَامٌ وَّمَلْبَسُه حَرَامٌ وَّغُذِىَ بِالْحَرَامِ فَاَنّٰى يُسْتَجَابَ لِذَالِكَ 
অর্থ: আল্লাহ উত্তম-পবিত্র। তিনি উত্তম এবং পবিত্র (পন্থা ও বস্তু) ছাড়া গ্রহণ করেন না। তিনি মুমিনদের সেই নির্দেশই দিয়েছেন, যে নির্দেশ দিয়েছেন রসূলগণকে। তিনি তাদের বলেছেন : ‘হে রসূলরা! তোমরা উত্তম ও পবিত্র জীবিকা আহার করো, ভোগ করো এবং আমলে সালেহ করো।’ তিনি আরো বলেছেন : ‘হে মুমিনরা! আমার প্রদত্ত উত্তম ও পবিত্র জীবিকা ভোগ-আহার করো।’ অতপর রসূলুল্লাহ সা. বললেন : দেখো, এক ব্যক্তি দূর দুরান্ত সফর করে আসে। তার চুল এলোমেলো, দেহ ধূলোমলিন। সে হাত উঠিয়ে প্রার্থনা করে : ‘হে প্রভু, হে প্রভু!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম (অর্থাৎ হারাম উপার্জনের), হারাম উপার্জনই সে ভোগ করে। কী করে কবুল হবে তার দোয়া? (সহীহ মুসলিম, মিশকাত হাদিস নম্বর ২৬৪০)

১০.    হালাল ও বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় সমূহ
হালাল এবং বৈধভাবে অর্থ উপার্জন ও ভোগ ব্যবহারের নির্দেশই ইসলামে দেয়া হয়েছে। ইসলাম নোংরা উপার্জন ও জীবিকাকে নিষিদ্ধ করে এবং উত্তম ও সুন্দর উপার্জন ও জীবিকাকে প্রশংসা করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُحَرِّمُوا طَيِّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ  وَكُلُوا مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالًا طَيِّبًا ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ 
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ যেসব ভালো জিনিস তোমাদের জন্যে হালাল করেছেন তোমরা সেগুলো নিষিদ্ধ করে নিওনা এবং সীমালংঘন করোনা। আল্লাহ সীমালংঘনকারীদের পছন্দ করেন না। আর আল্লাহ তোমাদের যেসব হালাল ও ভালো জীবিকা-জীবনোপকরণ দিয়েছেন সেগুলো ভোগ আহার করো এবং সেই আল্লাহকে ভয় করো, যাঁর প্রতি তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছো।  (সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৮৭-৮৮)
মূলত নিষিদ্ধ উৎসসমূহ ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিতে উপার্জনের বাকি সব উৎসই হালাল বা বৈধ। আয় উপার্জনের নিম্নোক্ত উৎসসমূহ হালাল এবং বৈধ :
০১.    ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন। বৈধ পন্থায় ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জনকে ইসলাম সর্বাধিক উৎসাহিত করেছে। ব্যবসা করা যায় :
ক. একক ব্যবসা,
খ. পূজি বিনিয়োগের মাধ্যমে শরিকানা ব্যবসা,
গ. পূজি ও শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথ বা শরিকানা ব্যবসা।
০২.    কৃষি কাজের মাধ্যমে উপার্জন। যেমন :
ক. নিজের জমিতে ফল ফসল ও অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদন ও উপার্জন,
খ. পরের জমিতে বর্গা চাষের মাধ্যমে উৎপাদন ও উপার্জন,
গ. পরের জমি ভাড়া  (ইজারা) নিয়ে উৎপাদন।
০৩.    পশু পাখি ও মৎস পালনের মাধ্যমে উপার্জন (জলে স্থলে খামার পদ্ধতি)।
০৪.    শিল্প কারখানা স্থাপনের মাধমে উপার্জন।
০৫.    পেশা গ্রহণের মাধ্যমে উপার্জন। শিক্ষকতা, ডাক্তারি, ওকালতি, ইত্যাদি।
০৬.    সরকারি বেসরকারি চাকুরি গ্রহণের মাধ্যমে উপার্জন।
০৭.    সেবা প্রদানের (সাভির্স চার্জ গ্রহণের) মাধ্যমে উপার্জন।
০৮.    মানসিক এবং শারীরিক শ্রমদানের মাধ্যমে উপার্জন।
০৯.    দালালি (সহযোগিতা) করার মাধ্যমে উপার্জন।
১০.    দান লাভের মাধ্যমে অর্জন।
১১.    হাদিয়া, তোহফা ও অসিয়তের মাধ্যমে লাভ।
১২.    উত্তরাধিকার লাভ।
১৩.    অধিকার হিসাবে অভিভাবক থেকে লাভ।
১৪.    সরকারি সাহায্য লাভ।
১৫.    অন্যান্য।

১১.    নারীর অর্থ উপার্জন ও সম্পদের মালিকানা অর্জন
এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে নারীর অর্থোপার্জন এবং খরচের বিষয়টিও আলোচনা করা জরুরি মনে করছি। কারণ, এ নিয়ে অকারণে সৃষ্টি করা হয়েছে অনেক কল্পকাহিনী।
ইসলাম পুরুষের মতো নারীর অর্জিত সম্পদের মালিকানা নারীকেই দিয়েছে (সূরা আন্নিসা : আয়াত৩২)। পুরুষের মতোই শরিয়া অনুমোদিত প্রক্রিয়ায় নারীর অর্জিত ও উপার্জিত নিজের অর্থ সম্পদের বিনিয়োগ, উন্নয়ন ও ব্যয় ব্যবহারের অধিকার তার নিজের জন্যে সংরক্ষিত। তবে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপনে এবং পরিবার পরিচালনায় অর্থ ব্যয়ের দায়িত্ব পুরুষের । এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ছাড়া নারীর অর্থ ব্যয় হয়না। নারীর আয়ের উৎস অধিক, ব্যয়ের বাধ্যতামূলক খাত একেবারেই সীমিত। তার ব্যয়ের খাত স্বাধীন সেচ্ছোমূলক। ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর আয় ও অর্জনের উৎস সমূহ নিম্নরূপ:
০১.    লালন পালন ও পড়া লেখার অর্থ পাবেন পিতার নিকট থেকে।
০২.    বিবাহের অর্থ প্রদান করবেন পিতা এবং স্বামী।
০৩.    বিবাহে স্বামীর নিকট থেকে মোহরানা লাভ।
০৪.    ঘর বাড়ি নির্মাণ খরচ বা বাসা ভাড়া পাবেন স্বামীর নিকট থেকে।
০৫.    খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার অর্থ পাবেন স্বামীর নিকট থেকে।
০৬.    সন্তান লালন পালন এবং তাদের শিক্ষা চিকিৎসা সহ যাবতীয় খরচের অর্থ নেবেন স্বামী থেকে।
০৭.    পিতা মাতা এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থ সম্পদ লাভ করবেন।
০৮.    স্বামী এবং সন্তানের মৃতুতেও উত্তরাধিকার সূত্রে অর্থ সম্পদ লাভ করবেন।
০৯.    স্বামী, সন্তান, পিতা, মাতা, ভাইবোন এবং অন্যান্য আত্মীয়দের পক্ষ থেকে দান, উপহার এবং হাদিয়া তোহফা লাভ।
১০.    স্বামী বা অভিভাবকের অনুমতিক্রমে (যদি বর্তমান থাকে) বৈধ প্রক্রিয়ায় চাকুরির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ।
১১.    বৈধ প্রক্রিয়ায় ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের সুযোগ।
১২.    শিক্ষকতা, চিকিৎসা ও অন্যান্য স্বাধীন পেশার মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ।
১৩.    হস্তশিল্পসহ ঘরে প্রস্তুতযোগ্য সামগ্রী তৈরির মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ।
১৪.    বিবাহ বিচ্ছেদ কালে তালাক দাতা স্বামীর নিকট থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর  অর্থ  লাভ।
১৫.    তালাক দাতা স্বামীর শিশু সন্তানকে দুধপান করালে বা লালন পালন করলে সে জন্যে অর্থ লাভ।

১২.    নারীদের  খরচের খাত
০১.    পড়া লেখার খরচ : প্রদান করনে পিতা, মাতা, স্বামী,ভ্রাতা। নিজের খরচ নেই, থাকলেও ঐচ্ছিক।
০২.    বিবাহ খরচ : প্রদান করেন পিতা, মাতা, ভ্রাতা, বর। নিজের খরচ ঐচ্ছিক।
০৩.    সন্তান লালন পালন খরচ: এ ক্ষেত্রে মায়ের খরচ ঐচ্ছিক, পিতার খরচ বাধ্যতামূলক।
০৪.    বাসস্থানের খরচ : বহন করেন পিতা, স্বামী, সন্তান। নিজের খরচ ঐচ্ছিক এবং কদাচিৎ।
০৫.    অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা খরচ : বহন করেন পিতা, স্বামী, সন্তান। নিজের খরচ ঐচ্ছিক/ কদাচিৎ।
০৬.    দান সদকা।
০৭.    হাদিয়া, তোহফা, উপহার।
০৮.    যাকাত।
০৯.    কর, খাজনা।
১০.    কাফফারা, ফিদিয়া, মান্নত।
নারীদের অর্থব্যয়ের খাত দশটি। এর মধ্যে ৭টি ঐচ্ছিক এবং তিনটি ক্ষেত্র বিশেষে এবং ঘটনাক্রমে বাধ্যতামূলক।

১৩.    অর্থ উপার্জনের হারাম ও নিষিদ্ধ উপায় সমূহ
ব্যক্তি ও সমাজ তথা মানুষের জন্যে যা কিছু ক্ষতিকর, অকল্যাণকর, তা সবই হারাম, নিষিদ্ধ এবং অবৈধ। ইসলামের এ নীতি অর্থনৈতিক বিষয়াদিসহ মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ইসলামের অর্থনীতি সমন্বিতভাবে ইতিবাচক ও নীতিবাচক । ইসলামের এই নীতিবাদিতা শরিয়ার বিধান এবং শাশ্বত আদর্শিক নীতিবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সে হিসেবে ইসলামে নিুোক্ত উপায় ও পন্থা প্রক্রিয়ায় আয় উপার্জন হারাম, নিষিদ্ধ ও অবৈধ :
১.    রিবা (সুদ) : এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন :
وَاَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَوا 
অর্থ: আল্লাহ হালাল করেছেন ব্যবসা বাণিজ্য এবং হারাম করেছেন রিবা (সূদ)। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৭৫)
২.    রিশওয়াত : অর্থাৎ ঘুষ ও উৎকোচের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ।
৩.    গরর : অর্থাৎ প্রতারণার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ, তা যে প্রকারেরই হোক।
৪.    ডাকাতি, লুন্ঠন, ছিনতাই ও অপহরণের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ।
৫.    দখল, জবর দখলের উপার্জন নিষিদ্ধ।
৬.    নিজের খুশিমতো দাম বা বিনিময় দিয়ে স্বত্তাধিকারীর অনিচ্ছা সত্তেও নিয়ে নেয়া নিষিদ্ধ।
এই কয়টি বিষয় সম্পর্কে কুরআন মজিদে বলা হয়েছে :
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ 
অর্থ: তোমরা নিজেদের মধ্যে অবৈধ পন্থায় একে অপরের অর্থ সম্পদ খেয়োনা এবং সেগুলো শাসকদের সামনেও এমন কোনো উদ্দেশ্যে উত্থাপন করোনা, যাতে করে তোমরা জেনে বুঝে পরের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পাও। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ১৮৮)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَن تَكُونَ تِجَارَةً عَن تَرَاضٍ مِّنكُمْ 
অর্থ: হে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের অর্থ সম্পদ বাতিল অন্যায় অবৈধ উপায়ে খেয়োনা। তবে পারস্পারিক ইচ্ছা ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা করলে ভিন্ন কথা। (সূরা ৪ আন্ নিসা : আয়াত ১৮৮) এ প্রসঙ্গে আরো দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৩৩।
৭.    আমানতের খেয়ানত ও আত্মস্যাতের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য (আল কুরআন ২ : ২৮৩; ৩ : ১৬১)
৮.    জুয়া, বাজি এবং এমন সব উপায় প্রক্রিয়া অবলম্বন করে উপার্জন করা, যার মাধ্যমে ঘটনাচক্রে একজনের অর্থসম্পদ আরেকজনের কাছে চলে যায়। এগুলো হারজিতের ধ্বংসকর খেলা। এতে এক পক্ষ কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়াই আরেক পক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তার অর্থ লুটে নেয়। এ প্রসঙ্গে দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯০।
৯.    হারাম বস্তুর উৎপাদন, ক্রয় বিক্রয় ও ব্যবসা বানিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : যেমন, ক. মদ ও মাদকদ্রব্য, খ. মৃত প্রাণী, গ. শুয়োর, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদির ব্যবসা। দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৩,৯০ এবং হাদিস দ্রষ্টব্য।
১০.    লটারি, ভাগ্য গণনা ও জ্যোতিষ ব্যবসার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯০।
১১.    অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি প্রচার ও প্রসারকারী কার্যক্রমের মাধ্যমে উপার্জন: দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ১৯।
১২.    ইহ্তিকার : ইহ্তিকারের মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। ইহ্তিকার হলো দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মওজুদ করে রাখা। বাজারে এর বিভিন্ন ধরণের নাম রয়েছে। রসূল সা. এ ধরণের কারবার নিষিদ্ধ করেছেন। তাছাড়া এটা সূরা নিসার ২৯ আয়াতে বর্ণিত বাতিল পন্থায় উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।
১৩.    রাষ্ট্র ও ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে অর্থোপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য সূরা ২: আয়াত ১৮৮।
১৪.    চুরির মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ : দ্রষ্টব্য আল কুরআন সূরা ৫ : আয়াত ৩৮।
১৫.    দেহ ব্যবসা ও বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ২,৩৩।
১৬.    মাপে ও ওজনে কমবেশি করার মাধমে উপার্জন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ মেপে বা ওজন করে নেয়ার সময় বেশি নেয়া এবং দেয়ার সময় কম দেয়া। কুরআন মাজিদে এ ধরনের লোকদের জন্যে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। দ্রষ্টব্য: সূরা ৮৩ মুতাফ্ফিফিন : আয়াত-১-১০।
১৭.    চোরাই মাল ক্রয় বিক্রয় এবং চোরালানী নিষিদ্ধ।
১৮.    অর্থ সম্পদ ও জমি জমা অনুৎপাদনশীল ফেলে রাখা নিষিদ্ধ।
১৯.    আসলের সাথে নকল ও ভেজাল মিশিয়ে বিক্রয় নিষিদ্ধ।
২০.    আসলের স্যাম্পল দেখিয়ে নকল সরবরাহ করা নিষিদ্ধ।
২১.    আসলের মোড়কে ভেজাল ও নকল মাল বিক্রি করা নিষিদ্ধ।
২২.    ফটকাবাজারি ও মুনাফাখোরী নিষিদ্ধ।
হাদিস থেকে এগুলোর নিষেধাজ্ঞা জানা যায়।
২৩.    এতিমের অর্থ সম্পদ ও সহায় সম্পত্তি ভোগ দখল করা নিষিদ্ধ : আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘যারা অন্যায় ভাবে এতিমদের অর্থ সম্পদ ও সহায় সম্পত্তি ভোগ দখল করে, তারা মূলত আগুন দিয়ে নিজেদের উদর ভর্তি করে। অচিরেই তাদের পোড়ানো হবে জ্বলন্ত আগুনে।’ (সূরা ৪ আন্নিসা : আয়াত ১০)
২৪.     বোনদের বা অন্য কারো উত্তরাধিকার বন্টন করে না দিয়ে নিজের সম্পদের সাথে একাকার করে রেখে ভোগ করা : যারা উওরাধিকার বন্টন করেন না, সূরা আন নিসার ১৪ আয়াতে তাদের অপমানজনক অনন্ত আযাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২৫.    ধনীদের যাকাত খাওয়া করা নিষিদ্ধ : ধনীদের যাকাত প্রদান করা ফরয। যাকাত পাওয়া অভাবীদের অধিকার। যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ থেকে যাকাত বের করে দেয়না, সে নিজ অর্থ সম্পদের সাথে অভাবীদের যাকাত বা অর্থ সম্পদ একাকার করে ভোগ করে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা অনুযায়ী এ সম্পদ দ্বারা তার জন্যে আগুনের বেড়ি তৈরি হচ্ছে। (দ্রষ্টব্য সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ১৮০)।
২৬.    দোকানি বা কারো নিকট থেকে কিছু ক্রয় করে দাম না দেয়া। ফলে ক্রয় করা বস্তু তার অবৈধ উপার্জন- যা তার জন্যে সম্পূর্ণ হারাম। এটা যুলুমের উপার্জন। অপরের অধিকার হরণ। (সূরা আন্নিসা : আয়াত ২৯)
২৭.    অন্যায্য বন্টন: উত্তরাধিকার বন্টন হোক, যৌথ কারবারের লাভালাভ বন্টন হোক, যৌথ ক্রয়ের মাল-সম্পদ বন্টন হোক, অথবা অন্য যে কোনো ধরণের বন্টনের ক্ষেত্রে নিজের ভাগে বেশি নেয়া, বেছে বেছে ভালোটা নেয়া, কিংবা নিজে সুবিধাজনকটা নিয়ে নেয়া অবৈধ। এটা যুলুমের মাধ্যমে উপার্জন। এটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। (দ্রষ্টব্য : সূরা নিসা, আয়াত ১০ ও ৩০)।
২৮.    ধার, করজ, ঋণ বা লোন নিয়ে পরিশোধ না করা। মানুষ সাধারণত ক. উন্নয়ন কাজের জন্যে, খ. ব্যবসায়ে বিনিয়োগের জন্যে, কিংবা গ. অভাবের তাড়নায় মৌলিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে ঋণ করে থাকে।
ঋণ গ্রহণ করা হয়ে থাকে সাধারণত সরকারি তহবিল, সরকারি ব্যাংক, প্রাইভেট ব্যাংক, সংস্থা এবং সামর্থবান ব্যক্তিদের নিকট থেকে।
কোনো চরম অভাবী বা দেউলিয়াকে ব্যক্তি তার ঋণ মাফ করে দিতে পারে। কিন্তু যারা ঋণ গ্রহণ করে চরম অভাবী বা দেওলিয়া না হয়েও ঋণ পরিশোধ করেনা, কিংবা সময়মতো করেনা, ইসলামের দৃষ্টিতে তারা চরম শাস্তি ভোগ করবে। কারণ তারা অন্যায়ভাবে অন্যদের অর্থসম্পদ গ্রাস করেছে।
২৯.    হারানো বা পড়ে থাকা অর্থ সামগ্রী নিয়ে নেয়া; এ ধরণের কিছু পাওয়া গেলে তা সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিতে হবে। কর্তৃপক্ষ উক্ত অর্থ সামগ্রীর স্বত্বাধিকারীকে খুঁজে বের করার জন্যে প্রচার বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করবে। শেষ পর্যন্ত তাকে পাওয়া না গেলে এই অর্থ সামগ্রী জনকল্যাণ মূলক তহবিলে জমা হবে।
৩০.    সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে ত্রাস ও আতংক সৃষ্টি করে এবং দাপট দেখিয়ে অর্থ আদায় করা নিষিদ্ধ। যেমন : চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, লুটপাট ইত্যাদি। কুরআন এবং হাদিসে এ ধরণের কাজকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (দ্রষ্টব্য আল কুরআন, সূরা ২ : আয়াত ১৮৮; সূরা ৪ : আয়াত ২৯)
৩১.    যাদুমন্ত্র বা যাদু টোনার মাধ্যমে উপার্জন নিষিদ্ধ। এটা মানুষের জন্যে ধ্বংসকর বিধায় কুরআন ও হাদিসে এটাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৩২.    মূর্তি, প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য নির্মাণ, উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রসূলুল্লাহ সা. এগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
৩৩.    এ ছাড়াও ব্যক্তি, মানবতা ও ঈমান আকিদার জন্যে ক্ষতিকর সবই নিষিদ্ধ।

১৪.    অর্থ সম্পদ ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা যা নিষিদ্ধ
মানুষ যেসব অর্থ অর্জন এবং উপার্জন করে, তা সাধারণত নিম্নরূপ খাতসমূহে ব্যয়-ব্যবহার করে থাকে :
১.    নিজের ও পরিবার পরিজনের জন্যে ব্যয় করে।
২.    উৎপাদন ও উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করে।
৩.    যাকাত প্রদান করে।
৪.    ট্যাক্স, খাজনা ও বিভিন্ন প্রকার কর প্রদান করে।
৫.    বিভিন্ন প্রকার দায়িত্ব কর্তব্য (Obligations) ও অধিকার (Rights) আদায়ে প্রদান করে।
৬.    দান করে।
৭.    সঞ্চিত ও পূঞ্জিভূত করে।
৮.    অপচয় ও অপব্যয় (overuse & misuse) করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থ ব্যয় একদিকে যেমন বিরাট নেকি ও পুণ্যের কাজ। অপরদিকে তা বিরাট পাপও অকল্যাণের হাতিয়ার। ইসলাম সব ধরণের কল্যাণের ব্যয়কে উৎসাহিত করে। কিন্তু সব ধরনের অকল্যাণকর কাজে ব্যয় করাকে নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্মোক্ত খাত ও প্রক্রিয়ায় ব্যয় বিনিয়োগ করা অবৈধ ও নিষিদ্ধ :
০১.    সুদী কারবারে বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২ : ২৭৫)
০২.    জুয়া খেলায় বিনিয়োগে নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ৫ : ৯০)
০৩.    ভাগ্য গণনায় ব্যয় নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ৫ : ৯০)
০৪.    ব্যভিচারের কাজে ব্যয় নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২৪ : ২,৩৩)
০৫.    সর্বপ্রকার অশ্লীলতা প্রসারকারী কাজ কারবারে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২৪ : ১৯)
০৬.    সর্বপ্রকার ধোকা প্রতারণার কাজে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ। (হাদিস : যে প্রতারণা করে, সে আমার লোক নয়)।
০৭.    ঘুষ প্রদান নিষিদ্ধ। (আল কুরআন ২ :১৮৮)
০৮.    মূর্তি, প্রতিকৃতি ও ভাষ্কর্য তৈরি ও ক্রয়ে ব্যয় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ।
০৯.    সর্বপ্রকার হারাম জিনিস ক্রয়ে ব্যয় করা নিষিদ্ধ। বিনিয়োগও নিষিদ্ধ।
১০.    ক্ষতিকর জ্ঞানার্জনে ও প্রশিক্ষণে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১১.    ভেজাল ও নকল ব্যবসায় বিনিয়োগ নিষিদ্ধ।
১২.    অবৈধ উদ্দেশ্য হাসিলের নিয়্যতে ধার-করজ-ঋণ প্রদান নিষিদ্ধ।
১৩.    খোঁটা দেয়ার উদ্দেশ্যে বা জশ, খ্যাতি ও সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে দান করা নিষিদ্ধ।
১৪.    প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বা দান না করে কৃপণতা করা নিষিদ্ধ।
১৫.    সর্বস্ব দান করে ফেলা বা ব্যয় করে ফেলা নিষিদ্ধ।
১৬.    অর্থ-সামগ্রী অপচয় (overuse) করা নিষিদ্ধ।
১৭.    অর্থ সম্পদ অপব্যয় (misuse) করা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ নিষ্প্রয়োজনীয় ও নিষিদ্ধ খাতে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১৮.    কারো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
১৯.    ভালো কাজের বিরোধিতা বা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
২০.    ইসলামের বিরোধিতা করা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কাজে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।
২১.    যে কোনো ক্ষতিকর, অকল্যাণকর এবং সামাজিক ও সামষ্টিক অনিষ্টকর কাজে ব্যয় করা নিষিদ্ধ।

১৫.    যেসব খাতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক
ইসলামের দৃষ্টিতে অর্জিত অর্থ সম্পদ বিনিয়োগ ব্যতিত যাবতীয় ব্যয়ের খাত সমূহ দুই ভাগে বিভক্ত। সেগুলো হলো :
০১.    বাধ্যতামূলক,
০২.    স্বেচ্ছামূলক।
ইসলামে নিম্নোক্ত খাতসমূহে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক এবং আবশ্যক :
১.    হুকুক : অর্থাৎ রক্ত সম্পর্কের কারণে যারা অধিকার লাভ করেছে তাদের জন্যে ব্যয় করা। যেমন : সন্তান, পিতামাতা।
২.    নাফকা : এর অর্থ বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যারা অধিকার লাভ করে তাদের জন্যে ব্যয় করা। যেমন: স্ত্রীদের জন্যে। এমনকি স্ত্রীকে তালাক দিলেও ইদ্দত পালন কালে, গর্ভে সন্তান থাকলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত এবং সন্তানকে দুধ পান করালে দুধ পান শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে নাফকা দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজিদে সূরা আন নিসার ৩৪ এবং সূরা আত তালাকের ৬-৭ আয়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৩.    বিবাহের মোহর: বিয়ের সময় একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে যে অর্থ প্রদান করেন তার নাম মোহর। মোহর প্রদান করা বাধ্যতামূলক, এ প্রসঙ্গে সূরা আন নিসার ৪ এবং ২০ আয়াতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
৪.    যাকাত এবং উশর : মূলত উশর যাকাতেরই একটি অংগ। উশর হলো ফল ফসলের যাকাত। বছর শেষে হিসাব নিকাশ করে উদ্ধৃত্ত (balance) অর্থ সম্পদ থেকে শরিয়া নির্ধারিত হারে এবং খাতে একটি অংশ পরিশোধ করাকে যাকাত বলা হয়। সালাত আদায় করার মতোই যাকাত আদায় করা ফরয। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে : ‘তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত পরিশোধ করো।’ (সূরা আল বাকারা : আয়াত ৪৩,৮৩,১০)
৫.    কাফ্ফারা : কেউ কোনো পাপ বা অপরাধ করে ফেললে তা থেকে নিষ্কৃতি পওয়ার জন্যে যে নেক কাজ করতে হয়, তাকে কাফ্ফারা বলা হয়। কুরআন মজিদে তিনটি পাপের ক্ষেত্রে কাফ্ফারার মাধ্যমে নিষ্কৃতি লাভের বিধান দেয়া হয়েছে। সেগুলো হলো : ১. ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের ফরয রোযা ভঙ্গ করলে। ২. যিহার করলে। অর্থাৎ নিজের স্ত্রীকে বা স্ত্রীর কোনো অঙ্গকে নিজের মা বা বোনের কোনো অঙ্গের মতো বলে তুলনা করলে। সূরা মুজাদালার ২-৪ আয়াতে এ সংক্রান্ত বিধান দেয়া হয়েছে। ৩. অংগিকার ভংগ করলে। সূরা আল মায়িদার ৮৯ আয়াতে -এ সংক্রান্ত বিধান দেয়া হয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে কাফ্ফারা হিসেবে রোযা রাখা কিংবা অভাবীদের খাওয়ানো, অথবা মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের কথা বলা হয়েছে।
৬.    ফিদিয়া : বার্ধক্যজনিত কারণে এবং এমন রোগের কারণে- যে রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়না রমযান মাসের ফরয রোযা রাখতে না পারলে তার বিনিময়ে কুরআন নির্দেশিত প্রক্রিয়ায় ও পরিমাণে দান করাকে ফিদিয়া বলা হয়।
৭.    নযর : নযরকে আমাদের দেশে মান্নত বলা হয়। এর অর্থ- উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে কোনো ত্যাগ স্বীকার বা দান করার স্বগত অংগীকার করা। উদ্দেশ্য পূর্ণ হলে প্রতিশ্রুত ত্যাগ স্বীকার করা বা দান করা বাধ্যতামূলক। যারা জান্নাতে যাবে, সূরা আদ্দাহরের ৭ আয়াতে তাদের একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা নযর (মান্নত) পূর্ণ করে।
৮.    সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরা : ঈদুল ফিতরের পূর্বে সামর্থবান ব্যক্তিগণ কর্তৃক অভাবী ব্যক্তিগণকে ঈদ আনন্দে শরিক করার জন্যে সুন্নাহ নির্ধারিত হারে সাহয্য প্রদানকে সাদাকাতুল ফিতর বলা হয়। রসূল সা. এই সাহায্য প্রদানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
৯.    কুরবানির গোশত বিতরণ: যারা তামাত্তু হজ্জ করেন তাদেরকে বাধ্যতামূলক কুরবানি করতে হয়। তাছাড়া সকল সামর্থবান মুসলিমকেই কুরবানি করতে তাকিদ করা হয়েছে। কুরবানির গোশতের একটি অংশ অভাবীদের দান করতে বলা হয়েছে।

১৬.    ব্যয়ের কল্যাণময় স্বেচ্ছামূলক খাতসমূহ
কুরআন এবং হাদিসে মুমিনদেরকে ব্যাপকভাবে স্বেচ্ছামূলক দান করতে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করা হয়েছে। এসব দানের প্রক্রিয়া ও খাত নিম্নরূপ :
১.    সাধারণ দান : এটাকে সাধারণত, দান, খয়রাত (কল্যাণের কাজ), সদকা ইত্যাদি বলা হয়। অভাবী এবং বিপদগ্রস্তদের সব সময় সর্বাবস্থায় এ দান করা যায়। এ দানের একটি বড় খাত হলো আল্লাহর পথে দান করা। এ দানের ব্যাপারে কুরআন ও হাদিসে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করা হয়েছে। কুরআন ও সুন্নায় আহবান জানানো হয়েছে দান করতে :
ক.    দরিদ্র অভাবী আত্মীয় স্বজনকে।
খ.    অভাবী প্রতিবেশীদেরকে।
গ.    ফকির তথা নিঃস্ব সাহায্যপ্রার্থীদেরকে।
ঘ.    সাধারণ অভাবী লোকদেরকে।
ঙ.    অভিভাবকহীন বিধবাদেরকে।
চ.    নিঃস্ব এতিমদেরকে।
ছ.    মযলুমদেরকে।
জ.    বিপদগ্রস্তদের সাহায্যার্থে।
ঝ.    নিগৃহীত, ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদকৃত এবং মুহাজিরদের সাহায্যার্থে।
ঞ.    নিঃস্ব পথিকদেরকে।
ট.    ঋণগ্রস্ত দেউলিয়াদেরকে।
ঠ.    পরের দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তির কাজে।
ড.    জনকল্যাণের কাজে (অর্থাৎ শিক্ষা, চিকিৎসা, জনপথ তৈরি, সুস্থ পরিবেশ তৈরি, পানি সরবরাহসহ যাবতীয় মানব কল্যাণের কাজে ব্যয় করা)।
ঢ.    মসজিদ নির্মাণের কাজে।
ণ.    আল্লাহর পথে (অর্থাৎ ইসলাম প্রচার প্রসারের কাজে। ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র, হামলা ইত্যাদি প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার কাজে)। কুরআন মজিদে এ খাতটিকে অত্যধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
এসব কাজে ব্যয় করাকে কুরআন মজিদে এবং হাদিসে মুমিনদের জন্যে প্রভুত নেকি, সওয়াব, মর্যাদা, জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের উপায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২.    উপহার বা হাদিয়া হিসেবে দান।
৩.    অসিয়তের মাধ্যমে দান : কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর পূর্বে তার সম্পদের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত অসিয়ত করে (আদেশ / উপদেশ দিয়ে) দান করে যেতে পারেন।
৪.    ওয়াক্ফ : কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার উৎপাদনশীল কোনো অর্থ সম্পত্তি জনকল্যাণের কাজে দান করে যাওয়াকে ওয়াক্ফ বলা হয়। ওয়াক্ফ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকার কিংবা জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে।
৫.    হেবা : হেবা হলো কোনো ব্যক্তিকে স্থায়ী ও নি:স্বার্থভাবে নিজের কোনো সম্পদ দিয়ে দেয়া।
৬.    ফল বা উৎপাদন ভোগের সুবিধা প্রদান : এটা হলো নির্দিষ্ট মওসূম বা সময়ের জন্যে নিজের কোনো বাগান বা গাছের ফল কিংবা গাভীর দুগ্ধ কাউকেও ভোগ করার সুবিধা দান করা।
৭.    আকস্মিক সংকট উত্তরণে সাহায্য করা : এটা হলো হঠাৎ কেউ কোনো সংকটে, সমস্যায় বা বিপদে পড়লে তাকে আর্থিক সাহায্য করা।
দান করার অসীম কল্যাণ সম্পর্কে কুরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অবহিত করেছেন। এর জন্যে তিনি উপদেশ দিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনের কয়েকটি আয়াত এখানে উল্লেখ করা হলো :
وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ ۗ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ 
অর্থ: দান করো। এতেই রয়েছে তোমাদের নিজেদের জন্যে কল্যাণ। যারা মনের সংকীর্ণতা (কৃপণতা) থেকে মুক্ত হয়, তারাই ফালাহ (সফলতা) অর্জনকারী। (সূরা ৬৪ আত্ তাগাবুন : আয়াত ১৬)
لَن تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّىٰ تُنفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ 
অর্থ: তোমরা ততোক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণ লাভ করবেনা, যতোক্ষণনা তোমাদের পছন্দের জিনিস দান করো। (সূরা ৩ আলে ইমরান : আয়াত ৯২)
مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ 
অর্থ: যারা নিজেদের অর্থ সম্পদ আল্লাহ্র পথে ব্যয় করে, তাদের (দানের) উপমা একটি শস্যবীজ, যা উৎপাদন করে সাতটি শীষ এবং প্রত্যেক শীষে শতদানা। (এভাবেই) যাকে ইচ্ছা আল্লাহ বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন। তিনি মহা প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞানী। (সূরা ২ বাকারা : আয়াত ২৬১)
لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَـٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ 
অর্থ: পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরানোতে প্রকৃত পক্ষে পুণ্য নেই। প্রকৃত পুণ্যের কাজ হলো, মানুষ ঈমান আনবে আল্লাহ্র প্রতি, পরকালের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আল কিতাবের প্রতি, নবীদের প্রতি; আর আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্থ সম্পদ দান করবে আত্মীয় স্বজনকে, এতিমদেরকে, অভাবীদেরকে, পথিকদেরকে, সাহায্যপ্রার্থীদেরকে এবং মানুষকে গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত করার কাজে; এছাড়া সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিয়ে দেবে। সূরা ২ : ১৭৭
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا  الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا  وَالَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ رِئَاءَ النَّاسِ 
অর্থ: তোমরা শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্ব করো, তাঁর সাথে কোনো কিছুকেই শরিক করোনা। আর ইহসান (দয়া ও সহানুভূতিমূলক আচরণ) করো পিতামাতার সাথে, আত্মীয় স্বজনের সাথে, এতিমদের সাথে, অভাবীদের সাথে, আত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, অনাত্মীয় প্রতিবেশীদের সাথে, সাথি বন্ধুদের সাথে, পথিকদের সাথে এবং তোমাদের অধিনস্ত ভৃত্যদের সাথে। জেনে রাখো, আল্লাহ দাম্ভিক ও অহংকারী লোকদের পছন্দ করেননা, যারা কার্পণ্য কঞ্জুসি করে, মানুষকে কৃপণতার শিক্ষা দেয় এবং আল্লাহ নিজ অনুগ্রহ (অর্থ সম্পদ) থেকে তাদের যা দান করেছেন তা গোপন করে রাখে। এ ধরণের অকৃতজ্ঞ লোকদের জন্যে আমরা অপমানকর আযাবের ব্যবস্থা করে রেখেছি। (আর ঐ সব লোকদেরও আল্লাহ পছন্দ করেন না) যারা কেবল লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্থ সম্পদ দান করে। (সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ৩৬-৩৮)
দান সম্পর্কে কুরআন মজিদে আরো বহু আয়াত রয়েছে। এ সম্পর্কে আছে রসূলুল্লাহ সা.-এর অনেক হাদিস। আগ্রহীগণ সেগুলো দেখে নেবেন।
সবশেষে আমরা ইসলামি অর্থনীতির কল্যাণধর্মীতা সম্পর্কে আধুনিক জগতের খ্যাতনামা ইসলামি চিন্তাবিদ ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আবুল আ’লা মওদূদীর একটি দীর্ঘ বক্তব্যের অংশ বিশেষ উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন :
“ইসলাম শুধু এতোটুকুই চায়না যে, সমাজ জীবনে কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত এবং অবাধ থাকবে; বরঞ্চ সেইসাথে এটাও চায় যে, এ ময়দানে প্রতিযোগীগণ পরস্পরের প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্দয় হবার পরিবর্তে সহমর্মী ও পিছে পড়ে থাকা মানুষের আশ্রয় প্রদানের মানসিকতা সৃষ্টি করতে চায়। অপরদিকে সমাজে এমন একটি শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তুলতে চায়, যে সংস্থা অক্ষম ও অসহায় লোকদের সাহায্যের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যেসব লোকের জীবিকা উপার্জনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা থাকবেনা, তারা এই সংস্থা থেকে নিজেদের অংশ পাবে; যারা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়বে, এই সংস্থা তাদের উঠিয়ে এনে আবার চলার যোগ্য করে দেবে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্যে যাদের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, এই সংস্থা থেকে তারা সাহায্য সহযোগিতা লাভ করবে। এ উদ্দেশ্যে ইসলাম আইনগতভাবে দেশের গোটা সঞ্চিত সম্পদ থেকে বার্ষিক ২.৫% এবং গোটা বাণিজ্যিক পুঁজি থেকে বার্ষিক ২.৫% যাকাত সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছে। সমস্ত উশরি জমির উৎপন্ন ফসল থেকে ১০% কিংবা ৫% উশর এবং কোনো কোনো খনিজ সম্পদের উৎপাদন থেকে ২০% যাকাত উসুল করতে হবে। এছাড়া গৃহপালিত পশুর উপরও বার্ষিক যাকাত আদায় করতে বলেছে। এই গোটা সম্পদ ইসলাম গরীব, এতিম, বৃদ্ধ, অক্ষম, উপার্জনহীন, রোগী এবং সব ধরণের অভাবী ও দরিদ্রদের সাহাযার্থে ব্যবহার করতে বলেছে। এটা এমন একটা সামাজিক বীমা, যার বর্তমানে ইসলামি সমাজে কোনো ব্যক্তি জীবন যাপনের অপরিহার্য সামগ্রী থেকে কখনো বঞ্চিত থাকতে পারেনা। কোনো শ্রমজীবী মানুষকে অভূক্ত থাকার ভয়ে কারখানা মালিক বা জমিদারের যেকোনো অন্যায় শর্ত মেনে নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হতে হবেনা। আর উপার্জনের প্রতিযোগিতায় নামার জন্যে ন্যূনতম যে শক্তি সামর্থ্য থাকা অপরিহার্য, কোনো ব্যক্তির অবস্থাই তার চেয়ে নীচে নেমে যাবেনা।” (আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলামী অর্থনীতি, বঙ্গানুবাদ ৪র্থ মুদ্রণ ২০০৯, শতাব্দী প্রকাশনী ঢাকা।)

১৭.    যারা ইসলামি অর্থনীতি চর্চা করতে চান তাদের জন্যে ক’টি পরামর্শ
যারা ইসলামের অর্থনীতি ও অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে ও চর্চা করতে আগ্রহী, এখানে তাদের জন্যে কয়েকটি পরামর্শ পেশ করা হলো :
১.    অর্থনীতিকে একক বা স্বতন্ত্র কোনো শাস্ত্র হিসেবে চিন্তা করবেন না। অর্থ এবং অর্থনীতিকে মানব জীবন ও জীবন-ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য কাঠামোর একটি অংগ, অংশ এবং বিভাগ হিসেবে ভাবুন।
২.    আপনার দেহের একটি অংগকে যেমন অযথা অন্য অংগের উপর প্রধান্য দেয়া উচিত নয়, তেমনি অর্থ এবং অর্থনীতিকে আপনার জীবন ও জীবন ব্যবস্থার অন্যান্য বিভাগের উপর অযথা অগ্রাধিকার দিতে যাবেন না। সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভংগি ও নীতি অবলম্বন করুন।
৩.    ইসলামি অর্থনীতিকে ইসলামি জীবন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ ও বিভাগ হিসেবে গ্রহণ করুন।
৪.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার নীতি কাঠামো বুঝার জন্যে এক বা একাধিক বার মনোযোগ সহকারে আল কুরআন পাঠ (অধ্যয়ন, স্টাডি) করুন। সাথে সাথে অর্থ সম্পদ ও জীবিকা সংক্রান্ত আয়াতগুলো নোট করুন। সেই সাথে :
ক.    অর্থ সম্পদকে কিভাবে ঈমান, জীবন ব্যবস্থা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও সাফল্যের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, তা বিশেষভাবে লক্ষ্য করুন এবং নোট করুন।
খ.    কি কি কারণ ও প্রক্রিয়ায় অর্থ সম্পদ মানব জীবনে ব্যর্থতা ও ধ্বংস ডেকে আনে সে বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন এবং নোট করুন।
গ.    অতপর আপনার মাথায় (মনের মনিকোঠায়) এবং খাতায় অংকিত ধারণাগুলোকে পয়েন্ট আকারে লিপিবদ্ধ করুন এবং চর্চা করুন।
৫.    বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের ‘অর্থ সম্পদ’ ও ‘ব্যবসা বাণিজ্য’ সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো কুরআনের অনুরূপ পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করুন।
৬.    কয়েকটি ফিকহ্ গ্রন্থ পড়ে নিন। যেমন :
ক.    হিদায়া।
খ.    ফিকহুস সুন্নাহ : সাইয়েদ সাবেক।
গ.    হালাল ও হারাম : ইউসুফ আল কারদাভি।
৭.    ইসলামি অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থা সংক্রান্ত বাংলা ভাষায় লিখিত কয়েকটি বই পড়ে নিন। যেমন :
০১.    ইসলামি অর্থনীতি : আবুল আ’লা মওদূদী
০২.    ইসলামি অর্থনীতি : মুহাম্মদ আবদুর রহিম
০৩.    ইসলামি অর্থনীতি : ড. হাসান জামান
০৪.    ইসলামের অর্থনৈতিক মতাদর্শ : ড. মুহাম্মদ ইউসুফুদ্দীন
০৫.    ইসলাম ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ : ড. এম. উমর চাপরা
০৬.    ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ : শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
০৭.    ইসলামের যাকাত বিধান : ড. ইউসুফ আল কারদাভি
০৮.    অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান : আবুল আ’লা মওদূদী
০৯.    আল কুরআনের অর্থনৈতিক নীতিমালা : আবুল আ’লা মওদূদী
১০.    ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ : আবুল আ’লা মওদূদী
১১.    সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং : আবুল আ’লা মওদূদী
৮.    আধুনিক কালে যারা ইসলামি অর্থনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে গবেষণা করেছেন, করছেন এবং ব্যাপক লেখালেখি করেছেন তাদের সম্পর্কে জানুন এবং তাদের গ্রন্থাবলী পড়–ন। তাদের কয়েকজন হলেন : মুহাম্মদ আনাস যারকা, আবুল আ’লা মওদূদী, ড. ইউসুফ আল কারদাভি, মুহাম্মদ বাকির সদর, প্রফেসর খুরশিদ আহমদ, ড. নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি, প্রফেসর মুনযের কাহ্ফ, ড. এম. উমর চাপরা, ফাহিম খান, মুনাওয়ার ইকবাল, আকরাম খান, ইউসুফ কামাল, মুস্তফা যারকা, আহমদ আল নাজ্জার, সাবাহ উদ্দিন সায়েম প্রমূখ।
আমাদের বাংলাদেশে যারা এ ক্ষেত্রে অগ্রণি ভূমিকা রেখেছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন : প্রফেসর ড. এম.এ. মান্নান, প্রফেসর আবদুল হামিদ, প্রফেসর শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, প্রফেসর মুহাম্মদ শরীফ হুসাইন, প্রফেসর ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক প্রমূখ।
৯.    ইসলামি অর্থব্যবস্থার নীতিমালার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে জানুন। এ সম্পর্কে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু বই পুস্তক বাজারে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর নীতিমালা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগ পদ্ধতি জেনে নিন। এ সম্পর্কে তাদের পুস্তিকা সমূহও পড়ুন।

সমাপ্ত
১৮. গ্রন্থসূত্র
০১.    আল কুরআন
০২.    সহীহ আল বুখারি
০৩.    সহীহ মুসলিম
০৪.    জামে তিরমিযি
০৫.    মিশকাতুল মাসাবিহ্
০৬.    সাইয়েদ সাবিক : ফিক্হুস্ সূন্নাহ্
০৭.    মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন : আল জামেউল আহকাম ফিক্হুস্ সুন্নাহ
০৮.    বুরহানুদ্দীন ফরগনানি : হিদায়া
০৯.    Muhammad Akram Khan : Economic Teaching of Prophet Mohammad
১০.    আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলামী অর্থনীতি
১১.    আবুল আ’লা মওদূদী : সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং
১২.    আবুল আ’লা মওদূদী : ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ
১৩.    আবুল আ’লা মওদূদী : অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান
১৪.    আবুল আ’লা মওদূদী : আল কুরআনের অর্থনৈতিক নীতিমালা
১৫.    Dr. M. Umer Chapra : Islam and the Economic Challenge
১৬.    ড. হাসান জামান: ইসলামী অর্থনীতি
১৭.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : হালাল ও হারাম
১৮.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : মুশকিলাতুল ফাকর ওয়া কাইফা আলাজাহাল ইসলাম
১৯.    ড. ইউসুফ আল কারদাভি : ইসলামের যাকাত বিধান
২০.    মুহাম্মদ আবদুর রহীম : ইসলামী অর্থনীতি
২১.    প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান : প্রিন্সিপলস অব ইকোনমিক্স
২২.    ড. মুহাম্মদ ইউসুফুদ্দীন : ইসলামের অর্থনৈতিক মতাদর্শ
২৩.    আবু উবায়েদ আল কাসিম বিন সাল্লাম : কিতাবুল আওয়াল
২৪.    শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : ইসলামী অর্থনীতি : নির্বাচিত প্রবন্ধ
২৫.    শাহ মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান : সূদ একটি ভয়াবহ অভিশাপ : পরিত্রাণের উপায়
২৬.    এমরান এন. হুসাইন : ইসলামে রিবা নিষিদ্ধ কেন?
২৭.    মুহাম্মদ শরীফ হুসাইন : সুদ, সমাজ অর্থনীতি
২৮.    মুহাম্মদ বাকির সদর : ইসলামি ইকতিসাদিয়াত
২৯.    Ayatullah Sayyid Mahmud Taleghani : Society and Economics in Islam
___________________________________________________________________বই সম্পর্কিত তথ্যাবলী
বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি
ISBN: 978-984-645-053-8

ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা আবদুস শহীদ নাসিম, © author প্রকাশক: বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি। পরিবেশক : শতাব্দী প্রকাশনী ৪৯১/১ মগবাজার ওয়ারলেস রেলগেইট, ঢাকা-১২১৭, ফোন : ৮৩১১২৯২। ১ম প্রকাশ ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯। কম্পোজ Saamra Computer. মুদ্রণে আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস, ৪২৩ বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।

Book Title : Islami Orthonitite Uparjon O Bayer Nitimala Author : Abdus Shaheed Naseem, Published by Bangladesh Quran Shikkha Society, Distributor: Shotabdi Prokashoni, 491/1 Moghbazar Wireless Railgate, Dhaka-1217, Bangladesh. Phone: 8311292. First Edition: December 2009.

দাম : ১৯ টাকা মাত্র।  Price TK. : 19.00 Only


বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত
নিম্নোক্ত বইগুলো পড়ুন :
    কুরআন বুঝার প্রথম পাঠ
    জানার জন্যে কুরআন মানার জন্যে কুরআন
    মানুষের চিরশত্রু শয়তান
    ঈমান ও আমলে সালেহ্
    ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা

সূচিপত্র______________________________________________
০১.        অর্থ কী?    ৫
০২.        অর্থনীতি কী?    ৫
০৩.        অর্থনীতির ইসলামি সংজ্ঞা    ৬
০৪.        ইসলামি অর্থব্যবস্থার ভিত্তি    ৬
০৫.        ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য সমূহ    ৯
০৬.        ইসলামি অর্থনীতির উদ্দেশ্য ও চূড়ান্ত লক্ষ্য    ১৩
০৭.        ইসলামে অর্থ উপার্জনের তাকিদ    ১৪
০৮.        হালাল ও বৈধ উপার্জনকারীর পরকালীন সাফল্য    ১৬
০৯.        হারাম ও অবৈধ উপার্জনের ভয়াবহ পরিণতি    ১৬
১০.        হালাল ও বৈধভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় সমূহ    ১৭
১১.        নারীর অর্থ উপার্জন ও সম্পদের মালিকানা অর্জন    ১৮
১২.        নারীদের  খরচের খাত    ১৯
১৩.        অর্থ উপার্জনের হারাম ও নিষিদ্ধ উপায় সমূহ    ২০
১৪.        অর্থ সম্পদ ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা যা নিষিদ্ধ    ২৩
১৫.        যেসব খাতে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক    ২৫
১৬.        ব্যয়ের কল্যাণময় স্বেচ্ছামূলক খাতসমূহ     ২৬
১৭.        যারা ইসলামি অর্থনীতি চর্চা করতে চান তাদের জন্যে ক’টি পরামর্শ    ৩০
১৮.        গ্রন্থসূত্র    ৩২



মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে

লিখেছেন মসজিদে নববীর পরিচালনা-পরিষদ   
Sunday, 14 June 2009

বিস্‌মিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহিম
মসজিদে নববীর সাথে সংশ্লিষ্ট আদবসমূহ
অনুবাদ: নূরুল্লাহ্ তা'রীফ
সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব-জাহানের প্রতিপালক ‘আল্লাহ্‌ তাআলার’ জন্য। প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

প্রিয় মুসলিম ভাই,
সে মহান আল্লাহর প্রশংসা করুন যিনি আপনাকে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে পৌঁছিয়েছেন। যে মসজিদের এক রাকাত নামাজ অন্য মসজিদের হাজার রাকাত নামাজের চেয়ে বেশী উত্তম, শুধু ‘মসজিদে-হারাম’ ছাড়া। যেখানে কল্যাণকর কিছু শিখতে আসা অথবা শিখানোর উদ্দেশ্যে আসা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার তুল্য। অতএব মসজিদে নববীতে যত বেশী নামাজ আদায় করা যায় সে জন্য আপনার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা উচিত এবং মসজিদে যে সকল ইলমের আসর রয়েছে সেগুলো থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আপনার আগ্রহ থাকা উচিত, যেন আপনি স্বচ্ছ জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহর ইবাদত পালন করতে পারেন এবং অজানা বিষয়গুলো প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারেন।

বিস্‌মিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহিম
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ) (الانبياء:7
“আর তোমরা যদি না জান তবে আলেমদের জিজ্ঞেস কর।” [সূরা আম্বিয়া-৭] জেনে রাখুন, এ মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু আদব-আখলাক রয়েছে যেগুলো আমাদের বজায় রাখা উচিত। এর কয়েকটি আমরা আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি-

(১) মুসলিম নর-নারী পরিপূর্ণ ভাব-গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে, ধীর-স্থিরে, পবিত্রতার সাথে, সুন্দর বেশ-ভূষা নিয়ে মসজিদে আসবেন। বিড়ি-সিগারেট, পেঁয়াজ, রসূন ইত্যাদির র্দুগন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে ভাল ঘ্রাণ নিয়ে তারা আল্লাহর ঘরে আসবেন। কারণ বনী আদম যা থেকে কষ্ট পায় আল্লাহর ফেরেশতারাও তা থেকে কষ্ট পায়।

(২) ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবেন এবং মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়বেন। বলবেন-
بِسْمِ اللهِ وَ الصَّلاَةُ وَ السَّلاَمُ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ، أَعُوْذُ بِاللهِ الْعَظِيْمِ وَ بِوَجْهِهِ الْكَرِيْمِ وَ سُلْطَانِهِ الْقَدِْيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ، اَلَّلهُمَّ افْتَحْ لِيْ أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ.
মসজিদে ঢুকে প্রথমে ‘তাহিয়্যাতুল’ মসজিদ দুই রাকাত নামাজ পড়বেন, তারপর যিকির-আযকার, ইবাদত-বন্দেগী বা কুরআন তেলাওয়াতে মশগুল হবেন।

(৩) আপনি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে সালাম দিতে যাবেন তখন আদবের সাথে তাঁর কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নিম্নস্বরে বলবেনঃ
السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُُّ وَ رَحْمَةُ اللهِ وَ بَرَكَاتُهُ. أَشْهَدُ أنَّكَ بَلَّغْتَ الرِّسَالََةََ وَ أدَّيْتَ الأمَانَةَ وَ نَصَحْتَ الأُمَّةَ وَ جَاهَدْتَ فِيْ اللهِ حَقَّ جِهَادِه، فَجَزَاكَ اللهُ عَنِّي وَ عَنِ الْمُسْلِمِيْنَ خَيْرَ الْجَزَاء.
“হে নবীজি, আপনার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি রিসালত পৌঁছিয়েছেন, আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, উম্মতকে নসীহত করেছেন, আল্লাহর রাস্তায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আল্লাহ আপনাকে আমার পক্ষ থেকে এবং সকল মুসলিমের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।”

এরপর আবু বকর ও উমর রাদিআল্লাহু আনহুমার নাম উল্লেখ করে তাদেরকে সালাম দিবেন। তারপর আপনি মসজিদের যে কোন নিরিবিলি স্থানে গিয়ে আল্লাহর কাছে যা ইচ্ছা দোয়া করুন। এই একীন ও এই বিশ্বাসের সাথে দোয়া করবেন - ভালমন্দের মালিক একমাত্র আল্লাহ্‌। অতএব অন্য কারো ধর্ণা না ধরে দুনিয়া-আখেরাতের যাবতীয় প্রয়োজন সরাসরি তাঁর কাছে পেশ করুন। প্রিয় নবীজি [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] ইরশাদ করেছেন, “যখন তুমি প্রার্থনা কর তখন সরাসরি আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা কর। যখন তুমি সাহায্য কামনা কর তখনও সরাসরি আল্লাহর কাছেই সাহায্য কামনা কর।” বরকতের নিয়তে মসজিদের গ্রিল বা দেয়াল স্পর্শ করবেন না, চুমা খাবেন না। রাসূলকে [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] সালাম দেয়ার সময় নামাযে দাঁড়াবার মত হাত বেধে দাঁড়াবেন না এবং দূর থেকে সালাম দিবেন না, কারণ এটা সাহাবায়ে কেরামের আমলের বরখেলাফ।
(৪) মসজিদে থাকাকালীন সময়টাকে পরিপূর্ণ কাজে লাগান। ফরজ নামাজ শেষে নামাজের জায়গায় বসে তাসবীহ পড়ুন, যিকির করুন অথবা কুরআন তেলাওয়াত করুন। সবসময় ভিড়মুক্ত স্থান নির্বাচন করুন, যেন ভিড় সৃষ্টিতে আপনার কোন অংশগ্রহন না থাকে এবং অপর মুসলিম ভাইকে কষ্ট দিয়ে আপনি গুনার-ভাগী না হন।
(৫) কাতারের খালি জায়গা পূর্ণ করার জন্য উৎসাহী হোন। চাপাচাপি না হলে ফজীলত পাওয়ার জন্য সবসময় সামনের কাতারে দাঁড়াবার চেষ্টা করুন। যাতায়াতের পথে অথবা দরজার সামনে বসবেন না। এতে রাস্তা সংকীর্ণ হয়ে অন্য মুসলিম ভায়ের কষ্ট হয়। বাইরের আঙ্গিনায় নামাজ পড়াকালে ইমামের সমান্তরালের সামনে গিয়ে কাতার করবেন না। পিলারগুলোর সাথে লাগানো সাইনবোর্ড দেখে ইমামের সমান্তরাল রেখা জেনে নিন।
(৬) আল্লাহর কিতাবকে যথাযথ সম্মান করুন। কুরআনের উপরে বা ভিতরে কিছু লিখবেন না, এর পাতা নিয়ে অনর্থক খেলা করবেন না। কুরআন শরীফের পাশে জুতা রাখবেন না।
(৭) কফ, থুথু ও ময়লা-আবর্জনা থেকে মসজিদ এবং মসজিদের আঙ্গিনাকে পরিচ্ছন্ন রাখুন। আপনার শিশুকে মসজিদের আদব-কায়দা শিক্ষা দিন। অনর্থক খেল-তামশা ও হৈ-হুল্লোড় থেকে তাদেরকে বিরত রাখুন।
(৮) মসজিদ থেকে একটু বিলম্বে বের হতে পারেন, যাতে মসজিদের গেটগুলোতে ভিড় অপেক্ষাকৃত কম হয়।
(৯) জেনে রাখুন মসজিদ ঘুমাবার জায়গা নয়। ভিক্ষা করা বা হারানো বস্তু তালাশ করার জন্য মসজিদ নয়।
(১০) খাবার পানি দিয়ে অজু করবেন না এবং মসজিদের কার্পেটগুলোকে গোল করে বালিশ বানাবেন না অথবা গায়ে দিবেন না। এ কার্পেটগুলো নামাজ পড়ার জন্য ওয়াক্‌ফ করা হয়েছে, বিছানা বানাবার জন্য নয়। তদ্রূপ কুরআন শরীফের রেহালগুলো মাথার নীচে দিয়ে ঘুমাবেন না, কারণ এগুলো শুধুমাত্র কুরআন শরীফ রাখার জন্য ওয়াক্‌ফকৃত।

পরিশেষে বলতে চাই, মসজিদ নববীর পরিচালনা-পরিষদের সাথে আপনার সহযোগিতা এবং যে কোন ধরণের সু-পরামর্শ বা মন্তব্য এ পবিত্র স্থানের যিয়ারতকারীদের সেবার মানকে আরো উন্নত করতে সহায়তা করবে। অতএব নির্দ্বিধায় এ জাতীয় যে কোন মন্তব্য বা পরামর্শ কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করুন। আল্লাহ্‌ আপনার আমল কবুল করে নিন, আপনার প্রতিদান বহুগুনে বৃদ্ধি করুন।

আস্‌সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ।
মসজিদে নববীর পরিচালনা-পরিষদ
মদীনা মোনাওয়ারা
সৌদি আরব



মুসলিম নারীর বিধান

বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে



লিখেছেন মক্তব তাও‘ইয়াতুল জালিয়াত, আল-জুলফী   
Thursday, 11 June 2009

বিস্‌মিল্লাহির রহমানির রহীম
ইসলামে নারীর মর্যাদা
ইসলামে নারীদের অধিকার সম্পর্কে উপস্থাপনের পূর্বে অন্যান্য জাতির নিকট তাদের মর্যাদা এবং তাদের সাথে কি ধরনের আচরণ করা হত, সে সম্পর্কে কিছু আলোচনা অতি আবশ্যক মনে করছি।

ইউনানদের নিকট মেয়েরা ছিল বেচা-কেনার সামগ্রী। তাদের কোন প্রকার অধিকার ছিল না। সমস্ত অধিকার পুরুষের জন্যই বরাদ্দ ছিল। মীরাস থেকে তারা ছিল বঞ্চিত। ধনসম্পদে তাদেরকে কোন হস্তক্ষেপ করতে দেয়া হত না। প্রসিদ্ধ দার্শনিক সুক্বরাতেরের বক্তব্য হলো- ‘পৃথিবীর অধঃপতনের বড় ও প্রধান কারণই হলো নারীদের অস্তিত্ব। নারীরা হলো এমন একটি বিষাক্ত বৃক্ষের মত, যার বাহ্যিক অতি সুন্দর কিন্তু চড়ই পাখি যখনই সে বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে, সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে।’

রোমকরা নারীদেরকে একটি আত্মাহীন বস্তু বলে গণ্য করতো। নারীদের কোন অধিকার এবং মূল্য তাদের নিকট ছিল না। তাদের কথা হলো- ‘নারীদের রূহ্‌ বা আত্মা নেই’। তাই তাদেরকে খুঁটির সাথে বেঁধে দ্রুতগতিতে ছুটিয়ে তাদের প্রাণ নাশ করা হতো।

হিন্দু ধর্মে নারীর অবস্থা আরো জঘন্য ও নিকৃষ্ট ছিল। তারা নারীকে তার স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে স্বামীর চিতায় পুড়িয়ে ধ্বংস করে দিত (যাকে সতীদাহ প্রথা বলা হয়)।

চীনারা বলে- নারীরা এমন যাতনাদায়ক পানি সদৃশ, যা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধিকে ধুয়ে-মুছে বিনাশ করে দেয়। প্রত্যেক চীনার তার স্ত্রীকে বিক্রয় করার এবং জীবদ্দশায় তাকে সমাধিস্থ করার অধিকার ছিল।

ইয়াহূদীরা নারীদের মনে করে এক অভিশপ্ত প্রাণী। কারণ, এই নারীই নাকি আদমকে পথভ্রষ্ট করেছে এবং তাকে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করতে বাধ্য করেছে। অনুরূপভাবে তারা নারীকে অপবিত্রা মনে করে; তাই তারা ধরে নেয়- যখন তার মাসিক হয়, তখন সমস্ত ঘর ও তার স্পর্শীয় সমস্ত বস্তু অপবিত্র হয়ে যায়। অনুরূপ ভাইয়ের উপস্থিতিতে পিতার সম্পদ থেকে সে মীরাসও পেত না।

খৃষ্টানদের নিকট নারী হলো- মানব জাতির সাথে নারীর কোন সম্পর্ক নেই। সাধু বুনাফান্তুর বলেন- ‘যখন কোন নারীকে দেখবে, তখন এটা মনে করবে না যে, তোমরা কোন মানব মূর্তি দেখছ, এমনকি কোন চতুষ্পদ পশুও না; বরং যা দেখেছ তা নিছক শয়তান। আর তা হতে যা শুন, তা হলো আজদাহার বাঁশী’। বৃটিশ আইনানুসারে বিগত শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত নারীরা দেশের নাগরিক হিসাবে গণ্য হত না। সব রকমের মালিকত্ব থেকে তারা হত বঞ্চিতা। এমনকি পরিহিত পোশাকটারও তারা মালিক হত না। ১৫৬৭ খৃষ্টাব্দে স্কটল্যাণ্ড পার্লামেন্টে এ আইন প্রণয়ন করা হয় যে, নারীদেরকে কোন কিছুর উপর আধিপত্য দেয়া বৈধ নয়। অনুরূপ বৃটিশ পার্লামেন্ট সপ্তম হেনরীর যুগে নারীদের জন্য ইঞ্জীল পাঠ নিষিদ্ধ করে দেয়।

কারণ, তারা অপবিত্রা। নারীরা মানুষ কিনা এ ব্যাপারে পর্যকেক্ষণের জন্য ১৫৮৬ খৃষ্টাব্দে ফ্রান্সে একটি কন্‌ফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে এটাই স্বীকৃতি পায় যে, নারীরা মানুষ, তবে তাদেরকে পুরুষের সেবার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। বৃটিশ আইনানুযায়ী ১৮০৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত স্বামীর জন্য তার স্ত্রীকে বিক্রয় করা বৈধ ছিল। ছয়পেনি (বৃটিশ মুদ্রা) পর্যন্ত তার মূল্য নির্দিষ্ট ছিল।

ইসলাম অবির্ভাবের পূর্বে আরবে নারীরা খুবই তুচ্ছ, ত্যাজ্য ও হেয় প্রতিপন্না ছিল। না তারা মীরাস পেত আর না কোন অধিকার। এমনকি তাদেরকে কোন কিছু গণ্যই করা হত না। আবার অনেকে তদের মেয়েদেরকে জীবন্ত সমাধিস্থ করতো। অতঃপর নারীদেরকে নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি দিতে এবং নারী-পুরুষ সকলে সমান, পুরুষের ন্যায় তাদেরও অধিকার আছে-এর উদাত্ত ঘোষণা দিতে অবির্ভাব হয় ইসলাম। মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوباً وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ -سورة الحجرات: 13
অর্থাৎ, ((হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন স্ত্রী হতে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে জাতি ও ভ্রাতৃগোষ্ঠী বানিয়ে দিয়েছি, যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। বস্তুতঃ আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানী সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহ্‌ভীরু।)) [সূরা আল-হুজরাতঃ ১৩] তিনি অরো বলেনঃ

وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتَ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُوْلَـئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلاَ يُظْلَمُونَ نَقِيراً - سورة النساء: 124
অর্থাৎ, ((আর যে নেক কাজ করবে-সে পুরুষ হোক বা মহিলা হোক-সে যদি ঈমানদার হয়, তবে এই ধরনের লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের বিন্দু পরিমাণ হকও নষ্ট হতে পারবে না।)) [সূরা আন্‌-নিসাঃ ১২৪] তিনি আরো বলেনঃ

وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً - سورة العنكبوت: 8
অর্থাৎ, ((আমি মানুষকে নিজের পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি।)) [সূরা আল-আনকাবূতঃ ৮] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

أكملُ المؤمنينَ إيماناً أحسنهُم خُلقاً. وخياركُم خياركُم لنسائِهِم - الترمذي: 1172
অর্থাৎ, ((পরিপূর্ণ ঈমানদার তো সে-ই, যার চরিত্র সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীদের প্রতি উত্তম।)) [তীরমিজীঃ ১১৭২] এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলোঃ

من أحق الناس بحسن صحابتي؟ قال: (أمك). قال: ثم من؟ قال: (ثم أمك). قال: ثم من؟ قال: (ثم أمك). قال: ثم من؟ قال: (ثم أبوك). - صحيح البخاري: 5626, مسلم: 2546
অর্থাৎ, ((মানুষের মধ্যে আমার উত্তম ব্যবহারের সর্বাধিক অধিকারী কে? উত্তরে তিনি বললেনঃ তোমার মা। অতঃপর সে বললঃ তারপর কে? তিনি জবাব দিলেনঃ তোমার মা। অতঃপর সে আবার বললঃ তারপর কে? তিনি বললেনঃ তোমার মা। তারপর কে? বললেনঃ তোমার বাবা।)) [বুখারীঃ ৫৬২৬, মুসলিমঃ ২৫৪৬] এই হলো নারীদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্তাকারে ইসলামের ধ্যান-ধারণা।
 

নারীর সাধারণ অধিকার
নারীর এমন সাধারণ অধিকার রয়েছে, যা তার নিজেরও জানা উচিত এবং সকলের এই মৌলিক অধিকার গুলো স্বীকৃতি দেয়া উচিত। ফলে যখনই চাইবে তা পুরাপুরি উপভোগ করতে পারবে। আর এই অধিকারের সার কথা হলোঃ

১)) মালিক হওয়ার অধিকার। নারী ঘর-বাড়ী, চাষাবাদের জমি, শিল্প-কারখানা, উদ্যান, সোনা-রূপা ও বিভিন্ন প্রকারের গবাদি পশুসহ সব কিছুর মালিক হতে পারবে। চাই সে স্ত্রী হোক অথবা মা হোক অথবা কন্যা বা বোন হোক।

২)) বিয়ে করা, স্বামী নির্বাচন, খুলআ’ কামনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার তার রয়েছে। আর এগুলো নারীর প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকার।

৩)) তার উপর ওয়াজিব তথা অত্যাবশ্যক বস্তুর শিক্ষা গ্রহণের অধিকার ও অনিস্বীকার্য বিষয়। যেমন মহান আল্লাহ্‌ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন, তাঁর ইবাদত করার পদ্ধতি শিক্ষা, নৈতিক দায়িত্ব ও করণীয় বিষয়ের জ্ঞান লাভ করা, তার সমাগ্রিক জীবনের শিষ্টাচার সম্পর্কে জানা এবং উৎকৃষ্ট চরিত্রের জ্ঞান অর্জন করা প্রভৃতি। কারণ এ ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ সকলের জন্যই। তিনি বলেনঃ

فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ - سورة محمد: 19
অর্থাৎ, ((জেনে রাখ! আল্লাহ্‌ ছাড়া সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই।)) [সূরা মুহাম্মাদঃ ১৯] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

طلب العلم فريضة عَلَى كُلّ مسلم - ابن ماجة: 224
অর্থাৎ, ((প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরয।)) [ইবনে মাজাঃ ২২৪]

৪)) নিজের ধন-সম্পদ ও অর্থবিত্ত থেকে স্বীয় ইচ্ছানুযায়ী সদকা করতে ও স্বামী, সন্তান-সন্ততি এবং পিতা-মাতার জন্য ব্যয় করতে পারবে, যতক্ষণ না সেটা অপচয় ও অপব্যয়ের পর্যায় পৌঁছে। এ ব্যাপারে তার অধিকার সম্পূর্ণরূপে পুরুষের অধিকারের মত।

৫)) ভালবাসা ও ঘৃণা করার অধিকার। সে সৎ ও নির্মল চরিত্রা নারীগণকে ভালবাসতে পারবে। ফলে স্বামী থাকলে তার অনুমতিক্রমে তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা, তাদেরকে উপহার দেয়া, পত্র বিনিময় করা, কুশলাদি জিজ্ঞেস করা, বিপদ ও দুর্যোগের দিনে সহানুভূতি ও সমবেদনা জ্ঞাপন করা ইত্যাদি করতে পারবে। (এটা নারীর শুধু অধিকার নয়; বরং এটা তার উচ্চ মানসিকতা ও দায়িত্ব সচেতনতার পরিচয়।) অধিকন্তু চরিত্রহীনা মহিলাদের ঘৃণা করবে এবং আল্লাহর নিমিত্তে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবে।

৬)) জীবদ্দশায় নিজ ধন-সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশের অসিয়ত করতে পারবে এবং কোন অভিযোগ আপত্তি ছাড়া তার মৃত্যুর পর তা কার্যêকর হবে। কেননা, অসিয়ত সাধারণ ব্যক্তিগত অধিকার। এ অধিকার যেমন পুরুষের রয়েছে, তেমনি নারীরও আছে। কারণ আল্লাহর সওয়াব ও প্রতিদান থেকে কেউ অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। তবে অসিয়তকৃত অর্থ ও ধনসম্পদ এক তৃতীয়াংশের বেশী হতে পারবে না। আর এতেও পুরুষ ও নারীর অধিকার সমান।

৭)) স্বর্ণ ও রেশম যা চায় পরিধান করতে পারবে। আর এ দু’টি পুরুষদের জন্য হারাম। কিন্তু পরিধানের অধিকার স্বাধীনতার অর্থ কখনো এ নয় যে, পোষাক শূন্য হয়ে যাবে অথবা অর্ধাংশ, এক চতুর্থাংশ কাপড় পরবে কিংবা মাথা, গলা ও বক্ষদেশ উন্মুক্ত রাখবে। হাঁ, যদি এমন কোন ব্যক্তি হয় যার সামনে এগুলো করা যেতে পারে তার ব্যাপার ভিন্ন।

৮)) রূপচর্চার অধিকার অর্থাৎ, আপন স্বামীর মন সন্তুষ্টির জন্য রূপচর্চা করতে পারবে। সুরমা লাগাতে পারবে, গালে ও ওষ্ঠে লাল লিপষ্টিক ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারবে, যদি সে ইচ্ছা করে। সর্বোৎকৃষ্ট মনোহারী ও সুন্দর পোশাক এবং হার ও গহনা পরতে পারবে। বাতিল ও সন্দেহ-সংশয়ের স্থান থেকে দূরে থাকার সংকল্পে পোষাক পরিচ্ছদে অমুসলিম নারীদের অথবা বেশ্যা, পতিতা ও দেহ ব্যবসায়ী ভ্রষ্টা নারীদের ফ্যাশন অবলম্বন করবে না।

৯)) পানাহারের অধিকার। যা-ই স্বাদ লাগে ও পছন্দ হয়, তা-ই সে পানাহার করতে পারবে। পানাহারের ব্যাপারে নারী-পুরুষের কোন ভেদাভেদ নেই। যেমন হালাল বস্তু উভয়ের জন্য হলাল, তেমনি হরাম বস্তুও উভয়ের জন্য হরাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وكُلُواْ وَاشْرَبُواْ وَلاَ تُسْرِفُواْ إِنَّهُ لاَ يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ - ورة الأعراف: 31
অর্থাৎ, ((খাও, পান কর এবং অপচয় করো না। নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীকে ভালবাসেন না।)) [সূরা আল-আ‘রাফঃ ৩১] এ সম্বোধনে উভয় জাতিই অন্তর্ভুক্ত।
 

স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার
স্বামীর উপর স্ত্রীর বিশেষ অধিকার রয়েছে। এ সমস্ত অধিকার স্ত্রীর স্বামীর কিছু অধিকার পালন করার জন্য ওয়াজিব হয়। আর তা হলো, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা না হলে, স্বামীর আনুগত্য করা, তার খাবার তৈরী করা, বিছানা পরিপাটি রাখা, তার সন্তানদের দুধ পান করানো, তাদের লালন-পালন করা, তার অর্থ-সম্পদ ও মান-মর্যাদা রক্ষা করা, নিজের সম্ভ্রম ও সতীত্ব রক্ষা করা, তার জন্য বৈধতার আওতায় রূপচর্চা করা ও নিজেকে সৌন্দর্যময় রাখা। নিম্নোক্ত জিনিসগুলো স্বামীর উপর স্ত্রীর অত্যাবশ্যকীয় অধিকার, যা আল্লাহ্‌র বাণী প্রমাণ করেঃ

وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ - سورة البقرة: 228
অর্থাৎ, ((নারীদের জন্য সঠিকভাবে সেরূপ অধিকার নির্দিষ্ট রয়েছে, যেমন তাদের উপর পুরুষদের অধিকার রয়েছে।)) [সূরা আল-বাকারাহঃ ২২৮]

আমরা সে অধিকারগুলো তুলে ধরছি, যেন মুমিন নারী তা জেনে নেয় এবং লজ্জা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ভয়ভীতি ছাড়াই তা দাবী করে। আর স্বামীর দায়িত্ব হলো, সেগুলো পুংখানুপুংখরূপে আদায় করা। হাঁ, স্ত্রী তার অধিকারের কোন কিছু স্বামীকে ক্ষমা করতে পারে।

১)) স্বামী স্বীয় আর্থিক সচ্ছলতা বা সংকটজনক অবস্থা অনুসারে স্ত্রীর সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করবে। স্ত্রীর পোশাক, পানহারা, চিকিৎসা ও বাসস্থান এ ব্যয়ভারের আওতায় পড়ে।

২)) স্বামী স্ত্রীর অভিভাবক হেতু তার মান-সম্ভ্রম, দেহ, অর্থ-সম্পদ ও দ্বীন রক্ষা স্বামীর দায়িত্ব। কেননা, কোন কিছুর অভিভাবক হওয়ার মানেই হলো তার দেখা-শুনা, পরিচর্যা ও হেফাযত করা।

৩)) দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে দ্বীনের জরুরী বিষয় শিক্ষা দেয়া। তবে স্বামী তাতে সক্ষম না হলে অন্ততপক্ষে মহিলাদের জন্য আয়োজিত ইলমের সমাবেশগুলোতে যোগদান করার অনুমতি দেবে। তা মসজিদ, মাদ্রাসায় হোক বা অন্য কোথাও। তবে শর্ত এই যে সেখানে ফেত্‌না বা স্বামী-স্ত্রীর ক্ষতি সাধিত না হাওয়ার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত থাকতে হবে।

৪)) স্ত্রীর সঙ্গে সদ্‌ভাবে জীবন-যাপন করা তার অন্যতম অধিকার। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেনঃ

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ - سورة النساء: 19
অর্থাৎ, ((তাদের (স্ত্রীলোকদের) সাথে সদ্‌ভাবে জীবন-যাপন কর।)) [সূরা আন্‌-নিসাঃ ১৯]

স্ত্রীর যৌন কামনা পূরণের অধিকার হরন না করা, গালি ও মন্দ ব্যবহার না করা। ফিৎনার ভয় না থাকলে আত্বীয়-স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করতে বাধা না দেয়া, শক্তি ও সামর্থেøর ঊর্ধ্বে কাজের চাপ না দেয়া এবং কথা ও আচরনে সুন্দর ব্যবহার করা সদ্‌ভাবে জীবন যাপন করার আওতাভুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

خيركم خيركم لأهله، وأنا خيركم لأهلي - سنن الترمذي: 3985
অর্থাৎ, ((তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে নিজ স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চেয়ে উত্তম।)) [তিরমিজীঃ ৩৯৮৫] তিনি আরো বলেনঃ

ما أكرم النساء ألا كريم, وما أهانهن إلا لئيم
((আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই নারীদের মর্যাদা দান করে। আর অভদ্র-অসভ্যরাই তাদের তুচ্ছ ভাবে।))

পর্দা
পরিবারকে ধ্বংস ও অবনতির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ইসলাম সুষ্ঠ ব্যবস্থা দিয়েছে এবং তাকে চরিত্র ও শিষ্টচারের শক্ত জালের মাধ্যমে সুরক্ষিত করেছে। যাতে পরিবার ও সমাজ এমন সুষ্ঠ ও সুন্দর হয়, যেখানে থাকবে না প্রবৃত্তির উপদ্রব এবং স্বেচ্ছাচারের দৌরাত্ম্য। ফিৎনা সৃষ্টিকারী সকল উত্তেজনামূলক পথকে অবরোধ করতে নারী-পুরুষকে দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ্‌ তা‘আলা নারীর সম্মানার্থে, তার মান সম্ভ্রমকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার হাত থেকে রক্ষার্থে, কুপ্রবত্তি ও অসৎ লোকের কুদৃষ্টি থেকে দূরে রাখতে, যাদের নিকট মান-মর্যাদার কোন মূল্য নেই, তাদের থেকে তাকে হেফাযত করতে, বিষাক্ত দৃষ্টির সৃষ্ট ফিৎনার দরজা বন্ধ করতে এবং তার সম্ভ্রম ও নৈতিক পবিত্রতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধার জালে সুরক্ষিত রাখতে পর্দার বিধান দান করেন।

আলেমদের ঐকমত্যানুযায়ী হাত ও মুখমণ্ডল ব্যতীত সর্বাঙ্গ আবৃত রাখা ওয়াজিব। নারীর কর্তব্য হলো, অপরিচিত পর পুরুষের সামনে সৌন্দর্যের প্রকাশ না করা। আর হাত ও মুখমণ্ডলকে আবৃত রাখার ব্যাপারে আলেমরা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছেন। প্রত্যেক দলের নিকট তাদের মতের সমর্থনে প্রমাণাদিও রয়েছে। আর পর্দা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে দলীলাদির সংখ্যাও অনেক। প্রত্যেক দল পর্দা সম্পর্কে বর্ণিত প্রমাণাদির কিছু অংশকে স্বীয় মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছে এবং তার পরিপন্থী দলীলসমূহকে বিভিন্ন উক্তির দ্বারা খণ্ডন করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاء حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ - سورة الأحزاب: 53
অর্থাৎ, ((নবীর স্ত্রীদের নিকট থেকে তোমাদের কিছু চেয়ে নিতে হলে পর্দার বাইরে থেকে চেয়ে পাঠাও। তোমাদের ও তাদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য এটা উত্তম পন্থা)) [সূরা আল-আহযাবঃ ৫৩] তিনি আরো বলেনঃ

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُوراً رَّحِيماً - سورة الأحزاب: 59
অর্থাৎ, ((হে নবী! তোমার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও ঈমানদার লোকদের মহিলাগণকে বলে দাও, তারা যেন নিজেদের উপর নিজেদের চাদরের আঁচল ঝুলিয়ে দেয়। এটা অধিক উত্তম নিয়ম ও রীতি। যেন তাদেরকে চিনতে পারা যায় ও তাদেরকে উত্যক্ত করা না হয়। আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল ও দয়াবান।)) [সূরা আল-আহযাবঃ ৫৯] তিনি আরো বলেনঃ

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاء بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُوْلِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاء وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ - سورة النور: 31
অর্থাৎ, ((আর হে নবী, মুমিন স্ত্রীলোকদের বল, তারা যেন নিজেদের চোখকে বাঁচিয়ে রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানসমূহের হেফাযত করে ও নিজেদের সাজ-সজ্জা না দেখায়, কেবল সেই সব জিনিস ছাড়া যা আপনা আপনিই প্রকাশ হয়ে পড়ে। এবং নিজেদের বক্ষদেশের উপর ওড়নার আঁচল ফেলে রাখে। আর নিজেদের সাজ-সজ্জা প্রকাশ করবে না, কিন্তু কেবল এই লোকদের সামনে, তাদের স্বামী, পিতা, স্বামীদের পিতা, নিজেদের পুত্র, বোনদের পুত্র, নিজেদের মেলা-মেশার স্ত্রীলোক, নিজের দাসী, সেইসব অধীনস্থ পুরুষ যাদের অন্য কোন রকম গরয নাই, আর সেইসব বালক যারা স্ত্রীলোকদের গোপন বিষায়াদি সম্পর্কে এখনো ওয়াকফিহাল হয় নাই। আর তারা নিজেদের পা যমীনের উপর সজোরে ফেলে চলা-ফেরা করবে না এইভাবে যে, নিজেদের যে সৌন্দর্যø তারা গোপন করে রেখেছে লোকেরা তা জানতে পারে।)) [সূরা আন্‌-নূরঃ ৩১] হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ

كان النساء يصلين مع رسول الله صلى الله عليه وسلم الفجر فكان إذا سلم انصرفن متلفعات بمروطهن فلا يعرفن من الغلس - سنن النسائي
অর্থাৎ, ((নারীরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ফজরের সালাতে যোগদান করতেন। অতঃপর সালাত শেষে চাদরে নিজেদেরকে আবৃত করে আপন আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করাকালীন অনন্ধকারের জন্য তাদেরকে কেউ চিনতে পারতো না।)) [নাসায়ী] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ

كان الرُّكبانُ يمرُّون بنا ونحن مع رسول اللّه صلى اللّه عليه وسلم محرماتٌ، فإِذا حاذوا بنا سدلت إحدانا جلبابها من رأسها على وجهها فإِذا جاوزنا كشفنا - السنن أبو داود: 1833
অর্থাৎ, ((আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে ইহ্‌রাম অবস্থায় থাকাকালীন সওয়ারীরা যখন আমাদের নিকট হয়ে অতিক্রম করত, তখন আমাদের কেউ তার চাদর মাথা থেকে মুখমণ্ডল পর্যন্ত ঝুলিয়ে নিত। অতঃপর যখন তারা চলে যেত, আমরা মুখমণ্ডল খুলে নিতাম।)) [সুনানে আবু দাউদঃ ১৮৩৩] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেনঃ

يرحم الله نساء المهاجرات الأول، لما أنزل الله: {وليضربن بخمرهن على جيوبهن}. شققن مروطهن فاختمرن بها - صحيح البخاري: 4480-4481
অর্থাৎ, ((সর্বপ্রথম হিজরতকারীদের স্ত্রীগণের উপর আল্লাহ্‌ রহম করুন। যখন আল্লাহর এই বাণী- “এবং নিজেদের বক্ষদেশের উপর ওড়নার আঁচল ফেলে রাখে” অবতীর্ণ হয়, তখন নিজেদের চাদরকে দু’ভাগ করে একাংশকে ওড়না বানিয়ে ব্যবহার করতে আরম্ভ করেন।)) [বুখারীঃ ৪৪৮০-৪৪৮১]

পর্দার ব্যাপারে বর্ণিত প্রমাণাদির সংখ্যা অনেক। এ ব্যাপারে মতভেদের উল্লেখ না করেও বলা যায় যে, প্রয়োজন বোধে নারী তার মুখমণ্ডল খুলতে পারে এ ব্যাপারে সকলেই একমত। যেমন ডাক্তারের সামনে চিকিৎসার জন্য খোলা ইত্যাদি। অনুরূপ সকলে মনে করেন যে, ফিৎনার আশংকা থাকলে মুখমণ্ডল খুলে রাখা বৈধ হবে না। যারা মুখমণ্ডলকে খুলে রাখা বৈধ মনে করেন, তারা ফিৎনার আশংকাকালীন তা আবৃত রাখা ওয়াজিব বলেও ঘোষণা দিয়েছেন। আর বর্তমানে যখন ফিৎনা-ফ্যাসাদ ব্যাপক রূপ ধারন করেছে, অসৎ ও ফাসেক প্রকৃতির মানুষ এত আধিক্য লাভ করেছে যে, শহর-বাজার ও সর্বত্র তা ছেয়ে গেছে এবং সৎ ও আল্লাহ্‌ভীরু লোকের হার কমে গেছে, এর থেকে ভয়াবহ ফিৎনার আশংকা আর কি হতে পারে? চরিত্র, পরিবার ও মান সম্মানকে সুরক্ষিত রাখার জন্যই পরপুরুষের সাথে অবৈধ মেলা-মেশা নারীর উপর ইসলাম হারাম করে দিয়েছে। ইসলাম মানুষের হেফাযত ও ফেৎনা-ফ্যাসাদের সমস্ত পথকে বন্ধ করতে তৎপর। আর নারীর পর্দাহীনভাবে চলা-ফেরায় ও অপরিচিত লোকদের সাথে বাধাহীনভাবে মেলা-মেশায় প্রবৃত্তির তাড়না জেগে উঠে স্বাভাবিক ভাবেই, আর এতে অন্যায়ের পথ সুগম হয়ে যায় এবং অন্যায় ও অনৌচিত্য র্কমকাণ্ড অনায়াসে সংঘটিত হয়ে যায়। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেনঃ

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى - سورة الأحزاب: 33
অর্থাৎ, ((নিজেদের ঘরে অবস্থান কর এবং পূর্বতন জাহেলী যুগের সাজগোজ দেখিয়ে বেড়িও না।)) [সূরা আল-আহযাবঃ ৩৩] তিনি আরো বলেনঃ

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعاً فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاء حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ - سورة الأحزاب: 53
অর্থাৎ, ((নবীর স্ত্রীদের নিকট থেকে তোমাদের কিছু চেয়ে নিতে হলে পর্দার বাইরে থেকে চেয়ে পাঠাও। এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষার জন্য উত্তম পন্থা।)) [সূরা আল-আহযাবঃ ৫৩]

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী-পুরুষের অবৈধ মেলা-মেশাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এমনকি এ পথে উদ্বুদ্ধকারী সকল উপায় উপকরণকেও অবরোধ করে দিয়েছেন, যদিও তা ইবাদাতের ক্ষেত্রে ও ইবাদাতের স্থানেও হয়। কখনো কখনো নারী নিজ বাড়ী থেকে ঐ স্থানে যেতে বাধ্য হয়, যেখান পুরুষের সমাগম। যেমন, তার নিকট তার প্রয়োজন পূরণ করে দেয়ার মত কেউ না থাকাকালীন সময়ে প্রয়োজনাদি পূরণের জন্য যাওয়া অথবা তার নিজের জন্য বা তার অধীনস্তদের জন্য জীবিকার কেনা-বেচাসহ অন্যান্য প্রয়োজনাদি পূরণের জন্য যাওয়া; এমতাবস্থায় তার বাড়ী থেকে বের হওয়াতে কোন দোষ নেই। তবে শরীয়তের বিধি-বিধানকে খেয়াল রেখে চলা-ফেরা করতে হবে। যেমন, ইসলামী বেশভূষায় সর্বাঙ্গ ঢেকে, সৌন্দর্যের প্রকাশ না করে বের হওয়া এবং পরপুরুষদের থেকে সব সময় পৃথক থাকা ও তাদের সাথে মিশে না যাওয়া। পরিবার ও সমাজকে (অন্যায় ও অনাচার থেকে) রক্ষার জন্য ইসলাম যে সমস্ত বিধান প্রণয়ন করেছে, তন্মধ্যে অপরিচিত কোন ব্যক্তির সাথে নারীর নির্জনে অবস্থান করাকে হারাম বলে ঘোষণা দেয়া হলো অন্যতম একটি বিধান। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরিচিত কোন ব্যক্তির সাথে নারীর নির্জনে থাকাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন যদি তার সাথে তার স্বামী বা মাহ্‌রাম (যাদের সাথে তার বিয়ে হারাম) না থাকে। কেননা, শয়তান মানুষের আত্মা ও চরিত্রকে কলংকিত করার কাজে দারুণভাবে তৎপর।
মাসিক ও নিফাস (প্রসবোত্তর রক্তপাত)-এর বিধান

মাসিকের সময় সীমা
১)) অধিকাংশ যে বয়সে মাসিক আসতে দেখা যায় তা হলো ১২ থেকে ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত। তবে নারীর মাসিক এর আগে অথবা পরেও আসতে পারে, তা নির্ভর করে তার অবস্থা ও আবহাওয়ার উপর।

২)) মাসিকের অল্পাধিক্যের কোন নির্ধারিত দিন নেই।

গর্ভবতীর মাসিক

অধিকাংশ নারীরা যখন গর্ভবতী হয়, তখন তাদের ঋতু বন্ধ হয়ে যায়। তবে যদি গর্ভবতী রক্ত দেখে, আর তা যদি প্রসবের দু’দিন অথবা তিন দিন আগে হয়, আর তার সাথে প্রসব বেদনাও যদি অনুভব করে, তাহলে সেটা নিফাসের রক্ত বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি প্রসবের অনেক দিন অথবা অল্প দিন আগে হয়, আর বেদনা যদি না থাকে, তবে সেটা না নিফাসের রক্ত হবে আর না হায়েযের। তবে যদি অনবরত হায়েযের রক্ত আসতে থাকে, গর্ভবতী হওয়ার পরও যদি তা বন্ধ না হয়, তাহলে সেটা মাসিক বলেই গণ্য হবে।

মাসিকের ব্যতিক্রম
মাসিকের ব্যতিক্রম কয়েক প্রকারের হয়। যেমন-
১)) কম-বেশি হওয়া। অর্থাৎ, নারীর নির্ধারিত অভ্যাস হলো ছয় দিন, কিন্তু মাসিক সাত দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকছে, অথবা তার নিয়ম সাত দিন, অথচ সে ছয় দিনেই পবিত্রা হয়ে গেছে।

২)) আগে-পরে হওয়া। অর্থাৎ, নারীর নিয়ম হলো মাসের শেষে হায়েয আসা, কিন্তু মাসের শুরুতেই হায়েয আসতে দেখলো, অথবা তার নিয়ম মাসের প্রথম দিকেই হায়েয আসা, কিন্তু হায়েয মাসের শেষে আরম্ভ হলো। সে যখনই রক্ত দেখবে, তখনই সে হায়েযজনিতা বলে পরিগণিতা হবে। আর যখনই তা থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে, তখনই পবিত্রা বলে গণ্য হবে। তাতে তার নিয়মের বেশী হোক কিংবা কম হোক, আগে হোক কিংবা পরে হোক।

৩)) মাসিকের তৃতীয় ব্যতিক্রম হলো, রক্তের রঙ হলুদবর্ণ বা ঘোলাটে হওয়া। অর্থাৎ, রক্তের রঙ দেখতে আহত স্থান থেকে নির্গত পানির ন্যায় হলুদবর্ণ, অথবা হলদে ও কালো মিশ্র্রিত ঘোলাটে, যদি এটা হায়েয চলাকালীন দিনে, অথবা হায়েযের পর পরই পবিত্র হওয়ার পূর্বেই দেখে, তাহলে তা হায়েয বলে গণ্য হবে এবং এক্ষেত্রে হায়েযের বিধান কার্যকরী হবে। কিন্তু যদি পবিত্রতা অর্জনের পর দেখে, তাহলে তা হায়েয বলে গণ্য হবে না।

৪)) কেটে কেটে রক্ত আসা। যেমন, একদিনে রক্ত দেখে আর একদিনে পরিষ্কার ইত্যাদি। এর দু’টি অবস্থা। যথা-
(ক) যদি এটা মহিলার সাথে সব সময় ঘটে থাকে, তাহলে ইস্তিহাযার রক্ত বলে পরিগণিত হবে এবং এতে ইস্তিহাযার বিধান বাস্তবায়িত হবে।

(খ) যদি এটা সব সময় মহিলার সাথে না ঘটে; বরং কখনো কখনো ঘটে এবং এরপর সে সঠিক পবিত্রাবস্থা পায়। তবে একদিনের কমে যদি রক্ত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পবিত্রা বলে গণ্য হবে না। হাঁ, এমন কোন জিনিস যদি দেখে যা পবিত্রতাকে প্রমাণ করে, তাহলে ভিন্ন কথা। যেমন, যদি তার নিয়মের ঠিক শেষের দিকে রক্ত বন্ধ হয়, অথবা সে যদি ‘কাস্‌সাতুল বায়দ্বা’ দেখে। আর ‘কাস্‌সাতুল বায়দ্বা’ হলো, সাদা পানি যা হায়েয বন্ধ হওয়ার পর রেহেম থেকে নির্গত হয়।

৫)) শুকনো ধরনের রক্ত আসা। অর্থাৎ, ঠিক রক্ত নয় রক্তের দাগ বা চিহ্ন দেখে। এটা যদি হায়েয আসার দিনে, অথবা হায়েয বন্ধ হওয়ার পরপরই পবিত্র হওয়ার পূর্বেই দেখে, তাহলে হায়েয বলে গণ্য হবে। আর যদি পবিত্র হওয়ার পর দেখে, তাহলে তা হায়েয হবে না।

মাসিকের বিধান
প্রথমতঃ সালাত। হায়েযজনিতা মহিলার উপর ফরয ও নফল প্রত্যেক সালাতই হারাম। কোন সালাতই আদায় করা ঠিক হবে না। অনুরূপ সালাতগুলির কাযা ও তার উপর ওয়াজিব হবে না। তবে যদি হায়েয আরম্ভ হওয়ার পূর্বে অথবা শেষ হওয়ার পর এতটা সময় পায়, যাতে পূর্ণ এক রাকা‘আত সালাত আদায় করা সম্ভব, তাহলে সেটা তার উপর ওয়াজিব হবে। যেমন, একটি মহিলার সূর্যাস্তের এতটা সময় পর হায়েয আরম্ভ হলো যে, এক রাকাআত সালাত পড়া যেত, এমতাবস্থায় পবিত্রতা অর্জনের পর তাকে মাগরিবের সালাত কাযা করতে হবে। কারণ, সে হায়েযজনিতা হওয়ার পূর্বে এক রাকা‘আত সালাত আদায় করার মত সময় পেয়েছিল। অনুরূপ একটি মহিলা সূর্যোদয়ের এতটা সময় পূর্বে হায়েয থেকে পবিত্রা হলো যে, এক রাকা‘আত সালাত আদায় করার জন্য তা যথেষ্ট ছিল, এমতাবস্থায় পবিত্রতা অর্জনের পর ফজরের সালাত তাকে কাযা করতে হবে। কারণ, হায়েযের পূর্বে এতটা সময় তার হাতে ছিল, যা এক রাকা‘আত সালাত আদায় করার জন্য যথেষ্ট ছিল। হাঁ, যিকির, তাকবীর, ‘সোবহানাল্লাহ্‌’, ‘আলহামদুলিল্লাহ্‌’ পাঠ করা, খাবার ইত্যাদির সময় ‘বিসমিল্লাহ্‌’ বলা, ফেকাহ্‌ ও হাদীস পাঠ করা, দো‘আ করা ও দো‘আয় ‘আমীন’ বলা এবং কুরআন শোনা ইত্যাদি কোন কিছুই হায়েযজনিতা মহিলার উপর হারাম নয়। স্বয়ং তার কুরআন পড়ার ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, যদি চোখে দেখে, অথবা মনে মনে পড়ে উচ্চারণ না করে, তাহলে কোন দোষ নেই। যেমন, কুরআন অথবা রেহেল সামনে রেখে তার দিকে দৃষ্টিপাত করে মনে মনে পড়া। তবে এ অবস্থায় তার কুরআন পাঠ না করাই উত্তম। হাঁ, একান্ত প্রয়োজনে পাঠ করতে পারবে। যেমন, সে শিক্ষিকা, ছাত্রীদের অধ্যয়ন করাতে হয়, অথবা পরীক্ষার সময় পরীক্ষার জন্য পড়ার প্রয়োজন বোধ করে ইত্যাদি।

দ্বিতীয়তঃ সওম। হায়েযজনিতা নারীর উপর ফরয ও নফল সব সওমই হারাম। কোন সওম পালন করা তার পক্ষে ঠিক নয়। তবে ফরয সওমের কাযা তার উপর ওয়াজিব। সওম পালন অবস্থায় যদি তার হায়েয আরম্ভ হয়ে যায়, তাহলে তার সওম বাতিল গণ্য হবে যদিও তা সূর্যাস্তের সামান্য পূর্বে হয়। এদিনের সওমের কাযা করা তার উপর ওয়াজিব, যদি সেটা ফরয সওম হয়। হাঁ, যদি সে সূর্যাস্তের পূর্বে হায়েয অনুভব করে কিন্তু তা নির্গত হয় সূর্যাস্তের পর, তাহলে তার সওম সঠিক বলে গণ্য হবে। যদি হায়েয অবস্থায় ফজর হয়ে যায়, তাহলে এ দিনের সওম শুদ্ধ হবে না, যদিও সে ফজরের সামান্য পরই পবিত্রতা অর্জন করে থাকে। আর যদি ফজরের পূর্বেই পবিত্র হয়ে যায়, তাহলে তার সওম সঠিক বলে গণ্য হবে, যদিও সে ফজরের পরে গোসল করে থাকে।

তৃতীয়তঃ কা‘বা শরীফের তাওয়াফ করা। ফরয ও নফল সব রকমের তাওয়াফই তার উপর হারাম। কোন তাওয়াফই করা ঠিক হবে না। তাওয়াফ ব্যতীত অন্যান্য কাজ যেমন, সাফা-মারওয়ার সা‘ঈ করা, আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফা ও মিনায় রাত্রিবাস এবং জামারাসমূহে কংকর মারা ইত্যাদি সহ হজ্জ ও উমরাহর যাবতীয় কাজ সে করতে পারবে। কোন কিছুই তার উপর হারাম নয়। সুতরাং কোন মহিলা যদি পবিত্রাবস্থায় তাওয়াফ আরম্ভ করে, অতঃপর যদি তাওয়াফের পর পরই কিংবা সা‘ঈ করার সময় হায়েয নির্গত হয় তাহলে এতে কোন দোষ নেই।

চতুর্থতঃ
মসজিদে অবস্থান করা। মসজিদে অবস্থান করা তার উপর হারাম। পঞ্চমতঃ সঙ্গম করা। তার সাথে যৌন বাসনা চরিতার্থ করা তার স্বামীর উপর হারাম এবং স্বামীকে এ সুযোগ দেয়াও তার উপর হারাম। তবে আল্লাহরই প্রশংসা যে, সঙ্গম ব্যতীত চুমা ও লজ্জাস্থান ব্যতীত অন্যান্য অঙ্গের সংস্পর্শের মাধ্যমে প্রবৃত্তি নিবারণের অনুমতি রয়েছে।

ষষ্ঠতঃ
তালাক। হায়েয অবস্থায় স্ত্রীকে তালাক দেয়া স্বামীর উপর হারাম। যদি সে হায়েয অবস্থায় তালাক দেয়, তাহলে সে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্যকারী এবং হারাম কাজ সম্পাদনকারী বিবেচিত হবে। এমতাবস্থায় তালাক প্রত্যাহার করা ও পবিত্রা না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের কাছে রাখা তার উপর ওয়াজিব। অতঃপর পবিত্রা হয়ে গেলে ইচ্ছা করলে তাকে তালাক দিতে পারবে। তবে উত্তম হলো দ্বিতীয় হায়েয পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দেয়া। দ্বিতীয় হায়েয থেকে পবিত্রা হয়ে যাওয়ার পর ইচ্ছা হলে রাখতেও পারে, আবার তালাক দিতেও পারে।

সপ্তমতঃ
গোসল ওয়াজিব হওয়া। হায়েয সমাপ্তির পর সর্বাঙ্গ শরীরকে ধুয়ে পবিত্রতা অর্জন করা তার উপর ওয়াজিব। মাথার বেণী খোলা অপরিহার্য নয়, কিন্তু যদি এমন শক্ত করে বাঁধা থাকে, যাতে আশংকা বোধ করে যে, চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছাবে না, তাহলে তা খুলতে হবে। যদি সালাতের সময়ের মধ্যে পবিত্রা হয়ে যায়, তাহলে তড়িঘড়ি গোসল করা অপরিহার্য হবে যাতে সঠিক সময়ে সালাতটা আদায় করতে সক্ষম হয়। যদি সে সফরে থাকে আর কাছে পানি না থাকে, অথবা পানি আছে কিন্তু তার ব্যবহারে ক্ষতির আশংকা থাকে, তাহলে সে গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করবে। অতঃপর আশংকা দূরীভূত হয়ে গেলে গোসল করে নেবে।

ইস্তিহাযাহ
ইস্তিহাযা হলো, হায়েযের পর ও রক্ত প্রবাহ অব্যাহত থাকা, বন্ধ না হওয়া, অথবা সাময়িকের জন্য বন্ধ হওয়া। কেউ কেউ বলে ১৫ দিনের বেশী রক্ত আসাকে ইস্তিহাযা বলে যদি সেটা তার নিয়ম না হয়।ইস্তিহাযার তিনটি অবস্থা। যেমন-

১)) ইস্তিহাযার পূর্বে তার হায়েযের একটি নির্দিষ্ট সময় ছিল, এমতাবস্থায় সে তার সাবেক নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে সেই দিনগুলিই হায়েযের দিন গণ্য করবে ও হায়েযের বিধান এতেই কার্যকরী হবে, বাকী অন্য দিনগুলি ইস্তিহাযা বলে বিবেচিত হবে এবং ইস্তিহাযা বিধান তাতে পালনীয় হবে। এর উদাহরণ হলো, একটি মহিলার প্রত্যেক মাসের শুরুতেই ছয় দিন রক্ত আসতো, অতঃপর সে ইস্তিহাযায় পতিত হওয়ায় রক্ত প্রবাহ অব্যাহত থাকতে লাগল, এমতাবস্থায় মাসের ছয় দিনই তার হায়েয বলে গণ্য হবে আর বাকীগুলি ইস্তিহাযা। তাই সে নির্দিষ্ট দিনগুলোকেই হায়েয গণ্য করবে। তারপর গোসল করবে ও সালাত আদায় করবে। ছয় দিনের অতিরিক্ত রক্তের কোন পরওয়া করবে না।

২)) ইস্তিহাযার পূর্বে তার হায়েযের কোন নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। অর্থাৎ, যখন থেকে সে রক্ত দেখেছে, তখন থেকেই তার এই অবস্থা, এমতাবস্থায় যে ক’টা দিন রক্তের রঙ কালো অথবা গাঢ় হবে, অথবা এমন গন্ধ যা হায়েয প্রমাণ করে, সেই দিন ক’টিই হায়েয বলে গণ্য হবে। বাকী দিনগুলি ইস্তিহাযা হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তাতে ইস্তিহাযার বিধান আরোপিত হবে। এর উদাহরণ হলো, একটি মহিলা প্রথম যে দিন থেকে রক্ত দেখে সেদিন থেকেই রক্ত বন্ধ হয় না। কিন্তু কিছু পার্থক্য সে দেখেছে, যেমন- দশদিন রক্তের রঙ দেখেছে গাঢ়, বাকী দিনগুলি পাতলা, অথবা দশদিন রক্তের গন্ধ হায়েযের মত ছিল, বাকী দিনগুলিতে কোন গন্ধ ছিল না, তাই যে দিনগুলিতে রক্তের রঙ কালো ও গাঢ় ছিল এবং হায়েযের গন্ধ ছিল, সেই দিনগুলিই হায়েয বলে গণ্য হবে, বাকীগুলি ইস্তিহাযা।

৩)) তার হায়েযের কোন নির্দিষ্ট সময় ও সঠিক পার্থক্য নেই। যেমন, প্রথম যখন থেকে সে রক্ত দেখেছে, তখন থেকেই তার ইস্তিহাযার রক্ত অব্যাহত আছে। আর রক্তের রঙ এক রকম, অথবা এমন বিভিন্ন ধরনের জটিল রক্তের স্বরূপ যাকে হায়েয বলা সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় সে অধিকাংশ নারীর নিয়মানুযায়ী কাজ করবে। তাই প্রত্যেক মাসে যখন থেকে সে হায়েয দেখবে, তখন থেকে ছয়দিন বা সাতদিন হায়েয গণ্য হবে, বাকী ইস্তিহাযা।

ইস্তিহাযার বিধান
ইস্তিহাযার বিধান পবিত্রতার বিধানের মতই, তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। তা হলো-
১)) প্রত্যেক সালাতের সময় তাকে ওযু করতে হবে।
২)) যখন সে ওযুর ইচ্ছা করবে, রক্তের দাগ ধুয়ে নেবে এবং রক্তের শোষণ করার জন্য লজ্জাস্থানে কোন সুতির কাপড়ের টুকরা রেখে নেবে।

নিফাসের বিধান
সন্তানাদির ভূমিষ্ঠের সময়, অথবা তার দু’দিন বা তিনদিন আগে-পিছে বেদনাজড়িত যে রক্ত রেহেম থেকে বের হয়, তাকেই নিফাসের রক্ত বলে। আর যখনই এই রক্ত বন্ধ হয়ে যায়, তখনই পবিত্রা বলে গণ্য হয়। তবে যদি ৪০ দিন অতিক্রম করে, তাহলে সে গোসল করে নেবে, যদিও রক্ত প্রবাহ অব্যাহত থাকে। কারণ, ৪০ দিনই হলো নিফাসের সর্বশেষ সময়। তবে ৪০ দিনের পর প্রবাহমান রক্ত যদি মাসিকের রক্ত হয়, তাহলে পবিত্রা না হওয়া পর্যন্ত মাসিকের নিয়ম পালন করবে। তারপর গোসল করবে। আর নিফাস তখনই প্রমাণিত হবে, যখন সৃষ্টির মধ্যে মানব আকৃতির প্রকাশ পাবে। কিন্তু যদি ছোট অসম্পূর্ণ ভ্রূণ হয়, মানবাকৃতির প্রকাশ যদি না থাকে, তাহলে তার রক্ত নিফাসের রক্ত বলে গণ্য হবে না; বরং তা কোন রগের রক্ত বলে গণ্য হবে এবং এমতাবস্থায় ইস্তিহাযার বিধান তাতে কার্যকরী হবে। মানবাকৃতি প্রকাশ হওয়ার সর্ব নিম্ন সময় হলো গর্ভধারন আরম্ভ থেকে ৮০ দিন। আর সর্বোচ্চ হলো ৯০ দিন। আর নিফাসের বিধান হলো উল্লেখিত মাসিকের বিধানের মত।

মাসিক প্রতিরোধক
মাসিক প্রতিরোধক কোন জিনিস নারী ব্যবহার করতে পারে দু’টি শর্তের ভিত্তিতে। যেমন-
১)) তার ব্যবহারে কোন ক্ষতির আশংকা যেন না থাকে, ক্ষতির আশংকা থাকলে তা জায়েয হবে না।
২)) এটা স্বামীর অনুমতিতে হতে হবে যদি তা স্বামীর সম্পর্কিত কোন বিষয় হয়।মাসিক নিয়ে আসে এমন কোন জিনিসও ব্যবহার করতে পারে দু’টি শর্তের ভিত্তিতে। যেমন-
১)) স্বামীর অনুমতি।
২)) কোন পালনীয় ওয়াজিব থেকে রক্ষার বাহানায় যেন এ কাজ না করা হয়। যেমন, সিয়াম পালন করা ও সালাত আদায় করা ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য ব্যবহার করা।
গর্ভধারণ প্রতিরোধক ব্যবহার করা দু’প্রকারের-
(এক) সব সময়ের জন্য প্রতিরোধ করা এটা জায়েয নয়।
(দুই) সাময়িকের জন্য প্রতিরোধ করা। যেমন, নারী যদি অত্যাধিক প্রসবকারিণী হয়, আর প্রসব তাকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে দু’বছর অন্তর একবার প্রসব হওয়ার ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা ভাল। আর এটা জায়েয তবে স্বামীর অনুমতি থাকতে হবে এবং নারীর যেন কোন ক্ষতির আশংকা না থাকে।

সমাপ্ত
বিঃ দ্রঃ কিতাবটা ছাপাবার অধিকার তাকে দেয়া হলো, যে বিনামূল্যে বন্টন করতে ইচ্ছুক। আর যে বিক্রয় করার জন্য ছাপাতে চায়, তাকে অফিসের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

ঠিকানাঃ মক্তব তাও‘ইয়াতুল জালিয়াত, আল-জুলফী।
পোষ্ট ব ১৮২, আল-জুলফী ১১৯৩২, সৌদি আরব।
ফোনঃ +৯৬৬ ০৬ ৪২২ ৫৬৫৭, ফ্যাক্সঃ +৯৬৬ ০৬ ৪২২ ৪২৩৪



মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম নারী

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২০ 0
বার দেখা হয়েছে


-মরিয়ম জামিলা
প্রকাশকের কথা
ইসলাম সর্বকালের মানুষের জন্য মহান আল্লাহ্‌ প্রদর্শিত জীবন দর্শন, জীবনাদর্শ ও পথ নির্দেশিকা। মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি ইসলামেই নিহিত। তাই ইসলাম জীবনাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজ ও সভ্যতাই প্রকৃতপক্ষে সুস্থ সমাজ ও সুষ্ঠু সভ্যতা। ইসলামী জীবন দর্শনের বাইরে মানুষের মনগড়া মতাদর্শের ভিত্তিতে যুগে যুগে দেশে দেশে যে সকল সমাজ ও সভ্যতা গড়ে উঠেছে সে সকল সমাজ ও সভ্যতা কোন ক্রমেই কল্যাণমুখী সমাজ ও সভ্যতা হতে পারেনি। বরং হয়েছে প্রকৃতি বিরোধী, বিকৃত ও মানবতা ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতা।

প্রাগৈতিহাসিক কালের আদ, সামুদ, লুত ও ফেরাউনী সভ্যতা, ঐতিহাসিক যুগের গ্রীক, রোম, পারস্য ও ভারতীয় সভ্যতা এবং বর্তমান যুগের বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা খোদাবিমুখ মানবতা বিরোধী বিকৃত সভ্যতারই উদাহরণ।

বিকৃত ও ভ্রষ্ট সভ্যতার একটি সবচেয়ে বড় উপাদান হল নগ্নতা ও বেহায়াপনা, যা নারী জাতির সতীত্বের অবমাননা করে। এটা মূলতঃই শয়তানী কাজ। অধুনিক বস্তুবাদী সভ্যতা নারী-পুরুষের সমতার নামে পুরুষের সকল অংগনে নারীকে টেনে এনে যেমন মাতৃত্বের সঠিক দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে রাখতে চাচ্ছে; তেমনি নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ দানের দ্বারা গোটা মানব সভ্যতাকেই একটি ভ্রষ্ট পাশবিক সভ্যতায় পরিণত করতে চাচ্ছে। মুসলিম বিশ্ব কিভাবে পাশ্চাত্যের এই ভ্রষ্ট নারীবাদী প্রচারণার শিকার হয়ে নিজ সভ্যতাকে ধ্বংস করছে “ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম নারী” শীর্ষক এই বইয়ে সুবিজ্ঞ লেখিকা তা অত্যন্ত সুন্দর যুক্তি ও তথ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।

উদীয়মান সাহিত্যিক জনাব মোফাচ্ছেল আহমদ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় বইটি অনুবাদ করে তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। মহান আল্লাহ তার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমীন!

মোঃ নেছার উদ্দিন মাসুদ
৪৫১, মীর হাজিরবাগ
ঢাকা-১২০৪

 
লেখিকার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
মরিয়ম জামিলা ১৯৩৪ সনে নিউ ইয়র্কে জার্মান বংশোদ্ভূত এক আমেরিকান ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নিউ ইয়র্কে সবচেয়ে ধনাঢ্য ও ঘনবসতিপূর্ণ উপশহর ওয়েচেষ্টারে তিনি লালিত পালিত হন এবং সরকারী বিদ্যালয়ে সম্পূর্ন ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা লাভ করেন। শৈশবেই তিনি অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে একটু ভিন্ন প্রকৃতির বিদ্যানুরাগী ও নিরতিশয় পড়ুয়া হয়ে ওঠেন। হাতে কোন বই ছাড়া তাকে দেখাই যেত না। তার এই পড়ালেখার পরিধি স্কুল পাঠ্য তালিকা ছেড়ে বহুদূর চলে গিয়েছিলো। যখন তিনি কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখেন তখন থেকেই তিনি খুব আবেগ প্রবণ হয়ে ওঠেন এবং যৌবনের সকল চপলতাকে অবজ্ঞা করতে থাকেন, যা একজন আকর্ষনীয়-সুন্দরী যুবতীর বেলায় সচরাচর দেখা যায় না। তাঁর জ্ঞান তৃষ্ণার প্রবোধ আকর্ষন ছিল ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, সমাজ বিজ্ঞান ও জীববিদ্যা। স্কুল ও মহল্লার পাবলিক পাঠাগারগুলো এবং অবশেষে নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরী তার দ্বিতীয় গৃহ হয়ে দেখা দিল।

মাধ্যমিক স্কুল থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভের পর ১৯৫২ সনে তিনি নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিবারেল আর্টস প্রোগ্রামে ভর্তি হোন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫৩ সনে তিনি ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার এই অসুস্থতা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে এবং কোন ডিপ্লোমা অর্জন ছারাই দু’বছরের মধ্যে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিত্যাগ করতে হয়। সরকারী ও বেসরকারি হাসপাতাল সমূহে তিনি দু’বছর (১৯৫৭-৫৯) চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাস্পারাল থেকে গৃহে ফেরার পরই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন একজন লেকিকা হসেবে। মারমাদুক পিকথলের অনুদিত কুরআন এবং আল্লামা মুহাম্মদ আসাদের লেখা দু’টো বই Road to Macca এবং Islam at the Cross Roads তাঁর হৃদয়ে ইসলামের প্রতি আগ্রহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মুসলিম দেশ সমূহের সমসাময়িক কয়েকজন প্রখ্যাত মুসলিম মণীষীর সাথে পত্রালাপ এবং নিউ ইয়র্কে বসবাসকারী কয়েকজন নওমুসলিমের সাথে বন্ধুত্ত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ব্রুকলাইন ইসলামী মিশনে শেখ দাউদ আহমদ ফয়সালের হাতে তিনি ইসলামে দীক্ষিত হোন। জনাব ফয়সাল তখন তার নাম মার্গারেট মারকিউস থেকে পরিবর্তন করে মরিয়ম জামিলা রাখেন।

এরপর তিনি সারা বিশ্বের ইসলামী চিন্তাবিদদের সাথে ব্যাপক পত্রালাপ শুরু করেন এবং ইংরেজীতে প্রকাশিত সকল ইসলামী পুস্তক ও সাময়িকী পড়তে থাকেন। তার এই পড়াশুনার মাধ্যমেই তিনি মাওলানা সাঈয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হন এবং ১৯৬০ সন থেকে তার সাথে নিয়মিত পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ১৯৬২ সনের সুরভিত বসন্তে মাওলানা মওদূদী মরিয়ম জামিলাকে পাকিস্তানে চলে এসে লাহোরে তার নিজ পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে বসবাস করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। মরিয়ম জামিলা তার আমন্ত্রণকে সাদরে গ্রহণ করেন। পাকিস্তানে চলে আসার এক বছর পরে জামায়াতে ইসলামীর একজন সার্বক্ষনিক কর্মী জনাব মোহাম্মদ ইউসুফ খানের সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে এই ইউসুফ খানই তার সকল বইয়ের প্রকাশনার দায়িত্ব নেন। মরিয়ম জামিলা চার সন্তানের জননী। তিনি তার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সাথে একটি বৃহৎ পরিবারে স্বামীর সকল সন্তান ও মুহাররেম আত্মীয়দের সাথে বসবাস করেছেন। বিবাহের পরও তিনি তার সাহিত্যকর্ম ও বুদ্ধিবৃত্তিক সকল প্রয়াস খুবই সফলতার সাথে চালিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তার গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো গর্ভধারণকালীন এবং দুই গর্ভের মধ্যবর্তী সময়ে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি খুবই কড়াকড়ির সাথে পর্দা পালন করে থাকেন।

বর্তমান ও অতীতের সকল প্রকৃতিসহ নাস্তিকতা ও বস্তুবাদের প্রতি তার সীমাহীন ঘৃণা এবং বিমূর্ত ও অতীন্দ্রিয় ধারণার প্রতি তার নিরবিচ্ছিন্ন কৌতূহলই তাকে শেষ পর্যন্ত জ্ঞান ও আবেগের সমস্ত চাহিদা পূরণ করে নির্ভেজাল সরল পথ ইসলামে দীক্ষিত করেছে। ইসলাম তাকে দিয়েছে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবন সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা।

------------------
অনুবাদকের কথা
সমাজে নারী ও পুরুষের অবস্থান, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরই গড়ে ওঠে সভ্যতার ভিত্তি। কোন সমাজ নারীকে যখনই তার সঠিক অবস্থান থেকে সরিয়ে এনেছে তখনই সে সমাজের বিপর্যয় ঘটেছে।

ইসলাম সমাজে নারী ও পুরুষের যে অবস্থান নির্দেশ করেছে আধুনিক বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবে মুসলিম সমাজ সে অবস্থান থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। আধুনিক ভ্রষ্ট সভ্যতার লীলাভূমি আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে এক ধনাঢ্য ইহুদী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সু-সাহিত্যিক নওমুসলিম বেগম মরিয়ম জামিলা “Islam and the Muslim Women Today (ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম নারী )” শীর্ষক এই পুস্তিকায় মুসলিম সমাজের এই বিকৃতির চিত্র যেমন এঁকেছেন, তেমনি পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তঃসার শূন্যতার ইতিবৃত্তও তলে ধরেছেন খুবই নিপুণভাবে।

নারী ও পুরুষ একই মানব প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত হলেও দৈহিক ও মানসিক দিক দিয়ে উভয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। দৈহিকভাবে পুরুষ সবল, বীর্যবান, প্রবল সাহসী, সৃষ্টি প্রয়াসী, কর্মঠ ও কষ্টসহিষ্ণু। নারী অবলা, দূর্বল, অধিক পরিশ্রম ও প্রতিকূলতার মোকাবিলায় অক্ষম। নিয়মিত মাসিক রক্তস্রাব, গর্ভধারণ ও সন্তান পালনের গুরু দায়িত্বের কারণে গৃহের বাইরে কাজের জন্য সে অনুপযুক্তও।

মানসিক দিক থেকে পুরুষ দৃঢ়চেতা, প্রত্যয়দীপ্ত ও সহনশীল; নারী আবেগ প্রবণ, দূর্বলচিত্ত ও লজ্জাশীলা।
নারীদেহে রয়েছে চৌম্বক ও ক্ষারীয় পদার্থের আধিক্য। এবং পুরুষ দেহে রয়েছে বৈদ্যুতিক ও অম্লীয় পদার্থের প্রাধান্য। তাই চুম্বক ও বিদ্যুতের মধ্যে এবং এসিড ও ক্ষারের মধ্যে যেমন পারস্পারিক আকর্ষন প্রবণতা আছে; প্রাকৃতিকভাবে তেমনি নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে প্রবল জৈবিক আসক্তি। নারী দেহের আলোকচ্ছটা পুরুষকে যেমন আবিষ্ট করে, পুরুষ দেহের বিদ্যুতাভা নারীকে তেমনি করে বিমোহিত। তাই অবাধ যৌনাচার থেকে বাঁচার জন্য এবং নারীর স্বকীয়তাকে ধরে রাখার জন্য ইসলাম দিয়েছে পর্দার বিধান-ভিন পুরুষ থেকে নিজ দেহ ও চেহারার সৌন্দর্যকে লুকিয়ে রাখার হুকুম।

ইসলাম নারীর আসল কর্মক্ষেত্র নির্দিষ্ট করেছে তার গৃহে-স্বামীর সংসারে। নারী তার নিজ অবস্থান থেকেই হতে পারে শিক্ষিতা, গুণবতী, বিদুষী, সমাজ হিতৈষী, জনসেবী ও সংগঠক। ইসলামের সোনালী যুগ এর প্রকৃষ্ট সাক্ষ্য বহন করছে।

পুরুষ তার স্বাভাবিক যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা দিয়ে ঘরের বাইরের অঙ্গনে যেমন কর্তৃত্ব করবে, নারীও তেমনি তার স্বাভাবিকতার দাবী অনুসারে পর্দার অন্তরালে থেকে মানব সভ্যতার অর্ধেক কাজের আঞ্জাম দিবে।

নারী তার প্রকৃতির দাবী অনুযায়ী সঠিক দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম যে কল্যাণময় সমাজ গঠন করেছে, বস্তুবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতা তাকেই ধ্বংস করার জন্য “নারী স্বাধীনতা” নামক নিরুর বাঁশী বাজিয়েছে। এই নারী স্বাধীনতাবাদীরা নারীদেরকে স্বাভাবিক লজ্জা ও অবগুণ্ঠন থেকে মুক্ত করে কর্মের সকল অংগনে পুরুষের পাশাপাশি নিয়ে এসেছে। ফলে লিংগের দ্বারা নির্ধারিত মানবিক সকল সম্পর্ক আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হতে চলেছে। সংসার ও পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে; পিতা-পুত্র ও মাতা-কন্যার সম্পর্ক টুটে যাচ্ছে।

দীর্ঘ দেঁড়শ বছরেরও অধিকাল ধরে মুসলিম বিশ্ব পাশ্চাত্যের দ্বারা শাসিত হয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে মুসলিম সমাজে পাশ্চাত্য শিক্ষা, দর্শন, সংস্কৃতি, আইন ও জীবনাচারের যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে, পরবর্তী সময়ে মুসলিম দেশগুলো ভৌগলিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করলেও অদ্যাবধি পরাশক্তিগুলোর সে গোলামীর নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেনি।

রাজনৈতিকভাবে অধিকাংশ মুসলিম দেশ এখনো মুসলিম নামধারী পাশ্চাত্যের মানস সন্তানদের দ্বারাই পরিচালিত এবং নতুন এই শাসকরা সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রায় সব ব্যাপারেই তাদের পশ্চিমা প্রভূদের মুখাপেক্ষী। ফলে ইসলামের কোন মূল্যবোধই এদের দ্বারা নিরাপদ নয়। পাশ্চাত্য শক্তি এদের মাধ্যমে মুসলিম সমাজের বিবর্তন চেষ্টায় সদা সচেষ্ট রয়েছে। তাদের অসংখ্য ষড়যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে অভাবগ্রস্থদের সাহায্যের নামে এনজিও ও মিশনারী তৎপরতার মাধ্যমে ধর্মান্তর এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় আর্থিক সহায়তার অস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক বিকৃতি সাধন। সাম্প্রতিক কায়রো ও বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনের প্রস্তাবনাসমূহ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মুসলিম দেশগুলোতে পাশ্চাত্যের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, দর্শন, সংস্কৃতি, আইন ও বিচার পদ্ধতি পুরোপুরি চালু রয়েছে। শুধু পারিবারিক পদ্ধতি কিছুটা ইসলামিক। এটাকেও ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য তারা উঠে পড়ে লেগেছে। পর্দা ও পোশাক, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, একাধিক বিবাহ, বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত আইন, পিতামাতার অধিকার, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার এবং উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদিকে পালটিয়ে দিয়ে সম্পুর্ণ পাশ্চাত্য আইন বিধান চালু করাই তাদের লক্ষ্য। পাশ্চাত্য ও ইসলামী সভ্যতা সম্পর্কে সবিশেষ অভিজ্ঞ লেখিকা উক্ত পুস্তিকায় এ বিষয়টিকেই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন।

সচেতন পাঠক সমাজের কাছে বইটির এই নিবেদন পৌঁছে দেয়ার জন্যই বইটি বাংলায় রূপান্তরে ব্রতী হয়েছি। বাংলা ভাষা-ভাষী মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে বৈরী পরিবেশে বেড়ে উঠা বর্তমান প্রজন্মের নারী ও পুরুষ এই বইয়ের মাধ্যমে কোন এক মাত্রায় পথের দিশা পেলেই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে, ইনশাআল্লাহ্‌।

মোফাচ্ছেল আহমদ
২৮.১২.৯৫।

 

সূচিপত্র
মুসলিম নারীর সামাজিক দায়িত্ব
মা হিসেবে মুসলিম নারীর দায়িত্ব
নারী স্বাধীনতা ও কাসেম আমীন
নারী স্বাধীনতা ও ইসলাম
নারী সমবাদী আন্দোলন ও মুসলিম নারী
------------

 
মুসলিম নারীর সামাজিক দায়িত্ব
আধুনিক জীবন যাত্রার শ্রেষ্ঠত্বে যারা বিশ্বাসী তারা (১) কন্যাদের বিবাহে অভিভাবকত্ব, (২) বহু বিবাহ, (৩) তালাক ও (৪) পর্দা প্রথার মত ইসলামী মূল্যবোধকে নারী জাতির সামাজিক মর্যাদার হানিকর জ্ঞান করে থাকেন।

বিশ্বের সকল মুসলিম দেশেই অধুনা “সংস্কার আন্দোলন” নামে একটি আন্দোলন চলছে যা ইসলামের প্রারম্ভকাল থেকে ইসলামী বলে বিবেচিত বিধানগুলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চায় এবং সে সকল ক্ষেত্রে অমুসলিম দেশগুলোতে প্রচলিত বিধানকেই চালু করতে চাচ্ছে।

এই নিবন্ধে আমি তাই নারী জাতি সম্পর্কিত ইসলামী শিক্ষার স্বাভাবিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং এ ব্যাপারে তাদের ওপর অন্যায় আচরণ যে মারাত্মক সামাজিক ক্ষতির কারণ তা সবিস্তরে বর্ণনা করব। আধুনিক নারী সাম্যবাদীরা মুসলিম বালিকার স্বামী নির্বাচনে পিতা-মাতা কিংবা অভিভাবকের মতামতের প্রাধান্যকে খুবই দুঃখজনক বলে মনে করেন এবং এটাকে তারা তার প্রতি পিতার নিষ্ঠুর জুলুম ও ব্যক্তি স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন। তারা বহু বিবাহের মত ইসলামের অন্য কোন বিধানকেই এত খারাপভাবে নিন্দা করেননি। একে তারা মুসলিম নারীত্বের চরম অবমাননা ও স্বেচ্ছাচারী কামুকতার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন। এই “সংস্কারবাদীরা” একে কেবল চরম অধঃপতিত সমাজের জন্যই উপযুক্ত প্রথা বলে মনে করেন এবং একে শুধুমাত্র বিশেষ ব্যতিক্রমধর্মী অবস্থাতেই মেনে নেয়া যায় বলে দায়ী করেন।

আমাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে, আমাদের এই আধুনিকতাবাদীদের এহেন দুঃখজনক স্বীকারোক্তির ভিত্তি আদৌ কুরআন কিংবা হাদিসে নেই। এটা সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি তাদের মানসিক দাসত্বের ফলশ্রুতি।

পাশ্চাত্য সমাজ যে তীব্র ঘৃণার সাথে বহু বিবাহ প্রথাকে দেখছে তার কারণ হলো তারা একাকীত্বের একটি অতিরঞ্জিত ধারণার দ্বারা অধিক মাত্রায় প্রভাবিত এবং সে ক্ষেত্রে তারা ব্যাভিচারকেও তেমন বীভৎস মনে করে না।

এটা অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখের ব্যাপার যে, অনেক মুসলিম প্রধান দেশেও ইসলামের পারিবারিক বিধানকে এমনভাবে অংগচ্ছেদ করা হয়েছে যে, তাদের সমকালীন আইনে নবী (স), তার সাহাবায়ে কেরাম (রা) ও অন্যান্য মহাপুরুষগণ যাঁরা একাধিক বিবাহ করেছেন তাঁদেরকে অপরাধী হিসেবেই সাব্যস্ত করা হয়ে থাকে। তালাক সম্পর্কিত ইসলামী আইনকেও তারা বহু বিবাহ প্রথার মত কর্কশভাবে অভিযুক্ত করেছেন। কোন ব্যক্তিকে শরীয়ত কর্তৃক তার স্ত্রীকে তালাক দেয়ার অনুমতি প্রদানকে ইসলামী নারী জাতিকে হেয় প্রতিপন্ন করার আর একটি প্রমান হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন। তারা একথা জোরে শোরেই বলেছেন যে, তালাকের মত এক তরফা স্ত্রী প্রত্যাখ্যান অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কারণ এটা খুবই সামান্য ও তুচ্ছ কারণে কাউকে তার স্ত্রী পরিত্যাগের অনুমতি প্রদান করে। সুতরাং তালাক অবশ্যই একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং ব্যাভিচার ও দুরারোগ্য পাগলামীর মত কোন মারাত্মক অবস্থার উদ্ভব হলেই শুধু কোর্টের অনুমোদন সাপেক্ষে কাউকে তালাক দেয়া যেতে পারে।

যেখানে ইসলামী শরীয়ত পারস্পরিক সহাবস্থানে অসহনশীল একটি অসুখী দম্পতিকে তাদের সমস্যার একটি সুন্দর ও সম্মানজনক সমাধানের ব্যাবস্থা প্রদান করেছে, সেখানে ঐ সকল “সংস্কারবাদী”রা বলেছেন যে, এই অসঙ্গত মেজাজের দু’টো নারী-পুরুষকেও তাদের বিবাহ বন্ধনকে ধরে রাখতে বাধ্য করতে হবে।

দু’জন নারী-পুরুষ যদি পারস্পরিক সন্তুষ্টি খুঁজে না পায় তবে কোন ধর্মহীন নৈতিকতাই যেহেতু তাদের একে অপরকে ভালবাসতে বাধ্য করতে পারে না, সুতরাং তারা অন্যত্র ভালোবাসা খুঁজবেই। পারিস্পরিক অসন্তুষ্টিপূর্ণ এ দুঃসহ সহাবস্থান থেকে মুক্তি পেতে তাদের একটি মাত্র উপায় থাকে, তা হলো মিথ্যা ও কুৎসার মাধ্যমে তালাকের জন্য কোর্টকে প্ররোচিত করা, আর যেহেতু এই মিথ্যা অপবাদ তাদের জন্য সামাজিক গ্লানির কারণ হয়, সেহেতু পুরো ব্যাপারটাই তাদের নৈতিক অধঃপতন ও ধ্বংস ডেকে আনে।

কোর্টে প্রমাণযোগ্য যথার্থ কারণ ছাড়া যে তার স্ত্রীকে তালাক দেয় সে খারাপ লোক বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু মানসিক পীড়নের মধ্যে আজীবন ধরে না রেখে মেয়ে লোকটিকে পছন্দমত বিবাহ বন্ধনের সুযোগ দেয়া যেকোন মানবিক বিচারেই খারাপ হবার নয়। তথাপি আমাদের আধুনিক সংস্কারবাদীরা এহেন অবস্থায়ও নারীটিকে আজীবন ঝগড়া-ঝাঁটি ও মানসিক পীড়নের মধ্যে রাখার জন্য আইন তৈরিতে উঠে পড়ে লেগেছেন।

পর্দা বা নারী-পুরুষের অবাঞ্ছিত মেলামেশা থেকে পৃথকীকরণ ব্যাবস্থাকেও আধুনিক শিক্ষিতরা মোটেই কম ক্রোধের দৃষ্টিতে দেখছেন না। তারা অমুসলিমদের মতই নারী দেহের অবগুণ্ঠন উন্মোচনে বদ্ধপরিকর। তাই তারা নারীদের জন্য সহশিক্ষা, ভোটাধিকার, দেশের বাইরে চাকরি গ্রহণ এবং সাধারণ্যে সকল কাজে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বশীলদের প্রবর্তিত এই “নারী স্বাধীনতার” সর্বোচ্চ চিত্র হলো- রাজপথে নেকাব উন্মোচিত মেয়েদের জাতীয় সঙ্গীতের তালে তালে ব্যানার দুলিয়ে উন্মত্ত কুচকাওয়াজ, নির্বাচনে পুরুষের পাশাপাশি মহিলাদের ভোট প্রদান, সেনাবাহিনীতে পুরুষ সৈনিকের পোশাকে সজ্জিত নারী, কল কারখানায় পুরুষের সাথে কর্মরত মেয়েলোক এবং আনন্দ মেলার উপহার বিপণীর সজ্জিত পশুর মত জাতীয় সুন্দরী প্রতিযোগীতার বিচারকগণ কর্তৃক আগত সুন্দরী ললনাদের দেহ ও সৌন্দর্য চোখে দেখার দৃশ্য।

আধুনিক সভ্যতায় নারীর সম্মান ও শ্রদ্ধার মাপকাঠি নির্ধারিত হয়ে থাকে পুরুষের সকল কাজে তার অংশগ্রহণ এবং এর সঙ্গে তার সকল সৌন্দর্য ও মাধুর্যকে উন্মুক্ত করার মাধ্যমে। ফলে সমসাময়িক ঐ সমাজে নারী ও পুরুষের উভয়ের পার্থক্য নির্ধারক সকল কর্মকান্ড সম্পূর্ণরূপে গুলিয়ে যায়।

ইসলামী শিক্ষা এই ধরনের বিপথগামী যৌনতামূলক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে কিছুতেই বরদাশত করতে পারে না।

ইসলাম নারীকে পুরুষের অঙ্গনে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়নি। তার দায়িত্ব নির্ধারিত হয়েছে তার ঘরে, তার স্বামীর সংসারে। তার সার্থকতা ও সফলতা নির্ধারিত হয়েছে স্বামীর প্রতি তার আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা এবং মানিক-রতন সন্তানদের লালন-পালনের মধ্যে। সকল মুসলিম নারীরই পছন্দের বিষয় হলো গোপনীয়তা, আর এ জন্য পর্দাই হচ্ছে অপরিহার্য মাধ্যম।

জীবন নাট্যের যে দৃশ্যের পুরুষ হবেন ইতিহাসের নায়ক, সে পটভূমিকায় পর্দার অন্তরালে নারী হবেন তার সকল কর্মকান্ডের সহায়ক। নারীর এই কর্মকান্ড কম উত্তেজক হলেও অধিকতর বিনম্র এবং সুষ্ঠু জীবন ধারার স্থিতিশীলতা, বিকাশ ও পবিত্রতা রক্ষায় তা কোনমতেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 
মা হিসেবে মুসলিম নারীর দায়িত্ব
একজন মুসলিম জননীর প্রাথমিক দায়িত্ব হল সন্তানদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী অনুপ্রাণিত করা।

অনারবীয় এলাকায় যে সকল মুসলিম নারী প্রত্যহ সকালে ভক্তিভরে কুরআন পড়েন তাদের অধিকাংশই তার সামান্যতম অর্থও জানেন না, কিংবা জানার চেষ্টাও করেন না।

ধর্মীয় ঝোঁক প্রবণ অথচ আধুনিক শিক্ষায় গড়ে ওঠা অনেক মেয়েই কুরআন, হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন করে থাকে। কিন্তু এগুলোকে তারা নোবেল নাটকের মতই ভাবে, কিংবা ভাবে কোন বিমূর্ত দর্শন হিসেবে। ইসলাম সম্পর্কিত এই পড়াশুনা তাই তাদেরকে এক মুহুর্তের জন্যও নোংরা ছায়াছবি দর্শন, অশ্লীল সংগীত শ্রবণ ও গানের তালে তালে অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন কিংবা অশালীন দেহ-আটা পোশাক পড়ে সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে সমর্থ হয় না।

এক্ষেত্রে মুসলিম মায়েদের কর্তব্য তাদের বেড়ে ওঠা ছেলে-মেয়েদেরকে এ কথা বুঝানো যে, স্কুল-কলেজে তাদের অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব যা করছে তা আসলে ঠিক নয়। মুসলিম নারী কুরআন-হাদীস পড়বেন এই উদ্দেশ্যে যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনে তার শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়।

অনেক মুসলমানের ঘরেই দেখা যায়, তাকের ওপরে সুন্দর সিল্কের কাপড়ে আবৃত করে কুরআন শরীফ রেখে দেয়া হয়েছে, যেন ময়লা পড়ার জন্যই। অব্যবহৃত এই অসংখ্য কুরআন আর্তি করে বলছে “ওহে মানুষ আমাকে বন্ধন মুক্ত কর, আমাকে পড়, আমাকে অনুসরণ কর।”

যে মায়েরা মহিলা বিষয়ক পত্রিকাদি পড়তে অভ্যস্ত তারা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি তাদের যুব সন্তানদের তীব্র বিদ্রোহাত্মক দৃষ্টিভংগিকেও সহজেই সমর্থন করে বসেন। এমনকি তাদের নির্বোধ, ঘৃণ্য আচরণ ও তুচ্ছ চপলতার প্রতি তীব্র আকর্ষণ এবং গতানুগতিকতার প্রতি সর্বাত্মক অনীহাকেও তারা প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। এই মায়েরা মনে করেন, “নাস্তিকতা ও বস্তুবাদ হচ্ছে যুব কিশোরদের জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এক জৈবিক বাস্তবতা। একে তারা একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করবেই। সুতরাং তাদেরকে এ সর্বব্যাপি ঝোঁক প্রবণতার ওপর ছেড়ে দেয়াই উচিত।”

এটা সম্পূর্ণ একটি প্রতারণাপূর্ণ কথা। এর কোন যৌক্তিকতাই থাকতে পারে না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তথাকথিত প্রগতিবাদীদের প্রচার প্রচারনাই তাদেরকে এ নৈরাশ্যের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

গণ মাধ্যমগুলোতে তারা যা শোনে ও দেখে এবং তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তারা যা শেখে, তাদের গৃহে আচরিত কিংবা শিখানো মূল্যবোধের সাথে তার কোন মিল না থাকায় স্বাভাবিকভাবেই তারা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। এসব গণমাধ্যম যদি পাশ্চাত্য জীবন-পদ্ধতি শিক্ষা না দিয়ে ইসলামী জীবন ধারার শিক্ষা দিতো তাহলে এই যুবক-যুবতীরা চিন্তা-বিশ্বাস এবং অনুভূতি ও আচরণে সম্পূর্ণ বিপরীত হতে পারতো। এই অত্যাবশ্যকীয় পরিবর্তন সাধনে শিক্ষিত জননীরাই কেবল তাদের সন্তানদের ওপর পরম কার্যকরী প্রভাব খাটাতে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।

পর্দা সম্পর্কিত ইসলামী শিক্ষার দাবীই হচ্ছে মহিলাগণ ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের সাথে একাকীত্বে বাস করবেন, নিতান্ত প্রয়োজনে আত্মীয়-সজন ও পুরুষ বন্ধু-বান্ধবের সাথে সাক্ষাতের জন্য বের হওয়া ছাড়া অধিকাংশ সময় তারা নিজ গৃহে অবস্থান করবেন। একজন মা তার বেড়ে ওঠা সন্তানদের সামনে তার ব্যক্তি জীবনে অনুশীলিত কার্যাদির দ্বারাই সুন্দর উদাহরণ উপস্থাপন করতে পারেন। যে জননী সর্বদা তার ঘর-কন্যার কাজে নিজেকে সাচ্ছন্দ রাখেন, রান্না-বান্না, তদারকী ও শিশুদের পরিচর্যায় ব্যাপৃত থাকেন, নিয়মিত নামায পড়েন, কুরআন অধ্যয়ন ও অন্যান্য ইবাদত বন্দেগীর কাজে ব্যস্ত থাকেন, তিনিই তার পরিবারে এমন একটি অনুকূল ইসলামী পরিবেশ সৃষ্ট করতে সক্ষম, যার দ্বারা তার শিশু সন্তানেরা গভীরভাবে প্রভাবিত হবে এবং বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে সে যখন বাইরের পরিবেশে মিশবে তখন অবাঞ্ছিত আচরণ দ্বারা আকৃষ্ট হবে না। এজন্য খুব অল্প বয়স থেকে শিশুদের ইসলামী শিক্ষা প্রদান করা উচিত। হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসুল (স) এঁর সাহাবা-ই-কেরাম (রা) এঁর সন্তানগণ এমনকি ন্যাংটা থাকাকালীন বয়সেও কুরআন আবৃত্তি করতে পারতেন।

শিশুরা যখন কথা বলতে শিখে তখনই তাকে কালিমা শিক্ষা দেয়া উচিত এবং বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ্‌, আল্লাহু আকবার, ইনশাআল্লাহ্‌, মাশাআল্লাহ প্রভৃতি ইসলামী ভাবাবেগপূর্ণ কথামালাও শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। শিশু যখনই দাঁড়াতে ও হাঁটতে শিখে তখনই মায়ের অনুকরণে তাকে নামাযের মহড়া করতে অনুপ্রাণিত করা উচিত। শিশুর বয়স যখন সাত বছর হবে তখন মায়েদের উচিত তাদেরকে নামায পড়তে চাপ দেয়া এবং দশ বছরেও নামায না পড়লে শিশুদের শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। এভাবে শিক্ষা দিলেই শিশুরা বুঝদার হওয়ার অনেক আগে থেকেই স্রষ্টা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।

বয়স ও মেধা অনুসারে এ সকল কর্তব্য পালনের গুরুত্ব সম্পর্কে শিশুদেরকে সহজ-সরল ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রদান করা উচিত। এ ক্ষেত্রে মায়েদের কর্তব্য শিশুদেরকে অতীত ও বর্তমেনের মুসলিম মহৎ ব্যক্তিত্বের রোমাঞ্চকর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে পরিচিত করে তোলা এবং তাদের নিজেদের জীবনে ঐ সকল মূল্যবোধ মেনে চলার তীব্র আকাংখা সৃষ্টি করা। শিশুরা যখন একটু বড় হয়ে ওঠে এবং নিজেরা ইচ্ছা করে বই পুস্তক পড়তে পারে তখন বাসগৃহের পরিবেশ এমন সব ইসলামী বই পুস্তক রাখা প্রয়োজন যা শিশুদেরকে পড়তে আকৃষ্ট করে।

যে সব ছেলেমেয়ে বেশ বড় হয়েছে কিংবা যৌবনে অবতীর্ণ হয়েছে তাদেরকে প্রেক্ষাগৃহে নোংরা ছায়াছবি ও রেডিও-টিভির অর্থহীন প্রোগ্রামগুলো কেবল দেখতে নিষেধ করলেই চলবে না বরং সেগুলোর খারাপ দিকটা তাদেরকে ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে। ঘরে যদি রেডিও অথবা টেলিভিশন সেট থাকে তবে মায়েদের উচিত কুরআন তিলাওয়াত, সংবাদ বুলেটিন, ভালো কবিতা আবৃত্তি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রোগ্রামগুলো ছাড়া অন্য সব প্রোগ্রাম শোনা থেকে সন্তানদেরকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা। কোন অবস্থাতেই শিশুদেরকে পাপ সংগীত শুনতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ শিশু চরিত্রের ওপর এর চেয়ে খারাপ নৈতিক প্রভাব ফেলার মত আর কোন প্রোগ্রাম নেই। যদি শিশু কখনো প্রতিবেশীর রেডিও-টিভি থেকে শুনে এ সকল খারাপ গান গাইতে শুরু করে তবে মায়েদের উচিত তাদেরকে চুপ থাকতে ব্যাধ করা এবং এসব নোংরা গান গাইতে লজ্জাবোধ থাকা উচিত বলে ধিক্কার দেয়া।

মুসলিম মায়েদের কোন অবস্থাতেই তাদের সন্তানদেরকে খৃস্টান মিশনারী স্কুলে বা আশ্রমে লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে পাঠাতে সম্মত হওয়া উচিত নয়। কারণ সেগুলোতে ছেলেমেয়েরা খৃষ্টধর্ম ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হবেই। এমনকি সরকারি স্কুলগুলোতেও নৈতিক শিক্ষার জন্য তেমন ভালো ফল আশা করা যায় না।

তাই এ ক্ষেত্রে সামর্থ থাকলে গৃহ শিক্ষকের মাধ্যমে কিংবা অসমর্থ হলে মসজিদে পাঠিয়ে ছেলেমেয়েদেরকে আরবী ভাষা, কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা প্রদানের সাহায্যে বস্তুবাদী শিক্ষার ক্ষতিপূরণ করা যেতে পারে। পারলে মা নিজেও তার সন্তানদেরকে এ ধরনের শিক্ষা দিতে পারেন।

প্রত্যেক মায়ের উচিত বাচ্চাদের স্কুল পাঠ্য সমস্ত টেক্স বই ভালোভাবে পড়ে দেখা। এগুলোতে যেসব বিষয় অসত্য, ভুল ও ক্ষতিকারক তা বাচ্চাদেরকে ধরিয়ে দেয়া এবং নিঃসন্দেহ প্রমাণে সেগুলোর অসত্যতা বুঝিয়ে দেয়া।

মুসলিম মায়েদের উচিত তার সাধ্যের সীমার মধ্যেই বাসগৃহকে আকর্ষনীয় করে তোলা। এ দেশের প্রায় সকল গৃহই, এমনকি মধ্যবিত্তের ঘরবাড়ীও অনেক ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা। অনেক মহিলাই মেঝেতে, বিশেষ করে উঠোন ও রান্না ঘরে আবর্জনা ছড়িয়ে রাখেন। তাদের এ একটা খারাপ অভ্যাস যে, তারা ময়লার মধ্যে থাকবেন তবুও নিজ হাতে তা পরিষ্কার করবেন না। ইসলামী শিক্ষা মেয়েদেরকে অবশ্যই পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মানুবর্তিতা শিখায়। নিজেদের হাতে ঘর ঝাড়ু দিতে কিংবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মুসলিম নারীকে কখনই লজ্জাবোধ করা উচিত নয় এবং চাকর-চাকরানীদের ওপর সবসময় এ ব্যাপারে নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয়। যদি সম্পদশালী হন তবে সর্বদা জাঁক-জমক ও অপচয় এড়িয়ে চলতে হবে এবং পশ্চিমা ধাঁচের সোফা, ড্রেসিং টেবিল, খেলোগয়না ইত্যাদি ব্যয় বহুল গৃহসামগ্রী পরিহার করতে হবে। কুরআন ও হাদিসের বানী সম্বলিত কারুকার্যপূর্ণ ক্যালিগ্রাফি দিয়ে ঘরের দেয়াল সজ্জিত করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ঘর সাজানো হবে অন্যদিকে তা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেবে যে, এটা মুসলিম বাসগৃহও। ইসলামী শিক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক ধরণের ছবি, পারিবারিক কিংবা বন্ধু-বান্ধবের একক ও গ্রুপ ফটোগ্রাফ ইত্যাদি কিছুতেই ফ্রেমে আটকিয়ে ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখা ঠিক নয়। ইসলামী শিক্ষা একজন বালিকাকে গৃহকর্মের জন্য অন্তত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মুল্যনীতি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মজাদায়ক হালাল খাদ্য তৈরির পদ্ধতি শেখায়। অনেক মুসলিম নারীই খাদ্যের পরিপুষ্টি জ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাই প্রয়োজনীয় ও উপযোগী প্রচুর খাদ্য হাতের কাছে থাকতেও তারা তাদের বাচ্চাদেরকে তা খাওয়াতে জানেন না।

একজন অশিক্ষিত ও উদাসীন মুসলিম নারী কিছুতেই অনৈসলামিক প্রভাব যা দিবারাত্রি তার সন্তানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা প্রতিহত করতে পারেন না। শুধুমাত্র একজন শিক্ষিত, চতুর ও অত্যন্ত আগ্রহশীল মুসলিম নারীই পারেন বর্তমান প্রতিকুল পরিবেশের সামনে সাহসের সাথে মুখোমুখি হতে।
----------------------------
 
নারী স্বাধীনতা ও কাসেম আমীন
নারী ও পুরুষের যৌন পবিত্রতার সংরক্ষণ, পর্দা করা, মেয়েদেরকে বিশ্বস্ত স্ত্রী হিসেবে গৃহে অবস্থান করা, সন্তান পালনে ও ঘরণীর কাজে নারীকে নিয়োজিত থাকা, স্বামীকে পরিবারের কর্তা ও জীবিকা উপার্জনকারী হিসেবে মেনে নেয়া, স্ত্রী তালাক ও বহু বিবাহে পুরুষের অধিকার থাকা প্রভৃতি প্রথাগুলো মুসলিম সমাজে মহানবী (স), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম ও ইমামদের যুগ থেকে দীর্ঘ তেরশত বছরেরও অধিককাল ধরে অনুশীলিত হয়ে আসছে। কোন ফকিহ কিংবা কোন মাজহাবের কোন আলেমই এ ব্যাপারে কখনো কোন প্রশ্ন তোলেননি। সকলেই নির্দ্বিধায় এ বিধানগুলো মেনে নিয়েছেন। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন নামধারী মুসলিমও কোরআন ও সুন্নাহ নির্দেশিত মুসলিম নারীর এই সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে কোন কটাক্ষ করার সামান্যতম সাহসও পায়নি।

ইতিহাসে প্রথম যে মুসলিম নামধারী ব্যক্তি পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে কথা তোলেন তার নাম কাসেম আমীন (১৮৬৫-১৯০৪) । কাসেম আমীন চুকেন একজন কুর্দী। পেশায় বিচারক। তিনি শেখ মোহাম্মদ আবদুহের শিষ্য ছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় কায়রোতে অতিবাহিত করেন। তার ফার্ষি ভাষা শিক্ষাকালে খৃষ্টান মিশনারীদের প্রচারণায় তার মনে বিশ্বাস জন্মায় যে, পর্দা, বহুবিবাহ ও তালাক প্রথা মুসলিম সমাজের পিছিয়ে যাওয়ার একমাত্র কারণ। এই ফরাসী শিক্ষা যতই তাকে পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎকৃষ্টতার পক্ষে যুক্তি দেয়, ততই তার নিজের সম্পর্কে নিকৃষ্টতার ধারণা জমতে থাকে। পরবর্তীতে তিনি লিখেন, “সত্যিকার সভ্যতা হবে বিজ্ঞান নির্ভর। সত্যিকার বিজ্ঞানের বিকাশের পুর্বেই ইসলাম যেহেতু তার পূর্ণতায় পৌঁছেছে; সুতারাং একে সভ্যতার আদর্শ ধরা যায় না”। তিনি আরও বলেন ইসলামের নৈতিক ভিত্তি দূর্বল। তিনি বলেন, “মুসলমানগণ, এমনকি মহানবী (স)-এর সময়ের মুসলমানগণও অন্য লোকদের চেয়ে কোন দিক দিয়ে ভালো ছিল না।” তার মতে, “পূর্ণতা ও চরম শ্রেষ্ঠত্বের পথ হল বিজ্ঞান। ইউরোপ বিজ্ঞানে যত বেশী অগ্রবর্তী হয়েছে, সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বেও তত বেশী এগিয়ে গেছে।” তিনি আরও লিখেন, “ইউরোপ সকল দিক দিয়েই আমাদের থেকে অগ্রবর্তী। যদিও আমরা ভেবে আনন্দ পাই যে, ইউরোপীয়রা বস্তুগতভাবে আমাদের চেয়ে সম্পদশালী হলেও নৈতিক দিক দিয়ে আমরা তাদের চেয়ে উৎকৃষ্টতরও; কিন্তু কথাটি ঠিক নয়। ইউরোপীয়রা আমাদের চেয়ে নৈতিক দিক দিয়ে অনেক বেশী অগ্রগামী। তাদের সকল শ্রেণীর মধ্যেই সামাজিক নৈতিকতা রয়েছে। ইউরোপে নারী স্বাধীনতাও কোন প্রথা বা অনুভূতি সৃষ্টি হয়নি। বরং তা বিজ্ঞান ও নৈতিকতা নির্ভর। তাই ইউরোপীয় বিজ্ঞানকে এর নৈতিক দিকটিকে বাদ দিয়ে গ্রহণ করা অর্থহীন। এ দু’টো জিনিস অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কশীল। সুতারাং আমাদের জীবনের সকল দিক ও বিভাগে পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিৎ।”

এই চিন্তাধারাই কাশেম আমীনকে ১৯০১ সালে পর্দা বিরোধী ‘দি নিউ ওম্যান’ নামক বইটি লিখতে আরম্ভ করে। এই বিষয়ে তিনি মুসলিম পারিবারিক জীবনকে ভীষণ খারাপভাবে চিত্রিত করেছেন। স্যামুয়েল জেম্মার নামক একজন পাশ্চাত্য লেখকের ‘চাইল্ড হুড ইন দি মোসলেম ওয়ার্ল্ড’ নামক বই থেকে কাশেম আমীন তার বইয়ে এমন উদ্ধৃতি টেনেছেন যে, “মুসলিম সমাজে পুরুষ হল নারীর নিরঙ্কুশ প্রভু। নারী তার আনন্দের বস্তু, যেমন একটি খেলনা, যা নিয়ে সে যেমন ইচ্ছা খেলতে পারে। জ্ঞান সমস্ত পুরুষের, আর নারী নির্বোধ, সব অজ্ঞতা তার জন্য। মুক্ত আকাশ ও সব আলো পুরুষের জন্য, আর নারীর জন্য সকল অন্ধকার ও বন্দীদশা। পুরুষ শুধু আদেশ করবে, আর নারী তা নীরবে মেনে চলবে। সব কিছুই পুরুষের, আর নারী তার এই সব কিছুর একটি তুচ্ছ অংশ মাত্র।” এই কাশেম আমীনই হলো মুসলিম নামধারী প্রথম ব্যক্তি যে মুসলিম পরিবারকে পশ্চিমা ধাঁচে পুনর্বিন্যাস করে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তার বইয়ে আলবার্ট হয়রানীর, “এরাবিক থট ইন দি লিবারেল এজ” নামক বই থেকে এভাবে উদ্ধৃতি টানেন যে, “প্রাচ্য দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখো, দেখবে নারীরা পুরুষের নিকট দাসত্বের শিকলে বন্দী হয়ে আছে। পুরুষরা তাদের শাসক। পুরুষ অত্যাচারী এবং সে যতক্ষণ ঘরে থাকে ততক্ষণ সে এই অত্যাচার চালাতে থাকে। পক্ষান্তরে তাকিয়ে দেখ ইউরোপীয় দেশগুলোর দিকে, সেখানে প্রতিটি সরকার মানুষের স্বাধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করেছে এবং নারীকে দিয়েছে চিন্তা ও কাজে উচ্চতর স্বাধীনতা ও সম্মান।”

কাশেম আমীন উক্ত বইয়ে আরো লিখেন, “মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ হলো, অজ্ঞতার কারণে সামাজিক মূল্যবোধের বিনাশ সাধন। এই অজ্ঞতা শুরু হয় পরিবার থেকে। এই অবস্থার উন্নতির জন্য পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন প্রয়োজন। এ শিক্ষার মাধ্যমে নারী শুধু পারিবারিক সমস্যা থেকেই বাঁচবে না, বরং পুরুষ উৎপীড়কের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে স্বাবলম্বী করতেও পারবে। এই শিক্ষা নারীকে অবগুণ্ঠন, নির্জনবাস ও উৎপীড়ন থেকে মুক্তি দিবে।” নারীর গৃহে অবস্থানকে কাশেম আমীন এই বলে ক্ষতিকর মনে করেন যে এটি নারীর প্রতি পুরুষের অবিশ্বাস থেকেই উৎসারিত। পুরুষ নারীকে শ্রদ্ধা করে না, তারা তাদেরকে গৃহ বন্দী করে রাখে। কারণ, তারা নারীকে পুরোপুরি মানুষই বলে স্বীকার করে না। পুরুষ নারীর মানবীয় গুণাবলীকে অস্বীকার করে এ জন্য যে, সে শুধুই নারীর দেহকেই ভোগ করতে চায়। বহু বিবাহ সম্পর্কেও কাশেম আমীন একই ধারণা পোষণ করেন। তার মতে, কোন নারীই পারেনা তার স্বামীকে অন্য নারীর সাথে অংশীদার করতে। যদি কোন পুরুষ দ্বিতীয় বিবাহ করে, তবে তা তার প্রথম স্ত্রীর ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাহ্য করেই সম্ভব। তালাক প্রথাকেও তিনি ঘৃণার সাথে দেখেন। তিনি বলেন, যদি এই প্রথা চালুই রাখা হয়, তবে নারীকেও এ ব্যাপারে সমঅধিকার দিতে হবে। তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের সমঅধিকার না পাবার কোন যুক্তি নেই বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে তিনি নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের পূর্বে সুদীর্ঘকাল শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত বলে জোর দেন।

কাসেম আমীনের ‘দি নিউ ওম্যান’ আধুনি মুসলিম নারীকে খৃষ্টান ও মানবতাবাদী আদর্শের শৃঙ্খলে বন্দী করার এক সুস্পষ্ট ঘোষণা। যে কেউ এ বই পড়বে তাকে বাস্তবিকই বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, এর লেখক একজন মুসলমান, কোন খৃস্টানধর্ম প্রচারক নন।

মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে ‘দি নিউ ওম্যান’ পুস্তকের এই বাদানুবাদের কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। কাসেম আমীন যা বলেছেন তা সম্পুর্ণরুপে মুসলিম নারীদের প্রকৃত অবস্থাকে নিরপেক্ষ ও খোলা মন নিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখার সামান্যতম চেষ্টা ব্যাতিরেকে এবং খৃষ্টান মিশনারীদের সকল আক্রমণকে অন্ধভাবে গ্রহণের ফলেই হয়েছে। প্রকৃত সত্য কথা হল- এই অধঃপতনের যুগেও অধিকাংশ মুসলিম পরিবার থেকে পারস্পারিক ভালোবাসা ও সহানুভূতির দ্বীপ্তি বিকীর্ণ হচ্ছে। বিশ্বের সকল দেশের মধ্যে মুসলিম দেশগুলোতেই পারিবারিক বন্ধন মজবুত। এই ঐতিহ্যগত পারিবারিক বিন্যাসের ফলে মুসলিম নারীগণ পরিবারের মা ও বধূ হিসেবে প্রভূত সম্মান, শ্রদ্ধা ও মর্যাদা পাচ্ছেন। তারা তথাকথিত পুরুষ নিপীড়কের ভয়ে পর্দা পালন করছে না; বরং এতে তার জন্য প্রচুর কল্যাণ নিহিত আছে জেনেই করছেন। এতে তাকে যে কিছু মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়, তা নয়। তবে সেটা নারীর সামাজিক অমর্যাদার কারণে নয়, বরং তা প্রচলিত নৈতিক অবক্ষয় ও বঞ্চনার কারণেই।

১৯৬১ সনের ১লা এপ্রিল আমাকে লেখা একটি ব্যক্তিগত পত্রে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী উল্লেখ করেন, “পাশ্চাত্য সভ্যতা নারী জাতির প্রতি খুবই নিষ্ঠুর প্রমাণিত হয়েছে। এই সভ্যতা নারীকে একদিকে প্রকৃতগত নারীত্বের দায়িত্ব পালন করাচ্ছে, অন্যদিকে তাকে একই সাথে পুরুষের বহুবিধ কাজে অংশগ্রহণের জন্য ঘরের বাইরে নিয়ে এসেছে, এভাবে তারা নারীকে দু’টো শানপাথরের মাঝখানে চৌকোণাভাবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অধিকন্তু তাদের প্রচারণা নারী সমাজকে পুরুষদের কাছে নিজেকে প্রতিযোগীতামূলকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রলুব্ধ করেছে। এই প্রতিযোগীতায় তারা স্বাভাবিক শালীনতাকে বিসর্জন দিয়ে অপর্যাপ্ত পোশাক, এমনকি নগ্নতা পর্যন্ত গড়িয়েছে। এভাবে তারা পুরুষের হাতের খেলনায় পরিণত হয়েছে। একমাত্র ইসলামই নারীকে এই দূর্গতি থেকে রক্ষা করতে পারে। কারণ, ইসলাম একজন নারীকে শুধুমাত্র একজন পুরুষের জন্যই নির্দৃষ্ট করে দেয় এবং তার প্রকৃতিগত কাজে নিরাপত্তা দিয়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে পাশ্চাত্য সভ্যতা নারীকে অসংখ্য পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য সেবাদাসীতে পরিণত করেছে। এবং যে সকল কাজ সত্যকারভাবে একজন রমণীর জন্য শোভনীয় সে সকল কাজের প্রতি তার হৃদয়ে একটি মিথ্যা লজ্জার ধারণা সৃষ্টি করে দিয়েছে। পরিবার ও সংসারকর্ম সংক্রান্ত ইসলামী নীতিমালাই একজন নারীর জন্য যথার্থভাবে উপযুক্ত এবং তার প্রকৃতির সাথে সম্পূর্ন সামঞ্জস্যশীল।”

পাশ্চাত্য সভ্যতার জন্য অন্ধ আনুগত্যের ফলে ১৯০১ সনে কাসেম আমীন বুঝতেই পারেননি যে, পাশ্চাত্যের এই নারী মুক্তিবাদী প্রচারণা পরবর্তী প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে অবাধ, সার্বজনীন ও অবৈধ যৌনতা চরিতার্থতার দিকে নিয়ে যাবে এবং তা মানুষের সহজাত পারিবারিক বন্ধনকে সম্পূর্ণরুপে ছিন্ন করে দেবে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কাসেম আমীন তার এই বইয়ের মাধ্যমে মুসলিম রমণীর পর্দার বিরুদ্ধে প্রচারণার যে তুফান তুলেছিলেন তার প্রতি খৃষ্টান মিশনারী ও পশ্চিমা আধিপত্যবাদীদের সর্বাত্বক সমর্থনের ফলে তা মুসলিম সমাজের অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন করে। এই প্রচারণার ফলে প্রত্যেক মুসলিম দেশে আগাছার মত একদল উশৃংখল মহিলা বেড়িয়ে আসলো- যারা মুসলিম নারীর সঠিক দায়িত্বানুভূতিকে ধ্বংস করে দিয়ে তাদের জীবন পদ্ধতিকে পশ্চিমা নষ্ট মেয়েদের জীবন পদ্ধতির সাথে একাকার করে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
-------------------
নারী স্বাধীনতা ও ইসলাম
আধুনিক বিশ্বে এমন কোন মুসলিম দেশই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে দেশ পাশ্চাত্যের নারী স্বাধীনতাবাদীদের মারাত্বক প্রচারণার স্বীকার হয়নি এবং পর্দা প্রথাকে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় বিধানরুপে চিহ্নিত করেনি, কিংবা তথাকথিত নারী স্বাধীনতাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির অপরিহার্য অংশ হিসেবে মেনে নেয়নি। যেমন- ১৯৭৬ সনের ১৯শে অক্টোবর পাকিস্তান টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর মুহাম্মদ মুকাদ্দাম বলেন, “কোন দেশেই আধুনিকীকরণ করা সম্ভব নয় যদি না সে দেশের নারী সমাজকে ধর্মীয় গোঁড়ামী থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা যায়। প্রাচ্যের অনেক দেশেই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগতে দেরী হয়েছে নারী সমাজকে স্বাধীনতা দানের ব্যাপারে সে সকল দেশের জনগণের মাঝে প্রোথিত গোঁরামী ও আদিম বিশ্বাসের কারণেই। পৃথিবীর অপরাপর দেশের সাথে যদি তাল মিলিয়ে না চলতে পারি তাহলে আমরাও স্বাধীন জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারবো না। এশিয়ার ও আফ্রিকার সকল উন্নয়নশীল দেশে নারী সমাজের ভূমিকা সুস্পষ্ট। দেশের উন্নয়নের জন্য তাদেরকে অবশ্যই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ জরতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো দেশের কিছু সংখ্যক লোক বিষয়টি বুঝতেই চায় না।”

১৯৭৬ সনের আগস্ট মাসে পাকিস্তান জাতীয় সংহতি পরিষদের উদ্যোগে লাহোরে অনুষ্ঠিত “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দু’দশকে নারী স্বাধিকার” শীর্ষক সেমিনারে উপরোক্ত বক্তব্যের ঠিক এইরূপ মন্তব্য করা হয়। যদি আমরা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করি এবং আমাদের এই দেশ গঠনের আদর্শিক ভিত্তি ইসলাম বলে মনে করি তবে কি এটা জানা আমাদের জন্য কর্তব্য হয় না যে, ইসলাম নারী স্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের কি শিক্ষা দিয়েছে ?

নারী অধিকার সম্পর্কে মত প্রকাশ করতে গিয়ে সূরা নিসার ৩৪নং আয়াতে বলা হয়েছে, “পুরুষরা হচ্ছে নারীদের তত্বাবধায়ক। কারণ, আল্লাহ্‌ পুরুষদেরকে নারীদের চেয়ে বেশী যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং পুরুষেরা নারীদের জন্য তাদের অর্থ ব্যয় করে।”

এ কথার তাৎপর্য হলো, কোন মুসলিম নারীই ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের জীবিকা অর্জনে বাধ্য নয় যতক্ষণ পর্যন্ত না তার জীবন ধারণের মত সামর্থ থাকবে, তার স্বামী মারা না যাবে কিংবা সে তালাক প্রাপ্তা না হবে অথবা তার ভরণপোষণ দেয়ার মত কোন পুরুষ আত্মীয় থাকবে।

কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী স্বামী তার স্ত্রীর জন্য বন্ধু ও কর্তা। স্বামীর কর্তব্য হলো স্ত্রীর প্রতি ন্যায়নিষ্ঠা, ভালোবাসা ও দয়া প্রদর্শন করা এবং এর প্রতিদানে স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর প্রতি বাধ্য ও অনুগত থাকা এবং স্বামী যাতে চরিত্রহীন হতে না পারে সে জন্য তার প্রতি অকৃত্রিম আস্থা নিবেদন করা।

কোরআনে স্বামীকে স্ত্রীর চেয়ে একমাত্রা ওপরে স্থান দেয়া হয়েছে এ জন্য নয় যে, সে নির্মম অত্যাচারী হবে, বরং তার দ্বারা পারিবারিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠিত হবে সে জন্যেই। যে পরিবারে স্ত্রী আর্থিকভাবে স্বয়ম্ভর সে পরিবারে স্বামী স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের কর্তৃত্বের ভূমিকা হারায়। পক্ষান্তরে পরিবারে মায়ের কর্তৃত্ব বেড়ে গেলে পিতার প্রতি সন্তানদের শ্রদ্ধাশীলতা হ্রাস পায়।

সুরা আন-নূরের ৩০-৩১ নং আয়াতে মুসলমান পুরুষদেরকে গায়ের মুহাররাম নারীদের প্রতি এবং মুসলিম নারীদেরকে গায়ের মুহাররাম পুরুষদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। পুরুষ ও নারী উভয়কেই বলা হয়েছে পরস্পরের চক্ষুকে অবনমিত রাখতে। মেয়ে লোকদেরকে মাথায় চাঁদর পরতে বলা হয়েছে এবং তার আঁচল দিয়ে মুখমণ্ডল ও বক্ষদেশ ঢেকে রাখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে তাদের স্বামী ও বিবাহ নিষিদ্ধ নিকটাত্মীয়দের ছাড়া আর কারো সামনে নিজেদের সৌন্দর্যের প্রদর্শনী করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রায়োগিক ভাবে এই আয়াত দ্বারা মুখমণ্ডলে কসমেটিক্স লাগানো এবং যৌন আবেদন সৃষ্টি করে এমন সব পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ হয়েছে।

হাদিস থেকে জানা যায়, রসূল (স)-এঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা)-এঁর ছোট বোন হযরত আসমা (রা) একদিন পাতলা কাপড়ের পোশাক পরে রসূল (স)-এঁর সামনে আসলে মহানবী তাঁকে এই বলে তিরস্কার করেছিলেন যে, যখন কোন মেয়েলোক বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন থেকে তার মুখমণ্ডল ও হস্তদ্বয় ছাড়া কোন কিছুই প্রকাশ করা উচিত নয়। সূরা আল আযহাবের ৫৫নং আয়াতে মহান আল্লাহ্‌ নবী (স)-এঁর স্ত্রীদের ঘরে গায়রে মুহাররাম পুরুষ ও বেগানা মহিলাদেরকে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন এবং ৫৯নং আয়াতে মুসলিম নারীদেরকে আকর্ষণীয় পোশাক ও অলঙ্কারাদি পরে বাইরে বের হতে বারণ করা হয়েছে এবং জনসম্মুখে পোশাক ও আচরণে এমন কিছু প্রদর্শন কতে মানা করা হয়েছে যাতে তাদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সৃষ্টি হতে পারে।

স্ত্রীলোকেরা পরিবারের মুহাররামা পুরুষ, চাকর ও দাসদের সাথেই কেবল খোলামেলা কথাবার্তা বলতে পারবে।
সূরা আযহাবের ৫৩ নং আয়াতে বিশ্বাসীগণকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে রসূল (স)-এঁর স্ত্রীদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের এবং তাঁদের নিকট কিছু চাইতে হলে তা পর্দার বাহির থেকে চাইতে। ৫৯ নং আয়াতে যখন কোন কারণে কোন মুসলিম মহিলাকে ঘরের বাইরে যেতে হয় তখন তাকে তার পুরো দেহ একটি চাঁদর দিয়ে ঢেকে নিতে বলা হয়েছে, যাতে করে তাদেরকে ধার্মিক মহিলা হিসেবে চেনা যায় এবং যাতে তারা উত্যক্ত না হয়। কোরআন মহানবী (স)-এঁর স্ত্রীদেরকে এবং প্রয়োগিকভাবে সকল মুসলিম মহিলাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে যখন কোন জরুরী প্রয়োজনে কোন গায়ের মুহাররাম পুরুষের সাথে সাক্ষাত করতে হয় তখন যেন সে তার সাথে এমন আবেগময় ভঙ্গি ব্যাবহার না করে যাতে লোকটির মনে প্রেমাভাব উৎপন্ন হতে পারে। বরং কথাবার্তা যেন সাদামাটা ও প্রথাগত হয়। হাদিসে মুসলিম নারীদেরকে স্বামী এবং বিবাহ নিষিদ্ধ নিকটাত্মীয়দের ছাড়া অন্য কারো সাথে (অর্থাৎ মুহাররাম কোন পুরুষের পরিচালনা ব্যতিরেকে) একাকী দূর যাত্রায় বের হতে নিষেধ করা হয়েছে।

যেখানে অধিকাংশ সহীহ হাদিসে মুসলিম নারীদেরকে মসজিদে নামাজের জামায়াতে একত্রিত হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং গৃহের নিভৃত কোণে নামাজ আদায় করাকেই খোদার কাছে অধিক পছন্দনীয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে; সেখানে একজন মুসলিম মহিলার প্রাইভেট সেক্রেটারী, ব্যাংক ক্লার্ক, বিমান বালা, হোটেল পরিচারিকা, বিজ্ঞাপন মডেল, গায়িকা, ড্যান্সার এবং সিনেমা, টেলিভিশন ও রেডিওতে অভিনেত্রীর ভূমিকায় আসাকে কিভাবে বরদাস্ত করা যেতে পারে ?

সুরা আন-নুরের ১-২৪ নং আয়াতে যারা বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক রাখে তাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি প্রদানের ভয় দেখানো হয়েছে। ইসলামে এ ব্যাপারে কোন দ্বৈত মাপকাঠির ব্যবস্থা নেই। যারা অবৈধ যৌন সম্পর্ক রাখে সে সকল নারী ও পুরুষের শাস্তির মধ্যে কোরআন ও হাদীসে কোন পার্থক্য করা হয়নি। উভয়ের জন্যই একই রূপ কঠিন শাস্তির উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের এই প্রমাণ ছাড়া পর্দার সপক্ষে ইসলামের অধিক আর কি প্রমাণ দরকার হতে পারে ? মুসলিম মহিলাদের চলাফেরার ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র নারীদের প্রতিরক্ষা এবং পুরুষদেরকে তাদের প্রতি অশুভ পদক্ষেপ থেকে সংযত রাখার উদ্দেশ্যেই আরোপিত হয়েছে। পৃথিবীতে ইসলামই হলো একমাত্র ধর্ম যা শুধু অনৈতিকতাকে মন্দ বলেই ক্ষান্ত হয় না বরং অনৈতিকতাকে উদ্দীপ্ত করে এমন যে কোন সামাজিক কর্ম থেকে বিশ্ববাসীদেরকে ফিরে থাকতে আদেশ দেয়।

নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম প্রবক্তা হচ্ছেন সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠাতা মার্কস ও এঙ্গেলস। ১৮৪৮ সনে প্রকাশিত তাদের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো বইয়ে তারা লিখেন, “গৃহ ও পরিবার একটি অভিশাপ ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, এটি নারীদেরকে চিরস্থায়ীভাবে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখে।” তারা বলেন, “ নারীদেরকে পারিবারিক বন্ধন থেকে মুক্তকরে দিতে হবে এবং কল-কারখানায় সার্বক্ষনিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদেরকে পুরোপুরি অর্থনৈতিক স্বয়ংম্ভরতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।” তাদের পরবর্তী নারীবাদী প্রবক্তারা সহশিক্ষা, ঘরের বাইরের একই কর্মস্থলে সহকর্মাবস্থান, সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে নারী-পুরুষের একত্র মিলন, অর্ধনগ্ন পোশাকে বিবাহপূর্ব প্রেম-অভিসার এবং যূথ সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে মদ্যপান, নেশাপান ও নৃত্যগানের মাধ্যমে নারী-পুরুষের অবাধ যৌনাচারের সুযোগদানের জন্য জিদ ধরেন। এক্ষেত্রে তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় জন্মনিরোধক সামগ্রী, বন্ধাকরণ ব্যবস্থা, অবাঞ্ছিত গর্ভের বিমোচন, অবৈধ সন্তানদের লালন পালনের জন্য রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নার্সারী ও বোর্ডিং- এর ব্যবস্থা রাখার দাবী করেন। এটাই হচ্ছে আধুনিক “নারী অধিকার” তত্ত্বের মূলগত ধারণা।

লাহোরের গুলবার্গ গার্হ্যস্ত অর্থনীতি বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে তেহরান ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যাঞ্চেলর শ্রোতাদের এ কথা বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, “আধুনিক সভ্যতার যেটুকি খারাবী যোগ হয়েছে তা অতি উদ্বিগ্ন রক্ষণধর্মী প্রতিক্রিয়াশীল ধারণার চেয়ে অনেক কম।” কিন্তু এই ভীতির কারণগুলো কি কারো জানা আছে? দেখুন না, নারী স্বাধীনতার কি ফল পশ্চিমারা ভোগ করছে!

আমেরিকান এক ঐতিহাসিক ও কলামিস্ট ম্যাক্সলার্নার বলেন, “আমরা একটি বেবিলিনীয় সমাজে বাস করছি। ইন্দ্রিয় সেবার প্রতি গুরোত্বারোপ ও যৌন স্বাধীনতার ফলে সমাজের সকল পুরাতন নীতি-নৈতিকতার বন্ধন ভেঙ্গে গেছে।” কিছুদিন আগেও কি জনসম্মুখে প্রকাশ করা যাবে কিংবা যাবে না তা নির্ধারণ করতো চার্চ, রাষ্ট্র, পরিবার ও সম্প্রদায়। কিন্তু অধুনা এ সকল প্রতিষ্ঠানগুলো জনসাধারণের দাবির কাছে পরাজিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন দায়িত্ব দাঁড়িয়েছে শুধুমাত্র শোনা ও দেখা। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্র দর্শকরা প্রতিদিন আর্ট গ্যালারী ও নাট্য গৃহসমূহে একত্রিত হচ্ছে উলঙ্গপ্রায় সুইডিশ নায়িকার ‘আমি এক নারী’ সিরিজের পর্ণ নাচ গান দেখে যৌন উত্তেজনা প্রবল করার জন্য। ইটালীয় সিনেমা পরিচালক ম্যাকিল্যানজেলো এন্টোনিওনি তার ‘ভেঙ্গে দাও’ ছায়াচিত্রে নগ্নতা বিরোধী সকল ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার মাথা খেয়েছেন। ফরাসী কৌতুক প্রিয় নায়িকা জেনফন্ডা সীমাহীন প্রলোভনধর্মী ছায়াছবি বারবারেলায় মুক্ত প্রেমাভিসারের গুণ কীর্তন করতে করতে একটি নগ্নতার দৃশ্য থেকে পরবর্তী অধিকতর আর একটি নগ্নতার দৃশ্যে ভেসে বেড়াচ্ছেন। কমপক্ষে দু’ঘণ্টা স্থায়ী ‘জেসনের প্রতিকৃতি’ নামক ছায়াচিত্রে একজন নিগ্রো বেশ্যা পুরুষের বিকৃত আত্মার ভ্রমণ কাহিনী এখন আমেরিকার প্রায় সকল পেক্ষাগৃহগুলোতেই খোলাখুলিভাবে দেখানো হয়ে থাকে, যা মানব জীবনের দিকগুলোকে সংকুচিত করেছে। খৃষ্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ ফাদার ওল্টার জে. ওং বলেন, “আমরা শীঘ্রই জানা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অধিক মাত্রায় স্বাধীন জীবন যাপনের সুযোগ পাচ্ছি.....।” (রিডার্স ডাইজেস্টের ১৯৬৮ সালের এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত “সমাজ যেদিকে যাচ্ছে আমাদের সব কিছু সেদিকে যাচ্ছে” নামক নিবন্ধ থেকে)।

আসুন পাশ্চাত্যের এই সামাজিক অবক্ষয়ের কি প্রভাব মুসলিম দেশগুলোর ওপর পড়েছে তা দেখা যাক। নারী স্বাধীনতা ও নৈতিক অধঃপতনের একটি প্রধান ও কার্যকর মাধ্যম হলো সিনেমা। “লাহোরের হিরামন্ডি জেলার প্রতিটি মেয়েরই আকাংখা হচ্ছে অভিনেত্রী হওয়া। তারা সকলেই চাচ্ছে চিত্রনায়িকা হতে। এই ইচ্ছার বাস্তবায়নের জন্য তারা যে কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার করতে রাজী আছে। এদের একটি বিরাট সংখ্যক মেয়ে তাদের নায়িকা হওয়ার আকাংখা পূরণের শর্তে তাথাকথিত সিনেমা পরিচালক ও প্রযোজকদের খুশী করার জন্য যে কোন জায়গায় উপস্থিত হতে রাজী রয়েছে। সিনেমা শিল্পের দ্বারা খুব সহজে ও সাধারণভাবে বিভ্রান্ত মেয়েলোক এরাই। এদের অধিকাংশই টুকিটাকি কিছু অভিনয়ের সুযোগ পেলেই খুশী। অতিরিক্ত বেশ কিছু মেয়ে এভাবেই সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়। এদের মধ্যে সামান্য কয়েকজন অবশ্যি প্রতিষ্ঠাও পায়। শহরের অনেক হোটেলেই “শুভ সময়” এর কাজে ব্যবহৃত হয়। কতিপয় হোটেল পরিচালক থাকে কোটনার ভূমিকায়। অধিকাংশ রেস্তোরাঁ ব্যবহৃত হয় খদ্দেরের সাথে নষ্টা মেয়েদের সাক্ষাতের স্থান হিসেবে। এ সকল মেয়ে লোকদেরকে নগরীর বাস স্ট্যান্ডগুলোতেও দেখা যায়। শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলোও খদ্দের ধরার জন্য খুবই পরিচিত স্থান। প্রেক্ষাগৃহগুলো যে সিনেমা দেখা ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহৃত হয় না তাও নয়। এ সকল ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা খুবই শিথিল।” (১৯৬৮ সালের ২৯ ও ৩০শে মার্চ তারিখে ‘দি পাকিস্তান টাইমস’-এ প্রকাশিত ‘লাহোরে বেশ্যাবৃত্তি’ নামক প্রতিবেদন থেকে)।

ক্রিস্টাইন কিলার অথবা মেরিলিন মনরোর মত মহিলা সেনাবাহিনী গঠন করা কি আমাদের জাতীয় উন্নয়নের অংশ হতে পারে?

নারী স্বাধীনতার পক্ষে পত্র-পত্রিকা, রেডিও এবং সিনেমার প্ররোচনা স্ত্রী ও সন্তানের মা হিসেবে নারীর ভূমিকাকে তাছিল্য ও খাটো করেছে। সন্তানের লালন-পালনের জন্য নারীদের গৃহে অবস্থানকে এই প্রচারণা জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অর্ধেক জনশক্তির অনুপস্থিতির ফলে অমার্জনীয় ক্ষতির কারণ বলে বর্ণনা করেছে।

রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে মুসলিম দেশসমূহে সহশিক্ষার দ্রুত প্রসারের ফলে ছেলে মেয়েদের মধ্যে অবাধ মেলামেশা ও যৌন অপরাধ প্রবণতা এমনভাবে বেড়েছে যে, তা অজস্র যুবক-যুবতীকে ধ্বংসের মুখোমুখি করে দিয়েছে এবং বিস্তর ঘটিয়েছে অসংখ্য পাপ কর্মের। সহশিক্ষা এই ভ্রমাত্মক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে জন্মগত কোন পার্থক্য নেই, সুতারাং উভয়কেই একই কর্মক্ষেত্রে অভিন্ন কাজের জন্য নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। ফলতঃ যে সকল মেয়ে সহ-শিক্ষা গ্রহণ করে তারা খুবই খারাপভাবে নিজেদেরকে বিবাহ ও মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করে। এরপরও নারী স্বাধীনতাবাদীরা বলে থাকেন মেয়েদের প্রাথমিক দায়িত্ব স্বামীর গৃহেই। এ কথার অন্য অর্থ দাঁড়ায়, আধুনিক নারীদেরকে দ্বৈত দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজের জীবিকার জন্য সারাক্ষণ ঘরের বাইরে কাজ করার পরও ঘরে ফিরে তাকে সন্তানের লালন-পালন, ঘরদোর সাজানো ও স্বামীর প্রয়োজন পূরণের মত অসম্ভব প্রায় সব বাধ্যবাধকতা পালন করতে হবে। এটাও কি ন্যায় বিচার?

মুসলিম দেশসমূহে অধুনা পাশ্চাত্যের আইনের অনুরূপ যে পারিবারিক আইন পাশ করা হয়েছে, সে আইন কি বাস্তবিকভাবে আমাদের নারী সমাজের কোন উন্নয়ন ঘটিয়েছে? এই আইন সতর্কভাবে বিবাহের জন্য একটি বয়সসীমা নির্দিষ্ট করে দেয় বটে, কিন্তু এই বয়স সীমার নিচে ( বিবাহ নিষিদ্ধ বয়সে) ছেলে-মেয়েদের অবৈধ যৌন কর্মের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা জারী করার বিষয়টি বেমালুম ভুলে যায়।

অধিকাংশ মুসলিম দেশে আধুনিকতাবাদীরা কোরআন ও সুন্নাহর আইন লঙ্ঘন, বহুবিবাহ প্রথাকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, এমনকি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে। তারা কখনই এই মানসিক অবস্থাটা বুঝতে চাচ্ছেন না যে, একজন স্ত্রীর পক্ষে তার স্বামীর অন্য একজন স্ত্রী যিনি তার নিরাপত্তাধীনে রয়েছেন এবং তার সন্তানেরা পিতার ভালোবাসা ও যত্ন পাচ্ছেন তার সাথে স্বামীর ভালোবাসাকে ভাগাভাগি করে নেয়া ভালো, না দেশীয় আইনে বর্তমান স্ত্রীকে তালাক না দিয়ে এবং তার সন্তানদের সহ তাকে তাড়িয়ে না দিয়ে অন্য কোন স্ত্রী গ্রহণে বাধা আছে বলে গোপনে কোণ মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্ক রেখে চলছে তা দেখা ভালো?

এটা কি সেই মহিলার জন্য কল্যাণকর নয়, যে তার স্বামীর সাথে ভালোভাবে থাকতে পারছে না, তাকে তার স্বামীর ব্যক্তিগতভাবে তালাক দিয়ে দিবেন এবং এই দম্পতি শান্তিপূর্ণভাবে পৃথক হয়ে গিয়ে আবার নতুন করে পছন্দমত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবেন? না, সেইটা ভালো যে, তাদের বিষয়টি কোর্টে যাবে এবং স্বামী এই বিবাহ বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কোর্ট নির্ধারিত ডিভোর্সের “প্রয়োজনীয় শর্ত” পুরণার্থে বাধ্য হয়ে স্ত্রীর ওপর অনৈতিক আচরণ ও পাগলামির মিথ্যা দোষারোপ করবে, যা মহিলাটির জন্য সামাজিক কলঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে এবং বেচারিনীর সকল সুনাম সুখ্যাতি জীবনের তরে ধূলিস্ব্যাত করে দেবে?

প্রকিতপক্ষে নারী স্বাধীনতাবাদের প্রবক্তারা নারীর ব্যক্তিগত সুখ সুবিধার প্রতি আগ্রহশীল নয়। লাহোরে ‘নিখিল পাকিস্তান মহিলা পরিষদ’ আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে পরিষদের এক সক্রিয় সমর্থক জনাবা সাতনাম মাহমুদ তার বক্তব্যে সরলতার সাথে এ কথা স্বীকার করেন যে, যদিও পাশ্চাত্যের মহিলারা বস্তুগত প্রাচূর্য এবং সামাজিক পূর্ণ স্বাধীনতা ও সম-অধিকার ভোগ করছে, তথাপি তারা কাঙ্ক্ষিত সুখে সুখী নয়। তিনি বলেন, যদি আত্মীক সুখই লক্ষ্য হয় তবে তার সমাধান তথাকথিত নারী স্বাধীনতার মধ্যে পাওয়া যাবে না। সুবিধাবাদী সমাজকর্মী এবং উক্ত মহিলা পরিষদের অন্যতম সদস্যা বেগম কাইসেরা আনোয়ার আলী তার বক্তব্যে যে সকল উচ্চ শিক্ষিতা মহিলা নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতীয় ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের বিষয়ে এমনভাবে নৈরাশ্য প্রকাশ করেন যে, তাদের সংগঠন মেয়েদের এই উন্নাসিকতার যে সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক তা যেন তিনি জানেনই না।

“সকল মুসলিম দেশেই নারী স্বাধীনতা আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে”- এ প্রচারণার আসল উদ্দেশ্য কি? এটা আসলে একটি মারাত্মক ষড়যন্ত্র যা আমাদের সংসার, পরিবার এবং এমনকি গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিতে চায়। ‘নারী অধিকার’, ‘নারী স্বাধীনতা’ ও ‘নারী উন্নয়ন’ প্রভৃতি সস্তা স্লোগান শুধুমাত্র মূল উদ্দেশ্যকে কুহেলিকার আবরণে ঢেকে রাখার জন্যেই।

মুসলিম বিশ্বে নারী মুক্তি আন্দোলন সেই চরম পরিণতিই ডেকে আনবে যা বিশ্বের অন্যান্য স্থানে এখন ঘটছে। যৌন বিষয়ে বিশ্বব্যাপী আজকের মানব সম্প্রদায় যে হারে ন্যাকারজনক আচরণে লিপ্ত হয়েছে তা বন্য পশুদের বিবেককেও হার মানায়। এই আচরণের অনিবার্জ পরিণতিতে সংসার ও পরিবার পদ্ধতিসহ সামাজিক সকল নৈতিকতার বন্ধন সম্পুর্নরূপে ভেঙ্গে পরবে এবং ব্যাপকভাবে কিশোর অপরাধ, দুর্নীতি, নির্যাতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনের কার্যকরীহীনতা দেখা দিবে। অতীতের সকল ইতিহাসই এর যথার্থ সাক্ষী যে, যখনই কোন সমাজে পাপ ও অনৈতিকতার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে সে সমাজ আর বেশীদিন টিকে থাকতে পারেনি।
--------------------

নারী সমবাদী আন্দোলন ও মুসলিম নারী
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী একটি মৌলিক আন্দোলন যা গোটা সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সকল মানবিক সম্পর্কের পরিবর্তন দাবী করেছে, তা হচ্ছে নারী সমবাদী আন্দোলন। “নারী মুক্তি আন্দোলন” নামেই এটি অধিক পরিচিত।

‘নারী মুক্তি আন্দোলন” বর্তমান যুগের কোন একক সৃষ্টি নয়। এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট প্রাচীনকাল পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে। প্লেটো তার “দি রিপাবলিক” গ্রন্থে পারিবারিক জীবন ও নারী পুরুষের দ্বারা চিহ্নিত সামাজিক সম্পর্কের অবসান দাবী করেছেন। প্রাচীন মিলনাত্মক নাটক লাইসিস্ট্রাটা এবং ব্যয়গত শতাব্দীতে হেনরিক ইবসেন্সের (১৮২৮-১৯০৬) লেখা “পুতুলের ঘর” নাট্যে এই নারীবাদী ধারণার পৌরোহিত্য করা হয়েছে। ভিক্টোরিয়ান যুগের অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল এবং সমাজবাদী দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিল এবং সমাজবাদী দার্শনিক ফ্রেডারিখ এঞ্জেলস ১৮৬৯ সনে লেখা “নারী পরাধীনতা” (Subjection of women) নামক প্রবন্ধে নারী মুক্তিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করেন। ১৮৮৪ সালে এঞ্জেলস জন সমক্ষে ঘোষণা করেন যে, “বিবাহ হচ্ছে এক ধরণের নিরানন্দ দাসত্ব বরন”। বিবাহ প্রথার উচ্ছেদ করে তিনি সরকারী ব্যবস্থাপনায় সন্তান লালন পালনের পরামর্শ দেন।

আমেরিকায় “নারী স্বাধীনতা” আন্দোলন শুরু হয়েছিল দাশ প্রথার বিলোপ ও মাদক বিরোধী আন্দোলনের বাড়তি অংশ হিসেবে। যে সকল মহিলা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা দেখলেন যে, তাদের দাবি জোড়াল করতে হলে তাদের রাজনৈতিক শক্তি দরকার। ১৮৪৮ সনের সেনেকা ফলস কনভেনশন (Seneca Falls Convention) এই “নারী মুক্তি আন্দোলনের” পথিকৃত। এই কনভেনশনের ঘোষণা পত্রে মহিলাদের নিজ সম্পত্তি ও উপার্জনের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে ডিভোর্স করার ক্ষমতা, সন্তানদের ওপর মায়ের অভিভাবকত্ব, চাকুরী ক্ষেত্রে নারী পুরুষের ভেদাভেদ দূরীকরণ পূর্বক একই কাজে সম বেতন-ভাতা নির্ধারণ এবং নির্বাচনে মহিলাদের ভোটাধিকারসহ প্রতিনিধিত্বের দাবী করা হয়।

মহিলা ভোটাধিকারের প্রচারণা যখন শুরু হল অধিকতর রক্ষণশীল নারীবাদীরা তখন তাদের সকল কর্ম প্রচেষ্টা শুধু এই একটি ইস্যুতে নিবন্ধ করলেন। ১৯২০ সালে মার্কিন সংবিধানের যখন ১৯ তম সংশোধনী আনা হল তখন দেখা গেল মহিলা কর্মীরা এবং জনগণ যা ধারণা করেছিলেন অর্থাৎ নির্বাচনে মহিলাদের ভোটাধিকার, তা পুরোপুরি এই সংবিধানে মেনে নেয়া হয়েছে। এরপর থেকে চল্লিশ বছরেরও অধিককাল নারীবাদী আন্দোলন অন্তর্নিহিত ছিল।

১৯৬১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এফ, কেনেডি মহিলাদের সামাজিক মর্যাদা সংক্রান্ত একটি প্রেসিডেন্টস কমিশন গঠন বিষয়ে প্রশাসনিক আদেশে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এই আদেশের বিষয়বস্তু ছিল, যে সকল প্রচলিত ধারণা, প্রথা, রীতি-নীতি, “নারী অধিকার” বাস্তবায়নে বাঁধা দেয় সেগুলো চিহ্নিত করা এবং তার প্রতিকারের সুপারিশ করা। এই প্রেসিডেন্টস কমিশন গঠনই হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মহিলাদের অবস্থান নির্ধারণ সম্পর্কিত প্রথম সরকারী পদক্ষেপ। এভাবে ১৯৬০ এর দশকের প্রথম ভাগেই সভা, সমাবেশ, মিছিল ও প্রতিরোধ কর্মসূচীর মাধ্যমে ৫০ বছরের সুপ্ত নারীবাদী আন্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এ সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে শুরু করলো। ১৮৪৮ সালে সেনেকো ফলস কনভেনশনে উপস্থিত মহিলারা তো শুধু মাতাল স্বামীদের দ্বারা গালি গালাজ ও দূর্ব্যবহারের প্রতিবাদ এবং বিবাহে নারীর আইনগত অধিকার, সম্পত্তি সংরক্ষণ, রোজগারের অধিকার ও একই কাজে মহিলা পুরুষের সম-বেতন দাবী করেছিলেন। কিন্তু তাদের এই উত্তরাধিকারিণীরা ছিলেন তাদের চেয়ে অনেক বেশী চরমপন্থী।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং দৃষ্টি আকর্শনী নারী সাম্যবাদী বিক্ষোভ সমাবেশ হয় ১৯৭০ এর ২৬শে আগস্ট। এই দিন হাজার হাজার মহিলা প্লাকার্ড বহন করে নিউ ইয়োর্কের ফিফথ এভিনিউতে সমবেত হন। এ সকল প্লাকার্ডে লেখা ছিলঃ “গৃহ বঁধুরা বিনা মাহিনায় দাসী মাত্র”, “গৃহ কর্মের জন্য সরকারী ভাতা চাই”, “নির্যাতিতা নারী, ভাত রেঁধো না, স্বামীকে সারা রাত উপোষ রাখো”, “মানবিক সহানুভূতি ভুলে যাও”, “বিবাহে জড়িয়োও না”, “তোয়ালে ধোয়া মহিলাদের কাজ নয়”, “গর্ভমোচন বৈধ কর”, “অধীনতা সুস্থ জীবনের জন্য কাম্য নয়” ইত্যাদি।

বর্তমান সময়ের নারীবাদীরা লিঙ্গের ভিন্নতা দ্বারা নির্ধারিত যে কোন সামাজিক কর্মকান্ডের ঘোর বিরোধী। তারা পুরুষের সাথে নারীর নিরংকুশ ও শর্তহীন সমতা দাবী করছেন, এমনকি তা দেহের গঠনগত বিষয়েও। নারী ও পুরুষের মধ্যে সৃষ্টিগত কোন পার্থক্য থাকতে পারে নারীবাদীরা তা স্বীকার করেন না। তাই স্ত্রীকে ঘরণী ও সন্তানের মা হতে হবে এবং স্বামী হবেন উপার্জনকারী ও গৃহকর্তা তা তারা মানতে রাজী নন। তারা বিশ্বাস করেন- নারীকেও পুরুষের মত যৌন কার্যে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে, নিষ্ক্রিয় হলে চলবে না। তারা এ জন্য বিবাহ পদ্ধতি, সংসার ও পরিবার প্রথার বিলোপ এবং সরকারী ব্যবস্থাপনায় সন্তান লালন পালনের ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে নারী জাতির পূর্ণ যৌন স্বাধীনতা দাবী করেন। তারা সকল নারীকে যৌন জীবনের ওপর পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জোর দেন। এ জন্য তারা জন্ম নিরোধক সকল সামগ্রীর ওপর সরকারী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জোর দাবী করেন, যাতে এ সকল সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতে পারে এবং বিবাহিত অবিবাহিত সকল বয়সের সকল মেয়েরাই ডাক্তারি ব্যাবস্থাপত্র ছাড়াই যে কোন ঔষধের দোকান থেকে তা ক্রয় করতে পারে। তারা দাবী করেন, গর্ভপাত সংক্রান্ত সকল বাধা নিষেধ তুলে দিতে হবে এবং যে কোন বয়সের গর্ভবিমোচনে নারীকে পূর্ণ অধিকার দিতে হবে। শুধু প্রয়োজনে গর্ভপাতের সুযোগ থাকলেই চলবে না বরং গরীব মহিলারা যাতে ইচ্ছা করলেই গর্ভপাত করতে পারে, সে জন্য সরকারী ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে গর্ভপাতের ব্যাবস্থা করতে হবে। স্কুলগুলোতে সকল বিষয়ে সহশিক্ষা প্রবর্তন করতে হবে। গার্হস্থ অর্থনীতি শুধু মেয়েদের জন্য এবং বিপণন ও কারিগরি শিক্ষা শুধু ছেলেদের জন্য নির্ধারিত থাকবে তা হবে না। ব্যায়ামাগার গুলোতে এবং শারীরিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ছেলে মেয়েদীর জন্য পৃথক ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে। মেয়েদেরকে সকল বয়সের ছেলেদের সাথে খেলাধুলা ও শরীর চর্চা প্রতিযোগীতা করার অনুমতি দিতে হবে। প্রচার মাধ্যম গুলোকে যৌনতার পার্থক্য সূচক শব্দও পরিহার করে “কর্মে ও উৎপাদনে নারী-পুরুষ সমান” এ ধারণার প্রচারণা চালাতে হবে। নারীবাদীরা শিশুতোষ পুস্তকাদির সমালোচনা করেন এ জন্য যে, এগুলোতে একক মা কিংবা বাবার পরিবারের উদাহরণ নেই এবং অবিবাহিতা ও স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নারীর মাতৃত্বকে আদর্শ হিসেবে দেখানো হয়নি। তারা বলেন, মায়েদের খেলার জন্য দিতে হবে মেকানিক্যাল টয় এবং ছেলেদের হন্য যান্ত্রিক পুতুল। চরমপন্থি নারীবাদীরা বিবাহ, সংসার ও পরিবার সংক্রান্ত সকল প্রচলিত পদ্ধতি তুলে দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এলাকায় বসবাসরত সকল নারী পুরুষকে একটি বৃহৎ যৌন জোনে পরিণত করার প্রস্তাব দেন এবং সন্তান লালন পালন সম্পুর্ণ সরকারী ব্যবস্থাপনাধীনে রাখার দাবী করেন। এ জন্য তারা আমেরিকায় যেমন প্রায় সকল এলাকায় জনগণের চিত্তবিনোদনের জন্য পার্ক, লাইব্রেরী ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা গড়ে উঠেছে তেমনি সকল এলাকায় সরকারী ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু করার দাবী করেন। তাদের দাবী হল পেশা গ্রহণে নারীত্ব কোন রূপ বাধা হতে পারবে না।

১৯৭১ সালে “দি নিউ ইয়র্ক টাইমস” পত্রিকায় প্রকাশিত “নারীবাদের পূনর্জন্ম” নামক এক প্রবন্ধে লিখিত হয়ঃ
“অনেক মহিলা বলতে পারেন যে, তারা সনাতন পন্থা অবলম্বন করতে চান। কিন্তু সেটা খুবই ভীতিজনক অথবা সেটা ভাবাই কঠিন বলে করতে পারছেন না। হ্যাঁ, পুরাতন নিয়মগুলোর মধ্যে একটা নিরাপদ ব্যাবস্থা আছে বলে মনে হতে পারে। তবে সেটা তেমনি, যেমন কেউ জেলখানার মধ্যে কোন ক্ষমতা অর্জন করলো, আর তার কাছে মনে হল বাইরের জগতটা ভয়াবহও। সম্ভবত এ সকল মহিলা কোন বিষয়টি পছন্দ করবেন তা স্থির করতে পারছেন না, ভয় পাচ্ছেন। আমরা মহিলাদের ওপর কোন কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। আমরা চাই শুধু তাদের নিকট গ্রহণীয় হতে পারে এমন সব বিকল্প দিকগুলো তুলে ধরতে। আমরা খুঁজে বের করেছি এমন সব পছন্দনীয় জিনিস যা গ্রহণ করলে একজন মানুষ সত্যকারের মানুষ হতে পারে। আমরা চাই মানুষকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে। কোন প্রথা, আইন বা মানসিক দাসত্বের দ্বারা তাদেরকে শৃঙ্কখলাবদ্ধ করতে চাই না। প্রকৃতিতে যদি এর জন্য স্থান না থাকে তবে প্রকৃতি এর জন্য স্থান করে দিতে বাধ্য।”

নারীবাদীরা মহিলাদের জন্য যে সকল “বিকল্প পছন্দ” খুঁজে বের করেছেন তার মধ্যে একটি হল নারী সমকামীতা (লেসবিয়ানিজম)। নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি শাখা হল সমকামী সংগঠন যা “দি ডটারস অব বিলিটিস” নামে পরিচিত। এর লক্ষ্য হল নারী সমকামীটার প্রসার ঘটানো।

“নারীবাদের পূণর্জন্ম” বইয়ের অন্যত্র বলা হয়েছে, “নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক সদস্যা রয়েছেন যারা এ আন্দোলন শুরু করার আগেই সমকামী ছিলেন এবং কিছু সদস্যা যারা এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের পর সমকামী হয়েছেন। পরে সমকামী হওয়াদের মধ্যে কতিপয় রয়েছেন যারা এটা বেছে নিয়েছেন রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে। এই চরম নারীবাদীদের মতে “নারী সমকামীতা” পুরুষের অত্যাচার থেকে নারীর আত্মরক্ষার একটি মাধ্যম।”

নিউ ইয়র্ক থেকে ১৯৭০ সালে প্রকাশিত নারী স্বাধীনতার উদ্দেশ্য সংক্রান্ত “দি নিউ ওম্যান” নামক একটি সংকলন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছেঃ আমেরিকায় লেসবিয়ানরা সংখ্যালঘু, কিন্তু এই সংখ্যা এক কোটির কম নয়। লেসবিয়ান হচ্ছে সে সকল নারী যারা পুরুষদের চেয়ে মেয়েদের প্রতি বেশী প্রেমাসক্ত হয়। সমকামিতা সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী যুক্তি প্রয়াসী এবং সবচেয়ে কম বাতিকগ্রস্থ মন্তব্য করেন দু’জন প্রখ্যাত মানসিক রোগের চিকিৎসক ডঃ জোয়েল ফোর্ট ও ডঃ জো, কে, অ্যাডামস। ১৯৬৬ সনে প্রকাশিত তাদের এই মন্তব্যটি হচ্ছেঃ ভিন্ন কামীদের মত সমকামীরাও একই মানব গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কোন আইন বা কোন সামাজিক সংগঠক কিংবা চাকুরী দাতাদের দ্বারা এদেরকে একটি ভিন্ন মানব গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। যৌন আচরণ সংক্রান্ত আইনের সংশোধন করতে হবে যাতে তা সমাজ বিরোধী যুব আচরণ, বলাৎকার ও উৎপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে কাজ করতে পারে। পারস্পরিক সম্মতিতে বয়স্কদের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে সংঘটিত যে কোন যৌন আচরণকে রাষ্ট্রীয় কিংবা সরকারী হস্তক্ষেপ যোগ্য কোন বিষয় হিসেবে গণ্য করা চলবে না।”

বিবর্তনকারী এই নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিণতি কি এবং কি ধরণের সমাজ ব্যবস্থা তারা চাচ্ছেন তা এখন ভেবে দেখুন।

একই পুস্তকের ১২২-১২৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছেঃ “এভাবে পুরুষের কাছে নারী- যেমন দেবতার কাছে উপাসক। দেবতা উপাসকের পূজা গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু তাকে আপন করে নিবে না, বরং তাকে পরে পায়ে ঠেলে দিতে। দেবতা উপাসক কখনো এক হতে পারে না। যৌন জীবন সম্পর্কে আমাদের সামাজিক শিক্ষা হল যৌবন উন্মেষের প্রথম দশ বছর কঠোর সংযম অবলম্বন করতে হবে (এমন কি হস্ত মৈথুনকেও এ ক্ষেত্রে বড় জোর একটি অপারগতা গোছের অপরাধ বলে গণ্য করা হয়)। এরপর সারাজীবন শুধু একজনকেই যৌনসংগিনী হিসেবে ধরে রাখতে হবে। প্রকৃতপক্ষে সমাজ আমাদেরকে একটি উন্নত যৌন জীবন সম্পর্কে অজ্ঞ এবং সন্ধিঘ্ন করে রাখার চেষ্টা করছে এবং বুঝাতে চাচ্ছে যে, পাঁচমিশালী যৌনতার নিষিদ্ধ ফল নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা যা পাচ্ছেন তার চেয়ে কখনো ভালো হতে পারে না। প্রচলিত প্রতিবাদের কি এক বাধা! যদি আমরা এই বাধাকে অতিক্রম করে আমাদের সমকামী মনোবৃত্তি ও কৌতূহল চরিতার্থ করে দেখতে পারি, তবেই আমরা বিচার করতে পারবো যে, আমাদের আবেগটি কতটুকু নৈতিক বা অনৈতিক এবং তখনই সম্ভব হবে তার আপাত ফলাফল, গুনাগুণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করে তার প্রতিকারের কার্যকারী পদক্ষেপ নেয়া। যদি পুরুষ তার পুরুষত্বকে অস্বীকার করে এবং একত্ব, বিনয়, পারস্পরিক আলোচনা, বিবেচনা, সহযোগীতা, ভদ্রতাপূর্ণ অস্বীকৃতি ও বিরোধের সকল মূল্যবোধকে মেনে নেয় তখন কি ঘটবে? আমরা যেমন যৌনতা সম্পর্কিত আমাদের কল্পনার উৎকর্ষতাকে অস্বীকার করতে পারি না, তেমনি আমাদের সম্পর্কের সকল স্বাভাবিক যৌন উপাদানকেও অস্বীকার করা যায় না। এই যৌন সম্পর্ক যেভাবে ঘটে, অর্থাৎ আলাপচারিতা, স্পর্শ, অঙ্গভঙ্গি ও প্রেম নিবেদন ইত্যাদিকে রক্ষণশীলদের নৈতিক পবিত্রতার ধরন থেকে পৃথক করে আমাদের নির্দোষ পছন্দের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

শুধু একজনের সাথে আজীবন বিবাহের রজ্জুতে ঝুলে থাকা ভালো, না বহুবিধ জীবন ভালো? কাকেও বিবাহ করার আগে অনেকেই চায় তার প্রাথমিক সম্পর্ক। এই প্রাথমিক সম্পর্ক খুবই দরকারি এবং একটি প্রশংসনীয় কাজ। এটাকেও যদি কেহ সমস্যা মনে করেন তবে সেটা করেছেন এজন্য যে আমরা যেন কোন নষ্ট মেয়ের খপ্পরে না পড়ি। এটা একটি পলায়নপর মনোবৃত্তি। এটা একটি অন্যায়। তবে তা কারো সাথে যৌন সম্পর্ক ঘটে যাওয়ার জন্য নয়; বরং তা কারো সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা থেকে সরে পড়ার মনোবৃত্তির কারণেই। তাই সমস্যা থেকেই যাবে।

আমাদের সকল আত্মীয়তার সম্পর্ক অতিরিক্তভাবে সংরক্ষিত রাখার প্রবণতা রয়েছে। আমরা চাই এটাকে শিথিল করে দিতে, যাতে সকলে খোলাখুলি ও সরাসরি যৌন আবেদন প্রকাশ করতে পারে। নারী ও পুরুষের এ ধরণের স্বাধীনতা কি আমেরিকার সনাতন পরিবার পদ্ধতিকে ভেঙ্গে দিবে? আমি তো তাই মনে করি। কারণ, এই পরিবার প্রথা এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা নানা সমস্যার সূতিকাগার। অভাব, অভিযোগ ও দক্ষতার প্রকাশ এবং অনেকগুলো মানুষের একত্র বাস ও রুজি রোজগারের এক গোষ্ঠীগত প্রচেষ্টার পরীক্ষা কেন্দ্র এই পরিবার।”

ভাগ্যিস, মুসলিম দেশগুলোতে এখনো নারীবাদী আন্দোলন এতটা চরম আকার ধারণ করেনি। কিন্তু আধুনিকীকরণ তথা পাশ্চাত্যকরণ নীতির ফলে পর্দা প্রথার দ্রুত অবলুপ্তি ঘটছে, মহিলারা ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি বিদ্রোহী হয়ে উঠছে এবং পশ্চিমা মেয়েদের ধাঁচে তারা নিজেদেরকে গড়ে তুলছে।

নিউ ইয়র্ক থেকে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত রাফায়েল পটাই লিখিত “আধুনিক বিশ্বে নারী” নামক বইয়ে বর্ণিত হয়েছেঃ

“শহুরে ধনাঢ্য ও প্রচলিত রীতি সম্পন্না মহিলারা, বিশেষ করে তেহরান শহরে এ ধরণের মহিলারা এখন ঘর কন্যার কাজে খুব সামান্য সময়ই ব্যয় করেন। তারা প্রায় সারাক্ষণই সামাজিক, পেশাগত, বিনোদনমূলক ও জনকল্যাণধর্মী কাজে ব্যাস্ত থাকেন, পোশাক প্রস্তুতকারী ও চুল পরিচর্যাকারীর কাছে যাওয়া, বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে সকালের নাস্তা ও দুপুরের খাবারের জন্য হোটেল রেস্তোরায় যাতায়াত এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদীতে অংশগ্রহণ এ সকল মহিলাদের নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও তারা খেলাধুলা ও ছুটি উপভোগের জন্য ঘরের বাইরে কাটাচ্ছেন। এই শ্রেণীর এক বিরাট সংখ্যক মহিলা সাংস্কৃতিক ও জনকল্যাণ কাজের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন। (পৃঃ ৭৭)

লেবাননের বিভিন্ন শহরে ঘর বহির্মুখী মহিলাদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতি রোববারে বৈরুতে সমুদ্র সৈকত সমূহে যত সংখ্যক জনসমাগম হচ্ছে তার মধ্যে মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে মোটেই কম নয়। এরা সকলেই প্রায় নতুন প্রজন্মের অল্প বয়সী তরুণ-তরুণী।

সৈকতের এই মেলামেশা নিঃসন্দেহে সামাজিক বাঁধনের শৈথিল্যের প্রমাণ। লেবাননে পাশ্চাত্যমুখী উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মহিলাদের পোশাক পরে ঘোরাফিরা করতে চায় তাদেরকেও তেমন বাধা দেয়া হয় না। সমাজের প্রায় সকল শ্রেণীর মেয়েরাই পোশাক পরিচ্ছদে অদ্ভুত রকমের তন্ময়তা প্রকাশ করছে, যা শুধু সমুদ্র সৈকত কিংবা বিনোদন কেন্দ্রই নয় বরং সকল অনুষ্ঠানাদিতেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা শীতকালে শীতের পোশাক পড়েন ঠিকই, কিন্তু গ্রীষ্মকালে তারা পড়ছেন সিল্কের আঁটসাঁট পোশাক কিংবা স্কার্ট ও পাতলা ব্লাউজ। এর সাথে থাকছে হিলতোলা জুতা, নাইলনের মোজা ও আকর্ষণীয় মেকআপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নয় এমন কিছু মুসলিম মেয়েরা মুখের ওপর খুবই পাতলা ও প্রতীকী নেকাব ঝুলিয়ে দিয়ে থাকেন। এই ক’বছর আগেও মেয়েরা সমুদ্র সৈকতে স্নান করতে লজ্জা বোধ করতো। এখন তারা এটাকে লুফে নিচ্ছে এবং অনেকেই খুব খাটো টুপিস পড়ে সমুদ্র স্নানে নামছে।”

নারীবাদ (Feminism) প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দেয়ার জন্য একটি অস্বাভাবিক, কৃত্রিম ও উদ্দেশ্যমূলক আন্দোলনের ফসল। এর লক্ষ্য হল সকল অদৃশ্য বিশ্বাস, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে অস্বীকার করা নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের ছাত্র-ছাত্রীরাই এই নারীবাদী আন্দোলনের অসারতা ও অযৌক্তিকতার পক্ষে নিশ্চিত ধারণা দিতে পারবেন। কারণ, প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক যুগের সকল মানব সভ্যতা ও মানুষের আচরণ থেকে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার যে, সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি ব্যবধান থাকবেই এবং নারী ও পুরুষ এই দুই পৃথক সত্ত্বার সমন্বয়েই সমাজ গড়ে ওঠে। সংসার ও পরিবারের পৃথকীকরণ, পরিবারে পিতার কর্তৃত্বের বিলোপ এবং যৌন বিশৃঙ্খলা যে সকল সমাজে ব্যাপক হারে প্রচলিত হয়েছে শেষ পর্যন্ত সে সকল কাজই অধঃপতিত ও ধ্বংস হয়েছে।

কেউ হয়তো বলবেন, যদি তাই হয় তবে কিভাবে পাশ্চাত্য তার নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্নীতি সত্ত্বেও বিশ্ব নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এত বেশী গতিশীল, বলবান ও শক্তিধর হয়ে থাকলো?

সাইয়েদ আবুল আ”লা মওদুদী বীরোচিত ‘পর্দা ও ইসলাম’ পুস্তকে নারীর মর্যাদা শীর্ষক আলোচনায় এ সম্পর্কে বিবৃত হয়েছেঃ

“যখন সমাজে নৈতিক লাম্পট্যপনা, আত্মপূজা ও যৌন অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করে; নারী-পুরুষ ও যুবক-বৃদ্ধ যৌন উন্মাদনায় হারিয়ে যায়; অর্থাৎ গোটা সমাজের মানুষ যখন পুরোপুরিভাবে যৌন বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে সমাজ স্বাভাবিকভাবেই ধ্বংসের অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। যারা এ ধরণের ধবংসশীল সমাজের উন্নতি ও সমৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করছে তারা আসলে সেই সমাজকেই দেখছে যা একটি অগ্নি গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে এবং যে কোন সময় তার সকল আত্ম-অহঙ্কার নিয়ে তাতে নিপতিত হবে। তারা ভাবে, কোন সামাজ তখনই সম্মৃদ্ধির উচ্চ শিখরে ওঠে যখন ঐ সমাজের সকল মানুষ নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে আত্মসেবী হয়ে যায়। কিন্তু এটা একটি দুঃখজনক সিদ্ধান্তও। যখন কোন সমাজে ধবংসশীল ও গঠনশীল উপাদানগুলো পাশাপাশি কাজ করতে থাকে এবং গঠনশীল উপাদানগুলো ধবংসশীল উপাদানগুলোর ওপর কোন না কোন দিক দিয়ে অগ্রগামী থাকে তখন ধ্বংসশীল কাজগুলো কে গঠনশীল কাজগুলোর ওপর বিজয়ী হয়েছে ভাবাটা নিতান্তই অন্যায়। উদাহরণ স্বরূপ ধরা যাক, একজন চতুর ব্যাবসায়ী যিনি কঠোর পরিশ্রম, তীক্ষ্ণ অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা উচ্চ অংকের মুনাফা অর্জন করেছেন। কিন্তু তিনি তা ব্যয় করছেন মদ, জুয়া ও লাগামহীন জীবনাচারের মাধ্যমে। তার কর্মের এই অংশ কি তাকে কোন সমৃদ্ধি ও কল্যাণ এনে দিতে পারবে? বাস্তব সত্য কথা হল, প্রথম প্রকারের গুণ তাকে যেমন উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, দ্বিতীয় প্রকারের গুণ তেমনি তাকে অধঃপতিত করে। ভাল গুনগুলোর কারণে তার যদি উন্নতি ঘটে তবে তার অর্থ এ হয় না যে, তার অসৎ গুণাবলী অকার্যকরী। হতে পারে জুয়ার শয়তান তার সমস্ত সম্পদ এক মূহুর্তেই কেড়ে নিবে, মদ্যপানের ফলে তার এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটবে যে, সে দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং এও হতে পারে যে, যৌন অপকর্মের শয়তান তাকে আত্মহত্যা, খুন বা অন্য কোন দুঃখজনক অবস্থায় ঠেলে দিবে। এখন সমৃদ্ধি, বৈভব ও আপাত ফুর্তির মধ্যে আছে বলে সে যে একদিন এ সকল দুঃখজনক অবস্থায় নিপতিত হবে না তা কেউ জোর করে বলতে পারে না। একইভাবে একটি জাতি প্রাথমিকভাবে গঠনশীল শক্তি থেকে উন্নতির উদ্যমতা পায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত তত্ত্বাবধানের অভাবে এর চারপাশে ধ্বংসের বীজ বপিত হতে থাকে। আস্তে আস্তে এই গঠনশীল শক্তি নিজ গতি হারিয়ে ফেলে এবং চারিদিকে তৎপর অপশক্তিগুলো তাকে আরো অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে।”

মানবতার মুক্তি কোথায় নিহিত? সমাজ গঠনের দিক দিয়ে ইসলামী শরীয়া পরিবারকে সমাজের মৌলিক ইউনিটি হিসেবে প্রাধান্যও দেয়। এই পরিবার শব্দটি একটি বৃহৎ অর্থ বহন করে। এটা বর্তমান সময়ের আণবিক ও পারমানবিক আকারের কোন পারিবারিক ধারণা নয়।

স্থানীয় অধিবাসী ও বদ্দু আরবদের মধ্যে প্রচলিত সকল রকম রেওয়াজ ও কু-সংস্কারের মূলোচ্ছেদ করে পুরোপুরি ধর্মের ভিত্তিতে নতুন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারাই ছিল মদিনায় মহানবী (স) এর বড় সাফল্য। নতুন এই সমাজের বন্ধন একদিকে যেমন ছিল গোটা মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যদিকে তেমনি তা ছিল প্রত্যেক মুসলিম পরিবারের সাথে সংযুক্ত। মুসলিম পরিবার গুলো হচ্ছে মুসলিম সমাজের এক একটি ক্ষুদ্র চিত্র ও সমাজের মূল ভিত্তি। ইসলামের গোষ্ঠিতান্ত্রিক প্রকৃতিতে পিতা হচ্ছেন পরিবারের ইমাম বা নেতা। পরিবারের ধর্মীয় কর্মকান্ডের মূল দায়িত্বশীল ব্যক্তি তিনিই। পিতা পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস, আচরণ ও নিয়ম নীতি তুলে ধরেন এবং তার বাস্তবায়ন ঘটান। পিতা পরিবারে আল্লাহরই প্রতিনিধি, তার কর্তৃত্ব প্রতীকী অর্থে আল্লাহরই কর্তৃত্ব। একজন পুরুষ পরিবারের সম্মানার্থ হন এ জন্য যে, তিনি পরিবারের ধর্মীয় গুরু। পরিবারের সদস্যদের ধর্মীয় সকল প্রয়োজন তিনিই পূরণ করেন। পুরুষরা যখনই পরিবারের এই ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণে বিরত হল এবং পুরুষোচিত কর্তৃত্ব পালনে ব্যর্থ হল, তখনই মুসলিম দেশগুলোতে কোথাও কোথাও মহিলারা ধর্মদ্রোহী আচরণ করতে সাহস পেল। আর এ সকল পুরুষরা ঐ সকল ‘উন্নত’(?) মহিলাদের অধার্মিক আচরণের জবাব দিল নিজেদের পুরুষত্বকে বিসর্জন দিয়ে মহিলাদের অনুগামী হওয়ার মাধ্যমে।

১৯৬৬ সনে লন্ডনে প্রকাশিত সাঈয়েদ হোসেইন নছর রচিত “ইসলামের আদর্শ ও বাস্তবতা” (Ideals and realities of Islam) নামক পুস্তকে বর্ণিত হয়েছেঃ

ঐতহ্যবাহী সনাতনধর্মী পরিবার স্থিতিশীল সমাজেরই এক একটি ইউনিট। একজন মুসলিম পুরুষ এক সংগে যে চারটে বিয়ে করতে পারে তা যেন চার কোণা কাবাগৃহের মতই স্থায়িত্বের প্রতীক। অনেকে হয়তো বুঝে উঠতে পারেন না যে, ইসলাম কেন এ ধরণের পারিবারিক কাঠামো অনুমোদন করে এবং এ কারণেই তারা ইসলামের বহবিবাহ প্রথাকে সমালোচনা করে থাকেন। মুসলিম আধুনিকতাবাদীরা খৃষ্টান সম্প্রদায়ের মত এ জন্য ইসলামের ওপর বিদ্বেষ পোষণ করেন, এমনকি তারা বহুবিবাহ প্রথাকে অনৈতিক বলেও দাবী করেন।

অবৈধ যৌন সম্পর্ক কমিয়ে আনার জন্য তারা পাঁচ মিশালী যৌনতাকে (Promiscuity) পর্যন্ত সামাজিক কাঠামোতে নীয়র আস্তে সুপারিশ করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি যতটা না মারাত্মক তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতিকর এই আধুনিকতাবাদী ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, তারা ইসলামী শরীয়ার শিক্ষাকে বুঝতে চান না এবং আধুনিক পাশ্চাত্য শ্রেণীগত ধারণার ওপর শরীয়াকে কোন মতেই স্থান দিতে রাজী নন।

নিঃসন্দেহে বর্তমান মুসলিম সমাজের একটি ক্ষুদ্র, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশের মহিলারা প্রচলিত ও ঐতিহ্যগত ইসলামী প্রথার বিরুদ্ধাচারণ করছে। প্রত্যেক সভ্যতার ইতিহাসেই দেখা যায় বিদ্যমান শক্তির বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর তৎপরতা চালু রয়েছে। হিন্দু ধর্মে সব সময়ই দেখা যায় মাতৃত্বের দিকটা শক্তিশালী। কিন্তু ইসলাম ধর্মে পুরুষের কর্তৃত্বই প্রধান। আধুনিকতাবাদী উগ্র প্রকৃতির মহিলারা ইসলামের এই প্রথাটিকে আক্রমণের সবচেয়ে বড় বিষয় বানিয়েছে। এই চৌদ্দশত বছর ধরে মুসলিম সমাজের ভিতরকার শত্রুরা মুসলিম সমাজকে ভেঙ্গে দেয়ার জন্য যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে আধুনিকতাবাদী এ মুসলিম মহিলাদের বিদ্রোহ প্রকৃতপক্ষে তারই ফল। পরুষ কর্তৃত্ববাদই এ সকল মহিলাদের প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার কারণ। পুরুষদের চেয়ে অতি নগণ্য সংখ্যক এই মহিলারা চাচ্ছেন যে, তাদের সব কিছুই হোক পশ্চিমা ধাঁচের। তারা প্রচণ্ড আবেগের সাথে স্বভাবে ও পোশাকে পশ্চিমা হয়ে যেতে চাচ্ছেন। এই ভাবাবেগের কারণ বুঝা কঠিন হবে যদি এর পেছনে নিহিত মানসিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা না হয়।

ইসলামী দৃষ্টির বিচারে নারী ও পুরুষের সাম্য কথাটি গোলাপ-জুঁই এর গুনাগুণ সমান বলার মতই একটি অযৌক্তিক কথা। কারণ, এ দু’টো ফুলেরই রয়েছে পৃথক পৃথক ঘ্রাণ, বর্ণ, আকৃতি ও সৈন্দর্য। তেমনি নারী-পুরুষও এক নয়। এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে ভিন্ন গঠন প্রকৃতি ও আচার আচরণ। মহিলারা যেমন হতে পারে না পুরুষের সমান, তেমনি পুরুষেরাও হতে পারে না মহিলাদের সমান। ইসলাম তাই এদের উভয়কে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় না করিয়ে বিবেচনা করেছে একে অপরের সহযোগী হিসেবে। নিজস্ব গঠন প্রকৃতি অনুযায়ী এদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে পৃথক পৃথক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

পুরুষের যেহেতু বহু গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ সম্পাদন করতে হয়; তাই তাকে কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের মত কিছু সামাজিক প্রাধান্য ও সুবিধা ভোগের সুযোগ দেয়া হয়।

প্রথমতঃ তাকে অর্থনৈতিক গুরু দায়িত্ব বহন করতে হয়। পরিবারের সার্বিক ব্যয় নির্বাহের দায়িত্বই তার। অপরদিকে স্ত্রী যদি ধনী হন, এমনকি তিনি যদি আর্থিকভাবে স্বাধীন হয়েও থাকেন, তবুও তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর। আদর্শবাদী মুসলিম সমাজে নারীকে জীবিকার জন্য কোন দুঃশ্চিন্তা করতে হয় না। এখানে এমন বৃহত্তর পারিবারিক পরিসর রয়েছে যে, কোথাও না কোথাও সে তার স্থান করে নিতে পারবে। এমনকি তার স্বামী বা পিতার অবর্তমানেও এ পারিবারিক পদ্ধতি তার আশ্রয়ের এবং অর্থনৈতিক চাপ থেকে আত্মরক্ষার পথ বের করে দিবে। এই বৃহত্তর ইসলামী পরিবারে একজন দায়িত্বশীল শুধু তার স্ত্রী ও সন্তানদের লালন পালনের দায়িত্ব বহনই করেন না, বরং প্রয়োজনবোধে তার মাতা, ভগ্নি, ফুফু, খালা, শালী, শ্বাশুড়ী এবং এমনকি চাচাতো-মামাতো বোন ও আরো দূরের আত্মীয় স্বজনদের পর্যন্ত সহযোগীতা করে থাকেন। সুতরাং শহুরে জীবনে যেমন একজন মুসলিম নারীকে সকল শক্তি ব্যয় করে চাকুরী খুঁজে বের করতে এবং জীবনের প্রতিটি পরিবারই এক একটি অর্থনৈতিক ইউনিট হওয়ায় পরিবারের সকল প্রয়োজন ভেতর থেকে অথবা যৌথ প্রচেষ্টায় অর্জিত হয়। ফলে নারীকে অনর্থক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জড়াতে হয় না।

দ্বিতীয়তঃ একজন মুসলিম নারী তার নিজের জন্য নিজেই একজন স্বামী খুঁজে নিতে পারে না এবং সে তার সৈন্দর্যের প্রদর্শনীও করতে পারে না- যা দিয়ে কাউকেও আকৃষ্ট করে ভবিষ্যতে তাকে স্বামী হিসেবে পাওয়ার আশা পোষণ করতে পারে। ফলে একজন মুসলিম নারী কাউকেও স্বামী হিসেবে খুঁজে পাওয়ার ভয়াবহ দুঃশ্চিন্তা এবং না পাওয়ার দুঃসহ বেদনা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। নারীর স্বাভাবিক চারিত্রিক দাবী অনুযায়ী তার পিতা-মাতা বা অভিভাবকগণ তার জন্য কোন উপযুক্ত বর খুঁজে না আনা পর্যন্ত সে গৃহেই অবস্থান করে থাকে। এ ধরণের বিবাহই হয়ে থাকে প্রকৃত ধর্মসম্মত বিবাহ এবং এতেই স্থায়িত্ব পায় পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। মুহূর্তের আবেগের বশে যে সকল বিবাহ সংঘটিত হয় সেগুলো প্রায়শই স্থায়ী হতে পারে না। কিন্তু অভিভাবকদের স্থির বিবেচনার মাধ্যমে সংঘটিত বিবাহ সমূহ প্রায়শই স্থায়ী হয় এবং এ সকল বিবাহে সাধারণত তালাকের ঘটনা ঘটে না।

তৃতীয়তঃ বিরল দু’একটি প্রয়োজন ছাড়া মুসলিম মহিলাগণ রক্তাত্ব যুদ্ধ ও রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে মুক্ত। এটাকে অনেকের কাছে একটি বঞ্চনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নারী প্রকৃতির প্রকৃত প্রয়োজনের আলোকে বিচার করলে দেখা যাবে যে, অধিকাংশ নারীর পক্ষেই এ সকল কাজে অংশগ্রহণ খুবই ভারী ও কঠিন বলে প্রমাণিত। এমনকি আধুনিক সে সকল সমাজে ‘সাম্যবাদী’ পদ্ধতিতে নারী ও পুরুষকে সমান করার প্রক্রিয়া চলছে যে সকল সমাজেও চরম কোন অবস্থা না দেখা দেয়া পর্যন্ত মহিলাদেরকে সামরিক বাহিনীতে অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

‘ইসলামের আদর্শ ও বাস্তবতা’ গ্রন্থের অন্যত্র সাঈয়েদ হোসেইন নছর বলেন, “ইসলাম নারীকে যে সকল সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে তার প্রতিদানে তাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট দায়িত্ত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, পরিবারের জন্য একটি শান্তির নীড় উপহার দেয়া এবং সন্তানদেরকে সঠিকভাবে মানুষ করে তোলা। পরিবারে স্ত্রীর ভূমিকা হয় সম্রাজ্ঞীর মত। আর পুরুষ তার পরিবারের হয় স্ত্রীর সম্মানিত মেহমান। গৃহ রবং যে বৃহৎ পারিবারিক পরিমণ্ডলের মধ্যে সে বাস করে তা-ই হচ্ছে মুসলিম নারীর দুনিয়া। নারীর জন্য গৃহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে হচ্ছে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা মৃত্যুর বুকে ঝাঁপ দেয়া। মুসলিম নারী বৃহৎ পারিবারিক অবকাঠামোর মধ্যেই তার অস্তিত্বের মর্ম খুঁজে পায় এবং এই পরিবারের মধ্যেই রয়েছে তার সকল প্রয়োজন পূরণ ও আত্মতৃপ্তির উপাদান।

শরীয়াহ নারী ও পুরুষের প্রকৃতি অনুযায়ী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সমাজে তাদের কর্ম ও অবস্থান নির্দেশ করে। এটি পুরুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য প্রদান করে এ জন্য যে, সে তার পরিবারের সকল দায়-দায়িত্ব বহন করে এবং পারিবারিক আর্থিক, সামাজিক ও অন্যবিধ সকল চাপ থেকে রক্ষ করে। যদিও পুরুষ গৃহের বাইরের রাজ্যে রাজত্ব করে এবং পরিবারের কর্তা, তথাপি গৃহে স্ত্রীর অনুশাসন সে শ্রদ্ধার সাথে মেনে চলে।

মহান আল্লাহ নারী ও পুরুষের ওপর পৃথক পৃথক ভাবে যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন প্রতিটি মুসলিম পরিবারে স্বামী ও স্ত্রী তা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে মেনে নিয়ে এমন একটি দৃঢ় ভিত্তি সম্পন্ন পরিবার গড়ে তোলে যা হয় গোটা সামাজিক সুষ্ঠু কাঠামোর জন্য এক একটি মৌলিক ইউনিট।”

খৃষ্টান জগতে যারা নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থক তারা নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতি বিদ্রোহ ও পারিবারিক পদ্ধতির অপরিহার্যতাকে অস্বীকৃতির মাধ্যমে আসলে নিজ সভ্যতার গোটা উত্তরাধিকারকেই অস্বীকার করছে এবং তার প্রতি বিদ্রোহী হয়েছে।

আধুনিক ইউরোপ এ কথা ভালো করেই জানে যে, মধ্যযুগীয় খৃষ্টান সমাজে সামন্ত প্রথার অনিষ্টকারিতা এবং যাজকদের অত্যাচার সত্বেও সামাজিক সংহতি, শান্তি, স্থায়িত্ব ও একতা বিরাজমান ছিল। মধ্যযুগীয় ইউরোপে খৃষ্টান পরিবারগুলোতে যে সকল মূল্যবোধ আচারিত হতো তার একটি উজ্জ্বল বর্ণনা বিখ্যাত জার্মান চিত্রশিল্পী আলব্রেট ডিউরার (১৪৭১-১৫২৮), যিনি একজন ধর্মনিষ্ঠ খৃষ্টান ছিলেন- তার পারিবারিক ঘটনাপঞ্জী থেকে নিম্নে বর্ণিত হলঃ ডিউরার পরিবারের এক সদস্যের বর্ণিত এই পারিবারিক জীবন ইসলামী পারিবারিক পদ্ধতির খুব কাছাকাছি।

“আমার শ্রদ্ধেয় পিতা, আলব্রেট ডিউরার জার্মান গেলেন এবং সেখানে এক নিচু পল্লী এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান করলেন। তারপর তিনি ১৪৫৫ সনের সেন্ট ইলিজিয়াস দিবসে (২৫শে জুলাই) নিউরেমবার্গ চলে এলেন। ঐদিন ছিল ফিলিপ পার্কিমারের বিবাহের দিন। এ জন্য বাড়ি সাজানো হয়েছিল এবং বৃহৎ লাইম গাছের নিচে মেহমান অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। এরপর থেকে ১৪৬৮ সন পর্যন্ত দীর্ঘ বছর আমার প্রিয় পিতা আলবার্ট ডিউরার বৃদ্ধ হাইরনোনাইমাস হপারের দেখাশুনা করেন। এরপর হপার তার ১৫ বছরের সুশ্রী, সুঠাম ও ধার্মিক কন্যা বারবারাকে তার সাথে বিয়ে দেন। এই বিয়ে হয়েছিল সেন্ট ভাইটাস দিবসের (৮ই জুন) ৮ দিন আগে। আমার এই মহীয়সী মা ৮টি সন্তান জন্মদান করেন এবং তাদেরকে বড় করে তুলেন। কখনো তাকে সম্মুখীন হতে হয়েছে সংক্রামক ব্যাধি ও মারাত্মক অসুস্থতার এবং সহ্য করতে হয়েছে প্রচণ্ড অনাহার, বিদ্রূপ, উপহাস, অবজ্ঞা ও উদ্বিগ্নতা; কিন্তু তিনি কখনো অন্তরে পোষণ করেননি কোন অস্থিরতা ও প্রতিশোধ স্পৃহা। আমার প্রিয় পিতার সন্তান, আমার এক ভাই ও বোনেরা সকলেই মারা গেছে কেউ অল্প বয়সে আর কেউ বড় হয়ে। শুধু আমরা তিন ভাই এখনো বেঁচে আছি এবং ততদিন বেঁচে থাকবো যতদিন প্রভু চাইবেন। আমরা এই তিন ভাই হচ্ছি আমি আলব্রেট, আমার ভাই অ্যান্ড্রেয়াস ও আমার ভ্রাতৃতুল্য হ্যান্স। হ্যান্স আমার পিতার সন্তান নন। আমার পিতা ছিলেন তার ভাইদের মধ্যে জ্যৈষ্ঠও। সারা জীবনই তিনি কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। নিজের এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ পোষণের জন্য নিজ হাতেই রোজগার করেছেন। তার জীবনে ছিল অনেক দুঃখ, প্রলোভন ও প্রতিকূলতা।

ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ, মানুষের প্রতি কল্যাণময়ী, ধৈর্যশীল, বিনম্র এই মানুষটি ছিলেন একজন আদর্শ খৃষ্টান। তাকে যারাই জানতো তারা সকলেই তার প্রশংসা করতো। সমাজের কাছে তার সামান্যই চাওয়া পাওয়া ছিল। তিনি ছিলেন খুব কম কথার লোক ও খোদাভীরু মানুষ। আমার এই মহান পিতা তার সন্তানদেরকে খোদাভীরুতা শিক্ষা দেয়ার জন্য খুবই পেরেশান ছিলেন। তার সবচেয়ে বড় আশা ছিল তার সন্তানদেরকে খোদা ও মানুষের দৃষ্টিতে কল্যাণধর্মী করে গড়া তোলা। এ জন্য তিনি সব সময় আমাদেরকে উপদেশ দিতেন ঈশ্বরকে ভালবাসতে এবং মানুষের সাথে সদাচরণ করতে। আমি শিক্ষার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলাম বলে তিনি আমার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। এ জন্যই তিনি আমাকে স্কুলে পাঠালেন। এখন আমি পড়তে ও লিখতে শিখলাম তখন তিনি আমাকে স্কুল থেকে নিয়ে এলেন এবং স্বর্ণকারের শিক্ষা ও কলাকৌশল শিখালেন। যখন আমি এই বিদ্যায় পারদর্শী হলাম তখন আমি অনুভব করলাম যে, স্বর্ণকারের চেয়ে চিত্রকর হওয়াই ভালো। যখন আমি এ কথা আমার পিতাকে জানালাম তখন তিনি তা শুনে খুশি হতে পারলেন না এবং তাঁর অধীনে শিক্ষানবিস হিসেবে যে সময় হারিয়েছে তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আমাকে আমার ইচ্ছামত অগ্রসর হতে অনুমতি দিলেন এবং ১৪৮৬ সনের সেন্ট এন্ড্রিট দিবসে (৩০শে নভেম্বর তারিখে) আমার পিতা আমাকে মিখাইল ও লজিমিউটের অধীনে তিন বছরের জন্য শিক্ষানবিস নিয়োগ করলেন। এই সময়েও প্রভু আমাকে পরিশ্রম করার শক্তি দিলেন এবং এ সময়ই বিষয়টি ভালভাবে শিখলাম। কিন্তু আমার শিক্ষকের সহযোগীদের হাতে খুবই অত্যাচারিত হয়েছিলাম। শিক্ষা শেষে আমি যখন ঘরে ফিরলাম তখন হ্যানসফ্রে আমার পিতার সাথে আলাপ আলোচনা করে তার কন্যা অ্যাগনেসকে আমার সাথে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অ্যাগনেসের সাথে তিনি আমাকে ২০০ ফ্লোরিনও দান করলেন। ১৪৯৪ সনের সেন্ট মার্গারেট দিবসের কিছু আগে ৭ই জুলাই সোমবার আমাদের এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়।

এর কিছুকাল পর আমার পিতা আমাশয় রোগে আক্রান্ত হলেন এবং কারো চিকিৎসাতেই তিনি সুস্থ হলেন না। যখন তিনি দেখলেন যে, মৃত্যু এসে যাচ্ছে তখন তিনি তার কাছে নিজেকে খুব শান্তভাবে ও ধৈর্যের সাথে সমর্পন করলেন এবং আমাকে আমার মায়ের যত্ন নিতে এবং আমাদের সকলকে খোদার বিধান মত জীবনযাপন করতে নির্দেশ দিলেন। তার জীবনের শেষ স্যাক্রামেন্টস দিবস (খৃষ্টীয় ভোজ দিবস) অতিবাহিত হল এবং তিনি বরণ করলেন একজন খৃষ্টান ধার্মীকের মরণ। রেখে গেলেন আমার মাকে একজন বিধবা হিসেবে। আমার পিতা জীবিত অবস্থায় সব সময়ই আমার নিকট আমার মায়ের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। তিনি বলতেন ‘তোমার মা একজন খুবই ভালো মেয়েলোক।’ এজন্যই আমি আমার মাকে কখনো ভুলে না থাকার সংকল্প করেছি।

হে আমার বন্ধুগণ, আমি তোমাদেরকে ঈশ্বরের নামে বলছি, তোমরা যখন আমার এই ধার্মিক পিতার মৃত্যুর কাহিনী পড়বে তখন তোমরা তার পারলৌকিক কল্যাণের জন্য এবং তোমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য খৃষ্টের নিকট এবং মাতা মারিয়মের নিকট এই বলে পার্থনা করবে, ঈশ্বর যেন আমাদেরকে তাঁর সেবার মাধ্যমে সার্থক জীবন ও কল্যাণময় মৃত্যু দান করেন। এটা কখনো সম্ভব নয় যে, এক ব্যক্তি উত্তম জীবন যাপন করবেন আর তার মৃত্যু হবে একটা অশুভ মৃত্যু। কারণ, ঈশ্বর করুণাময়।

এখন আমি আপনাদেরকে জানাচ্ছি যে, ১৫১৩ সালের ‘রোগেশন’ দিবসের আগের মঙ্গলবার আমার মাতা যাকে আমি আমার পিতার মৃত্যুর দু’বছর পরই যখন তিনি কর্পদক শূন্য হয়ে গেলেন তখন আমার তত্ত্বাবধানে নিয়ে এসেছিলাম, দীর্ঘ নয় বছর আমার সেবাধীনে থাকার পড় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমরা ঐদিন সকাল বেলা তার ঘরের দরজা ভেঙ্গে তাকে বের করে আনলাম। কারণ তিনি এতই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, দরজা খুলে দেয়ার মত কোন শক্তি তার ছিল না এবং দরজা ভেঙ্গে বের করাই ছিল একমাত্র উপায়। আমরা তাকে নীচ তলায় নিয়ে এলাম এবং তার জন্য উভয় ‘সেক্রামেন্ট (প্রভুর উদ্দেশ্যে ভোজ)’ অনুষ্ঠান করা হল। কারণ, সকলেই ধারণা করলেন যে, তিনি মারা যাচ্ছেন। আমার পিতার মৃত্যুর পড় থেকেই তিনি কখনই শারীরিকভাবে ভালো ছিলেন না।

অসুস্থ হয়ে পড়ার দিন থেকে এক বছরেরও অধিককাল পরে খৃষ্টীয় ১৫১৪ সনের ১৭ই মে রাতের আধার ঘনিয়ে আসার দু’ঘণ্টা আগে আমার এই মহিয়ষী মা বারবারা ডিউরার ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন এবং পোপ ধর্মগুরুদের মাধ্যমে তার পাপ ও দুঃখ মোচনের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধানুষ্ঠান করা হল। মৃত্যুর আগে তিনি আমার জন্য আশীর্বাদ ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করলেন এবং পাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য অনেক উপদেশ দিলেন। তিনি যদিও মৃত্যুর ভয়ে খুবই ভীত ছিলেন, কিন্তু তিনি জানালেন যে, ঈশ্বরের সাথে সাক্ষাত করতে তিনি মোটেই ভীত নন। আমার মায়ের মৃত্যুতে এতই ব্যথিত হলাম যে, তা আমার পক্ষে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ঈশ্বর তার আত্মার মঙ্গল করুন। সর্বদা ঈশ্বরের স্তুতিকীর্তনে এবং আমরা যাতে ঈশ্বরকে শ্রদ্ধা জানাই তা দেখতে তিনি খুবই প্রশান্তি অনুভব করতেন। নিয়মিত গীর্জায় যাওয়া তার অভ্যাস ছিল। আমি কোন ভুল করে ফেললে তিনি খুবই ক্ষেপে যেতেন এবং তীব্র ভৎর্সনা করতেন। আমি আমার ভাইয়েরা কোন অন্যায় কাজ করে ফেলি এ ভয়ে তিনি সব সময় ভীত থাকতেন। যখনই ঘরের বাইরে যেতাম কিংবা বাহির থেকে ঘরে ফিরতাম তখনই তিনি বলতেন ঈশ্বর তোমার সহায় হউন। তিনি সব সময়ই আমাদেরকে আমাদের আত্মা, জৈবিকতা ও ধর্ম সম্পর্কে সজাগ করে দিতেন। তার সবকর্ম, মানুষের প্রতি দয়া অথবা তার প্রশংসার দিকগুলো এমনই বলে শেষ করতে পারব না। তিনি যখন মারা গেলেন তখন তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর এবং আমি আমার সাধ্যমত খুব ভালো ভাবেই তাকে সমাহিত করলাম। মহান প্রভু আমাকেও একজন সত্যিকার খৃষ্টানের মৃত্যু দান করুন এবং তাঁর সাথে, তাঁর স্বর্গীয় সেবক আমার বাবা, মা, ও বন্ধুদের সাথে মিলিত হওয়ার তাওফিক দিন এবং আমাদেরকে পারলৌকিক কল্যাণময় অনন্ত জীবন দান করুন। আমীন! আজীবন আমার মা মৃত্যুর পরপারেই অধিক সুখের স্বপ্ন দেখতেন।”

সম অধিকারবাদীদের প্রস্তাবিত অদ্বৈত-যৌনতার (Uni-sexual) সমাজ হচ্ছে এমন একটি সমাজ যেখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য স্বীকৃত নয় এবং সে সমাজটি এমন একটি সমাজ যেখানে বিবাহ, সংসার ও পরিবার, লজ্জা, সতীত্ব ও মাতৃত্ব ঘৃণিত বিষয় এবং এগুলো ‘প্রগতি’ ও ‘স্বাধীনতার’ পরিচায়ক না হয়ে বরং চরম অধঃপতনের কারণ বলেই বিবেচিত। এর ফলাফল নির্ভেজাল অরাজকতা, সীমাহীন বিশৃঙ্খলা ও সম্পূর্ণ সামাজিক অব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়।

যদি তাই হয়, তবু কেন সম অধিকারবাদ (Feminism) এত জনপ্রিয় ? লখনৌ থেকে ১৯৭০ সনে প্রকাশিত আবুল হাসান আলী নদভী বিরচিত ‘ধর্ম ও সভ্যতা’ প্রবন্ধে বলা হয়ঃ

“বস্তুবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থা খুবই পুরাতন এবং অধিক জনপ্রিয়ও। এর চেয়ে আর কোন সমাজ ব্যবস্থা কোন দেশ ও কালের অধিকাংশ মানুষের কাছে এত বেশী সহজ গ্রহণযোগ্য, সন্তোষজনক ও অনায়াসে বিকাশযোগ্য হয়নি। জনসাধারণের কাছে এর প্রতি মোহনীয় এমনি একটি গভীর আকর্ষন রয়েছে যে, এর শিকড় সমাজের গভীরে প্রবেশ করাতে হয় না, কিংবা এর জন্য মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে জাগিয়ে তুলতে হয় না। অথবা এর জন্য প্রয়োজন হয় না কোন ত্যাগ ও কোরবানির। এতে কারো জন্য কারো কোন দুঃখ-কষ্টও স্বীকার করতে হয় না। শুধু চলতে হয় সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে বস্তুবাদের ন্যায় আর কোন সামাজিক ব্যবস্থারই মানব জাতির ওপর এত অধিক ও ব্যাপক কর্তৃত্ব করার সুযোগ হয়নি।”

বর্তমান সময়ের মত কোন কালেই মানব জাতির ওপর নৈতিক অধঃপতন ও সামাজিক অবক্ষয় এত বিশ্বজনীনভাবে বিস্তার লাভ করেনি। নারী পুরুষের সাম্যতার ধারণাটি মানব জাতিকে পশুর চেয়েও নিম্নস্তরে নিয়ে এসেছে। পশু তার সহজাত প্রবৃত্তি দ্বারা চালিত হয় এবং তার স্বভাবের বিরুদ্ধে সে কোন কিছুই করতে পারে না। পশুদের মাঝে কোন সমকামিতা নেই। একই জাতের পুরুষ পশু শুধু ঐ জাতীয় স্ত্রী পশুদের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। কোন পুরুষ পশু কখনই কোন পুরুষ পশুর প্রতি এবং কোন স্ত্রী পশু কখনই কোন স্ত্রী পশুর প্রতি কামভাব পোষণ করে না। পশুদের মধ্যে বাচ্চারা যখন বড় হয় এবং নিজেদের যত্ন নিজেরাই নিতে শিখে তখন থেকে মাতৃত্বের সম্পর্কটি সম্পুর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে যায়। অধিকাংশ প্রজাতির পুরুষ পশুর মধ্যে ঔরসজাতকদের প্রতি কোন আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। পশুদের মধ্যে লজ্জা, সতীত্ব, বিবাহ ও কন্যাপুত্র সহ পারিবারিক বন্ধন ইত্যেদি কোন বিষয় নেই। এই ধারণা ও বন্ধন শুধু মানবীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। নারী সাম্যবাদীরা মানুষের এই মানস পরিচায়ক গুণাবলীকেই ধ্বংস করে দিতে এবং মানুষে মানুষে বিদ্যমান সকল সম্পর্কের ভিত্তি ও সামাজিক সকল বন্ধন ধীরে ধীরে দূর্বল করে দিতে চাচ্ছে। এর পরিণতি হবে আত্মহত্যা। আর সেই আত্মহত্যা কোন একক জাতির নয়, বরং তা হবে গোটা মানব প্রজাতির জন্য।

                                                                                    সমাপ্ত



ফটো গ্যালারী

1/6
ওহুদ যুদ্ধ - হযরত মহাম্মদ (সা:) এর বিপ্লবী জীবন
2/6
মুসলিম নারীর বিধান
3/6
ইসলামি অর্থনীতিতে উপার্জন ও ব্যয়ের নীতিমালা
4 / 6
ইসলামীক জিজ্ঞাসাঃ লাঠি হাতে নিয়ে জুমার খুতবা দেয়া কি সুন্নত?
5/6
মসজিদে নববী যিয়ারতের কিছু আদব-কায়দা
6/6
উম্মাতে মুসলিমার দায়িত্ব

Islam-icon Profile.png